ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে
আমরা বেশ কিছুদিন মঁসিয়ে কান-এর অতিথি হিসেবে থাকলাম। তিনি আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। প্রায় প্রতিদিন দুপুর বা রাতের খাবারের সময় শিল্পী, লেখক বা অন্য ধরনের গণ্যমান্য অতিথির সঙ্গে আমাদের দেখা হতো। অঁরি বার্গসোঁর সঙ্গে বাবার লম্বা সময় ধরে কথা হতো। যেখানে অন্য ফরাসিরা ইংরেজি প্রায় বলতই না, তিনি মাতৃভাষায় কথা বলার মত সাবলীলভাবে ইংরেজি বলতে পারতেন। আর পারবেনই না কেন, তাঁর মা যে ছিলেন স্কটিশ। অবশ্য তাঁর উচ্চারণে স্কটিশ টান ছিল, বোধকরি সেটাও মায়ের সূত্রেই পাওয়া। বার্গসোর সঙ্গে এরকম একটা সাক্ষাতের সময় সুধীর রুদ্র উপস্থিত ছিলেন। তিনি মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় সাক্ষাৎকারটির বিবরণ প্রকাশ করেন, কিন্তু তার জন্য বার্গসোঁর অনুমতি নেওয়া হয়নি। আমি পরে শুনেছি যে আগে অনুমতি না নিয়ে ঘরোয়া সাক্ষাৎকার প্রকাশ করার কারণে তিনি একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন।
কোঁতে দ্য ব্রিম ফ্রান্সের সুপরিচিত কবিদের একজন ছিলেন। তিনি বাবার কাছে প্রায়ই আসতেন তাঁর বাংলা কবিতার সর্বসাম্প্রতিক অনুবাদ শুনতে। তাঁর ইচ্ছে ছিল বাবার কিছু লেখার অনুবাদ করবেন। কাজেই বাবার কণ্ঠে আবৃত্তি শুনে মূল রচনার ভিতরে ঢুকতে চাইতেন। তাঁর চেয়েও বেশি খ্যাতিমান ছিলেন কোঁতে দ্য নোয়েই নামের আরেক মহিলা কবি। এক বিকেলে মঁসিয়ে কানকে সঙ্গে করে তিনি এলেন। তিনি এই কবির খুব অনুরাগী ছিলেন। নোয়েই-এর দেদীপ্যমান ব্যক্তিত্বে খুব দ্রুতই আমরা মোহিত হলাম। উচ্ছ্বাসপ্রবণ, খোলামেলা আর অত্যন্ত আবেগী এ কবি ছিলেন জাত ফরাসি। যৌবনে তিনি নিশ্চয়ই অনেক আকর্ষণীয়া ছিলেন। বিদায় নেবার আগে তিনি বললেন যে বাবার সঙ্গে কথা বলে তাঁর সব অহঙ্কার দূর হয়েছে। তিনি এসেছিলেন জয় করতে, ফিরে যাচ্ছেন অনুগত ভক্ত হয়ে।
কার্পেলে বোনদেরকে আমরা জানতাম কয়েক বছর আগে থেকেই, যখন তারা ভারতে বেড়াতে এসেছিল। বড় বোন আঁদ্রে ছিল একজন শিল্পী। প্যারিসে সে ইতোমধ্যেই বেশ নাম কুড়িয়েছে। আর সুজান ছিল সংস্কৃতের ছাত্র। বাবার প্রতি তাদের ভক্তির কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। আমাদের ফ্রান্সে অবস্থানের পুরো সময়টাতে তারা আমাদের দেখভাল করার চেষ্টা করেছে। আঁদ্রের সঙ্গে আমার স্ত্রীর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মেছিল। তখন থেকে শুরু করে ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে তার মৃত্যু পর্যন্ত সে ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ও বিশ্বস্ত বন্ধু। আমাদের বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিল। তার সহায়তা ছাড়া আমরা প্যারিসের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী মহলের এতটা নিবিড় সান্নিধ্যে যেতে পারতাম না। সাম্প্রতিককালে নানাবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাঙাগড়ার কারণে প্যারিসের এ মর্যাদা হ্রাস পেলেও, সে সময় প্যারিস ইউরোপের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত ছিল। প্রবল বেঁচে থাকা, শিল্প ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে অসম্ভবকে সম্ভব করার আশায় বিরামহীন চেষ্টা চালানো, এই বৈভব ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ জীবন, এ কেবল প্যারিসেই সম্ভব। এর কিছু অংশের স্বাদ নিতে পেরে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করেছিলাম। তখন ইম্প্রেশনিস্ট এবং তারপর পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীগণ একটি নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। এ ধারার শিল্পী সেজান, মনে, রেনোয়াঁ, গগ্যা, ভ্যান গগ, রদ্যা এবং অন্যদের ছবি ছিল প্যারিসের আড্ডার মূল বিষয়। তাঁদের ছবিকে ঘিরে সর্বত্র নানা বিতর্ক জমে উঠেছিল। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রদর্শনীতে তখনও তাঁদের কোনো ছবি বা ভাস্কর্যের ঠাঁই হয়নি। নতুন ধারার শিল্পকর্ম দেখার জন্য আমরা খুব আগ্রহী ছিলাম। আঁদ্রে কার্পেলে আমাদেরকে প্লেস দ্য মেদেলিনে অবস্থিত এক চিত্র ব্যবসায়ীর দোকানে নিয়ে গেলেন। এখানে একটি বড় সংখ্যার ইম্প্রেশনিস্ট ও পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছিল। এ ঘরানার এত অধিক সংখ্যক শিল্পকর্মের একত্রে প্রদর্শনী সম্ভবত এবারই প্রথম। আমাদের ওপর এর প্রভাব ছিল সর্বব্যাপী। ভ্যান গগের চিত্র বিশেষভাবে আমার মন জয় করেছিল। এই এত বছর পার হয়ে যাবার পরও এ পাগলাটে শিল্পীর প্রতি আমার মুগ্ধতায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি।
প্রফেসর সিলভাঁ লেভি ও তাঁর স্ত্রী বাবাকে তাঁদের বাসায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। হাল এবং জার্দি দে প্রাতেঁর কাছেই তাঁদের ফ্ল্যাট। চারপাশটা মোটেও আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু তাঁদের লিভিং রুমে ঢুকে পড়লে বাইরের অনাকর্ষণীয় ম্যাড়মেড়ে জগতের কথা আর মনেই থাকে না। ঘরোয়া পরিবেশ আর মাদাম লেভি’র মাতৃসুলভ যত্নআত্তি এতটাই আপন মনে হয় যে প্রত্যেকেই দ্রুত প্রশান্তি অনুভব করেন। ভারত বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রফেসর লেভির নাম পাশ্চাত্যে সুবিদিত। অতি বড় পণ্ডিত হলেও তিনি অত্যন্ত সামাজিক আর সেই সঙ্গে তাঁর রসবোধও উঁচু মানের। কাজেই তাঁকে পছন্দ না করে শিক্ষার্থীদের উপায় কী? ছাত্রদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যেন আমাদের দেশের গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের মত। তাঁদের বাসায় বেড়াতে গিয়ে বাবা প্রস্তাব দেন যে তিনি যেন প্রথম বিদেশি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে শান্তিনিকেতনে আসেন। প্রফেসর লেভি তাতে সম্মত হন।
বাবা ফ্রান্সের সাহিত্য জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হিসেবে মনে করতেন, এমন দুই লেখকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য খুব আগ্রহী ছিলেন। যদিও কয়েক বছর আগেই আঁদ্রে জিদ ফরাসি ভাষায় গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছিলেন, বাবা তখনও তাঁকে সামনাসামনি দেখেননি।[১] রম্যাঁ রল্যাঁর বই পড়ে বাবার মনে হয়েছিল যে তাঁর সঙ্গে তাঁর নিজের অনেক মিল রয়েছে। কিন্তু তাঁকেও বাবা দেখেননি। অদ্ভুত ব্যাপার, বাবা যখনই রোল্যার সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন তখনই তাঁর ফরাসি বন্ধুরা কোনো-না-কোনো ছুতোয় বিষয়টি এড়িয়ে যান। আসলে পরাজিত জার্মানদের প্রতি রোল্যার মনোভাবের কারণে তিনি তখন ফ্রান্সে প্রায় অবাঞ্ছিত বললেই চলে। কাজেই তাঁকে খুঁজে পেতে কেউই আমাদের সাহায্য করল না, যদিও আমরা পরে জেনেছিলাম যে তিনি তখন প্যারিসেই ছিলেন। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে অবশেষে তাঁর ঠিকানা পাওয়া গেল। তিনি তখন একটা অ্যাপার্টমেন্ট হাউজের সবচেয়ে উপরের তালায় থাকতেন। একদিন নোংরা সিঁড়ির অনেক ধাপে পা ফেলে তাঁর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। এর আগে রোল্যাকে দেখা তো দূরে থাক আমি তাঁর কোনো ছবিও দেখিনি। দরজায় নক করতেই রোগা-পাতলা স্কুলমাস্টার ধরনের চেহারার বয়স্কমতন এক লোক পাল্লা খুলে দিলেন। তাঁকে দেখে মোটেও আহামরি কিছু মনে হল না। তাঁর নামটা তাঁর চেহারার তুলনায় আরও বেশি রোমান্টিক। তাঁর বইপত্র আর নাম মিলিয়ে আমার কল্পনায় এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা ছিল। সামনাসামনি যখন দেখা হল, তখন আমি কিছু বলতে পারছি না। পরপরই বুঝতে পারলাম যে রোল্যা এক অক্ষরও ইংরেজি বলেন না, আর ফরাসি ভাষায় আমার যে যৎসামান্য জ্ঞান, তা-ও কোনো কাজে এল না। কাজেই মিশন অসমাপ্ত রেখেই আমি দ্রুত ফিরে এলাম। রোল্যার সঙ্গে পরে আমাদের ঠিকই দেখা হয়েছিল, তবে সেটা প্যারিসে নয়। এ ঘটনার অনেক পরে, আমরা যখন সুইজারল্যান্ডে তখন তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে চেনার সুযোগ ঘটেছিল।
আদ্রেঁ জিদের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। একদিন আমার স্ত্রী ও আমি আদ্রে কার্পেলের সঙ্গে অতেউইলের পিছনে বয়া দ্য বোলনের উপকণ্ঠে হাঁটছি, এমন সময় আমাদের বন্ধু আমাদেরকে একটি কৌতূহলোদ্দীপক আধুনিক স্থাপত্যের বাড়ি দেখালেন। বললেন যে ওখানেই জিদ থাকেন। আঁদ্রে কার্পেলে আরও বললেন যে তিনি বড্ড আত্মকেন্দ্রিক এবং কখনও কোনো অতিথির সঙ্গে দেখা করেন না। আমরা অবশ্য একবার চেষ্টা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং তাঁর দরজায় নক করলাম। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর পুনরায় নক করলাম। কিন্তু তাতেও বাড়ির নীরবতা ভাঙল না। শেষে যখন ফিরে আসার উপক্রম তখন লম্বা গাউন পরা এক লোক দরজা খুলে দিলেন। তিনি আমাদের দিকে এক নজর তাকালেন, তারপর দরজার পাল্লা দুটি জোরে দুদিকে ঠেলা মেরে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা কেবল তাকিয়ে দেখতে পেলাম যে একজন লোক একেকবারে দুটি করে সিঁড়ি ডিঙিয়ে প্রায় উড়ে উড়ে বাড়ির রহস্যময় ও অদ্ভুত অন্তর্ভাগে ঢুকে গেলেন। আঁদ্রে কার্পেলে বললেন যে জিদ অতিমাত্রায় লাজুক বলেই এ রকম করেছেন, অন্য কোনো কারণে নয়।
প্যারিসে আরেকজন অতি চমৎকার ব্যক্তির সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। তবে সেটা এ সফরে নয়। বছর দশেক পরে, আমরা যখন পুনরায় প্যারিসে গিয়েছিলাম। তিনি আর্জেন্টিনার কবি, লেখক ও শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক সিনোরা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো।[২] প্যারিসেও তাঁর খ্যাতি ছিল। তিনি এখানে প্রায়ই আসতেন। অভিজাত চালচলন ও মনকাড়া আচার-ব্যবহার তাঁকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তিনি যখনই আসতেন, সোজা বাবার কাছে চলে যেতেন। কোনো রকমের আনুষ্ঠানিকতা বা আশেপাশে কে আছে তার ধার ধারতেন না। বাবার জন্য তাঁর সুগভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ ছিল। তাঁর সামান্যতম খেয়াল মেটানোর জন্য হেন কাজ নেই যা তিনি করতে পারতেন না। অবশ্য কখনও কখনও তাঁর কর্তৃত্বসুলভ ব্যবহারের কারণে জটিলতাও তৈরি হতো। পেরুর স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বাবাকে সেদেশে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। তিনি সেখানে যাচ্ছিলেনও। ওকাম্পো তাঁকে বুয়েনস্ আয়ার্স-এর উপকণ্ঠে তাঁদের পারিবারিক পল্লীনিবাসে নিয়ে যান এবং পেরু না যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর ধারণা হয়েছিল, বাবার শরীরের যা অবস্থা তাতে আন্দিজ পর্বতমালা পার হয়ে কষ্টকর পেরুযাত্রা ঠিক হবে না। পরে বোঝা গিয়েছিল যে বাবার স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর এ আশঙ্কা অমূলক ছিল না। কিন্তু তিনি না যাওয়ায় আর্জেন্টিনা ও পেরুর মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমস্যা দেখা দেয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওকাম্পোর বাড়িতে বাবার বসার জন্য যে চেয়ারটি দেয়া হয় তাতে তিনি খুব আরাম বোধ করতেন। ফিরবার পথে বাবার জাহাজ যখন ইউরোপের উদ্দেশে রওনা দেবে, এমন সময় তিনি জোর করে ধরলেন যে বাবার কেবিন সাজিয়ে দেবেন। তিনি সেই চেয়ারটিও দিতে চাইলেন। কিন্তু জাহাজ কোম্পানির লোকজন রাজি হচ্ছিল না, কারণ কেবিনের দরজা দিয়ে তা ঢুকছিল না। অনেক যুক্তিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত দরজা খুলে ফেলে চেয়ারটি ভিতরে ঢুকানো হল। তিনি জানতেন অন্য লোকদের দিয়ে কীভাবে কাজ করিয়ে নিতে হয়। বাবা তাঁর নাম দিয়েছিলেন বিজয়া। বাবার প্রতি ওকাম্পোর ভক্তির নিদর্শন হিসেবে এখনও সে চেয়ারটি রবীন্দ্র সদনে সংরক্ষিত আছে।
১৯৩০ সালে বাবা পুনরায় প্যারিসে এলেন। এবারে তিনি সঙ্গে করে তাঁর আঁকা বেশকিছু বাছাই ছবি নিয়ে এসেছিলেন। প্যারিসের শিল্পীগণ এগুলো দেখে একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে বললেন। আমরা এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম যে স্বল্প সময়ের নোটিসে এখানে এ ধরনের প্রদর্শনীর জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মোটামুটি মানের একটি হল পেতে অন্তত বছর খানেক আগে বুকিং দিতে হয়। প্যারিসে এসে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে বাবা সিনোরা ওকাম্পোকে তার করলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই চলে এলেন এবং মনে হল যেন অনায়াসেই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে ফেললেন। কয়েকদিনের মধ্যেই ‘দি তিয়াতেরে পিগালে’ নামক হল বুক করা আর প্রয়োজনীয় প্রচার চালানোসহ প্রদর্শনীর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেল। দারুণ সফল একটা আয়োজন ছিল এটা। আমাদের ফরাসি শুভানুধ্যায়ীরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে প্যারিসে এত দ্রুত এমন একটা প্রদর্শনী করা সম্ভব।
যুদ্ধের পরপর ফ্রান্স থেকে সরাসরি জার্মানি যাবার ভিসা সহজে পাওয়া যেত না। কাজেই আমরা হল্যান্ড হয়ে গেলাম। সেখানে ড. ফ্রেডারিক ভ্যান এডেন দেখা করতে এলেন। তিনি ডাচ ভাষায় বাবার বই অনুবাদ করেছেন। এডেন ছিলেন ভাববাদী, কিন্তু মহাযুদ্ধের অমানবিকতা দেখে তাঁর মোহমুক্তি ঘটেছিল। এর প্রতিবাদেই বুঝি-বা তিনি একটি আশ্রমের মত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন, যেখানে জীবনযাত্রা হবে খুব সহজ ও সরল, কিন্তু চিন্তা-চেতনা হবে মহৎ প্রকৃতির। দেখা গেল এখানে আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যক্তিরা মহৎ ধ্যান-ধারণা নয়, বরং এর নাম ভাঙিয়ে আশ্রমের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সহজে জীবন কাটানোর পক্ষপাতী। আমাদের এই স্বার্থান্ধ বস্তুবাদী পৃথিবীতে এর আগেও বহু সংসার-অনভিজ্ঞ মহজ্জন বিভিন্ন কাঙ্ক্ষিত কিন্তু অবাস্তব প্রয়াস নিয়েছেন যেগুলো বেশিদিন টেকেনি। ভন এডেনের উদ্যোগও সেই একই ভাগ্য বরণে বাধ্য হল।
জার্মানিতে বাবা যে অভ্যর্থনা পেলেন এককথায় তা অভূতপূর্ব। আমাদের সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ডার্মস্টাটে কাটানো সময়টা। সেখানে আমরা ছিলাম হেসে-র গ্রান্ড ডিউকের অতিথি হিসেবে। তাঁকে তখনও অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হতো। এর কারণ এই নয় যে কাইজারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল বা তিনি মহারানী ভিক্টোরিয়ার আত্মীয় ছিলেন। বরং নিজের চরিত্রমাধুর্য আর সাধারণ লোকদের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তিনি সকলের মন জয় করেছিলেন। বিপ্লবের পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। ডিউক আমাদেরকে একটা ঘটনার কথা শোনালেন। সেদিনই বিপ্লব শুরু হয়েছে। একদল লোক এসে তাঁর বাড়ির গেটের সামনে ভিড় জমাল। তারা নাকি ডিউকের প্রাসাদ দখল করতে চায়। তাঁর নাপিতই ছিল এদের নেতা। ডিউক নিজেই সদর দরজা খুলে দিলেন এবং সবাইকে ভিতরে এসে আনন্দ করতে নিমন্ত্রণ জানালেন। তারা সোজা মদের ভাঁড়ারে ঢুকে পান করতে লেগে গেল। সুরাপান শেষে ডিউকের সম্মতিক্রমে তাঁর সব গাড়ি বের করল আর পাগলের মত শহরে ঘুরতে লাগল। সন্ধ্যার মধ্যে সবকিছু শান্ত হয়ে এল। এভাবে ডিউকের প্রাসাদটি রক্ষা পেল।
ডার্মস্টাটে বাবা সপ্তাহখানেক ছিলেন। এসময় তাঁর কোনো ধরা-বাঁধা কর্মসূচি ছিল না। না কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার, না কোনো দাওয়াতে যাওয়ার, না কোনো বক্তৃতা দেয়ার বাধ্যবাধকতা। প্রাসাদটির নিচতলা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সকালে বা বিকেলে কিছু লোক জমায়েত হলে বাবা আসতেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। বাবাকে ডার্মস্টাটে নিমন্ত্রণের নেপথ্যে ছিলেন কাউন্ট হেরমান কাইজারলিং। তিনিই সব ব্যবস্থা করেছিলেন। বাবার দোভাষীর কাজটাও তিনিই করে দিতেন। বাবার কথা তিনি এত ভালোভাবে জার্মান ভাষায় ব্যাখ্যা করে বোঝাতে পারতেন যে জনসাধারণের সঙ্গে দর্শনের মত বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেও বাবার অসুবিধা হয়নি। বেশির ভাগ সময়ই তারা প্রশ্ন করত আর বাবা সে সম্পর্কে তাঁর নিজের মতামত বিশ্লেষণ করে শোনাতেন। ঐসকল কথাবার্তা রেকর্ড করে রাখতে পারলে বড়ই ভালো হতো। এ থেকে জার্মানির সাধারণ লোকদের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন জানা যেত তেমনি জানা যেত জীবন ও দর্শনের নানা বিষয়ে বাবার মতামত।
গ্রান্ড ডিউকের প্রাসাদে কাইজার পরিবারের অনেক সদস্য এসে উঠেছিলেন। তাঁর পুত্ররা সে সময় সেখানে বাস করছিলেন। শুধু যুবরাজ কী একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অন্যত্র ছিলেন। একদিন কাইজারের দ্বিতীয় ছেলে আমাকে নিয়ে বাবার কাছে গেলেন। তিনি তাঁর সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চান। বাবার কাছে গিয়ে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কঠিন হৃদয় জার্মানদের কাউকে কাউকে আমি আগেও কাঁদতে দেখেছি, কিন্তু কাইজারের ছেলে যেভাবে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তা আমার ধারণারও বাইরে ছিল। বিদায়ের আগে তিনি বাবাকে একটি ফুলদানি উপহার দিলেন। এটি ছিল বিশেষভাবে ডিজাইন করা। তিনি বললেন যে এর সাথে তাঁর মনের গড়নের সাযুজ্য রয়েছে। আর আমার জুটল হোহেনৎসলার্ন রাজবংশের প্রতীকশোভিত একটা সিগারেট কেস।
রবিবার দিন ডিউক এবং কাউন্ট কাইজারলিং আমাদেরকে বেড়াতে নিয়ে গেলেন। আমরা একটা পার্কে ঢুকলাম এবং সেখানে জমায়েত হওয়া ছুটি-কাটানো লোকদের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম। সেখানে একটা টিলার মত ছিল। তার চূড়ায় পাথরের বেঞ্চিতে বাবাকে বসানো হল। খুব দ্রুত ভিড় জমে গেল এবং লোকেরা টিলার ঢাল জুড়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গান গাইতে শুরু করল। ঘণ্টাখানেক ধরে একের পর এক গান চলল। কম করে হলেও অন্তত দুহাজার লোক জমা হয়েছিল। তাঁদেরকে নির্দেশনা দেয়ার কেউ ছিল না। তবুও এত লোক কী চমৎকার কোরাস গাইল! কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই, নেই সুর-লয়ের ঘাটতি। জার্মানির বাইরে এরকমটি চিন্তাও করা যায় না। সাধারণ মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনা বাবাকে খুব আলোড়িত করেছিল। বেদনাবিধুর মন নিয়ে আমরা ডার্মস্টাট ছাড়লাম।
জার্মানি যখন এসেই পড়েছেন, বাবা সুইডেন যাবেন না–তা কি হয়? নোবেল কমিটির আমন্ত্রণের ব্যাপারটা তো ছিলই। স্টকহোম ইউরোপের সুন্দর নগরীগুলোর অন্যতম। সেখানে আমাদের অবস্থান খুব মধুর ছিল। নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিক ভোজসভার আয়োজন করেছিল। বাবা অনুবাদ পড়েছেন এমন লেখকদের অনেকের সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে তাঁর দেখা হয়ে গেল। আনুষ্ঠানিক ভোজসভায় সুইডেনের রাজা সভাপতিত্ব করলেন আর আতিথেয়তা করলেন সেলমা লাগেরলফ।[৩] বাবা বসলেন এ দুজনের মাঝখানে। উপস্থিত ছিলেন নুট হামসুন[৪], বিওনসন[৫], সোয়েন হেডিন, বোয়ের এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার খ্যাতিমান লেখকবৃন্দ। আমি বসেছিলাম নোবেল কমিটির সচিবের পাশে। তিনি আমার কানে কানে একটা মজার ঘটনা বললেন। নুট হামসুন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বরাবর যেমনটি হয়, পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানে সেবারও খাদ্য আর পানীয়ের ছড়াছড়ি। হামসুন বড় হয়েছেন কৃষককুলে। সুরাপানে তাঁর প্রবল আসক্তি। অনুষ্ঠান চলছে। তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে নানাজন বক্তৃতা করছেন। এবার হামসুনের ধন্যবাদ দেওয়ার পালা। কিন্তু দেখা গেল তাঁর কোনো সাড়াশব্দ নেই। তাঁর চেয়ার শূন্য। কোথায় তিনি? অবশেষে বদ্ধ মাতাল হামসুনকে পাওয়া গেল তাঁর টেবিলের নিচে। কিছু একটা ধরে বের হয়ে আসবেন এই বৃথা চেষ্টায় তিনি তখন সেলমা লাগেরলফের স্কার্টের প্রান্ত ধরে টানাটানি করছেন। এবারে অবশ্য সেরকম বেমক্কা কিছু ঘটল না।
সোয়েন হেডিনের[৬] সঙ্গে আমাদের আগেও দেখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন পর্যটক। যেখানে-সেখানে চট করে চলে যেতেন। সবখানেই এমনভাবে থাকতেন যেন সেটাই তাঁর বাড়ি। গোটা বিশ্বটাকেই তাঁর নিজের আলয় বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি পড়তে বাবা পছন্দ করতেন। দেখা হবার পর তিনি ব্যক্তি হেডিনকেও পছন্দ করে ফেললেন। তাঁর সঙ্গে সহজেই সবার বন্ধুত্ব হয়ে যেত। তিনি তখন ইংরেজদের ওপর ভীষণ ক্ষেপে আছেন। বৃটিশরা একসময় তাঁকে যে সম্মানে ভূষিত করেছিল, তা ফিরিয়ে নিয়েছে। বয়সের তুলনায় তাঁকে অনেক তাজা দেখাত। তিনি আমাদের জানালেন যে আবার মধ্য এশিয়ায় ঘুরতে বেরুবেন। একদিন সুইডেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেখা করতে এলেন। তিনি বললেন যে বাবার সম্মানে সুইডিশ সরকার সেনাবাহিনীর সিপ্লেনে করে আমাদের বার্লিন ফেরার ব্যবস্থা করতে চায়। তিনি এতে রাজি হলে সুইডিশ সরকার আনন্দিত হবে। আইডিয়াটা বাবার খুব পছন্দ হল। যথারীতি একটি বিমানকে প্রস্তুত করা হল। এর পর কোনো একদিন হেডিন বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে এলেন। যখনকার কথা বলছি তখন বিমান চলাচলের যুগ কেবল শুরু হয়েছে। তিনি বিমানভ্রমণের কথা শুনেই আঁতকে উঠলেন। আমাকে বললেন যে বাবাকে যেন আমি মানা করি। তিনি তাঁর দেশ সুইডেনকে ভালোবাসেন। তবুও কিছুতেই চান না যে আমরা সুইডিশ বিমানে উঠি। বিমানটা কোনো জার্মান পাইলট চালালে না হয় দেখা যেত! হেডিন তৎক্ষণাৎ মন্ত্রণালয়ে ফোন করলেন এবং তাঁর উদ্বেগের কথা জানালেন। এর পর ট্রেনে চেপে বসা এবং নৌপথ জাহাজে পাড়ি দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না।
জার্মানিতে ফিরে বাবা দেশটির উত্তরাঞ্চলে কয়েকটি বক্তৃতা দিলেন। তারপর আমরা গেলাম দক্ষিণাঞ্চলের চমৎকার শহর মুনখেন-এ। সেখানে বাবার বইপত্রের জার্মান ভাষায় প্রকাশক কুর্ট ভোল্ফ-এর বাড়ি। তিনি তার বাড়িতে কয়েকদিন থাকার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন। বিভিন্ন চিত্রশালা আর জাদুঘর দেখার ফাঁকে ফাঁকে বাবা প্রকাশকের সঙ্গে কিছু কাজের কথাও সেরে নিলেন। জার্মানির বেশির ভাগ শহরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, তবে ব্যাভারিয়ার রাজধানীর কথা আলাদা করে বলতেই হবে। আমরা এর সৌন্দর্যে অভিভূত হলাম। হিটলার সেসময় তাঁর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংগঠিত করছিলেন এবং এর সদস্য সংগ্রহ করছিলেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত তেমন বেশি সাড়া পাননি। যে বিয়ার-হলটি পরবর্তীতে এত কুখ্যাতি অর্জন করেছে, সেখানেও আমি গিয়েছিলাম। হিটলার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে যে টেবিলে বসতেন, সেটিও আমাকে দেখানো হয়েছিল।
একদিন বাবার সঙ্গে দেখা করতে অস্ট্রিয়ার এক ভদ্রমহিলা এলেন। তিনি বললেন যে বাবাকে ভিয়েনা সফরে যাওয়া এবং কয়েকটি বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ জানাতে তিনি লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। আমরা ইতোমধ্যে প্যারিস ফিরে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেলেছিলাম কিন্তু তিনি অনেক জোরাজুরি করে সম্মতি আদায় করে তবে ছাড়লেন। বললেন যে যুদ্ধে অস্ট্রিয়াই সবেচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখনও ওই দেশটিই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। বাবার প্রশান্তিকর উপস্থিতি হয়ত সেখানকার ক্ষত শুকোতে কিছুটা সাহায্য করবে। এ কারণে জার্মানির চেয়েও তাঁর অস্ট্রিয়াতে যাওয়াটা বেশি জরুরি। আমরা যখন কিছুতেই রাজি হতে চাচ্ছিলাম না, তিনি এমনকি সম্মানি দেওয়ার লোভও দেখালেন। বললেন যে যদিও তাঁরা এখন দরিদ্র, বাবাকে একনজর দেখা এবং তাঁর কথা শোনার খরচ যোগাতে প্রয়োজনে ভিয়েনার লোকজন এক সপ্তাহ উপোস করবে। এমন কাকুতি-মিনতির পর কে আর না যেয়ে থাকতে পারে! অবশ্য আমরা তখনই রওনা দিলাম না। আমরা গেলাম প্রাগ হয়ে। চেকোশ্লোভাকিয়ায় যাবেন বলে বাবা আগেই কথা দিয়েছিলেন। এবার প্রতিশ্রুতি পালনের একটা সুযোগ হল। এছাড়া প্রফেসর উইন্টারনিৎজ-এর সঙ্গেও দেখা হবে। বাবা তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। বোহেমিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশি শাসনের অধীন ছিল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সদিচ্ছায় আর ভার্সাই সন্ধির সুবাদে তারা প্রথমবার স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। চারদিকে উৎসবমুখর আমেজ চলছে। বাবার আগমন সে আনন্দ-উল্লাস আরও বাড়িয়ে দিল। তারা যতভাবে সম্ভব সফল আয়োজনের চেষ্টা চালাল। বোহেমিয়ার[৭] রাষ্ট্রপতি ড. মাসারিকই[৮] বাবার সফরের সবকিছুর দায়িত্ব নিতে প্রফেসর উইন্টারনিৎজ এবং ড. ভি. লেজনিকে অনুরোধ করলেন। আমরা যখন কেপ মার্তায় ছিলাম তখন বাবার সঙ্গে মাসারিকের দেখা হয়েছিল। এভাবে দুজন বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ ঘটল। বাবা তাঁদেরকে শান্তিনিকেতনে আসার আমন্ত্রণ জানালেন। পরবর্তীতে তাঁরা শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। প্রাগে আমরা অনেক নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। একদিন দুটি নিমন্ত্রণপত্র ধাঁধায় ফেলে দিল। একই বিশ্বদ্যিালয় ক্যাম্পাসে একই দিনে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান! শেষে এর রহস্য ভেদ হল। রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল জার্মানদের প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর চেকোশ্লোভাকিয়ার আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। তারাও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করল। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানটির কাজ চলবে কোথায়? ভবন সংখ্যা বেশি নয়, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো তো রাতারাতি তৈরি করাও সম্ভব নয়। শেষে স্থির হল একই অবকাঠামো দুই বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করবে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ছাত্র-ছাত্রী সেখানে পালাক্রমে কাজ করবে। এ ব্যবস্থার কারণে একই স্থানে আমাদেরকে সকালে অভ্যর্থনা জানালেন জার্মান ইউনিভার্সিটির প্রফেসর উইন্টারনিৎজ আর বিকেলে অভ্যর্থনা জানালেন চেক ইউনিভার্সিটির ড. লেজনি।
অবাক হবার অবশ্য আরেকটু বাকি ছিল। হোটেলে ফেরার পথে দেখলাম আমাদেরকে ভিন্ন একটি পথে নেয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরটি মোটামুটি চিনে গিয়েছিলাম। হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল। ড্রাইভার জানাল যে একটু সমস্যা দেখা দিয়েছে, সারাতে কিছুক্ষণ লাগবে। সঙ্গে সঙ্গেই একজন লোক হাজির হল। তিনি বললেন যে একজন কবিকে গাড়িতে বসিয়ে রাখা ভালো দেখায় না। গাড়িটি যেখানে থেমেছে তার ঠিক সঙ্গেই তার দোকান। প্রায় জোরাজুরি করেই আমাদেরকে সেখানে নিয়ে তুললেন। গিয়ে দেখি ওটা একটা ছবি তোলার স্টুডিও। তখন মনে পড়ল যে লোকটাকে আমি আগেও দেখেছি। তিনি একজন ফটোগ্রাফার। বাবার ছবি তোলার সুযোগ করে দিতে আমার পিছনে লেগেছিলেন। কিন্তু অনুমতি পাচ্ছিলেন না। আর কোনো উপায় না দেখে নিশ্চয়ই ড্রাইভারের সঙ্গে আঁতাত করে এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তবে বলতেই হবে যে লোকটা করিৎকর্মা। যেভাবেই সুযোগ ম্যানেজ করে থাকুন না কেন, তার একটি মুহূর্তও হেলায় হারাতে দেননি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কয়েক ডজন ছবি তোলা হয়ে গেল। তাঁর কয়েকজন চটপটে সহকারী সারি বেঁধে প্রস্তুত হয়ে ছিল। ছবি তোলা হতেই নেগেটিভটি হাতে হাতে ভিতরে চলে যেত আর সঙ্গে সঙ্গেই নতুন নেগেটিভ চলে আসত। এভাবে তোলা ছবিগুলো কিন্তু অত্যন্ত চমৎকার হয়েছিল। বাবার সুন্দর ছবিগুলোর মধ্যে এগুলো স্থান পাবার যোগ্য।
প্রফেসর উইন্টারনিৎজ এবং ভি. লেজনির সুবাদে প্রাগে যেন আমরা নিজের বাড়ির মতই ছিলাম। প্রাচীন প্রাসাদ, দুর্গসমৃদ্ধ এ সুন্দর শহর আর তার অতিথিপরায়ণ লোকদের ছেড়ে আসতে কষ্টই হচ্ছিল। কিন্তু ভিয়েনা আমাদের ডাকছিল। যুদ্ধের কারণে এর নাগরিকরা কঠিন দুর্দশায় পড়লেও শহরটির আলাদা একটা আকর্ষণ ছিল। প্রাগ থেকে ওখানে যেতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ এখানে আমরা ছিলাম অপ্রত্যাশিতভাবে স্বাধীনতা লাভ করার আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মাঝে, আর ওখানে গিয়ে দেখলাম লোকজন অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। চারদিকে চরম হতাশা আর শোক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের অবস্থা এমনই ছিল। কোথাও দুঃখ আর কোথাও আনন্দ। সীমান্ত পাড়ি দিতে দিতে আমরা প্রায়ই এরকম বৈপরীত্য লক্ষ করেছি। ফ্রান্স থেকে হল্যান্ড যাবার পর দেখা একটি দৃশ্য আমি কখনও ভুলব না। সে সময় আমরা ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না যে জার্মানি যাওয়ার অনুমতি পাব কি না। কিন্তু বাবা প্রফেসর মেয়ার বেনফি ও তার স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে খুব আগ্রহী ছিলেন। এ দম্পতি তাঁর বই অনুবাদ করেছিলেন। কাজেই তিনি তাঁদেরকে হল্যান্ডে চলে আসতে অনুরোধ করলেন। মিসেস ভন ইঘেন-এর অতিথি হয়ে আমরা সেখানকার একটি গ্রামে উঠেছিলাম। তাঁরা রাতে আসলেন। সকালে নাস্তার টেবিলে তাঁদের সঙ্গে আমাদের দেখা হল। টেবিলটি ফল, রুটি, মাখন, ক্রিম ও নানা উপাদেয় খাদ্যে ভর্তি ছিল। কৃশ হয়ে যাওয়া দুই জার্মান সেখানে চুপচাপ বসে থাকলেন; কোনো খাবারই স্পর্শ করলেন না। একটু পর তাঁদের দুগাল বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। গত পাঁচ বছরে তাঁরা এ আতিশয্য দেখেননি। অথচ হল্যান্ড ঠিক তাঁর পাশের দেশ।
হ্যাপসবার্গ সম্রাটদের শাসনামলে ভিয়েনা ছিল আনন্দে ভরপুর একটি শহর। যুদ্ধের পরে তা বিপর্যস্ত নগরীতে পরিণত হয়। ছেঁড়া কাপড়-চোপড় পরে দীর্ণ-শীর্ণ মুখে লোকজন বাইরে বের হতো। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার এই যে এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও শিল্প-সংস্কৃতি এবং এ জাতীয় জিনিসের প্রতি তাঁদের প্রচণ্ড ভালোবাসা এতটুকু লোপ পায়নি। আমরা দেখতে পেলাম যে থিয়েটার, কনসার্ট, অপেরা হাউস আর বক্তৃতা আয়োজনের হলগুলো আগের মতই লোকে লোকারণ্য। এগুলোর টিকিট কাটার পয়সা যোগাড় করতে ভিয়েনাবাসী এমনকি না খেয়ে থাকতেও রাজি।
অপেরা গৃহগুলোতে তখন ওয়াগনারের দি মায়েস্তারসিঙ্গার চলছে। আমরা বাবাকে এটা দেখতে রাজি করালাম। প্রফেসর উইন্টারনিৎজ প্রাগ থেকে আমাদের সঙ্গী হয়ে এসেছিলেন। তিনি আগেই আমাদেরকে গল্পটা বলে দিলেন। অপেরা চলার সময় সংগীতও বুঝিয়ে দিলেন। ভারতীয়দের কাছে ইউরোপের সংগীত অত্যন্ত দুর্বোধ্য ঠেকে। এর আগে আমি ধ্রুপদী অপেরা বোঝার চেষ্টা করিনি। তদুপরি দি মায়েস্তারসিঙ্গার হল ওয়াগনারের অপেরাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন। তবু মনে হল যেন আমরা তা বুঝতে পারলাম আর এর মজাটা নিতে পারলাম। অধ্যাপক মশাই এত সুন্দর করে আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য অপেরা শেষ হতে হতে আমাদের মাথা দপদপ করছিল, যেন ফেটে পড়বে। একটা ব্যাপার আমি বুঝতে পারি না, এবং একদিক থেকে মনে হয় যেন শিল্পরীতির দিক থেকেও তা অনুপযোগী। সেটা হল পাশ্চাত্য সংগীতজ্ঞরা কেন কেবল আবেগ উসকে দিয়েই কাজ সারেন। তাঁদের উচিত সব ধরনের অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে তাঁদের চূড়া স্পর্শ করা।
যে অস্ট্রিয়ান মহিলাটি আমাদের দাওয়াত করতে জার্মানি গিয়েছিলেন, এবং ভিয়েনাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি কিন্তু তাঁর প্রস্তাব ভোলেননি। একদিন ঠিক ঠিকই বাবার সম্মানী হিসেবে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে হাজির হলেন। বাবা পুরো টাকাটাই ফিরিয়ে দিলেন। অনুরোধ করলেন এ টাকাটা যেন ভিয়েনার অভুক্ত শিশুদের সেবায় ব্যয় করা হয়। পরে শুনেছিলাম যে অস্ট্রিয়ায় বাবার জনপ্রিয়তা এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল।
*
১. প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে যে, জিদ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন গীতাঞ্জলির স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদকারী হিমেনেথ, গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদে কিছুটা সাহায্যকারী ডব্লিউ বি ইয়েটসও। খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই এমন কৃতী অনুবাদকের সমাহার ঘটেছে।
২. এ বিদূষী নারীর বাড়ি আর্জেন্টিনা। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৪ সালে সেখানে গেলে এর বাড়িতে কিছুদিন কাটান। ওকাম্পোর সঙ্গে কবির একটি মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কবি তাঁকে পূরবী নামক কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন।
৩. প্রথম নোবেল পুরস্কার পাওয়া নারী লেখক। এ সুইডিশ সাহিত্যিক ১৯০৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
৪. নরওয়ের সাহিত্যিক, ১৯২০ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
৫. বিয়র্নস্টার্ন বিওর্নসন (১৮৩২-১৯১০)। নরওয়ের সাহিত্যিক, ১৯০৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
৬. সুইডিশ পর্যটক ও ভূগোলবিদ। নোবেল পুরস্কার কমিটির আজীবন সদস্য ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ফায়ারফ্লাইজ গ্রন্থটি উৎসর্গ করেন।
৭. বর্তমান চেকোশ্লোভাকিয়ার পশ্চিম অংশ। চেকোশ্লোভাকিয়ার আয়তন ও জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাবেক বোহেমিয়া নিয়ে গঠিত।
৮. তিনি ১৯১৮ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বোহেমিয়া তথা বর্তমান চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ফ্রান্সের কেপ মার্তায় থাকার সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল।
