সুইজারল্যান্ডের সেই চাষি
সুইজারল্যান্ডের সেইন্ট মোরিজ-এর আশেপাশে গ্রীষ্মাবকাশ যাপন একটি আনন্দজনক অভিজ্ঞতা। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের সঙ্গে কয়েকজন হাঙ্গেরিয়ান বন্ধুও ছিল। তাদের উপস্থিতি এ আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। গরমের দিনে এ এলাকায় প্রচুর পর্যটক আসে। আমরা এমন এক স্থানে হোটেল ভাড়া করলাম যা ক্রীড়াপাগল পর্যটকদের নাগাল থেকে যথেষ্ট দূরে। আমাদের দলে হাঙ্গেরির বিখ্যাত বেহালাবাদক হুবারমানও ছিলেন। কিন্তু আমরা খুব কমই তাঁকে দেখতে পেতাম। তিনি সারাক্ষণই তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ করে থাকতেন, এমনকি ডাইনিং টেবিলেও সহজে নামতে চাইতেন না। আমরা তাঁর কিছু স্বভাবের কথা জানতে পারলাম। তিনি যখনই কোথাও ভ্রমণ করতে যান হোটেলের বেশ কয়েকটি স্যুট, এমনকি কখনও কখনও একটি পুরো তলা তাঁর জন্য ভাড়া করতে হয়। তিনি আবার সঙ্গে করে বিশেষ ধরনের তুলোযুক্ত কম্বল নিয়ে যান। দরজা ও জানালার ফাঁকে এগুলো গুঁজে দিতে হয়। তার কক্ষকে সম্পূর্ণ শব্দনিরোধী করার পরও তিনি অভিযোগ করেন যে আওয়াজের কারণে তাঁর সমস্যা হচ্ছে।
এক বিকেলে আমরা ইতালিয়ান সীমান্তের কাছে গেলাম। গভীর গিরিখার আর পাইন-আচ্ছাদিত মালভূমির মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে জোরে গাড়ি চালাতে চালাতে ছোট্ট একটা গ্রামে পৌছুলাম। একটা বাড়ির সামনে থামলাম। এখানে কিছু তালগাছ ছিল। এমন বিদেশ-বিভূঁইয়ে তালের গাছ দেখে আমি সেগুলোর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। তা দেখতে পেয়ে একজন হাঙ্গেরিয়ান বন্ধু বলল যে আমাদের উচিত এমন সুন্দর রুচির মালিককে খুঁজে বের করা। আমাদের ডাকাডাকিতে বাড়িটি থেকে একেবারে অভব্য ধরনের একজন লোক বের হয়ে এলেন এবং ভিতরে যাবার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু আমরা তার কথা বুঝতে পারছিলাম না। শেষে একজনকে পাওয়া গেল যে সুইজারল্যান্ডের ওই এলাকার আঞ্চলিক ভাষা বোঝে। আমরা সবাই একে একে পরিচিত হলাম। আমার স্ত্রী ও আমার নাম শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের কেউ হন কি-না। যখন তিনি জানলেন যে কবির পুত্র ও পুত্রবধূ তার সামনে দাঁড়িয়ে, বিস্ময় ও উত্তেজনায় তিনি রীতিমত কাঁপতে শুরু করলেন। তিনি দৌড়ে ভিতরে গিয়ে তার বোনকে ডাকলেন, তারপর আমাদের হাত ধরে উপর তলার একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন। কক্ষটির মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বইয়ে ভর্তি ছিল। আমরা অত্যন্ত অবাক হয়ে দেখলাম যে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত বাবার প্রত্যেকটি বই-ই তার সংগ্রহে রয়েছে। কিন্তু এর পর যা ঘটল তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।
সুইস কৃষকের পোশাক পরিহিত লোকটি তার খসখসে হাত দিয়ে একটি সংস্কৃত ধ্রুপদী বই বের করে তা থেকে একের পর এক আবৃত্তি করতে শুরু করলেন। অনুবাদকের মাধ্যমে জানা গেল যে বছর দুই আগে একটি জার্মান বইয়ে তিনি দুই লাইনের একটি সংস্কৃত শ্লোক পড়েছিলেন। এটি তার এত ভালো লেগেছিল যে তৎক্ষণাৎ কতগুলো সংস্কৃত বই কেনার অর্ডার পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি ভাষাটা শিখতে পারেন আর মূল ভাষায় লেখাগুলো পড়তে পারেন। তিনি সংস্কৃত শিখেছিলেন সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায়। লোকটি থাকেন এক নির্জন পাহাড়ি স্থানে, যেখান থেকে নিকটতম রেলস্টেশন চল্লিশ মাইল দূরে। আমার মনে হল যে নিজের চেষ্টায় আয়ত্ত করা তার সংস্কৃতজ্ঞান দর্শন ও সাহিত্য পাঠের জন্য যথেষ্ট। তার বোনের সঙ্গে আমাদের দেখা হল। তিনি জানালেন যে চিত্রা, ঘরে-বাইরে আর ডাকঘর তার অত্যন্ত প্রিয় পাঠ্য। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি গ্রামের অন্য কৃষকদেরকে এসব রচনা থেকে পাঠ করে শোনান। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ভারতীয় ডিজাইনে চামড়ার কুশন তৈরি করা। তিনি যে ডিজাইনগুলো ব্যবহার করেন সেগুলো পেয়েছিলেন বটতলায় ছাপা রামায়ণ থেকে। অবশ্য কীভাবে পেয়েছিলেন সে এক রহস্য।
আমরা ভরা মন নিয়ে হোটেলে ফিরলাম। এ জ্ঞানী কৃষকের সঙ্গে মিশে আর ভারতের প্রতি এ দুটি সহজ-সরল লোকের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মান দেখে আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব বেড়ে গিয়েছিল।
