একটি ডিনার পার্টি
জেঠিমাদের বসার ঘরে প্রায়ই আসতেন তারকনাথ পালিত, এসপি সিনহা, ডব্লিউ. সি. ব্যানার্জি, কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত, বিহারীলাল গুপ্ত, আশুতোষ চৌধুরী আর তার ভাইয়েরা[১], মনমোহন ঘোষ, লালমোহন ঘোষ এবং রাসবিহারী ঘোষ।[২] ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে নিঃসন্দেহে এরাই অগ্রণী ছিলেন। রাসবিহারীর পাশাপাশি তারকনাথের স্মৃতি চিরঅম্লান থাকবে তাঁর দানশীলতার জন্য। হাইকোর্টে আইন ব্যবসা করে তিনি যে বিপুল বিত্ত অর্জন করেছিলেন, তার পুরোটাই বিজ্ঞান গবেষণার উন্নয়নের জন্য দান করে দিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকেও তিনি উদার হস্তে সহায়তা করেছেন।[৩] তার ছেলে লোকেন পালিত অক্সফোর্ডে শিক্ষা গ্রহণ করে আইসিএস অফিসার হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর দিকে বাবার বিশেষ টান ছিল। সাহিত্যের, বিশেষত কবিতার প্রতি লোকেন পালিতের খাঁটি অনুরাগ ছিল। তিনি ছিলেন বাবার লেখালেখির ভক্ত, তাঁর মতামতকে বাবা গুরুত্ব দিতেন। বাবা আর লোকেন পালিতের চিঠি-পত্রের মধ্যে দুজনের গভীর সম্পর্কের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। এসকল চিঠির কিছুসংখ্যক ইতোমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে।[৪]
তারকনাথ ছাড়া অন্য আর যাদের নাম করেছি তাঁরা প্রায় সকলেই ছিলেন উঁচু শ্রেণির আইনজীবী। সে সময় শিক্ষিত যুবকদের সামনে পেশার সুযোগ ছিল সীমিত। অধিক বুদ্ধিমানরাই কেবল আইন পেশায় যোগ দিতেন। তারা রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও তারাই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তাদের রাজনীতির ওপর বাবার তেমন কোনো বিশ্বাস ছিল না। প্রথম দিকে কংগ্রেস ছিল নখদন্তহীন। এর কাজ ছিল সভা অনুষ্ঠান আর বিভিন্ন বিষয়ে নির্বিষ প্রস্তাব পাস করা গোছের। বাবা এগুলোর অসারতা ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন। কোলকাতায় কংগ্রেসের এক সম্মেলনের[৫] পর এ উপলক্ষে সমবেত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সম্মানে তারকনাথ তাঁর বাসায় এক ডিনারের আয়োজন করেছিলেন। মোটের ওপর বলতে গেলে এটি ছিল নিজেরাই নিজেদের সাধুবাদ দেয়ার মত একটা ব্যাপার। এতে বাবাকেও দাওয়াত দেওয়া হয়, যদিও নিমন্ত্রণ পেয়ে তিনি অবাকই হয়েছিলেন। ভারতীয় নেতাদের জন্য ইংরেজ ধরনে আয়োজিত ডিনারে যাবার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তারকনাথ অবশ্য খুব চাপাচাপি করছিলেন। তার ইচ্ছে ছিল অতিথিদেরকে বাবার কণ্ঠে গান শোনাবেন। সেখানে যেয়ে বাবা যে গান গেলেন, তাতেই তাঁর অসন্তুষ্টির বিষয়টি ফুটে উঠেছিল:
আমায় বোলো না গাহিতে বলো না।
এ কি শুধু হাসি খেলা, প্রমোদের মেলা, শুধু মিছেকথা ছলনা?।
এ যে নয়নের জল, হতাশের শ্বাস, কলঙ্কের কথা, দরিদ্রের আশ,
এ যে বুক-ফাটা দুখে গুমরিছে বুকে গভীর মরমবেদনা।
এ কি শুধু হাসি খেলা, প্রমোদের মেলা, শুধু মিছেকথা ছলনা?।
এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি কথা গেঁথে গেঁথে নিতে করতালি—
মিছে কথা কয়ে, মিছে যশ লয়ে, মিছে কাজে নিশিযাপনা!
কে জাগিবে আজ, কে করিবে কাজ, কে ঘুচাতে চাহে জননীর লাজ-
কাতরে কাঁদিবে, মায়ের পায়ে দিবে সকল প্রাণের কামনা?
এ কি শুধু হাসি খেলা, প্রমোদের মেলা, শুধু মিছেকথা ছলনা? ।
গানটিতে ঠিকমতো সুর সংযোজনের সময়ও তিনি পাননি। পালিতের বাড়ি যেতে যেতে পথেই তিনি এটি রচনা করেছিলেন।
ডিনারে সবাই ইংরেজ প্রথায় সুটেড-বুটেড হয়ে গেলেও বাবা গিয়েছিলেন ধুতি ও চাদর পরে। এটাও ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ। এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল যখন গানের কলিতে কলিতে তিনি মনের গভীর বেদনা ও ক্ষোভ উজাড় করে ঢেলে দিলেন। মুখ ব্যাদান করে সবাই গান শুনলেন, যার পর পার্টিটাই মাটি হয়ে গেল।[৬]
*
১. পাবনা জেলার হরিদাসপুর গ্রামের জমিদার বংশের দুর্গাদাস চৌধুরীর পুত্র আশুতোষ চৌধুরী কোলকাতায় খ্যাতিমান ব্যারিস্টার ছিলেন। তাঁর ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক সবুজ পত্রের সম্পাদক ও সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী। চৌধুরী ভাইদের অনেকে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের বিয়ে করেন। যেমন আশুতোষ বিয়ে করেন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা প্রতিভাসুন্দরীকে, প্রমথ চৌধুরী বিয়ে করেন সত্যেন্দ্রনাথের কন্যা ইন্দিরা দেবীকে আর তার পরের ভাই মথ চৌধুরী বিয়ে করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন সৌদামিনী দেবীর নাতনি লীলাকে (নীল)। প্রখ্যাত অভিনেত্রী দেবিকারাণী মথ চৌধুরী ও লীলার কন্যা।
২. বিখ্যাত ব্যারিস্টার। ১৯১৫ সালের ৩ জুন সম্রাট পঞ্চম জর্জের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁকেও ‘নাইট’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
৩. শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয় চালানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার নেন। এ ধারের টাকা তারকনাথ তাঁর উইলে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে যান। কবি পরে বিশ্ববিদ্যালয়কে এ টাকা পরিশোধ করেন।
৪. রবীন্দ্রনাথ তাঁর য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি, ১ম ও ২য় খণ্ড এবং ক্ষণিকা কাব্য অর্থাৎ মোট ৩টি বই লোকেন পালিতকে উৎসর্গ করেন। তিনি সিএফ এন্ড্রুজকেও ৩টি বই উৎসর্গ করেছিলেন। কাদম্বরী দেবী (মোট ৭টি বই উৎসর্গীকৃত) ছাড়া এত বেশি গ্রন্থ তিনি আর কাউকে উৎসর্গ করেননি। এ থেকেই তাঁদের দুজনের অন্তরঙ্গতা বোঝা যায়। লোকেন পালিত ১৯০৮ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যান আইন ব্যবসায় করতে, ফিরে আসেন ১৯১৪ সালে। পরের বছর মারা যান।
৫. ১৮৮৬ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত।
৬. ঘটনাটি রথীন্দ্রনাথের জন্মের আগের। তিনি পিতা রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে এটি শুনেছেন। তবে পালিতের বাড়ি যেতে যেতে পথেই কবি গানটি রচনা করেন-এ তথ্য সঠিক নয়। কোলকাতা কংগ্রেসের মাসখানেক আগে প্রকাশিত কড়ি ও কোমল গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ডিনারের দিন রচনা হলে তা সম্ভব হতো না।
