ব্রাহ্মসমাজের উৎসব
পিতামহ ঘটা করে ব্রাহ্মসমাজেরই[১] বার্ষিকী উদযাপন করতেন। যতদূর মনে পড়ে প্রতি বছর ১১ মাঘ এ অনুষ্ঠানটি হতো। কয়েক সপ্তাহ ধরে এর প্রস্তুতি চলত এবং সারা বাড়িতে সাড়া পড়ে যেত। পরিবারের প্রত্যেক প্রতিভাবানকেই এ উপলক্ষে কিছু না কিছু ভূমিকা পালন করতে হতো। উৎসবের জন্য সংগীত রচনার ভার পড়ত বাবার ওপর। প্রতি বছরই নতুন নতুন গান লেখা হতো। তারপর শুরু হতো রিহার্সাল। জ্যাঠাত ভাই নীতীন্দ্ৰনাথ[২] যত দিন বেঁচে ছিলেন, অনুষ্ঠানের সাজসজ্জার বিষয়টি তিনিই দেখতেন। বাড়ির সম্পূর্ণ বহির্ভাগ মেরামত করা, নতুন করে রং করা, সাজানো-গোছানো, এগুলো ছিল নিয়মিত কাজ। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো আঙিনার যে অংশটাতে ব্রাহ্মসমাজের সদস্যগণ সমবেত হতেন, সেটির সৌন্দর্যায়নে। নীতুদাদা প্রতি বছরই নতুন ডিজাইনে সাজাতেন। একবার তিনি চাইলেন যেন পিলারগুলো শ্যাওলা-পড়া গাছের গুঁড়ির মত দেখায়। কিন্তু কোলকাতা শহরে কোথায় পাবেন শ্যাওলা? কাজেই গ্রামে জেলে পাঠানো হল। তারা বদ্ধ পুকুর ঘেঁটে কয়েকটি গরুর গাড়ি বোঝাই করে সবুজ রঙের সরু সরু শ্যাওলা নিয়ে এল। এগুলোর সঙ্গে পদ্মফুল ব্যবহার করে তিনি স্থানটিকে এমনভাবে সাজালেন যে তা দেখার মত হয়ে উঠল। নিজের কাজে তিনি এতই খুশি হলেন যে তা দেখার জন্য শিল্পী অবনীন্দ্রনাথকে[৩] খবর পাঠালেন। তাঁদের দুজনের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। নীতীন্দ্র অবনীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বাহবা পেতে চেয়েছিলেন। অবনীন্দ্র এসে বললেন যে সবকিছু ভালোই হয়েছে। এ কথা বলেই তিনি নাক চেপে ধরে দিলেন ফিরতি দৌড়। নীতীন্দ্রনাথ বুঝতেই পারেননি যে জায়গাটি পচা মাছের গন্ধে ভরে গেছে। তিনি খুব মুষড়ে পড়লেন। অনুষ্ঠানও কাছে এসে গেছে। নতুন করে শুরু করার সময় ছিল না। শেষ পর্যন্ত পিতামহর দ্বারস্থ হতে হল। তিনি অনেক টাকা দিলেন। অতিথিরা এসে কিছুই টের পেলেন না। পাবেন কী করে? মহর্ষির টাকায় নীতীন্দ্র ততক্ষণে গ্যালন গ্যালন ল্যাভেণ্ডার আর ইউ-ডি-কোলন জাতীয় সুগন্ধি ঢেলে দুর্গন্ধ ঢাকা দিয়ে ফেলেছেন!
মাঘ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ব্রাহ্মসমাজের এ পার্বণকে মাঘোৎসব বলা হতো। কোলকাতাবাসী অধীর আগ্রহে এ উৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকত। কেবল যে সযত্নে নির্বাচিত দক্ষ শিল্পীদের পরিবেশিত গান-বাদ্য তাদের মনোরঞ্জন করত তা-ই নয়, গুরুগম্ভীর স্বরে বৈদিক মন্ত্রপাঠ এবং ধর্মীয় বক্তৃতাও তারা গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে শুনত। প্রথমদিকে মহর্ষি নিজেই বেদিতে বসতেন ও বক্তৃতা দিতেন। পরবর্তীতে হয় জ্যাঠামশাই সত্যেন্দ্রনাথ অথবা বাবা এ দায়িত্ব পালন করতেন।
আমরা শিশুর দল অবশ্যি এসবের চেয়ে খাবার-দাবার, হলরুম ও করিডোরে জ্বালানো মোমবাতি আর সাজসজ্জায় ব্যবহৃত ফুলগুলোর দিকেই বেশি আগ্রহী ছিলাম। পরদিন ডেকোরেশন আর আলোকসজ্জা সরিয়ে ফেলার আগে সেগুলো নিয়ে আমরা খেলায় মেতে উঠতাম।
*
১. রাজা রামমোহন রায়ের প্রবর্তিত ধর্মমতের নাম ছিল ‘বেদান্ত প্রতিপাদ্য ধর্ম’। ১৮৪৭ সালের ২৮ মে তত্ত্ববোধিনী সভার বার্ষিক অধিবেশনে এ নাম পরিবর্তন করে ‘ব্রাহ্মধর্ম’ রাখা হয়।
২. দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় পুত্র। জন্ম-১৮৬৭, মৃত্যু-১৯০১।
৩. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জন্ম-১৮৭১, মৃত্যু-১৯৫১। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র আর গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র।
