আবারও শিলাইদহে
১৯০৯ সালের শেষদিকে আমি দেশে ফিরে আসি। শিলাইদহের কুঠিবাড়িটি আমার জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। আমি সেখানে থাকব আর জমিদারি দেখাশোনা করব। এছাড়া একটি কৃষিখামার থাকবে যেখানে কৃষি বিষয়ে স্বাধীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারব। আমি তখন তরুণ, শরীরে শক্তি, মনে উদ্যম। আমার জন্য এটা একটা অত্যন্ত ভালো ব্যবস্থা বলতে হবে। দেশে ফিরতে না ফিরতেই বাবা আমাকে নিয়ে জমিদারি দেখতে বের হলেন। উদ্দেশ্য প্রজাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া আর ব্যবস্থাপনা শেখানো। হাউজবোটে বাবা আর আমি, কেবল আমরা দুজন ঘুরে বেড়িয়েছি। এটা ছিল চমৎকার অভিজ্ঞতা। একের পর এক প্রিয়জনদের বিচ্ছেদ বিশেষত শমীর মৃত্যুতে তিনি বড় একা হয়ে পড়েছিলেন। স্বভাবতই তাঁর সকল স্নেহ আমাকে উজাড় করে দিতে চাইলেন। পরিচিত নদীর বুকে নৌকায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে প্রতি সন্ধ্যায় আমরা ছাদের উপর বসতাম। হেন বিষয় নেই যা নিয়ে আমাদের আলাপ হতো না। এর আগে কখনোই বাবার সঙ্গে এত খোলামেলা আলাপ করিনি। বাবার সামনে কোনো বিষয় তুলতে হলে সহজে মুখ খুলতে পারতাম না। এবারে কিন্তু ছেলেমানুষের মত প্রগলভ হয়ে উঠলাম। বিদেশ থেকে সদ্য শিখে আসা বিষয়গুলো তখনও তাজা। কাজেই কৃষি অর্থনীতি, জেনেটিকস, বিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে বইয়ের বিদ্যে ফলানোর চেষ্টা করলাম। বাবা বোধহয় এতে খুব মজাই পেয়েছেন। বেশির ভাগ সময়ই তিনি ধৈর্য ধরে এসব শুনেছেন। কখনও কখনও গাঁয়ের মানুষদের জীবন, তাদের সমস্যা এবং সেগুলোর বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা আমাকে শোনাতেন। সাহিত্য নিয়ে খুব কমই আলোচনা হতো। হয়ত ভেবেছিলেন, বিজ্ঞানে শিক্ষালাভ করায় শিল্পের মর্ম আমি বুঝব না।
আমি শিলাইদহে থিতু হয়ে বসলাম এবং গ্রামের ভদ্রলোকের মত জীবন চালাতে লাগলাম। কৃষিখামার তৈরি করা হল। আমেরিকা থেকে ভুট্টা আর অন্যান্য গোখাদ্যের বীজ আমদানি করা হল। ভারতীয় পরিবেশের উপযোগী আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হল। এমনকি মাটি পরীক্ষার জন্য ছোটখাটো পরীক্ষাগারও তৈরি হল। মাইরন ফেলপস নামক একজন আমেরিকান আইনজীবী এ সময় ভারতে বেড়াতে এসেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি থাকায় তিনি এখানে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি খামারটির খুব প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, এ যে দেখছি আমেরিকার বাইরে এক খাঁটি আমেরিকান খামার।
শিলাইদহের কাজ আমার ভালো লাগত। এখানকার দায়িত্ব নিয়ে যখন ব্যস্ত আছি, বাবা ডেকে পাঠালেন। খুড়তুতো ভাই গগনেন্দ্রর ভাগ্নি প্রতিমাকে বিয়ে করতে হবে। ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিয়ের অনুষ্ঠান হল। আমাদের বংশে এটাই ছিল প্রথম বিধবা বিবাহ।[২]
পরবর্তী কয়েক বছর বেশ সুখেই কাটল। জমিদারির কাজকর্ম আর খামারে কৃষিবিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে আমি ব্যস্ত থাকতাম। মিজ বোরদিত্তি নামক শিক্ষকের কাছে প্রতিমা পড়ালেখা শিখতেন। ইনি ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। কৃষিপল্লীর পরিবেশে কাটানো এ চমৎকার জীবনে হঠাৎ ছেদ পড়ল। শান্তিনিকেতনের কাজ নিয়ে বাবা একা কুলাতে পারছিলেন না। তিনি আমাকে সেখানে চলে যেতে বললেন। তাতে যদি তাঁর ভার কিছুটা লাঘব হয়। আমার বন্ধু সতীশ রঞ্জন মজুমদার ইতোমধ্যে বাবার সঙ্গে সেখানে যোগ দিয়েছে। ভগ্নিপতি নগেন গাঙ্গুলিও আমেরিকা থেকে যেকোনো দিন ফিরে আসবেন এবং সেখানে কাজ করবেন। বাবা আমাদের তিনজনকে ইলিনয় থেকে পড়িয়ে এনেছেন। শান্তিনিকেতনে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। আমরা যোগ দিলে সে সংখ্যা কিছুটা বাড়বে। শিলাইদহের বাড়িটি ছিল আনন্দময়। এটি ‘কুঠিবাড়ি’ নামে পরিচিত। এর চারপাশ ঘিরে ছিল গোলাপের বাগান, বর্ষাকালে অফুরন্ত সবুজের সমারোহ আর শীতে সুগন্ধি সর্ষে ফুলের হলদে চাদর। কুঠিবাড়ির পাশ দিয়ে বহমান ক্ষণে ক্ষণে গতি বদলানো চপলমতি পদ্মা, মধুর স্মৃতিতে বোঝাই হাউজবোট, শিকারের বিশ্বস্ত সঙ্গী একহাতা শিকারি চামরু, আমার যা কিছু পছন্দের সেগুলো পিছে ফেলে শান্তিনিকেতনের ঊষর ভূমির দিকে রওয়ানা হতে হল।
*
১. এখানে রথীন্দ্রনাথের একটু স্মৃতিবিভ্রম ঘটেছে। ফেব্রুয়ারিতে নয়, বিয়েটি হয়েছিল ১৯১০ সনের ২৭ জানুয়ারি, বৌভাত হয় ৩০ জানুয়ারি। তবে ফেব্রুয়ারিতে শান্তিনিকেতনের ছাত্ররা ঘটা করে রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমাকে স্বাগত জানিয়েছিল, তিনি হয়ত সে স্মৃতি থেকে এরূপ লিখেছেন।
২. ঠাকুর পরিবারে এর আগে আরও তিনবার বিধবা বিয়ের প্রসঙ্গ উঠেছিল। প্রথমটি বলেন্দ্রনাথের বিধবা পত্নী সাহানা দেবীকে বিয়ে দেয়ার উদ্যোগ। পরবর্তীতে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজো ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্য আর তৃতীয়বার মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর খোদ রবীন্দ্রনাথের জন্য বিধবা রমণী বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। প্রতিবারই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বাদ সাধেন। ফলে বিধবা বিয়ের উদ্যোগ সফল হয়নি।
