নাটক ও অভিনয়
মঞ্চে অভিনয় ছিল ঠাকুর পরিবারের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমার বাবা এ চর্চার মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেন এবং নিজেও অল্প বয়সেই নাটক রচনা শুরু করেন। মূলত পরিবারের সদস্যরাই এসব নাটকে অভিনয় করতেন, আর প্রধান চরিত্রে তিনি নিজেই থাকতেন।
তার প্রথম নাটক বাল্মীকি-প্রতিভা। ১৮৮১ সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে তিনি এটা রচনা করেন। রচনা ও মঞ্চায়নে বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নানাভাবে সহায়তা করেন। এমনকি তারা একসঙ্গে কতগুলো গানের সুরও দেন এটি ছিল বাংলা ভাষার প্রথম কাব্যনাট্য। চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলা আর ঘটনার নাটকীয়তা তুলে ধরার জন্য তারা এতে পশ্চিমা গানের সুর ব্যবহার করেন। সংগীতের বিবেচনায় এটি ছিল এক নতুন ও সাহসী উদ্যোগ। বাবার অল্প বয়সের রচনা হলেও নাটকটি কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে এবং অদ্যাবধি প্রায়শ এর অভিনয় হচ্ছে। অবশ্য এর প্রথম অভিনয় প্রচেষ্টা দুর্ভাগ্যের মুখে পড়ে। ১৮৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এটি মঞ্চস্থ হয়। জোড়াসাঁকোর বাড়ির ছাদে বাঁশ দিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়। সবকিছু যখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত, সে সময় হঠাৎ ঝড় এসে মঞ্চটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলে। তাতে অবশ্যি উদ্যোক্তারা দমে যাননি। তাঁরা ঠিকই অভিনয় সম্পন্ন করেন। প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র সে অভিনয় দেখেছিলেন। বঙ্গদর্শন পত্রিকায় তিনি নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরে লেডি ল্যান্সডাউনের উপস্থিতিতে বাড়ির উঠোনে এটি মঞ্চস্থ হয়। এবারও পাত্র-পাত্রী ছিলেন ঠাকুরবাড়ির। তাঁরা সংগীতে যেমন ছিলেন দক্ষ, অভিনয়েও ছিলেন তেমনি পাকা। নাটকটি অত্যন্ত সফল হয়। এটি দেখার জন্য তৎকালীন রাজধানী শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। নতুন ধরনের আঙ্গিক ও গানের ব্যবহার দেখে তারা একাধারে অবাক ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। অবশ্য সে অভিনয়ের খুব বেশি স্মৃতিচিহ্ন নেই, কেবল একটি দৃশ্যের দুটি আলোকচিত্র ছাড়া। বাবার রচনাসংগ্রহে সে ছবি অনেকেই দেখে থাকবেন।
বাল্মীকি-প্রতিভা ছাড়া বাবা আর মাত্র একটি অপেরাধর্মী নাটক রচনা করেছিলেন। সেটি মায়ার খেলা। ১৮৮৮ সালে এটি বই আকারে বের হয়। বাল্মীকি-প্রতিভার কাহিনি নেয়া হয়েছিল রামায়ণ থেকে, আর এতে বিদেশি সংগীত ব্যবহার করা হয়েছিল। সেদিক থেকে ভাবলে মায়ার খেলা অনেক বেশি মৌলিক রচনা। মিসেস পিকে রায়ের অনুরোধে ‘সখী সমিতি’ নামে মহিলাদের একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে নাটক মঞ্চস্থ করতে চাইলে বাবা এ নাটকটি লিখে দেন। বেথুন কলেজে এর প্রথম মঞ্চায়ন হয়। সেই যে শুরু, এখনও নাটকটি মঞ্চায়িত হয়ে থাকে।
এর পর রচিত হল রাজা ও রাণী এবং বিসর্জন। সত্যিকার নাটক বলতে আমরা যা বুঝি, এ দুটি ছিল তাই। জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরজিতলার বাড়িতে রাজা ও রাণীর অভিনয় হয়েছিল। এ নাটকে মা নারায়ণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। জীবনে এই একবারই তিনি মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিরজিতলা ছেড়ে পার্ক স্ট্রিটে বাসা নিয়েছিলেন। সম্ভবত সেখানেই বিসর্জন নাটকের প্রথম অভিনয় হয়। উল্লেখ্য, ত্রিপুরার মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য অভিনয় দেখতে উপস্থিত ছিলেন। তার নিজের রাজবংশের কোনো এক অতীত কাহিনির সঙ্গে নাটকটির সাযুজ্য ছিল। সেজন্য তিনি এ নাটকের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। জয়সিংহের মৃত্যুতে শোকার্ত রঘুপতির ভূমিকায় বাবার যে বিখ্যাত আলোকচিত্র আছে, এটি সম্ভবত এ দিনেই তোলা। এগুলোর সবই আমার জন্মের পূর্বের ঘটনা। পরবর্তীতে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের সংগীত সমাজের নিজস্ব ক্লাবঘরে বিসর্জন অভিনীত হয়। আমার কেবল সে অভিনয়টির আবছা স্মৃতি মনে আছে।
রাজা ও রাণী সবচেয়ে বেশিবার অভিনীত হয়েছিল। পরিবর্তন আর পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়েছে এতে সবচেয়ে বেশি। এটি রাজা ও রাণী, ভৈরবের বলি এবং তপতী—এ তিনটি ভিন্ন নামে মঞ্চস্থ হয়েছিল। অক্ষয় মজুমদার কৌতুকপূর্ণ অভিনয়ের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অনেক কমেডি নাটকে তিনি পেশিবহুল বলবান ব্যক্তির চরিত্রে রূপদান করেছেন। বাল্মীকি- প্রতিভা নাটকেও তিনি দস্যুদলের সর্দারের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর হাস্যোদ্দীপক ভাব-ভঙ্গির কারণে নাটকটির একটি করুণ দৃশ্যও প্রায় কমিকে পরিণত হতে বসেছিল! তারপরও তাঁর খেদ ছিল যে মনোমত অভিনয় করার মত কোনো করুণ চরিত্র তাঁকে কখনও দেয়া হয়নি।
অভিনয় ও গানের প্রসঙ্গে আমার চাচাত বোন অভির কথা না বললেই নয়। কবি-কবি চেহারার এ বালিকা মায়ার খেলা নৃত্যনাট্যে কী চমৎকারই না অভিনয় করেছিল আর সুন্দর করে গেয়েছিল! অপরিসীম সম্ভাবনা বুকে নিয়ে অল্প বয়সেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
দুঃখের কথা যে এসকল বিবরণ লেখার জন্য আমাকে শোনা কথার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেননা, তখন আমার বয়স খুবই কম ছিল। এ চারটি নাটক সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা বললাম, এর চেয়ে বেশি কিছু মনে রাখা সে বয়সে সম্ভব ছিল না। আমি বড়জোর আশ্রমের শুরুর দিকের দিনগুলোর কথা মনে করতে পারি। বাবা তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্র-শিক্ষকরা মঞ্চায়ন করতে পারবেন এমন ধরনের নাটক লিখতে শুরু করেছেন। এর আগে তিনি মূলত রোমান্টিক ধাঁচের নাটক লিখতেন, আবহও থাকত মনোজগৎকেন্দ্রিক। শান্তিনিকেতনের জন্য লেখা নাটকগুলো কিন্তু সেগুলো থেকে আলাদা। শারদোৎসব, অচলায়তন আর ফাল্গুনী—এ নাটক তিনটি এ পর্বের লেখা। এগুলোর অন্তর্নিহিত মূল্য তো ছিলই, ছিল বিশেষ কৌশলও। তদুপরি এগুলো প্রথম দিকের ক্লাসিকধর্মী নাটক যথা, রাজা ও রাণী, বিসর্জন এবং পরবর্তীকালের রূপকধর্মী নাটক যেমন ডাকঘর, রাজা, তপতী ইত্যাদির মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছিল। শান্তিনিকেতনের নাটকগুলোর বিষয়বস্তু সহজ, কিন্তু এগুলোর মধ্যে এক ধরনের এলেগোরিক্যাল দ্যোতনা রয়েছে। আর একটা লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল যে এগুলোর কোনোটিতেই কোনো নারী চরিত্র ছিল না। শান্তিনিকেতনে অভিনয় করার মত কোনো নারী না থাকার কারণে বোধহয় এই বর্জন।
আমার মনে হয় শান্তিনিকেতনে অভিনয়ের সূচনা হয়েছিল শারদোৎসব লেখারও আগে। ১৯০২ সালেই আশ্রমের উদ্যোগে বিসর্জন নাটকের অভিনয় হয়েছিল। তখন ওখানে না ছিল মঞ্চ, না ছিল এর সঙ্গে সম্পর্কিত জিনিসপত্র। কিন্তু এ সকল বস্তুর অভাব পুষিয়ে দিয়েছিল আন্তরিকতা ও উদ্যম। তখন ছাত্রসংখ্যাও বেশি ছিল না। কাজেই সন্তোষ মজুমদার, নয়ন চট্টোপাধ্যায় আর আমি—এ তিনজনকেই প্রধান প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছিল। রিহার্সাল চলতে লাগল নিয়মিত। এর মধ্যে এন্ট্রান্স পরীক্ষা এসে গেল। শিক্ষকগণ বাবাকে বোঝালেন যে আপাতত নাট্যচর্চা বন্ধ না করলে আমাদের পরীক্ষা পাসের কোনো আশা নেই। বাবা অবশ্য তাঁদের কথায় কান দিলেন না। আমাদের খুশি দেখে কে! শিক্ষকদের আপত্তি কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। তাঁরা দিনের পর দিন এর বিরোধিতা চালিয়ে গেছেন। কিন্তু বাবা কখনোই তাঁদের সঙ্গে একমত হননি।
লাইব্রেরির পিছনের লম্বা ছাউনি খাবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সেখানেই নাটকের মঞ্চায়ন করা হবে ঠিক হল। কিন্তু মঞ্চ তৈরির যোগাড়যন্ত্র বলতে ছিল কেবল কয়েকটি আধভাঙা খাট। পর্দায় বিভিন্ন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য কোলকাতা থেকে একজন চিত্রকরকে আনা হল। একটি সাধারণ তুলি হাতে নিয়ে তিনি অসম্ভব দৃশ্যাদি ফুটিয়ে তুলতে পারতেন। তিনি একজন লোক ছিলেন বটে। স্বাক্ষর দিতেন হ-চ-হ এই তিনটি অক্ষর। এই স্বাক্ষর দেখেই লোকে তাঁকে চিনে ফেলতে পারত। আমাদের জোড়াসাঁকোর পরিবারে তাঁকে নিয়ে অনেক গল্প চালু ছিল। সম্ভবত গগনেন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে একটি ক্যারিকেচার এঁকেছিলেন। বাবার গল্প-সল্প বইয়ের একটি গল্পের চরিত্রও অনেকটা তাঁর আদলে সৃষ্টি। কিন্তু আমরা, অল্পবয়সী ছেলেপিলের দল, তাঁর কাজে আমোদ পাবার চেয়েও মুগ্ধ হতাম বেশি। তাঁর আঁকা জমকালো ছবি দিয়েই আমরা মঞ্চ সাজাতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ছাত্রাবাস থেকে খাট নিয়ে আসা হল, আর হ-চ-হ’র চিত্রকর্মগুলো এমন শ্রদ্ধাভরে পশ্চাৎ পর্দায় লাগানো হল যেন ধর্মীয় ছবি টানাচ্ছি। এই কাঁচা দৃশ্যসজ্জা সত্ত্বেও মঞ্চায়ন ব্যর্থ হয়নি। বাবা অন্তত কয়েকজন প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেতা খুঁজে পেয়েছিলেন। নক্ষত্রমাণিক্যের ভূমিকায় নয়ন অসাধারণ অভিনয় করেছিল। অভিনয়ে তার ছিল জন্মগত প্রতিভা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে অল্প বয়সেই মারা যায়। নইলে পরবর্তীতে বাবার অনেক নাটকেই সে ভূমিকা পালন করতে পারত। জগদানন্দবাবু ছিলেন আরেক আবিষ্কার। তিনি করেছিলেন রঘুপতির পাঠ। যতদিন বেঁচেছিলেন, নাটক হলেই তাঁকে কোনো-না-কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে হতো।
শারদোৎসব রচিত হয় কয়েক বছর পরে। ততদিনে আশ্রমের চেহারা অনেকখানি বদলে গিয়েছে। নতুন ছাত্রাবাস নির্মিত হয়েছে। এর একটি বড় কক্ষ ছিল। এটি অভিনয়ের জন্য এত লাগসই ছিল যে এর নামই হয়ে গিয়েছিল নাট্যঘর। হল অর্থে যা বোঝায় একে ঠিক তা বলা মুশকিল। কেননা, এর ছাদ ছিল নিচু। তবুও আগের খাবার ঘরের নিরিখে এ ছিল এক বিরাট সংযোজন। ততদিনে ছাত্রের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে একশর কাছাকাছি। কর্মচারীর সংখ্যাও সেই হারে বেড়েছে। ফলে অভিনেতা বেছে নেয়ার সুযোগ যেমন বাড়ল তেমনি বাড়ল অভিনয়ের মান। এর মধ্যে ক্ষিতিমোহন সেন, অজিত চক্রবর্তী, প্রমথ বিশী এবং তপন চ্যাটার্জি অভিনয়ে যোগ দিয়েছেন। কঠিনভাবে পরীক্ষা করে বাবা নিজেই অভিনেতা ঠিক করতেন। সে সময় তিনি খোলা স্থানে রিহার্সাল করাতে পছন্দ করতেন। সেটা দেখা ও শোনার জন্য আশ্রমের সবাই চলে এলেও তিনি বিরক্ত হতেন না। ফলে নাটক ও গানের রিহার্সাল যে কেবল কুশীলবদেরই মান বাড়াত তা নয়, বরং সবাই তা থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারত। আমি নিশ্চিত যে এ পদ্ধতি অবলম্বন করেই বাবা আশ্রমের সকলের মধ্যে শিল্প ও সংগীতের বোধ সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন। গান শেখানোর জন্য কোনো নিয়মিত ক্লাসের ব্যবস্থা ছিল না, তবু প্রায় সকলেই গাইতে পারত। তখন থেকেই যেন শান্তিনিকেতনের বাতাসে গান ভেসে বেড়াত, যা আজও অক্ষুণ্ণ আছে। আমি বলব না যে প্রত্যেকেই খুব ভালো অভিনয় করতে পারত। তবে এটা সত্য যে অভিনয়ের জন্য বেশ বড় একটা দল তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বাবা যখনই কোনো নাটক করতে চাইতেন, এদের মধ্য থেকে তিনি খুব দ্রুত এবং সহজে অভিনেতা ঠিক করে ফেলতে পারতেন। দুঃখের বিষয়, খোলা জায়গায় রিহার্সাল করানোর পদ্ধতিটি বেশিদিন চালু রাখা যায়নি। আশ্রমের আকার ও কর্মকাণ্ড এবং বাইরে থেকে আসা অতিথির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধ করে দিতে হয়। ফলে বাবার সুচারু পরিচালনায় শিক্ষানবিশ অভিনেতারা যে কঠিন প্রশিক্ষণ নিত, তা দেখার সুযোগ থেকে ছাত্ররা বঞ্চিত হয়।
শারদোৎসব যেন শান্তিনিকেতনের চিত্তকে ধারণ করত। চারপাশে প্রকৃতির শারদীয় রূপ এ নাটকের জন্য এক আদর্শ পটভূমি তৈরি করে দিত। এ নাটকে যারা অভিনয় করত তারা তাদের নিজ ভূমিকার সঙ্গে এতটাই আপন বোধ করত যে অভিনয় হয়ে উঠত সহজাত ও সাবলীল। নাটক দেখার জন্য কোলকাতার অনেককে দাওয়াত দেয়া হতো। স্বতঃস্ফূর্ত আর প্রাণোচ্ছল অভিনয় দেখে দর্শকরা অভিভূত হয়ে যেত।
শারদোৎসব-এর সাফল্যে বাবা খুব উৎসাহ পেলেন। দ্রুতই তিনি প্রায়শ্চিত্ত, রাজা, অচলায়তন নামে আরও তিনটি নাটকের মঞ্চায়ন করে ফেললেন। প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষের শেষে একটা নাটক হবে—এটা একটা রেওয়াজ হয়ে গেল। কোলকাতা থেকে আরও অধিকসংখ্যক বন্ধু-বান্ধব সেগুলো দেখতে আসতে থাকলেন। বাবা এ সময় খুব উত্তেজিত থাকতেন এবং তাঁদের আরাম-আয়েশের খুঁটিনাটি পর্যন্ত তদারক করতেন।
প্রায়শ্চিত্ত মূলত বৌ-ঠাকুরাণীর হাট উপন্যাসের নাট্যরূপ। সে অর্থে বাবার প্রথম দিককার রচনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তখন পর্যন্ত এর অভিনয় হয়নি। শান্তিনিকেতনে নাটক মঞ্চায়নের সাফল্যে তিনি এতটাই আনন্দিত হয়েছিলেন যে, ঠিক করলেন এ নাটকটিরও অভিনয় করাবেন। শারদোৎসব এবং অচলায়তন সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার রচনা। এ দুইয়ের মাঝখানে যে প্রায়শ্চিত্ত অভিনীত হল, বাবার সে উৎসাহই সম্ভবত তার প্রধান কারণ। প্রায়শ্চিত্ত নাটকটি “আরেক কারণেও উল্লেখের দাবি রাখে। বাবার যে কয়টি নাটক বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত, পরিমার্জিত হয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন নামে ছাপা হয়েছে, এটি ছিল সেগুলোর অন্যতম।
১৯১১ সালে রাজা নাটকের মঞ্চায়ন হল। আমি তখন শিলাইদহে, কাজেই অভিনয় দেখতে পারিনি। তবে শুনেছি যে অতি উঁচুমানের নাটক হয়েছিল সেটি। আগেই বলেছি, বাবা একদল অভিনেতাকে একত্রিত করতে ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ করে তুলতে পেরেছিলেন। তাঁরা যে কেবল বাবার কাজের সঙ্গী ছিলেন তা-ই নয়, মননেও একই চেতনা লালন করতেন। এরকম সমন্বয় খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। আমার তো মনে হয় কেবল মস্কো আর্ট থিয়েটার আর আইরিশ থিয়েটারই এর সমকক্ষ হতে পারে। শান্তিনিকেতনের মত এ দুটি প্রতিষ্ঠানেও কলাকুশলীদের দুএকজনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর সাফল্য নির্ভর করত না। বরং সকলের ভূমিকার সার্বিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে মূল সুর ধ্বনিত হতো। অভিনেতাদের ঐকান্তিকতা দেখে দর্শক আলোড়িত হতো এবং শৈল্পিক সন্তুষ্টি নিয়ে ফিরে যেত।
রাজা নাটকটিও দর্শকদের সেরকম সন্তুষ্টি দিয়েছিল। কিন্তু এর মর্মার্থ নিয়ে তাদের মনে দ্বিধা তৈরি হল। সত্যি বলতে কি কোলকাতার সাহিত্যিক মহলে বহু বছর ধরে এ দ্বিধা বজায় ছিল। বলাবলি হতে লাগল যে সাহিত্যের তৎকালীন যে মান, তার সঙ্গে বাবার লেখা নাটক মেলানো যায় না। সেগুলোর সিম্বলিজম বিভ্রান্তি তৈরি করে। সবচেয়ে বড় কথা, সেগুলোতে নাকি নাটকের গতিও থাকে না। তখন থেকে এই নাটকগুলোর এই যে পুনঃপুন অভিনয় হয়ে চলেছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় যে সে সকল অভিযোগের কোনোটিরই কোনো সত্যতা নেই।
অচলায়তন অভিনীত হয় ১৯১৪ সালে, শান্তিনিকেতনে সিএফ এন্ড্রুজকে দেয়া অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে। শারদোৎসব ও অচলায়তন নাটকে যে কেবল বয়স্করা অভিনয় করেছেন তা নয়, ছাত্ররাও এগুলোতে সুযোগ পেয়েছে। শান্তিনিকেতনের ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে মধুর ও প্রীতির সম্পর্ক বিরাজ করত। ফলে এ দুই শ্রেণির অভিনেতাই অত্যন্ত সহজাতভাবে মঞ্চের অভিনয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। যথারীতি মহা পঞ্চকের ভূমিকায় জগদানন্দবাবুর অভিনয় দর্শক মাতাল। একইভাবে আসর মাত করলেন দিনেন্দ্রনাথও। তিনি ভালো অভিনেতা ছিলেন, তদুপরি ছিলেন নাটকের কোরাস গাইয়েদের নেতা। ঠাকুরদার ভূমিকায় ক্ষিতিমোহন সেনের অভিনয়ও দারুণ প্রশংসা কুড়াল। বাবা করেছিলেন আচার্যের চরিত্র। সমবেত দর্শকদের বিশেষ খোরাক যোগালেন ডব্লিউডব্লিউ পিয়ার্সন। এমনিতে তিনি ভালোই বাংলা বলতে পারতেন, কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ‘অড়হর খেসারির ডাল’ বলতে গিয়ে। তিনি তোতলাতে লাগলেন। দর্শকরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল। শান্তিনিকেতনে যেসব বিদেশি আসত, আশ্রমের সকল কাজেই বাবা তাঁদের অংশগ্রহণ পছন্দ করতেন। বিশেষভাবে খেয়াল রাখতেন তাঁরা যেন নাটকে অভিনয় করতে পারেন। এ কারণেই ডব্লিউডব্লিউ পিয়ার্সন, লিওনার্দ এলমহার্স্ট, ড. হ্যারি টিম্বরস ও তাঁর স্ত্রী হৈমন্তী চক্রবর্তী এবং আরও অনেকে বিভিন্ন উপলক্ষে মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কোলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের বহু বছরের নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়েছিল ফাল্গুনী নাটকটি। ১৯১৫ সালের বসন্তে বাবা এটি রচনা করেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শান্তিনিকেতনে এর প্রথম অভিনয় হয়। আশ্রমের দুই খুদে বালক গাইল ‘ওগো দখিন হাওয়া’ গানটি। যারা এটি শুনেছেন, প্রতিবছর বসন্ত এলেই সে দুই খুদে গায়কের সুমধুর কণ্ঠের স্মৃতি তাঁদের মনে পড়বে। বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের দিক থেকে এটি ছিল অন্যসব নাটক থেকে আলাদা। সাধারণভাবে নাটকের জন্য তা যুৎসই হতো না। শারদোৎসব, অচলায়তন ও ফাল্গুনী— শান্তিনিকেতনে অভিনীত হওয়া এ তিন নাটকের কোনোটিতেই দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য চিত্রিত পর্দা ব্যবহার করা হয়নি। কোনো বিশেষ শিল্পরীতির কথা না ভেবে সহজাত প্রাকৃতিক দৃশ্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ ধরনের মঞ্চসজ্জা অন্য দুটি নাটকের চেয়ে ফাল্গুনীর ক্ষেত্রে আরও বেশি উপযোগী ছিল।
পরের বছর (১৯১৬) শীতের শেষের দিকে শান্তিনিকেতনে যথারীতি মাঘোৎসব অনুষ্ঠিত হল। বরাবরের মত বাবা ধর্মীয় কার্যাদি সম্পন্ন করলেন। এর পরপরই ঠিক করা হল যে কোলকাতায় পুনরায় ফাল্গুনীর মঞ্চায়ন করা হবে। বাঁকুড়ায় তখন চরম দুর্ভিক্ষ চলছে, তাদের খুব সাহায্যের দরকার। বাবা তড়িঘড়ি করে রিহার্সাল করালেন, যেন নাটকটি দ্রুত মঞ্চায়ন করে টিকিট থেকে প্রাপ্ত অর্থ বাঁকুড়ায় পাঠানো যায়।
বিচিত্রা ক্লাবের কাজে এ সময় আমি কোলকাতাতেই ছিলাম। কাজেই এর ব্যবস্থাপনার ভারও আমার ওপরই পড়ল। এ প্রথমবারের মত শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীরা বাইরে অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এত বড় একটা দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ায় আমার নার্ভাসনেস বেড়ে গেল। অভিনয়ের প্রথম দিন বলতে গেলে তেমন কোনো দর্শকই হয়নি।[১] সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের পুরনো ছাত্রদেরকে জড়ো করলাম। এরা তখন কোলকাতার বিভিন্ন কলেজে পড়ছে। তাদেরকে বললাম বন্ধু-বান্ধবদের মাধ্যমে এ কথা প্রচার করতে যে যারা এ নাটকটি দেখতে চায় তারা যেন পরদিন সকালেই টিকিট কেটে ফেলে। পরদিন দেখা গেল সবকটি টিকিটই বিক্রি হয়ে গিয়েছে, যদিও দাম ছিল খুবই চড়া। শেষে সন্ধ্যায় দেখা গেল লোকে ১০০ টাকা করে টিকিট কিনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফাল্গুনীর অভিনয় দেখছে। সকল খরচ মেটানোর পরও আমরা ত্রাণ কমিটির কাছে ৮০০০ টাকা পাঠাতে পেরেছিলাম। আমাদের পরবর্তী প্রায় সকল প্রকাশ্য মঞ্চায়নই সফল হয়েছিল। তবু আমি বলব যে ফাল্গুনীর মত এত টাকার টিকিট আর কখনোই বিক্রয় হয়নি।
বাবা পুনরাবৃত্তি পছন্দ করতেন না। কোন সৃজনশীল লোকই বা তা করতে পারে? কোনো নাটক অভিনয়ের পালা আসলে অবধারিতভাবে তাতে সংযোজন- বিয়োজন করতেন। রিহার্সালের শেষদিন পর্যন্ত পরিবর্তনের ধারা চলতেই থাকত। কয়েক দিন ধরে চলা মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে এক সন্ধ্যায় অভিনয় হয়ে যাবার পর পরবর্তী সন্ধ্যার আগে আবারও কাটাছেঁড়া চলছে। এতে অভিনেতাদের খুব অসুবিধা হতো। মঞ্চায়নের সব পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করা গেলে সেটা একটা মজার সংকলন হতো।
আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে এক বছর আগে শান্তিনিকেতনে যেভাবে ফাল্গুনীর অভিনয় হয়েছে, কোলকাতায় সেভাবে হবে না। হলও ঠিক তাই। একেবারে শেষ মুহূর্তে তিনি মূল নাটকের আগে বৈরাগ্য-সাধন নামে একটি নাটিকা জুড়ে দিলেন। এর অভিনয়ের জন্য নতুন একদল পাত্র-পাত্রী দরকার হল। হয়ত বাবা ভেবেছিলেন, তিনি যে নতুন ধারার নাটক দেখাতে চাচ্ছেন, সাধারণ মানুষ তার স্বাদ নিতে পারবে না। সে আশঙ্কা থেকেই ভূমিকার মত কিছু একটা দেখিয়ে নেয়া। আবার এ-ও হতে পারে যে নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র আর অবনীন্দ্রনাথের প্রতিভা জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য তিনি এ নাটিকা লিখেছেন। মনে হয় যেন তাঁদের কথা ভেবেই এর বিভিন্ন অংশ লেখা। এই ছোট্ট নাটিকাটি মূল নাটকের আকর্ষণ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল।
আমাদের বাড়ির সামনেই মঞ্চ তৈরি করা হল। গগনেন্দ্রর নির্দেশনায় নন্দলাল বসু ও সুরেন্দ্রনাথ কর বিভিন্ন দৃশ্য ফুটিয়ে তুললেন। শান্তিনিকেতনে এতদিন প্রাকৃতিক সাজসজ্জায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পর্দার এখানে-সেখানে অল্পকিছু তুলির আঁচড়েই কিন্তু একটা বাস্তবানুগ ভিন্ন আবহ তৈরি হয়ে গেল। ‘ধীরে বন্ধুগো ধীরে’ গাইতে গাইতে এক অন্ধ বাউল একটা অন্ধকার গহ্বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্যটা দর্শকের মনকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল। বাউলের ভূমিকায় বাবা স্বয়ং অভিনয় করেছিলেন। ১৯১৬ সালের দিকে বাবা অনুনাদক কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন। তিনি যখন গাইতে গাইতে পর্দার আড়ালে চলে গেলেন, গানের শেষ কথার সঙ্গে তার গলাও মিলিয়ে গেল, দর্শক সবাই আবেগমথিত হয়ে গেলেন। গানই ছিল এ নাটকের প্রাণ। বাবা, দিনেন্দ্রনাথ, অজিত চক্রবর্তী আর শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের দল গেয়েওছিলেন সেরকম। আমার বিশ্বাস, অজিত চক্রবর্তী জীবনের সেরা গান গেয়েছিলেন সেদিন। বিশেষ করে ‘আমি যাব না গো অমনি চলে’ তিনি যেভাবে গেয়েছেন, তেমন আর কখনও পারেননি। কোলকাতার এ সফল মঞ্চায়নের পর শান্তিনিকেতনবাসীর আর কোনো সন্দেহ থাকল না। এটাও বোঝা গেল নাটক থেকে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।
শান্তিনিকেতনের অভিনেতারা ফাল্গুনীর পর বহু বছর প্রকাশ্যে কোনো মঞ্চায়ন করেননি। এর কারণ বাবার ব্যস্ততা। কোলকাতায় সদ্য গড়ে ওঠা বিচিত্রা ক্লাব তাঁর সময়ের অনেকখানি কেড়ে নিচ্ছিল। এর পরপর লম্বা সময়ের জন্য তিনি ইউরোপ সফরে গেলেন। ১৯১৭ সালেও তিনি ডাকঘর নামের নাটকটি করেছেন, তবে সেটা শান্তিনিকেতনে নয়, কোলকাতায়। কেবল অমলের চরিত্রে শান্তিনিকেতনের একজন বালককে নেয়া হল, অন্য সমস্ত অভিনেতা ছিলেন কোলকাতার। বিচিত্রা হলে রিহার্সাল আর অভিনয় হল। প্রকৃতিগত দিক থেকে ডাকঘর ছিল অনেকটা ছান্দিক, এর সহজ কিন্তু কাব্যিক ভাষার মধ্যে অতীন্দ্রিয় দর্শন লুকানো। এতে একটাও শব্দ ছিল না যা অতিরিক্ত, একটাও বাক্য ছিল না যার কোনো তাৎপর্য নেই। কেবল জাত শিল্পীদের পক্ষেই এমন একটি নাটক ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। সৌভাগ্যবশত এমন একদল অভিনেতা সহজেই পাওয়া গেল। নাটকের প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে তারা চমৎকারভাবে মানিয়ে গেলেন। বাবা নিজে অভিনয় করেছিলেন গফুর প্রহরী আর ফকিরের ভূমিকায়। অবনীন্দ্রনাথ দ্বৈত চরিত্রে পাঠ করেছিলেন। তিনি সেজেছিলেন ডাক্তার আর গ্রামপ্রধান। এর বাইরে গগনেন্দ্র মাধবের, দিনেন্দ্রনাথ ফকিরের সঙ্গীর আর অসিত হালদার দৈ বিক্রেতার ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেরা নির্বাচন ছিল অমলের ভূমিকায় আশামুকুল। যেন এ চরিত্রটি করার জন্যই তার জন্ম হয়েছিল। নাটকটির একমাত্র নারী চরিত্র একটি ছোট মেয়ে, অমলের খেলার সঙ্গী। অবনীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ কন্যা এ চরিত্রে রূপদান করেছিল। নাটকের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় ডাকপিওনের বহুকাঙ্ক্ষিত চিঠি হাতে নিয়ে অমল মৃত পড়ে আছে। সে সময় এ বালিকা অভিনেত্রীর ‘অমল’ বলে মর্মস্পর্শী ডাকে যে করুণ দৃশ্যের অবতারণা হল, এতটা হবে বলে স্বয়ং নাট্যকারও ভাবতে পেরেছিলেন কি না সন্দেহ।
বিচিত্রা হলের এক কোণে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। ঘরের ভিতরে আর যেটুকু জায়গা ছিল তাতে মোটে শদেড়েক দর্শক বসতে পারে। নাটকটির জন্য এটিই বরং ছিল সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। কেননা, এর থেকে বড় পরিসরের আয়োজন হলে অভিনয়ের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় দর্শকদের চোখে পড়ত না। মঞ্চ সাজানোর পুরো দায়িত্বে ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। তিনি এক নতুন এবং সাহসী পরিকল্পনা করলেন। মঞ্চের উপর মাটির ছাদ আর বেড়া দিয়ে সত্যিকারের কুটির নির্মাণ করা হল। সাজসজ্জা ছিল সাধারণ কিন্তু অসাধারণ শৈল্পিক। কেবল একজন বোদ্ধার পক্ষেই এরকম পরিকল্পনা গ্রহণ আর তার বাস্তবায়ন সম্ভব।
ডাকঘর মঞ্চায়নের উদ্দেশ্য ছিল বিচিত্রা ক্লাবের সদস্যদের সহায়তা করা। সে কারণে সীমিত পরিসরে এর আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এটা দেখার জন্য লোকের আগ্রহ এত বৃদ্ধি পায় যে বেশ কয়েকবার এর অভিনয় করাতে হয়। প্রত্যেকবার অভিনয় শেষ হয়ে যাবার পর মঞ্চ ভেঙে ফেলতে গেলেই বাধা পড়ত। অনুরোধ আসত আবারও মঞ্চায়নের। ফলে বিচিত্রা ক্লাবের মঞ্চটি কয়েক মাস সেভাবেই রেখে দিতে হল। যতদূর মনে পড়ে সপ্তমবারের আয়োজনটিই ছিল সর্বশেষ। কোলকাতায় অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের সম্মানে এটা করা হয়েছিল। কংগ্রেস শেষ হয়ে গেলে সম্মেলনের সভাপতি মহীয়সী নারী মিসেস অ্যানি বেসান্ত, পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, মহাত্মা গান্ধী এবং লোকমান্য তিলক এ নাটক দেখতে আমাদের বাড়ি এলেন। বলতে দ্বিধা নেই যে নাটককে ঠিকমত ফুটিয়ে তোলার দিক বিবেচনায় আর কোনো অভিনয়ই নাট্যকার, প্রযোজক, অভিনেতা আর দর্শকদের এতটা তৃপ্তি দিতে পারেনি। শিল্প-নৈপুণ্য এবং মঞ্চসজ্জা যেন এই একবারই উৎকৃষ্টতার তুঙ্গে উঠেছিল।
