৪. ইব্ন কাসীর (র)-এর জীবনী
ইবন কাসীর (র)-এর জীবনী
(ক) ব্যক্তি পরিচয়
তার নাম ইসমাঈল ইবন উমর ইবন কাসীর ইবন দূ ইবন কাসীর ইবন দিরা আলকুরায়শী। তাঁর খান্দানটি কুরায়শের বনী হাসালা শাখা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। সম্ভ্রান্ত গোত্ররূপে এ গোত্রটির খ্যাতি রয়েছে। তাদের বংশ লতিকা সংরক্ষিত রয়েছে।
আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক আল মিযযী এ বংশ লতিকার কিছু অংশ সম্পর্কে অবগতি লাভ করেছেন— যদ্দরুন তিনি আনন্দিত হন ও অনেকটা বিস্ময়বোধ করেন। এ জন্যে তিনি আমার বংশ তালিকায় ‘আল কুরায়শী’ উপাধি লেখা শুরু করেন।৪০ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ৩২।]
আমার নিকট এটি ইবন কাসীর (র)-এর বিশুদ্ধতম বংশ তালিকা। কারণ, ইবন কাসীর (র) তার ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান্ নিহায়া’তে নিজে এটি উদ্ধৃত করেছেন। এজন্যে তার নাম ও বংশ পরিচয়ে যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়ে থাকে সে সম্পর্কে আমরা আলোকপাত করবো না।৪১ [ইবন হাজর, আদদুররুল কামিনা, খঃ ১, পৃঃ ২৯৯, ৩৭৭। দাউদী, তাবাকাতুল মুফাসসিরীন, খঃ ১, পৃঃ ১১০। যাহাবীঃ তাবাকাতুল হুফফাজ পৃঃ ৫৭, যিরকানী আল–আলম, খঃ ১, পৃঃ ৩২০।] কারণ যার সম্পর্কে এসব বিবৃতি তার সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীতে অন্য সব তথ্য একেবারে গুরুত্বহীন।
জন্মঃ ৭০১ হিজরী সনে ইবন কাছীর (র) জন্মগ্রহণ করেন। যেমনটি ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে তিনি উল্লেখ করেছেন।৪২ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ২২।] এ থেকে তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে যে মতপার্থক্য ছিল তার নিরসন হল।৪৩ [ইবন কাসীর, উমদাতুত্ তাফসীর (আল মুকাদ্দামা) খঃ ১১, পৃঃ ২২। যারকানী, আল ইলাম, খঃ ১: পৃঃ ৩৭।] তাঁর জন্মস্থান ছিল ‘বুসরা’(বর্তমানে উযা হুরান নামে পরিচিত।)-এর অন্তর্গত ‘মিজদাল’ নামক জনপদে। ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে তাঁর জন্মস্থান ‘মুজায়দিল’ বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।৪৪ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১৪, পৃঃ ৩২।] যতদূর মনে হয় ভুলক্রমেই এমনটি লিখিত হয়েছে।
তাঁর পিতাঃ তার পিতা হলেন খতীব শিহাবউদ্দীন আবু হাফস উমর ইবন কাসীর। তিনি বসবাস করতেন বুসরা নগরীর পশ্চিমে অবস্থিত ‘শারকাবীন’ গ্রামে। বসরা ও শারকাবীনের দূরত্ব খুবই সামান্য। খতীব শিহাবউদ্দীন ৬৪০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতুল গোত্র বনু উকবায় তিনি বিদ্যার্জনে ব্রতী হন। তিনি চমৎকার কবিতা লিখতেন। বুসরার আন্নাকা অঞ্চলের বিদ্যালয়সমূহে তিনি লেখাপড়া করেন। তারপর বুসরার পূর্বদিকে অবস্থিত খিতাবা জনপদে চলে যান। তিনি শাফিঈ মাযহাব অবলম্বন করেন এবং ইমাম নওয়াবী ও ইমাম গাযারীর নিকট বিদ্যা শিক্ষা করেন। তিনি সেখানে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এরপর ফিরে আসেন ‘মিজদাল’-এ। এখানে তার বিবাহ হয়। আবদুল ওহহাব, আবদুল আযীয ও ইসমাঈল নামক তিন পুত্রের জন্মের পর তার কয়েকজন কন্যা সন্তানও জন্মগ্রহণ করে। এছাড়া ইউনুস ও ইদ্রীস নামক দুই পুত্রও জন্মগ্রহণ করে। ইবন কাসীরের পিতার একটি প্রসিদ্ধ জীবনালেখ্য ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।৪৫ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১৪, পৃঃ ৩৩।] ৭০৩ হিজরীতে মুজায়দিলে ইবন কাছীরের পিতার ইতিকাল হয়। তখন ইসমাঈল-এর বয়স প্রায় তিন বছর।
(২) শৈশব ও যৌবন
ইবন কাসীর (র)-এর সহোদর আবদুল ওহহাব ৭০৭ হিজরীতে সপরিবারে দামেশকে চলে যান। তাঁর সম্পর্কে ইবন কাসীরের মন্তব্য, “তিনি আমাদের সহোদর এবং আমাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহবৎসল ছিলেন।”৪৬ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১৪, পৃঃ ৪৮।] ইবন কাসীর (র) হিজরী ৮ম শতাব্দীতে মামলুক সুলতানদের শাসনামলে তার যৌবনকাল অতিবাহিত করেন। তাতারীদের আক্রমণ, একাধিক দুর্ভিক্ষ, হৃদয়বিদারক দুর্যোগগুলো তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। তখন দুর্ভিক্ষে লক্ষ-লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে। তিনি ফিরিঙ্গীদের সাথে সংঘটিত ক্রুসেড যুদ্ধগুলোও দেখেছেন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের প্রতিষ্ঠা, শাসকদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি তাঁর সম্মুখেই সংঘটিত হয়। এতদসত্ত্বেও এ যুগে শিক্ষা-দীক্ষা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধনের প্রবল উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। আমীর-উমারাদের আগ্রহ এবং বিজ্ঞজন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে অকাতরে দান করার কারণে প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বহুসংখ্যক গ্রন্থ রচিত ও সংকলিত হয়।
মৃত্যুঃ ৭৭৪ হিজরী সনে ২৬শে শা’বান বৃহস্পতিবার তার ইনতিকাল হয়। তার জানাযায় বহুসংখ্যক লোকের সমাগম ঘটে। তার ওসীয়ত অনুসারে তার সর্বশেষ আবাসস্থল সূফীদের গোরস্থানে শায়খুল ইসলাম তকী উদ্দীন ইবন তাইমিয়্যা (র)-এর কাছে তাকে দাফন করা হয়। যা দামেশকের বাব আন-নাসর-এর সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত।
(৩) তার শিক্ষকবৃন্দ
ইবন কাসীর (র) প্রখর মেধাশক্তির অধিকারী ছিলেন। দশ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তিনি কুরআন মজীদ কণ্ঠস্থ করে নিয়েছিলেন। শায়খ নূরুদ্দীন আলী ইবন ইবনুহীজা কুরকী শাওবাকী দিমাশকী শাফিঈ (মৃত্যুঃ ৭৩০ হিঃ)-এর ওফাত উপলক্ষে ইবন কাছীর (র) লিখেছেন, “কুরআন হিফজ ও কিতাব অধ্যয়নে তিনি আমাদের সহপাঠী ছিলেন। আমি ৭১১ হিজরীতে কুরআন খতম করি।’৪৭ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃ ১৫৬, ৩২৬।]
শত শত শায়খের নিকট তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে তিনি যাদের দ্বারা প্রভাবিত হন এবং যাদের তিনি অনুসরণ করেন তাদের সংখ্যা খুবই অল্প ছিল। এদের মধ্যে শায়খ তকী উদ্দীন ইবন তাইমিয়া সর্বাগ্রগণ্য। কারণ তাঁর সাথে ইবন কাছীর (র)-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ইবন কাসীর তার অভিমত অনুসরণ করতেন এবং তালাকের মাসআলায় তার মতানুযায়ী ফতোয়া দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিপদেও পড়েছিলেন এবং কষ্টও ভোগ করেছেন। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইবন কাসীর (র)-এর লিখিত তথ্য সূত্রে আমরা তা জানতে পারি। হিজরী ৮ম শতাব্দীর প্রথমার্ধের বড় বড় ঘটনার বর্ণনায় এ তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইতিহাস শাস্ত্রে তিনি সিরিয়ার ইতিহাসবিদ কাসিম ইবন মুহাম্মদ বিরলী (মৃত্যু ৭৩৯ হিঃ) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কাসিম ইবন মুহাম্মদ (র)-এর ইতিহাস গ্রন্থ যা মূলত শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু শামা মাকদেসী-এর ইতিহাস গ্রন্থের পরিশিষ্ট। ইবন কাসীরের ইতিহাস গ্রন্থে উপরোল্লেখিত গ্রন্থের সবিশেষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
হাদীস শাস্ত্রে তার উপর প্রভাব বিস্তার করেছেন শায়খ মিযযী ইউসুফ ইবন আবদুর রহমান জামালুদ্দীন (মৃত্যু ৭৪৪ হিঃ)। তিনি সে যুগে গোটা মিসরে স্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন। ‘তাহযীবুল কামাল’ গ্রন্থটি তাঁর রচিত। ইবন কাছীর (র) শায়খ ‘মিযযী’-এর অধিকাংশ গ্রন্থ তাঁর কাছে অধ্যয়ন করেন। ইবন কাসীর (র) উক্ত শায়খের এতই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য অর্জন করেছিলেন যে, শায়খের কন্যা ‘যায়নাব’কে তিনি বিবাহ করেন। তিনি হাদীসশাস্ত্র ও রাবীদের জীবনী সম্পর্কে শায়খ মিযযী থেকে প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন।৪৮ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ২০৩, ২০৪। ইবন হাজর, আদদুরারুল কামিনা, খঃ ৪, পৃঃ ৪৫৭।] তিনি অংক শাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেন উস্তাদ ‘হাযরী’ থেকে।৪৯ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ১৫৬।]
ইবন কাসীর (র)-এর আরো কতিপয় শিক্ষক
(১) জনাব ইজুদ্দীন আবু ইয়া’লা, হামযা ইবন মুআইয়িদুদ্দীন আবুল মা’আলী, আস’আদ ইবন ইজ্জুদ্দীন আবু গালিব মুযাফফর ইবনুল ওযীর আত তামীমী দামেশকী ইবনুল কালানসী (মৃঃ ৭২৯ হিঃ)। ইনি মুহাদ্দিস ছিলেন। নেতৃত্বের গুণাবলীও তাঁর মধ্যে ছিল। ৭১০ হিজরী সনে তিনি মন্ত্রীত্ব লাভ করেছিলেন।৫০ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ১৫৩।]
(২) ইব্রাহীম ইবন আবদুর রহমান গাযারী। ইবন কাসীর (র) তাঁর নিকট শাফিঈ মাযহাবের দীক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ তাঁর কাছে অধ্যয়ন করেন।৫১ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃষ্ঠা ১৫২।]
(৩) নাজমুদ্দীন ইবনুল আসকালানী (র)। ৯টি মজলিসে ইবন কাসীর (র) তাঁর নিকট সহীহ মুসলিম অধ্যয়ন করেন।
(৪) শিহাবুদ্দীন আলহিজার ওরফে ইবন শাহনা। আশরাফিয়া দারুল হাদীসে তিনি হাদীসের প্রায় ৫০০টি পুস্তিকা(جزء) অধ্যয়ন করেন। ৭৩০ হিজরীতে তাঁর ইনতিকাল হয়। তার নাম ছিল আহমদ ইবন আবু তালিব।
(৫) কামালুদ্দীন ইবন কাযী শাহবাহ্, তাঁর নিকট ইবন হাজিব রচিত উসূল বিষয়ক গ্রন্থ ‘মুখতাসার’ পাঠ করেন।
(৬) শায়খ নাজমুদ্দীন মূসা ইবন আলী ইবন মুহাম্মদ জীলী দামেশকী। ইনি বিদগ্ধ জ্ঞানীজন এবং লেখক ছিলেন। ইবনুল বাসীস নামে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। লিপি বিদ্যায় উস্তাদ এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞ বলে তিনি বিবেচিত হতেন। ৭১৬ হিজরী সনে তাঁর মৃত্যু হয়।
(৭) শায়খ হাফিজ ও ইতিহাসবিদ শামসুদ্দীন যাহাবী মুহাম্মদ ইবন আহমদ কায়মায- তাঁর নিকটও তিনি শিক্ষা লাভ করেন। ৭৪৮ হিজরী সনে তাঁর মৃত্যু হয়।
(৮) নাজমুদ্দীন মূসা ইবন আলী ইবন মুহাম্মদ, তিনি একাধারে শায়খ এবং উচ্চমানের কবি ছিলেন। ৭১৬ হিজরীতে তিনি ইনতিকাল করেন।
(৯) কাসিম ইবন আসাকির, ইবন শীরাযী, ইসহাক আসাদী মিসর থেকে তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন আবু মূসা কুরাফী এবং আবুল ফাতাহ্ দারূসী।
তাঁর জ্ঞান গরিমার স্বীকৃতি
এমন একজন মানুষ যিনি তাঁর সমসাময়িক যুগের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবিদ, হাদীসবিশারদ, তাফসীরকারগণ এবং অংক শাস্ত্রবিদগণের কাছে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছেন, এ ধরনের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষ খুব কমই দেখা যায়।
দাউদী তাঁর প্রশংসা করেছেন এভাবে- “আমরা যাদেরকে পেয়েছি তাদের মধ্যে ইবন কাসীর (র) হাদীসের মূল পাঠ কণ্ঠস্থকারীদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন এবং হাদীসের উৎস, পরিচিতি, রিজাল পরিচিতি এবং শুদ্ধাশুদ্ধ বিচারে বিজ্ঞতম ব্যক্তি। তাঁর সমকালীন বিদগ্ধজন ও তার শায়খগণ তাঁর স্বীকৃতি দিতেন। ফিকাহ ও ইতিহাস শাস্ত্রের বহু কিছু তার নখদর্পণে ছিল। তিনি যা শুনতেন তা খুব কমই ভুলতেন। তিনি গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী উত্তম ফিকাহবিদ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। আরবী ভাষার আলোচনায় তিনি সার্থকভাবে অংশ নিতেন। কবিতা রচনা করতেন। আমি বহুবারই তাঁর কাছে গিয়েছি কিন্তু কোন বার কিছু না শিখে এসেছি বলে আমার মনে পড়ে না।”৫২ [দাউদী, তাবাকাতুল মুফাসসিরীন, খঃ ১৪, পৃঃ ১১১।]
ইবন কাসীর (র)-এর প্রশংসা বর্ণনায় হাফিজ যাহাবী (র) বলেনঃ “তিনি হাদীসসমূহের উৎস নির্ণয় করেছেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করেছেন, গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাফসীর গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং এসব ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।”৫৩ [যাহাবী, তাবাকাতুল হুফফায, খঃ ৪, পৃঃ ২৯।] ‘আল মু’জামুল মুখতাস’ গ্রন্থে বলেছেন, “তিনি ফতোয়াবিশারদ ইমাম, প্রাজ্ঞ ও প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ, বিজ্ঞ ফকীহ এবং হাদীসের বরাত সমৃদ্ধ তাফসীরে সিদ্ধহস্ত।”
আবুল মুহসিন হুসাইনী (র) বলেছেন, “তিনি একই সাথে ফতোয়া দিয়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন, তর্কযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, ফিকাহ, তাফসীর ও ব্যাকরণ শাস্ত্রে নতুন রচনাশৈলী উদ্ভাবন করেছেন এবং হাদীস বর্ণনাকারী ও হাদীসের সত্যাসত্য বিচারের ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।৫৪ [আবুল মাহাসিন আল হুসায়নি, যায়লু তাযকিরাতুল হুফফায, পৃঃ ৫৮।]
আল্লামা সুয়ূতী (র) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “তাঁর তাফসীর গ্রন্থটি অভূতপূর্ব, তাঁর পদ্ধতিতে আর কোন তাফসীর গ্রন্থ সংকলিত হয়নি।”৫৫ [সুয়ূতী, যায়লু তাবাকাতিল হুফফাজ, পৃঃ ২২।]
গবেষণামূলক বিষয়াদিতে যেমন, ইতিহাসবিদ, তাফসীরকার এবং হাদীস বিশারদরূপে তিনি সামাজিক জীবনে এবং চিন্তার জগতে রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। আল্লামা যাহাবী (র)-এর পর তিনি উম্মুস্সা’ওয়াত তানাককুরিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।৫৬ [আলহাসানী, যায়লু তাযকিরাতিল হুফফাজ পৃঃ ৫৮। ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ১৮২, প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৭৫।] তিনি ‘নুজায়বিয়ায়’ শিক্ষকতা করেন এবং ৭৪৮ হিজরী সনে ফাওকানী বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন।
দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি সিরিয়ার নায়েবে সুলতানের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং সাইপ্রাসবাসীদের ভীতি প্রদর্শন ও শাস্তির ঘোষণা প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন।৫৭ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ৩২৯।] অন্যত্র তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনি খলীফার সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং খলীফা তাঁকে বিনয়ী, বিচক্ষণ ও মিষ্টভাষী বলে প্রশংসা করেছিলেন।৫৮ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ২৫৭।]
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
অধঃপতনের যুগে রাজনৈতিক বিষয়াদিতে উলামা-মাশায়েখদের পরস্পর বিরোধী ভূমিকার কারণে দলীল-প্রমাণের প্রতি জনসাধারণের বীতশ্রদ্ধ ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। তাই ফতোয়া প্রার্থী সংশ্লিষ্ট ফতোয়ার সাহায্যে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা আন্দোলন সংগঠিত করবে এমন আশংকায় তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফতোয়া দানে বিরত থাকেন। যেমন কাযীর বিরুদ্ধে ফতোয়া দানে তিনি বিরত থাকতেন। কারণ ফতোয়া দ্বারা প্রশাসনকে বিব্রত করা হয়।৫৯ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ২১৬।]
অস্থিরতার এই যুগে রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের রায় ঘোষণার ব্যাপারে তিনি যতটুকু রক্ষণশীল ছিলেন, অন্যদের সাথে মিলেমিশে কাজ করার ব্যাপারে তিনি ততটুকু উদার ও অকুণ্ঠ ছিলেন। হারীরিয়্যা তরীকার সাথে সংশ্লিষ্ট ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনকারী আবদুল্লাহ আল মুলাতী থেকে হাদীস বর্ণনা করাকে তিনি স্বভাবগতভাবে এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে অপছন্দ করতেন।৬০ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃষ্ঠা ৩২৭।]
খ. রচনাবলী
ইবন কাসীর (র) বিশেষত ইতিহাস, তাফসীর এবং হাদীস বিষয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও পাণ্ডুলিপি আকারে বহু গ্রন্থ রয়েছে।
(১) প্রকাশিত গ্রন্থরাজি
(১) আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়াঃ এটির জন্যেই আমরা এই ভূমিকা লিখছি। এটি ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ। ১৪ খণ্ডে সমাপ্ত। শেষ দুখণ্ড শেষ যুগের ফিতনা-ফাসাদ ও যুদ্ধবিগ্রহ বিষয়ক। ইবন কাসীর (র) তাঁর ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, “শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু শামা মাকদেসীর ইতিহাস গ্রন্থের পরিশিষ্ট স্বরূপ আমাদের শায়খ হাফিজ ইলমুদ্দীন বিরযালী যে ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছেন এটি তার পরিশিষ্ট। তার ইতিহাস গ্রন্থের পরিশিষ্ট স্বরূপ এযুগ পর্যন্ত ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ আমি এ গ্রন্থে সংযোজিত করেছি। তার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো চয়ন করার কাজ আমি শেষ করেছি ৭৫১ হিজরী সনে। হযরত আদম (আ) থেকে আমাদের এ যুগ পর্যন্ত তিনি যা লিখেছেন তা এখানে এসে শেষ হয়েছে।৬১ [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ১৯৪।]
কিন্তু ৭৩৮ হিজরীর পর থেকে ৭৫১ হিজরী পর্যন্ত সময়কালে বিরযালীর সংগহীত কোন তথ্য সম্পর্কে আমি অবগত হইনি।৬২ [আমাদের সম্মুখে উপস্থিত গ্রন্থে আমরা এই বর্ণনাভঙ্গি লক্ষ্য করি।
(ক) ইবন আসাকিরের (মৃত্যু ৫৭১) দামেশকের ইতিহাস (تا ريخ دمشق)
(খ) আবু শামা (মৃত্যু ৬৬৫) রচিত দামেশকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস (اختصار تاريخ دمشق)
(গ) বিরজালী (মৃত্যু ৭৩৯) রচিত দামেশকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের পরিশিষ্ট (ذيل اختصا تاريخ دمشق)।
(ঘ) ইবন কাসীর (মৃত্যু ৭৭৪) রচিত, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (البداية والنهاية )
(ঙ) শিহাবুদ্দীন ইবন হাজী (মৃঃ ৮১৬) রচিত, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-এর পরিশিষ্ট (ذيل البداية والنهاية) আমার ধারণা, এটিই তাঁর পূর্বতন আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থ।) ইবন কাসীর তার ইতিহাস গ্রন্থের অনুসরণ করে ৭৬৮ হিজরী সন পর্যন্ত পৌঁছান অর্থাৎ তার মৃত্যুর ৬ বছর পূর্ব পর্যন্ত ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। সুতরাং বলা যায় যে, ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থটি শায়খ শিহাবুদ্দীন আবু শামা মাকদেসীর (মৃঃ ৬৬৫ হিঃ) ইতিহাস গ্রন্থের পরিশিষ্টের পরিশিষ্ট।৬৩ [ইনি হলেন শিহাবুদ্দীন আবদুর রহমান ইবন ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম ইবন উছমান ইবন আবু বকর ইবন আব্বাস, আবু মুহাম্মদ আল মাকদেসী। তিনি ছিলেন একাধারে ইমাম, আলিম, হাফিজ, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও ইতিহাসবিদ। তিনি আবু শামা নামে প্রসিদ্ধ। তিনি দারুল হাদীস আল আশরাফিয়া–এর শায়খ এবং রুকনিয়াহ মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ হল বহু খণ্ডে সমাপ্ত ইখতিসার তারিখে দামিশক [বিরযালী (র) এ গ্রন্থেরই পরিশিষ্ট রচনা করেছেন], শরহুশ শাতিবিয়্যাহ, আররাদ্দু ইলাল আমীরিল আউয়াল, আল মাবআছ, আল ইসরা, আররাওদাতায়ন ফীদ দাউলাতায়ন আসসালাহিয়্যাহ্ ওয়ান নূরিয়্যাহ। ৫৯৯ হিজরীতে তার জন্য ‘আররাওদাতায়ন’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট রূপে তিনি আরও কিছু তথ্য সংযোজন করেছেন। তিনি হাদীস এবং ফিকাহ্ অধ্যয়ন করেছেন ফখর ইবন আসাকির ও ইবন আবদুস সালাম (র) থেকে। তিনি মুজতাহিদের স্তরে উন্নীত হয়েছিলেন। কবিতাও রচনা করেছেন। অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে তার মৃত্যু হয়। ৬৬৫ হিজরী সনে তার বাসগৃহে তাকে দাফন করা হয়।]
সুতরাং এই কিতাবের বুনিয়াদ ও ভিত্তি হল শায়খ আবু শামা মাকদেসীর ইতিহাস গ্রন্থ, এটিতে রয়েছে ৬৬৫ হিজরী পর্যন্ত সময়কালের তথ্য। তার পরবর্তী অংশের ভিত্তি হল বিরযালীর ইতিহাস গ্রন্থ।৬৪ [বিরযালী হলেন, ইলমুদ্দীন আবু মুহাম্মদ আল কাসিম ইবন মুহাম্মদ ইবন বিরযালী। সিরিয়ার ইতিহাসবিদ। শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী। ৬৬৫ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ যে বছর শায়খ আবু শামা মাকদেসী ইনতিকাল। করেন সে বছর বিরযালীর জন্ম হয়। ৭৩৯ হিজরীতে তিনি ইনতিকাল করেন। তখন তিনি ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। অতঃপর তাকে গোসল দেওয়া হয় এবং কাফন পরানো হয়। এক হাজারেরও অধিক শায়খ ও আলিম তার লাশ বহন করে নিয়ে যান। আন নূরিয়া মাদ্রাসায় তিনি শায়খুল হাদীস ছিলেন। তাঁর কিতাবগুলো এই প্রতিষ্ঠানের জন্যে তিনি ওয়াকফ করে দেন। [ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃঃ ১৯৬–৯৭] এটি হল ৭৩৮ হিজরী সন পর্যন্ত, অর্থাৎ তার মৃত্যুর এক বছর পূর্ব পর্যন্ত। তারপর তথ্য সন্নিবেশিত করলেন ইবন কাসীর (র) ৭৬৮ হিজরী সন পর্যন্ত। অবশ্য ‘আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থটি হুবহু আবু শামার গ্রন্থ নয়। কারণ, ইবন কাসীর (র) ছিলেন আবু শামা–এর ইতিহাস গ্রন্থ এবং বিরযালীর ইতিহাস গ্রন্থের পরিশোধন ও পরিমার্জনকারী। ইবন কাসীর (র) বলেন, “তার ইতিহাস–গ্রন্থ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো চয়ন করার কাজ শেষ করি ৭৫১ হিজরী সনের জুমাদাল উখরার ২০ তারিখ বুধবারে।”৬৫[ইবন কাসীর, আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ১৪, পৃষ্ঠা ১৯৪, তাঁর সংকলন ‘আলমুকতাফা লি তারীখে আবীশামা’ এটিকে তিনি আবু শামা রচিত ইতিহাস গ্রন্থ “আর রাওপাতায়ন’-এর সাথে সংযোজন করেছেন। জুরজী যায়দান তার তারীখে আদাবিল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে এরূপ উল্লেখ করেছেন। তাতে ৭২০ হিজরী পর্যন্ত কালের ঘটনাবলী তিনি বিবৃত করেছেন। ‘কুপরিলীতে’ এর একটি কপি রয়েছে। কায়রোর আন্তর্জাতিক আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাণ্ডুলিপি বিভাগে এর একটি ফটো কপি রয়েছে। তার শিষ্য তকীউদ্দীন ইবন রাফি সালামী (মৃত্যু ৭৭৪ হিঃ) ‘আল ওফিয়াতে’ এর একটি পরিশিষ্ট লিখেছেন। ‘দারুল কুতুব আলমিসরিয়াতে’ এর একটি কপি রয়েছে।]
তিনি তাঁর এই গ্রন্থটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেনঃ
(১) প্রথম অংশে রয়েছে আরশ-কুরসী, আসমান-যমীন ও এগুলোর মধ্যে যা আছে তা সৃষ্টির ইতিহাস এবং আসমান-যমীনের মধ্যবর্তী যা আছে সেগুলো সৃষ্টির ইতিহাস। অর্থাৎ ফেরেশতাকুল, জিন, শয়তান ইত্যাদির বর্ণনা। আরও রয়েছে হযরত আদম (আ)-এর সৃষ্টি, আম্বিয়া-ই কেরামের ঘটনাবলী, ইসরাঈলীদের বিবরণ এবং আইয়ামে জাহিলিয়াতের ঘটনাবলীসহ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুওত লাভ পর্যন্ত কালের ঘটনাবলী।
(২) দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে নবী করীম (সা)-এর ওফাতের পর থেকে ৭৬৮ হিজরী পর্যন্ত।
(৩) তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিতব্য অশান্তি, বিপর্যয়, কিয়ামতের আলামতসমূহ, পুনরুত্থান, হাশর-নশর, কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ অবস্থা ও জান্নাত-জাহান্নামের বিবরণ।
ইতিহাস গ্রন্থ সংকলনে তিনি তাঁর পূর্বে সংকলিত ইতিহাস গ্রন্থগুলোর তথা তারীখে তাবারী, তারীখে মাসউদী ও তারীখে ইবনিল আছীর ইত্যাদি গ্রন্থের রীতি অনুসরণ করেছেন। ঘটনাবলী তিনি বছরওয়ারী বর্ণনা করেছেন। এগুলো বর্ণনায় তিনি বিভিন্ন শিরোনাম ব্যবহার করেছেন। প্রথমে তিনি বছরের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন। তারপর ঐ বছর যারা ইনতিকাল করেছেন তাঁদের জীবনী আলোচনা করেছেন। কবিতার উদ্ধৃতি আছে প্রায় সব পৃষ্ঠাতেই। অনেক সময় তাঁর স্বরচিত কবিতা কিংবা প্রাসঙ্গিক কুরআনুল করীমের আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
এই গ্রন্থটি বহুবার মুদ্রিত হয়েছে। আমার মনে হয় এর প্রাচীনতম মুদ্রণ হল ১৩৪৮ হিজরীর মুদ্রণটি। বাদশাহ আবদুল আযীয ইবন আবদুর রহমান আল সউদ এটি মুদ্রণ ও প্রকাশে আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছিলেন। আসতানাতে অবস্থিত ওলীউদ্দীন লাইব্রেরীতে রক্ষিত কপি থেকে কুর্দিস্তান আল আলামিয়া প্রেসে এটি মুদ্রিত হয়েছিল।
দ্বিতীয়বার মুদ্রিত হয়েছিল কায়রোর আসসা’আদাহ ছাপাখানায় ১৩৫১ হিজরীতে। তারপর দুই খণ্ডে আলাদা-আলাদা ছাপা হয় মিসরে। অনুরূপভাবে শায়খ ইসমাঈল আনসারী কর্তৃক পরিমার্জিত রূপে রিয়াদে ছাপা হয় ১৩৮৮ হিজরী সনে, তবে এ সকল মুদ্রণে বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। এ জন্যে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিশোধন করে বর্তমান মুদ্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ প্রসংগে আমরা উল্লেখ করতে পারি যে, শিহাবুদ্দীন ইবন হুযযী (ওফাত ৮১৬ হিঃ) “আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট গ্রন্থ রচনা করেছিলেন ৭৪১ হিজরী থেকে ৭৬৯ হিজরী সন পর্যন্ত সময়কালের ঐতিহাসিক তথ্যাদি সন্নিবেশিত করে। বার্লিনে তার একটি কপি রয়েছে।
আমরা এ বিষয়ে ঐতিহাসিক জুরজী যায়দানের একটি অভিমতের বিরোধিতা করি। তিনি বলেছেন যে, ‘বিরযালী’ রচিত ‘আল মুকতাফা লি তারীখে আবী শামাহ’ গ্রন্থটি ইবন আসাকির রচিত ‘ইখতিসারু তারীখ-ই-দামিশক’ গ্রন্থের পরিশিষ্ট। জুরজী যায়দান উল্লেখ করেছেন যে, আররাওদাতাইন ফী আখবারে দাওলাতাইন আসসিলাহিয়্যাহ ওয়ান নুরিয়্যাহ্’ গ্রন্থের সাথে ‘আল মুকতাফা লি তারীখে আবী শামাহ্’-এর সম্পর্ক রয়েছে তা সঠিক নয়।
যেহেতু ইবন আসাকীর-এর ইতিহাস গ্রন্থটি হল এ সিরিজের মূল ভিত্তি যা সর্বমহলে সুপরিচিত। ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-ই যেহেতু এই ভিত্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত, তাই ইবন আসাকির সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার— যদিও এখানে তার আলোচনা খুব একটা প্রাসংগিক নয়।
তিনি, ইবন আসাকির, হাফিজ আবুল কাসেম আলী ইবন আবু মুহাম্মদ হাসান ইবন হিবাতুল্লাহ ওরফে ইবন আসাকির দিমাশকী। তার উপাধি ছিল সেকাতুদ্দীন। তিনি সিরিয়ার মুহাদ্দিছ, শাফিঈ মাযহাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফকীহ্। কোন কোন সফরে তিনি সামআনীর সফরসঙ্গী ছিলেন। দামেশকের নূরিয়া মাদ্রাসায় অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। তার রচিত ‘তারীখে দিমাশক’ গ্রন্থের জন্যে তিনি সমধিক খ্যাতি লাভ করেন। খতীব আবু বকরের ‘তারীখ-ই বাগদাদ’ গ্রন্থের রচনা-রীতি অনুসরণে ইবনে আসাকির ৮০ খণ্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থটি সংকলন করেছেন। তাতে তিনি ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকে তাঁর সমসাময়িক কাল পর্যন্ত দামেশকে বসবাসকারী এবং দামেশকে আগত গুরুত্ত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, রাবীগণ, মুহাদ্দিসগণ, হাফিজগণ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের জীবনী আলোচনা করেছেন। দামেশকের “মাজমা আল ইলমী আল-আরবী”-এর অর্থানুকল্যে এ গ্রন্থের কতক অংশ প্রকাশিত হয়েছিল আর কতক অংশ প্রকাশিত হয়েছিল দামেশকের ‘রাওদাতুশ শাম” প্রকাশনালয়ের সহায়তায়।
এই গ্রন্থের কয়েকটি পরিশিষ্ট গ্রন্থ রয়েছে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলঃ
মূল রচয়িতা ইবন আসাকির (র)-এর পুত্র আলকাসিম রচিত পরিশিষ্ট।
সদরুদ্দীন বাকরী-এর রচিত পরিশিষ্ট।
উমর ইবন হাজিব রচিত পরিশিষ্ট।
আলোচ্য গ্রন্থের কয়েকটি সার-সংক্ষেপ গ্রন্থ রয়েছে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলঃ
ইখতিসারে আবী শামা, এটির পরিশিষ্ট লিখেছেন বিরযালী এবং পরবর্তী অংশ ইবন কাসীর (র)।
‘লিসানুল আরব’ গ্রন্থ প্রণেতা জামালউদ্দীন ইবন মানযূর রচিত সংক্ষিপ্তসার। ইসমাঈল আজলূযী আল-জার্রাহ্ কৃত সংক্ষিপ্তসার।
ইখতিসার-ই শায়খ আবুল ফাতহ আল খাতীব (ওফাত ১৩১৫ হিঃ)।
ইবন কাসীর (র)-এর অন্যান্য রচনা
(২) তাফসীরুল কুরআনিল কারীম (তাফসীরে ইবন কাসীর)
এটি প্রথমে ছাপা হয় বুলাকে, কানূজীর ‘ফাতহুল বয়ানের’ পার্শ্বটীকা রূপে এটি প্রকাশিত , হয়েছিল ১০ খণ্ডে। পুনরায় ছাপা হয় ১৩০০ হিজরীতে সাইয়িদ আবু তায়্যিব সিদ্দীক ইবন হাসান খান রচিত ‘মাজমাউল বয়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন’ গ্রন্থের পার্শ্বটীকা স্বরূপ। ১৩৪৩ হিজরীতে এটি নাজদ ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের ইমাম সুলতান আবদুল আযীয ইবন আবদুর রহমান আল ফায়সাল-এর নির্দেশে মিসরের আল মানার ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়। এটির পার্শ্বটীকায় ছিল ইমাম বগভী (র) রচিত তাফসীর। পরে সংক্ষিপ্ত আকারে “উমদাতুত্ তাফসীর আনিল হাফিজ ইবন কাছীর” নামে ১৯৫৬ খৃস্টাব্দ/১৩৭৫ হিজরীতে পুনঃপ্রকাশিত হয়। এটি ৫টি খণ্ডে মুদ্রিত হয়। তাফসীর নং ১৬৮ ক্রমিক নম্বরে ৭ খণ্ডে সুন্দর হস্তাক্ষরে লিখিত মাকতাবাতুল আযহারিয়ায় রক্ষিত পান্ডুলিপি থেকে এটি মুদ্রিত হয় ৮২৫ হিজরীতে। মুহাম্মদ আলী সূফী এটির কপি করে দিয়েছিলেন। আমার জানা মতে এটি উৎকৃষ্টতম ছাপা।
ইবন কাসীর (র) কুরআন করীমের তাফসীর কুরআনের আয়াত দ্বারা, অতঃপর হাদীস দ্বারা এই নীতির অনুসরণ করেছেন। ইসরাঈলীদের মনগড়া বর্ণনাগুলোর তিনি সমালোচনা করেছেন। এগুলোর প্রতি তার কোন আস্থা ছিল না। তবে শরীয়ত যেগুলো সমর্থন করে, সেগুলো ব্যতিক্রম। তিনি তাফসীর গ্রন্থের সাথে ‘ফাযায়েলুল কুরআন’ও সংযুক্ত করে দিয়েছেন। যা ১৩৪৮ হিজরীতে স্বতন্ত্রভাবে মিসরে ছাপা হয়েছিল। অতঃপর তার তাফসীরের সাথে পুনরায় ছাপা হয়।
(৩) আল ইজতিহাদ ফী তামাবিল জিহাদ
দারুল কুতুব আলমিসুরিয়্যাতে এর একটি অশুদ্ধ কপি সংরক্ষিত আছে। ‘আলমাখতূতাত ইন্সটিটিউটে’ এর ফটোকপি মজুদ আছে। এ কিতাবটি অতি সাধারণভাবে কোন প্রকারের পরিশোধন পরিমার্জন ব্যতীত প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল বহু ভুল ও বিকৃতি। ১৩৪৭ হিজরী সনে ‘আবুল হাওল’ প্রেসে এটি মুদ্রিত হয়। তবে পরিশোধিত ও পরিমার্জিত প্রকাশনা হল ১৪০১ হিজরী মুতাবিক ১৯৮১ খৃস্টাব্দে বৈরুতে প্রকাশিত মুদ্রণটি। আবদুল্লাহ আবদুর রহীম উসায়লীন এই মুদ্রণের তত্ত্বাবধান করেন।
সিরিয়ার নায়েবে সুলতান আমীর মুনজাক ইবন আবদুল্লাহ্ সায়ফুদ্দীন আল ইউসুফীর (ওফাত-৭৭৬ হিঃ) আগ্রহ পূরণার্থে ইবন কাসীর (র) এ গ্রন্থটি সংকলন করেছিলেন। এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত রয়েছে হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুসলিম ও ক্রুসেডারদের যুদ্ধ বিগ্রহের বর্ণনা। সেই যুগের বর্ণনা যে যুগে ইবন কাসীর (র) জীবন যাপন করেছিলেন। ইতিহাস শাস্ত্রে এটি একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থরূপে বিবেচিত হয়। কারণ, সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলী এই গ্রন্থে সত্যতা ও বিশ্বস্ততার সাথে বর্ণিত হয়েছে। তিনি তার এ গ্রন্থটি একটি ভূমিকা দ্বারা শুরু করেন। এতে তিনি জিহাদে উদ্বুদ্ধকারী কুরআনের আয়াতসমূহ এবং এরপর এ বিষয়ক হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন। মোট ১৩টি হাদীস তিনি এখানে সন্নিবেশিত করেছেন। তারপর ক্রুসেডার ও মুসলমানদের মধ্যকার যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর আলেকজান্দ্রিয়া সীমান্তে ফিরিঙ্গীদের আগ্রাসী আক্রমণ এবং মুসলমানদের প্রতিরোধের কথা বর্ণনা করেছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগ থেকে শুরু করে খিলাফতে রাশেদা ও তার পরবর্তী যুগের সিরিয়ায় মুসলমানদের ‘জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ্’-এর জন্যে অবিরাম প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। ফিরিঙ্গীদের বায়তুল মুকাদ্দাস দখল এবং সালাহউদ্দীন আয়ুবী কর্তৃক তা পুনরুদ্ধারের ইতিহাস এবং গাযা, নাবলুস, আজলূন, কুর্ক, গাওর, শাওবাক ও সাফাদ অঞ্চল পুনরাধিকারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন।
(৪) ইখতিসার–ই–উলুমিল হাদীস
এটি হাদীসের পরিভাষা বিষয়ক একটি পুস্তিকা। “আল-বাইছুল হাছীছ ইলা মা’রিফাতি উলুমিল হাদীস” শিরোনামে আহমদ মুহাম্মদ শাকির এটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। এটা হচ্ছে ইবন কাসীর (র) কৃত ইবন সালাহ-এর মুকদ্দিমা’ গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত সার। এ গ্রন্থের কয়েকটি মুদ্রণ হয়।
(ক) ১৩৫৩ হিজরী সনে শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রাযযাক হামযার পরিশোধন সহকারে এর মক্কা সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
(খ) ১৩৫৫ হিজরী সনে এর মিসরীয় সংস্করণ ছাপা হয়। আহমদ শাকির এটি সংশোধন করেছেন।
(গ) কিছু অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও মন্তব্য সহকারে আহমদ শাকির ১৩৭০ হিজরী সনে এটা কায়রো থেকে পুনঃ প্রকাশ করেন।
(৫) শামাইলুর রাসূল ওয়া দালাইলু নুবুওয়াতিহী ওয়া ফযায়েলিহী ও খাসাইসিহী
এটি ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। ১৩৮৬ হিঃ/১৯৬৭ খ্রীঃ কায়রো থেকে প্রকাশিত এ গ্রন্থটি মুস্তাফা আবদুল ওয়াহিদ কর্তৃক পরিশোধিত ও পরিমার্জিত।
পরিশোধনে তিনি নিম্নে উল্লেখিত কপিগুলোর সাহায্য নিয়েছেন।
(ক) ওলীউদ্দীন কৃত ফটোকপি, এটি ইতিহাস গ্রন্থ ক্রমিক নং ১১১০ রূপে ‘দারুল কুতুব আল মিসরিয়্যা’ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত রয়েছে।
(খ) মাকতাবা-ই-তায়মুরিয়্যা সংরক্ষিত ইতিহাস গ্রন্থ নং ২৪৪৩।
(গ) আলেপ্পোর মাকতাবা-ই-আহমদিয়া পান্ডুলিপি থেকে সংরক্ষিত কপি অনুসারে ১৩৫১ হিঃ সনে দারুস সাআদা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত কপি।
(৬) ইখতিসারু আস সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ
এটিও ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ থেকে সংকলিত গ্রন্থ। এতে ইবন কাসীর (র)-এর জাহেলী যুগের আরব ইতিহাস এবং সীরাতুন্নবী (সা) বিষয়ক আলোচনা স্থান পেয়েছে। ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’-এর ২য় খণ্ডের শেষ থেকে ৫ম, খণ্ডের শেষ পর্যন্ত প্রায় তিন খণ্ডের আলোচনা এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে। অর্থাৎ এই অংশটি ৪ ভাগে বিভক্ত। গ্রন্থটি বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। যেমনঃ
(ক) মিসরীয় মুদ্রণঃ ১৩৫৮ হিঃ/১৯৫৭ খ্রীঃ আরিফ লাইব্রেরীতে রক্ষিত কপি অনুসারে “আল ফুসূল ফী ইখতিসারে সীরাতে রাসূল (সা)” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
(খ) বৈরুত ও দামেশকের ‘মুআসসাসাতু উলুমিল কুরআন ওয়া দারুল কলম’ প্রকাশনালয়ের প্রকাশনা। ১৩৯৯-১৪০০ হিজরীর মধ্যে ডঃ মুহাম্মদ ঈদ আল-খারাবী ও প্রফেসর মুহিউদ্দীন মস্তূ এই সংস্করণটি সম্পাদনা করেন।
(৭) আহাদীসুত তাওহীদ ওয়ার রাদদু আলাশ শিরক
ব্রুকলম্যান তার আরবী সাহিত্যের ইতিহাস تا ريخ الادب العربي গ্রন্থের (২/৪৮) পরিশিষ্টে এ তথ্য উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ১২৯৭ হিজরী সনে এটি দিল্লীতে মুদ্রিত হয়েছে।
উপরোল্লেখিত গ্রন্থগুলোই হচ্ছে ইবন কাসীর (র) রচিত প্রকাশিত গ্রন্থ। তাঁর অপ্রকাশিত রচনাবলীর সংখ্যা অনেক। সেগুলোর মধ্যে প্রসিদ্ধগুলোর তালিকা নিম্নে দেয়া হচ্ছেঃ
তাঁর অপ্রকাশিত রচনাবলী
(৮) জামিউল মাসানীদ
এ গ্রন্থটি ৮ খণ্ডে সমাপ্ত। শায়খ মুহাম্মদ আবদুর রাযযাক হামযা এটির নামকরণ করেছেন “আল-হাদসূ ওয়াস্ সুনান ফী আহাদীসিল মাসানীদ ওয়াস্ সুনান”। এটিতে তিনি ইমাম আহমদ আল-বাযযায-এর মুসনাদ, আবূ ইয়া’লা-এর মুসনাদ, ইবন আবী শায়বার মুসনাদ এবং ৬টি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। দারুল কুতুব আল-মিসরিয়াতে এর একটি কপি মওজুদ আছে যা সাত খণ্ডে বাঁধাইকৃত।
৭ম খণ্ডে আবু হুরায়রা (রা)-এর মুসনাদ-এর সিংহভাগ স্থান পেয়েছে।
(৯) তাবাকাতুশ শাফিঈয়া
দাউদী তার গ্রন্থে (১ম খঃ পৃঃ ১১০-১১১)-এর উল্লেখ করেছেন। কায়রোর আল মাখতূতাত ইন্সটিটিউটে ৭৮৯ ক্রমিক নম্বরে এ পুস্তকটির একটি ফটোকপি মওজুদ আছে যা ত্রুটিপূর্ণ। রাবাতের কাতানীর কপি থেকে এটি ফটো কপি করা হয়েছে। সেখানে শুস্তারবামিত এর অপর একটি পান্ডুলিপি রয়েছে যার ক্রমিক নং হচ্ছে ৩৩৯০।
ইবন কাসীর (র)-এর বিলুপ্ত রচনাবলী
ইবন কাসীর (র)-এর যে সকল রচনা আমরা পাইনি কিন্তু তাঁর গ্রন্থাদিতে কিংবা পূর্ববর্তী যুগের লেখকদের গ্রন্থে সেগুলোর নাম পাওয়া যায় তার কতকগুলোর কথা আমরা নিম্নে উল্লেখ করছিঃ
(১০) আত তাকমীল ফী মারিফাতিস সিকাতি ওয়াদ দুআ’ফা ওয়াল মাজাহীল
হাদীসের বর্ণনাকারিগণ সংক্রান্ত ৫ খণ্ডে সমাপ্ত এ-গ্রন্থটিতে তিনি তাঁর শায়খ ‘মিযযী’-এর ‘তাহযীবুল কামাল’ এবং আল্লামা যাহাবী-এর মীযানুল ইতিদাল’ গ্রন্থদ্বয় একত্র করেছেন। তিনি নিজে হাদীস বর্ণনাকারীদের যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত অতিরিক্ত কিছু তথ্যও এতে সংযোজন করেছেন।
নিম্নে বর্ণিত গ্রন্থসমূহে আলোচ্য গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছেঃ
(ক) হাজী খলীফা রচিত কাশফুযযুনূন, খঃ ১, পৃঃ ৪৭১
(খ) দাউদী রচিত তাবাকাতুল মুফাসসেরীন, খঃ ১, পৃঃ ১১০
(গ) আল্লামা সুয়ূতী রচিত যায়লু তাযকিরাতিল হুফফাজ, পৃঃ ৫৮।
(১১) আল কাওয়াকিবুদ দারারী ফীত তারীখ
এটি জীবন চরিত বিষয়ক গ্রন্থ। ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ থেকে এটি সংকলিত। হাজী খলীফা তাঁর ‘কাশফুজ জুনুন’ গ্রন্থে আলোচ্য গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের ১৫২১ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ করেছেন।
(১২) সীরাতুশ শায়খায়ন
এ গ্রন্থে তিনি হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফত প্রাপ্তি, তার মর্যাদা ও আচার-আচরণের বিষয় উল্লেখ করেছেন। এরপর উল্লেখ করেছেন হযরত উমর ফারুক (রা)-এর জীবন, কর্ম ও অন্যান্য বিষয়। তারা দুজনে নবী করীম (সা) থেকে যে সকল হাদীস বর্ণনা করেছেন, সেগুলোও তিনি এ গ্রন্থে সংকলিত করেছেন। ফলে গ্রন্থটি হয়েছে তিনখণ্ড বিশিষ্ট।
নিম্নে বর্ণিত গ্রন্থগুলোতে আলোচ্য গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ
(ক) আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া খঃ ৭, পৃঃ ১৮।
(খ) আল্লামা সুয়ূতী রচিত যায়লু তাযকিরাতিল হুফফাজ, পৃঃ ৩৬১।
(১৩) আল ওয়াদিহুন নাফীস ফী মানাকিবিল ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইদরীস
এ গ্রন্থটি মানাকিবিশ শাফি’ঈ’ নামে প্রসিদ্ধ।
নিম্নে বর্ণিত গ্রন্থগুলোতে এর উল্লেখ রয়েছেঃ
(ক) হাজী খলীফা রচিত কাশফুজ জুনুন, খঃ ২, পৃঃ ১৮৪০।
(খ) আদ দাউদী রচিত ‘তাবাকাতুল মুফাসসিরীন’ খঃ ১, পৃঃ ১১১।
(১৪) কিতাবুল আহকাম
এটি একটি বিরাট গ্রন্থ। তিনি এটি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। হজ্জ অধ্যায় পর্যন্ত রচনা করেছিলেন। “আল-আহকামুস সুগরা ফীল হাদীস” নামেও এটির উল্লেখ পাওয়া পায়। হাজী খলীফা রচিত ‘কাশফুজ জুনুন’ গ্রন্থের ১ম খণ্ডে ৫৫০ পৃষ্ঠায় এ গ্রন্থটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
(১৫) আল আহকামুল কবীরা
নিম্নলিখিত গ্রন্থাদিতে এ গ্রন্থের আলোচনা রয়েছেঃ
(ক) ইবন কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ৩, পৃঃ ২৫৩।
(খ) আদ দাউদী তাবাকাতুল মুফাসসিরীন, খঃ ১, পৃঃ ১১০, ১১১।
(১৬) তাখরীজু আহাদীসি আদিল্লাতিৎ তানবীহ ফী ফুরুইশ শাফি’ঈয়্যা
নিম্নোক্ত গ্রন্থাদিতে এ গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ
(ক) ইবন কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খঃ ২, পৃঃ ১২৫।
(খ) আল বাগদাদী, হিদায়াতুল আরেফীন, খঃ ১, পৃঃ ২১৫।
(১৭) ইখতিসারু কিতাবি আল মাদখাল ইলা কিতাবিস সুনান লিল বায়হাকী
এর সারসংক্ষেপ। ইবন কাসীর (র) রচিত “ইখতিসার উলুমিল হাদীস” গ্রন্থের ৪র্থ পৃষ্ঠায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
(১৮) শারহু সহীহ আল–বুখারী
তিনি এটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেন নি। নিম্নে বর্ণিত গ্রন্থগুলোতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়ঃ
(ক) ইবন কাসীর (র) রচিত ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, খঃ ৩, পৃঃ ৩। (খ) প্রাগুক্ত খঃ ১১, পৃঃ ৩৬।
(গ) হাজী খলীফা রচিত ‘কাশফুজ জুনুন’ খঃ ১, পৃঃ ৫৫০।
(ঘ) আদ দাউদী, তাবাকাতুল মুফাসৃসিরীন, খঃ ১, পৃঃ ১১০-১১১।
(১৯) আস–সিমাত
হাজী খলীফা রচিত কাশফুজ জুনুন গ্রন্থের ২য় খণ্ডে ১০০২ পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে। উপরোল্লেখিত পরিশিষ্ট, ভাষ্য গ্রন্থ, সারসংক্ষেপ এবং সংকলনগুলোর পাশাপাশি ইবন কাসীর (র)-এর একটি কাব্য গ্রন্থেরও সন্ধান পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত শ্রুতিমধুর। এটি সংকলন ও ব্যাখ্যা করা জরুরী। অদূর ভবিষ্যতে একাজ সম্পন্ন করার হিম্মত ও তাওফীক যেন আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে দান করেন।
তার কবিতার নমুনাঃ
تمر بنا الايام تتري وانما – نساق الي الاجال والعين تنظر
দিন যাচ্ছে অবিরাম আর আমরা আহা
নীত হচ্ছি মৃত্যুর দিকে চক্ষু দেখিছে তাহা।
فلا عائد ذاك الشباب الذي مضى – ولا زائل هذا المشيب المكدر
অতীত যৌবন আসবে না ফিরে কভু এ জীবনে
জরাজীর্ণ এই বার্ধক্য যাবে না সরে কোনক্ষণে।
জ্ঞাতব্য
(১) তার রচনাশৈলীঃ আল্লামা ইবন কাসীর (র) ও তাঁর রচনাবলী সম্পর্কে আলোচনার উপসংহারে তাঁর রচনাশৈলী সম্পর্কে কিছু কথা বলা জরুরী। ইবন কাসীর (র) ছন্দ ও বাক্যের সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দিতেন। তবে তিনি কতগুলো স্থানীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেগুলো ঐতিহাসিক তাবারী, মাসউদী ও ইবনুল আসীরের ভাষাগত উৎকর্ষের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়। ইবন খালদূন তার মুকাদ্দমা ও ইতিহাস গ্রন্থে যে পর্যায়ের ভাষাগত অলংকার ব্যবহার করেছেন ইবন কাসীর (র)-এর ব্যবহৃত ভাষা তার তুলনায় দুর্বল। আমরা এ কথা বলতে পারি। যে, ইবন কাসীর (র) তার ইতিহাস গ্রন্থ রচনার প্রতি যত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, শব্দ ও ভাষার প্রতি তত গুরুত্ব দেননি। কারণ তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে ততটা পারদর্শী ছিলেন না। তাঁর কবিতার ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।
তার ভাষার মধ্যে আমরা প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি লক্ষ্য করি। যেমন তিনি বলেছেনঃ
ووطنوا اراضی کشیرة من صنع بلادهم
অনুরূপভাবে তাঁর যুগের তুর্কী ও মামলুকদের ব্যবহৃত কতকগুলো শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। যথোচিত শব্দ চয়নেও কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়।
যেমন সালাহ উদ্দীনের ব্যাপারে তাঁর পুত্রদের শোক ও আহাজারীর বর্ণনায় তিনি লিখেছেন – يتبا كون عليه (তারা কৃত্রিমভাবে তার জন্যে কাঁদছে।) যেন পিতা-পুত্রের মাঝে কোন আন্তরিক ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল না, ফলে তারা কান্নার ভান করেছে।
(২) বর্ণনা পদ্ধতিঃ এতো ছিল ভাষাগত দিক। বর্ণনা পদ্ধতির ক্ষেত্রে ইবন কাসীরের রচনা পাঠে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।
(ক) কুরআনুল দ্বারা কুরআনের তাফসীর করার পদ্ধতি বিষয়ের সাথে সংগতি রেখে তিনি কুরআন করীমের প্রচুর আয়াত সন্নিবেশিত করেছেন। অতঃপর আয়াতের সাথে সম্পর্কিত হাদীসসমূহ উল্লেখ করেছেন।
(খ) তার ইতিহাস গ্রন্থে বিশ্বকোষ সুলভ বর্ণনা পদ্ধতি লক্ষণীয়। তিনি বর্ণনাকারীদের সূত্র ও ভাষ্যসমূহ দ্বারা তার ইতিহাস গ্রন্থকে সমৃদ্ধ করেছেন।
(৩) ইসরাঈলী বর্ণনাগুলো সম্পর্কে তিনি সন্দেহ পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, এটি এবং এটির ন্যায় অন্যান্য বর্ণনা আমার মতে মিথ্যাচারী ও ধর্মত্যাগী লোকদের স্বকপোলকল্পিত রচনা। এ সবের দ্বারা তারা তাদের দীনের ব্যাপারে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে। অন্যত্র তিনি বলেছেন, এই তাফসীরে আমি যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছি তা হল ইসরাঈলী বর্ণনা বর্জন। কারণ এগুলোর উল্লেখ করা শুধু সময়ের অপচয়। এগুলোতে রয়েছে তাদের মধ্যে প্রচলিত মিথ্যাচারের বর্ণনা।
(৪) একজন হাদীসবিশারদ ইমামের মতই তিনি রেওয়ায়েত বা বর্ণনা সূত্রসহ তথ্য উল্লেখে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইজতিহাদ ও আপন অভিমত সংযোজনকে তিনি অপছন্দ করতেন।
(৫) সংশ্লিষ্ট গ্রন্থগুলোর একত্রীকরণ। কোন তথ্য কিংবা বর্ণনাতে রং চড়াতে গিয়ে তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন করতেন না। বরং প্রতিটি দলীল ও বর্ণনাকে তিনি হুবহু উদ্ধৃত করতেন।
(৬) অলংকরণ, বিন্যাস, সৌন্দর্য বিধান, ব্যাখ্যাকরণ ও হেতু বর্ণনা তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল। বরং তার প্রধান ও সার্বিক লক্ষ্য ছিল তথ্যসমূহ একত্র করা। ফলে কখনো কখনো তথ্য ও বর্ণনার পুনরাবৃত্তি পরিলক্ষিত হয়। আবার কখনো কোন তথ্যের প্রাসংগিক বিষয়াদি একাধিক স্থানে সন্নিবেশিত হয়েছে।
তথ্য সূত্র
আমরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান তথ্য সূত্রসমূহ উল্লেখ করছি, যাতে বিস্তারিত জানার জন্যে ভাষ্যগ্রন্থসমূহের সাহায্য নেয়া যায়ঃ
(১) ইবন কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪ খণ্ড, ৭ ভলিউমে।
(২) ইবন কাসীর, উমদাতুত তাফসীর আনিল হাফিজ ইবন কাসীর
সংক্ষেপায়ন ও সম্পাদনা- আহমদ মুহাম্মদ শাকির, দারুল মাআরিফ, মিসর। প্রথম প্রকাশ, ১৩৭৬ হি/১৯৫৬ খৃঃ।
(৩) ইবন কাসীর, আল-ইজতিহাদ ফী তালাবিল জিহাদ, সম্পাদনা, আবদুল্লাহ, আবদুর রহীম উসায়লান, বৈরুত, ১৪০১ হিঃ/১৯৮১ খৃঃ।
(৪) ইবন কাসীর, ইখতিসার উলুমিল হাদীস, সম্পাদনা—আহমদ শাকির, ভূমিকা, আবদুর রাযযাক হামযা, কায়রো, ১৩৭০ হিঃ।
(৫) ইবন কাসীর, শামাইলুর রাসূলু ওয়া দালাইলু নুবুওয়াতিহী, ওয়া ফাযাইলিহী ওয়া খাসাইসিহী, সম্পাদনা— মুস্তফা আবদুল ওয়াহিদ, ঈসা আল বাবী আল হালাবী এণ্ড কোম্পানী মুদ্রণালয়, কায়রো, ১৩৮৬হিঃ/১৯৬৭ খৃঃ।
(৬) ইবন কাসীর, ইখতিসারু আসসীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, সম্পাদনা—মুহাম্মদ ঈদ আল খাতরাবী ও মুহিউদ্দীন মস্তুও, উলুমুল কুরআন ওয়া দারুল কলম ফাউন্ডেশন দামেশক, বৈরুত, ১৩৯৯-১৪০০ হিঃ।
(৭) ইবন কাসীর, আসসীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, সম্পাদনা—মুস্তাফা আবদুল ওয়াহিদ, দারুল মা’রিফাহ্ লিত তাবাআ ওয়ান নাশূর, বৈরুত, ১৩৯৯ হিঃ/১৯৭৯ খৃঃ।
(৮) ইবন কাসীর, তাফসীর ইবন কাসীর ওয়াল বাগাবী, মাতবা’আতুল মানার মুদ্রিত, মুহাম্মদ রশীদ রেযার উপস্থাপনা, মুদ্রণ নির্দেশ দিয়েছেন সুলতান আবদুল আযীয আল-সাউদ, নজদ ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ইমাম, মিসর, ১৩৪৩ হিজরী।
(৯) খায়রুদ্দীন আযিরিকলী, আল-আ’লাম, কামূস ও তারাজিম, দারুল ইলম লিল মালাঈন, বৈরুত রোড নং-৫, ১৯৮০ খৃস্টাব্দ।
(১০) জুরজী যয়দান, তারীখু আদাবিল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ, উপস্থাপনা, শাওকী দায়ফ, দারুল হিলাল মুদ্রিত, কায়রো।
(১১) শামসুদ্দীন আযহাবী, তাকিরাতুল হুফফাজ, হায়দ্রাবাদে মুদ্রিত, ১৩৩৪ হিজরী।
(১২) ইবন হাজর আল আসকালানী, আদদুরারুল কামিনা ফী আ’ইয়ান আল মিআতিস সামিনা, হায়দ্রাবাদে মুদ্রিত, ১৩৪৮ হিজরী।
