জোড়াসাঁকোর সেই বাড়িটি
বাড়িটির ইতিহাস বেশ মজার। আগেই বলেছি আমাদের পূর্বপুরুষগণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম দিককার সময়ে কোলকাতায় বসতি স্থাপন করেন। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের পত্তনের সময় ইংরেজদের সহযোগিতা করে তারা প্রচুর অর্থের মালিক হন এবং সে অর্থ দিয়ে জোড়াসাঁকোতে একটি প্রাসাদোপম অট্টালিকা নির্মাণ করেন। এর দেখাদেখি অন্য ভদ্র পরিবারগুলোও এলাকাটির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং সুন্দর সুন্দর দালান নির্মাণ করতে থাকে। পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিজাত বাড়ি নির্মিত হতে হতে জোড়াসাঁকো এক সময় কোলকাতার সবচেয়ে আধুনিক অংশে পরিণত হয়। পরিতাপের বিষয় যে, সে সকল নান্দনিক বাড়ি ভেঙে ফেলে আজকাল উৎকটদর্শন আধুনিক ম্যানসন তৈরি করা হচ্ছে। বাড়িগুলোর সম্মুখভাগে সুউচ্চ খিলান আর ভিতর দিকে একাধিক আঙিনা যে কেবল আভিজাত্যের প্রতীক ছিল তা-ই নয়, বরং তা ছিল মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলের জন্য লাগসই স্থাপত্য প্রযুক্তি।
প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর মারা গেলে তাঁর ছেলে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পরিবারপ্রধান হন। যদিও অনেক বছর ধরে তিনি ঠাকুর পরিবার থেকে দূরে পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে বসবাস করেছেন, তবুও তাঁর প্রভাববিস্তারী ব্যক্তিত্ব পরিবারটির অগণিত সদস্যকে একই সূত্রে গ্রথিত করে রেখেছিল। তারা তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন দ্বারাও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। আমার দ্বিতীয় জ্যাঠা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের প্রথম আইসিএস অফিসার ছিলেন। বোম্বে প্রেসিডেন্সি ছিল তাঁর কর্মস্থল। ফলে তিনি পরিবার থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি বালিগঞ্জে বসবাস শুরু করেন।
জোড়াসাঁকোর ৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনে মহর্ষির বংশধরগণ বসবাস করতেন। এটা ছিল এক একর জমির উপর বিস্তৃত প্রকাণ্ড এক দালান। এর সামনের দিকে ছিল সুপ্রশস্ত বারান্দা আর বড় বড় হলরুম। কিন্তু ভিতরের দিকের করিডোর, সিঁড়ি আর কক্ষগুলো ছিল অন্ধকার আর মলিন। সেখানে কখনও সূর্যালোক পৌছুত না। ছেলেবেলায় সেগুলোর ভিতর দিয়ে যাতায়াতের সময় ভয়ে আমাদের গা ছমছম করত। এ বাড়ির উল্টোদিকে, ৫ নং বাড়িতে থাকতেন তিন শিল্পী— গগনেন্দ্র, সমরেন্দ্র আর অবনীন্দ্ৰ।[১]
*
[১. ৬ নং বাড়িটি ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের অপরমহল। নিজের জন্য তিনি পাশেই ৫ নং বাড়িটি তৈরি করেন, যেটি বৈঠকখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় দেবেন্দ্ৰনাথ ঠাকুরের পরিবার পার ৬ নং বাড়ি আর তাঁর ভাই গিরীন্দ্রনাথের পরিবার ৫ নং বাড়িটির মালিকানা লাভ করে।]
