১৬. কাবীল ও হাবীলের কাহিনী
কাবীল ও হাবীলের কাহিনী
আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ
(۞ وَٱتۡلُ عَلَیۡهِمۡ نَبَأَ ٱبۡنَیۡ ءَادَمَ بِٱلۡحَقِّ إِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانࣰا فَتُقُبِّلَ مِنۡ أَحَدِهِمَا وَلَمۡ یُتَقَبَّلۡ مِنَ ٱلۡـَٔاخَرِ قَالَ لَأَقۡتُلَنَّكَۖ قَالَ إِنَّمَا یَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِینَ لَىِٕنۢ بَسَطتَ إِلَیَّ یَدَكَ لِتَقۡتُلَنِی مَاۤ أَنَا۠ بِبَاسِطࣲ یَدِیَ إِلَیۡكَ لِأَقۡتُلَكَۖ إِنِّیۤ أَخَافُ ٱللَّهَ رَبَّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ إِنِّیۤ أُرِیدُ أَن تَبُوۤأَ بِإِثۡمِی وَإِثۡمِكَ فَتَكُونَ مِنۡ أَصۡحَـٰبِ ٱلنَّارِۚ وَذَ ٰلِكَ جَزَ ٰۤؤُا۟ ٱلظَّـٰلِمِینَ فَطَوَّعَتۡ لَهُۥ نَفۡسُهُۥ قَتۡلَ أَخِیهِ فَقَتَلَهُۥ فَأَصۡبَحَ مِنَ ٱلۡخَـٰسِرِینَ فَبَعَثَ ٱللَّهُ غُرَابࣰا یَبۡحَثُ فِی ٱلۡأَرۡضِ لِیُرِیَهُۥ كَیۡفَ یُوَ ٰرِی سَوۡءَةَ أَخِیهِۚ قَالَ یَـٰوَیۡلَتَىٰۤ أَعَجَزۡتُ أَنۡ أَكُونَ مِثۡلَ هَـٰذَا ٱلۡغُرَابِ فَأُوَ ٰرِیَ سَوۡءَةَ أَخِیۖ فَأَصۡبَحَ مِنَ ٱلنَّـٰدِمِینَ)[Surat Al-Ma’idah 27 – 31]
অর্থাৎ, আদমের দু’পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও, যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল তখন একজনের কুরবানী ককূল হলো, অন্য অনের ককূল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব-ই। অপরজন বলল, আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন।
আমাকে হত্যা করার জন্য আমার প্রতি তুমি হাত বাড়ালেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত বাড়াব না। আমি তো জগতসমূহের রব আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করে জাহান্নামী হও এবং এটা জালিমদের কর্মফল। তারপর তার প্রবৃত্তি তাকে তার ভাইকে হত্যায় প্ররোচিত করল এবং সে তাকে হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো।
তারপর আল্লাহ্ তা’আলা একটি কাক পাঠালেন যে তার ভাই-এর লাশ কিভাবে গোপন করা যায় তা দেখাবার জন্য মাটি খুঁড়তে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতও হতে পারলাম না যাতে আমার ভাই-এর লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। (৫: ২৭-৩১)
তাফসীর গ্রন্থে আমরা সূরা মায়িদার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এ কাহিনী সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা করেছি। এখানে শুধু পূর্বসূরি ইমামগণ এ বিষয়ে যা বলেছেন তার সারাংশ উল্লেখ করব।
সুদ্দী (র) ইবন আব্বাস ও ইবন মাসউদ (রা)-সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আদম (আ) এক গর্ভের পুত্র সন্তানের সঙ্গে অন্য গর্ভের কন্যা সন্তানকে বিয়ে দিতেন। হাবীল সে মতে কাবীলের যমজ বোনকে বিয়ে করতে মনস্থ করেন। কাবীল বয়সে হাবীলের চাইতে বড় ছিল। আর তার বোন ছিল অত্যধিক রূপসী।৭৫ (মূল আরবীতে সম্ভবত ভুলবশত কাবীল স্থলে হাবীল ছাপা হয়েছে।— সম্পাদকদ্বয়)
তাই কাবীল ভাইকে না দিয়ে নিজেই আপন বোনকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাইল এবং আদম (আ) হাবীলের সাথে তাকে বিবাহ দেয়ার আদেশ করলে সে তা অগ্রাহ্য করল। ফলে আদম (আ) তাদের দু’জনকে কুরবানী করার আদেশ দিয়ে নিজে হজ্জ করার জন্য মক্কায় চলে যান। যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি আসমানসমূহকে তাঁর সন্তানদের দেখাশুনার দায়িত্ব দিতে চান কিন্তু তারা তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। যমীন এবং পাহাড় পর্বতসমূহকে তা নিতে বললে তারাও অস্বীকৃতি জানায়। অবশেষে কাবীল এ দায়িত্বভার গ্রহণ করে।
তারপর আদম (আ) চলে গেলে তারা তাদের কুরবানী করে। হাবীল একটি মোটা-তাজা বকরী কুরবানী করেন। তার অনেক বকরী ছিল। আর কাবীল কুরবানী দেয় নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের এক বোঝা শস্য।
তারপর আগুন হাবীলের কুরবানী গ্রাস করে নেয় আর কাবীলের কুরবানী অগ্রাহ্য করে। এতে কাবীল ক্ষেপে গিয়ে বলল, তোমাকে আমি হত্যা করেই ছাড়ব। যাতে করে তুমি আমার বোনকে বিয়ে করতে না পার। উত্তরে হাবীল বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা কেবল মুত্তাকীদের কুরবানী-ই ককূল করে থাকেন।
ইবন আব্বাস (রা) থেকে আরো একাধিক সূত্রে এবং আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) থেকেও এটা বর্ণিত আছে। আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! তাদের দু’জনের মধ্যে নিহত লোকটি-ই অধিকতর শক্তিশালী ছিল। কিন্তু নির্দোষ থাকার প্রবণতা তাকে হত্যাকারীর প্রতি হাত বাড়ানো থেকে বিরত রাখে।
আবু জাফর আল-বাকির (র) বলেন, আদম (আ) হাবীল ও কাবীলের কুরবানী করার এবং হাবীলের কুরবানী কবূল হওয়ার আর কাবীলের কুরবানী কবূল না হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তখন কাবীল বলল, ওর জন্য আপনি দু’আ করেছিলেন বিধায় তার কুরবানী কবূল হয়েছে আর আমার জন্য আপনি দু’আই করেননি। সাথে সাথে সে ভাইকে হুমকি প্রদান করে।
এর কিছুদিন পর একরাতে হাবীল পশুপাল নিয়ে বাড়ি ফিরতে বিলম্ব করেন। ফলে আদম (আ) তার ভাই কাবীলকে বললেন, দেখতো ওর আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন? কাবীল গিয়ে হাবীলকে চারণ ভূমিতে দেখতে পেয়ে তাকে বলল, তোমার কুরবানী কবূল হলো আর আমারটা হয়নি। হাবীল বললেন, আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের কুরবানী-ই কবূল করে থাকেন। এ কথা শুনে চটে গিয়ে কাবীল সাথে থাকা একটি লোহার টুকরো দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে।
কেউ কেউ বলেন, কাবীল ঘুমন্ত অবস্থায় হাবীলকে একটি পাথর খণ্ড নিক্ষেপে তাঁর মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। কেউ কেউ বলেন, কাবীল সজোরে হাবীলের গলা টিপে ধরে এবং হিংস্র পশুর ন্যায় তাঁকে কামড় দেয়াতেই তিনি মারা যান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
(لَىِٕنۢ بَسَطتَ إِلَیَّ یَدَكَ لِتَقۡتُلَنِی مَاۤ أَنَا۠ بِبَاسِطࣲ یَدِیَ إِلَیۡكَ لِأَقۡتُلَكَۖ إِنِّیۤ أَخَافُ ٱللَّهَ رَبَّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ)
[Surat Al-Ma’idah 28]
অর্থাৎ, আমাকে খুন করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত বাড়ালেও তোমাকে খুন করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত বাড়াবার নই। (৫: ২৮)
কাবীলের হত্যার হুমকির জবাবে হাবীলের এ বক্তব্য তাঁর উত্তম চরিত্র, খোদাভীতি এবং ভাই তার ক্ষতি সাধন করার যে সংকল্প ব্যক্ত করেছিল তার প্রতিশোধ নেয়া থেকে তাঁর বিরত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ প্রসঙ্গেই সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ তরবারি উঁচিয়ে দু’ মুসলিম মুখোমুখি হলে হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি দু’জনেই জাহান্নামে যাবে। একথা শুনে সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারী জাহান্নামে যাওয়ার কারণটা তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি জাহান্নামে যাবে তার কারণ? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ এর কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যার জন্য লালায়িত ছিল।
(إِنِّیۤ أُرِیدُ أَن تَبُوۤأَ بِإِثۡمِی وَإِثۡمِكَ فَتَكُونَ مِنۡ أَصۡحَـٰبِ ٱلنَّارِۚ وَذَ ٰلِكَ جَزَ ٰۤؤُا۟ ٱلظَّـٰلِمِینَ)
[Surat Al-Ma’idah 29]
অর্থাৎ, আমি তোমার সাথে লড়াই করা পরিহার করতে চাই। যদিও আমি তোমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। কারণ আমি এ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি যে, তুমি আমার ও তোমার পাপের ভার বহন করবে। অর্থাৎ তোমার পূর্ববর্তী পাপসমূহের সাথে আমাকে হত্যা করার পাপের বোঝাও তুমি বহন করবে, আমি এটাই চাই। মুজাহিদ সুদ্দী ও ইবন জারীর (র) প্রমুখ আলোচ্য আয়াতের এ অর্থ করেছেন। এ আয়াতের উদ্দেশ্য এটা নয় যে, নিছক হত্যার কারণে নিহত ব্যক্তির যাবতীয় পাপ হত্যাকারীর ঘাড়ে গিয়ে চাপে, যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন। কেননা, ইবন জারীর এ মতের বিপরীত মতকে সর্ববাদী সম্মত মত বলে বর্ণনা করেছেন।
অজ্ঞাত নামা কেউ কেউ এ মর্মে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির যিম্মায় কোন পাপ অবশিষ্ট রাখে না। কিন্তু এর কোন ভিত্তি নেই এবং হাদীসের কোন কিতাবে সহীহ; হাসান বা যয়ীফ কোন সনদে এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে কারো কারো ব্যাপারে কিয়ামতের দিন এমনটি ঘটবে যে, নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর নিকট ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। কিন্তু হত্যাকারীর নেক আমলসমূহ তা পূরণ করতে পারবে না। ফলে নিহত ব্যক্তির পাপকর্ম হত্যাকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে। যেমনটি সর্বপ্রকার অত্যাচার-অবিচারের ব্যাপারে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর হত্যা হলো, সব জুলুমের বড় জুলুম। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তাফসীরে আমরা এসব আলোচনা লিপিবব্ধ করেছি। সকল প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য।
ইমাম আহমদ, আবু দাউদ ও তিরমিযী (র) সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি উছমান ইব্ন আফফান (রা)-এর গোলযোগের সময় বলেছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “অদূর ভবিষ্যতে এমন একটি গোলযোগ হবে যে, সে সময়ে বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চাইতে, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি চলন্ত ব্যক্তির চাইতে এবং চলন্ত ব্যক্তি ধাবমান ব্যক্তির চাইতে উত্তম হবে।” এ কথা শুনে সা’দ ইবন আবু ওয়াক্কাস (রা) বললেন, আচ্ছা, কেউ যদি আমার ঘরে প্রবেশ করে আমাকে হত্যা করার জন্য হাত বাড়ায় তখন আমি কি করব? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ “তখন তুমি আদমের পুত্রের ন্যায় হয়ো।” হুযায়ফা ইবন য়ামান (রা) থেকে ইবন মারদুয়েহ মার সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “তখন তুমি আদমের দু’পুত্রের উত্তমজনের ন্যায় হয়ো।” মুসলিম এবং একমাত্র নাসাঈ ব্যতীত সুনান সংকলকগণ আবু যর (রা) থেকে এরূপ বর্ণনা করেছেন।
আহমদ (র) বর্ণনা করেন যে, ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তিই নিহত হয় তার খুনের একটি দায় আদমের প্রথম পুত্রের ঘাড়ে চাপে। কারণ সে-ই সর্বপ্রথম হত্যার রেওয়াজ প্রবর্তন করে।”
আবু দাউদ (র) ব্যতীত সিহাহ সিত্তাহর সংকলকগণ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তদ্রুপ আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস (রা) ও ইবরাহীম নাখয়ী (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, তারা এতটুকু বলার পর আরো বলেছেন যে, দামেশকের উত্তর সীমান্তে কাসিউন পাহাড়ের সন্নিকটে একটি বধ্যভূমি আছে বলে কথিত আছে। এ স্থানটিকে মাগারাতুদ দাম বলা হয়ে থাকে। কেননা সেখানেই কাবীল তার ভাই হাবীলকে খুন করেছিল বলে কথিত আছে। এ তথ্যটি আহলে কিতাবদের থেকে সংগৃহীত। তাই এর যথার্থতা সম্পর্কে আল্লাহ-ই ভালো জানেন।
হাফিজ ইবন আসাকির (র) তাঁর গ্রন্থে আহমদ ইবন কাসীর (র)-এর জীবনী প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি একজন পুণ্যবান লোক ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর (রা), উমর (রা) ও হাবীলকে স্বপ্ন দেখেন। তিনি হাবীলকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে, এখানেই তাঁর রক্তপাত করা হয়েছে কি না। তিনি শপথ করে তা স্বীকার করেন এবং বলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকট দু’আ করেছিলেন, যেন তিনি এ স্থানটিকে সব দু’আ কবুল হওয়ার স্থান করে দেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর দুআ কবূল করেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা) এ ব্যাপারে তাকে সমর্থন দান করে বলেনঃ আবু বকর (রা) ও উমর (রা) প্রতি বৃহস্পতিবার এ স্থানটির যিয়ারত করেন। এটি একটি স্বপ্ন মাত্র। ঘটনাটি সত্যি সত্যি আহমদ ইবন কাসীর-এর হলেও এর উপর শরয়ী বিধান কার্যকর হবে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
(فَبَعَثَ ٱللَّهُ غُرَابࣰا یَبۡحَثُ فِی ٱلۡأَرۡضِ لِیُرِیَهُۥ كَیۡفَ یُوَ ٰرِی سَوۡءَةَ أَخِیهِۚ قَالَ یَـٰوَیۡلَتَىٰۤ أَعَجَزۡتُ أَنۡ أَكُونَ مِثۡلَ هَـٰذَا ٱلۡغُرَابِ فَأُوَ ٰرِیَ سَوۡءَةَ أَخِیۖ فَأَصۡبَحَ مِنَ ٱلنَّـٰدِمِینَ)
[Surat Al-Ma’idah 31]
অর্থাৎ, তারপর আল্লাহ এক কাক পাঠালেন, যে তার ভাই-এর শব কিভাবে গোপন করা যায় তা দেখাবার জন্য মাটি খনন করতে লাগল। সে বলল, হায়! আমি কি এ কাকের মতও হতে পারলাম না, যাতে আমার ভাইয়ের লাশ গোপন করতে পারি? তারপর সে অনুতপ্ত হলো। (৫: ৩১)
কেউ কেউ উল্লেখ করেন যে, কাবীল হাবীলকে হত্যা করে এক বছর পর্যন্ত; অন্যদের মতে একশত বছর পর্যন্ত তাকে নিজের পিঠে করে রাখে। এরপর আল্লাহ্ তা’আলা দু’টি কাক প্রেরণ করেন। সুদ্দী (র) সনদসহ কতিপয় সাহাবীর বরাতে বর্ণনা করেন যে, দু’ভাই (ভাই সম্পর্কীয় দু’টি কাক) পরস্পর ঝগড়া করে একজন অপরজনকে হত্যা করে ফেলে। তারপর মাটি খুঁড়ে তাকে দাফন করে রাখে। তখন কাবীল এ দৃশ্য দেখে বলল, يأ ويلتي أعجزت…… এরপর সে কাকের ন্যায় হাবীলকে দাফন করে।
ইতিহাস ও সীরাত বিশারদগণ বলেন যে, আদম (আ) তাঁর পুত্র হাবীলের জন্য অত্যন্ত শোকাহত হয়ে পড়েন এবং এ বিষয়ে কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করেন। ইবন জারীর (র) ইবন হুমায়দ থেকে তা উল্লেখ করেন। তাহলোঃ
تغيرت البلاد ومن عليها – فوجه الأرض مغبر قبح
تغير كل ذي لون وطعم – وقل بشاشة الوجه المليح
অর্থাৎ, জনপদ ও জনগণ সব উলট-পালট হয়ে গেছে। ফলে পৃথিবীর চেহারা এখন ধূলি-ধূসর ও মলিন রূপ ধারণ করেছে। কোন কিছুরই রং-রূপ-স্বাদ-গন্ধ এখন আর আগের মত নেই। লাবণ্যময় চেহারার উজ্জ্বলতাও আগের চেয়ে কমে গেছে।
এর জবাবে আদম (আ)-এর উদ্দেশে বলা হলোঃ
ابا هابيل قد قتلا جميعا – وصار الى كالميت الذبح
وجاء بشرة قد كان منها – علي خوف فجماء بها يصبح
অর্থাৎ, হে হাবীলের পিতা! ওরা দুজনই নিহত হয়েছে এবং বেঁচে থাকা লোকটিও যবাইকৃত মৃতের ন্যায় হয়ে গেছে। সে এমন একটি অপকর্ম করলো যে, তার ফলে সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আর্তনাদ করতে করতে ছুটতে লাগলো।
এ পংক্তিগুলোও সন্দেহমুক্ত নয়। এমনও হতে পারে যে, আদম (আ) পুত্রশোকে নিজের ভাষায় কোন কথা বলেছিলেন, পরবর্তীতে কেউ তা এভাবে কবিতায় রূপ দেয়। এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। আল্লাহই ভালো জানেন।
মুজাহিদ (র) উল্লেখ করেন যে, কাবীল যেদিন তার ভাইকে হত্যা করেছিল সেদিনই নগদ নগদ তাকে এর শাস্তি প্রদান করা হয়। মাতা-পিতার অবাধ্যতা, ভাইয়ের প্রতি হিংসা এবং পাপের শাস্তিস্বরূপ তার পায়ের গোছাকে উরুর সাথে ঝুলিয়ে এবং মুখমণ্ডলকে সূর্যমুখী করে রাখা হয়েছিল। হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ পরকালের জন্য শাস্তি সঞ্চিত রাখার সাথে সাথে আল্লাহ্ তা’আলা দুনিয়াতেও তার নগদ শাস্তি প্রদান করেন। শাসকের বিরুদ্ধাচরণ ও আত্মীয়তা ছিন্ন করার মত এমন জঘন্য অপরাধ আর নেই।
আহলে কিতাবদের হাতে রক্ষিত তথাকথিত তাওরাতে আমি দেখেছি যে, আল্লাহ্ তা’আলা কাবীলকে অবকাশ দিয়েছিলেন। সে এডেনের পূর্বদিকে অবস্থিত নূদ অঞ্চলের কিন্নীন নামক স্থানে কিছুকাল বসবাস করেছিল এবং খানূখ নামক তার একটি সন্তানও জন্ম হয়েছিল। তারপর খানূকের ঔরসে উনদুর, উনদুরের ঔরসে মাহ্ওয়াবীল, মাহওয়াবীলের ঔরসে মুতাওয়াশীল এবং মুতাওয়াশীলের ঔরসে লামাকের জন্ম হয়। এই লামাক দু মহিলাকে বিবাহ করে। একজন হলো আদা আর অপর জন সালা। আদা ইবিল নামক একটি সন্তান প্রসব করেন। এ ইবিলই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি গম্বুজাকৃতির তাঁবুতে বসবাস করেন এবং সম্পদ আহরণ করেন। ঐ আদার গর্ভে নওবিল নামক আরেকটি সন্তান জন্ম হয় এবং ঐ ব্যক্তিই সর্বপ্রথম বাদ্যযন্ত্র এবং করতাল ব্যবহার করে।
আর সালা তুবলাকীন নামক একটি সন্তান প্রসব করেন। এ তুবলাকীনই সর্বপ্রথম তামা ও লোহা ব্যবহার করেন। সালা একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন, তার নাম ছিল নামা।
কথিত তাওরাতে এও আছে যে, আদম (আ) একদা স্ত্রী সহবাস করলে তার একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। স্ত্রী তার নাম শীছ রেখে বললেন, কাবীল কর্তৃক নিহত হাবীলের পরিবর্তে আমাকে এ সন্তান দান করা হয়েছে বলে এর এ নাম রাখা হলো। এ শীছের ঔরসে আনূশ-এর জন্ম হয়।
কথিত আছে যে, শীছ-এর যেদিন জন্ম হয় সেদিন আদম (আ)-এর বয়স ছিল একশ ত্রিশ বছর। এরপর তিনি আরো আটশ বছর বেঁচেছিলেন। আনুশের জন্মের দিন শীছ-এর বয়স ছিল একশ পঁয়ষট্টি বছর। এরপর তিনি আরো আটশ সাত বছর বেঁচেছিলেন। আনুশ ছাড়া তাঁর আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ে ভূমিষ্ঠ হন। আনুশের বয়স যখন নব্বই বছর, তখন তাঁর পুত্র কীনান-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো আটশ’ পনের বছর বেঁচেছিলেন। এ সময়ে তাঁর আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ের জন্ম হয়। তারপর যখন কীনানের বয়স সত্তর বছরে উপনীত হয়, তখন তাঁর ঔরসে মাহলাইল-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো আটশ চল্লিশ বছর আয়ু পান। এ সময়ে তার আরো কিছু ছেলে-মেয়ের জন্ম হয়। তারপর মাহলাইল পঁয়ষট্টি বছর বয়সে উপনীত হলে তার পুত্র য়ারদ-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো আটশ ত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন। এ সময়ে তাঁর আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ে জন্ম হয়। তারপর য়ারদ একশ বাষট্টি বছর বয়সে পৌঁছুলে তাঁর পুত্র খানূখ-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো আটশ’ বছর বেঁচে থাকেন। এ সময়ে তার আরো কয়েকটি পুত্র-কন্যার জন্ম হয়। তারপর খানূখের বয়স পঁয়ষট্টি বছর হলে তার পুত্র মুতাওয়াশশালিহ-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো আটশ’ বছর বেঁচেছিলেন। এ সময়ে তাঁর আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ে জন্ম নেয়। তারপর যখন মুতাওয়াশালিহ একশ সাতাশি বছর বয়সে উপনীত হন, তখন তাঁর পুত্র লামাক-এর জন্ম হয়। এরপর তিনি আরো সাতশ বিরাশি বছর হায়াত পান। এ সময়ে তার আরো কয়েকটি ছেলে-মেয়ে জন্মলাভ করে। লামাক এর বয়স একশ’ বিরাশি বছর হলে তার ঔরসে নূহ (আ)-এর জন্ম হয়। এর পর তিনি আরো পাঁচশ’ পঁচানব্বই বছর বেঁচে থাকেন। এ সময়ে তাঁর আরো করেকটি ছেলে-মেয়ের জন্ম হয়। তারপর নূহ (আ)-এর বয়স পাঁচশ বছর হলে তাঁর ঔরসে সাম, হাম ও আফিছ-এর জন্ম হয়। এ হলো আহলি কিতাবদের গ্রন্থের সুস্পষ্ট বর্ণনা।
উক্ত ঘটনাপঞ্জি আসমানী কিতাবের বর্ণনা কি না এ ব্যাপারে যথাযথ সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। বহু আলিম এ অভিমত ব্যক্ত করে এ ব্যাপারে আহলি কিতাবদের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। উক্ত বর্ণনায় যে অবিবেচনা প্রসূত অতিকথন রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। অনেকে এ বর্ণনাটিতে ব্যাখ্যাস্বরূপ অনেক সংযোজন করেছেন এবং তাতে যথেষ্ট ভুল রয়েছে। যথাস্থানে আমি বিষয়টি আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ্।
ইমাম আবু জাফর ইবন জাবীর তার ইতিহাস গ্রন্থে কতিপয় আহলি কিতাবের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, আদম (আ)-এর ঔরসে হাওয়া (আ)-এর বিশ গর্ভে চল্লিশটি সন্তান প্রসব করেন। ইবন ইসহাক এ বক্তব্য দিয়ে তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
কেউ কেউ বলেন, হাওয়া (আ) প্রতি গর্ভে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান করে একশ’ বিশ জোড়া সন্তানের জন্ম দেন। এদের সর্বপ্রথম হলো, কাবীল ও তার বোন কালীমা আর সর্বশেষ হলো আবদুল মুগীছ ও তার বোন উম্মুল মুগীছ। এরপর মানুষ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং সংখ্যায় তারা অনেক হয়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে বিস্তার লাভ করে।
যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
( یَـٰۤأَیُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِی خَلَقَكُم مِّن نَّفۡسࣲ وَ ٰحِدَةࣲ وَخَلَقَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا وَبَثَّ مِنۡهُمَا رِجَالࣰا كَثِیرࣰا وَنِسَاۤءࣰۚ)[Surat An-Nisa’ 1]
অর্থাৎ, হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি হতেই সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তার থেকে তার সংগিনী সৃষ্টি করেন এবং যিনি তাদের দু’জন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। (৪: ১)
ঐতিহাসিকগণ বলেন, আদম (আ) তাঁর নিজের ঔরসজাত সন্তান এবং তাদের সন্তানদের সংখ্যা চার লক্ষে উপনীত হওয়ার পরই ইন্তিকাল করেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
(۞ هُوَ ٱلَّذِی خَلَقَكُم مِّن نَّفۡسࣲ وَ ٰحِدَةࣲ وَجَعَلَ مِنۡهَا زَوۡجَهَا لِیَسۡكُنَ إِلَیۡهَاۖ فَلَمَّا تَغَشَّىٰهَا حَمَلَتۡ حَمۡلًا خَفِیفࣰا فَمَرَّتۡ بِهِۦۖ فَلَمَّاۤ أَثۡقَلَت دَّعَوَا ٱللَّهَ رَبَّهُمَا لَىِٕنۡ ءَاتَیۡتَنَا صَـٰلِحࣰا لَّنَكُونَنَّ مِنَ ٱلشَّـٰكِرِینَ فَلَمَّاۤ ءَاتَىٰهُمَا صَـٰلِحࣰا جَعَلَا لَهُۥ شُرَكَاۤءَ فِیمَاۤ ءَاتَىٰهُمَاۚ فَتَعَـٰلَى ٱللَّهُ عَمَّا یُشۡرِكُونَ)
[Surat Al-A’raf 189 – 190]
অর্থাৎ, তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তা থেকে তার সংগিনী সৃষ্টি করেন, যাতে সে তার নিকট শান্তি পায়। তারপর যখন সে তার সাথে সংগত হয়, তখন সে এক লঘু গর্ভ ধারণ করে এবং তা নিয়ে সে অনায়াসে চলাফেরা করে; গর্ভ যখন গুরুভার হয় তখন তারা উভয়ে তাদের প্রতিপালক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যদি তুমি আমাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দাও, তবে তো আমরা কৃতজ্ঞ থাকবই। তারপর যখন তিনি তাদেরকে এক পূর্ণাঙ্গ সন্তান দান করেন, তখন তারা তাদেরকে যা দান করা হয় সে সম্বন্ধে আল্লাহর শরীক করে, কিন্তু তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ্ তা অপেক্ষা অনেক উর্ধ্বে। (৭: ১৮৯-১৯০)
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম আদম (আ)-এর কথা উল্লেখ করে পরে জিন তথা মানব জাতির আলোচনায় চলে গেছেন। এর দ্বারা আদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে বুঝানো হয়নি বরং ব্যক্তি উল্লেখের দ্বারা মানব জাতিকে বুঝানোই আসল উদ্দেশ্য।
যেমন এক স্থানে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
(وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا ٱلۡإِنسَـٰنَ مِن سُلَـٰلَةࣲ مِّن طِینࣲ ثُمَّ جَعَلۡنَـٰهُ نُطۡفَةࣰ فِی قَرَارࣲ مَّكِینࣲ)
[Surat Al-Mu’minun 12 – 13]
অর্থাৎ আমি মানুষকে মৃত্তিকার উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে শুক্র বিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ আধারে। (২৩: ১২-১৩)
অন্যত্র আল্লাহ বলেনঃ
(وَلَقَدۡ زَیَّنَّا ٱلسَّمَاۤءَ ٱلدُّنۡیَا بِمَصَـٰبِیحَ وَجَعَلۡنَـٰهَا رُجُومࣰا لِّلشَّیَـٰطِینِۖ )
[Surat Al-Mulk 5]
অর্থাৎ- আমি নিকটবর্তী আকাশকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং তাদেরকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ। (৬৭: ৫)
এখানে একথা সকলেরই জানা যে, শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ সত্যি সত্যি আকাশের নক্ষত্ররাজি নয়। আয়াতে নক্ষত্র শব্দ উল্লেখ করে নক্ষত্র শ্রেণী বুঝানো হয়েছে।
ইমাম আহমদ (র) বর্ণনা করেন যে, সামুরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ হাওয়ার সন্তান জন্মগ্রহণ করে বাঁচত না। একবার তার একটি সন্তান জন্ম হলে ইবলীস তার কাছে গমন করে বলল, তুমি এর নাম আবদুল হারিছ রেখে দাও, তবে সে বাঁচবে। হাওয়া তার নাম আবদুল হারিছ রেখে দিলে সে বেঁচে যায়। তা ছিল শয়তানের ইংগিত ও নির্দেশে।
ইমাম তিরমিযী, ইবন জারীর, ইবন আবূ হাতিম ও ইব্ন মারদুয়েহ (র) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আপন আপন তাফসীরে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর হাকিম বর্ণনা করেছেন তার মুসতাদরাকে। এরা সকলেই আবদুস সামাদ ইবন আবদুল ওয়ারিছ-এর হাদীস থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম বলেছেন, এর সনদ সহীহ। তবে বুখারী ও মুসলিম (র) তা বর্ণনা করেননি। আর তিরমিযী (র) বলেছেন, হাদীসটি হাসান গরীব। উমর ইবন ইবরাহীম-এর হাদীস ব্যতীত অন্য কোনভাবে আমি এর সন্ধান পাইনি। কেউ কেউ আবদুস সামাদ থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে মারফু সূত্রে নয়। এ সাহাবী পর্যন্ত মওকুফ সূত্রে বর্ণিত হওয়াই হাদীসটি কটিযুক্ত হওয়ার কারণ। এটিই যুক্তিসঙ্গত কথা। স্পষ্টতই বর্ণনাটি ইসরাঈলিয়াত থেকে সংগৃহীত। অনুরূপভাবে ইবন আব্বাস (রা) থেকেও মওকুফ রূপে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। স্পষ্টতই এটা কা’ব আহবার সূত্রে প্রাপ্ত হাসান বসরী (র) এ আয়াতগুলোর এর বিপরীত ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর নিকট যদি সামুরা (রা) থেকে মারফূ সূত্রে হাদীসটি প্রমাণিত হতো, তাহলে তিনি ভিন্নমত পোষণ করতেন না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
তাছাড়া আল্লাহ তাআলা আদম ও হাওয়া (আ)-কে এ জন্য সৃষ্টি করেছেন যে, তারা মানব জাতির উৎসমূল হবেন এবং তাদের থেকে তিনি বহু নর-নারী বিস্তার করবেন। সুতরাং উপরোক্ত হাদীসে যা উল্লেখ করা হয়েছে যদি তা যথার্থ হয়ে থাকে, তাহলে হাওয়া (আ)-এর সন্তানাদি না বাঁচার কী যুক্তি থাকতে পারে? নিশ্চিত হলো এই যে, একে মারফু আখ্যা দেয়া ভুল। মওকুফ হওয়াই যথার্থ। আমি আমার তাফসীরের কিতাবে বিষয়টি আলোচনা করেছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
উল্লেখ যে, আদম ও হাওয়া (আ) অত্যন্ত মুত্তাকী ছিলেন। কেননা আদম (আ) হলেন মানব জাতির পিতা। আল্লাহ তা’আলা তাঁকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন, তাঁর মধ্যে নিজের রূহ সঞ্চার করে তাঁর ফেরেশতাদেরকে তার সম্মুখে সিজদাবনত করান, তাকে যাবতীয় বস্তুর নাম শিক্ষা দেন ও তাঁকে জান্নাতে বসবাস করতে দেন।
ইবন হিব্বান (র) তার সহীহ গ্রন্থে আবু যর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! নবীর সংখ্যা কত?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ ‘এক লক্ষ চব্বিশ হাজার।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তাঁদের মধ্যে রাসূলের সংখ্যা কত?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ ‘তিনশ তেরজনের বিরাট একদল।’ আমি বললাম, ‘তাঁদের প্রথম কে ছিলেন?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ ‘আদম (আ)।’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! তিনি কি প্রেরিত নবী?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তাঁকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেন। তারপর তার মধ্যে তাঁর রূহ্ সঞ্চার করেন। তারপর তাকে নিজেই সুঠাম করেন।
তাবারানী (র) বর্ণনা করেন যে, ইবন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “শুনে রেখ, ফেরেশতাদের সেরা হলেন জিবরাঈল (আ)। নবীদের সেরা হলেন আদম (আ)। দিবসের সেরা হলো জুআর দিন, মাসের সেরা হলো রমযান, রাতের সেরা হলো লাইলাতুল কদর এবং নারীদের সেরা হলেন ইমরান তনয়া মারয়াম।”
এটি দুর্বল সনদ। কারণ, রাবী আবু হুরমু নাফিকে ইবন মাঈন মিথুক সাব্যস্ত করেছেন। আর আহমদ, আবু যুর’আ, আবূ হাতিম, ইবন হিব্বান (র) প্রমুখ তাকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
কাব আল-আহবার বলেন, জান্নাতে কারো দাড়ি থাকবে না। কেবল আদম (আ)-এর নাভি পর্যন্ত দীর্ঘ কালো দাড়ি থাকবে। আর জান্নাতে কাউকে উপনাম ধরে ডাকা হবে না। শুধুমাত্র আদম (আ)-কেই উপনাম ধরে ডাকা হবে। দুনিয়াতে তাঁর উপনাম হলো আবুল বাশার আর জান্নাতে হবে আবু মুহাম্মদ।
ইবন আদী জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) থেকে মারফূ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, “আদম (আ) ব্যতীত সকল জান্নাতীকেই স্বনামে ডাকা হবে। আদম (আ)-কে ডাকা হবে আবু মুহাম্মদ উপনামে।” ইব্ন আবু আদী আলী (রা) ইবন আবু তালিব-এর হাদীস থেকেও এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তবে তা সর্বদিক থেকেই দুর্বল। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত মি’রাজ সংক্রান্ত হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নিম্ন আকাশে আদম (আ)-এর নিকট গমন করেন; তখন আদম (আ) তাকে বলেছিলেন, পুণ্যবান পুত্র ও পুণ্যবান নবীকে স্বাগতম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর ডানে একদল এবং বামে একদল লোক দেখতে পান। আদম (আ) ডানদিকে দৃষ্টিপাত করে হেসে দেন ও বামদিকে দৃষ্টিপাত করে কেঁদে ফেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘জিবরাঈল এসব কী?’ উত্তরে জিবরাঈল (আ) বললেন, ‘ইনি আদম এবং এরা তার বংশধর। ডান দিকের লোকগুলো হলো জান্নাতী। তাই সেদিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি হেসে দেন আর বামদিকের লোকগুলো হলো জাহান্নামী। তাই ওদের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি কেঁদে ফেলেন।’ আবুল বাযযার বর্ণনা করেন যে, হাসান (র) বলেন যে, আদম (আ)-এর জ্ঞান-বুদ্ধি তার সমস্ত সন্তানের জ্ঞান-বুদ্ধির সমান ছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা) ঐ হাদীসে আরও বলেনঃ তারপর আমি ইউসুফ (আ)-এর নিকট গমন করি। দেখতে পেলাম, তাকে অর্ধেক রূপ দেয়া হয়েছে। আলিমগণ এর অর্থ করতে গিয়ে বলেন, ইউসুফ (আ) আদম (আ)-এর রূপের অর্ধেকের অধিকারী ছিলেন। এ কথাটা যুক্তিসঙ্গত। কারণ, আল্লাহ তাআলা আদম (আ)-কে নিজের পবিত্র হাতে সৃষ্টি করেছেন ও আকৃতি দান করেছেন এবং তার মধ্যে নিজের রূহ্ সঞ্চার করেছেন। অতএব, এমন লোকটি অন্যদের তুলনায় অধিক সুন্দর হবেন এটাই স্বাভাবিক।
আমরা আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) এবং ইবন আমর (রা) থেকেও মওকূফ ও মারফু রূপে বর্ণনা করেছি যে, আল্লাহ তাআলা যখন জান্নাত সৃষ্টি করেন; তখন ফেরেশতাগণ বলেছিল যে, হে আমাদের রব! এটি আপনি আমাদেরকে দিয়ে দিন। কারণ, আদম (আ)-এর সন্তানদের জন্যে তো দুনিয়া-ই সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাতে তারা সেখানে পানাহার করতে পারে। উত্তরে আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ আমার সম্মান ও মহিমার শপথ! যাকে আমি নিজ হাতে সৃষ্টি করলাম, তার সন্তানদেরকে আমি তাদের সমান করবো না— যাদেরকে আমি কুন (হও) বলতেই হয়ে গেছে।
সহীহ বুখারী ও মুসলিম ইত্যাদিতে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীস আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা’আলা আদম (আ)-কে তার আকৃতিতে সৃষ্টি করেন।” এ হাদীসের ব্যাখ্যায় অনেকে অনেক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই। আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
আদম (আ)-এর ওফাত ও আপন পুত্র শীছ (আ)-এর প্রতি তাঁর ওসীয়ত
শীছ অর্থ আল্লাহর দান। হাবীলের নিহত হওয়ার পর তিনি এ সন্তান লাভ করেছিলেন বলে আদম ও হাওয়া (আ) তার এ নাম রেখেছিলেন।
আবু যর (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা একশ’ চারখানা সহীফা (পুস্তিকা) নাযিল করেন। তন্মধ্যে পঞ্চাশটি নাযিল করেন শীছ-এর উপর।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন, মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে আদম (আ) তাঁর পুত্র শীছ (আ)-কে ওসীয়ত করেন, তাকে রাত ও দিবসের ক্ষণসমূহ এবং সেসব ক্ষণের ইবাদতসমূহ শিখিয়ে যান ও ভবিষ্যতে ঘটিতব্য তুফান সম্পর্কে অবহিত করে যান। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) বলেন, আজকের সকল আদম সন্তানের বংশধারা শীছ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে যায় এবং শীছ ব্যতীত আদম (আ)-এর অপর সব ক’টি বংশধারাই বিলুপ্ত হয়ে যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
কোন এক জুমু’আর দিনে আদম (আ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে ফেরেশতাগণ আল্লাহর পক্ষ হতে জান্নাত থেকে কিছু সুগন্ধি ও কাফন নিয়ে তাঁর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর পুত্র এবং স্থলাভিষিক্ত শীছ (আ)-কে সান্ত্বনা দান করেন। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) বলেন, আর সাত দিন ও সাতরাত পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্যের গ্রহণ লেগে থাকে।
ইমাম আহমদের পুত্র আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন যে, য়াহয়া ইবন যামরা সাদী বলেন, মদীনায় আমি এক প্রবীণ ব্যক্তিকে কথা বলতে দেখতে পেয়ে তার পরিচয় জানতে চাইলে লোকেরা বলল, ইনি উবাই ইবন কা’ব। তখন তিনি বলছিলেন যে, “আদম (আ)-এর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর পুত্রদেরকে বললেন, আমার জান্নাতের ফল খেতে ইচ্ছে হয়। ফলে তাঁরা ফলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। পথে তাঁদের সঙ্গে কতিপয় ফেরেশতার সাক্ষাৎ ঘটে। তাদের সাথে আদম (আ)-এর কাফন, সুগন্ধি, কয়েকটি কুঠার, কোদাল ও থলে ছিল। ফেরেশতাগণ তাদেরকে বললেন, হে আদম-পুত্রগণ! তোমরা কী চাও এবং কী খুঁজছে? কিংবা বললেন, তোমরা কি উদ্দেশ্যে এবং কোথায় যাচ্ছো? উত্তরে তারা বললেন, আমাদের পিতা অসুস্থ। তিনি জান্নাতের ফল খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা শুনে ফেরেশতাগণ বললেনঃ তোমরা ফিরে যাও। তোমাদের পিতার ইন্তিকালের সময় ঘনিয়ে এসেছে। যা হোক, ফেরেশতাগণ আদম (আ)-এর নিকট আসলে হাওয়া (আ) তাদের চিনে ফেলেন এবং আদম (আ)-কে জড়িয়ে ধরেন। তখন আদম (আ) বললেন, আমাকে ছেড়ে দিয়ে তুমি সরে যাও। কারণ তোমার আগেই আমার ডাক পড়ে গেছে। অতএব, আমি ও আমার মহান রব-এর ফেরেশতাগণের মধ্য থেকে তুমি সরে দাড়াও। তারপর ফেরেশতাগণ তার জানকবয করে নিয়ে গোসল দেন, কাফন পরান, সুগন্ধি মাখিয়ে দেন এবং তার জন্য বগলী কবর খুঁড়ে জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর তাঁকে কবরে রেখে দাফন করেন। তারপর তারা বললেন, হে আদমের সন্তানগণ! এ হলো তোমাদের দাফনের নিয়ম। এর সনদ সহীহ।
ইবন আসাকির (র) ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ ফেরেশতাগণ আদম (আ)-এর জানাযায় চারবার, আবু বকর (রা) ফাতিমা (রা)-এর জানাযায় চারবার, উমর (রা) আবূ বকর (রা)-এর জানাযায় চারবার এবং সুহায়ব (রা)-র উমর (রা)-এর জানাযায় চারবার তাকবীর পাঠ করেন।৭৬(হাদীসটি বিশুদ্ধ হয়ে থাকলে এটাকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী বলে বিবেচনা করতে হবে। – সম্পাদক) ইবন আসাকির বলেন, শায়বান ব্যতীত অন্যান্য রাবী মাইমূন সূত্রে ইবন উমর (রা) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।
আদম (আ)-কে কোথায় দাফন করা হয়েছে, এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। প্রসিদ্ধ মত হলো, তাঁকে সে পাহাড়ের নিকটে দাফন করা হয়েছে, যে পাহাড় থেকে তাঁকে ভারতবর্ষে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন, মক্কার আবু কুবায়স পাহাড়ে তাকে দাফন করা হয়। কেউ কেউ বলেন, মহা প্লাবনের সময় হযরত নূহ (আ) আদম ও হাওয়া (আ)-এর লাশ একটি সিন্দুকে ভরে বায়তুল মুকাদ্দাসে দাফন করেন। ইবন জারীর এ তথ্য বর্ণনা করেছেন। ইবন আসাকির কারো কারো সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আদম (আ)-এর মাথা হলো মসজিদে ইবরাহীম (আ)-এর নিকট আর পা দু’খানা হলো বায়তুল মুকাদ্দাস-এর সাখরা নামক বিখ্যাত পাথর খণ্ডের নিকট। উল্লেখ্য যে, আদম (আ)-এর ওফাতের এক বছর পরই হাওয়া (আ)-এর মৃত্যু হয়।
আদম (আ)-এর আয়ু কত ছিল এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইবন আব্বাস (রা) ও আবু হুরায়রা (রা) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদীসে আমরা উল্লেখ করে এসেছি যে, আদম (আ)-এর আয়ু লাওহে মাহফুজে এক হাজার বছর লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আদম (আ) ন’শ ত্রিশ বছর জীবন লাভ করেছিলেন বলে তাওরাতে যে তথ্য আছে, তার সঙ্গে এর কোন বিরোধ নেই। কারণ ইহুদীদের এ বক্তব্য আপত্তিকর এবং আমাদের হাতে যে সংরক্ষিত সঠিক তথ্য রয়েছে; তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত। তাছাড়া ইহুদীদের বক্তব্য ও হাদীসের তথ্যের মাঝে সমন্বয় সাধন করাও সম্ভব। কারণ তাওরাতের তথ্য যদি সংরক্ষিত হয়; তা হলে তা অবতরণের পর পৃথিবীতে অবস্থান করার মেয়াদের উপর প্রয়োগ হবে। আর তাহলে সৌর হিসাবে ন’শ ত্রিশ বছর আর চান্দ্র হিসাবে নয় শ’ সাতান্ন বছর। এর সঙ্গে যোগ হবে ইবন জারীর-এর বর্ণনানুযায়ী অবতরণের পূর্বে জান্নাতে অবস্থানের মেয়াদকাল তেতাল্লিশ বছর। সর্বসাকুল্যে এক হাজার বছর।
‘আতা খুরাসানী বলেন, আদম (আ)-এ ইন্তিকাল হলে গোটা সৃষ্টিজগত সাতদিন পর্যন্ত ক্রন্দন করে। ইবন আসাকির (র) এ তথ্য বর্ণনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শীছ (আ) তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি সে হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী নবী ছিলেন যা ইবন হিব্বান তার সহীহ-এ আবু যর (রা) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, শীছ (আ)-এর উপর পঞ্চাশটি সহীফা নাযিল হয়। এরপর তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসলে তাঁর ওসীয়ত অনুসারে তাঁর পুত্র আনূশ, তারপর তাঁর পুত্র কীনন দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তারপর তিনিও মৃত্যুবরণ করলে তার ছেলে মাহলাঈল দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পারসিকদের ধারণা মতে, মাহলাঈল সপ্তরাজ্যের তথা গোটা পৃথিবীর রাজা ছিলেন। তিনি-ই সর্ব প্রথম গাছপালা কেটে শহর, নগর ও বড় বড় দুর্গ নির্মাণ করেন। বাবেল ও ‘সূস আল-আকসা নগরী তিনিই নির্মাণ করেন। তিনিই ইবলীস ও তার সাঙ্গপাঙ্গদেরকে পরাজিত করে তাদেরকে পৃথিবী সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ এবং বিভিন্ন পাহাড়ী উপত্যকায় তাড়িয়ে দেন। আর তিনিই একদল অবাধ্য জিন-ভূতকে হত্যা করেন। তাঁর একটি বড় মুকুট ছিল। তিনি লোকজনের উদ্দেশে বক্তৃতা প্রদান করতেন। তাঁর রাজত্ব চল্লিশ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র য়ারদ তার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর তারও মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আপন পুত্র খানুখকে ওসীয়ত করে যান। প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী এ খানুখ-ই হলেন ইদরীস (আ)।
