Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র ২

    লেখক এক পাতা গল্প433 Mins Read0
    ⤶

    ভাষণ সংকলন

    ১. ১০. ১৩৮৪– ৩. ৯. ১৩৯২
    জানুয়ারি ১৯৭৮– ডিসেম্বর ১৯৮৫

    মুসলিম সাহিত্য সমাজের ৫২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আয়োজিত আবুল হোসেন স্মরণ সভায় প্রদত্ত বক্তৃতা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! পরলোকগত শ্রদ্ধেয় মৌলবী আবুল হোসেন সাহেব তার স্বল্পপরিসর জীবনে বুদ্ধির মুক্তি সম্বন্ধে যে বিরাট অবদান রেখে গেছেন, তা আপনাদের কারো অজানা নেই। কিন্তু তার বিরাট প্রতিভা ও বহুমুখী অবদানের বিশেষ কিছু আমি অবগত নই। কেননা নিবাস আমার বরিশাল জেলার লামচরি নামের এক গণ্ডগ্রামের কৃষক পরিবারে, যেখানে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের তথা মুসলিম সাহিত্য সমাজের দীপশিখার আলো পৌঁছে নাই এখনও। তবুও নানা সূত্রে তাঁর অবদান সম্পর্কে সামান্য কিছু জানতে পেরেছি এবং তাতেই তার বিদেহী আত্মা ও নামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েছি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। কিন্তু কোনো মহাপুরুষের নামের মালা গলায় ঝুলিয়ে রাখলে অথবা তার নাম জপ করলেই শ্রদ্ধা দেখানো হয় না। তার জন্য আবশ্যক তার জীবনাদর্শের শুধু অনুকরণ নয়, অনুশীলন। জানিনা তা কতটুকু পারছি বা পিরবো।

    নিতান্ত দুঃখের সাথে আমার বলতে ইচ্ছে হয় যে, আবুল হোসেন সাহেবের অকালমৃত্যুর মূল কারণ রোগ নয়, মানুষের আঘাত। তবে সে আঘাত ছিলো দেহে নয়, তার মনে। মনের আঘাতে যে দেহে রোগ জন্মাতে পারে, তা চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকার করে। হয়তো কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, মনে আঘাত অনেকেই পেয়ে থাকে, ভগ্নমনোরথ অনেকেই হয়, তারা রোগাক্রান্ত হয় না কেন? এতে আমার আর একটা পাল্টা প্রশ্ন করতে হয় যে, কামপ্রবণ শক্তি অনেকেরই থাকে, কিন্তু তারা সকলেই কামোন্মাদ রোগগ্রস্ত হয় না কেন? মনের অদম্য স্পৃহায় বাধা পেলে যখন তা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তখনি মানসিক রোগ দেখা দেয়, নচেৎ নয়। আমরা অনেক কাজ করি হলে হোক, না হলে না হোক গোছের মনোভাব নিয়ে। কিন্তু আবুল হোসেন সাহেবের মনোবল ছিলো অত্যন্ত প্রবল। তাই তার ইচ্ছা ও স্পৃহা ছিলো অদম্য, অনন্য। তিনি তার মনে যে আঘাত পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যান্য স্থানে, তাও ছিলো অনন্য। আমার মনে হয়, তারই পরিপ্রেক্ষিতে তার অকালমৃত্যু। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে পৌরোহিত্য করেছেন তিনি। নিজের জন্য নয়, দেশের জনগণের জীবনের মানোন্নয়নের জন্যই। আর তিনি শুধু পৌরোহিত্য করেন নাই, করেছেন আত্মনিয়োগ, আত্মসমর্পণ ও জীবনদান।

    মরহুম আবুল হোসেন সাহেব মুসলমান ছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানপ্রিয় ধ্বজাধারী মুসলমান ছিলেন না। ছিলেন মানবদরদী মুসলমান, মানবতাবাদী মুসলমান তিনি ছিলেন। তা-ই কতিপয় অনুষ্ঠানপ্রিয় মুসলমানের গাত্রদাহের কারণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু অনুষ্ঠান পালনই প্রকৃত ইসলাম নয়, আল্লাহে বিশ্বাস রেখে মানবকল্যাণে ব্রতী হওয়াই প্রকৃত ইসলাম। তার মতে, মানবকল্যাণ আগে, পরে অনুষ্ঠান। জলমগ্ন শিশুকে উদ্ধারের কাজে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি নামাজ পড়তে যাওয়া ইসলামের বিধান নয়। যে দেশে লক্ষ লক্ষ নর-নারী ও শিশু অনাহারে অস্থিকঙ্কালসার হয়ে সমস্ত দিন ঘুরে ঘুরে একমুঠো অন্ন পাচ্ছে না, সে দেশের বিমানবিহারী হাজীদের নিজে উড়ে, টাকা উড়িয়ে হজব্রত পালনের কোনো সার্থকতা নাই। যে দেশের হাজার হাজার গৃহহীন মানুষ মুক্তাকাশের তলে পথে-প্রান্তরে রাত কাটাচ্ছে, সে দেশে উপাসনামন্দিরে সাততলা মিনার তৈয়ারে কোনো সার্থকতা নাই। যে দেশের এতিমরা বস্রাভাবে উলঙ্গ থাকছে আর শীতে কাঁপছে, সে দেশের মানুষের ২২ হাত কাপড়ে দিস্তার বাঁধা সুন্নত হয় কিরূপে? আমাদের দেশের এ দৃশ্য অনেকেই দেখেন এবং মর্মে মর্মে অনুভবও করেন, তবে মুখ ফুটে বলবার সাহস পান না। মরহুম আবুল হোসেন সাহেবও এ দৃশ্য দেখেছেন, অনুভব করেছেন, অন্তদাহে অতিষ্ঠ হয়ে উচ্চকণ্ঠে দু-চার কথা বলতে ভয় পাননি। তাই তিনি ছিলেন আড়ম্বরপ্রিয় ধার্মিকদের বিরাগভাজন।

    মরহুম আবুল হোসেন সাহেব শুধু মানবতাবাদীই ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিবর্তনবাদীও এবং তা শুধু জীবের বিবর্তন নয়, ধর্মীয় বিবর্তনবাদীও। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তনশীল জগতে কোনো ধর্ম ও ধর্মবিধান অপরিবর্তনীয় থাকতে পারে না, ইসলামও না। কিন্তু গোড়া ধার্মিকগণ বলেন, ধর্মবিধি অপরিবর্তনীয়, ধর্মগ্রন্থ সনাতন। এ বিষয়েও সনাতনীদের সাথে মরহুমের দ্বন্দ্ব ছিলো আমরণ।

    মরহুম আবুল হোসেন সাহেব বলতেন, তার প্রত্যেকটি বাক্য বর্ণে বর্ণে সত্য এবং মুসলিম সমাজ তাঁর অনেক কথা মেনেও নিচ্ছে, তবে কাগজে নয়, কাজে। তিনি বলেছেন যে, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ধর্মের বিধি-নিষেধগুলোর কিছু কিছু পরিবর্তন আবশ্যক। আজ ধর্মীয় নেতাগণ তা নীরবতার মাধ্যমে মেনে নিচ্ছেন বা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

    সুদ নেওয়া-দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও তা এখন সর্বত্র চলছে। অবরোধ প্রথা এখন রোধ হতে চলেছে। ছবি আঁকা, রাখা, দেখা নিষিদ্ধ হলেও তা এখন মাছ-ভাতের মতোই চলছে। এরূপ ধর্মের অনেক বিধি-নিষেধ আজ সামাজিক বা আন্তর্জাতিকভাবে লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে। কিন্তু এর কোনোটিকে নিয়ে ধর্মীয় নেতারা এখন আর উচ্চবাচ্য করেন না। বিশেষত খোয়াজ-খেজেরের কেচ্ছা, হারুখ-মারুৎ ফেরেশতার উপাখ্যান, এয়াজুজ-মাজুজের কাহিনীও আজকাল আর কোনোও ওয়াজের মজলিসে শোনা যায় না।

    আমি আমার মামুলি ধরণের কথা বাড়িয়ে আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। মরহুম আবুল হোসেন সাহেবের বিদেহী আত্মার আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আজকের সভার উদ্দেশ্য সফল হোক, এই কামনা করে বিদায় নিচ্ছি।
    [১. ১০. ১৩৮৪]

    .

    বাংলাদেশ সোসিও-ফিলসফিক হিউম্যানিস্ট গিল্ড আয়োজিত সেমিনারে পঠিত বক্তৃতা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার তরুণ বন্ধুগণ! আজকের এই সভায় যোগদানের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি এবং এজন্য এই সভার আহ্বায়ক সাহেব ও তার সহকর্মীবৃন্দকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

    আজকের এই সভায় উপস্থিত সুধীবৃন্দের মধ্যে বোধহয় প্রত্যেকেই একে অন্যের জানা ও চেনা, কিন্তু দু’-চারজন ছাড়া অন্য কেউই আমাকে চেনেন না বা আমার সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। অজানাকে জানার স্পৃহা মানুষের চিরন্তন, কোনো আগন্তুক সম্বন্ধেও তাই। আজকের সভায় আমি নবাগত ব্যক্তি। কাজেই আমার পরিচয় জানবার জন্য আপনাদের কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। আপনাদের এই সভায় আমার যোগদানের ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়, আকস্মিক। তাই আমি আমার পরিচয় সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিছু কথা বলে নিতে চাই।

    আজকের এই সভায় উপস্থিত জনগণের মধ্যে আমি হলাম সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। কয়েকটি ব্যতিক্রম সম্বন্ধে বলছি।

    ১. আমার মনে হয়, আপনারা অনেকেই শহরবাসী, কেউই পল্লীবাসী নন, অন্তত বর্তমানে। বোধ হয় যে, এ সভায় আমি একাই পল্লীগ্রামের অধিবাসী। নিবাস আমার বরিশাল জেলার লামচরি নামক গ্রামে। কোনো শহর-বন্দরে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে আমার কোনো বাসাবাড়িও নেই।

    ২. সকলে না হলেও হয়তো আপনারা অনেকেই চাকুরিজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ইত্যাদি ভদ্রজনোচিত কাজে নিয়োজিত আছেন। কিন্তু আমি হলাম একজন নিম্নশ্রেণীর কৃষিজীবী লোক। একমাত্র কৃষিই আমার উপজীবিকা।

    ৩. শিক্ষার ক্ষেত্রে এ সভায় আমি যে অদ্বিতীয়, তা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। কেননা শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার সেকেলে, পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। অন্য কোনো শিক্ষাপীঠে প্রবেশের সুযোগ আমার হয় নি কখনো এবং সহযোগিতা লাভ করতে পারি নি কোনো শিক্ষকের।

    ৪. স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক আমরা। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা এবং রাষ্ট্রভাষাও। কিন্তু এ দেশের শিক্ষার মানদণ্ড এখনো ইংরেজি। যেমন ম্যাট্রিকুলেট, বি.এ., এম.এ. ইত্যাদি। আজকাল শিক্ষিত মানেই ইংরেজি-শিক্ষিত ব্যক্তি। আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় সুপণ্ডিত হলেও আধুনিক সমাজ তাকে একবাক্যে শিক্ষিত বলতে ইতস্তত করে, যদি না সে ইংরেজি জানে। কিন্তু এটা সমাজের নিছক হঠকারিতা নয়। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। এ ভাষা না জানা ব্যক্তির পক্ষে বিশ্বমানবের সাথে ভাবের প্রত্যক্ষ আদান-প্রদান সম্ভব নয়। মানুষের জ্ঞান অনুশীলনের প্রায় সমস্ত বই-পুস্তক রয়েছে ইংরেজি ভাষায়। ইংরেজি ভাষা না জানা কোনো ব্যক্তির পক্ষে কোনো বিষয়েই উচ্চতর জ্ঞান লাভের সম্ভাবনা নেই। বাংলা সাহিত্যের বাজারে ইংরেজি গ্রন্থের কিছু কিছু অনুবাদগ্রন্থ আমদানি হয়েছে বটে, কিন্তু তা আবশ্যকের তুলনায় নেহায়েত কম। তাই উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে বাংলাবাসীর বা বাংলাভাষীর এখনো কথায় কথায় বিদেশে পাড়ি জমাতে হয়। বাংলাভাষী না থাকলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ইংরেজি ভাষা উঠিয়ে দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে যাবে।

    এহেন ইংরেজি ভাষার সাথে আমার পরিচয় নেই মোটেই। কায়ক্লেশে সহজ বাংলা ভাষা পড়ার অভ্যাস করেছিলাম আমাদের গ্রামের একজন পুঁথিপাঠকের কাছে, মোক্তল হোসেন ও সোনাভানের পুঁথি পড়ে। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষার কোনো সুযোগ আমার হয়নি কখনো। বাংলা ভাষার বেলায় না বললেও, আপনারা আমাকে ইংরেজি-মূর্খ বলতে পারেন স্বচ্ছন্দে। আমার কোনো কোনো লেখায় দু’চারটে ইংরেজি শব্দ দেখতে পারেন, তা অন্যকে দিয়ে লেখানো।

    জীবনের ৭৭টি বছর অতিবাহিত করেছি কৃষিকাজ ও তার ফাঁকে ফাঁকে সামান্য কি পড়াশুনা করে। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিন্দুমাত্র আলোও পৌঁছে নি আমাদের গ্রামখানিতে। বরং অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার প্রভৃতি অজ্ঞানতার অন্ধকারে গ্রামখানি আচ্ছন্ন। আর সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামেই আমি বাস করে আসছি অহর্নিশ গরু-মোষের সাহচর্য নিয়ে।

    সচরাচর দেখা যায়, অনুন্নত গ্রামগুলোই অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে ভরপুর। আমাদেরটিও তার ব্যতিক্রম নয়, তা আগেই বলেছি। কিন্তু আশৈশব আমার মনটি ছিলো যুক্তিবাদী। তাই আমি ছিলাম, আজও আছি, আমাদের গ্রামের জনগণের মধ্যে একটু ব্যতিক্রম। বলা যায় বেয়াড়া। গোছের।

    গ্রামের সামাজিক এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি ও আখ্যানগুলোকে যুক্তিবাদের কষ্টিপাথরে যাচাই করতে গিয়ে আমার মনে কতগুলো জিজ্ঞাসার উদয় হয়েছিলো এবং সত্যসন্ধানের অদম্য স্পৃহায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমি সত্যের সন্ধান’ নামে একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক লিখেছিলাম বিগত ১৩৫৮ সালে। মনের কথা কলমকে দিয়ে বলাবার আমার ক্ষমতার অভাব। তদুপরি লিখতেও জানি না ভালোভাবে। তবুও লিখেছি অন্তরের এক অজানা আবেগবশে। তা যেন দন্তহীন শিশুর মিছরি খাবার মতো –চিবুতে না পেরে চুষে খাওয়া। বহু বাধা-বিপত্তির মধ্যে উক্ত পুস্তকখানা দীর্ঘ ২২ বছর পর ১৩৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু আজও আমি সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন নই। তার কিঞ্চিৎ আভাস দিয়েছি উক্ত পুস্তকখানার ভূমিকায়।

    আলোচ্য পুস্তকখানা গোষ্ঠিবিশেষের গাত্রদাহের কারণ হলেও সুধীমহলে বিশেষভাবে সমাদর লাভ করেছে। আমার মনে হয় আপনাদের সভায় আমাকে অংশগ্রহণের সুযোগ এনে দিয়েছে আমার ক্ষুদ্র পুস্তকখানাই।

    যদিও আমি মুক্ত মন ও স্বাধীন চিন্তার অধিকারী নই, তবুও উক্ত গুণে গুণান্বিত ব্যক্তিদের আমি আন্তরিক ভালোবাসি। আর আমার সেই ভালোবাসার প্রতিদানেই পেয়েছি আমি ঢাকাস্থ কিছুসংখ্যক বিদগ্ধমনার সাথে মেলামেশার সুযোগ। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ধারক ও বাহক হলো মানুষের গতানুগতিকতা এবং তা মানব সমাজের প্রগতির পরিপন্থী। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের মূল উৎস উদঘাটন করে জনগণের দৃষ্টিগোচর করানোর উদ্দেশ্যে সৃষ্টি রহস্য’ নামে আমি সম্প্রতি আর একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক লিখেছি। এ পুস্তকখানাও মুদ্রিত হয়েছে। তবে এখনো প্রকাশিত হয়নি। আমি আশা করি সুধী পাঠকবৃন্দ উক্ত পুস্তিকা দু’খানা গ্রহণ করবেন আমার লেখার উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং সমালোচক বন্ধুগণ সমালোচনা করবেন আমার মূঢ়তাজনিত ত্রুটিগুলোকে ক্ষমার চোখ দেখে। তা শুধু আশা নয়, নিবেদনও।

    স্থানীয় গ্রামীণ সমাজে ভুক্ত থেকেও আমি গুরুবাদীর সমাজে শামিল হতে না পারায় প্রাণঘাতী বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নিতান্তই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। এমতাবস্থায়, ‘সুধীবৃন্দ তাদের এই মূঢ় সেবকের প্রতি কৃপাদৃষ্টি রাখলে উপকৃত হবো’ –এ আশা নিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    .

    আরজ মঞ্জিল লাইব্রেরীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ

    মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার পল্লীবাসী আত্মীয়-বন্ধুগণ! আজ আমার জীবন ধন্য হলো, তা দু’টি কারণে। প্রথমটি হলো জেলা প্রশাসক সাহেবের হাতে আমার বহু আকাঙিক্ষত ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির দারোদঘাটন দেখতে পেয়ে। দ্বিতীয়টি হলো আমার চিরপ্রিয় পাঠশালার প্রাণপ্রিয় ছাত্রদের সুকোমল হস্তে সর্বপ্রথমবার বৃত্তি প্রদান করতে পেরে।

    আজ আমার ৮০ বছর দীর্ঘ জীবনের মধ্যে পরম ও চরম আনন্দের একটি দিন। ‘পরম’ ও ‘চরম’ এই জন্য যে, এ লামচরি গ্রামের মতো একটি গণ্ডগ্রামে ভাইটগাছ, গুঁড়িকচু ও কচুরিপানায় আচ্ছাদিত জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে অবস্থিত আমার এ নগণ্য প্রতিষ্ঠানটির শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে যে সমস্ত মনীষীবৃন্দের চরণদর্শন লাভের সৌভাগ্য আজ আমার হলো, এ জীবনে তা আর কখনো হয়নি, হয়তো ভবিষ্যতে আর হবেও না কোনোদিন। কেননা আমি এখন খরস্রোতা-নদীতীরের ফাটল ধরা মাটির উপর দাঁড়ানো বৃক্ষের মতোই পঁড়িয়ে আছি। যে কোনো মুহূর্তে ডুবে যেতে পারি অতল সলিলে।

    হয়তো কেউ জানতে চাইতে পারেন যে, বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে ‘অভাব’-এর তো অভাব নেই। তবে কেন আমার মনে লাইব্রেরীর মতো সামান্য একটা অভাব মোচনের প্রবণতা জাগলো? এর জবাবে আমি আপনাদের এই জানাতে চাই যে, এটা আমার আজীবনকালের ভিক্ষাবৃত্তি ও চুরিকর্মের পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সে কি রকম, সংক্ষেপে তা বলছি।

    জন্ম আমার ৩রা পৌষ ১৩০৭ সালে। আমার শৈশবকালে এ গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ছিলো না। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা ও আট বছর বয়সে বিওনিলামে সর্বহারা হয়ে বিধবা মায়ের আঁচল ধরে দশ দুয়ারের সাহায্যে শৈশবে আমাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। স্থানীয় মুন্সি মরহুম আ. করিম সাহেব একখানি মক্তব খোলেন তার বাড়িতে ১৩২০ সালে। আমি অবৈতনিকভাবে তার কাছে শিক্ষা করলাম স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ, বানান-ফলা পর্যন্ত। কিন্তু ছাত্রবেতন অনাদায়হেতু তিনি মক্তবটি বন্ধ করে দিলেন ১৩২১ সালে। আর এখানেই হলো আমার। বিদ্যাশিক্ষার সমাপ্তি বা সমাধি।

    শৈশবে লেখাপড়া শেখার প্রবল আগ্রহ আমার ছিলো, কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না। উক্ত সামান্য বিদ্যার জোরেই চুরি করে করে পড়েছি জয়গুণ, সোনাভান, জগনামা, মোক্তল হোসেন। ইত্যাদি পুঁথি এবং ভিক্ষা করে পড়েছি তৎকালে বরিশালে পড়ুয়া ছাত্রদের পুরোনো পাঠ্যবইগুলো। সে সব ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন প্রিয় ফজলুর রহমান (গ্রাজুয়েট)। তিনি অবসরপ্রাপ্ত এল, এ. ও.। বর্তমানে এখানেই আছেন।

    বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরী থেকে বই চুরি করে করে বাড়িতে এনে পড়তে শুরু করি ১৩৪৪ সাল থেকে। মিউনিসিপ্যাল এলাকার বাইরের কোনো পাঠককে তার বাড়িতে বই দেবার নিয়ম নেই বলে আমাকে বাড়িতে এনে বই পড়তে হয়েছে তৎকালীন বরিশালের টুপির ব্যবসায়ী জনাব ওয়াজেদ আলী তালুকদারের বেনামিতে। আমি তার কাছে ঋণী। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর বই সময় সময় এখনো বাড়িতে এনে পড়ি, তা-ও বেনামিতে আনতে হয়। এ সমস্ত আমার পক্ষে চুরিই বটে। এ চুরিকাজে যথাসম্ভব সাহায্য দান করেছেন মাননীয় লাইব্রেরীয়ান জনাব ইয়াকুব আলী (মোক্তার সাহেব। আমি তাঁরও কাছে ঋণী। এর মধ্যে বরিশাল শংকর লাইব্রেরী থেকেও বই-পুস্তক এনে পড়েছি দু-তিন বছর, তা-ও অনুরূপভাবে।

    ১৩৫৪-৫৫ সাল থেকে কিছু কিছু বই চুরি করে এনে পড়তে থাকি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরী থেকে। সে চুরিকাজে সাহায্য দান করেছেন ও করেন মাননীয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব। তিনি শুধু আমার চুরিকাজের সহযোগীই নন, আমার জীবনের সাধনার যাবতীয় ফলাফলের তিনি সমঅংশীদার। হয়তোবা তার চেয়েও বেশি। তিনি আমার জীবনের সাথে এতই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত যে, কারো সাহায্য না নিয়ে তিনি আমার জীবনী লিখতে পারেন। মাননীয় অধ্যাপক শামসুল হক সাহেব এবং মাননীয় অধ্যাপক শামসুল ইসলাম সাহেবও। সাহায্য করেছেন কলেজ লাইব্রেরী থেকে বই চুরির কাজে। ১৩৫৭ থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত চুরি করে এনে কিছু কিছু বই পড়েছি বরিশালের ব্যাপটিস্ট মিশন লাইব্রেরী থেকে এবং ভিক্ষাও পেয়েছি কিছু পুস্তক-পুস্তিকা সেখান থেকে। আর এ কাজে আমাকে সাহায্য দান করেছেন। তৎকালীন লাইব্রেরীয়ান মি. মরিস সাহেব। তিনি ছিলেন স্কটল্যাণ্ডের অধিবাসী। তবে বাংলা ভাষা জানতেন ভালো। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।

    যে সমস্ত মনীষীগণ আমার জন্য চুরি করেছেন বা আমার চুরিকাজে সাহায্য করেছেন, আমার মনে হয় যে, আইনের কাছে তারা অন্যায় করে থাকলেও সমাজের কাছে তারা মহৎ কাজই করেছেন। কেননা তারা একটি ‘জানোয়ার’কে মানুষ বানিয়েছেন। আর সেই মানুষটির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ আপনারা এই জংলাভূমে পদধূলি দিয়েছেন।

    প্রবাদ আছে– ‘চোরের বাড়িতে দালান নেই’ এবং ভিক্ষার চালে ভরে না গোলা’। তাই ভেবে আজীবনকালের ভিক্ষা ও চুরি করা সম্পদটুকু মজুত করে রাখা নিষ্ফল মনে করে জনগণের কল্যাণ কামনায় তা সাধারণ্যে দান করে দেবার প্রয়াসী হয়ে, তা দান করলাম ‘সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামক দু’খানা ক্ষুদ্র পুস্তকের মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, রাজধানীর বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই বই দু’খানা আমার দান বলে স্বীকার করতে চাননি। তারা অনেকেই বলেছেন যে, পল্লীবাসী কৃষকরা নিরক্ষর হলেও সাধারণত ভালোমানুষ এবং বেশির ভাগই ঈমানধনে ধনী। তাদের মধ্যে এমন আনাড়ি লোক ও এ সমস্ত দানসামগ্রী থাকা অসম্ভব। এই বই নিশ্চয় কোনো বুদ্ধিজীবী লোকের লেখা। হয়তো তিনি ধুরন্ধরী করে নাম দিয়েছেন একজন কৃষকের। বই দুখানা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব কি-না, তা যাচাই করবার জন্য প্রাক্তন ডি. পি. আই জনাব ফেরদাউস খান তো তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আমাকে আমন্ত্রণ দিয়ে নিয়ে রীতিমতো পরীক্ষাই নিলেন ৩. ১. ৭৬ তারিখে। সে পরীক্ষাকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন জনাব আ. ন. ম. এনামুল হক এবং চিত্রশিল্পী কাজী আবুল কাসেম সাহেব। সেদিন কাসেম সাহেবের হাতে পেন্সিলে আঁকা আমার একটি ছবি এখানেই আছে।

    কিন্তু বুদ্ধিজীবী মহলের সে কথার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজধানীর বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ প্রধান ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাঁক পত্রিকায় ও তার প্রণীত ‘আরণ্যক দৃশ্যাবলী’ নামক বইখানিতে। তিনি অন্যান্যের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “কল্পিত নাম নয়, ছদ্মনাম নয় কারো। আরজ আলী মাতুব্বরের নিবাস বরিশাল।” তার সে বইখানা এখানেও আছে।

    ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা এবং চুরি করে করে যে পাপ অর্জন করেছি, তারই প্রায়শ্চিত্ত অথবা যে অপরাধ করেছি, তারই জরিমানা দিচ্ছি এখন প্রায় ৬০ হাজার টাকা। যার দ্বারা স্থাপিত হচ্ছে এই ক্ষুদ্র পাঠাগারটি, মজুত হচ্ছে জনতা ব্যাংকে ১০ হাজার টাকা এবং করা হচ্ছে দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক বৃত্তিদানের ব্যবস্থা। এসমস্ত অর্থ আমার দান নয়, এগুলো পাপের প্রায়শ্চিত্ত বা অপরাধের জরিমানা। কেননা ঐসমস্ত পাপ বা অপকর্ম না করলে, হয়তো এসমস্ত জরিমানা দিতাম না কখনো।

    দারিদ্র নিবন্ধন কোনো স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি দেশের। অন্যসব ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। তাই কোনো স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আমার শিক্ষাপীঠ নয়। আমার শিক্ষাপীঠ হলো লাইব্রেরী। আশৈশব লাইব্রেরীকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনো ভালোবাসি। লাইব্রেরীই আমার তীর্থস্থান। আমার মতে –মন্দির, মসজিদ, গির্জা থেকে লাইব্রেরী বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।

    তাই যখন কোনোরূপ একটি জনকল্যাণমূলক কাজ করবার জন্য মনস্থির করেছি, তখন সেই লাইব্রেরীপ্রীতিই জাগিয়ে তুলেছে আমার মনে লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার প্রবণতা। আর তারই ফল এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটি। যেহেতু আমি লাইব্রেরীর কাছে ঋণী, আমি লাইব্রেরীর ভক্ত।

    লাইব্রেরী ছাড়া আমার আরও একটি তীর্থস্থান ছিলো। তা হলো প্রায় ৬৭ বছরের পুরোনো একখানা দোচালা খড়ের ঘর। অর্থাৎ মরহুম মুন্সি আবদুল করিম সাহেবের ক্ষুদ্র পাঠশালাটি। সেটি ছিলো আমার শৈশবকালের তীর্থস্থান। সেখানে গিয়ে লিখতে হয়েছে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ তালপাতায় এবং বানান-ফলা কলাপাতায়, লেমের কালি ও টুনির কলম দিয়ে। সে পাঠশালায় সমপাঠী বা সহপাঠী যারা ছিলো, তারা সবাই কালে বা অকালে এ জগত ছেড়ে চলে গেছে, জীবিত আছি মাত্র দুজন আরজ আলী।

    সেকালের সেই পরলোকগত সহপাঠীদের কচি মনের সাথে আমার তখনকার কচি মনের যে ভালোবাসা জন্মেছিলো, তা ভুলতে পারিনি আজও। তাই সময় সময় এ বৃদ্ধ মনটি যেন কচি হয়ে যায় এবং স্মৃতিপটে আঁকা সেই সব বাল্যবন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও খেলা করে। কিন্তু সে খেলায় মন-মানস তৃপ্ত হয় না।

    তাই আমার শৈশবের সেই কচি মনটি বন্ধুত্ব পাতাতে চায় আধুনিক কালের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কচিমনা শিশুদের সাথে। কিন্তু জানি যে, অধুনা কোনো শিশুছাত্রই আমার মতো চুল দাড়ি পাকা, দন্তহীন বৃদ্ধের সাথে বন্ধুত্ব পাবে না, আমাকে ভালোবাসবে না। মনের সরলতায় আমি যে আজও একজন শিশু, তা কেউ বুঝবে না, বোঝবার কথাও নয়। তাই স্থির করেছি যে, ছাত্ররা আমাকে ভালোবাসুক আর না-ই বাসুক, আমি তাদের ভালোবাসবো। শৈশবকাল থেকেই আমার মনে বাসা বেঁধেছে পাঠশালাপ্রীতি ও ছাত্রপ্রীতি। কামনা করি যে, আমার মরআত্মা যেন অনন্তকাল ধরে পাঠশালার শিশুছাত্রদের সাথেই খেলা করে। আর তাই হবে আমার স্বর্গসুখ। এ ছাড়া অন্য কোনোরূপ স্বর্গ আমার কাম্য নয়। আর সেই পাঠশালা ও ছাত্রপ্রীতির নিদর্শন হলো ছাত্রদের বৃত্তি দান অর্থাৎ আরজ ফাণ্ড থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনন্তকাল স্থায়ী প্রতিযোগিতামূলক বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান।

    অর্থ আমার নেই। কেননা জীবনে অর্থের জন্য সাধনা করিনি, বেঁচে থাকার অতিরিক্ত। কর্মজীবনের শেষ অধ্যায়ে ১৩৬৭ সালে আমার স্থাবরাস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি ওয়ারিশদের দান ও বণ্টন করে দিয়ে রিক্ত হস্তে সংসারত্যাগী হয়ে, সে সময় থেকে পুত্রগণের পোষ্য হয়ে জীবন যাপন করছি। তবে ছেলেদের বলে দিয়েছি যে, অতঃপর এ বৃদ্ধ বয়সে দেহটি খাঁটিয়ে যদি কিছু অর্থ উপার্জন করতে পারি, তবে তার প্রতি তোমাদের কারো কোনো দাবি থাকবে না, আমি তা ইচ্ছামতো কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করবো। ওয়ারিশগণ তাতে সম্মত ছিলো এবং এখনো আছে। বিশেষত আমার প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণে তারা যথাসম্ভব সহযোগিতাও করছে। তবে তারা এতে কোনোরূপ আর্থিক সাহায্য দানে অক্ষম।

    সংসারত্যাগী হয়েও নিষ্কর্মা হয়ে বসে থাকিনি আমি, দিনমজুরি করেছি মাঠে মাঠে আমিন রূপে। সেই মজুরিলব্ধ অর্থ দ্বারা কিছু ভূসম্পত্তি খরিদ করেছিলাম ৩মি ইতঃপূর্বে। গত বছর তা সমস্তই বিক্রয় করেছি। ক্রেতারাও প্রায় সবাই এখানে আছেন। সেই সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ সামান্য পুঁজি নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপনের বিরাট কাজে হাত দিয়েছি। সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও অন্যান্য বাবদ তহবিল ছিলো মাত্র ৪৫ হাজার টাকা এবং পরিকল্পিত কাজের ব্যয় বরাদ্দ ছিলো ৬০ হাজার টাকা। আমি জানি যে, এর ঘাটতির ১৫ হাজার টাকা পূরণ করতে হবে আমাকে দিনমজুরি করে। মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবকে প্রদত্ত পরিকল্পনায় এ ঘাটতির বা তা পূরণের উপায় সম্বন্ধে কোনো উল্লেখ করিনি। কেননা আমার দৃঢ় ধারণা এই যে, যদি মজুরগিরিতে অক্ষম হই, তাহলে ভিক্ষা করবো। ভিক্ষায় আমার লজ্জা নেই। লোকে আমাকে ভিখারী বলুক, তা আমি চাই। আর সেই কারণেই আমার একখানি জীবনী লিখে নাম দিয়েছি ‘ভিখারীর আত্মকাহিনী’। ভিক্ষা করা সম্প্রতি শুরুও করেছি। এবারে ঢাকায় গিয়ে কতিপয় বিদ্যোৎসাহী বন্ধুর কাছে বই ভিক্ষা পেয়েছি ১০৮ খানা, যার মোট মূল্য ৯৮৩.৭৫ টাকা। সে বইগুলো আমার লাইব্রেরীতে আছে।

    টাকা আমার নেই। আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার টাকার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমার প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় কাজ সমাধা করতে টাকার অভাব আছে, তা-তো আগেই বলেছি। অভাব আছে কিছু বইপত্রের ও আসবাবপত্রের। কিন্তু তা পূরণ কবা আমার ক্ষমতার বাইরে নয়। সুধী মহোদয়গণ! আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন যে, এখন আমার জন্য কোনো ভবিষ্যত নেই। ‘ভবিষ্যত’ আমার হাতে থাকলে কোনো অভাবকেই অভাব বলে মনে করতাম না। তাই আপনাদের কাছে আমার অভাবের একটি তালিকা পেশ করছি।

    ১. গরু-ছাগলের কবল থেকে ফুল-ফলের গাছ রক্ষার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর সরহদ্দের সীমানা বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ করা।

    ২. আগন্তুকদের পানীয় জলের জন্য একটি নলকূপ বসানো।

    ৩. বয়স্কদের শিক্ষার জন্য নৈশবিদ্যালয়রূপে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ করা।

    ৪. দানপত্র রেজিস্ট্রীকরণের ব্যয় নির্বাহ করা (এটাই আমার সর্বপ্রধান সমস্যা এবং আশু প্রয়োজন)।

    একবার আমার ৬০ বছর বয়সের সময়ে ঘোষণা করেছিলাম যে, অতঃপর যা-কিছু উপার্জন করবো, তা সমস্তই দেশের জনকল্যাণে ব্যয় করবো। আপনারা দেখেছেন যে, তা আমি করেছি। আজ ৮০ বছর বয়সে আবার ঘোষণা করছি যে, অতঃপর যদি কোনো কাজের মজুরি পাই, কিংবা পুরস্কার বা উপহারপ্রাপ্ত হই, অথবা কোনো মহৎ ব্যক্তিদের নিকট হতে কোনোরূপ দানপ্রাপ্ত হই, বা মহামান্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনোরূপ সাহায্যপ্রাপ্ত হই, তবে তা সমস্তই আমার এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বার্ষিক বৃত্তিদানে ব্যয় করবো। আর এজন্য উপস্থিত সুধীবৃন্দের বিশেষ করে মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

    শ্রদ্ধেয় অতিথিবৃন্দ! আপনাদের আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। এখন আমি মৃত্যুপথের যাত্রী। অনেকের সাথেই হয়তো এ-ই আমার শেষ দেখা। আপনাদের মতো যে সমস্ত সুধীজনের সাথে সৌভাগ্যক্রমে আমার পরিচয় লাভের সুযোগ ঘটেছে, তারা সবাই হচ্ছেন বিদ্যায়, জ্ঞানে, গুণে, ধনে, মানে, পরিবেশ ও আভিজাত্যে আমার সাথে এতটাই অসমান যে, তা পরিমাপ করা যায় না। আর আমি হলাম একজন অশিক্ষিত, পল্লীবাসী কৃষক। তাই অনেক সময় আপনাদের সাথে আলাপ-আলোচনা ও ব্যবহারে সৌজন্য রক্ষা করে চলতে পারিনি। হয়তো ত্রুটি হয়েছে, হয়েছে বেয়াদবি। কিন্তু তা আমার অহত্তকার নয়, তা হচ্ছে স্বকীয় অজ্ঞতা, মূর্খতা বা বার্ধক্যহেতু জ্ঞানের খর্বতা। সেজন্য আমি আজ আপনাদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছি।

    আমার পল্লীবাসী ভাই ও বোনেরা, যারা এখানে আছেন বা না আছেন, সবাইকে ধন্যবাদ জানাই এই জন্য যে, আমি আপনাদের গ্রাম্য সমাজের একজন আনাড়ি মানুষ। কেননা প্রচলিত সমাজবিধির বিরুদ্ধে অনেক কাজ করে যাচ্ছি। আর সেজন্য আপনারা আমাকে সমাজচ্যুত করতে। পারতেন, পারতেন একঘরে করতে, বর্জন করতে। কিন্তু তা আপনারা করেননি, বরং আমাকে সাথে নিয়েই কাজ করেছেন সকলে সব সময়, মর্যাদা দান করেছেন। কোনো কোনো কারণে আপনাদের অবহেলার পাত্র হলেও অবহেলা করেননি আমাকে কেউ কোনোদিন। তাই আমি। আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জীবনের শেষ প্রহরে বিদায় নিচ্ছি।

    পরিশেষে — হে আমার মহান অতিথিবৃন্দ! সময়, শক্তি ও অর্থ নষ্ট করে এবং শ্রম স্বীকার করে আপনারা আমার এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির সামান্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করে অনুষ্ঠানটিকে সাফল্যমণ্ডিত করেছেন, আমাকে করেছেন গৌরবান্বিত। বিশেষত মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব উদ্বোধনপর্বে পৌরোহিত্য করায় অনুষ্ঠানটি হচ্ছে গৌরবোজ্জ্বল এবং তার পদস্পর্শে লাইব্রেরীটি হয়েছে ধন্য, ধন্য হচ্ছে লামচরি গ্রামখানি। আমি নিজের ও লামচরিবাসীদের পক্ষ থেকে আপনাদের সকৃতজ্ঞ মোবারকবাদ জানাচ্ছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।

    [২৫. ১. ১৯৮১]

    .

    বাংলাদেশ লেখক শিবিরের বরিশাল শাখা আয়োজিত নজরুল জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রদত্ত লিখিত ভাষণ

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আপনাদের এ মহৎ অনুষ্ঠানে সমাবিষ্ট মহজ্জনদের মধ্যে অনেকের কাছেই আমি অপরিচিত। তাই আজকের অনুষ্ঠানবিষয়ে কিছু বলার পূর্বে আমি আমার পরিচয়জ্ঞাপক দু-চারটি কথা আপনাদের কাছে বলতে চাই। এবং সেজন্য মাননীয় সভাপতি সাহেবের অনুমতি প্রার্থনা করছি।

    জন্ম আমার ৩রা পৌষ ১৩০৭ সালে, বরিশাল থেকে প্রায় সাত মাইল দূরে লামচরি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহারা ও আট বছর বয়সে নিলামে বিত্তহারা হয়ে বিধবা মায়ের আঁচল ধরে দশ দুয়ারের সাহায্যে শৈশবে আমাকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। সেকালে আমাদের গ্রামে কোনোরূপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো না, স্থানীয় মুন্সি আ. করিম সাহেব একখানি মক্তব খোলেন তার বাড়িতে ১৩২০ সালে। এতিম ছেলে বলে আমি অবৈতনিকভাবে তার কাছে শিক্ষা করলাম স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণ এবং বানান-ফলা পর্যন্ত। কিন্তু ছাত্রবেতন অনাদায়হেতু তিনি মক্তবটি বন্ধ করে দিলেন ১৩২১ সালে। আর এখানেই হলো আমার বিদ্যাশিক্ষার সমাপ্তি বা সমাধি।

    শৈশবে লেখা-পড়া শেখার প্রবল আগ্রহ ছিলো, কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না। উক্ত সামান্য বিদ্যার জোরেই গ্রাম্য পুঁথিপাঠকদের কাছে গিয়ে বানান করে করে পড়েছি জয়গুন, সোনাভান, জগনামা, মোক্তল হোসেন ইত্যাদি পুঁথি এবং ভিক্ষা করে করে পড়েছি তৎকালীন বরিশালে পড়ুয়া প্রতিবাসী ছাত্রদের পুরোনো পাঠ্যবইগুলো।

    দারিদ্র নিবন্ধন আমাকে কৃষিকাজ শুরু করতে হয়েছিলো অল্প বয়সেই। কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে বরিশালের এই পাবলিক লাইব্রেরী থেকে চুরি করে করে বই পড়তে শুরু করি ১৯শে পৌষ ১৩৪৪ সাল থেকে। মিউনিসিপ্যাল এলাকার বাইরের কোনো পাঠককে তার বাড়িতে বই দেবার নিয়ম নেই বলে আমাকে বাড়িতে নিয়ে বই পড়তে হয়েছে তৎকালীন বরিশালের টুপির ব্যবসায়ী জনাব ওয়াজেদ আলী তালুকদারের বেনামিতে। এটা আমার পক্ষে চুরিই বটে।

    তালুকদার সাহেবের অবর্তমানে স্বনামে বই পড়তে শুরু করি ৮ই আশ্বিন ১৩৭২ সাল থেকে (ইং ২৫. ৯. ৬৫)। কিন্তু এ সময়ও অসদুপায় অবলম্বন করতে হলো আমার অধ্যয়নলিপ্সার তাড়নায়। ঠিকানা লিখতে হলো ‘দপ্তরখানা রোড, বরিশাল’। এটা ছিলো ডাহা মিথ্যা ঠিকানা। আমার এসব অসৎ কাজে যথাসম্ভব সাহায্য দান করেছেন প্রাক্তন লাইব্রেরীয়ান জনাব ইয়াকুব আলী মিয়া (মোক্তার সাহেব) এবং বন্ধুবর সিরাজুল ইসলাম সাহেব। তারা বর্তমানেও এখানেই আছেন।

    এছাড়া ১৩৫৪-৫৫ সাল থেকে কিছু কিছু বই চুরি করে নিয়ে পড়তে থাকি বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরী থেকে। কেননা কলেজ লাইব্রেরী থেকে বাড়িতে নিয়ে বই পড়বার কোনো অধিকার আমার ছিলো না। সে চুরিকাজে সাহায্য দান করেছেন ও করেন উক্ত কলেজের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক গাজী গোলাম কাদির সাহেব (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)। ১৩৫৭ থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত চুরি করে কিছু কিছু বই পড়েছি বরিশালের ব্যাপটিস্ট মিশন লাইব্রেরী থেকে। সেখানে চুরি করতে হয়েছে সে লাইব্রেরীর কর্তৃপক্ষের নিষেধের জন্য নয়, আমার প্রতিবাসী গোঁড়া মুসল্লিদের নিন্দার ভয়ে। সেখানে যথোচিত সাহায্য দান করেছেন তৎকালীন লাইব্রেরীয়ান মি. মরিস সাহেব। তিনি ছিলেন স্কটল্যাণ্ডের অধিবাসী। তবে বাংলা জানতেন ভালো। এর মধ্যে বরিশাল শংকর লাইব্রেরী থেকেও বই-পুস্তক নিয়ে পড়েছি দু’-তিন বছর। তা ও অনুরূপভাবেই।

    উক্তরূপ অসৎ কাজে যে সমস্ত মনীষী আমাকে সাহায্য দান করেছেন, আইনের কাছে অন্যায় করে থাকলেও সমাজের কাছে তারা মহৎ কাজই করেছেন। কেননা তারা একটি অমানুষকে মানুষ বানাবার চেষ্টা করেছেন। হয়তো আশানুরূপ ফল তারা পাননি। আমি তাদের কাছে চিরঋণে আবদ্ধ।

    পূর্বেই বলেছি যে, বরিশাল থেকে আমার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৭ মাইল। কাজেই যে কোনো একখানা বই পড়বার জন্য আমাকে হাঁটতে হয়েছে প্রায় ১৪ মাইল। কেননা তখন কোনোরূপ যানবাহনের ব্যবস্থা ছিলো না আমাদের বরিশালে যাতায়াতের জন্য, নেই আজও। আর এভাবে। বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর সাথে সংযোগ রক্ষা করে চলেছি আমি ১৩৪৪ থেকে ১৩৭৯ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ একাদিক্রমে প্রায় ৩৫ বছর ধরে। অতঃপর পুস্তকাদি রচনা ও প্রকাশনার ব্যাপারে আমাকে এখন অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে ঢাকা নগরীতে।

    দারিদ্র নিবন্ধন কোনো স্কুল-কলেজে গিয়ে পয়সা দিয়ে বিদ্যা কিনতে পারিনি। দেশের অন্য সব ছাত্র-ছাত্রীদের মতো। তাই কোনো স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা আমার শিক্ষাপীঠ নয়, আমার শিক্ষাপীঠ হলো লাইব্রেরী। আশৈশব লাইব্রেরীকে ভালোবেসে এসেছি এবং এখনও ভালোবাসি। লাইব্রেরীই আমার তীর্থস্থান। আশা করি আমরণ লাইব্রেরীর সেবা করতে এবং এ-ও কামনা করি, লাইব্রেরীর মেঝেই হয় যেন আমার অন্তিমশয্যা। তাই নিজ পল্লীতে প্রতিষ্ঠা করেছি নগণ্য একটি পাবলিক লাইব্রেরী ১৩৮৬ সালে। আমার মতে মন্দির, মসজিদ, গির্জা থেকে লাইব্রেরী বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।

    আমার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে আপনাদের আর কষ্ট দিতে চাই না। এখন আমি আজকের অনুষ্ঠান সম্পর্কে দু-একটি কথা বলে বক্তব্য শেষ করবো।

    বাংলাদেশ লেখক শিবিরের বরিশাল শাখার উৎসাহী কর্মীবৃন্দের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে আজ এখানে বিদ্রোহী কবির জন্মদিনকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হচ্ছে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর শুধু এখানেই নয়, এ দিনটি পালিত হচ্ছে দেশের সর্বত্র এবং দেশের বাইরেও বহু জায়গায়, অবশ্য সুধীসমাজে। এ দিনটিতে সর্বত্রই হচ্ছে কবির জীবনের বিভিন্ন দিক ও বিষয় সম্বন্ধে নানা ধরণের আলোচনা, নীতিগতভাবেই। দেশের সুধীসমাজ আজ কবির সপ্রশংস আলোচনায় মুখর, ভক্তিরসে আপ্লুত। বিশেষত দেশের যুবসমাজকে দেখি এর পুরোভাগে। এটা শ্লাঘার বিষয় এবং গৌরবেরও। আর কবির আকাঙ্ক্ষাও ছিলো এটাই। দেশের দুস্থ জনগণের দুঃখ-দুর্দশা মোচন ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে উদাত্ত কণ্ঠে ডাক দিয়েছেন কবি দেশের তরুণদেরকেই সবসময়। সেজন্য আমাদের মতো বৃদ্ধদেরকে ডাকেননি তিনি কখনও। কেননা তিনি জানতেন যে, দেশের নিপীড়িত জনগণের ভাগ্যে বিবর্তন ঘটাতে পারে একমাত্র তরুণরাই।

    কবির যশোগান, গুণগান, স্তুতিগান আজ দেশে-বিদেশে সর্বত্র। কিন্তু কবি কি এ সবের কাঙাল ছিলেন, বা প্রত্যাশা করেছিলেন এসব প্রাপ্তির জন্য কারো কাছে? না, তিনি ওসবের কাঙাল ছিলেন না এবং প্রত্যাশাও করেননি কারো কাছে ওসব পাবার জন্য। কেননা তার জীবনে ওসব তিনি অযাচিতভাবেই পেয়েছিলেন প্রচুর। তবে কি তিনি নিষ্কাম-নিস্পৃহ হয়ে ইহধাম ত্যাগ করতে পেরেছেন? কবির কোনো বাসনা কি অপূর্ণ ছিলো না এবং তা পূর্ণ করবার জন্য তার বিদেহী আত্মা কি আপনাদের দিকে চেয়ে নেই? আছে বইকি। একটু খোঁজ নিলে সহজেই দেখা যাবে যে, তার সে অপূর্ণ বাসনাটি ছিলো দেশের দীন-দুঃখীর দুঃখ-দুর্দশা দূর করার বাসনা। তার সে বাসনাটি পূর্ণ করবার জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন আমরণ। কিন্তু তা তিনি পারেননি পূর্ণ করে যেতে ধরাধামে থেকে। তাই কবির মরআত্মা সতৃষ্ণ নয়নে চেয়ে আছে আপনাদের দিকে তার সে বাসনাটি পূর্ণ করার অপেক্ষায়। কবির গানের সুর, কবিতার ছন্দ, প্রবন্ধের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ইত্যাদিতে কবিকে যতোই প্রশংসিত করা হোক না কেন, সমাজের কাছে বাহবা পেলেও কবির বিদেহী আত্মার আশীর্বাদ তাতে মিলবে না, যদি না তার অপূর্ণ বাসনা পূর্ণ করা হয়।

    কবির যাবতীয় লেখায় এবং অন্তরে ছিলো দীন-দুঃখী ও মেহনতী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার প্রবল আকুতি। কিন্তু নিয়তির সাথে তিনি পেরে উঠলেন না, পারলেন না মনের সে বাসনা পূর্ণ করে যেতে। আজ তার উত্তরসূরীদের কর্তব্য কবির সে বাসনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হওয়া। আর সেজন্য আবশ্যক সুপরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা। এ কাজে যথার্থই যারা আত্মনিয়োগ করবেন, একমাত্র তারাই হবেন কবির বাস্তব অনুসারিত্বের দাবিদার। বস্তুত এ কাজই হবে নজরুলপ্রীতির মাপকাঠি, তাঁর নামের অনুষ্ঠানে প্রীতি নয়।

    এ পর্যন্ত বলেই আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।

    [১২. ২. ১৩৮৮]

    .

    বরিশাল সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত গুণী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পঠিত ভাষণ

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে বলবার মতো বহু কথা থাকলেও সময়ের অভাবে তা বলতে পারছি না। কেননা এখান থেকে আমাকে যেতে হবে প্রায় সাত মাইল দূরে, এক বৈঠার নৌকায় অথবা হাঁটাপথে। তাই শুধুমাত্র আমার পরিচয়জ্ঞাপক দু’একটি কথা বলতে চাই, কেননা অনেকের কাছে আমি অপরিচিত।

    আজকের এ অনুষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে –বরিশাল সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে গুণী সংবর্ধনা। কবি-সাহিত্যিকগণের একটি বিশেষ গুণ হলো সময় সময় কিছু ভুল করা। এবং সেরকম একটি ভুল করেছেন বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সুধী সদস্যবৃন্দ আজও। আর সে ভুল করতেও তাদের বহু কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে, ব্যয় হচ্ছে শক্তি, সময়, অর্থ এবং করতে হচ্ছে অনেক চিন্তা-ভাবনা-কল্পনা।

    আগের দিনের কবি-সাহিত্যিকগণ (তৎসঙ্গে জনসাধারণও) চাঁদের রূপ-গুণের কীর্তন করে এসেছেন শতমুখে অজস্রধারায় দূর থেকে দেখে, কাছে গিয়ে দেখতে পাননি ঐ চাঁদের আসল রূপটি কি। কারো মুখের সৌন্দর্য বর্ণনায় বলা হতো মুখখানা চাঁদের মতো’, কোনো দুর্লভ বস্তু প্রাপ্তিতে বলা হতো ‘হাতে চাঁদ পেয়েছে’, বলা হতো চাঁদের কিরণ অতি মধুর ইত্যাদি। কিন্তু আজকাল মানুষ দূর থেকে চাঁদের কাছে গিয়েছে, পদস্পর্শ করেছে চাঁদের গায়ে এবং দেখছে। এখন চাঁদের আসল রূপটি কি। এখন দেখা গেছে যে, চাঁদের দেহটি মোটেই সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়। তা হচ্ছে এবড়োখেবড়ো খানাখন্দ, আগ্নেয়গিরির পোড়াপাথর আর জলশূন্য সমুদুরের খাদে ভরা। চাঁদ আসলে সুন্দর মোটেই নয়।

    মানুষ এখন চাঁদকে হাতে পেয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো দুর্লভ বস্তু এখনো পায়নি। পায়নি মণি-মাণিক্য, হীরা-জহরত, সোনা-রূপা-লোহা বা কয়লার খনিও। আর ‘চাঁদের কিরণ অতি মধুর’ তো দূরের কথা, এখন দেখা গেছে যে, আসলে চাঁদের কোনো কিরণই নেই; চাঁদ ছড়াচ্ছে শুধু সূর্যেরই আলো, যা সমস্তই তার ধার করা।

    ঐরূপ আগের দিনের কবি-সাহিত্যিক এবং জনগণের মতোই আজ ভুল করেছেন বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সুধী সদস্যবৃন্দ, চাঁদের মতো দূর থেকে দেখে আমাকে গুণীগণের সমপর্যায়ভুক্ত করে। আমার নিকটবর্তী হলে তারা দেখতে পাবেন যে, আসলে আমার রূপটি চাঁদের মতোই।

    আদিকবি বাল্মীকির কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটেছিলো নাকি কামক্রীড়ারত এক ক্রৌঞ্চের (বক জাতীয় পাখি) মৃত্যুতে শোকে অভিভূত হয়ে। আর আমার পড়ালেখার তথা অজানাকে জানার প্রেরণা জেগেছে আমার মাতার মৃত্যুশোকে অভিভূত হয়ে। সে প্রসঙ্গটি আমি অনেক সময় বলেছি এবং তা কতিপয় পত্র-পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছে। এখানেও হয়তো কেউ কেউ সে। ঘটনাটি জেনে বা শুনে থাকতে পারেন। তবুও সে বিষয়ে দু’একটি কথা আবার এখানে বলছি।

    আমি পল্লীবাসী একজন গরীব কৃষকের ছেলে। আমার চার বছর বয়সে বাবা মারা যান। দারিদ্র নিবন্ধন শৈশবে কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ আমার ঘটেনি, বর্ণবোধ ছাড়া।

    ১৩৩৯ সালে আমার মা মারা গেলে আমি মৃত মায়ের ফটো তুলেছিলাম। মা’র সৎকারের উদ্দেশ্যে যে সমস্ত আলেম ও মুসল্লিরা এসেছিলেন, “ফটো তোলা হারাম” –বলে তারা জানাজা পড়া ও দাফন করা ত্যাগ করে লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা আমার মাকে জানাজা ছাড়াই কতিপয় অমুসল্লি নিয়ে সৃষ্টিকর্তার হাতে সমর্পণ করতে হলো কবরে।

    আমার মা ছিলেন অতিশয় নামাজী-কালামী ধার্মিকা রমণী। তবু তিনি মুসল্লিদের হাতের মাটি বা আলেমদের পড়া জানাজা পেলেন না আমার কৃতকর্মের ফলে। এ অনুতাপে আমি দগ্ধ হতে লাগলাম।

    সেদ্দিন আমি শোকে, দুঃখে, ক্ষোভে উন্মাদ হয়ে মা’র মৃতদেহ সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, আমার আমরণ ধর্মের সাধনা করেও লাঞ্ছিত হলেন ধর্মের ধ্বজাধারীদের যে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের ফলে, আমি অভিযান চালাবো সে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যতদিন বাঁচি। মা’র বিদেহী আত্মাকে সম্বোধন করে আরও বলেছিলাম —

    “তুমি আশীর্বাদ করো মোরে মা,
    আমি বাজাতে পারি যেন      সে অভিযানের দামামা।”

    তৎপরবর্তী জীবনে আমার যাবতীয় কাজ ও পড়া-লেখা সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষার প্রয়াসমাত্র। আমার প্রণীত পুস্তক সত্যের সন্ধান’, ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘মুক্ত মন’, ‘অনুমান’ এবং সদ্য প্রকাশিত ‘স্মরণিকা পর্যন্ত সবই উক্ত দামামার মূর্ত প্রকাশ এবং আমার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরীটিও সেই দামামার প্রতিরূপ, আর কতিপয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক বৃত্তি প্রদান ইত্যাদিও সে দামামার রূপান্তরমাত্র। আমি সাহিত্যিক নই, আমি একজন পণু সৈনিক বাদ্যকর।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! যারা ভালোভাবে আমার পরিচয় জানতে চান, তারা যেন আমার প্রণীত কোনো পুস্তক পাঠ করেন এবং জনরবে বিশ্বাস না করেন। কেননা বন্ধুরা আমাকে উচ্চে তোলেন, শত্রুরা নামায় নিচুতে, আমার মূল ঠিকানা মেলে না ওর কিছুতে।

    বরিশাল সাহিত্য পরিষদের সুধী সদস্যবৃন্দ! আপনারা এ মহতী অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে আমার মতো একজন নগণ্য মানুষকে সংবর্ধনা জানিয়ে আপনাদের নিজেদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং আমাকে করেছেন ভাগ্যবান। সমাজে যারা এরূপ জনকল্যাণে আত্মাহুতি দিতে পারেন, তাঁরা। মহৎ আখ্যা পাবার দাবিদার এবং সে দাবিদার আপনারাও। তাই আমি সে দাবিটির স্বীকৃতি ও সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দকে মোবারকবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ১৬. ৮. ১৯৮২

    .

    বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী বরিশাল শাখার চতুর্দশ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে সংবর্ধনার উত্তরে

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ এবং প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আমার বক্তৃতা করার অভ্যেস নেই –এ কথাটি বললে পুরো সত্য কথা বলা হবে না। বরং এটাই সত্য কথা যে, আমার বক্তৃতা করার যোগ্যতা নেই। তাই আমি লিখিতভাবে দু-চারটে কথা আপনাদের কাছে পেশ করছি।

    আপনাদের আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে আমি একজন অদ্বিতীয় ব্যক্তি। তবে তা উৎকর্ষজনিত নয়, অপকর্ষজনিত। এমন কতগুলো বিষয় আছে, যাতে আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে আমার সমতুল্য অন্য কেউ আছেন বলে মনে হয় না। সে বিষয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।

    ১. শিক্ষা –বিদ্যাশিক্ষা আমার পাঠশালার দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত। আমার মনে হয় যে, শিক্ষাক্ষেত্রে আমার সমকক্ষ এ সভায় অপর কেউ নেই। সুতরাং এ সভায় আমি একজন অদ্বিতীয় বিদ্বান।

    ২. বাসস্থান –আমার সহগামী দু-চারজন ছাড়া এ সভায় এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না, যিনি আজীবন পল্লীবাসী। অর্থাৎ কোনো শহরের সাথে যার কোনোরূপ আবাসিক সম্পর্ক নেই। আমার মনে হয় যে, এ বিষয়টিতেও আমি অদ্বিতীয়।

    ৩. পেশা –পেশায় আমি একজন খাঁটি কৃষক। আমার মনে হয় যে, এ সভায় এমন আর একজন লোকও নেই, যিনি একমাত্র কৃষিকাজেই জীবন অতিবাহিত করেছেন বা করছেন। সুতরাং এ বিষয়টিতেও আমি অদ্বিতীয়।

    ৪. পরিবেশ—- পল্লীবাসী চাষীদের প্রাকৃতিক পরিবেশ যে কি রকম, সে বিষয়ে কিছু না বললেও চলে এবং সামাজিক পরিবেশের বর্ণনাও নিষ্প্রয়োজন। ভাইটগাছ, গুঁড়িকচু, কচুরিপানা ও ঝোঁপ-জঙ্গলে আচ্ছাদিত কুঁড়েঘরেই অতিবাহিত হয়েছে আমার জীবন এবং জীবনের অধিকাংশ সময়ই আমার সহচর ছিলো গরু। আমার মনে হয় যে, আমার পরিবেশের ন্যায় নোংরা পরিবেশে বাস করা মানুষ এ সভায় অপর একজনও নেই। সুতরাং পরিবেশভিত্তিক হিসেবেও এ সভায় আমি অদ্বিতীয়।

    ৫. বয়স –আমার বর্তমান বয়স ৮২ বছর। স্বাভাবিক কারণেই দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে, হ্রাস পেয়েছে শ্রবণশক্তি, চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি এবং অভাব ঘটেছে কায়িক শক্তিরও। আমার মনে হয় যে, এরূপ শক্তিহীন মানুষ এ সভায় অপর কেউ নেই। সুতরাং শক্তিহীনতায়ও আমি অদ্বিতীয়ই বটে!

    ৬. ভাষা –আজকের এ সভায় হয়তো এমন আর একজন লোকও পাবেন না, যিনি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা জানেন না। কিন্তু আমি হচ্ছি একজন ‘ইংরেজিমূর্খ’ মানুষ। একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা না জানায় আমি পণুজীবন যাপন করছি। কেননা যে ব্যক্তি একখানা পায়ের অধিকারী, সে লাঠি বা কৃত্রিম পা ব্যবহার করে সমতল মাটিতে চলতে সক্ষম হলেও তার পক্ষে পর্বতে আরোহণ সম্ভব নয়। তদ্রূপ একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা না জানায় উচ্চতর জ্ঞান লাভে আমি বঞ্চিত। আমার মনে হয়, যে কোনো মানুষের পক্ষে উচ্চতর জ্ঞান লাভের মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। আর তাই আমার অনায়ত্ত। কাজেই এ সভায় আমি ইংরেজি ভাষায় অদ্বিতীয় মূর্খ।

    আমার লিখিত ‘সত্যের সন্ধান’ ও ‘সৃষ্টি রহস্য’ নামক বই দু’খানা যিনি পড়েছেন, তিনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, কিছু কিছু ইংরেজি আমি নিশ্চয়ই জানি। যেহেতু উক্ত পুস্তকদ্বয়ের কোনো কোনো স্থানে বাংলার সাথে ইংরেজি প্রতিশব্দ দেয়া আছে। কিন্তু তিনি যদি উক্ত বইয়ের পাণ্ডুলিপি দু’খানা দেখতে পান, তাহলে তিনি দেখতে পাবেন যে, তা সমস্তই শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেবের হাতে লেখা।

    অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব বরিশালের বিদগ্ধ সমাজে অপরিচিত নন। তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়, মনে পড়ে, ১৯৪৪ সালের কোনো এক শুভনে। শুভদিন’ বলছি এই জন্য যে, স্থানটি ছিলো একটি বিবাহ মজলিস। আর বিবাহ অনুষ্ঠান তো শুভদিন দেখেই হয়। কাজী সাহেব তখন ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দর্শন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। সেই দিনের প্রাথমিক পরিচয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজী সাহেবের কিশোর মনে হয়তো কৌতূহল জন্মেছিল একজন চাষীর অজানাকে জানার স্পৃহা দেখে এবং আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম একজন শিক্ষানবীশ তরুণের জ্ঞানের বিস্তৃতি ও গভীরতা দেখে। সেইদিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমার হিতাকাক্ষী এবং তিনি সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন আমার জীবনের মানোন্নয়নের জন্যে। এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি তার সহযোগিতায় যে সমস্ত মহামূল্য দানসামগ্রীপ্রাপ্ত হয়েছি, আজ যদি তিনি তা ফিরিয়ে নেন, তাহলে আমার বিশেষ কোনো সম্বলই থাকবে না –একমাত্র লাঙ্গল-জোয়াল ও কাস্তে-কোদাল ছাড়া। তিনি আমার ব্যক্তিত্বের সমঅংশীদার বা তার চেয়েও বেশি। আজকে আপনারা আমাকে যে সংবর্ধনা দান করছেন, তা মূলত আমার প্রাপ্য নয়, তা প্রাপ্য আমার শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেবের।

    পরিশেষে, আমি একজন অদ্বিতীয় নির্ঘণ মানুষ। তথাপি আমাকে ‘গুণী’ পর্যায়ভুক্ত করে নিতান্ত ভুল করেছেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী বরিশাল শাখার সুধী সদস্যবৃন্দ। আর সেই ভুলের জন্য আমি তাদের সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং মহান অতিথিবৃন্দকে মোবারকবাদ ও তরুণ-তরুণীদের আশীর্বাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ৫.১১.১৯৮২

    .

    আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরী বার্ষিক বিবরণী

    ১. উপস্থাপনা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, সদস্যবৃন্দ এবং সুধী অতিথিবৃন্দ! পরম সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, আজ আমার ৮৩তম জন্মদিবসে আমার উৎসর্গীকৃত লাইব্রেরীটির ২য় বার্ষিক অধিবেশন দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম আপনাদের মতো সুধীজনকে। বর্তমানে আমি আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর পরিচালক কমিটির সম্পাদক ও নির্বাহী কমিটির সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, লাইব্রেরীয়ান এবং পরিচারকও। এ সমস্ত কাজ করতে গিয়ে ত্রুটিহীনতার পরিচয় দিতে পারিনি, বিশেষত সম্পাদকীয় কাজে। আমি জানি যে, কোনো সম্পাদক তার কমিটির আদেশ-উপদেশ ও অনুমোদন ছাড়া বিশেষ কোনো কাজ করতে পারেন না। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তা করেছি। তাতে কমিটির সদস্যবৃন্দ মনে করতে পারেন যে, আমি কমিটিকে অবহেলা ও অবমাননা করেছি। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। আমার সম্পাদনা-কাজে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে আমি প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায়। উৎসর্গীকৃত হবার পর এ লাইব্রেরীটির উপর আমার কোনোরূপ ব্যক্তিগত অধিকার নেই। কিন্তু আমি মনে করি যে, এ লাইব্রেরীটির উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করবার ব্যক্তিগত অধিকার আমার এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সেই মনোভাবের— ভিত্তিতেই লাইব্রেরীর সামনে একটি পুকুর খনন করেছি, ঢাকার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাজেমী ও শিশু একাডেমীতে লাইব্রেরীটির সাহায্যের জন্য আবেদন করেছি এবং ছোটোখাটো আরও কিছু কাজ করেছি কমিটির অনুমতি বা সম্মতি না নিয়েই। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, শক্তি ও সময় (পরমায়ু) –এর কোনোটিই বর্তমানে আমার নেই। যৌবনে সংসার পরিচালনার কাজে পাঁচসালা, দশমালা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশসালা পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছি। কিন্তু আজ অর্ধসালা পরিকল্পনা গ্রহণ করতেও সাহস হচ্ছে না। আজ ইচ্ছে হয় যেন এক বছরের কাজ এক সপ্তাহে শেষ করে ফেলি। আর সেই অত্যুগ্র বাসনা এবং সময় ও শক্তিহীনতার জন্যই আমি সব সময় মিটিং ডেকে কমিটির মতামত নিতে পারছি না। তাই আমার অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য লাইব্রেরী কমিটির মহান সদস্যবৃন্দের কাছে, বিশেষত মাননীয় সভাপতি সাহেবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

    ২. লাইব্রেরীর আয়-ব্যয় ও আবশ্যক

    প্রথমত আয়

    বর্তমান ১৯৮২ সালের অদ্য ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় হয়েছে নিম্নরূপ –

    ক. সদস্য পাঠকদের আদায়ী চাঁদা। টাকা ১০৩.০০

    খ. ব্যাংকে মজুত টাকার সুদ              ২,৩৮৫.০০

    গ. দানপ্রাপ্তি

    ১. মা. মোশাররফ হোসেন মাতুব্বর

    ২. ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মাননীয়, সিরাজুল ইসলামের বদান্যতায় জেলা পরিষদ থেকে প্রাপ্ত দান                                            ৮,৮৯০.০০

    ৩. জনাব খালেকুজ্জামানের বদান্যতায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্ত দান    ৭৩৮.০০

    ৪. মৌ. মোসলেম উদ্দীন মাতুব্বরের দান      ২৫০.০০

    ঘ. ব্যাংকের মজুত আদায়।                     ৫,০০০.০০

    ঙ. ৮১ সালের আগত তহবিল                 ১,৩৬৪.৩০

    মোট টাকা ১৮,৮৪৫.৩০

    দ্বিতীয়ত ব্যয়

    বর্তমান সালের অদ্য ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে নিম্নরূপ –

    ১. অধিবেশন ব্যয় ১৯৮১                          টাকা ৩৬৪.০০

    ২. বৃত্তিদান ১৯৮১                                         ৪০০.০০

    ৩. ব্যাংকে মজুত                                           ৮,৮৯০.০০

    ৪. পুকুর খনন                                             ৮৮৬.00

    ৫. ‘স্মরণিকা’ ছাপা                                        ৪,৪৪৯.৯০

    ৬. নলকূপ স্থাপনের উদ্দেশ্যে মজুত মা, অধ্যক্ষ মো. হানিফ    ১,০০০.০০

    ৭. যাতায়াত ব্যয় (বরিশাল ও ঢাকা)                     ৫০৯.৩০

    ৮. বই খরিদ                                              ৯৯.০০

    ৯. অধিবেশন ব্যয় ১৯৮২                                 ৩৭০.০০

    ১০. ভিক্ষাদান ১৯৮২                                      ১০০.০০

    মোট টাকা ১৭,০৬৮.২০

    মজুত তহবিল

    মা. কোষাধ্যক্ষ                                       টাকা ১,৭৭৭.১০

    মা, জনতা ব্যাংক                                        ৩,৮৯০.০০

    মোট টাকা ৫,৬৬৭.১০

    কিন্তু আবশ্যক হচ্ছে—

    ক. নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ ২০,০০০.০০

    খ. লাইব্রেরীর সীমানা বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ                          ১০,০০০.০০

    গ. আসবাব ও পুস্তক খরিদ।                                                  ১০,০০০.০০

    মোট টাকা ৪০,০০০.০০

    ৩. পুস্তকাদির বিবরণ।

    বর্তমানে লাইব্রেরীর পুস্তক-পুস্তিকার সর্বমোট সংখ্যা ৮৭৭। তন্মধ্যে –

    ১. বিজ্ঞান        ৭৮

    ২. দর্শন          ১৮

    ৩. ধর্ম           ৩৫

    ৪. গণিত        ১৩

    ৫. ভূগোল       ১২

    ৬. ইতিহাস     ৩৭

    ৭. গল্প          ২৮

    ৮. উপন্যাস    ১১৫

    ৯. নাটক        ৬

    ১০. জীবনী     ২৪

    ১১. ভ্রমণ       ১১

    ১২. প্রবন্ধ      ১৭

    ১৩. অভিধান   ৫

    ১৪. ব্যাকরণ    ৭

    ১৫ সাহিত্য     ৩৯

    ১৬. আইন      ১২

    ১৭. চিকিৎসা     ৮

    ১৮. ইংরেজি     ১৮

    ১৯. রাজনীতি   ৫৪

    ২০. কৃষি       ৪৭

    ২১. বিবিধ     ২৯৩

    উল্লিখিত বইয়ের মোট মূল্য ৯,০৬৪.৯৫ টাকা।

    ৪. পাঠক ও পাঠোন্নতি

    বর্তমানে লাইব্রেরীর সদস্য পাঠকের সংখ্যা হচ্ছে ১৫ জন এবং তারা সর্বমোট পুস্তক অধ্যয়ন। করেছেন ২৯২টি। সুতরাং প্রত্যেকে গড়ে পুস্তক অধ্যয়ন করেছেন প্রায় ১৯২ টি।

    ৫. ভিক্ষাদান ও বৃত্তিদান।

    ক. ভিক্ষাদান

    ভবিষ্যতে আমার মৃত্যুদিনটিতে প্রতিবছর ২০ জন কাঙ্গল-কাগালীকে মোট ১০০.০০ টাকা ভিক্ষাদানের ওয়াদা আমার ট্রাস্টনামায় লিখিত আছে। এবং এ-ও লেখা আছে যে, আমার মৃত্যুর পূর্বে আমি ঐ টাকা আমার জন্মদিনে দান করবো। আজ আমার ৮৩তম জন্মদিন। তাই ভিক্ষাদান কাজটি আজকের এ অধিবেশনের অংশবিশেষ। কাজেই এ অধিবেশনে বসেই কাঙ্গল কাঙ্গালীদের হস্তে ভিক্ষা দান করা সমীচীন ছিলো। কিন্তু সময় সংকুলান হবে না মনে করে সে। দান কাজটি সমাধা করা হয়েছে আজ সকাল ১০টায়। এ অসৌজন্যমূলক কাজটি করার জন্য আপনাদের কাছে আমি লজ্জিত।

    খ, বৃত্তিদান

    বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার আগ্রহ বাড়াবার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর তহবিল থেকে স্থানীয় দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ১ম শ্রেণী ১০:০০, ২য় শ্রেণী ১৫.০০, ৩য় শ্রেণী ২০.০০, ৪র্থ শ্রেণী ২৫.০০ এবং ৫ম শ্রেণী ৩০.০০– একুন ১০০.০০ টাকা করে প্রতিবছর বৃত্তিদানের ব্যবস্থা ছিলো আমার পরিকল্পনায় এবং ১৯৭৯ সালে বৃত্তি দান করাও হয়েছিলো তা-ই। কিন্তু ৮০ সালে ৩টিতে এবং ৮১ সালে বৃত্তি দান করা হয়েছে। ৪টিতে। আশা করি যে, ৮২ সালে বৃত্তি দান করা হবে ৫টিতে। অতিরিক্তটি হবে লামচরি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং বৃত্তিদানের পরিমাণ হবে– ৬ষ্ঠ শ্রেণী ২০.০০, ৭ম শ্রেণী ২৫.০০, ৮ম শ্রেণী ৩০.০০, ৯ম শ্রেণী ৩৫,০০ এবং ১০ম শ্রেণী ৪০.০০ –একুন ১৫০.০০ টাকা। এ সমস্ত বৃত্তি অনন্তকাল চলবে।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ! শৈশবে একদা আমি ভিখারী ছিলাম এবং বার্ধক্যেও ভিখারী হয়েছি। তবে পার্থক্য এই যে, শৈশবে ভিখারী ছিলাম অভাবে, আর বার্ধক্যে ভিখারী হয়েছি স্বভাবে। মধ্যবয়সে যা কিছু উপার্জন করেছিলাম, তার সমস্তই দান করেছি ওয়ারিশদের মধ্যে এবং জনকল্যাণে। স্থাবর বা অস্থাবর কোনো সম্পদই আমার বর্তমানে নেই এবং কায়িক শ্রমের দ্বারা অর্থ উপার্জনের ক্ষমতাও নেই, আছে শুধু মানবকল্যাণের বাসনা। তাই এখন ভিক্ষা করে ভিক্ষা দিচ্ছি।

    এ বছর লাইব্রেরীর তহবিল থেকে পরিচালক ও পরিচারক ভাতা বাবদ আমি ৪৫০.০০ টাকা গ্রহণের ইচ্ছা করেছি। আর বিগত ২৪. ১১. ৮২ তারিখে বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আমার একটি সাক্ষাতকার রেকর্ড করেছেন (তাতে আমার পরিচয়জ্ঞাপক ভাষণ দান করেছেন বাংলাদেশ দর্শন সমিতির সভাপতি মাননীয় অধ্যক্ষ সাইঁদুর রহমান এবং উক্ত সমিতির সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী নূরুল ইসলাম) এবং টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ সে মর্মে আমাকে নগদ ৮২৯.০০ টাকা দান করেছেন। অধিকন্তু ১৬০.০০ টাকা মূল্যের ৬খানা দর্শনশাস্ত্রের বই দান করেছেন। বইগুলো আপনাদের এই লাইব্রেরীতে দান করেছি এবং নগদপ্রাপ্ত ৮২৯.০০ টাকার সাথে আমার পরিচালক ভাতা ৪৫০.০০ টাকা মিলিয়ে মোট ১,২৭৯.০০ টাকা মজুত তহবিলের একটি পরিকল্পনা করেছি, লামচরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃত্তিদানের উদ্দেশ্যে। এরই মধ্যে উক্ত বিদ্যালয়ের নামে ১,০০০.০০ টাকা বরিশালের জনতা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রেখেছি বিগত ১. ১২. ৮২ তারিখে। উক্ত টাকার বার্ষিক সুদ ১৫০.০০ টাকা দ্বারা আগামী ১৯৮৩ সাল থেকে আলোচ্য বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি দান করা যাবে এবং অবশিষ্ট মজুত অর্থের দ্বারা আলোচ্য বিদ্যালয়ে বর্তমান ৮২ সালের বৃত্তিদানের আশা পোষণ করছি।

    বিদ্যালয়সমূহে বৃত্তি দান করা হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে টেস্ট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনোটির ফলাফল প্রকাশিত না। হওয়ায় অদ্য বৃত্তিদান সম্ভব হচ্ছে না, হয়তো ভবিষ্যতেও এ দিনটিতে হবে না। তাই বিদ্যালয়ে বৃত্তিদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিলো প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষ রবিবারে। বর্তমানে সরকারি সাপ্তাহিক ছুটির দিনের পবির্তন হওয়ায় ঐ দিনটির পরিবর্তন হওয়া উচিত কি না এবং হলে তা কোন্ বার হওয়া সঙ্গত, তা কমিটির বিবেচনাধীন রইলো।

    ৬. ব্যাংকিং বিষয়

    লাইব্রেরী স্থাপনান্তে এর নানাবিধ কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে বরিশাল জনতা ব্যাংক চকবাজার শাখায় আমি আমানত হিসাবে একাউন্ট খুলেছি ৫টি। তন্মধ্যে স্থায়ী আমানত তিনটি এবং অস্থায়ী দুইটি।

    প্রথমত লাইব্রেরীর সাধারণ তহবিলের উৎস হিসাবে ১০,০০০.০০ টাকার স্থায়ী আমানত খুলেছি একটি। হিসাব ন. ৩৬৬১১২/১০৮, তারিখ ৩. ৪. ৭৯।

    দ্বিতীয়ত লাইব্রেরী ও আমার সমাধির মেরামতি কাজের জন্য ৫০০.০০ টাকার স্থায়ী আমানত একটি। হিসাব ন. ৩৬৬১৬৭/১৬০, তারিখ ১৪. ৭. ৭৯।

    তৃতীয়ত প্রাথমিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ট্রাস্টনামা সম্পাদনার পরের পরিকল্পনা মোতাবেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বৃত্তিদানের উদ্দেশ্যে ৩৩৫.০০ টাকার স্থায়ী আমানত একটি। হিসাব ন. ০৩২০২৪/২১৪, তারিখ ২৮. ৬. ৮২।

    চতুর্থত অস্থায়ী আমানত একটি। হিসাব ন. ৪১৫৮, তারিখ ২০. ৭. ৮২।

    পঞ্চমত লাইব্রেরীর সাধারণ তহবিলের টাকা মজুত রাখার জন্য অস্থায়ী আমানত একটি। হিসাব ন. ৩৭৭২, তারিখ ১৯.৯০।

    ব্যাংকের নিয়ম মাফিক স্থায়ী আমানতের আর্থিক বছর শেষ হয় যে তারিখে টাকা আমানত রাখা হয়, পরবর্তী বছর সেই তারিখে। তাতে লাইব্রেরীর বার্ষিক অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের সময় সুদের টাকা পাওয়া যায় না বলে ১ ও ৩ ন. দফের টাকা তুলে হিসাব নবায়ন করা হয়েছে ১. ১২. ৮২ তারিখে। তাতে হিসাব নম্বর ও টাকার পরিমাণ পরিবর্তিত হয়ে ১ম দফের টাকার পরিমাণ হয়েছে ১০,০০০.০০ টাকার স্থলে ১০,০৫০.০০ টাকা ও হিসাব ন. হচ্ছে ০৯২০৩৬/২২৬ এবং ৩য় দফের টাকার পরিমাণ হয়েছে ৩৩৫.০০ টাকার স্থলে ১,০০০.০০ টাকা, হিসাব ন. ০৯২০৩৭/২২৭।

    আলোচ্য হিসাবগুলো এযাবত আমার নামেই চলে আসছে। তবে আগামী ১৯৮৩ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে তা পরিবর্তনপূর্বক আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর নামে লিখিত করার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে অচিরেই আবেদন জানাতে আশা রাখি।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও সুধী অতিথিবৃন্দ! আপনারা যে মূল্যবান সময় নষ্ট ও কষ্ট স্বীকার করে লামচরির মতো জংলা ও দুর্গন্ধময় স্থানে পদার্পণ করেছেন, তার কারণ একমাত্র আমি এবং আমার খামখেয়ালি পরিকল্পনা। তবুও আশা করবো যে, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও পল্লীতে আমার পরিকল্পনা মোতাবেক জনকল্যাণের কাজ আরম্ভ হোক এবং সে সব অঞ্চলের সুধীবৃন্দ আপনাদের মতোই কষ্ট ভোগ করুন। সবশেষে আপনাদের সব রকম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বার্ষিক বিবরণী শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ১৯. ১২. ১৯৮২।

    .

    ‘মানবিক উন্নয়নে যুব সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে সভাপতির ভাষণ

    শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ ও আমার প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে যোগদানস করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আমি ধন্যবাদ জানাই এ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের এই জন্য যে, তারা আমাকে শুধু আমন্ত্রণই নয়, আজকের ৩য় অধিবেশনে আমাকে সভাপতির আসনে বসাবার মতো মানসিকতা অর্জন করেছেন। আমি একজন পল্লীবাসী অশিক্ষিত কৃষক। এ দেশের কৃষকরা শিক্ষিত সমাজের কোনো সভা-সমিতিতে আমন্ত্রিত হয় না, একমাত্র রাজনৈতিক দলের ভোটের সময় ছাড়া। কিন্তু তা-তো আমন্ত্রণ নয়, সে হচ্ছে বঁড়শি ফেলে মাছেদের টোপ গেলানো –নেতাদের স্বার্থসিদ্ধির কৌশলমাত্র। কিন্তু স্বার্থহীনভাবে কেউ যদি আমাদের আমন্ত্রণ জানায়, তবে তা হয় উদ্যোক্তাদের উদারতার পরিচয় এবং আমাদের আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। রাজনৈতিক নেতারা নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, মুটে-মজুরকে ডেকে নানারূপ দরদ দেখান, ওয়াদা করেন– ৬ দফা, ৯ দফা, অকপটভাবে; আবির্ভূত হন তারা মানবতার প্রতীক রূপে, উঁচিয়ে ধরেন আশার আলোকবর্তিকা। আর আমরা সর্বহারার দল যারা আছি, তারা ঝাঁপিয়ে পড়ি পতঙ্গের মতো সে আলোর আকর্ষণে। কিন্তু এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, সে আলোয় স্নিগ্ধ হইনি আমরা কখনো, দগ্ধ হওয়া ছাড়া।

    আজকাল ‘মানবতা’ বা ‘মানবতাবাদ’ কথাটার বড় ছড়াছড়ি। দেখেশুনে মনে হয় যে, কথাটা অতি আধুনিক কালের এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা। বস্তুত তা নয়। আজ পৃথিবীতে ছোটো বড়ো যতোগুলি ধর্মমত প্রচলিত তছে, তার প্রত্যেকটি ধর্মই ‘মানবতা’কে দিয়েছে প্রাধান্য। কাগালকে ভিক্ষা দাও, দীন-দুঃখীকে সাহায্য করো, দুস্থজনের সেবা করো ইত্যাদি বাক্যগুলো সব ধর্মেই বিদ্যমান। কিন্তু অনেক ধার্মিকের কাছে ধর্মাচরণ এখন দৈনিক, সাপ্তাহিক ও বার্ষিক অনুষ্ঠান–আরাধনায়ই সীমাবদ্ধ।

    আজ মনে পড়ে আমার গতবারে কোরবানির সময়ে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনের দৃশ্যটি। হয়তো আপনারাও দেখেছেন কেউ কেউ। স্টেশনের যত্রতত্র দেখা যায় সর্বহারা ও গৃহহারার দল। তারা গগনচুম্বী অট্টালিকার কাছেই বাস করছে খোলা গগনের নিচে। তাদের উদরে অন্ন, পরনে বস্ত্র, রোগের ঔষধ নেই; উপবাসী মা’দের বুকে দুধ নেই, কোলের শিশুগুলি কাঁদছে পথিকের দিকে তাকিয়ে।

    সেবারে স্টেশনের একাংশে বসেছিলো কোরবানির পশু বিক্রির বিরাট বাজার এবং সেখানে চলছিলো কে কতো বেশি মূল্যের গরু কিনে কোরবানি করবেন তার পাল্লা। একজন (তিনি ধার্মিক কি না, জানি না) ১৪ হাজার টাকা মূল্যে একটি গরু কিনে জন চারেক চাকরের হাতে গরুর রশি দিয়ে রাস্তার মধ্যখান দিয়ে সগর্বে বুক ফুলিয়ে যাচ্ছেন। আর রাস্তার পাশেই এক সর্বহারা পেটের দায়ে লাউয়ের ছোলা সিদ্ধ করে খাচ্ছে। এ দৃশ্য শুধু কমলাপুরেই নয়, দেশের সর্বত্রই ঐরূপ উন্নতমানের ধার্মিকের সাক্ষাত পাওয়া যায়। আমাদের অঞ্চলেও এমন অনেক ধার্মিক ব্যক্তি আছেন, যারা ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে পবিত্র হজব্রত পালন করছেন,

    অথচ কুলির পয়সা নিয়ে ঝগড়া বাধাচ্ছেন। আমার কথাগুলো শুনে কেউ যেন মনে না করেন যে, আমি ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানগুলো পালনের বিরোধিতা করছি। আমি দাবি করছি মানবতার অগ্রাধিকার মাত্র।

    যদিও একথা স্বীকৃত হয়ে থাকে যে, পশু, পাখি, কীট, পতঙ্গ এমনকি জল, বায়ু, অগ্নি ইত্যাদিরও এক একটি ধর্ম আছে, তত্ৰাচ বিশ্বমানবের ধর্ম বনাম ‘মানবধর্ম’ বলে একটা আন্তর্জাতিক ধর্মকে স্বীকার করা হয় না। আচার, অনুষ্ঠান, প্রার্থনা পদ্ধতি ইত্যাদি এমন কোনো বিষয় নেই, যাতে সকল ধর্ম এক মত পোষণ করে। কিন্তু মানবতা? মানবতাবর্জিত কোনো ধর্ম পৃথিবীতে নেই। আর্তের সেবা, দুস্থের প্রতি দয়া, অহিংসা, পরোপকার ইত্যাদি সব ধর্মে শুধু স্বীকৃতই নয়, একান্ত পালনীয় বিধান। সুতরাং সব ধর্মের স্বীকৃত যে মতবাদ, অর্থাৎ মানবতাবাদই। হওয়া উচিত মানুষের আন্তর্জাতিক ধর্ম বনাম মানবধর্ম।

    কারা চায় দেশে মানবতার প্রতিষ্ঠা হোক? কারা মানবতার প্রত্যাশী? তাই বলছি।

    জগতে রোদন ও বিনয় এসেছে দুর্বলের জন্য, সবলের জন্য নয়। প্রত্যাশিত বস্তু পাবার জন্য দুর্বল রোদন করে, কিন্তু সবল তা কেড়ে নেয় এবং দুর্বল বিনয় করে, আর সবল করে দাবি। এই শক্তিহীনের দলে যারা আছে (শতকরা প্রায় ৮০ জন), তারাই ভরসা রাখে মানবতার উপর এবং কামনা করে দেশে ‘মানবতাবাদ’-এর প্রতিষ্ঠা হোক। বলা বাহুল্য যে, আমি সেই শক্তিহীনের দলেরই একজন। তাই দেশে ‘মানবতাবাদ’ প্রতিষ্ঠা লাভ করুক, এই আমার কাম্য।

    আমি একজন মানবদরদী এমন কথা বলছি না। তবে মানবতাকে শ্রদ্ধা করি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের চেয়ে বেশি এবং পালনও করে থাকি আমার সামান্য শক্তি দিয়ে যতোটুকু পারি। এখন আমি এ সম্বন্ধে দু-একটি কথা বলতে চাই। কিন্তু তা বলবার পূর্বে আপনাদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি– কথাগুলোকে আত্মশ্লাঘামূলক বলে বিবেচনা না করার জন্যে।

    জন্ম আমার ১৩০৭ সালে, বরিশালের অদূরবর্তী লামচরি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। ১৩১১ সালে বাবা মারা যান এবং ১৩১৭ সালে আমার বিত্ত এবং ১৩১৮ সালে বসতঘরখানা নিলাম করে নেন সদাশয় মহাজনেরা। তখন বেঁচে থাকার আর কোনো উপায়ই ছিলো না দশ দুয়ারের সাহায্য ছাড়া। আমাদের গ্রামে সে সময় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো না বলে বিদ্যাশিক্ষার কোনো সুযোগ আমার ঘটেনি বর্ণবোধ ব্যতীত। পেটের দায়ে কৃষিকাজ শুরু করতে হয় অল্প বয়সে এবং কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে সামান্য পড়ালেখার চর্চা করি আমি ঘরে বসেই।

    আমার উর্ধ্বতন পাঁচ পুরুষের বয়সের গড় হিসাব করে জানতে পেরেছিলাম যে, তাদের গড় পরমায়ু ছিলো ৬০ বছর করে। তাই বংশের রেওয়াজ মোতাবেক আমিও আমার পরমায়ু ৬০ বছর কল্পনা করে ১৩৬৭ সালে, যখন আমার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয় তখন, স্থাবরাস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তি, এমনকি বসতঘরখানা পর্যন্ত পুত্র-কন্যাদের ফরায়েজ বিধান মতে দান ও বণ্টন করে দিয়ে সম্পূর্ণ রিক্ত হয়ে তাদের পোষ্য হয়ে জীবন যাপন করছি। সম্পত্তি দান ও বণ্টনকালে আমি আমার ওয়ারিশগণের মধ্যে ঘোষণা করেছি যে, নিজ দেহটি ভিন্ন এখন আমার আর কোনো সম্পদ নেই। সুতরাং ভবিষ্যতে এ দেহটি খাঁটিয়ে যদি কোনো অর্থ উপার্জন করতে পারি, তবে তার উপর তোমাদের কারো কোনো দাবিদাওয়া থাকবে না, তা সমস্তই আমি যে কোনোরাপ জনকল্যাণে দান করবো।

    উক্ত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৩৬৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যে অর্থ বা সম্পত্তি উপার্জন করতে পেরেছি, তা সমস্তই জনকল্যাণে দান করেছি। এখন আমি আমার জনসেবার বিষয় ও পদ্ধতি সম্বন্ধে সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ আলোচনা করছি।

    ১. লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা

    জনসাধারণের জ্ঞানোন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি ক্ষুদ্র পাকা লাইব্রেরী স্থাপনপূর্বক তা জনগণের পক্ষে ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটির বরাবরে রেজিস্ট্রীকৃত ট্রাস্টনামা দ্বারা দান করেছি। কমিটির স্থায়ী সভাপতি হচ্ছেন (পদাধিকার বলে) মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাহেব এবং লাইব্রেরীটির শুভ উদ্বোধন পর্বে পৌরোহিত্য করেছেন তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাননীয় আবদুল আউয়াল সাহেব।

    ২. মজুত তহবিল

    উপরোক্ত দানপত্রের অধীনে জনতা ব্যাংক, বরিশাল চকবাজার শাখায় ১২ হাজার টাকা স্থায়ী আমানত রেখেছি। যার বার্ষিক লভ্যাংশের পরিমাণ বর্তমানে ১৮ শ’ টাকা। উক্ত লভ্যাংশের টাকা থেকে ৫০ টাকা রিজার্ভ রেখে ১,৭৫০ টাকা নিম্নলিখিত নিয়ম মাফিক জনকল্যাণের কাজে ব্যয় করা হচ্ছে ও হবে।

    নিয়মাবলী

    ক. বৃত্তিদান

    নিকটতম ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটিতে বার্ষিক এক শত টাকা করে মোট ৪ শত টাকা এবং একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৫০ টাকা, একুন বৃত্তিদান ৫৫০ টাকা। এতদ্ভিন্ন রিজার্ভ তহবিলের টাকার লভ্যাংশের দ্বারা প্রতি ৭-৮ বছরে একটি করে বৃত্তিদানযোগ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো যাবে। উল্লেখ্য যে, বিদ্যালয়সমূহের বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে আলোচ্য বৃত্তি দেয়া হচ্ছে ও হবে এবং এ বৃত্তিদান অনন্তকাল চলবে।

    খ. ভিক্ষাদান

    স্থানীয় নিকটতম ২০ জন কাঙ্গল-কাঙ্গালীকে বার্ষিক ভিক্ষাদান মোট ১ শত টাকা। বর্তমানে এ ভিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে ৩রা পৌষ আমার জন্মদিনে এবং আমার মৃত্যুর পরে দেয়া হবে মৃত্যুদিনে।

    গ, পুরস্কার প্রদান।

    আমার প্রদত্ত রে. ট্রাস্টনামা দলিলের ৬ ন, দফাটিতে পুরস্কার প্রদান সম্পর্কে যে ঘোষণা লিপিবদ্ধ আছে, তা এখানে উদ্ধৃত করছি।

    “মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে ‘বিশ্বমানবতাবাদ’ বনাম ‘মানবধর্ম’-এর উৎকর্ষজনক একটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধ রচনার জন্য রচয়িতাকে ১০০.০০ টাকা (বার্ষিক প্রতিযোগিতামূলক) পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণের মধ্যে এই পুরস্কার প্রদানানুষ্ঠান সম্পাদনের জন্য উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাইতে হইবে। আমি আশা করি যে, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ আমার এই কাজে সহযোগিতা দান করিবেন। কর্তৃপক্ষের নির্দেশিত তারিখে বা তৎপূর্বে বিভাগ প্রধানের কাছে উক্ত টাকা পাঠাইতে হইবে। এই পুরস্কার আবহমানকাল চলিতে থাকিবে।”

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দের অনেকেই বাংলাদেশ দর্শন সমিতির সদস্য। এবারে তাদের কাছে উক্ত পুরস্কার প্রদান সম্বন্ধে আবেদন জানালে তারা স্থির করেছেন যে, পুরস্কার দেয়ার কাজটি বাংলাদেশ দর্শন সমিতির কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে সমিতির কর্তৃপক্ষ স্থির করেছেন যে, পুরস্কারটি প্রতি বছরের পরিবর্তে প্রতি দ্বিতীয় বছরে প্রদত্ত হবে এবং তাতে পুরস্কারের পরিমাণ হবে দু’শ’ টাকা করে। বর্তমান বছর থেকে উক্ত পুরস্কার প্রদানের কাজটি শুরু করা হবে।

    প্রকাশিতব্য এই যে, বৃত্তিপ্রদানের ন্যায় ভিক্ষা এবং পুরস্কার প্রদানও অনন্তকাল ধরে চলবে।

    ৩. বিবিধ

    পূর্বোক্ত কাজগুলি সমাধা করে অবশিষ্ট টাকা লাইব্রেরী পরিচালনা ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয়িত হবে।

    শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ ও আমার প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ। বর্তমানে আমি কপর্দকশূন্য, সর্বহারা। মানবকল্যাণে দান করার মতো, আমার আর কোনো সম্পদই নেই, একমাত্র নিজ দেহটি ভিন্ন। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার মরদেহটি মানবকল্যাণে দান করবার জন্য। এবং সে মর্মে একখানা দানপত্র রেজিস্ট্রী করে দিয়েছি বিগত ৫, ১২, ৮১ তারিখে, বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজের অনুকুলে। আর চক্ষু দান করেছি চক্ষু ব্যাংকে।

    আমি এমন কথা বলছিনা যে, আপনারা যারা মানবতাবাদ-এর পথযাত্রী আছেন, তারা আমার পথেই গমন করবেন। তবে এইটুকু বলতে চাই যে, আমার নির্বাচিত পথেই হোক, অথবা অন্য কোনো সহজ ও উত্তম পথেই হোক –মানবতার প্রচার ও প্রসার দেখতে পেলে আমি সুখী হবো, হয়তো শান্তি পাবে আমার বিদেহী আত্মা।

    মহান সুধীবৃন্দ! আমি আপনাদেরকে আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। আপনাদের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে, জীবনের অন্তিম কালে আপনাদের কাছে বিদায় নিচ্ছি, হয়তো চিরবিদায়।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ১১. ৬. ১৯৮৩।

    .

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় পাঠ করার জন্য লিখিত ভাষণ কিন্তু সভাটি কোনো কারণবশত অনুষ্ঠিত হয়নি

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ ও আমার প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আপনাদের এ মহতী সম্মেলনে আম ও ভাষণদানের সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ সভায় বলবার মতো কোনো বিষয় আমার আয়ত্তে নেই। রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি ইত্যাদি এমন কোনো নীতি নেই এবং ভূতত্ত্ব, আকাশতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, শরীরতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি এমন কোনো তত্ত্ব নেই, যা আপনাদের অজানা। কিন্তু আমার মনে হয় যে, একটিমাত্র বিষয় আছে, যা আপনাদের অনেকেরই অজানা। সে বিষয়টি হচ্ছে আমার পরিচয়। তাই আমি আমার পরিচয়জ্ঞাপক সামান্য কিছু আলোচনা করেই আমার বক্তব্য শেষ করবো।

    বরিশাল শহরের অদূরে লামচরি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আমার ৩রা পৌষ, ১৩০৭ সালে। চার বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান, ১৩১১ সালে। আমার বাবার বিঘা পাঁচেক কৃষিজমি ও ক্ষুদ্র একখানা টিনের বসতঘর ছিলো। খাজনা অনাদায়হেতু ১৩১৭ সালে আমার কৃষিজমিটুকু নিলাম হয়ে যায় এবং কর্জ-দেনার দায়ে মহাজনরা ঘরখানা নিলাম করিয়ে নেন ১৩১৮ সালে। তখন স্বামীহারা, বিত্তহারা ও গৃহহারা হয়ে মা আমাকে নিয়ে ভাসতে থাকেন অকূল দুঃখের সাগরে। সে সময়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে আমাকে দশ দুয়ারের সাহায্যে।

    তখন আমাদের গ্রামে কোনোরূপ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো না। শরীয়তি শিক্ষা দানের জন্য জনৈক মুন্সি একখানা মক্তব খোলেন তার বাড়িতে ১৩২০ সালে। এতিম ছেলে বলে আমি তার মক্তবে ভর্তি হলাম অবৈতনিকভাবে। সেখানে প্রথম বছর শিক্ষা করলাম স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ তালপাতায় এবং বানান-ফলা কলাপাতায়, কেননা আমার বই-স্লেট কেনার সঙ্গতি ছিলো না। অতঃপর এক আত্মীয়ের প্রদত্ত রামসুন্দর বসুর ‘বাল্যশিক্ষা’ নামক বইখানা পড়ার সময় ছাত্রবেতন অনাদায়হেতু মুন্সি সাহেব মক্তবটি বন্ধ করে দিলেন ১৩২১ সালে। আর এখানেই হলো আমার আনুষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষার সমাপ্তি বা সমাধি।

    পড়া-লেখা শেখার প্রবল আগ্রহ আমার ছিলো। কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না। পেটের দায়ে কৃষিকাজ শুরু করতে হয় অল্প বয়সেই। আমার বাড়ির পাশে একজন ভালো পুঁথিপাঠক ছিলেন। কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি তার সাথে পুঁথি পড়তে শুরু করি, বাংলা ভাষা পড়বার কিছুটা ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং উদ্দেশ্য আংশিক সফল হয় জয়গুন, সোনাভান, জঙ্গনামা, মোক্তল হোসেন ইত্যাদি পুঁথি পাঠের মাধ্যমে। এ সময়ে আমার পাড়ার দুটি ছেলে বরিশালের টাউন স্কুল ও জিলা স্কুলে পড়তো। তাদের পুরোনো পাঠ্যবইগুলো এনে পড়তে শুরু করি ১৩৩৫ সাল থেকে এবং তা পড়ি ১৩৪৩ সাল পর্যন্ত। কেন তা জানি না, সাহিত্য, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস ইত্যাদির চেয়ে বিজ্ঞানের বই ও প্রবন্ধগুলো আমার মনকে আকর্ষণ করতো বেশি। তখন থেকেই আমি বিজ্ঞানের ভক্ত।

    আমার মা ছিলেন অতিশয় নামাজী-কালামী একজন ধার্মিকা রমণী। এবং তার ছোঁয়াচ লেগেছিলো আমার গায়েও কিছুটা। কিন্তু আমার জীবনের গতিপথ বেঁকে যায় আমার মায়ের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি দুঃখজনক ঘটনায়।

    ১৩৩৯ সালে মা মারা গেলে আমি মৃত মায়ের ফটো তুলেছিলাম। আমার মাকে দাফন করার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত মুন্সি, মৌলবি ও মুসল্লিরা এসেছিলেন, ‘ফটো তোলা হারাম’ বলে মায়ের নামাজে জানাজা ও দাফন করা ত্যাগ করে তারা লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা কতিপয় অমুসল্লি নিয়ে জানাজা ছাড়াই আমার মাকে সৃষ্টিকর্তার হাতে সমর্পণ করতে হয় কবরে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ছবি তোলা দূষণীয় হলেও সে দোষে দোষী স্বয়ং আমিই, আমার মা নন। তথাপি কেন যে আমার মায়ের অবমাননা করা হলো, তা ভেবে না পেয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে মা’র শিয়রে দাঁড়িয়ে তার বিদেহী আত্মাকে উদ্দেশ করে এই বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, “মা! আজীবন ছিলে তুমি ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। আর আজ সেই ধর্মের নামেই হলে তুমি শেয়াল-কুকুরের ভক্ষ্য। সমাজে বিরাজ করছে এখন ধর্মের নামে অসংখ্য কুসংস্কার। তুমি আমায় আশীর্বাদ করো, আমার জীবনের ব্রত হয় যেন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ অভিযান। আর সে অভিযান সার্থক করে আমি যেন তোমার কাছে আসতে পারি। তুমি আশীর্বাদ করো মোরে মা, আমি যেন বাজাতে পারি সে অভিযানের দামামা।”

    আমি জানি যে, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূরীকরণ অভিযানে সৈনিকরূপে লড়াই করবার যোগ্যতা আমার নেই। কেননা আমি পঙ্গু। তাই সে অভিযানে অংশ নিতে হবে আমাকে বাজনদার রূপে। প্রতিজ্ঞা করেছি যে, সে অভিযানে দামামা বাজাবো। কিন্তু তা পাবো কোথায়? দামামা তৈরির উপকরণ তো আমার আয়ত্তে নেই। তাই প্রথমেই আত্মনিয়োগ করতে হলো। উপকরণ সংগ্রহের কাজে।

    বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও বিবিধ বিষয়ে কিছু কিছু জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে সেখানকার পুস্তকাদি অধ্যয়ন করতে শুরু করি ১৩৪৪ সাল থেকে। স্বয়ং মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত বলে যদিও ইসলাম ধর্মের মূলতত্ত্ব সম্বন্ধে কিছু কিছু তত্ত্ব জানার সুযোগ ছিলো, কিন্তু হিন্দু, বৌদ্ধ, পার্সি, ইহুদি, খ্রীস্টান ইত্যাদি ধর্ম সম্বন্ধে বিশেষ কিছুই আমার জানার সুযোগ ছিলো না। তাই সেসব ধর্ম সম্বন্ধে কিছু কিছু জানার আগ্রহ নিয়ে পড়তে থাকি বরিশালের। শংকর লাইব্রেরী ও ব্যাপ্টিস্ট মিশন লাইব্রেরীর কিছু কিছু বই। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব জানতেন আমার সাধনার উদ্দেশ্য কি। তাই উদ্দেশ্যসিদ্ধির সহায়ক হবে বলে তিনি আমাকে দর্শনশাস্ত্র চর্চা করতে উপদেশ দেন এবং তার উপদেশ ও সহযোগিতায় দর্শনসমুদ্রের বেলাভূমিতে বিচরণ করতে থাকি ১৩৫৪ সাল থেকে। তখন দিন যেতো মাঠে আমার রাত যেতো পাঠে।

    মায়ের মৃত্যুর পর থেকে দীর্ঘ ১৮ বছর সাধনার পর কতিপয় ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসকে দর্শনের উত্তাপে গলিয়ে বিজ্ঞানের ছাঁচে ঢেলে তার একটি তালিকা তৈরি করছিলাম প্রশ্নের আকারে ১৩৫৭ সালে। এ সময় স্থানীয় গোঁড়া বন্ধুরা আমাকে ধর্মবিরোধী ও নাখোদা (নাস্তিক) বলে প্রচার করতে থাকে এবং আমার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম ছেড়ে শহর পর্যন্ত। লোক পরম্পরায় আমার নাম শুনতে পেয়ে তৎকালীন বরিশালের লইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তাবলিগ জামাতের আমির জনাব এফ. করিম সাহেব সদলে আমার সাথে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হন ১৩৫৮ সালের ১২ই জ্যৈষ্ঠ তারিখে আমার বাড়িতে গিয়ে। সে দিনটি ছিলো রবিবার, সাহেবের ছুটির দিন। তাই তিনি নিশ্চিন্তে আমার সাথে তর্কযুদ্ধ চালান বেলা ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বরিশালে গিয়ে তিনি আমাকে এক ফৌজদারি মামলায় সোপর্দ করেন ‘কম্যুনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে। সে মামলায় আমার জবানবন্দি তলব করা হলে উপরোল্লিখিত তালিকার প্রশ্নগুলোর কিছু কিছু ব্যাখ্যা লিখে ‘সত্যের সন্ধান’ নাম দিয়ে তা জবানবন্দিরূপে কোর্টে দাখিল করি তৎকালীন বরিশালের পুলিশ সুপার জনাব মহিউদ্দীন সাহেবের মাধ্যমে, ২৭শে আষাঢ়, ১৩৫৮ সালে (ইং ১২. ৭. ৫১)।

    ‘সত্যের সন্ধান’-এর পাণ্ডুলিপিখানার বদৌলতে সে মামলায় দৈহিক নিষ্কৃতি পেলাম বটে, কিন্তু মানসিক শাস্তি ভোগ করতে হলো বহু বছর। কেননা তৎকালীন পাকিস্তান তথা মুসলিম লীগ সরকারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিলেন যে, সত্যের সন্ধান’ বইখানা আমি প্রকাশ করতে পারবো না, ধর্মীয় সনাতন মতবাদের সমালোচনামূলক অন্য কোনো বই লিখতে পারবো না এবং পারবো না কোনো সভা-সমিতিতে বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বমত প্রচার করতে। যদি এর একটি কাজও করি, তবে যে কোনো অজুহাতে আমাকে পুনঃ ফৌজদারিতে সোপর্দ করা হবে। অগত্যা কলম-কালাম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হলো ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এভাবে নষ্ট হয়ে গেলো আমার কর্মজীবনের অমূল্য ২০টি বছর।

    বাংলাদেশে কুখ্যাত পাকিস্তান সরকারের সমাধি হলে পর ‘সত্যের সন্ধান’ বইখানা প্রকাশ করা হয় ১৩৮০ সালে, রচনার ২২ বছর পর। তারপরে আমার লিখিত বই ‘সৃষ্টি রহস্য প্রকাশিত হয় ১৩৮৪ ল, ‘স্মরণিকা ১৩৮৯ সালে এবং ‘অনুমান’ নামের ক্ষুদ্র একখানা পুস্তিকা ১৩৯০ সালে। এ প্রসঙ্গে সভাসীন সুধীবৃন্দকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমার লিখিত যাবতীয় পুস্তক পুস্তিকাই হচ্ছে আমার মায়ের মৃত্যুদিনে আকাঙ্ক্ষিত ‘দামামা’র অঙ্গবিশেষ।

    কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, আমি ধর্মের বিরোধিতা করছি। বস্তুত তা নয়। পশু, পাখি, কীট-পততগ ইত্যাদি সমস্ত জীবের এমনকি জল, বায়ু, অগ্নি ইত্যাদি পদার্থেরও এক একটি ধর্ম আছে। ধর্ম একটি থাকবেই। তবে তার সঙ্গে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থাকা আমার কাম্য নয়।

    মানব সমাজে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিলো মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্যই। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত ধর্মগুলো মানুষের কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই করছে বেশি, অবশ্য জাগতিক ব্যাপারে। ধর্মবেত্তারা সকলেই ছিলেন মানবকল্যাণে আত্মনিবেদিত মহাপুরুষ। কিন্তু তাঁরা তাঁদের দেশ ও কালের বন্ধনমুক্ত ছিলেন না। তাদের প্রবর্তিত সেকালের অনেক কল্যাণকর ব্যবস্থাই একালের মানুষের অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই ধর্মীয় সমাজবিধানে ফাটল ধরেছে বহুদিন আগে থেকেই। সুদ আদান-প্রদান, খেলাধুলা, নাচ-গান-বাজনা, সুরা পান, ছবি আঁকা, নারী স্বাধীনতা, বিধর্মীর ভাষা শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ধর্মবিরোধী কাজগুলো এখন শুধু রাষ্ট্রীয় সমর্থনপুষ্টই নয়, লাভ করেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। বিশেষত গান, বাজনা, নারী, নাচ ও ছবি –এ পাঁচটির একত্র সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায় সিনেমা, রেডিও এবং টেলিভিশনে। কিন্তু সেসবের বিরুদ্ধে সনাতনপন্থীরা কখনো প্রতিবাদের ঝড় তোলেননি। অথচ প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন ফজলুর রহমান, বযলুর রহমান, আ. র. ম. এনামুল হক, আবুল ফজল প্রমুখ মনীষীগণের দু’কলম লেখায়। কতকটা আমারও।

    বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের ফলে ধর্ম হোঁচট খাচ্ছে পদে পদে। কোনো ধর্মের এমন শক্তি নেই যে, আজ ডারউইনের বিবর্তনবাদ বাতিল করে দেয়, নাকচ করে মর্গানের সমাজতত্ত্ব এবং ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত করে কোপার্নিকাস-গ্যালিলিওর আকাশ তত্ত্ব, নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব এবং আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে।

    মধ্যযুগে যুগমানবের আসনে সমাসীন ছিলেন তৎকালীন মুনি-ঋষি ও নবী-আম্বিয়ারা। তার ছিলেন গুণী, জ্ঞানী ও মহৎ চরিত্রের মানুষ, তবে ভাববাদী। তাদের আদেশ-উপদেশ পালন ও চরিত্র অনুকরণ করেছেন সেকালের জনগণ এবং তখন তা উচিতও ছিলো। কিন্তু সেই সব মনীষীরা এযুগের মানুষের ইহজীবনের জন্য বিশেষ কিছুই রেখে যাননি, একমাত্র পারলৌকিক সুখ-দুঃখের কল্পনা ছাড়া।

    এ যুগের যুগমানবের আসনে সমাসীন আছেন– কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা। এঁরা সবাই এযুগের গুণী, জ্ঞানী ও মহৎ চরিত্রের মানুষ। তবে এঁরা হচ্ছেন মুক্তমন, স্বাধীন চিন্তার অধিকারী ও বাস্তববাদী। এঁদের অবদান ছাড়া এ যুগের কোনো মানুষের ইহজীবনের এক মুহূর্তও চলে না। তাই এঁদের সম্মিলিত মতাদর্শ আমাদের মস্তকে গ্রহণ করা উচিত ভাববাদের আবর্জনার বোঝা ফেলে দিয়ে। বর্তমান যুগে বিজ্ঞানবিরোধী কোনো শিক্ষাই গ্রহণীয় নয়।

    এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, এঁদের সম্মিলিত মতাদর্শ কি? এক কথায় তার উত্তর হচ্ছে– মানবতা। হয়তো ঐ মানবতাই হবে আগামী দিনের মানুষের আন্তর্জাতিক ধর্ম তথা মানবধর্ম।

    আমি মানবতাকে শ্রদ্ধা করি, যথাসাধ্য পালনের চেষ্টা করি এবং মানবতার উৎকর্ষ সাধনে। প্রয়াসী। আমি ঐ বিষয়ে একটি রচনা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। প্রতি জোড় বছরের জানুয়ারি মাসে ‘মানবতাবাদ’-এর উৎকর্ষজনক অনুন ৬০০ শব্দ সম্বলিত একটি প্রবন্ধ আহ্বান করা হবে এবং সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত প্রবন্ধটির রচিয়তাকে ২০০.০০ টাকা পুরস্কার প্রদান করা হবে। বিশেষত সে পুরস্কারপ্রদান অনন্তকাল চলতে থাকবে। নির্বাচিত প্রবন্ধটি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করা হবে, হয়তো তা ভবিষ্যতে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হবে।

    মৃত্যুর পরে আমার চক্ষুদ্বয় চক্ষুব্যাংকে এবং মরদেহটি বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজে দান করেছি। উদ্দেশ্য –মানবকল্যাণ।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ ও প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! এতক্ষণ আমি নানাবিধ অবাঞ্ছিত বিষয়ের আলোচনা করে আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করেছি। এজন্য আমি আপনাদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে আমার পরিচয় জ্ঞাপন শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ৭. ৫. ১৩৯০।

    .

    আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর বার্ষিক অধিবেশনে প্রদত্ত বক্তৃতা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, সদস্যবৃন্দ এবং সুধী অতিথিবৃন্দ! আজ আমার ৮৩তম জন্মদিবস এবং আমার উৎসর্গীকৃত লাইব্রেরীটির ৩য় বার্ষিক অনুষ্ঠান। লাইব্রেরীর পরিচালক কমিটির স্থায়ী সভাপতি বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাননীয় এম. এ. বারী সাহেবের অনুপস্থিতিতে আমি আজ পূৰ্ণানন্দ পাচ্ছি না, হয়তো আপনারাও পাচ্ছেন না। আজকের এ নিরানন্দের জন্য দায়ী একমাত্র আমিই। কেননা প্রায় দেড় মাস কাল নানাবিধ রোগাক্রান্ত হয়ে আমি শয্যাশায়ী থাকায় যথাসময়ে তাকে নোটিশ প্রদান করতে না পারাই, আমার বোধ হয়, তার এ অনুষ্ঠানে যোগদান করতে না পারার কারণ। সে যা হোক, কমিটির বিধিমতে কোনো কমিটির সভাপতির অনুপস্থিতিতে তার সহ-সভাপতিই তার আসন পাবার অধিকারী বটে। তাই আজকের অধিবেশনে আমাদের কমিটির সহ-সভাপতি শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেব এ অধিবেশনের সভাপতির আসনের অধিকারী এবং তিনি সুযোগ্য ও আমাদের মনোপূতও বটেন। এখন আমরা তার সভাপতিত্বে সভার কাজ শুরু করছি।

    বার্ষিক বিবরণী।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব এবং উপস্থিত সদস্যবৃন্দ। সরকারি বিধি মোতাবেক যে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বছর শেষ হয় ৩০শে জুন, অন্যথায় ৩১শে ডিসেম্বর তারিখে। কিন্তু আমাদের এ প্রতিষ্ঠানটিতে তার কোনো তারিখই রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা এ প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক অধিবেশন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩রা পৌষ, আমার জন্মদিনটিতে। ইংরেজি হিসাব মতে তা হয় প্রতি তিন বছরে দু’বছর ১৯শে ডিসেম্বর এবং এক বছর ১৮ই। সুতরাং এ তারিখটি হচ্ছে জুন মাস থেকে প্রায় ছয় মাস পরে এবং ৩১শে ডিসেম্বরের ১২-১৩ দিন পূর্বে। কাজেই নির্ধারিত তারিখে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হলে অনুষ্ঠানের দিন বা তার আগের দিন আর্থিক বছর শেষ না করে গত্যন্তর নেই। তাই এ প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে এর বার্ষিক অধিবেশনের পূর্বের দিন আর্থিক বছরের সমাপ্তি ঘোষণার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। এবং আপনাদের অনুমোদন না নিয়ে অদ্য তাই করা হচ্ছে বলে এ বার্ষিক বিবরণটি অনুমোদনের জন্য আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি।

    এখন আমি ১৯৮২ সালের ২০শে ডিসেম্বর থেকে বর্তমান ১৯৮৩ সালের ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত লাইব্রেরীর বার্ষিক আয়-ব্যয় ও অন্যান্য সম্বন্ধে আলোচনা করছি।

    আয়-ব্যয়

    প্রথমত আয়

    ১. আগত তহবিল         টাকা ১,৭৭৭.১০

    ২. মজুত আদায়।               ৫,৭০০.০০

    ৩. দানপ্রাপ্তি (নগদ)          ২৫.০০

    ৪. ধার গ্রহণ                   ১৯৩.০০

    ৫. চাদা আদায়                ১৬.০০

    মোট টাকা ৭,৭১১.১০

    দ্বিতীয়ত ব্যয়

    ১. অনুষ্ঠান ও অতিথিসেবা      টাকা ৬২৯.৭৫

    ২. সেরেস্তা খরচ             ২৬.০০

    ৩. ভিক্ষাদান (১৯৮২)      ১০৭.০০

    ৪. বৃত্তিদান (১৯৮২)       ৫৫০.০০

    ৫. যাতায়াত (বরিশাল ও ঢাকায়)  ৪২৯.৪৫

    ৬. পুকুর খনন             ১,১৩৭.০০

    ৭. বই খরিদ               ৭৬.৫০

    ৮. ধার শোধ              ১৯৩.০০

    ৯. বই ছাপা (অনুমান)    ৩,০৩৩.৫৫

    ১০. পরিচালক ও পরিচারক ভাতা   ৪৫০.০০

    ১১. বিবিধ                 ৩০২.১০

    মোট টাকা ৬,৯৩৪.৩৫

    মজুত তহবিল –টাকা ৭৭৬.৭৫

    স্বাক্ষর, কোষাধ্যক্ষ।

    আলোচ্য ব্যয়ের মধ্যে ‘বই ছাপা’ দফাটির ব্যয় প্রকৃত ব্যয় নয়, কেননা সদ্যপ্রকাশিত আমার ‘অনুমান’ নামের বইখানার সর্বস্বত্ব আমি আপনাদের এ লাইব্রেরীটির অনুকূলে দান করেছি এবং তজ্জন্যই লাইব্রেরীর অর্থে প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং বই ছাপা খাতের ৩,০৩৩.৫৫ টাকা লাইব্রেরীর মজুত তহবিল বটে এবং প্রকাশনার লভ্যাংশ হবে লাইব্রেরীরই প্রাপ্য।

    পুস্তকাদির বিবরণ

    বর্তমানে লাইব্রেরীর পুস্তক-পুস্তিকার সংখ্যা হচ্ছে—

    ১. বিজ্ঞান        ৮৫

    ২. দর্শন          ২১

    ৩. ধর্ম           ৪২

    ৪. গণিত        ১৩

    ৫. ভূগোল       ১২

    ৬. ইতিহাস     ৪৩+১

    ৭. গল্প          ৩৪

    ৮. উপন্যাস    ১৩০

    ৯. নাটক        ১১

    ১০. জীবনী     ৩২

    ১১. ভ্রমণ       ১৩

    ১২. প্রবন্ধ      ২০

    ১৩. অভিধান   ৫

    ১৪. ব্যাকরণ    ৭

    ১৫ সাহিত্য     ৪৭

    ১৬. আইন      ১৪

    ১৭. চিকিৎসা     ৮+১

    ১৮. ইংরেজি     ৩৩

    ১৯. রাজনীতি   ৬৩+১

    ২০. কৃষি       ৪৮

    ২১. বিবিধ     ৩২৯

    উপরোক্ত পুস্তকসমূহের মোট মূল্য– টাকা ১০,৫৭৬.৪০ + ৮৫.০০ = ১০,৬৬১.৪০

    পাঠক ও পাঠোন্নতি

    ১. লাইব্রেরীটির সাধারণ পাঠকের সংখ্যা নগণ্য, তবে বর্তমান বছরে সদস্য পাঠকের সংখ্যা।                                                             ১৩

    ২. সদস্য পাঠকদের পঠিত বইয়ের মোট সংখ্যা        ২৮৬

    ৩. প্রতি সদস্যের পঠিত বইয়ের গড় সংখ্যা            ২২

    দানপ্রাপ্তি

    ক. নগদ অর্থ

    মহকুমা প্রশাসক                   টাকা ১,৫০০.০০

    ইউনিয়ন পরিষদ                        ৪০০.০০

    মার্শাল ল অফিস                      ৩,০০০.০০

    মো. হোসেন চাপ্রাশী                     ২৫.০০

    মোট টাকা ৪,৯২৫.০০

    খ. পুস্তকাদি

    দাতাগণের নাম                   ঠিকানা               সংখ্যা

    জনাব কাজী নূরুল ইসলাম      ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়     ১     টাকা ৮.০০

    জনাব খায়রুল আলম ঢাকা      ঢাকা                   ১            ৮.০০

    জনাব রামেন্দু মজুমদার          বিটপী, ঢাকা           ১            ৬.০০

    জনাব বদরুদ্দিন উমর           লেখক শিবির, ঢাকা    ৬           ৩৩.০০

    জনাব বশীর আল হেলাল       বাংলা একাডেমী        ৬০        ১,০১৪.০০

    জনাব জুয়েল                     ঢাকা                     ১            ২.৬৫

    বাংলা একাডেমী                  ঢাকা                   ২৫           ৪০৫.০০

    জনাব ফিরোজ সিকদার          লামচরি                 ৩           ২৩.৫০

    জনাব আরজ আলী মাতুব্বর(সম্পাদক)  লামচরি        ৪          ৩১.০০

    মোট ১০২ টাকা ১,৫৩১.১৫

    লামচরির মতো গণ্ডগ্রামে অবস্থিত এ নগণ্য লাইব্রেরীটির উন্নয়নকল্পে যে সমস্ত মহৎ ব্যক্তি উপরোক্ত নগদ অর্থ ও পুস্তকাদি দান করেছেন, লাইব্রেরীর পরিচালক কমিটির পক্ষ থেকে আমি তাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

    মাননীয় সভাসদবৃন্দ, কোনো প্রতিষ্ঠানের বেতনভোগীকে ‘কর্তব্য পালন করতে হয় এবং অবৈতনিককে পালন করতে হয় ‘দায়িত্ব। আর প্রতিষ্ঠাতার কর্তব্য বা দায়িত্ব কোনোটিই থাকে না, থাকে শুধু দরদ। আমি এ প্রতিষ্ঠানটির বেতন বা ভাতা ভোগী লাইব্রেরীয়ান ও অবৈতনিক সম্পাদক এবং প্রতিষ্ঠাতাও। তাই এ লাইব্রেরীটির কাজ করতে হচ্ছে আমাকে একাধারে কর্তব্য, দায়িত্ব এবং দরদ নিয়ে। অথচ আমি একজন অক্ষম মানুষ। বুদ্ধি সামান্য থাকলেও বিদ্যা নেই, মন আছে ধন নেই, ইচ্ছা আছে উপায় নেই এবং সাধ আছে সাধ্য নেই, যেহেতু আমি এখন অতিবৃদ্ধ। একখানা ইংরেজি চিঠি পড়াতে যেতে হয় সিকদার বাড়ি বা মৃধা বাড়ি ইয়াসিন আলী সিকদার ও ফজলুর রহমান মৃধার কাছে। অর্থের জন্য যেতে হয় ধনীর দুয়ারে এবং নিজ শক্তিতে কোনো কাজ করতে পারি না, অন্যের সাহায্য ছাড়া।

    আগেই বলেছি যে, আমার সাধ আছে সাধ্য নেই। অর্থ আমার নেই। নিজ উপার্জিত কানি তিনেক জমি ছিলো, তাই বিক্রি করে প্রতিষ্ঠা করেছি এ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি। আমার আর কোনো সম্পত্তিই নেই, ছেলেদের দান করা সম্পত্তি ছাড়া। এ লাইব্রেরীটির উন্নয়নকল্পে এখনও বহু অর্থের প্রয়োজন, যা বহন করা আমার সামর্থের বাইরে।

    আপনারা হয়তো জানেন যে, আমার এ প্রতিষ্ঠানটি দান করে দিয়েছি রেজিস্ট্রীকৃত ‘ট্রাস্টনামা দলিল দ্বারা জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্যে। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন আমার নয়, আপনাদের। আমার আছে শুধু দরদ। তাই আমার সেই দরদটুকু নিয়ে এ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নকল্পে বাংলাদেশ সরকারের ও দেশের মহান ব্যক্তিদের বিশেষত সভায় উপস্থিত সুধীবৃন্দের কৃপাদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, সদস্যবৃন্দ ও সুধী অতিথিবৃন্দ! আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট ও নানাবিধ কষ্ট স্বীকার করে এ লামচরির মতো জঙ্গল ও দুর্গন্ধময় স্থানে পদার্পণ করেছেন। আপনাদের সব রকম কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বার্ষিক বিবরণী শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ৩.৯.১৩৯০

    .

    বার্ষিক বৃত্তিপ্রদান অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণ

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ এবং আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীগণ! আজ আমার সামান্যতম বৃত্তিদানের পঞ্চম বার্ষিক অনুষ্ঠান। আমার এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটি প্রতিষ্ঠা করা হয় বিগত ১৩৮৬ মোতাবেক ১৯৭৯ সালে। এবং উক্ত সাল থেকেই বৃত্তিদান শুরু করা হয়।

    ছাত্র-ছাত্রীদের সুকোমল হস্তে সর্বপ্রথম বৃত্তিপ্রদান ও লাইব্রেরীর শুভ উদ্বোধন পর্বে পৌরোহিত্য করেন তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাননীয় আ. আউয়াল সাহেব ২৫. ১. ৮১ তারিখে, দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অতঃপর ১৯৮০ সালের বৃত্তি প্রদান করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শ্রীযুক্ত বাবু অরবিন্দ কর ৩. ৫. ৮১ তারিখে, ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৮১ সালের বৃত্তি প্রদান করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) মাননীয় সিরাজুল ইসলাম সাহেব ১০. ১. ৮২ তারিখে, ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৮২ সালের বৃত্তি প্রদান করেন মহকুমা প্রশাসক মাননীয় এম. এ. মতিন সাহেব ১৪. ১. ৮৩ তারিখে, ৪টি প্রাথমিক ও ১টি মাধ্যমিক –মোট ৫টি বিদ্যালয়ে। এবং ১৯৮৩ সালের বৃত্তি প্রদান করবেন অদ্যকার অনুষ্ঠানের সভাপতি মাননীয় ইউ, এন. ও. সাহেব অদ্য ১৪, ১. ৮৪ তারিখে, তাও ৫টি বিদ্যালয়ে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, আমার বৃত্তিপ্রদানের প্রথম বছর বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিলো ২টি, দ্বিতীয় বছর ৩টি, তৃতীয় বছর ৪টি এবং চতুর্থ বছর ৫টি। পূর্বের বছরগুলির ন্যায় সংখ্যা বাড়াতে পারলে এ বছর বিদ্যালয়ের সংখ্যা হওয়া উচিত ছিলো ৬টি। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যবশত এ বছর সংখ্যা বাড়াতে পারছি না। হয়তো আর পারবোও না কোনোদিন। কেননা ১৩৬৭ সালের পরে সম্পদ বলতে আমার কিছুই ছিলো না, একমাত্র কায়িক শক্তি ছাড়া। কায়িক শক্তির দ্বারাই আমি মাঠে মাঠে দিনমজুরি করেছি আমিন রূপে। আর তারই ফল আমার এ প্রতিষ্ঠান। বার্ধক্যজনিত শক্তিহীনতার দরুন এখন আর মাঠে মাঠে কাজ করতে পারছি না। তাই এ বছর বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বাড়াতে পারছি না। তবে বরিশাল জনতা ব্যাংক, চকবাজার শাখায় আমি একটি রিজার্ভ ফাণ্ড করেছি এবং তাতে প্রত্যেক বছর ৫০.০০ টাকা করে মজুত রাখার ব্যবস্থা করেছি, যার শুধু মুনাফার দ্বারাই অন্তত ৫ বছর পর পর একটি করে বৃত্তিদানযোগ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। আমি আশা করি যে, এ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে প্রতি ১০০ বছরে ২০টি করে বৃত্তিদানযোগ্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়বে এবং এরূপ সংখ্যাবৃদ্ধি অনন্তকাল চলতে থাকবে, যদি কোনোরূপ রাষ্ট্রীয় বিভ্রাট না ঘটে।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আপনারা হয়তো জানেন যে, আমার সামান্য সম্বল যা কিছু ছিলো, তা সবই দান করেছি জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে, এমনকি নিজ দেহটিও! ঐ একই উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্র একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু তাতে এখনও তাভাব রয়েছে বহু, যা পূরণ করা আমার সামণের বাইরে। গণশিক্ষার মাধ্যম রূপে লাইব্রেরী ভবনে একটি টেলিভিশন সেট থাকা আবশ্যক বলে মনে করি। কিন্তু তা আমার সামর্থে কুলোচ্ছ না। এ বিষয়ে সদাশয় ইউ. এন. ও. সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

    হে আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীগণ! তোমরা যারা এ বছর বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান পাওনি, তারা আগামী বছর প্রথম স্থান পাবার জন্য যত্ন নিবে এবং যারা প্রথম স্থান পেয়েছ, তারা আজ বৃত্তিদান গ্রহণ করবে এবং আগামী দিনেও আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকবে। তোমাদের সুস্বাস্থ্য ও পাঠানুরাগ বৃদ্ধির জন্য আমার আশীর্বাদ রইলো।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও সুধী অতিথিবৃন্দ। আপনারা আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট ও শ্রম স্বীকার করে শহর থেকে বহুদূরে এ নগণ্য পল্লীতে পদার্পণ করেছেন। যার ফলে আমার বৃত্তিদান অনুষ্ঠানটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে, ধন্য হয়েছে লামচরি গ্রামখানি। আর এর জন্য আপনাদেরকে সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ১৪. ১. ১৯৮৪

    .

    বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার বার্ষিক কারুশিল্প পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ

    উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আপনারা এ মহতী অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ ও শুভ উদ্বোধন পর্বে পৌরোহিত্য করার সুযোগ দান করায় নিজেকে মনে করছি। ধন্য ও ভাগ্যবান। আমি নিজে ভাগ্যবাদী নই, তবে জানি যে, যা কল্পনা করা যায় এমন কোনো কিছু পেলে তাকে কর্মফল বলা হয়, আর অকল্পনীয় কোনো কিছু পেলে তাকে বলা হয় ভাগ্য। সুদূর অজ পাড়াগাঁয়ের একজন অজ্ঞ চাষী হয়ে আজ আমি যে আপনাদের এ মহতী অনুষ্ঠানে যোগদান করার সুযোগ পাবো, তা ছিলো আমার কল্পনার অতীত, তাই বলতে হয় এটা আমার নিছক ভাগ্য, কর্মফল নয়।

    আপনাদের এ মহৎ অনুষ্ঠানটি হচ্ছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার বার্ষিক অনুষ্ঠান। যদিও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি অজ্ঞাত নই, তথাপি এ সংস্থার কর্মপদ্ধতি ও অগ্রগতি সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না গতকাল সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে এসে আপনাদের কতিপয় সুধীজনের সংস্পর্শ না পাওয়া পর্যন্ত। কাজেই আপনাদের মহান কর্মতৎপরতা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তবে এইটুকু জ্ঞাত আছি যে, এ যন্ত্রযুগের প্রবল প্রবাহে বাঙালীর জাতীয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যকে ভেসে যেতে দেওয়া যায় না। আর এ কাজে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, তাঁরা অভিনন্দনযোগ্য।

    বর্তমানে আধুনিক গানের সুরে ও ছন্দে দেশ ভেসে যাচ্ছে, অথচ কেউ কেউ সংগ্রহ করছেন পল্লীগীতি, বাউলগান, ভাটিয়ালি ও লালনগীতি। আধুনিক কবিতার মাহাত্ম যেখানে আকাশচুম্বী, সেখানে কেউ কেউ সংগ্রহ করছেন মলিন পুঁথিসাহিত্য। আবার নভেল-নাটকে ভরপুর দেশের কেউ কেউ সংগ্রহ করছেন পল্লীবাংলার প্রবাদবাক্যগুলো। এভাবে বাংলার ঐতিহ্য রক্ষার প্রচেষ্টায় যারা আত্মনিয়োগ করেছেন বা করছেন, তারা নিশ্চয়ই অভিনন্দিত ও পুরস্কৃত হবার পাত্র। এবং তাই হচ্ছে আজকের এ অনুষ্ঠানে।

    বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ঐরূপ শুধু অভিনন্দনযোগ্যই নয়, প্রাপ্য তাদের আরো অনেক কিছু। কেননা এ সংস্থা শুধু বাংলার ঐতিহ্য রক্ষাকারী সংস্থাই নয়, এর আছে বহুমুখী মাহাত্ম। বর্তমান অর্থসংকটের দিনে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দ্বারা যেমন কিছুটা অর্থসংকট দূর হতে পারে, তেমনি দূরীভূত হতে পারে দেশের বেকার সমস্যা। নানা কারণে যারা পুঁথিগত বিদ্যা শিক্ষায় অগ্রগতি লাভ করতে পারে না, ফলে কর্মজীবনে যারা বিভ্রান্ত, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প তাদের কাছে যেন অন্ধের যষ্টি।

    মূল্যহীন কথা বলে আমি আর আপনাদের কষ্ট দিতে চাইনা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার কর্মীবৃন্দের নিরলস প্রচেষ্টা সফল ও তার অগ্রগতি হোক– এই কামনা করে ও আজকের এ অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য ও সভার কাজ শেষ করছি।

    ১. ১. ১৩৯১।

    .

    আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর বার্ষিক বিবরণী।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, শ্রদ্ধেয় সদস্য ও সুধী অতিথিবৃন্দ। আজ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর ৫ম বার্ষিক অধিবেশন এবং আমার ৮৪তম জন্মদিন। আমার মনে হয় যে, আজকের এ সম্মেলনে আমি আপনাদের সকলের চেয়ে অধিক ভাগ্যবান। তবে তা রূপ-গুণ, বিদ্যা-বুদ্ধি বা অর্থ-সম্পদে নয়, শুধুমাত্র বয়সের তুলনায়। বর্তমানে আমি বয়সের এমন এক পর্যায়ে এসে গেছি যে, প্রতি বছরেই আপনাদের কাছে নিতে হয় ‘চিরবিদায়’। কেননা কোনো বার্ষিক অনুষ্ঠানেই আশা করতে পারি না যে, আগামী অনুষ্ঠান দেখতে পাবো। গতবারের অনুষ্ঠানেও আমার আশা ছিলো না যে, এবারের অনুষ্ঠান দেখতে পাবো। তাই সেবারের অনুষ্ঠানে নিয়েছিলাম চিরবিদায়। তথাপি নিয়তি আমাকে সুযোগ দান করেছে আজকে আপনাদের এ মহতী সম্মেলনে যোগদান করার জন্য। তাই আমি বিশ্বনিয়ন্তার কাছে আত্মসমর্পণপূর্বক ১৯৮৩-৮৪ সালের বার্ষিক বিবরণী পাঠ শুরু করছি।

    আজকের এ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে–

    ১. ১৯৮৩-৮৪ সালের আয়-ব্যয় পর্যালোচনা ও অনুমোদন।

    ২, ৩, পরিচালক ও নির্বাহী কমিটি নতুনভাবে গঠন।

    ৪, ৫. বর্তমান সালের বাবদ ভিক্ষাদান ও বৃত্তিপ্রদানের তারিখ নির্ধারণ করা।

    উক্ত বিষয়সমূহের মধ্যে আজকের অধিবেশনের সময় সংক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে কমিটির সাক্ষাতে বেলা ১১টায় স্থানীয় ২০ জন কাঙ্গল-কাগালীকে মোট ১০০.০০ টাকা ভিক্ষা প্রদান করা হয়েছে। এ অসৌজন্যমূলক কাজটি করার জন্য আমি আপনাদের নিকট ক্ষমা চাচ্ছি।

    আমার সাবেক পরিকল্পনা তথা গঠনতন্ত্র মোতাবেক লাইব্রেরীর তহবিল থেকে স্থানীয় কতিপয় বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র-ছাত্রীদের বার্ষিক বৃত্তিপ্রদানের তারিখ ছিলো প্রত্যেক পৌষ মাসের শেষ রবিবার, যেহেতু তখন দেশের সরকারি ছুটির দিন ছিলো রবিবারে। কিন্তু অধুনা সরকারি ছুটির দিন শুক্রবার ধার্য থাকায় আগামীতে বৃত্তিপ্রদানের তারিখ প্রত্যেক পৌষ মাসের শেষ শুক্রবারে ধার্য থাকা বাঞ্ছনীয়। এ বিষয়ে কমিটির অনুমোদন প্রার্থনা করছি।

    এ যাবত বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে ৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৪০০.০০ টাকা এবং ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৫০.০০ টাকা, একুনে মোট ৫৫০.০০ টাকা। কিন্তু বর্তমান বছর থেকে আরও ১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০০.০০ টাকা ও ১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৫০.০০ টাকা বার্ষিক বৃত্তিপ্রদানের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।

    আমার পরিকল্পিত ও সম্পাদিত ট্রাস্টমার ৬ ন. দফে মোতাবেক মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে মানবতাবাদ-এর উৎকর্ষজনক একটি উৎকৃষ্ট প্রবন্ধের রচয়িতাকে ১০০.০০ টাকা করে বার্ষিক প্রতিযোগিতামূলক পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত ছিলো। এ-ও সিদ্ধান্ত ছিলো যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উক্ত পুরস্কার বিতরিত হবে এবং উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের কর্তৃপক্ষ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। অধিকন্তু একথাও পরিকল্পনাভুক্ত ছিলো যে, কর্তৃপক্ষ যদি কোনো কারণে আমার ঈপ্সিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি সম্পাদনে অসম্মতি জানান, তবে উক্ত টাকার দ্বারা অতিরিক্ত একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথানিয়মে বৃত্তি প্রদান করা হবে। (দেখুন ‘স্মরণিকা’, পৃ. ৩১)।

    একটি কথা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন দর্শন বিভাগ প্রধান মাননীয় ড. আ. মতিন সাহেব আলোচ্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য আমাকে আশ্বাস প্রদান করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বিভাগ প্রধান যে কোনো কারণে উক্ত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। এতদকারণে উক্ত পুরস্কারের বরাদ্দকৃত টাকা এযাবত লাইব্রেরীর তহবিলে মজুদ রয়েছে। তাই উক্ত পুরস্কারের বরাদ্দকৃত টাকার দ্বারা এ বছর থেকে অতিরিক্ত ১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বৃত্তিপ্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি এবং সে মর্মে চরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মনোনীত করেছি।

    চরবাড়িয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক –এ বিদ্যালয় দু’টি একই স্থানে ও পাশাপাশি অবস্থিত। তার একটিতে বৃত্তি প্রদান করা হলে অপরটিতেও বৃত্তি প্রদান করা সমীচীন। তাই মানবতা রক্ষার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লাইব্রেরীর তহবিল থেকে বরিশাল জনতা ব্যাংক চকবাজার শাখায় ১,০০০.০০ টাকা স্থায়ী আমানত রাখা হয়েছে (হিসাব ন. ১৮৯১১৮/৪০৯)। এ টাকার লভ্যাংশ দ্বারা চরবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতেও বৃত্তিপ্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আর এ বছর উক্ত বিদ্যালয় দুটিতে বৃত্তিপ্রদান করা যাবে উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরস্কারের উদ্দেশ্যে বরাদ্দকৃত মজুত টাকা দ্বারা।

    এখন আমি ১৯৮৩-৮৪ সালের কার্যবিবরণী ও নতুন কমিটি গঠন সম্বন্ধে আলোচনা করবো, প্রথমে কার্যবিবরণী ও পরে কমিটি গঠন সম্বন্ধে।

    লাইব্রেরীর আয়, ব্যয় ও আবশ্যক

    লাইব্রেরীর সদস্যবৃন্দের স্মরণার্থে উল্লেখ্য যে, এ লাইব্রেরীটির প্রধানত দুইটি তহবিল আছে– ক. বিশেষ তহবিল ও খ. সাধারণ তহবিল।

    ক. বিশেষ তহবিল

    এ তহবিলের কোনো অর্থ কখনো ব্যয় করা যাবে না, শুধুমাত্র তার লভ্যাংশ ব্যয় করা যাবে। দেখুন ট্রাস্টনামা দলিলের দফে ন, ১১ এবং ‘স্মরণিকা’ পুস্তকের পৃ. ৩২-৩৪।

    বর্তমানে ক. তহবিলের টাকার পরিমাণ হচ্ছে ১২,৫৫০.০০ টাকা। এ টাকা স্থায়ী আমানত রাখা হয়েছে জনতা ব্যাংক, চকবাজার শাখা, বরিশালে। হিসাব ন. ০৯২০৩৬/২২৬, ০৯২০৩৬/২২৭, ৩৩৩১৬৭/১৬০ ও ১৮৯১১৮/৪০৯।

    খ. সাধারণ তহবিল

    এ তহবিলের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে বিশেষ তহবিলের (স্থায়ী আমানত) টাকার লভ্যাংশ এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্তি, জনসাধারণের স্বেচ্ছাকৃত দান, পাঠক সদস্যদের প্রদত্ত চাঁদার টাকা ইত্যাদি। এখানে সাধারণ তহবিল সম্বন্ধে বর্তমান সালের আয় ও ব্যয়ের হিসাব দিচ্ছি।

    আয়

    ১. বিগত সালের মজুত     টাকা ৭৭৬.৭৫

    ২. দানপ্রাপ্তি                   ২২০.০০

    ৩. স্থায়ী আমানতী টাকার সুদপ্রাপ্তি

    ক. ১৯৮২-৮৩             ১,৬০৮.০০

    খ. ১৯৮৩-৮৪            ১,৭৫০.০০

    ৪. পাঠকদের চাঁদা         ৩৯.০০

    ৫. ব্যাংকের অস্থায়ী আমানতী আদায়     ২,৫৯০.০০

    মোট টাকা ৬,৯৮৩.৭৫

    খরচ বাদ টাকা ৪,৩২১.৩৫

    মজুত তহবিল টাকা ২,৬৬২.৪০

    ব্যয়

    ১. যাতায়াত         টাকা ১৩৯.৬০

    ২. অনুষ্ঠান (১৯৮৩)      ২৯১.০০

    ৩. বৃত্তিদান (১৯৮৩)      ৫৫০.০০

    ৪. ভিক্ষাদান (১৯৮৩)     ১০০.০০

    ৫. ভিক্ষাদান (১৯৮৪)    ১০০.০০

    ৬. বই প্রকাশ              ৩৮২.০০

    ৭. নলকূপ স্থাপন           ৫১৩.০০

    ৮. পুকুর খনন             ২৮০.০০

    ৯. পরিচালক ভাতা        ৪৫০.০০

    ১০. সেরেস্তা খরচ           ৩০.০০

    ১১. অতিথি সেবা

    ১২. অনুষ্ঠান (১৯৮৪)

    ১৩. বিবিধ                  ৭.৫০

    ১৪. ব্যাংকের স্থায়ী আমানত   ১,০০০.০০

    মোট টাকা ৪,৩২১.৩৫

    কিন্তু একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ, লাইব্রেরীর সরহদ্দ বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ ও আসবাবপত্র খরিদ বাবদ মোট প্রায় ৩০,০০০.০০ টাকার দরকার। এ বিষয়ে মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

    পুস্তকাদি ও পাঠক

    বর্তমানে লাইব্রেরীর পুস্তকাদির সংখ্যা হচ্ছে –

    ১. বিজ্ঞান        ৮৮

    ২. দর্শন          ২৪

    ৩. ধর্ম           ৪৩

    ৪. গণিত        ১৩

    ৫. ভূগোল       ১২

    ৬. ইতিহাস     ৪৫

    ৭. গল্প          ৩৭

    ৮. উপন্যাস    ১৩২

    ৯. নাটক        ১১

    ১০. জীবনী     ৩৫

    ১১. ভ্রমণ       ১৩

    ১২. প্রবন্ধ      ২৩

    ১৩. অভিধান   ৫

    ১৪. ব্যাকরণ    ৭

    ১৫ সাহিত্য     ৫৩

    ১৬. আইন      ১৪

    ১৭. চিকিৎসা     ৯

    ১৮. ইংরেজি     ৩৮

    ১৯. রাজনীতি   ৮২

    ২০. কৃষি       ৪৮

    ২১. বিবিধ     ২৮৫

    বইয়ের মোট সংখ্যা ১০১৭

    মোট মূল্য ১২,৭৩৩.৯৫ টাকা।

    পাঠকবৃন্দ

    এ লাইব্রেরীতে সাধারণ পাঠকের সংখ্যা নগণ্য, সদস্য পাঠকের সংখ্যা হচ্ছে বর্তমানে ১৮ জন। সদস্য পাঠকদের মধ্যে ২টি শ্রেণী আছে– প্রৌঢ় এবং ছাত্র। লাইব্রেরীর নিয়মমতে কোনো ছাত্র পাঠকের নিকট থেকে চাদা গ্রহণ করা হয় না। তবে প্রৌঢ়দের নিকট থেকে মাসিক চাদা গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে লাইব্রেরীর ছাত্র সদস্যের সংখ্যা মোট ১৫ এবং প্রৌঢ় সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৩ জন।

    বর্তমান সালে উক্ত পাঠকগণ পুস্তক অধ্যয়ন করেছেন মোট ২৩০টি। সুতরাং পাঠকগণ প্রত্যেকে গড়ে পুস্তক অধ্যয়ন করেছেন প্রায় ১৩টি করে। কিন্তু পাঠকগণের মধ্যে সর্বাধিক পুস্তক

    অধ্যয়নপূর্বক কৃতিত্ব অর্জন করেছেন–

    ১ম স্থানের অধিকারী   মো. ফিরোজ সিকদার  পঠিত পুস্তক ৪৬টি।

    ২য় স্থানের অধিকারী   মো. আলতাফ হোসেন   পঠিত পুস্তক ৩৮টি।

    ৩য় স্থানের অধিকারী   মো. ইয়াসিন আলী সি.   পঠিত পুস্তক ২০টি।

    নতুন কমিটি গঠন সম্বন্ধে আলোচনা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! এখন আমি লাইব্রেরীর নতুন কমিটি গঠন সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ আলোচনা করতে চাই। কেননা লাইব্রেরীর গঠনতন্ত্র তথা ট্রাস্টমার নির্দেশমতে এ বছর (৫ম বছর) নতুন কমিটি গঠন করা কর্তব্য। কিন্তু আলোচনার পূর্বে ট্রাস্টনামায় লিখিত ১২ ন. দফেটি আপনাদের পড়ে শুনাচ্ছি। দেখুন ‘স্মরণিকা’, পৃ. ৩৪-৩৫।

    (‘স্মরণিকা’ পাঠ)

    ট্রাস্টমার নির্দেশমতেই নতুন কমিটি গঠন করা উচিত। কিন্তু সময়ের গতিধারার প্রতি লক্ষ্য করে এবং লাইব্রেরীর মঙ্গলার্থে আমার সাবেক পরিকল্পনা অর্থাৎ ট্রাস্টমার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন। করা এখন সমীচীন বলে মনে করি।

    আমার পরিকল্পিত গঠনতন্ত্রমতে লাইব্রেরীর পরিচালক কমিটির সদস্যপদের সংখ্যা ছিলো ১১। যথা –পাঠকদের মনোনীত সদস্যের সংখ্যা ৪, প্রতিষ্ঠাতার মনোনীত ৪ এবং সরকারি পর্যায়ে ৩ জন; মোট ১১ জন। কিন্তু বর্তমানে সরকারি পর্যায়ের সদস্যপদের সংখ্যা ৩টির স্থলে (একটি পদ বৃদ্ধি করে) ৪টি পদ ধার্য করা সমীচীন বলে আমি মনে করি। আমি এ-ও মনে করি যে, সে বর্ধিত পদটির অধিকারী হবেন আমাদের উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাহেব। সে মর্মে বর্তমান উপজেলা অফিসার মাননীয় এম. এ. বারি সাহেবের সম্মতি গ্রহণ করা হয়েছে।

    ট্রাস্টনামার ১২ন, দফের লিখিতমতে, যদি কোনো মহৎ ব্যক্তি লাইব্রেরীটির উন্নয়নকল্পে অন্যূন ১,০০০.০০ টাকা বা তার সমমূল্যের কোনো বস্তু দান করেন, তবে তিনি লাইব্রেরীর পরিচালক কমিটির একজন স্থায়ী সদস্য হতে পারবেন এবং তাকে সহযোগী সদস্য বলা যাবে। সে মর্মে বর্তমান পরিচালক কমিটির সহযোগী সদস্য হচ্ছেন মৌ. মোশাররফ হোসেন মাতুব্বর। যেহেতু এ লাইব্রেরীর উন্নয়নকল্পে তিনি এককালীন ২,৫০০.০০ টাকা দান করেছেন। নতুন কমিটি গঠনে সহযোগী সদস্য হবে দুইজন। এর অতিরিক্ত ব্যক্তিটি হবে মো. আ. খালেক মাতুববর (মাণিক), যেহেতু সে বিভিন্ন সময়ে এ যাবত যে সমস্ত বস্তু এ লাইব্রেরীতে দান করেছে, তার মোট মূল্য হচ্ছে ১,১৮৮.০০ টাকা। তার দানের বস্তুগুলো হচ্ছে–

    বই                 ৬১টি মূল্য           টাকা ৪৪৪.০০

    দেয়াল ফটো (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)   ১      80.00

    দেয়াল ফটো (কাজী নজরুল)     ১       ৫০.০০

    টেবিল                              ২       ৮৫.০০

    চেয়ার                              ৩       ১২০.০০

    তাকের তক্তা                      ১৮      ৩৬০.০০

    পাঞ্চার মেশিন                   ১          ২০

    পেপার ওয়েট(কাচ)             ১০        ৪০.০০

    গামপট                         ১          ৩.০০

    স্ট্যাম্প প্যাড (ময়কালি)        ১         ২৬.০০

    মোট মূল্য টাকা ১,১৮৮.০০

    নতুন পরিচালক কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর পাঠকগণ তাদের মনোনীত ৪ জন সদস্যের নামের তালিকা প্রদান করেছেন এবং প্রতিষ্ঠাতা কর্তৃক মনোনীত ৪ জন সদস্যের নামের তালিকা প্রদত্ত হয়েছে।

    ট্রাস্টমার নির্দেশ মোতাবেক সরকারি পর্যায়ের একজন শিক্ষাবিদ সদস্য মনোনীত করবেন মাননীয় সভাপতি সাহেব। এবং এ মর্মে বর্তমান কমিটির সদস্য হচ্ছেন মাননীয় অধ্যক্ষ মো. হানিফ সাহেব। আমি আশা করি যে, সভাপতি সাহেব তাঁকেই নবগঠিত পরিচালক কমিটির সদস্যপদে মনোনয়ন প্রদান করবেন।

    সুতরাং পূর্বোক্ত আলোচনাসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নরূপ নবগঠিত পরিচালক কমিটি হতে পারে।

    ক. সরকারি পর্যায়ের সদস্যা ৪ জন

    ১. মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক(পদাধিকার বলে)      সভাপতি

    ২. মাননীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (পদাধিকার বলে)    সদস্য

    ৩. মাননীয় জেলা প্রশাসক মনোনীত শিক্ষাবিদ সদস্য
    অধ্যক্ষ জনাব মো. হানিফ                                               সদস্য

    ৪. মাননীয় সভাপতি, চরবাড়িয়া ইউনিয়ন
    পরিষদ (পদাধিকার বলে)                                               সদস্য

    খ. পাঠকদের মনোনীত সদস্য ৪ জন

    ১. মৌ, ফজলুর রহমান মৃধা, লামচরি                         সদস্য

    ২. মৌ. মোসলেম উদ্দীন মাতুব্বর, লামচরি                   সদস্য

    ৩. ডা. আ. আলী সিকদার, লামচরি                           সদস্য

    ৪. মো. ফিরোজ সিকদার, লামচরি                             সদস্য

    গ. প্রতিষ্ঠাতার মনোনীত সদস্য ৪ জন

    ১. জনাব অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির, বরিশাল।          সদস্য

    ২. মৌ, আ. গণি আকন, লামচরি                             সদস্য

    ৩. মৌ. গোলাম রসুল মোল্লা, লামচরি                         সদস্য

    ৪. আরজ আলী মাতুব্বর, লামচরি                            সদস্য

    ঘ. সহযোগী সদস্য ২ জন

    ১. মৌ. মোশাররফ হোসেন মাতুব্বর, লামচরি                সদস্য

    ২. মো. আ. খালেক মাতুব্বর (মাণিক), লামচরি             সদস্য

    মোট ১৪ জন

    অদ্যকার অধিবেশনে প্রস্তাবিতরূপে নবগঠিত পরিচালক কমিটি অনুমোদিত হলে, পরে কমিটির বিশেষ পদসমূহের প্রস্তাব উত্থাপিত হবে।

    সবশেষে, মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! লামচরি গ্রামের মতো একটি অখ্যাত ও নোংরা পরিবেশে অবস্থিত এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির বার্ষিক অনুষ্ঠানে আপনারা যেভাবে সময়, শক্তি ও অর্থ অপচয় করে পদধূলি দান করেছেন, সেজন্য আমি নিজের ও লামচরিবাসী জনগণের পক্ষ থেকে আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার বার্ষিক বিবরণী এখানেই শেষ করছি।

    ইতি।

    ৩.৯.১৩৯১

    .

    বাংলাদেশ দর্শন সমিতির ষষ্ঠ সাধারণ সম্মেলনে পঠিত বক্তৃতা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও আমার প্রিয় তরুণ-তরুণীগণ! আজকের এ মহতী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ ও দুটি কথা বলার সুযোগ পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ সভায় বলবার মতো কিছুই আমার আয়ত্তে নেই, একমাত্র পরিচয় জ্ঞাপন ছাড়া। তাই আমার পরিচয়জ্ঞাপক দু’-একটি কথা বলেই বক্তব্য শেষ করবো।

    আমার পরিচয় –বরিশাল জেলার লামচরি গ্রাম নিবাসী একজন অজ্ঞ চাষী। মাত্র চার বৎসর বয়সে আমার বাবা মারা যান এবং দশ বৎসর বয়সে দেনার দায়ে নিলামে বিক্রি হয়ে যায় সামান্য বিত্তটুকু এবং বসতঘরখানা। তখন বেঁচে থাকতে হয় দশ দুয়ারের সাহায্যে। দারিদ্র নিবন্ধন কোনো বিদ্যায়তনে বিদ্যালাভের সুযোগ ঘটেনি আমার, বর্ণবোধ ছাড়া।

    পেটের দায়ে আমাকে কৃষিকাজ শুরু করতে হয় অল্প বয়সেই। কৃষিকাজের ফাঁকে ফাঁকে সামান্য পড়ার কাজও চালাতে থাকি ঘরে বসেই। বাংলাভাষা পড়ার সামান্য ক্ষমতা জন্মে গ্রাম্য পুঁথিপাঠকদের সংগে পুঁথিপাঠ ও স্থানীয় পড়ুয়া ছাত্রদের পুরোনো পাঠ্যপুস্তক পাঠের মাধ্যমে। পয়সা দিয়ে কোনো বিদ্যালয়ে বিদ্যা খরিদ করা ছিলো আমার ক্ষমতার বাইরে। তাই আমার কাছে কোনো শিক্ষাঙ্গনের ক্যাশমেমো নেই।

    আপনারা জানেন যে, অধুনা উচ্চতর জ্ঞান লাভের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। আর তা-ই আমার অনায়ত্ত। একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি ভাষা না জানায় আমি পণু। যে ব্যক্তি একটি পায়ের অধিকারী, কায়ক্লেশে সমতল ভূমিতে বিচরণ সম্ভব হলেও তার পক্ষে পর্বতে আরোহণ যেমন সম্ভব নয়, তদ্রূপ ইংরেজি ভাষা না জানার ফলে আমি উচ্চতর জ্ঞান লাভে হয়েছি। বঞ্চিত।

    বিগত ইং ২৭. ১০. ৭৮ তারিখের ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা, ১০. ৬. ৮১ তারিখের সংবাদ পত্রিকা, ১৯. ৭. ৮১ তারিখের ‘বিপ্লবী বাংলাদেশ’ পত্রিকা, ৪, ৯. ৮১ তারিখের ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকা, ১২. ১২. ৮২ তারিখের ‘সন্ধানী’ পত্রিকা ও আমার সম্পাদিত ‘স্মরণিকা’ পুস্তিকাখানা যারা পাঠ করেছেন এবং যারা ১৭. ৪. ৮৩ তারিখে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রচ্ছদ’ অনুষ্ঠানে আমার সাক্ষাতকারের বাণী শ্রবণ করেছেন– তারা হয়তো জানেন আমার দুঃখজনক একটি ঘটনা। তবুও সেই অবিস্মরণীয় বিষাদময় ঘটনাটি সংক্ষেপে এখানে বলছি। যে ঘটনা আমাকে করেছে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দ্রোহী।

    আমার মা ছিলেন অতিশয় নামাজী-কালামী একজন ধার্মিকা রমণী। তার নামাজ-রোজা বাদ পড়া তো দূরের কথা, কাজা হতেও দেখিনি আমার জীবনে। তাঁর তাহাজ্জুদ নামাজ বাদ পড়েনি মাঘ মাসের দারুণ শীতের রাতেও। ১৩৩৯ সালে আমার মা মারা গেলে আমি মৃত মায়ের ফটো তুলেছিলাম। মাকে দাফন করার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত মুন্সি, মৌলবি ও মুসল্লিরা এসেছিলেন, ফটো তোলা হারাম’ বলে তারা জানাজা ও দাফন করা ত্যাগ করে লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা কতিপয় অমুসল্লি নিয়ে জানাজা ছাড়াই মাকে সৃষ্টিকর্তার হাতে সমর্পন করতে হয় কবরে।

    ধর্মীয় দৃষ্টিতে ছবি তোলা দূষণীয় হলেও সে দোষে দোষী স্বয়ং আমিই, আমার মা নন। তথাপি কেন যে আমার মায়ের অবমাননা করা হলো, তা ভেবে না পেয়ে আমি বিমূঢ় হয়ে মা’র শিয়রে দাঁড়িয়ে তার বিদেহী আত্মাকে উদ্দেশ করে এই বলে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, “মা, আজীবন ছিলে তুমি ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। আর আজ সেই ধর্মের নামেই হলে তুমি শিয়াল কুকুরের ভক্ষ্য। সমাজে বিরাজ করছে এখন ধর্মের নামে অসংখ্য অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার। তুমি আমায় আশীর্বাদ করো, আমার জীবনের ব্রত হয় যেন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ অভিযান। আর সে অভিযান সার্থক করে আমি যেন তোমার কাছে আসতে পারি।

    “তুমি আশীর্বাদ করো মোরে মা,
    আমি বাজাতে পারি যেন       সে অভিযানের দামামা।”

    মায়ের মৃত্যুদিন থেকে সামান্য বিদ্যার পুঁজি নিয়ে বিজ্ঞান ও দর্শনসমুদ্রের বেলাভূমিতে বিচরণ করে যাচ্ছি কিছু উপলখণ্ড সংগ্রহের আশায়, যার দ্বারা অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে আঘাত করা যায়।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ! আমি দার্শনিক নই, এমনকি কোনো পুঁথিগত দর্শন আমার আয়ত্তে নেই, কতকটা লালন শাহের মতোই। তবে দর্শনকে ভালোবাসি, দার্শনিকদের শ্রদ্ধা করি এবং তাদের সংসর্গ লাভে আনন্দিত হই। কিন্তু আমি ভাববাদী দর্শনে অনুরক্ত নই।

    বাংলাদেশ দর্শন সমিতির মাননীয় সদস্যবৃন্দ! আপনাদের এ দার্শনিক সম্মেলনে আমার মতো অজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষে দর্শন সম্বন্ধে কোনোরূপ আলোচনা করার অর্থ হবে আমার অজ্ঞতাই প্রচার করা। অধিকন্তু তা হবে মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প বলার মতোই হাস্যকর। তবে উপসংহারে আমি এই বলতে চাই যে, যদিও দর্শনশাস্ত্রটি সার্বজনীন, তথাপি হিন্দু দর্শন, বৌদ্ধ দর্শন, মুসলিম দর্শন, ভারতীয় দর্শন, গ্রীক দর্শন ইত্যাদি দর্শনে যেমন স্বাতন্ত্র, বর্তমান বাঙালীর জাতীয় দর্শনেও তেমনটি বাঞ্ছনীয়। আর আমার ব্যক্তিগত অভিমত থেকে বলছি, তা হওয়া উচিত মানবতাবাদী দর্শন। কেননা সর্বদেশে এবং সর্বকালে মেহনতী মানুষই মানবতার প্রত্যাশী, পুঁজিপতিরা নয়। আর দুনিয়ার দরিদ্রতম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ, যেখানে মেহনতী মানুষের সংখ্যা শতকরা প্রায় ৯০। তাই এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনদর্শনই হওয়া উচিত বাঙালীর জাতীয় দর্শন তথা মানবতাবাদী দর্শন।

    সুধী সভাসদবৃন্দ! আমি মূল্যহীন বক্তব্য দ্বারা আপনাদের মূল্যবান সময় আর নষ্ট করতে চাই না। বাংলাদেশ দর্শন সমিতি অমর হোক –এই কামনা করে এবং এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।

    .

    বার্ষিক বৃত্তিদান অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতা

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, সুধী সদস্য ও অতিথিবৃন্দ এবং আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীগণ! আজ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর ৫ম বার্ষিক বৃত্তিদান অনুষ্ঠান উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু আজকের এ অনুষ্ঠানটি নতুন কোনো অনুষ্ঠান নয়। বিগত ১৮. ১২. ৮৪ তারিখে এ লাইব্রেরীর বার্ষিক অনুষ্ঠানের কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত একটি অসম্পূর্ণ বিষয় সম্পন্ন করার অধিবেশন মাত্র।

    এ লাইব্রেরীটির উদ্বোধন পর্বে পৌরোহিত্য করেছিলেন তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক মাননীয় আবদুল আউয়াল সাহেব বিগত ২৫. ১. ৮১ তারিখে। এবং তিনি স্বহস্তে বৃত্তি প্রদান করেছিলেন উত্তর লামচরি ও দক্ষিণ লামচরির দুইটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দ্বিতীয় বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে চরমোনাই (মাদ্রাসা) প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তৃতীয় বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে চরবাড়িয়া লামচরি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ ৪টিতে। চতুর্থ বছর বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে লামচরি মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহ ৫টিতে এবং বর্তমান পঞ্চম বছর বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে চরবাড়িয়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সহ মোট ৭টি বিদ্যালয়ে। জানিনা আমার মুমূষু জীবনে বৃত্তিদানযোগ্য বিদ্যালয়ের আরও সংখ্যাবৃদ্ধি দেখতে পাবো কিনা। কিন্তু বৃত্তিদানের ব্যাপারে। আমি এমন একটি চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করে রেখেছি, যাতে আমার মৃত্যুর পরে এ ধরণের দ্রুত না হলেও, ভবিষ্যতে প্রতি ৫-৬ বছর পর পর একটি করে বৃত্তিদানযোগ্য বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যদি লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখেন।

    ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠানুরাগ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বার্ষিক বৃত্তি ছাড়া আমি আর একটি নিয়ম প্রবর্তন। করেছি ১৯৮৩ সাল থেকে। সে নিয়মটি হচ্ছে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বার্ষিক পরীক্ষাকালীন যে ছাত্র বা ছাত্রীটির রোল নম্বর সর্বাধিক ছিলো, তাকে একখানা বই পুরস্কার দেয়া হবে। রোল নম্বর পর্যালোচনার মাধ্যমে জানা যায় যে, কোন্ ছাত্র বা ছাত্রীটির লেখাপড়ার আগ্রহ কতটুকু বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মনে করুন, ক্লাসে একটি ছাত্রের ১৯৮৪ সালের রোল নম্বর ১০ এবং সে বার্ষিক পরীক্ষায় ১ম স্থান অধিকার করেছে। সুতরাং ১৯৮৫ সালে তার রোল ন. ১ অর্থাৎ সে এ বছর ৯ জন ছাত্র-ছাত্রীকে পরাজিত করেছে। এভাবে রোল ন. যার যতো বেশি ছিলো, সে ততো বেশি সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তার এ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দান করা সমীচীন। তাই আমি সর্বোচ্চ রোল নম্বরের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র একটি পুরস্কার প্রদানের নিয়ম প্রবর্তন করেছি। পুরস্কারটি নির্বাচিত হবে প্রাপকের পড়ার যোগ্যতার মাপকাঠিতে। পুরস্কারের বইখানা হবে শিক্ষামূলক। অদ্যকার বৃত্তিদান অনুষ্ঠানে বৃত্তিপ্রাপকদের মধ্যে সর্বোচ্চ রোল নম্বর ছিলো ৩৮। এ নম্বরটি যার সে হচ্ছে উত্তর লামচরি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ম শ্রেণীর ছাত্রী মাসুমা বেগম, পিতা– মো. আমির আলী গাজী, গ্রাম– উত্তর লামচরি। সুতরাং এ বছরের পুরস্কার তার প্রাপ্য। এ ছাড়া আর একটি পরিকল্পনা আমার রয়েছে, যা কার্যকর করার সময় আজও আসে নি। সে পরিকল্পনাটি হচ্ছে এই যে, যদি কোনো ছাত্র বা ছাত্রী একাদিক্রমে পাঁচ বছর তার রোল নম্বর ১ রাখতে সক্ষম হয়, তবে সে এই লাইব্রেরী থেকে একখানা পুস্তক উপহার পাবে। বইখানা নির্বাচিত হবে প্রাপকের শ্রেণীগত যোগ্যতার ভিত্তিতে।

    আমার জীবনের ব্রত হচ্ছে মানুষের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার দূর করা। আমার মনে হয় যে, সে উদ্দেশ্য সিদ্ধির বিশেষ উপায় হচ্ছে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ লোকশিক্ষার দ্রুত অগ্রগতি সাধন করা। আর সে উদ্দেশ্য সিদ্ধির সামান্য ইন্ধন যোগাচ্ছি পুস্তকাদি প্রণয়ন, লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা ও বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে। এছাড়া আমার অন্যান্য যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মুখ্য উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ।

    এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, লামচরির মতো একটি গণ্ডগ্রামে এরূপ একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে দেশের কতোটুকু কল্যাণ করা যাবে? এর উত্তরে বলছি, গ্রাম দেশেরই একটি অংশ। সুতরাং একটি গ্রামের কল্যাণ একটি দেশের আংশিক কল্যাণও বটে। আমি এ আশাও করি যে, এ ক্ষুদ্র নিকৃষ্ট প্রতিষ্ঠানটির অনুকরণে দেশের অন্যত্র বা সর্বত্র বৃহৎ বা উৎকৃষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। আর যদি কখনও তাই হয়, তবে তখনই সার্থক হবে আমার এ হীন প্রচেষ্টা।

    দেশ, প্রদেশ, জেলা তো দূরের কথা, শুধুমাত্র লামচরি গ্রামেও আমার কোনোরূপ বৈশিষ্ট নেই। বিদ্যা-বুদ্ধি বা অর্থ-সম্পদে, কথাটি আপনারা সবাই জানেন। পক্ষান্তরে এ দেশে বা এ অঞ্চলে এমন সব যোগ্য ব্যক্তি আছেন, যাদের একখানা পকশালার সমান মূল্য নেই আমার সমস্ত সম্পদের। আমি আশা করি, দেশের মানুষের শিক্ষাক্ষেত্রে তারা এ ধরণের কিছুটা অবদান রাখবেন।

    দেশে হয়তো এখনও বহু লোক আছেন, যাঁরা হচ্ছেন আমার মতোই, অর্থাৎ যাদের ইচ্ছা আছে অথচ উপায় নেই। তারা হয়তো ১০-২০ জন লোক মিলে সমবায় নীতিতে এরূপ ক্ষুদ্র বা এর চেয়েও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। ক্রমে এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের প্রসার ও প্রচারের ফলে দেশের অন্যত্র বা সর্বত্র পল্লী অঞ্চলে পাবলিক লাইব্রেরী গড়ে উঠবে।

    পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, আজ সারা দেশে চলছে ভোগের তুমুল লড়াই, ত্যাগের নয়। ভোগর ময়দানে সৈন্যরা গিজগিজ করে, কিন্তু ত্যাগের ময়দান সৈন্যহীন।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আমার মূল্যহীন বক্তব্য দ্বারা আপনাদের আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। আপনাদের এ দূরাগমনের কষ্ট স্বীকারের জন্য সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি। এখন ছাত্র-ছাত্রীদের সুকোমল হস্তে বৃত্তি প্রদান ও আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করে আপনারা আমার এ কুৎসিত কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করুন।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।

    ১১. ১. ১৯৮৫

    .

    আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীতে জেলা প্রশাসনের পুস্তক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতা

    মাননীয় বাকেরগঞ্জ জেলা প্রশাসক বনাম সভাপতি সাহেব ও সুধী অতিথিবৃন্দ! লামচরির মতো গণ্ডগ্রামে অবস্থিত আমার প্রতিষ্ঠিত এ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটির নোংরা প্রাঙ্গণে মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব অনাহূত হয়েও যেভাবে পদধূলি দিয়েছেন, সেজন্য আমি নিজেকে ধন্য ও গৌরবান্বিত মনে করছি। কিন্তু আজকের এই গৌরবোজ্জ্বল দিনটিতে আমার মানসগগন ছেয়ে রয়েছে বিষাদের একটি কালো মেঘ। সে বিষাদের কারণ হচ্ছে এই যে, সময়ের স্বল্পতা ও আমার নিজের অযোগ্যতা, এ উভয় কারণেই আপনাদের মর্যাদা মাফিক যথাযোগ্য অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করতে না পারা। আমার অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

    জন্ম আমার ৩রা পৌষ, ১৩০৭ সালে। ১৩৬৭ সালে যখন বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হয়, তখন পর্যন্ত যে বিত্ত-সম্পদ উপার্জন করতে পেরেছিলাম, তার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পদ আমার ওয়ারিশগণের মধ্যে দান ও বণ্টন করে দিয়েছি এবং রিক্ত হস্তে আমি আমার পুত্রগণের পোয্য হয়ে জীবন যাপন করছি। কিন্তু পুত্রদের কাছে আমি এ কথা বলে রেখেছি যে, অবশিষ্ট জীবনে আমি আমার দেহটি খাঁটিয়ে যদি কোনো অর্থ উপার্জন করতে পারি, তবে তা সমস্তই দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করবো। তাতে তাদের কোনো দাবি-দাওয়া থাকবে না। আমার ওয়ারিশগণ তাতে সম্মত ছিলো ও আছে। অতঃপর ১৩৮৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আমার ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু কায়িক শ্রমের দ্বারা যে অর্থ উপার্জন করতে পেরেছি, তা সমস্তই আমি এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির মাধ্যমে জনকল্যাণে দান করেছি। আজ পর্যন্ত যার পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১২ হাজার টাকা স্থায়ী আমানত রেখেছি জনতা ব্যাংক চকবাজার শাখা, বরিশালে। যার লভ্যাংশের দ্বারা লাইব্রেরীর চলতি খরচ মেটানো হচ্ছে এবং স্থানীয় ৫টি প্রাথমিক ও ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট ৮০০.০০ টাকা করে বার্ষিক বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।

    বর্তমানে আমি কপর্দকশূন্য ও পরবাসী। পরবাসী কথাটি সঙ্গতিহীন বলে আপনাদের মনে হলেও তা একাধিকরূপে সত্য। এ কথাটি কারো অজানা নয় যে, দান করা বস্তুর উপর দাতার কোনো স্বত্ব বা অধিকার থাকে না, দাতার কাছে তখন তা হয় পরের সম্পদ। বর্তমানে আমি যে বাড়িতে বাস করি, সে বাড়িটি আমার নয়। কেননা তা আমি দান করে দিয়েছি। সুতরাং এখন আমি নিজ বাড়িতে পরবাসী। বর্তমানে যে লাইব্রেরীটিতে বাস করি, সেটিও আমার নয়। কেননা তা আমি দান করে দিয়েছি। সুতরাং আমি আমার নিজ লাইব্রেরীতে পরবাসী। সর্বোপরি আমার মন ও প্রাণটিকে নিয়ে যে দেহটিতে বাস করছি, সে দেহটিও আমার নয়, কেননা তা বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজে দান করে দিয়েছি। সুতরাং দেহগতভাবেও আমি এখন পরের দেহেই বাস করি। এত রকম পরবাসী হওয়া সত্ত্বেও আমি নিজেকে মনে করি যেন স্বর্গবাসী। কিন্তু সে স্বর্গীয় সুখের মধ্যে একটিমাত্র দুঃখ এই যে, আমার প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দান করা আমার সামর্থে কুলোয়নি। কেননা আমার পরিকল্পিত কতিপয় কাজ এখনো বাকি।

    নিরক্ষর বয়স্কদের শিক্ষার জন্য একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি বারান্দা নির্মাণ, গরু-ছাগলের কবল থেকে ফুলবাগান রক্ষার উদ্দেশ্যে লাইব্রেরীর সরহদ্দ বরাবর একটি দেয়াল নির্মাণ, আসবাবপত্র ও কিছু পুস্তকাদি খরিদ ইত্যাদি বাবদ এখনো প্রায় ৩০ হাজার টাকার দরকার। কিন্তু এ অর্থ সংকুলানের তহবিল আমার নেই। তাই সে বিষয়ে সদাশয় বাংলাদেশ সরকার বিশেষত মহান জেলা প্রশাসক সাহেবের শুভদৃষ্টি প্রার্থনা করছি।

    মাননীয় জেলা প্রশাসক সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আমার মামুলি আলোচনা দ্বারা আপনাদের মূল্যবান সময় আর নষ্ট করতে চাই না। এ নিঃস্ব পল্লীর ধূলিময় মাটিতে পদার্পণ করে আপনারা যে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন, সেজন্য পল্লীবাসীদের ও নিজের পক্ষ থেকে আপনাদের সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।

    ২১. ১. ১৯৮৫

    .

    বাংলা একাডেমী কর্তৃক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, বাংলা একাডেমীর সংশ্লিষ্ট মনীষীগণ, উপস্থিত সুধীবৃন্দ ও অন্যান্য বন্ধুগণ! বাঙালী জাতির প্রগতিপথের আলোকস্তম্ভ হচ্ছে বাংলা একাডেমী। যে সমস্ত সুধীবৃন্দ এ মহতী প্রতিষ্ঠানটির ধারণ, বহন ও পরিচালনা কাজে নিয়োজিত আছেন, তারা কয়েকটি অস্বাভাবিক ব্যাপারের সমন্বয় ঘটিয়েছেন আজকের এ মহান অনুষ্ঠানটিতে। প্রথম অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, বাংলা একাডেমীর বিদগ্ধ সমাজের কোনো অনুষ্ঠানে আমার মতো পল্লীবাসী একজন অশিক্ষিত কৃষককে আমন্ত্রণ করা। দ্বিতীয় হচ্ছে, আমাকে সংবর্ধনা প্রদান করা এবং তৃতীয় অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, আমাকে ফেলো’ পদ দানের প্রস্তাব করা। আমার মনে হয় যে, এ সমস্ত হচ্ছে তাদের উদারতা ও মহত্ত্বের প্রকাশ। আমাকে সংবর্ধনা দান করার মাধ্যমে তারা দেশবাসীকে দেখাতে চাচ্ছেন যে, তারা তুচ্ছতমকেও তুচ্ছ করেন না, গ্রহণ করেন সাদরে। নতুবা আজ আপনারা আমাকে যে সংবর্ধনা দান করছেন, তা কোনোরূপ যোগ্যতার মাপকাঠিতে আমার প্রাপ্য নয়।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও শ্রদ্ধেয় সুধীবৃন্দ, যারা আমাকে দেখেননি, শুধু আমার নামটিই জানেন, তারা যা-ই মনে করুন না কেন, যারা আমাকে ভালোভাবে চেনেন তারা জানেন যে, আমি কি পরিমাণ মূর্খ। আধুনিক সমাজে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র না থাকলে অথবা ইংরেজি ভাষা না জানলে সে শিক্ষিত বলে বিবেচিত হয় না। অথচ এ দুটোর একটিও আমার দখলে নেই।

    বর্তমান জগতে উচ্চতর জ্ঞান লাভের মাধ্যম হচ্ছে ইংরেজি ভাষা। আর তাই আমার অনায়ত্ত। একাধিক ভাষা বিশেষত ইংরেজি না জানায় আমি পঙ্গু। আর পঙ্গু ব্যক্তির পক্ষে কায়ক্লেশে সমতল ভূমিতে চলা সম্ভব হলেও যেমন পর্বতে আরোহণ করা সম্ভব নয়, তেমন ইংরেজি ভাষা না জানার ফলে আমি উচ্চতর জ্ঞান লাভ হতে আছি বঞ্চিত। আমার মতো পঙ্গু বাঙালী এ দেশে যারা আছেন, তারা কামনা করেন এবং আমিও কামনা করি যে, বাংলা ভাষা আরও সমৃদ্ধ হোক, যাতে আমরা ইংরেজি ভাষার সাহায্য ছাড়া শুধু বাংলা ভাষার মাধ্যমেই উচ্চতর জ্ঞান লাভের সুযোগপ্রাপ্ত হই। পরম আনন্দ ও আশার বিষয় এই যে, বাংলা ভাষার দৈন্য দূর করার উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যেই বাংলা একাডেমী সচেষ্ট হয়েছে এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, অনুবাদ ও গবেষণামূলক কিছুসংখ্যক পুস্তক বাংলা ভাষায় প্রকাশের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের অভাবের। তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তবে দেশের সুধী ও বুদ্ধিজীবী সমাজ এ বিষয়ে একাডেমীর সাথে একাত্ম হলে বাংলা ভাষা তার দীনতা ঘুচিয়ে অচিরেই স্বাবলম্বী হতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, বাংলা একাডেমীর সংশ্লিষ্ট মনীষীগণ ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! মামুলি আলোচনা দ্বারা আমি আপনাদের আর অধিক কষ্ট দিতে চাই না। আপনারা আপনাদের অমূল্য সময় নষ্ট করে এবং কষ্ট স্বীকার করে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন, এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, এবং আপনাদের সাদর সংবর্ধনা সানন্দে গ্রহণপূর্বক আমি আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক। বাংলাদেশ অমর হোক।

    ১. ১. ১৩৯২

    .

    আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অনুষ্ঠানে সম্পাদকের ভাষণ ও কার্যবিবরণী

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, শ্রদ্ধেয় সদস্যবৃন্দ ও অতিথিবৃন্দ! আজ আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরীর ষষ্ঠ বার্ষিক অধিবেশন এবং আমার ছিয়াশিতম জন্মদিন। স্বয়ং ছিয়াশিতম জন্মদিন উদযাপনকারী লোকের সংখ্যা খুব অল্প। তাই আমি সেই অল্প সংখ্যার দলে আছি বলে নিজেকে পরম সৌভাগ্যবান মনে করছি।

    আজকের এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুইটি অনুষ্ঠানের সমবায়ে। বিগত ১৯৮০ সাল থেকে ৮৪ সাল পর্যন্ত লাইব্রেরীর পাচঁটি বার্ষিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এই দিনটি আমার জন্মদিন হওয়া সত্ত্বেও কোনো অধিবেশনেই আমার জীবন আখ্যান সম্বন্ধে কোনো আলোচনাই করি নি এবং অন্য কেউও করেননি। আমি মনে করি যে, আজকের এই অধিবেশনটি আমার জীবনের অন্তিম অধিবেশন। তাই আজ লাইব্রেরী প্রসঙ্গের পূর্বে আমার জীবন আখ্যান সম্বন্ধে আপনাদের কাছে কিছু নিবেদন করতে চাই এবং সেজন্য মাননীয় সভাপতি সাহেবের অনুমতি প্রার্থনা করছি।

    জন্ম আমার ৩রা পৌষ ১৩০৭ সালে, লামচরি গ্রামের এই বাড়িতেই। শৈশবে আমার বাবা মারা যান। তখন স্বামীহারা ও বিত্তহারা মা আমাকে নিয়ে ভাসতে থাকেন অকূল দুঃখের সাগরে।

    তখন এই গ্রামে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো না। এ গ্রামের এক মুন্সি সাহেবের নিকট স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ ও বানান-ফলা শিক্ষা করি ১৩২০ থেকে ২১ সাল পর্যন্ত, এতিম ছেলে বলে অবৈতনিকভাবে। অতঃপর মুন্সি সাহেব মক্তবটি বন্ধ করে দিলে পয়সা ও পাঠশালার অভাবে কোথাও পড়ালেখার সুযোগ না পেয়ে কৃষিকাজ শুরু করি ১৩২৬ সালে।

    লেখাপড়ার প্রতি আমার অত্যন্ত আগ্রহ ছিলো। কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না। তাই পড়ালেখার চর্চা করতে থাকি গ্রাম্য পুঁথিপাঠকদের সাথে পুঁথি পড়ে পড়ে। এভাবে পুঁথি পড়ে বাংলা পড়ার কিছুটা যোগ্যতা জন্মালো। এ সময়ে আমাদের গ্রামের দুইজন যুবক বরিশাল টাউন ও জিলা স্কুলে পড়তেন, যাদের একজন, ফজলুর রহমান, এখানেই আছেন। তাদের ঘরে ফেলে রাখা পাঠ্যপুস্তকগুলো পড়ার সুযোগ পাই ১৩৪৩ সন পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ১৩৩৯ সালে আমার মা মারা গেলে একটি মর্মান্তিক ঘটনার জন্য লেখাপড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পায় ও মানসিক বৃত্তির আমূল পরিবর্তন হয়। আর এ কারণেই বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরীর সদস্য হয়ে সেখানকার ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদি পুস্তক অধ্যয়ন করতে থাকি ১৩৪৪ সাল থেকে। লাইব্রেরীর সদস্য হতে হয়েছে আমাকে বেনামিতে। কেননা পৌরসভার বাইরের কোনো লোককে সদস্য করার নিয়ম তখন ছিলো না। জানিনা আজও সে নিয়ম বহাল আছে কিনা। এ ছাড়া হিন্দু ধর্মতত্ত্ব জানার আগ্রহ নিয়ে বরিশাল শংকর লাইব্রেরীর পুস্তকাদি এবং ইহুদি ও খ্রীস্টান ধর্ম জানার আগ্রহ নিয়ে পড়তে থাকি ব্যাপ্টিস্ট মিশন লাইব্রেরীর বই। আরও সৌভাগ্য হয়েছিল বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরীর পুস্তকাদি অধ্যয়নের, শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদির সাহেবের মাধ্যমে।

    উপরোক্তরূপ বিভিন্ন লাইব্রেরীর পুস্তকাদি অধ্যয়নে কিঞ্চিৎ ক্ষমতা অর্জিত হলে ‘সত্যের সন্ধান’ নামক একখানা ক্ষুদ্র পুস্তক রচনা করি ১৩৫৮ সালে আমার মৃত মায়ের জন্য শোকসন্তপ্ত হৃদয় নিয়ে। এর পরে আমার লিখিত পুস্তক ‘সৃষ্টি রহস্য’, ‘স্মরণিকা’ ও ‘অনুমান। আমার লিখিত পুস্তকাদি পাঠ করলে সুধীসমাজ বিশেষভাবে আমার আত্মিক ও সাত্ত্বিক পরিচয় পাবেন বলে মনে করি। এছাড়া আমার কার্যাবলী বিশ্লেষণ করলেও আপনারা আমার কিছু পরিচয় পাবেন। এ দেশে আমি কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। নিজে কিছুই না বুঝে অন্যের দেখাদেখি কাজ করা পছন্দ করি না। সত্যের সন্ধান করা আমার জীবনের সাধনা, মানবকল্যাণ আমার ব্রত। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারকে ঘৃণা করি পুরীষের মতো, আদর করি মানবতার। আমি ঘাটে বাধা নৌকায় ঘুমোতে চাই না, চাই সজাগ থেকে চলতি নৌকায় ভ্রমণ করতে। অভিনবত্বের প্রশংসা করি, নিন্দা করি স্থবিরতার। কৃষিকাজে জীবন কাটিয়েছি। তাই কৃষকরা আমার বন্ধু। কিন্তু গম, গোল.আলু ও ধান চাষীরা আমার বন্ধু বটে, গাঁজার চাষীরা নয়।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব ও উপস্থিত সুধীবৃন্দ! আমার মূল্যহীন ব্যক্তিগত আলোচনার দ্বারা আপনাদের অধিক কষ্ট দিতে চাইনা। এখন আমি লাইব্রেরী সম্বন্ধে সামান্য কিছু আলোচনা করবো। এ বছর লাইব্রেরীর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো বিষয় নেই। তবে সাধারণভাবে যেটুকু আছে তা সংক্ষেপে বলছি।

    ক, আয় ও ব্যয়ের হিসাব

    আয়

    ১. গত বছরের মজুত        টাকা ১,০১৮.০০

    ২. অনুদানপ্রাপ্তি                    ৩,২০০.০০

    ৩. চাঁদা আদায়                     ১৯.০০

    ৪. আমানত জমা                  ১,১৩৫.০০

    ৫. ব্যাংক থেকে আদায়            ৪,৭৫০.০০

    মোট টাকা ১০,১২২.০০

    ব্যয়

    ১. বৃত্তি প্রদান (১৯৮৪)         টাকা ৮০০.০০

    ২. অনুষ্ঠান ও অতিথিসেবা           ১,৯৮২.৩৫

    ৩. সেরেস্তা খরচ                      ২৮.০০

    ৪. বই খরিদ                          ৩৯.০০

    ৫. পুস্তক প্রকাশ                      ৪১০.০০

    ৬. লাইব্রেরীর ফুলবাগান পরিচর্যা    ১৫০.০০

    ৭. লাইব্রেরী উন্নয়ন                  ৬৪৫.০০

    ৮. যাতায়াত                        ৫৬২.৭০

    ৯. আমানত শেষ                   ১,১৩৫.০০

    ১০. ব্যাংক মজুত                   ৩,২০০.০০

    ১১. ভিক্ষাদান (১৯৮৫)              ১০০.০০

    ১২. বিবিধ                           ৬০০.০০

    ১৩. পরিচালক ও পরিচারক ভাতা(১৯৮৫)  ৪৫০.০০

    মোট টাকা ১০,১০২.০৫

    মোট আয়  টাকা    ১০,১২২.০০

    মোট ব্যয়            ১০,১০২.০৫

    মজুত       টাকা    ১৯.৯৫

    খ. পুস্তকাদির সংখ্যা

    ১. বিজ্ঞান        ৮৮

    ২. দর্শন          ২৪

    ৩. ধর্ম           ৪৩

    ৪. গণিত        ১৩

    ৫. ভূগোল       ১২

    ৬. ইতিহাস     ৪৫

    ৭. গল্প          ৩৭

    ৮. উপন্যাস    ১৩২

    ৯. নাটক        ১১

    ১০. জীবনী     ৩৫

    ১১. ভ্রমণ       ১৩

    ১২. প্রবন্ধ      ২৩

    ১৩. অভিধান   ৫

    ১৪. ব্যাকরণ    ৭

    ১৫ সাহিত্য     ৫৩

    ১৬. আইন      ১৪

    ১৭. চিকিৎসা     ৯

    ১৮. ইংরেজি     ৬৮

    ১৯. রাজনীতি   ৮২

    ২০. কৃষি       ৪৮

    ২১. বিবিধ     ২৯০

    বইয়ের মোট সংখ্যা ১০৫২

    গ. পাঠকবৃন্দ

    এ লাইব্রেরীটির সাধারণ পাঠকের সংখ্যা নগণ্য। লাইব্রেরীর নিয়মমতে কোনো ছাত্র-ছাত্রী পাঠকের নিকট হতে চাদা আদায় করা হয় না। বয়স্ক পাঠকদের নিকট হতে মাসিক চাঁদা আদায় করা হয়। তবে বর্তমানে বয়স্ক পাঠক নেই বললেই চলে। নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রী পাঠকের সংখ্যা ২৫ জন এবং এ বছর তাদের পঠিত বইয়ের সংখ্যা ২৬০।

    ঘ, লাইব্রেরীর উন্নয়ন

    এ বছর লাইব্রেরীর উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৪৫ টাকা। কিন্তু উন্নয়ন কাজ হয় নি মোটেই। ১৯৭৯ সালে যখন লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করেছি, তখন আমাকে অর্থের সংস্থান করতে হয়েছে ৩ কানি চাষের জমি বিক্রি করে। তাই অর্থাভাবে তখনকার পরিকল্পনা মোতাবেক লাইব্রেরীটি নির্মাণ করতে পারিনি। নিরক্ষর বয়স্কদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে লাইব্রেরী সংলগ্ন একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা ছিলো আমার প্রথম থেকেই। সে কথাটি আমার সম্পাদিত ট্রাস্টনামা ও ‘স্মরণিকা’-য় উল্লিখিত আছে। কিন্তু অর্থাভাবে তা আজও কার্যকর করতে পারি নি। এবং জানিনা আমার মুমূর্ষ জীবনে স্বচক্ষে দেখে যেতে পারবো কিনা। তাই সে আশাটি পূরণের জন্য ভরসা রেখেছিলাম সরকারি অনুদানের উপর এবং সেজন্য প্রথম আবেদন জানিয়েছিলাম স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাননীয় সভাপতি সাহেবের নিকট। উক্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সভাপতি সাহেব লাইব্রেরীর বৃদ্ধি ও বারান্দা নির্মাণের জন্য ২০,০০০.০০ টাকা মঞ্জুর করেন এবং তা বরিশাল সদর উপজেলা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করেন। উক্ত অনুমোদনের বিষয়টি মাননীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে জানতে পেয়ে ও তার আদেশমতে লাইব্রেরীর বর্ধিত ভিত্তি প্রস্তুত করি ও প্রয়োজনীয় বালি খরিদ করি। এতে প্রায় ১,০০০.০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, উক্ত বিশ হাজার টাকা আজও পাচ্ছি না বলে লাইব্রেরীর বৃদ্ধির কাজ করা সম্ভব হয় নি। পক্ষান্তরে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১,০০০.০০ টাকা।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, ইউ. এন. ও. সাহেব ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে সবিনয় নিবেদন এই যে, লাইব্রেরীটির বৃদ্ধির আবশ্যকতা স্বচক্ষে দেখে ও তার গুরুত্ব অনুধাবনপূর্বক উক্ত কাজটি সমাধা করার প্রতি শুভদৃষ্টি কামনা করছি।

    মাননীয় সভাপতি সাহেব, সদস্যবৃন্দ ও সুধী অতিথিবৃন্দ! লামচরির মতো গণ্ডগ্রামে অবস্থিত এ ক্ষুদ্র লাইব্রেরীটির বার্ষিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আপনারা যে মূল্যবান সময় নষ্ট করেছেন, সেজন্য লাইব্রেরী ও লামচরিবাসীদের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে আমার বক্তব্য শেষ করছি। উপস্থিত কাঙ্গল-কাঙ্গালীদের ভিক্ষা প্রদানের জন্য মাননীয় সভাপতি সাহেবকে সবিনয় অনুরোধ জানাচ্ছি।

    ধন্যবাদ, শুভ হোক।
    ৩. ৯. ১৩৯২

    ⤶
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআমার শিল্পী জীবনের কথা – আব্বাসউদ্দীন আহমদ
    Next Article আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র ৩

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    তারপর কী হল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 17, 2025
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    শর্ম্মিষ্ঠা নাটক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    November 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }