বাংলাদেশে শিল্প আন্দোলন ও বিচিত্রা ক্লাব
বহু বছর যে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণা ও রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়েছে তার জন্য শিল্পী ভ্রাতৃত্রয়ের মাঝখানে এসে পড়ে তাঁদের কাজের ধরন দেখা আর চিন্তা-চেতনার সঙ্গে পরিচিত হওয়া নতুন অভিজ্ঞতা বৈকি। তাঁদের ছবি তোলার স্টুডিও কোনটি? রংতুলিই বা কোথায়? দক্ষিণমুখী টানা বারান্দায় তিনটা ইজিচেয়ারে বসে তিন ভাই গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র আর অবনীন্দ্র ছবি আঁকতেন, জমিদারি চালাতেন, অতিথি আপ্যায়ন করতেন আবার প্রাচ্যের অনাড়ম্বর ও সরল ধরনে বিচার-আচারও করতেন। অবনীন্দ্র আর্ট স্কুল থেকে অবসর নিয়েছিলেন। এখানেই ছাত্ররা আসত আর তাদের নানান জিজ্ঞাসা নিয়ে আলাপ করত, কখনও কখনও পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁদের কাজ করা দেখত। সর্বসাম্প্রতিক ধারার স্কেচ ও চিত্র দেখার জন্য প্রাচ্যের শিল্পকর্মের সুহৃদ এবং সমালোচকও এখানে আসতেন। আরও আসত ব্যবসায়ীরা; পুরনো দিনের মিনিয়েচার, পাণ্ডুলিপি আর নানা ধরনের শিল্পকর্ম নিয়ে। তাদের আগমন অবশ্য বিক্রয়ের জন্য নয়, বরং বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়ার জন্য। এর বাইরে ছোট চাকরিপ্রার্থী থেকে শুরু করে বড় কর্মকর্তা, নানান ধরনের অতিথিদের ভিড় তো লেগেই থাকত। আর ছিল আড্ডাবাজরা, যাদের কাজই ছিল শহরের সর্বশেষ মুখরোচক বিষয়ে গল্প করা।
এ সকল সামাজিক কর্তব্যের কোনোটিই তাদের একাগ্রতায় চিড় ধরাতে বা মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। তিন ভাইয়ের মধ্যে সমরেন্দ্র শিল্পী হিসেবে কম ছিলেন না, কিন্তু অধিকতর প্রতিভাধর অন্য দুভাইয়ের সঙ্গে কখনও পাল্লা দেয়ার চেষ্টা করেননি। গগনেন্দ্র ও অবনীন্দ্র সে বারান্দায় লম্বা নলের হুকা নিয়ে ছবি আঁকতে বসতেন। পাশে থাকত এক পাত্র পানি, যার মাঝখানে একটি গোলাপ ভাসত। আর থাকত ছবি আঁকার সাধারণ কিছু সরঞ্জাম। যে সকল চিত্র পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছে, সেগুলো এমন পরিবেশেই আঁকা হতো। তাঁদের চিত্রাংকন পদ্ধতি দেখে আমি খুব মজা পেতাম।
গগনেন্দ্র ছিলেন পরিবারের কর্তা। পারিবারিক ও সামাজিক নানা দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হতো। অবসর কাটাতেন অভিনয় করে আর ছবি তুলে। তিনি ছিলেন জাত অভিনেতা। ঠাকুর পরিবারে কোনো নতুন নাটক হলে তাঁর জন্য বাঁধাধরা চরিত্র থাকত। তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন বেশ দেরিতে— ছোটভাই অবনীন্দ্র ততদিনে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছেন। ঠিক কোন্ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন তা বলা মুশকিল। সম্ভবত কাকুজো ওকাকুরা এবং অন্য কয়েকজন জাপানি শিল্পী তাঁকে অনুপ্রাণিত করে থাকবেন। আমি দেশে ফেরার পর দেখেছি যে ১৯১০ সালের দিকেও চিত্রাংকনকে তিনি সিরিয়াসলি নেননি। এটি তখনও কেবল শখের পর্যায়ে। বোধহয় তখনও তাঁর ছন্দ খুঁজে পাননি। সে সময় বাবার জীবনস্মৃতি প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। বইটির জন্য কয়েকটি ছবি এঁকে দিতে আমি তাঁকে অনুরোধ করি। তখন থেকে তাঁর আঁকা ছবিগুলো গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
মোটামুটি এ সময়েই ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট জন্মলাভ করে। জাস্টিস উড্রোফ, এন. ব্লাউন্ট, ও.সি. গাঙ্গুলি এবং অন্যান্য শিল্পপ্রেমিকের সঙ্গে গগনেন্দ্র ও অবনীন্দ্রের যোগাযোগ ছিল। তাদের সম্মিলিত চেষ্টায় এ সংগঠন গড়ে ওঠে। বার্ষিক প্রদর্শনীতে বেশির ভাগই এ দুই ভাইয়ের ছবি থাকত, সঙ্গে থাকত তাদের প্রিয় ছাত্র নন্দলাল বসু, সুরেন গাঙ্গুলি, অসিত হালদার, শৈলেন দে, ক্ষিতীন মজুমদার প্রমুখের ছবি। প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো শীতকালে। কোলকাতা তখনও ভারতের রাজধানী। শীত মৌসুমে কেবল বাংলার অন্যান্য এলাকা থেকে নয়, সারা ভারতের লোকজনই এখানে ভিড় জমাত। এ সময় চিত্র প্রদর্শনী তাই কেবল এ শহরের নয়, বরং সারাদেশের জন্যই একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হতো। এর আয়োজনের পিছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন গগনেন্দ্র। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার কারণে অভিজাত সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষ সবাই প্রদর্শনী দেখতে আসত। আরও দুয়েকজনের নাম না বললেই নয়। যেমন—লর্ড কারমাইকেল এবং কিছুদিন পরে লর্ড রোনাল্ডসে (ইনি পরে মার্কুই অব জেটল্যান্ড উপাধি পেয়েছিলেন)। তাঁরা ভারতীয় শিল্পকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা না করলে ওরিয়েন্টাল আর্ট সোসাইটি সফল হতে পারত না। সোসাইটিকে তাঁরা তাঁদের নাম ব্যবহার করতে তো দিয়েছিলেনই, উপরন্তু সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ বরাদ্দ পেতেও সাহায্য করেছিলেন।
গগনেন্দ্র এবং অবনীন্দ্রের প্রতিভা কেবল ছবি আঁকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অনেক বিষয়েই তাঁদের অবদান রয়েছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যে দালানটিতে তাঁরা বাস করতেন, তা ছিল সনাতন ভিক্টোরিয়ান ধাঁচে বানানো। আগের প্রজন্মের লোকজন পুরনো রীতিতেই সেটি সাজিয়েছিলেন। শিল্পী ভ্রাতৃদ্বয় পুরো বিল্ডিংটাকে নতুন রূপ দিলেন এবং নতুনভাবে সাজালেন। দুভাই ডিজাইন তৈরি করে দিতেন। দক্ষিণ ভারত থেকে আসা অত্যন্ত সুদক্ষ এক কাঠমিস্ত্রী সেগুলো বানাতেন। তাঁদের দেখানো ঘরশয্যার রীতি পরে কোলকাতার ফ্যাশনে পরিণত হয়। তাঁদের প্রতিভার সর্বোচ্চ স্ফুরণ ঘটেছিল ড্রয়িংরুমের বেলায়। আধা প্রাচ্য আর আধা পাশ্চাত্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে তাঁরা এ কক্ষটি সাজান। বেছে বেছে সবচেয়ে পছন্দসই ভারতীয় ছবি ও শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো বসার ঘরটি দেখতে এসে বিদেশি অতিথিরাও মোহিত হয়ে যেতেন।
এ ঘরে কাটানো অনেক সন্ধ্যার স্মৃতি মনে ভিড় করছে। মৃদু আলোয় বড় বড় ডিভানে বসে কয়েকজন শিল্পরসিক ধ্যান করার মত মগ্নতা নিয়ে বীণা বাজানো শুনছেন, এ ছিল তখনকার নিত্য দৃশ্য। আমিও এক কোণে চুপচাপ বসে বিদেশি অতিথিসহ অন্যদেরকে দেখতাম। এখানে খ্যাতিমান পরিব্রাজক ও দার্শনিক কাউন্ট কাইজারলিং, শিল্পীদের বন্ধু এবং নিজেও শিল্পী রোটেনস্টাইন, অনন্যা পাভলোভা, বিখ্যাত দ্রষ্টা কাকুজো ওকাকুরা, শিল্প-সংগ্রাহক গলোবিউ, আনন্দময়ী কার্পেলে বোনদ্বয় এবং শিল্পপ্রেমিক লর্ড কারমাইকেলকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
লর্ড কারমাইকেলের কথায় মনে পড়ল এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে গড়ে ওঠা গগনেন্দ্রর সখ্যের কথা। তিনি কয়েক বছর বাংলার গভর্নর তথা ছোটলাট ছিলেন। মেয়াদের শেষদিকে বেশ কিছু ভুল কাজ করার ফলে তাঁর জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু গগনেন্দ্রর মত যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা তাঁকে শ্রদ্ধা না করে পারেননি। এদেশীয় শিল্পকর্মকে তিনি প্রকৃতই বুঝতেন এবং গুরুত্ব দিতেন। বাংলার কারুশিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য তিনি চেষ্টাও করেছিলেন। মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্পের পুনরুত্থানে মূল অবদান তাঁর। তাঁর পরামর্শেই বেঙ্গল হোম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর জন্য সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ বরাদ্দও করেন। গগনেন্দ্রনাথকে এর সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। অনুকূল পরিবেশের অভাবে প্রায় হারিয়ে যেতে বসা বাংলার কারুশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ জাগানোর জন্য তিনি অনেক চেষ্টা করেন। এজন্য একটি বিক্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। এখানে বিক্রীত পণ্যের পরিমাণ দেখে মনে হয় যে গগনেন্দ্রর চেষ্টা সফল হয়েছিল।
গ্রীষ্মকালে গগনেন্দ্র ঘনঘন দার্জিলিং যেতেন। সেখানে তিনি হিমালয়ের অনেক ছবি আঁকেন। তুষারাবৃত পর্বতমালা তাঁকে টানত। কাঞ্চনজঙ্ঘার আকাশরেখাগুলোতে তিনি একটি উল্টানো মুখের আদল কল্পনা করে নিয়েছিলেন। তাঁর আঁকা এ সকল রাজকীয় শৃঙ্গের চিত্রে এ বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। পাহাড়ে থাকতে তিনি গাউনের মত দেখতে এক ধরনের তিব্বতি ঢিলে জামা পরতেন। এটি পরবর্তীতে শিল্পী ভ্রাতৃদ্বয়ের এবং বাবার ট্রেডমার্ক পোশাক হয়ে দাঁড়ায়। ঠাকুর পরিবারে পোশাক নিয়ে ভালোই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।
আমি বরাবরই ব্যবহারিক দিক নিয়ে বেশি চিন্তা করি। কিছুদিনের মধ্যেই শিল্পের পরিবেশ আত্মস্থ হল। ভাবলাম বিভিন্নমুখী প্রতিভার স্রোতকে এক সুতোয় বাঁধা দরকার। এ চিন্তা থেকেই বিচিত্রা ক্লাবের সূত্রপাত। অনেক কোলকাতাবাসীর হয়ত আজও সেটা মনে আছে। এ কাজে চাচাত ভাইয়েরা অকৃপণভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় লাল বাড়িতে। সভাপতি ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। চাচাত ভাই সুরেন্দ্রনাথ ক্লাবের নিয়ম-কানুন তৈরি করেছিলেন, যদি আদৌ তাকে নিয়ম-কানুন বলা যায়। কেননা, এ ক্লাবের যে সদস্যপদ, চাঁদা বা আর কোনো বিষয়ে বাঁধা-ধরা কোনো নিয়মই ছিল না। নন্দলাল বসু ক্লাবের সিলমোহরের নকশা করে দিয়েছিলেন। অনেকটা কুঁড়েঘরের আদলে বিচিত্রা শব্দটি খোদাই করা ছিল। সভার শেষে বাবা তাঁর অপ্রকাশিত রচনা থেকে পড়ে শোনান। মিটিংটি হয় দোতলায়, আর নিচে আয়োজন করা হয় জাঁকালো নৈশভোজের। চাইনিজ মন্দিরের মত লাল আর সোনালি রঙে নৈশভোজের স্থান সাজানো হয়।
ঊনবিংশ শতকের নব্বই-এর দশকে কাউন্ট ওকাকুরা বারবার এদেশে এসেছিলেন। একবার তিনি জাপান থেকে দুজন চিত্রকরকে নিয়ে আসেন। তাঁরা গগনেন্দ্রর আতিথ্য গ্রহণ করেন। তাঁরা সিল্কের ক্যানভাস বিছিয়ে মাটিতে বসে তুলির নিপুণ আঁচড়ে অদ্ভুত দক্ষতায় ছবি আঁকতেন। ঠাকুর পরিবারের সবাই মুগ্ধ হয়ে তাঁদের জড়তাহীন হাতের কাজ দেখতেন। এদের একজনের নাম তাইকান। তিনি বিজুইতসেন স্কুল অব পেইন্টার্স-এর নেতা হিসেবে সমধিক পরিচিত। গগনেন্দ্রর প্রথম দিককার ছবি থেকে বোঝা যায় যে, তিনি জাপানি শিল্পরীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জাপানি শিল্পের প্রতি এই টানের ফলেই বহু বছর পরে বিচিত্রা ক্লাবের উদ্যোগে জাপান থেকে কাম্পো আরাই নামে আরেকজন চিত্রকরকে নিয়ে আসা হয়। তিনি ক্লাবের ছত্রচ্ছায়ায় ছবি আঁকা শেখাতেন।
বিচিত্রা ক্লাবের কর্মকাণ্ডও সত্যি সত্যি বিচিত্রমুখী ছিল। কখনও এটা কাজ করেছে ছবি আঁকার স্কুল হিসেবে, কখনও পাঠাগার হিসেবে, কখনওবা শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিলনমেলা হিসেবে। দিনের বেলা দেখা যেত এর এক স্থানে নন্দলাল বসু, অসিত কুমার হালদার আর সুরেন্দ্রনাথ করের মত চিত্রকরগণ ছবি আঁকছেন, অন্য কোনোখানে মূর্তি গড়ছেন এনকে দেবল, আর কোথাও-বা মুকুল দে খোদাইকর্ম করছেন। কয়েকজন শিক্ষানবিশ তাঁদের কাজ দেখত। আমার স্ত্রী প্রতিমাও ছিল এ দলের একজন। সন্ধ্যায় প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠত এর লাইব্রেরি। সপ্তাহে একদিন এটি আবার শিল্পী, লেখক আর সংগীতজ্ঞদের সামাজিক মেলামেশার কেন্দ্র হয়ে উঠত। এছাড়া নাটকের অভিনয় আর গানের অনুষ্ঠান তো লেগেই ছিল।
খুব শীঘ্রই এর কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও বাড়ানো হল। সারা প্রদেশ থেকে দেশীয় শিল্পকর্ম সংগ্রহের চেষ্টা চলল। একজন যুবককে নিযুক্ত করা হল গ্রামে গ্রামে ঘুরে নানা ডিজাইনের আলপনা, সূচিকর্ম, মাটির কাজ আর ঝুড়ির নমুনা সংগ্রহ করতে। অবনীন্দ্র অনেক শিশুতোষ ব্ৰত-পার্বণের ছড়া জানতেন। এগুলোর সঙ্গে আলপনার ডিজাইন মিলিয়ে পরে বই আকারে প্রকাশ করা হয়।
এ সময় গগনেন্দ্রনাথ ক্যারিকেচার আঁকতে শুরু করেন। এদেশে এটা ছিল নতুন ধরনের কাজ। তাঁর ভাণ্ডারে যে বিপুল হাস্যরস আর ব্যঙ্গ সঞ্চিত ছিল, ক্যারিকেচারের মাধ্যমে সেগুলো তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। এগুলোর কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে রাতারাতি তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। ক্যারিকেচারগুলো পুনঃপ্রকাশের জন্য নানা জায়গা থেকে অনুরোধ আসতে থাকে। এই পটভূমিতে বিচিত্রা ক্লাব প্রকাশনার কাজে হাত দেয়। একটি পুরনো লিথো প্রেস কেনা হয় ও একজন বৃদ্ধ মুসলিম মুদ্রাকরকে মুদ্রণের ভার দেয়া হয়। সকালে গগনেন্দ্র ক্যারিকেচার আঁকতেন, বিকেলে মুদ্রাকর সেটাকে পাথরের স্ল্যাবে রূপান্তরিত করতেন। তারপর তার তত্ত্বাবধানে ছাপানোর কাজ শুরু হতো। এভাবে ক্যারিকেচারগুলোর দুই খণ্ড প্রকাশ করা সম্ভব হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো বিক্রি হয়ে যায়।
ক্রমে বিশ্বভারতীর কাজে আমাদের মনোযোগ বেড়ে গেলে বিচিত্রা ক্লাবের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অসিত কুমার হালদার, নন্দলাল বসু, সুরেন্দ্রনাথ কর প্রমুখ শিল্পীকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসা হয়। উদ্দেশ্য এখানে একটি ছবি আঁকার স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। সে স্কুলটি বর্তমানে কলাভবন নামে পরিচিত। যে কয় বছর বিচিত্রা ক্লাব সজীব ছিল, এটি কোলকাতার সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, ও শৈল্পিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনেও এ ক্লাবটির অবদান অনেক। তিনজন মহান ব্যক্তির কারণে বিচিত্রা ক্লাবের পক্ষে এ গৌরব অর্জন সম্ভব হয়েছিল। তারা হলেন আমার বাবা, গগনেন্দ্র আর অবনীন্দ্র। অল্প কয়জন প্রতিভাবান লোকের সম্মিলিত প্রয়াস কীভাবে সৃষ্টিশীল কাজে গতিশীলতা বয়ে আনতে পারে, এ ক্লাবটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি মূলত চিত্রাঙ্কন বিষয়ে এ ক্লাবের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেছি। কিন্তু সাহিত্যক্ষেত্রেও এর অবদান কোনো অংশেই কম ছিল না। এর সাপ্তাহিক আসরগুলোতে তৎকালীন বাংলার প্রায় সকল সাহিত্যিকই উপস্থিত হতেন। বাবা, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী এবং অন্য লেখকগণ এখানে তাদের লেখা পাঠ করে শোনাতেন। চলিত ভাষাকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রচার করা এবং বাংলাকে সংস্কৃতের প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে সবুজ পত্র আন্দোলন যাত্রা শুরু করে। বলা যেতে পারে যে সবুজ পত্র এই বিচিত্রা ক্লাবেই জন্ম নিয়েছিল।
