নরওয়ে সফর ভণ্ডুল
১৯২০ সাল। প্রথম মহাযুদ্ধ থেমে গেলেও ইউরোপে এর বেশ বিপর বিভিন্ন দেশের সরকার তখনও রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি ভালে তখন লন্ডনে। ইউরোপের নানান স্থান থেকে বাবার কাছে মরুর আসছে। ১৯১৩ সালে বাবা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। পুরস্কার গ্রহণ করাটাই হচ্ছে প্রথা। নোবেল কমিটি বাবাকে লুটছেন মেরে তোর জানিয়েছিল। কিন্তু বাবা যেতে পারেননি। তারপর যুদ্ধ শুরু হল
ইউরোপেই আছেন। এ সময় যখন পুনরায় নিমন্ত্রণ এল বাবা ভাবো না করে পারলেন না। কাজেই সিদ্ধান্ত নেয়া হল মহাদেশটি ভ্রমণের শুরুতেই ফুটতে যাওয়া হবে। সঙ্গে থাকব আমি, আমার স্ত্রী, উইলি পিয়ার্সন ও মিস্টার বোমাটি নামক বোম্বের এক পার্সি ভদ্রলোক। উইলি পিয়ার্সন বাবার একান্ত নটর হিলের কাজ করছিলেন। ইতোমধ্যে আমাদের দলে একজন নতুন সদস্য যোগ দিলেন বাবা মানুষের সঙ্গ পছন্দ করতেন। তিনি এতে খুশিই হলেন। একজন পতিতার প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ এ মহিলাকে বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে নিলেন জানতেন যে ভদ্রমহিলা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত কিন্তু তিনি যে একটি সরকারি দপ্তরের হয়ে কাজ করেন, সেটা জানতেন না। ভদ্রমহিলা সহজেই আমাদের দলের সঙ্গে মানিয়ে নিলেন এবং পূর্বদেশীয় দর্শন বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে বাবার মন জয় করে ফেললেন। আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনার কথা শুনে তিনি নিজ খরচে ভ্রমণ গাইড হতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তিনি এও বললেন যে স্ক্যান্ডিনেভিয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল ব্যক্তিকেই তিনি চেনেন। এ উপকারটুকুর সুযোগ পেলে তাঁর দেশবাসী বাবাকে যে অপরিমেয় শ্রদ্ধা করে, তার সামান্য অংশ দৃশ্যমান হবে। বলা বাহুল্য, এরকম অনুরোধে রাজি হতেই হল। তিনি চারদিকে এত চিঠিপত্র লিখলেন এবং এত দক্ষতা দেখাতে শুরু করলেন যে আমার ও পিয়ার্সনের কাজের চাপ অনেকখানি কমে গেল। ঠিক হল যে আমরা নিউহ্যাভেন থেকে জাহাজে উঠব এবং উত্তর সাগর পাড়ি দিয়ে নরওয়ের বার্গেন-এ পৌঁছব . বরাবর যাত্রার দিনই আমরা টিকিট কাটতাম। এবারেও জাহাজ ছাড়ার দিনেই আমি থমাস কুক-এ টিকিট কাটতে গেলাম। ভ্রমণ দপ্তরে আমি সুপরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। আর টিকিট কাউন্টারের কেরানিটি আমাদের রকমসকম ভালোই বুঝে গিয়েছিলেন। কাজেই টিকিট কাটবার সময় সতর্ক করে দিলেন, “এবারে কিন্তু আর টিকিট ফেরত নেয়া হবে না।”
পাসপোর্ট, টিকিট, মালপত্রের উপর লাগানোর জন্য চিহ্ন ইত্যাদি ঠিক করে সন্ধ্যা নাগাদ ফ্ল্যাটে ফিরলাম। ফিরেই বোমানজির কাছে এক রোমাঞ্চকর সংবাদ শুনলাম। সুইডিশ সূত্র থেকে শোনা খবরটা কেবল গোয়েন্দা কাহিনিতেই মানায়। জানা গেল যে আমাদের ভাবী সফরসঙ্গী একজন আন্তর্জাতিক গুপ্তচর। পিয়ার্সন ক্ষেপে গিয়ে মহিলার কাছ থেকে সত্যটা জানার জন্য ছুটলেন। বাবার প্রতিক্রিয়া হল ভিন্ন। তিনি তৎক্ষণাৎ আমাকে এ যাত্রা বাতিল করে পরদিন সকালে প্যারিস যাবার আয়োজন করতে বললেন। এ ধরনের আচমকা পরিবর্তনের সঙ্গে আমি বহু আগেই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। এবারেও মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের টিকিট ফেরত দিয়ে এলাম। যার কাছ থেকে টিকিট কিনেছিলাম, কাউন্টারে তখনও তিনিই ছিলেন। আর্থিক দিক থেকে কোনরূপ দণ্ড দিতে হল না, তবে সে অফিসে নির্ভরযোগ্য যাত্রী হিসেবে এতদিন যদি সামান্য সুনামও অবশিষ্ট থেকে থাকে, এবারে বোধ করি তাও আর রইল না।
পরদিন সন্ধ্যায় আমরা প্যারিস পৌছুলাম। কয়েকদিন পর বার্গেন থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রসমূহ থেকে সংগৃহীত একগাদা পেপার কাটিং এল। এগুলো আমি এখনও রেখে দিয়েছি। বড় বড় শিরোনাম দিয়ে এবং প্রথম পৃষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের বার্গেন পৌঁছানোর সংবাদ ছাপা হয়েছে। এমনকি জাহাজ থেকে আমাদের অবতরণের ছবিও দেয়া হয়েছে! আধুনিক সংবাদপত্রের সংবাদ ফাঁদার কী নমুনা! আর যে ভদ্রমহিলা এগুলো পোস্ট করে পাঠিয়েছিলেন, তিনি নিশ্চয়ই মনে মনে উচ্চস্বরে হেসেছেন।[১]
*
১. ১৯২০ সালের নরওয়ে সফর তণ্ডুল হলেও ১৯২৬ সালে কবি নরওয়ে গিয়েছিলেন। সে বছরের ২১ আগস্ট তিনি ইংল্যান্ড থেকে অসলোর উদ্দেশে যাত্রা করেন এবং ২৫ আগস্ট ওরিয়েন্টাল একাডেমিতে নরওয়ের রাজার উপস্থিতিতে বক্তৃতা করেন।
