মার্কিন মুলুকে
কুয়াশার রাজত্বের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের শীতকালটা কেটে গেল। অক্টোবরে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে পাড়ি জমালাম। এখানে বাবা সম্পূর্ণ আলাদা আর তরতাজা একটা পরিবেশ পেলেন।
আমি বাবাকে ইলিনয়ে অবস্থিত আমার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আরবানাতে যেতে ও কয়েক মাস থাকতে রাজি করাতে পারলাম। ভেবেছিলাম, এতে হয়ত আমার ডক্টরেটের কাজ এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ঘটবে। আমার কলেজের খুব কাছেই একটা বাড়ি পেয়ে গেলাম ও আমরা সেখানে ডেরা বাঁধলাম। আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করলাম যে বাবা খুব দ্রুত লেখালেখি শুরু করে দিলেন। আমি জানতাম যে একবার লেখার টেবিলে থিতু হয়ে গেলে তিনি আর নড়তে চাইবেন না। সেই সুযোগে আমি লম্বা সময় ইউনিভার্সিটিতে কাটাতে পারব আর আমার থিসিস-এর কাজ শেষ করে ফেলতে পারব। আমেরিকায় ঘর গোছানো বড় সহজ কাজ নয়। আমার স্ত্রী এর আগে কখনও এখানে আসেননি। তাঁকে বেশ কঠিন একটা সময় কাটাতে হল। অবশ্য তিনি আরও দুজনের সাহায্য পেয়েছিলেন। এদের একজন শান্তিনিকেতনের সাবেক শিক্ষক বঙ্কিম রায়, আর অন্যজন শান্তিনিকেতনেরই ছাত্র সোমেন্দ্র দেব বর্মন। এছাড়া সেমুর্স পরিবারের লোকজনও আমাদের অনেক উপকার করেছিলেন।
বাবা এ সময় সাধনা লিখছিলেন। একেকটা অধ্যায় লেখা হলেই আমাকে তার টাইপ করার ব্যবস্থা করতে হতো। কিন্তু যেহেতু প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু সংযোজন-বিয়োজন চলত, টাইপিং-এর ব্যাপারটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াল। আমরা সঙ্গে যে পরিমাণ টাকাকড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে ওটা পোষাত না। কাজেই একটা বহনযোগ্য টাইপরাইটার কিনে ফেলা হল এবং আমি নিজেই টাইপ করে দিতে লাগলাম। আমাকে এতবার টাইপ ও পুনটাইপ করতে হল যে প্রায় গোটা বইটাই মুখস্থ হয়ে গেল। স্থানীয় ইউনিটারিয়ান চার্চের পাদরি ছিলেন হার্ভার্ড থেকে পাস করা। আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এই ছোট শহরের অন্য অধিবাসীদের তুলনায় তাঁর মন-মানসিকতা ছিল অনেক উদার প্রকৃতির। চার্চে গিয়ে নির্বাচিত কিছু শ্রোতার সামনে এই সকল লেখা থেকে পড়ে শোনাবার জন্য তিনি বাবাকে প্রায়ই অনুরোধ করতেন। শ্রোতাদের নিকট থেকে উৎসাহ পেয়ে বাবা একেক করে প্রত্যেকটি অধ্যায়ই পড়ে ফেললেন। সাধনা লিখতে পেরে তিনি খুশি হয়েছিলেন। কেননা, এর প্রত্যেকটি অধ্যায়কেই পৃথক ডিসকোর্সের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
কিন্তু আরবানার মত একটি প্রাদেশিক বিরান ভূমি কি বাবাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারে? তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। এ লক্ষণগুলো আমি ভালোই জানতাম।
তিনি তাঁর লেখা সম্পন্ন করেছেন। তাঁর মতে, এগুলো হল পশ্চিমের প্রতি ভারতের বার্তা। কাজেই তিনি এগুলো অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন। সৌভাগ্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় জমায়েতে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ আপনাআপনিই এসে গেল। দ্য ফেডারেশন অব রিলিজিয়াস লিবারেলস রোচেস্টারে একটি সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছিল। বাবা সেখানে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেলেন। জাতিগত সংঘাতের ওপর সেখানে প্রদত্ত বাবার বক্তৃতা বেশ প্রশংসা অর্জন করল। জার্মানির বিদগ্ধ দার্শনিক ডক্টর রুডলফ ইউকেন এ কংগ্রেসে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বাবার দেখা হল। তাঁরা দুজন নানা বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে কথা বললেন।
এর পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ আসতে থাকল। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সিরিজ বক্তৃতা আয়োজনের কাজে আমাকে শিকাগো যেতে হল। সেখানে আমি প্রথমবারের মত মিসেস উইলিয়াম ভন মুডির[১] সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনি ছিলেন কবি মুডির স্ত্রী। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বাবাকে আতিথ্য দিলেন। এ যোগাযোগের পরিণামে সযত্নলালিত এক দীর্ঘ বন্ধুত্বের সূচনা হল যা ভদ্রমহিলার মৃত্যু পর্যন্ত অটুট ছিল। তাঁর গৃহ ভাবীকালের অনেক শিল্পীর আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। বিদেশ থেকে যেসব খ্যাতিমান ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যেতেন, তাদের কাছেও বাড়িটি ছিল অন্যতম আকর্ষণের বস্তু।
শিকাগোর পর সিরিজ বক্তৃতার আমন্ত্রণ এল হার্ভার্ড আর নিউইয়র্ক থেকে বুঝতে পারলাম যে আরবানার ক্যাম্প গুটানোর সময় এসেছে। এও বুঝতে পারলাম যে স্নাতকোত্তর পড়াশুনার পাটও বুঝি এখানেই চুকল। অবশ্য এর জন্য আমি দুঃখ পাইনি।
১৯১৩ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি আমরা পুনরায় ইংল্যান্ডে ফিরে এলাম এবং সেখান থেকে একই বছর সেপ্টেম্বরের ৪ তারিখ ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করলাম।
*
১. রবীন্দ্রনাথ খ্যাতনামা কবি-নাট্যকার ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উইলিয়াম তন মুডির স্ত্রী হ্যারিয়েট মুডির শিকাগোর বাড়িতে প্রথমবার আতিথ্য নেন ১৯১৩ সালের জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে। তিনি পরে আরও কয়েকবার তাঁর অতিথি হন। কবি তাঁকে Chitra (১৯১৩) গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন। আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে তাঁর শেষ জীবন দুঃখ-দৈন্যের মধ্যে কাটে। রবীন্দ্রনাথ যখন শেষবার যুক্তরাষ্ট্রে যান, তখন মিসেস মুডির অবস্থা শোচনীয়, কিন্তু কবির সঙ্গে তাঁর কোনোরূপ যোগাযোগ হয়েছে, এমন কোনো তথ্য মেলে না।
