Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া – ১

    বিদায়া ওয়ান নিহায়া এক পাতা গল্প1327 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩৬. ফিরআউনের ধ্বংসোত্তর যুগে বনী ইসরাঈলের অবস্থা

    ফিরআউনের ধ্বংসোত্তর যুগে বনী ইসরাঈলের অবস্থা

    আল্লাহ্ তা’আলার বাণীঃ

    (فَٱنتَقَمۡنَا مِنۡهُمۡ فَأَغۡرَقۡنَـٰهُمۡ فِی ٱلۡیَمِّ بِأَنَّهُمۡ كَذَّبُوا۟ بِـَٔایَـٰتِنَا وَكَانُوا۟ عَنۡهَا غَـٰفِلِینَ ۝ وَأَوۡرَثۡنَا ٱلۡقَوۡمَ ٱلَّذِینَ كَانُوا۟ یُسۡتَضۡعَفُونَ مَشَـٰرِقَ ٱلۡأَرۡضِ وَمَغَـٰرِبَهَا ٱلَّتِی بَـٰرَكۡنَا فِیهَاۖ وَتَمَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ ٱلۡحُسۡنَىٰ عَلَىٰ بَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ بِمَا صَبَرُوا۟ۖ وَدَمَّرۡنَا مَا كَانَ یَصۡنَعُ فِرۡعَوۡنُ وَقَوۡمُهُۥ وَمَا كَانُوا۟ یَعۡرِشُونَ ۝ وَجَـٰوَزۡنَا بِبَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ ٱلۡبَحۡرَ فَأَتَوۡا۟ عَلَىٰ قَوۡمࣲ یَعۡكُفُونَ عَلَىٰۤ أَصۡنَامࣲ لَّهُمۡۚ قَالُوا۟ یَـٰمُوسَى ٱجۡعَل لَّنَاۤ إِلَـٰهࣰا كَمَا لَهُمۡ ءَالِهَةࣱۚ قَالَ إِنَّكُمۡ قَوۡمࣱ تَجۡهَلُونَ ۝ إِنَّ هَـٰۤؤُلَاۤءِ مُتَبَّرࣱ مَّا هُمۡ فِیهِ وَبَـٰطِلࣱ مَّا كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ ۝ قَالَ أَغَیۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِیكُمۡ إِلَـٰهࣰا وَهُوَ فَضَّلَكُمۡ عَلَى ٱلۡعَـٰلَمِینَ ۝ وَإِذۡ أَنجَیۡنَـٰكُم مِّنۡ ءَالِ فِرۡعَوۡنَ یَسُومُونَكُمۡ سُوۤءَ ٱلۡعَذَابِ یُقَتِّلُونَ أَبۡنَاۤءَكُمۡ وَیَسۡتَحۡیُونَ نِسَاۤءَكُمۡۚ وَفِی ذَ ٰ⁠لِكُم بَلَاۤءࣱ مِّن رَّبِّكُمۡ عَظِیمࣱ)

    [Surat Al-A’raf 136 – 141]

    অর্থাৎ, সুতরাং আমি তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি এবং তাদেরকে অতল সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছি। কারণ তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করত এবং এ সম্বন্ধে তারা ছিল গাফিল। যে সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হত তাদেরকে আমি আমার কল্যাণপ্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের অধিকারী করি; এবং বনী ইসরাঈল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভবাণী সত্যে পরিণত হল। যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, আর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যে সব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করেছি। আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দেই; তারপর তারা প্রতিমাপূজায় রত এক সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হয়। তারা বলল, হে মূসা! তাদের দেবতার মত আমাদের জন্যও একটি দেবতা গড়ে দাও; সে বলল, তোমরা তো এক মূর্খ সম্প্রদায়। এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত হবে এবং তারা যা করছে তাও অমূলক। সে আবারো বলল, আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের জন্য আমি কি অন্য ইলাহ্ খুঁজব অথচ তিনি তোমাদেরকে বিশ্বজগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন? স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে ফিরআউনের অনুসারীদের হাত হতে উদ্ধার করেছি, যারা তোমাদেরকে নিকৃষ্ট শাস্তি দিত। তারা তোমাদের পুত্র সন্তানকে হত্যা করত এবং তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রাখত; এতে ছিল তোমাদের প্রতিপালকের এক মহাপরীক্ষা। (সূরা আ’রাফঃ ১৩৬-১৪১)

    উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা বর্ণনা দিচ্ছেন যে, কিভাবে তিনি ফিরআউন ও তার সেনাবাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন এবং কিভাবে তাদের ইজ্জত-সম্মান ভূলুণ্ঠিত করেছিলেন। আর তাদের মাল-সম্পদ আল্লাহ্ তা’আলা কেমনভাবে ধ্বংস করে বনী ইসরাঈলকে তাদের সমস্ত ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারী করে দিয়েছিলেন।

    যেমন আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

    (كَذَ ٰ⁠لِكَۖ وَأَوۡرَثۡنَـٰهَا بَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ)

    [Surat Ash-Shu’ara 59]

    অর্থাৎ, এরূপই ঘটেছিল এবং বনী ইসরাঈলকে করেছিলাম এ সমুদয়ের অধিকারী। (সূরা শুআরাঃ ৫৯)

    অনুরূপভাবে আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَنُرِیدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى ٱلَّذِینَ ٱسۡتُضۡعِفُوا۟ فِی ٱلۡأَرۡضِ وَنَجۡعَلَهُمۡ أَىِٕمَّةࣰ وَنَجۡعَلَهُمُ ٱلۡوَ ٰ⁠رِثِینَ)

    [Surat Al-Qasas 5]

    অর্থাৎ, আমি ইচ্ছে করেছিলাম, সে দেশে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে; তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে ও উত্তরাধিকারী করতে। (সূরা কাসাসঃ ৫)

    আবার অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেনঃ

    (وَأَوۡرَثۡنَا ٱلۡقَوۡمَ ٱلَّذِینَ كَانُوا۟ یُسۡتَضۡعَفُونَ مَشَـٰرِقَ ٱلۡأَرۡضِ وَمَغَـٰرِبَهَا ٱلَّتِی بَـٰرَكۡنَا فِیهَاۖ وَتَمَّتۡ كَلِمَتُ رَبِّكَ ٱلۡحُسۡنَىٰ عَلَىٰ بَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ بِمَا صَبَرُوا۟ۖ وَدَمَّرۡنَا مَا كَانَ یَصۡنَعُ فِرۡعَوۡنُ وَقَوۡمُهُۥ وَمَا كَانُوا۟ یَعۡرِشُونَ)[Surat Al-A’raf 137]

    অর্থাৎ, যে সম্প্রদায়কে দুর্বল গণ্য করা হত তাদেরকে আমি আমার কল্যাণ প্রাপ্ত রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিমের উত্তরাধিকারী করি এবং বনী ইসরাঈল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভ বাণী সত্যে পরিণত হল, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল আর ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের শিল্প এবং যে সব প্রাসাদ তারা নির্মাণ করেছিল তা ধ্বংস করেছি। (সূরা আরাফঃ ১৩৭)

    আল্লাহ্ তা’আলা ফিরআউন ও তার গোষ্ঠীর সকলকে ধ্বংস করে দিলেন। দুনিয়ায় বিরাজমান তাদের মহা সম্মান ঐতিহ্য তিনি বিনষ্ট করে দিলেন। তাদের রাজা, আমীর-উমারা ও সৈন্য-সামন্ত ধ্বংস হয়ে গেল। মিসর দেশে সাধারণ প্রজাবর্গ ব্যতীত আর কেউ অবশিষ্ট রইল না। ইবন আবদুল হাকাম ‘মিসরের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ঐদিন থেকে মিসরের স্ত্রী লোকেরা পুরুষদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিল, কেননা আমীর-উমারাদের স্ত্রীরা তাদের চেয়ে নিম্ন শ্রেণীর সাধারণ লোকদেরকে বিয়ে করতে হয়েছিল। তাই তাদের স্বামীদের উপর স্বভাবতই তাদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠি হয়। এ প্রথা মিসরে আজ পর্যন্ত চলে আসছে।

    কিতাবীদের মতে, বনী ইসরাঈলকে যে মাসে মিসর ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সে মাসকেই আল্লাহ্ তা’আলা তাদের বছরের প্রথম মাস বলে নির্ধারণ করে দেন। তাদেরকে হুকুম দেওয়া হয় যে, তাদের প্রতিটি পরিবার যেন একটি মেষশাবক যবেহ করে। যদি প্রতিটি পরিবার একটি করে মেষশাবক সংগ্রহ করতে না পারে তাহলে পড়শীর সাথে অংশীদার হয়ে তা করবে। যবেহ করার পর মেষশাবকের রক্ত তাদের ঘরের দরজার চৌকাটে ছিটিয়ে দিতে হবে, যাতে তাদের ঘরগুলো চিহ্নিত হয়ে থাকে। তারা এটাকে রান্না করে খেতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, মেষশাবকের মাথা, পায়া ও পেট ভুনা করে খেতে পারবে। তারা মেষশাবকের কিছুই অবশিষ্ট রাখবে না এবং ঘরের বাইরেও ফেলতে পারবে না, তারা সাতদিন রুটি দিয়ে নাশতা করবে। সাত দিনের শুরু হবে তাদের বছরের প্রথম মাসের ১৪ তারিখ হতে। আর এটা ছিল বসন্তকাল। যখন তারা খানা খাবে তাদের কোমর কোমরবন্দ দ্বারা বাঁধা থাকবে, পায়ে মুজা থাকবে, হাতে লাঠি থাকবে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্রুত খাবে, রাতের বেলায় খাবারের পর কিছু খাবার বাকি থাকলে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে; এটাই তাদের ও পরবর্তীদের জন্যে ঈদ বা পর্বের দিন রূপে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই নিয়ম যতদিন বলবৎ ছিল তাওরাতের বিধান ততদিন পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তাওরাতের বিধান যখন বাতিল হয়ে যায়, তখন এরূপ নিয়মও রহিত হয়ে যায়। আর পরবর্তীতে এরূপ নিয়ম প্রকৃত পক্ষে রহিত হয়ে গিয়েছিল।

    কিতাবীরা আরো বলে থাকেন, ফিরআউনের ধ্বংসের পূর্ব রাতে আল্লাহ্ তা’আলা কিবতীদের সকল নবজাতক শিশু ও নবজাতক প্রাণীকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, যাতে তারা বনী ইসরাঈলের পিছু ধাওয়া থেকে বিরত থাকে। দুপুরের সময় বনী ইসরাঈল বের হয়ে পড়ল। মিসরের অধিবাসিগণ তখন তাদের নবজাতক সন্তান ও পশুপালের শোকে অভিভূত ছিল। এমন কোন পরিবার ছিল না, যারা এরূপ শোকে শোকাহত ছিল না। অন্যদিকে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ আসার সাথে সাথে বনী ইসরাঈলরা অতি দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে পড়ল। এমনকি তারা নিজেদের আটার খামিরও তৈরি করে সারেনি, তাদের পাথেয়াদি চাদরে জড়িয়ে এগুলো কাধে ঝুলিয়ে নিল। তারা মিসরবাসীদের নিকট থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ধারস্বরূপ নিয়েছিল। তারা যখন মিসর থেকে বের হয়, তখন স্ত্রীলোক ব্যতীত তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ লাখ, তাদের সাথে ছিল তাদের পশুপাল। আর তাদের মিসরে অবস্থানের মেয়াদ ছিল চারশ ত্রিশ বছর। এটা তাদের কিতাবের কথা। ঐ বছরটিকে তারা নিষ্কৃতির বছর سنت الفسخ আর তাদের ঐ ঈদকে ‘নিষ্কৃতির ঈদ’ বলে অভিহিত করে। তাদের আরো দুটি ঈদ ছিল—ঈদুল ফাতির ও ঈদুল হামল। ঈদুল হামল ছিল বছরের প্রথম দিন। এই তিন ঈদ তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তাদের কিতাবে এগুলোর উল্লেখ ছিল।

    তারা যখন মিসর থেকে বের হয়ে পড়ল তখন তারা তাদের সাথে নিয়েছিল ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর কফিন এবং তারা সূফ নদীর রাস্তা ধরে চলছিল। তারা দিনের বেলায় ভ্রমণ করত; মেঘ তাদের সামনে সামনে ভ্রমণ করত। মেঘের মধ্যে ছিল নূরের স্তম্ভ এবং রাতে তাদের সামনে ছিল আগুনের স্তম্ভ। এ পথ ধরে তারা সমুদ্রের উপকূলে গিয়ে উপস্থিত হল। সেখানে তারা পৌঁছতে না পৌঁছতেই ফিরআউন ও তার মিসরীয় সৈন্যদল তাদের নিকটে পৌঁছে গেল। বনী ইসরাঈলরা তখন সমুদ্রের কিনারায় অবতরণ করেছিল। তাদের অনেকেই শঙ্কিত হয়ে পড়ল। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলতে লাগল, এরূপ প্রান্তরে এসে মৃত্যুবরণ করার চেয়ে মিসরের হীনতম জীবন যাপনই বরং উত্তম ছিল। তাদের উদ্দেশে মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ভয় করো না। কেননা, ফিরআউন ও তার সেনাবাহিনী এর পর আর তাদের শহরে ফিরে যেতে পারবে না। কিতাবীরা আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ দিলেন তিনি যেন সমুদ্রে নিজ লাঠি দ্বারা আঘাত করে সমুদ্র বিভক্ত করে দেন—যাতে তারা সমুদ্রে প্রবেশ করে ও শুকনো পথ পায়। দুই দিকে পানি সরে গিয়ে দুই পাহাড়ের আকার ধারণ করল; আর মাঝখানে শুকনো পথ বেরিয়ে আসে। কেননা, আল্লাহ তাআলা তখন গরম দক্ষিণা বায়ু প্রবাহিত করে দেন। তখন বনী ইসরাঈলরা সমুদ্র পার হয়ে গেল। আর ফিরআউন তার সেনাবাহিনীসহ বনী ইসরাঈলকে অনুসরণ করল। যখন সে সমুদ্রের মধ্যভাগে পৌঁছল, তখন আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাঁর লাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত করেন। ফলে পানি পূর্বের আকার ধারণ করল। তবে কিতাবীদের মতে, এ ঘটনাটি ঘটেছিল রাতের বেলায় এবং সমুদ্র তাদের উপর স্থির হয়েছিল সকাল বেলায়। এটা তাদের বোঝার ভুল এবং এটা অনুবাদ বিভ্রাটের কারণে হয়েছে। আল্লাহ তাআলাই অধিকতর জ্ঞাত। তারা আরো বলেন, যখন আল্লাহ্ তা’আলা ফিরআউন ও তার সেনাবাহিনীকে ডুবিয়ে মারলেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) ও বনী ইসরাঈল প্রতিপালকের উদ্দেশে নিম্নরূপ তাসবীহ পাঠ করলেনঃ

    يسبح الرب البهي الذى قهر الجنود

    ونبذ فرسانها فى البحر المنيع المحمود

    অর্থাৎ—‘সেই জ্যোতির্ময় প্রতিপালকের তাসবীহ পাঠ করছি, যিনি সেনাবাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছেন এবং অশ্বারোহীদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেছেন, যিনি উত্তম প্রতিরোধকারী ও প্রশংসিত।’ এটা ছিল একটি দীর্ঘ তাসবীহ। তারা আরো বলেন, হারূনের বোন নাবীয়াহ মারয়াম নিজ হাতে একটি দফ৮৫ (দফ এমন একটি বাদ্যযন্ত্র যার এক দিকে চামড়া লাগানো থাকে) ধারণ করেছিলেন এবং অন্যান্য স্ত্রীলোক তার অনুসরণ করেছিল, সকলেই দফ ও তবলা নিয়ে পথে বের হলো, মারয়াম তাদের জন্যে সুর করে গাইছিলেনঃ

    فسبحان الرب القهار الذي قهر الخيول وركبانها القاء في البحر

    “পরাক্রমশালী পবিত্র সেই প্রতিপালক যিনি ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ারদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে প্রতিহত করেছেন।” এরূপ বর্ণনা তাদের কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

    এরূপ বর্ণনা সম্ভবত, মুহাম্মদ ইবন কা’ব আল কুরাযী (র) থেকে নেয়া হয়েছে, যিনি কুরআনের আয়াত يا اخت هارون এর ব্যাখ্যায় বলতেন যে, ইমরানের কন্যা মারয়াম, ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর মা হচ্ছেন মূসা (আলাইহিস সালাম) ও হারূন (আলাইহিস সালাম)-এর বোন। তার বর্ণনাটি যে অমূলক, তাফসীরে তা আমরা বর্ণনা করেছি। এটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। কেননা, কেউ এরূপ মত পোষণ করেননি বরং প্রত্যেক তাফসীরকার এটার বিরোধিতা করেছেন। যদি ধরে নেয়া হয় যে, এরূপ হতে পারে তাহলে তার ব্যাখ্যা হবে এরূপঃ মূসা (আলাইহিস সালাম) ও হারূন (আলাইহিস সালাম)-এর বোন মারয়াম কিন্ত ইমরান এবং ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর মা মারয়াম কিন্ত ইমরানের মধ্যে নাম, পিতার নাম ও ভাইয়ের নামের মধ্যে মিল রয়েছে। যেমন- একদা মুগীরা ইব্‌ন শুবা (রাযিআল্লাহু আনহু) সাহাবীকে নাজরানের অধিবাসীরা يا اخت هارون এ- আয়াতাংশের তাফসীর প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিল। তিনি জানতেন না তাদেরকে কি বলবেন। তাই তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন, জবাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে বললেন, তুমি কি জান না তারা আম্বিয়ায়েকিরামের নামের সাথে মিল রেখে নামকরণ করতেন? ইমাম মুসলিম (র) এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

    মারয়ামকে তারা মাবিয়াহ বলত, যেমন রাজার পরিবারের স্ত্রীকে রানী বলা হয়ে থাকে। আমীরের স্ত্রীকে আমীরাহ বলা হয়ে থাকে, যদিও তাদের বাদশাহী কিংবা প্রশাসনে কোন হাত নেই। নবী পরিবারের সদস্যা হিসাবে তাঁকে নাবিয়াহ বলা হয়েছে। এটি রূপকভাবে বলা হয়েছে। সত্যি সত্যি তিনি নবী ছিলেন না এবং তার কাছে আল্লাহ তাআলার ওহী আসত না। আর মহা খুশির দিন ঈদে তাঁর দফ বাজানো হচ্ছে এ কথার প্রমাণ যে, ঈদে দফ বাজানো আমাদের পূর্বে তাদের শরীয়তেও বৈধ ছিল। এমনকি এটা আমাদের শরীয়তেও মেয়েদের জন্য ঈদের দিনে বৈধ। এ প্রসঙ্গে নিম্নে বর্ণিত হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য। মিনার দিনসমূহে তথা কুরবানীর ঈদের সময়ে দুটি বালিকা আয়েশা সিদ্দীকা (রাযিআল্লাহু আনহা)-এর কাছে দফ বাজাচ্ছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে ছিলেন, হুযূরের চেহারা ছিল দেয়ালের দিকে। যখন আবু বকর (রাযিআল্লাহু আনহু) ঘরে ঢুকলেন তখন তাদেরকে ধমক দিলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ঘরে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে আবু বকর! তাদেরকে এটা করতে দাও। কেননা, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যেই রয়েছে উৎসবের দিন এবং এটা আমাদের উৎসবের দিন। অনুরূপভাবে বিয়ে-শাদীর মজলিসে এবং প্রবাসীকে সংবর্ধনা জানানোর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ধরনের দফ বাজাননা জায়েয আছে—যা সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাদিতে বর্ণিত রয়েছে।

    কিতাবিগণ আরো বলেন যে, বনী ইসরাঈলরা যখন সমুদ্র অতিক্রম করল এবং সিরিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করল তখন তারা একটি স্থানে তিনদিন অবস্থান করে। সেখানে পানি ছিল না। তাদের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক লোক এ নিয়ে নানারূপ সমালোচনা করে। তখন তারা লবণাক্ত বিস্বাদ পানি খুঁজে পেল, যা পান করার উপযোগী ছিল না। তখন আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ দিলে তিনি একটি কাঠের টুকরো পানির উপর রেখে দিলেন। তখন তা মিঠা পানিতে পরিণত হল এবং পানকারীদের জন্যে উপাদেয় হয়ে গেল। তখন আল্লাহ তাআলা মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে ফরজ, সুন্নাত ইত্যাদি শিক্ষা দান করলেন এবং প্রচুর নসীহত প্রদান করলেন।

    মহাপরাক্রমশালী ও আপন কিতাবের রক্ষণাবেক্ষণকারী আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর কালামে ইরশাদ করেনঃ

    (وَجَـٰوَزۡنَا بِبَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ ٱلۡبَحۡرَ فَأَتَوۡا۟ عَلَىٰ قَوۡمࣲ یَعۡكُفُونَ عَلَىٰۤ أَصۡنَامࣲ لَّهُمۡۚ قَالُوا۟ یَـٰمُوسَى ٱجۡعَل لَّنَاۤ إِلَـٰهࣰا كَمَا لَهُمۡ ءَالِهَةࣱۚ قَالَ إِنَّكُمۡ قَوۡمࣱ تَجۡهَلُونَ ۝ إِنَّ هَـٰۤؤُلَاۤءِ مُتَبَّرࣱ مَّا هُمۡ فِیهِ وَبَـٰطِلࣱ مَّا كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ)[Surat Al-A’raf 138 – 139]

    অর্থাৎ, আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে দেই। তারপর তারা প্রতিমা পূজায় রত এক সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হয়। তারা বলল, “হে মূসা! তাদের দেবতার মত আমাদের জন্যেও একটি দেবতা গড়ে দাও।’ সে বলল, ‘তোমরা তো এক মূর্খ সম্প্রদায়; এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তাতে বিধ্বস্ত হবে এবং তারা যা করেছে তাও অমূলক।” (৭ আ’রাফঃ ১৩৮-১৩৯)

    তারা এরূপ মূর্খতা ও পথভ্রষ্টতার কথা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আরয করছিল অথচ তারা আল্লাহ্ তা’আলার নিদর্শনাদি ও কুদরত প্রত্যক্ষ করছিল যা প্রমাণ করে যে, মহাসম্মানিত ও মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা’আলার রাসূল যা কিছু নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তা যথার্থ। তারা এমন একটি সম্প্রদায়ের নিকট উপস্থিত হলো, যারা মূর্তি পূজায় রত ছিল। কেউ কেউ বলেন, এই মূর্তিগুলো ছিল গরুর আকৃতির। তারা তাদেরকে প্রশ্ন করেছিল যে, কেন তারা এগুলোর পূজা করে? তখন তারা বলেছিল যে, এগুলো তাদের উপকার ও অপকার সাধন করে থাকে এবং প্রয়োজনে তাদের কাছেই উপজীবিকা চাওয়া হয়। বনী ইসরাঈলের কিছু মূর্খ লোক তাদের কথায় বিশ্বাস করল। তখন এই মূর্খরা তাদের নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আরয করল যে, তিনি যেন তাদের জন্যেও দেব-দেবী গড়ে দেন যেমন ঐসব লোকের দেব-দেবী রয়েছে।

    মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে প্রতিউত্তরে বললেন, প্রতিমা পূজাকারিগণ নির্বোধ এবং তারা হিদায়াতের পথে পরিচালিত নয়। আর এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত হবে এবং তারা যা করেছে তাও অমূলক। তারপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহ্ তা’আলার নিয়ামতরাজি এবং সমকালীন বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে তাদেরকে জ্ঞানে, শরীয়তের এবং তাদের মধ্য থেকে রাসূল প্রেরণের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দানের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি তাদেরকে আরো স্মরণ করিয়ে দেন যে, মহাশক্তির অধিকারী ফিরআউনের কবল থেকে আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে উদ্ধার করেছেন এবং ফিরাউনকে তাদের সম্মুখেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাছাড়া ফিরআউন ও তার ঘনিষ্ঠ অনুচরগণ যেসব সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা নিজেদের জন্যে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত করে রেখেছিল ও সুরম্য প্রাসাদ গড়েছিল, আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে সে সবের উত্তরাধিকারী করেছেন। তিনি তাদের কাছে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন যে, এক লা-শরীফ আল্লাহ্ তা’আলা ব্যতীত অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। কেননা তিনিই সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও মহাপরাক্রমশালী। তবে বনী ইসরাঈলের সকলেই তাদের জন্যে দেব-দেবী গড়ে দেবার দরখাস্ত করেনি বরং কিছু সংখ্যক মূর্খ ও নির্বোধ লোক এরূপ করেছিল। তাই আয়াতাংশ وجاوزنا ببمي اسرائيل এ قوم বা সম্প্রদায় বলতে তাদের সকল লোককে নয়, কিছু সংখ্যককে বুঝানো হয়েছে। যেমন সূরায়ে কাহাফের আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَیَوۡمَ نُسَیِّرُ ٱلۡجِبَالَ وَتَرَى ٱلۡأَرۡضَ بَارِزَةࣰ وَحَشَرۡنَـٰهُمۡ فَلَمۡ نُغَادِرۡ مِنۡهُمۡ أَحَدࣰا ۝ وَعُرِضُوا۟ عَلَىٰ رَبِّكَ صَفࣰّا لَّقَدۡ جِئۡتُمُونَا كَمَا خَلَقۡنَـٰكُمۡ أَوَّلَ مَرَّةِۭۚ بَلۡ زَعَمۡتُمۡ أَلَّن نَّجۡعَلَ لَكُم مَّوۡعِدࣰا)

    [Surat Al-Kahf 47 – 48]

    অর্থাৎ——“সেদিন তাদের সকলকে আমি একত্রকরণ এবং তাদের কাউকেও অব্যাহতি দেব না এবং তাদেরকে তোমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত করা হবে সারিবদ্ধভাবে এবং বলা হবে, তোমাদেরকে প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার নিকট উপস্থিত হবেই অথচ তোমরা মনে করতে, যে, তোমাদের জন্য প্রতিশ্রুত ক্ষণে আমি তোমাদেরকে উপস্থিত করব না।” (সূরা কাহাফঃ ৪৭-৪৮)

    উক্ত আয়াতে বর্ণিত ‘অথচ তোমরা মনে করতে’ দ্বারা তাদের সকলকে বুঝানো হয়নি বরং কতক সংখ্যককে বুঝানো হয়েছে। ইমাম আহমদ (র)এ প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, আবূ ওয়াকিদ লায়সী (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, হুনাইন যুদ্ধের সময় আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে বের হলাম। যখন আমরা একটি কূল গাছের কাছে উপস্থিত হলাম তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। কাফিরদের যেরূপ তরবারি রাখার জায়গা রয়েছে, আমাদের সেরূপ তরবারি রাখার জায়গার ব্যবস্থা করে দিন। কাফিররা তাদের তরবারি কুল গাছে ঝুলিয়ে রাখে ও তার চারপাশে ঘিরে বসে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখন (আশ্চর্যান্বিত হয়ে) বললেনঃ আল্লাহু আকবার! এবং বললেন এটা হচ্ছে ঠিক তেমনি, যেমনটি বনী ইসরাঈলরা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিল اجعل لنا الها كمالهم الهة অর্থাৎ “হে মূসা! তাদের দেবতাদের মত আমাদের জন্যেও একটি দেবতা গড়ে দাও।’ তোমরা তো তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতিই অনুসরণ করছ। ইমাম নাসাঈ (র) এবং তিরমিযী (র)ও ভিন্ন সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী (র) হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে অভিহিত করেছেন। ইন জারীর (র) আবূ ওয়াকিদ আল লাইসী (রাযিআল্লাহু আনহু)-এর বরাতে বর্ণনা করেছেন যে, সাহাবায়ে কিরাম (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে খায়বারের উদ্দেশে মক্কা ত্যাগ করেন। বর্ণনাকারী বলেন, কাফিরদের একটি কুলগাছ ছিল, তারা এটার কাছে অবস্থান করত এবং তাদের হাতিয়ার এটার সাথে ঝুলিয়ে রাখত। এ গাছটাকে বলা হত যাতু আনওয়াত। বর্ণনাকারী বলেন, একটি বড় সবুজ রংয়ের কুল গাছের কাছে পৌঁছে আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদের জন্যেও একটি যাতু আনওয়াত-এর ব্যবস্থা করুন, যেমনটি কাফিরদের রয়েছে। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ, তোমরা এরূপ কথা বললে, যেমন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিল, আমাদের জন্য এ সম্প্রদায়ের দেবতাদের মত একটি দেবতা গড়ে দাও। সে বলল, তোমরা তো এক মূর্খ সম্প্রদায়। এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত হবে এবং তারা যা করছে তাও অমূলক।” (সূরা আরাফঃ ১৩৮-১৩৯)

    বস্তুত মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন মিসর ত্যাগ করে বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে সেখানে পৌঁছলেন, তখন সেখানে হায়সানী, ফাযারী ও কানআনী ইত্যাদি গোত্র সম্বলিত একটি দুর্দান্ত জাতিকে বসবাসরত দেখতে পান। মূসা (আলাইহিস সালাম) তখন বনী ইসরাঈলকে শহরে প্রবেশ করার এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বিতাড়িত করতে হুকুম দিলেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কিংবা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে এই শহরটি বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নির্দেশ মানতে অস্বীকার করল এবং যুদ্ধ থেকে বিরত রইল। তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে ভীতিগ্রস্ত করলেন এবং তীহ প্রান্তরে নিক্ষেপ করেন, যেখানে তারা সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর যাবত উদ্ভান্তের মত ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে থাকেন।

    যেমন আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ یَـٰقَوۡمِ ٱذۡكُرُوا۟ نِعۡمَةَ ٱللَّهِ عَلَیۡكُمۡ إِذۡ جَعَلَ فِیكُمۡ أَنۢبِیَاۤءَ وَجَعَلَكُم مُّلُوكࣰا وَءَاتَىٰكُم مَّا لَمۡ یُؤۡتِ أَحَدࣰا مِّنَ ٱلۡعَـٰلَمِینَ ۝ یَـٰقَوۡمِ ٱدۡخُلُوا۟ ٱلۡأَرۡضَ ٱلۡمُقَدَّسَةَ ٱلَّتِی كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡ وَلَا تَرۡتَدُّوا۟ عَلَىٰۤ أَدۡبَارِكُمۡ فَتَنقَلِبُوا۟ خَـٰسِرِینَ ۝ قَالُوا۟ یَـٰمُوسَىٰۤ إِنَّ فِیهَا قَوۡمࣰا جَبَّارِینَ وَإِنَّا لَن نَّدۡخُلَهَا حَتَّىٰ یَخۡرُجُوا۟ مِنۡهَا فَإِن یَخۡرُجُوا۟ مِنۡهَا فَإِنَّا دَ ٰ⁠خِلُونَ ۝ قَالَ رَجُلَانِ مِنَ ٱلَّذِینَ یَخَافُونَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَیۡهِمَا ٱدۡخُلُوا۟ عَلَیۡهِمُ ٱلۡبَابَ فَإِذَا دَخَلۡتُمُوهُ فَإِنَّكُمۡ غَـٰلِبُونَۚ وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوۤا۟ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِینَ ۝ قَالُوا۟ یَـٰمُوسَىٰۤ إِنَّا لَن نَّدۡخُلَهَاۤ أَبَدࣰا مَّا دَامُوا۟ فِیهَا فَٱذۡهَبۡ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَـٰتِلَاۤ إِنَّا هَـٰهُنَا قَـٰعِدُونَ ۝ قَالَ رَبِّ إِنِّی لَاۤ أَمۡلِكُ إِلَّا نَفۡسِی وَأَخِیۖ فَٱفۡرُقۡ بَیۡنَنَا وَبَیۡنَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡفَـٰسِقِینَ ۝ قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَیۡهِمۡۛ أَرۡبَعِینَ سَنَةࣰۛ یَتِیهُونَ فِی ٱلۡأَرۡضِۚ فَلَا تَأۡسَ عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡفَـٰسِقِینَ)[Surat Al-Ma’idah 20 – 26]

    অর্থাৎ, স্মরণ কর, মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল— হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর; যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে নবী করেছিলেন ও তোমাদেরকে রাজাধিপতি করেছিলেন এবং বিশ্বজগতে কাউকেও যা তিনি দেননি তা তোমাদেরকে দিয়েছিলেন। হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন তাতে তোমরা প্রবেশ কর এবং পশ্চাদপসরণ করবে না, করলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তারা বলল, হে মূসা! সেখানে এক দুর্দান্ত সম্প্রদায় রয়েছে এবং তারা সে স্থান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেখানে কিছুতেই প্রবেশ করব না; তারা সেই স্থান থেকে বের হয়ে গেলেই আমরা প্রবেশ করব। যারা ভয় করছিল তাদের মধ্যে দু’জন, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন তারা বলল, তোমরা তাদের মুকাবিলা করে দরজায় প্রবেশ করলেই তোমরা জয়ী হবে আর তোমরা মুমিন হলে আল্লাহর উপরই নির্ভর কর। তারা বলল, হে মূসা! তারা যতদিন সেখানে থাকবে, ততদিন আমরা সেখানে প্রবেশ করবই না। সুতরাং তুমি আর তোমার প্রতিপালক যাও এবং যুদ্ধ কর; আমরা এখানেই বসে থাকবো। সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমার ও আমার ভাই ব্যতীত অপর কারও উপর আমার আধিপত্য নেই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও। আল্লাহ্ বললেন, তবে এটা চল্লিশ বছর তাদের জন্য নিষিদ্ধ রইল, তারা পৃথিবীতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াবে, সুতরাং তুমি সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করবে না। (সূরা মায়িদাঃ ২০-২৬)

    এখানে আল্লাহর নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈলের উপর আল্লাহ তাআলা যে অনুগ্রহ করেছিলেন, তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক নিয়ামতসমূহ দান করে অনুগ্রহ করেছিলেন। তাই আল্লাহর নবী তাদেরকে আল্লাহর রাহে আল্লাহর দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্যে আদেশ দিচ্ছেন।

    তিনি বললেনঃ

    (یَـٰقَوۡمِ ٱدۡخُلُوا۟ ٱلۡأَرۡضَ ٱلۡمُقَدَّسَةَ ٱلَّتِی كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡ وَلَا تَرۡتَدُّوا۟ عَلَىٰۤ أَدۡبَارِكُمۡ فَتَنقَلِبُوا۟ خَـٰسِرِینَ)

    [Surat Al-Ma’idah 21]

    অর্থাৎ, হে আমার সম্প্রদায়! পবিত্র ভূমিতে তোমরা প্রবেশ কর আর এটা তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্যে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে না এবং দুশমনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হতে বিরত থাকবে না। যদি পশ্চাদপসরণ কর ও বিরত থাক। লাভের পর ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরিপূর্ণতা অর্জনের পর অপরিপূর্ণতার শিকার হবে।

    প্রতিউত্তরে তারা বলল, ياموسي ان فيها قوما جبارين অর্থাৎ হে মূসা! সেখানে রয়েছে একটি দুর্ধর্ষ, দুর্দান্ত ও কাফির সম্প্রদায়। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বলতে লাগল

    ( وَإِنَّا لَن نَّدۡخُلَهَا حَتَّىٰ یَخۡرُجُوا۟ مِنۡهَا فَإِن یَخۡرُجُوا۟ مِنۡهَا فَإِنَّا دَ ٰ⁠خِلُونَ)

    [Surat Al-Ma’idah 22]

    অর্থাৎ যতক্ষণ না ঐ সম্প্রদায়টি সেখান থেকে বের হয়ে যায় আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। যখন তারা বের হয়ে যাবে আমরা সেখানে প্রবেশ করব, অথচ তারা ফিরআউনের ধ্বংস ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। আর সে ছিল এদের তুলনায় অধিকতর দুর্দান্ত, অধিকতর যুদ্ধ-কুশলী এবং সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে প্রবলতর। এ থেকে বোঝা যায় যে, তারা তাদের এরূপ উক্তির ফলে ভৎসনার যোগ্য এবং খোদাদ্রোহী হতভাগ্য, দুর্দান্ত শত্রুদের মুকাবিলা থেকে বিরত থেকে লাঞ্ছনা ও নিন্দার যোগ্য।

    এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বহু তাফসীরকার বিভিন্ন ধরনের কল্প-কাহিনী ও বিবেকের কাছে অগ্রহণীয় এবং বিশুদ্ধ বর্ণনা বিবর্জিত তথ্যাদি পেশ করেছেন। যেমন কেউ কেউ বলেছেন, বনী ইসরাঈলের প্রতিপক্ষ দুর্দান্ত সম্প্রদায়ের লোকজন বিরাট দেহের অধিকারী ও ভীষণ আকৃতির ছিল। তারা এরূপও বর্ণনা করেছেন যে, বনী ইসরাঈলের দূতরা যখন তাদের কাছে পৌঁছল, তখন সে দুর্দান্ত সম্প্রদায়ের দূতদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি তাদের সাথে সাক্ষাত করল এবং তাদেরকে একজন একজন করে পাকড়াও করে আস্তিনের মধ্যে ও পায়জামার ফিতার সাথে জড়াতে লাগল, দূতরা সংখ্যায় ছিল বারজন। লোকটি তাদেরকে তাদের বাদশাহর সম্মুখে ফেলল। বাদশাহ বলল, এগুলো কি? তারা যে আদম সন্তান সে চিনতেই পারল না। অবশেষে তারা তার কাছে তাদের পরিচয় দিল।

    এসব কল্প-কাহিনী ভিত্তিহীন। এ সম্পর্কে আরো বর্ণিত রয়েছে যে, বাদশাহ তাদের ফেরৎ যাওয়ার সময় তাদের সাথে কিছু আঙ্গুর দিয়েছিল। প্রতিটি আঙ্গুর একজন লোকের জন্যে যথেষ্ট ছিল। তাদের সাথে আরো কিছু ফলও সে দিয়েছিল, যাতে তারা তাদের দেহের আকার-আকৃতি সম্বন্ধে ধারণা করতে পারে। এই বর্ণনাটিও বিশুদ্ধ নয়। এ প্রসঙ্গে তারা আরো বর্ণনা করেছেন যে, দুর্ধর্ষ ব্যক্তিদের মধ্য হতে উক্ত ইবন আনাক নামী এক ব্যক্তি বনী ইসরাঈলকে ধ্বংস করার জন্যে বনী ইসরাঈলের দিকে এগিয়ে আসল। তার উচ্চতা ছিল ৩৩৩৩ হাত। বাগাবী প্রমুখ তাফসীরকারগণ এরূপ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা শুদ্ধ নয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর হাদীসঃ

    ان الله خلق ادم طوله ستون ذراعاثم لم يزل الخلق ينقص حتى الان

    অর্থাৎ আল্লাহ আদমকে ষাট হাত উচ্চতা বিশিষ্ট করে সৃষ্টি করেন তারপর ক্রমে ক্রমে কমতে কমতে তা এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে- এর ব্যাখ্যা বর্ণনা প্রসঙ্গে তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তারা আরো বলেন, উজ নামের উক্ত ব্যক্তিটি একটি পাহাড়ের চূড়ার প্রতি তাকাল ও তা উপড়িয়ে নিয়ে আসল এবং মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সৈন্য-সামন্তের উপর রেখে দেবার মনস্থ করল, এমন সময় একটি পাখি আসল ও পাথরের পাহাড়টিকে ঠোকর দিল এবং তা ছিদ্র করে ফেলল। ফলে উজের গলায় তা বেড়ীর মত বসে গেল। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তার দিকে অগ্রসর হয়ে লাফ দিয়ে ১০ হাত উপরে উঠলেন। তার উচ্চতা ছিল ১০ হাত। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে তাঁর লাঠিটি ছিল। আর লাঠিটির উচ্চতাও ছিল ১০ হাত। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর লাঠি তাঁর পায়ের গিটের কাছে পৌঁছল এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে লাঠি দ্বারা বধ করলেন। উক্ত বর্ণনাটি আওফ আল-বাকালী (র) থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইবন জারীর (র) আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে এটি বর্ণনা করেছেন তবে এ বর্ণনার সনদের বিশুদ্ধতায় মতবিরোধ রয়েছে। এ ছাড়াও এগুলো সবই হচ্ছে ইসরাঈলী বর্ণনা। এর সব বর্ণনা বনী ইসরাঈলের মূর্খদের রচিত। এসব মিথ্যা বর্ণনার সংখ্যা এত অধিক যে, এগুলোর মধ্যে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। এগুলোকে সত্য বলে মেনে নিলে বনী ইসরাঈলকে যুদ্ধে যোগদান না করার কিংবা যুদ্ধ হতে বিরত থাকার ব্যাপারে ক্ষমার যোগ্য বলে বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে যুদ্ধ হতে বিরত থাকার জন্যে শাস্তি প্রদান করেছেন, জিহাদ না করার জন্যে এবং তাদের রাসূলের বিরোধিতা করার জন্যে তাদেরকে তীহের ময়দানে চল্লিশ বছর যাবত ভবঘুরে জীবন যাপন করার শাস্তি দিয়েছেন। দু’জন পুণ্যবান ব্যক্তি তাদেরকে যুদ্ধ করার জন্যে অগ্রসর হতে এবং যুদ্ধ পরিহারের মনোভাব প্রত্যাহার করার জন্যে যে উপদেশ দান করেছিলেন, তা আল্লাহ্ তা’আলা উপরোক্ত আয়াতে ইংগিত করেছেন। কথিত আছে, উক্ত দু’জন ছিলেন ইউশা ইবুন নূন (আলাইহিস সালাম) ও কালিব ইবন ইউকান্না। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), মুজাহিদ (র), ইকরিমা (র), আতীয়্যা (র), সুদ্দী (র), রবী ইবন আনাস (র) ও আরো অনেকে এ মত ব্যক্ত করেছেন।

    আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (قَالَ رَجُلَانِ مِنَ ٱلَّذِینَ یَخَافُونَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَیۡهِمَا ٱدۡخُلُوا۟ عَلَیۡهِمُ ٱلۡبَابَ فَإِذَا دَخَلۡتُمُوهُ فَإِنَّكُمۡ غَـٰلِبُونَۚ وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوۤا۟ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِینَ)[Surat Al-Ma’idah 23]

    অর্থাৎ, যারা ভয় করে কিংবা যারা ভীত তাদের মধ্য হতে দুইজন যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ঈমান, ইসলাম, আনুগত্য ও সাহস প্রদান করেছেন, তাঁরা বললেন, দরজা দিয়ে তাদের কাছে ঢুকে পড় এবং ঢুকে পড়লেই তোমরা জয়ী হয়ে যাবে। আর যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার উপর তাওয়াকুল রাখ তার কাছেই সাহায্য চাও এবং তার কাছেই আশ্রয় চাও, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে বিজয়ী করবেন। তখন তারা বলল, ‘হে মূসা! যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্দান্ত সম্প্রদায় উক্ত শহরে অবস্থান করবে, আমরা সেখানে প্রবেশ করব না। তুমি ও তোমার প্রতিপালক তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, আমরা এখানেই বসে রইলাম।’ (সূরা মায়িদাঃ ২৩)

    মোটকথা, বনী ইসরাঈলের সর্দাররা জিহাদ হতে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিল। এর ফলে বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেল। কথিত আছে, ইউশা (আলাইহিস সালাম) ও কালিব (আলাইহিস সালাম) যখন তাদের এরূপ উক্তি শুনতে পেলেন (তখনকার নিয়ম অনুযায়ী) তারা তাদের কাপড় ছিড়ে ফেলেন এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) ও হারূন (আলাইহিস সালাম) এই অশ্রাব্য কথার জন্য আল্লাহ্ তা’আলার গযব থেকে পরিত্রাণের জন্যে বনী ইসরাঈলের প্রতি আল্লাহ্ তা’আলার রহমত কামনা করে সিজদায় পড়ে গেলেন।

    মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ

    (قَالَ رَبِّ إِنِّی لَاۤ أَمۡلِكُ إِلَّا نَفۡسِی وَأَخِیۖ فَٱفۡرُقۡ بَیۡنَنَا وَبَیۡنَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡفَـٰسِقِینَ)

    [Surat Al-Ma’idah 25]

    অর্থাৎ, হে আমার প্রতিপালক! আমার ও আমার ভাই ছাড়া আর কারো উপর আমার আধিপত্য নেই। সুতরাং তুমি আমাদের ও সত্যত্যাগী সম্প্রদায়ের মধ্যে ফয়সালা করে দাও! (সূরা মায়িদাঃ ২৫)

    উক্ত আয়াতে উল্লেখিত আয়াতাংশের অর্থ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, এটার অর্থ হচ্ছে আমার ও তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিন।

    আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

    (قَالَ فَإِنَّهَا مُحَرَّمَةٌ عَلَیۡهِمۡۛ أَرۡبَعِینَ سَنَةࣰۛ یَتِیهُونَ فِی ٱلۡأَرۡضِۚ فَلَا تَأۡسَ عَلَى ٱلۡقَوۡمِ ٱلۡفَـٰسِقِینَ)

    [Surat Al-Ma’idah 26]

    অর্থাৎ, জিহাদ হতে বিরত থাকার জন্য তাদেরকে এ শাস্তি দেয়া হয়েছিল যে, তারা চল্লিশ বছর যাবত দিন-রাত সকাল-সন্ধ্যা তীহ ময়দানে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ভবঘুরে জীবন যাপন করবে। (সূরা মায়িদাঃ ২৬)

    কথিত আছে, তাদের যারা তীহ ময়দানে প্রবেশ করেছিল তাদের কেউ বের হতে পারেনি বরং তাদের সকলে এই চল্লিশ বছরে সেখানে মৃত্যুবরণ করেছিল। কেবল তাদের ছেলে-মেয়েরা এবং ইউশা (আলাইহিস সালাম) ও কালিব (আলাইহিস সালাম) বেঁচে ছিলেন। বদরের দিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীগণ মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ের ন্যায় বলেননি। বরং তিনি যখন তাদের কাছে যুদ্ধে যাবার বিষয়ে পরামর্শ করলেন, তখন আবু বকর সিদ্দীক (রাযিআল্লাহু আনহু) এ ব্যাপারে কথা বললেন, আবু বকর (রাযিআল্লাহু আনহু) ও অন্যান্য মুহাজির সাহাবী এ ব্যাপারে উত্তম পরামর্শ দিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘তোমরা আমাকে এ ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান কর।’ শেষ পর্যন্ত সা’দ ইবন মুয়ায (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, সম্ভবত আপনি আমাদের দিকেই ইঙ্গিত করছেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনি আমাদেরকে নিয়ে এ সমুদ্র পাড়ি দিতে চান অতঃপর আপনি এটাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে আমরাও আপনার সাথে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত। আমাদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তিই পিছু হটে থাকবে না। আগামীকালই যদি আমাদেরকে শত্রুর মুকাবিলা করতে হয় আমরা যুদ্ধে ধৈর্যের পরিচয় দেব এবং মুকাবিলার সময় দৃঢ় থাকব। হয়ত শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা আমাদের পক্ষ থেকে আপনাকে এমন আচরণ প্রদর্শন করাবেন যাতে আপনার চোখ জুড়াবে। সুতরাং আপনি আল্লাহ তা’আলার উপর ভরসা করে রওয়ানা হতে পারেন। তাঁর কথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অত্যন্ত প্রীত হলেন।

    ইমাম আহমদ (র) ইবন শিহাব (র) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, সাহাবী হযরত মিকদাদ (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বদরের যুদ্ধের দিন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে সেরূপ বলব না, যেরূপ বনী ইসরাঈল মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিল-

    ( فَٱذۡهَبۡ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَـٰتِلَاۤ إِنَّا هَـٰهُنَا قَـٰعِدُونَ)

    [Surat Al-Ma’idah 24]

    অর্থাৎ তুমি ও তোমার প্রতিপালক যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে রইলাম, বরং আমরা বলব, আপনি ও আপনার প্রতিপালক যুদ্ধে যাত্রা করুন, আমরাও আপনাদের সাথে যুদ্ধে শরীক থাকবো।’

    উল্লেখিত হাদীসের এ সনদটি উত্তম। অন্য অনেক সূত্রেও এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমদ (র) আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমি মিকদাদ (রাযিআল্লাহু আনহু)-কে এমন একটি যুদ্ধে উপস্থিত হতে দেখেছি, যে যুদ্ধে তাঁর অবস্থান এতই গৌরবজনক ছিল যে, আমি যদি সে অবস্থানে থাকতাম তবে তা অন্য যে কোন কিছুর চাইতে আমার কাছে প্রিয়তর হতো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়ায় রত ছিলেন, এমন সময় মিকদাদ (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর খিদমতে হাযির হয়ে আরয করলেন, “আল্লাহর শপথ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে এরূপ বলব না, যেরূপ বনী ইসরাঈলরা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিল ( فَٱذۡهَبۡ أَنتَ وَرَبُّكَ فَقَـٰتِلَاۤ إِنَّا هَـٰهُنَا ) বরং আমরা যুদ্ধ করব, আপনার ডানপাশে আপনার বামপাশে, আপনার সামনে ও পিছন থেকে আমরা প্রাণ দিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। এ কথা শুনার পর আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখতে পেলাম। তিনি এতে খুশী হয়েছিলেন।

    ইমাম বুখারী (র) তাঁর গ্রন্থের তাফসীর এবং মাগাযী অধ্যায়ে এ বর্ণনা পেশ করেছেন। হাফিজ আবু বকর মারদোয়েহ্ (র) আনাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন বদরের দিকে রওয়ানা হলেন, তখন তিনি মুসলমানদের সাথে পরামর্শ করলেন। উমর (রাযিআল্লাহু আনহু) তাঁকে সুপরামর্শ দিলেন। তারপর হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আনসারগণের পরামর্শ চাইলেন। কিছু সংখ্যক আনসার অন্যান্য আনসারকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে আনসার সম্প্রদায়! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধের ব্যাপারে তোমাদের পরামর্শ চাইছেন।’ তখন আনসারগণ বললেন, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এরূপ বলব না যেরূপ বনী ইসরাঈল মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছিলঃ ‘যে সত্তা আপনাকে সত্যসহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ, আমাদেরকে যদি পৃথিবীর অতি দূরতম অংশেও মুকাবিলার জন্যে যেতে বলা হয়, নিশ্চয়ই আমরা আপনার আনুগত্য করব।’ ইমাম আহমদ (র) বিভিন্ন সূত্রে আনাস (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে অনুরূপ বর্ণনা পেশ করেছেন। ইবন হিব্বান (র) তার ‘সহীহ’ গ্রন্থেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

    বনী ইসরাঈলের তীহ প্রান্তরে প্রবেশ ও অত্যাশ্চর্য ঘটনাবলী

    পূর্বোল্লিখিত দুর্দান্ত জাতির বিরুদ্ধে বনী ইসরাঈলের জিহাদ করা হতে বিরত থাকার বিষয়টি উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। এ কারণে আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে তীহ প্রান্তরে, ভবঘুরের মত বিচরণের শাস্তি দেন এবং নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, চল্লিশ বছর তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না। কিতাবীদের গ্রন্থাদিতে জিহাদ থেকে বিরত থাকার বিষয়টি আমার চোখে পড়েনি বরং তাদের কিতাবে রয়েছে, “মূসা (আলাইহিস সালাম) একদিন ইউশা (আলাইহিস সালাম)-কে কাফিরদের একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করার প্রস্তুতি নিতে হুকুম দিলেন। আর মূসা (আলাইহিস সালাম), হারূন (আলাইহিস সালাম) ও খোর নামক এক ব্যক্তি একটি টিলার চূড়ায় বসেছিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর লাঠি উপরের দিকে উঠালেন, যখনই তিনি তাঁর লাঠি উপরের দিকে উঠিয়ে রাখতেন, তখনই ইউশা (আলাইহিস সালাম) শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ী হতেন। আর যখনই লাঠিসহ তার হাত ক্লান্তি কিংবা অন্য কারণে নিচে নেমে আসত তখনই শত্রুদল বিজয়ী হতে থাকত। তাই হারূন (আলাইহিস সালাম) ও খোর মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর দুই হাতকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ডানে, বামে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। ইউশা (আলাইহিস সালাম)-এর সৈন্য দল জয়লাভ করল।

    কিতাবীদের মতে, ইউশা (আলাইহিস সালাম)-এর সেনাবাহিনী সকলে মাদায়ানকে পছন্দ করত। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর শ্বশুরের কাছে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর যাবতীয় ঘটনার সংবাদ পৌঁছল। আর এ খবর পৌঁছল যে, কিভাবে আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে তার শত্রু ফিরআউনের বিরুদ্ধে বিজয় দান করেছেন। তাই তিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আনুগত্য সহকারে উপস্থিত হলেন। তাঁর সাথে ছিলেন তার মেয়ে সাফুরা। সাফুরা ছিলেন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রী। তার সাথে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্র জারশুন এবং আটিরও ছিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর শ্বশুরের সাথে সাক্ষাত করলেন। তিনি তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। তাঁর সাথে বনী ইসরাঈলের মুরুব্বীগণও সাক্ষাত করলেন, তারাও তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেন।

    কিতাবীরা আরো উল্লেখ করে যে, মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর শ্বশুর দেখলেন যে, ঝগড়া বিবাদের সময় বনী ইসরাঈলের একটি দল মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে ভিড় জমায়। তাই তিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন জনগণের মধ্য হতে কিছু সংখ্যক আমানতদার, পরহেযগার ও চরিত্রবান প্রশাসক নিযুক্ত করেন। যারা ঘুষ ও খিয়ানতকে ঘৃণা করেন। তিনি যেন তাদেরকে বিভিন্ন স্তরের প্রধানরূপে নিযুক্ত করেন। যেমন প্রতি হাজারের জন্যে, প্রতি শতের জন্যে, প্রতি পঞ্চাশজনের জন্য এবং প্রতি দশজনের জন্য একজন করে। তারা জনগণের মধ্যে বিচারকার্য সমাধা করবেন। তাদের কর্তব্য সমাধানে যদি কোন প্রকার সমস্যা দেখা দেয়, তখন তারা আপনার কাছে ফায়সালার জন্যে আসবে এবং আপনি তাদের সমস্যার সমাধান দেবেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) সেরূপ শাসনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করলেন।

    কিতাবীরা আরো বলেন, মিসর থেকে বের হবার তৃতীয় মাসে বনী ইসরাঈলরা সিনাইর কাছে সমতল ভূমিতে অবতরণ করেন। তারা তাদের কাছে চলতি বছরের প্রথম মাসে মিসর থেকে বের হয়েছিলেন। এটা ছিল বসন্ত ঋতুর সূচনাকাল। কাজেই তারা যেন গ্রীষ্মের প্রারম্ভে তীহ নামক ময়দানে প্রবেশ করেছিলেন। আল্লাহই অধিকতর জ্ঞাত।

    কিতাবীরা বলেন, বনী ইসরাঈলগণ সিনাইয়ের তূর পাহাড়ের পাশেই অবতরণ করেন। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তুর পাহাড়ে আরোহণ করেন এবং তাঁর প্রতিপালক তার সাথে কথা বলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে হুকুম দিলেন, তিনি যেন বনী ইসরাইলকে আল্লাহ তা’আলা যেসব নিয়ামত প্রদান করেছেন, তা স্মরণ করিয়ে দেন। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে ফিরআউন ও তার সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা করেছেন এবং তাদেরকে যেন শকুনের দুইটি পাখায় উঠিয়ে ফিরআউনের কবল থেকে রক্ষা করেছেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে নির্দেশ দেন, তিনি যেন বনী ইসরাঈলকে পবিত্রতা অর্জন করতে, গোসল করতে, কাপড়-চোপড় ধুয়ে তৃতীয় দিবসের জন্যে তৈরি হতে হুকুম দেন। তৃতীয় দিন সমাগত হলে তিনি নির্দেশ দেন, তারা যেন পাহাড়ের পাশে সমবেত হন, তবে তাদের মধ্য হতে কেউ যেন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে না আসে। যদি তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর কাছে আসে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শিংগার আওয়াজ শুনতে থাকবে, এমনকি একটি প্রাণীও তখন তার কাছে যেতে পারবে না। যখন শিংগার আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাবে তখন পাহাড়ে যাওয়া তাদের জন্যে বৈধ হবে। বনী ইসরাঈলও মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কথা শুনলেন; তাঁর আনুগত্য করলেন, গোসল করলেন; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হলেন; পবিত্রতা অর্জন করলেন ও খুশবু ব্যবহার করলেন। তৃতীয় দিন পাহাড়ের উপর বিরাট মেঘখণ্ড দেখা দিল; সেখানে গর্জন শোনা গেল; বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল ও শিংগার বিকট আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। এতে বনী ইসরাইল ঘাবড়ে গেল ও অত্যন্ত আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা বের হল এবং পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়াল। পাহাড়কে বিরাট ধোয়ায় ঢেকে ফেলল, তার মধ্যে ছিল অনেকগুলো নূরের স্তম্ভ।

    সমস্ত পাহাড় প্রচণ্ডভাবে কাঁপতে লাগল, শিংগার গর্জন অব্যাহত রইল এবং ক্রমাগত তা বৃদ্ধি পেতে লাগল। মূসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন পাহাড়ের উপরে, আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর সাথে একান্তে কথা বলছিলেন। আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে নেমে যেতে হুকুম দিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ্ তা’আলার কালাম শোনার জন্যে পাহাড়ের নিকটবর্তী হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাদের আলেমদেরকেও তিনি নিকটবর্তী হতে আদেশ দিয়েছিলেন। অতঃপর অধিক নৈকট্য অর্জন করার জন্যে তাদেরকে পাহাড়েও চড়তে হুকুম দিলেন।

    উপরোক্ত সংবাদটি হলো কিতাবীদের গ্রন্থাদিতে লিখিত সংবাদ যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে যায়।(كتاب البدايه والنهاية

    মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! এরা পাহাড়ে চড়তে সক্ষম নয় আর তুমি পূর্বে একাজ করতে নিষেধ করেছিলে।’ অতঃপর আল্লাহ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে তার ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে নিয়ে আসতে হুকুম দিলেন। আর আলিমগণ এবং বনী ইসরাঈলের অন্যরা যেন নিকটে উপস্থিত থাকে। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাই করলেন। তাঁর প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন। তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাকে দশটি কলেমা বা উপদেশ বাণী দিলেন।

    কিতাবীদের মতে, বনী ইসরাঈলরা আল্লাহর কালাম শুনেছিল কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, যতক্ষণ না মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আর মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে তারা বলতে লাগল, ‘আপনি প্রতিপালকের কাছ থেকে আমাদের কাছে উপদেশ বাণী পৌঁছিয়ে দিন। আমরা আশংকা করছি হয়তো আমরা মারা পড়ব। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদের কাছে আল্লাহ্ তা’আলার তরফ থেকে প্রাপ্ত দশটি উপদেশ বাণী পৌঁছিয়ে দেন। আর এগুলো হচ্ছেঃ (এক) লা-শরীক আল্লাহ্ তা’আলার ইবাদতের নির্দেশ, (দুই) আল্লাহ্ তা’আলার সাথে মিথ্যা শপথ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা, (তিন) ‘সাবাত সংরক্ষণের জন্যে নির্দেশ। তার অর্থ হচ্ছে সপ্তাহের একদিন অর্থাৎ শনিবারকে ইবাদতের জন্যে নির্দিষ্ট রাখা। শনিবারকে রহিত করে আল্লাহ তাআলা এর বিকল্পরূপে আমাদেরকে জুমআর দিন দান করেছেন। (চার) তোমার পিতা-মাতাকে সম্মান কর। তাহলে পৃথিবীতে আল্লাহ্ তা’আলা তোমার আয়ু বৃদ্ধি করে দেবেন, (পাঁচ) নর হত্যা করবে না, (ছয়) ব্যভিচার করবে না, (সাত) চুরি করবে না, (আট) তোমার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে না, (নয়) তোমার প্রতিবেশীর ঘরের প্রতি লোভের দৃষ্টিতে তাকাবে না, (দশ) তোমার সাথীর স্ত্রী, গোলাম-বাঁদী, গরু-গাধা ইত্যাদি কোন জিনিসে লোভ করবে না। অর্থাৎ হিংসা থেকে বারণ করা হয়। আমাদের প্রাচীনকালের আলিমগণ ও অন্য অনেকেই বলেন যে, এ দশটি উপদেশ বাণীর সারমর্ম কুরআনের সূরায়ে আনআমের দু’টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

    যাতে আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন:

    (۞ قُلۡ تَعَالَوۡا۟ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَیۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُوا۟ بِهِۦ شَیۡـࣰٔاۖ وَبِٱلۡوَ ٰ⁠لِدَیۡنِ إِحۡسَـٰنࣰاۖ وَلَا تَقۡتُلُوۤا۟ أَوۡلَـٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَـٰقࣲ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِیَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُوا۟ ٱلۡفَوَ ٰ⁠حِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُوا۟ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِی حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ ۝ وَلَا تَقۡرَبُوا۟ مَالَ ٱلۡیَتِیمِ إِلَّا بِٱلَّتِی هِیَ أَحۡسَنُ حَتَّىٰ یَبۡلُغَ أَشُدَّهُۥۚ وَأَوۡفُوا۟ ٱلۡكَیۡلَ وَٱلۡمِیزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ لَا نُكَلِّفُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۖ وَإِذَا قُلۡتُمۡ فَٱعۡدِلُوا۟ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰۖ وَبِعَهۡدِ ٱللَّهِ أَوۡفُوا۟ۚ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ ۝ وَأَنَّ هَـٰذَا صِرَ ٰ⁠طِی مُسۡتَقِیمࣰا فَٱتَّبِعُوهُۖ وَلَا تَتَّبِعُوا۟ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمۡ عَن سَبِیلِهِۦۚ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ)

    [Surat Al-An’am 151 – 153]

    অর্থাৎ—বল, এস তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তোমাদেরকে তা পড়ে শুনাই, তাহলো তোমরা তাঁর কোন শরীক করবে না, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযিক দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের কাছে যাবে না; আল্লাহ্ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করবে না। তোমাদেরকে তিনি এই নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর। ইয়াতীম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ব্যতীত তোমরা তার সম্পত্তির নিকটবর্তী হবে না এবং পরিমাণ ও ওজন ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দেবে। আমি কাউকেও তার সাধ্যাতীত ভার অর্পণ করি না। যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য বলবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর এবং এপথই আমার সরলপথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করবে। (সূরা আনআমঃ ১৫১-১৫৩)

    তারা এই দশটি উপদেশ বাণীর পরও বহু ওসীয়ত ও বিভিন্ন মূল্যবান নির্দেশাবলীর উল্লেখ করেছেন, যেগুলো বহুদিন যাবত চালু ছিল। তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এগুলো আমল করেছেন কিন্তু এরপরই এগুলোতে আমলকারীদের পক্ষ হতে অবাধ্যতার ছোঁয়া লাগে। তারা এগুলোর দিকে লক্ষ্য করলো এবং এগুলোতে পরিবর্তন সাধন করল, কোন কোনটা একেবারে বদল করে দিল; আবার কোন কোনটার মনগড়া ব্যাখ্যা দান করতে লাগল। তারপর এগুলোকে একেবারেই তারা ছেড়ে দিল। এরূপ এসব নির্দেশ এককালে পূর্ণরূপে চালু থাকার পর পরিবর্তিত ও বর্জিত হয়ে যায়। পূর্বে ও পরে আল্লাহ তাআলার হুকুমই বলবৎ থাকবে, তিনিই যা ইচ্ছে হুকুম করে থাকেন এবং যা ইচ্ছে করে থাকেন, তাঁরই হাতে সৃষ্টি ও আদেশের মূল চাবিকাঠি। জগতের প্রতিপালক আল্লাহই বরকতময়। অন্যত্র আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (یَـٰبَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ قَدۡ أَنجَیۡنَـٰكُم مِّنۡ عَدُوِّكُمۡ وَوَ ٰ⁠عَدۡنَـٰكُمۡ جَانِبَ ٱلطُّورِ ٱلۡأَیۡمَنَ وَنَزَّلۡنَا عَلَیۡكُمُ ٱلۡمَنَّ وَٱلسَّلۡوَىٰ ۝ كُلُوا۟ مِن طَیِّبَـٰتِ مَا رَزَقۡنَـٰكُمۡ وَلَا تَطۡغَوۡا۟ فِیهِ فَیَحِلَّ عَلَیۡكُمۡ غَضَبِیۖ وَمَن یَحۡلِلۡ عَلَیۡهِ غَضَبِی فَقَدۡ هَوَىٰ ۝ وَإِنِّی لَغَفَّارࣱ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَـٰلِحࣰا ثُمَّ ٱهۡتَدَىٰ)

    [Surat Ta-Ha 80 – 82]

    অর্থাৎ, হে বনী ইসরাঈল! আমি তো তোমাদেরকে শত্রু থেকে উদ্ধার করেছিলাম, আমি তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তূর পর্বতের দক্ষিণ পার্শ্বে এবং তোমাদের কাছে মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করেছিলাম, তোমাদেরকে যা দান করেছি তা হতে ভাল ভাল বস্তু আহার কর এবং এ বিষয়ে সীমালংঘন করো না, করলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ অবধারিত এবং যার উপর আমার ক্রোধ অবধারিত সে তো ধ্বংস হয়ে যায়। আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তাঁর প্রতি, যে তওবা করে ঈমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎপথে অবিচলিত থাকে। (সূরা তা-হাঃ ৮০-৮২)

    আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলের প্রতি যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছিলেন সেগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এখানে দিচ্ছেন। তিনি তাদেরকে শত্রু থেকে রক্ষা করেছিলেন, বিপদ-আপদ ও সংকীর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই দিয়েছিলেন। আর তাদেরকে তূর পর্বতের দক্ষিণ পার্শ্বে তাদের নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গ দান করার জন্যে অংগীকার করেছিলেন যাতে তিনি তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের উপকারের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিধান অবতীর্ণ করতে পারেন। আর আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর মান্না আসমান থেকে প্রতি প্রত্যুষে নাযিল করেন। তাদের জন্যে অতি প্রয়োজনের বেলায় কঠিন সময়ে এমন ভূমিতে ভ্রমণ ও অবস্থানকালে যেখানে কোন প্রকার ফসলাদি ও দুধেল প্রাণী ছিল না। প্রতিদিন সকালে তারা মান্না ঘরের মাঝেই পেয়ে যেত এবং তাদের প্রয়োজন মুতাবিক রেখে দিত যাতে ঐদিনের সকাল হতে আগামী দিনের ঐ সময় পর্যন্ত তাদের খাওয়া-দাওয়া চলে। যে ব্যক্তি এরূপ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সঞ্চয় করে রাখত তা নষ্ট হয়ে যেত; আর যে কম গ্রহণ করত এটাই তার জন্যে যথেষ্ট হত; যে অতিরিক্ত নিত তাও অবশিষ্ট থাকতো না। মান্না তারা রুটির মত করে তৈরি করত এটা ছিল ধধবে সাদা এবং অতি মিষ্ট। দিনের শেষ বেলা সালওয়া নামক পাখি তাদের কাছে এসে যেত, রাতের খাবারের প্রয়োজন মত পরিমাণ পাখি তারা অনায়াসে শিকার করত। গ্রীষ্মকাল দেখা দিলে আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর মেঘখণ্ড প্রেরণ করে ছায়া দান করতেন। এই মেঘখণ্ড তাদের প্রখরতা ও উত্তাপ থেকে রক্ষা করত।

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (یَـٰبَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ ٱذۡكُرُوا۟ نِعۡمَتِیَ ٱلَّتِیۤ أَنۡعَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ وَأَوۡفُوا۟ بِعَهۡدِیۤ أُوفِ بِعَهۡدِكُمۡ وَإِیَّـٰیَ فَٱرۡهَبُونِ ۝ وَءَامِنُوا۟ بِمَاۤ أَنزَلۡتُ مُصَدِّقࣰا لِّمَا مَعَكُمۡ وَلَا تَكُونُوۤا۟ أَوَّلَ كَافِرِۭ بِهِۦۖ وَلَا تَشۡتَرُوا۟ بِـَٔایَـٰتِی ثَمَنࣰا قَلِیلࣰا وَإِیَّـٰیَ فَٱتَّقُونِ)[Surat Al-Baqarah 40 – 41]

    “হে বনী ইসরাঈল! আমার সে অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর যা দিয়ে আমি তোমাদেরকে অনুগৃহীত করেছি এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূর্ণ কর। আমিও তোমাদের সঙ্গে আমার অঙ্গীকার পূর্ণ করব এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর। আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে ঈমান আন। এটা তোমাদের কাছে যা আছে তার প্রত্যয়নকারী। আর তোমরাই এটার প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করবে না। তোমরা শুধু আমাকে ভয় করবে।” (সূরা বাকারাঃ ৪০-৪১)

    এরপর আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (یَـٰبَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ ٱذۡكُرُوا۟ نِعۡمَتِیَ ٱلَّتِیۤ أَنۡعَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ وَأَنِّی فَضَّلۡتُكُمۡ عَلَى ٱلۡعَـٰلَمِینَ ۝ وَٱتَّقُوا۟ یَوۡمࣰا لَّا تَجۡزِی نَفۡسٌ عَن نَّفۡسࣲ شَیۡـࣰٔا وَلَا یُقۡبَلُ مِنۡهَا شَفَـٰعَةࣱ وَلَا یُؤۡخَذُ مِنۡهَا عَدۡلࣱ وَلَا هُمۡ یُنصَرُونَ ۝ وَإِذۡ نَجَّیۡنَـٰكُم مِّنۡ ءَالِ فِرۡعَوۡنَ یَسُومُونَكُمۡ سُوۤءَ ٱلۡعَذَابِ یُذَبِّحُونَ أَبۡنَاۤءَكُمۡ وَیَسۡتَحۡیُونَ نِسَاۤءَكُمۡۚ وَفِی ذَ ٰ⁠لِكُم بَلَاۤءࣱ مِّن رَّبِّكُمۡ عَظِیمࣱ ۝ وَإِذۡ فَرَقۡنَا بِكُمُ ٱلۡبَحۡرَ فَأَنجَیۡنَـٰكُمۡ وَأَغۡرَقۡنَاۤ ءَالَ فِرۡعَوۡنَ وَأَنتُمۡ تَنظُرُونَ ۝ وَإِذۡ وَ ٰ⁠عَدۡنَا مُوسَىٰۤ أَرۡبَعِینَ لَیۡلَةࣰ ثُمَّ ٱتَّخَذۡتُمُ ٱلۡعِجۡلَ مِنۢ بَعۡدِهِۦ وَأَنتُمۡ ظَـٰلِمُونَ ۝ ثُمَّ عَفَوۡنَا عَنكُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَ ٰ⁠لِكَ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ ۝ وَإِذۡ ءَاتَیۡنَا مُوسَى ٱلۡكِتَـٰبَ وَٱلۡفُرۡقَانَ لَعَلَّكُمۡ تَهۡتَدُونَ ۝ وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ یَـٰقَوۡمِ إِنَّكُمۡ ظَلَمۡتُمۡ أَنفُسَكُم بِٱتِّخَاذِكُمُ ٱلۡعِجۡلَ فَتُوبُوۤا۟ إِلَىٰ بَارِىِٕكُمۡ فَٱقۡتُلُوۤا۟ أَنفُسَكُمۡ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ خَیۡرࣱ لَّكُمۡ عِندَ بَارِىِٕكُمۡ فَتَابَ عَلَیۡكُمۡۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِیمُ ۝ وَإِذۡ قُلۡتُمۡ یَـٰمُوسَىٰ لَن نُّؤۡمِنَ لَكَ حَتَّىٰ نَرَى ٱللَّهَ جَهۡرَةࣰ فَأَخَذَتۡكُمُ ٱلصَّـٰعِقَةُ وَأَنتُمۡ تَنظُرُونَ ۝ ثُمَّ بَعَثۡنَـٰكُم مِّنۢ بَعۡدِ مَوۡتِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ ۝ وَظَلَّلۡنَا عَلَیۡكُمُ ٱلۡغَمَامَ وَأَنزَلۡنَا عَلَیۡكُمُ ٱلۡمَنَّ وَٱلسَّلۡوَىٰۖ كُلُوا۟ مِن طَیِّبَـٰتِ مَا رَزَقۡنَـٰكُمۡۚ وَمَا ظَلَمُونَا وَلَـٰكِن كَانُوۤا۟ أَنفُسَهُمۡ یَظۡلِمُونَ)[Surat Al-Baqarah 47 – 57]

    অর্থাৎ, হে বনী ইসরাঈল! আমার সেই অনুগ্রহকে স্মরণ কর, যা দ্বারা আমি তোমাদেরকে অর্থাৎ অনুগৃহীত করেছিলাম এবং বিশ্বে সবার উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম। তোমরা সে দিনকে ভয় কর যেদিন কেউ কারো কোন কাজে আসবে না, কারো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না এবং কারো নিকট থেকে বিনিময় গৃহীত হবে না এবং তারা কোন প্রকার সাহায্য প্রাপ্তও হবে না। স্মরণ কর, যখন আমি ফিরআউনী সম্প্রদায়ের কবল থেকে তোমাদেরকে নিষ্কৃতি দিয়েছিলাম, যারা তোমাদের পুত্রদেরকে যবেহ করে ও তোমাদের নারীদেরকে জীবিত রেখে তোমাদেরকে মর্মান্তিক যন্ত্রণা দিত; এবং এতে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক মহাপরীক্ষা ছিল; যখন তোমাদের জন্য সাগরকে বিভক্ত করেছিলাম এবং তোমাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম ও ফিরআউনী সম্প্রদায়কে নিমজ্জিত করেছিলাম আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করেছিলে। যখন মূসার জন্যে চল্লিশ রাত নির্ধারিত করেছিলাম, তার প্রস্থানের পর তোমরা তখন বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছিলে। তোমরা তো জালিম। এরপরও আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যখন আমি মূসাকে কিতাব ও ফুরকান দান করেছিলাম যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও। আর যখন মূসা আপন সম্প্রদায়ের লোককে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি ঘোর অত্যাচার করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের স্রষ্টার পানে ফিরে যাও এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর। তোমাদের স্রষ্টার কাছে এটাই শ্রেয়। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করব না, তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে আর তোমরা নিজেরাই দেখছিলে। তারপর মৃত্যুর পর আমি তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর। আমি মেঘ দ্বারা তোমাদের উপর ছায়া বিস্তার করলাম। তোমাদের নিকট মান্না ও সালওয়া প্রেরণ করলাম। বলেছিলাম, তোমাদেরকে ভাল যা দান করেছি তা হতে আহার কর। তারা আমার প্রতি কোন জুলুম করে নাই বরং তারা তাদের প্রতিই জুলুম করেছিল। (সূরা বাকারাঃ ৪৭-৫৭)

    অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (۞ وَإِذِ ٱسۡتَسۡقَىٰ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ فَقُلۡنَا ٱضۡرِب بِّعَصَاكَ ٱلۡحَجَرَۖ فَٱنفَجَرَتۡ مِنۡهُ ٱثۡنَتَا عَشۡرَةَ عَیۡنࣰاۖ قَدۡ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسࣲ مَّشۡرَبَهُمۡۖ كُلُوا۟ وَٱشۡرَبُوا۟ مِن رِّزۡقِ ٱللَّهِ وَلَا تَعۡثَوۡا۟ فِی ٱلۡأَرۡضِ مُفۡسِدِینَ ۝ وَإِذۡ قُلۡتُمۡ یَـٰمُوسَىٰ لَن نَّصۡبِرَ عَلَىٰ طَعَامࣲ وَ ٰ⁠حِدࣲ فَٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُخۡرِجۡ لَنَا مِمَّا تُنۢبِتُ ٱلۡأَرۡضُ مِنۢ بَقۡلِهَا وَقِثَّاۤىِٕهَا وَفُومِهَا وَعَدَسِهَا وَبَصَلِهَاۖ قَالَ أَتَسۡتَبۡدِلُونَ ٱلَّذِی هُوَ أَدۡنَىٰ بِٱلَّذِی هُوَ خَیۡرٌۚ ٱهۡبِطُوا۟ مِصۡرࣰا فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلۡتُمۡۗ وَضُرِبَتۡ عَلَیۡهِمُ ٱلذِّلَّةُ وَٱلۡمَسۡكَنَةُ وَبَاۤءُو بِغَضَبࣲ مِّنَ ٱللَّهِۗ ذَ ٰ⁠لِكَ بِأَنَّهُمۡ كَانُوا۟ یَكۡفُرُونَ بِـَٔایَـٰتِ ٱللَّهِ وَیَقۡتُلُونَ ٱلنَّبِیِّـۧنَ بِغَیۡرِ ٱلۡحَقِّۗ ذَ ٰ⁠لِكَ بِمَا عَصَوا۟ وَّكَانُوا۟ یَعۡتَدُونَ)[Surat Al-Baqarah 60 – 61]

    অর্থাৎ, স্মরণ কর, যখন মূসা তার সম্প্রদায়ের জন্য পানি প্রার্থনা করল। আমি বললাম, তোমরা লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত কর। ফলে তাথেকে বারটি ঝরনা প্রবাহিত হল। প্রত্যেক গোত্র নিজ নিজ পান-স্থান চিনে নিল। আমি বললাম, ‘আল্লাহ্ প্রদত্ত জীবিকা হতে তোমরা পানাহার কর এবং দুষ্কৃতকারীরূপে পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করে বেড়াবে না। যখন তোমরা বলেছিলে, “হে মূসা! আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্যধারণ করব না। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে আমাদের জন্য প্রার্থনা কর তিনি যেন ভূমিজাত দ্রব্য, শাক-সবজি, ফাঁকুড়, গম, মসুর ও পিঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন। মূসা বলল, তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্টতর বস্তুর সাথে বদল করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও তা সেখানে রয়েছে। আর তারা লাঞ্ছনা ও দারিদ্রগ্রস্ত হল ও তারা আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হলো।

    এটা এজন্য যে, তারা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করত এবং নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। অবাধ্যতা ও সীমালংঘন করবার জন্যই তাদের এই পরিণতি হয়েছিল। (সূরা বাকারাঃ ৬০-৬১)

    এখানে আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে যেসব নিয়ামত দান করেছেন ও অনুগ্রহ করেছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে দুটো সুস্বাদু খাবার বিনা কষ্টে ও পরিশ্রমে সহজলভ্য করে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন ভোরে আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্যে মান্না অবতীর্ণ করতেন এবং সন্ধ্যার সময় সালওয়া নামক পাখি প্রেরণ করতেন। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর লাঠি দ্বারা পাথরে আঘাত করার ফলে তাদের জন্যে আল্লাহ তা’আলা পানি প্রবাহিত করে দিয়েছিলেন। তারা এই পাথরটিকে তাদের সাথে লাঠি সহকারে বহন করত। এই পাথর থেকে বারটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হত; প্রতিটি গোত্রের জন্যে একটি প্রস্রবণ নির্ধারিত ছিল। এই প্রস্রবণগুলো পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি প্রবাহিত করত। তারা নিজেরা পান করত ও তাদের প্রাণীদেরকে পানি পান করাত এবং তারা প্রয়োজনীয় পানি জমা করেও রাখত। উত্তাপ থেকে বাঁচাবার জন্যে মেঘ দ্বারা তাদেরকে আল্লাহ তাআলা ছায়া দান করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার তরফ হতে তাদের জন্যে ছিল এগুলো বড় বড় নিয়ামত ও দান, তবে তারা এগুলোর পূর্ণ মর্যাদা অনুধাবন করেনি এবং এগুলোর জন্যে যথাযোগ্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেনি। আর যথাযথভাবে ইবাদতও তারা আঞ্জাম দেয়নি। অতঃপর তাদের অনেকেই এসব নিয়ামতের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করল। এগুলোর প্রতি অধৈর্য হয়ে উঠল এবং চাইল যাতে তাদেরকে এগুলো পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এমন সব বস্তু যা ভূমি উৎপন্ন করে যেমন শাক, সবৃজি, ফঁকুড়, গম, মসুর ও পিয়াজ ইত্যাদি। এ কথার জন্যে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে ভৎসনা করলেন এবং ধমক দিলেন, তাদের সতর্ক করে বললেনঃ

    أَتَسۡتَبۡدِلُونَ ٱلَّذِی هُوَ أَدۡنَىٰ بِٱلَّذِی هُوَ خَیۡرٌۚ ٱهۡبِطُوا۟ مِصۡرࣰا فَإِنَّ لَكُم مَّا سَأَلۡتُمۡۗ

    অর্থাৎ, ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল শহরের অধিবাসীর জন্য অর্জিত উৎকৃষ্ট নিয়ামতসমূহের পরিবর্তে কি তোমরা নিকৃষ্টতর বস্তু চাও? তাহলে তোমরা যেসব বস্তু ও মর্যাদার উপযুক্ত নও তার থেকে অবতরণ করে তোমরা যে ধরনের নিকৃষ্ট মানের খাদ্য খাবার চাও তা তোমরা অর্জন করতে পারবে। তবে আমি তোমাদের আবদারের প্রতি সাড়া দিচ্ছি না এবং তোমরা যে ধরনের আকাঙক্ষা পোষণ করছ তাও আল্লাহ তা’আলার দরবারে আপাতত পৌছাচ্ছি না। উপরোক্ত যেসব আচরণ তাদের থেকে পরিলক্ষিত হয়েছে তা থেকে বোঝা যায় যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে যেসব কাজ থেকে বিরত রাখতে ইচ্ছে করেছিলেন তা থেকে তারা বিরত থাকেনি।

    যেমন আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (كُلُوا۟ مِن طَیِّبَـٰتِ مَا رَزَقۡنَـٰكُمۡ وَلَا تَطۡغَوۡا۟ فِیهِ فَیَحِلَّ عَلَیۡكُمۡ غَضَبِیۖ وَمَن یَحۡلِلۡ عَلَیۡهِ غَضَبِی فَقَدۡ هَوَىٰ) [Surat Ta-Ha 81]

    অর্থাৎ, এ বিষয়ে সীমালংঘন করবে না, করলে তোমাদের উপর আমার ক্রোধ অবধারিত এবং যার উপর আমার ক্রোধ অবধারিত সে তো ধ্বংস হয়ে যায়। (সূরা তা-হাঃ ৮১)

    বনী ইসরাঈলের উপর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা’আলার গযব অবধারিত হয়েছিল। তবে আল্লাহ্ তা’আলা এরূপ কঠোর শাস্তিকে আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথেও সম্পৃক্ত করেছেন, ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে আল্লাহ্ তা’আলার প্রতি প্রত্যাবর্তন করে ও পাপরাশি থেকে তওবা করে এবং বিতাড়িত শয়তানের অনুসরণে আর লিপ্ত না থাকে।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

    (وَإِنِّی لَغَفَّارࣱ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَـٰلِحࣰا ثُمَّ ٱهۡتَدَىٰ)

    [Surat Ta-Ha 82]

    অর্থাৎ, আমি অবশ্যই ক্ষমাশীল তার প্রতি যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে ও সৎপথে অবিচল থাকে। (সূরাঃ তা-হা ৮২)

    আল্লাহর দীদার লাভের জন্য মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর প্রার্থনা

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ-

    (۞ وَوَ ٰ⁠عَدۡنَا مُوسَىٰ ثَلَـٰثِینَ لَیۡلَةࣰ وَأَتۡمَمۡنَـٰهَا بِعَشۡرࣲ فَتَمَّ مِیقَـٰتُ رَبِّهِۦۤ أَرۡبَعِینَ لَیۡلَةࣰۚ وَقَالَ مُوسَىٰ لِأَخِیهِ هَـٰرُونَ ٱخۡلُفۡنِی فِی قَوۡمِی وَأَصۡلِحۡ وَلَا تَتَّبِعۡ سَبِیلَ ٱلۡمُفۡسِدِینَ ۝ وَلَمَّا جَاۤءَ مُوسَىٰ لِمِیقَـٰتِنَا وَكَلَّمَهُۥ رَبُّهُۥ قَالَ رَبِّ أَرِنِیۤ أَنظُرۡ إِلَیۡكَۚ قَالَ لَن تَرَىٰنِی وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَكَانَهُۥ فَسَوۡفَ تَرَىٰنِیۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُۥ دَكࣰّا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقࣰاۚ فَلَمَّاۤ أَفَاقَ قَالَ سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَیۡكَ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِینَ ۝ قَالَ یَـٰمُوسَىٰۤ إِنِّی ٱصۡطَفَیۡتُكَ عَلَى ٱلنَّاسِ بِرِسَـٰلَـٰتِی وَبِكَلَـٰمِی فَخُذۡ مَاۤ ءَاتَیۡتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّـٰكِرِینَ ۝ وَكَتَبۡنَا لَهُۥ فِی ٱلۡأَلۡوَاحِ مِن كُلِّ شَیۡءࣲ مَّوۡعِظَةࣰ وَتَفۡصِیلࣰا لِّكُلِّ شَیۡءࣲ فَخُذۡهَا بِقُوَّةࣲ وَأۡمُرۡ قَوۡمَكَ یَأۡخُذُوا۟ بِأَحۡسَنِهَاۚ سَأُو۟رِیكُمۡ دَارَ ٱلۡفَـٰسِقِینَ ۝ سَأَصۡرِفُ عَنۡ ءَایَـٰتِیَ ٱلَّذِینَ یَتَكَبَّرُونَ فِی ٱلۡأَرۡضِ بِغَیۡرِ ٱلۡحَقِّ وَإِن یَرَوۡا۟ كُلَّ ءَایَةࣲ لَّا یُؤۡمِنُوا۟ بِهَا وَإِن یَرَوۡا۟ سَبِیلَ ٱلرُّشۡدِ لَا یَتَّخِذُوهُ سَبِیلࣰا وَإِن یَرَوۡا۟ سَبِیلَ ٱلۡغَیِّ یَتَّخِذُوهُ سَبِیلࣰاۚ ذَ ٰ⁠لِكَ بِأَنَّهُمۡ كَذَّبُوا۟ بِـَٔایَـٰتِنَا وَكَانُوا۟ عَنۡهَا غَـٰفِلِینَ ۝ وَٱلَّذِینَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔایَـٰتِنَا وَلِقَاۤءِ ٱلۡـَٔاخِرَةِ حَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡۚ هَلۡ یُجۡزَوۡنَ إِلَّا مَا كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ)

    [Surat Al-A’raf 142 – 147]

    “স্মরণ কর মূসার জন্য আমি ত্রিশ রাত নির্ধারিত করি এবং আরো দশ দ্বারা তা পূর্ণ করি। এভাবে তার প্রতিপালকের নির্ধারিত সময় চল্লিশ রাত্রিতে পূর্ণ হয় এবং মূসা তার ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে বলল, আমার অনুপস্থিতিতে আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমি আমার প্রতিনিধিত্ব করবে; সংশোধন করবে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পথ অনুসরণ করবে না, মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হল এবং তার প্রতিপালক তার সাথে কথা বললেন, তখন সে বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও, আমি তোমাকে দেখব।’ তিনি বললেন, তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না, বরং তুমি পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর, এটা স্বস্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখবে। যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল। আর মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল। যখন সে জ্ঞান ফিরে পেল তখন সে বলল, ‘মহিমময় তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।

    তিনি বললেন, “হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দিয়েছি; সুতরাং আমি যা দিলাম তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ হও। আমি তার জন্য ফলকে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি; সুতরাং এগুলো শক্তভাবে ধর এবং তোমার সম্প্রদায়কে এগুলোর যা উত্তম তা গ্রহণ করতে নির্দেশ দাও। আমি শীঘ্র সত্যত্যাগীদের বাসস্থান তোমাদেরকে দেখাব। পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন থেকে ফিরিয়ে দেব, তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন দেখলেও তাতে বিশ্বাস করবে না, তারা সৎপথ দেখলেও এটাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না। কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে এটাকে তারা পথ হিসেবে গ্রহণ করবে, এটা এজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনকে অস্বীকার করেছে এবং সে সম্বন্ধে তারা ছিল গাফিল। যারা আমার নিদর্শন ও পরকালে সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে তাদের কার্য নিষ্ফল হয়। তারা যা করে তদনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে।” (সূরা আরাফঃ ১৪২-১৪৭)

    পূর্ববর্তী যুগের উলামায়ে কিরামের একটি দল, যাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) ও মুজাহিদ (র) বলেন, আয়াতে উল্লেখিত ত্রিশ রাত্রের অর্থ হচ্ছে যিলকদ মাসের পূর্ণটা এবং যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ রাত মোট চল্লিশ রাত। এ হিসেবে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্যে আল্লাহ তাআলার বাক্যালাপের দিন হচ্ছে কুরবানীর ঈদের দিন। আর অনুরূপ একটি দিনেই আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জন্যে তাঁর দীনকে পূর্ণতা দান করেন এবং তাঁর দলীল-প্রমাণাদি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

    মূলত মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন তার নির্ধারিত মেয়াদ পরিপূর্ণ করলেন তখন তিনি ছিলেন রোযাদার। কথিত আছে, তিনি কোন প্রকার খাবার চাননি। অতঃপর যখন মাস সমাপ্ত হল তিনি এক প্রকার একটি বৃক্ষের ছাল হাতে নিলেন এবং মুখে সুগন্ধি আনয়ন করার জন্যে তা একটু চিবিয়ে নিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে আরো দশদিন রোযা রাখত আদেশ দিলেন। তাতে চল্লিশ দিন পুরা হলো। আর এ কারণে হাদীস শরীফে রয়েছে যে, خلوف فم الصائم اطيب عند الله من ريح المسك অর্থাৎ রোযাদারের মুখের গন্ধ, আল্লাহ তা’আলার কাছে মিশকের সুগন্ধি চেয়ে উত্তম।

    মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন তার নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার জন্যে পাহাড় পানে রওয়ানা হলেন, তখন ভাই হারূন (আলাইহিস সালাম)-কে বনী ইসরাঈলের কাছে স্বীয় প্রতিনিধিরূপে রেখে গেলেন। হারূন (আলাইহিস সালাম) ছিলেন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সহোদর ভাই। অতি নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল ও জনপ্রিয় ব্যক্তি।

    আল্লাহ তা’আলার মনোনীত ধর্মের প্রতি আহ্বানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাহায্যকারী। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাঁকে প্রয়োজনীয় কাজের আদেশ দিলেন। নবুওতের ক্ষেত্রে তাঁর বিশিষ্ট মর্যাদা থাকায় মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নবুওতের মর্যাদার কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ ولماجاا موسى لميقاتنا وكلمه ربه অর্থাৎ মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন তার জন্যে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছলেন তখন তার প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলা পর্দার আড়াল থেকে তার সাথে কথা বললেন। আল্লাহ তাআলা তাকে আপন কথা শুনালেন; মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে আহ্বান করলেন, সংগোপনে তার সাথে কথা বললেন; এবং নিকটবর্তী করে নিলেন, এটা উচ্চ একটি সম্মানিত স্থান, দুর্ভেদ্য দুর্গ, সম্মানিত পদমর্যাদা ও অতি উচ্চ অবস্থান। তার উপর আল্লাহ্ তা’আলার অবিরাম দরূদ এবং দুনিয়া ও আখিরাতে তার উপর আল্লাহ্ তা’আলার সালাম বা শান্তি। যখন তাঁকে উচ্চ মর্যাদা ও মহাসম্মান দান করা হল এবং তিনি আল্লাহ তাআলার কালাম শুনলেন, তখন তিনি পর্দা সরিয়ে নেবার আবেদন করলেন এবং এমন মহান সত্তার উদ্দেশে যাকে দুনিয়ার সাধারণ চোখ দেখতে পায় না, তার উদ্দেশে বললেনঃ

    رب ارني انظر اليكহে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দাও! আমি তোমাকে দেখব। আল্লাহ্ উত্তরে বলেনঃ لن ترانى “তুমি আমাকে কখনই দেখতে পাবে না। অর্থাৎ মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ্ তা’আলার প্রকাশের সময় স্থির থাকতে পারবেন না; কেননা পাহাড় যা মানুষের তুলনায় অধিকতর স্থির ও কাঠামোগতভাবে অধিক শক্তিশালী। পাহাড়ই যখন আল্লাহ্ তা’আলার জ্যোতি প্রকাশের সময় স্থির থাকতে পারে না তখন মানুষ কেমন করে পারবে? এ জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

    (وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَكَانَهُۥ فَسَوۡفَ تَرَىٰنِیۚ )

    [Surat Al-A’raf 143]

    অর্থাৎ তুমি বরং পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য কর তা স্বস্থানে স্থির থাকলে তবে তুমি আমাকে দেখতে পারবে।

    প্রাচীন যুগের কিতাবগুলোতে বর্ণিত রয়েছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন, ‘হে মূসা, কোন জীবিত ব্যক্তি আমাকে দেখলে মারা পড়বে এবং কোন শুষ্ক দ্রব্য আমাকে দেখলে উলট-পালট হয়ে গড়িয়ে পড়বে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবু মূসা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহ্ তা’আলার পর্দা হচ্ছে নূর বা জ্যোতির। অন্য এক বর্ণনা মতে, আল্লাহ তা’আলার পর্দা হচ্ছে আগুন। যদি তিনি পর্দা সরান তাহলে তার চেহারার ঔজ্জ্বল্যের দরুন যতদূর তাঁর দৃষ্টি পৌঁছে সবকিছুই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

    আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) আয়াতাংশ لا تدركه الابصار -এর তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, এটা হচ্ছে আল্লাহ্ তা’আলার ঐ নূর যা কোন বস্তুর সামনে প্রকাশ করলে তা টিকতে পারবে না। এজন্যই আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

    (فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُۥ دَكࣰّا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقࣰاۚ فَلَمَّاۤ أَفَاقَ قَالَ سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَیۡكَ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِینَ)

    “যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন তখন তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করল। আর মূসা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ল, যখন সে জ্ঞান ফিরে পেল তখন সে বলে উঠল। মহিমময় তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের মধ্যে আমিই প্রথম।”

    মুজাহিদ (র) আয়াতাংশ ( وَلَـٰكِنِ ٱنظُرۡ إِلَى ٱلۡجَبَلِ فَإِنِ ٱسۡتَقَرَّ مَكَانَهُۥ فَسَوۡفَ تَرَىٰنِیۚ )

    -এর তাফসীর প্রসঙ্গে বলেনঃ

    এটার অর্থ হচ্ছে- পাহাড় তোমার চাইতে বড় এবং কাঠামোতেও তোমার চাইতে অধিকতর শক্ত, যখন তার প্রতিপালক পাহাড়ে জ্যোতি প্রকাশ করলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) পাহাড়ের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখেন, পাহাড় স্থির থাকতে পারছে না। পাহাড় সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, প্রথম ধাক্কায় তা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রত্যক্ষ করছিলেন পাহাড় কি করে। অতঃপর তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। ইমাম আহমদ (র) ও তিরমিযী (র) হতে বর্ণিত এবং ইবন জারীর (র) ও হাকিম (র) কর্তৃক সত্যায়িত এ বিবরণটি আমি আমার তাফসীর গ্রন্থে বর্ণনা করেছি। ইন জারীর (র) আনাস (রাযিআল্লাহু আনহু) সূত্রে বর্ণিত রিওয়ায়াতে অতিরিক্ত এটুকু রয়েছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُۥ لِلۡجَبَلِ جَعَلَهُۥ دَكࣰّا আয়াতাংশ তিলাওয়াত করেন এবং আঙ্গুলে ইশারা করে বলেন, এভাবে পাহাড় ধসে গেল বলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বৃদ্ধাঙ্গুলিকে কনিষ্ঠা আঙ্গুলের উপরের জোড়ায় স্থাপন করলেন।

    সুদ্দী (র) ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর জ্যোতি কনিষ্ঠ অঙ্গুলির পরিমাণে প্রকাশ করায় পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল অর্থাৎ মাটি হয়ে গেল। আয়াতাংশ خر এ উল্লেখিত এর وخر موسى صعقا অর্থ হচ্ছে বেহুঁশ হয়ে যাওয়া। কাতাদা (র) বলেন, এটার অর্থ হচ্ছে মারা যাওয়া তবে প্রথম অর্থটি বিশুদ্ধতর। কেননা, পরে আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ فلما افاق কেননা বেহুঁশ হবার পরই জ্ঞান ফিরে পায়। আয়াতাংশ ( سُبۡحَـٰنَكَ تُبۡتُ إِلَیۡكَ وَأَنَا۠ أَوَّلُ ٱلۡمُؤۡمِنِینَ) (মহিমময় তুমি, আমি অনুতপ্ত হয়ে তোমাতেই প্রত্যাবর্তন করলাম এবং মুমিনদের আমিই প্রথম।) অর্থাৎ আল্লাহ্ যেহেতু মহিমময় ও মহাসম্মানিত সেহেতু কেউ তাঁকে দেখতে পারবে না। মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, এর পর আর কোন দিনও তোমার দর্শনের আকক্ষা করব না। আমিই প্রথম মুমিন অর্থাৎ তোমাকে কোন জীবিত লোক দেখলে মারা যাবে এবং কোন শুল্ক বস্তু দেখলে তা গড়িয়ে পড়বে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবৃ সাঈদ খুদরী (র) থেকে বর্ণিত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ “আমাকে তোমরা আম্বিয়ায়ে কিরামের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে প্রাধান্য দিও না। কেননা, কিয়ামতের দিন যখন মানব জাতি জ্ঞানহারা হয়ে যাবে, তখন আমিই সর্বপ্রথম জ্ঞান ফিরে পাব। আর তখন আমি মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে আল্লাহ্ তা’আলার আরশের কাছে স্তম্ভ ধরে থাকতে দেখতে পাব। আমি জানি না, তিনি কি আমার পূর্বেই জ্ঞান ফিরে পাবেন, না কি তাঁকে তূর পাহাড়ে জ্ঞান হারাবার প্রতিদান দেয়া হবে।’ পাঠটি বুখারীর।

    এ হাদীসের প্রথম দিকে এক ইহুদীর ঘটনা রয়েছে। একজন আনসারী তাকে চড় মেরেছিলেন যখন সে বলেছিল لا والذي اصطفي موسي علي البشر অর্থাৎ না, এমন সত্তার শপথ করে বলছি যিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে সমস্ত বনী আদমের মধ্যে অধিকতর সম্মান দিয়েছেন। তখন আনসারী প্রশ্ন করেছিলেন আল্লাহ কি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকেও মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে অধিক সম্মান দিয়েছিলেন? ইহুদী বলল, হ্যা, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ لاتخيروني من بين الانبياء বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। এই হাদীসে لاتخيروني علي موسى অর্থাৎ মূসা (আলাইহিস সালাম) থেকে আমাকে অগ্রাধিকার দেবে না, কথাটিরও উল্লেখ রয়েছে। এরূপ নিষেধ করার কারণ বিভিন্ন হতে পারে। কেউ কেউ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটা বিনয় প্রকাশ করার জন্য বলেছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন, এটার অর্থ হচ্ছে আমার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে কিংবা আম্বিয়ায়ে কিরামকে তুচ্ছ করার উদ্দেশ্যে আমার অগ্রাধিকার বর্ণনা করবে না।

    অথবা এটার অর্থ হচ্ছে এরূপঃ এটা তোমাদের কাজ নয় বরং আল্লাহ তাআলাই কোন নবীকে অন্য নবীর উপর মর্যাদা দান করে থাকেন। এই মর্যাদা ও অগ্রাধিকার কারো অভিমতের উপর নির্ভরশীল নয়। এই মর্যাদা অভিমতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় না বরং আল্লাহ্ তা’আলার ওহীর উপর নির্ভরশীল। যিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সকলের মধ্যে উত্তম এই তথ্যটি জানার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরূপ বলতে নিষেধ করেছিলেন, যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তিনিই সকলের মধ্যে উত্তম তখন এ নিষেধাজ্ঞাটি রহিত হয়ে যায়। তার এ অভিমতটি সন্দেহমুক্ত নয়। কেননা, উপরোক্ত হাদীসটি আবু সাঈদ খুদরী (র) ও আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত হয়েছে। আর আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) খায়বর যুদ্ধের বছরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন। তাই খায়বর যুদ্ধের পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানতে পেরেছেন, এর সম্ভাবনা ক্ষীণ। আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ। তবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে সমস্ত মানব তথা সমস্ত সৃষ্টির সেরা এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    كنتم خيرامة اخرجت للناس

    অর্থাৎ, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরানঃ ১১০)

    আর উম্মতের পরিপূর্ণতা তাদের নবীর মান-মর্যাদার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়। হাদীসের সর্বোচ্চ সূত্র তথা মুতাওয়াতির বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি থাকব আদম সন্তানদের সর্দার। এটা আমার গর্ব নয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মাকামে মাহমূদ যে কেবল তারই জন্য নির্দিষ্ট তা তিনি উল্লেখ করেন। মাকামে মাহমূদ পূর্বের ও পরের সকলের কাছেই ঈর্ষণীয় এবং এই মর্যাদা অন্য সব নবী-রাসূলের নাগালের বাইরে থাকবে। এমনকি নূহ (আলাইহিস সালাম), ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম), মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং ইসা ইব্‌ন মারয়াম (আলাইহিস সালাম) প্রমুখ বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন নবীগণও এ গৌরব লাভ করবেন না।

    فاكون اول من يفيق فاجد موسى باطشا بقائمة العرش فلاادرى افاق قبلى ام جوزى لصعقة الطور

    হাদীসে উক্ত উপরোক্ত বাক্য দ্বারা বোঝা যায়, বান্দাদের আমলের ফয়সালা করার সময় আল্লাহ তা’আলা যখন জ্যোতি প্রকাশ করবেন, তখন কিয়ামতের মাঠে সৃষ্টিকুল জ্ঞানহারা হয়ে যাবে। অতিরিক্ত ভয়-ভীতি ও আতংকগ্রস্ততার জন্যই তারা এরূপ জ্ঞানহারা হবে। তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম যিনি জ্ঞান ফিরে পাবেন তিনি হচ্ছেন সর্বশেষ নবী এবং সব নবীর চেয়ে আসমান যমীনের প্রতিপালকের প্রিয়তম মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে আরশের স্তম্ভ ধরে থাকতে দেখবেন। সত্যবাদী নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ

    لا ادرى اصعق فافاق قبلى اوجوزنى بصعقة الطور

    অর্থাৎ- আমি জানি না তাঁর জ্ঞানহারা হওয়া কি অতি হালকা ছিল কেননা তিনি দুনিয়ায় একবার জ্ঞানহারা হয়েছিলেন, নাকি তাকে তুর পাহাড়ে জ্ঞান হারানোর প্রতিদান দেয়া হয়েছে অর্থাৎ তিনি আদৌ জ্ঞানহারা হননি। এতে রয়েছে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য একটি বড় মর্যাদা। তবে এই বিশেষ মর্যাদার কারণে তাঁর সার্বিক মর্যাদাবান বুঝায় না আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মর্যাদা ও ফযীলতের দিকে এভাবে ইংগিত করেন, কেননা যখন ইহুদী বলেছিলঃ لا والذى اصطفى موسى على البشر অর্থাৎ না, শথ যিনি মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে সমগ্র মানব জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, আনসারী ইহুদীর গালে চপেটাঘাত করায় মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সম্পর্কে কেউ বিরূপ মনোভাব পোষণ করতে পারে তাই রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার মর্যাদা ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছিলেন।

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন, হে মূসা! আমি তোমাকে আমার রিসালাত এবং বাক্যালাপ দ্বারা তোমাকে মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি অর্থাৎ সমসাময়িক যুগের লোকদের উপর পূর্ববর্তীদের উপর নয়, কেননা ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) থেকে উত্তম ছিলেন। যা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর কাহিনীর মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। আবার তাঁর পরবর্তীদের উপরও নয়, কেননা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁদের উভয় থেকেই উত্তম ছিলেন। যেমন মিরাজের রাতে সকল নবী-রাসূলের উপর মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ পেয়েছে। যেমন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ ساقوم مقاما يرغب الى الخلق حتى ابراهيم আমি এমন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব যার আখাক্ষা সৃষ্টিকুলের সকলেই করবে, এমনকি ইব্রাহীম (আলাইহিস সালাম)-ও।

    আল্লাহ তাআলার বলেনঃ ( فَخُذۡ مَاۤ ءَاتَیۡتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّـٰكِرِینَ)

    আমি যে রিসালাত তোমাকে দান করেছি তা শক্তভাবে গ্রহণ কর, তার চাইতে বেশি প্রার্থনা কর না এবং কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হও।

    আল্লাহ তাআলা বলেনঃ “আমি তার জন্যে ফলকে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি।” ফলকগুলোর উপাদান ছিল খুবই মূল্যবান। সহীহ গ্রন্থে আছে যে, আল্লাহ তাআলা নিজ কুদরতী হাতে মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্য তাওরাত লিখেছিলেন, তার মধ্যে ছিল উপদেশাবলী এবং বনী ইসরাঈলের প্রয়োজনীয় হালাল-হারামের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, فخذها بقوة এগুলোকে সুদৃঢ়ভাবে নেক নিয়তে ধর। তারপর বলেনঃ وامر قو مك ياخذباحسنها অর্থাৎ, তোমার সম্প্রদায়কে নির্দেশ দাও তারা যেন এগুলোর যা উত্তম তা গ্রহণ করে। তারা যেন তার উত্তম ব্যাখ্যা গ্রহণ করে। আর যারা আমার আনুগত্য পরিহারকারী, আমার আদেশের বিরোধী ও আমার রাসূলদের মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম গোপন রাখছে। আমি শীঘ্রই সত্য-ত্যাগীদের বাসস্থান তোমাদেরকে দেখাব।

    আয়াতে উল্লেখিত-

    (سَأَصۡرِفُ عَنۡ ءَایَـٰتِیَ ٱلَّذِینَ یَتَكَبَّرُونَ فِی ٱلۡأَرۡضِ بِغَیۡرِ ٱلۡحَقِّ وَإِن یَرَوۡا۟ كُلَّ ءَایَةࣲ لَّا یُؤۡمِنُوا۟ بِهَا وَإِن یَرَوۡا۟ سَبِیلَ ٱلرُّشۡدِ لَا یَتَّخِذُوهُ سَبِیلࣰا وَإِن یَرَوۡا۟ سَبِیلَ ٱلۡغَیِّ یَتَّخِذُوهُ سَبِیلࣰاۚ ذَ ٰ⁠لِكَ بِأَنَّهُمۡ كَذَّبُوا۟ بِـَٔایَـٰتِنَا وَكَانُوا۟ عَنۡهَا غَـٰفِلِینَ ۝ وَٱلَّذِینَ كَذَّبُوا۟ بِـَٔایَـٰتِنَا وَلِقَاۤءِ ٱلۡـَٔاخِرَةِ حَبِطَتۡ أَعۡمَـٰلُهُمۡۚ هَلۡ یُجۡزَوۡنَ إِلَّا مَا كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ)[Surat Al-A’raf 146 – 147]

    অর্থাৎ, পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে বেড়ায় তাদের দৃষ্টি আমার নিদর্শন হতে ফিরিয়ে দেব। তারা এগুলোর তাৎপর্য ও মূল অর্থ বুঝতে অক্ষম থাকবে; তারা আমার প্রত্যেকটি নিদর্শন ও অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পরও তাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে না; তারা সৎপথ দেখলেও এটাকে পথ বলে গ্রহণ করবে না, এ পথে চলবে না, এ পথের অনুসরণ করবে না, কিন্তু তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে এটাকে তারা পথ হিসেবে গ্রহণ করবে এটা এজন্য যে, তারা আমার নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে; এগুলো থেকে তারা গাফিল রয়েছে; এগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য বুঝতে তারা ব্যর্থ হয়েছে এবং সে অনুযায়ী আমল করা থেকে বিরত রয়েছে। যারা আমার নিদর্শন ও পরকালের সাক্ষাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাদের কর্ম নিষ্ফল হবে। তারা যা করবে তদনুযায়ীই তাদেরকে প্রতিফল দেয়া হবে। (সূরা আরাফ ১৪৬-১৪৭)

    বনী ইসরাঈলের বাছুর পূজার বিবরণ

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

    (وَٱتَّخَذَ قَوۡمُ مُوسَىٰ مِنۢ بَعۡدِهِۦ مِنۡ حُلِیِّهِمۡ عِجۡلࣰا جَسَدࣰا لَّهُۥ خُوَارٌۚ أَلَمۡ یَرَوۡا۟ أَنَّهُۥ لَا یُكَلِّمُهُمۡ وَلَا یَهۡدِیهِمۡ سَبِیلًاۘ ٱتَّخَذُوهُ وَكَانُوا۟ ظَـٰلِمِینَ ۝ وَلَمَّا سُقِطَ فِیۤ أَیۡدِیهِمۡ وَرَأَوۡا۟ أَنَّهُمۡ قَدۡ ضَلُّوا۟ قَالُوا۟ لَىِٕن لَّمۡ یَرۡحَمۡنَا رَبُّنَا وَیَغۡفِرۡ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَـٰسِرِینَ ۝ وَلَمَّا رَجَعَ مُوسَىٰۤ إِلَىٰ قَوۡمِهِۦ غَضۡبَـٰنَ أَسِفࣰا قَالَ بِئۡسَمَا خَلَفۡتُمُونِی مِنۢ بَعۡدِیۤۖ أَعَجِلۡتُمۡ أَمۡرَ رَبِّكُمۡۖ وَأَلۡقَى ٱلۡأَلۡوَاحَ وَأَخَذَ بِرَأۡسِ أَخِیهِ یَجُرُّهُۥۤ إِلَیۡهِۚ قَالَ ٱبۡنَ أُمَّ إِنَّ ٱلۡقَوۡمَ ٱسۡتَضۡعَفُونِی وَكَادُوا۟ یَقۡتُلُونَنِی فَلَا تُشۡمِتۡ بِیَ ٱلۡأَعۡدَاۤءَ وَلَا تَجۡعَلۡنِی مَعَ ٱلۡقَوۡمِ ٱلظَّـٰلِمِینَ ۝ قَالَ رَبِّ ٱغۡفِرۡ لِی وَلِأَخِی وَأَدۡخِلۡنَا فِی رَحۡمَتِكَۖ وَأَنتَ أَرۡحَمُ ٱلرَّ ٰ⁠حِمِینَ ۝ إِنَّ ٱلَّذِینَ ٱتَّخَذُوا۟ ٱلۡعِجۡلَ سَیَنَالُهُمۡ غَضَبࣱ مِّن رَّبِّهِمۡ وَذِلَّةࣱ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَاۚ وَكَذَ ٰ⁠لِكَ نَجۡزِی ٱلۡمُفۡتَرِینَ ۝ وَٱلَّذِینَ عَمِلُوا۟ ٱلسَّیِّـَٔاتِ ثُمَّ تَابُوا۟ مِنۢ بَعۡدِهَا وَءَامَنُوۤا۟ إِنَّ رَبَّكَ مِنۢ بَعۡدِهَا لَغَفُورࣱ رَّحِیمࣱ ۝ وَلَمَّا سَكَتَ عَن مُّوسَى ٱلۡغَضَبُ أَخَذَ ٱلۡأَلۡوَاحَۖ وَفِی نُسۡخَتِهَا هُدࣰى وَرَحۡمَةࣱ لِّلَّذِینَ هُمۡ لِرَبِّهِمۡ یَرۡهَبُونَ)

    [Surat Al-A’raf 148 – 154]

    “মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দ্বারা গড়ল একটি বাছুর, একটি অবয়ব, যা হাম্বা রব করত। তারা কি দেখল না যে, এটা তাদের সাথে কথা বলে না ও তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা এটাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করল এবং তারা ছিল জালিম। তারা যখন অনুতপ্ত হল ও দেখল যে, তারা বিপথগামী হয়ে গিয়েছে, তখন তারা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের প্রতি দয়া না করেন ও আমাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে আমরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবই। মূসা যখন ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে তার সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবর্তন করল, তখন বলল, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা আমার কত নিকৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব করেছ। তোমাদের প্রতিপালকের আদেশের পূর্বে তোমরা ত্বরান্বিত করলে? এবং সে ফলকগুলো ফেলে দিল আর তার ভাইকে চুলে ধরে নিজের দিকে টেনে আনল। হারূন বললেন, হে আমার সহোদর! লোকেরা তো আমাকে দুর্বল ঠাউরিয়েছিল এবং আমাকে প্রায় হত্যা করেই ফেলেছিল। আমার সাথে এমন করো না যাতে শত্রুরা আনন্দিত হয় এবং আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করো না। মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করো এবং আমাদেরকে তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল কর। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু। যারা বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে, পার্থিব জীবনে তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ও লাঞ্ছনা আপতিত হবেই। আর এভাবে আমি মিথ্যা রচনাকারীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। যারা অসকার্য করে তারা পরে তওবা করলে ও ঈমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। মূসার ক্রোধ যখন প্রশমিত হলো তখন সে ফলকগুলো তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য এতে যা লিখিত ছিল তাতে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত। (সূরা আ’রাফঃ ১৪৮-১৫৪)

    অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ-

    (۞ وَمَاۤ أَعۡجَلَكَ عَن قَوۡمِكَ یَـٰمُوسَىٰ ۝ قَالَ هُمۡ أُو۟لَاۤءِ عَلَىٰۤ أَثَرِی وَعَجِلۡتُ إِلَیۡكَ رَبِّ لِتَرۡضَىٰ ۝ قَالَ فَإِنَّا قَدۡ فَتَنَّا قَوۡمَكَ مِنۢ بَعۡدِكَ وَأَضَلَّهُمُ ٱلسَّامِرِیُّ ۝ فَرَجَعَ مُوسَىٰۤ إِلَىٰ قَوۡمِهِۦ غَضۡبَـٰنَ أَسِفࣰاۚ قَالَ یَـٰقَوۡمِ أَلَمۡ یَعِدۡكُمۡ رَبُّكُمۡ وَعۡدًا حَسَنًاۚ أَفَطَالَ عَلَیۡكُمُ ٱلۡعَهۡدُ أَمۡ أَرَدتُّمۡ أَن یَحِلَّ عَلَیۡكُمۡ غَضَبࣱ مِّن رَّبِّكُمۡ فَأَخۡلَفۡتُم مَّوۡعِدِی ۝ قَالُوا۟ مَاۤ أَخۡلَفۡنَا مَوۡعِدَكَ بِمَلۡكِنَا وَلَـٰكِنَّا حُمِّلۡنَاۤ أَوۡزَارࣰا مِّن زِینَةِ ٱلۡقَوۡمِ فَقَذَفۡنَـٰهَا فَكَذَ ٰ⁠لِكَ أَلۡقَى ٱلسَّامِرِیُّ ۝ فَأَخۡرَجَ لَهُمۡ عِجۡلࣰا جَسَدࣰا لَّهُۥ خُوَارࣱ فَقَالُوا۟ هَـٰذَاۤ إِلَـٰهُكُمۡ وَإِلَـٰهُ مُوسَىٰ فَنَسِیَ ۝ أَفَلَا یَرَوۡنَ أَلَّا یَرۡجِعُ إِلَیۡهِمۡ قَوۡلࣰا وَلَا یَمۡلِكُ لَهُمۡ ضَرࣰّا وَلَا نَفۡعࣰا ۝ وَلَقَدۡ قَالَ لَهُمۡ هَـٰرُونُ مِن قَبۡلُ یَـٰقَوۡمِ إِنَّمَا فُتِنتُم بِهِۦۖ وَإِنَّ رَبَّكُمُ ٱلرَّحۡمَـٰنُ فَٱتَّبِعُونِی وَأَطِیعُوۤا۟ أَمۡرِی ۝ قَالُوا۟ لَن نَّبۡرَحَ عَلَیۡهِ عَـٰكِفِینَ حَتَّىٰ یَرۡجِعَ إِلَیۡنَا مُوسَىٰ ۝ قَالَ یَـٰهَـٰرُونُ مَا مَنَعَكَ إِذۡ رَأَیۡتَهُمۡ ضَلُّوۤا۟ ۝ أَلَّا تَتَّبِعَنِۖ أَفَعَصَیۡتَ أَمۡرِی ۝ قَالَ یَبۡنَؤُمَّ لَا تَأۡخُذۡ بِلِحۡیَتِی وَلَا بِرَأۡسِیۤۖ إِنِّی خَشِیتُ أَن تَقُولَ فَرَّقۡتَ بَیۡنَ بَنِیۤ إِسۡرَ ٰ⁠ۤءِیلَ وَلَمۡ تَرۡقُبۡ قَوۡلِی ۝ قَالَ فَمَا خَطۡبُكَ یَـٰسَـٰمِرِیُّ ۝ قَالَ بَصُرۡتُ بِمَا لَمۡ یَبۡصُرُوا۟ بِهِۦ فَقَبَضۡتُ قَبۡضَةࣰ مِّنۡ أَثَرِ ٱلرَّسُولِ فَنَبَذۡتُهَا وَكَذَ ٰ⁠لِكَ سَوَّلَتۡ لِی نَفۡسِی ۝ قَالَ فَٱذۡهَبۡ فَإِنَّ لَكَ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ أَن تَقُولَ لَا مِسَاسَۖ وَإِنَّ لَكَ مَوۡعِدࣰا لَّن تُخۡلَفَهُۥۖ وَٱنظُرۡ إِلَىٰۤ إِلَـٰهِكَ ٱلَّذِی ظَلۡتَ عَلَیۡهِ عَاكِفࣰاۖ لَّنُحَرِّقَنَّهُۥ ثُمَّ لَنَنسِفَنَّهُۥ فِی ٱلۡیَمِّ نَسۡفًا ۝ إِنَّمَاۤ إِلَـٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِی لَاۤ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَیۡءٍ عِلۡمࣰا)

    [Surat Ta-Ha 83 – 98]

    অর্থাৎ হে মূসা! তোমার সম্প্রদায়কে পশ্চাতে ফেলে তোমাকে ত্বরা করতে বাধ্য করল কিসে? সে বলল, এই তো তারা আমার পশ্চাতে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি ত্বরায় তোমার কাছে আসলাম, তুমি সন্তুষ্ট হবে এ জন্য। তিনি বললেন, আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষায় ফেলেছি তোমার চলে আসার পর এবং সামিরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। তারপর মূসা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল কুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে। সে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তবে কি প্রতিশ্রুতিকাল তোমাদের কাছে সুদীর্ঘ হয়েছে; না তোমরা চেয়েছ তোমাদের প্রতি আপতিত হোক তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ, যে কারণে তোমরা আমার প্রতি প্রদত্ত অংগীকার ভংগ করলে? ওরা বলল, ‘আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অংগীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি, তবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল লোকের অলংকারের বোঝা এবং আমরা তা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করি, অনুরূপভাবে সামিরীও নিক্ষেপ করে। তারপর সে ওদের জন্যে গড়ল একটা বাছুর, একটা অবয়ব, যা হাম্বা রব করত। ওরা বলল, “এটা তোমাদের ইলাহ এবং মূসারও ইলাহ, কিন্তু মূসা ভুলে গিয়েছে। তবে কি ওরা ভেবে দেখে না যে, এটা তাদের কথায় সাড়া দেয় না এবং তাদের কোন ক্ষতি অথবা উপকার করবার ক্ষমতাও রাখে না। হারূন তাদেরকে পূর্বেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এটার দ্বারা তো কেবল তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। তোমাদের প্রতিপালক দয়াময়। সুতরাং তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল। ওরা বলেছিল, আমাদের কাছে মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এটার পূজা হতে কিছুতেই বিরত হব না। মূসা বলল, হে হারূন! তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল, আমার অনুসরণ করা থেকে? তবে কি তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে? হারূন বলল, হে আমার সহোদর! আমার দাড়ি ও চুল ধরো না। আমি আশংকা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, তুমি বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ ও তুমি আমার বাক্য পালনে যত্নবান হওনি। মূসা বলল, হে সামিরী! তোমার ব্যাপার কি? সে বলল, আমি দেখেছিলাম যা ওরা দেখেনি। তারপর আমি সেই দূতের (জিবরাঈলের) পদচিহ্ন থেকে এবং মুষ্ঠি (ধুলা) নিয়েছিলাম এবং আমি এটা নিক্ষেপ করেছিলাম এবং আমার মন আমার জন্য শোভন করেছিল এইরূপ করা।” মূসা বলল, দূর হও, তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য এটাই রইল যে তুমি বলবে, “আমি অস্পৃশ্য এবং তোমার জন্য রইল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ, তোমার বেলায় যার ব্যতিক্রম হবে না এবং তুমি তোমার সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ্য কর যার পূজায় তুমি রত ছিলে; আমরা ওটাকে জ্বালিয়ে দেবই। অতঃপর ওটাকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরে নিক্ষেপ করবই। তোমাদের ইলাহ তো কেবল আল্লাহই, যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তাঁর জ্ঞান সর্ববিষয়ে ব্যাপ্ত। (সূরা তাহাঃ ৮৩-৯৮)

    উপরোক্ত আয়াতসমূহে আল্লাহ্ তা’আলা বনী ইসরাঈলের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন আল্লাহ্ তা’আলা নির্ধারিত সময়ে উপনীত হলেন, তখন তিনি তূর পর্বতে অবস্থান করে আপন প্রতিপালকের সাথে একান্ত কথা বললেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তা’আলার নিকট বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান এবং আল্লাহ তাআলা সে সব বিষয়ে তাকে জানিয়ে দেন। মধ্যকার এক ব্যক্তি যাকে হারূন আস সামিরী বলা হয় সে যেসব অলংকার ধারস্বরূপ নিয়েছিল সেগুলো দিয়ে সে একটি বাছুর-মূর্তি তৈরি করল এবং বনী ইসরাঈলের সামনে ফিরআউনকে আল্লাহ তা’আলা ডুবিয়ে মারার সময় জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঘোড়র পায়ের এক মুষ্ঠি ধুলা মূর্তিটির ভিতরে নিক্ষেপ করল। সাথে সাথে বাছুর মূর্তিটি জীবন্ত বাছুরের মত হাম্বা হাম্বা আওয়াজ দিতে লাগল। কেউ কেউ বলেন, এতে তা রক্ত-মাংসের জীবন্ত একটি বাছুরে রূপান্তরিত হয়ে যায় আর তা হাম্বা হাম্বা রব করতে থাকে। কাতাদা (র) প্রমুখ মুফাসসিরীন এ মত ব্যক্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেন, যখন এটার পেছন দিক থেকে বাতাস ঢুকত এবং মুখ দিয়ে বের হত তখনই হাম্বা হাম্বা আওয়াজ হত যেমন সাধারণত গরু ডেকে থাকে। এতে তারা এর চতুর্দিকে নাচতে থাকে এবং উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। তারা বলতে লাগল, এটাই তোমাদের ও মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ইলাহ, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন। অর্থাৎ মূসা (আলাইহিস সালাম) আমাদের নিকটস্থ প্রতিপালককে ভুলে গেছেন এবং অন্যত্র গিয়ে তাকে খোঁজাখুঁজি করছেন অথচ প্রতিপালক তো এখানেই রয়েছেন। (নির্বোধরা যা বলছে আল্লাহ তাআলা তার বহু বহু ঊর্ধে, তার নাম ও গুণগুলো এসব অপবাদ থেকে পূত-পবিত্র এবং আল্লাহ্ তা’আলা প্রদত্ত নিয়ামত সমূহও অগণিত) তারা যেটাকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছিল তা বড় জোর একটা জন্তু বা শয়তান ছিল। তাদের এই ভ্রান্ত ধারণার অসারতা বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তারা কি দেখে না যে, এই বাছুরটি তাদের কথার কোন উত্তর দিতে পারে না এবং এটা তাদের কোন উপকার বা অপকার করতে পারে না। অন্যত্র বলেন, তারা কি দেখে না যে, এটা তাদের সাথে কথা বলতে পারে না এবং তাদেরকে পথনির্দেশ করতে পারে না। আর এরা ছিল জালিম।” (৭ আরাফঃ ১৪৮)

    এখানে আল্লাহ্ তা’আলা উল্লেখ করেন যে, এ জন্তুটি তাদের সাথে কথা বলতে পারে না, তাদের কোন কথার জবাব দিতে পারে না, কোন ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে না কিংবা কোন উপকার করারও শক্তি রাখে না, তাদেরকে পথনির্দেশও করতে পারে না, তারা তাদের আত্মার প্রতি জুলুম করেছে। তারা তাদের এই মূর্খতা ও বিভ্রান্তির অসারতা সম্বন্ধে সম্যক অবগত। “অতঃপর তারা যখন তাদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত হল এবং অনুভব করতে পারল যে, তারা ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে তখন তারা বলতে লাগল, যদি আমাদের প্রতিপালক আমাদের প্রতি দয়া না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ব।” (৭ আরাফঃ ১৪৯)

    অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদের কাছে ফিরে আসলেন এবং তাদের বাছুর পূজা করার বিষয়টি জানতে পারলেন। তাঁর সাথে ছিল বেশ কয়েকটি ফলক যেগুলোর মধ্যে তাওরাত লিপিবদ্ধ ছিল, তিনি এগুলো ফেলে দিলেন। কেউ কেউ বলেন, এগুলোকে তিনি ভেঙ্গে ফেলেন। কিতাবীরা এরূপ বলে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআলা এগুলোর পরিবর্তে অন্য ফলক দান করেন। কুরআনুল করীমের ভাষ্যে এর স্পষ্ট উল্লেখ নেই তবে এত দূর আছে যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদের কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করে, ফলকগুলো ফেলে দিয়েছিলেন। কিতাবীদের মতে, সেখানে ছিল মাত্র দুইটি ফলক। কুরআনের আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, ফলক বেশ কয়েকটিই ছিল। আল্লাহ্ তা’আলা যখন তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের বাছুর পূজার কথা অবগত করেছিলেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তেমন প্রভাবান্বিত হননি। তখন আল্লাহ্ তাকে তা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করতে নির্দেশ দেন। এ জন্যেই ইমাম আহমদ (র) ও ইবন হিব্বান (র) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেনঃ ليس الخبر كالمعاينة অর্থাৎ সংবাদ প্রাপ্তি এবং প্রত্যক্ষ দর্শন সমান নয়। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাদেরকে ভৎসনা করলেন এবং তাদের এ হীন কাজের জন্যে তাদেরকে দোষারোপ করলেন। তখন তার কাছে তারা মিথ্যা ওযর আপত্তি পেশ করে বললঃ

    (قَالُوا۟ مَاۤ أَخۡلَفۡنَا مَوۡعِدَكَ بِمَلۡكِنَا وَلَـٰكِنَّا حُمِّلۡنَاۤ أَوۡزَارࣰا مِّن زِینَةِ ٱلۡقَوۡمِ فَقَذَفۡنَـٰهَا فَكَذَ ٰ⁠لِكَ أَلۡقَى ٱلسَّامِرِیُّ)[Surat Ta-Ha 87]

    অর্থাৎ, তারা বলল, আমরা তোমার প্রতি প্রদত্ত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি তবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল লোকের অলংকারের বোঝা এবং আমরা তা অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করি। অনুরূপভাবে সামিরীও নিক্ষেপ করে। (সূরা তা-হাঃ ৮৭)

    তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ফিরআউন সম্প্রদায়ের অলংকারের অধিকারী হওয়াকে তারা পাপকার্য বলে মনে করতে লাগল অথচ আল্লাহ তাআলা এগুলোকে তাদের জন্য বৈধ করে দিয়েছিলেন। অথচ তারা মহা পরাক্রমশালী অদ্বিতীয় মহাপ্রভুর সাথে হাম্বা হাম্বা রবের অধিকারী বাছুরের পূজাকে তাদের মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার কারণে পাপকার্য বলে বিবেচনা করছিল না। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) আপন সহোদর হারূন (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং তাঁকে বললেনঃ ( یَـٰهَـٰرُونُ مَا مَنَعَكَ) (হে হারূন! তুমি যখন দেখলে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল আমার অনুসরণ করা থেকে? (সূরা তা-হাঃ ৯২)

    অর্থাৎ যখন তুমি তাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারটি দেখলে তখন তুমি কেন আমাকে সে সম্বন্ধে অবহিত করলে না? তখন তিনি বললেন, ( خَشِیتُ أَن تَقُولَ فَرَّقۡتَ بَیۡنَ بَنِیۤ )

    আমি আশংকা করেছিলাম যে, তুমি বলবে যে, তুমি বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ। (সূরা তা-হাঃ ৯৪)

    অর্থাৎ তুমি হয়ত বলতে, তুমি তাদেরকে ছেড়ে আমার কাছে চলে আসলে অথচ আমি তোমাকে তাদের মধ্যে আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে এসেছিলাম।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

    (قَالَ رَبِّ ٱغۡفِرۡ لِی وَلِأَخِی وَأَدۡخِلۡنَا فِی رَحۡمَتِكَۖ وَأَنتَ أَرۡحَمُ ٱلرَّ ٰ⁠حِمِینَ)

    [Surat Al-A’raf 151]

    “মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা কর এবং আমাদেরকে। তোমার রহমতের মধ্যে দাখিল কর। তুমিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (সূরা আ’রাফঃ ১৫১)

    হারূন (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে এরূপ জঘন্য কাজ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন এবং তাদেরকে কঠোরভাবে ভৎসনা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَلَقَدۡ قَالَ لَهُمۡ هَـٰرُونُ مِن قَبۡلُ یَـٰقَوۡمِ إِنَّمَا فُتِنتُم بِهِۦۖ )

    [Surat Ta-Ha : 90]

    অর্থাৎ হারূন তাদেরকে পূর্বেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তো কেবল তোমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা এ বাছুর ও এর হাম্বা রবকে তোমাদের জন্যে একটি পরীক্ষার বিষয় করেছেন।

    নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক খুবই দয়াময় অর্থাৎ এ বাছুর তোমাদের প্রভু নয়। (সূরা তা-হাঃ ৯০ আয়াত) فَٱتَّبِعُونِی وَأَطِیعُوۤا۟ أَمۡرِی সুতরাং আমি যা বলি তার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মান্য কর। তারা বলেছিল, আমাদের কাছে মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এটার পূজা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।” (সূরা তা-হাঃ ৯১) আল্লাহ তা’আলা হারূন (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছেন। আর আল্লাহ্ তা’আলার সাক্ষ্যই যথেষ্ট। যে হারূন (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে এরূপ জঘন্য কাজ থেকে নিষেধ করেছিলেন, তাদেরকে ভৎসনা করেছিলেন কিন্তু তারা তার কথা মান্য করেনি। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) সামিরীর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং বললেন, “তুমি যা করেছ কে তোমাকে এরূপ করতে বলেছি?” উত্তরে সে বলল, “আমি জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন একটি ঘোড়ার উপর সওয়ার তখন আমি জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঘোড়ার পায়ের ধুলা সংগ্রহ করেছিলাম। আবার কেউ কেউ বলেনঃ সামিরী জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-কে দেখেছিল। জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)-এর ঘোড়ার খুর যেখানেই পড়ত অমনি সে স্থানটি ঘাসে সবুজ হয়ে যেত। তাই সে ঘোড়ার খুরের নিচের মাটি সংগ্রহ করল। এরপর যখন সে এই স্বর্ণ-নির্মিত বাছুরের মুখে ঐ মাটি রেখে দিল, তখনই সে আওয়াজ করতে লাগল এবং পরবর্তী ঘটনা সংঘটিত হল। এজন্যেই সামিরী বলেছিল—“আমার মন আমার জন্যে এরূপ করা শোভন করেছিল। তখন মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে অভিশাপ দিলেন এবং বললেন, তুমি সব সময়ে বলবে لا مساس অর্থাৎ আমাকে কেউ স্পর্শ করবে না। কেননা, সে এমন জিনিস স্পর্শ করেছিল যা তার স্পর্শ করা উচিত ছিল না। এটা তার দুনিয়ার শাস্তি। অতঃপর আখিরাতের শাস্তির কথাও তিনি ঘোষণা করেন। অত্র আয়াতে উল্লেখিত لن تخلقه কে কেউ কেউ لن نخلفه পাঠ করেছেন অর্থাৎ এর ব্যতিক্রম হবে না’ স্থলে ‘আমি ব্যতিক্রম করব না। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) বাছুরটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেললেন।

    এ অভিমতটি কাতাদা (র) প্রমুখের। আবার কেউ কেউ বলেন, উখা দিয়ে তিনি বাছুর মূর্তিটি ধ্বংস করেছিলেন। এ অভিমতটি আলী (রাযিআল্লাহু আনহু), আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) প্রমুখের। কিতাবীদের ভাষ্যও তাই। অতঃপর এটাকে মূসা (আলাইহিস সালাম) সমুদ্রে নিক্ষেপ করলেন এবং বনী ইসরাঈলকে সেই সমুদ্রের পানি পান করতে নির্দেশ দিলেন। তারা পানি পান করল। যারা বাছুরের পূজা করেছিল, বাছুরের ছাই তাদের ঠোঁটে লেগে রইল যাতে বোঝা গেল যে, তারাই ছিল এর পূজারী। কেউ কেউ বলেন, তাদের রং হলদে হয়ে যায়।

    আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম) সম্বন্ধে আরও বলেন যে, তিনি বনী ইসরাঈলকে বলেছিলেনঃ

    (إِنَّمَاۤ إِلَـٰهُكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِی لَاۤ إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَۚ وَسِعَ كُلَّ شَیۡءٍ عِلۡمࣰا)

    [Surat Ta-Ha 98]

    ‘তোমাদের ইলাহ তো কেবল আল্লাহই যিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই। তার জ্ঞান সর্ববিষয়ে ব্যপ্ত।’

    আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ

    (إِنَّ ٱلَّذِینَ ٱتَّخَذُوا۟ ٱلۡعِجۡلَ سَیَنَالُهُمۡ غَضَبࣱ مِّن رَّبِّهِمۡ وَذِلَّةࣱ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَاۚ وَكَذَ ٰ⁠لِكَ نَجۡزِی ٱلۡمُفۡتَرِینَ)

    [Surat Al-A’raf 152]

    অর্থাৎ–‘যারা বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে পার্থিব জীবনে তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের ক্রোধ ও লাঞ্ছনা আপতিত হবেই, আর এভাবে আমি মিথ্যা রচনাকারীদের প্রতিফল দিয়ে থাকি।’ (সূরা আরাফঃ ১৫২)

    বাস্তবিকই বনী ইসরাঈলের উপর এরূপ ক্রোধ ও লাঞ্ছনাই আপতিত হয়েছিল। প্রাচীন আলিমগণের কেউ কেউ বলেছেন, وَكَذَ ٰ⁠لِكَ نَجۡزِی ٱلۡمُفۡتَرِینَ আয়াতাংশ -এর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী প্রতিটি বিদআত উদ্ভাবনকারীর এরূপ অবশ্যম্ভাবী পরিণামের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা আপন ধৈর্যশীলতা, সৃষ্টির প্রতি তাঁর দয়া ও তওবা কবুলের ব্যাপারে বান্দাদের উপর তাঁর অনুগ্রহের কথা বর্ণনা করে বলেন, ‘যারা অসৎ কার্য করে তারা পরে তওবা করলে ও ঈমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আরাফঃ ১৫৩)

    কিন্তু বাছুর পূজারীদের হত্যার শাস্তি ব্যতীত আল্লাহ্ তা’আলা কোন তওবা কবুল করলেন না। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦ یَـٰقَوۡمِ إِنَّكُمۡ ظَلَمۡتُمۡ أَنفُسَكُم بِٱتِّخَاذِكُمُ ٱلۡعِجۡلَ فَتُوبُوۤا۟ إِلَىٰ بَارِىِٕكُمۡ فَٱقۡتُلُوۤا۟ أَنفُسَكُمۡ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ خَیۡرࣱ لَّكُمۡ عِندَ بَارِىِٕكُمۡ فَتَابَ عَلَیۡكُمۡۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِیمُ)

    [Surat Al-Baqarah 54]

    আর স্মরণ কর, যখন মূসা আপন সম্প্রদায়ের লোককে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! বাছুরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের প্রতি ঘোর অত্যাচার করেছ। সুতরাং তোমরা তোমাদের স্রষ্টার পানে ফিরে যাও এবং তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কর। তোমাদের স্রষ্টার কাছে এটাই শ্রেয়। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা বাকারাঃ ৫৪)

    কথিত আছে, একদিন ভোরবেলা যারা বাছুর পূজা করেনি তারা তরবারি হাতে নিল; অন্যদিকে আল্লাহ তা’আলা তাদের প্রতি এমন ঘন কুয়াশা অবতীর্ণ করলেন যে, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে এবং একই বংশের একজন অন্যজনকে চিনতে পারছিল না। তারা বাছুর পূজারীদেরকে পাইকারী হারে হত্যা করল এবং তাদের মূলোৎপাটন করে দিল। কথিত রয়েছে যে, তারা ঐ দিনের একই প্রভাতে সত্তর হাজার লোককে হত্যা করেছিল।

    অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

    (وَلَمَّا سَكَتَ عَن مُّوسَى ٱلۡغَضَبُ أَخَذَ ٱلۡأَلۡوَاحَۖ وَفِی نُسۡخَتِهَا هُدࣰى وَرَحۡمَةࣱ لِّلَّذِینَ هُمۡ لِرَبِّهِمۡ یَرۡهَبُونَ)[Surat Al-A’raf 154]

    অর্থাৎ—“যখন মূসার ক্রোধ প্রশমিত হল তখন সে ফলকগুলো তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে তাদের জন্য ওতে যা লিখিত ছিল তাতে ছিল পথনির্দেশ ও রহমত।” (সূরা আরাফঃ ১৫৪)।

    আয়াতাংশে উল্লেখিত وَفِی نُسۡخَتِهَا هُدࣰى وَرَحۡمَةࣱ এর দ্বারা কেউ কেউ প্রমাণ করেন যে, ফলকগুলো ভেঙে গিয়েছিল। তবে এই প্রমাণটি সঠিক নয়। কেননা, কুরআনের শব্দে এমন কিছু পাওয়া যায় না যাতে প্রমাণিত হয় যে, এগুলো ভেঙে গিয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) ফিনা সম্বলিত হাদীসসমূহে উল্লেখ করেছেন যে, তাদের বাছুর পূজার ঘটনাটি ছিল তাদের সমুদ্র পার হবার পর। এই অভিমতটি অযৌক্তিক নয়; কেননা তারা যখন সমুদ্র পার হলো তখন তারা বলেছিল, “হে মূসা! তাদের যেমন ইলাহসমূহ রয়েছে আমাদের জন্যেও তেমন একটি ইলাহ্ গড়ে দাও।” (সূরা আ’রাফঃ ১০৮)

    অনুরূপ অভিমত কিতাবীরা প্রকাশ করে থাকেন। কেননা, তাদের বাছুর পূজার ঘটনাটি ছিল বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে আগমনের পূর্বে। বাছুর পূজারীদেরকে হত্যা করার যখন হুকুম দেয়া হয়, তখন প্রথম দিনে তিন হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছিল। অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তাদের ক্ষমা করা হল এই শর্তে যে, তারা বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَٱخۡتَارَ مُوسَىٰ قَوۡمَهُۥ سَبۡعِینَ رَجُلࣰا لِّمِیقَـٰتِنَاۖ فَلَمَّاۤ أَخَذَتۡهُمُ ٱلرَّجۡفَةُ قَالَ رَبِّ لَوۡ شِئۡتَ أَهۡلَكۡتَهُم مِّن قَبۡلُ وَإِیَّـٰیَۖ أَتُهۡلِكُنَا بِمَا فَعَلَ ٱلسُّفَهَاۤءُ مِنَّاۤۖ إِنۡ هِیَ إِلَّا فِتۡنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاۤءُ وَتَهۡدِی مَن تَشَاۤءُۖ أَنتَ وَلِیُّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا وَٱرۡحَمۡنَاۖ وَأَنتَ خَیۡرُ ٱلۡغَـٰفِرِینَ ۝ ۞ وَٱكۡتُبۡ لَنَا فِی هَـٰذِهِ ٱلدُّنۡیَا حَسَنَةࣰ وَفِی ٱلۡـَٔاخِرَةِ إِنَّا هُدۡنَاۤ إِلَیۡكَۚ قَالَ عَذَابِیۤ أُصِیبُ بِهِۦ مَنۡ أَشَاۤءُۖ وَرَحۡمَتِی وَسِعَتۡ كُلَّ شَیۡءࣲۚ فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِینَ یَتَّقُونَ وَیُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِینَ هُم بِـَٔایَـٰتِنَا یُؤۡمِنُونَ ۝ ٱلَّذِینَ یَتَّبِعُونَ ٱلرَّسُولَ ٱلنَّبِیَّ ٱلۡأُمِّیَّ ٱلَّذِی یَجِدُونَهُۥ مَكۡتُوبًا عِندَهُمۡ فِی ٱلتَّوۡرَىٰةِ وَٱلۡإِنجِیلِ یَأۡمُرُهُم بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَیَنۡهَىٰهُمۡ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَیُحِلُّ لَهُمُ ٱلطَّیِّبَـٰتِ وَیُحَرِّمُ عَلَیۡهِمُ ٱلۡخَبَـٰۤىِٕثَ وَیَضَعُ عَنۡهُمۡ إِصۡرَهُمۡ وَٱلۡأَغۡلَـٰلَ ٱلَّتِی كَانَتۡ عَلَیۡهِمۡۚ فَٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ بِهِۦ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَٱتَّبَعُوا۟ ٱلنُّورَ ٱلَّذِیۤ أُنزِلَ مَعَهُۥۤ أُو۟لَـٰۤىِٕكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ)

    [Surat Al-A’raf 155 – 157]

    অর্থাৎ, মূসা তার নিজ সম্প্রদায় থেকে সত্তরজন লোককে আমার নির্ধারিত স্থানে সমবেত হবার জন্যে মনোনীত করল। তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছা করলে পূর্বেই তো তাদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ তারা যা করেছে সেজন্য কি তুমি আমাদেরকে ধ্বংস করবে? এটা তো শুধু তোমার পরীক্ষা, যা দিয়ে তুমি যাকে ইচ্ছে বিপথগামী কর এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত কর। তুমিই তো আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য নির্ধারিত কর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করেছি। আল্লাহ বলেন, আমার শাস্তি যাকে ইচ্ছে দিয়ে থাকি, আর আমার দয়া, তাতে প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি এটা তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে। যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তাওরাত ও ইঞ্জিল, যা তাদের নিকট রয়েছে তাতে তারা লিপিবদ্ধ পায়, যে তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় ও অসকার্যে বাধা দেয়, যে তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে ও অপবিত্র বস্তু হারাম করে এবং যে মুক্ত করে তাদেরকে তাদের গুরুভার থেকে ও শৃংখল থেকে যা তাদের উপর ছিল। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যেই নূর তার সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” (সূরা আ’রাফঃ ১৫৫-১৫৭)

    সুদ্দী (র) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) ও অন্যান্য মুফাস্‌সির উল্লেখ করেন যে, এই সত্তরজন ছিলেন বনী ইসরাঈলের উলামায়ে কিয়াম। আর তাদের সাথে ছিলেন মূসা (আলাইহিস সালাম), হারূন (আলাইহিস সালাম), ইউশা (আলাইহিস সালাম) নাদাব ও আবীছ। বনী ইসরাঈলের যারা বাছুর পূজা করেছিল তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্যে তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে গিয়েছিলেন। আর তাদেরকে হুকুম দেয়া হয়েছিল তারা যেন পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন করে গোসল করে ও সুগন্ধি ব্যবহার করে। তখন তারা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে আগমন করলেন, পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন; পাহাড়ের উপরে ঝুলন্ত ছিল মেঘখণ্ড, নূরের স্তম্ভ ছিল সুউচ্চ। মূসা (আলাইহিস সালাম) পাহাড়ে আরোহণ করলেন। বনী ইসরাঈলরা দাবি করেন যে, তারা আল্লাহ তা’আলার কালাম শুনেছেন। কিছু সংখ্যক তাফসীরকারক তাদের এ দাবিকে সমর্থন করেছেন এবং বলেছেন, সূরায়ে বাকারার আয়াতে উল্লেখিত আল্লাহ তা’আলার বাণী শ্রবণকারী যে দলটির কথা বলা হয়েছে, সত্তরজনের দলের দ্বারাও একই অর্থ নেয়া হয়েছে।

    সূরায়ে বাকারায় আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেনঃ

    (۞ أَفَتَطۡمَعُونَ أَن یُؤۡمِنُوا۟ لَكُمۡ وَقَدۡ كَانَ فَرِیقࣱ مِّنۡهُمۡ یَسۡمَعُونَ كَلَـٰمَ ٱللَّهِ ثُمَّ یُحَرِّفُونَهُۥ مِنۢ بَعۡدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمۡ یَعۡلَمُونَ)[Surat Al-Baqarah 75]

    অর্থাৎ তোমরা কি এই আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে, যখন তাদের একদল আল্লাহর বাণী শ্রবণ করে। তারপর তা বুঝবার পর জেনে-শুনে এটা বিকৃত করে। (সূরা বাকারাঃ ৭৫)

    তবে এ আয়াতে যে শুধু তাদের কথাই বলা হয়েছে, এটাও অপরিহার্য নয়। কেননা, আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِنۡ أَحَدࣱ مِّنَ ٱلۡمُشۡرِكِینَ ٱسۡتَجَارَكَ فَأَجِرۡهُ حَتَّىٰ یَسۡمَعَ كَلَـٰمَ ٱللَّهِ ثُمَّ أَبۡلِغۡهُ مَأۡمَنَهُۥۚ ذَ ٰ⁠لِكَ بِأَنَّهُمۡ قَوۡمࣱ لَّا یَعۡلَمُونَ)[Surat At-Tawbah 6]

    অর্থাৎ- “মুশরিকদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তুমি তাকে আশ্রয় দেবে যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়, অতঃপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দেবে। কারণ তারা অজ্ঞ লোক।” (সূরা তওবা: ৬)

    অর্থাৎ তাবলীগের খাতিরে তাঁকে আল্লাহ্ তা’আলার বাণী শোনাবার জন্যে হুকুম দেয়া হয়েছে, অনুরূপভাবে তারাও মূসা (আলাইহিস সালাম) থেকে তাবলীগ হিসেবে আল্লাহ তা’আলার বাণী শুনেছিলেন। কিতাবীরা আরো মনে করে যে, এ সত্তর ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে দেখেছিল। এটা তাদের ভ্রান্ত ধারণা বৈ আর কিছুই নয়। কেননা, তারা যখন আল্লাহ তা’আলাকে দেখতে চেয়েছিল তখনই তারা বজ্রাহত হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِذۡ قُلۡتُمۡ یَـٰمُوسَىٰ لَن نُّؤۡمِنَ لَكَ حَتَّىٰ نَرَى ٱللَّهَ جَهۡرَةࣰ فَأَخَذَتۡكُمُ ٱلصَّـٰعِقَةُ وَأَنتُمۡ تَنظُرُونَ ۝ ثُمَّ بَعَثۡنَـٰكُم مِّنۢ بَعۡدِ مَوۡتِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ)[Surat Al-Baqarah 55 – 56]

    “স্মরণ কর, যখন তোমরা বলেছিলে, হে মূসা! আমরা আল্লাহকে প্রত্যক্ষভাবে না দেখা পর্যন্ত তোমাকে কখনও বিশ্বাস করব না। তখন তোমরা বজ্রাহত হয়েছিলে, আর তোমরা নিজেরাই দেখছিলে, মৃত্যুর পর তোমাদের পুনর্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।” (সূরা বাকারাঃ ৫৫-৫৬)

    অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (فَلَمَّاۤ أَخَذَتۡهُمُ ٱلرَّجۡفَةُ قَالَ رَبِّ لَوۡ شِئۡتَ أَهۡلَكۡتَهُم مِّن قَبۡلُ وَإِیَّـٰیَۖ)

    [Surat Al-A’raf 155]

    “তারা যখন ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হল তখন মূসা বলল, হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছে করলে পূর্বেই তো তাদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে …..।”

    মুহাম্মদ ইবন ইসহাক (র) বলেন, “মূসা (আলাইহিস সালাম) বনী ইসরাঈল থেকে সত্তরজন সদস্যকে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ক্রমানুযায়ী মনোনীত করেছিলেন এবং তাদেরকে বলেছিলেন, “আল্লাহ তাআলার দিকে প্রত্যাগমন কর, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তওবা কর এবং তোমাদের মধ্যে যারা বাছুর পূজা করে অন্যায় করেছে তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ তা’আলার কাছে তোমরা তওবা কর; তোমরা সিয়াম আদায় কর; পবিত্রতা অর্জন কর ও নিজেদের জামা-কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কর।” অতঃপর আপন প্রতিপালক কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে সীনাই মরুভূমির তূর পাহাড়ে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। আর তিনি কোন সময়ই আল্লাহ তা’আলার অনুমতি ব্যতীত সেখানে গমন করতেন না। আল্লাহ তা’আলার কালাম শোনাবার জন্যে তাদের সেই সত্তরজন মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে অনুরোধ করল। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি একাজটি করতে চেষ্টা করব। মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন পাহাড়ের নিকটবর্তী হলেন, তখন তার উপর মেঘমালার স্তম্ভ নেমে আসল এবং তা সমস্ত পাহাড়কে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মূসা (আলাইহিস সালাম) আরও নিকটবর্তী হলেন এবং মেঘমালায় ঢুকে পড়লেন, আর নিজের সম্প্রদায়কে বলতে লাগলেন, তোমরা নিকটবর্তী হও।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন আল্লাহ তা’আলার সাথে কথা বলতেন, তখন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মুখমণ্ডলের উপর এমন উজ্জ্বল নূরের প্রতিফলন ঘটত যার দিকে বনী আদমের কেউ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারত না। তাই সামনে পর্দা ঝুলিয়ে দেয়া হল, সম্প্রদায়ের লোকেরা অগ্রসর হলেন এবং মেঘমালায় ঢুকে সিজদাবনত হয়ে পড়লেন। আল্লাহ তা’আলা যখন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে কথা বলছিলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বলছিলেন, এটা কর, ঐটা করো না। তখন তারা আল্লাহ তাআলার কথা শুনছিলেন। আল্লাহ তা’আলা যখন তার নির্দেশ প্রদান সম্পন্ন করলেন এবং মূসা (আলাইহিস সালাম) থেকে মেঘমালা কেটে গেল ও সম্প্রদায়ের দিকে তিনি দৃষ্টি দিলেন, তখন তারা বলল, হে মূসা! আমরা তোমার কথায় বিশ্বাস করি না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্য দেখতে পাই। তারা তখন বজ্রাহত হল ও তাদের থেকে তাদের রূহ বের হয়ে পড়ল। তাতে তারা সকলেই মৃত্যুবরণ করল।

    তৎক্ষণাৎ মূসা (আলাইহিস সালাম) আপন প্রতিপালককে ডাকতে লাগলেন এবং অনুনয় বিনয় করে আরযী জানাতে লাগলেনঃ

    رَبِّ لَوۡ شِئۡتَ أَهۡلَكۡتَهُم مِّن قَبۡلُ وَإِیَّـٰیَۖ أَتُهۡلِكُنَا بِمَا فَعَلَ ٱلسُّفَهَاۤءُ مِنَّاۤ

    অর্থাৎ “হে আমার প্রতিপালক! তুমি ইচ্ছে করলে পূর্বেই তো তাদেরকে এবং আমাকেও ধ্বংস করতে পারতে। আমাদের মধ্যে যারা নির্বোধ, তারা যা করেছে সেজন্য তুমি আমাদেরকে কি ধ্বংস করবে?

    অন্য কথায়, আমাদের মধ্য হতে নির্বোধরা যা করেছে; তারা বাছুরের পূজা করেছে। তাদের এ কাজের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), মুজাহিদ (র), কাতাদা (র) ও ইবন জুরায়জ (র) বলেন, বনী ইসরাঈলরা বজ্রাঘাতে আক্রান্ত হয়েছিল, কেননা তারা তাদের সম্প্রদায়কে বাছুর পূজা থেকে বিরত রাখেনি। উক্ত আয়াতে উল্লেখিত আয়াতাংশ ان هى الا فتنتك-এর অর্থ হচ্ছে, এটা তোমার প্রদত্ত পরীক্ষা ছাড়া কিছুই নয়।’ এ অভিমতটি আবদুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), সাঈদ ইবন জুবাইর (রাযিআল্লাহু আনহু), আবুল আলীয়া (র), রাবী ইবন আনাস (র) ও পূর্বাপরের অসংখ্য উলামায়ে কিরামের। অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমিই এটা নির্ধারিত করে রেখেছিলে, বা তাদেরকে এটার দ্বারা পরীক্ষা করার জন্যে বাছুর পূজা করার বিষয়টি সৃষ্টি করেছিলে।

    যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَلَقَدۡ قَالَ لَهُمۡ هَـٰرُونُ مِن قَبۡلُ یَـٰقَوۡمِ إِنَّمَا فُتِنتُم بِهِۦۖ )

    [Surat Ta-Ha 90]

    অর্থাৎ— “হারূন তাদেরকে পূর্বেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! বাছুর পূজা দ্বারা তো কেবল তোমাদেরকে পরীক্ষায়ই ফেলা হয়েছে।” (সূরা তা-হাঃ ৯০)

    এজন্য মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেনঃ

    ( تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَاۤءُ وَتَهۡدِی مَن تَشَاۤءُۖ )

    অর্থাৎ “তুমিই এই পরীক্ষা দ্বারা যাকে ইচ্ছে পথভ্রষ্ট কর এবং যাকে ইচ্ছে হিদায়ত কর। তুমিই নির্দেশ ও ইচ্ছার মালিক। তুমি যা নির্দেশ বা ফয়সালা কর তা বাধা দেয়ার মত কারো শক্তি নেই এবং কেউ তা প্রতিহতও করতে পারে না।

    (أَنتَ وَلِیُّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا وَٱرۡحَمۡنَاۖ وَأَنتَ خَیۡرُ ٱلۡغَـٰفِرِینَ)

    অর্থাৎ, তুমিই তো আমাদের অভিভাবক, সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা কর ও আমাদের প্রতি দয়া কর এবং ক্ষমাশীলদের মধ্যে তুমিই তো শ্রেষ্ঠ। আমাদের জন্য নির্ধারিত কর ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ, আমরা তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করেছি এবং অনুনয় বিনয় সহকারে তোমাকেই স্মরণ করেছি।

    উপরোক্ত তাফসীরটি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), মুজাহিদ, সাঈদ ইবন জুবাইর, আবুল আলীয়া, ইবরাহীম তায়মী, যাহহাক, সুদ্দী, কাতাদা (র) ও আরো অনেকেই এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন। আভিধানিক অর্থও তাই।

    আয়াতাংশঃ

    (قَالَ عَذَابِیۤ أُصِیبُ بِهِۦ مَنۡ أَشَاۤءُۖ )

    [Surat Al-A’raf 156]

    অর্থাৎ–‘আমি যেসব বস্তু সৃষ্টি করেছি এগুলোর কারণে আমি যাকে ইচ্ছে শাস্তি প্রদান করব। আমার রহমত তা তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। (সূরা আ’রাফঃ ১৫৬)

    সহীহ্ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ “আল্লাহ তা’আলা যখন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজন সমাপ্ত করেন তখন তিনি একটি লিপি লিখলেন ও আরশের উপর তাঁর কাছে রেখে দিলেন, তাতে লেখা ছিল ان رحتى تغلب غضبى “নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার গযবকে হার মানায়।”

    আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ “সুতরাং এটা আমি তাদের জন্যে নির্ধারিত করব যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে, যাকাত দেবে ও আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করবে।” অর্থাৎ আমি সুনিশ্চিতভাবে তাদেরকেই রহমত দান করব যারা এসব গুণের অধিকারী হবে। “আর যারা বার্তাবাহক উম্মী নবীর অনুসরণ করবে”- এখানে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর উম্মত সম্বন্ধে উল্লেখ করে তাঁদের মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এবং মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে একান্ত আলাপে আল্লাহ্ তা’আলা এ বিষয়টিও জানিয়ে দিয়েছিলেন। আমার তাফসীর গ্রন্থে এই আয়াত ও তার পরবর্তী আয়াতের তাফসীর বর্ণনাকালে আমি এ সম্পর্কে বিস্তারিত প্রয়োজনীয় আলোচনা পেশ করেছি।

    কাতাদা (র) বলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! ফলকে আমি এমন এক উম্মতের উল্লেখ দেখতে পাচ্ছি যারা হবে শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির জন্য তাদের আবির্ভাব হবে, তারা সৎ কার্যের নির্দেশ দান করবে, অসৎ কাজে নিষেধ করবে। হে প্রতিপালক! তাদেরকে আমার উম্মত করে দিন! আল্লাহ তাআলা বললেন, না, ওরা আহমদের উম্মত।’ পুনরায় মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! ফলকে আমি একটি উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি যারা সৃষ্টি হিসেবে সর্বশেষ কিন্তু জান্নাতে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম। হে আমার প্রতিপালক! তাদেরকে আমার উম্মত করে দিন! আল্লাহ তা’আলা বললেন, ‘না, এরা আহমদের উম্মত। আবার মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! ফলকে আমি একটি উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি, যাদের অন্তরে আল্লাহ তা’আলার কালাম সুরক্ষিত, অর্থাৎ ওরা আল্লাহ তা’আলার কালামের হাফিজ। তারা হিফজ হতে আল্লাহ তা’আলার কালাম তিলাওয়াত করবেন। উম্মতে মুহাম্মদীর পূর্বে যেসব উম্মত ছিলেন তারা দেখে দেখে আল্লাহ তা’আলার কালাম তিলাওয়াত করতেন। কিন্তু যখন তাদের থেকে আল্লাহ তাআলার কালাম উঠিয়ে নেয়া হতো, তখন তারা আর কিছুই তিলাওয়াত করতে পারতো না। কেননা, তারা আল্লাহ তাআলার কালামের কোন অংশই হিফজ করতে পারেনি। তারা পরবর্তীতে আল্লাহ তা’আলার কালামকে আর চিনতেই সক্ষম হতো না। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীকে আল্লাহ তা’আলার কালাম হিফজ করার তাওফীক দান করা হয়েছে, যা অন্য কাউকে দান করা হয়নি। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! ওদেরকে আমার উম্মত করে দিন। আল্লাহ তা’আলা বললেন, না, ওরা আহমদের উম্মত।

    মূসা (আলাইহিস সালাম) আবারো বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! ফলকে আমি এমন একটি উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি, যারা তাদের পূর্বের আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং শেষ কিতাবের প্রতিও বিশ্বাস স্থাপন করবে। তারা পথভ্রষ্ট বিভিন্ন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, এমনকি আখেরী যামানার একচক্ষুবিশিষ্ট মিথ্যাবাদী দাজ্জালের বিরুদ্ধেও জিহাদ করবে। তাদেরকে আমার উম্মত করে দিন।” আল্লাহ তা’আলা বললেন, না, ওরা আহমদের উম্মত। মূসা (আলাইহিস সালাম) পুনরায় বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! ফলকে আমি এমন একটি উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি যারা আল্লাহ তা’আলার নামের সাদকা-খয়রাত নিজেরা খাবে কিন্তু তাদেরকে এটার জন্যে আবার পুরস্কারও দেয়া হবে।” উম্মতে মুহাম্মদীর পূর্বে অন্যান্য উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি সাদকা করত এবং তা আল্লাহ তা’আলার দরবারে কবুল হত তখন আল্লাহ তা’আলা আগুন প্রেরণ করতেন এবং সে আগুন তা পুড়িয়ে দিত। কিন্তু যদি তা কবুল না হত তাহলে আগুন তা পোড়াত না। বরং এটাকে পশু-পাখিরা খেয়ে ফেলত এবং আল্লাহ তা’আলা ঐ উম্মতের ধনীদের সাদকা দরিদ্রদের জন্যে গ্রহণ করবেন। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! এদেরকে আমার উম্মত বানিয়ে দিন।” আল্লাহ তা’আলা বললেন, ‘না, ওরা আহমদের উম্মত।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) পুনরায় বললেন, “ফলকে আমি এমন এক উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি, তারা যদি একটি নেক কাজ করতে ইচ্ছে করে অথচ পরবর্তীতে তা করতে না পারে, তাহলে তাদের জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর যদি তা তারা করতে পারে, তাহলে তাদের জন্যে দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত নেকী দেয়া হবে। ওদেরকে আমার উম্মত করে দিন!” আল্লাহ তা’আলা বললেন, “না, ওরা আহমদের উম্মত।” মূসা (আলাইহিস সালাম) পুনরায় বললেন, “আমি ফলকে এমন একটি উম্মতের উল্লেখ পাচ্ছি যারা অন্যদের জন্যে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে এবং তাদের সে সুপারিশ ককূলও, করা হবে। তাদেরকে আমার উম্মত করে দিন। আল্লাহ তাআলা বললেন, “না, এরা আহমদের উম্মত।”

    কাতাদা (র) বলেন, আমাদের কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, অতঃপর মূসা (আলাইহিস সালাম) ফলক ফেলে দিলেন এবং বললেন اللهم اجعلنى من امة احمد হে আল্লাহ! আমাকেও আহমদের উম্মতে শামিল করুন। অনেকেই মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর এরূপ মুনাজাত উল্লেখ করেছেন এবং মুনাজাতে এমন বিষয়াদি সম্বন্ধে উল্লেখ রয়েছে, যেগুলোর কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই বিশুদ্ধ হাদীস ও বাণীসমূহের মাধ্যমে প্রাপ্ত এ সংক্রান্ত বিবরণ আল্লাহ তাআলার সাহায্য, তাওফীক, হিদায়াত ও সহায়তা নিয়ে পেশ করব।

    হাফিজ আবু হাতিম মুহাম্মদ ইবন হাতিম ইবন হিব্বান (র) তাঁর বিখ্যাত সহীহ’ গ্রন্থে জান্নাতীদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলার কাছে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জিজ্ঞাসা সম্পর্কে বলেনঃ মুগীরা ইব্‌ন শুবা (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন যে, মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তা’আলাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, জান্নাতীদের মধ্যে মর্যাদায় সর্বনিম্ন কে? আল্লাহ তা’আলা বলেন, জান্নাতীগণ জান্নাতে প্রবেশ করার পর এক ব্যক্তি আগমন করবে। তখন তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। সে ব্যক্তি বলবে, আমি কেমন করে জান্নাতে প্রবেশ করবো অথচ লোকজন সকলেই নিজ নিজ স্থান করে নিয়েছে ও নির্ধারিত নিয়ামত লাভ করেছে। তাকে তখন বলা হবে যে, যদি তোমাকে দুনিয়ার রাজাদের কোন এক রাজার রাজ্যের সমান জান্নাত দেয়া হয়, তাহলে কি তুমি সন্তুষ্ট হবে? উত্তরে সে বলবে, “হ্যাঁ, আমার প্রতিপালক!’ তাকে তখন বলা হবে, তোমার জন্যে এটা এটার ন্যায় আরো একটা এবং এটার ন্যায় আরো এক জান্নাত। সে তখন বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি সন্তুষ্ট। তখন তাঁকে বলা হবে, এর সাথে রয়েছে তোমার জন্যে যা তোমার মন চাইবে ও যাতে চোখ জুড়াবে।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ তাআলার কাছে জানতে চান, জান্নাতীদের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী আল্লাহ্ তা’আলা বললেন, “তাদের সম্বন্ধে আমি তোমাকে বলছি, তাদের মর্যাদার বৃক্ষটি আমি নিজ কুদরতী হাতে রোপণ করেছি এবং তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছিয়েছি তা এমন যা কোন দিন কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং যা কোন আদম সন্তানের কল্পনায় আসেনি।”

    এ হাদীসের বক্তব্যের যথার্থতার প্রমাণ বহন করে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটিঃ

    (فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسࣱ مَّاۤ أُخۡفِیَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعۡیُنࣲ جَزَاۤءَۢ بِمَا كَانُوا۟ یَعۡمَلُونَ)

    [Surat As-Sajdah 17]

    অর্থাৎ “কেউই জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর কি লুক্কায়িত রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ।” (৩২ সাজদাঃ ১৭)

    অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম (র) ও ইমাম তিরমিযী (র) সুফিয়ান ইবন উয়াইনা (র) সূত্রে বর্ণনা করেন, মুসলিমের পাঠ হচ্ছেঃ فيقال له اترضى অতঃপর তাকে বলা হবে যদি পৃথিবীর কোন রাজার রাজ্যের সমতুল্য তোমাকে দান করা হয় তাতে কি তুমি সন্তুষ্ট হবে? তখন সে ব্যক্তি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি এতে সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তোমার জন্যে রয়েছে এটা, এটার অনুরূপ এবং এটার অনুরূপ। এটার অনুরূপ, আরো এটার অনুরূপ পঞ্চম বারের পর সে ব্যক্তি বলবেঃ হে আমার প্রতিপালক! এটাতে আমি সন্তুষ্ট।’ অতঃপর বলা হবে, এটা তো তোমার জন্যে থাকবেই এবং তার সাথে আরো দশগুণ, আর এছাড়াও তোমার জন্যে থাকবে যা তোমার মনে চাইবে ও যাতে তোমার চোখ জুড়াবে। তখন সে ব্যক্তি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি সন্তুষ্ট।’ আর মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! এরাই তাহলে মর্যাদায় সর্বোচ্চ?’ তখন আল্লাহ্ তা’আলা বললেন, তাদের সম্মানের বৃক্ষ আমি নিজ হাতে রোপণ করেছি এবং সম্মানের পরিচর্যার কাজও আমিই সমাপ্ত করেছি। তাদের এত নিয়ামত দেয়া হবে, যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শুনেনি এবং কোন মানবহৃদয় এর কল্পনাও করেনি। ইমাম মুসলিম (র) বলেন, কুরআন মজীদের আয়াতে তার যথার্থতার প্রমাণ রয়েছে। فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسࣱ مَّاۤ أُخۡفِیَ لَهُم

    ইমাম তিরমিযী (র) হাদীসটি হাসান ও সহীহ বলেছেন। কেউ কেউ বলেন, হাদীসটিকে মওকুফ বললেও বিশুদ্ধ মতে তা মারফু। ইবন হিব্বান (র) তার ‘সহীহ’ গ্রন্থে মূসা (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক তাঁর প্রতিপালককে সাতটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা প্রসঙ্গে বলেনঃ

    আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন। একদিন মূসা (আলাইহিস সালাম) আপন প্রতিপালকের কাছে ছয়টি বিষয়ে প্রশ্ন করেন, আর এই ছয়টি বিষয় শুধু তাঁরই জন্যে বলে তিনি মনে করেছিলেন। সপ্তম বিষয়টি মূসা (আলাইহিস সালাম) পছন্দ করেননি। মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রশ্ন করেন, (১) হে আমার প্রতিপালক! তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক পরহেজগার কে? আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ “যে ব্যক্তি যিকির করে এবং গাফিল থাকে না। (২) মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক হিদায়াতপ্রাপ্ত কে? আল্লাহ তা’আলা বলেন, যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করে। (৩) মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম বিচারক কে? আল্লাহ তা’আলা বলেন, যে মানুষের জন্যে সেরূপ বিচারই করে যা সে নিজের জন্যে করে। (৪) মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী কে? আল্লাহ তা’আলা বলেন, এমন জ্ঞানী যে জ্ঞান আহরণে তৃপ্ত হয় না বরং লোকজনের জ্ঞানকে নিজের জ্ঞানের সাথে যোগ করে। (৫) মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত কে? আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, যে বান্দা প্রতিশোধ গ্রহণের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয়। (৬) মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রশ্ন করেন? তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক ধনী কে? আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “যে বান্দা তাকে যা দেয়া হয়েছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে।’ (৭) মূসা (আলাইহিস সালাম) প্রশ্ন করেনঃ তোমার বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক দরিদ্র কে? আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, ‘মানকুস’ —যার মনে অভাববোধ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, “বাহ্যিক ধনীকে প্রকৃত পক্ষে ধনী বলা হয় না, অন্তরের ধনীকেই ধনী বলা হয়। যখন আল্লাহ তাআলা কোন বান্দার প্রতি কল্যাণ চান, তখন তাকে অন্তরে ধনী হবার এবং হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভয় করার তাওফীক দেন। আর যদি কোন বান্দার অকল্যাণ চান তাহলে তার চোখ দারিদ্রকে প্রকট করে তুলেন। হাদীসে বর্ণিত منقوص শব্দের ব্যাখ্যায় ইন হিব্বান (র) বলেন, এটার অর্থ হচ্ছে তাকে যা কিছু দেয়া হয়েছে তা সে নগণ্য মনে করে এবং আরো অধিক চায়।

    ইবন জারীর (র) তার ইতিহাস গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি এতটুকু বর্ধিত করে বলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, হে আমার প্রতিপালক! তোমার বান্দাদের মধ্যে কে সর্বাধিক জ্ঞানী? আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, যে নিজের জ্ঞানের সাথে সাথে লোকজনের জ্ঞানও অন্বেষণ করে। অচিরেই সে একটি উপদেশ বাণী পাবে, যা তাকে আমার হিদায়াতের দিকে পথপ্রদর্শন করবে কিংবা আমার নিষেধ থেকে বিরত রাখবে। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কি পৃথিবীতে কেউ আছেন? আল্লাহ্ তা’আলা বললেন, হ্যা আছে, সে হচ্ছে খিযির।’ মূসা (আলাইহিস সালাম) খিযির (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যে পথের সন্ধান চান। পরবর্তীতে এর আলোচনা হবে।

    ইবন হিব্বানের বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস— ইমাম আহমদ (র) বলেন, আবু সাঈদ খুদরী (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন, “একদিন মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! তোমার মুমিন বান্দা দুনিয়াতে অভাবে-অনটনে দিন যাপন করে। আল্লাহ বলেন, তার জন্যে জান্নাতের একটি দ্বার খুলে দেয়া হবে তা দিয়ে সে জান্নাতের দিকে তাকাবে। ‘আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “হে মূসা! এটা হচ্ছে সেই বস্তু যা আমি তার জন্যে তৈরি করে রেখেছি।” মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, “হে আমার প্রতিপালক! তোমার ইযযত ও পরাক্রমের শপথ, যদি তার দুই হাত ও দুই পা কাটা গিয়ে থাকে এবং তার জন্ম থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সে হামা দিয়ে চলে আর এটাই যদি তার শেষ গন্তব্যস্থল হয়, তাহলে সে যেন কোনদিন কোন কষ্টই ভোগ করেনি।” রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “পুনরায় মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, হে আমার প্রতিপালক! তোমার কাফির বান্দা দুনিয়ার প্রাচুর্যের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “তার জন্যে জাহান্নামের একটি দ্বার খুলে দেয়া হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে মূসা! এটা আমি তার জন্যে তৈরি করে রেখেছি। মূসা (আলাইহিস সালাম) বলেন, “হে আমার প্রতিপালক! তোমার ইযযত ও পরাক্রমের শপথ, তার জন্ম থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যদি তাকে পার্থিব সম্পদ দেয়া হত, আর এটাই যদি তার গন্তব্যস্থল হয় তাহলে সে যেন কখনও কোন কল্যাণ লাভ করেনি। তবে এ হাদীসের সূত্রের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আল্লাহই সম্যক জ্ঞাত।

    ইবন হিব্বান (র) মূসা (আলাইহিস সালাম) কর্তৃক আপন প্রতিপালকের কাছে এমন একটি ‘যিকির প্রার্থনা’ শিরোনামে আবু সাঈদ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে এটি বর্ণনা করেন যে, একদিন মূসা (আলাইহিস সালাম) আরয করলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যার মাধ্যমে আমি আপনাকে স্মরণ করতে পারি ও ডাকতে পারি। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, হে মূসা! তুমি বল, لا اله الا الله মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, “হে আমার প্রতিপালক! আপনার প্রত্যেক বান্দাই তো এই কলেমা বলে থাকে। আল্লাহ তা’আলা বললেন, তুমি বল, لا اله الا الله মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমি এমন একটি কালেমা চাই যা আপনি আমার জন্যেই বিশেষভাবে দান করবেন। আল্লাহ তা’আলা বললেন, হে মূসা! যদি সাত আসমান ও সাত যমীনের বাসিন্দাদেরকে এক পাল্লায় রাখা হয় এবং لا اله الا الله কলেমাকে অন্য পাল্লায় রাখা হয় তাহলে لا اله الا الله  এর পাল্লাটি অপর পাল্লাটি থেকে অধিক ভারী হবে। এই হাদীসের সত্যতার প্রমাণ حديث البطاقة আর অর্থের দিক দিয়ে এ হাদীসের অতি নিকটবর্তী হল নিম্ন বর্ণিত হাদীস যা হাদীসের কিতাবগুলোতে বর্ণিত রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেন, সর্বোত্তম দু’আ হচ্ছে, আরাফাত ময়দানের দুআ।’

    আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণের সর্বোত্তম বাণী হলঃ

    لا اله الا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شي قدير

    অর্থাৎ এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, অংশীদারহীন, তাঁরই জন্য যত প্রশংসা এবং তিনিই সর্বশক্তিমান। اية الكرسى এর তাফসীর প্রসঙ্গে ইবন আবু হাতিম (র) ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বনী ইসরাঈল মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে প্রশ্ন করলেন, তোমার প্রতিপালক কি ঘুমান? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। তখন তার প্রতিপালক তাকে ডেকে বললেন, হে মূসা! তারা তোমাকে প্রশ্ন করেছে তোমার প্রতিপালক কি ঘুমান? তাই তুমি তোমার দুই হাতে দুইটি বোতল ধারণ কর এবং রাত জাগরণ কর। মূসা (আলাইহিস সালাম) এরূপ করলেন, যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিক্রান্ত হল, তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন এবং তাঁর মাথা হাঁটুর উপর ঝুঁকে পড়ল। অতঃপর তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং বোতল দু’টিকে মজবুত করে ধরলেন। এরপর যখন শেষরাত হলো তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। অমনি তাঁর দুই হাতের দুটি বোতল পড়ে গেল ও ভেঙ্গে গেল।

    অতঃপর আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে বললেন, “হে মূসা! যদি আমি নিদ্রাচ্ছন্ন হতাম তাহলে আসমান ও যমীন পতিত হত এবং তোমার হাতের বোতল দু’টির ন্যায় আসমান-যমীন ধ্বংস হয়ে যেত। বর্ণনাকারী বলেন, এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা’আলা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে আয়াতুল কুরসী নাযিল করেন।

    ইবন জারীর (র) আবূ হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন, আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে মিম্বরে বসে মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “একদিন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর অন্তরে এই প্রশ্ন উদিত হল যে, আল্লাহ্ তা’আলা কি নিদ্রা যান? তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর কাছে একজন ফেরেশতাকে পাঠালেন, তিনি তাকে তিন রাত অনিদ্রা অবস্থায় রাখলেন। অতঃপর তাকে দুই হাতে দু’টি কাঁচের বোতল দিলেন, আর এই দু’টো বোতলকে সযত্নে রাখার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাঁর ঘুম পেলেই দু’টো হাত একত্র হয়ে যাবার উপক্রম হত এবং তিনি জেগে উঠতেন। অতঃপর তিনি একটিকে অপরটির সাথে একত্রে ধরে রাখতেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। তার দুটো হাত কেঁপে উঠলো এবং দুটো বোতলই পড়ে ভেঙ্গে গেল।” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ তাআলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জন্যে এই একটি উদাহরণ বর্ণনা করেন যে, যদি আল্লাহ্ তা’আলা নিদ্রা যেতেন তাহলে আসমান ও যমীনকে ধরে রাখতে পারতেন না।

    উপরোক্ত হাদীস মারফুরূপে গরীব পর্যায়ের। তবে খুব সম্ভব এটা কোন সাহাবীর বাণী এবং এর উৎস ইহুদীদের বর্ণনা।

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِذۡ أَخَذۡنَا مِیثَـٰقَكُمۡ وَرَفَعۡنَا فَوۡقَكُمُ ٱلطُّورَ خُذُوا۟ مَاۤ ءَاتَیۡنَـٰكُم بِقُوَّةࣲ وَٱذۡكُرُوا۟ مَا فِیهِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ۝ ثُمَّ تَوَلَّیۡتُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَ ٰ⁠لِكَۖ فَلَوۡلَا فَضۡلُ ٱللَّهِ عَلَیۡكُمۡ وَرَحۡمَتُهُۥ لَكُنتُم مِّنَ ٱلۡخَـٰسِرِینَ)

    [Surat Al-Baqarah 63 – 64]

    “স্মরণ কর যখন তোমাদের অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তূরকে তোমাদের ঊর্ধে উত্তোলন করেছিলাম; বলেছিলাম, আমি যা দিলাম দৃঢ়তার সাথে তা গ্রহণ কর এবং তাতে যা রয়েছে তা স্মরণ রাখ। যাতে তোমরা সাবধান হয়ে চলতে পার। এটার পরেও তোমরা মুখ ফিরালে। আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা তোমাদের প্রতি না থাকলে তোমরা অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে।” (সূরা বাকারাঃ ৬৩ – ৬৪)

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (۞ وَإِذۡ نَتَقۡنَا ٱلۡجَبَلَ فَوۡقَهُمۡ كَأَنَّهُۥ ظُلَّةࣱ وَظَنُّوۤا۟ أَنَّهُۥ وَاقِعُۢ بِهِمۡ خُذُوا۟ مَاۤ ءَاتَیۡنَـٰكُم بِقُوَّةࣲ وَٱذۡكُرُوا۟ مَا فِیهِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ)[Surat Al-A’raf 171]

    অর্থাৎ “স্মরণ কর, আমি পৰ্বতকে তাদের ঊর্ধে উত্তোলন করি। আর তা ছিল যেন এক চাঁদোয়া। তারা ধারণা করল যে, এটা তাদের উপর পড়ে যাবে। বললাম, আমি যা দিলাম তা দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং ওতে যা আছে তা স্মরণ করো, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।” (সূরা আরাফঃ ১৭১)

    আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) ও প্রাচীন যুগের উলামায়ে কিরামের অনেকেই বলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন তাওরাত সম্বলিত ফলক নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে আগমন করলেন তখন সম্প্রদায়কে তা গ্রহণ করতে ও শক্তভাবে তা ধরতে নির্দেশ দিলেন। তারা তখন বলল, তাওরাতকে আমাদের কাছে খুলে ধরুন, যদি এর আদেশ নিষেধাবলী সহজ হয় তাহলে আমরা তা গ্রহণ করব। মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, তাওরাতের মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা তোমরা কবুল কর, তারা তা কয়েকবার প্রত্যাখ্যান করে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদেরকে হুকুম করেন তারা যেন তূর পাহাড় বনী ইসরাঈলের মাথার উপর উত্তোলন করেন। অমনি পাহাড় তাদের মাথার উপর মেঘখণ্ডের ন্যায় ঝুলতে লাগল, তাদের তখন বলা হল, তোমরা যদি তাওরাতকে তার সব কিছুসহ ককূল না কর এই পাহাড় তোমাদের মাথার উপর পড়বে। তখন তারা তা কবুল করল। তাদেরকে সিজদা করার হুকুম দেয়া হলো, তখন তারা সিজদা করল। তবে তারা পাহাড়ের দিকে আড় নজরে তাকিয়ে রয়েছিল। ইহুদীদের মধ্যে আজ পর্যন্ত এরূপ বলাবলি করে থাকে যে, যে সিজদার কারণে আমাদের উপর থেকে আযাব বিদূরিত হয়েছিল তার থেকে উত্তম সিজদা হতে পারে না।

    আবু বকর ইবন আবদুল্লাহ্ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন তাওরাতকে খুলে ধরলেন তখন পৃথিবীতে যত পাহাড়, গাছপালা ও পাথর রয়েছে সবই কম্পিত হয়ে উঠল, আর দুনিয়ার বালক বৃদ্ধ নির্বিশেষে যত ইহুদীর কাছে তাওরাত পাঠ করা হল তারা প্রকম্পিত হয়ে উঠল ও মাথা অবনত করল।

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    ثُمَّ تَوَلَّیۡتُم مِّنۢ بَعۡدِ ذَ ٰ⁠لِكَۖ

    অর্থাৎ তোমরা এই মহাপ্রতিশ্রুতি ও বিরাট ব্যাপার দেখার পর তোমাদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ।

    আল্লাহ তা’আলা পুনরায় বলেনঃ

    ( فَلَوۡلَا فَضۡلُ ٱللَّهِ عَلَیۡكُمۡ وَرَحۡمَتُهُۥ لَكُنتُم مِّنَ ٱلۡخَـٰسِرِینَ)

    অর্থাৎ তোমাদের প্রতি রাসূল ও কিতাব প্রেরণের মাধ্যমে যদি আল্লাহর অনুগ্রহ এবং অনুকম্পা না থাকত তাহলে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হতে।

    বনী ইসরাঈলের গাভীর ঘটনা

    আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (وَإِذۡ قَالَ مُوسَىٰ لِقَوۡمِهِۦۤ إِنَّ ٱللَّهَ یَأۡمُرُكُمۡ أَن تَذۡبَحُوا۟ بَقَرَةࣰۖ قَالُوۤا۟ أَتَتَّخِذُنَا هُزُوࣰاۖ قَالَ أَعُوذُ بِٱللَّهِ أَنۡ أَكُونَ مِنَ ٱلۡجَـٰهِلِینَ ۝ قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا هِیَۚ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ لَّا فَارِضࣱ وَلَا بِكۡرٌ عَوَانُۢ بَیۡنَ ذَ ٰ⁠لِكَۖ فَٱفۡعَلُوا۟ مَا تُؤۡمَرُونَ ۝ قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا لَوۡنُهَاۚ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ صَفۡرَاۤءُ فَاقِعࣱ لَّوۡنُهَا تَسُرُّ ٱلنَّـٰظِرِینَ ۝ قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا هِیَ إِنَّ ٱلۡبَقَرَ تَشَـٰبَهَ عَلَیۡنَا وَإِنَّاۤ إِن شَاۤءَ ٱللَّهُ لَمُهۡتَدُونَ ۝ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ لَّا ذَلُولࣱ تُثِیرُ ٱلۡأَرۡضَ وَلَا تَسۡقِی ٱلۡحَرۡثَ مُسَلَّمَةࣱ لَّا شِیَةَ فِیهَاۚ قَالُوا۟ ٱلۡـَٔـٰنَ جِئۡتَ بِٱلۡحَقِّۚ فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا۟ یَفۡعَلُونَ ۝ وَإِذۡ قَتَلۡتُمۡ نَفۡسࣰا فَٱدَّ ٰ⁠رَ ٰٔۡ ⁠تُمۡ فِیهَاۖ وَٱللَّهُ مُخۡرِجࣱ مَّا كُنتُمۡ تَكۡتُمُونَ ۝ فَقُلۡنَا ٱضۡرِبُوهُ بِبَعۡضِهَاۚ كَذَ ٰ⁠لِكَ یُحۡیِ ٱللَّهُ ٱلۡمَوۡتَىٰ وَیُرِیكُمۡ ءَایَـٰتِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ)[Surat Al-Baqarah 67 – 73]

    অর্থাৎ স্মরণ কর, যখন মূসা (আলাইহিস সালাম) আপন সম্প্রদায়কে বলেছিলঃ আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু যবেহর আদেশ দিয়েছেন। তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছ? মূসা বলল, আল্লাহর শরণ নিচ্ছি যাতে আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল, ওটা কী রূপ? মূসা বলল, আল্লাহ্ বলেছেন, ‘এটা এমন গরু যা বৃদ্ধও নয়, অল্পবয়স্কও নয়— মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যা আদিষ্ট হয়েছ তা কর। তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল, এটার রং কি? মূসা বলল, আল্লাহ্ বলছেন, এটা হলুদ বর্ণের গরু, এটার রং উজ্জ্বল গাঢ়, যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়। তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল, তা কোনটি? আমরা গরুটি সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছে করলে নিশ্চয়ই আমরা দিশা পাব। মূসা বলল, তিনি বলছেন, ওটা এমন এক গরু যা জমি চাষে ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয়নি, সুস্থ ও নিখুঁত। তারা বলল, এখন তুমি সত্য এনেছে যদিও তারা যবেহ করতে প্রস্তুত ছিল না, তবুও তারা এটাকে যবেহ্ করল। স্মরণ কর, যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করছিলে। তোমরা যা গোপন রাখছিলে, আল্লাহ্ তা ব্যক্ত করছেন। আমি বললাম, “এটার কোন অংশ দ্বারা ওকে আঘাত কর, এভাবে আল্লাহ্ মৃতকে জীবিত করেন এবং তার নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার। (২ বাকারাঃ ৬৭ – ৭৩)

    আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) উবাইদা সালমানী আবুল আলীয়া (র) মুজাহিদ আর সূদ্দী (র) ও প্রাচীনকালের অনেক আলিম বলেন, বনী ইসরাঈলের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল খুবই ধনী ও অতিশয় বৃদ্ধ। তার ছিল বেশ কয়েকজন ভাতিজা। তারা তার ওয়ারিশ হবার জন্যে তার মৃত্যু কামনা করছিল। তাই একরাতে তাদের একজন তাকে হত্যা করল এবং তার লাশ চৌরাস্তায় ফেলে রেখে এল। আবার কেউ কেউ বলেন, ভাতিজাদের একজনের ঘরের সামনে তা রেখে এল। ভোর বেলায় হত্যাকারী সম্বন্ধে লোকজনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। তার ঐ ভাতিজা এসে কান্নাকাটি করতে লাগল এবং তার উপরে জুলুম হয়েছে বলে অভিযোগ করতে লাগল। অন্য লোকজন বলতে লাগল, তোমরা কেন ঝগড়া করছ এবং আল্লাহর নবীর কাছে গিয়ে কেন এটার ফয়সালা প্রার্থনা করছ না? তাই মৃত ব্যক্তির ভাতিজা আল্লাহর নবী মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর কাছে আগমন করে তার চাচার হত্যার ব্যাপারে অভিযোগ করল। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাদেরকে আল্লাহ্ তাআলার শপথ দিয়ে বললেন, কেউ যদি এ বিষয়ে কিছু জানে তাহলে সে যেন বিষয়টি আমাকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটি লোকও পাওয়া গেল না, যে এ বিষয়ে জানে। তারা বরং মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে অনুরোধ করল তিনি যেন নিজ প্রতিপালককে এই বিষয়ে প্রশ্ন করে তা জেনে নেন। সুতরাং মূসা (আলাইহিস সালাম) আপন প্রতিপালকের নিকট তা জানতে চান।

    আল্লাহ্ তা’আলা মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে হুকুম দিলেন; যাতে তিনি তাদেরকে একটি গাভী যবেহু করতে আদেশ করেন। তিনি বললেনঃ

    (إِنَّ ٱللَّهَ یَأۡمُرُكُمۡ أَن تَذۡبَحُوا۟ بَقَرَةࣰۖ قَالُوۤا۟ أَتَتَّخِذُنَا هُزُوࣰاۖ

    অর্থাৎ – “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তারা প্রতি উত্তরে বলল, তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ? অর্থাৎ আমরা তোমাকে নিহত ব্যক্তি প্রসঙ্গে প্রশ্ন করছি আর তুমি আমাদের গরু যবেহ্ করার পরামর্শ দিচ্ছ? মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন, আমার কাছে প্রেরিত ওহী ব্যতীত অন্য কিছু বলার ব্যাপারে আমি আল্লাহ্ তা’আলার শরণ নিচ্ছি। তোমরা আল্লাহ তাআলাকে প্রশ্ন করার জন্যে আবেদন করেছ, আল্লাহ্ তা’আলা প্রশ্নের উত্তরে এটা বলেছেন। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), উবায়দা, মুজাহিদ, ইকরিমা, আবুল আলীয়া প্রমুখ বলেছেন, যদি তারা যে কোন একটি গাভী যবেহ করত তাহলে তার দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হত। কিন্তু তারা ব্যাপারটি জটিল করাতে তাদের কাছে এটা জটিল আকার ধারণ করেছিল। একটি মারফু হাদীসে এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে তবে এটার সূত্রে কিছু রয়েছে। অতঃপর তারা গরুটির গুণাগুণ, রঙ ও বয়স সম্পর্কে প্রশ্ন করল এবং তাদেরকে প্রতিপালক আল্লাহ্ তা’আলার পক্ষ থেকে এমনভাবে জবাব দেয়া হল যে, এরূপ গরু খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াল। তাফসীর গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। বস্তুত তাদেরকে একটি মধ্য বয়সী গরু যবেহ্ করার জন্যে হুকুম দেয়া হয়েছিল। অন্য কথায়, এটা বৃদ্ধও নয়, আবার অল্প বয়সীও নয়।

    এই অভিমতটি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু), মুজাহিদ, আবুল আলীয়া, ইকরামা, হাসান, কাতাদা (র) প্রমুখ তাফসীরবিদের। তারপর তারা নিজেদের জন্য সংকীর্ণতা ও জটিলতা ডেকে আনল। তারা গরুটির রং সম্বন্ধে প্রশ্ন করল। তাই তাদেরকে এমন লোহিতাভ হলুদ রং-এর কথা বলা হল, যা দর্শকদেরও আনন্দ দেয়। এই রংটি একান্তই দুর্লভ। এরপর তারা আরো সংকীর্ণতা ও জটিলতা সৃষ্টি করে বলল, হে মূসা! তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল যে, তা কোনটি? আমরা গরুটি সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছে করলে নিশ্চয়ই আমরা দিশা পাব।’ এই প্রসঙ্গে ইবন আবু হাতিম (র) ও ইবন মারদুওয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরাতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, ইসরাঈল যদি গরু সম্বন্ধে পরিচিতি লাভ করার ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ্ না বলত তাহলে কখনও তাদেরকে এ কাজ সম্পাদন করার জন্যে তাওফীক দেয়া হত না। তবে এ হাদীসের বিশুদ্ধতা সন্দেহমুক্ত নয়। আল্লাহ্ তা’আলাই অধিকতর জ্ঞাত।

    আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

    (قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا هِیَۚ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ لَّا فَارِضࣱ وَلَا بِكۡرٌ عَوَانُۢ بَیۡنَ ذَ ٰ⁠لِكَۖ فَٱفۡعَلُوا۟ مَا تُؤۡمَرُونَ ۝ قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا لَوۡنُهَاۚ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ صَفۡرَاۤءُ فَاقِعࣱ لَّوۡنُهَا تَسُرُّ ٱلنَّـٰظِرِینَ ۝ قَالُوا۟ ٱدۡعُ لَنَا رَبَّكَ یُبَیِّن لَّنَا مَا هِیَ إِنَّ ٱلۡبَقَرَ تَشَـٰبَهَ عَلَیۡنَا وَإِنَّاۤ إِن شَاۤءَ ٱللَّهُ لَمُهۡتَدُونَ ۝ قَالَ إِنَّهُۥ یَقُولُ إِنَّهَا بَقَرَةࣱ لَّا ذَلُولࣱ تُثِیرُ ٱلۡأَرۡضَ وَلَا تَسۡقِی ٱلۡحَرۡثَ مُسَلَّمَةࣱ لَّا شِیَةَ فِیهَاۚ قَالُوا۟ ٱلۡـَٔـٰنَ جِئۡتَ بِٱلۡحَقِّۚ فَذَبَحُوهَا وَمَا كَادُوا۟ یَفۡعَلُونَ)[Surat Al-Baqarah 68 – 71]

    অর্থাৎ মূসা বলল, তিনি বলছেন, ওটা এমন এক গরু যা জমি চাষে ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। সুস্থ, নিখুঁত। তারা বলল, এখন তুমি সত্য এনেছ। যদিও তারা যবেহ্ করতে উদ্যত ছিল না। তবুও তারা তা যবেহ্ করল। (সূরা বাকারাঃ ৬৮ – ৭১)

    উক্ত আয়াতে আরোপিত এ বৈশিষ্ট্যগুলো পূর্বের বৈশিষ্ট্যগুলোর তুলনায় আরো দুষ্প্রাপ্য ছিল। কেননা এতে শর্ত আরোপ করা হয়েছে যেন গরুটি জমি চাষ ও ক্ষেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার ফলে দুর্বল ও অসুস্থ না হয়ে থাকে, এবং তা যেন সুস্থ, সবল ও নিখুঁত হয়। এটি আবুল আলীয়া ও কাতাদা (র)-এর অভিমত। আয়াতে উক্ত: لا شية فيها এর অর্থ হচ্ছে এটার মধ্যে নিজস্ব রঙ ব্যতীত এতে যেন অন্য কোন রঙ এর মিশ্রণ না থাকে। বরং এটা যাবতীয় দোষ ও অন্য সব রঙয়ের মিশ্রণ থেকে যেন নিখুঁত হয়। যখন গরুটিতে উল্লেখিত শর্ত ও গুণসমূহ আরোপিত করা হল তখন তারা বলল, এখন তুমি সত্য এনেছ। কথিত আছে যে, তারা এসব গুণবিশিষ্ট গরুটি খোঁজাখুঁজি করে এমন এক ব্যক্তির কাছে এটাকে পেয়েছিল, যে ছিলেন অত্যন্ত পিতৃভক্ত। তারা তার কাছ থেকে গরুটি কিনতে চাইল, কিন্তু সে তাদের কাছে গরুটি বিক্রি করতে রাজি হল না। তারা তাকে অত্যন্ত চড়ামূল্য দিয়ে গরুটি খরিদ করল।

    সুদ্দী (র) উল্লেখ করেছেন, তারা প্রথমত গরুটির সম-ওজনের স্বর্ণ দিয়ে গরুটি ক্রয় করতে চায়। কিন্তু গরুর মালিক রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার ওজনের দশগুণ স্বর্ণ দিয়ে তারা গরুটি খরিদ করল। অতঃপর আল্লাহর নবী মূসা (আলাইহিস সালাম) এটাকে যবেহ করার নির্দেশ দিলেন। তারা গরুটি যবেহ করার ব্যাপারে প্রথমত ইতস্তত করছিল। পরে রাজি হল। এরপর আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে হুকুম আসল যেন তারা নিহত ব্যক্তিটিকে যবেহ কৃত গরুটির কোন অঙ্গ দ্বারা আঘাত করে। কেউ কেউ বলেন, উরুর গোশত দ্বারা আঘাত করার কথা বলা হয়েছিল; আবার কেউ কেউ কোমলাস্থি দ্বারা, আবার কেউ কেউ দুই কাঁধের মধ্যবর্তী গোশত দ্বারা আঘাত করার কথা বলা হয়েছিল বলে মত প্রকাশ করেন। যখন তারা মৃত ব্যক্তিকে ওটার দ্বারা আঘাত করল, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে পুনর্জীবিত করলেন এবং লোকটি উঠে দাঁড়াল। তার গলার শিরা থেকে রক্ত ঝরছিল। মূসা (আলাইহিস সালাম) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে তোমাকে হত্যা করেছে?’ সে বলল, আমার ভাতিজা। তার পর সে পূর্বের মত অবস্থায় ফিরে গেল।

    আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ

    (كَذَ ٰ⁠لِكَ یُحۡیِ ٱللَّهُ ٱلۡمَوۡتَىٰ وَیُرِیكُمۡ ءَایَـٰتِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ)

    ‘এভাবে আল্লাহ্ মৃতকে জীবিত করেন এবং তার নিদর্শন তোমাদের দেখিয়ে থাকেন যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পার।’ অর্থাৎ তোমরা যেমন আল্লাহ্ তা’আলার হুকুমে নিহত ব্যক্তির পুনর্জীবিত হওয়া প্রত্যক্ষ করলে, তেমনি আল্লাহ তা’আলা এক মুহূর্তে সমস্ত মৃতকে যখন ইচ্ছে তখন জীবিত করবেন।

    যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেনঃ

    (مَّا خَلۡقُكُمۡ وَلَا بَعۡثُكُمۡ إِلَّا كَنَفۡسࣲ وَ ٰ⁠حِدَةٍۚ )

    [Surat Luqman 28]

    অর্থাৎ—তোমাদের সকলের সৃষ্টি ও পুনরুত্থান একটি মাত্র প্রাণীর সৃষ্টি ও পুনরুত্থানেরই অনুরূপ।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleইসলাম ও বিজ্ঞান – প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    Next Article নতুন বিশ রহস্য – স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অসম্পূর্ণ বই
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026
    Our Picks

    রুদ্রসমগ্র – রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

    January 8, 2026

    রান্না খাদ্য পুষ্টি – সিদ্দিকা কবীর

    January 8, 2026

    শহর খুলনার আদি পর্ব – আবুল কালাম সামসুদ্দিন

    January 8, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }