পরেশনাথে
বিচিত্রা ক্লাবের কাজে আমাকে কয়েক বছর কোলকাতায় কাটাতে হল। এর পর শান্তিনিকেতন থেকে ডাক পড়ল। স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য সেখানে চলে গেলাম। অবশ্য শান্তিনিকেতনে চলে যাওয়ার আগে বিচিত্রা ক্লাবের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম ছেড়ে কিছুদিনের জন্য এক নতুন পেশায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম। মোটরগাড়ির ব্যবসা খুললাম। বলা বাহুল্য, এর বেলায়ও ঠাকুরবাড়ির ব্যবসায়িক ঐতিহ্যের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি, অর্থাৎ উদ্যোগটি লাভের মুখ দেখেনি। তবে আর্থিক সাফল্য না পেলেও এটি নিয়ে আমি তৃপ্ত ছিলাম। কেননা, গাড়ি চালানো ছিল আমার শখ। এ ব্যবসা আমার শখ পূরণে সাহায্য করেছিল। আমি জোরে গাড়ি চালাতে পছন্দ করতাম, পছন্দ করতাম নতুন নতুন মডেলের গাড়ি চালাতে। এ ব্যবসার সুবাদে ঘনঘন গাড়ি নিয়ে দূরের যাত্রায় বেরিয়ে পড়ার অজুহাত পাওয়া গেল। সুযোগ পেলেই ছোটনাগপুরের দিকে চলে যেতাম। সে এলাকাটি তখনও বুনো রয়ে গেছে। মানুষের পদচারণা প্রকৃতিকে নষ্ট করে দেয়নি। অগণিত পাহাড় আর ঢেউ খেলানো উপত্যকা, বর্ষায় উদ্দাম আর শীতে স্ফটিকস্বচ্ছ নদী, নানা জীব-জন্তুতে পরিপূর্ণ শাল আর মহুয়ার ঘন বন। এগুলোর প্রতি আমার অমোঘ আকর্ষণ ছিল।
এক গ্রীষ্মে প্রত্যন্ত এলাকার সমতলে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পরেশনাথ পাহাড়ের চূড়া চোখে পড়ল। প্রচণ্ড গরমে আমাদের তখন সেদ্ধ হবার অবস্থা। কাজেই সামনে সবুজ পাহাড়ের শ্যামল ছায়ার হাতছানি উপেক্ষা করতে পারলাম না। চারপাশে এলোমেলোভাবে ছড়ানো-ছিটানো ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝখানে হঠাৎ চার হাজার ফুট উঁচু পর্বতটির আশ্চর্য উত্থান দেখে মনে হয় যেন একদল বামনের মাঝে প্রকাণ্ড এক দৈত্যের উদয় হয়েছে। আমি জানি না ভূতাত্ত্বিকগণ এ অসামঞ্জস্যের কী ব্যাখ্যা দেবেন। তবে এটা জোর গলায়ই বলতে পারি যে, এ এলাকার ভিতর দিয়ে যাওয়া যেকোনো যাত্রীর মনে এটি নিশ্চয়ই মোহ তৈরি করে। গোড়ার দিকে একবারমাত্র ভাঁজ খেয়ে চারপাশের সমতল থেকে এর তীক্ষ্ণ চূড়া যেভাবে ঊর্ধ্বাকাশে উঠে গেছে, এরকম দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া ভার। তুলনা মেলে না এর রাজসিক সৌন্দর্যেরও। কিন্তু চারপাশের পাহাড়গুলোর উচ্চতা এমন চমৎকার অনুপাতে বিন্যস্ত যে, আগে থেকে জানা না থাকলে যে-কারোরই মনে হবে পরেশনাথে বুঝি সহজেই চড়া যাবে। অন্তত আমাদের তা-ই মনে হয়েছিল। আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেলাম এবং কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই পর্বতারোহণ শুরু করলাম।
পাহাড়ের পাদদেশ ঘিরে মৌসুমি জলবায়ুর ঘন জঙ্গল। সেগুলোর মাথার উপর দিয়ে যেখান থেকে প্রথম উৎরাই শুরু, সেখানে জৈন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মশালা। আমাদের অর্বাচীন সাহস দেখে পুরোহিত নিশ্চয়ই মনে মনে হেসেছেন। তিনি অবশ্যি খুব মিষ্টি ব্যবহার করলেন। আমাদেরকে প্রায় তরমুজের মত বড় একটা পাকা পেঁপে দিলেন। বলতে দ্বিধা নেই এটাকে তখন উটকো ঝামেলা মনে হয়েছিল। নিছক সৌজন্যের খাতিরেই আমরা এটা গ্রহণ করলাম, যদিও পরে তাঁর এ সহৃদয়তা কাজে এসেছিল। আরও বেশি কাজে এসেছিল তাঁর অন্য একটা উপকার। আমার স্ত্রী ছিলেন অভিযাত্রীদলের একমাত্র নারী সদস্য। তিনি পাহাড় বেয়ে অতদূর উঠতে পারবেন না ভেবে পুরোহিত একটা ডুলি আর চারজন কুলি পাঠিয়ে দিলেন। অসুস্থ, বৃদ্ধ আর যেসব মানুষ পাহাড় ডিঙাতে পারেন না কিন্তু মন্দির দর্শন করতে চান তাঁদেরকে ডুলিতে তুলে কুলিরা কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায়।
জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমরা উঠছি তো উঠছিই। শীঘ্রই পেঁপেটা খাওয়া হয়ে গেল। পুণ্যার্থীরা তখন পাহাড় থেকে নেমে আসছেন। সন্ধ্যা নামার আগেই তাঁরা উপত্যকার ধর্মশালায় ফিরতে চান। তাঁরা আমাদেরকে আর না উঠতে উপদেশ দিলেন। উপরে ওঠার পথে কী কী কঠিন অসুবিধা হবে তাঁর ফিরিস্তি দিয়ে নিরুৎসাহিত করতে চেষ্টা করলেন। একজন বৃদ্ধ মহিলা তো আমার হাত ধরে কেঁদেই ফেললেন। এমন বোকামো করতে মানা করলেন। কিন্তু তরুণ-তাজা রক্ত কি আর সে নিষেধ শোনে? শীঘ্রই দূরের হাজারিবাগ জেলার কোনো এক সুদূর দিগন্তে গোধূলির রক্তিম আবির মেখে সূর্য ডুবে গেল। শ্যাওলা-পড়া উঁচু উঁচু শালগাছের নিচে তখন কেবল আমরা চারজন আর কুলিরা। আঁধার যত ঘনিয়ে এল বনের নিশুতি রাতের জীবনও যেন তত জীবন্ত হতে লাগল। কানে ভেসে আসতে লাগল চেনা-অচেনা হাজারো রকমের ডাক। আতঙ্ক দূর করার জন্য কুলিরা থেকে থেকে ‘রাম, রাম’ বলে হাঁক পাড়তে লাগল। তাদের চিৎকার শূন্য আকাশে মিলিয়ে গেল, এমনকি কোনো প্রতিধ্বনিও ফিরে এল না। চূড়ার নিচে এক চিলতে জায়গায় তীর্থযাত্রীদের জন্য একটা রেস্ট হাউজ আছে। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে আমরা প্রায় বিধ্বস্ত। তারুণ্যের সে উদ্যম কোথায় মিইয়ে গিয়েছে! কিন্তু হা ভগবান! রেস্টহাউজের দরজায় যে তালা ঝুলছে। কোনোভাবেই ভিতরে ঢুকবার উপায় নেই। অগত্যা বাইরেই রাত কাটাতে হল। শুকনো ঘাস আর কিছু ডালপালা দিয়ে একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম।
দিনের আলো চোখের উপর চাবুকের মত ঘা মারতে শুরু করলে আমাদের ঘুম ভাঙল। চারপাশে তাকিয়ে মনে হল আমরা যেন পৃথিবীর ছাদে পৌঁছে গিয়েছি। কিন্তু উপরে ওঠার তখনও সামান্য বাকি ছিল। একেবারে চূড়ায় পাথরে তৈরি পরেশনাথের মন্দির সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। জৈন ধর্মাবলম্বীরা এ সন্ন্যাসীর পূজা করে। আগের রাতের ঊর্ধ্বারোহণের কারণে আমাদের সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছিল। পরেশনাথের মন্দির দেখার আগ্রহে লম্বা সিঁড়ির ধাপের পর ধাপ পেরিয়ে আমরা উঠতে থাকলাম। মন্দিরের ভিতরটা আশ্চর্য রকম পরিষ্কার। কোথাও একটু দাগ পর্যন্ত নেই। মনে হল সকালের স্নান-সারা বিধবার নির্মলতার মত মন্দিরটির শ্বেতশুভ্র পবিত্রতা ঝলমল করছে। কেবল সন্ন্যাসীর পবিত্র বাণীসম্বলিত একটি পুস্তক ছাড়া আর কিছু নেই। নির্জন পাহাড়ের চূড়ায় সে মন্দিরগৃহে আমরা তখন দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। মানুষের আধ্যাত্মিক সাধনা কতটা উচ্চমার্গের হতে পারে মন্দিরটির প্রতিটি পাথর যেন তারই অকাট্য সাক্ষ্য দিচ্ছে।
