দেশে ফেরা
১৯০৯ সালের গ্রীষ্মকালের আগেই ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পড়ালেখা শেষ হয়ে গেল। দেশে ফেরার পূর্বে ইউরোপে গিয়ে কয়েক মাস কাটালাম। লন্ডনে ক্লিমেন্স স্ট্রিটের একটি ফ্ল্যাটে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে থাকার সুযোগ হল। বাঙালি নামে তাঁর একটি পত্রিকা ছিল। যতদূর মনে পড়ে সে পত্রিকার পক্ষে একটি প্রেস কনফারেন্স কভার করার জন্য তিনি এখানে এসেছিলেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময় ব্যয় করছিলেন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে আর বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে। উদ্দেশ্য ভারত সম্পর্কে বৃটিশদের আগ্রহ জাগানো। সব ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, বিশেষ করে শ্রমিক দলের সমর্থকরা সারাদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত। স্যার হেনরি কটনের ছেলে এইচ.ই.এ. কটন সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে থাকতেন এবং তাঁর সচিবের কাজ করতেন। যে অতিথিটি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিলেন তিনি হলেন রিভিউ অব দ্য রিভিউজ-এর সম্পাদক মিস্টার ডব্লিউটি স্টিড। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে ইংল্যান্ড যে সময় বিশ্বের দুর্বল রাষ্ট্র ও ব্যক্তিবর্গের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে ঠিক সে সময় সেখানে একদল উদারপন্থি মানবতাবাদী জন্ম নিয়েছিলেন। মিস্টার স্টিড ছিলেন এ দলটির একজন। অনেক বছর পরে এইচডব্লিউ নেভিনসন নামের একজনকেও আমার ঠিক এমনি ভালো লেগেছিল।
সুরেন্দ্রনাথের বক্তৃতা সবখানেই সমাদৃত হতো। আমার বিশেষ করে মনে পড়ে ওয়েস্টমিনস্টার হোটেলে ন্যাশনাল লিবারেল ক্লাবের দেয়া ডিনারে তার বক্তৃতার কথা। স্বাগত বক্তব্যের জবাবে সেই সন্ধ্যায় তিনি যা বললেন, মনে হল বাগদেবী যেন নিজে তাঁর কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছেন। আমার নিকটে বসা কয়েকজন ফিসফিস করে বললেন যে বার্কের পরে নির্ভুল ইংরেজিতে এমন বাগ্মিতা আর দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন জাত বক্তা। তারপরও প্রতিটি বক্তৃতার জন্য অনেক যত্ন নিয়ে তৈরি হতেন। এমনও দেখেছি পরের দিন যে বক্তৃতা দিতে হবে, আগের দিন হোটেলের কক্ষে জোরে জোরে তার মহড়া দিচ্ছেন। তিনি খুবই শৃঙ্খলাপরায়ণ ছিলেন। সকালে উঠেই ডাম্বেল নিয়ে ব্যায়াম করতেন, তারপর গোগ্রাসে নাস্তা করতেন। আমার বন্ধু কেদারনাথ দাশগুপ্ত তাঁর সঙ্গে ছিল। তাঁর দেখাশুনা করার জন্য সে নিজে থেকেই লন্ডনে এসেছিল। আমাদের দুজনকে প্রায়ই নিকটস্থ এ.বি.সি. রেস্টুরেন্টে গিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হতো। কেননা, দেখা যেত তিনজনের জন্য যে নাস্তা আনা হয়েছে সুরেন্দ্রনাথ একাই তা খেয়ে ফেলেছেন।
অনেক বছর পর ১৯১৭ সালে সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে এক অপ্রীতিকর পরিবেশে আমার আবার দেখা হয়। সে বছর কোলকাতায় কংগ্রেসের সম্মেলন হবে। তখন তার প্রস্তুতি চলছে। ভারতের জাতীয় আন্দোলনে মিসেস অ্যানি বেসান্তের অনেক অবদান রয়েছে। এর জন্য তিনি অনেক কষ্টও সয়েছেন। জনগণ তাঁর সে ভূমিকার স্বীকৃতি দিতে চাইল। তারা তাঁকে সে সম্মেলনের সভাপতি করতে চাইল। কিন্তু তাঁর নাম প্রস্তাব করা হলে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি প্রবল আপত্তি তুললেন। তিনি রক্ষণশীল ছিলেন। একজন চরমপন্থি মহিলা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন—এটা তিনি কিছুতেই মানতে পারছিলেন না।
বাবা মিসেস বেসান্তের নাম সমর্থন করলেন। রক্ষণশীলদের প্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে বাবাকে অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি করা হল। শেষ পর্যন্ত সংকট কেটে গেল এবং সভাপতি হিসেবে মিসেস বেসান্তের নাম চূড়ান্ত হল। বাবা তখন পদত্যাগ করলেন। সম্মেলনের প্রথম দিনের প্রথম সেশনে তিনি উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি দারুণভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল। গগনেন্দ্রনাথের আঁকা একটি ছবিতে এ স্মৃতি অক্ষয় হয়ে আছে। ছবিটিতে দেখা যায় বাবা এ সভায় ‘ভারতের প্রার্থনা’ নামে একটি কবিতা পাঠ করছেন।
রোদাম্পস্টিডের বিশ্বখ্যাত পরীক্ষাকেন্দ্রের কথা বাদ দিলে, কৃষি বিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধি করার কোনো সুযোগ ইংল্যান্ডে ছিল না। কাজেই আমি জার্মানি চলে গেলাম এবং গোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক টার্মের জন্য ভর্তি হলাম। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে সুনাম ছাড়াও, অন্য একটি কারণেও গোটিঙেন মনোযোগ কুড়িয়েছিল। প্রিন্স বিসমার্ক এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিলেন। কিন্তু শীঘ্রই কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারলেন যে এ বেয়াড়া ছাত্রটিকে কোনো রকম নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনা সম্ভব নয়। কঠিন কঠিন শাস্তি দিয়েও যখন তাঁর দুষ্টুমি কমানো গেল না, কর্তৃপক্ষ তখন নির্দেশ দিলেন যে বিসমার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে থাকতে পারবেন না। তিনি সে সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। কিন্তু তাঁর মনে কী ছিল তা কে জানত! বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ঘেঁষে একটি ঝর্ণা ছিল। এর উপর একটি সেতু ছিল। সেতুটির ওপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্তৃত্ব নেই। তরুণ বিসমার্ক সেতুটির ঠিক অপর প্রান্তে কুটির নির্মাণ করে থাকতে শুরু করলেন। এভাবেই তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞাভরে পাশ কাটিয়ে গেলেন। বিধির কি বিধান, যে কর্তৃপক্ষ বিসমার্ককে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকতে দেননি, তারাই কিন্তু পরবর্তীতে বিশেষ যত্ন নিয়ে কুটিরটি সংরক্ষণ করেছেন, এমনকি তাঁর স্মরণে একটি টাওয়ারও নির্মাণ করেছেন। করবেনই না কেন, ততদিনে বিসমার্ক যে তাঁদের সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র!
এই গোটিঙেনেই আমি প্রথমবারের মত দ্বন্দ্বযুদ্ধ দেখতে পাই। ভাবতেও পারিনি যে বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। শুনলাম যে জার্মানির ছাত্রদের মধ্যে হরহামেশাই এটা হয়ে থাকে। তবে আইনত এটা নিষিদ্ধ। আইনকে ফাঁকি দিতে শহর থেকে বেশ দূরের এক নির্জন রেস্তোরাঁয় এর আয়োজন করা হল। ফলে পুলিশ চোখ বন্ধ রাখার সহজ মওকা পেল। রেস্তোরাঁর পাশেই একটি বড় হলঘর ছিল। তার দেয়াল ঘেঁষে স্টেডিয়ামের মত করে দর্শকদের বসার সারি। ডুয়েল লড়াই মনে হয় এখানকার লোকদের এক ধরনের বিনোদন যোগায়। কেননা, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দ্বন্দ্বযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হতো আর কয়েকশত লোক তা দেখতে উপস্থিত থাকত। কাঠের গুঁড়া ছিটানো মেঝেতে প্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধারা এবং কয়েকজন ডাক্তার দাঁড়াতেন। চারদিকে আয়োডোফর্ম ওষুধের গন্ধ। সেখানে ঢুকেই দেখতে পেলাম যে একটি লড়াই সবে শুরু হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধাদ্বয় হাতিয়ার হিসেবে বড় তলোয়ার বেছে নিয়েছে এবং একে অপরকে আঘাত করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজনের মাথা থেকে গোল আধুলির আকারের চামড়া কেটে পড়ে গেল। ডাক্তারগণ লড়াই থামিয়ে দিলেন এবং জীবাণুমুক্ত করার ঔষধ দিলেন। কিন্তু সেলাই করলেন না। মুখ ও মাথায় যে দাগ হতো ছাত্রসমাজ তার ক্ষতি পুষিয়ে দিত। বিশেষ করে মেয়েরা আকৃষ্ট হতো। যত বেশি কুৎসিৎ, আকর্ষণ তত বেশি। যে বন্ধুটি আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি আরও কয়েকটি লড়াই দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি লড়াই দেখেই আমার তৃষ্ণা মিটল। সেখান থেকে দ্রুত চলে এলাম।
