বাবার সঙ্গে লন্ডনে
১৯০২ সালে মা মারা গেলেন। এর পর থেকে বাবা খুব কমই শরীরের যত্ন নিতেন। তিনি বিরতিহীনভাবে লিখে যাচ্ছিলেন। সাহিত্যসাধনার জন্য আরও বেশি সময় বের করতে তিনি প্রায়ই খাওয়া-দাওয়াও বাদ দিয়ে দিতেন। তার ওপর, এ সময়টায় নানাবিধ জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ডে, বিশেষত রাজনৈতিক ব্যাপারে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মানসিক বা চারিত্রিক গঠনটা ঠিক এ ধরনের কাজের উপযুক্ত ছিল না। এসবের পাশাপাশি শান্তিনিকেতন স্কুলের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটা তো ছিলই। প্রতিষ্ঠানটিকে ঠিকমত দাঁড় করাবার জন্য তিনি যে কেবল সময় ও শক্তি নিয়োগ করেছেন তা-ই নয়, নিজের যে সীমিত আর্থিক সামর্থ্য ছিল তা-ও এর পেছনে ব্যয় করেছেন। এর ধকল বইতে গিয়ে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হতে শুরু করল। যদিও তাঁর শরীরের গাঁথুনি ছিল চমৎকার, ১৯১২ সালের দিকে তা প্রায় ভেঙে পড়ল। ডাক্তার ও বন্ধু-বান্ধবরা তাঁকে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বের হতে এবং ইউরোপে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পরামর্শ দিলেন।
কোলকাতা থেকে লন্ডনে যাবার জাহাজের টিকিট পাওয়া গেল। যাত্রার আগের দিন সন্ধ্যায় স্যার আশুতোষ চৌধুরীর প্রাসাদোপম বাসভবনে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। এতে বাবার বাল্মীকি-প্রতিভা নাটকটি অভিনীত হল। দীর্ঘদিন ধরেই এর প্রস্তুতি চলছিল। বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দিনেন্দ্রনাথ। বাবা নাটক দেখলেন। আমরা অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম। কিন্তু তিনি ঘুমাতে গেলেন না। সারারাত ধরে নানান জনকে চিঠি লিখলেন। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙতে আমরা দেখলাম তাঁর অবস্থা প্রায় বিধ্বস্ত। তক্ষুনি ডাক্তার ডাকা হল। আগের দিন সন্ধ্যায়ই আমাদের সমস্ত মাল জাহাজে তুলে দেয়া হয়েছিল। তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য চাঁদপাল ঘাটের জেটিতে আসা লোকেরা অবাক হয়ে দেখল যে মালপত্র নিয়ে জাহাজ রওয়ানা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু যে যাত্রী এগুলোর মালিক তাঁরই কোনো খবর নেই।
আমার ধারণা, বিলেত যাত্রার জন্য ডাক্তারদের দেয়া পরামর্শ বাবা ঠিক পছন্দ করেননি। তিনি তাঁর নিজস্ব উপায়ে আমাদের সে উদ্যোগ ঠেকিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। আগেও একাধিকবার এরকম হয়েছে। তাঁর ওপর কেউ কিছু চাপিয়ে দিতে গেলে সেটা শেষ পর্যন্ত কিম্ভূতকিমাকার, এমনকি হাস্যকর ঘটনায় রূপ নিয়েছে। বাবার চরিত্রের এ অপ্রত্যাশিত কাঠিন্যের পরিচয় যারা পেয়েছেন তাঁদের কাছে এরকম মজাদার কাহিনি অনেক শুনতে পাওয়া যাবে।
সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে পড়ায় ডাক্তাররা এবার পরামর্শ দিলেন কিছুদিন একেবারে বিছানায় শুয়ে থাকতে। যাত্রার ধকল সইবার মত সুস্থ হলেই কেবল পুনরায় ইউরোপ রওয়ানা হতে। স্বাস্থ্য ও মনোবল উদ্ধারের জন্য বাবার কাছে শিলাইদহের চেয়ে ভালো জায়গা আর হয় না। আগেও তিনি এখানেই আশ্রয় নিয়েছেন। ডাক্তাররা তাঁকে বলে দিয়েছিলেন শারীরিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো ধরনের কঠিন পরিশ্রমের কাজ না করতে। তিনি ভাবলেন, এ সময়টায় কিছু অনুবাদ করলে ভালো লাগবে। র্যামজে ম্যাকডোনাল্ডের[১] মন্তব্য এ কাজে তাঁকে উৎসাহ যুগিয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে, এ ঘটনার কয়েক মাস আগে তিনি শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় বাবার কিছু ইংরেজি অনুবাদ বেরিয়েছিল। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক অজিত কুমার চক্রবর্তী সেগুলো র্যামজে ম্যাকডোনাল্ডকে দেখালে তিনি ভূয়সী প্রশংসা করেন। এর আগে আনন্দকুমার স্বামী ও জগদীশচন্দ্র বসুও বাবাকে অনুবাদে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন।
শিলাইদহে ফিরতে পেরে বাবা খুব আনন্দিত হলেন। অবশ্য তিনি বুঝতে পারেননি যে এ যাত্রাই শিলাইদহে তাঁর শেষবার আগমন। বহু বছর পরে বাবা বোধহয় আরেকবার এখানে এসেছিলেন, কিন্তু সে একেবারে অতি অল্প সময়ের জন্য। এবারে তিনি এলেন একা, আর কুঠিবাড়িটিকে পেলেন একান্ত নিজের মত করে। ছাদের ছোট্ট পড়ার ঘরটাতে সারাদিন কাটাতেন। এখান থেকে একদিকে দেখতে পেতেন দিগন্ত বিস্তৃত অবারিত মাঠে জমির পর জমির বুক জুড়ে গলিত সোনার মত সর্ষে ফুলের সমারোহ, অন্যদিকে ছিল রাজসিক পদ্মার শুকিয়ে যাওয়া শীর্ণ শাখায় রূপালি জলের কোল ঘেঁষে ধু-ধু বালির চর। এ শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে বাবাকে বিরক্ত করার কেউ ছিল না। কেবল মাঝে মাঝে একজন বৈষ্ণবী আসত। ধর্ম ও দর্শন নিয়ে তাঁর সহজাত আলোচনা আর সরল কিন্তু গভীর বিশ্বাস বাবাকে নাড়া দিয়েছিল। সাধনা ও অন্যান্য লেখায় তিনি তাঁকে অমর করে রেখেছেন।
সৃষ্টিশীল জীবনের সেরা বছরগুলো যেখানে কেটেছে, সেই শিলাইদহে ফিরতে পেরে বাবা স্বভাবতই আনন্দিত ছিলেন। এখানকার সৃষ্টিবান্ধব পরিবেশ আর বৈষ্ণবীর সঙ্গে কথোপকথন হয়ত অনুবাদের জন্য কবিতা নির্বাচন আর তিনি সেগুলোকে যেভাবে ইংরেজিতে প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা নির্ধারণে বাবাকে প্রভাবিত করে থাকবে। অনেকে ভেবে থাকেন যে ইংরেজি গীতাঞ্জলি হয়ত বাংলা গীতাঞ্জলিরই হুবহু অনুবাদ। আসলে তা নয়। বাবা তাঁর দশটি বই থেকে কবিতা বাছাই করে অনুবাদ করেছিলেন। অবশ্য এটা ঠিক যে প্রায় অর্ধেক কবিতা তিনি মূল গীতাঞ্জলি থেকেই নিয়েছিলেন।[২] অনুবাদের সময় বাবা কোনো কারিকুরি দেখাতে চাননি। ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে ভাষার এ স্বাচ্ছন্দ্যই বোধহয় ইয়েটসকে এত প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে থাকবে। আমার ধারণা, শিলাইদহের সেই দিনগুলোর চেতনা কিছুটা ভিন্নরূপে এতে প্রতিফলিত হয়েছে। এর কবিতাগুলো যেন নিছক অনুবাদ নয়, বরং নতুন জীবন লাভ করেছে।
শিলাইদহ থেকে বাবা কিছুটা ভালো স্বাস্থ্য নিয়ে ফিরলেন। আমরা আবার তাঁকে ইংল্যান্ড নিয়ে যাবার আয়োজন করলাম। এবারে আর কোনো সমস্যা হল না। ১৯১২ সালের ২৭ মে আমরা বোম্বে থেকে পি অ্যান্ড ও কোম্পানির জাহাজে বিলাত যাত্রা করলাম।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে আমি কিছুদিন ইউরোপে কাটিয়েছিলাম। তবু মহাদেশটি সম্পর্কে আমার খুব বেশি কিছু জানা ছিল না। আর আমার স্ত্রী প্রতিমার এটা প্রথম বিদেশ সফর। বলাই বাহুল্য, সঙ্গী হিসেবে আমরা খুব দক্ষ ছিলাম না। আমাদের দায়িত্ব আরও জটিল হয়ে গেল শান্তিনিকেতনের একজন ছাত্রকে সঙ্গী হিসেবে নেবার ফলে। উচ্চশিক্ষার জন্য সে হার্ভার্ড যাচ্ছিল। সদ্য স্কুলের গণ্ডি পেরুনো এ ছাত্রটির আচার-আচরণ কখনও হাসির, কখনও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিশেষত সে তখনও জুতায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। শান্তিনিকেতনে সে খালি পায়ে চলাফেরা করত, জাহাজেও সুযোগ পেলেই নাঙ্গা পায়ে ডেক-এ বের হয়ে পড়ত। কাঁটা-চামচ আর ছুরি সে বিলক্ষণ চিনত, কেবল জানত না সেগুলো দিয়ে কীভাবে খাবার খেতে হয়। একবার অবশ্য সে গোয়েন্দাগিরিতে খুব সাফল্য দেখিয়েছিল। বাবা আম পছন্দ করতেন। সে কারণে আমরা তাঁর জন্য এক বাক্স সুস্বাদু আম নিয়েছিলাম। এগুলো তাঁর কেবিনেই রাখা ছিল। এক বিকেলে সবাই যখন ঘুমুচ্ছিল তখন এক মহিলা চুপি চুপি বাবার ঘরে ঢুকে আম খেয়ে নিচ্ছিলেন। কেবিনের খোলা দরজা দিয়ে ভেসে আসা পাকা আমের ঘ্রাণের কারণে তিনি হয়ত লোভ সামলাতে পারেননি। সে তাকে হাতেনাতে পাকড়াও করে। চোর ধরার আনন্দে সে সাংঘাতিক উত্তেজিত হয়েছিল।
জাহাজের যাত্রা সচরাচর গতানুগতিক হয়ে থাকে, আমাদেরটাও ছিল তাই। অবশেষে এক সন্ধ্যায় লন্ডন পৌঁছুলাম। থাকার ব্যবস্থা ছিল ব্লুমসবেরি হোটেলে। সেখানে যেতে শেরিং ক্রস স্টেশন থেকে পাতাল রেলে চড়লাম। পাতাল রেলের অভিজ্ঞতা সেবারই প্রথম। আমরা বলতে গেলে বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলাম। বাবার ব্রিফকেসটা ছিল আমার হাতে। এর ভিতরেই ইংরেজি গীতাঞ্জলি আর দি গার্ডেনার-এর পাণ্ডুলিপি রাখা ছিল। পরদিন বাবা রোটেনস্টাইনের কাছে যাবেন। তাঁকে পাণ্ডুলিপি দুটি দেখাবেন। রওয়ানা হবার প্রাক্কালে ব্রিফকেসের খোঁজ পড়ল। তখন দেখা গেল ওটা নেই। কী সর্বনেশে ব্যাপার! আমি প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড় দিলাম। গন্তব্য হারানো মালের অফিস। অবশেষে চামড়ার ব্যাগটা পাওয়া গেল। ভাগ্যিস ওটা হারায়নি। আমার গাফিলতির কারণে সে যাত্রায় গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপি হারিয়ে গেলে ইতিহাসের গতি কোনদিকে মোড় নিত কে জানে!
আপাতদৃষ্টিতে লন্ডন নগরী অতিথিবান্ধব নয়। প্রথমবার সেখানে গেলে বিদেশিরা নিঃসঙ্গ বোধ করেন। আমাদেরও মনে হল যেন হোটেলে বন্দি হয়ে আছি। এর পরেও তো কতবার কতখানে গিয়েছি। সেবারে বৃটিশ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে লক্ষ লক্ষ লোকের ভিড়েও নিজেদেরকে যেরকম অনাহূত বলে মনে হয়েছিল, এরকমটি আর কখনও পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি। আসলে লন্ডনের সঙ্গে একাত্ম হতে সময় লাগে। এক সময় আবিষ্কার করলাম বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ নিরাসক্ত ও নিরানন্দ পরিবেশ আমাদেরও ভালো লাগতে শুরু করেছে। বাবার মত স্পর্শকাতর একজন মানুষের জন্য প্রথম কয়েকটা সপ্তাহ খুবই বেদনাদায়ক ছিল। ইংল্যান্ডে এটাই তাঁর প্রথম আগমন নয়। ছাত্রজীবনেও তিনি লন্ডনে ছিলেন। পরে দ্বিতীয় জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন তাঁর ‘ফার্লো’ ছুটি কাটাতে লন্ডন এসেছিলেন, বাবা সে সময়ও তাঁর সঙ্গে মাস চারেক এখানে কাটিয়ে গিয়েছিলেন। সেবারে লোকেন পালিতও সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু মাঝখানে এত বছর গড়িয়ে গেছে যে তখনকার সঙ্গী-সাথীদের কথা তাঁর স্মৃতি থেকে প্রায় লোপ পেয়ে গিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও চেনা-জানা কারও খোঁজ পাওয়া গেল না। রোটেনস্টাইন ছাড়া আমাদের পরিচিত জন বলতে প্রায় কেউই ছিলেন না। বছরখানেক আগে কোলকাতায় তাঁর সঙ্গে বাবার পরিচয় ঘটেছিল। তিনি আমাদেরকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানালেন এবং বাবাকে শিল্পী ও সাহিত্যিক মহলে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করলেন। রোটেনস্টাইন[৩] ছিলেন চিত্রশিল্পী। কিন্তু সাহিত্যিক মহলেও তাঁর প্রচুর বন্ধু-বান্ধব ছিল। আগে বা পরে হোক, সে সময়কার লন্ডনের রাজনীতি, শিল্প বা সাহিত্যমহলের হোমরাচোমরা প্রায় সকলেরই তিনি ছবি এঁকেছিলেন। তদুপরি, তিনি ছিলেন সদালাপী। এ কারণে বুদ্ধিজীবীগণ তাঁর সঙ্গে মিশতে পছন্দ করতেন। বাবা কেবল নাম বলে দিতেন, দেখা যেত কয়েকদিনের মধ্যেই রোটেনস্টাইন সে ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। এভাবে ইয়েটস, মেসফিল্ড,[৪] এইচজি ওয়েলস, স্টপফোর্ড ব্রুক, হাডসন, নেভিনসন, ইভেলিন আন্ডারহিল[৫] প্রমুখের সঙ্গে বাবার পরিচয় ঘটল। সে সময় রোটেনস্টাইন যাদের ছবি এঁকেছেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটা তাঁর স্টুডিওতেই সেরে ফেলা হতো। তিনি ছবি আঁকতেন, আর বাবা ছবি আঁকানোর জন্য বসে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে কথাবার্তা সেরে নিতেন। বিখ্যাত লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার সঙ্গে সে স্টুডিওতেই বাবার পরিচয় হয়েছিল। অবশ্য লরেন্স তখনও অত বিখ্যাত হননি। বৃটিশ সরকার সে সময় রোটেনস্টাইনকে হাউস অব কমন্সের জন্য ভারতীয় দৃশ্যের কয়েকটি বড় আকারের ছবি এঁকে দেয়ার কাজ দেয়। এগুলোর মধ্যে বেনারস ঘাটের ছবিও ছিল। ঘাটে দাঁড়ানো মানুষ আঁকার জন্য তিনি মডেল খুঁজছিলেন। শান্তিনিকেতনের কালীমোহন ঘোষ এ সময় ইংল্যান্ডে ছিলেন। এ কাজের জন্য তাঁকেই রোটেনস্টাইনের বিশেষভাবে মনে ধরে।
লন্ডন তখন ইংল্যান্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। আর হ্যাম্পস্টিড হিথ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আনাগোনামুখর। সমাজে ভিক্টোরিয়ান যুগের রেশ চলছে। চারদিকে তখনও বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা, শৈল্পিক উদ্দীপনা, মোটের ওপর আশাবাদ বিরাজমান। ইংরেজরা ভাবছে পৃথিবীর ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব তাদের। মনে হচ্ছিল সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাসমূহকে অবিচল আস্থা, এমনকি আত্মতুষ্টির সঙ্গে মোকাবেলা করা হচ্ছে। পৃথিবীটা যেন তাদেরই, আর তা শীঘ্রই স্বর্গে পরিণত হতে চলেছে। নিঃসন্দেহে এ স্বপ্ন ছিল কল্পনানির্ভর। এটা যে কতটা অবাস্তব ছিল অতি শীঘ্রই তা বোঝা গিয়েছিল। যতই অলীক হোক, একে সামনে রেখেই ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা এমন উৎসাহ ও প্রাবল্যের সঙ্গে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন যে তাঁদের প্রশংসা না করে পারা যায় না।
এরই মধ্যে এল সেই ঐতিহাসিক সন্ধ্যাটা। রোটেনস্টাইনের বাসার ড্রয়িংরুমে আর্নেস্ট রিজ, অ্যালিস মেইনেল, হেনরি নেভিনসন, এজরা পাউন্ড, মে সিনক্লেয়ার, চার্লস ট্রেভেলিয়ান, সিএফ এন্ড্রুজ এবং অন্যরা সমবেত হয়েছেন। তাঁদের সামনে ইয়েটস মন আবেশ-করা সুরেলা গলায় গীতাঞ্জলি থেকে একের পর এক আবৃত্তি করে গেলেন। পড়া শেষ হলে দেখা গেল কারও মুখে কোনো কথা নেই, চারপাশে প্রায় কষ্টকর নীরবতা। পরদিন বন্যার মত প্রশংসাসূচক চিঠি আসা শুরু হল। এরই জের ধরে লন্ডনস্থ ইন্ডিয়া সোসাইটি বইটির একটি সুদৃশ্য সংস্করণ বের করল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সব কপি নিঃশেষ হয়ে গেল। এমনকি কোথাও কোথাও তা উচ্চমূল্যেও বিক্রয় হল। ইংরেজরা বাবাকে সেযুগের একজন প্রধান কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিল।[৬] এ কাহিনি হয়ত সকলেরই জানা। তবু এখানে সিএফ এন্ড্রুজ-এর অনুভূতি উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি লিখলেন:
হ্যামস্টেড হিথ-এর পাশ ঘেঁষে আমি আর এইচডব্লিউ নেভিনসন হাঁটছিলাম। কথা বলছিলাম না কেউই। আমি একা হতে চাইছিলাম। যা শুনে এলাম তার আশ্চর্য মাহাত্ম্য নিয়ে নীরবে চিন্তা করতে চাইছিলাম। নেভিনসনকে ছেড়ে হিথ পার হয়ে চলে এলাম। আকাশ ছিল মেঘমুক্ত, সেখানে যেন ভারতীয় বেগুনি রঙের মত একটা আভা ছড়িয়ে ছিল। সেখানে আমি পুনরায় কবিতাগুলোর আশ্চর্য আবেশ নিয়ে একাকী ভাববার সুযোগ পেলাম: এর ইংরেজিটা ছিল বড় সহজাত, বড় সুরেলা। শৈশবের সুমধুর ধ্বনির মত এ আমাকে অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আমি গভীর রাত পর্যন্ত, বলতে গেলে প্রায় ভোরবেলা পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে কাটিয়ে দিলাম।
আমরা যে কক্ষটিতে বসে কবিতাগুলো শুনছিলাম তা যেন নিচের লন্ডন নগরীর রাতের আলোকমালার দিকে তাকিয়েছিল… গ্রীষ্মের প্রলম্বিত সন্ধ্যায় জানালার পাশে বসে শুনছিলাম একের পর এক টেগোরের কবিতা পড়া হচ্ছে… আমার মনে পড়ে সে রাতে চলে আসবার সময় আমি কতই না সুখী হয়েছিলাম! তাঁর কবিতার নতুন মদ আমাকে মাতাল করে দিয়েছিল। এর আগে তাঁর কেবল ছিটেফোঁটা কিছু কবিতা দেখেছিলাম। এ আবৃত্তির অনুষ্ঠানে যা শুনলাম তা আমাকে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ প্রতিভা বুঝতে সহায়তা করল, অকৃত্রিম ও নির্ভেজালভাবে। এ যেন অনেকটা কিটসের অভিজ্ঞতার মত, যখন তিনি প্রথমবার চ্যাপম্যানের অনুবাদে হোমার পড়েছিলেন—
Then felt I like some watcher of the skies
When a new planet swims into his ken.
ইয়েটস কর্তৃক বাবার কবিতা আবৃত্তির পর যে অগণিত প্রশংসাসূচক চিঠি এসেছিল, তাদের থেকে মাত্র একটি নিচে তুলে ধরছি। সে সময়কার খ্যাতিমান লেখক মিজ মে সিনক্লেয়ার এটি লিখেছিলেন—
প্রিয় মি. টেগোর,
গতরাতে আপনার কবিতা সম্পর্কে কিছু বলতে পারিনি, কেননা, এগুলো ছিল এমন ধরনের যেগুলো সম্পর্কে চট করে কোনো মতামত দেয়া যায় না। কিন্তু আজ আমি বলতে পারি, এগুলোর রেশ কোনো দিনই আমার মন থেকে মুছে যাবে না, এমনকি আর যদি কখনও না-ও শুনি, তবু। এমন নয় যে এগুলো কেবল পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের আধার বা নিখাদ কবিতা। এর বাইরেও এগুলো আমার জন্য এমন স্বর্গীয় উপহার বয়ে এনেছিল যা আমি কেবল আলোর ঝলকানির মত হঠাৎ হঠাৎ অনুভব করতে পারি, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না। আমি জানি না অন্যের চোখ দিয়ে দেখা সম্ভব কি না। তবে এটা জানি যে অন্যের স্থির বিশ্বাস দেখে নিজে বিশ্বাস করা সম্ভব।
আপনি যা লিখেছেন তার সঙ্গে কেবল কবি সেন্ট জন অব দ্য ক্রশ-এর দি ডার্ক নাইট অব দ্য সউল-এরই তুলনা চলে। পরম অতীন্দ্রিয় অন্তর্দৃষ্টির দিক থেকে বিবেচনা করলে আপনি তাঁকেও ছাড়িয়ে গেছেন, ছাড়িয়ে গেছেন আমার জানা সকল ভাববাদী ক্রিশ্চিয়ান কবিকেই। এ দ্যোতনা ক্রিশ্চিয়ান ভাববাদে প্রায় সম্পূর্ণতই অনুপস্থিত। ক্রিশ্চিয়ান ভাববাদ বড় বেশি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কল্পনানির্ভর, এটি যথেষ্ট খাঁটি নয় এবং জীবনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো ধারণ করতেও সক্ষম নয়—এবং যাকে বলে জগতের মায়াকে ভেদ করে সত্যিকারের দেখা, তাও এর ক্ষেত্রে নেই। ফলে এর আবেদন পুরোপুরি পূতপবিত্র হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্তত আমার সবসময় তাই মনে হয়েছে। এ ত্রুটি ধরতে পারার কারণেই বোধহয় তা আমাকে সম্পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি।
অবশেষে গতরাতে আমি সে বিশুদ্ধ তৃপ্তি পেলাম আপনার কবিতার মধ্যে। চরম উৎকর্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আপনি আমাদের ভাষায় এমন কিছু যোগ করেছেন যা কেবল ইংরেজিতে কেন, কোনো পশ্চিমা ভাষায়ই আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি।
আমি এটা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে আসছে হেমন্তে এ কবিতাগুলো এখান থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।
শ্রদ্ধার সঙ্গে,
আপনার একান্ত
মে সিনক্লেয়ার
ইতোমধ্যে আমরা হোটেল থেকে চলে গিয়েছিলাম। নতুন নিবাস সাউথ কেনসিংটনে দুই বেলজিয়ান সহোদরা পরিচালিত একটি বোর্ডিং হাউজে। খাওয়া বলতে ছিল গরুর মাংসের রোস্ট, সেদ্ধ বাঁধাকপি, ইয়র্কশায়ার পুডিং আর বঁইচি ফলের মত একজাতের ফলের চাটনি। একঘেয়ে ঠেকলেও এগুলোই ছিল হোটেলগুলোর নিয়মিত পরিবেশনা। নতুন জায়াগাটা ছিল ক্রমওয়েল রোডে অবস্থিত ভারতীয় ছাত্রদের হোস্টেলের বেশ কাছে। এর ফলে তারা সহজেই বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারত। এদের মধ্যে অনেকেই জীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছে। সময়টাকে প্রাণবন্ত করে রেখেছিলেন সুকুমার রায়। পেশাগত দিক থেকে তিনি ছিলেন প্রসেস এনগ্রেভার। কিন্তু তাঁর বড় পরিচয় একজন সুরসিক লেখক হিসেবে। এটা দুঃখজনক যে আজ আর তিনি আমাদের মাঝে নেই।
লন্ডনে রোটেনস্টাইন পরিবার ছাড়া আরও ছিল হ্যাভেল পরিবার। মি. হ্যাভেল কোলকাতার আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন। আমার চাচাত ভাই অবনীন্দ্রনাথের গুরুও ছিলেন তিনি। ডেনমার্কের লোক হলেও অবসর গ্রহণের পর থেকে তিনি লন্ডনেই বসবাস করছিলেন। ইতোমধ্যে এখানে তিনি ভারতীয় শিল্পকলার বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। মূলত তাঁর উদ্যোগেই লন্ডনে ইন্ডিয়া সোসাইটি গড়ে উঠেছিল এবং আমার যদি ভুল না হয়, তিনিই ছিলেন এর প্রথম সম্পাদক। এ সংগঠন প্রতিষ্ঠার পিছনে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইংল্যান্ডে ভারতীয় শিল্পকলাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা এবং ভারতীয় শিল্পীদেরকে কাজ দেয়ার ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া অফিসের সমর্থন আদায় করা। এ সময়েই একটা বিশেষ সুযোগ এসে গেল। তখন নতুন দিল্লি গড়ে তোলার আয়োজন চলছে। হাভেল মনে করতেন যে ভারতীয় শিল্পকলার রীতি অনুসারে ভারতীয় শিল্পীদের দ্বারাই এর পরিকল্পনা করা উচিত। দিল্লি যেন একটা হাইব্রিড নগরে পরিণত না হয় সে বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ইন্ডিয়া সোসাইটির মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজের উৎসাহ আর উদ্যমের জন্যই বুঝিবা হাভেল ইংরেজদের ব্যবসায় প্রবণতার ব্যাপারটি হিসেবে ধরেননি। স্যার এডওয়ার্ড লুটেইনস-এর নেতৃত্বে প্রবল বিরুদ্ধশক্তি দাঁড়িয়ে গেল। যে উইলিয়াম রোটেনস্টাইন ভারতীয় শিল্পকলার ভক্ত ছিলেন, সেই তিনিও হাভেলকে সমর্থন করলেন না। সমর্থন করলেন উল্টো পক্ষকে। ফলে ইন্ডিয়া সোসাইটি দুভাগ হয়ে গেল এবং এর পর থেকে নেহাৎই ইন্ডিয়া অফিসের আজ্ঞাবহে পরিণত হল। এর প্রতিবাদে হাভেল সোসাইটির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেন, কিন্তু তাতে কারোরই কোনো ভাবান্তর হয়েছে বলে মনে হল না।
এ সময় লন্ডনের শিল্পীদের সমাজে, ঠিক বোহেমিয়ান না হলেও তাদের নিজস্ব ধারার জীবনযাত্রায় বিশেষ আকর্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছিলেন আনন্দ কে. কুমারস্বামী। ছবির মত চেহারার এ মানুষটি অধিকাংশ সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন। এ ধরনের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য তাঁকে প্রায়ই আমন্ত্রণ জানানো হতো। তিনি কথা বলতে পারতেনও বটে—শিল্প সংক্রান্ত যেকোনো বিষয়ে, সাবলীল আর মনকাড়া ভঙ্গিতে। অবশ্য বাগ্মিতার চেয়েও তাঁর লম্বা আর সুন্দর দেহসৌষ্ঠবের আকর্ষণই বোধহয় বেশি ছিল।[৭]
উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস ছিলেন এরকম আরেকজন, যিনি আসরের সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হতেন। জনতার ভিড়েও তাঁর আলাদা ব্যক্তিত্ব বজায় থাকত, যদিও কোনো রকমের নাক উঁচু বা অহমিকা ভাব তাঁর ছিল না। এটাই ছিল তাঁর বড় বিশেষত্ব। প্রথম দেখা হবার দিনে আমিও তাঁর এ নিরাসক্ততার পরিচয় পেয়েছিলাম। কোনো একজনের ড্রয়িংরুমে তাঁকে দেখেছিলাম, কিন্তু এগিয়ে গিয়ে কথা বলতে সাহস পাইনি। অচিরেই তাঁকে বেশ ভালো করে জানার সুযোগ ঘটল। তাঁর ভদ্রোচিত আচরণ আমাকে মোহিত করল। তিনি ওবার্ন প্লেসে এক মুচির দোকানের উপরের একটি চিলেকোঠায় থাকতেন। জায়গাটা ছিল রাসেল স্কয়ারের কাছেই। বন্ধু কালীমোহন ঘোষকে সঙ্গে নিয়ে আমি প্রায়ই সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। নীরব-নির্জন বাসায় ভূত আর প্রেতাত্মাদের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক রাত অবধি আলোচনা হতো। আমরা এ ধারণা নিয়ে ফিরতাম যে ইয়েটস এক কল্পনার জগতে বাস করছেন, যে জগৎ তাঁর নিজের কাছে হয়ত বাস্তব বলে বোধ হতো। বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো যে তিনি একজন পশ্চিমা জগতের মানুষ।
একদিন আমাদের অবাক করে দিয়ে সাউথ কেনসিংটনের বাসায় স্যার অলিভার লজ বাবার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। আমি খুব মজা পেলাম যখন দেখলাম এ বিখ্যাত বিজ্ঞানীও বাবাকে ভারতবাসীদের পুনর্জন্মে বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করছেন। তিনি ততদিনে বিজ্ঞানে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং সম্পূর্ণভাবে অধ্যাত্মবাদে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
আরেকজন অতিথি ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনিও হঠাৎ এসেছিলেন আগে থেকে জানান না দিয়ে। এর আগে বাবা কোনোদিন তাঁকে দেখেননি। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিলেন। জানালেন যে বাবার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য সুদূর ক্যামব্রিজ থেকে এখানে এসেছেন। এর পর আর কোনো আলাপচারিতায় না গিয়ে বাবাকে প্রশ্ন করে বসলেন, “টেগোর, বলুন তো সৌন্দর্য আসলে কী?” প্রশ্নটা এতই আচমকা ছিল যে বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর সৌন্দর্য সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণা ব্যাখ্যা করলেন। এ বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা আরও পূর্ণতা লাভ করে পরবর্তীতে ক্রিয়েটিভ ইউনিটি নামক বইয়ের ‘হোয়াট ইজ আর্ট’ নামক প্রবন্ধে রূপ পেয়েছে। আমি জানি না বাবার ব্যাখ্যা রাসেলকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল কি না। কেননা, তিনি যেমন আচমকা এসেছিলেন তেমনি আচমকা চলে গিয়েছিলেন।[৮]
বাবা যখন নতুন নতুন ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন, কালীমোহন ঘোষ আর আমি মূলত দুজন কবির সঙ্গে আমাদের অবসর সময় কাটাতাম। এরা হলেন ইয়েটস আর এজরা পাউন্ড। এজরা পাউন্ড ছিলেন একেবারে আলাদা এক জাতের। তিনি কবিতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এ বিষয়ে সচেতন থাকতেন আর খুব গর্ব অনুভব করতেন যে অন্য কবিদের থেকে আলাদা কাব্যরীতির জন্ম দিতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে তাঁর মধ্যে প্রদর্শনপ্রিয়তা ছিল, তা সত্ত্বেও তাঁকে আমাদের ভালো লেগেছিল। সম্ভবত মার্কিন নাগরিক বলেই তাঁর ব্যবহার ছিল নিঃসঙ্কোচ ও উষ্ণ, যদিও নিজের জাতীয়তা নিয়ে তাঁর কোনোরূপ অহঙ্কার ছিল না। তিনি বাবার অনুসারী হয়ে গেলেন এবং তাঁকে গুরুর মত দেখতে শুরু করলেন।
সমসাময়িক ইংরেজ লেখকদের মধ্যে বাবা বিশেষভাবে পছন্দ করতেন ডব্লিউএইচ হাডসন-এর লেখা। আমার বোন ও আমি যখন সবেমাত্র ইংরেজি বুঝতে শিখেছি তখনই তিনি আমাদেরকে হাডসনের ভ্রমণকাহিনি থেকে পড়তে দিতেন। তাঁর প্রিয় দুটি বই ছিল দি নেচারেলিস্ট ইন লা প্লাটা এবং গ্রিন ম্যানসনস। রোটেনস্টাইনও হাডসনের লেখা পছন্দ করতেন। কাজেই তাঁর সঙ্গে সহজেই একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়ে গেল। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না। ফিরে এসে বাবা তাঁর সম্পর্কে এমন একটি ঘটনার কথা বললেন, যা থেকে তাঁর লেখায় বিদ্যমান প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণ বোঝা গেল। হাডসন সংগীত পছন্দ করতেন। সংগীতপ্রীতির কারণেই তিনি একজন বেহালাবাদককে বিয়ে করেন। তিনি তন্ময় হয়ে তার বেহালা শুনতেন। কিন্তু বিয়ের পর তাঁর স্ত্রী বেহালা ছুঁয়েও দেখতেন না। হাডসন সাংঘাতিকভাবে আশাহত হন। এর মধ্যে স্ত্রী চলাফেরায় অক্ষম হয়ে পড়েন। আগে যতই দুঃখ পেয়ে থাকেন না কেন বছরের পর বছর ধরে তিনি গভীর মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে চলৎশক্তিহীন স্ত্রীর সেবা-যত্ন চালিয়ে গেছেন। প্রিয় মানুষটির কাছ থেকে যে ভালোবাসার প্রতিদান তিনি পাননি, তা-ই হয়ত পরবর্তীতে বুনো প্রকৃতির প্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে। হাডসনকে ব্যক্তিগতভাবে জানতে পেরে তাঁর প্রতি বাবার মুগ্ধতা আরও বেড়ে গিয়েছিল।
এক সন্ধ্যায় মিজ মে সিনক্লেয়ার আমাদের নেমন্তন্ন করেছিলেন। খ্যাতিমান লেখকদের বড় আকারের জমায়েতই ছিল ওটা। বাবা বসেছিলেন বার্নার্ড শ’র পাশে। টেবিলের চারপাশ ঘিরে প্রতিভাদীপ্ত কথোপকথনের ঝলকানি চলছিল। কিন্তু শ’ বলতে গেলে কোনো কথাই বলেননি। এতে সবাই খুব অবাক হয়েছিলেন। বাবাই কথা বলে যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ আমাদেরকে জানিয়েছিলেন যে এর আগে কোনো জমায়েতেই শ’ এতটা নীরবতা পালন করেননি। আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ ঘটেছিল কুইন’স হলে। সেখানে আমরা হেইফিটজ-এর বেহালা শুনতে গিয়েছিলাম। কনসার্ট শেষে বের হবার পথে জটলার মধ্যে কে একজন বাবাকে ধরে তার নিজের দিকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে চিনতে পারছেন কি? আমি বার্নার্ড শ’-এ কথা বলেই তিনি হাঁটা ধরলেন।
নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন তখন চরমে উঠেছে। আমার স্ত্রীও এ বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন এবং বেশ কয়েকটা সভায় যোগ দিয়েছিলেন। একদিন এমনি এক সভা থেকে তাঁর ফিরতে দেরি হচ্ছিল। আমরা এ কথা ভেবে একটু শঙ্কিত হয়ে উঠলাম যে তিনিও দোকানের কাচ ভাঙায় অংশ নিয়েছেন কি না এবং সেজন্য গ্রেফতার হয়েছেন কি না। শেষ পর্যন্ত তিনি বাসায় ফিরলেন এবং শ’ সম্পর্কে আরেকটা মজার ঘটনা বললেন। এটা থেকে শ’র চরিত্র সম্পর্কে কিছুটা ধারণা করা যাবে। সকলেই জানত যে শ’ এ আন্দোলনের একজন কড়া সমর্থক ছিলেন। সেদিন খুব সকালে এক অপরিচিত ব্যক্তি অ্যাডেলফি টেরেসে এসে শ’র ঘুম ভাঙায় এবং তাঁকে বলে যে তক্ষুণি একশত পাউন্ড দিতে হবে। নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় মিজ প্যাংকহার্স্ট গ্রেফতার হয়েছেন এবং তাঁর জামিনের ব্যবস্থা করতে টাকাটা লাগবে। শ’ সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দিলেন। পরবর্তীতে জানা গেল যে গ্রেফতার হবার ব্যাপারটা ডাহা মিথ্যা। শ’ প্রতারিত হয়েছেন। তিনি অবশ্যি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন, ‘লোকটা নিশ্চয়ই এ টাকা পাবার যোগ্যতা রাখে। সে তো এ কথা প্রমাণ করতে পেরেছে যে ইংল্যান্ডে অন্তত একজন হলেও বার্নার্ড শ’র চেয়ে চতুর ব্যক্তি আছে।
আর্নেস্ট রিজ[৮]-এর সঙ্গে বাবার প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ডেন্টস থেকে ফেরার পথে তিনি প্রায়ই আমাদের বাসায় উঠতেন এবং জম্পেশ রকমের দাড়ির আড়ালে ঢেকে যাওয়া চোয়ালে বিশাল হাসি ফুটিয়ে গল্প করতে লেগে যেতেন। সাহিত্যের ওপর তাঁর দখল কেবল অভিধানের সঙ্গেই তুলনীয়। আর বিচারক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তাঁর বাসা ছিল গোল্ডার্স গ্রিনে, সাদামাটা কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজানো। আমরাও প্রায়ই সেখানে যেতাম, আর বাগানে বসে ‘শরবত’-এ চুমুক দিতে দিতে তাঁর পিয়ানো শুনতাম। পরম দরদ দিয়ে তিনি তা বাজাতেন। মিসেস রিজ ছিলেন অত্যন্ত অতিথিবৎসল একজন নিবেদিতপ্রাণ গৃহিণী। এ দম্পতির চমৎকার একজোড়া সন্তান ছিল। দেখা যেত এদের পুরো পরিবারটি বাবাকে ঘিরে ধরে গীতাঞ্জলি থেকে গাইতে অনুরোধ করছে। তাঁরা ছিল ওয়েলস-এর লোক। দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করা সত্ত্বেও তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য একটুও লোপ পায়নি। সংগীত ছিল এদের মজ্জায়, ফলে বাবার গান বিদেশি সুরের হলেও তা বুঝতে তাঁদের কষ্ট হয়নি। ড. ওয়ালফোর্ড ডেভিস ছিলেন এ পরিবারের বন্ধু। তিনি বাবার কাছ থেকে বাংলা সুর টুকে নিয়ে যেতেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেও একজন সংগীত রচয়িতা হয়েছিলেন।
থমাস স্টার্জ মুরকে[১০] বাবা যখন প্রথম দেখেন তখন মুর তরুণ কবি। কবি হিসেবে তিনি কখনোই খ্যাতি অর্জন করতে বা প্রথম কাতারে গণ্য হতে পারেননি। তথাপি তাঁর ছন্দচেতনা ও শব্দ চেনার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। গীতাঞ্জলির পর যে সকল গ্রন্থ বের হয়েছিল, সেগুলোর জন্য কবিতা নির্বাচন ও কোন কবিতার পর কোন কবিতা দেবেন সে বিষয়ে বাবা প্রায়ই তাঁর সঙ্গে আলাপ করতেন। তাঁকে ইংরেজদের মত দেখাত না। চিন্তাধারা ও দেহসৌষ্ঠবে তাঁকে বরং ফরাসি হিসেবেই বেশি মানাত। তাঁর স্ত্রী বাবার দি ক্রিসেন্ট মুন নামক বইটি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন।
একসময় আমাদের লন্ডনবাসের মেয়াদ ফুরিয়ে এল। ইয়েটসের নেতৃত্বে শিল্প-সাহিত্য জগতের এক দল মানুষ আমাদের বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করে। এটা ঘটেছিল ট্রোকাডেরো রেস্টুরেন্টে। ইয়েটস এদিনও গীতাঞ্জলি থেকে পাঠ করলেন। এবারে অবশ্য শ্রোতা বেশি ছিল—সেটা তাঁদের সংখ্যা ও বিভিন্ন ঘরানার প্রতিনিধিত্ব, এ উভয় বিবেচনাতেই। রাতের খাওয়ার পর অনেকেই বক্তৃতা করলেন, যেগুলোর অধিকাংশ ছিল বিভিন্ন সাহিত্যিক ঘরানার নেতৃবৃন্দ কর্তৃক প্রশংসাবাণী। জবাব দিতে উঠে বাবা এ পর্যন্ত অপ্রকাশিত কয়েকটা কবিতা শোনালেন। সবশেষে তিনি বাংলায় বন্দে মাতরম গাইলেন। এসময় প্রত্যেকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করল এবং গান শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকল।
*
১. শ্রমিক দলের নেতা, ১৯২৪ সালে এবং ১৯২৯-৩১ মেয়াদে শ্রমিক দলের নেতা হিসেবে আর ১৯৩১-৩৫ মেয়াদে জাতীয় সরকারের প্রধান হিসেবে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯০৯ সালের অক্টোবরে প্রথমবার সস্ত্রীক কোলকাতায় আসেন। এ সময়েই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অবগত হন।
২. বাংলা গীতাঞ্জলিতে মোট গান আর কবিতার সংখ্যা ১৫৭ আর ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে ১০৩। এর মধ্যে বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে নেয়া হয়েছে ৫৩টি, গীতিমাল্য থেকে ১৬টি, নৈবেদ্য থেকে ১৫টি, খেয়া থেকে ১১টি, শিশু থেকে ৩টি, কল্পনা থেকে ১টি, চৈতালী থেকে ১টি, উৎসর্গ থেকে ১টি, স্মরণ থেকে ১টি এবং অচলায়তন থেকে ১টি।
৩. উইলিয়াম রোটেনস্টাইন (কেউ কেউ রোটেনস্টাইনও লিখেন)। বৃটিশ চিত্রকর। ১৯১১ সালের জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ পর্যন্ত তিনি কোলকাতায় ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে জোড়াসাঁকোতে তাঁদের দেখা হয়।
৪. জন মেসফিল্ড (১৮৭৮-১৯৬৭)। ইনি ১৯৩০ সাল থেকে আমৃত্যু যুক্তরাজ্যের রাজকবি ছিলেন।
৫. মরমীয়াবাদের উপর বিভিন্ন গ্রন্থের লেখক। তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় সম্ভবত রোটেনস্টাইন নয়, যে সিনক্লেয়ার-এর মাধ্যমে।
৬. ১৯১২ সালের ১ নভেম্বর ইন্ডিয়া সোসাইটি গীতাঞ্জলির ৭৫০ কপির সংস্করণ প্রকাশ করে। এর কয়েক মাস পর ম্যাকমিলান অ্যান্ড কোম্পানি ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে এর একটি নতুন সংস্করণ বের করে। রবীন্দ্রনাথ এতটাই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন যে পরবর্তী আট মাসে এটি ১০ বার পুনর্মুদ্রিত হয়।
৭. পুরো নাম আনন্দ কেন্টিস কুমারস্বামী (১৮৭৭-১৯৪৭)। শ্রীলংকান তামিল। ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পকলার বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। এ বিষয়ে তাঁর একাধিক গ্রন্থ রয়েছে।
৮. বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে আদৌ এ সাক্ষাৎকারটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না, এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে। ১৯৬০ সালে রথীন্দ্রনাথের এ বিবরণটি রাসেলকে দেখালে তিনি বলেন যে তিনি কখনোই নিজ থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে যাননি। আর রথীন্দ্রনাথ কবির সঙ্গে তাঁর আলাপের যে বিবরণ দিয়েছেন, সে ধরনের আলাপের কথাও তিনি মনে করতে পারেননি। অবশ্য রাসেল নিজেও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপের বিষয়ে সবসময় সঠিক তথ্য দেননি। তাঁদের মধ্যে কয়েকবার দেখা হয়েছিল।
৯. কবি, Everman’s Library-র সম্পাদক হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাঁর আরেক পরিচয়, তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবন নিয়ে লেখা প্রথম গ্রন্থ Rabindranath Tagore: A Biographical Study-এর লেখক। বইটি ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এর আগে এমনকি বাংলা ভাষায় ও রবীন্দ্রনাথের জীবনীমূলক গ্রন্থ বের হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর Sadhana – The Relation of Life গ্রন্থটি আর্নেস্ট রিজকে উৎসর্গ করেন।
১০. তিনি রয়্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন। রয়্যাল সোসাইটির সদস্য হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার জন্য তিনিই সুইডিশ একাডেমিতে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ রয়্যাল সোসাইটির মনোনয়ন পাননি, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছিলেন মার্কিন সাহিত্যিক টমাস হার্ভিকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর The Crescent Moon গ্রন্থটি স্টার্জ মুরকে উৎসর্গ করেন।
