শান্তিনিকেতনের শুরুর দিনগুলো
সত্যিকারের প্রতিভাবানরা একভাবে বেঁচে থাকতে, জীবনে কেবল একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না। বাবাও পারেননি। সারাজীবন ধরেই তিনি বাসস্থান, নিজের পরিপার্শ্ব, খাদ্য আর পোশাক-পরিচ্ছদে নতুনত্ব যোগ করতে চেয়েছেন। সবচেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর কর্মপ্রিয় আর সৃজনশীল মনের খোরাকের জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র প্রয়োজন ছিল। সে কারণেই বোধহয় শিলাইদহ তাঁকে বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। পরবর্তী গন্তব্য ছিল শান্তিনিকেতন। অস্থিরতা তাঁকে পেয়ে বসেছিল। শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে নিজের ধ্যান-ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য তিনি একটি উপযুক্ত স্থানের খোঁজে ছিলেন। শিশুদের জন্য যে আদর্শ পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার তিনি স্বপ্ন দেখতেন, শান্তিনিকেতনই ছিল তা বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট স্থান।
যতদূর মনে পড়ে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় নয় বছর বয়সের সময়। সে সময় বাংলায় ব্রাহ্মসমাজ, পাঞ্জাবে আর্য সমাজ আর বোম্বেতে প্রার্থনা সমাজ নামে তিনটি সমাজ বিদ্যমান ছিল। আমার চাচাত ভাই বলেন্দ্রনাথ এ তিনটি সমাজকে একত্রিত করে সর্বভারতীয় থিইস্টিক সোসাইটি গড়তে চেয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি এসকল ধর্মীয় সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে একত্রীকরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন বাস্তবিকতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞ এক আদর্শবাদী। তাঁর বন্ধু-বান্ধবরাও ছিল তাত্ত্বিকতায় বিশ্বাসী। ফল হল এই যে, এ সফর থেকে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী মন নিয়ে ফিরে এলেন এবং পিতামহের নিকট শান্তিনিকেতনে একটি ধর্মীয় সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব করলেন। মহর্ষি সঙ্গে সঙ্গে আদি সমাজের শিবধন বিদ্যার্ণভকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আমাকে সংস্কৃতের প্রাথমিক জ্ঞান দিতেন। পিতামহ তাঁকে আদেশ করলেন যে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যেই আমাকে যেন শিখিয়ে পড়িয়ে উপনয়নের উপযুক্ত করে তোলা হয়। শান্তিনিকেতনে এই উপনয়ন অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে তিনি যে কেবল বিভিন্ন সমাজের নেতৃবৃন্দকেই নিমন্ত্রণ করবেন তা-ই নয়, বরং ভারতের সকল প্রদেশের সুপরিচিত বেদান্ত পণ্ডিতদেরকেও আমন্ত্রণ জানাবেন। তিন মাস পর আমার পরীক্ষা হবে। মহর্ষি নিজেই দেখবেন যে আমি সঠিক উচ্চারণে সংস্কৃত মন্ত্ৰ পাঠ করতে পারছি কি-না। সিলেবাসও মহর্ষিই নির্ধারণ করে দিলেন। আমাকে শিখতে হবে উপনিষদের কিছু নির্বাচিত অংশ, যাকে ‘ব্রাহ্মধর্ম’ শিরোনাম দেয়া হয়েছিল। আমার গুরু তাঁর ছাত্রের দৌড় ভালোই জানতেন। তিনি এ আদেশে শিউরে উঠলেন। এ যে অসম্ভব এক কাজ! কিন্তু মহর্ষির আদেশ অলঙ্ঘনীয়। কাজেই আমরা গুরু-শিষ্য মিলে প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। সে চেষ্টা এতই ফলবতী হয়েছিল যে আমি মহর্ষির প্রিয় মন্ত্রসমূহ পাঠ করে শোনালে তিনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। আমার কিছুটা হিংসে হল যখন দেখলাম যে তিনি আমার গুরুকে মোটা অঙ্কের টাকা পুরস্কার দিলেন।
উপনয়নের জন্য সবাইকে দাওয়াত দেয়া হল। আমাকেও শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়া হল। খ্যাতনামা পণ্ডিতদের সামনে বৈদিক রীতিতে উৎসবের নানা পর্ব অনুষ্ঠিত হল। এক প্রভাতে আমার পরীক্ষা শুরু হল। আমার মাথা মুণ্ডন করা হয়েছে, পরানো হয়েছে হলুদ বসন। এক হাতে দেয়া হয়েছে একটি লম্বা দণ্ড আর এক হাতে ভিক্ষাপাত্র। আমাকে প্রথমে উপনিষদের বিভিন্ন শ্লোক আবৃত্তি করতে হবে। তারপর পাত্রটি হাতে নিয়ে মন্দিরে সমাগত অতিথিদের প্রত্যেকের কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে। এর পর তিনদিনের বন্দিজীবন, যেখানে গায়ত্রী ন শিখতে হবে।
ব্যাপারটির যে এখানেই ইতি ঘটল, তা নয়। অতিথিদের মধ্যে বেনারসের বিখ্যাত বেদান্ত পণ্ডিত ব্ৰহ্মাত্ৰত সমাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি বাবাকে বললেন যে আমার উচ্চারণ ঠিকই আছে। তবে আরও খাঁটি বৈদিক রীতি-নীতি মেনে আমাকে শেখানো উচিত। এ বিষয়ে তিনিই ছিলেন একমাত্র বিশেষজ্ঞ। তিনি নিজেই প্রস্তাব করলেন যে আরও কিছুদিন থেকে আমাকে বিশুদ্ধভাবে মন্ত্রোচ্চারণ শেখাবেন। কাজেই ‘ওম’ ধ্বনির উচ্চারণ শেখার শ্রমসাধ্য আয়াস শুরু হল। সপ্তাহখানেক গেলে আমি বুঝতে পারলাম যে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ ধ্বনির আধ্যাত্মিক রহস্য বুঝে উঠতে পারিনি। প্রশিক্ষণ কিন্তু চলতেই থাকল। শান্তিনিকেতনের প্রথম স্মৃতির কথা মনে হলে আমার নাসিকাধ্বনির সঙ্গে সে বিপুলাকার পণ্ডিতের গলার নিমখাদের উচ্চতান মিলিয়ে সমবেদ থেকে সূত্র আবৃত্তির প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার কথাই মনে পড়ে।
উপনয়নের পরবর্তী তিন বছরের প্রায় পুরোটাই কেটেছে শিলাইদহে। আমার বারো বছরের সময় শিলাইদহ ছেড়ে পাকাপাকিভাবে শান্তিনিকেতনে ফিরে আসি। শান্তিনিকেতনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য মহর্ষি একটি ট্রাস্ট গঠন করে এখানকার জমি ও দালানসমূহ দান করে দিয়েছিলেন। এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও দিয়েছিলেন বার্ষিক আঠারো শত টাকা আয়ের আরেক খণ্ড জমি। ১৮৮৭ সালে ট্রাস্টটি গঠিত হয়। অন্যান্য কাজের মধ্যে ট্রাস্ট এখানে একটি ব্রাহ্ম-বিদ্যালয় এবং পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও মহর্ষির ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রতি বছর ৭ পৌষ একটি মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা করে।[১] ১৯০১ সালের ৭ পৌষ ব্রাহ্ম-বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এর কয়েক মাস পূর্বেই বাবা আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যান যেন আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে নিতে পারেন। ইতোমধ্যে তিনি পুরীর সমুদ্রসৈকতে অবস্থিত তাঁর মালিকানাধীন বাংলোটি বিক্রয় করে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন। শিলাইদহে জগদানন্দ রায় নামে তাঁর এক কর্মচারী ছিলেন। তিনি হোমিওপ্যাথি জানতেন। বাবা ভাবলেন জগদানন্দের মত লোককে জমিদারির কাজে খাটিয়ে রাখলে প্রতিভার অপচয় হবে। তিনি তাঁকেও শান্তিনিকেতনে নিয়ে এলেন।
শান্তিনিকেতনে তখন মাত্র দুটি দালান। এদের একটি অতিথিশালা। আরেকটি দালান ছিল বাগানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। অতিথিসদনকে তো আর স্কুল বানানো যায় না। কাজেই তিন কামরাবিশিষ্ট অন্য দালানটিতে স্কুলের কার্যক্রম শুরু হল। স্কুল সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটি কক্ষে পাঠাগার স্থাপন করা হল। বাবা কোলকাতা থেকে তাঁর সংগ্রহের চমৎকার বইগুলো এখানে আনিয়ে নিলেন। এগুলোকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরির মূল সম্পদ গড়ে ওঠে। লাইব্রেরিটিকে কখনোই এখান থেকে সরানো হয়নি। বইগুলো তাকে তাকে সাজানো হয়ে গেলে মনোযোগ গেল ছাত্রদের বাসস্থানের দিকে। জগদানন্দবাবুকে ছাত্রাবাস তৈরির দায়িত্ব দেয়া হল। ঐ সকল দিনে আমাদের কর্মচারীদের সংখ্যা এত কম ছিল যে এ হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারটিকে তাঁর নিজের কাজের বাইরেও ম্যানেজার, ইঞ্জিনিয়ার, রান্নাঘরের সুপারিনটেন্ডেন্ট এবং আরও নানাবিধ দায়িত্ব সামলাতে হতো। লাইব্রেরির পাশেই কাদামাটি দিয়ে নিচু কিন্তু লম্বা ঘর তৈরি করা হল। বহু বছর ধরে ছাত্র এবং শিক্ষকদের জন্য এটাই ছিল একমাত্র আস্তানা। এর একটি অংশ ‘আদি কুটির’ নামে আজও টিকে আছে। অন্য আর যে বিল্ডিংটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় সেটি ছিল রান্নাঘর। বর্তমান বিশ্বভারতী কার্যালয়ের অংশবিশেষে আজও তার কয়েকটি দেয়ালের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
কোলকাতার বন্ধু-বান্ধবদের বলে-কয়ে চারটি ছাত্র যোগাড় হল। আমাকে নিয়ে সাকুল্যে দাঁড়াল পাঁচজনে। খাঁটি ব্রহ্মচারীদের মতই আমাদেরকেও লম্বা হলুদ বসন পরানো হল। অবশ্য উদ্বোধনের দিন আমাদেরকে লাল সিল্কের ধুতি ও চাদর দেয়া হয়েছিল। এগুলো পরে মন্দিরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালে সকলের দৃষ্টি আমাদের ওপর নিবদ্ধ হল। আমরা তখন বেশ গর্ব অনুভব করলাম। জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ প্রার্থনা পরিচালনা করলেন। এ উপলক্ষে বেশ নামিদামি অতিথিদের সমাগম হয়েছিল। ৭ পৌষের মেলা ততদিনে শান্তিনিকেতনের একটি নিয়মিত অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হয়ে গেলেও এর চরিত্র এখনও অনেকটা তেমনই আছে। শুরুর দিকে মেলা ছিল একদিনের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য বাবা কয়েকটি সংগীত রচনা করেছিলেন, তাদের একটি ছিল ‘মোরা সত্যের ‘পরে মন’। ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ গানটি রচনা হবার পূর্ব পর্যন্ত এটিই বিদ্যালয়ের সংগীত হিসেবে গাওয়া হতো।
ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের সংখ্যাও বাড়ল। আমার আগের সংস্কৃত শিক্ষক পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণভকে আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে আনা হল। কিছুদিনের মধ্যেই রেওয়াচান্দ নামের একজন ইংরেজির শিক্ষক যোগ দিলেন। সিন্ধু থেকে আসা এ শিক্ষক ছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের শিষ্য। পরবর্তীতে তিনি অনিমানন্দ স্বামী নাম গ্রহণ করে কোলকাতার উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতন ধারার একটি স্কুল খুলেছিলেন। তিনি রোমান ক্যাথলিক ছিলেন, আর নিয়ম-কানুনের বিষয়ে ছিলেন খুব কড়া। অনেকটা ক্রিকেট মাঠ থেকে শৃঙ্খলা শিখে তা দৈনন্দিন জীবনে আরোপ করার মতই ছিল তার মানসিকতা। অন্যদিকে বাবা ছিলেন স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার পক্ষে। অচিরেই এ দুই আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হল এবং রেওয়াচান্দ বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। বাংলা পড়াতে এলেন সুবোধ চন্দ্র মজুমদার। তিনি ছিলেন বাবার পুরনো বন্ধু শ্রীশ চন্দ্র মজুমদারের চাচাত ভাই। তাঁর সঙ্গে শ্রীশবাবুর পুত্র সন্তোষও এল। অবশ্য শিক্ষক হিসেবে নয়, ছাত্র হিসেবে। এন্ট্রান্স ক্লাসে আমরা এ দুজনই ছাত্র ছিলাম। ফলে একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হলাম। স্কুলের শুরু থেকেই ক্যাপ্টেন তথা ছাত্রদের দলপতি নির্বাচনের চর্চা ছিল। অবশ্য যতদিন সন্তোষ ও আমি ছাত্রাবাসে ছিলাম ততদিন দলপতি নির্বাচনের ব্যাপারটা ছিল কেবলি আনুষ্ঠানিকতা। আমরা দুজনই পালাক্রমে দলপতি নির্বাচিত হতাম। প্রথমদিকে শান্তিনিকেতনের ইমেজ ছিল কিছুটা সংশোধনমূলক। অভিভাবকেরা তাদের দুষ্ট সন্তানদেরই এখানে পাঠাতেন। এ বুনো ছাত্রদের পরিচালনা করার ভার সন্তোষ আর আমার কাঁধেই চাপত। দীর্ঘ দিনব্যাপী এ দলপতিত্বের মহড়া পরবর্তী জীবনে আমাদের দুজনের ক্ষেত্রেই খুব কাজে এসেছিল।
পুরনো শিক্ষকগণ কার পর কে এসেছিলেন তা কালানুক্রমিকভাবে বলা খুবই মুশকিল। তবে এটা মনে আছে যে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বছরেই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল, সতীশ চন্দ্র রায়, অজিত কুমার চক্রবর্তী প্রমুখ স্বনামধন্য শিক্ষকের আগমন ঘটেছিল। আমাদের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন রেভারেন্ড কালীচরণ ব্যানার্জির ভাইপো মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা যখন এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু এখানকার আবহাওয়া তাঁর স্বাস্থ্যের অনকূল না হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি অন্যত্র চলে যান।
ছাত্র ও শিক্ষকগণ যে ধরনের জীবন যাপন করতেন তা কেবল সাধারণই নয় বরং রীতিমত কৃচ্ছ্র সাধনার পর্যায়ে পড়ে। সবকিছুর পিছনেই যেন ছিল ব্রহ্মাচর্যের আদর্শ। হলুদ ইউনিফর্ম পোশাকের দৈন্য আড়াল করত; একজোড়া কম্বল বিছানার কাজ করত; আর একঘেয়ে নিরামিষ খাবারের সঙ্গে বুঝিবা কেবল জেলখানার খাদ্যেরই তুলনা চলত। কিন্তু এসবই অবশ্যপালনীয় হিসেবে ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। কেউই জুতা, এমনকি স্যান্ডেলও পরত না, আর টুথপেস্ট বা মাথার তেলের মত বিলাসিতা তো ছিল রীতিমত নিষিদ্ধ। বাবা যখন ঠিক করলেন যে আমাকেও ছাত্রাবাসে থাকতে হবে, সে সিদ্ধান্ত সমর্থন করতে মায়ের নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল।[২] আমরা যে কষ্ট করে থাকতাম তা তাঁর সহ্য হতো না। খাদ্যের কষ্ট পুষিয়ে দেয়ার জন্য তিনি মাঝে মাঝেই ছাত্র-শিক্ষক সবাইকে দাওয়াত করে নিজের হাতে প্রস্তুত করা সুস্বাদু খাবার খাওয়াতেন। আমরা হঠাৎ হঠাৎ তার হেঁশেলে হামলা করলে তিনি যে অখুশি হতেন না তা বলাই বাহুল্য।
দারিদ্র্যের কষ্ট বা আরাম-আয়েশের যত অভাবই হোক, কেউ কিন্তু কোনোদিন অভিযোগ করেনি। আমরা সত্যি সত্যিই সাধারণ জীবনাদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম এবং বাহুল্যহীন জীবন নিয়ে গর্ব অনুভব করতাম। যত সাদাসিধেভাবেই পরিচালিত হোক না কেন, আশ্রম চালাতে বাবার খুব সমস্যা হতো। কেননা, প্রতিষ্ঠানটির আয় বলতে তো ছিল কেবল শান্তিনিকেতনের ট্রাস্ট থেকে পাওয়া বার্ষিক আঠারো শত টাকা। বহু বছর পর্যন্ত ছাত্রদেরকে কোনো রকমের ফি দিতে হতো না। কেবল যে তাদের শিক্ষাই অবৈতনিক ছিল, তা-ই নয়, বরং তাদের থাকা-খাওয়া, এমনকি পোশাকও দেয়া হতো বিনামূল্যে। বাবাকেই এর পুরো ভার বহন করতে হতো, যদিও তখন তাঁর নিজের আয় ছিল মাসে মাত্র দুইশত টাকা। মা মারা গিয়েছিলেন ১৯০২ সালে। স্কুলের খরচ চালাতে এর আগেই তাঁর প্রায় সমস্ত গয়না বিক্রয় করে দিতে হয়েছিল।
কেবল এ কষ্টকর দিকের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ বোধহয় অন্যায় হবে। বহিরঙ্গে যত গরিবানাই থাকুক, আমাদের আনন্দেরও কমতি ছিল না। জীবন এখানে সুখ আর নানান অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ছিল। গান রচনায় বাবা ছিলেন ক্লান্তিহীন। শান্তিনিকেতনে উপস্থিত থাকলে তিনি স্কুলের কাজে মনপ্রাণ ঢেলে দিতেন। নতুন নতুন গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে, মহাভারত থেকে গল্প শুনিয়ে, ছাত্রদের সঙ্গে অন্তঃকক্ষ খেলায় অংশ নিয়ে, নাটকের মহড়া দিয়ে আর কখনও কখনও ক্লাস নিয়ে তাদের মাতিয়ে রাখতেন। শিক্ষকগণও আমাদের সঙ্গেই থাকতেন। ফলে সকল সুখ-দুঃখ আমরা ভাগ করে নিতাম। কখনও কখনও তাঁদেরকে নিয়ে আমরা মজাও করতাম। তাঁরা রাগ করতেন না। কারণ নির্দোষ কৌতুকের আড়ালে যে সুগভীর শ্রদ্ধা লুকিয়ে ছিল তা তাঁরা জানতেন। জগদানন্দ রায়কে আমরা সকলেই ভয় পেতাম। ভয় সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে মাঝে মাঝে মজা করতাম। একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমার এখনও মনে আছে। একদিন তিনি বারান্দায় দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। আমরা কতিপয় দুষ্টু ছেলের দল চুপি চুপি কাছে গিয়ে তাঁকে বিছানাসুদ্ধ আমাদের কাঁধে তুলে নিলাম। তারপর ‘হরিবোল’ বলে চিৎকার করে বাঁধের ওপাশে নদীতে নিয়ে গিয়ে জলে ডুবিয়ে দিলাম। মাস্টারমশাই সারা রাস্তা জুড়েই আমাদের শাপ-শাপান্ত করলেন কিন্তু আমরা লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হলাম না। কেননা, তাঁর কপট রাগের আড়ালে একটা হাসির আভাস আমাদের চোখে পড়েছিল।
সত্যিই আমরা একটা সুখী পরিবার ছিলাম। ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে অনেকজন হওয়ায় সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব ছিল না। অন্যের দুর্বলতা ও মতামত সহ্য করার ক্ষমতা আর পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ পুরো দলটাকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিল। এটা ছিল প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মেধাবী ছাত্র খুব কমই ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু বুদ্ধি যেমনই হোক, এখানে কয়েক মাস কাটানোর ফলে শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের মধ্যে এমন একটা ছাপ পড়ত যে তাদেরকে আর দশজন থেকে আলাদা করে চেনা যেত। আমার ধারণা, এ ধরনের চরিত্র গঠনই এ দেশের প্রতি শান্তিনিকেতনের সত্যিকারের অবদান।
১৯০৪ সালের এপ্রিলের শেষে পক্ষকাল ধরে সূর্য যেন জ্বলছিল। সঙ্গে ছিল তপ্ত লু হাওয়া। পড়ালেখার পাততাড়ি গুটিয়ে ছাত্ররা কম গরম কোনো স্থানে চলে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে শান্তিনিকেতনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে। শূন্য ছাত্রাবাসে খাপছাড়াভাবে পড়ে রইলাম কেবল আমি আর আমার মত আর দুএকজন হতভাগা। আমাদের সঙ্গে ভাইপো দিনেন্দ্রনাথও ছিল, যাকে বাবা তাঁর গানের ‘অভিভাবক’ বলতেন। হঠাৎ করেই যেন আশ্রমের গুঞ্জন থেমে গিয়েছিল। ভাবলাম শুষ্ক গরম মৌসুমের লম্বা দিনগুলো একঘেয়েভাবে কাটাতে হবে। কিন্তু শীঘ্রই শূন্যতা ও একাকিত্বের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম যে বিরক্তি তো লাগছেই না, বরং অন্য সময়ের ব্যস্ততার অন্তরালে যে অদ্ভুত সৌন্দর্য আমাকে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছিল, নির্জনতার মধ্যেই তা আমাকে ধরা দিল। নিজের মধ্যে এক নতুন ধরনের আগ্রহের সৃষ্টি হল, যা ক্রমে ক্রমে আমাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করে নিল।
প্রকৃতি হচ্ছে হিংসুক রক্ষিতার মত—সে কেবল তাদের কাছেই ধরা দেয় যারা নিষ্কলঙ্ক মন নিয়ে নির্জনে তার নিকট আসে। প্রতিদিন প্রত্যুষে যখন শান্তিনিকেতনে দিন শুরুর ঘণ্টা বেজে উঠত, আমরা সবাই জেগে উঠতাম। তালগাছের সারির ঠিক পিছনেই পূর্বাকাশ তখন রক্তিম আভা ধারণ করেছে। কিন্তু আমরা কেউই তা দেখতে পেতাম না। গ্রীষ্মের এই ছুটিতে সে ঘণ্টা বাজার ব্যাপার নেই। তবু ঊষারও অনেক আগে আমার ঘুম ভাঙত। প্রভাতি আকাশে বর্ণের যে অপরূপ ছটা এ সময়টায় দেখতে পেতাম তা যেন মিস না হয়ে যায় সে আশঙ্কায় বিছানা ছেড়ে পূর্ব দিকে ছুটে যেতাম। দিনগুলো ছিল অনেক দীর্ঘ। কিন্তু প্রত্যেকটি মুহূর্তই যেন ছিল সম্ভাবনার আকর, প্রত্যেক গাছেই যেন ছিল কোনো-না-কোনো বার্তা। পাখিদের প্রত্যেকটি কিচিরমিচিরই যেন জীবনে যোগ করছিল নতুন কোনো স্বাদ। আমার সহপাঠীরা আর কোলাহলমুখর বন্ধুরা আমাকে ছেড়ে গেছে সত্য; কিন্তু এই পৃথিবী, এই আকাশ, এই বাতাস, ছোট ছোট প্রাণী আর পোকাগুলো আমাকে নিবিড় সান্নিধ্য দিয়েছে। অন্য সময় যাদের দিকে আমরা ফিরেও তাকাতে চাই না তাদেরই যেন নতুন করে দেখলাম। তাদের মধ্যেই নতুন নতুন রহস্য, অজানা বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেলাম। এসব অদ্ভুত আবিষ্কার আর নতুন অভিজ্ঞতা লাভের আনন্দেই বুঝি আমি প্রখর রৌদ্র মাথায় নিয়ে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ালাম, কিংবা ময়নার পিছনে পিছনে শালবনের ভিতরে তার বাসা পর্যন্ত গেলাম বা কীটপতঙ্গের ডাক শোনার জন্য রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সজাগ থাকলাম।
সব স্মৃতিই যে এমন মধুর ছিল, তা নয়। একদিন দুপুরে পাঠাগারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। সামনে শূন্য ধানক্ষেতের বুকে ছান্দসিক গতিতে লু হাওয়া বইছে। কখনও কখনও ঘূর্ণি হাওয়া এসে ঝরা পাতাগুলোকে পাক খাইয়ে খাইয়ে অনেক উঁচুতে তুলে নিচ্ছে। হঠাৎ চুপি চুপি দুটি হায়েনা চলে এল। কিছু বুঝে উঠবার আগেই একটি হায়েনা চোখের পলকে একটি ভেড়াকে মেরে ফেলল। তারপর ওটাকে পিঠে করে বয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি এমনকি লাঠি নিয়ে তাড়া করারও সময় পেলাম না। অবশ্য তাড়া করেও ফল হতো না কিছু আমি ঘটনাটা বুঝে ওঠার অনেক আগেই ওটা মরে গিয়েছিল। হায়েনাদের সাহস আর তৎপরতা অবিশ্বাস্য।
এ গ্রীষ্মের ছুটিতেই আমি প্রথমবারের মত কবি সতীশ রায়ের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এসেছিলাম। শেষবারের মতও বটে, কেননা, পরের ছুটি শুরু হবার আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য প্রাপ্ত হলেও সত্যিকারের প্রতিভাবানের সান্নিধ্য কে ভুলতে পারে! তাঁর ভিতর থেকে যেন উদ্যম আর প্রাণপ্রাচুর্য বিচ্ছুরিত হতো। সে সঙ্গে ছিল নির্ভীক বিশ্লেষণী মন আর যা কিছু ভালো তা আস্বাদনের বিপুল বাসনা। চিন্তা ও কর্মে কিছুটা উদাসীন আর অন্য দশজনের থেকে একেবারে আলাদা এ মানুষটি জানতেন কাকে কতটা সম্মান জানাতে হয়। তাঁর সবচেয়ে বড় গুণ হল সাহিত্য সম্পর্কে অফুরান জ্ঞান। মাত্র একুশ বছর বয়স, অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ভার্জিল, দান্তে, শেক্সপিয়র বা কালিদাস থেকে আবৃত্তি করতে পারতেন। তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন ব্রাউনিং আর রবীন্দ্রনাথ। খাঁটি ভদ্রলোক হবার কারণে তিনি ইতরবিশেষ পার্থক্য করতে জানতেন না। বয়স এবং মন-মানসিকতা উভয় দিক থেকেই আমি ছিলাম অপরিপক্ক, তবু তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাঁর অগাধ জ্ঞানভাণ্ডারের কিছুটা ঢেলে দিয়েছিলেন। দিনের বেলায় আমরা পাঠাগারের নিরালা কোণে বসে ধ্রুপদী সাহিত্য পাঠ করতাম। আর প্রায়শ রাত কাটিয়ে দিতাম আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীর গতিবিধি দেখে দেখে। একটার পর একটা নক্ষত্রমণ্ডলী দিগন্তে ডুবে যেত, সেই সঙ্গে সতীশ রায়ের কণ্ঠে চলত বাংলা কবিতার আবৃত্তি। তাঁর কণ্ঠ এতই বাঙ্ময় ছিল যে শুনে শুনেই সব কবিতার অর্থ বোঝা হয়ে যেত, আলাদা করে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন পড়ত না।
সতীশ রায়ের সেরা আবৃত্তিটা শুনেছিলাম এক ঝড়ের দিনে। আশ্রমে সেদিন ঝড়ো হাওয়ার তাণ্ডব চলছে। এত ভালো আবৃত্তি আর কোনোদিন শুনিনি, আর কখনও শুনব বলেও মনে হয় না (মন এতটাই ভরে গিয়েছিল যে বোধহয় আর কারও কাছে কোনোদিন আবৃত্তি শুনতে চাইব না)। দিনটি ছিল চৈত্রের শেষ, বছরেরও শেষ দিন। সচরাচর যা হয় তার থেকে অনেক বেশি গরম পড়েছিল সেদিন। গরমের হাত থেকে বাঁচতে আমরা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে অন্ধকারে বসে থাকলাম। কিন্তু বদ্ধ ঘরে আর কতক্ষণ থাকা যায়? এক সময়
বাইরে বেরুলাম। দেখলাম উত্তর-পশ্চিমে মেঘের ঘনঘটা, আকাশ আঁধার করে কালবোশেখির মহড়া চলছে। দেখতে দেখতে যেন এক প্রকাণ্ড নীলবর্ণ দৈত্য পাহাড়সম উচ্চতার লালচে ধূলির নিশান উড়িয়ে দুরন্ত বেগে ধেয়ে এল, আশ্রমটাকে যেন সে গিলে খেতে চায়। আমরা স্তম্ভিত হয়ে প্রকৃতির রুদ্র রূপ দেখছি, সেসময় সতীশ রায় শুরু করলেন আবৃত্তি। কানে তালা দেয়া বজ্রপাতের হুংকারের মধ্যেই তাঁর কণ্ঠে ভেসে এল ‘বর্ষশেষ’ কবিতার প্রথম অনুচ্ছেদ:
ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে ধেয়ে চলে আসে
বাধাবন্ধহারা
গ্রামান্তের বেণুকুঞ্জে নীলাঞ্জনছায়া সঞ্চারিয়া-
হানি দীর্ঘধারা।
তাঁর গলা একবারও কাঁপলো না। পুরো কবিতাটাই তিনি পড়ে গেলেন ঝড়ের সমান তালে। বুঝতে পারছিলাম না কণ্ঠ শুনব, না উদ্দীপ্ত আবৃত্তিকারের অঙ্গভঙ্গি দেখব। কী ঘটতে যাচ্ছে ভালো করে বুঝতে পারার আগেই সতীশ রায় ঝড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। তাঁকে কোথাও দেখতে পেলাম না। শেষে দলবেঁধে খোঁজা শুরু হল এবং ভুবনডাঙা গ্রামের কাছে এক গাছতলায় তাঁকে অর্ধমৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। [৩]
সতীশ রায় আর দিনেন্দ্রনাথের সংস্পর্শে ছুটির দিনগুলোতে আশ্রমজুড়ে কবিতা আর গানের জোয়ার বয়ে গেল। এ রস থেকে কেউই দূরে থাকতে পারেনি। কেবল একজন বাদে। আশ্রমে সাদা দাড়িওয়ালা এক নীতিবাগীশ ভদ্রলোক ছিলেন। আমাদের এ বোহেমিয়াপনা তিনি ভালো চোখে দেখতেন না। তীর্থস্থানের যাজকদের মত তিনিও ভাবতেন শান্তিনিকেতন হল পবিত্র স্থান। কোনোভাবেই এর খাঁটিত্ব নষ্ট করা চলবে না। শেক্সপিয়র কিংবা কালিদাসের বিশেষ বিশেষ অংশের আবৃত্তি শুনলে তিনি আহত বোধ করতেন। আমার মনে আছে একবার শকুন্তলার আবৃত্তি শুনে তিনি কানে আঙুল দিয়ে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করেছিলেন!
এ সময় সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র নামে একজন বিজ্ঞান শিক্ষক ছুটি কাটাতে আশ্রমে এসেছিলেন। তিনি শীঘ্রই আশ্রমের প্রেমে পড়ে গেলেন। আশ্রমের তথাকথিত গবেষণাগারের ধুলোয় পড়ে থাকা কয়েকটি টেস্টটিউব আর জারের সাহায্যে তিনি আমাকে রসায়ন শিখিয়েছিলেন। তাঁর শেখানোর ধরনটাই ছিল আলাদা। মৌলিক পদার্থ কোনটার সঙ্গে কোনটা মেশে আর কোনটা মেশে না বোঝাতে গিয়ে তিনি সেগুলোকে দেব-দেবীর সঙ্গে তুলনা করতেন। কোনোটাকে চার হাতওয়ালা দেবতা, কোনোটাকে দশ মাথাওয়ালা দেবতা বা এ ধরনের কিছু একটা বানিয়ে তাঁর বৈশিষ্ট্যের কথা মনে রাখতে বলতেন। এর পর কে কাকে পছন্দ করে বা অপছন্দ করে তা এমনভাবে বোঝাতেন যেন চোখের সামনে ছবি তুলে ধরছেন। এগুলো এমনভাবে মনে গেঁথে গিয়েছিল যে রসায়ন নিয়ে আমি আর কখনও সমস্যায় পড়িনি। তখন কে জানত যে এ অধ্যাপক একদিন কবি হিসেবেও খ্যাতিমান হবেন!
বাবা তখন আলমোড়ায়, আমার অসুস্থ বোন রানীকে নিয়ে বায়ু পরিবর্তনের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। ওখান থেকে প্রায়ই আমাদের জন্য তরতাজা পাহাড়ি মধু পাঠাতেন। তিনি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়কে আশ্রমের দায়িত্বে রেখে গিয়েছিলেন। নানা কারণে তিনি একজন বিশেষ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। জন্মেছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে, প্রথম জীবনে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, পরে কার্ডিনাল নিউম্যানের লেখা পড়ে ক্যাথলিক খ্রিস্টান হয়ে যান। এ সময়টায় তিনি সোফিয়া নামের একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতেন। তাঁর স্বদেশপ্রেম এত তীব্র ছিল যে, ক্যাথলিক হলেও তিনি হিন্দু সন্ন্যাসীর ন্যায় ভারতীয় পোশাক পরতেন। দেশপ্রেমের কারণেই বোধ করি তিনি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করেন এবং শেষ জীবনে হিন্দুত্বের জঙ্গিপনায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি যখন আশ্রমে এলেন তখনও তাঁর মনে এইসব ভাঙাগড়া চলছে। হঠাৎ তাঁর মধ্যে স্বদেশিয়ানার উৎকট উদ্যোগ দেখা দিলে দুজনার দুটি পথ আলাদা হয়ে যায়। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে বাবা বদ্ধপরিকর ছিলেন, আর অন্যজন শান্তিনিকেতন ছেড়ে কোলকাতায় গিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলেন, পাশাপাশি সন্ধ্যা নামে একটি ইংরেজি দৈনিক বের করার কাজে হাত দিলেন। তাঁর মত এত বিশুদ্ধ ও খাঁটি ইংরেজি লিখতে বা বলতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
উপাধ্যায় মশায়কে যে আমরা কেবল প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবেই দেখতাম তা নয়, তাঁকে সন্ন্যাসী বা আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ হিসেবেও শ্রদ্ধা ও ভয় করতাম। একদিন পাঞ্জাব থেকে এক পালোয়ান এল। তার সঙ্গে কুস্তি লড়তে আশ্রমের সবার প্রতি সে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল। কিন্তু তার শরীরের গাঁথুনি দেখে কেউই সাহস পেল না। কুস্তির লড়াই দেখার এমন চমৎকার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে আমরা ছোটরা কিছুটা হতাশ হলাম। হঠাৎ দেখি টাইটস পরে উপাধ্যায় মশায় নিজেই হাজির, নিজের বাহুতে চাপড় মেরে তিনি পাঞ্জাবি দৈত্যকে লড়াইয়ে আহ্বান করলেন। বাঙালি এ পণ্ডিতকে হারাতে পেশাদার কুস্তিগীরকে বিস্তর বেগ পোহাতে হয়েছিল।
গ্রীষ্মকালের শান্তিনিকেতনকে বাইরের লোকে খুব কমই জানে। প্রচণ্ড তাপ আর শুষ্কতার জন্য এ সময় এখানকার গাছের পাতা ঝরে যায়, মাটি পুড়ে লাল রঙ ধারণ করে, তপ্ত হাওয়ায় ধুলোর মেঘ উড়ে আসে, আর হঠাৎ হঠাৎ বজ্রপাত ঘটে, যা দেখতে দারুণ কিন্তু সহায়-সম্পদ ধ্বংস করে। সত্যি সত্যি বইপত্রে উল্লেখকৃত ‘রুদ্র বৈশাখই’ দেখা দেয়। আর কী আশ্চর্য! আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি হতে না হতেই এসব কোথায় ধুয়েমুছে যায়! কোনো এক জাদুকরের দণ্ডের স্পর্শে মুহূর্তেই ডালে ডালে পাতার নাচন শুরু হয়, পাখিরা বিরতিহীনভাবে গাইতে থাকে, আর একটা মরুভূমি শান্তিনিকেতনের বাগানে পরিণত হয়।
ছুটি শেষ হলে বিষণ্ন মন নিয়ে সেই পরিচিত শ্রেণিকক্ষের আসনে গিয়ে বসলাম, পুনরায় পড়ালেখা শুরু হল।
*
১. ১৮৪৩ সালের ২১ ডিসেম্বর বা ৭ পৌষ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। মোট ২১ জন সেদিন ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তী ২ বছরের মধ্যে এ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ৫০০তে উন্নীত হয়। এ উপলক্ষে ১৮৪৫ সালের ২০ ডিসেম্বর বা ৭ পৌষ গৌরহাটির বাগানে পৌষ উৎসব পালন করা শুরু হয়।
২. ১৯০৩ সালের ১৭ মে রবীন্দ্রনাথ এক চিঠিতে রথীন্দ্রনাথকে লিখেন, ‘আমার ইচ্ছা তুই দিবারাত্রি বিদ্যালয়েই থাকিস্। শান্তিনিকেতনের বাড়িতে তোর যাতায়াত থাকিলে মন বিক্ষিপ্ত হইবে। তুই বিদ্যালয়ের ছাত্র- এ কথা কিছুতেই বিস্মৃত হইবি না।’
৩. এর কিছুদিনের মধ্যেই সতীশ রায় ভয়ানক বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে ছিলেন না। তখনকার দিনে বসন্ত রোগীকে দাহ করা হতো না। শান্তিনিকেতন থেকে একটু দূরে জংলামত এলাকায় সতীশ রায়ের মৃতদেহ ফেলে আসা হয়। এ সময় বসন্তভীতি এতটা ছড়িয়ে পড়ে যে, শান্তিনিকেতন স্কুলের ছাত্র-শিক্ষকদের শিলাইদহে নিয়ে আসা হয়। কয়েক মাস পর শান্তিনিকেতনের স্কুল আবার শান্তিনিকেতনে ফেরত যায়।
