ঠাকুর পরিবারে নতুন শিশু
জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের[১] বাড়িতে আমাদের বংশের বয়স্করা প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়ই জমায়েত হতেন। বাড়িটিতে একটি বাঁধাই করা খাতা ছিল। ধাঁধা, চটুল মন্তব্য, অর্থহীন ছড়া, প্রজ্ঞাসূচক কোনো কথা, যা-কিছুই উপস্থিত লোকদের মনে আসত না কেন, তারা ঐ খাতাটিতে তৎক্ষণাৎ লিখে রাখতেন। এর নাম দেয়া হয়েছিল পারিবারিক খাতা। খাতাটিতে চোখ বুলাতে গিয়ে আমার জন্ম বিষয়ে পেন্সিলে লেখা কিছু মন্তব্য দেখতে পেলাম। স্বভাবতই আমি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। নিয়ম ছিল যে এ খাতার লেখাগুলো কখনও প্রকাশ করা চলবে না। কিন্তু অগ্রজদের অন্তত দুটি মন্তব্য প্রকাশ করার লোভ সামলাতে পারছি না। প্রথমটি হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর[২] কর্তৃক আমার জন্মের পূর্বে করা ভবিষ্যদ্বাণী—
নভেম্বর ১৮৮৮
রবিকাকার একটি মান্যবান ও সৌভাগ্যবান পুত্র হইবে, কন্যা হইবে না। সে রবিকাকার মত তেমন হাস্যরসপ্রিয় হইবে না, রবিকাকার অপেক্ষা গম্ভীর হইবে। সে সমাজের কার্যে ঘুরিবার অপেক্ষা দূরে দূরে একাকী অবস্থান করিয়া ঈশ্বরের ধ্যানে নিযুক্ত থাকিবে।
প্রথম পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে লিখিত[৩]
শ্রী হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর
দ্বিতীয় মন্তব্যটি আমার জন্মের পর, ঐ ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আরেকজনের প্রতিক্রিয়া—
হিদ্দা[৪], তোমার ভবিষ্যদ্বাণীও এখন চাক্ষুষ—। প্রকৃতিটা গম্ভীর যা… তা অস্বীকার করবার যো নেই। তবে কি না সামাজিক জীব না হয়ে থোকা যে আরণ্যক ঋষি হবে তাও … মনে হয় না। আর গম্ভীর হয়েছে বলে যে হাসবে না তা নয়। রবি কাকারও প্রকৃতি আসলে (যদি ধর] গম্ভীর। গম্ভীর আর গোমড়ামুখোয় তফাৎ আছে। হাসলেই যে গাম্ভীর্য মারা যায় এমনও বোধ হয় না। আসল কথা গভীরতা, সেটা আবশ্যক— হাসি মানে সারাক্ষণ দাঁত বের করে থাকা না।
মার্চ ১৮৯০
বি. টি.[৫]
তাদের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কতদূর সফল হয়েছে সে বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে এ কথা অবশ্যই বলব যে হিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেরকম ভেবেছিলেন, ধ্যান ও প্রার্থনায় জীবন কাটাইনি।
আমি এমন একটি বাড়িতে জন্মেছি যেখানে এক ছাদের নিচে শতাধিক লোকের বাস। এরকম বৃহৎ পরিবারে কোনো শিশুর জন্ম হলে তা আলাদা করে নজরে পড়ার কথা নয়। তার ওপর আমি ছিলাম বাবার ভাইদের মধ্যে কনিষ্ঠজনের সন্তান। বাবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবিত পুত্রদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ইতোমধ্যে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে এত বেশি নাতি-নাতনীর আবির্ভাব ঘটেছে যে আমার জন্ম কোনো বিশেষ ঘটনা বলে কারও হয়ত মনেই হয়নি। অন্যদের মনোভাব যাই হোক না কেন, প্ৰথম পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে পেরে মা নিশ্চয়ই আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছিলেন, যদিও শিশুটি তার প্রথম সন্তানের মত অত সুন্দর ছিল না। আমার দিদি[৬] ছিল টুকটুকে ফর্সা, পরিবারের সবাই তাকে আদর করত। আর আমার জীবন শুরুই হয়েছে অবহেলিত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে। এ বেদনা আমার মানসিকতায় এমন একটা প্রভাব ফেলেছে যা পরিণত বয়সেও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। অধিকন্তু সে সময় চাচাত ভাই-বোনদের মধ্যে আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট। কাজেই বাল্যকালেই পরিবারে আমার তুচ্ছ অবস্থান টের পেয়েছিলাম। যতই বড় হচ্ছিলাম হীনম্মন্যতার বোধ আমাকে ততই নিষ্ক্রিয় ও অসামাজিক করে তুলছিল। একান্নবর্তী পরিবারের শিশুরা অনেক সুবিধা ভোগ করে থাকে এটা যেমন সত্য, তেমনি অতি অল্প বয়স থেকেই প্রতিযোগিতার যাঁতাকলে পিষ্ট হবার আশঙ্কাও থাকে। যারা দুর্বল বা যাদের কোনো দিক দিয়ে কোনো ঘাটতি আছে, প্রতিযোগিতা সব সময়ই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
[১. দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র। জন্ম-১৮৪২, মৃত্যু-১৯২৩। ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম আইসিএস।
২. রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র, বয়সে যদিও মাত্র ছয় বছরের ছোট। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয়
পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ছেলে। জন্ম-১৮৬৭, মৃত্যু-১৯০৮।
৩. রথীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর। সে হিসেবে তাঁর জন্মের মাসখানেক আগে এ মন্তব্য লেখা হয়।
৪. হিত-দা থেকে হিন্দা।
৫. বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পুত্র বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র। জন্ম-১৮৭০, মৃত্যু-১৮৯৯। শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ছিল।
৬. মাধুরীলতা, ডাকনাম বেলা। রবীন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান। জন্ম-১৮৮৬, মৃত্যু-১৯১৮। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর মৃত্যুর কয়েক বছর পর তাঁর ছোট ছেলে শরৎকুমারের সঙ্গে বেলার বিয়ে হয়।
