পতিসর
বাবার সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণ বাদ দিলে আমি মূলত শান্তিনিকেতনেই থাকতাম। জমিদারি দেখাশুনার ভার আমার ওপরই ছিল। কাজেই আমাকে মাঝে মাঝে শিলাইদহ ও পতিসরে যেতে হতো। এ সকল সফরে আমি খুব আনন্দ পেতাম। এগুলো আমাকে ছেলেবেলাকার কথা মনে করিয়ে দিত। এসকল স্থানে কত আনন্দেই না আমার দিন কেটেছে! প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর, জরুরি প্রয়োজনে আমাকে কয়েকদিনের জন্য পতিসর যেতে হয়েছিল।
দুলতে দুলতে লম্বা পথ চলা শেষে ট্রেন থামল। আমার মনে তখন আনন্দ আর আগ্রহ। যেন দীর্ঘ দিন পর পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে। এর পর চড়লাম হাউজবোটে, এটি আমাকে পতিসর নিয়ে যাবে। মনে হল নৌকাটির যেন কোনো তাড়াহুড়ো নেই, ধীরে-সুস্থে যাত্রা শুরু হল। কিন্তু শীঘ্রই নদীর উপরের রেল সেতু আর স্টেশনের কুৎসিত লোহার পাত দিয়ে তৈরি ঘরগুলো চোখের আড়াল হয়ে গেল।
আত্রাই এমন একটি নদী যা আমাদের দেশে বিখ্যাত, কিন্তু বাইরের লোকে এর সম্পর্কে খুব কমই জানে। এটার ইতিহাসও খুব প্রাচীন নয়। মহাভারত-এ কোনো উল্লেখ নেই। পবিত্র দিনগুলোতে পুণ্যলোভী তীর্থযাত্রীরা এর জলে স্নান করে আত্মা বিশুদ্ধ করতে ভিড় জমায় না। বাংলার শ্যামল বক্ষ জুড়ে যে শত শত অখ্যাত স্রোতস্বিনী এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে, আত্রাই সেগুলোরই একটি। সে নিজেও বোধহয় তার ক্ষুদ্রত্ব সম্পর্কে জানে, তাই বুঝি ইচ্ছা-অনিচ্ছায় দিগন্ত বিস্তারী ধানের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে পথ করে নিয়েছে। কোথাও কোথাও বা নিছক জলাভূমিতে মিশে গিয়েছে। তারপর হঠাৎ যেন সাধ হয়েছে কোনো গ্রামে ঢুকবার। গাঁয়ের মাঝামাঝি গিয়ে ভেবেছে কাজটা ঠিক হয়নি। কাজেই কোনো প্রশস্ত উঠোন ছুঁইছুঁই করে হালকা বাঁক নিয়ে পুনরায় দিগন্তের পথে বেরিয়ে পড়েছে। এই যে দীর্ঘ সর্পিল পথযাত্রা, এর কোনো পর্যায়েই কিন্তু সে সাহস করে কোনো বড় গঞ্জের প্রান্ত ছোঁয়নি। একবারও সাহস করেনি কোনো বড় শহরের গায়ে ঢু মারতে।
আত্রাইয়ের মন্থর স্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমি নিজেও তার মত হয়ে গেলাম। সময়ের হিসাব অর্থহীন হয়ে গেল। গন্তব্যে পৌছুনোরও যেন কোনো তাড়া নেই। বজরার জানালার ধারে ইজিচেয়ার টেনে বসে গেলাম আর নীরবে পিছিয়ে যাওয়া নৈসর্গিক দৃশ্যাবলি দেখতে থাকলাম। দুই পাড়ে নানা আকার ও আকৃতির অগণিত মাছ ধরার জাল বিছানো। কাঁখে কলস নিয়ে গাঁয়ের বধূরা সার বেঁধে নদীর দিকে চলেছে। ঘাটে কোলাহলমুখর শিশুরা জল ছিটিয়ে স্নান করছে। একদল পোষা হাঁস অন্য পাড়ে যাবার পণ করে সাঁতরিয়ে নদী পাড়ি দিচ্ছে। পরের বাঁকেই হয়ত চোখে পড়ছে একগুচ্ছ মাটির ঘর। শসার মাচা আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা এসব বাড়ির প্রায় পুরোটাই নৌকা থেকে দেখা যায়। এদের একদিকে জমি থেকে সদ্য কেটে আনা ধানের গাদা, অন্যদিকে হয়ত বয়স্ক মহিলারা লম্বা দণ্ড দিয়ে কাঠের থালিতে ধান ভানছে। নদীর বুকে চলতে চলতে গ্রামের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রা দেখতে পেলাম। মাঠে মাঠে কৃষকদের নীরস খাটুনি, মহিলাদের একঘেয়ে ঘর-গেরস্তালি। এই তো তাদের জীবন। আনন্দের ঘটা এখানে কম, আর বিনোদন তো নেই বললেই চলে। উৎসাহের সঙ্গে সবকিছুর খুঁটিনাটি দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হল, যে জীবন আমার নয়, তা এভাবে খুঁটিয়ে দেখার কোনো অধিকার আমার আছে কি? এ কথা ভাবতেই লজ্জা লাগল, জানালা থেকে সরে নৌকার ভিতরের দিকে ঢুকে গেলাম।
কিন্তু নৌকার ভিতরে ঢুকে গেলেও গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের এ চিত্র মন থেকে মুছে যেত না। মন চলে যেত সুদূর অতীতে, আদিম যুগে। সেযুগেরও ঐ একই ছবি। ভারতের সুদীর্ঘ ইতিহাস মনে পড়ল। ভেবে দেখলাম, এখানে সভ্যতার কত উত্থান-পতন ঘটেছে, এ দেশ বিদেশিদের দ্বারা কতবার আক্রান্ত হয়েছে, হয়েছে কত যুদ্ধ-বিগ্রহ। কিন্তু গ্রামজীবনের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। আমি আজ যা দেখলাম, শত বা সহস্র বছর আগেও পল্লীবাংলা ঠিক এরকমই ছিল। উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যে মুহুর্মুহু পরিবর্তন ঘটলেও, যুগের পর যুগ ধরে এর গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা কীভাবে অপরিবর্তিত থাকল সে এক বিস্ময় বটে। কোন্ সে বৈশিষ্ট্য যা এ ব্যবস্থাকে চিরকালীন স্থায়িত্ব দিয়েছে? এর কি এমন একটা অন্তর্নিহিত শক্তি আছে, যা কোনো পদার্থের ভিতরের অণুগুলোর মধ্যকার রাসায়নিক বন্ধনের চেয়ে শক্তিশালী এমন কোনো মৌলিক গুণ, যা এখনও আমাদের নজরে পড়েনি? নাকি এর ঢিলেঢালা গঠন, সাংগঠনিক চরিত্রের অভাব, এর নানাবিধ ত্রুটিই একে সকল পরিবেশে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার ক্ষমতা দিয়েছে?
এরকম মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে আমি একটি গ্রামে নামলাম। একদল বয়স্ক লোকের দেখা পেলাম। যে চিন্তাটা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে তার জবাব পেতে তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। আমাকে একটি নিচু ঘরের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসতে দেয়া হল। সামনে মাদুর পেতে তার ওপরে গ্রামবাসী বসল। বেশির ভাগেরই খালি গা, পোশাক বলতে কোমর পর্যন্ত ঢাকা। নারকেলের খোল দিয়ে বানানো হুঁকা এক হাত থেকে আরেক হাতে ঘুরছে। মনে হল যেন মধ্যযুগে ফিরে গিয়েছি, গাঁয়ের মাতবর সেজে কোনো সামাজিক সমস্যা নিয়ে দরবার করছি।
লম্বা দাড়িওয়ালা এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল: “বাবুজি, এসকল বুলি আওড়িয়ে কী লাভ? আন্তরিকতাহীন যেসব সংস্কার অতি উৎসাহ নিয়ে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, এসব আমাদের যুবকদের কোনো কাজে আসবে না। আমাদেরকে একজন লেনিন দাও, দেখবে তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সভা ভেঙে গেল। আমি উঠলাম এবং তড়িঘড়ি করে নৌকার দিকে চললাম।
