বাবার বিদেশ ভ্রমণসমূহ
বাবা ছিলেন এক অদম্য পথিক। এমনকি জীবনের শুরুর দিকেও তিনি বেশিক্ষণ ঘরে থাকতেন না। তখন অবশ্যি তাঁকে ভারতের ভিতরে ঘোরাঘুরি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ব্যতিক্রম কেবল দুবার ইংল্যান্ড গমন। প্রথমবার তিনি গিয়েছিলেন আমার জন্মেরও বহু আগে। দ্বিতীয়বার যান ১৮৯০ সালে, আমি যখন কেবল শিশু, সবার কোলে কোলে ঘুরছি। পরবর্তী জীবনে ইউরোপের বেশির ভাগ যাত্রায় এবং একবার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকালে আমি ও আমার স্ত্রী সঙ্গে ছিলাম। যতদূর মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে আমাদের ভ্রমণের বছরগুলো ছিল ১৯১২, ১৯২০, ১৯২৪, ১৯২৬ এবং ১৯৩০ সাল। ১৯৩২ সালে তিনি পারস্য ও মেসোপটেমিয়া যান। সেবারে কেবল আমার স্ত্রী সঙ্গী হয়েছিল। স্বাস্থ্য ভালো না থাকায় আমি সঙ্গে যেতে পারিনি। আমাদেরকে সঙ্গে নিয়ে করা ভ্রমণ ছাড়াও অন্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে বাবা দূরপ্রাচ্য ও দুই আমেরিকা মহাদেশে অনেকবার গিয়েছিলেন। রাশিয়া ভ্রমণের সময়ও আমরা তাঁর সঙ্গী হতে পারিনি।
ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ ও ফলস্বরূপ নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির কারণে বাবার ১৯১২ সালের ইংল্যান্ড ভ্রমণ স্মরণীয় হয়ে আছে। ইউরোপের পরবর্তী সফর ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপর, ১৯২০ সালে। ১৯২০ ও ২১–এ দুবছর আমরা ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ ভ্রমণ করেছিলাম, আর আমেরিকায় একটা দীর্ঘ শীতকাল কাটিয়েছিলাম। সত্যি বলতে কি এবারই আমরা ভালো করে বহির্বিশ্বের সত্যিকারের রূপটা বুঝতে পেরেছিলাম। ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ সভ্যতার ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল। লোকের মনে সে ভয়াবহ স্মৃতি তখনও টাটকা। জীবন পুনর্গঠনের জন্য মরিয়া পশ্চিমের মানুষেরা দিশা খুঁজে পাবার প্রত্যাশায় প্রাচ্যের প্রতি দৃষ্টি বাড়িয়েছিল। এ সময় বাবার উপস্থিতিকে তারা দৈব আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তাঁর বাণী তাঁদেরকে আশা যুগিয়েছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের লোকজন সাধারণত আবেগতাড়িত হয় না। কিন্তু সে দুই দেশেও বাবা বিস্ময়কর ভক্তি ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন। আর মধ্য ও উত্তর ইউরোপের তো কথাই নেই। বাবা যেখানে পা রেখেছেন, সে স্থানটিই যেন তাঁদের প্রার্থনাস্থলে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন সভায় বা রেলস্টেশনে দেখেছি ভিড়ের মধ্যে বাবার আস্তিন স্পর্শ করার জন্য তাঁদের সে কী ঠেলাঠেলি! তাঁর বই বিক্রিরও জোয়ার চলছিল তখন। জার্মানিতে লক্ষ লক্ষ কপি বিক্রয় হয়েছিল। যে ব্যাংকে রয়্যালটির টাকা জমা হতো তাঁরা বাবার নিকট জানতে চাইল, সেই টাকাটা দিয়ে তারা কী করবে। কেননা, তখন মুদ্রাস্ফীতি চলছিল। ব্যাংকে টাকা অলস পড়ে থাকলে তাঁর মূল্য কমে যাচ্ছিল। আমরা যখন জার্মানিতে পৌছুলাম, মুদ্রাস্ফীতি এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বাবার অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া কয়েক মিলিয়ন মার্কের মূল্য তখন ভারতীয় দশ হাজার রুপির সমান দাঁড়িয়েছে। আমাদের সঙ্গী ছিলেন বোম্বের একজন ব্যবসায়ী। তিনি বললেন যে এ টাকা উত্তোলন করা ঠিক হবে না। বরং ব্যভারিয়ান বন্ড কিনে রেখে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পরে যখন মার্কের দাম বাড়বে তখন তা ভাঙিয়ে নিলে হবে। কিন্তু কয়েকদিন পরেই ব্যাংক আমাদেরকে জানাল যে ব্যাংকে রক্ষিত টাকার বর্তমান মূল্য মাত্র কয়েক আনাতে এসে ঠেকেছে। ফলে তাঁরা হিসাবটি বন্ধ করে দিচ্ছে। এইভাবে বাবা লাখপতি হবার বিড়ম্বনা থেকে বাঁচলেন!
ইউরোপে বাবার জনপ্রিয়তার বিষয়ে একটি ঘটনার কথা বলি। তখন আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ ফ্রান্সের কাপ মাতায় অবস্থিত অ্যালবার্ট কানের চমৎকার বাড়িতে থাকছি। সেখানে আমাদের এক নারী চিত্রকর বন্ধু একটি ঘটনা শোনালেন। তিনি সবে ইতালি ভ্রমণ করে ফিরেছেন। সেখানকার নদীতীরবর্তী ছোট জেলেপল্লীতে তিনি দেখলেন যে ডাঙায় তুলে রাখা নৌকার ছায়ায় বসে এক জেলে মাছ ধরার জাল শুকোচ্ছেন। তার হাতে বই। শিল্পী-বন্ধু কৌতূহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এরকম পরিবেশে তিনি কী পড়ছেন। জেলেটি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “মনে করবেন না যেন আমি কোনো আজে-বাজে রোমান্টিক গল্প পড়ছি; আমার হাতে এটা রবি ঠাকুরের ডাকঘর।”
একজন ভারতীয় সেনা অফিসার আমাদের জানালেন যে তিনি তাঁর দল নিয়ে মহাদেশে ঘোরার সময় তাঁদের ট্রেন এক স্টেশনে থেমেছিল। একদল মেয়ে উপহার হিসেবে তাঁদের বগিতে ঝুড়ি ঝুড়ি ফল ও ফুল তুলে দিয়েছিল। ট্রেন চলতে শুরু করলে তাঁরা সবাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠল ‘টেগোরের দেশের উদ্দেশে। আমরা এও শুনলাম যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাবার দিন সন্ধ্যায় ক্লিমেন্স গীতাঞ্জলি থেকে পাঠ শুনবার জন্য কোঁত দ্য নোয়েইকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
তবে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ছিল তরুণ কবি উইলফ্রেড ওয়েনের মায়ের কাছ থেকে আসা একটি চিঠি। ছেলের করুণ মৃত্যুর পর তিনি বাবাকে লিখলেন:
সুসবারি
১ আগস্ট ১৯২০
প্রিয় স্যার রবীন্দ্রনাথ,
আপনি লন্ডনে এসেছেন শোনার পর থেকেই আপনাকে চিঠি লিখতে চাইছিলাম, কিন্তু সাহস পাচ্ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত লেখার ইচ্ছেটারই জয় হল। হয়ত এ চিঠি আপনার কাছে পৌছুবে না, কেননা, আমি আপনার সঠিক ঠিকানা জানি না। তবু এ আশায় লিখছি যে খামের উপর আপনার নাম থাকলেই ডাক বিভাগ তা যথাস্থানে পৌঁছে দেবে। প্রায় দুবছর হল আমার প্রিয় বড় ছেলে শেষবারের মত যুদ্ধে গিয়েছে। সে যেদিন বিদায় নিল, আমরা বিষণ্ণ হৃদয়ে ফ্রান্সের দিকে মুখ করে রৌদ্রোজ্জ্বল সমুদ্রের তীরে বসে ছিলাম। সে আপনার চমৎকার কবিতা থেকে আবৃত্তি করল, ‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই/ যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।’ যুদ্ধ থেকে সে আর ফিরে আসেনি। ওরা আমাকে তার ছোট্ট নোটবুকটা পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি সেখানেও এই কটি লাইন লেখা দেখতে পেলাম। নিচে আপনার নাম লেখা। দয়া করে জানাবেন কি—আপনার কোন বইতে আমি পুরো কবিতাটা খুঁজে পাব?
যুদ্ধ শেষ হবার মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বে আমার সোনার টুকরো ছেলেটা মারা গেল। আর সংবাদটা পেলাম আমরা যুদ্ধবিরতির দিনে।[১] আমার ছেলের যুদ্ধকালীন লেখা কবিতাগুলো নিয়ে শীঘ্রই একটা ছোট বই বের হবে। যুদ্ধের বিভীষিকায় তাঁর মন ভারাক্রান্ত ছিল। সে আরও মর্মাহত ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা অধিকাংশ মানুষের ভাবান্তরহীনতা দেখে। সে চিত্রই তাঁর কবিতাগুলোতে ফুটে উঠেছে। সে তার নিজের বেদনার কথা বলেনি, কিন্তু যারা তাকে ভালোবাসে তারা ঠিকই টের পাচ্ছে যে এরকম কবিতা লিখতে পারার আগে কী নিদারুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই না তাকে যেতে হয়েছে! সে কেবল ২৫-এ পা দিয়েছিল। তার জীবন সুন্দর ছিল, আর যা কিছু সুন্দর তা সে ভালোবাসত। স্রষ্টা তাকে নিশ্চয়ই জানতেন, তবু যখন তাকে নিয়েই গেলেন, আমি আর আহাজারি করব না। কেননা, আমি জানি যে ভগবান ভালোবাসারই দেবতা। যদি ফিরিয়ে দেয়াই সবচেয়ে ভালো হতো, তিনি নিশ্চয়ই ছেলেকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিতেন। তার সঙ্গে আমার আবার দেখা হবে, সে জায়গাটা প্রস্তুত করতেই তো আমাদের ত্রাণকর্তা যিশু সেখানে গেছেন। বাকি দিনগুলো আমি নতশিরে সে অপেক্ষায় কাটিয়ে দেব। চিঠিটা লম্বা হয়ে যাবার জন্য ক্ষমা করবেন, আদতে আমি ছোট করেই লিখতে চেয়েছিলাম। আমার ছেলের কবিতাগুলো আপনি পড়লে আমরা সম্মানিত বোধ করব। এ হেমন্তে চাট্টো অ্যান্ড উইন্ডাস নামের একটা কোম্পানি ওটা বের করছে। আপনাকে একটি কপি পাঠানোর অনুমতি পেলে নিজেকে ধন্য মনে করব।
পরম শ্রদ্ধা ও গুণমুগ্ধতার সঙ্গে,
উইলফ্রেড ওয়েনের মা
সুসান এইচ. ওয়েন
এরকম ভক্তি ও প্রীতিপূর্ণ চিঠির উত্তরে সাড়া না দিয়ে আমাদের উপায় ছিল না। যুদ্ধের ঠিক পরপর কয়েক বছর বাবার খ্যাতি যখন চরমে পৌঁছেছিল, তখনই যে কেবল এরকম ঘটনা ঘটেছে তা নয়, পরবর্তী সফরগুলোতেও আমরা এরকম শ্রদ্ধার পরিচয় পেয়েছি।
*
১. ১৯১৮ সালের ৪ নভেম্বর ওয়েন যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান, আর যুদ্ধবিরতি হয় ১১ নভেম্বর। সেদিন যখন চার্চে চার্চে আনন্দসূচক ঘণ্টাধ্বনি বাজছে, তখনই ওয়েনের মা ছেলের মৃত্যু সংবাদ পান। যুদ্ধকালীন কবিতার জন্য ওয়েন ইংরেজি সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন। ১৯২০ সালে Poems of Wilfred Owen নামে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
