মৃত্যুর করাল ছায়া
বাবা শান্তিনিকেতনে শিক্ষাদান পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মগ্ন ছিলেন। এ সময় মা অসুখে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে কোলকাতায় নিয়ে যেতে হল। ডাক্তাররা আশা ছেড়ে দেবার পূর্বেই মা বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি আর সেরে উঠবেন না। শেষবার আমি যখন তাঁর শয্যাপাশে গেলাম, তখন তিনি কথাও বলতে পারেন না। আমাকে দেখে তাঁর গাল বেয়ে নীরব অশ্রুধারা বইতে লাগল। আমার ভাই শমি তখন একেবারে শিশু। সে রাতে আমার তিন বোন—বেলা, রানী ও মীরা আর শমি ও আমাকে বাড়ির আলাদা একটা অংশে শুতে দেয়া হল। কিন্তু বেলা ও আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। একটা প্রচ্ছন্ন ভয় আমাদের জাগিয়ে রেখেছিল। চিলেকোঠা থেকে মায়ের ঘরটা দেখা যেত। খুব সকালে আমরা সেখানে গেলাম ও ভয়ে ভয়ে উঁকি দিলাম। সারা ঘরে একটা অলক্ষুণে নীরবতা। যেন মৃত্যুর ছায়া সে রাতে গোপনে বাড়িটির চারধার মাড়িয়ে গেছে। কেউ বলে না দিলেও আমরা বুঝতে পারছিলাম যে মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সে সন্ধ্যায় বাবা আমাকে মায়ের একজোড়া চটিজুতো দিলেন। সেগুলো আজও আমি তাঁর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করছি।
বাইরে বাইরে বাবাকে শক্তই দেখাত। আমাদের দেখাশোনার ভার পড়ল মায়ের এক দূর সম্পর্কীয় পিসির ওপর। বাবা শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে এমনভাবে কাজে ডুবে গেলেন যেন কোনো কিছুই তাঁর মনঃসংযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারবে না। কিন্তু বিচ্ছেদ ও একাকিত্বের গভীর বেদনার ছাপ পড়ল স্মরণ নামক গ্রন্থের অনেক কবিতায়।
আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই—
যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই।
আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান—
সেথা হতে যা হারায় মেলে না সন্ধান।
অনন্ত তোমার গৃহ, বিশ্বময় ধাম,
হে নাথ, খুঁজিতে তারে সেথা আসিলাম।
দাঁড়ালেম তব সন্ধ্যা-গগনের তলে,
চাহিলাম তোমা-পানে নয়নের জলে।
কোনো মুখ, কোনো সুখ, আশাতৃষা কোনো
যেথা হতে হারাইতে পারে না কখনো,
সেথায় এনেছি মোর পীড়িত এ হিয়া-
দাও তারে, দাও তারে, দাও ডুবাইয়া।
ঘরে মোর নাহি আর যে অমৃতরস
বিশ্ব-মাঝে পাই সেই হারানো পরশ।[১]
কিন্তু মায়ের প্রস্থান ছিল দুঃখের মিছিলের কেবল শুরু। বাবা যাদেরকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন তাঁদের অনেককেই একে একে মৃত্যুর করাল ছায়া কেড়ে নিয়ে গেল।
শান্তিনিকেতনে ফিরে এসে স্কুলের কাজ শুরু করতে না করতেই রানীর যক্ষ্মা হল। সে সময় এ রোগের কোনো চিকিৎসা ছিল না। ভালো আবহাওয়ায় রোগ নিরাময় হতে পারে—এ আশায় বাবা তাকে হাজারিবাগ নিয়ে গেলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল যে ফিরতে বিলম্ব হতে পারে। কাজেই স্কুলের ভার দিয়ে যাবার জন্য তিনি একজন নির্ভরযোগ্য লোক খুঁজছিলেন। সম্প্রতি তিনি মোহিতচন্দ্র সেনের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের ওপর বাবার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। এছাড়া সদাশয় ব্যক্তি হিসেবেও মোহিত বাবুকে পছন্দ করতেন। সে সময় তিনি কোলকাতার একটা কলেজে অধ্যাপনা করতেন। বাবার অনুপস্থিতির সময় প্রায়ই তিনি শান্তিনিকেতনে আসতেন। পরবর্তীতে কলেজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি স্থায়ীভাবে এখানে চলে আসেন এবং স্কুলের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
হাজারিবাগের আবহাওয়া খুব একটা উপকারে এল না। বাবা তখন রানীকে আলমোড়ার পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। আমি থেকে গেলাম শান্তিনিকেতনে, হোস্টেলের স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে। এন্ট্রান্স পরীক্ষা হয়ে গেলে মোহিত বাবু আমাকে মিল্টন ও শেক্সপিয়র এবং বিধুশেখর ভট্টাচার্য সংস্কৃত ও পালি শেখাতেন। অবসরে আমি অশ্বঘোষের বুদ্ধচরিত বাংলায় অনুবাদ করতাম। বহু বছর পর বিশ্বভারতী দুই খণ্ডে এ বইটি প্রকাশ করেছিল। সংকোচের সঙ্গে স্বীকার করছি যে আমার সংস্কৃত জ্ঞান আহামরি কিছু ছিল না। ফলে বিশ্বভারতীর গবেষণা ভবনের একজন পণ্ডিতকে অনুবাদটির চূড়ান্ত সম্পাদনার ভার দিতে হয়েছিল।
গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হলে ছাত্ররা এবং শিক্ষক-কর্মচারীর বেশির ভাগ শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেল। আমি থাকলাম আর থাকল আমার সময় কাটানোর নিজস্ব কিছু পদ্ধতি। বাবার টেবিলে আমার জ্যাঠাত বোন ইন্দিরাকে লেখা তাঁর চিঠির দুই বান্ডিল অনুলিপি পেলাম। ইন্দিরা সেগুলো অতি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেছিল ও তার চমৎকার হস্তাক্ষরে অনুলিপি করে দিয়েছিল। আর সুন্দরভাবে বাঁধাই করে দিয়েছিল তার ভাই সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এগুলো পেয়ে আমি দারুণভাবে উৎফুল্ল হয়েছিলাম। একটি ছোট টিলার উপর বটগাছের নিচে ডেক-চেয়ার পেতে আমি এগুলো পড়তে বসে যেতাম। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠ। কেবল একসারি তালগাছ সান্ত্রীর মত দাঁড়িয়ে যেন মধ্যদিনের নির্জনতাকে পাহারা দিত। লক্ষ করতাম গ্রীষ্মের তাপ বালুময় পতিত ভূমি থেকে প্রতিফলিত হয়ে নিশ্চল বাতাসের ভিতর দিয়ে ছন্দময় ভঙ্গিতে উপরে উঠছে। অখণ্ড মনোযোগের জন্য এ ছিল এক দারুণ পরিবেশ। এমনকি কোনো পাখির ডাকও ছিল না। কেননা, সূর্যের তাপ এড়ানোর জন্য তারা পাতার আড়ালে লুকিয়ে গিয়েছিল।
চিঠিগুলো প্রধানত শিলাইদহ ও পতিসরে অবস্থানকালীন লেখা হয়েছিল। সে অঞ্চলের নদীগুলোতে হাউজবোটে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বাবা এগুলো লিখেছিলেন। ওরকম নদীর শান্ত জল আর আনন্দময় সবুজ প্রকৃতিতে ছুটিটা কাটাতে পারলে কতই না ভালো হতো! কিন্তু আমাকে সময় কাটাতে হচ্ছে অনুর্বর পতিতভূমির মাঝখানে। সবুজ প্রকৃতি তো দূরের কথা, শান্তিনিকেতনের চারপাশে একটা গাছের পাতাও নেই। কিন্তু চিঠির প্রাণবন্ত বর্ণনা আমার ওপর জাদুকরী প্রভাব বিস্তার করল। আমি যেন ঘোরের মধ্যে শিলাইদহ আর পতিসরের প্রিয় স্থানগুলোতে চলে যেতে থাকলাম। আর কোনো কিছু পড়ে এত আনন্দ পাইনি। এ চিঠিগুলো আমি ও আমার ভগ্নিপতি নরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি মিলে ১৯১১ সালে ছিন্নপত্র নাম দিয়ে প্রকাশ করেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে চিঠিগুলোর উৎকৃষ্ট অংশগুলোতে বাবা নির্দয়ের মত সংশোধনের কলম চালিয়েছিলেন।
আমি যখন আশ্রমে ঘোরাফেরা করছি আর বারবার চিঠিগুলো পড়ছি, তখন কোলকাতা থেকে রানীর মৃত্যুসংবাদ এল। আলমোড়ায় তার স্বাস্থ্যের বেশ উন্নতি হয়েছে দেখে বাবা তাকে কোলকাতায় নিয়ে এলেন। কিন্তু সে পুনরায় ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত হল। মায়ের মৃত্যুর নয় মাস পর তাকেও আমরা হারালাম।
বাবা এবার নতুন উদ্যমে স্কুলের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল যথাযোগ্য শিক্ষক খুঁজে পাওয়া। প্রায়শ শিক্ষক বদলাতে হতো। নতুন শিক্ষক নিয়োগ করা হলে বাবা নিজেই তার প্রশিক্ষণের ভার নিতেন। তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে শান্তিনিকেতনের আদর্শের উপযুক্ত করে তোলতেন। তাঁর পরিচালনায় স্কুলের উন্নতি হতে লাগল। মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এ সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেল। স্কুলের অগ্রগতি নিয়ে যখন বাবা মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে উঠেছেন, তখনি আরেকবার মৃত্যুর ধাক্কা লাগল। কোলকাতায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেলেন। মহর্ষির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে বাবা কোলকাতায় ছুটে গেলেন। তাঁকে সেখানে দীর্ঘদিন থাকতে হল। ঠাকুর পরিবারের মত একটি বড় পরিবারের কর্তার মৃত্যুর পর অনেক কিছু নিষ্পন্ন করতে হয়। এক্ষেত্রেও বিষয়-সম্পত্তির বিলিবণ্টনে অনেক সময় লাগল। মহর্ষির মৃত্যুর পর ঠাকুর পরিবার ভেঙে গেল। হিন্দু যৌথ পরিবার হিসেবে একত্রে থাকতে শরিকেরা আর রাজি হল না।
আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, তখন ছোট ভাই শমীন্দ্র মারা গেল। ছোট বোন মীরা আর শমীন্দ্র শান্তিনিকেতনে বাবার সঙ্গে ছিল। শমীন্দ্র ছিল অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ বালক। সবার আশা ছিল বড় হলে সে-ও বাবার মত কবি হবে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। ছুটি কাটাতে সে বন্ধুদের সঙ্গে মুঙ্গের গিয়েছিল। সেখানে কলেরায় আক্রান্ত হল। বাবা দ্রুত সেখানে গেলেন। বাবা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর সে মারা গেল। বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের এক মহাদেশে আমার কাছে টেলিগ্রাম সে সংবাদ বয়ে নিয়ে গেল।
এর কয়েক বছর পর আমি যখন শান্তিনিকেতনে, বড় বোন বেলাও মারা গেল। সে তখন স্বামীর সঙ্গে কোলকাতায় থাকত। রানীর মত বেলারও যক্ষ্মা হয়েছিল। অসুখ ধরা পড়া থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সর্বক্ষণ বাবা তার বিছানার পাশে থাকতেন। বাবা যে যত্ন করতেন আর যেভাবে তাকে আনন্দিত রাখতে চেষ্টা করতেন সম্ভবত কোনো নার্সই তা পারত না। বেলার লেখার হাত ভালো ছিল। বাবা কাহিনির মসলা যোগান দিতেন আর তাকে দিয়ে গল্প লেখাতেন। সন্তানদের মধ্যে বেলাই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। তার মৃত্যু তাঁকে ভয়ংকরভাবে আঘাত করেছিল।[২]
ভাগ্যের উত্থান-পতন, দুঃখ কিংবা ক্লেশ কোনো কিছুই অবশ্য বাবার চিত্তের প্রশান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারত না। মহর্ষির মতই তিনিও সর্বাবস্থায় অবিচলিত থাকতেন। বেদনা যতই পীড়াদায়ক হোক না কেন, তা তাঁর ভিতরের শান্তিকে নষ্ট করতে পারত না। সবচেয়ে দুঃখের দুর্ভাগ্যকে সইবার মত এক অতিমানবিক শক্তি ছিল তাঁর।
এ কয় বছরে একের পর এক দুঃসহ পরীক্ষার মুখোমুখি হলেও বাবার কলম কিন্তু বসে থাকেনি। বাবা যখন রানীর সেবাযত্ন করছেন আর তার আরোগ্যলাভের আশায় তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন, সে সময়টায় তিনি লিখেন চোখের বালি আর নৌকাডুবির মত উপন্যাস। কদাচিৎ তিনি একটানে কোনো উপন্যাস লিখেছেন। একটি অধ্যায় লেখা হলেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের জন্য তা পত্রিকায় পাঠিয়ে দিতেন। নিজে যত দুঃখ-কষ্টই ভোগ করুন, বাবা কখনও পত্রিকার সম্পাদকদের অপেক্ষায় রাখতেন না। চারপাশে পরিবেশগত বা মানসিক এত ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও যে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ আর অন্যান্য লেখার অবিরাম স্রোত বয়ে গেছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা আর সৃষ্টির অদম্য তাড়না না থাকলে তা সম্ভব হতো না।
*
১. ১৩২১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত স্মরণ নামক কাব্যের ৫ নং কবিতা। ১৩২১ সালে বই আকারে বের হলেও মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই কবি স্মরণ-এর কবিতাগুলো রচনা করেছিলেন। তিনি মারা যান ১৩০৯ বাংলা সনের ৭ অগ্রহায়ণ। আর এগুলো প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্গদর্শন-এর ১৩০৯ সালেরই অগ্রহায়ণ-ফাল্গুন সংখ্যায়।
২. শেষ জীবনে, রবীন্দ্রনাথের ৭১ বছর বয়সে, মৃত্যু কবিকে আবারও আঘাত দিয়েছিল। কবির পাঁচ সন্তানের মধ্যে কন্যা বেলা, রানী আর পুত্র শমীন্দ্র বহু আগেই মারা গেছে। রথীন্দ্রনাথ বেঁচে আছেন, তবে এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে যে তাঁর ঔরসে সন্তান হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি নন্দিনী (পুপে) নামের কন্যা দত্তক নিয়েছেন। কন্যা মীরা আর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় আর তাঁর বোন নন্দিতা গঙ্গোপাধ্যায়ই তখন রবীন্দ্রনাথের জীবিত বংশধর। জার্মানিতে পড়াশুনাকালীন নীতীন্দ্র মারা যান ১৯৩২ সালের ৭ আগস্ট তারিখে। নন্দিতা ওরফে বুড়ির বিয়ে হয় কৃষ্ণা কৃপালনীর সঙ্গে। এ দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন। নিঃসন্তান ছিলেন রথীন্দ্রনাথের পালিতা কন্যা নন্দিনীও। ফলে ১৯৬১ সালে রথীন্দ্রনাথ, ১৯৬৭ সালে নন্দিতা আর ১৯৬৯ সালের দিকে মীরা দেবীর মৃত্যুর পর পৃথিবীতে কবির ঔরসজাত আর কোনো বংশধর থাকল না। শোনা যায়, নাতি নীতীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে কবি এতটাই আঘাত পেয়েছিলেন যে এর পর তিনি আর নামের আগে শ্ৰী লিখতেন না।
