স্বদেশি আন্দোলন
এন্ট্রান্স পাস করার পর আমি যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাই। ঐ পরীক্ষার শেষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হবার মাঝখানের অবকাশে মধ্য গ্রীষ্মের আরেক প্রবল উন্মাদনা আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। দেশপ্রেমের যে জোয়ার সারাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তা আমাকেও দারুণভাবে স্পর্শ করে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই স্বদেশি আন্দোলন শুরু হয়েছিল আর ১৯০৫-০৬ সালে তুঙ্গে উঠেছিল। অবশ্য ঠাকুর পরিবারের লোকদের কাছে এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। দেশপ্রেম বলতে যা বোঝায়, ঠিক সেরকম একটি পরিবেশেই আমরা মানুষ হয়েছি। বাবার জীবনস্মৃতি যারা পড়েছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে এমনকি তাঁর বাল্যকালেও তিনি সকল ক্ষেত্রে স্বদেশিয়ানা প্রচারের সাহসী প্রচেষ্টা লক্ষ করেছিলেন। এর একটি বড় উদাহরণ আমার জ্যাঠামশাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ছিলেন মূলত শিল্প-সাহিত্য-সংগীত জগতের লোক। সেই তিনিও স্বদেশি উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি জাহাজ কোম্পানি খুলে বসেন। তিনি কয়েকটি বাষ্প-চালিত জাহাজ কেনেন এবং পূর্ববঙ্গের নদ-নদীতে চালাতে শুরু করেন। অবশ্য একটি ইংরেজ কোম্পানি কিছুটা অবৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করে তাঁকে নৌপরিবহন ব্যবসায়ের পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করে। এ দেশপ্রেমমূলক উদ্দীপনার জন্য তাঁকে চড়া মূল্য দিতে হয়। কেননা, তিনি অনেক টাকা ঋণ নিয়ে এ ব্যবসায় খুলেছিলেন। বহু বছর ধরে তাঁকে এ ঋণের ঘানি টানতে হয়েছিল।
এ সকল প্রচেষ্টা কেবল স্বদেশি চেতনার বহিরঙ্গ ছিল। সে সময় উপরতলার ভদ্রলোকেরা ইংরেজি আচার-ব্যবহারে কেতাদুরস্ত হলেও, ঠাকুর পরিবার তাঁদের জীবনযাপন প্রণালী, পোশাক পরার ধরন, এমনকি চিন্তা-চেতনায়ও দেশীয় পরিচয় পুরোপুরি বজায় রেখেছিল। আমরা ছিলাম মনেপ্রাণে ভারতীয়। কাজেই দেশবাসী যখন স্বদেশিয়ানার স্লোগান তুলল, সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তাতে সাড়া দিলাম।
স্বদেশি আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন এটা চাপিয়ে দেয়নি। বলা যেতে পারে যে রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যপন্থা অবলম্বন ও ব্যর্থতার প্রতিবাদস্বরূপ এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। জনগণ অস্থির হয়ে উঠেছিল। তারা কাঁধ থেকে বিদেশি শাসনের জোয়াল ফেলে দিতে চাচ্ছিল। কংগ্রেস যেন বিভিন্ন প্রস্তাব পাস করেই তাদের দায় সারছিল। তাদের এ নেতিবাচক ও অকার্যকর রাজনীতি জনসাধারণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। চারদিকে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রবল উত্তেজনা। আবেগের এমন ঢেউ বাংলায় আগে আর কখনও দেখা যায়নি। শান্তিনিকেতনেও এর আঁচ লাগল। বাদ গেলাম না আমি এবং আমার বন্ধু সন্তোষ মজুমদারও। ভাইপো দিনেন্দ্রনাথ এবং অজিত চক্রবর্তী রোজ সকালে একটি দল নিয়ে নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে দেশপ্রেমের গান গেয়ে বেড়াত আর আন্দোলনের জন্য চাঁদা তুলত। প্রতিদিনই আমরা তাতে যোগ দিতাম। বিলেতি পণ্য বর্জনের আহ্বান জানাতে আমরা মাঝে মাঝে শহরেও যেতাম।
১৯০৫ সালের যুদ্ধে জাপান সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে দেয়। এ ঘটনাও স্বদেশি আন্দোলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ দুদেশের চুক্তি স্বাক্ষরের দিন আমরা শান্তিনিকেতনের ফুটবল মাঠের মাঝখানে বিরাট আকারের আগুন জ্বালালাম এবং সারারাত গান গেয়ে এশিয়ার জাগরণ উদযাপন করলাম। বাবা জাপান থেকে একজন যুযুৎসু বিশেষজ্ঞকে নিয়ে এসেছিলেন। বৃটিশদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য আমরা তাঁর নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিলাম! ভাবখানা এমন যে জুডোর চেতনা ও কৌশলই জাপানিদেরকে যুদ্ধে জিতিয়ে দিয়েছিল।
কিছুদিন না যেতেই আন্দোলনটি দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে গেল। একদিকে থাকলেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী, আর অন্যদিকে রইলেন চরমপন্থিরা, প্রায়শ যাদেরকে সন্ত্রাসবাদী বলা হয়, যারা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বৃটিশদের তাড়াতে চাইছিলেন।
স্বদেশি আন্দোলনের চরিত্রটা ঠিকভাবে বুঝতে হলে এতে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর ভূমিকাকে অবহেলা করলে চলবে না। নিঃসন্দেহে তাঁরাই এর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যদিও তাঁদের অনেকেই পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চাননি। তৎকালীন যুবসমাজের ওপর তাঁরা কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং কেমন করে তাদের ভিতর দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন আজও অনেকে তার সম্যক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে না। আজকে পুরনো স্মৃতি ঘাঁটতে গিয়ে দেখি যে নামগুলো আমার মনে সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বল করছে সেগুলো কোনো বাঙালির নাম নয়, এমনকি নয় কোনো ভারতীয়রও। তাঁরা দুজন বিদেশি—কাউন্ট কাকুজো ওকাকুরা আর সিস্টার নিবেদিতা।
কাউন্ট ওকাকুরা তেমন কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই কোলকাতা এসেছিলেন, অনেকটা অচেনা আগন্তুক হিসেবে। তিনি কী করে আমাদের পরিবারের সংস্পর্শে এসেছিলেন তা আমার জানা নেই। কিন্তু তিনি আমার জ্যাঠাত ভাই সুরেন্দ্রনাথকে অত্যন্ত পছন্দ করলেন এবং তাঁর বাড়িতে বাস করতে শুরু করলেন। সেখানে থাকতে থাকতেই তিনি সমাজের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে পরিচয় করে নিলেন। তিনি যখন তাঁর বিখ্যাত বই আইডিয়াল অব দ্য ইস্ট লেখেন তা আমাদের কাছে রীতিমত ঐশী বাণীর মত মনে হল। এর শুরুর বাক্যটাই আমাদের মনের গভীর সুপ্তিকে ভাঙিয়ে দিয়েছিল। তা ছিল এরকম, “এশিয়া এক। হিমালয় কেবল দুটি শক্তিশালী সভ্যতাকে আলাদা করেছে—একদিকে চিনের কনফুসিয়ান কমিউনিজম এবং অন্যদিকে ভারতের বৈদিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য।” কেবল আমাদের পরিবারের লোকদের সঙ্গেই নয় বরং জগদীশচন্দ্র বসু, সিস্টার নিবেদিতা, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ এবং চরমপন্থি দলের কোনো কোনো নেতার সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। বাংলার জাগরণে বৃটিশ সংস্পর্শের প্রভাব নিয়ে অনেক কিছুই লেখা হয়েছে কিন্তু খুব কম লোকই বুঝতে পেরেছে এই জাপানি জ্ঞানীর আশ্চর্যজনক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এ প্রদেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে কী গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল! তিনি এসেছিলেন এক ক্রান্তিলগ্নে, যখন পশ্চিমা শাসনের প্রতি প্রতিবাদ সবে শুরু হয়েছে। তাঁর কথা ও লেখার মধ্য দিয়ে তিনি আমাদেরকে নিজ সভ্যতার ওপর হারানো আস্থা ফিরে পেতে এবং বিশ্ব সভ্যতায় এশিয়ার যে তখনও অনেক কিছু দেবার আছে সে বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেন। এটা এক নীরব বিপ্লব সংঘটিত করে যা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সুস্থ জাতীয়তাবোধের জন্ম দেয়। ক্রমে এই জাতীয়তাবাদ ভারতের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।
স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য সিস্টার নিবেদিতা ছিলেন জাতিতে আইরিশ। কেউ নতুন ধর্মান্তরিত হলে তার যেমন উদ্যম থাকে, তাঁরও তেমনি ছিল। বলা যেতে পারে যেকোনো ভারতীয়ের তুলনায় বেশিই ছিল। গুরুর প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর আইরিশ রক্ত সক্রিয় হয়ে উঠল। তাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্ব একদিকে যেমন তাঁর আত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির পুনর্নির্মাণ করতে বাধ্য করল,
তেমনি অনুপ্রাণিত করল ভারতের স্বাধীনতার স্বপক্ষে আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়াতে। স্বামী বিবেকানন্দ এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি যে কেবল বিখ্যাত ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে আসতে পারলেন তা-ই নয়, বহু সংখ্যক যুবকের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ঘটল। তাঁদের সংবেদনশীল হৃদয়ে তিনি দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিতে এবং নতুন কিছু করার তাড়না সঞ্চারিত করতে সক্ষম হলেন।
১৯০৫ সালে আমি আর সন্তোষ মজুমদার গিরিডিতে ছুটি কাটাচ্ছিলাম। আমরা এ আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেলাম। আমাদের কাছাকাছি থাকতেন সুপরিচিত রাজনীতিবিদ মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতা, আর ছিলেন ভি. রায়—জগতের যেকোনো মঙ্গলকর কিছুর জন্য যার উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। রোজ সকালে আমরা কয়েকজন শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে দেশাত্মবোধক গান গাইতাম। আরও বেশিসংখ্যক লোক সংগঠিত হয়ে প্রত্যেক সন্ধ্যায় দোকানে দোকানে প্রচারণা চালাতে যেতাম যেন তারা বিদেশি পণ্য বিক্রয় না করে। কোনো দোকানে বিদেশি কাপড় পাওয়া গেলে তা জব্দ করা হতো। সবশেষে এভাবে সংগৃহীত ম্যাঞ্চেস্টারে তৈরি কাপড় আগুন দিয়ে পোড়ানো হতো। একদিন আমাদেরকে খবর দেয়া হল ব্যারিস্টার পি. মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি কোলকাতা থেকে এসেছিলেন এবং নিকটবর্তী ডাকবাংলোয় উঠেছিলেন। তিনি আমাদেরকে অনুশীলন সমিতির কথা বললেন, বিশেষত বৃটিশদের তাড়াতে এবং দেশমাতৃকাকে বিদেশি শাসনের নিগড় থেকে উদ্ধার করতে সশস্ত্র দলটি কীভাবে গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছে তা জানালেন। এরকম দেশদ্রোহমূলক কথাবার্তা তিনি এত প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন দেখে আমরা খুব রোমাঞ্চিত হলাম। তিনি আমাদেরকে এতটা বিশ্বাস করছেন ভেবেও আমাদের খুব ভালো লাগল। আমরা তাঁকে কথা দিলাম যে কোলকাতায় ফেরামাত্রই অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেব।
সে ছিল এক কাল। এমন কর্মচাঞ্চল্য ও উদ্দীপনা কোনো জাতির জীবনে খুব কমই আসে। সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নানা ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য অগণিত যুবকের দল ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমার মনে আছে বিপিন চন্দ্র পাল, সখারাম গণেশ দেওস্কর, রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, হেম চন্দ্র মল্লিক, সতীশ চন্দ্র মুখার্জিসহ অন্যরা প্রায়ই মধ্যরাতে হাজির হতেন এবং কিছু বুনো কর্মসূচি নিয়ে বাবা ও গগনেন্দ্রনাথের সঙ্গে গোপন বৈঠক করতেন।
বাবা যদিও তাঁর বক্তৃতা ও লেখা, বিশেষ করে দেশপ্রেমের গানের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন, তাঁর মূল চিন্তা ছিল কীভাবে এই গণজাগরণকে গঠনমূলক কাজে নিয়োজিত করা যায়। এই সময়ে কোলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে সুধীসমাজের এক বিশাল জমায়েতের সামনে তিনি ‘স্বদেশি সমাজ’ নামক প্রবন্ধ পড়লেন। তিনি এ প্রবন্ধের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন ও স্বনির্ভরতার মাধ্যমে গ্রামবাংলা পুনর্গঠনের রূপরেখা তুলে ধরেন।
নভেম্বরের এক ঠান্ডা কিন্তু ঝলমলে সকালে আমরা ছোট ছোট শালগাছের ঝোপের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম। ঘাস তখনও ভেজা। শিশিরবিন্দুগুলো সূর্যের তির্যক আলোয় হীরের মত জ্বলজ্বল করছে। বাবার মন ভালো ছিল। তিনি গুনগুন করে একটি গানের সুর ভাঁজছিলেন। হঠাৎ তিনি আমাদের দেশে প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর বন্ধু অক্ষয় চৌধুরীর জামাতা যতীন বসু আমাদের সঙ্গে ছিলেন। বাবা বলতে থাকলেন যে আমাদের যুবকদের যে ধরনের শিক্ষা প্রয়োজন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তা দিতে পারছে না। বাংলোতে ফিরে এসেও এ বিষয়ে আলাপ চলতে থাকল। এক সময় বাবা যেন নিজেকেই জিজ্ঞেস করলেন: আমাদের কি একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকা উচিত নয়? এ চিন্তা জাগতেই তিনি অস্থির হয়ে গেলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সে সন্ধ্যায়ই কোলকাতা রওয়ানা দিলেন। সেখানেও ভালোই সাড়া পাওয়া গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জাতীয় শিক্ষা কাউন্সিল গঠিত হল। এ কাউন্সিলের অধীনে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে বাবা তাঁর পাঠ্যক্রম তৈরি এবং অন্যান্য কিছু কাজের ভার নিলেন। এইভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হল। অবশ্য কাউন্সিলের একটি কি দুটি মিটিংয়ের পরই তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হল। তিনি দেখলেন যে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দিকেই কাউন্সিলের সদস্যগণের আগ্রহ বেশি। এছাড়া কারিগরি শিক্ষার দিকেও তাদের ঝোঁক রয়েছে। বাবার উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশরা শিক্ষার যে নিয়ম ও বিধি চালু করেছে তার বাইরে বেরিয়ে এসে ভারতীয় ঘরানার শিক্ষাদান পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করে চালু করতে। কাউন্সিল যা করতে চাচ্ছে তাতে এ উদ্দেশ্য সাধন হবে না বুঝতে পেরে তিনি পরে আর কোনো সভায় যোগ দেননি।
বাংলা ভাগের প্রতিবাদে যে আন্দোলন শুরু হল বাবা তাতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেন। মনে হল স্বেচ্ছায় গৃহীত বিচ্ছিন্নতা পরিত্যাগ করে তিনি বুঝি রাতারাতি জাতীয়তাবাদের সেরা প্রচারকে পরিণত হলেন। কবিতা, গান আর মর্মভেদী বক্তৃতায় কার্জনের ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করলেন। পাশাপাশি জনসাধারণের প্রতি আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে একতাবদ্ধ হতে আহ্বান জানালেন। চিরাচরিত রাখিবন্ধন উৎসবেও তিনি নতুন মাত্রা যোগ করলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় ঐদিন সবার হাতে রঙিন সুতো বেঁধে দেয়া হল, যা বাংলার চিরঐক্যের অমর প্রতীক হয়ে দেখা দিল। রাখিবন্ধনের দিন কোলকাতায় এক বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হল। তিনি তার নেতৃত্ব দিলেন এবং রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে গাইলেন—
বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান…
এবং
বাংলার মাটি, বাংলার জল…।
এদিন দেশপ্রেমের অভূতপূর্ব আবেগ সঞ্চারিত হয়েছিল। বিকেলে বাগবাজারের পশুপতি বসুর বাড়ির প্রশস্ত আঙিনায় এক বিরাট জনসভা হল। জাতীয় আন্দোলনকে চালিয়ে নেওয়া এবং একটি গণমিলনায়তন নির্মাণের জন্য তহবিল গঠন করতে বাবা এ সভায় সবার প্রতি আবেদন জানালেন। তৎক্ষণাৎ পঞ্চাশ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়ে গেল।
অবশ্য শীঘ্রই বাবা বুঝে গেলেন যে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বদেশি আন্দোলনকে যেদিকে নিয়ে যেতে চাইছেন তিনি তা সমর্থন করতে পারবেন না। ১৯০৫-০৬ সালের স্বদেশি থেকে ১৯২১ সালের অসহযোগ পর্যন্ত যত রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে তাতে বাবার যেটুকুই সংস্রব ছিল তাতে তিনি সবসময়ই গঠনমূলক কর্মসূচির কথা বলেছেন। লোকেরা অনেক সময়ই অবাক হয়ে ভাবে, বাবা কেন স্বদেশি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, এমনকি নেতৃত্ব দিলেন আবার হঠাৎ কেন এর কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন!
আমার মনে হয় এর কারণ তাঁর প্রতিভা ছিল মূলত সৃষ্টিশীল কাজের উপযোগী। বর্জনের সংস্কৃতিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯২১ সালের মার্চে সিএফ এন্ড্রুজকে লেখা এক পত্রে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নিমরূপ স্মৃতিচারণ করেন[১]:
‘আজ মনে পড়ছে স্বদেশি আন্দোলনের সময় আমাদের ‘বিচিত্রা’ ভবনের দোতলায় আমার সঙ্গে একদল যুবকের দেখা করার ঘটনাটা। তারা জানাল যে আমি বললেই তারা স্কুল-কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে। আমি তাদের কথা একেবারেই মানতে পারলাম না। তারা রাগ করে চলে গেল। দেশের প্রতি আমার কোনো দরদ আছে কি না তা নিয়েও তারা ঘোরতর সন্দেহ পোষণ করল। তারা জানে না যে জনজোয়ারের এ উচ্ছ্বাসেরও বহু বছর আগে, যখন আমার নিজের বলতে পাঁচশত টাকাও ছিল না, তখনই ‘স্বদেশি ভাণ্ডার’ খোলার জন্য এক হাজার টাকা দিয়েছিলাম।[২] বললে জুটেছে পরিহাস আর পুঁজি খোয়ানো।
ঐ যুবকদেরকে বিদ্যালয় পরিত্যাগ না করতে বলার কারণ হল নিষ্ফল বিশৃঙ্খলা আমাকে কখনও টানে না, এমনকি তা সাময়িকের জন্য হলেও। জীবন্ত বাস্তবতাকে এড়িয়ে সংক্ষিপ্ত পথে কার্যসিন্ধির প্রবণতাকে আমি ভয় পাই। এ যুবকরা তো আর কোনো ছায়ামূর্তি নয়।[৩] তারা বাস্তবে বাস করছে, এ কথা তাদের কাছে যেমন সত্য, তেমনি সত্য অন্যদের কাছেপ। যে বর্জননীতি ওদের জীবনকে বাস্তবতার ভিটে থেকে উচ্ছেদ করবে, তাকে আমি হালকাভাবে নিতে পারিনি। কোনোরূপ বিকল্প ব্যবস্থা না করে পেশাগত জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রলোভন দিয়ে ওদের প্রতি যে অবিচার ও ক্ষতি করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই তাদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না।’
একই কারণে তিনি ভারতে তৎকালে চলমান অসহযোগ আন্দোলনে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে পারেননি। তাঁর নিকট অসহযোগ আন্দোলনের অর্থ ছিল ‘রাজনৈতিক সংযম।’ ঐ একই চিঠিতে তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “আমাদের ছাত্ররা কিসের তরে তাঁদের ত্যাগের নৈবেদ্য অর্পণ করছে? পূর্ণতর শিক্ষার দিকে নয়, বরং অশিক্ষার পায়ে।”
এরও আগে, ১৯২০ সালে এ বিষয়ে আরও জোরালো ও খোলাখুলিভাবে তিনি লিখেছিলেন:
দেখতে পাচ্ছি আমার দেশবাসী অসহযোগ নিয়ে কীরকম ভয়ানকভাবে উদ্দীপ্ত। এটিও শেষ পর্যন্ত বাংলায় স্বদেশি আন্দোলনের পরিণামই ভোগ করবে। এরকম আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভারত জুড়ে আলাদা আলাদা দেশসেবামূলক সংগঠন তৈরি করতে পারলে ভালো হতো।
মহাত্মা গান্ধী এতে সত্যিকারের নেতৃত্ব দিন। তিনি যেন ইতিবাচক সেবার ডাক দিতে পারেন, ত্যাগের ডাক দিতে পারেন, যার লক্ষ্য হবে প্রেমময় এবং সৃজনশীল। আমি তাঁর পদতলে বসে আদেশ পালনে রাজি আছি যদি প্ৰেম ও সেবার মাধ্যমে আমার দেশবাসীর সেবা করতে বলেন। কিন্তু ক্রোধের আগুন জ্বালানো এবং তা ঘর থেকে ঘরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আমার পৌরুষ ব্যয় করতে রাজি নই।
তাঁর অবস্থান সম্ভবত সবচেয়ে পরিষ্কার করে বুঝিয়েছেন ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে নিউইয়র্ক থেকে সিএফ এন্ড্রুজকে লেখা নিচের এই চিঠিটিতে[৪] :
স্বদেশি, স্বরাজ—এ শব্দ দুটি আমাদের দেশের লোকদেরকে প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপ্ত করে। এ দুটি শব্দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়ার মত এমন আগুন রয়েছে যা আর কিছুতে নেই। এ উত্তাপ এবং আন্দোলন আমাকেও স্পর্শ করে। তবে, হয়ত আমার কবিস্বভাবের কারণেই, স্বদেশি বা স্বরাজ্য আন্দোলনকে আমি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে মেনে নিতে পারিনি। এগুলোর যতটুকু গুরুত্ব রয়েছে, এরা তার থেকে অনেক বেশি মূল্য দাবি করে। তাই কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হবার পর, আমি যে সকল লোককে সঙ্গে নিয়ে এ লক্ষ্যে কাজ করেছি, তাদের থেকে দূরে সরে না এসে পারিনি। দেশপ্ৰেম বা কেবল নীতির কাছে পরিপূর্ণ মানবসত্তা বলি হয়ে যাচ্ছে দেখলে আমার মন কেঁদে ওঠে।
আমার কাছে মনুষ্যত্ব বিপুল, বিরাট ও বহুমুখী।
বাবা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ভারতের জাতীয় চরিত্রে সৃষ্টিশীলতা রয়েছে। তাঁর এ ধারণাই ক্রমে আরও পরিণত হয়ে পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যের লোকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বৃহত্তর স্বপ্নের রূপ নেয়। তিনি বলতেন যে বিশ্বভারতীর আদর্শ এটাই। শান্তিনিকেতন এবং শ্রীনিকেতনে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, ১৯২১ সালের ইউরোপ সফরশেষে ফিরে এসে সেগুলোর নানাবিধ কাজে আরও বেশি আত্মনিয়োগ করেন। এসকল প্রতিষ্ঠান একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক চরিত্রের ছিল, তেমনি ছিল গান্ধীর ভাষায় ‘খাঁটি দেশি।
এভাবে, স্বদেশি বা স্বরাজপন্থিদের সঙ্গে পথ ভাগ হয়ে যাবার অনিবার্য ব্যাপারটি ঘটল। বাবা নীরবে-নিঃশব্দে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। কেবল খেয়া কাব্যের কয়েকটি কবিতায় তাঁর সে সময়কার মনোভাবের আঁচড় লেগে থাকল। রাজনীতি থেকে দূরে গেলেও তাঁর কর্মযজ্ঞ কিন্তু থেমে থাকেনি। জাতি গঠনমূলক কাজের তাড়না থেকেই তিনি পরবর্তীতে শ্রীনিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাবনা এ সময় থেকেই শুরু হয়। তিনি নিজ জমিদারিতে এ বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রজাদেরকে উন্নয়নমূলক কাজে সংগঠিত করার জন্য পরিকল্পনা করেন এবং তা কাজে পরিণত করতে কয়েকজন কর্মচারীকে গ্রামে পাঠিয়ে দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, পল্লীর উন্নতিসাধন করতে হলে সেখানকার মূল সম্পদ কৃষির উন্নতি করতে হবে। এ পর্যায়ে তিনি ঠিক করলেন যে সন্তোষ এবং আমাকে কৃষি ও পশুপালন শিখতে বিদেশে পাঠাবেন, যেন ফিরে এসে এ কাজে তাঁকে সহায়তা করতে পারি।.
*
১. রবীন্দ্রনাথ এ চিঠিটি লেখেন ৫ মার্চ ১৯২১ তারিখে, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো থেকে।
২. অম্বিকাচরণ উকিলের উদ্যোগে স্বদেশি পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য ১৮৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কোলকাতার হ্যারিসন রোতে ‘স্বদেশি ভাণ্ডার’ নামের যৌথ-ব্যবসায় স্থাপিত হয়। এর সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
৩. মূল চিঠিটি প্রায় আড়াই পাতার, ১০টি অনুচ্ছেদে লিখিত। রথীন্দ্রনাথ এর থেকে ৬ নং অনুচ্ছেদ পুরোটা আর ৭ নং অনুচ্ছেদ আংশিক, ‘ছায়ামূর্তি নয়’ পর্যন্ত উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত পড়ে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য পুরো পরিষ্কার নাও হতে পারে, এ আশংকায় পরের তিনটি বাক্য মূল চিঠি থেকে অনুবাদ করে সংযুক্ত করেছি। মূল চিঠির সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে দেখি রথীন্দ্রনাথের বইয়ে চিঠিটির একটি লাইন ‘These students were no mere phantoms to ine’ পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্য একাদেমি কর্তৃক প্রকাশিত শিশিরকুমার দাস সম্পাদিত The English Writings of Rabindranath Tagore, vol. 3’তে (সংস্করণ ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ২৮৬) বাক্যটি ছাপা হয়েছে These students were no mere plantoms to the মজার ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের একটি প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত রবীন্দ্র রচনাবলির ২১তম খণ্ড Rabindra Ocuvre’-এও (প্রথম সংস্করণ সেপ্টেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৭৪), phantoms নয়, plantoins-ই ছেপেছে। কিন্তু ইংরেজি ভাষায় plantoins বলে কোনো শব্দ আছে বলে আমাদের জানা নেই। সিএফ এন্ড্রুজ এর মূল ‘Letter to a Friend’ এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পাইনি, তবে ঐ বইয়ের বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত মলিনা রায়ের অনুবাদ ‘রবীন্দ্রনাথ-এন্ড্রুজ পত্রাবলী’তে চিঠিটির অনুবাদ থেকে মনে হয় শব্দটি plantoins হবে না, বরং রথীন্দ্রনাথ উল্লেখকৃত phantoms হবে।
৪. ১৪ জানুয়ারি, ১৯২১, নিউইয়র্ক থেকে লিখিত।
