ঠাকুর পরিবার
ঠাকুর পরিবার আদতে বন্দ্যোপাধ্যায় পদবির বাঙালি ব্রাহ্মণদের অন্তর্ভুক্ত। তারা দক্ষ নামের এক ব্রাহ্মণের বংশধর। ইতিহাস বলে যে অষ্টম শতাব্দীর বৌদ্ধপ্রধান বাংলায় বিশুদ্ধতাবাদী হিন্দুত্বের পুনর্জাগরণ ঘটাতে কনৌজ থেকে আটজন ব্রাহ্মণকে আনা হয়েছিল। দক্ষ ছিলেন তাদেরই একজন। তাঁর বংশধরগণ নানা স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছে। অবশেষে ১৬৯০ সালে পঞ্চানন নামে একজন কোলকাতার নিকট গোবিন্দপুরে বসতি স্থাপন করে। সে সময় কোলকাতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্ত ঘাঁটি। উঠতি এ বাণিজ্যিক শহরটিতে তখন টাকা কামাই করার অফুরান সুযোগ। এ আকর্ষণেই অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ঠাকুর পরিবার পাথুরিয়াঘাটা ও জোড়াসাঁকোতে বাড়ি নির্মাণ করে।
কথিত আছে যে, ঠাকুর পরিবার একসময় খুলনার কাছে বসবাস করত এবং সেখানকার মুসলিম শাসনকর্তার অধীনে চাকরি করত। তাদের পরিবারের দুই ভাই এক অদ্ভুত উপায়ে জাত খোয়ায়। একজনের নাম ছিল কামদেব। কোনো এক রোযার দিনে তিনি দেখেন যে শাসনকর্তার একজন সভাসদ লেবুর গন্ধ শুঁকছে। ঠাট্টা করে কামদেব তাকে বলে যে তার রোযা ভেঙে গেছে। কেননা, শাস্ত্র অনুসারে, ঘ্রাণাং অর্ধং ভোজনাং। সভাসদটি কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে যায় এবং শাসনকর্তাকে ঘটনাটি জানায়। কয়েকদিন পর শাসনকর্তা ঠাকুর পরিবারের সদস্য এবং অন্য হিন্দুদের একটি গানের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেন। পাশের কক্ষেই গরুর মাংস রান্না করা হচ্ছিল। মাংসের কড়া গন্ধ অনুষ্ঠানস্থলে ভেসে আসছিল। হিন্দুরা তাদের নাক চেপে ধরে চলে আসতে চায়। শাসনকর্তা তাদের বললেন যে গন্ধ শোঁকার মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যেই কিছুটা ভোজন করে ফেলেছে, কাজেই তাদের উচিত ভোজনের বাকি কাজটুকুও সম্পন্ন করা। সঙ্গীরা চলে আসলেও কামদেব ও তার এক ভাই জাত খোয়াতে বাধ্য হয়। ঠাকুরবাড়ির অন্যরা ধর্মান্তরিত হয়নি, তবুও কট্টর হিন্দুরা তাদেরকে হেয় চোখে দেখতে শুরু করে এবং পিরালি (পির-আলি) ব্রাহ্মণ নাম দেয়।
ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষগণ যাযাবরের ন্যায় বাংলার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতেন। উপরে বর্ণিত ঘটনার মাধ্যমে জাত খোয়ানোর কারণে তাঁদেরকে আউটকাস্ট হিসেবেও দেখা হতো। তাঁরা অন্যদের নিকট থেকে তেমন কোনো সহায়তা পেতেন না। সমাজে সম্মানজনক আসন পেতে হলে তাঁদেরকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। কঠিন জীবন সংগ্রাম তাঁদেরকে শেখাল যে কেবল ধনসম্পদ অর্জনের মাধ্যমেই পৃথিবীতে জায়গা করে নেয়া সম্ভব। সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতির ঊর্ধ্বে ওঠার মত যে পাইওনিয়ারিং স্পিরিট ও চিত্তের স্বাধীনতা পরবর্তীতে ঠাকুর পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়, অবজ্ঞাকে জয় করার নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সম্ভবত সে গুণাবলির উন্মেষ ঘটে। প্রভূত সম্পদ অর্জন এবং আরামদায়ক জীবনযাত্রা নিশ্চিত হবার পর তারা অন্যান্য দিকে মনোযোগ দেয় এবং তাদের প্রতিভার নানামুখী স্ফুরণ ঘটে। আমার প্রপিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রোমান্টিক মানুষ। তিনি ছিলেন বাংলার নবজাগরণের পিতৃপুরুষ রাজা রামমোহন রায়ের সমসাময়িক। তিনি তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন, দরকারমত টাকা-পয়সা দিয়েও সহায়তা করেছেন। ততদিনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় শক্তভাবে শেকড় গেড়ে বসেছে এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। দ্বারকানাথ ইংরেজি জানতেন। ভাষাজ্ঞান কাজে লাগিয়ে কোম্পানির শাসনামলে পাওয়া সুযোগ ব্যবহারে তিনি কারিশমা দেখান। তিনি যে কেবল অতি অল্প বয়সেই অঢেল সম্পত্তির মালিক হন তা-ই নয়, বৃটিশদের অধীনে বড় বড় দায়িত্ব পালনেরও সুযোগ লাভ করেন। সামাজিক কল্যাণ ও উচ্চশিক্ষা বিস্তারের বিভিন্ন আন্দোলনে রামমোহন রায়ের সঙ্গে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর জীবদ্দশায় এমন একটিও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি যাতে তার অনুদান ছিল না। দানশীলতার জন্য তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ নামে পরিচিতি লাভ করেন। ভারতীয়রা যে ধরনের ব্যবসায়ের কথা চিন্তাও করত না, তিনি সে ধরনের ব্যবসায়ও শুরু করেছিলেন। ভারত আর ইংল্যান্ডের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য তাঁর কয়েকটি জাহাজ ছিল। ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য কনিষ্ঠ পুত্র নগেন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ইংল্যান্ডে গমন করেছিলেন। আমার সেই প্রপিতৃব্য ভ্রমণকালীন ডায়েরি লিখতেন। এটা অত্যন্ত বিশুদ্ধ ইংরেজিতে লেখা একজন ভারতীয়ের চোখে দেখা ভিক্টোরিয়ান যুগের শুরুর দিকের ইংল্যান্ডের অভিজাতগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিবরণ। সিপাহী বিদ্রোহের অস্থির ও বিপদসংকুল সময়টাতে বোম্বে থেকে কোলকাতা অভিমুখে রোমাঞ্চকর যাত্রার চিত্তাকর্ষক বিবরণও তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন।
লন্ডন পৌঁছুনোর কিছুকালের মধ্যেই দ্বারকানাথ ঠাকুর মহারানী ভিক্টোরিয়া আর তার সভাসদদের প্রিয়ভাজনে পরিণত হন। সে সময় তাঁর চাকর যে চিঠি পাঠিয়েছিল, সেগুলো থেকে তাঁর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্রমণকালীন বেশ কিছু আমোদজনক ঘটনার কথা জানা যায়। একবার লন্ডনে তাঁকে শিকার পার্টিতে নিমন্ত্রণ করা হয়। শিকারের জায়গায় ঘোড়ায় চড়ে যেতে হবে। কথা ছিল যে শিকারির দল তাঁকে হোটেল থেকে নিয়ে যাবে। বন্ধুরা তাঁকে নিতে এলে তিনি জানালেন যে তাঁর পা ব্যথা করছে, ফলে ঘোড়ায় চড়া সম্ভব নয়। তিনি শিকারে যেতে চাইলেন না। তারা অনেক জোরাজুরি করার পর রফা হল যে তাঁকে ঘোড়ায় চড়তে হবে না, তাঁর জন্য আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করা হবে। শিকারের দল রওয়ানা হল। মাঝখানে তিনি গাড়িতে বসা আর চারপাশে ঘোড়ায় চড়া বৃটিশ নরনারী, অনেকটা উচ্চপদস্থ কাউকে প্রটোকল দিয়ে নিয়ে যাবার মত ব্যাপার। সেদিন সকালে লন্ডনবাসীরা অবাক হয়ে দেখল যে অভিজাত বৃটিশরা এক ভারতীয়ের গাড়ি পাহারা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!
প্যারিসে এক সম্ভ্রান্ত মহিলা তাঁকে দাওয়াত দেন। সেখানে তিনি দেখতে পান যে একটি কাশ্মীরি শাল দিয়ে ঘরের দেয়াল সাজানো হয়েছে। কাশ্মিরী শাল ওখানে দামি ও দুষ্প্রাপ্য। কাউন্টেস গর্বিত ভঙ্গিতে তাঁকে শালটি দেখান। এবারে দ্বারকানাথের পালা। তিনি ঐ ভদ্রমহিলাসহ প্যারিসের অন্য অনেক অভিজাত ব্যক্তিকে তাঁর ওখানে নিমন্ত্রণ করেন। নেমন্তন্ন শেষে কাউন্টেস আর তার বন্ধুরা যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, প্রিন্স দ্বারকানাথ তাদের প্রত্যেককে একটি দামি কাশ্মীরি শাল উপহার দিলেন। এ ভাবেই তিনি তাঁদের সঙ্গে টেক্কা দিতেন।
মনে করা হয় যে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ তদবির নিয়ে দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সরিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার ইজারা বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেওয়া। রানী ভিক্টোরিয়া তাঁকে সাদরেই গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কিছুটা রহস্যময় অবস্থার মধ্যে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর[১] কারণে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগটি সফল হয়নি।
*
[১. দ্বারকানাথ দ্বিতীয়বার ইংল্যান্ড যান ১৮৪৫ সালে। ১৮৪৬ সালের ১ আগস্ট সন্ধ্যায় লন্ডনের কাছে সারে শহরের সেন্ট জর্জেস হোটেলে তিনি মারা যান। মৃত্যুর সার্টিফিকেটে কারণ হিসেবে “ডান ফুসফুসের জ্বর প্রদাহ” উল্লেখ করা হয়। যদিও মৃত্যুর দিন মর্নিং ক্রনিকল পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছিল যে তিনি যকৃতের দোষজনিত পীড়ায় ভুগছেন।]
