নৌকার নাম পদ্মা
বাবা পদ্মা নদী ভালোবাসতেন। নদীটির গ্র্যান্ডিউর এবং সৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি অনেক কবিতাও লিখেছেন। তাঁর হাউজবোটের নামও রাখলেন পদ্মা। নামটি তাঁর দেয়া হলেও, নৌকাটি কিন্তু বহু আগে থেকেই আমাদের বাড়িতে ছিল। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি তৈরি করেন। তিনি এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সময় কোলকাতার কাছে হুগলী নদীর ধারে এটি বাঁধা থাকত। দেবেন্দ্রনাথ হাউজবোটটিতে করে গঙ্গার উজানে ও ভাটিতে বেড়াতেন। একবার এ হাউজবোটে করে বেড়ানোর সময় বার্তাবাহক এসে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মৃত্যুর সংবাদ দেন।[১] মহর্ষি এতে করে বেনারসেও গেছেন। সিপাহী বিদ্রোহের সময়টাতেও তিনি এরকম একটি নৌভ্রমণ করেছিলেন।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালু হবার আগে বাংলায় যাতায়াত হতো মূলত নৌপথে। ধনী লোকদের বাড়িতে সে সময় নানা ধরনের নৌকা থাকত, হাউজবোট তো একটা থাকতই। দূরের যাত্রায় যেমন এর ব্যবহার হতো, তেমনি এটা দিয়ে আনন্দভ্রমণও করা হতো। বিশেষ ধরনে বানানো এ ধরনের বোট কেবল বাংলায়ই দেখা যেত। এদের খোল ছিল প্রশস্ত, ফলে জায়গা থাকত অনেক। এগুলো ছিল ভারী, চলতও ধীরে ধীরে। তবে সুবিধা ছিল যে অগভীর জলেও চলতে পারত। এ ধরনের হাউজবোট তৈরি হতো ঢাকায়, ফলে এদেরকে ঢাকাই বজরা বলা হতো। জমিদাররা এগুলোর মালিকানা নিয়ে গর্ব করত এবং কে কার থেকে বাহারি বজরা বানাতে পারে তার পাল্লা দিত। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বলে আজকাল আর এ ধরনের হাউজবোট দেখা যায় না।
পদ্মাকে বাবা ভাবতেন তাঁর পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহারগুলোর একটা হিসেবে। যৌবনে তিনি একান্ত নিজের মধ্যে নিমগ্ন এবং লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সে সময়টায় সমাজ থেকে দূরে থাকতেন। হাউজবোটটি তাঁকে কাঙ্ক্ষিত নির্জনতার সুযোগ এনে দিয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির বিশাল জমিদারি দেখতে তাঁকে বাংলার বিভিন্ন স্থানসহ উড়িষ্যার গ্রামেও যেতে হতো। তিনি পদ্মায় করে যেতেন। অধিকাংশ সময় কাটত নদীতে নদীতে। তাঁর জন্য এর চেয়ে সুবিধাজনক আর কিছুই হতে পারত না। তিনি পুরোমাত্রায় এর সদ্ব্যবহার করেছিলেন। মাঝবয়সে নানা কারণে তিনি শান্তিনিকেতনে চলে যান। সেখানে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানটি তখন তাঁর ধ্যান-জ্ঞান হয়ে দাঁড়ায়। গোড়ার দিকে সেখান থেকেও হঠাৎ শিলাইদহে চলে আসতেন এবং পদ্মায় করে ঘুরে বেড়াতেন। শান্তিনিকেতন ও কোলকাতার উদ্বেগ ও অশান্তির জীবন থেকে পালাতে পেরে তিনি যে কত খুশি হতেন, তা তাঁর সে সময়কার লেখা চিঠি পড়লে বোঝা যায়।
তাঁর জীবনের দুটি ভাগ। প্রথম ভাগে তিনি একজন নির্জন শিল্পী, যিনি জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছেন, সন্ধান করছেন এমন পরশপাথরের, যা সৃষ্টির প্রেরণা দেবে, সাহিত্যকর্মকে অর্থমণ্ডিত করে তুলবে। দ্বিতীয় ভাগে তিনি একজন পরিপক্ক মানুষ, যিনি নানান কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন, নিজের চিন্তা ও কর্মের সঙ্গে বন্ধু-বান্ধবদের সম্পৃক্ত করছেন। দুপর্যায়ের ক্ষেত্রেই পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে তাঁর গভীরতম টান ছিল গ্রামবাংলার প্রতি, যেখানে উর্বর সবুজ ভূমিতে বাঁশঝাড় দখিনা হাওয়ায় দুলছে, দীঘল দেহের ভাঁজে ভাঁজে গ্রাম লুকিয়ে রেখেছে বিশাল সব নদী আর তাদের ধবধবে বালুচরগুলোকে।
আমার বয়স সাত পেরুতে না পেরুতেই বাবা আমাকে নিয়ে প্রায়ই নৌপথে বের হতে লাগলেন। মা অবশ্যি শংকায় আকুল হতেন, কিন্তু বাবা শুনতেন না। প্রায়শ সঙ্গী হবার ফলে তাঁর হাউজবোটের জীবন সম্পর্কে আমি ভালোভাবে জানতে পেরেছিলাম। অনেক অ্যাডভেঞ্চার ও মজার ঘটনারও সাক্ষী আমি। এমন একটি ঘটনার কথা ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছি। এখন আমি কেবল হাউজবোটটি এবং বাবার সাহিত্যের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথাই বলব।
শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর-এ তিন জমিদারি আর কুষ্টিয়ার কারখানা নদীপথে সংযুক্ত ছিল। এগুলোতে যাতায়াতের সুবাদে বাবা প্রচুর সময় নদীতে কাটাতে পারতেন। এ বিষয়ে আমার সবচেয়ে পুরনো স্মৃতি হল কুষ্টিয়া যাবার ঘটনা। কুষ্টিয়া রেলস্টেশনটি গড়াই নদীর বাঁধের উপর বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়েছিল। স্টেশনমাস্টার ছিল একপেয়ে এক ইংরেজ। নদীতে প্রবল স্রোতের ঘূর্ণিপাক, তীরে নোঙর করা অসংখ্য মালবাহী নৌকা আর ডিঙির বহর। আমার কাছে এসবই ছিল নতুন আর নিষিদ্ধ জগতের মত। কিন্তু হাউজবোটে ঢুকে গেলেই সবকিছু বাড়ির মত। এর ভিতরকার চমৎকার কারুকাজ আর পারিবারিক পরিবেশে আমি স্বস্তি বোধ করতাম। খাবার ছিল মূলত ইলিশ মাছের। হালকা কিছু খেয়েই বাবা লিখতে বসে যেতেন। আর আমি বসে বসে নদীর জলে অগুনতি পোকামাকড়ের খেলা দেখতাম। সঙ্গে ছিল ব্যস্ত জনপদের দৃশ্য, যে দৃশ্য হাজারবার দেখেও ক্লান্তি আসে না। ফ্যাক্টরি দেখা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। পাটের গাঁট করার জন্য বিশাল হাইড্রলিক প্রেসার, দূরপল্লীতে পাঠানোর জন্য সারি করে সাজিয়ে রাখা আখ মাড়াইয়ের যন্ত্র, বড় বড় গুদাম ভর্তি সরিষা আর অন্যান্য তৈলবীজ, ঘর্মাক্ত শ্রমিকদের হুড়াহুড়ি, এসব ছিল নিত্যকার দৃশ্য। বাবা প্রত্যেকটি বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন কিন্তু এর জন্য বেশি সময় লাগত না। কর্মচারীরা লম্বা লম্বা রিপোর্ট আর হিসেবপত্তর নিয়ে আসত, কিন্তু বাবা যেন কেমন করে অতি অল্পতেই সারকথাটা বুঝে নিয়ে সমাধান করে দিতেন। কাজ হয়ে গেলেই আবারও লেখায় মগ্ন হতেন, যেন মাঝখানের এ বিরতিটুকু তাঁর মনঃসংযোগে একটুও চিড় ধরাতে পারেনি। লেখা চলত সূর্যাস্ত পর্যন্ত। সন্ধ্যা হয়ে এলে তিনি ডেকের উপর বসতেন। তিনি আমাকে কী বলতেন সেগুলো আজ আর মনে নেই। বেশির ভাগ সময়ই চুপচাপ বসে থাকতেন আর স্রোতের টানে ভেসে চলা জেলে নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। অস্তগামী সূর্যের লালচে আলোয় সেগুলোকে মনে হতো ছায়ার মত। আকাশে একটি দুটি করে তারা ফুটতে ফুটতে রাত একসময় রহস্যের ভারি চাদর দিয়ে চরাচর ঢেকে দিত I ততক্ষণে খাবার তৈরি হয়েছে। বাবুর্চি ফটিক এসে সে খবর দিয়ে নীরবতা ভাঙত। খাওয়া শেষ হতে না হতেই আমার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসত কিন্তু বাবা ঘুমাতেন না। তিনি পড়তে বসতেন। তাঁর সঙ্গে সব সময়ই বইপত্র থাকত। যতদূর মনে পড়ে বিভিন্ন সমাজের তুলনামূলক আলোচনার বই, নৃতত্ত্ব ও অন্যান্য বিজ্ঞান, ইন্দো-আর্য ভাষার তুলনামূলক ব্যাকরণ, সংস্কৃত ধ্রুপদী সাহিত্য- এগুলোই ছিল তাঁর পছন্দের। আরও ছিল ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস ও সমালোচনামূলক বই, ফ্রেঞ্চ আর রুশ সাহিত্যের অনুবাদ। হালকা সাহিত্য, সে বাংলা-ই হোক আর ইংরেজি-ই হোক, তাঁকে টানত না।
জমিদারিতে গেলেও এ রুটিনের তেমন একটা হেরফের হতো না। কেবল সকালের দিকটা আলাদা করে জমিদারির কাজে ব্যয় করতেন। হয়ত কর্মচারীদের নিয়ে সভা করতেন বা প্রজাদের দরখাস্তের শুনানি করতেন। বাহারি পোশাকপরা প্রহরীরা বন্দুকের গুলি ছুঁড়ে বাবার আগমন ঘোষণা করত, আর ঘোমটা পরা মহিলারা করত শঙ্খধ্বনি। যেন মধ্যযুগের কোনো সামন্ত এসেছেন। সে দিনটি পুণ্যাহ হলে তো কথাই নেই। শোভাযাত্রা সহকারে বাবাকে অফিস বিল্ডিংয়ের সামনের বেদিতে নিয়ে বসানো হতো। সামনে খাটানো শামিয়ানার নিচে বসত প্রজারা। বাবাকে বসতে হতো উঁচু মঞ্চে, যেন সবাই তাঁকে দেখতে পায়। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর প্রজারা একে একে এসে তাদের জমিদারকে নজরানা (খাজনার প্রথম কিস্তি, টাকার অঙ্কে খুবই সামান্য) দিত। প্রথমে আসত গাঁয়ের সর্দার ও মুরব্বিরা। এর পর সাধারণ জনদের পালা। নজরানা দেয়ার পর কুর্নিশ করে বাবার আশীর্বাদ নিত। একদিকে যখন খাজনা দেয়া চলছে, অন্যদিকে তখন খাবারের আয়োজন করতে সবাই ব্যস্ত। প্রজারা নিজেরাই সব ব্যবস্থা করত। তারা এটাও খেয়াল রাখত যে, সামাজিক সম্মান ও রীতিনীতির যেন ব্যত্যয় না ঘটে। হাজার হাজার লোককে খাওয়াতে হতো বলে আয়োজন হতো খুবই সাদামাটা-কেবল চিড়া আর দই। এ থেকেও তারা যে আনন্দ পেত তা ছিল দেখার মত।
পদ্মা নদী আকারে এত বিশাল, এর স্রোত এত ভয়ংকর আর প্রলয়ের মাতম নিয়ে এত ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় আসে যে তীরবাসীদের জীবনে হরহামেশাই বিপদসঙ্কুল অ্যাডভেঞ্চারের দেখা মেলে। এ জীবন বাবা ভালোই উপভোগ করেছিলেন। তিনি দক্ষ সাঁতারু ছিলেন। তাঁকে অনায়াসে গড়াই নদী সাঁতরে যেতে দেখেছি। আমি যেন সাঁতার শিখতে বাধ্য হই সেজন্য তিনি আমাকে হাউজবোটের ডেক থেকে নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। বলা বাহুল্য,
পরদিন আর ফেলে দিতে হয়নি! বাবা ঝুঁকি নিতে ভালোবাসতেন। খারাপ আবহাওয়ায় পদ্মায় নাও ভাসাতে আমাদের বুড়ো ম্যানেজার যে কতবার মানা করেছে। কিন্তু বাবা বিপদকে থোড়াই কেয়ার করতেন। একবার মন ঠিক করে ফেললে কোনো কিছুই তাঁকে ফেরাতে পারত না। অবশ্য তাঁর সঙ্গে অন্যদেরও জীবন-সংশয় হতে পারে দেখলে তিনি সহজেই ক্ষান্ত হতেন।
হাউজবোট পদ্মায় বসে তিনি কোন্ কোন্ গল্প বা কবিতা লিখেছিলেন তা আমার মনে নেই। হয়ত কোনো একদিন রবীন্দ্রসাহিত্যের কোনো এক পরিশ্রমী গবেষক তা বের করে আমাদের জানাবেন। তবে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, বিংশ শতাব্দী শুরুর পূর্ব পর্যন্ত তাঁর রচনাবলির অধিকাংশই লেখা হয়েছিল হাউজবোটে। নদীয়া, ফরিদপুর, পাবনা আর রাজশাহীর বিভিন্ন নদীতে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে তিনি গ্রামবাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে জানতে পেরেছিলেন, পরবর্তীতে যা তাঁর সাহিত্যের খোরাক হয়েছে।
হাউজবোট পদ্মা বাবার যথেষ্ট কাজে লেগেছে। পৃথিবী যখন তাঁর শান্তি কেড়ে নিয়েছে তখন তা তাঁকে আশ্রয় ও শান্তি দিয়েছে। প্রয়োজনের সময় তাঁকে অ্যাডভেঞ্চারে মেতে ওঠার সুযোগ দিয়েছে। পল্লী জীবনের গভীরে নিয়ে গিয়ে লেখনীর রসদ যুগিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ছিল এক অফুরান আনন্দের ভাণ্ডার।
*
১. সম্ভবত ২০.৯.১৮৪৬ তারিখে দেবেন্দ্রনাথ পিতার মৃত্যুসংবাদ পান। দ্বারকানাথের মৃতদেহ ইংল্যান্ডের কেলসল গ্রিনের সমাধিতে সমাহিত করা হয়, তবে তার আগে হৃৎপিণ্ড বের করে রাখা হয় ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। মৃত্যুর প্রায় ২ মাস ১০ দিন পর ১১ অক্টোবর গঙ্গার তীরে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পিতার কুশপুত্তলিকা দাহ করেন।
