হিমালয় যাত্রা
ভারতের বিভিন্ন স্থানে তীর্থযাত্রার বিষয়ে সিস্টার নিবেদিতা খুব আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে দুর্গম পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণ বিষয়ে তাঁর প্রবল টান ছিল। যাঁরা তাঁর বই দি ওয়েভ অব ইন্ডিয়ান লাইফ পড়েছেন, তাঁদের হয়ত মনে আছে তীর্থযাত্রার কী আদর্শ বর্ণনাই না তিনি করেছেন! তিনি যে অতি কর্মমুখর একজন ব্যক্তি, এ ক্ষেত্রেও তার ছাপ রেখেছেন। তীর্থযাত্রার মনোমুগ্ধকর বিবরণ লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তরুণ বয়সীদের বিভিন্ন দল গঠন করে তাদেরকে এ সকল স্থানে ভ্রমণে পাঠিয়েছেন। তাঁর মতে এটা ছিল তাদের শিক্ষার অঙ্গ। তাঁর কাছে বাবা শুনতে পেলেন যে বেলুড় মঠের সাধু সদানন্দ স্বামীর নেতৃত্বে তরুণদের একটি দল পশ্চিম হিমালয়ের কেদারনাথ মন্দিরে যাচ্ছে। তিনি এ দলের সঙ্গে আমাকে ও পাঠাতে চাইলেন।[১] আমি তখন শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মাচার্য আশ্রমের ছাত্র। বাবা ভাবলেন, পদব্রজে পাহাড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে কষ্ট সহ্য করার শিক্ষা লাভ হবে। দুর্গম হিমালয় দিয়ে প্রায় দুইশত মাইল হেঁটে বরফঢাকা অঞ্চলে অবস্থিত কেদারনাথ মন্দিরে পৌঁছা তো সহজ কথা নয়। আজ যখন পিছন ফিরে তাকাই, ভাবতে আশ্চর্য লাগে, এমনকি এ যুগেও কয়জন অভিভাবক তাদের অপরিণত বয়সী সন্তানকে এরূপ কঠিন যাত্রায় পাঠাতে সাহস করবেন!
নষ্ট করবার মত সময় ছিল না, যদিও প্রস্তুতি তেমন কিছু নয়। কাপড়- চোপড় যত কম ও সাদাসিধে হয় ততই ভালো। একজোড়া ধুতি ও কোর্তা, ভিতরে পরার জন্য এক সেট গরম জামা, আর পাহাড়ে হাঁটার উপযোগী একজোড়া বুট। এগুলোর সঙ্গে নগদ একশত রুপি সঙ্গে নিয়ে এক বিকেলে হাওড়া স্টেশন থেকে রেলের তৃতীয় শ্রেণির কামরায় আমাদের যাত্রা শুরু হল। দলটির গঠন ছিল অদ্ভুত রকমের। আমাদের পরিবারের দিনেন্দ্র[২] আমাদের সঙ্গী ছিল। ছিল একদল হবু সন্ন্যাসী, বড়লোকের একটি বা দুটি বখে যাওয়া সন্তান আর কয়েকজন দোকানদারের ছেলে। আমিই ছিলাম সবার চেয়ে ছোট। অন্যদের বয়স আমার থেকে অনেক বেশি। ভিতরে ভিতরে খানিকটা দমে গিয়েছিলাম। কিন্তু স্বামীজী আমাকে কাছে টেনে নিলেন। শীঘ্রই বুঝতে পারলাম যে স্বামীজীর কড়া হলুদ কাপড়ের আড়ালে একটি ভালো মন লুকিয়ে আছে, আর তিনি খুব রসিকও বটেন। আস্তে আস্তে আমার সাহস বেড়ে গেল। তাঁর শিষ্যদের একজন ছিলেন অমূল্য মহারাজ। তাঁর পিতা মহেন্দ্রবাবু রামকৃষ্ণের কথামৃত সংকলন করেছিলেন। অমূল্যবাবু আমার খুব যত্ন নিয়েছিলেন, অনেকটা বড়ভাই যেমন তার ছোটভাইয়ের যত্ন নেয়। তাঁর জন্য আমার শ্রদ্ধার শেষ নেই। তিনি এখন রামকৃষ্ণ মিশনের সভাপতি, আর তাঁর এখনকার নাম স্বামী শংকরানন্দ।
রেললাইন গেছে কুমায়ুন পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত। শেষ রেলস্টেশনটির নাম কাঠগোদাম। আমরা সেখানে ট্রেন থেকে নামলাম। তার পর থেকে কেবল হাঁটা আর হাঁটা। প্রথমদিকে আমরা দিনে পাঁচ থেকে আট মাইল হাঁটতাম। শীঘ্রই দিনে বিশ মাইল হাঁটা শুরু হল। কিন্তু শহরে বড় হওয়া কারও কারও জন্য এটা ছিল খুব বেশি। স্বামীজী তাদেরকে নৈনিতালে রেখে গেলেন। বাকি রইল দশ জনের মত। তিব্বতের সীমানাসংলগ্ন কেদারনাথ মন্দিরে যেতে আর আসতে প্রায় চারশ মাইল পথ। পদব্রজে এ দূরত্ব অতিক্রম করতে আমাদের এক মাসের কিছু বেশি সময় লাগল।
কী বিচিত্র ছিল সে অভিজ্ঞতা! প্রতিদিন চোখের সামনে কত নিত্যনতুন মনোলোভা রূপই না খুলে যেত! আমরা ভারতের নানা জায়গা থেকে আসা তীর্থযাত্রীদের স্রোতে মিশে গেলাম। কেউ এসেছে পাঞ্জাবের বালুকাময় মরুভূমি থেকে, কেউ এসেছে নারকেল গাছ শোভিত মালাবার থেকে, কেউবা এসেছে নরম শস্যশ্যামল বাংলা থেকে। নানা বয়সের, নানা জাতের, নানা রকমের নারী-পুরুষ আর শিশুদের বিচিত্র মিশেল ছিল তীর্থযাত্রীদের দলে। কোনো দলে ছিল সদ্য কৈশোর পেরুনো তরুণ, কোনো দলে ছিল পক্ককেশ বুড়ো। সদ্য বিবাহিত বর-কনে যেমন ছিল, তেমনি ছিল বয়সের ভারে চামড়া কুঁচকে যাওয়া বিধবার দল। তাদের বসন-ব্যসনও ছিল বিচিত্র। রাজপুত মহিলাদের রঙচঙে বসন, পাঞ্জাবের সামরিক কর্মকর্তাদের সুশোভন পাগড়ি, বাঙালিদের ধুতি আর শাড়ি, আগ্রা আর তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মেয়েদের হাজার কুচির ঘাগরা, সন্ন্যাসীদের হলুদ আঙরাখা আর নানা ঘরানার নেংটি পরা সাধুদের প্রায় উলঙ্গ শরীর।
হিমালয় পর্বতমালাকে আঘাত করে করে পবিত্র নদী নিজের পথ করে নিয়েছে। তারই পাড় ঘেঁষে ঘেঁষে প্রায় দুইশত মাইল পাথুরে পথ বেয়ে তবে কেদারনাথে পৌছুতে হবে। চোখের সামনে উষ্ণ আর ধুলোময় বিস্তৃত ভূমিতে এপ্রিকট আর বেদানার চাষ। এর পর দেওদার গাছের আঠা থেকে আসা বার্নিশসদৃশ ঘ্রাণ নিতে নিতে বনের ফাঁকে ফাঁকে এগিয়ে যাওয়া। পথ উপরে উঠছে তো উঠছেই। উঠতে উঠতে একেবারে মাথা ঘুরানোর মত উঁচুতে উঠে গেলাম আমরা। নিচের নদীটাকে মনে হল যেন নর্তকীর পায়ের রুপালি নূপুরের মত পর্বতমালাকে বেষ্টন করে রেখেছে। গিরিখাতের বিশাল বিশাল পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে তীব্র স্রোত। এক স্থানে দেখলাম রশি দিয়ে তৈরি বিপজ্জনক ঝুলন্ত সেতু। পথে পড়ল প্রশস্ত মালভূমি। নলখাগড়া আর ঘাসে ঢাকা বিস্তৃত তৃণভূমি। যেন পথ চিনতে সুবিধে হয় সেজন্যেই বুঝিবা এখানে-ওখানে এক-আধটি আমগাছ দাঁড়িয়ে। মালভূমিটি পার হয়ে আমরা কর্ণপ্রয়াগে এসে পৌছুলাম। এখানে নদীটি দুভাগ হয়ে গিয়েছে। এক ভাগ, যার নাম অলকানন্দা, চঞ্চল পায়ে সশব্দে এগিয়েছে বদ্রীনাথের হিমবাহের দিকে। অন্য ভাগটি মন্দাকিনী, যার অর্থ স্বর্গের ঝর্ণা। বুঝিবা নিজের নামকে সার্থক করবার জন্যই, পর্বতমালার ঢালে ঢালে জন্মানো ঘন বনের মধ্য দিয়ে সংকীর্ণ গিরিপথ বেয়ে বেয়ে কেদারনাথের বরফাবৃত অঞ্চলের দিকে গেছে।
আখরোট গাছের নিচে গোল হয়ে বসে মহিলারা আগুন জ্বেলেছিল আর রুটি বানাচ্ছিল। অদূরে দুই জলস্রোত পাশাপাশি বইছিল, যেন মন্দাকিনীর অনাঘ্রাত স্বচ্ছ জল অলকানন্দার ঘোলা জলে মিশে যেতে অনিচ্ছুক। কাছেই কোথাও থেকে ভেসে আসছিল উৎসব উপলক্ষে রচিত গান: কেদারনাথকে চরণ-কমলমে প্রাণ হামারা আটাকে (আমার প্রাণ কেদারনাথের পদ্মের মত পা জড়িয়ে ধরে থাকে)। রাস্তা পাক খেয়ে খেয়ে ক্রমশ খাড়া থেকে আরও খাড়া হয়ে উপরের দিকে উঠছিল। অবশ্য এটি কেবল নামেই রাস্তা। নিচ থেকে খাড়া হয়ে ওঠা পর্বতের কয়েক হাজার ফুট উপরে পাথরের খানিকটা কেটে গোঁজ আকৃতির সরু একটা পথ কোনোভাবে বের করা হয়েছে। ধারালো নুড়ির উপর দিয়ে চলতে চলতে পা ফুলে যায়, এখানে-সেখানে কালসিটে পড়ে। একেকবারে খুব সামান্যই এগুনো যায়। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। প্রায় সবারই চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ মারা। পিছনে হঠাৎ মর্মভেদী চিৎকার শুনলাম। দেখলাম একজন হাড় জিরজিরে ভিখিরি। বোধহয় সাধ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। পা রক্তাক্ত। একমাত্র যে ন্যাকড়াটি দিয়ে সে পা বেঁধে রেখেছিল সেটিও পড়ে যাওয়াতে তার এ আহাজারি। আমার কষ্ট লাগল। সে আমার সহানুভূতিপূর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও চিৎকার করে উঠল:
‘ওভাবে দেখছ কী? এটা খুবই ছোট একটা ব্যাপার। তোমরা কেদারনাথে যাবে আর আমি পিছনে পড়ে থাকব—সেটি হবে না। কেদারনাথ আমায় ডাকছেন। আটকায় কার সাধ্যি? জয় কেদারজি কি জয়
*
১. কারও কারও মতে সদানন্দ স্বামী (১৮৬৫-১৯১১) ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম শিষ্য, রামকৃষ্ণ মিশনে ‘গুপ্ত মহারাজ’ নামে অভিহিত। মূল নাম শরৎচন্দ্র গুপ্ত। তিনি সিস্টার নিবেদিতা প্রতিষ্ঠিত বিবেকানন্দ আশ্রমের ছাত্রদের ১৯০৩ ও ১৯০৪ সালে কেদার-বলরি নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯০৪ সালের যাত্রার কথা জানতে পেরে রবীন্দ্রনাথ রথীন্দ্রনাথকে সঙ্গে পাঠান।
২. রথীন্দ্রনাথ লিখেছেন cousin Dinendranath, কিন্তু তাঁর চাচাত/ফুফাত/মামাত ভাইদের মধ্যে দিনেন্দ্র নামের কেউ ছিল না। তিনি সম্ভবত তাঁর থেকে বয়সে বছর ছয়েক বড় রবীন্দ্রসংগীতের বিখ্যাত ওস্তাদ দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলেছেন। কিন্তু দিনেন্দ্রনাথ সম্পর্কে রথীন্দ্রনাথের কাজিন নন, বরং জ্যাঠাত ভাই দ্বিপেন্দ্রনাথের পুত্র। দিনেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ‘নাতি’ সম্পর্কীয় হলেও দুজনের বয়সের ব্যবধান মাত্র ২১ বছর।
