কসমোপলিটান ক্লাব
১৯০৬ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাইরের দেশগুলোর তেমন যোগাযোগ ছিল না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হাতেগোনা কয়েকজন বিদেশি ছাত্র ছিল। তারাও মূলত ফিলিপাইন আর মেক্সিকো থেকে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রদের কেউ কেউ আমাদের বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহী ছিল, কেউ কেউ ছিল ঠিক তার উল্টো।
কয়েকজন বিদেশিকে সংগঠিত করে আমি একটি বহুজাতিক ক্লাব শুরু করলাম। সৌভাগ্যক্রমে এ কাজে কয়েকজন অধ্যাপক সাহায্য করলেন। তাঁদের আনুকূল্য ছাড়া কোনো রকম ভিত্তি পাওয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব ছিল না। সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে রোমান ভাষার অধ্যাপক ড. এআর সেমুর। তিনি যে কেবল কসমোপলিটান ক্লাবকেই সহায়তা করেছেন তা নয়, প্রত্যেক বিদেশি ছাত্রের প্রতিই খুব সদয় এবং আন্তরিক ছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল নেভাদা স্ট্রিটে। তা যেন আমার নিজের বাসার মতই হয়ে গেল। মিসেস সেমুর আমাকে মায়ের মত আদর করতেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম এলাকার সে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তিন বছর পড়েছি। আমার ওখানকার জীবন ছিল বিবর্ণ। কেবল এই ভদ্রমহিলার মাতৃস্নেহ ছিল উজ্জ্বলতায় ভাস্বর। আমি তাঁদের ওখানে নিয়মিত যেতাম। রান্নাঘরের থালাবাসন ধুতে ধুতে তিনি আমার সঙ্গে গল্প করতেন। মাঝে মাঝে আমিও হাত লাগাতাম। কাচের এবং চীনে তৈরি ভঙ্গুর জিনিসপত্র ভেঙে হাত কেটে যেতে পারে বলে তিনি আমাকে মানা করতেন। কিন্তু তার নিষেধ শুনতাম না। অবসর সময়ে তাকে ভারতীয় ধ্রুপদী সাহিত্য অনুবাদ করে শোনাতাম, এর বদলে কখনও কখনও তিনি তার লেখা কবিতা শোনাতেন। কয়েক বছর পর বাবা আর্বানা বেড়াতে এলেন। সন্ধ্যায় আমি ডক্টরেট পর্যায়ের গবেষণায় ব্যস্ত থাকতাম আর বাবা সেমুর পরিবারের সঙ্গে গল্প করতে যেতেন। তাঁরা বাবার জন্য আগ্রহ নিয়ে বসার ঘরে অপেক্ষা করতেন। তিনি তখন Sadhana গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো লিখছিলেন। সেগুলো তাঁদেরকে পড়ে শোনাতেন। আজও পরিবারটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে। মিসেস সেমুরের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ বজায় আছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেলেও তার সে সময়কার স্নেহ ও প্রীতি এখনও আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে হয়।
কসমোপলিটান ক্লাবের কথা বলতে গিয়ে একটি চিঠির কথা না তুললেই নয়। ১৯৫৬ সালের ৮ জুলাই মিসেস সেমুর এটি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তোমার কি ভারতের এক তরুণ ছাত্রের কথা মনে আছে, ১৯০৯ সালের কসমোপলিটান ক্লাবের বাৎসরিক নৈশভোজে যে Auf Wiedersehend[১] বলে বিদায় জানিয়েছিল? মিস্টার সেমুর-এর ফাইলপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি সে সব দিনের বেশ কিছু চিঠি, কাগজ আর নানা অনুষ্ঠানের সূচিপত্র পেয়েছি। এগুলো দিয়ে ক্লাবটির প্রথম দিককার ইতিহাস লেখা যেতে পারে। এগুলোর মধ্যে সে নৈশভোজ সংক্রান্ত কাগজপত্রও আছে। আমার মনে পড়ছে ক্লাব প্রতিষ্ঠায় তোমার আগ্রহ, নিষ্ঠা আর এর মঙ্গল ও শ্রীবৃদ্ধি সাধনে তোমার একাগ্র প্রচেষ্টার কথা। তুমি ঠিক জানতে ক্লাব ভালোভাবে চালাতে হলে কী চাই—নিদেনপক্ষে একটা ঘর আর একদল নিবেদিত সদস্য। তুমি চলে যাওয়ার পর ক্লাব চালাতে অন্যদেরকে বেগ পেতে হয়েছে।
আবার মূল কথায় ফেরা যাক। বছরখানেকের মধ্যেই কসমোপলিটান ক্লাবের সদস্যসংখ্যা বেশ বেড়ে গেল। আমি এর সভাপতি নির্বাচিত হলাম। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও এর ঢেউ লাগল। এ সকল ক্লাবকে আমরা একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের অধীনে নিয়ে এলাম। এর নাম দেয়া হল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবস। আমি চলে আসার আগে একই ধরনের ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল। এ ধরনের কসমোপলিটান বা আন্তর্জাতিক ক্লাবগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমার বন্ধু লিওনার্দ এলমহার্স্ট তখন কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ছিলেন। তিনি মিসেস ডরোথি স্ট্রেইটের কাছ থেকে একটি বড় অঙ্কের অনুদান সংগ্রহে সক্ষম হন। এই টাকা দিয়ে আমাদের ক্লাবের ঘর তৈরি করা হল। মিসেস ডরোথি ছিলেন ধনী বিধবা। মৃত স্বামীর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি এ টাকা দান করেছিলেন। এ টাকায় একটি চমৎকার দালান তৈরি করা হল। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।
আমি যখন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, সে সময় ছাত্রদের মনমানসিকতা ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বললেই মন ও আত্মার মুক্তির কথা মনে জাগে। কিন্তু তার কোনো চিহ্ন সেখানে ছিল না। এও দেখেছি যে ইভানজেলিস্ট খ্রিস্টানরা এখানে তাদের মতবাদ প্রচার করত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবাধে ধর্ম প্রচারের অনুমতি আছে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। বিলি সানডে নামক একজন ইভানজেলিস্ট রীতিমত আড়ম্বর করে এ কাজ করতেন। একবার তাঁর সভায় অনেক ছাত্র জমায়েত হল। এখানে তিনি এমন ভাঁড়ামি করলেন যে আমি রীতিমত ভয় পেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলিনি নামে একটি পত্রিকা ছিল। পরদিন সে পত্রিকায় এর মৃদু প্রতিবাদপত্র লিখলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম যে সম্পাদকও তা ছাপিয়ে দিয়েছেন। তারপর চারদিক থেকে আমার ওপর আক্রমণাত্মক বাক্যবাণ ছোঁড়া হতে লাগল। অবস্থা চরমে উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেবার চিন্তা করলাম। তখন পত্রিকাটি আমার পক্ষে আবার একটি কড়া সম্পাদকীয় লিখল। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করা হয়। এটি লিখেছিলেন কার্ল ভ্যান ডোরেন নামক একজন সিনিয়র ছাত্র। তাঁকে আমি চিনতাম না। একজন অপরিচিতের কাছ থেকে এ সমর্থন পেয়ে খুশি হয়েছিলাম। পরবর্তীকালে এ আনন্দ আরও বেড়ে গিয়েছে, যখন শুনেছি যে কার্ল ভ্যান ডোরেন আমেরিকার অন্যতম সাহিত্য সমালোচক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
*
১. জার্মান শব্দ। এর অর্থ আবার দেখা হওয়া পর্যন্ত বা আবার দেখা হবে।
