টুকরো স্মৃতি
আমাদের কোলকাতা বাস দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়নি। আমার বয়স আট বছর হয়েছে কি হয়নি, পিতামহ বাবাকে পারিবারিক জমিদারি দেখাশুনার ভার দিলেন। বাবা ছিলেন কনিষ্ঠ পুত্র, তদুপরি কবি। তবুও তিনি কেন তাঁর কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করলেন, বোঝা শক্ত। সিদ্ধান্তটি অনেকেরই পছন্দ হয়নি। দায়িত্বটির সঙ্গে নগদ প্রাপ্তির যোগ ছিল, সেটাও অনেকের ঈর্ষার উদ্রেক ঘটিয়ে থাকতে পারে। আগে পরিবারের অন্য সকলের মত বাবাও মাসে দুইশ’ টাকা ভাতা পেতেন, নতুন দায়িত্ব লাভের ফলে ভাতার পরিমাণ আরও একশ’ টাকা বাড়ল। তখনকার দিনের হিসেবে এ টাকা কতই না বেশি ছিল[১] আর এখনকার আমলে কতই না অকিঞ্চিৎকর! আমাদের জমিদারির সদর দপ্তর ছিল শিলাইদহ। একসময় বাবা আমাদেরকেও সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। শিলাইদহ যাবার আগে জোড়াসাঁকোর আরও কিছু বিচ্ছিন্ন টুকরো-টাকরা স্মৃতি মনে পড়ে। সে সকল স্মৃতি যত না বাবাকে ঘিরে, তার চেয়ে বেশি মায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
আমরা যে ঘরগুলোতে থাকতাম, তার বাইরে বাবার আলাদা পড়ার ঘর ছিল। তিনি সেখানে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন অথবা সাহিত্যজগতের বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতেন। সপ্তাহে একবার তিনি আমাকে ও আমার দিদিকে ডেকে পাঠাতেন। সেদিন ঘড়িতে দম দেয়া হতো। বাবা তাঁর বিয়েতে একটা সোনার পকেট ঘড়ি উপহার পেয়েছিলেন। ঘড়িটির দুদিকে ডালা ছিল, একটা বোতাম টিপলে ডালা খুলে যেত। তিনি সবসময় এ ঘড়িটাই ব্যবহার করতেন। এর পর দম দেয়া হতো চামড়ার বাক্সে রাখা আরেকটি দামি ঘড়িতে, যাকে বলে ক্যারেজ ক্লক। এ ফাঁকে ঘড়িটির ইতিহাসও একটু বলে নিই। দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন বিলাত যান, সে যুগের বিখ্যাত ঘড়ি নির্মাতা ম্যাককাবেকে ওটা বানিয়ে দেয়ার ফরমায়েশ করেন। ঘড়িটি তৈরি করতে কয়েক বছর লেগেছিল। তৈরি শেষ হবার আগেই দ্বারকানাথ মারা যান। ঘড়ি তৈরি হলে দেখা গেল ক্রেতার খোঁজ নেই। নির্মাতা কোম্পানি পরবর্তী এক বছরে বহু কষ্ট করে দ্বারকানাথের ওয়ারিশ তথা মহর্ষির ঠিকানা সংগ্রহ করেন এবং ঘড়িটি সুদূর লন্ডন থেকে কোলকাতায় আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। দ্বারকানাথ ঘড়িটির সম্পূর্ণ মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করেছিলেন। তিনি কাউকেই এর কথা বলে যাননি। ম্যাকক্যাব কোম্পানি যদি না জানাত, তাহলে ঘড়িটির কথা কেউ জানতেও পারত না। কোম্পানিটি যে কতটা সৎ—ঘটনাটি তারই প্রমাণ বহন করে। মহর্ষি পরে বাবাকে ঘড়িটি উপহার দেন। এজন্য বাবা এটির বিশেষ যত্ন নিতেন, নিজেই এর দম দিতেন। আমাদের দুজন ছাড়া আর কাউকে ওটা ধরতে দিতেন না। ঘড়িটিতে ঘটা করে দম দেয়া হতো এবং এ সময় উপস্থিত থাকতে পারতাম বলে বেশ অহংকার হতো।
অনেক তরুণ কবি ও খ্যাতি-প্রত্যাশী সাহিত্যিক বাবার কাছে ঘন ঘন আসতেন। এদের একজন ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি বিলেত থেকে ফিরে সবে কোলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেছেন। তখনও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েননি। রাজনীতি নয়, সেসময় কবিতা লেখার দিকেই তাঁর বেশি ঝোঁক ছিল।[২] মামলা পাবার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোর্টে কাটিয়ে সরাসরি আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। একবারে দুটো করে সিঁড়ি ভাঙতেন, আর উপরে উঠতে উঠতেই চেঁচিয়ে বলতেন, “কাকিমা, তাড়াতাড়ি ঝোল-মাংস আর লুচি দেন। পেটে আগুন জ্বলছে।” তিনি বেশ খেতে পারতেন, মা তাঁকে খাওয়াতে পছন্দ করতেন। তাঁর পকেটে সব সময় নোটবুক থাকত, সেখান থেকে নতুন কবিতা পড়ে শোনাতেন। বাবা তাঁকে প্রেরণা দিতেন, কখনও লেখাগুলোর একটু-আধটু সংশোধন করতেন, আবার কখনও তাঁর উৎসাহে একেবারেই জল ঢেলে দিতেন।
মা ছিলেন স্নেহপরায়ণ ও মিষ্টি স্বভাবের। পরিবারের সবাই তাঁকে পছন্দ করত। তারা সুখ-দুঃখের কথা বলার জন্য মায়ের কাছে আসত। তিনি যেমন তাদের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন তেমনি বিপদের সময় পরামর্শ দিতেন। সবার ওপর তাঁর ছিল সমান স্নেহ, এক বলুদাদা[৩] ছাড়া। এ চাচাত ভাইটির প্রতি তাঁর বিশেষ মমতা ছিল। তিনি মাকে তার লেখা পড়ে শোনাতেন, পড়ে শোনাতেন সংস্কৃত ও ইংরেজি ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম থেকেও। মা-র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না বললেই চলে। কিন্তু শুনতে শুনতেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মহৎ রচনাগুলোর সঙ্গে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন, আর সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তাঁর খানিকটা জ্ঞানও জন্মেছিল।
বলুদাদাকে বাবাও পছন্দ করতেন। তাঁর মধ্যে শৈল্পিক ও সাহিত্যিক লক্ষণাবলি দেখতে পেয়ে বাবা তাঁর যত্ন নিয়েছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁকে শেখাতে শুরু করেছিলেন। সাহিত্যের দিকে ঝোঁক ছিল আরেক দাদা, জ্যাঠাতো ভাই সুধীন্দ্রনাথেরও।[৪] দুজনের প্রতিভা যেন বিকাশের সুযোগ পায় বাবার সেদিকে খেয়াল ছিল। বালক নামক কিশোরদের পত্রিকাটিতে নিয়মিত লেখার জন্য তিনি তাঁদেরকে উৎসাহিত করতেন। পত্রিকাটির আয়ু ছিল মাত্ৰ দুবছর। কিন্তু এর মান ছিল খুব ভালো। আজকের দিনেও এটাকে কিশোর
সাংবাদিকতার একটি পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষানবিসি সম্পন্ন করার জন্য তাদেরকে সাধনা পত্রিকার সম্পাদনার কাজেও লাগানো হয়। এটি ছিল বাবার প্রতিষ্ঠা করা অতি উঁচুমানের সাহিত্যপত্রিকা।[৫] বড় জ্যাঠা দ্বিজেন্দ্রনাথের ভারতী পত্রিকাতেও তারা লিখতেন।[৬]
বলেন্দ্রনাথকে আমি বলুদাদা বলে ডাকতাম। কোনো প্রবন্ধ লেখা শেষ হলে তিনি তা বাবাকে দেখাতেন। প্রায় সময়ই বাবা সেগুলো পুনরায় লিখতে বলতেন। বিষয়বস্তুটিকে কীভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে সে বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিতেন। পুনর্লিখন সম্পন্ন হলে, বাবা তাঁর সঙ্গে প্রত্যেকটা বাক্য ধরে ধরে আলোচনা করতেন। প্রয়োজনে বাক্যের গঠন শুদ্ধ করতেন এবং অধিকতর উপযোগী শব্দ বসিয়ে দিতেন। অন্তত চার-পাঁচবার লেখা ব্যতীত কোনো প্রবন্ধই মুদ্রণের জন্য ছাড়পত্র পেত না। রচনাশৈলী শুদ্ধ করার এ নিবিড় প্রশিক্ষণ বলুদাদা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছিলেন। এতে কাজও হয়েছিল বেশ। তিনি যেকোনো বিষয়কে প্রাঞ্জল অথচ যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনের কৌশল আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রবন্ধে একটিও বাক্য পাওয়া যেত না যা বাহুল্য, একটিও শব্দ পাওয়া যেত না যার চেয়ে আরও যুৎসই প্রতিশব্দ ব্যবহার করা যেত। বলুদাদা অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার শুরুর দিকের বলি। মায়ের সঙ্গে একত্রে ভ্রমণকালে দাঙ্গাকারীরা তাঁদের গাড়িটিতে হামলা করে। নিজের মাকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি মাথায় আঘাত পান। এ আঘাতজনিত জটিলতা থেকে পরবর্তীতে তার মৃত্যু হয়।[৭] তিনি কেবল একটি কি দুটি কবিতার বই আর একটি প্রবন্ধ সংকলন রচনা করতে পেরেছিলেন। সংখ্যায় অল্প হলেও তাঁর রচনাবলি বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।[৮]
আমাদের বাড়িটির বিশাল ছাদ ছিল। এটি এতই বড় যে এর মধ্যে দুটি টেনিস কোর্ট এঁটে যেতে পারে। এটি অনেকটা সামাজিকতার কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বাচ্চারা এখানে খেলাধুলা করত, দিনভর তাদের হৈচৈ শোনা যেত। সন্ধ্যার দিকে বয়স্করা, বিশেষ করে মহিলারা আসতেন। মাঝখানে কিছুটা জায়গা একটু উঁচু করে প্ল্যাটফর্মের মত তৈরি করা হয়েছিল। তাঁরা সেখানে মাদুর আর চাদর বিছিয়ে আড্ডা দিতে বসতেন। চা-পানের চল তখনও শুরু হয়নি। মায়ের ভাণ্ডারে হরেক রকমের মিষ্টি থাকত। তিনি সবাইকে মিষ্টি আর ঠাণ্ডা সরবত খেতে দিতেন। বাতি জ্বালানোর জন্য নির্দিষ্ট লোক ছিল। সন্ধ্যার আঁধার নেমে এলে সে ঘরে ঘরে তেলের লণ্ঠন জ্বালিয়ে রেখে যেত। ততক্ষণে পুরুষরাও ছাদের আড্ডায় যোগ দিত। আসর তখন জমজমাট হয়ে যেত। অন্য কিছু হোক আর না হোক, গানের আসর হতোই। গান ছাড়া ঠাকুরবাড়ি অকল্পনীয়। প্রায় সব সময়ই কোনো-না-কোনো ঘর থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসত। এ বাড়ির প্রায় সকলেই ভালো শিল্পী ছিলেন। কেবল তা-ই নয়, গান ছিল তাদের প্রাণ, গান ছিল তাঁদের জীবন। সংগীত চর্চার জন্য ছাদটি ছিল আদর্শ। গ্রীষ্মকালে দখিনা বাতাসে যেমন গা জুড়াত, তেমনি চাঁদের মায়াবী আলোয় গোটা পরিবেশ যেন অপার্থিব হয়ে উঠত। প্রেম, ভক্তি, বিরহ ও বেদনার—সব ধরনের গানই গাওয়া হতো এখানে। সুকণ্ঠী গায়ক ছিল অনেক, কিন্তু বাবা বিশেষভাবে পছন্দ করতেন আমাদের জ্যাঠাতো বোন অভিদিদির[৯] গান। তার গলায় যেন বসন্তের পাখি গেয়ে উঠত। সে অল্প বয়সে মারা গিয়েছিল। তার মত এত মিষ্টি কণ্ঠ আর কখনও ঐ বাড়িকে আনন্দে ভরিয়ে তোলেনি। পরিবারের বাইরের গায়কদের মধ্যে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন অমলা দাশের গানও বাবা পছন্দ করতেন। মা তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। দত্তক নেয়ার মত সে পরিবারের একজন হিসেবেই বেড়ে উঠছিল।[১০] আমরা তাকে ডাকতাম অমলাদি। এ সময় বাবা এমন কিছু গান রচনা করেছিলেন যেগুলো বিশেষভাবে তাঁর কণ্ঠেই ভালো লাগত। একটি গান ছিল-
চিরসখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।
সংসারগহনে নির্ভয়নির্ভর, নির্জনসজনে সঙ্গে রহো ॥
অধনের হও ধন, অনাথের নাথ হও হে, অবলের বল।
জরভারাতুরে নবীন করো ও হে সুধাসাগর ॥[১১]
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে লেখা এসব গান শুনতে পেলে আজও আমার মন ছাদের সে সন্ধ্যাগুলোতে চলে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অমলাদির ছবি, দেখতে পাই অবিস্মরণীয় কণ্ঠে তন্ময় হয়ে তিনি গান গাইছেন। অমলাদি সুন্দরী ছিলেন না। অস্বাভাবিক রকমের লম্বা আর হৃষ্টপুষ্টতার কারণে তাঁকে দেখে সমীহ জাগত। তবে সুরেলা গলার সুমিষ্ট গান শুনলে তার পুরুষালি চেহারার কথা আর কারও মনে থাকত না।
*
১. এর গুরুত্ব বোঝা যাবে যদি আমরা মনে রাখি যে তখন চালের দাম ছিল মোটামুটি তিন টাকা মণ।
২. পরবর্তীকালে রাজনীতি করে বিখ্যাত হন, দেশবন্ধু উপাধি লাভ করেন। তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ বের হয়েছিল। তবে দেশবন্ধুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের হৃদ্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দুই বিখ্যাত ব্যক্তি পরস্পর থেকে ক্রমে দূরে সরে যান। কথিত আছে যে, তাঁর সাগরসঙ্গীত কাব্য বের হলে রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে মৌনতা অবলম্বন করেন। পরবর্তীকালে চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকা রবীন্দ্রবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, এমনকি দেশবন্ধু ভাড়াটে লেখক দিয়ে রবীন্দ্রবিরোধী লেখা ছাপাতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ কখনও প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করেননি। বরং দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর ‘এনেছিলে সাথে করে/মৃত্যুহীন প্রাণ/মরণে তাহাই তুমি/করে গেলে দান’ নামক কবিতা লিখে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
৩. বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৪. দেবেন্দ্রনাথের বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ পুত্র। জন্ম-১৮৬৯, মৃত্যু-১৯২৯।
৫. সাধনার প্রকাশ ঘটে ১৮৯১ সালে। শুরুতে সম্পাদক হিসেবে সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ছাপা হতো। বছর তিনেক পর থেকে সম্পাদক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নাম ছাপা শুরু হয়।
৬. সম্পাদক হিসেবে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম থাকলেও এ পত্রিকার মূল ব্যক্তি ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী দেবী তাঁকে সহায়তা করতেন।
৭. রথীন্দ্রনাথ বর্ণিত এ তথ্যটি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। অন্য কারও লেখায় এর সমর্থন পাওয়া যায় না। এমনকি এ গ্রন্থেরই বাংলা রূপ পিতৃস্মৃতি গ্রন্থে রথীন্দ্রনাথ নিজেও তা উল্লেখ করেননি, কেবল এটুকু লিখেছেন যে তিনি অল্পবয়সে মারা যান। কারও কারও মতে, বলেন্দ্রনাথ যক্ষ্মায় মারা যান। তাঁর মা প্রফুল্লময়ী দেবীর বর্ণনা অনুসারে ভ্রমণকালে কাশীতে একটি পুকুরে গোসলের সময় তাঁর কানে পানি ঢোকে। সেই থেকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ব্রাহ্মসমাজের সম্মেলন নিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। কুষ্টিয়ায় স্থাপিত ব্যবসায়ে লোকসান হলে তা সামলাতে গিয়ে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে কোলকাতায় মারা যান। রবীন্দ্রনাথও একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন যে রোগাক্রান্ত হয়েই তিনি মারা গেছেন। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় ১৮৯৯ সালের ১৯ আগস্ট, ২৯ বছর বয়সে।
৮. তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থের নাম চিত্র ও কাব্য। এটি মূলত সাহিত্য সমালোচনা। কবিতার বই দুটির নাম মাধবিকা ও শ্রাবণী। তবে এগুলোর বাইরেও তাঁর লেখা বিশেষত ব্রহ্মসংগীত রয়েছে।
৯. হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা অভিজ্ঞা ঠাকুর। জন্ম-১৮৭৪, মৃত্যু সম্ভবত ১৮৯৫। ব্রাহ্মসমাজের গায়ক রাধিকামোহন গোস্বামীর কাছে তালিম নেন। জন্মাবধি রোগা ছিলেন। বিয়ের রাতেই তাঁর যক্ষ্মা ধরা পড়ে। জানা যায় যে রোগীর অবস্থা শেষ পর্যায়ে। রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে প্রেরিত এক চিঠিতে লিখেন, ‘তোর আজকের চিঠিতে এক জায়গায় অভির গানের একটু উল্লেখ আছে—পড়ে মনটা কেমন হঠাৎ হু হু করে উঠল… অভির মিষ্টি গান শুনবার জন্য আমার এমনি ইচ্ছে করে উঠল যে…।’
১০. তিনি ছিলেন মৃণালিনী দেবীর ঘনিষ্ঠ সখী, বয়সে যদিও তিন বছরের ছোট। তাঁর স্কুলের বেতনও ঠাকুরবাড়ি থেকে দেয়া হতো।
১১. রবীন্দ্রসংগীতে অমলা দাশের ভূমিকা বোঝার জন্য এটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে, প্রথমদিকে নারী শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করতেন না। রেকর্ডে প্রথম দিকের মহিলা গাইয়ে যেমন মানদাসুন্দরী, পূর্ণকুমারী দাসী, আশ্চর্যকুমারী প্রমুখ ছিলেন মূলত বাইজি। বিখ্যাত বাইজি গহরজানও রবীন্দ্রনাথের দুটি গান রেকর্ড করেছেন। তবে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের সুরের ধার ধারতেন না, তাঁর লেখা গান নিজেদের সুরে গাইতেন! সুর তো ঠিক থাকার প্রশ্নই নেই, এমনকি কথাও বদলে দিতেন তাঁরা। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে অমলা দাশই হলেন গৃহস্থ ঘরের প্রথম মেয়ে, যাকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান রেকর্ড করিয়েছেন। রেকর্ডে শিল্পী হিসেবে কিন্তু তাঁর পুরো নাম থাকত না, লেখা থাকত মিস দাশ (এমেচার)। রবি ঠাকুরের ‘যদি এ আমার হৃদয়দুয়ার’, ‘হৃদয়বাসনা পূর্ণ হল’, ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’, ‘একি আকুলতা ভুবনে’সহ এখানে উল্লেখকৃত ‘চিরসখা, ছেড়ো না মোরে’ গানটিও তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডে বের হয়েছিল।
