Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026

    আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ – রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ – রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক পাতা গল্প280 Mins Read0
    ⤶

    বাবাকে যেমন দেখেছি

    বাবার প্রতিভা নিয়ে অসংখ্য লেখা বের হয়েছে। নিশ্চয়ই আরও বের হবে। এ বিষয়ে কিছু লেখা আমার জন্য ধৃষ্টতা। বাবা নিজেই তাঁর স্মৃতিকথা লিখে গিয়েছেন। তাঁর বহু বন্ধুর কাছে অসংখ্য চিঠি লিখে নিজেকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। লক্ষণীয় যে তাঁর স্মৃতিকথাগুলো পুরোপুরি ঘটনার কালক্রম হিসেবে সাজানো নয়। এগুলোতে বরং তাঁর মনের ভিতরটাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। কোনো প্রতিভাধর ব্যক্তিকেই বুঝে ওঠা সহজ নয়। নিছক জীবনের ঘটনাপঞ্জির বর্ণনা তাঁর মত সংবেদনশীল মানুষের ক্ষেত্রে কেবল তাঁর মনের প্রায় অবোধ্য গতিপ্রকৃতির তুচ্ছ বিবরণী হয়ে দাঁড়ায়, এর বেশি কিছু নয়। প্রতিভাধর ব্যক্তিরা মামুলি তথ্যকে সর্বাংশে অতিক্রম করে যান। তিনি এমন এক পৃথিবীতে বাস করেন যেখানে জাগতিক আইন-কানুন চলে না। এটা প্রায় সকল সৃজনশীল শিল্পীর ক্ষেত্রেই সত্য, বাবার বেলায় তো কথাই নেই। তাঁর মধ্যে একাধারে কবি, বিজ্ঞানী, দার্শনিক আর দ্রষ্টার মন একাকার হয়ে গিয়েছিল। এরকম একজন ব্যক্তিকে বোঝার জন্য সম্ভাব্য সকল চেষ্টা চালানো হলেও, তাঁর ব্যক্তিত্ব অস্পষ্ট আর পরিমাপের নিক্তির কাছে অধরাই থেকে যায়।

    তিনি ছিলেন অত্যন্ত মানবিক। পাশাপাশি অত্যন্ত জটিল মনের অধিকারী। স্বভাবে লাজুক এবং সংবেদনশীল, কাজেই কোনো ব্যক্তির সঙ্গে বা কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কী আচরণ করবেন, তা বোঝা যেত না। ছিলেন অত্যন্ত চপলমতি। কখনও কখনও তিনি সব সংকোচ ঝেড়ে ফেলে বন্ধুদের, বিশেষ করে তরুণ ভক্তদের আপ্যায়িত করতেন, হাসি-ঠাট্টায় মজলিস ভরিয়ে রাখতেন। আবার কখনও-বা নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলতেন। তখন তাঁর মনের ভিতরে কী হচ্ছে তা কেউ বুঝতে পারত না। তাঁর সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোতে তিনি বাচ্চাদের সঙ্গে এমনভাবে মিশতেন যেন নিজেও একজন শিশু। এমন প্রেমময়, এমন সম্ভ্রম ও সম্মান-জাগানিয়া কাউকে আমি সারাজীবনে আর দেখিনি।

    তাঁর নিয়ত পরিবর্তনশীল চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ লোকদেরও হিমশিম খেতে হতো। কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে যে বাবা তাঁর ভিতরের মনোভাব এমনকি নিজের কাছেও স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। কাজেই তাঁর কোনো ব্যবহারের কারণ বুঝতে তাঁর নিকটজনদেরও কষ্ট হতো। তাঁর সুকোমল সংবেদনশীলতা, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলোর ক্ষেত্রে, আর অন্যদের জন্য চূড়ান্ত রকমের উৎকণ্ঠা; এ উভয় মিলে প্রায়শ তাঁকে সত্যিকারের বাসনা গোপন করে অন্যরূপ আচরণে বাধ্য করত। আমার ও আমার স্ত্রীর সঙ্গেও বাবা অনেকবার এরূপ করেছেন। আসল ব্যাপারটা ধরতে পেরে আমরা খুব আমোদ পেতাম।

    আমার দাদা তাঁর এ কনিষ্ঠ পুত্রটিকে খুব ভালোবাসতেন। বাবার বাল্যকালেই মহর্ষির চোখে তাঁর প্রতিভা ধরা পড়েছিল। সম্ভবত সে কারণেই তিনি তাঁর ওপর খুব স্নেহশীল ছিলেন। বাড়ির সবচেয়ে ভালো আর সুবিধাজনক ঘরে তাঁকে থাকতে দেয়া হতো। তাতেও যখন তিনি সন্তুষ্ট হলেন না, দাদামশায় তাঁর জন্য আলাদা বাড়িই বানিয়ে দিলেন। এর রঙ ছিল লাল, এজন্য নাম হয়ে গিয়েছিল লালবাড়ি। বাবা সবসময়ই তাঁর পরিপার্শ্ব বদলাতে ভালোবাসতেন। তিনি একটানা বেশিদিন একই ঘরে বা একই বাড়িতে থাকতে পারতেন না। শান্তিনিকেতনের কুড়িটিরও অধিক ঘর তাঁর স্পর্শে ধন্য হয়েছে। কাজেই দাদামশায়ের কাছ থেকে নতুন বাড়ি বানানোর সম্মতি ও সহায়তা পেয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন। আমার চাচাত ভাই নীতীন্দ্রর বাড়ি বানানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। তাকেই এ কাজের ভার দেয়া হল। বাবা বলে দিলেন যে নিচতলা আর দোতলায় কেবল একটা করে হলরুমের মত বড় কক্ষ থাকবে। ভিতরে স্থানান্তরযোগ্য পার্টিশন থাকবে। তাঁর যখন ভিতরটা বদলাতে ইচ্ছে করবে, যেন কেবল পার্টিশন বদলিয়েই তা করে ফেলতে পারেন। তাঁর ইচ্ছেমতই বাড়ি বানানো হল। নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেখা গেল প্রতি তলায় একটি করেই কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু নিচতলা থেকে দোতলায় উঠবার জন্য কোনো সিঁড়ির ব্যবস্থা রাখা হয়নি!

    দাদামশায় যদিও বাবাকে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, খরচের ব্যাপারটা তিনি নিজেই দেখতেন। তিনি অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলতেন। প্ৰত্যেক মাসের দ্বিতীয় দিন হিসেবপত্তর নিয়ে তাঁর সঙ্গে বসতে হতো এবং তাঁকে পড়ে শোনাতে হতো। প্রত্যেকটি অঙ্ক তিনি মনে রাখতে পারতেন, আয়-ব্যয়ের বিবরণ পড়ে শোনানোর সময় প্রায়ই বেমক্কা প্রশ্ন করে বসতেন। বাবা এ দিনটাকে স্কুল-ছাত্রের পরীক্ষা-ভীতির মত ভয় করতেন। আমরা ছোটরা বুঝতে পারতাম না—আমাদের বাবা কেন তাঁর বাবাকে এত ভয় করছেন।

    তরুণ লেখকেরা যেরকম কবিতা লিখে সেরকম নয়, বরং বাবা ভক্তিমূলক গীতিকবিতার একটি বই লিখেছেন শুনে মহর্ষি অত্যন্ত অবাক ও আনন্দিত হলেন। তিনি একদিন বাবাকে ডেকে পাঠালেন এবং সব কবিতা শুনতে চাইলেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে গভীর মনোযোগের সঙ্গে মহর্ষি বাবার আবৃত্তি শুনলেন। শেষে বাবা যখন গাইতে শুরু করলেন, দাদামশায়ের গাল বেয়ে নীরব অশ্রুধারা বইতে লাগল। বাবার গান শেষ হতেই দাদা তাকে এগুলো প্রকাশ করার খরচ প্রদান করলেন। শোনা যায় যে দাদা তাঁকে বলেছিলেন, “আমি রাজা হলে হয়ত তোমার এ প্রতিভার যথাযথ পুরস্কার দিতে পারতাম। আমার সাধ্যানুসারে আমি কেবল এটুকুই দিতে পারলাম।” কবিতাগুলো নৈবেদ্য নামে প্রকাশিত হয়েছিল। এ গ্রন্থের অনেক কবিতার অনুবাদ ইংরেজি গীতাঞ্জলির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

    Books & Literature

    বাবা কখনোই সন্তানদের সঙ্গে কর্কশ ব্যবহার করতেন না, আবার স্নেহের আতিশয্যও দেখাতেন না। এমন একটি ঘটনার কথাও আমার মনে পড়ে না যে তিনি আমাদেরকে প্রহার করেছেন। প্রকৃতিগতভাবেই তাঁর পক্ষে সহিংসতা অবলম্বন করা অসম্ভব ছিল। বাল্য ও কৈশোরের সব বছর মিলিয়ে মাত্র তিনবার তিনি আমার ওপর যাকে বলে সত্যিকারের রাগ করেছিলেন। ছেলেবেলায় গোসল করতে আমার ভালো লাগত না। গোসল তো নয় যেন দলাই মালাই করে শরীরের ওপর প্রতিদিন নিয়মিত অত্যাচার চালানো। একদিন মা অনেক চেষ্টা করেও আমাকে স্নান করাতে পারলেন না। তখন বাবাকে বললেন। তিনি আমাকে তুলে নিয়ে একটি আলমারির উপর বসিয়ে দিলেন। বকাঝকা করলেন না, এমনকি একটা কঠিন শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করলেন না। এর পর থেকে গোসল করা নিয়ে মা’র সঙ্গে আর কখনও ঝামেলা করিনি।

    আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল শিলাইদহে। আমি শুনেছিলাম যে দুর্গাপূজার শেষদিন পদ্মার পাবনাসংলগ্ন তীরে নৌকাবাইচ হয়। ছোট কিন্তু সুন্দর ইছামতী নদীর মোহনায় এদিন শতশত নৌকা জমায়েত হয়। সন্ধ্যায় হাজার হাজার বাতি জ্বলে উঠে জায়গাটাকে অপরূপ করে তোলে। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি টেনেছিল নৌকাবাইচের আকর্ষণ। মাছধরা নৌকার মতই এক ধরনের নৌকা, খুব সরু আর লম্বা, সার বেঁধে দাঁড়ায়। একেকটি নৌকায় কুড়িজন বা তার বেশি বৈঠাধারী থাকে। কার নৌকা আগে যেতে পারে তার তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। পদ্মার পাড়ে আমাদের বেশ কিছুদিন বসবাস হয়ে গিয়েছে। মা আমাকে মাসে পাঁচ টাকা হাতখরচ দিতেন। সেগুলোর প্রতিটি কানাকড়ি জমিয়ে আমি একটি ডিঙি নৌকাও কিনেছিলাম। ফলত ততদিনে নিজেকে বেশ পাকা নাবিক ভাবতে শুরু করেছি। কাজেই এমন সুযোগ হেলায় হারাই কীভাবে? আমাদের দুইটি ডিঙি নৌকা ছিল। ম্যানেজারকে স্তুতিবাক্য আর মিষ্টি কথা দিয়ে বড় ডিঙিটি বের করতে রাজি করিয়ে ফেললাম। পদ্মা পাড়ি দেয়ার জন্য এটিকে প্রস্তুত করা হল। ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে এই সময়ে পদ্মা সবচেয়ে প্রমত্তা। প্রায় সাত মাইল প্রশস্ত ঘূর্ণিময় জলের এই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অন্য পাড়ে গমন মুখের কথা নয়। আমরা অনুমানও করতে পারিনি সামনে কী কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বাবা সহজেই অনুমতি দিলেন। এ ধরনের উদ্যোগে, তা যতই বোকার মত হোক না কেন, তিনি কখনও মানা করতেন না। কেবল খোঁজ নিতেন যে ঠিকমত প্রস্তুতি নিয়েছি কি না। খুব সকালেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। জলের দেবতার দোয়া চেয়ে মাঝি নৌকা ছেড়ে দিল।

    স্রোত এত তীব্র ছিল যে পাবনার পাড়ে পৌঁছতে সারা দিন লেগে গেল। দূর থেকে আমরা বাতির মিছিল দেখতে পাচ্ছিলাম। ম্যানেজার এবং আমার এক চাচা ইতোমধ্যে অস্থির হয়ে পড়েছেন। তারা বলতে লাগলেন যে আমাদের এক্ষুনি ফেরা উচিত। বাবা নিশ্চয়ই চাইবেন যে আমরা যেন রাতের খাওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু হা হতোস্মি। আমি তাঁদের কথায় কান দিলাম না। বরং হালের কাছে গিয়ে গাঁট হয়ে বসলাম। নৌকাবাইচ শুরুর ঠিক আগে আগে আমরা ওখানে গিয়ে পৌঁছলাম। শখানেক বা তারও বেশি নৌকা লম্বা দুই লাইনে তৈরি হয়েই ছিল। আনন্দমুখর চিৎকারের তালে তালে যে বাইচ শুরু হল তার কাছে অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজের নৌকাবাইচ কিছুই না। সূর্যাস্তের সোনালি আভা যেন চারদিকে গলে গলে পড়ছিল। তারই ক্যানভাসে চমৎকারভাবে নির্মিত তরবারির মত শানিত নৌকাগুলোর অবিশ্বাস্য বেগে সামনে ধাবিত হবার দৃশ্য আমি কখনও ভুলব না। বাংলার এ প্রাচীন ঐতিহ্য দর্শন করতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। পাবনায় এমন নৌকাবাইচ পরে আর কখনও হয়নি। এই চমৎকার খেলাটি বুঝি বাংলা থেকে বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছে।

    নৌকাবাইচ শেষে বিসর্জনের পালা। নানানভাবে সজ্জিত দেবীর অসংখ্য মূর্তি যখন নদীবক্ষে ডুবিয়ে দেয়া হচ্ছে, আকাশে তখন আমাদের অলক্ষ্যে মেঘ জমছে। ঘোর অন্ধকারে আমরা শিলাইদহ অভিমুখে ফিরতি যাত্রা করলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পথের দিশা হারিয়ে ফেললাম। আমাদের সঙ্গে সশস্ত্র সিপাই ছিল। তারা একটু পরপর শূন্যে ফাঁকা গুলি ছুড়তে লাগল। এইরকম গুলির উত্তরে শিলাইদহের ঘাট থেকে যদি পাল্টা গুলির শব্দ শোনা যায় তাহলে তার আওয়াজ ধরে ঘাটে পৌঁছানো যাবে, সেই আশায়। শেষ পর্যন্ত সংকেত পাঠানোর এই পদ্ধতি কাজে এল। শিলাইদহের দিক থেকে পাল্টা গুলি হল। রাত দুটোয় আমরা প্রথম এরকম গুলির শব্দ শুনলাম। তারপর সেদিকে মুখ করে নৌকা চালানো হল। ঘাটে নেমে দেখতে পেলাম বাবা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। হারিকেনের আলোয় তার যে থমথমে মুখ দেখলাম, ভয় পাওয়ার জন্য তা-ই যথেষ্ট ছিল। একটিও কথা না বলে তিনি দ্রুত কুঠিবাড়ির পথ ধরলেন। পরেও এ নিয়ে কোনো রাগ দেখাননি বা কটুকাটব্য করেননি। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁর নীরবতাকে ভয়ংকর মনে হতো। মনে হতো, শাস্তি দিলেও এর চেয়ে ভালো ছিল। কেবল আমিই নই, আরও অনেকের কাছেই এর প্রমাণ মিলবে।

    তৃতীয় ঘটনাটি কয়েক বছর পরে শান্তিনিকেতনে ঘটেছিল। সুরুলে বনভোজনে যাওয়া হবে। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হল কয়েকজন তরুণ শিক্ষককে সংগঠিত করার। শ্রীনিকেতনে পল্লীসংগঠন বিভাগ স্থাপনের বহু আগের ঘটনা এটি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক নির্মিত বড় কুঠির ধ্বংসাবশেষে আমরা তাঁবু ফেললাম। পূর্বে এটা ছিল জন চিপ নামক এক নীলকরের আস্তানা। মধ্যরাত পেরিয়ে দিনের প্রথম প্রহর পর্যন্ত আমরা আনন্দ করলাম। শান্তিনিকেতনে যখন ফিরে এলাম, কোনো শিক্ষকেরই আর দুপুরে ক্লাস নেয়ার মত অবস্থা ছিল না। সবাই মনে মনে ছুটি চাচ্ছিলেন। কিন্তু কেউই বাবাকে সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। যেহেতু আমার উপস্থিতিতে আশ্রমের শৃঙ্খলা পরিপন্থী ঘটনাটি ঘটেছিল, সে দায়িত্ব আমিই নিলাম। বুকের ভিতরের অপরাধী ভাব গোপন রেখে চেহারায় যথাসম্ভব সাহস ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। বাবা কেবল জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা মজা পেয়েছিলে তো?” বাবাকে শোনাতে বিলম্বের কত যে সাফাই দাঁড় করিয়েছিলাম, তাঁর কণ্ঠ শুনেই সব কোথায় উবে গেল। কোনোরকমের ব্যাখ্যা দেবার চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দ্রুত ফিরে এলাম। এর পর থেকে বাবা কষ্ট পেতে পারেন এমন কাজ সচেতনভাবে আর কখনও করিনি।

    কবি হিসেবে বাবা স্বীকৃতি পেয়েছেন পরিণত বয়সে। তবে সমাজকর্মী হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন সেই তরুণ বয়স থেকেই। তাঁর অত্যন্ত সুন্দর কান্তি আর কণ্ঠমাধুর্য হয়ত তাঁর জনপ্রিয়তার কিছুটা কারণ হয়ে থাকবে। কিন্তু এর জন্য তাঁকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছিল। একবার তিনি ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছিলেন। হল ছিল কানায় কানায় পরিপূর্ণ, আর বক্তৃতাটাও ছিল লম্বা। বাবা যথাসম্ভব উঁচু স্বরে প্রায় দেড় ঘণ্টা কথা বললেন। বক্তৃতা শেষ হলে শ্রোতারা বাবার গান শুনতে চাইল। কিন্তু বাবা বুঝতে পেরেছিলেন যে এত দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা করার পর তাঁর পক্ষে আর গান গাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বঙ্কিমবাবু নিজেও যখন গান গাওয়ার অনুরোধ করলেন, তিনি আর না করতে পারলেন না। বাবা গাইলেন। সুরেলা আওয়াজে হল ভরিয়ে দিয়ে এমনভাবে গাওয়া কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত চাপ নিয়েছিলেন। ফলে স্বরনালী ক্ষতিগ্রস্ত হল। বায়ু পরিবর্তন আর বিশ্রাম গ্রহণ করতে তিনি সিমলা গেলেন। কিন্তু আগের সে কণ্ঠ আর ফিরে এল না।[১]

    বাবা ভালো জামাকাপড় পরতে পছন্দ করতেন। যৌবনে জনসমক্ষে বের হতেন ধুতি, রেশমি কুর্তা আর রেশমি চাদর পরে। এই বাঙালি পোশাকে তাঁকে খুব সুন্দর মানাত। লোকে তাঁর কুর্তার রং বা তাঁর চাদর পরার ধরনের প্রশংসা ও তা অনুকরণের চেষ্টা করত। অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে ভ্রমণের সময় তিনি ট্রাউজার আর বোতামযুক্ত লম্বা কোট বা আচকান এবং একটি ছোট পাগড়ি পরতেন। এই ভাঁজযুক্ত পাগড়িটি আমার জ্যাঠামশাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবিষ্কার। লোকে একে পিরালি পাগড়ি বলত। এরও বহু বছর পরে, তিনি খাটো আচকান পরা বাদ দিয়ে দিলেন। এর স্থান দখল করল জোব্বা। কখনও কখনও একই সঙ্গে দুটি জোব্বাও ব্যবহার করতেন। আর মাথায় পরতে শুরু করলেন নরম টুপি। রঙিন কাপড়ে তাঁর অনীহা ছিল না। ভালোবাসতেন ঈষৎ কমলা মিশ্রিত হালকা বাদামি রঙ। বাবার শেষ জীবনে যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই তাঁকে এ মৃদু অথচ প্রশান্তিকর পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই দেখতে পেয়েছেন।

    এ প্রসঙ্গে একটি বিশেষ ঘটনার কথা বলতে চাই। বাবা ও গান্ধীজির মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। কিন্তু বহিরঙ্গে এ দুজনের মধ্যে কোনোরূপ সাদৃশ্য ছিল না। গান্ধীজি কেবল কোনোরকমে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা পোশাক পরতেন। অন্যদিকে বাবা পরতেন লম্বা রঙিন জোব্বা। এ পার্থক্য লোকের চোখ এড়ায়নি। আমি এমনও শুনেছি যে কেউ কেউ বাবাকে বিলাসী বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁরা হয়ত ভাবতেন যে বাবার পোশাক-আশাক খুব দামি। আসলে তা নয়। সেগুলোর অধিকাংশেরই দাম বেশি ছিল না। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও গড়ন এমন ছিল যে তাঁর গায়ে নিতান্ত সাধারণ কাপড়ও রাজার পোশাকের মত দেখাত। আবার হয়ত দেখা গেল বেশ অভিজাত পরিধেয়ও নিতান্ত মামুলি ঠেকছে। আর গান্ধীজির কটিবাস ছিল ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ বস্ত্রহীন মানুষের প্রতীক। নিশ্চয়ই তার গুরুত্ব ছিল। তাই বলে বাবার রুচিশীল পোশাক যে অতিরিক্ত ছিল তা নয়। গান্ধীজি চান বা না চান, তাঁর দেখানো পথেই আমাদের জাতীয় জীবনেও কৃচ্ছ্র সাধনের প্রভাব পড়েছে। বাবা এরকম কৃচ্ছ্র সাধনের পক্ষপাতী ছিলেন না। ভারতবর্ষের মত একটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশে, লোকে যেখানে বঞ্চনা ছাড়া কিছু পায় না, সেখানে ত্যাগের মন্ত্র জনগণের আদর্শ হতে পারে না। বরং তারা যেন জীবনের উৎকৃষ্ট সামগ্রীর স্বাদ নিতে পারে, তাদেরকে সেদিকে উৎসাহিত করা উচিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সত্যিকারের কী প্রয়োজন তা গুলিয়ে ফেলার কারণে জীর্ণ পোশাক আর অগোছালো আচার-ব্যবহার বড় সদগুণ হিসেবে সমাজে আদৃত হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এ প্রবণতা বাবার শিল্পীসুলভ চৈতন্যকে আঘাত করেছিল।

    জীবনের বেশির ভাগ সময়জুড়ে বাবা যে তীব্র ও অন্যায্য সমালোচনার শিকার হয়েছেন, খুব কম লেখককেই তেমন আঘাত সইতে হয়েছে। এগুলোর খুব কমই সাহিত্য-সমালোচনা ছিল। তিক্ত তো ছিলই, কখনও কখনও এমনকি অশালীনও ছিল। একশ্রেণির বাংলা সংবাদপত্রে নিয়মিতভাবে এরূপ কটুকাটব্যের কারণ ছিল কাগজের কাটতি বাড়ানো। অবশ্য আরও গূঢ়তর একটা কারণ ছিল। এ দেশের লোকদের একটা বড় অংশ কখনোই তাঁকে আপন ভাবতে পারেনি। তাঁর জন্ম হয়েছে অভিজাত পরিবারে, তিনি লিখেছেন একেবারে নিজস্ব এক ভাষায় যার সঙ্গে আগের বা সমসাময়িক লেখকদের সঙ্গে কোনো মিল নেই। অধিকন্তু, তিনি ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত, যাঁরা গোঁড়া হিন্দুত্বকে সংস্কার করতে চাওয়ায় সমাজের চোখে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিলেন। এ সকল কারণেই সম্ভবত কেবল নামকাওয়াস্তে লেখকরাই নয়, বরং দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও চিত্তরঞ্জন দাশের মত বিখ্যাত মানুষেরাও বাবার বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলার তরুণদের ওপর বাবার প্রভাব ক্ষুণ্ন করা। এ কথা বলা যাবে না যে, এ সকল আক্রমণ বাবার মনে দাগ কাটেনি। তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন যখন দেখলেন যে যাঁদেরকে পছন্দ করতেন, যাঁদের ক্যারিয়ার গঠনে সাহায্য করেছেন, তারাই তাঁর সবচেয়ে তিক্ত সমালোচকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনোই এসব সমালোচনার উত্তর দেননি। একবার কেবল ‘নিন্দুকের প্রতি’ নামক একটি কবিতা লিখেছিলেন। কিন্তু সেটাও ছিল অত্যন্ত সংযত ভাষায়, তাতে কোনো তিরস্কার ছিল না।

    সারাজীবন ধরেই তিনি নিঃসঙ্গতায় ভুগেছেন। এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক নিঃসঙ্গতা, তাঁর মাপের প্রতিভাধরমাত্রই যাঁর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। সন্দেহ নেই তাঁর অনেক বন্ধু ছিলেন, কিন্তু তাঁরা ছিলেন তরুণ ভক্ত, যাঁরা তাঁর মনের খিদে মেটাতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর অন্য বিবেচনায় নিঃসঙ্গ জীবনে এরূপ ভক্তের উপস্থিতিরও আলাদা মূল্য ছিল। তাঁদের ভালোবাসা এবং ভক্তির উষ্ণতা আনন্দ বয়ে আনত। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- সত্যেন্দ্ৰনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল গাঙ্গুলি, হেমেন্দ্রকুমার রায়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থ, নরেন্দ্র দেব, অমল হোম, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, যতীন্দ্রমোহন এবং দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচি। এই তরুণ কবি ও লেখকের দলটি নিয়মিতভাবে সুকিয়া স্ট্রিটের একটি বাড়িতে জমায়েত হতেন। এটি ছিল মণিলাল গাঙ্গুলির অফিস। তিনি ছিলেন কান্তিক প্রেসের ম্যানেজার আর ভারতী পত্রিকার প্রকাশক- সম্পাদক। তাঁরা বাবার সবকিছুরই কট্টর সমর্থক ছিলেন। বাবার ‘সম্মান’ বাঁচানোর জন্য এরা এমন যুদ্ধংদেহী ছিলেন যে তাঁরা ‘রাবীন্দ্রিক’ নামে পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন।

    শান্তিনিকেতনে শিক্ষা বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য বাবাকে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয়েছে তা খুব কম লোকই জানত বা বুঝত। স্কুলটি যখন প্রতিষ্ঠা হল দেখা গেল ছাত্র নেই। যারা এল তারাও ছিল বেয়াড়া প্রকৃতির। লোকেরা প্রতিষ্ঠানটিকে অবজ্ঞা করত এবং বাবার নতুন ধ্যান-ধারণা চালুর চেষ্টাকে উপহাস করত। এ বিদ্যালয় যে শিক্ষা গ্রহণে অনিচ্ছুক ছাত্রদের সংশোধনাগার নয়, তার চেয়ে বেশি কিছু—এটা বোঝাতেই কয়েক বছর লেগে গেল। এর মধ্যে বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে এল শাসকদের সন্দেহ। ইংরেজরা সরকারি কর্মচারীদের সতর্ক করে দিয়ে গোপন সার্কুলার জারি করল যে তারা যেন তাদের সন্তানদের শান্তিনিকেতনে না পাঠায়।[২] বৈষয়িক দিক থেকে ভাবলে বাবার জন্য এমন একটি কাজে হাত দেয়া বোকামি ছিল। তাঁর তখন নিজের সংসার চালানোর মতই টাকা নেই। তার ওপর কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ে লোকসান হবার কারণে তিনি ঋণগ্রস্ত। স্কুল শুরু করতে গিয়ে তাঁর সবকিছু, এমনকি মায়ের অলঙ্কার পর্যন্ত বিক্রয় করে দিতে হয়েছিল। বিক্রয় করে দিতে হয়েছিল বিয়ের সময় উপহার হিসেবে পাওয়া চেইনওয়ালা সোনার ঘড়িটিও। ছোটবেলায় এই ঘড়িটি আমাদের খুব প্রিয় ছিল। আমরা ঘড়িটির ঢাকনা খুলে ভিতরের খোদাই করা মনোগ্রামটি দেখতে পছন্দ করতাম। ঘড়িটি কিনেছিলেন বাবারই এক বন্ধু। যে ভদ্রমহিলা এটি কিনেছিলেন, ১৯১০ সালে তিনি এটি ফিরিয়ে দেন।[৩]

    আমি এতে খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তখন থেকে আমি ঘড়িটিকে সযত্নে সংরক্ষণ করছি।

    শান্তিনিকেতনের আকার বছরে বছরে বৃদ্ধি পেল, সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেল টাকা-পয়সার টানাপড়েন। টাকার জন্য বাবাকে তাঁর বন্ধু লোকেন পালিতের বাবা স্যার তারকনাথ পালিতের কাছে হাত পাততে হল। স্যার তারকের জীবদ্দশায় বাবা এ ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে দিয়েছিলেন। ফলে এবার কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হল পাওনাদার। এ ঋণ নিয়ে বাবা অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তিনি বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ যতটা পেয়েছেন, ধনের দেবী লক্ষ্মীর প্ৰসাদ ততটা পাননি। দুর্ভাগ্য ও মন্দ ভাগ্য যেন পালা করে তাঁর কাছে আসত। ১৯১৬-১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের সিরিজ বক্তৃতা থেকে প্রচুর টাকা উপার্জন হয়েছিল। এ সফরের জন্য বাবা শ্রান্তি-ক্লান্তি ভুলে পরিশ্রম করেছেন। তাঁর আশা ছিল যে, এবারে তিনি প্রচুর টাকা পাবেন যা দিয়ে সমস্ত ঋণ তো পরিশোধ করা যাবেই, উপরন্তু শান্তিনিকেতনকে গড়ে তোলার জন্যও আর কারও কাছে হাত পাততে হবে না। কিন্তু বিধি বাম। মন্দভাগ্য আবারও তাঁর আশায় ছাই ঢেলে দিল। যে সংস্থাটি এ সফরের ব্যবস্থা করেছিল, সফরের শেষ দিকে এসে তারা দেউলিয়া হয়ে গেল। বাবার বেশ কয়েক লাখ টাকা প্রাপ্য হয়েছিল। বাবার সঙ্গী উইলি প্যাটারসন কেবল কয়েক হাজার রুপি আদায় করে দিতে পেরেছিলেন। এ টাকা দিয়ে কোনো রকমে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা মেটানো গিয়েছিল।

    ইউরোপে বিক্রীত বই থেকেও বাবা অনেক টাকা পেতে পারতেন। কিন্তু যখন তাঁর খ্যাতি তুঙ্গে উঠেছে, তখনি লাগল প্রথম মহাযুদ্ধ। ফলে রয়্যালটি থেকেও তেমন টাকা পাওয়া গেল না।

    Books & Literature

    শান্তিনিকেতনকে টিকিয়ে রাখার জন্য বাবাকে নিয়মিত টাকা সংগ্রহের অভিযানে বের হতে হতো। ১৯২০ সালে নিউইয়র্কে এরকম একটি সফরে আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম। সেবারে অর্থ সংগ্রহের জন্য বেশ সংগঠিতভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল।

    মিসেস উইলার্ড স্ট্রেইট এবং মিস্টার মর্গ্যানথু (সিনিয়র)-এর চেষ্টায় ওয়ালস্ট্রিটের লাখপতিদের বড় একটি দল বেশ মোটা অঙ্কের অনুদান দেবেন মর্মে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। মর্গ্যানথু নিজেও ওয়ালস্ট্রিটের একজন বিনিয়োগকারী ছিলেন। তাছাড়া কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ব্যাপারটা চূড়ান্ত করতে তিনি তাঁর বাড়িতে এক ভোজসভার আয়োজন করেন এবং শতাধিক ধনী বন্ধুবান্ধবকে আমন্ত্রণ জানান। আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে বাবা অন্তত কয়েক লাখ ডলার নিয়ে ফিরতে পারবেন। কিন্তু কয়েক লাখ তো দূরের কথা, কয়েক হাজার ডলারও তিনি পাননি।

    তিক্ত ও হতাশ মন নিয়ে বাবা দেশে ফিরলেন। নিউইয়র্কের ব্যস্ততা আর হৈ-হট্টগোল বাবার ভালো লাগার কথা নয়। তবু কেবল শান্তিনিকেতনের জন্য অর্থ সংগ্রহের মানসে তিনি সেখানকার হোটেলে কয়েক সপ্তাহ কাটালেন। তাঁর সংবেদনশীল মন এর বিপক্ষে ছিল। এ সময়ে সিএফ এন্ড্রুজ-এর নিকট লিখিত চিঠিপত্রে তিনি তাঁর মনোবেদনা উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন। আমার জন্যও তা কম পরীক্ষার ছিল না। কেবলি মনে হচ্ছিল যে বাবার এ কষ্টের জন্য আমিই দায়ী। কেননা, আমি তাঁকে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করেছিলাম। পরে জানা গিয়েছিল যে বৃটিশ সরকারের বিরোধিতার কারণে একেবারে শেষ মুহূর্তে ওয়ালস্ট্রিটের লাখপতিরা নিজেদের হাত গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ইংরেজরা এমন ধারণা দিয়েছিল যে ভারতের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরাসরি সাহায্য দেয়াকে তারা সাধুবাদ জানাবে না।[৪]

    বাবার এবং শান্তিনিকেতনে তাঁর কাজের কদর বিত্তবান মানুষদের বোঝার কথা নয়। অথচ প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাছেই টাকা চাইতে হচ্ছে, বাবার জন্য এটা ছিল গভীর বেদনার বিষয়। ফলে টাকা চাইবার জন্য সমস্ত যোগাড়যন্ত্র করা হলেও, একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন কেবল মুখ ফুটে চাইবার কথা, তখনি তিনি সংকোচে ভুগতেন। কিছুতেই টাকার কথা বলতে পারতেন না। একবার আমাদের বন্ধু বোম্বের এক ব্যবসায়ী বরোদার গায়কোয়াড়ের সঙ্গে বাবার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন। সিদ্ধান্ত হল যে তাঁর নিকট মোটা দাগের সহায়তা চাওয়া হবে। গায়কোয়াড় তখন লুজান-এ বাস করছেন। ঐ বন্ধুটি আমাকে বললেন যে বাবার বিষয়ে গায়কোয়াড়ের বেশ আগ্রহ আছে। বন্ধুটি ইতোমধ্যে এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তাও বলে রেখেছেন। গায়কোয়াড় এত পরিমাণ অনুদান দেবেন যে শান্তিনিকেতন একটা ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাবে। টাকার জন্য বাবাকে আর দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে হবে না। আমি লুজান গিয়ে মহারাজাকে বাবার সঙ্গে আমাদের জেনিভার হোটেলে মধ্যাহ্নভোজে দাওয়াত করে আসলাম। দেখা গেল খাবার টেবিলে তাঁরা বেশ আলাপে মেতে উঠেছেন। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তাঁরা এমন মগ্ন হয়ে যাচ্ছিলেন যে আমি আর আমার বন্ধু আসল কথা তোলার কোনো সুযোগই পাচ্ছি না। শেষ পর্যন্ত বাবা বুঝি আমাদের চোখে-মুখের ভাষা বুঝতে পারলেন। তখন তাড়াতাড়ি করে তাঁর ইউরোপে আগমনের উদ্দেশ্য খোলাসা করলেন, আর বললেন যে মহারাজা যদি-বা কিছু অনুদান দিতে মনস্থির করে থাকেন, তাহলে যেন ধরে নেন যে টাকাটা জলে গেছে। এ কথা শুনে আমার বোম্বের বন্ধু টেবিলের নিচ দিয়ে আমার পায়ে ধাক্কা দিলেন। বরোদার মহারাজা নীরবতা অবলম্বন করলেন, আর কোনোরূপ প্রতিশ্রুতি না দিয়েই চলে গেলেন।

    শেষ পর্যন্ত মহাত্মাজি বাবার বেদনা বুঝতে পারলেন। বুঝতে পারলেন কোন্ পরিস্থিতিতে একজন কবিকে টাকার জন্য দেশ-বিদেশ চষে বেড়াতে হয়। ১৯৩৬ সালে দিল্লিতে দুজনের দেখা হল। বাবা তখন শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের দিয়ে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ করাচ্ছেন। উদ্দেশ্য অর্থ সংগ্রহ। মহাত্মা আমাদের কাছে জানতে চাইলেন শান্তিনিকেতনের জন্য মোট কত টাকার প্রয়োজন, যার জন্য বাবা দুশ্চিন্তা করছেন। বাবা দিল্লি ত্যাগ করার আগেই গান্ধীজি সে অঙ্কের একটি চেক তার হাতে তুলে দিলেন। টাকাটা তিনি এর মধ্যে সংগ্রহ করে রেখেছিলেন।[৫] চেকটা দিয়ে তিনি অনুরোধ করলেন বাবা যেন আর কোনোদিন টাকার জন্য বের না হন।

    গান্ধীজির কাছ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে অর্থ পেয়ে দলের সকলের আনন্দ দেখে কে। কিন্তু বাবা আনন্দে মেতে উঠলেন না। তাঁর মুখে বরং বিষাদের ছায়া পড়ল। কারণ বুঝতে দেরি হল না। বাবা যে কেবল টাকার জন্যই বেরোতেন, তা তো নয়। অভিনয়ের দলবল নিয়ে বেরোলে তাঁর শারীরিক কষ্ট হতো ঠিকই, কিন্তু মিলত মানসিক প্রশান্তি। দর্শকদের সামনে রং, রস, নৃত্য-গীতে নিজের সৃষ্টি মূর্ত হয়ে উঠত দেখে তিনি অপরিমেয় আনন্দ পেতেন। গান্ধীজির সংগ্রহ করা টাকায় সাময়িক অর্থাভাব ঘুচল ঠিকই, কিন্তু তাঁর অনুরোধ রাখতে গেলে এখন থেকে বাবাকে সে আনন্দ হতে বঞ্চিত হতে হবে।[৬]

    সংগীত এবং অভিনয় ছিল বাবার শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা বলতে তিনি বুঝতেন নন্দনতাত্ত্বিক চেতনার বিকাশ এবং পরিপূর্ণ আত্মপ্রকাশ। জীবনের পূর্ণতর রূপের অনুসন্ধানই ছিল শান্তিনিকেতনী শিক্ষাব্যবস্থার মূল কথা এবং প্রধান সাফল্য। প্রতিষ্ঠানটি যদিও শহর থেকে দূরে পল্লী অঞ্চলে অবস্থিত, এর ছাত্রদের সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্যগীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে সে আদর্শ দিকবিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কথা বললে বাড়াবাড়ি হবে না যে শান্তিনিকেতন ভারতীয়দের, বিশেষত বাঙালিদের রুচি গঠনে বিরাট অবদান রেখেছে।

    বাবা মূলত আশাবাদী আর প্রফুল্ল চিত্তের মানুষ ছিলেন। সেইসঙ্গে ছিল তাঁর তীব্র রসবোধ। সারা জীবন ধরে তিনি যে উত্থান-পতনের মুখোমুখি হয়েছেন, উল্লেখকৃত শক্তির কারণে তিনি সেগুলো সহজে সামলাতে পেরেছেন। যত বেদনা তাঁকে সইতে হয়েছে, অর্থকষ্টকে সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোটই বলা যায়। তাঁর যখন মাত্র ৪১ বছর বয়স, তখন স্ত্রী, মানে আমার মা মারা যান। তখন তিনি সমানে সাহিত্য রচনা করে চলেছেন। সৃষ্টিশীলতার মধ্যগগনে মায়ের মৃত্যু প্রথম আঘাত হয়ে এল। পাঁচ সন্তানের দেখাশুনার ভার তার ওপর পড়ল। আমার দুবোন তখন বিবাহিত, আর সবচেয়ে ছোট ভাইটির বয়স মাত্র আট বছর।

    বাবাকে এই সময় যে-কোনো মানুষের সহ্য করার অতিরিক্ত চাপ বইতে হচ্ছিল। নিজের সন্তানদের দেখাশুনা করা ছাড়াও শান্তিনিকেতনের শত শত ছাত্র-ছাত্রীকে মানুষ করার দায়িত্বও ছিল তাঁর। কিন্তু পরীক্ষার এখানেই শেষ হয়নি। এ যেন ছিল শুরুমাত্র। একে একে তাঁর পিতা, নিজের দুই মেয়ে আর আদরের ছোট ছেলে মারা গেল। যৌবনের মধ্যগগনে মারা গেল আমার দুই চাচাত ভাই, বলেন্দ্র আর নীতীন্দ্র। এ দুজনকে বাবা নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতেন। চলে গেলেন সতীশ রায় আর মোহিতচন্দ্র সেনও। এদের মৃত্যুতে বাবা শান্তিনিকেতন স্কুলের সবচেয়ে বড় দুই সমর্থককে হারালেন। এই নিদারুণ দুঃখ ও যাতনার বছরগুলোতে বাবার শরীরও ভালো যায়নি। তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন। যে মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে তিনি প্রিয়জনদের হারানোর বেদনা বয়েছেন, তার তুলনা মেলা ভার। কিন্তু তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হল, এ সকল বিচ্ছেদ তাঁর কলমকে থামিয়ে দিতে পারেনি, পারেনি তাঁর চিত্তের প্রশান্তিকে বিনষ্ট করতে। বরং বেদনা ও শোক যেন তাঁর লেখনীকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে তুলেছে।

    বাবার কর্মক্ষমতা ছিল অস্বাভাবিক রকমের বেশি। শরীরের গাঁথুনি ছিল মজবুত। বাল্যকালের নিয়মিত শরীরচর্চা তাঁকে আরও শক্তপোক্ত করে তুলেছিল। ব্যায়াম করাতেন আমার জ্যাঠাদের একজন। আর ছিলেন একজন পেশাদার ব্যায়ামবিদ, যিনি তাঁকে কুস্তি শেখাতেন। সব মিলিয়ে শক্তপোক্ত শরীরের অধিকারী। যেখানেই যেতেন, সুস্বাস্থ্য আর সৌম্য কান্তি সবার নজর কাড়ত। ছোট ছোট করে ছাঁটা দাড়ি আর কোঁকড়ানো লম্বা চুলের ঢেউ তাঁর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। শেষ জীবনে তাঁর ছিল শ্বেতশুভ্র দীর্ঘ দাড়ি আর পরতেন লম্বা জোব্বা। তাঁর এ প্রশান্তিকর মূর্তি দেখে পশ্চিমের অনেকে বলত, “ইনি তো দেখছি আমাদের যিশুর মত”!

    একেবারে শেষের বছরগুলোতেও তাকে ছোটখাটো কোনো রোগব্যাধিতে ভুগতে দেখিনি। অবশ্য একটি দুরারোগ্য ব্যাধি তিনি বংশগতভাবেই পেয়েছিলেন। ১৯১২ সালে অস্ত্রোপচার করে সেটিও সারিয়ে তোলা হয়। পরবর্তী বহু বছর, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত তিনি সুস্থই ছিলেন। জীবনভর সারাদিন কাজ করেছেন। তাঁর দিন শুরু হতো ভোর চারটায়। আধাঘণ্টা বা তাঁর একটু বেশি সময় ধ্যান করে লেখার টেবিলে গিয়ে বসতেন। একা একা নাস্তা করতে পছন্দ করতেন না। এসময় কারও না কারও সঙ্গ চাইতেন। কিন্তু এত সকাল সকাল নাস্তা করতেন যে দেখা যেত যার সঙ্গে বসে খাওয়ার কথা তিনিই তখন পর্যন্ত আসতে পারেননি। বাবা তখন তাকে আনার জন্য লোক পাঠাতেন এবং তার না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। এটা অবশ্য তাঁর মন ভালো থাকার সময়ের কথা বলছি। এ সময় তিনি রসালো গল্প বলতেন, কৌতুক করতেন আর বুদ্ধিদীপ্ত আলাপে নাস্তার টেবিল মাতিয়ে রাখতেন।

    কবিতা, উপন্যাস, আর প্রবন্ধ লেখা, গানে সুর দেয়া, একই সঙ্গে বাবা অনেক লেখালেখি করতেন। এর পরও কীভাবে দর্শনার্থীদের এত সময় দিতেন, সে এক আশ্চর্যের ব্যাপার। যে যে-কারণেই এসে থাকুক না কেন, দর্শনার্থীদের তিনি কখনও বসিয়ে রাখতেন না। উটকো লোকদের ভিড় থেকে বাবাকে বাঁচানোর জন্য তাঁর একান্ত সচিবদের গলদঘর্ম হতে হতো। বাবা টের পেলে তাঁদের বকুনি লাগাতেন। তিনি দিনের বেলায় বিশ্রাম নিতেন না। এমনকি গ্রীষ্মকালের সবচেয়ে গরমের দিনগুলোতেও তিনি টেবিলে বসে একমনে কাজ করতেন। দরজা-জানালা থাকত খোলা। সেগুলো দিয়ে গরম হাওয়া ঢুকছে কি-না সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ ছিল না। পড়াশোনা করতেন রাতে। তিনি ঘুমাতেনও দেরি করে, ফলে লম্বা সময় ধরে পড়তে পারতেন। চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুম তার লাগত না। ছিল অখণ্ড মনোযোগ। অন্যান্য কাজের পাশাপাশি এই যে এত লেখালেখি করতে পেরেছেন, আবার দর্শনার্থীদেরকেও এত সময় দিতে পেরেছেন, মনঃসংযোগের গভীরতার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। কিছুই তাঁর চিন্তার সুতো ছিঁড়তে পারেনি। কোনো কবিতার মাঝখানেই হয়ত কেউ এলেন, তিনি লেখা থামিয়ে তার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলেন। ঘণ্টাখানেক পর টেবিলে ফিরে অসমাপ্ত কবিতাটা সমাপ্ত করলেন। যেন এর মধ্যে কেউ আসেনি, কোনো ব্যাঘাতই ঘটেনি। চারপাশের পরিবর্তনও কোনো প্রভাব ফেলতে পারত না। কোনো কোনো বইয়ে কবিতার নিচে দেয়া রচনার তারিখগুলো তাঁর জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে কত বৈরী পরিবেশের মধ্যেও তিনি এগুলো লিখতে পেরেছেন। যখনই বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন বোধ করতেন, গান লিখতে আর সেগুলোতে সুর দিতে বসে যেতেন। এটাই ছিল তাঁর ক্লান্তি দূর করার একমাত্র পথ। শেষ জীবনে যে ছবি আঁকতে শুরু করেন, সেটাও তাঁর বিনোদনের খোরাক হয়ে দাঁড়ায়।

    আমার প্রপিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন ১৮৪৪ সালে বিলেত সফরে যান, ভাগ্নে নবীন বাবুকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে অনেকটা তাঁর সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডন থেকে এক চিঠিতে জানান যে দ্বারকানাথ ঠাকুরকে নিয়ে তিনি আর পারছেন না। কারণ ‘বাবু ঘন ঘন মত বদলান।’ তাঁর এই পর্যবেক্ষণ প্রায় আমাদের পারিবারিক নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি, মানে বাবার বিষয়ে তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। এমনকি সিদ্ধান্তের হঠাৎ পরিবর্তন হলে বাবা নিজেও এই বাক্যের দোহাই দিয়ে আমার স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতেন! আমরা তাঁর দোদুল্যমানতার সঙ্গে মানিয়ে গিয়েছিলাম। এরূপ পরিবর্তনের কারণে প্রায়শ অনেক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতো, এমনকি কখনও কখনও বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেত। তাঁর অনুসন্ধিৎসু আর কল্পনাপ্রবণ মনের কাছে শেষ কথা বলে কিছু ছিল না। দেখা গেছে কোনো কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পর তাঁর মন বেঁকে বসেছে। কোনো একটা অজুহাত তুলে তা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত তিনি শান্তি পাচ্ছেন না। ‘স্ট্যাটাস কু’ বলে যে কথাটা প্রচলিত আছে, বাবার জন্য তা প্রযোজ্য ছিল না। কেবল যে তাঁর দৈনন্দিন জীবন, বাসস্থান, খাবার, পোশাক এবং এরকম অন্যান্য জিনিসের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন হতো, তা নয়। বরং তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যেও এ পরিবর্তনশীলতার ছোঁয়া পড়ত। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন বিপ্লবী, তবে তাঁর লক্ষ্য ধ্বংস করা নয়, সৃষ্টি করা। সাহিত্যই হোক, ধর্মই হোক আর সে সামাজিক আচার, শিক্ষা কিংবা রাজনীতিই হোক; প্রচলিত রীতিনীতির ওপর যখনই তাঁর মন বিতৃষ্ণ হয়েছে, তখনই তিনি নির্ভয়ে তার সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন, এবং অন্য কেউ তা বাস্তবায়নের সাহস না পেলে নিজেই হাতেকলমে শুরু করে দিয়েছেন। নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগ্রহ আর প্রথাসিদ্ধ নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গী হয়ে ছিল।

    তাঁর মনের অফুরন্ত প্রাণশক্তি আমাকে সবচেয়ে বেশি চমৎকৃত করে। ক্ষণিকের জন্যও তিনি থেমে যাননি। প্রতিদিনই তিনি নিজেকে কিছু না কিছু বাড়িয়ে তুলেছেন। যে বয়সে কারও নতুন কিছু করার উদ্যম থাকে না, সেই বয়সেই তিনি তাঁর রচনাকৌশলের সবচেয়ে সাহসী নিরীক্ষাগুলো করেছেন। যখন তাঁর বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, তখন তিনি ছন্দ বাদ দিয়েছেন, মুক্তছন্দে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। এই সময়ে লেখা তাঁর কোনো কোনো গল্পে যৌনতার মত স্পর্শকাতর বিষয়ের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। এতে সম্ভবত গোঁড়া পাঠকরা কিছুটা ধাক্কাও খেয়েছেন। শেষ বইটি তিনি নিজ হাতে কলম ধরে লিখতে পারেননি। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি মুখে মুখে বলে গেছেন আর যারা তার সেবা-যত্ন করতেন তাঁরা শুনে শুনে লিখেছেন। এ বইটিতেও সাহিত্যের কাঠামো ও শৈলী নিয়ে তাঁর নিরীক্ষার চিহ্ন মেলে।

    যত পরিশ্রম করেই কোনো জীবনী লেখা হোক না কেন, তা বাবার মত একজন মানুষের পূর্ণ চিত্র আঁকতে পারবে না। এমন সূক্ষ্ম দ্যোতনা আর লালিত্যে যাপিত একটি জীবন যথাযথভাবে বর্ণনা করা কেবল তাঁর মত মহান লেখকের দ্বারাই সম্ভব। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর জীবন সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর নিজের লেখাতেই। আর কিছুতেই তাঁকে এর চেয়ে ভালোভাবে জানা যাবে না। একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘কবিরে পাবে না কবির জীবনীতে’। সত্যিই তাই। কবিকে তাঁর কবিতাতেই খুঁজে নিতে হবে। তাঁর রচনাবলি-ই তাঁর সবচেয়ে বড় জীবনী। আমি এ কথা বলে শেষ করতে চাই যে, যে জীবন তিনি যাপন করেছেন, সেটাই তাঁর সবচেয়ে মহান কবিতা।

    *

    ১. রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রের কথা উল্লেখ করলেও, মৈত্রেয়ী দেবীর রবীন্দ্রনাথ: গৃহে ও বিশ্বের রবীন্দ্রসংগীত প্রবন্ধে আমরা ভিন্ন বিবরণ পাই। তিনি কবির কাছে শুনেছেন যে একটি স্মৃতিসভায় গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি গান করার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। কবির গলার অবস্থা ভালো ছিল না, তবুও কবি গান করেন। এতে তাঁর গলার কোনো শিরা ছিড়ে যায়। এ ঘটনার পর থেকে তাঁর আর আগের মত গান করার শক্তি ছিল না।

    ২. সার্কুলারটির কথা ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ পায়। কয়েক মাসের মধ্যেই এটি প্রত্যাহার করা হয়।

    ৩. ঘড়িটির ক্রেতা রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীর বিয়েতে ঘড়িটি উপহার হিসেবে প্রদান করেন।

    ৪. উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ১৯২৫ সালে একজন ধনী মহিলা শান্তিনিকেতনকে ২৫,০০০ ডলার দিতে চাইলে একজন বৃটিশ কর্মকর্তা তাকে নিবৃত্ত করেন। অবশ্য এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রবাসীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কিছু পদ্ধতিগত মতপার্থক্যও ছিল। পশ্চিমারা, বিশেষত আমেরিকানরা চাইত যে শান্তিনিকেতনের জন্য একটি বোর্ড অব ট্রাস্টি করা হোক। তাহলে তারা টাকা দেবে। কিন্তু বোর্ড অব ট্রাস্টির ধারণা কবি মেনে নিতে পারেননি।

    ৫. গান্ধীজি ৬০,০০০ টাকার চেক দিয়েছিলেন। টাকাটা দিয়েছিলেন জিডি বিড়লা, যিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

    ৬. গান্ধী অনুরোধ করেছিলেন এর পর কবি যেন আর তহবিল সংগ্রহে বের না হন। পরের বছর কবি আবার তহবিল সংগ্রহে আহমেদাবাদ যাবেন শুনে তিনি রাগ করেছিলেন।

    ***

    ⤶
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    Next Article কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026

    আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ – রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }