২৫. হযরত ইবরাহীম খলীল (আ)-এর প্রশংসায় আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)
হযরত ইবরাহীম খলীল (আ)-এর প্রশংসায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেনঃ
(وَإِذِ ابْتَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ ۖ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا ۖ قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ۖ قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ) [Surat Al-Baqarah 124]
অর্থাৎ, স্মরণ কর, যখন ইব্রাহীমকে তাঁর প্রতিপালক কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন এবং সেগুলো সে পূর্ণ করেছিল। আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানব জাতির নেতা করছি, সে বলল, আমার বংশধরগণের মধ্য হতেও? আল্লাহ বললেন, আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য নয়। (সূরা বাকারাঃ ১২৪)
আল্লাহ্ হযরত ইব্রাহীম (আ)-কে যেসব কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন, তিনি সেসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ্ তাঁকে মানব জাতির নেতৃত্ব দান করেন। যাতে তারা তাঁর অনুকরণ ও অনুসরণ করতে পারে। ইব্রাহীম (আ) এই নিয়ামত তার পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে অব্যাহত রাখার জন্যে আল্লাহর নিকট দু’আ করেন। আল্লাহ্ তাঁর প্রার্থনা শুনেন এবং জানিয়ে দেন যে, তাকে যে নেতৃত্ব দেয়া হল তা জালিমরা লাভ করতে পারবে না, এটা কেবল তাঁর সন্তানদের মধ্যে আলিম ও সৎকর্মশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ
(وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ) [Surat Al-Ankabut 27]
অর্থাৎ, আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকূব এবং তার বংশধরদের জন্যে স্থির করলাম নবুওত ও কিতাব, আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম। আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম হবে। (২৯ আন-কাবূতঃ ২৭)
আল্লাহর বাণীঃ
(وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ كُلًّا هَدَيْنَا ۚ وَنُوحًا هَدَيْنَا مِنْ قَبْلُ ۖ وَمِنْ ذُرِّيَّتِهِ دَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ وَأَيُّوبَ وَيُوسُفَ وَمُوسَىٰ وَهَارُونَ ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ * وَزَكَرِيَّا وَيَحْيَىٰ وَعِيسَىٰ وَإِلْيَاسَ ۖ كُلٌّ مِنَ الصَّالِحِينَ * وَإِسْمَاعِيلَ وَالْيَسَعَ وَيُونُسَ وَلُوطًا ۚ وَكُلًّا فَضَّلْنَا عَلَى الْعَالَمِينَ * وَمِنْ آبَائِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَإِخْوَانِهِمْ ۖ وَاجْتَبَيْنَاهُمْ وَهَدَيْنَاهُمْ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ)
[Surat Al-An’am 84 – 87]
অর্থাৎ, এবং তাকে দান করেছিলাম ইসহাক ও ইয়াকূব ও ওদের প্রত্যেককে সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম, পূর্বে নূহকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম এবং তার বংশধর দাঊদ, সুলায়মান, আইয়ুব, ইউসুফ, মূসা ও হারূনকেও; আর এভাবেই সকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি এবং যাকারিয়া, ইয়াহইয়া, ঈসা এবং ইলিয়াসকেও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম, এরা সকলে সজ্জনদের অন্তর্ভুক্ত। আরও সৎপথে পরিচালিত করেছিলাম ইসমাঈল, আল-ইয়াসা’আ, ইউনুস ও লূতকে; এবং শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলাম বিশ্ব জগতের উপর প্রত্যেককে এবং এদের পিতৃ-পুরুষ, বংশধর এবং ভ্রাতৃবৃন্দের কতককে; তাদেরকে মনোনীত করেছিলাম এবং সরল পথে পরিচালিত করেছিলাম। (সূরা আনআমঃ ৮৪-৮৭)
প্রসিদ্ধ মতে, ومن ذريته (তাঁর বংশধরদের) বলতে এখানে হযরত ইবরাহীম (আ)-কে বুঝান হয়েছে। হযরত লূত (আ) যদিও হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর ভাতিজা তবুও অন্যদের প্রাধান্য হেতু তাঁকেও বংশধর হিসাবে বলা হয়েছে। অপর একদল আলিমের মতে, তাঁর বলতে হযরত নূহ (আ)-কে বুঝান হয়েছে। পূর্বে আমরা নূহ (আ)-এর আলোচনায় এ বিষয়ের উল্লেখ করেছি। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আল্লাহর বাণীঃ
(وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا وَإِبْرَاهِيمَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِمَا النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ ۖ فَمِنْهُمْ مُهْتَدٍ ۖ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ) [Surat Al-Hadid 26]
অর্থাৎ, আমি নূহ এবং ইবরাহীমকে রাসূলরূপে প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদের বংশধরগণের জন্যে স্থির করেছিলাম নবুওত ও কিতাব। (সূরা হাদীদঃ ২৬)
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর পরে আসমান থেকে যত কিতাব যত নবীর উপর নাযিল হয়েছে, তারা সকলেই নিশ্চিতভাবে তাঁর বংশধরদের অন্তর্ভুক্ত। এটা এমন একটা সম্মান যার কোন তুলনা হয় না। এমন একটা সুমহান মর্যাদা যার তুল্য আর কিছুই নেই। কারণ, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঔরসে দুই মহান পুত্র-সন্তানের জন্ম হয়। হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল এবং সারাহর গর্ভে ইসহাক। ইসহাকের পুত্র ইয়াকূব তাঁর অপর নাম ছিল ইসরাঈল। পরবর্তী বংশধরগণ এই ইসরাঈলের নামেই বনী ইসরাঈল নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই ইসরাঈলী বংশে এতো বিপুল সংখ্যক নবীর আগমন ঘটে, যাদের সঠিক সংখ্যা তাদেরকে প্রেরণকারী আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই জানেন না। অব্যাহতভাবে এই বংশেই নবী-রাসূলগণ আসতে থাকেন এবং হযরত ঈসা ইবন মারয়াম (আ) পর্যন্ত পৌঁছে সে ধারার সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ইসরাঈল বংশের শেষ নবী। অপরদিকে হযরত ইসমাঈল (আ)-এর সন্তানগণ আরবের বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে আরব ভূমিতেই বসবাস করতে থাকেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ নবী খাতামুল আম্বিয়া, বনী আদমের শ্রেষ্ঠ সন্তান, দুনিয়া ও আখিরাতের গৌরব রবি মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিম আল কুরায়শী আল-মক্কী ওয়াল মাদানী ব্যতীত অন্য কোন নবীর আগমন ঘটেনি। ইনিই হলেন সেই মহামানব যার দ্বারা সমগ্র মানব জাতি গৌরবান্বিত। আদি-অন্ত সকল মানুষের ঈর্ষার পাত্র।
সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ
ساقوم مقامايرغب الى الخلق كلهم حتى ابر اهيم
অর্থাৎ—‘আমি এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত হব যে, আমার কাছে পৌঁছার জন্যে প্রত্যেকেই লালায়িত হবে; এমনকি ইবরাহীম (আ)-ও।’ এই বাক্যের দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা) প্রকারান্তরে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরে অন্য সব মানুষের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতে হযরত ইবরাহীম (আ)-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ ও সম্মানিত পুরুষ।
ইমাম বুখারী (র) ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) হাসান (রা)-কে কোলে নিয়ে বলতেন, আমি তোমাদের দুই ভাইয়ের জন্যে সেরূপ আশ্রয় চাই, যেরূপ আশ্রয় চেয়েছিলেন তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আ) ইসমাঈল ও ইসহাকের জন্যে। আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাহ্ দ্বারা প্রত্যেক শয়তান ও বিষাক্ত সরীসৃপ থেকে এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর চোখের দৃষ্টি থেকে। সুনান হাদীসের গ্রন্থকারগণও মানসূর (র) সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ্ বলেনঃ
(وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِي الْمَوْتَىٰ ۖ قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ ۖ قَالَ بَلَىٰ وَلَٰكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي ۖ قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَىٰ كُلِّ جَبَلٍ مِنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعْيًا ۚ وَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ) [Surat Al-Baqarah 260]
অর্থাৎ, যখন ইবরাহীম বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর আমাকে দেখাও।’ তিনি বললেন, ‘তবে কি তুমি বিশ্বাস করনি?’ সে বলল, ‘কেন করব না, তবে এটি কেবল আমার চিত্ত প্রশান্তির জন্যে।’ তিনি বললেন, ‘তবে চারটি পাখি লও এবং সেগুলোকে তোমার বশীভূত করে লও। তারপর তাদের এক এক অংশ এক এক পাহাড়ে স্থাপন কর। তারপর তাদেরকে ডাক দাও ওরা দ্রুতগতিতে তোমার নিকট আসবে। জেনে রেখো, আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা বাকারাঃ ২৬০)
আল্লাহর নিকট হযরত ইবরাহীম (আ)-এর এই প্রশ্ন সম্পর্কে মুফাসসিরগণ বহু কথা লিখেছেন, আমরা তাফসীর গ্রন্থে সে সবের বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সারকথা এই যে, ইবরাহীম (আ)-এর প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেন। আল্লাহ্ তাকে চার প্রকার পাখি সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন। এই চার প্রকার পাখি কি কি ছিল সে বিষয়ে মুফাসসিরগণের মতভেদ আছে। যাই হোক, উক্ত পাখিগুলোকে কেটে তাদের মাংস ও পাখা ইত্যাদি খণ্ড-বিখণ্ড করে সবগুলো মিলিয়ে মিশিয়ে চারটি ভাগে বিভক্ত করে এবং এক এক ভাগ এক এক পাহাড়ে রাখতে বলেন। তারপর প্রত্যেকটি পাখির নাম ধরে আল্লাহর নামে ডাকতে বলেন। ইবরাহীম (আ) যখন একটি একটি করে পাখির নাম ধরে ডাকেন, তখন প্রত্যেক পাহাড় থেকে ঐ পাখির খণ্ডিত মাংস ও পাখা উড়ে এসে একত্রিত হতে থাকে এবং পূর্বে যেরূপ ছিল সেরূপ পূর্ণাঙ্গ পাখিতে পরিণত হতে থাকে। আর ইবরাহীম (আ) সেই মহান সত্তার কুদরত ও ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করেন, যিনি কোন কিছুকে হও (কুন) বললে সাথে সাথেই তা হয়ে যায়। ইব্রাহীম (আ)-এর ডাকের সাথে ঐ পাখিগুলো তাঁর দিকে দৌড়িয়ে আসতে থাকে। উড়ে আসার চেয়ে দৌড়ে আসার মধ্যে আল্লাহর কুদরত অধিক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ইব্রাহীম (আ) পাখিগুলোর মাথা কেটে নিজের হাতে রেখে দিয়েছিলেন। বাকি অংশ পাহাড় থেকে উড়ে আসলে তিনি মাথা ফেলে দিতেন। ফলে মাথাগুলো সংশ্লিষ্ট পাখির দেহের সাথে গিয়ে লেগে যেত। অতএব, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। আল্লাহ মৃতকে জীবিত করতে পারেন এ ব্যাপারে ইব্রাহীম (আ)-এর ইলমে ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস) ছিল। এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তা খোলা চোখে দেখতে চেয়েছিলেন মাত্র। যাতে ‘ইলমে ইয়াকীন’ ‘আয়নুল ইয়াকীনে’ উন্নীত হয়। আল্লাহ্ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করেন ও আশা পূরণ করেন। আল্লাহর বাণীঃ
(يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ * هَا أَنْتُمْ هَٰؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ ۚ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ * مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَٰذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا ۗ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ)
[Surat Aal-E-Imran 65 – 68]
অর্থাৎ, হে কিতাবিগণ! ইব্রাহীম সম্বন্ধে কেন তোমরা তর্ক কর, অথচ তাওরাত ও ইনজীল তো তার পরেই অবতীর্ণ হয়েছিল? তোমরা কি বুঝ না? দেখ, যে বিষয়ে তোমাদের সামান্য জ্ঞান আছে তোমরাই তো সে বিষয়ে তর্ক করেছ, তবে যে বিষয়ে তোমাদের কোনই জ্ঞান নেই সে বিষয়ে কেন তর্ক করছ? আল্লাহ জ্ঞাত আছেন এবং তোমরা জ্ঞাত নও। ইবরাহীম ইহুদীও ছিল না, খৃস্টানও ছিল না; সে ছিল একনিষ্ঠ, আত্মসমর্পণকারী এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যারা ইবরাহীমের অনুসরণ করেছিল তারা এবং এই নবী ও যারা ঈমান এনেছে মানুষের মধ্যে তারা ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম। আল্লাহ্ মু’মিনদের অভিভাবক। (সূরা আল-ইমরানঃ ৬৫-৬৮)
ইয়াহুদ ও নাসারা প্রত্যেকেই দাবি করত যে, ইবরাহীম (আ) তাদেরই লোক। আল্লাহ্ তাদের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে ইবরাহীম (আ)-কে তাদের দলভুক্ত হওয়ার অপবাদ থেকে মুক্ত করেন। তিনি তাদের চরম মূর্খতা ও জ্ঞানের স্বল্পতা এই বলে প্রকাশ করে দেন যে, তাওরাত ও ইনজীল তো তার যুগের পরেই নাযিল হয়েছে।
وما انزلت التورةوالانجيل الا من بعده
অর্থাৎ তিনি কিভাবে তোমাদের ধর্মের লোক হবেন, যখন দুনিয়া থেকে তার বিদায়ের বহু যুগ পরে তাওরাত ইনজীল নাযিল হয়েছে অর্থাৎ তোমাদের শরীয়ত এসেছে। এ কারণেই আল্লাহ বলেছেনঃ
افلا تعقلون
তোমরা কি এ সামান্য বিষয়টিও বুঝ না?
আল্লাহ আরও বলেনঃ
(مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ)
[Surat Aal-E-Imran 67]
অর্থাৎ, ইবরাহীম ইহুদীও ছিল না, নাসারাও ছিল না, বরং সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী। সে মুশরিকও ছিল না। আল্লাহ্ এখানে স্পষ্ট বলেছেন যে, ইবরাহীম ছিলেন দীনে হানীফের উপর প্রতিষ্ঠিত। দীনে হানীফ বলা হয় স্বেচ্ছায় বাতিলকে পরিত্যাগ করে হককে গ্রহণ করা এবং আন্তরিকভাবে তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। এই দীনে হানীফ ইহুদী, খৃস্টান ও মুশরিকদের ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। আল্লাহ বলেনঃ
(وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ ۚ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ * إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ ۖ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ * وَوَصَّىٰ بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَىٰ لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ * أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَٰهَكَ وَإِلَٰهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَٰهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ * تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ ۖ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَا كَسَبْتُمْ ۖ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ * وَقَالُوا كُونُوا هُودًا أَوْ نَصَارَىٰ تَهْتَدُوا ۗ قُلْ بَلْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنْزِلَ إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِنْ رَبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ * فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنْتُمْ بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوْا ۖ وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ ۖ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ ۚ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ * صِبْغَةَ اللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ * قُلْ أَتُحَاجُّونَنَا فِي اللَّهِ وَهُوَ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ وَلَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُخْلِصُونَ * أَمْ تَقُولُونَ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطَ كَانُوا هُودًا أَوْ نَصَارَىٰ ۗ قُلْ أَأَنْتُمْ أَعْلَمُ أَمِ اللَّهُ ۗ وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ كَتَمَ شَهَادَةً عِنْدَهُ مِنَ اللَّهِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ) [Surat Al-Baqarah 130 – 140]
অর্থাৎ, যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ব্যতীত ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ হতে আর কে বিমুখ হবে! পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; পরকালেও সে সৎ কর্মপরায়ণগণের অন্যতম। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ কর’, সে বলেছিল, ‘জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম।’ এবং ইবরাহীম ও ইয়াকূব এ সম্বন্ধে তাদের পুত্রগণকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিল, ‘হে পুত্রগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যে এ দীনকে মনোনীত করেছেন। সুতরাং আত্মসমর্পণকারী না হয়ে তোমরা কখনও মৃত্যুবরণ করিও না।’ ইয়াকূবের নিকট যখন মৃত্যু এসেছিল তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন পুত্রগণকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আমার পরে তোমরা কিসের ইবাদত করবে?’ তারা তখন বলেছিল, আমরা আপনার ইলাহ্-এর ও আপনার পিতৃ-পুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহ-এরই ইবাদত করব। তিনি একমাত্র ইলাহ্ এবং আমরা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী।’ সেই উম্মত অতীত হয়েছে- ওরা যা অর্জন করেছে তা ওদের, তোমরা যা অর্জন কর তা তোমাদের। তারা যা করত সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে কোন প্রশ্ন করা হবে না। তারা বলে, ইহুদী বা খৃস্টান হও, ঠিক পথ পাবে।’ বল, বরং একনিষ্ঠ হয়ে আমরা ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করব এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।’ তোমরা বল, আমরা আল্লাহতে ঈমান রাখি এবং যা আমাদের প্রতি এবং ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তার বংশধরগণের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে দেয়া হয়েছে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং আমরা তাঁর নিকট আত্মসমর্পণকারী। তোমরা যাতে ঈমান এনেছ তারা যদি সেরূপ ঈমান আনে তবে নিশ্চয় তারা সৎপথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারা নিশ্চয়ই বিরুদ্ধভাবাপন্ন। তাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্যে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। আমরা গ্রহণ করলাম আল্লাহর রং, রঙে আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিকতর সুন্দর? এবং আমরা তাঁরই ইবাদতকারী। বল, আল্লাহ্ সম্বন্ধে তোমরা কি আমাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও? যখন তিনি আমাদের প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক! আমাদের কর্ম আমাদের এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের এবং আমরা তাঁর প্রতি অকপট। তোমরা কি বল যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তার বংশধরগণ ইহুদী কিংবা খৃস্টান ছিল?
বল, তোমরা বেশি জান, না আল্লাহ্? আল্লাহর নিকট হতে তার কাছে যে প্রমাণ আছে তা যে গোপন করে তার অপেক্ষা অধিকতর জালিম আর কে হতে পারে? তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্বন্ধে অনবহিত নন। (২ঃ ১৩০-১৪০)
আল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ)-কে ইহুদী বা খৃস্টান হওয়ার অপবাদ থেকে মুক্ত করে সুস্পষ্টভাবে বলে দেন যে, তিনি একনিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন এবং তিনি মুশরিকও ছিলেন না। এ কারণে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেনঃ
إن اولى الناس بابرهيم للذين أتبعوه.
‘মানুষের মধ্যে ইবরাহীম (আ)-এর ঘনিষ্ঠতম তারা, যারা তাকে অনুসরণ করে।’ তাঁর সময়ে যারা তাঁর অনুসারী ছিল এবং তার পরে যারা তাঁর দীন গ্রহণ করেছে।
وهذا النبى
(এবং এই নবী) অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা)। কেননা যেই দীনে-হানীফকে আল্লাহ ইবরাহীম (আ)-এর জন্যে মনোনীত করেছিলেন সেই দীনে-হানিফকেই তিনি মুহাম্মদ (সা)-এর জন্য মনোনীত করেছেন। তদুপরি মুহাম্মদ (সা)-এর দীনকে তিনি পূর্ণতা দান করেছেন এবং তাঁকে এমন সব নিয়ামত দান করেছেন যা অন্য কোন নবী বা রাসূলকে ইতিপূর্বে দান করেননি।
আল্লাহ বলেনঃ
(قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ * لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ) [Surat Al-An’am 161 – 163]
অর্থাৎ, বল, আমার প্রতিপালক আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। এটাই সু-প্রতিষ্ঠিত দীন ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বল, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশে। তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি এরূপই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম। (৬ঃ ১৬১-১৬৩)
আল্লাহ আরো বলেনঃ
(إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتًا لِلَّهِ حَنِيفًا وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * شَاكِرًا لِأَنْعُمِهِ ۚ اجْتَبَاهُ وَهَدَاهُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ * وَآتَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ * ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ) [Surat An-Nahl 120 – 123]
অর্থাৎ, ইবরাহীম ছিল এক উম্মত আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সে ছিল আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছিলেন এবং তাকে সরল পথে পরিচালিত করেছিলেন। আমি তাকে দুনিয়ায় দিয়েছিলাম মঙ্গল এবং আখিরাতেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম। এখন আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করলাম, তুমি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ কর এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (১৬ঃ ১২০-১২৩)
ইমাম বুখারী (র) ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা ঘরের মধ্যে প্রাণীর ছবি দেখে তাতে প্রবেশ করেননি। অতঃপর তার হুকুমে সেগুলো মুছে ফেলা হয়। তিনি কাবাঘরে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর মূর্তির হাতে জুয়ার তীর দেখতে পান। এ দেখে তিনি বলেন, যারা এরূপ বানিয়েছে তাদেরকে আল্লাহ নিপাত করুক। আল্লাহর কসম, তারা দু’জনের কেউই জুয়ার তীর বের করেন নি। আয়াতে উল্লিখিত উম্মতআ(امة) অর্থ নেতা ও পথপ্রদর্শক। যিনি মঙ্গলের দিকে মানুষকে আহ্বান করেন এবং সে ব্যাপারে তাকে অনুসরণ করা হয়। قانتا لله এর অর্থ সর্বাবস্থায়—চলাফেরার প্রতি মূহূর্তে আল্লাহকে ভয় করে চলা حنيفا অর্থ অন্তদৃষ্টির সাথে আন্তরিক হওয়া।
( وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * شَاكِرًا لِأَنْعُمِهِ )
[Surat An-Nahl 120 – 121]
অর্থ সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে পালন কর্তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। যথা অন্তর, জিহ্বা ও কর্ম ইত্যাদির মাধ্যমে। اجتباه অর্থ-আল্লাহ তাঁকে নিজের জন্যে মনোনীত করেন। রিসালাতের দায়িত্ব দেয়ার জন্যে বাছাই করেন। নিজের বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তাঁকে দান করেন।
আল্লাহর বাণীঃ
(وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا) [Surat An-Nisa’ 125]
অর্থাৎ, দীনের ব্যাপারে সেই ব্যক্তি অপেক্ষা কে উত্তম, যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করে। আল্লাহ ইবরাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন। (৪ঃ ১২৫)
এখানে আল্লাহ হযরত ইবরাহীমের ধর্মাদর্শ অনুসরণ করার জন্যে উৎসাহিত করেছেন। কেননা, তিনি ছিলেন মজবুত দীন ও সরল পথের উপর সু-প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাকে যা যা করার আদেশ দিয়েছিলেন তিনি তার সব কিছুই যথাযথভাবে পালন করেছেন। আল্লাহ নিজেই তাঁর প্রশংসায় বলেছেন
(وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّىٰ)
[Surat An-Najm 37]
(এবং ইবরাহীমের কিতাবে, সে পালন করেছিল তার দায়িত্ব (৫৩ঃ ৩৭)। এ কারণেই আল্লাহ তাঁকে খলীল রূপে গ্রহণ করেন। খলীল বলা হয় সেই বন্ধুকে যার প্রতি প্রগাঢ় ভালবাসা থাকে। যেমন কোন কবি বলেছেনঃ
قد تخلت مسلك الروح مني- وبذا سمي الخليل خليلا
অর্থাৎ—আমার অন্তরকে সে ভালবাসা দিয়ে জয় করে নিয়েছে আর এ কারণেই অন্তরঙ্গ বন্ধুকে খলীল বলা হয়। অনুরূপভাবে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-ও আল্লাহর খলীল হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছিলেন। সহীহ বুখারী, মুসলিম ইত্যাদি গ্রন্থে জুনদুব আল-বাজালী, আবদুল্লাহ ইবন আমর ও ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত।
রাসূল (সা) বলেছেনঃ হে জনমণ্ডলী! জেনে রেখো আল্লাহ আমাকে তাঁর খলীলরূপে গ্রহণ করেছেন, যেভাবে তিনি ইবরাহীমকে খলীল রূপে গ্রহণ করেছিলেনঃ
ایها الناس ان الله اتخذني خليلا كما اتخذ ابرهيم خليلا.
জীবনের শেষ ভাষণে রাসূল (সা) বলেছিলেনঃ
ایها الناس لو كنت متخذا من اهل الارض خليلا لا تخذت أبا بكر
‘হে জনগণ! পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে কাউকে যদি আমি খলীল হিসাবে গ্রহণ করতাম, তবে অবশ্যই আবু বকর (রা)-কে আমার খলীল বানাতাম। কিন্তু তোমাদের এই সাথী আল্লাহর খলীল।’
এ হাদীস বুখারী ও মুসলিমে আবু সাঈদ খুদরী (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তা ছাড়া আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা), ইবন আব্বাস (রা) ও ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে এ হাদীসখানা অন্যান্য কিতাবেও বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারীতে আমর ইবন মায়মূন (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত মু’আয (রা) ইয়ামানে গমন করেন। তখন সবাইকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করেন এবং কিরাআতে এ আয়াতে তিলাওয়াত করেনঃ
اتخذ الله ابرهيم خليلا
(আল্লাহ ইবরাহীমকে খলীলরূপে গ্রহণ করেন) তখন উপস্থিত একজন বললেন, ইবরাহীমের মায়ের চোখ কতই না শীতল হয়েছিল। ইবন মারদূয়েহ (র) …. ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, একদা রাসূল (সা)-এর কতিপয় সাহাবা তার জন্য অপেক্ষমাণ দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বের হয়ে আসেন। কাছাকাছি এলে তিনি শুনতে পান—এরা যেন কিছু একটা বলাবলি করছেন। তখন সেখানে থেমে গিয়ে তিনি তাদের থেকে শুনতে পান যে, কেউ একজন বলছেন, কী আশ্চর্য! আল্লাহ তাঁরই সৃষ্টি মানুষের মধ্য থেকে ‘খলীল’ বানিয়েছেন—ইবরাহীম তার খলীল। আর একজন বলছেন, কী আশ্চর্য! আল্লাহ মূসার সাথে কথাবার্তা বলেছেন। অপরজন বলছেন, ঈসা তো আল্লাহর রূহ্ ও কালিমাহ্। অন্য আর একজন বলছেন, আদম (আ)-কে আল্লাহ বাছাই করে নিয়েছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সম্মুখে আসেন এবং বলেন, আমি তোমাদের কথাবার্তা ও বিস্মিত হওয়ার কথা শুনতে পেয়েছি। ইবরাহীম (আ) আল্লাহর খলীল, তিনি তা-ই ছিলেন, মূসা (আ) আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন তিনিও তা-ই ছিলেন, ঈসা (আ) আল্লাহর রূহ ও কালিমাহ্ তিনি ঠিক তা-ই ছিলেন। আদম (আ)-কে আল্লাহ বাছাই করেছিলেন, এবং তিনি তেমনই ছিলেন। জেনে রেখ, আমি আল্লাহর হাবীব (পরম বন্ধু) এতে আমার কোন অহংকার নেই। জেনে রেখ, আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই প্রথম শোনা হবে, এতে আমার কোন অহংকার নেই। আমিই সে ব্যক্তি যে সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজার কড়া নাড়বে। অতঃপর তা খুলে আমাকে ভিতরে প্রবেশ করানো হবে। তখন আমার সাথে থাকবে দরিদ্র মুমিনগণ; কিয়ামতের দিন প্রাথমিক যুগের ও শেষ যুগের সকল মানুষের মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত আমিই, এতে আমার কোন অহংকার নেই। এই সনদে হাদীসটি ‘গরীব’ পর্যায়ের বটে। তবে অন্যান্য সনদে এর সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
হাকিম (র) তাঁর ‘মুসতাদরাকে’ ইবন আব্বাস (রা)-এর উক্তি উল্লেখ করেছেন। ইবন আব্বাস (রা) বলেছেনঃ তোমরা কি অস্বীকার করতে পারবে যে, খলীল হওয়ার সৌভাগ্য হযরত ইবরাহীম (আ)-এর। আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য হযরত মূসা (আ)-এর এবং আল্লাহর দীদার লাভের সৌভাগ্য মুহাম্মদ (সা)-এর। ইব্ন আবু হাতিম (র) ইসহাক ইবন বাশশার (র) সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ যখন ইবরাহীম (আ)-কে খলীলরূপে বরণ করে নেন, তখন তার অন্তরের মধ্যে ভীতি গেড়ে বসে, এমনকি পাখি যেমন আকাশে ওড়ার সময় ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ হয় তেমনি তাঁর অন্তর থেকে উৎপন্ন ভীতির আওয়াজ দূর থেকে শোনা যেত। উবায়দ ইবন উমায়র (রা) বলেন, ইবরাহীম (আ) সর্বদাই অতিথি আপ্যায়ন করতেন। একদিন তিনি অতিথির সন্ধানে ঘর থেকে বের হলেন। কিন্তু কোন অতিথি পেলেন না। অবশেষে ঘরে ফিরে এসে দেখেন একজন মানুষ ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ওহে আল্লাহর বান্দা! আমার বিনা অনুমতিতে কে তোমাকে আমার ঘরে প্রবেশ করাল? লোকটি বলল, এ ঘরের মালিকের অনুমতিক্রমেই আমি এতে প্রবেশ করেছি। ইবরাহীম (আ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পরিচয় কী? সে বলল, আমি রূহ কবজকারী মালাকুল মওত। আমাকে আমার প্রতিপালক তার এক বান্দার নিকট এই সু-সংবাদ দিয়ে প্রেরণ করেছেন যে, তাঁকে আল্লাহ খলীল রূপে গ্রহণ করেছেন। ইবরাহীম (আ) বললেন, সেই বান্দাটি কে? আল্লাহর কসম, এ সংবাদটি যদি আমাকে দিতে! তিনি কোন দূরতম এলাকায় অবস্থান করলেও আমি তাঁর নিকট যেতাম এবং আমৃত্যু সেখানেই অবস্থান করতাম। মালাকুল মওত বললেন— আপনিই হচ্ছেন সেই বান্দা। ইবরাহীম (আ) বললেন, আমি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আপনিই। ইবরাহীম (আ) বললেন, আল্লাহ আমাকে কি কারণে তাঁর খলীলরূপে গ্রহণ করলেন? তিনি জবাব দিলেন, কারণ এই যে, আপনি মানুষকে দান করেন, তাদের কাছে কিছু চান না। ইবন আবু হাতিম (র) এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ্ হযরত ইবরাহীম (আ)-এর এই গুণের কথা উল্লেখ করে কুরআনের বহু স্থানে তার প্রশংসা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, কুরআনের পঁয়ত্রিশ জায়গায় এর উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে কেবল সূরা বাকারায় পনের জায়গায় তার উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম (আ) সেই পাঁচজন উলুল-আযম (দৃঢ় প্রতিজ্ঞ) নবীর অন্যতম, নবীগণের মধ্যে যাদের নাম আল্লাহ তা’আলা কুরআনের দুইটি সূরায় অর্থাৎ সূরা আহযাব ও সূরা শূরায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। আয়াত দু’টি হলোঃ
(وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْهُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا) [Surat Al-Ahzab 7]
অর্থাৎ, স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার নিকট থেকেও এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা এবং ঈসা ইবন মারয়ামের নিকট থেকে। আমি তাদের নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার। (সূরা আহযাবঃ ৭)
আল্লাহর বাণীঃ
(شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ) [Surat Ash-Shura 13]
অর্থ, আল্লাহ তোমাদের জন্যে বিধিবদ্ধ করেছেন সেই দীন যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি তোমার নিকট এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এ কথা বলে যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে মতভেদ কর না। (সূরা শূরাঃ ১৩)
উক্ত পাঁচজন উলুল আযম নবীদের মধ্যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর পরেই হযরত ইবরাহীম (আ)-এর স্থান। (মি’রাজ রজনীতে) তিনি হযরত ইবরাহীম (আ)-কে সপ্তম আকাশের উপরে বায়তুল মা’মূরে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখেছিলেন। যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদত করার জন্যে প্রবেশ করেন এবং আর কখনও দ্বিতীয়বার সেখানে প্রবেশের সুযোগ তাদের আসে না। আর শূরায়ক ইবন আবু নুমায়র হযরত আনাস (রা) সূত্রে মি’রাজ সম্পর্কের হাদীসে যে বর্ণনা করেছেন, ইবরাহীম (আ) ষষ্ঠ আকাশে এবং মূসা (আ) সপ্তম আকাশে ছিলেন, উক্ত হাদীসে রাবী শূরায়ক-এর ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ সমালোচনা করেছেন। সুতরাং প্রথম হাদীসই সঠিক ও বিশুদ্ধ।
ইমাম আহমদ (র) আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ
ان الكريم بن الكريم بن الكريم يوسف بن يعقوب بن اسحاق بن ابرهيم خليل
অর্থ, একজন সম্মানিত পুত্র যার পিতাও ছিল সম্মানিত। তার পিতাও ছিল সম্মানিত এবং তার পিতাও ছিল সম্মানিত। এরা হল ইউসুফ, তার পিতা ইয়াকূব। তার পিতা ইসহাক এবং তার পিতা ইবরাহীম খলীল (আ)। ইমাম আহমদ (র) এ হাদীসটি এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
হযরত মূসা (আ) থেকে হযরত ইবরাহীম (আ) যে শ্রেষ্ঠ এ বিষয়টি নিম্নোক্ত হাদীসের দ্বারা প্রতীয়মান হয়। যেখানে বলা হয়েছেঃ
واخرت الثالثة ليوم ير غب الى الخلق كلهم حتى ابراهيم
অর্থাৎ তৃতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি আমাকে দান করা হয়েছে তা সেইদিন দেয়া হবে, যেই দিন সমস্ত মানুষ আমার প্রতি আকৃষ্ট হবে, এমনকি ইবরাহীমও।
এ হাদীস ইমাম মুসলিম উবাই ইবন কা’ব (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আর তাহল ‘মাকামে মাহমূদ’। রাসূল (সা) পূর্বেই তা জানিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, ‘কিয়ামতের দিন আমি হব বনী আদমের সর্দার এবং এতে আমার অহংকার নেই।’ ঐ হাদীসে এর পর বলা হয়েছে যে, মানুষ সুপারিশ পাওয়ার জন্যে আদম (আ)-এর কাছে যাবে, তারপর নূহ, তারপরে ইব্রাহীম, তারপরে মূসা ও তারপরে ঈসা (আ)-এর কাছে যাবে। প্রত্যেকেই সুপারিশ করতে অস্বীকার করবেন। সবশেষে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে যাবে। তখন তিনি বলবেন, ‘আমিই এর যোগ্য। এটা আমারই কাজ।’ বুখারী শরীফে বিভিন্ন জায়গায় এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম ও নাসাঈ ইবন উমর আল আমরী সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
ইমাম বুখারী (র) আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-কে জিজ্ঞেস করা হয়, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অধিক সম্মানিত মানুষ কে? রসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ অধিকতর মুত্তাকী ব্যক্তি। তারা বললেনঃ আমরা আপনাকে এ কথা জিজ্ঞেস করি নাই। পরে তিনি বললেন, তা হলে ইউসুফ; যিনি আল্লাহর নবী, তাঁর পিতাও আল্লাহর নবী, তাঁর পিতাও আল্লাহর নবী এবং তার পিতা আল্লাহর খলীল। সাহাবাগণ বললেনঃ আমরা এটাও জিজ্ঞেস করিনি। তিনি বললেন, তা হলে কি তোমরা আরবদের উৎসসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছ? তবে শোনঃ জাহিলী যুগে যারা উত্তম ছিল, ইসলামী যুগেও তারাই উত্তম, যদি তারা ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন হয়। বুখারী, নাসাঈ ও আহমদ (র) বিভিন্ন সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদ (র) ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ হাশরের ময়দানে মানুষকে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ ও খাৎনাবিহীন অবস্থায় উঠানো হবে। সর্বপ্রথম ইবরাহীম (আ)-কে কাপড় পরান হবে। এরপর তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করেনঃ
كما بدأنا اول خلق نعيده
‘যে অবস্থায় আমি প্রথমে সৃষ্টি করেছি ঐ অবস্থায়ই পুনরায় উঠাব।’ (২১ আম্বিয়াঃ ১০৪)
ইমাম বুখারী ও মুসলিম (র) উভয়েই এ হাদীসটি ভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর এই বিশেষ ফযীলত ও সম্মানের কারণে তিনি ‘মাকামে মাহমূদের অধিকারীর’ তুলনায় অধিক সম্মানিত হয়ে যাননি। যে মাকামে মাহমূদের জন্যে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবাই ঈর্ষান্বিত হবেন।
ইমাম আহমদ (র) আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেনঃ এক ব্যক্তি রাসূল (সা)-কে সম্বোধন করে বলল, يا خير البرية (হে সৃষ্টিকুলের সেরা!) রাসূল (সা) বললেন, তিনি হলেন হযরত ইব্রাহীম (আ)। ইমাম মুসলিমও এ হাদীসটি বিভিন্ন মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী (র) একে সহীহ ও হাসান বলেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ কথাটি আপন পিতৃ-পুরুষ হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সম্মানার্থে বিনয় প্রকাশ স্বরূপ বলেছেন। যেমন তিনি বলেছেনঃ অন্য নবীদের উপরে তোমরা আমাকে প্রাধান্য দিও না (لا تفضلو ني علي)তিনি আরও বলেছেন তোমরা আমাকে মূসার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করো না। কারণ, কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুশ হয়ে পড়ে থাকবে। অতঃপর সর্বপ্রথম আমার হুঁশ ফিরে আসবে। কিন্তু আমি উঠে দেখতে পাব মূসা (আ) আল্লাহর আরশের স্তম্ভ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জানি না, মূসা (আ) কি আমার পূর্বেই হুঁশপ্রাপ্ত হবেন, না কি তূর পাহাড়ে বেহুশ হওয়ার বদলাম্বরূপ এ রকম করা হবে। এই সব বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও মুহাম্মদ (সা)-এর কিয়ামতের দিন বনী আদমের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও সর্দার হওয়াতে কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। কেননা, মুতাওয়াতির সূত্রে একথা প্রমাণিত যে, কিয়ামতের দিন তিনিই হবেন سبد واد ادم তথা মানবকুল শ্রেষ্ঠ।
অনুরূপভাবে মুসলিম শরীফে উবাই ইবন কাব সূত্রে বর্ণিত হাদীস—‘আমাকে যে তিনটি বিশেষত্ব দান করা হয়েছে তার তৃতীয়টি সেদিন দেয়া হবে, যেদিন সকল মানুষ আমার প্রতি আকৃষ্ট হবে। এমনকি ইবরাহীমও।’ এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শ্রেষ্ঠত্বই প্রমাণিত হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর পরেই হযরত ইবরাহীম (আ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উলুল-আযম রাসূল প্রমাণিত হবার কারণে সালাতের মধ্যে তাশাহহুদে ইবরাহীম (আ)-এর উল্লেখ করতে মুসল্লীদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন বুখারী ও মুসলিমে কা’ব ইবন আজুরা (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণিত হয়েছে। কা’ব বলেন, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রতি সালাম তো আমরা জানি, কিন্তু আপনার প্রতি সালাত কীভাবে? জবাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমরা বলবেঃ
اللهم صل على محمد وعلى آل محمد كما صليت على ابراهیم وعلی آل ابراهيم وبارك على محمد وعلى آل محمد کما بارکت علی ابراهیم و على ال ابراهيم إنك حميد مجيد.
অর্থাৎ, (হে আল্লাহ! মুহাম্মদের প্রতি ও তাঁর পরিবার বর্গের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন যেমনি আপনি ইবরাহীমের উপর ও তাঁর পরিবারবর্গের উপরে রহমত বর্ষণ করেছিলেন। আর মুহাম্মদের প্রতি এবং তার পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করুন। যেমনি আপনি ইব্রাহীমের উপর ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি বরকত দান করেছিলেন। আপনি অত্যধিক প্রশংসিত ও সম্মানিত)।
আল্লাহর বাণীঃ
وابرهيم الذىوفى
‘আর ইব্রাহীম তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছিল।’ অর্থাৎ তাঁকে যত প্রকার হুকুম করা হয়েছিল তিনি তার সবগুলোই পালন করেছিলেন। ঈমানের সমস্ত গুণাগুণ ও সকল শাখা-প্রশাখা তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। কোন বড় ও জটিল সমস্যাই তাকে কোন ছোট হুকুম পালনে বাধা দিতে পারেনি এবং বড় ধরনের হুকুম পালনের ক্লান্তি তাকে ছোট ধরনের হুকুম পালনে বিরত রাখেনি। আবদুর রাযযাক (র) ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে নিম্নের আয়াত
وإذ ابتلى إبراهيم ربه بكلمات فاتمهن .
(স্মরণ কর, ইবরাহীমকে তার প্রতিপালক কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা নিলে তিনি সবগুলোই পূরণ করেন)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ আল্লাহ্ ইবরাহীমকে মাথা সংক্রান্ত পাঁচ প্রকার, পবিত্রতা এবং দেহের অবশিষ্ট অংশ সংক্রান্ত পাঁচ প্রকার পবিত্রতার হুকুম দ্বারা পরীক্ষা করেছেন। মাথার পাঁচ প্রকার এইঃ (১) গোঁফ কাটা (2) কুলি করা (৩) মিস্ওয়াক করা (৪) পানি দ্বারা নাক পরিষ্কার করা। (৫) মাথার চুলের সিঁথি কাটা। অবশিষ্ট শরীরের পাঁচ প্রকার হল (১) নখ কাটা (২) নাভীর নীচের পশম মুণ্ডন (৩) খাৎনা করা (৪) বগলের পশম উঠান (৫) পেশাব-পায়খানার পর পানি দ্বারা শৌচ করা। ইবন আবূ হাতিম এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আবদুর রাযযাক বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, মুজাহিদ, শা’বী, নখঈ, আবূ সালিহ্ ও আবুল জালদও অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। বুখারী ও মুসলিমে আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ মানুষের স্বভাবগত পরিচ্ছন্নত পাঁচটি (১) খানা করা (২) ক্ষৌর কর্ম করা (৩) গোঁফ কাটা (৪) নখ কাটা (৫) বগলের পশম উঠান। সহীহ মুসলিম ও সুনান গ্রন্থাদিতে আয়েশা (রা) সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, স্বভাবগত পরিচ্ছন্নতা দশটি (১) গোঁফ ছাঁটা (২) দাড়ি লম্বা হতে দেয়া (৩) মিসওয়াক করা (৪) পানি দ্বারা নাক পরিষ্কার করা (৫) নখ কাটা (৬) দেহের গ্রন্থি পানি দ্বারা ধোয়া (৭) বগলের পশম উঠান (৮) নাভীর নীচের অংশে ক্ষৌর করা। (৯) পানি দ্বারা ইসতিনজা করা (১০) খাৎনা করা। খাৎনার সময়ে তাঁর (ইব্রাহীম (আ)-এর) বয়স সম্পর্কে আলোচনা পরে আসছে। যাই হোক নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে ইবাদত-বন্দেগী হযরত ইবরাহীম (আ)-কে শরীরের যত্ন নেয়া, প্রত্যেক অসঙ্গে-প্রত্যঙ্গের হক আদায় করা, সৌন্দর্য রক্ষা করা এবং যে জিনিসগুলো ক্ষতিকর ছিল যথাঃ অধিক পরিমাণ চুল, বড় নখ, দাঁতের ময়লা ও দাগ দূর করা থেকে অমনোযোগী করে রাখত না। সুতরাং এ বিষয়গুলোও আল্লাহ্ কর্তৃক ইবরাহীমের প্রশংসা (ইব্রাহীম তার কর্তব্য বাস্তবায়ন করেছে)-এর অন্তর্ভুক্ত।
জান্নাতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রাসাদ
হাফিজ আবু বকর আল বাযযার (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ জান্নাতের মধ্যে মনি-মুক্তা দ্বারা নির্মিত একটি অতি মনোরম প্রাসাদ রয়েছে। কোন ভাঙ্গাচুরা বা ফাটল তাতে নেই। আল্লাহ তাঁর খলীলের জন্যে এটি তৈরি করেছেন। আল্লাহর মেহমান হিসেবে তিনি তাতে থাকবেন। বাযযার (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। অতঃপর বাযযার (র) বলেন, এই হাদীসের বর্ণনাকারী হামমাদ ইবন সালামা থেকে কেবল য়াযীদ ইবন হারুন ও নযর ইবন শুমায়লী মারফু হিসেবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ঐ দু’জন বাদে অন্য সবাই মওকূফ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ত্রুটি না থাকলে হাদীসটি সহীহ্-এর শর্তে উত্তীর্ণ হতো, কিন্তু ইমাম বুখারী ও মুসলিম (র) এটি বর্ণনা করেননি।
ইবরাহীম (আ)-এর আকৃতি–অবয়ব
ইমাম আহমদ (র) জাবির (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমার সম্মুখে পয়গম্বরগণকে পেশ করা হয়। তন্মধ্যে মূসা (আ) শানুয়া গোত্রের লোকদের অনুরূপ দেখতে পাই। ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-কে অনেকটা উরওয়া ইবন মাসউদের মত এবং ইবরাহীম (আ)-কে অনেকটা দাহয়া কালবীর মত দেখতে পাই। এ সনদে ও এ পাঠে ইমাম আহমদ (র) একাই এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদ (র) আসওয়াদ ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেনঃ আমি ঈসা ইবন মারয়াম, মূসা ও ইব্রাহীম (আ)-কে দেখেছি। তন্মধ্যে ঈসা (আ) ছিলেন গৌরবর্ণ, চুল ঘন কাল, বক্ষদেশ প্রশস্ত। আর মূসা (আ) ছিলেন ধূসরবর্ণ ও বলিষ্ঠ দেহী। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ আর ইব্রাহীম (আ)? রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, তোমাদের সাথীর দিকে তাকাও অর্থাৎ তাঁর নিজের দিকে ইঙ্গিত করেন। ইমাম বুখারী মুজাহিদ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি ইবন আব্বাস (রা) থেকে শুনেছেন যে, লোকজন তার সম্মুখে দাজ্জালের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছিল এবং বলছিল, দাজ্জালের চক্ষুদ্বয়ের মধ্যখানে লিখিত থাকবে কাফির। ইবন আব্বাস (রা) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে এ কথা শুনি নাই। বরং তিনি বলেছেনঃ ইবরাহীম (আ)-কে যদি দেখতে চাও, তবে তোমাদের সাথীর প্রতি তাকাও। আর মূসা (আ) হলেন, ঘনচুল, ধূসর রং বিশিষ্ট। তিনি একটি লাল উটের উপর উপবিষ্ট—যার নাকের রশি খেজুর গাছের ছালের তৈরি। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তিনি এ অবস্থায় উপত্যকার দিকে নেমে আসছেন। বুখারী ও মুসলিম (র) এ হাদীসটি ভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী (র) ‘কিতাবুল হজ্জ’ ও ‘কিতাবুল লিবাসে’ এবং মুসলিম (র)ও আবদুল্লাহ ইবন আওন সূত্রে এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন।
হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর ইনতিকাল ও তাঁর বয়স প্রসঙ্গ
ইবন জারীর (র) তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত ইব্রাহীম (আ) নমরূদ (ইবন কিনআন)-এর যুগে জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে যে, এই নমরূদই ছিল প্রসিদ্ধ বাদশাহ যাহ্হাক। সে দীর্ঘ এক হাজার বছর যাবত বাদশাহী করেছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে। তার শাসন আমল ছিল জুলুম-অত্যাচারে পরিপূর্ণ। কোন কোন ইতিহাসবিদের মতে, এই নমরূদ ছিল বনূ রাসিব গোত্রের লোেক। এই গোত্রেই হযরত নূহ (আ) প্রেরিত হয়েছিলেন। নমরূদ ঐ সময় সমগ্র দুনিয়ার বাদশাহ ছিল। ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেছেন, একদা আকাশে একটি নক্ষত্র উদিত হয়। তার জ্যোতির সম্মুখে সূর্য ও চন্দ্র নিষ্প্রভ হয়ে যায়। এ অবস্থায় লোকজন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নমরূদ বিচলিত হয়ে দেশের সব গণক ও জ্যোতির্বিদদের একত্র করে এর কারণ জিজ্ঞেস করে। তারা জানাল, আপনার রাজত্বের মধ্যে এমন এক শিশুর জন্ম হবে যার হাতে আপনার বাদশাহীর পতন ঘটবে। নমরূদ তখন রাজ্যব্যাপী ঘোষণা দিল, এখন থেকে কোন পুরুষ স্ত্রীর কাছে যেতে পারবে না এবং এখন থেকে কোন শিশুর জন্ম হলে তাকে হত্যা করা হবে। এতদসত্ত্বেও হযরত ইবরাহীম (আ) ঐ সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ তাকে হিফাজত করেন ও পাপিষ্ঠদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেন। তিনি তাকে উত্তমভাবে লালন-পালনের ব্যবস্থা করেন। ক্রমশ বড় হয়ে তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন, যা পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর জন্মভূমি ছিল ‘সূস’ কারও মতে ‘বাবেল’, কারও মতে কূছায় ৮০ (মু’জামুল বুলদান কিতাবে এর নাম লেখা হয়েছে ‘কূছা’ كاف এর উপর পেশ, واو সাকিন, ثا এর উপর যবর ও শেষে আলিফে মাকসূরা ياء সহ লেখা হয়ে থাকে। যেহেতু এটা চার অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ। কুছায় নামে তিনটি জায়গা আছে (১) সাওয়াদুল ইরাকে (২) বাবেলে (৩) মক্কায়। ইরাকের কুছায় দুটি (১) কুছায় তারীক (২) কুছায় রীবী। এটাই ইব্রাহীম (আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত স্থান এবং এখানেই তার জন্ম হয়। এ দু’টি স্থানই বাবেলে অবস্থিত। এখানেই ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। উক্ত দুটি কুছায় বাবেলের দুই প্রান্তে অবস্থিত।) -এর পার্শ্ববর্তী সাওয়াদ নামক এক গ্রাম। ইতিপূর্বে হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে হযরত ইব্রাহীম (আ) দামেশকের পূর্ব পার্শ্বে বারযাহ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর হাতে নমরূদের পতন ঘটাবার পর তিনি প্রথমে হারানে এবং পরে সেখান থেকে শাম দেশে হিজরত করেন এবং সেখান থেকে ঈলিয়ায় গিয়ে বসবাস করেন। অতঃপর ইসমাঈল ও ইসহাক (আ)-এর জন্ম হয়। তারপর কিনআনের অন্তর্গত হিবরূন নামক স্থানে সারাহর ইনতিকাল হয়। আহলে কিতাবগণ উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুকালে সারাহর বয়স হয়েছিল একশ’ সাতাশ বছর। ইবরাহীম (আ) সারাহর মৃত্যুতে অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং দুঃখ প্রকাশ করেন। বনূ হায়ছ গোত্রের আফরূন ইবন সাখার নামক এক ব্যক্তির কাছ থেকে চারশ’ মিছকালের বিনিময়ে তিনি একটি জায়গা ক্রয় করেন এবং সারাহকে সেখানে দাফন করেন। এরপর ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসহাককে রুফাকা বিনত বাতূঈল ইবন নাহূর ইবন তারাহ্-এর সাথে বিবাহ করান। পুত্রবধুকে আনার জন্যে তিনি নিজের ভৃত্যকে পাঠিয়ে দেন। সে রুফাকা ও তার দুধ-মা ও দাসীদেরকে উটের উপর সওয়ার করে নিয়ে আসে।
আহলি কিতাবদের বর্ণনাঃ হযরত ইবরাহীম (আ) অতঃপর কানতুরা নাম্নী এক মহিলাকে বিবাহ করেন এবং তার গর্ভে যামরান, ইয়াকশান, মাদান, মাদয়ান, শায়াক ও শূহ-এর জন্ম হয়। এদের প্রত্যেকের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কেও বিবরণ রয়েছে।
ইবন আসাকির বিভিন্ন প্রাচীন পণ্ডিতদের বরাতে ইবরাহীম (আ)-এর কাছে মালাকুল মওতের আগমন সম্পর্কে আহলে কিতাবদের উপাখ্যানসমূহ বর্ণনা করেছেন। সঠিক অবস্থা আল্লাহই ভাল জানেন। কেউ কেউ বলেছেন, হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ)-এর মত হযরত ইবরাহীম (আ)-ও আকস্মিকভাবে ইনতিকাল করেন। কিন্তু আহলে কিতাব ও অন্যদের বর্ণনা এর বিপরীত। তারা বলেছেন, ইবরাহীম (আ) পীড়িত হয়ে একশ’ পঁচাত্তর বছর মতান্তরে একশ’ নব্বই বছর বয়সে ইনতিকাল করেন এবং আফরান হায়ছীর সেই জমিতে তাঁর সহধর্মিনী সারাহর কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। ইসমাঈল (আ) ও ইসহাক (আ) উভয়ে দাফনকার্য সম্পাদন করেন। ইবনুল-কালবী বলেছেন, ইবরাহীম (আ) দু’শ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। আবু হাতিম ইবন হিব্বান তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থে মুফাযযল… আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, হযরত ইবরাহীম (আ) বাটালীর সাহায্যে খাতুনা করান। তখন তার বয়স ছিল একশ’ বিশ বছর। এরপর তিনি আশি বছর কাল জীবিত থাকেন। হাফিজ ইবন আসাকির (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে এ হাদীসখানা মওকূফ’ভাবে বর্ণনা করেছেন।
তারপর ইবন হিব্বান (র) এ হাদীস যারা মারফূভাবে বর্ণনা করেছেন তাদের বর্ণনাকে বাতিল বলে অভিহিত করেছেন, যেমন মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ (র) আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা) বলেছেন, ইবরাহীম (আ) যখন একশ’ বিশ বছর বয়সে উপনীত হন, তখন খাতনা করান এবং এরপর আশি বছর জীবিত থাকেন। আর তিনি কাদাম (ছুঁতারের বাইস) দ্বারা খানা করিয়েছিলেন। হাফিজ ইবন আসাকির (র) আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। নবী করীম (সা) বলেছেনঃ ইবরাহীম (আ) যখন খাৎনা করান তখন তাঁর বয়স ছিল আশি বছর। ইবন হিব্বান আবদুর রাযযাক থেকে বর্ণনা করেছেন যে, কাদূম একটা গ্রামের নাম। আমার জানা মতে ‘সহীহ’ গ্রন্থে যা এসেছে তা এই যে, ইবরাহীম (আ) যখন খানা করান তখন তিনি আশি বছর বয়সে পৌঁছেন। অন্য বর্ণনায় তাঁর বয়স ছিল আশি বছর। এ দুটি বর্ণনার কোনটিতেই এ কথা নেই যে, তিনি পরে কত দিন জীবিত ছিলেন। আল্লাহই সম্যক অবগত। মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল ‘তাফসীরে ওকী’র মধ্যে ‘যিয়াদাত’ থেকে উদ্ধৃত করেছেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেনঃ ইবরাহীম (আ) সর্বপ্রথম পায়জামা পরিধান করেন, সর্বপ্রথম মাথার চুলে সিঁথি কাটেন, সর্বপ্রথম ক্ষৌর কর্ম করেন, সর্বপ্রথম খাৎনা করান কাদূমের সাহায্যে। তখন তাঁর বয়স ছিল একশ’ বিশ বছর এবং তারপরে আশি বছর জীবিত থাকেন। তিনিই সর্বপ্রথম অতিথিকে আহার করান, সর্বপ্রথম প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হন। এ মওকুফ হাদীসটি মারফু হাদীসেরই অনুরূপ। ইবন হিব্বান (র) এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন।
ইমাম মালিক (র) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রা) থেকে বর্ণনা করেন। ইবরাহীম (আ)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি অতিথিকে আহার করান এবং প্রথম মানুষ যিনি খাৎনা করান, সর্বপ্রথম তিনিই গোঁফ ছাঁটেন, সর্বপ্রথম তিনিই প্রৌঢ়ত্বের শুভ্রতা প্রত্যক্ষ করেন। ইবরাহীম (আ) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! এটা কী? আল্লাহ বললেন, এ হল মর্যাদা। ইবরাহীম (আ) বললেন, হে প্রতিপালক! তা হলে আমায় মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে দিন। ইয়াহয়া ও সাঈদ ব্যতীত অন্য সবাই আরও কিছু বাড়িয়ে বলেছেন যেমনঃ তিনিই সর্বপ্রথম লোক যিনি গোঁফ ছোট করেন, সর্বপ্রথম ক্ষৌরকর্ম করেন, সর্বপ্রথম পায়জামা পরিধান করেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কবর, তাঁর পুত্র ইসহাক (আ)-এর কবর ও তাঁর পৌত্র ইয়াকূব (আ)-এর কবর ‘মুরাব্বা’ নামক গোরস্তানে যা হযরত সুলায়মান ইবন দাউদ (আ) হিবরূন (Hebron) শহরে তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে এর নাম বালাদুল খলীল (খলীলের শহর)।৮১ (সম্প্রতিকালে শহরটি খলিলীয়া নামে পরিচিতি।) বনী ইসরাঈলের যুগ থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত বংশ ও জাতি পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে এ কথাই চলে আসছে। যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কবর মুরাব্বাতে অবস্থিত। সুতরাং কথাটা যে সঠিক, তা নিশ্চিতভাবে বলা চলে। তবে কোন নির্ভরযোগ্য সূত্রে তাঁর কবর কোনটি তা নির্ণিত হয়নি।
সুতরাং ঐ স্থানটির যত্ন করা এবং তার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা সকলের কর্তব্য, এ স্থানটি পদদলিত করা উচিত নয়। কেননা, হতে পারে যে স্থানটি পদদলিত করা হচ্ছে তারই নিচে হযরত ইবরাহীম খলীল বা তার কোন পুত্রের কবর রয়েছে। ইবন আসাকির ওহব ইবন মুনাব্বিহ সূত্রে বলেছেন, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কবরের কাছে একটি প্রাচীন শিলা পাওয়া গিয়েছে, যার উপর নিম্নলিখিত কবিতা লেখা রয়েছেঃ
الهى جهولا امله – يموت من جا اجله
او من دنا من حتفه – لم تغن عنه حيله
وكيف يبقى اخر – من مات عنه اوله
والمرء لا يصحبه – في القبر الا عمله
অর্থঃ হে আল্লাহ! যে ব্যক্তির নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসে তার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে মৃত্যুর কাছে সে আত্মসমর্পণ করে। মৃত্যু যার দুয়ারে এসে যায় তাকে কোন কলাকৌশল আর বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। পূর্বের লোকই যখন গত হয়ে গেছে, তখন আর শেষের লোক টিকে থাকে কোন উপায়ে। মানুষ তার কবরের সাথী নিজের আমল ভিন্ন কাউকেই পাবে না।
হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সন্তান–সন্তুতি প্রসঙ্গ
হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আ)। যিনি মিসরের কিবতী বংশীয়া হাজেরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। এরপর ইবরাহীম (আ)-এর স্ত্রী তার চাচাত বোন সারাহর গর্ভের দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক (আ) জন্মগ্রহণ করেন। তারপর হযরত ইবরাহীম (আ) কিনআনের কানতুরা বিনত ইয়াকতানকে বিবাহ করেন। তাঁর গর্ভে ছয়টি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তারা হলেন (১) মাদয়ান (২) যামরান (৩) সারাজ (৪) য়াকশান (৫) নাশুক (৬) এ নামটি অজ্ঞাত। এরপর হযরত ইবরাহীম (আ) হাজুন বিনত আমীনকে বিবাহ করেন। এই পক্ষে পাঁচটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেনঃ (১) কায়সান (২) সুরাজ (৩) উমায়স (৪) লূতান (৫) লাফিস। আবুল কাসিম সহায়লী তার ‘আত-তারীফ ওয়াল আ’লাম’ গ্রন্থে এরূপ উল্লেখ করেছেন।
হযরত ইবরাহীম (আ)-এর জীবদ্দশায় যে সব বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তন্মধ্যে লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা ও তাদের উপর আল্লাহর আযাবের ঘটনা অন্যতম। ঘটনাটি নিম্নরূপঃ হযরত লূত (আ) ছিলেন হারান ইব্ন তারাহ-এর পুত্র। এই তারাহকেই আযরও বলা হত। যা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। হযরত লূত ছিলেন ইবরাহীম খলীল (আ)-এর ভাতিজা। ইবরাহীম, হারান ও নাজুর এরা ছিলেন তিন ভাই যা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। হারানের বংশধরকে বনূ হারান বলা হয়। কিন্তু আহলে কিতাবদের ইতিহাস এ মত সমর্থন করে না। হযরত লূত (আ) চাচা ইবরাহীম খলীল (আ)-এর নির্দেশক্রমে গওর যাগার অঞ্চলে সাদ্দুম শহরে চলে যান। এটা ছিল ঐ অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র। অনেক গ্রাম, মহল্লা ও ক্ষেত-খামার এবং ব্যবসায়কেন্দ্র এ শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ছিল। এখানকার অধিবাসীরা ছিল দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট, পাপাসক্ত, দুশ্চরিত্র, সংকীর্ণমনা ও জঘন্য কাফির। তারা দস্যুবৃত্তি করতো। প্রকাশ্য মজলিসে অশ্লীল ও বেহায়াপনা প্রদর্শন করত। কোন পাপের কাজ থেকেই তারা বিরত থাকত না। অতিশয় জঘন্য ছিল তাদের কাজ-কারবার। তারা এমন একটি অশ্লীল কাজের জন্ম দেয় যা ইতিপূর্বে কোন আদম সন্তান করেনি। তাহলো, নারীদেরকে ত্যাগ করে তারা সমকামিতায় লিপ্ত হয়। হযরত লূত (আ) তাদেরকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং এসব ঘৃণিত অভ্যাস, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা বর্জন করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের ভ্রান্তি, বিদ্রোহ, পাপ ও কুফরের প্রতি অবিচল থাকে। ফলে, আল্লাহ তাদের উপর এমন কঠিন আযাব নাযিল করলেন যা ফেরাবার সাধ্য কারোরই নেই, এ ছিল তাদের ধারণাতীত ও কল্পনাতীত শাস্তি। আল্লাহ তাদেরকে সমূলে বিনাশ করে দিলেন। বিশ্বের বিবেকবানদের জন্যে তা একটি শিক্ষাপ্রদ ঘটনা হয়ে থাকল। এ কারণেই আল্লাহ তার মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। সূরা আ’রাফে আল্লাহ বলেনঃ
(وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ * إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ ۚ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ * وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ ۖ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ * فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ * وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ) [Surat Al-A’raf]
অর্থাৎ, এবং লূতকে পাঠিয়েছিলাম। সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, “তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি; তোমরা তো কাম-তৃপ্তির জন্যে নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন কর, তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়। তারপর তাকে ও তার স্ত্রী ব্যতীত তার পরিজনবর্গকে উদ্ধার করেছিলাম, তার স্ত্রী ছিল পেছনে রয়ে থাকা লোকদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। সুতরাং অপরাধীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা লক্ষ্য কর! (৭ঃ ৮০-৮৪)
সূরা হূদে আল্লাহ বলেনঃ
(وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا سَلَامًا ۖ قَالَ سَلَامٌ ۖ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاءَ بِعِجْلٍ حَنِيذٍ * فَلَمَّا رَأَىٰ أَيْدِيَهُمْ لَا تَصِلُ إِلَيْهِ نَكِرَهُمْ وَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً ۚ قَالُوا لَا تَخَفْ إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمِ لُوطٍ * وَامْرَأَتُهُ قَائِمَةٌ فَضَحِكَتْ فَبَشَّرْنَاهَا بِإِسْحَاقَ وَمِنْ وَرَاءِ إِسْحَاقَ يَعْقُوبَ * قَالَتْ يَا وَيْلَتَىٰ أَأَلِدُ وَأَنَا عَجُوزٌ وَهَٰذَا بَعْلِي شَيْخًا ۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيْءٌ عَجِيبٌ * قَالُوا أَتَعْجَبِينَ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ۖ رَحْمَتُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الْبَيْتِ ۚ إِنَّهُ حَمِيدٌ مَجِيدٌ * فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ * إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُنِيبٌ * يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَٰذَا ۖ إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَإِنَّهُمْ آتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُودٍ * وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ * وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ ۚ قَالَ يَا قَوْمِ هَٰؤُلَاءِ بَنَاتِي هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ ۖ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي ۖ أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ * قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ * قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَىٰ رُكْنٍ شَدِيدٍ * قَالُوا يَا لُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصِلُوا إِلَيْكَ ۖ فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ إِلَّا امْرَأَتَكَ ۖ إِنَّهُ مُصِيبُهَا مَا أَصَابَهُمْ ۚ إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ ۚ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ مَنْضُودٍ * مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ ۖ وَمَا هِيَ مِنَ الظَّالِمِينَ بِبَعِيدٍ) [Surat Hud]
অর্থাৎ, আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহীমের নিকট আসল। তারা বলল, ‘সালাম’। সেও বলল, ‘সালাম’, সে অবিলম্বে এক কাবাব করা বাছুর আনল। সে যখন দেখল, তাদের হাত ঐটির দিকে প্রসারিত হচ্ছে না। তখন তাদেরকে অবাঞ্ছিত মনে করল এবং তাদের সম্বন্ধে তার মনে ভীতি সঞ্চার হল। তারা বলল, ‘ভয় করো না, আমরা লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি।’ তখন তার স্ত্রী দাঁড়িয়েছিল এবং সে হাসল। তারপর আমি তাকে ইসহাকের ও ইসহাকের পরবর্তী ইয়াকুবের সুসংবাদ দিলাম। সে বলল, ‘কি আশ্চর্য! সন্তানের মা হব আমি যখন আমি বৃদ্ধা এবং এই আমার স্বামী বৃদ্ধ! এটা অবশ্যই এক অদ্ভুত ব্যাপার।’ তারা বলল, ‘আল্লাহর কাজে তুমি বিস্ময় বোধ করছ? হে পরিবারবর্গ! তোমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ। তিনি প্রশংসাৰ্থ ও সম্মানাহ্।’
তারপর যখন ইবরাহীমের ভীতি দূরীভূত হল এবং তার নিকট সুসংবাদ আসল তখন সে লূতের সম্প্রদায়ের সম্বন্ধে আমার সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল। ইবরাহীম তো অবশ্যই সহনশীল। কোমল-হৃদয়, সতত আল্লাহ অভিমুখী। হে ইবরাহীম! এ থেকে বিরত হও। তোমার প্রতিপালকের বিধান এসে পড়েছে। ওদের প্রতি তো আসবে শাস্তি যা অনিবার্য এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের নিকট আসল তখন তাদের আগমনে সে বিষন্ন হল এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল এবং বলল, ‘এটি নিদারুণ দিন’! তার সম্প্রদায় তার নিকট উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটে আসল এবং পূর্ব থেকে তারা কু-কর্মে লিপ্ত ছিল।
সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার কন্যা, তোমাদের জন্যে এরা পবিত্র। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে আমাকে হেয় করো না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভাল মানুষ নেই?’ তারা বলল, ‘তুমি তো জান, তোমার কন্যাদেরকে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই; আমরা কি চাই তা তো তুমি জানই।’ সে বলল, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকত অথবা যদি আমি নিতে পারতাম কোন শক্তিশালী আশ্রয়! তারা বলল, হে লূত! আমরা তোমার প্রতিপালক প্রেরিত ফেরেশতা। ওরা কখনই তোমার নিকট পৌঁছতে পারবে না। সুতরাং তুমি রাতের কোন এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তোমাদের মধ্যে কেউ পেছন দিকে তাকাবে না, তোমার স্ত্রী ব্যতীত। ওদের যা ঘটবে তারও তাই ঘটবে। প্রভাত ওদের জন্যে নির্ধারিত কাল। প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?
তারপর যখন আমার আদেশ আসল তখন আমি জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম এবং তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর-কংকর যা তোমার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত ছিল। এটি জালিমদের থেকে দূরে নয়। (১১ঃ ৬৯-৮৩)
সূরা হিজরে আল্লাহ বলেনঃ
(وَنَبِّئْهُمْ عَنْ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ * إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلَامًا قَالَ إِنَّا مِنْكُمْ وَجِلُونَ * قَالُوا لَا تَوْجَلْ إِنَّا نُبَشِّرُكَ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ * قَالَ أَبَشَّرْتُمُونِي عَلَىٰ أَنْ مَسَّنِيَ الْكِبَرُ فَبِمَ تُبَشِّرُونَ * قَالُوا بَشَّرْنَاكَ بِالْحَقِّ فَلَا تَكُنْ مِنَ الْقَانِطِينَ * قَالَ وَمَنْ يَقْنَطُ مِنْ رَحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُّونَ * قَالَ فَمَا خَطْبُكُمْ أَيُّهَا الْمُرْسَلُونَ * قَالُوا إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمٍ مُجْرِمِينَ * إِلَّا آلَ لُوطٍ إِنَّا لَمُنَجُّوهُمْ أَجْمَعِينَ * إِلَّا امْرَأَتَهُ قَدَّرْنَا ۙ إِنَّهَا لَمِنَ الْغَابِرِينَ * فَلَمَّا جَاءَ آلَ لُوطٍ الْمُرْسَلُونَ * قَالَ إِنَّكُمْ قَوْمٌ مُنْكَرُونَ * قَالُوا بَلْ جِئْنَاكَ بِمَا كَانُوا فِيهِ يَمْتَرُونَ * وَأَتَيْنَاكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ * فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَاتَّبِعْ أَدْبَارَهُمْ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ وَامْضُوا حَيْثُ تُؤْمَرُونَ * وَقَضَيْنَا إِلَيْهِ ذَٰلِكَ الْأَمْرَ أَنَّ دَابِرَ هَٰؤُلَاءِ مَقْطُوعٌ مُصْبِحِينَ * وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ * قَالَ إِنَّ هَٰؤُلَاءِ ضَيْفِي فَلَا تَفْضَحُونِ * وَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ * قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ *قَالَ هَٰؤُلَاءِ بَنَاتِي إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ * لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ * فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ مُشْرِقِينَ * فَجَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ * إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِلْمُتَوَسِّمِينَ * وَإِنَّهَا لَبِسَبِيلٍ مُقِيمٍ * إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً لِلْمُؤْمِنِينَ) [Surat Al-Hijr]
অর্থাৎ, এবং ওদেরকে বল, ইবরাহীমের অতিথিদের কথা, যখন ওরা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘সালাম’, তখন সে বলেছিল, আমরা তোমাদের আগমনে আতংকিত। ওরা বলল, ‘ভয় করো না, আমরা তোমাকে এক জ্ঞানী পুত্রের শুভ সংবাদ দিচ্ছি।’ সে বলল, তোমরা কি আমাকে শুভ সংবাদ দিচ্ছ আমি বার্ধক্যগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও? তোমরা কী বিষয়ে শুভ সংবাদ দিচ্ছ? ওরা বলল, ‘আমরা সত্য সংবাদ দিচ্ছি, সুতরাং তুমি হতাশ হয়ো না।’ সে বলল, যারা পথভ্রষ্ট তারা ব্যতীত আর কে তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ হতে হতাশ হয়? সে বলল, ‘হে প্রেরিতগণ! তোমাদের আর বিশেষ কি কাজ আছে?’ ওরা বলল, ‘আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রেরণ করা হয়েছে তবে লূতের পরিবারবর্গের বিরুদ্ধে নয়, আমরা অবশ্যই ওদের সকলকে রক্ষা করব। কিন্তু তার স্ত্রীকে নয়। আমরা স্থির করেছি যে, সে অবশ্যই পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত।
ফেরেশতাগণ যখন লূত পরিবারের কাছে আসল, তখন লূত বলল, তোমরা তো অপরিচিত লোক। তারা বলল, না ওরা সে বিষয়ে সন্দিগ্ধ ছিল, আমরা তোমার নিকট তাই নিয়ে এসেছি; ‘আমরা তোমার কাছে সত্য সংবাদ নিয়ে এসেছি এবং অবশ্যই আমরা সত্যবাদী, সুতরাং তুমি রাতের কোন এক সময়ে তোমার পরিবারবর্গসহ বের হয়ে পড় এবং তুমি তাদের পশ্চাদানুসরণ কর এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন পেছন দিকে না তাকায়; তোমাদেরকে যেখানে যেতে বলা হচ্ছে তোমরা সেখানে চলে যাও। আমি তাকে এ বিষয়ে প্রত্যাদেশ দিলাম যে, প্রত্যুষে ওদেরকে সমূলে বিনাশ করা হবে। ’
নগরবাসিগণ উল্লসিত হয়ে উপস্থিত হল। সে বলল, ‘ওরা আমার অতিথি; সুতরাং তোমরা আমাকে বে-ইজ্জত করো না। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ও আমাকে হেয় করো না।’ তারা বলল, ‘আমরা কি দুনিয়াশুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে তোমাকে নিষেধ করিনি?’ লূত বলল, ‘একান্তই যদি তোমরা কিছু করতে চাও তবে আমার এই কন্যাগণ রয়েছে। তোমার জীবনের শপথ, ওরা তো মত্ততায় বিমূঢ় হয়েছে। তারপর সূর্যোদয়ের সময়ে মহানাদ তাদেরকে আঘাত করল; এবং আমি জনপদকে উল্টিয়ে উপর নিচ করে দিলাম এবং ওদের উপর প্রস্তর-কংকর বর্ষণ করলাম। অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে। তা লোক চলাচলের পথের পাশে এখনও বিদ্যমান। অবশ্যই এতে মুমিনদের জন্যে রয়েছে নিদর্শন। (১৫ঃ ৫১-৭৭)
সূরা শুআরায়, আল্লাহ বলেনঃ
(كَذَّبَتْ قَوْمُ لُوطٍ الْمُرْسَلِينَ * إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ لُوطٌ أَلَا تَتَّقُونَ * إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ * فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ * وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ * أَتَأْتُونَ الذُّكْرَانَ مِنَ الْعَالَمِينَ * وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ ۚ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ عَادُونَ * قَالُوا لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ يَا لُوطُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمُخْرَجِينَ * قَالَ إِنِّي لِعَمَلِكُمْ مِنَ الْقَالِينَ * رَبِّ نَجِّنِي وَأَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ * فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ أَجْمَعِينَ * إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَابِرِينَ * ثُمَّ دَمَّرْنَا الْآخَرِينَ * وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ * إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَةً ۖ وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ * وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ) [Surat Ash-Shu’ara 160 – 175]
অর্থাৎ, লূতের সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল, যখন ওদের ভাই লূত ওদেরকে বলল, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তো তোমাদের জন্যে এক বিশ্বস্ত রাসূল। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি এর জন্যে তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না, আমার পুরস্কার তো জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছেই আছে। সৃষ্টির মধ্যে তোমরা তো কেবল পুরুষের সাথেই উপগত হও এবং তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীলোক সৃষ্টি করেছেন তাদেরকে তোমরা বর্জন করে থাক। তোমরা তো সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। ওরা বলল, ‘হে নূত! তুমি যদি নিবৃত্ত না হও, তবে অবশ্যই তুমি নির্বাসিত হবে।’
লূত বলল, ‘আমি তোমাদের এ কাজকে ঘৃণা করি। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এবং আমার পরিবার-পরিজনকে, ওরা যা করে তা থেকে রক্ষা কর।’ অতঃপর আমি তাকে এবং তার পরিবার-পরিজন সকলকে রক্ষা করলাম। এক বৃদ্ধা ব্যতীত, যে ছিল পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর অপর সকলকে ধ্বংস করলাম। তাদের উপর শাস্তিমূলক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম, তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তাদের জন্যে এই বৃষ্টি ছিল কত নিকৃষ্ট! এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে। কিন্তু ওদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। (২৬ঃ ১৬০-১৭৫)
সূরা নামলে আল্লাহ বলেনঃ
(وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ * أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ ۚ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ * فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوا آلَ لُوطٍ مِنْ قَرْيَتِكُمْ ۖ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ * فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ قَدَّرْنَاهَا مِنَ الْغَابِرِينَ * وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ) [Surat An-Naml 54 – 58]
অর্থাৎ, স্মরণ কর, লূতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমরা জেনেশুনে কেন অশ্লীল কাজ করছ? তোমরা কি কাম-তৃপ্তির জন্যে নারীকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক অজ্ঞ সম্প্রদায়। উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু বলল, লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা পবিত্র সাজতে চায়। তারপর তাকে ও তার পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতীত; তাকে করেছিলাম ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের উপর ভয়ংকর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম; যাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল তাদের জন্য এই বর্ষণ ছিল কত মারাত্মক! (২৭ঃ ৫৪-৫৮)
সূরা আনকাবূতে আল্লাহ বলেনঃ
(وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ * أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ ۖ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتِنَا بِعَذَابِ اللَّهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ * قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ * وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا إِنَّا مُهْلِكُو أَهْلِ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ ۖ إِنَّ أَهْلَهَا كَانُوا ظَالِمِينَ * قَالَ إِنَّ فِيهَا لُوطًا ۚ قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيهَا ۖ لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ * وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ ۖ إِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ * إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَىٰ أَهْلِ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ * وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ) [Surat Al-Ankabut 28 – 35]
অর্থাৎ, স্মরণ কর লুতের কথা, সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা তো এমন অশ্লীল কাজ করছ; যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরাই তো পুরুষে উপগত হচ্ছ। তোমরাই তো রাহাজানি করে থাক এবং তোমরাই তো নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্য কাজ করে থাক।’ উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল, ‘আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি নিয়ে এসো যদি তুমি সত্যবাদী হও।’ সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য কর। যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদসহ ইবরাহীমের কাছে আসল, তারা বলেছিল, আমরা এই জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব। এর অধিবাসীরা তো জালিম। ইবরাহীম বলল, এই জনপদে তো লূত রয়েছে। তারা বলল, ‘সেখানে কারা আছে তা আমরা ভাল জানি; আমরা তো লূতকে ও তার পরিবার-পরিজনবর্গকে রক্ষা করবই; তার স্ত্রী ব্যতীত; সে তো পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত।’
এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে আসল, তখন তাদের জন্যে সে বিষন্ন হয়ে পড়ল এবং নিজকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল। তারা বলল, ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমরা তোমাকে ও তোমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করব, তোমার স্ত্রী ব্যতীত; সে তো পেছনে রয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। আমরা এই জনপদবাসীদের উপর আকাশ থেকে শাস্তি নাযিল করব, কারণ তারা পাপাচার করেছিল। আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি। (২৯ঃ ২৮-৩৫)
সূরা সাফফাতে আল্লাহ বলেনঃ
(وَإِنَّ لُوطًا لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ * إِذْ نَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ أَجْمَعِينَ * إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَابِرِينَ * ثُمَّ دَمَّرْنَا الْآخَرِينَ * وَإِنَّكُمْ لَتَمُرُّونَ عَلَيْهِمْ مُصْبِحِينَ * وَبِاللَّيْلِ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ)
[Surat As-Saaffat 133 – 138]
অর্থাৎ, লূতও ছিল রাসূলগণের একজন। আমি তাকে ও তার পরিবারের সকলকে উদ্ধার করেছিলাম-এক বৃদ্ধা ব্যতীত, সে ছিল পেছনে রয়ে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর অবশিষ্টদেরকে আমি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করেছিলাম। তোমরা তো ওদের ধ্বংসাবশেষগুলো অতিক্রম করে থাক সকালে ও সন্ধ্যায়, তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? (৩৭ঃ ১৩৩-১৩৮)
সূরা যারিয়াতে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর মেহমান ও পুত্রের সুসংবাদের ঘটনা উল্লেখ করার পর আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
(قَالَ فَمَا خَطْبُكُمْ أَيُّهَا الْمُرْسَلُونَ * قَالُوا إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمٍ مُجْرِمِينَ * لِنُرْسِلَ عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ طِينٍ * مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُسْرِفِينَ * فَأَخْرَجْنَا مَنْ كَانَ فِيهَا مِنَ الْمُؤْمِنِينَ * فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ * وَتَرَكْنَا فِيهَا آيَةً لِلَّذِينَ يَخَافُونَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ)
[Surat Adh-Dhariyat 31 – 37]
অর্থাৎ, ইবরাহীম বলল, ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমাদের বিশেষ কাজ কী?’ ওরা বলল, ‘আমাদেরকে এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে।’ ওদের উপর নিক্ষেপ করার জন্যে মাটির শক্ত ঢেলা, যা সীমালংঘনকারীদের জন্যে চিহ্নিত, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে। সেখানে যে সব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম এবং সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত কোন আত্মসমর্পণকারী আমি পাইনি। যারা মর্মন্তুদ শাস্তিকে ভয় করে, আমি তাদের জন্যে তাতে একটি নিদর্শন রেখেছি। (৫১ঃ ৩১-৩৭)
সূরা কামার আল্লাহ বলেনঃ
(كَذَّبَتْ قَوْمُ لُوطٍ بِالنُّذُرِ * إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ حَاصِبًا إِلَّا آلَ لُوطٍ ۖ نَجَّيْنَاهُمْ بِسَحَرٍ * نِعْمَةً مِنْ عِنْدِنَا ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي مَنْ شَكَرَ * وَلَقَدْ أَنْذَرَهُمْ بَطْشَتَنَا فَتَمَارَوْا بِالنُّذُرِ * وَلَقَدْ رَاوَدُوهُ عَنْ ضَيْفِهِ فَطَمَسْنَا أَعْيُنَهُمْ فَذُوقُوا عَذَابِي وَنُذُرِ * وَلَقَدْ صَبَّحَهُمْ بُكْرَةً عَذَابٌ مُسْتَقِرٌّ * فَذُوقُوا عَذَابِي وَنُذُرِ * وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ) [Surat Al-Qamar 33 – 40]
অর্থাৎ, লূত সম্প্রদায় প্রত্যাখ্যান করেছিল সতর্ককারীদেরকে, আমি ওদের উপর পাঠিয়েছিলাম পাথরবাহী প্রচণ্ড ঝড়। কিন্তু লূত পরিবারের উপর নয়। তাদেরকে আমি উদ্ধার করেছিলাম রাতের শেষাংশে আমার বিশেষ অনুগ্ৰহস্বরূপ; যারা কৃতজ্ঞ আমি তাদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। লূত ওদেরকে সতর্ক করেছিল আমার কঠোর শাস্তি সম্পর্কে; কিন্তু ওরা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতণ্ডা শুরু করল। ওরা লুতের কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল, তখন আমি ওদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললাম, ‘আস্বাদন কর, আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম। ভোরে বিরামহীন শাস্তি তাদেরকে আঘাত করল এবং আমি বললাম, আস্বাদন কর, আমার শাস্তি এবং সতর্কবাণীর পরিণাম। আমি কুরআন সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্যে; অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি? (৫৪ঃ ৩৩-৪০)
তাফসীর গ্রন্থে এ সব সূরার যথাস্থানে আমরা এই ঘটনার বিশদ আলোচনা করেছি। আল্লাহ হযরত লূত (আ) ও তাঁর সম্প্রদায় সম্পর্কে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করেছেন। আমরা ইতিপূর্বে কওমে নূহ, কওমে আদ ও কওমে ছামূদ-এর আলোচনায় সেসব উল্লেখ করেছি।
এখন আমরা সে সব কথার সার-সংক্ষেপ বর্ণনা করব, যা তাদের কর্মনীতি ও পরিণতি সম্পর্কে কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য কামনা করি। তাহলো, হযরত লূত (আ) তাঁর সম্প্রদায়কে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান। সেইসব অশ্লীল কাজ করতে নিষেধ করেন যার উল্লেখ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা করেছেন। কিন্তু একজন লোকও তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি এবং তার উপর ঈমান আনেনি। নিষেধকৃত কর্ম থেকে কেউ বিরত থাকেনি। বরং তারা তাদের অবস্থার উপর অটল অবিচল হয়ে থাকে এবং নিজেদের ভ্রষ্টতা ও মূর্খতা থেকে বিরত থাকেনি। এমনকি তারা তাদের রাসূলকে তাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
রাসূল যখন তাদেরকে উদ্দেশ করে উপদেশ দেন, তখন তারা বিবেক না খাটিয়ে এই এক উত্তরই দিতে থাকে যে, লূত পরিবারকে তোমরা তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। কেননা, তারা এমন মানুষ যারা পাক-পবিত্র সাজতে চায়। এ কথার মধ্য দিয়ে তারা লূত পরিবারের নিন্দা করতে গিয়ে তাদের চরম প্রশংসাই করেছে। আবার এটাকেই তারা বহিষ্কারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। চরম শত্রুতা ও ঘৃণা থাকার কারণেই তারা লূতকে এ কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু আল্লাহ হযরত লূত (আ)-কে ও তার পরিবারবর্গকে পবিত্র রাখলেন এবং সম্মানের সঙ্গে সেখান থেকে তাদেরকে বের করে আনলেন, তবে তার স্ত্রীকে নয়। আর তার সম্প্রদায়ের সবাইকে আপন বাসভূমিতে চিরস্থায়ীভাবে থাকতে দিলেন। তবে সে থাকা ছিল দুর্গন্ধময় সমুদ্র তরঙ্গের আঘাতে লীন হয়ে। যা ছিল প্রকৃতপক্ষে উত্তপ্ত আগুন ও তাপ প্রবাহ এবং তার পানি তিক্ত ও লবণাক্ত।
তারা নবীকে এরূপ উত্তর তখনই দিয়েছে, যখন তিনি তাদেরকে জঘন্য পাপ ও চরম অশ্লীলতা যা ইতিপূর্বে বিশ্বের কোন লোক করেনি, তা থেকে নিবৃত্ত থাকতে বলেছেন। এ কারণেই তারা বিশ্ববাসীর জন্যে উদাহরণ ও শিক্ষাপ্রদ হয়ে রয়ে গিয়েছে। এ পাপকর্ম ছাড়াও তারা ছিনতাই, রাহাজানি করত, পথের সাথীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করত। প্রকাশ্য মজলিসে বিভিন্ন রকম নির্লজ্জ কথা বলতো এবং লজ্জাজনক কাজে লিপ্ত হতো। যেমন সশব্দে বায়ু ত্যাগ করত। এতে কোন লজ্জা বোধ করত না। অনেক সময় বড় বড় জঘন্য কাজও করত। কোন উপদেশদানকারীর উপদেশ ও জ্ঞানী লোকের পরামর্শের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করতো না। এ জাতীয় কাজের মাধ্যমে তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত বরং তার চাইতেও অধম ও বিভ্রান্ত বলে পরিচয় দিত। তারা তাদের বর্তমান কাজ থেকে বিরত থাকেনি, বিগত পাপ থেকে অনুশোচনা করেনি এবং ভবিষ্যতে আত্মসংশোধনের ইচ্ছাও করেনি। অতএব, আল্লাহ তাদেরকে শক্ত হাতে পাকড়াও করলেন। তারা হযরত লূত (আ)-কে বলেছিলঃ
ائتنا بعذاب الله إن گفت من الصادقين
(তুমি সত্যবাদী হয়ে থাকলে আল্লাহর আযাব আমাদের জন্যে নিয়ে এস) অর্থাৎ নবী তাদের যে কঠিন আযাবের ভয় দেখাচ্ছিলেন তারা সেই আযাব কামনা করছিল এবং ভয়াবহ শাস্তির আবেদন জানাচ্ছিল। এই সময় দয়ালু নবী তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান। তিনি বিশ্ব প্রভু ও রাসূলগণের ইলাহ্-এর নিকট অনাচারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করেন। ফলে নবীর মর্যাদা হানিতে আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক হয়, নবীর ক্রোধের জন্যে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন। নবীর প্রার্থনা কবুল করেন এবং তাঁর প্রার্থিত বস্তু দান করেন। আপন দূত ও ফেরেশতাগণকে প্রেরণ করেন। তারা আল্লাহর খলীল ইবরাহীম (আ)-এর কাছে আগমন করেন। তাকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দেন এবং তারা যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে এসেছেন সে বিষয়টিও তাঁকে জানান।
(قَالَ فَمَا خَطْبُكُمْ أَيُّهَا الْمُرْسَلُونَ * قَالُوا إِنَّا أُرْسِلْنَا إِلَىٰ قَوْمٍ مُجْرِمِينَ * لِنُرْسِلَ عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ طِينٍ * مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ لِلْمُسْرِفِينَ) [Surat Adh-Dhariyat 31 – 34]
অর্থাৎ, ইবরাহীম বলল, হে ফেরেশতাগণ! আপনাদের আগমনের উদ্দেশ্য কী? তারা বলল, আমরা এক অপরাধী সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। যাতে তাদের উপর শক্ত ঢেলা নিক্ষেপ করি, যা সীমালংঘনকারীদের শাস্তি দেয়ার জন্যে আপনার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত রয়েছে।
আল্লাহ বলেনঃ
(وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَىٰ قَالُوا إِنَّا مُهْلِكُو أَهْلِ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ ۖ إِنَّ أَهْلَهَا كَانُوا ظَالِمِينَ * قَالَ إِنَّ فِيهَا لُوطًا ۚ قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيهَا ۖ لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ)
[Surat Al-Ankabut 31 – 32]
অর্থাৎ, আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ ইবরাহীমের কাছে সুসংবাদ নিয়ে আসল, তখন তারা বলেছিল, আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের ধ্বংস করব। কারণ এর অধিবাসীরা জালিম। ইবরাহীম বলল, এই জনপদে তো লূতও আছে। তারা বলল, ওখানে কারা আছে সে সম্পর্কে আমরা ভালভাবে অবগত আছি। আমরা তাকে ও তার পরিবারবর্গকে অবশ্যই রক্ষা করব, তবে তার স্ত্রীকে নয়। সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। (২৯ঃ ৩১-৩২)
আল্লাহ্ বলেনঃ
(إِنَّ إِبْرَاهِيمَ لَحَلِيمٌ أَوَّاهٌ مُنِيبٌ * يَا إِبْرَاهِيمُ أَعْرِضْ عَنْ هَٰذَا ۖ إِنَّهُ قَدْ جَاءَ أَمْرُ رَبِّكَ ۖ وَإِنَّهُمْ آتِيهِمْ عَذَابٌ غَيْرُ مَرْدُودٍ) [Surat Hud 75 – 76]
(যখন ইবরাহীমের ভীতি দূর হল ও সুসংবাদ জানান হল, তখন সে দূতের প্রসঙ্গ নিয়ে আমার সাথে বিতর্ক করা আরম্ভ করল) কেননা, ইবরাহীম (আ) আশা করেছিলেন যে, তারা খারাপ পথ পরিহার করে ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।
তাই আল্লাহ্ বলেনঃ
(فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَىٰ يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ)
[Surat Hud 74]
(নিশ্চয়ই ইবরাহীম বড়ই ধৈর্যশীল, কোমল হৃদয় ও একনিষ্ঠ ইবাদতকারী। হে ইবরাহীম! এ জাতীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাক। তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেছে এবং তাদের উপর সে আযাব অবশ্যই পতিত হবে)। অর্থাৎ এ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে কথা বল। কেননা, তাদের ধ্বংস ও নির্মূল করার আদেশ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে নির্দেশ দেওয়া হয়ে গেছে। তাঁর এ নির্দেশ ও শাস্তি ফেরাবার ও প্রতিহত করার সাধ্য কারও নেই। এ নির্দেশ অপ্রতিরোধ্যভাবে আসবেই। (সূরা হূদঃ ৭৪-৭৫)
সাঈদ ইবন জুবায়র, সুদ্দী, কাতাদা ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ইবরাহীম (আ) ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেনঃ আপনারা কি এমন কোন জনপদ ধ্বংস করবেন যেখানে তিনশ’ মুমিন রয়েছে? তারা বললেন, না। তিনি বললেন, যদি দুশ’ থাকে? তারা বললেন না। ইবরাহীম বললেন, যদি চল্লিশ জন মুমিন থাকে? তারা বললেন, না। তিনি বললেন, যদি চৌদ্দজন মুমিন থাকে? তারা বললেন তবুও না। ইবন ইসহাক লিখেছেনঃ ইবরাহীম (আ) এ কথাও বলেছিলেন যে, যদি একজন মাত্র মুমিন থাকে তবে সেই জনপদ ধ্বংস করার ব্যাপারে আপনাদের মত কি? জবাবে তারা বললেনঃ তবুও ধ্বংস করা হবে না। তখন তিনি বললেন, সেখানে তো লূত রয়েছে। তারা বলল, ‘সেখানে কে আছে তা আমাদের ভালভাবেই জানা আছে।’
আহলি কিতাবদের বর্ণনায় এসেছে যে, ইবরাহীম (আ) বলেছিলেন, হে আল্লাহ! লূত সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্চাশজন সৎকর্মশীল লোক থাকলেও কি আপনি তাদেরকে ধ্বংস করবেন? এভাবে উভয়ের কথোপকথন দশজন পর্যন্ত নেমে আসে। আল্লাহ বলেন, তাদের মধ্যে দশজন সৎকর্মশীল লোক থাকলেও আমি তাদেরকে ধ্বংস করব না।
আল্লাহর বাণীঃ
(وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالَ هَٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ)
[Surat Hud 77]
অর্থাৎ, আর যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লূতের কাছে আগমন করল তখন তাদের আগমনে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হল এবং বলতে লাগল, আজ অত্যন্ত কঠিন দিন। (সূরা হুদঃ ৭৭)
মুফাসসিরগণ বলেছেনঃ এই ফেরেশতাগণ ছিলেন হযরত জিবরাঈল (আ), মীকাঈল (আ) ও ইসরাফীল (আ)। তারা ইবরাহীম (আ)-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসেন এবং সাদ্দুম শহরে এসে উপস্থিত হন। লুত (আ)-এর সম্প্রদায়ের পরীক্ষাস্বরূপ এবং তাদের শাস্তিযোগ্য হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণস্বরূপ তারা সুদর্শন তরুণ বেশে হাযির হন। হযরত লূত (আ)-এর বাড়িতে তারা অতিথি হিসাবে ওঠেন। তখন ছিল সূর্য ডোবার সময়। হযরত লূত (আ) তাদের দেখে ভীত হলেন। মনে মনে ভাবলেন, যদি তিনি আতিথ্য প্রদান না করেন, তবে অন্য কেউ তা করবে। তিনি তাদেরকে মানুষই ভাবলেন। দুশ্চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরল। তিনি বললেন, আজ একটা বড় কঠিন দিন।
ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে মুজাহিদ, কাতাদা ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) হযরত লুত (আ)-এর এ কঠিন পরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত লুত (আ) অন্যান্য সময়ে তাঁর সম্প্রদায়কে নিজের মেহমানদের কাছে ঘেঁষতে নিষেধ করতেন। এ কারণে তারা লূত (আ)-এর উপর শর্ত আরোপ করেছিল যে, তিনি নিজের বাড়িতে কাউকে মেহমান হিসেবে রাখবেন না। কিন্তু সেদিন তিনি এমন লোকদেরকেই মেহমানরূপে দেখতে পেলেন যাদেরকে সরিয়ে দেয়ার উপায়ও ছিল না।
কাতাদা (র) বলেন, হযরত লূত (আ) নিজের ক্ষেতে কাজ করছিলেন, এমন সময় মেহমানগণ তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁর বাড়িতে মেহমান হওয়ার আবেদন জানান। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করতে লজ্জাবোধ করেন এবং সেখান থেকে তাদেরকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হন এবং তাদের আগে আগে হাঁটতে থাকেন। তাদের সাথে তিনি এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতে থাকেন, যাতে তারা এ জনপদ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যান। হযরত লূত (আ) তাদেরকে বললেন, হে ভাইয়েরা! এই জনপদের লোকের চেয়ে নিকৃষ্ট ও দুশ্চরিত্র লোক ধরাপৃষ্ঠে আর আছে কিনা আমার জানা নেই। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে তিনি আবার এ কথা উল্লেখ করেন। এভাবে চারবার তাদেরকে কথাটি বলেন। কাতাদা (র) বলেন, ফেরেশতাগণ এ ব্যাপারে আদিষ্ট ছিলেন যে, যতক্ষণ নবী তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা যেন তাদেরকে ধ্বংস না করেন।
সুদ্দী (র) বলেন, ফেরেশতাগণ ইবরাহীম (আ)-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লূতের সম্প্রদায়ের উদ্দেশে রওয়ানা হন। দুপুর বেলা তারা সেখানে পৌঁছেন। সাদ্দূম নদীর তীরে উপস্থিত হলে হযরত লূত (আ)-এর এক মেয়ের সাথে তাদের সাক্ষাৎ হয়। বাড়িতে পানি নেয়ার জন্যে সে এখানে এসেছিল। লূত (আ)-এর ছিলেন দুই কন্যা। বড়জনের নাম রায়ছা এবং ছোট জনের নাম যারাতা। মেয়েটিকে তারা বললেনঃ ওহে! এখানে মেহমান হওয়া যায় এমন কারও বাড়ি আছে কি? মেয়েটি বললেন, আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত জনপদে প্রবেশ করবেন না। নিজের সম্প্রদায়ের ব্যাপারে মেয়েটির অন্তরে লোকগুলোর প্রতি করুণার উদ্রেক হয়। বাড়ি এসে মেয়েটি পিতাকে সম্বোধন করে বললেনঃ পিতা নগর তোরণে কয়েকজন তরুণ আপনার অপেক্ষায় আছেন। তাদের মত সুদর্শন লোক আমি কখনও দেখিনি। আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদেরকে না লাঞ্ছিত করে! ইতিপূর্বে সম্প্রদায়ের লোকজন হযরত লূত (আ)-কে কোন পুরুষ লোককে মেহমান রাখতে নিষেধ করে দিয়েছিল। যা হোক, হযরত লূত (আ) তাদেরকে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং নিজের পরিবারবর্গের লোকজন ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানতে পারেনি। কিন্তু লূতের স্ত্রী বাড়ি থেকে বের হয়ে জনপদের লোকদের কাছে খবরটি পৌঁছিয়ে দেয়। সে জানিয়ে দেয় যে, লূতের বাড়িতে এমন কতিপয় সুশ্রী তরুণ এসেছে যাদের ন্যায় সুন্দর লোক আর হয় না। তখন লোকজন খুশীতে লূত (আ)-এর বাড়ির দিকে ছুটে আসে।
আল্লাহর বাণীঃ
وَمِن قَبۡلُ كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ ٱلسَّیِّـَٔاتِۚ
[Surat Hud 78]
(ইতিপূর্বে তারা বিভিন্ন রকম পাপকর্মে লিপ্ত ছিল) অর্থাৎ বহু বড় বড় গুনাহর সাথে এই জঘন্য পাপ কাজও তারা চালিয়ে যেতো।
قَالَ یَـٰقَوۡمِ هَـٰۤؤُلَاۤءِ بَنَاتِی هُنَّ أَطۡهَرُ لَكُمۡۖ
[Surat Hud 78]
লূত বলল, হে আমার সম্প্রদায়! এই যে আমার কন্যারা আছে যারা তোমাদের জন্যে পবিত্রতম।
এ কথা দ্বারা হযরত লূত (আ) তাঁর ধর্মীয় ও দীনী কন্যাদের অর্থাৎ তাদের স্ত্রীদের প্রতি ইংগিত করেছেন। কেননা, নবীগণ তাদের উম্মতের জন্যে পিতৃতুল্য। হাদীস ও কুরআনে এরূপই বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেনঃ
وَجَاۤءَهُۥ قَوۡمُهُۥ یُهۡرَعُونَ إِلَیۡهِ وَمِن قَبۡلُ كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ ٱلسَّیِّـَٔاتِۚ قَالَ یَـٰقَوۡمِ هَـٰۤؤُلَاۤءِ بَنَاتِی هُنَّ أَطۡهَرُ لَكُمۡۖ فَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلَا تُخۡزُونِ فِی ضَیۡفِیۤۖ أَلَیۡسَ مِنكُمۡ رَجُلࣱ رَّشِیدࣱ[Surat Hud 78]
নবী মুমিনদের জন্যে তাদের নিজেদের চাইতেও ঘনিষ্ঠতর আর তাঁর স্ত্রীগণ মুমিনদের মা। (৩৩: ৬)। কোন কোন সাহাবা ও প্রাচীন আলিমগণের মতে নবী মু’মিনদের পিতা।
উপরোক্ত আয়াতের অনুরূপ আর একটি আয়াত এইঃ
أَتَأۡتُونَ ٱلذُّكۡرَانَ مِنَ ٱلۡعَـٰلَمِینَ وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمۡ رَبُّكُم مِّنۡ أَزۡوَ ٰجِكُمۚ بَلۡ أَنتُمۡ قَوۡمٌ عَادُونَ[Surat Ash-Shu’ara 165 – 166]
অর্থাৎ, তোমরা বিশ্বের পুরুষদের কাছে গমন করছ। আর তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে যে স্ত্রীকুল সৃষ্টি করেছেন তাদেরকে পরিত্যাগ করছ; বরং তোমরা এক সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়। (২৬: ১৬৫)
মুজাহিদ, সাঈদ ইবন জুবায়র, রাবী ইবন আনাস, কাতাদা, সুদ্দী ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) আয়াতের উক্তরূপ ব্যাখ্যা করেছেন এবং এ ব্যাখ্যাই সঠিক। দ্বিতীয় মতটি অর্থাৎ তাঁর নিজের কন্যাগণ হওয়া ভুল। এটা আহলি কিতাবদের থেকে গৃহীত এবং তাদের কিতাবে অনেক বিকৃতি ঘটেছে। তাদের আর একটি ভুল উক্তি এই যে, ফেরেশতারা সংখ্যায় ছিলেন দুইজন এবং রাত্রে তারা লুত (আ)-এর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করেন। এছাড়া আহলি কিতাবগণ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক অদ্ভুত মিথ্যা উপাখ্যান সৃষ্টি করেছে।
আল্লাহর বাণীঃ
فَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلَا تُخۡزُونِ فِی ضَیۡفِیۤۖ أَلَیۡسَ مِنكُمۡ رَجُلࣱ رَّشِیدࣱ
[Surat Hud 78]
অতএব, আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেহমানদের প্রতি অন্যায় আচরণ করে আমাকে হেয় কর না। তোমাদের মধ্যে কি কোন ভাল মানুষ নেই? (১১: ৭৮)
এ আয়াতে হযরত লুত (আ) নিজ জাতিকে অশ্লীল কাজ থেকে বারণ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি এ কথারও সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তাদের সমাজের একজন লোকও সুস্থ রুচির বা ভাল স্বভাবের ছিল না; বরং সমাজের সমস্ত লোকই ছিল নির্বোধ, জঘন্য পাপাসক্ত ও নিরেট কাফির। ফেরেশতাগণও এটাই চাচ্ছিলেন যে, সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পূর্বেই নবীর কাছ থেকে তাদের সম্পর্কে তারা কিছু শুনবেন। কিন্তু সম্প্রদায়ের অভিশপ্ত লোকেরা নবীর উত্তম কথার উত্তরে বললঃ
قَالُوا۟ لَقَدۡ عَلِمۡتَ مَا لَنَا فِی بَنَاتِكَ مِنۡ حَقࣲّ وَإِنَّكَ لَتَعۡلَمُ مَا نُرِیدُ
[Surat Hud 79]
অর্থাৎ, আপনি ভাল করেই জানেন, আপনার কন্যাদের দিয়ে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। আপনি এও জানেন যে, আমরা কি চাচ্ছি। (১১: ৭৯)
তারা বলছে, হে লূত! আপনি অবগত আছেন যে, স্ত্রীদের প্রতি আমাদের কোন আকর্ষণ নেই। আমাদের উদ্দেশ্য কি, তা আপনি ভাল করেই জানেন। নবীকে উদ্দেশ করে তারা এরূপ কুৎসিৎ ভাষা ব্যবহার করতে আল্লাহকে একটুও ভয় পায়নি। যিনি কঠিন শাস্তিদাতা। এ কারণে হযরত লূত (আ) বলেছিলেনঃ
قَالَ لَوۡ أَنَّ لِی بِكُمۡ قُوَّةً أَوۡ ءَاوِیۤ إِلَىٰ رُكۡنࣲ شَدِیدࣲ
[Surat Hud 80]
অর্থাৎ, হায়, তোমাদের উপর যদি আমার শক্তি থাকত অথবা যদি আমি নিতে পারতাম কোন শক্তিশালী আশ্রয়। (১১: ৮০)
অর্থাৎ তিনি কামনা করেছিলেন সম্প্রদায়কে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা যদি হযরত লুতের থাকত, অথবা তাকে সাহায্যকারী ধনবল বা জনবল যদি থাকত তা হলে তাদের অন্যায় দাবির উপযুক্ত শাস্তি তিনি দিতে পারতেন।
যুহরী (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে মারফুরূপে হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ সন্দেহ প্রকাশের ব্যাপারে আমরা ইবরাহীম (আ)-এর চাইতে বেশি হকদার। আল্লাহ লুত (আ)-এর উপর রহম করুন। কেননা, তিনি শক্তিশালী অবলম্বনের আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। আমি যদি সেই দীর্ঘকাল জেলখানায় অবস্থান করতাম যেমনি ইউসুফ (আ) করেছিলেন তবে আমি অবশ্যই আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতাম। এ হাদীস আবুয যিনাদ ভিন্ন সূত্রেও বর্ণনা করেছেন এবং মুহাম্মদ ইবন আমর (র) আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, আল্লাহ নূত (আ)-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। কেননা, তিনি শক্তিশালী অবলম্বন অর্থাৎ আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করেছিলেন। এরপর থেকে আল্লাহ যত নবী প্রেরণ করেছেন তাদেরকে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর বাণীঃ
وَجَاۤءَ أَهۡلُ ٱلۡمَدِینَةِ یَسۡتَبۡشِرُونَ قَالَ إِنَّ هَـٰۤؤُلَاۤءِ ضَیۡفِی فَلَا تَفۡضَحُونِ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَلَا تُخۡزُونِ قَالُوۤا۟ أَوَلَمۡ نَنۡهَكَ عَنِ ٱلۡعَـٰلَمِینَ قَالَ هَـٰۤؤُلَاۤءِ بَنَاتِیۤ إِن كُنتُمۡ فَـٰعِلِینَ
[Surat Al-Hijr 67 – 71]
অর্থাৎ, নগরবাসীরা উল্লসিত হয়ে উপস্থিত হলো। সে বলল, ওরা আমার মেহমান, সুতরাং তোমরা আমাকে বে-ইজ্জত করো না। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে হেয় করো না। তারা বলল, হে লূত! আমরা কি তোমাকে দুনিয়া শুদ্ধ লোককে আশ্রয় দিতে নিষেধ করিনি? লূত বলল, তোমাদের একান্তই যদি কিছু করতে হয় তাহলে আমার এই কন্যাগণ রয়েছে। (১৫: ৬৭)
হযরত লুত (আ) সম্প্রদায়ের লোকজনকে তাদের স্ত্রীদের কাছে যেতে আদেশ দেন এবং তাদের কু-অভ্যাসের উপর অবিচল থাকার মন্দ পরিণতির কথা জানিয়ে দেন যা অচিরেই তাদের উপর পতিত হবে। কিন্তু কোন কিছুতেই তারা নিবৃত্ত হল না। বরং নবী যতই তাদেরকে উপদেশ দেন, তারা ততই উত্তেজিত হয়ে মেহমানদের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করে। কিন্তু রাতের শেষে তকদীর তাদেরকে কোথায় পৌঁছিয়ে দেবে তা তাদের আদৌ জানা ছিল না। এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনের কসম করে বলেনঃ
لَعَمۡرُكَ إِنَّهُمۡ لَفِی سَكۡرَتِهِمۡ یَعۡمَهُونَ
[Surat Al-Hijr 72]
অর্থাৎ, তোমার জীবনের শপথ! ওরা তো মত্ততায় বিমূঢ় হয়েছে। (১৫: ৭২)
আল্লাহর বাণীঃ
وَلَقَدۡ أَنذَرَهُم بَطۡشَتَنَا فَتَمَارَوۡا۟ بِٱلنُّذُرِ وَلَقَدۡ رَ ٰوَدُوهُ عَن ضَیۡفِهِۦ فَطَمَسۡنَاۤ أَعۡیُنَهُمۡ فَذُوقُوا۟ عَذَابِی وَنُذُرِ وَلَقَدۡ صَبَّحَهُم بُكۡرَةً عَذَابࣱ مُّسۡتَقِرࣱّ[Surat Al-Qamar 36 – 38]
লূত ওদেরকে আমার কঠোর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু ওরা সতর্কবাণী সম্বন্ধে বিতণ্ডা শুরু করল। তারা লুতের কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল। তখন আমি ওদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললাম, আস্বাদন কর আমার শাস্তি ও সতর্কবাণীর পরিণাম। প্রত্যুষে বিরামহীন শাস্তি তাদেরকে আঘাত করল। (৫৪: ৩৬-৩৮)
মুফাসসির ও অন্যান্য আলিম বলেছেন, হযরত লূত (আ) তাঁর সম্প্রদায়কে তার ঘরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন এবং তাদেরকে বাধা দেন। ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। তারা তা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হলো। আর হযরত লূত (আ) দরজার বাইরে থেকে তাদেরকে উপদেশ দিতে এবং ভিতরে যেতে বারণ করতে থাকেন। উভয় পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ চলতে থাকে। অবস্থা যখন সঙ্গীন হয়ে আসল এবং ঘটনা লুত (আ)-এর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হল; তখন তিনি বললেন, তোমাদের প্রতিহত করার শক্তি যদি আমার থাকত অথবা কোন শক্তিশালী অবলম্বনের আশ্রয় নিতে পারতাম তবে তোমাদেরকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতাম। এ সময় ফেরেশতাগণ বললেনঃ
یَـٰلُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَن یَصِلُوۤا۟ إِلَیۡكَ
[Surat Hud 81]
“হে লূত! আমরা তোমার প্রতিপালক প্রেরিত ফেরেশতা। ওরা কখনই তোমার কাছে পৌঁছতে পারবে না।” (১১: ৮১)
মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, জিবরাঈল (আ) ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সম্মুখে আসেন এবং নিজ ডানার এক প্রান্ত দ্বারা হালকাভাবে তাদের চেহারায় আঘাত করেন। ফলে তাদের দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়ে যায়। কেউ কেউ বলেছেন, তাদের চোখ সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়ে যায়। এমনকি চেহারায় চোখের কোন চিহ্নই অবশিষ্ট রইলো না। তারপর তারা দেয়াল হাতড়িয়ে কোন মতে সেখান থেকে ফিরে যায়। আল্লাহর নবী লুত (আ)-কে ধমক দিতে দিতে বলতে থাকেন— কাল সকালে আমাদের ও তার মধ্যে বোঝাপড়া হবে।
আল্লাহ বলেনঃ
وَلَقَدۡ رَ ٰوَدُوهُ عَن ضَیۡفِهِۦ فَطَمَسۡنَاۤ أَعۡیُنَهُمۡ فَذُوقُوا۟ عَذَابِی وَنُذُرِ وَلَقَدۡ صَبَّحَهُم بُكۡرَةً عَذَابࣱ مُّسۡتَقِرࣱّ[Surat Al-Qamar 37 – 38]
অর্থাৎ, ওরা লূতের কাছ থেকে তার মেহমানদেরকে দাবি করল। তখন আমি তাদের দৃষ্টিশক্তি লোপ করে দিলাম এবং আমি বললামঃ এখন আমার শাস্তি ও সতর্ক বাণীর পরিণাম আস্বাদন কর। প্রত্যুষে বিরামহীন শাস্তি ও তাদের উপর আঘাত হানল। (৫৪: ৩৭-৩৮)
ফেরেশতাগণ হযরত লূত (আ)-এর কাছে দু’টি প্রস্তাব পেশ করেন (১) পরিবার-পরিজন নিয়ে রাতের শেষে রওয়ানা হয়ে যাবেন (২) কেউ পেছনের দিকে ফিরে তাকাবেন না। অর্থাৎ সম্প্রদায়ের উপর যখন আযাব পতিত হবে এবং আযাবের শব্দ শোনা যাবে তখন কেউ যেন পশ্চাতে ফিরে না তাকায়। ফেরেশতাগণ আরও জানান যে, তিনি যেন সকলের পেছনে থেকে সবাইকে পরিচালনা করেন। الا امرءتك এই বাক্যাংশের দু’টি অর্থ হতে পারে (১) যাওয়ার সময় তোমার স্ত্রীকে সাথে নেবে না। এ অবস্থায় امراءة এর উপর যবর দিয়ে পড়তে হবে এবং فاسو باهلك থেকে সে ব্যতিক্রম হবে। (২) যাওয়ার পথে দলের কেউ পেছনের দিকে তাকাবে না কিন্তু কেবল তোমার স্ত্রীই এ নির্দেশ অমান্য করে পেছনের দিকে তাকাবে; ফলে সম্প্রদায়ের উপর যে আযাব আসবে ঐ আযাবে সেও গ্রেফতার হবে। এ অবস্থায় امراءة ولا يلتفت احد থেকে মুস্তাসনা (ব্যতিক্রম) হবে। পেশ যুক্ত পাঠ (امرأتك) এ অর্থকে সমর্থন করে। কিন্তু প্রথম অর্থই অধিকতর স্পষ্ট।
সুহায়লী বলেন, লুত (আ)-এর স্ত্রীর নাম ওয়ালিহা এবং নূহ (আ)-এর স্ত্রীর নাম ওয়ালিগা। আগন্তুক ফেরেশতাগণ ঐসব বিদ্রোহী পাপিষ্ঠ, সীমালংঘনকারী নির্বোধ অভিশপ্ত সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হবে এ সুসংবাদ লুত (আ)-কে শোনান, যারা পরবর্তী যুগের লোকদের জন্যে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّ مَوۡعِدَهُمُ ٱلصُّبۡحُۚ أَلَیۡسَ ٱلصُّبۡحُ بِقَرِیبࣲ
[Surat Hud 81]
অর্থাৎ, তাদের প্রতিশ্রুত সময় প্রভাত কাল। আর প্রভাত কাল খুব নিকটে নয় কি?
হযরত লূত (আ) নিজ পরিবারবর্গ নিয়ে বের হয়ে আসেন। পরিবারবর্গ বলতে তার দু’টি কন্যাই মাত্র ছিল। সম্প্রদায়ের অন্য কোন একটি লোকও তার সাথে আসেনি। কেউ কেউ বলেছেন, তার স্ত্রীও একই সাথে বের হয়েছিল। কিন্তু সঠিক খবর আল্লাহই ভাল জানেন। তাঁরা যখন সে এলাকা অতিক্রম করে চলে আসেন এবং সূর্য উদিত হয়, তখন আল্লাহর অলংঘনীয় নির্দেশ ও অপ্রতিরোধ্য আযাব তাদের উপর নেমে আসে। আহলি কিতাবদের মতে, ফেরেশতাগণ হযরত লূত (আ)-কে তথায় অবস্থিত একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে বলেন। কিন্তু হযরত লূত (আ)-এর নিকট তা অত্যন্ত দুঃসাধ্য ঠেকে। তাই তিনি নিকটবর্তী কোন গ্রামে চলে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। ফেরেশতাগণ বললেন, তাই করুন। গ্রামে পৌঁছে সেখানে স্থিত হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো এবং তারপরই আমরা আযাব অবতীর্ণ করব। আহলি কিতাবগণ বলেন, সে মতে হযরত লুত (আ) গওরযাগর নামক একটি ক্ষুদ্র গ্রামে চলে যান এবং সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তাদের উপর আল্লাহর আযাব নেমে আসে।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
فَلَمَّا جَاۤءَ أَمۡرُنَا جَعَلۡنَا عَـٰلِیَهَا سَافِلَهَا وَأَمۡطَرۡنَا عَلَیۡهَا حِجَارَةࣰ مِّن سِجِّیلࣲ مَّنضُودࣲ مُّسَوَّمَةً عِندَ رَبِّكَۖ وَمَا هِیَ مِنَ ٱلظَّـٰلِمِینَ بِبَعِیدࣲ[Surat Hud 82 – 83]
অর্থাৎ, তারপর যখন আমার আদেশ আসল তখন আমি জনপদকে উল্টিয়ে দিলাম এবং ওদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর, কংকর যা তোমার প্রতিপালকের কাছে চিহ্নিত ছিল। এটি জালিমদের থেকে দূরে নয়। (১১: ৮২)
মুফাসসিরগণ বলেন, হযরত জিবরাঈল (আ) আপন ডানার এক প্রান্ত দিয়ে লূত সম্প্রদায়ের আবাসভূমি গভীর নিচু থেকে উপড়িয়ে নেন। মোট সাতটি নগরে তারা বসবাস করত। কারও মতে তাদের সংখ্যা চারশ’, কারও মতে চার হাজার। সে এলাকার সমস্ত মানুষ, জীব-জন্তু, ঘরবাড়ি ও ধন-সম্পদ যা কিছু ছিল সবকিছুসহ উঠিয়ে নেয়া হয়। উপরে আকাশের সীমানা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়। আসমানের এত কাছে নিয়ে যাওয়া হয় যে, সেখানকার ফেরেশতাগণ মোরগের ডাক ও কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ পর্যন্ত শুনতে পান। তারপর সেখান থেকে উল্টিয়ে নিচে নিক্ষেপ করা হয়। মুজাহিদ (র) বলেন, সর্বপ্রথম যা নিচে এসে পতিত হয় তা হল তাদের উঁচু অট্টালিকাসমূহ।
وَأَمۡطَرۡنَا عَلَیۡهِمۡ حِجَارَةࣰ مِّن سِجِّیلٍ
[Surat Al-Hijr 74]
(তাদের উপর পাথর কঙ্কর বর্ষণ করলাম)
سجيل ফার্সী শব্দ, একে আরবীকরণ করা হয়েছে। অর্থ ও অত্যধিক শক্ত ও কঠিন। منضود অর্থ ক্রমাগত। অর্থাৎ আকাশ থেকে একের পর এক যা তাদের উপর আসতে থাকে। مسومة অর্থ চিহ্নিত। প্রতিটি পাথরের গায়ে সেই ব্যক্তির নাম লেখা ছিল যার উপর তা পতিত হবার জন্যে নির্ধারিত ছিল। যেমন আল্লাহ বলেছেনঃ
مُّسَوَّمَةً عِندَ رَبِّكَ لِلۡمُسۡرِفِینَ
[Surat Adh-Dhariyat 34]
(তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত যা সীমালংঘনকারীদের জন্যে নির্ধারিত।)।
আল্লাহর বাণীঃ
وَأَمۡطَرۡنَا عَلَیۡهِم مَّطَرࣰاۖ فَسَاۤءَ مَطَرُ ٱلۡمُنذَرِینَ
[Surat Ash-Shu’ara 173]
অর্থাৎ, তাদের উপর শাস্তিমূলক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল তাদের জন্যে এ বৃষ্টি কতই না নিকৃষ্ট! (২৬: ১৭৩)
আল্লাহর বাণীঃ
وَٱلۡمُؤۡتَفِكَةَ أَهۡوَىٰ فَغَشَّىٰهَا مَا غَشَّىٰ
[Surat An-Najm 53 – 54]
অর্থাৎ, উৎপাটিত আবাসভূমিকে উল্টিয়ে নিক্ষেপ করেছিলেন। তারপর তা আচ্ছন্ন করে ফেলল কী। সর্বগ্রাসী শাস্তি! (৫৩: ৫৩)
অর্থাৎ আল্লাহ সেই জনপদের ভূখণ্ডকে উপরে তুলে নিচের অংশকে উপরে ও উপরের অংশকে নিচে করে উল্টিয়ে দেন। তারপর শক্ত পাথর-কংকর বর্ষণ করেন অবিরামভাবে যা তাদের সবাইকে ছেয়ে ফেলে। প্রতিটি পাথরের উপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম লেখা ছিল। এ পাথরগুলো ঐ জনপদে উপস্থিত সকলের উপর পতিত হয়। অনুরূপ যারা তখন সেখানে অনুপস্থিত ছিল অর্থাৎ মুসাফির, পথিক ও দূরে অবস্থানকারী সকলের উপরই তা পতিত হয়। কথিত আছে যে, হযরত লূত (আ)-এর স্ত্রী তার সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে থেকে যায়। অপর মতে বলা হয়েছে যে, সে তার স্বামী ও দুই কন্যার সাথে বেরিয়ে যায়। কিন্তু যখন সে আযাব ও শহর ধ্বংস হওয়ার শব্দ শুনতে পায়, তখন সে পেছনে সম্প্রদায়ের দিকে ফিরে তাকায় এবং আগের পরের আল্লাহর সকল নির্দেশ অমান্য করে। ‘হায় আমার সম্প্রদায়! বলে সে বিলাপ করতে থাকে। তখন উপর থেকে একটি পাথর এসে তার মাথায় পড়ে এবং তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। এভাবে সে নিজ সম্প্রদায়ের ভাগ্যের সাথে একীভূত হয়ে যায়। কারণ, সে ছিল তার সম্প্রদায়ের ধর্মে বিশ্বাসী। তাদের সংবাদ সরবরাহকারিণী; হযরত লূত (আ)-এর বাড়িতে মেহমান আসলে সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সে সংবাদ পৌঁছিয়ে দিত। আল্লাহ বলেনঃ
ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلࣰا لِّلَّذِینَ كَفَرُوا۟ ٱمۡرَأَتَ نُوحࣲ وَٱمۡرَأَتَ لُوطࣲۖ كَانَتَا تَحۡتَ عَبۡدَیۡنِ مِنۡ عِبَادِنَا صَـٰلِحَیۡنِ فَخَانَتَاهُمَا فَلَمۡ یُغۡنِیَا عَنۡهُمَا مِنَ ٱللَّهِ شَیۡـࣰٔا وَقِیلَ ٱدۡخُلَا ٱلنَّارَ مَعَ ٱلدَّ ٰخِلِینَ
[Surat At-Tahrim 10]
অর্থাৎ, আল্লাহ কাফিরদের জন্যে নূহ ও লূতের স্ত্রীকে দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন। ওরা ছিল আমার বান্দাগণের মধ্যে দুজন সৎকর্মপরায়ণ বান্দার অধীন। কিন্তু ওরা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে, নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে কিছুমাত্র রক্ষা করতে পারল না। তাই ওদেরকে বলা হল, জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও ওতে প্রবেশ কর। (৬৬: ১০)
অর্থাৎ তারা নবীদের সাথে দীনের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, নবীর দীন গ্রহণ করেনি এখানে এ অর্থ কিছুতেই নেয়া যাবে না যে, তারা প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কোনভাবে অশ্লীল কাজে জড়িত ছিল। কেননা, আল্লাহ কোন ব্যভিচারিণীকে কোন নবীর স্ত্রী হিসেবে নির্ধারণ করেননি। হযরত ইবন আব্বাস (রা)-সহ অন্যান্য প্রাচীন ও পরবর্তীকালের ইমাম ও মুফাসিরগণ এ কথাই বলেছেন। তারা বলেছেন, কোন নবীর কোন স্ত্রী কখনও ব্যভিচার করেননি। যারা এর বিপরীত মত ব্যক্ত করেছেন, তারা বিরাট ভুল করেছেন। ‘ইফকের’ ঘটনায় কতিপয় ব্যক্তি হযরত আয়েশা (রা)-এর প্রতি অপবাদ দিলে আল্লাহ্ তা’আলা আয়েশা (রা)-এর পবিত্রতা ঘোষণা করে যে আয়াত নাযিল করেন, তাতে ঐসব মু’মিন লোকদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। আল্লাহর বাণীঃ
إِذۡ تَلَقَّوۡنَهُۥ بِأَلۡسِنَتِكُمۡ وَتَقُولُونَ بِأَفۡوَاهِكُم مَّا لَیۡسَ لَكُم بِهِۦ عِلۡمࣱ وَتَحۡسَبُونَهُۥ هَیِّنࣰا وَهُوَ عِندَ ٱللَّهِ عَظِیمࣱ وَلَوۡلَاۤ إِذۡ سَمِعۡتُمُوهُ قُلۡتُم مَّا یَكُونُ لَنَاۤ أَن نَّتَكَلَّمَ بِهَـٰذَا سُبۡحَـٰنَكَ هَـٰذَا بُهۡتَـٰنٌ عَظِیمࣱ
[Surat An-Nur 15 – 16]
অর্থাৎ, যখন তোমরা মুখে মুখে এ কথা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা একে তুচ্ছজ্ঞান করছিলে। যদিও আল্লাহর কাছে এটা ছিল গুরুতর এবং তোমরা যখন এ কথা শুনলে তখন কেন বললে না— এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নয়। আল্লাহ পবিত্র মহান। এতে এক গুরুতর অপবাদ। (২৪: ১৫-১৬)
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনার নবীর স্ত্রী এ দোষে জড়িত হবে এ থেকে আপনি পবিত্র।
আল্লাহ বাণীঃ
وَمَا هِیَ مِنَ ٱلظَّـٰلِمِینَ بِبَعِیدࣲ
[Surat Hud 83]
(আর এটা জালিমদের থেকে বেশি দূরে নয়) অর্থাৎ এই শাস্তি বেশি দূরে নয় সেইসব লোকদের থেকে যারা লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের ন্যায় কুকর্মে লিপ্ত হবে। এই কারণে কোন কোন আলিম বলেছেন, পুরুষের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত ব্যক্তিকে ‘রজম’ বা পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা হবে, চাই সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত। ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমদ, ইবন হাম্বল (র) প্রমুখ ইমাম এই মত পোষণ করেন। তাঁরা বর্ণিত সেই হাদীস থেকেও দলীল গ্রহণ করেছেন যা ইবন আব্বাস (রা) কর্তৃক মুসনাদে আহমদে ও সুনান গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, এমন কোন লোক যদি তোমরা পাও, যে লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের অনুরূপ পাপ কাজে লিপ্ত, তখন সংশ্লিষ্ট উভয় ব্যক্তিকেই হত্যা কর। ইমাম আবু হানীফা (র) বলেন, পুরুষের সাথে সমকামীকে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলে দিয়ে তার উপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে; যেভাবে লুতের সম্প্রদায়ের সাথে করা হয়েছিল। তিনি দলীলরূপে নিমোক্ত আয়াত পেশ করেছেন।
وَمَا هِیَ مِنَ ٱلظَّـٰلِمِینَ بِبَعِیدࣲ
[Surat Hud 83]
(এটা জালিমদের থেকে বেশি দূরে নয়) আল্লাহ তা’আলা লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের গোটা এলাকাকে একটি দুর্গন্ধময় সমুদ্রে পরিণত করেন। ঐ সমুদ্রের পানি ও সমুদ্রের পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। এভাবে স্মরণীয় বিধ্বস্ত এলাকাটি পরবর্তীকালের সেইসব মানুষের জন্যে শিক্ষণীয় ও উপদেশ গ্রহণের বস্তুতে পরিণত হয়েছে, যারা আল্লাহর অবাধ্য হয়, রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ও আপন মনিবের নাফরমানী করে। এ ঘটনা সে বিষয়েও প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহ তাঁর মুমিন বান্দাদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে আসেন। আল্লাহর বাণীঃ
إِنَّ فِی ذَ ٰلِكَ لَـَٔایَةࣰۖ وَمَا كَانَ أَكۡثَرُهُم مُّؤۡمِنِینَ وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ ٱلۡعَزِیزُ ٱلرَّحِیمُ
[Surat Ash-Shu’ara 8 – 9]
অর্থাৎ, নিশ্চয় তাতে আছে নিদর্শন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়। তোমার প্রতিপালক তিনি তো পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু। (২৬: ৮-৯)
আল্লাহর বাণীঃ
فَأَخَذَتۡهُمُ ٱلصَّیۡحَةُ مُشۡرِقِینَ فَجَعَلۡنَا عَـٰلِیَهَا سَافِلَهَا وَأَمۡطَرۡنَا عَلَیۡهِمۡ حِجَارَةࣰ مِّن سِجِّیلٍ إِنَّ فِی ذَ ٰلِكَ لَـَٔایَـٰتࣲ لِّلۡمُتَوَسِّمِینَ وَإِنَّهَا لَبِسَبِیلࣲ مُّقِیمٍ إِنَّ فِی ذَ ٰلِكَ لَـَٔایَةࣰ لِّلۡمُؤۡمِنِینَ
[Surat Al-Hijr 73 – 77]
অর্থাৎ, তারপর সূর্যোদয়ের সময়ে এক মহানাদ তাদেরকে আঘাত করল এবং আমি জনপদকে উল্টিয়ে উপর-নীচ করে দিলাম এবং তাদের উপর পাথর-কংকর বর্ষণ করলাম। অবশ্যই এতে নিদর্শন রয়েছে পর্যবেক্ষণ শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের জন্যে। লোক চলাচলের পথের পাশে তা এখনও বিদ্যমান। এতে অবশ্যই রয়েছে মু’মিনদের জন্যে নির্দশন। (১৫: ৭৩-৭৭)
متو سمين বলা হয় সেসব লোকদেরকে যারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকে। এখানে দূরদৃষ্টির অর্থ হল এই বিষয়ে চিন্তা করা যে, এ জনপদটি ও তার বাসিন্দারা আবাদ হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে আল্লাহ্ তা ধ্বংস ও বিধ্বস্ত করে দিলেন। তিরমিযী ইত্যাদি কিতাবে মারফু হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল (সা) বলেছেনঃ
اتقوا فراسة المؤمن فانه ينظر بنور الله
মু’মিনের দূরদৃষ্টিকে তোমরা সমীহ করবে, কেননা সে আল্লাহপ্রদত্ত নূরের সাহায্যে দেখতে পায়। একথা বলে রাসূল (সা) নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ
إِنَّ فِی ذَ ٰلِكَ لَـَٔایَـٰتࣲ لِّلۡمُتَوَسِّمِینَ
[Surat Al-Hijr 75]
(দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মু’মিনদের জন্যে এতে নিদর্শন রয়েছে)। আল্লাহর বাণীঃ
وَإِنَّهَا لَبِسَبِیلࣲ مُّقِیمٍ
[Surat Al-Hijr 76]
(পথের পাশে তা এখনও বিদ্যমান) অর্থাৎ যাতায়াতের চালু পথে ঐ জনপদের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন অপর আয়াতে বলা হয়েছেঃ
وَإِنَّكُمۡ لَتَمُرُّونَ عَلَیۡهِم مُّصۡبِحِینَ وَبِٱلَّیۡلِۚ أَفَلَا تَعۡقِلُونَ
[Surat As-Saaffat 137 – 138]
(তোমরা তো তাদের ধ্বংসাবশেষগুলো সকাল-সন্ধ্যায় অতিক্রম করে থাক। তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না? (৩৭: ১৩৭-১৩৮) অপর আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ
وَلَقَد تَّرَكۡنَا مِنۡهَاۤ ءَایَةَۢ بَیِّنَةࣰ لِّقَوۡمࣲ یَعۡقِلُونَ
[Surat Al-Ankabut 35]
অর্থাৎ, বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্যে আমি এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি। (২৯: ৩৫)
আল্লাহর বাণীঃ
فَأَخۡرَجۡنَا مَن كَانَ فِیهَا مِنَ ٱلۡمُؤۡمِنِینَ فَمَا وَجَدۡنَا فِیهَا غَیۡرَ بَیۡتࣲ مِّنَ ٱلۡمُسۡلِمِینَ وَتَرَكۡنَا فِیهَاۤ ءَایَةࣰ لِّلَّذِینَ یَخَافُونَ ٱلۡعَذَابَ ٱلۡأَلِیمَ[Surat Adh-Dhariyat 35 – 37]
অর্থাৎ, সেখানে যেসব মুমিন ছিল আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম এবং সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত আর কোন মুসলিম গৃহ আমি পাইনি। যারা মর্মন্তুদ শাস্তিকে ভয় করে আমি তাদের জন্যে এর মধ্যে একটি নির্দশন রেখেছি। (৫১: ৩৫-৩৭)
অর্থাৎ লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের জনপদটিকে আমি শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের জন্যে রেখে দিয়েছি সেইসব লোকের জন্যে যারা আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। না দেখেই আল্লাহকে ভয় করে, মহান প্রতিপালকের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার ব্যাপারে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে, প্রবৃত্তি পরায়ণতা থেকে বিরত থাকে, আল্লাহর নিষিদ্ধ জিনিস থেকে দূরে থাকে। তাঁর নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকে এবং লূত (আ)-এর সম্প্রদায়ের মত হওয়ার ব্যাপারে অন্তরে ভয় রাখে (ومن تشبه بقوم فهو منهم) যে ব্যক্তি কোন জাতির সাথে সাদৃশ্য রাখে সে তাদের দলভুক্ত। সকল ব্যাপারে পূর্ণ সাদৃশ্য হতে হবে এমন কোন কথা নেই; বরং কোন কোন ব্যাপারে সাদৃশ্য থাকলেই হয়। যেমন কেউ কেউ বলেছেন, তোমরা যদি সম্পূর্ণরূপে কওমে লূত হয়ে থাক, তবে কওমে লূত তোমাদের থেকে খুব বেশি পৃথক নয়। অতএব, যে লোক জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও আল্লাহ-ভীরু, সে আল্লাহর যাবতীয় নির্দেশ মেনে চলবে এবং রাসূলের আদর্শকে অনুসরণ করবে, সে অবশ্যই হালাল স্ত্রী ও যুদ্ধবন্দী দাসী ভোগ করবে। শয়তানের পথে চলতে সে ভয় পাবে। অন্যথায় সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হবে এবং নিমোক্ত আয়াতের আওতায় এসে যাবে
وَمَا هِیَ مِنَ ٱلظَّـٰلِمِینَ بِبَعِیدࣲ
[Surat Hud 83]
(জালিমদের থেকে তা বেশি দূরে নয়।)
