একটি ভ্রমণ ডায়েরি
১৯২০ সালের ইউরোপ ভ্রমণের কিছু কিছু ঘটনা আমি একটি ডায়েরিতে টুকে রেখেছিলাম। যদিও সেগুলো খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা আর অসম্পূর্ণ। পাঠকদেরকে জানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। খুব সামান্য হলেও কারও কারও কাছে এগুলোর কোনো মূল্য থাকতে পারে:
১৫ মে ১৯২০
বেলা সাড়ে দশটার দিকে আমরা ডকের দিকে এগুলাম। ক্ষিতিমোহন সেন আমাদের সঙ্গে গাড়িতে এসেছিলেন। বেলা বারটার মধ্যেই সবাই উঠে পড়লাম। কিন্তু জাহাজ ছাড়তে ছাড়তে বিকেল ৫টা বেজে গেল। জাহাজটি ছিল জনাকীর্ণ, আকারেও বেশ বড়।
১৬ মে
জাহাজের যাত্রীদের মধ্যে বেশ খ্যাতিমান কয়েকজন ছিলেন। আলওয়ারের মহারাজা, আগা খান[১], স্যার কারিমভয়, স্যার জে. জিজিভয়, নবানগরের জাম সাহেব, রণজিৎ সিং (রণজি), এবং আরও কয়েকজন। বাকি যাত্রীরা ছিল গতানুগতিক। সব মিলিয়ে এক জাহাজে অনেক বেশিসংখ্যক লোক, অস্বস্তি বোধ করার মত যথেষ্ট।
মনে হচ্ছে আগা খান ও মহারাজার সঙ্গে কথা বলে বাবা মজা পাচ্ছেন। আগা খান প্রায়ই বাবাকে হাফিজের[২] রচনা থেকে পাঠ করে শোনান এবং তারপর দুজনে সুফিবাদ নিয়ে আলোচনা করেন। জাম সাহেবও অত্যন্ত ভদ্র সহযাত্রী।
৫ জুন
মার্সেই থেকে প্লাইমাউথ বন্দর পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। আমরা আশা করেছিলাম কেদার দাশগুপ্ত বন্দরে থাকবেন। বেশ অবাক হয়ে দেখলাম পিয়ার্সনও অপেক্ষা করছেন। রোটেনস্টাইন ও তাঁর পরিবারের লোকজন আমাদেরকে প্যাডিংটনে অভ্যর্থনা জানান এবং কেনসিংটন প্যালেস ম্যানসনে নিয়ে যান। তিনি সেখানে আমাদের জন্য একটি ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রাসাদটি ছিল খুবই আরামদায়ক।
ডিনারের পর রোটেনস্টাইন আবার এলেন। বাবা অনেকক্ষণ ধরে তার সঙ্গে গল্প করলেন। পুরনো বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের খোঁজখবর নিলেন। তাঁরা ভারত ও ইংল্যান্ডের সমসাময়িক অবস্থা নিয়েও আলোচনা করলেন। মনে হল যেন পুরনো দিন—১৯১৩ সালের সেই গ্রীষ্মটাই বুঝি ফিরে এসেছে।
৬ জুন
পিয়ার্সন আমাদের সঙ্গেই থাকছেন। প্রায় সারাদিনই কোনো-না-কোনো অতিথি এলেন। সকালে রোটেনস্টাইন এলেন তাঁর মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে সরকারের সঙ্গে শিল্পী-সাহিত্যিকদের সম্পর্কের বিষয়টি উঠল। বিশেষ করে যে সকল শিল্পী, লেখক ও বুদ্ধিজীবী সরকারের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন এবং লোভ ও শোষণ নিয়ে দুঃখ বোধ করেন, সরকারের সঙ্গে তাঁদের সহযোগিতা করা উচিত কি-না সে প্রসঙ্গে আলোচনা হল। রোটেনস্টাইন সহযোগিতার পক্ষে সাফাই গাইলেন; তাঁর মতে দেশের পুনর্গঠনের জন্য সরকার যখন আবেদন জানায়, শিল্পী-সাহিত্যিকদের তখন নিজেদের সেরাটাই ঢেলে দেয়া উচিত। তাছাড়া ‘সেবা’র ধারণা আধুনিক মানুষের এতটা গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে যে, কেবল তার মধ্য দিয়েই তাদের শান্তি অর্জিত হতে পারে। বিশেষ করে শিল্পীদের ক্ষেত্রে, তাঁদের জীবন ধারণ ও শিল্পের সংরক্ষণের জন্য কেবল গুটিকয় ধনী ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কেননা, ধনীদের সঞ্চয়ে ভাটা পড়তে পারে এবং তারা শিল্পের পেছনে ব্যয় কমিয়ে দিতে পারে। তাঁদের বরং রাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে গণতন্ত্রের জন্য কাজ করা উচিত। বাবা বললেন যে, শিল্পীদের অবশ্যই নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা থাকা উচিত, এবং তাদের সামনে কোনো রকমের প্রতিবন্ধকতা কল্যাণকর নয়। তিনি কোলকাতার ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট-এর কথা তুললেন এবং বললেন যে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিতভাবেই উল্টো ফল বয়ে আনবে। শিল্পীদের মনে ও শিল্পকর্মে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। রোটেনস্টাইন বললেন, যত যা-ই হোক শিল্পীদের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকা অতটা খারাপ কিছু নয়। এতে তেমন কিছু এসে যায় না এবং কখনও কখনও তাঁদের বিষয়বস্তু অন্য কারও দ্বারা নির্দের্শিত হলেই বরং ভালো ফল দিয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইতালিয়ান চিত্রকরদের ওপর ধর্মের ভূমিকার কথা তোলেন। তাঁর মতে আধুনিক স্বাধীনতা ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে, যেমনটি দেখা গেছে ভবিষ্যৎবাদীদের ক্ষেত্রে।
স্যার ফ্রাংক ডাইসনের সঙ্গে গ্রিনউইচ মানমন্দিরে একটি চমৎকার বিকেল কাটল। তাঁকে বোঝা কঠিন। পুরো জায়গাটায় নীরবতা বিরাজ করছে। এটা খুব আশ্চর্যের ব্যাপার যে এত অল্প আড়ম্বরে এত বিশাল কাজ হচ্ছে এখানে। স্যার ফ্রাংক ডাইসনের আগে দায়িত্ব পালনকারীরাও সবাই ছিলেন খ্যাতিমান। স্যার আইজাক নিউটন ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক মহান কর্মের সুযোগ্য পরিবেশই তৈরি হয়েছে এখানে। স্যার ফ্রাংক আমাদেরকে সর্বশেষ পূর্ণ সূর্যগ্রহণের ছবি দেখালেন। এ ছবিটি দ্বারাই প্রথমবারের মত আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল।
১৭ জুন
গত কয়দিন এত বেশি ব্যস্ততা ছিল যে ডায়েরি লেখার সময় পাইনি। আমরা রোটেনস্টাইনের ওখানে অনেকবার গিয়েছি। বাবা সেখানে প্রায়ই যান, তবে এত বেশিবার নয় যতটা তিনি গিয়েছিলেন আগেরবারের বিলাত সফরে হ্যাম্পস্টিডে বাস করার সময়। তাঁর বাসায় তিনি পুরনো বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের অনেকের দেখা পেয়েছিলেন।
বাবা ইন্ডিয়া অফিসে জনাব মন্টেগু এবং লর্ড সিনহার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি মন্টেগুকে বলেন যে, ভারতবাসী জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে জেনারেল ডায়ারকে শাস্তি প্রদান যতটা না দাবি করে, তার চেয়ে বেশি প্রত্যাশা করে—জাতি হিসেবে বৃটিশরা এ অপরাধের নিন্দা করুক। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অফিসটি যেন একটি মেশিন; এর হৃদয়হীনতার কারণে ভারতীয়দের ওপর জুলুম চলে। একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উপমহাদেশে যখন হাজার হাজার শিশু দুধের অভাবে মারা যাচ্ছে, তখন এ অফিসটি ব্রাজিলে গাভি রপ্তানির অনুমতি দেয়, এমনকি কাথিয়ার অঞ্চলের প্রধানগণ সে অঞ্চল থেকে অন্যত্র গরু পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা সত্ত্বেও। পাঞ্জাবের নৃশংসতার প্রশ্নে মি. মন্টেগু বাবার সঙ্গে একমত হন, কিন্তু বলেন যে ন্যায়-অন্যায় বোধ থেকে সব সময় তিনি কাজ করতে পারেন না। তিনি সরকারের ভিতরে কিছু পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করছেন যাতে ভবিষ্যতে আর এরকম ঘটনা না ঘটে।
রাতের খাবারের পর সুনীতি চট্টোপাধ্যায় রাশিয়ান চিত্রকর নিকোলাস রোয়েরিক আর তাঁর দুই পুত্রকে নিয়ে দেখা করতে আসেন। রোয়েরিক আমাদেরকে তাঁর চিত্রগুলোর ছবি সংবলিত একটি অ্যালবাম দেখান। তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে বন্ধু-বান্ধবরা এ অ্যালবামটি প্রকাশ করেছিল। ছবিগুলো সত্যিই অসাধারণ। এগুলোর সঙ্গে তুলনা করার মত ছবি পশ্চিমা শিল্পকর্মে নেই। বাবা অত্যন্ত মুগ্ধ হলেন। তাঁর ছেলেদের একজন লন্ডনে সংস্কৃত পড়ছে। আরেকজন পড়ছে স্থাপত্যবিদ্যা। তাঁদের অকৃত্রিম সারল্য এবং সহজাত ভদ্রতা কতই না প্রশান্তিকর আর চিত্তগ্রাহী! ইংরেজদের কাঠিন্যের তুলনায় সেটা কতই না আলাদা!
২৭ জুন
রোববার বিকেলে বাবা কর্নেল লরেন্সের[৩] সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজন করলেন। তিনি তাঁকে খুব পছন্দ করতেন। কর্নেল লরেন্স বললেন যে বৃটিশ সরকারের প্রতারণামূলক আচরণের কারণে তিনি আরবে ফিরে যেতে লজ্জা পাচ্ছেন। আরবের লোকদের নিকট তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সরকার তা রক্ষা করেনি। যে লোকদের তিনি এত ভালোবাসেন, এখন কীভাবে তাঁদের সামনে যাবেন। তিনি ছিলেন অক্সফোর্ড থেকে সদ্য পাস করা যুবক। আরবে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের নিকট নায়ক হিসেবে পরিগণিত হন এবং শক্তিশালী সেনাদল গঠন করে তুর্কিদেরকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তিনি তাদের সঙ্গে গভীরভাবে মিশেছেন। তারাও তাঁকে এত সম্মানের সঙ্গে ও আপন ভাবে নিয়েছে যে পারলে রাজমুকুটও পরিয়ে দেয়। তাঁর জীবন যেন গল্পের মত, যার সমতুল্য উদাহরণ এ শতাব্দীতে খুঁজে পাওয়া ভার। বাবা বললেন যে পশ্চিমের মানুষদের ভিতরে এমন এক নিষ্ঠুরতা আছে যা ভারতীয়দের মধ্যে নেই। চরিত্রগত দিক থেকে ভারতীয়রা এতটাই আলাদা যে তারা তাদের শাসকদের কাছ থেকে এ লরেন্স অব অ্যারাবিয়া মোটর সাইকেল চালাতে ভালোবাসতেন। ১৯৩৫ সালের মে মাসে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর হেলমেট ব্যবহার জনপ্রিয় হয়
জিনিস রপ্ত করতেও পারবে না। জবাবে লরেন্স বললেন যে, ইংরেজরা যতটা আঘাত করে তার থেকে প্রচণ্ডতরভাবে তাদেরকে আঘাত করার মধ্যেই এর একমাত্র সমাধান নিহিত। কেবল তখনই তাদের চেতনা জাগবে আর অন্যদেরকে তাদের সমতুল্য ভাই হিসেবে ব্যবহার করবে।
জুন
বৃহস্পতিবারে দ্য ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট সোসাইটি বাবাকে স্বাগত জানাতে ক্যাক্সটন হলে এক সভার আয়োজন করে। হলটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। মন্টেগুর সাবেক আন্ডারসেক্রেটারি চার্লস রবার্টস সভায় সভাপতিত্ব করেন। তিনি একটি লম্বা বক্তৃতা দেন, যদিও সভার লোকজন তাঁর কথা প্রায় শুনতেই পাচ্ছিল না। তারপর মিজ টাবস বাবার চারটি গান গেয়ে শোনান। একজন সুপরিচিত সুরকার এগুলোতে সুর দিয়েছিলেন। তাঁর গলা ছিল প্রবল, কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে যে মূল কবিতাগুলোতে যে চেতনা ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা ফুটিয়ে তোলার জন্য এ সংগীত ছিল একেবারেই অনুপযুক্ত। এ ছিল বড় বেশি বাদ্যযন্ত্রনির্ভর। এর পর এল সিবিল থর্নডাইকের পালা। তিনি সম্প্রতি ‘ট্রোজান, উইমেন ও মিডিয়া’য় করুণ অভিনয়ের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি কবি লরেন্স বিনিয়ন রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন। আহ! কী মধুর তাঁর গলা! তাঁর কণ্ঠের কারুকার্যে আমরা মোহিত হলাম। প্রত্যুত্তরে বাবা মৃদুস্বরে সংক্ষেপে ভাষণ দিলেন। সবাই তাঁর বক্তব্যের খুব প্রশংসা করল। বের হবার পথে আর্নেস্ট রিজ আমাকে বলেন যে বাবার কথাই সেই সন্ধ্যার সেরা উপভোগ্য ছিল। অনুষ্ঠানের সভাপতিকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ভূপেন্দ্রনাথ রাজনীতির প্রসঙ্গ না এনে পারলেন না। এটা ছিল বিস্ফোরণের মত। এবং যেহেতু তাঁর কথাগুলো একেবারে ভিতর থেকে বের হয়ে এসেছিল সেজন্য এগুলোকে অসমঞ্জসও মনে হয়নি। আলওয়ারের ও ঝালওয়ারের মহারাজাদ্বয়, গিলবার্ট মারে, লরেন্স বিনিয়ন, স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত এবং আরও অনেকে সে সভায় উপস্থিত ছিলেন। মি. দুবে তখন সপরিবারে ব্রাইটনের নিকটে বাস করতেন। তাঁরা সেখানে আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বাবা যখন গাড়িতে উঠলেন, তাঁকে দেখার জন্য প্রবেশপথে অনেকে ভিড় করে দাঁড়াল।
চার্লস রবার্টস আমাদেরকে মধ্যাহ্নভোজনে দাওয়াত করেছিলেন। সেখানে লর্ড রবার্ট সিসিল ও গিলবার্ট মারে উপস্থিত ছিলেন। আহারের পর বাবা লর্ড সিসিলকে একপাশে নিয়ে গিয়ে ভারতের রাজনীতি বিষয়ে কথা বললেন। সিসিল স্বীকার করলেন যে ভারতে কী ঘটছে সে বিষয়ে তিনি পুরোপুরি অজ্ঞ, কাজেই বাবার মুখ থেকে তা শুনতে চাইলেন। বাবা তাঁকে বিস্তারিতভাবে তখনকার পরিস্থিতি ও মন্টেগু সংস্কারের অকার্যকারিতার কথা বুঝিয়ে বললেন। জবাবে লর্ড সিসিল মন্তব্য করলেন, “ভারতে ইংরেজদের সংখ্যা খুবই কম। যেহেতু আমরা মনে করি ভারতের মঙ্গল সাধন করার জন্যই তারা সেখানে রয়েছে, কাজেই তাদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের সাধ্যে কুলায় এমন সব কিছুই আমরা করব।” বাবা উত্তর দিলেন, “এর একমাত্র কারণ তোমরা জান যে তোমরা জনবিচ্ছিন্ন এবং হিংস্র শক্তিপ্রয়োগ ছাড়া ভারতে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে অক্ষম। সেজন্যই দুপক্ষের সম্পর্ক এ বিপর্যয়কর অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।” সিসিল আর কথা বাড়ালেন না, বরং বাবার কথা শেষ হওয়ামাত্রই চলে গেলেন। গিলবার্ট মারে এ বিষয়ে কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। বাবা বললেন যে তিনি যদি তাঁর মত কিছু বুদ্ধিজীবীকে দিয়ে একটি প্রতিবাদপত্রে স্বাক্ষর করাতে পারেন, নৈতিক দিক থেকে সেটার একটা বিরাট প্রভাব পড়বে। গিলবার্ট প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি চেষ্টা করবেন। আরও বললেন যে এটা করতে তেমন কষ্ট হবে না।
সোমবার দিন আমরা সবাই ক্যামব্রিজে গেলাম। মিসেস রবার্টস আমাদেরকে চা-চক্রে দাওয়াত দিয়েছিলেন। বাবা পিয়ার্সনের সঙ্গে দেড়টার ট্রেনে রওয়ানা দিলেন। সেদিন ছিল ক্যামব্রিজে ডিগ্রি প্রদানের অনুষ্ঠান। কাজেই লোকে লোকারণ্য। এন্ডারসন আমাদেরকে নিতে স্টেশনে এলেন। তাঁর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। ক্যামব্রিজে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমাদেরকে ব্লু বোর হোটেলে উঠতে হল। বাবা অধ্যাপক এন্ডারসনের সঙ্গে সারা সকাল বাংলা গীতিকবিতা আর তার সঙ্গে ফরাসি গীতিকবিতার তুলনামূলক আলোচনায় কাটালেন।
অধ্যাপক লোয়েস ডিকিনসনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ হল। এর পর এলেন অধ্যাপক কেইনস। তাঁকে দেখে কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির জাঁদরেল বিশেষজ্ঞ মনে হল না, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ, মেধাবি, বেয়াড়া কোনো ছাত্রের মত লাগল। খ্যাতি বোধহয় তাঁকে বদলে দিতে পারেনি। কিংস কলেজে ডিকিনসনের একটি সুন্দর কক্ষ ছিল। এটি প্রাচ্যের রেশম ও চাইনিজ চিত্র দ্বারা সাজানো ছিল। তিনি নিশ্চয়ই প্রাচ্য ভ্রমণে এসে এগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। কথাবার্তা হল রাজনীতি, প্রাচ্য ও আমেরিকায় ভ্রমণ, ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্য, চাইনিজ চিত্রকলা আর এরকম বিষয় নিয়ে। ডিকিনসন বললেন যে ভারতের দার্শনিক রচনাবলি পশ্চিমের পাঠকদের বোধগম্য ভাষায় আরও বেশি করে পাওয়া গেলে ভালো হতো। বাবা বললেন যে বেশির ভাগ অনুবাদকর্মই হয়েছে অত্যন্ত আনাড়িভাবে, এমন সব পণ্ডিতের দ্বারা যাদের লিখনশৈলী নিম্নমানের বা মূল রচনার ওপর যাদের ভালো দখল নেই।
২০ জুলাই
রবিবার বিকেলে বাবা পিয়ার্সনের সঙ্গে পিটার্সফিল্ড চলে গেলেন। সেখানে ম্যুরহেড বোনদের সঙ্গে এক সপ্তাহ কাটাবেন। স্টার্জ মুরও কাছেই থাকেন। আমরা গেলাম না, কারণ ওখানে আমাদের সবার থাকার মত জায়গা হতো না।
ওই বিকেলে আমরা মিস্টার ও মিসেস ইয়েটসের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমরা ঠিকানা জানতাম না, তবে রোটেনস্টাইনের নিকট শুনেছিলাম যে তাঁরা এজরা পাউন্ডের ফ্ল্যাটে থাকেন। কাজেই চার্চ ওয়াকে গেলাম, কিন্তু গিয়ে শুনলাম যে এজরা পাউন্ড সেখান থেকে চলে গিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ইয়েটস দম্পতি আমরা যেখানে থাকি, অর্থাৎ চার্চ স্ট্রিটের খুব কাছেই থাকেন। রোটেনস্টাইনই তাঁদেরকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেন। সাক্ষাতের সময় তিনি কয়েক মিনিটের জন্য উপস্থিত ছিলেন। দেখলাম ইয়েটস-এর তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমেরিকায় বক্তৃতাদানের লম্বা সফর সেরে তাঁরা কেবল লন্ডন ফিরেছেন। তিনি বলেন যে বাবার সাম্প্রতিক দুটি গ্রন্থ, মাই রেমিনিসেন্স ও দ্য হোম অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। পরের কবছর, বাবা যখন তাঁর সেরা লেখাগুলো লিখছেন এবং সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, সে সময়কার কথা আত্মজীবনীটিতে থাকলে আরও ভালো হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি এও বললেন যে দ্য হোম অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড (ঘরে-বাইরে) যেন সমসাময়িক আয়ারল্যান্ডের প্রতিচ্ছবি। এ বইয়ে বর্ণিত প্রতিটি সমস্যাই তাঁর নিজের দেশের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি জানতে চান বইটি নিয়ে ভারতে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কারণ তাঁর বিশ্বাস, আয়ারল্যান্ডের কোনো লেখক এরকম একটি বই লিখলে রীতিমত আলোড়ন পড়ে যেত।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রোটেনস্টাইন আমাদেরকে তাঁর বাসায় নৈশভোজোত্তর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করলেন। সেখানে দিলীপ রায় কয়েকটি ভারতীয় গান গাইলেন। ইয়েটস বাবাকে অনুরোধ করলেন গীতাঞ্জলি থেকে গাইতে। তিনি প্রথমে অভিজাত ভঙ্গিতে ইংরেজি থেকে পাঠ করলেন, তারপর বাবা বাংলায় গাইলেন।
২২ জুলাই
স্যার হোরেস প্লাংকেটের বাসায় একটি ভিন্নধর্মী সাক্ষাৎকার ঘটল। পিয়ার্সন ও আমি বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম। আলাপের প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল আয়ারল্যান্ডে সমবায় আন্দোলন। স্যার হোরেস বাগ্মী ছিলেন না কিন্তু তাঁর প্রত্যেকটি কথাই ছিল অভিজ্ঞতা নিংড়ানো। তিনি প্রায় তিরিশ বছর আয়ারল্যান্ডের গ্রামীণ জীবন নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি আদর্শ দ্বারা পরিচালিত, আবার একই সঙ্গে বাস্তববাদীও। বড় কথা এই যে তিনি তাঁর অনেক স্বপ্নকেই সফল করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন যে শুরুতে তাঁরা কিছু ভুল করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যেকটি ব্যর্থতা থেকেই তাঁরা কিছু না কিছু শিখেছেন, যাতে করে সমস্যার মূল চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে যে নীতির ওপর ভিত্তি করে তাঁরা কাজ করেছেন তাতে কোনো খুঁত ছিল না। এ নিয়ে তাঁদের কোনো সন্দেহ ছিল না। এখন তিনি জানেন নতুন করে শুরু করতে হলে ঠিক কীভাবে এগুতে হবে আর কোন কোন বিষয় এড়িয়ে যেতে হবে। তিনি জানতেন যে আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম অংশের সঙ্গে ভারতের সাযুজ্য রয়েছে। তিনি খুব দুঃখ প্রকাশ করেন যে শরীর ভালো না থাকায় শিল্প সংক্রান্ত কমিশনের সঙ্গে ভারতে যেতে পারেননি। এর পর তিনি সহযোগিতার কয়েকটি মৌলিক দিকের উল্লেখ করেন, এবং বলেন যে, অন্য অনেক ক্ষেত্রের চেয়ে, এমনকি ধর্মের চেয়েও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানবজাতির এক হওয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ বেশি।
বাবা যখন বললেন যে আমাদের ডেনমার্ক যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, স্যার হোরেস জানালেন যে প্রথমে তাঁরাও ডেনমার্কে অনুসৃত পদ্ধতি অনুসারেই সমবায় আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সেখানকার পরিবেশ সমবায়ের জন্য খুবই অনুকূল ছিল, ফলে খুব সহজেই তা সেখানে সাফল্য লাভ করেছিল। ঠিক এই কারণেই ভারতের উচিত হবে ডেনমার্কের বদলে আয়ারল্যান্ডের সমবায় আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেয়া। আমরা তাহলে সমবায়ের সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারব। তিনি আরও বলেন যে স্থানীয় পারিপার্শ্বিকতা ভালোভাবে জানতে পারাটা খুব জরুরি। জনসাধারণের সত্যিকারের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হবে,
হবে, তারপর একেকবারে একেকটা বিষয় ধরে এগুতে হবে। এভাবেই কেবল সমবায় আন্দোলনে সাফল্য লাভ করা সম্ভব। শুরুর দিকে কোনো ব্যর্থতা দেখা দিলে মনোবল ভেঙে যাবে। তারপর তিনি বাবাকে আয়ারল্যান্ডে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন, তবে সেটা তখনই নয়। অক্টোবর হতে পারে সেরা সময়। ততদিনে রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বাবা লেডি কোর্টনির সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ করেন। এখানে কনটেম্পোরারি রিভিউ-এর সম্পাদক মিস্টার গুচ এবং মিস্টার ও মিসেস সিডনি ওয়েব উপস্থিত ছিলেন। গুচকে বাবার খুব পছন্দ হল। ভারতের মিল মালিকগণ কর্তৃক শ্রমিকদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে মিসেস ওয়েবের ধারণা ছিল খুবই সরলীকৃত। ফকির শ্রেণির প্রতিও তিনি ঘৃণার মনোভাব পোষণ করতেন। বাবা তীব্রভাবে দ্বিমত প্রকাশ করেন।
৪ আগস্ট
জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ কেটে গেল ইউনিয়ন অব ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট-এর উদ্যোগে পাঁচটি নাট্যকাব্যের অভিনয় নিয়ে। এগুলো সম্প্রতি অনূদিত হয়েছে, তখনও প্রকাশিত হয়নি। একই উপলক্ষে ছিল বাবার বক্তৃতা, বিষয় ‘পল্লী বাংলার আধ্যাত্মিক গান। বাবা নাটকগুলোর রিহার্সালে সহায়তা করলেন, আমি আর প্রতিমা অংশ নিলাম অভিনেতাদের পোশাক নির্বাচনে। অভিনয়স্থল হিসেবে উইংমোর হলকে ঠিক করা হল। মঞ্চ বলতে তেমন কিছু সাজানো হয়নি, কেবল পটভূমিতে নীল পর্দা ঝুলানো, কয়েকটি লতাগুল্মের পাত্র স্থাপন আর গোটা দুই স্পট লাইটের ব্যবস্থা করা হল। কোনো ফুটলাইটের ব্যবস্থা করা হয়নি, তাতেই কিন্তু দারুণ লাগল। অভিনয়ও ভালো হয়েছিল। দুই নাটকের মাঝখানে সরোজিনী নাইডু কয়েক মিনিট বক্তৃতার মাধ্যমে নাটকগুলোর পরিচয় তুলে ধরলেন। বিরতির সময় এলিস কুমারা (মিসেস কুমারস্বামী) গান গাইলেন। কখনও কখনও একঘেয়ে লাগলেও, তার কণ্ঠ সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল। পর্দা পড়বার আগে বাবা ‘জনগণ-মন অধিনায়ক’ আবৃত্তি করলেন, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায়। কচ ও দেবযানীর অভিনয় শুরুর আগে ছোট্ট একটি মূকাভিনয়ের মাধ্যমে প্রাচীনকালের আশ্রম দেখানো হল। বনের কুটিরে একদল শিষ্য তাঁদের গুরুকে ঘিরে বসে আছে আর কুটিরবাসী বালিকারা তাদের কলসি থেকে বাগানের গাছে পানি দিচ্ছে। দিনের পাট শেষ হয়ে আসার প্রাক্কালে গুরুমশাই সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি করলেন। তারা যখন চলে যাচ্ছিল তখনি কচ আবির্ভূত হলেন আর দেখতে পেলেন যে দেবযানী ফুলের মালা গাঁথছে! এ দৃশ্যটুকুর মাধ্যমে বেশ চমৎকারভাবে নাটকের আবহ তৈরি হয়ে গেল : বাবাই এর প্রস্তাব করেছিলেন, আর অভিনয় করেছিলেন মুকুল দে, নিখিল চৌধুরী ও ক্লিংহফার বোনেরা। দুঃখের বিষয় যে দাশগুপ্ত মৌসুমের মূল সময়ে এর আয়োজন করতে পারেননি। এ অভিনয়ের আয়োজন হতে হতে বোকারা সব অন্যত্র চলে গিয়েছিল। কিন্তু তবু হল ভর্তি দর্শক হয়েছিল, এবং আমি বুঝতে পারছিলাম যে নাটকগুলো তাদের ভালো লাগছে। পরের দিন সন্ধ্যায় বাবা এই হলেই বক্তৃতা দিলেন। নাটকের চেয়েও বক্তৃতার টিকিট বেশি বিক্রয় হয়েছিল।
কিছুদিন আগে রোটেনস্টাইনের ওখানে মিলে. ডি. আরানভির সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছিল। সে সন্ধ্যায় রোটেনস্টাইন দিলীপ রায়কে হিন্দি গান গাইতে অনুরোধ করেন। বাবাও নিজের দুয়েকটি গান গাইলেন। এতে মিলে, ডি. আরানভি দারুণভাবে মোহিত হন এবং তিনি যে অনুষ্ঠানে বেহালা বাজাবেন সে অনুষ্ঠানে বাবাকে নিমন্ত্রণ করেন। তিনি বললেন যে বাবার সামনে বাজানোটা তাঁর অন্যতম স্বপ্ন। বাবা সেখানে গেলেন এবং অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে ফিরে এলেন। তিনি যে সম্মান দেখিয়েছিলেন তাতে বাবা অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। সেদিন তিনি যতটা চমৎকার বাজিয়েছিলেন এমন আর আগে কখনও বাজাননি। বাবা বললেন যে এই প্রথমবারের মত তিনি পাশ্চাত্যের সংগীতকে সত্যি সত্যি উপভোগ করেছেন এবং পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন। তিনি একজন অতি বড়মাপের শিল্পী—কিন্তু সেরকম উৎসাহ পেলেই কেবল প্রতিভার পুরোটা ঢেলে বাজাতে পারেন। এবং সে সন্ধ্যায় তিনি সত্যিকারের উদ্দীপনা লাভ করেছিলেন। সহজ, মন খোলা, শিশুসুলভ এবং গভীর আধ্যাত্মিক বোধসম্পন্ন এই তরুণী শুধু শিল্পী হিসেবেই মহান ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও দারুণ ছিলেন। রোটেনস্টাইন এবং বাবা উভয়েই তাঁর গুণগ্রাহী ছিলেন। রোটেনস্টাইন তাঁকে আরেক দিন তাঁর বাসায় বাজাতে বললেন। আমরা সবাই সেখানে গেলাম। কিন্তু সেদিন তিনি ক্লান্ত ছিলেন, কাজেই তাঁর বোনের সঙ্গে যুগলবন্দি বাজাতে চাইলেন। তাঁরা অত্যন্ত চমৎকার বাজালেন, কিন্তু বাবা বললেন যে সেদিনের মত অত ভালো হয়নি। তাঁর বোনের বিয়ে হয়েছিল মিস্টার ফাচিরি নামে এক গ্রিক ভদ্রলোকের সঙ্গে। এ দুবোনের বাড়ি হাঙ্গেরি, তাঁরা ছিলেন সুরকার জোয়াচিমের ভাগ্নি। পরের সপ্তাহে আমরা তাঁদের বাড়িতে চা খেতে গেলাম। তদ্দণ্ডেই তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কোনো ভদ্রতার খোলস নেই; তাঁদের সঙ্গে মিশলে সঙ্গে সঙ্গেই মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা টের পাওয়া যেত। সেখানে অধ্যাপক টুবেও ছিলেন। তিনি বাখ ও হেডনের কয়েকটি সুর বাজালেন এবং আমাদেরকে ব্যাখ্যা করে বোঝালেন। তিনি বললেন যে বাবার কয়েকটি গান থেকে তাঁর মনে হয়েছে অন্য কোনো সুরকারের চেয়ে হেডনের সুর থেকে বাজানোই ভালো হবে। তারপর তারা সবাই মিলে (পিয়ানো, দুটি বেহালা আর সেল্লো দিয়ে) ব্রাহম-এর সুন্দর একটি সুর বাজালেন। এ দুই তরুণীর সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করলাম।
*
১. তৃতীয় আগা খাঁ, আগা সুলতান মুহম্মদ শাহ (১৮৭৭-১৯৫৭)
২. স্মরণীয়, কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও হাফিজের রচনার ভক্ত ছিলেন।
৩. লরেন্স অব অ্যারাবিয়া নামে খ্যাত থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের বিপক্ষে আরবদের সংগঠিত করেন। বুদ্ধিমত্তা, সাহস আর গেরিলাকৌশল দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যে তুর্কিদের পরাজয় ত্বরান্বিত করেন। সংক্ষেপে টি. ই. লরেন্স নামে পরিচিত। তিনি এ উপমহাদেশেও বছরখানেক কাজ করেছিলেন। এ সাক্ষাৎকারের কয়েক বছর পর, ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি করাচির কাছে একটি ঘাঁটিতে যোগ দেন। পরের বছর মে মাসে মীরানশাহে বদলি হন। নভেম্বর মাসে আফগানিস্তানের একটি উপজাতি বিদ্রোহ করলে এর সঙ্গে লরেন্সের নাম জড়িয়ে যায়। গোপন মিশন নিয়ে তিনি তীর্থযাত্রীর বেশে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মর্মে বৃটেনের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় খবর বের হয়। সে খবর উপমহাদেশের পত্রিকায়ও প্রচারিত হয়। পরবর্তীতে সমালোচনা শুরু হলে এবং আফগান সরকার অস্বস্তি প্রকাশ করলে তাঁকে উপমহাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। ১৯২৮ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন।
