ইউরোপের সীমান্ত থেকে সীমান্তে
১৯২৬ সালের সফর নানা কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যারা নিজ চোখে দেখেননি তাঁরা কল্পনাও করতে পারবেন না প্রত্যেকটি দেশে বাবা কীরকম সম্ভাষণ ও শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন। তিনি যেখানেই গেছেন কেবল যে সরকারি- বেসরকারি লোকজন দ্বারা রাজকীয় অভ্যর্থনা পেয়েছেন তা-ই নয়; বরং এমন সম্মান জুটেছে যা কেবল ধর্মগুরুগণই পেয়েছেন। তাঁর দর্শনলাভ বা আলখেল্লার প্রান্ত ছুঁয়ে দেখার জন্য প্রত্যেকটি রেলস্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় হতো। পশ্চিমের মানুষদের যে যুক্তিবাদী ও নিরাবেগ মূর্তি আমাদের চোখে ভাসে, তার সঙ্গে এ চিত্র মেলে না। ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত আবেগের এই জোয়ারে আমরা ভেসে গিয়েছি। সফরের শেষদিকে দক্ষিণ বন্ধানে কিছুটা প্রাচ্যের পরিবেশ লক্ষ করেছি। সোফিয়াতে আমাদের অবস্থান ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু নানা অনুষ্ঠান আর কর্মসূচিতে ঠাসা। এখানকার সফর শেষ হলে বুলগেরিয়ার রাজা একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করলেন। কর্মকর্তা আর সাংবাদিকগণ আমাদেরকে রোমানিয়ার সীমান্তের একটি ছোট শহর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। যাত্রাটি ছোট হলেও এর আয়োজন ছিল চূড়ান্ত রকমের
আন্তরিক অভ্যর্থনা পেতে পেতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, তারপরও বিদায়ের এ প্রদর্শনী আলাদা দাগ কেটেছিল। যা-ই হোক, রাজকীয় ট্রেন গন্তব্যে অর্থাৎ দানিয়ুবের তীরের একটি স্টেশনে পৌছুল। এখানটা একটি জাহাজঘাটও বটে। এ নদীটি ছিল বুলগেরিয়া আর রোমানিয়ার মধ্যে প্রাকৃতিক সীমান্ত। দানিয়ুব দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তার নিম্নভাগে অত্যন্ত প্রশস্ত আকার ধারণ করেছে। এটি আমাদেরকে পদ্মা নদীর কথা মনে করিয়ে দিল। হাঙ্গেরি যেতে হলে দানিয়ুব পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু নদী পেরুব কীভাবে? ওমা, নেমেই দেখি এক যুদ্ধজাহাজ দাঁড়িয়ে আছে! সেটা আবার নানা রঙের পতাকা আর বাহারি জিনিসপত্রে সাজানো। তোপধ্বনি করে আর উচ্চগ্রামে সে দেশের জাতীয় সংগীত বাজিয়ে আমাদেরকে বিদায় জানানো হল। এ সকল কর্মকাণ্ড যখন চলছে, দেখলাম জাহাজের লোকজন অন্যপাড়ের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে কী যেন খুঁজছে। তাঁরা বেশ মজা পাচ্ছে মনে হল। একটু পরেই এ আমোদ উল্লাসে রূপ নিল। এ জাহাজ আমাদেরকে অপর পাড়ে রোমানিয়ার একটি বন্দরে পৌঁছে দিলে দেখলাম যে অভ্যর্থনা জানানোর কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। কেবল একজন লোক দাঁড়িয়ে। তিনি ঐ ছোট্ট রেলস্টেশনটির ম্যানেজার। কী করবেন বুঝতে না পেরে তাঁরও চুল-দাড়ি ছেঁড়ার মত অবস্থা। শেষবার কামান দাগা হয়ে গেলে আমরা জাহাজ থেকে নামলাম। জাহাজটি যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন তাঁর ভিতর থেকে অট্টহাসি ভেসে এল, ভেসে এল বাদকদলের অসংলগ্ন আওয়াজ। এ প্রবল উল্লাস আর হট্টগোলের কোনো কারণ বুঝতে পারলাম না। আমাদের অভ্যর্থনাকারী পরে জানালেন যে বুলগেরিয়ানরা আমাদের আগমনের সঠিক সময় রোমানিয়ার সরকারকে জানায়নি। তারা এটা ইচ্ছে করেই করেছিল যেন রোমানিয়াকে একটু বেকায়দায় ফেলা যায়। আগে থেকে সংবাদ না জানার কারণে দানিয়ুবের তীর থেকে রোমানিয়ার রাজধানীতে নিয়ে যাবার জন্য বিশেষ কোন আয়োজন করা হয়নি। বুলগেরিয়ানদের উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল—এটা বুঝতে পেরে তারা নিশ্চয়ই পরেও বেশ হাসাহাসি করতে পেরেছে।[১]
*
১. রোমানিয়ানরা কবির আগমন সংবাদ জানত না, নাকি এটি অবহেলা ছিল এ বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ আছ। কেননা, কবি রোমানিয়া পৌঁছেন ২০ নভেম্বর। কবি যে আসছেন সে খবর সেদিনের একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরদিন কবিকে শহর দেখানোর জন্য রাজার নিজস্ব ঘোড়ার গাড়ি এলেও ক্লান্তির কথা বলে রবীন্দ্রনাথ বের হননি। কারও কারও মতে প্রাণহীন অভ্যর্থনায় বিরক্ত হয়ে কবি রাজি হননি। কবির সঙ্গে থাকা আদরের নাতনি নন্দিনী (রথীন্দ্রনাথের পালিতা কন্যা) একটি পার্কে ফুল তুলতে গেলে তাঁকে ফুল তোলা বারণ মর্মে নোটিস দেখিয়ে দেয়া হয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের আতিথ্যের সঙ্গে মেলে না।
