Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    উতল হাওয়া – তসলিমা নাসরিন

    তসলিমা নাসরিন এক পাতা গল্প774 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ২৪. সংসার ধর্ম

    সংসার ধর্ম

    হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে হবে এক বছর, না কম না বেশি। বছর শেষ হলে ঢাকায় পাকাপাকি ভাবে নিজের সংসারে ফিরব এরকমই কথা রুদ্রর সঙ্গে। রুদ্রও মোংলা মিঠেখালির পাট চুকিয়ে ঢাকায় ফিরবে। শুরু হবে সংসার আমাদের। কোনও ছেদ না পড়া সংসার। পাকাপাকির আগেই অবশ্য নানা ছুতোয় আমার ঢাকা যাওয়া হতে থাকে, রুটিনে এক মাস গ্রাম পড়ল তো ঢাকা যাও, পড়ে গিয়ে হাত ভাঙল তো ঢাকা যাও। ডান হাতের কনুইয়ের হাড় ভেঙে টুকরো হয়নি, সামান্য ফেটেছে, ওটুকুর জন্যই হাড়ের ডাক্তার প্লাস্টার লাগিয়ে দিয়ে বললেন, পুরো এক মাস। স্ত্রীরোগপ্রসুতিবিদ্যা বিভাগে তখনও আমার ডিউটি শেষ হয়নি, অধ্যাপক জোবায়েদ হোসেন, গলার দড়িতে নব্বই ডিগ্রি কোণে ঝুলে থাকা হাত দেখেই বললেন, ভাঙলা? হুম, ভাল একটা কারণ জুটে গেল ফাঁকি মারার, কি বল? না, জোবায়েদ হোসেন এটি ঠিক বলেননি। ডিউটিতে ফাঁকি মারার গোপন কোনও ইচ্ছে আমার ছিল না।

    হাত ভাঙা তো গা-গরম হওয়া বা খুসুখসে কাশির মত নয়, রীতিমত বড় একটি ঘটনা, এই ঘটনায় নিদ্বির্ধায় প্রশিক্ষণ কামাই করা যায়, বাঘ হয়েও জোবায়েদ হোসেন মেনেছেন, আমি না মানার কে! মা দুদিন মুখে তুলে খাইয়ে দিলেন, গোসল করিয়ে জামা পরিয়ে দিলেন। মাকে ঠেলে সরিয়ে একদিন ঢাকায় রওনা হই। ঢাকা যাওয়ার কোনও ইচ্ছে হত না যদি না রুদ্র ময়মনসিংহে এসে সে রাতের ব্যাপারে স্বীকার করত যে সে রাতে সে মাতাল ছিল, যা করেছে কোনও সুস্থ মস্তিস্কে করে নি। আজকাল ঢাকা যেতে বাড়িতে কোনও কৈফিয়ত দিই না যে সার্টিফিকেট তুলতে হবে বা অপারেশন করাতে হবে বা অন্য কোনও বড় কারণ যে কারণে ঢাকা না গেলেই নয়। দিব্যি ঢাকা যাচ্ছি বলে বেরিয়ে যাই, কোথায় থাকব কার বাড়িতে তাও বলি না, বলি না কারণ বাড়ির সবাই জানে আমি কোথায় কার কাছে যাই। এ নিয়ে কেউ আমার সঙ্গে কোনও আলোচনায় বসে না। আমার ঢাকা যাওয়ার প্রসঙ্গ এলেই কলকলে বাড়িটি হঠাৎ চপু হয়ে যায়। ওই নৈঃশব্দ থেকে আমি নিঃশব্দে মিলিয়ে যাই। বাড়ি থেকে রিক্সা নিয়ে বাসস্ট্যান্ড। ঢাকা যাওয়ার বাস, ঘন্টায় ঘন্টায় ছাড়ছে।

    রুদ্র আমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়, যেহেতু আমার ডান হাতটি অকেজো। গোসলখানায় নিয়ে আমার কাপড় জামা খুলে গায়ে জল ঢেলে সাবান মেখে গোসল করিয়ে দেয়। গোসল করানোর সময় আমার শরীর স্পর্শ করে তার শরীরের ভেতর ফুঁসে উঠতে থাকে আরেকটি শরীর। নরম তোয়ালেয় গা মাথা মুছিয়ে আমাকে ঘরে আনে, শুইয়ে দেয়। উর্ধাঙ্গ অচল হলে কি হবে, নিম্নাঙ্গ তো অচল নয়। রাতে যখন গাছপালা দুলিয়ে মেঘ জমিয়ে ঘরে তুমুল তুফান তোলে রুদ্র, সেই তুফানে চৌকি ভেঙে পড়ে তলায় তোশক বালিশ সহ আমি। ভাল হাতটি ভাঙতে ভাঙতেও ভাঙেনা। এর পরের তুফান মেঝের ওপর বয়, মেঝে ভেঙে নিয়ে নিচতলায় না পড়লেও মজবুত দেখে বড় একটি খাট কেনা হয়, যেন কোনও ঝড় তুফানে না ভেঙে পড়ে। বড় বিছানায় শুয়ে অভ্যেস আমার। হাত পা ছড়িয়ে শুতে না পারলে ঘুম ভাল হয় না। তার ওপর আবার কোলবালিশের ব্যাপারও আছে। মাথার বালিশকে কোলবালিশ করে আপাতত ঝড় তুফান শেষে নিদ্রা যাই। খাট কিনে তোশক বালিশ কিনে টাকা ফুরিয়ে যায়। টাকা ফুরোলে রুদ্র যা করে, মোংলা রওনা হয়। এবার আমাকে নিয়ে মোংলা যাবে সে। আমি বাধা দিই না। রুদ্রর সঙ্গ আমার প্রার্থিত। সাত সমুদ্দুর তের নদীর ওপারে যেতে হলেও যাব, আর এ তো শ্বশুর বাড়ি!

     

    হাত ভাঙা বলে কোনও লাল কাতান পরার দায় নেই, একরকম বাঁচি। লম্বা একটি ঢিলে জামা পরে থাকি, পরতে খুলতে সুবিধে। ঢাকা থেকে রেলে করে, লঞ্চে করে, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মোংলায়, রূপসার ঘোলা জলের পাড়ে সেই নিঝুম বাড়িটিতে আবার, দোতলার ঘরটিতে আবার। বাড়িতে অনেকগুলো মানুষ, অথচ মনে হয় কেউ নেই বুঝি, কেউ ছিল না বুঝি! মানুষ খুঁজতে আমাকে ঘরে ঘরে উঁকি দিতে হয়। রুদ্রর মা তাঁর ভারি শরীরটি নিয়ে শুয়ে আছেন পালঙ্কে। বাকি ঘরগুলোয় আছে বাকিরা। বাকিরা যা কিছুই করছে, নিঃশব্দে করছে। পিঠাপিঠি ভাই বোন, অথচ কোনও চড়চিমটি-চুলোচুলো নেই। গোসলের সময় গোসল করছে, খাওয়ার সময় খাচ্ছে, ঘুমের সময় ঘুমোচ্ছে। চাবি দেওয়া যন্ত্রের মত, কাঁটায় কাঁটায় ঘটে যাচ্ছে সব, কিছুই পড়ে থাকছে না, কিছুরই এদিক ওদিক হয়না, এমন নিয়ম, পালনের প্রশ্ন ওঠে না, দেখলেই হাঁসফাঁস লাগে, আমি কোনও রুটিন মেনে চলতে পারি না, ক্ষিধে লাগলে খেয়ে উঠি, গোসল করে পরে খেতে হবে এমন নিয়মের মধ্যে নিজেকে কখনই ফেলতে পারি না, আজ গোসল করি তো কাল করি না, আজ নাস্তা খাই তো কাল খাই না, দুপুরে কোনওদিন ঘুমোই, কোনওদিন ঘুমোই না, রাত নটা বা দশটা বাজলেই আমার ঘুমোতে যেতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কখনও আটটায় যাই, কখনও দশটায়, কখনও আবার সারা রাত্তির যাওয়াই হয় না। আমার উপস্থিতি এ বাড়িটির মন্থর ছন্দে একটুকু পরিবর্তন আনে না। অবকাশে যেরকম উৎসব শুরু হয় নতুন কেউ এলে, তার কিছুই ঘটে না এ বাড়িতে। সম্ভাষণও এমন শীতল, যেন মানুষগুলো সকাল বিকাল আমাকে দেখছে, যেন আমি এ বাড়িতে দীর্ঘ দীর্ঘ বছর ধরে বাস করছি। ইচ্ছে করে বাড়িটির মরচে ধরা দরজা ভীষণ ধাক্কা দিয়ে খুলি, মাকড়শার জালগুলো সরাই। মানুষ একটু চিৎকার করুক, গলা ছেড়ে গান গাক, উঠোনের কাদায় হঠাৎ পিছলে পড়ে যাক, কেউ কাউকে ধমক লাগাক, কেউ তর্কে করুক কিছু নিয়ে, কিছু একটা ঘটুক, কেউ কিছু একটা করুক, হো হো করে হাসুক, হাসতে যদি না পারে তবু কিছু একটা করুক, না হয় কাঁদুক। তবু কিছু করুক। আমিই ওদের গায়ের শ্যাওলা সরিয়ে বলি, চল গল্প করি, চল তাস খেলি। বিছানায় সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে আসর জমাতে চাই, জমে না। কারও কোনও গল্প নেই। অসম্ভব নিস্পৃহতার আঁচলে ওরা মুখ লুকিয়ে রাখে। ভাঙা হাত, তবু শুয়ে বসে থাকতে ইচ্ছে করে না, কিছু একটা করার তীব্র আকাঙক্ষা রক্তের কণার সঙ্গে মাথা থেকে পা অবদি দৌড়োয়। সারা বাড়িতে কোনও বই নেই যে পড়ব, সময় আমার প্রতি লোমকূপে বাবলা গাছের কাঁটা হয়ে বেঁধে। সময় আমার খুব বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়, চাবুকে চাবুকে আমাকে রক্তাক্ত করতে থাকে। প্রতিদিন সকালে বা দুপুরে বেরিয়ে যায় রুদ্র, অসহ্য অপেক্ষার প্রহর কাটাই একা একা, মধ্যরাতে মাতাল স্বামী ঘরে ফেরে। দিনগুলো এভাবেই পেরোতে থাকে। এভাবেই রাতগুলো। ঘর থেকে বেরোতে গেলেই একটি কিম্ভূতকিমাকার না এসে আমাকে অচল করে রাখে। তবওু গোঁ ধরে যাবই যাবই বলে এক রাতে বেরোলাম, একটি হোটেলে সে গেল, একটি আড্ডায়, মদের আড্ডায়। বন্দরে ভদ্রলোকদের যাওয়ার জায়গা বলতে এই হোটেলটিই, রুদ্র বলে। গুমোট ঘরের বাইরে এসে আমি ফুসফুস ভরে হাওয়া নিতে চেয়েছিলাম, হাওয়া জোটে, মদগন্ধময়হাওয়াই জোটে।

    প্রাণ ফিরে পাই যেদিন বন্দর ত্যাগের আয়োজন হয়, যদিও ঢাকার পথে নয়, যাত্রাটি আরও গভীর গ্রামের পথে, তবু এ বাড়ির শুয়ে বসে থাকা জীবনটি শেষ করার জন্য আমি আকুল হয়ে রওনা হই। গ্রামে নিশ্চয়ই বন্দরের মত শ্রমিকের উৎপাত নেই, রুদ্রর হাত ধরে সেইসব শস্যের সবুজ ক্ষেতের আলপথ ধরে হাঁটতে পারব, যেসব ক্ষেতের কথা বারবার সে লিখেছে কবিতায়। মিঠেখালি গ্রামটি নিশ্চয়ই ছবির মত সুন্দর একটি গ্রাম, যে গ্রামের সৌন্দর্য রুদ্রকে বারবার টেনে আনে এখানে। কোথায় বসে সে কবিতা লেখে, কোন বৃক্ষতলে সে উদাস বসে আমাকে ভাবে, কোন ভরা জ্যোৎস্নার মাঠে সে একা একা দৌড়ে যায়, দুচোখ ভরে দেখব সব। মোংলা থেকে ছইঅলা নৌকোয় মুখ আড়াল করে আরও সব মেয়েমানুষের সঙ্গে খাল পেরিয়ে মিঠেখালি যেতে হয়। গভীর গ্রামের ভেতর চারদিকে ফসলের ক্ষেত, কিছু গোলপাতার ঘর এদিকে ওদিকে, মাঝখানে গাছগাছালি ঘেরা বড় একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে একটি পুকুর, পুকুরে শান বাধাঁনো ঘাট। সন্ধে হলেই বাড়ির ঘরে, বারান্দায়, সিঁড়িতে প্রচুর হারিকেন জ্বলে। ঝাড়বাতি থাকলে এটিকে সত্যিকার জমিদার বাড়িই বলা যেত। অবাক হই, এই ঘোর গহীন গ্রামে কে এনেছে ইট পাথর, কে গড়েছে এই বাড়ি! রুদ্রর নানার বাড়ি এটি। নানার দাপট ছিল এলাকায়, তার চেয়ে বেশি দাপট ছিল তার বড়মামার। গ্রামগঞ্জের দাপুটে অনেক লোক একাত্তরে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, তিনিও ছিলেন। রুদ্রর মেজমামাও স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন না। এমন পরিবারে মানুষ হয়ে রুদ্র অন্যরকম। নিজে সে নিজের নাম রুদ্র রেখেছে। না রাখলে পিতৃদত্ত মুহম্মদ শহিদুল্লাহ নামটি নিয়েই তাকে জীবন কাটাতে হত। কবিতা লেখে স্বাধীনতার পক্ষে, মসনদে রাজাকারের ফিরে আসায় প্রচণ্ড ক্ষোভে সে বলে, জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরোনো শকুন। কবিতায় শকুন বলে গাল দিলেও রুদ্রর অগাধ শ্রদ্ধা দেখি তার সেই মামাদের জন্য। গোবরে পদ্মফুলটির জন্য গৌরব হয় হয় করেও হয় না। গ্রামের বাড়িতে যখন থাকে সে, তার বড়মামার ঘরে থাকে। ঘরে বড় বড় দুটো পালঙ্ক, বড় বড় কাঠের আলমারি, বড় বড় চেয়ার। সবই বড় বড়। জমিদারি গন্ধ বেরোচ্ছে সব কিছু থেকে। বড়মামা বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর বউ আছেন, বউটি একদিকে তার বড়মামি আরেকদিকে বড়ফুপু। রুদ্র কাকু বলে ডাকে তাঁকে। কাকুর কথা সে আমাকে চিঠিতে লিখেছে অনেক। কাকুর নিজের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। রুদ্রকেই তিনি নিজের ছেলের মত লালন পালন করেছেন। এখানে জানালার কাছে বড়মামার পুরোনো টেবিলটিতে বসে রুদ্র কবিতা লেখে, বড়মামার পালঙ্কে নরম গদিতে ঘুমোয়। ঘুমোয়, চাকরবাকর আরদালি খানসামা তার আদেশ পালনের অপেক্ষায় থাকে। মাসের পর মাস কাটিয়ে দেয় সে এ বাড়িতেই। এমন জমিদারি আমি যখন ফ্যালফ্যাল করে দেখছি, রুদ্র বলে, আরও ছিল, এখন তো পড়তির মুখে! এখন পড়তির মুখে না হয়ে উঠতির মুখে হলে সম্ভবত আনন্দ হত তার! যৎসামান্য অবশিষ্ট আছে, আগে অনেক ছিল, আরও ছিল! সেই আগের আরোর জন্য, আগের অঢেলের জন্য, অনেকের জন্য রুদ্রর গর্ব হচ্ছে টের পাই। ধনসম্পত্তি নিয়ে তার অহঙ্কার সে চাইলেও গোপন করতে পারে না। কিন্তু দরিদ্রকে শোষণ না করে কেউ কি এত ধনসম্পত্তি করতে পারে? পারে না, মন বলে, পারে না। রুদ্র তো সেই আশিভাগের পক্ষে কবিতা লেখে, যারা তার দোতলার ঘরটিতে কখনও পৌঁছতে পারে না, নিচের সিঁড়ি থেকেই যাদের হটিয়ে দেয় পাইক পেয়াদারা। যারা রোদে পুড়ে পুড়ে ক্ষেতে লাঙল দিচ্ছে, ওইসব বরগাচাষীরা, যাদের শ্রমের ফসল উঠছে এ বাড়ির গোলায়! যাদের আর রুদ্রর মধ্যে অনেক ফারাক। আমি মেলাতে পারি না। সা−ম্যর জন্য চিৎকার করে কবিতা পড়ে রুদ্র, সাম্য কি সত্যিই সে মন থেকে চায়! ঘরের চার দেয়াল ক্রমশ পা পা করে এগোতে থাকে আমার দিকে। রুদ্রকে বলি, চল বাইরে বেরোই।

    বাইরে কোথায় যাবে?

    গ্রাম দেখতে।

    গ্রামে তো দেখার কিছু নেই।

    দেখার কিছু থাকবে না কেন?

    দেখার কিছু নেই, শুধু ক্ষেত।

    ক্ষেতই দেখব।

    ক্ষেত দেখে কি করবে? এসব ধানের ক্ষেত দেখার কোনও মানে হয়?

    চল দুজন হাঁটি গ্রামের পথে। তুমি তো আমাকে চিঠিতে কতবার লিখেছো, যে, তোমার নাকি ইচ্ছে করে দিগন্ত অবদি সুবজ ধানের ক্ষেত দেখাতে আমাকে? দেখাতে গ্রামের আশ্চর্য সুন্দর রূপ!

    খামোকা বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। বাড়িতে বসে কাকুর সাথে গল্প কর। বীথি ওরা আছে, ওদের সাথে সময় কাটাও।

     

    সময় তো আমি রুদ্রর সঙ্গে কাটাতে চাই। কথা বলতে বলতে দপু রু গড়িয়ে যাবে, বিকেল গড়িয়ে যাবে, টের পাবো না। রাতের কালো পর্দা এসে আমাদের মুখ ঢেকে দেবে, আমরা যে পরস্পরকে আর দেখতে পাচ্ছি না, টের পাবো না। আমাদের নিঃশ্বাসের কাছাকাছি আমরা থাকব, আমাদের স্পর্শের কাছে থাকব, আমাদের অনুভবের কাছে, টের পাবো না। জীবনের টুকরো টুকরো নিয়ে, টুকরো টুকরো জীবন নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা, অথবা কোনও কিছু না নিয়ে, মনে যা আসে তাই নিয়ে, সপুুরি গাছের মাথায় এইমাত্র যে পাখিটি এসে বসল, সেই পাখিটি নিয়ে, একটি বালক দৌড়ে এসে পুকুরে ঝাপঁ দিল, সেই বালকটি নিয়ে। কিন্তু আমি চাইলেও রুদ্রর নিস্পৃহতা লক্ষ করি, সে একা একা শুয়ে থাকতে চায় পালঙ্কটিতে। তার বুকের লোমে আঙুলে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে জীবনে কি কি আমার ইচ্ছে করে, কি কি করে না বলব, চায় না সে। আমার হাঁটুর কাছে তার মাথা, তার হাঁটুর কাছে আমার, এভাবেই শুয়েই স্মৃুতি থেকে কবিতা পড়ে যাব যে যতটা জানি, চায় না সে। সে চায় সারাদিন আমি বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে কাটাই, রাতে শুতে আসি তার বিছানায়। ঢাকার রুদ্র আর মিঠেখালির রুদ্রকে আমি শত চেষ্টা করেও মেলাতে পারি না।

    কাকুর সঙ্গে গল্প করতে গেলে তিনি আলমারি খুলে শাড়ি বের করেন আমার জন্য, গয়নার বাক্স খুলে ভারি ভারি গয়না পরিয়ে দেন গায়ে। স্বামীকে সুখী করার জন্য যা যা করতে হয় স্ত্রীদের, তার সবই যেন আমি পরম নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাই, কর্তব্যকাজে যেন কখনও অবহেলা না করি। কাকুর উপদেশের সাগরে আমি খড়কুটোর মত ভাসতে থাকি। কাকু না হয় পুরোনো কালের মানুষ, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর একশ রকম কর্তব্যের কথা তিনি জানেন, কিন্তু নতুন কালের মানুষ বীথির কাছে গিয়ে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর অন্তত একটি কর্তব্য সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। রূপসী বীথির রূপসী কপাল নিভাঁজ পাওয়ার আশায় বসে থাকি, ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়। বীথি সারাদিনই সংসারের নানারকম সমস্যা নিয়ে এর ওর সঙ্গে কথা বলছে, আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বলে বৌদি বস, কিন্তু সমস্যার খুব কাছে আমি বসে থাকি, তা সে চায় না। বীথির সমস্যার অন্ত নেই। তার অভিযোগের শেষ নেই। বাবা মা মেজমামা কাকু সবার বিরুদ্ধে তার গণ্ডা গণ্ডা অভিযোগ। মোংলা বন্দরের সংসার তাকে দেখাশোনা করতে হয়, এ সংসারও। মেজ মামার ছেলে মণির সঙ্গে বীথির বিয়ে হয়েছে। সম্পর্কের শেকলে মোংলা আর মিঠেখালির মানুষেরা খুব শক্ত করে বাধাঁ, বীথির মেজমামাই বীথির শ্বশুর, সম্পর্কগুলো কি রকম একটির সঙ্গে আরেকটি লেগে আছে শেকলের মত! শেকল নিয়ে রুদ্রর মা মোটেও ভাবেন না, সংসারের কোনও কাজ নিয়েও ভাবেন না অথচ অগুনতি দুর্ভাবনা নিয়ে মিঠেখালির বাড়ি এসেও পালঙ্কে শুয়ে দিন কাটান। তাঁর সেবায় আমি সামান্যও ব্যবহৃত হতে পারি কি না জানতে যখন ঘরে ঢুকি, তিনি কাউকে জলদি করে ডেকে বলেন, দেখ তো শহিদুল্লাহর বউএর কিছু লাগবে কি না দেখ!

    না, আমার কিছু লাগবে না, আমি এমনি এসেছি। বিব্রত শাশুড়ির সামনে ঘোমটা- মাথার ততোধিক বিব্রত বউটি বলে।

    এমনি এসে তাঁর ঘরে কেউ বসে থাকলে তিনি যে বিব্রত হন বেশ বুঝতে পারি। তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আমার যে গল্প করার ইচ্ছে, তা বলে তাঁকে আরও বিব্রত করতে ইচ্ছে করে না।

    বিকেলে রুদ্র একা বেরোবে বাইরে। তার কাজের অন্ত নেই। কেন যাচ্ছে!, যেও না, প্লিজ, থাকো, আমার এসব ছেঁদো অনুরোধ পুকুরে ঢিলের মত ছুঁড়ে দিয়ে সে মোংলা বন্দরে যায়, ফিরে আসে গভীর রাতে, এক শরীর ঝাঁঝালো গন্ধ নিয়ে।

    গন্ধ কেন?

    এই একটু মদ খেয়েছি।

    কেন খেয়েছো?

    খেতে ইচ্ছে করেছে তাই খেয়েছি।

    তোমাকে আর কত বলব মদ খেও না! তুমি কি কোনওদিন আমার কথা শুনবে না?

    ঘরে কাকু আছেন, অন্য বিছানায়, রুদ্র ভ্রুক্ষেপ করে না, যত রাতই হোক তার শরীর চাই।

    তুমি কি কেবল শরীরই বোঝো রুদ্র? মন বোঝো না?

    না রুদ্র মন বোঝে না, সে বিশ্বাস করে শরীরেই বসত করে মনরূপ পাখি। শরীর মেলালে মনের দেখা মেলে।

    রুদ্রর শরীর চাই। প্রতি রাতেই তার চাই, যে করেই হোক, যে পরিবেশেই হোক, চাই। পূর্ণিমায় যখন গ্রাম ভেসে যাচ্ছে, আলোয় আমার মন ভাসছে, রুদ্রকে নিয়ে ছাদে যাই পূর্ণিমা দেখতে। ঝকঝকে চাঁদের তলে শীতল পাটিতে শুয়ে আছি, আলোয় আমার মন নাচছে, তার একটি হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে আলোয়-ভেজা শীতে কাঁপি, এভাবেই চল সারারাত চাঁদের আলোয় স্নান করি, চল সারারাত, চল সারারাত এভাবেই। আলোয় আমার মন উড়ছে। রুদ্র আলোয় ভাসতে চায় না, উড়তে চায় না, সে আমার শরীরে ডুবতে চায়। ওই ছাদে যে কেউ চলে আসতে পারের বিপদের দুআঙুল দূরে দাঁড়িয়ে সে শরীর ভোগ করে। বেঘোরে ঘুমোয়। আমি আর চাঁদ জেগে থাকি একা একা, সারারাত একা একা।

     

    ঘরে বসে থাকব আর খাবার চলে আসবে ঘরে, এ খুব আরামের হয়ত, কিন্তু আমার দ্বিধা হয় এ বাড়ির সমস্ত আরাম আয়েশে গা এলিয়ে দিতে। এ আমার শ্বশুর বাড়ি না হোক, শাশুড়ির বাড়ি তো। নিজেকে সংসারের প্রয়োজনে লাগাতে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি আমি একটি বাড়তি মানুষ, হুকুম খাটার লোকের অভাব নেই বাড়িতে। জমিদারের বাড়িতে যা হয়। এ বাড়ির বড় বড় জিনিসগুলো আমার বোধগম্য হয় না সহজে। রুদ্র যখন বীথির সঙ্গে জমিজমা ধান চাল সহায় সম্পত্তি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলে, আমি বেশির ভাগই বুঝি না। রুদ্র পরে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছে, ভীষণ এক জটিল অবস্থার মধ্যে আছে এই জমিদারি। মিঠেখালির জমি থেকে যা আয় হয়, তার মায়ের ভাগ সে নিয়ে যায় এখান থেকে। বহু বছর হল এভাবেই নিচ্ছে সে ভাগটি। ভাগ নিয়ে কিছু সে নিজের জন্য রেখে বাকিটা রেখে যায় বন্দরের সংসার-কাজে। কিন্তু রুদ্র এখন ভাগের ধান বিক্রিতে বিশ্বাসী নয় আর। অনেকদিন থেকে সে তার মাকে বলছে যেন মেজ মামা জমি ভাগের ব্যবস্থা করেন। তার মায়ের ভাগেরটুকু থেকে কিছু বিক্রি করে সে ঢাকায় ছাপাখানার ব্যবসা শুরু করবে। রুদ্র ঢাকার পঞ্চাশ লালবাগের বাড়িটিতেও তার মায়ের ভাগ দাবি করে, ওটিও ছেড়ে দিতে সে রাজি নয়। বীথি তার দাদাকে লোক চক্ষুর অন্তরালে সমর্থন জানিয়ে যায়। জমি ভাগ করতে মেজ মামা রাজি হন না। বড়মামার পর এখন মেজই হর্তকর্তা, তিনি না চাইলে ভাগ সম্ভব নয়। জমিজমা বিষয়ক জটিলতা থেকে আমার মন উঠে দৌড়ে যায় শান বাধাঁনো পুকুরঘাটে। চল যাই, হাঁসের সাঁতার দেখি বসি। চল, পুকুরে গোসল করি। আমার আবদার শুনে বাড়ির সবাই হাসে, রুদ্রও হাসে। যেন আমার বোধ হয়নি বুদ্ধি হয়নি, যেন জীবন কাকে বলে তার কিছুই আমি এখনও জানি না। আমি আমার শিশুসুলভ অপরিপক্বতা দিয়ে কেবল লোক হাসাতে পারি। পুকুরে বাইরের মানুষ গোসল করতে আসে, ও পুকুরে বাড়ির বউএর নাওয়া চলবে না। গোসল করতে হলে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে ভেতরের পুকুরে। ভেতরের ঘোলা পুকুরে আমি পা ডুবিয়ে বসে থাকি।

    দোতলার জানালা থেকে আমি তাকিয়ে থাকি পুকুরটির দিকে। পুকুরটিকেও আমার মত খুব একলা মনে হয়। যেন দীর্ঘ দীর্ঘ দিন তারও কোথাও কোনও পুকুরে গোসল সারা হয়নি। গায়ে শ্যাওলা জমে আছে পুকুরের। এই পুকুরটির পানি দিয়েই এ বাড়ির রান্নাবান্না ধোয়া পাকলা অযু গোসল সব হয়। পানি খাওয়াও হয়। বড় বড় মটকিতে বর্ষার সময় বর্ষার জল জমিয়ে রাখার নিয়ম। মটকিগুলো উঠোনেই পড়ে থাকে। সারাবছর মটকির পানিও খাওয়া হয়। ফুরিয়ে গেলে পুকুরের পানি। একদিন পানি খেতে গিয়ে গেলাসের পানিতে দেখি অনেকগুলো কিড়ে কিলবিল করে সাঁতার কাটছে। অন্যরা দিব্যি কিড়েঅলা পানি খেয়ে নিচ্ছে। আমি হা হা করে থামাতে এলে বীথি বলল, ও কিড়ে কোনও ক্ষতি করে না, ও খাওয়া যায়। বীথি আমাকে পানির উৎসের কথা বলে, বলে কি করে খাবার পানি সংগ্রহ করে ওরা। আমি থ হয়ে বসে থাকি। দেখে হাসে সবাই। আমাকে খুব অদ্ভুত চিড়িয়া কিছু ভাবে নিশ্চয়ই ওরা। পানিহীন দিন কাটতে থাকে আমার। দিনে যে দুকাপ চা খাওয়া হয়, তা দিয়ে পানির অভাব পুরণ করি শরীরের। রুদ্র মোংলা বন্দর থেকে অনেকগুলো ফানটা কোকোকোলা আনিয়ে দিয়েছে আমার জন্য। জানালায় দাঁড়িয়ে দেখি পুকুরটিতে লোকেরা সাবান মেখে গোসল করছে। বুঝি না, কি করে এত নিশ্চিন্তে এই পুকুরের পানিই পান করছে সবাই! এত জমি এত টাকা, অথচ কোনও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা কি কেউ করতে পারে না? রুদ্র বলে, ব্যবস্থা করার কোনও প্রয়োজন নেই। এই পানি খেয়ে আসছি সেই ছোটবেলা থেকে, কখনও কোনও অসুখ হয়নি। কাকুর ঘরটিতে বসে আমার অলস অবসর সময় কাটতে থাকে। এ বাড়িতেও বই খুঁজি। হাদিস কোরানের ওপর কিছু বই ছাড়া অন্য কোনও বই নেই, কিছু পঞ্জিকা আছে শুধু এ ঘরে বসেই পুরোনো পঞ্জিকা খুলে রুদ্র একদিন আমার জন্মতারিখ বের করেছিল। আরবি সালের বারোই রবিউল আওয়াল আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পড়েছে ইংরেজি কোন সালে, আটান্ন থেকে চৌষট্টি পর্যন্ত খুঁজে বের করে জানিয়েছিল বাষট্টি সালে। বাষট্টি সালের পঁচিশে আগস্টে। এই কাকুর ঘরে খামোকা কাজকম্মহীন বসে থাকতে রুদ্রর কোনও অসুবিধে হয় না। দীর্ঘ দীর্ঘ মাস এ ঘরেই বসে থাকে সে। এ ঘরে বসেই কবিতা লেখে, এ ঘরে বসেই ডাকে পাঠানো আমার চিঠি পড়ে, নিজেও লেখে। ঘরে বসে থাকতে থাকতে জীবন স্যাঁতসেঁতে লাগে, রুদ্রকে যখনই বলি, চল ঢাকা ফিরে যাই। রুদ্র এক কথাই বলে টাকার যোগাড় হোক আগে। কি করে টাকার যোগাড় হবে আমার বোঝা হয় না। যেদিন আমরা মিঠেখালি ছাড়ি, তার আগের রাতে রুদ্র মোংলা বন্দর থেকে মদ খেয়ে ফিরেছে। প্রায়-মাতাল রুদ্র একটি কাণ্ড ঘটাতে চায়। আমার বাধা না মেনে সে কাণ্ডটি ঘটায়। তার মেজ মামার আলমারির তালা ভেঙে জমির দলিল বের করে আনে। দলিল হাতে তার। যে দলিলটি পেতে বছরের পর বছর সে অপেক্ষা করেছে। সে এখন দিব্যি কোনওরকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তার মার ভাগের জমি বিক্রি করে দিতে পারে যে কারও কাছে। কিন্তু বাড়ির কেউই রুদ্রর এই কাণ্ডটিকে সমর্থন করে না। কাকু এত যে তার আদরের, তিনিও করেন না, রুদ্রর মা, যাঁর জমি, তিনিও তার পুত্রের এমন অসভ্যতা মেনে নেন না, বীথিও না, যে কি না তার দাদার প্রতি কাজে বাহবা দিয়ে আসছে। রুদ্রর পদক্ষেপটি সম্পূর্ণই বিফলে যায়। মেজমামার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাঁর হাতেই শেষ অবদি তুলে দিতে হয় দলিলটি। চলে যাওয়ার দিন রুদ্র আমাকে ঠেলে পাঠায় মেজমামাকে যেন পা ছুঁয়ে সালাম করি, কদমবুসি করি। রুদ্রর আদেশ আমি নতমুখে পালন করি, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর একশ কর্তব্যের এটি একটি।

     

    রুদ্রর অনেক কিছু বিফলে যায়। নটা পাঁচটা চাকরি তার পোষাবে না বলেছিল, তারপরও ঢাকায় সে চাকরির জন্য ধরনা দেয়। চাকরি পাওয়া হয় না। পত্রিকা অফিসগুলোয় ঘোরে, ওখানেও ব্যবস্থা হয় না কিছুর। অন্তত কোনও পত্রিকায় যদি সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তার একটি চাকরি জুটত। কে দেবে চাকরি! নামি লেখক সৈয়দ শামসুল হকের আলিশান বাড়ি গিয়ে অনুরোধ করে তিনি যদি অন্তত চিত্রনাট্য লেখার কোনও কাজ রুদ্রকে দেন, সৈয়দ হক কথা দেন না। তিনি যে ছদ্মনামে বাংলা চলশ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে পয়সা কামাচ্ছেন, এ কথা অনেকেই জানে। সৈয়দ হকের ছোটভাই এর প্রকাশনী সব্যসাচী থেকে রুদ্রর তৃতীয় কবিতার বই মানুষের মানচিত্র বের হয়। এটুকুই। এর বেশি রুদ্রর ভাগ্যে কিছু জোটে না। মানুষের মানচিত্র যেবার বেরোলো বইমেলায়, প্রতিদিন বিকেলে মেলায় গিয়ে সে ঠায় বসে থেকেছে বইয়ের স্টলটিতে। তার বসে থাকার কারণে যদি বিক্রি হয় বই অথবা কেউ যদি বই কিনে বইয়ে সই চায়। মেলা ভাঙা পর্যন্ত রুদ্র বসে থাকে। রুদ্র কেবল কবিতা লিখে আর কবিতার বই ছেপেই শান্ত হয় না। সুযোগ পেলেই নানারকম দলে ভিড়ে যায় । সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছে রুদ্র আর তার বন্ধুরা। এরশাদ বিরোধী নানা রকম অনুষ্ঠান করছে এই জোট। কিন্তু ঢাকায় রুদ্রর দীর্ঘদিনের অনপু স্থিতির কারণে সাংস্কুতিক জোটে তার বড় দাযিত্বটি অন্য কাউকে দিয়ে দেওয়া হয়। নিজের হারানো পদটি ফিরে পেতে সে হন্যে হয়ে ঘোরে, ফিরে পাওয়া হয় না। রুদ্র জানে যে পাকাপাকি ভাবে ঢাকা না এলে সংসার তো তার করা হবেই না, দেশের সাহিত্যঅঙ্গনে প্রতিভাবান তরুণ কবি হিসেবে তার যে একটি পরিচিতি হয়েছে, সেটিকেও কিছু হিংসুক কবিকুল বিনাশ করতে চেষ্টা করবে।

    রুদ্রর জন্য মায়া হয় আমার। আমি বলি, তুমি কবিতা লেখ, আমি সংসার চালাবো। টাকা পয়সা রোজগার নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। প্রথমেই নিজের টাকায় যে জিনিসটি কিনি সে বইয়ের আলমারি। রুদ্রর পুরোনো বাঁশের তাক থেকে তার বইগুলো নিয়ে আলমারিতে সাজিয়ে রাখি। নয়াপল্টনে ছোটদার বাড়ি যেতে আসতে ইস্পাতের দোকানে থেমে কাপড় চোপড় রাখার আলমারি কিনেও তাজমহল রোডের ঘরে তুলি। দুজনের কাপড় চোপড় গুছিয়ে রাখি ওতে। একটু একটু করে সংসারের জিনিস কেনা শুরু করতে হবে, সে রুদ্রও জানে। অবকাশ থেকে আমার কাপড় চোপড় বইপত্র হাজার রকম টুকিটাকি জিনিস ট্রাংকে করে তাজমহল রোডে নিয়ে এসেছি। মন প্রাণ শরীর সব ঢেলে দিই সংসার সাজানোয়। রুদ্রর টাকা উড়তে থাকে মেথরপট্টির মদের আড্ডায়, সাকুরায়। সাকুরায় প্রায় রাতে যায়, ওখানে মদ নিয়ে বসে। বন্ধুদের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলতে বলতে মদ পান করে, ম্যাচবাক্সে আঙুলের টোকা দিয়ে দিয়ে আমার মনের কোণে বাউরি বাতাস .. গেয়ে ওঠে মাতাল রুদ্র। প্রায়ই। মধ্যরাতে টলতে থাকা রুদ্রকে নিয়ে রিক্সা করে বাড়ি ফিরি। রুদ্র মদ খাচ্ছে না, মদ রুদ্রকে খাচ্ছে। মদ ছাড়া সন্ধে বা রাত তার কাটে মন মরা। আমি তাকে কেঁদে বোঝাই, ধমকে বোঝাই, রাগ করে, আদর করে বোঝাই যে মদ খাওয়া শরীরের জন্য ভাল নয়। রুদ্র সব বোঝে, আবার কিছুই বোঝে না। মদ যদি না জোটে, কিছু একটার দরকার তার হয়ই, গাঁজা নয়ত চরস। কালো চরস কাগজে মুড়ে রাখে, সেগুলো গুঁড়ো করে সিগারেটের খোলে ঢুকিয়ে খায় সে। রুদ্রকে এসব খাওয়া বন্ধ করার জন্য নিশিদিন অনুরোধ করেও কোনও লাভ নেই। সে তার নেশা করেই যাবে যে করেই হোক। আমিও মদ খাবো, আমিও গাঁজা চরস খাবো- যেদিন বলি, সে বাধা দেয় না। বরং পিঠে চাপড় মেরে উৎসাহ দেয়। চরস ভরা সিগারেট এগিয়ে দেয় আমার দিকে, দু টান দিয়ে কেশে নাশ হই। সাকুরায় মদের গেলাস এগিয়ে দেয় বিষম উৎসাহে, গন্ধ শুঁকতেই বিবমিষা আমাকে গ্রাস করে ফেলে বলে এক গেলাস কমলার রসে তিন ফোঁটা ভদকা মিশিয়েও মদে আমার শুরুটা করে দিতে সে মরিয়া হয়ে ওঠে। গলা ছিঁড়ে যায় ঝাঁঝে, দু চুমুক পান করার পর সে আমাকে বাহবা দেয়, এই তো বেশ হচ্ছে, এভাবে চালিয়ে যাও, হয়ে যাবে। কিন্তু হয় না। রুদ্রর পথ অনুসরণ করা সম্ভব হয় না। সে একাই তার পথে চলতে থাকে, সঙ্গে কিছু মদারু গাঁজারু বন্ধু। মদের আড্ডায় সঙ্গী হয়ে মাগনা মদ খেতে বন্ধুরা সন্ধের পরই ভিড় জমাতে থাকে। রুদ্রর হস্ত উদার হস্ত পেটে মদ পড়লে পারলে দশ বারোজনকে মাগনা মদ খাওয়াতে রাজি হয়ে যায়। রুদ্রর এই জনমদসেবায় সংসার খরচের টাকা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। টাকা ফুরোনো মানে তার ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়া। এভাবে কি চলে রুদ্র? চলে না সে জানে, কিন্তু আর কোনও উপায় নেই। আমি সংসারের খরচ বহন করতে পারি, কিন্তু তাই বলে রুদ্রর মদের টাকা যোগাতে তো পারি না। আমার প্রশিক্ষণ-ভাতার টাকায় এত তো কুলোবে না। রুদ্র জানে যে কুলোবে না, তাই তাকে মোংলা পাড়ি দিতেই হয়।

    যতদিন সে মোংলা বা মিঠেখালিতে পড়ে থাকে, ততদিন আমি ডাক্তারি প্রশিক্ষণে মন নিবেশ করি, না করতে পারলেও অন্তত উপস্থিতিটি রাখি। রুদ্র ঢাকায় ফিরলেই প্রশিক্ষণ গুল্লি মেরে তার কাছে চলে যাই। রুদ্রই আমার ঠিকানা, তাকে নিয়ে আমার সংসারের স্বপ্ন-চারা লকলক করে বড় হতে থাকে, বৃক্ষ হতে থাকে। রুদ্রর ছোট বোন মেরি এখন ঢাকায়, লালবাগে মেজমামার বাড়িতে থেকে লালমাটিয়া কলেজে আইএ ভর্তি হয়েছে। শুনে রুদ্রকে বলি, মেরিকে এ বাড়িতে নিয়ে এসো। এখান থেকে কলেজ কাছে হবে। মামার বাড়িতে থাকার চেয়ে ভাইএর বাড়িতে থাকা ভাল। এখানে নিজের বাড়ির মত থাকতে পারবে। রুদ্র প্রথম রাজি হয় না। এ বাড়িতে কি করে থাকবে মেরি! আরাম আয়েশের ব্যবস্থা নেই, কাজের লোক নেই, আমাদেরও পাকাপাকি থাকা হচ্ছে না এখানে। আমার প্রশিক্ষণ তো খুব শিগগির শেষ হয়ে যাচ্ছে, রুদ্র না থাক, আমি তো থাকতে পারব মাসের বেশির ভাগ সময়ই, হয়ত পাঁচ সাতদিনের জন্য যাবো। এক সন্ধেয় লালবাগ থেকে মেরিকে নিয়ে আসি আমরা। মেরি থাকা শুরু করার পর বাড়িটিকে সত্যিকার বাড়ির মত লাগে। গীতার কাছ থেকে রান্নাবান্না করার জন্য সবুজ নামের এক কিশোরিকে নিয়ে আসি। প্রতিদিন সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনছি। এক ঘোরের মধ্যে বাঁচি। কিন্তু সব ফেলে ময়মনসিংহ যেতেই হয় যেহেতু প্রশিক্ষণ আমার এখনো শেষ হয়নি। ময়মনসিংহ থেকে যখনই ঢাকায় ফিরি, আমার সংসারটিকে অনেকটাই পাল্টো যেতে দেখি। দেখি রুদ্রর আরেক বোন সাফিকে মোংলা থেকে রুদ্র ঢাকা নিয়ে এসেছে। রুদ্রর ভাইবোনগুলো সব দেখতে এক, সবগুলো মুখে তাদের মায়ের মুখ । সাফি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে, বিয়ের জন্য বসে আছে। মোংলার চেয়ে ঢাকায় পাত্র পাওয়া সুবিধে বলে রুদ্র ওকে ঢাকায় এনেছে। বাড়িটি এখন আর কোনও ছন্নছড়া দম্পতির ছন্নছাড়া সংসার বলে মনে হয় না, বাড়িটি নপুূর পরে নাচে, কলবল খরবল করে বাড়িটি কথা কয়। আমার ভাল লাগে, ভাল লাগে এ ভেবেও যে রুদ্র তার দুবোনের সামনে নিজের মান বাঁচাতে আর মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরবে না। ভাল লাগে রুদ্রর সংসারি হওয়া দেখে। কিন্তু, একবারও কি সে আমাকে জানাতে পারত না যে সে সাফিকে ঢাকায় নিয়ে আসছে! আমি একটু একটু করে টের পাই, সংসারের অনেক সিদ্ধান্ত সে একা নিচ্ছে। মেরি আর সাফি শোবার ঘরে থাকছে, বড় বিছানাটিতে। আলমারিতে ওদের কাপড় চোপড়, জিনিসপত্র। আমার কাপড়গুলো এক পাশে এক কোণে সরে যাচ্ছে। আমার জায়গা দিন দিন কমতে কমতে ছোট হয়ে আসছে। আমি আর রুদ্র সামনের পড়ার ঘরটিতে ভেঙে পড়া চৌকির ছোট তোশকটি বিছিয়ে ঘুমোই। কৃচ্ছউস!ধন করি। অথবা কেষ্ট পেতে চাই। কষ্ট করিলে নাকি কেষ্ট মেলে। সংসারের মধ্যে রুদ্রকে নিয়ে সন্ন্যাসযাপন করেও তাকে আমার সারাক্ষণের জন্য পাওয়া হয় না। তার সময় হয় মোংলা যাওয়ার। আমাকে চুমু খেয়ে, ভাল থেকো লক্ষ্মী সোনা, ভাল থেকো প্রাণ ইত্যাদি বলে সাফির হাতে সংসার খরচের টাকা দিয়ে রাতের ট্রেন ধরতে চলে যায়। সংসার নিজের টাকায় সাজিয়েছি, কিন্তু সংসার খরচের টাকা আমার হাতে না দিয়ে বোনের হাতে দেওয়ায় সংসার নিয়ে আমার উত্তেজনায় একটি ছোট্ট ঢিল পড়তে গিয়েও পড়েনি, আমার বিশ্বাস হয় না যে আমার এই সংসার আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে।

     

    রুদ্র বলেছে, বড় একটি বাড়ি প্রয়োজন, কারণ তার ছোট ভাই আবদুল্লাহকেও ঢাকায় এনে সে ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেবে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখে বাড়ি খুঁজতে থাকি। পছন্দ হয় না বেশির ভাগ, পছন্দ হলে ভাড়া বেশি। ভাড়া কম হলে ঘর ছোট, জায়গা কম। খুঁজতে খুঁজতে একদিন ইন্দিরা রোডের রাজাবাজারে একটি বাড়ি পছন্দ হয়। বাড়িভাড়া এক মাসের জমা দিয়ে রুদ্রর ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকি। ফিরে এলে মুহম্মদপুরে তাজমহল রোডের বাড়িটি ছেড়ে দিয়ে জিনিসপত্র ইন্দিরা রোডের নতুন বাড়িতে নিয়ে যাই। দুটো শোবার ঘর, একটি বড় একটি ছোট, বড় একটি বৈঠক ঘর, বড় শোবার ঘরের পাশে একটি টানা বারান্দা। সাফি বড় শোবার ঘরটি পছন্দ করে ওর জন্য, সাফির প্রস্তাবে রুদ্র রাজি হয় না, মেরি আর সাফি দুজনকেই সে বুঝিয়ে বলে বড় ঘরটিতেই তার এবং আমার থাকা উচিত। আমাদের জন্য নতুন একটি খাট কিনে বড় শোবার ঘরে পাতে। নিজের লেখার টেবিলটিও। নতুন একটি আলমারি কেনাও হয় এ ঘরের জন্য, সেটি জানালার কাছে। আবদুল্লাহর জন্য একটি ছোট খাট কিনে বৈঠক ঘরে পেতে দেওয়া হয়। ছোট শোবার ঘরে আগের বড় খাটটি আর আগের ইস্পাতের আলমারিটি মেরি আর সাফির জন্য বসানো হয়। ওদিকে ময়মনসিংহে হাসপাতালে যেতে আসতে পথে যে আসবাবপত্রের দোকান পড়ে, ওখান থেকে খাবার টেবিল, চেয়ার, সোফা ইত্যাদি যা বানাতে দিয়েছি, ময়মনসিংহে নিয়ে গিয়ে ট্রাক ভাড়া করে আসবাবের দোকান থেকে সমস্ত আসবাব নিয়ে এমনকি অবকাশ থেকেও একটি পুরোনো চেস্ট অব ড্রয়ার আর একটি −শ্বত পাথরের টেবিল তুলে নিয়ে দুজন ঢাকায় ফিরি। একটি সাজানো গোছানো সুন্দর বাড়ি, একটি সুখের শান্তির সংসার ছাড়া আমার মাথায় আর কিছু নেই। নিপুণ হাতে সংসার সাজাই। সংসারের হাজার রকম জিনিস ঘোরের মধ্যে কিনে নিই, সঞ্চয় যা ছিল সব ঢেলে, স্থির হই সংসারে। প্রশিক্ষণ সমাপ্ত। আর ময়মনসিংহে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এবার তোমার খবর কি রুদ্র! আমি তো তোমার কাছে চলে এসেছি, আমার অনপু স্থিতি তোমাকে যে নিয়ন্ত্রণহীন জীবন দিত, এলোমেলো জীবন দিত, সে জীবন আর দেবে না। এই দেখ, আমার সমস্ত নিয়ে আমি এখানে। তোমার কাছে। রুদ্র কথা দেয়, সেও তার সংসারে পাকাপাকি চলে আসছে, আর যেন তাকে টাকার জন্য ছুটতে না হয় কোথাও। একটি ছোটখাট হলেও ছাপাখানা খুলতে পারে এমন টাকা যে করেই হোক, নিয়ে আসবে মোংলা বা মিঠেখালি থেকে। তার বাবা বা মায়ের কোনও জমি বিক্রি করে। ঢাকায় সে ছাপাখানার ব্যবসা শুরু করবে। বাবা মার সম্পত্তি থেকে যে ভাগ তার পাওয়ার কথা, সেটি এখনই সে নিয়ে নেবে।

    ছাপাখানা। ছাপাখানা। রুদ্র সব পরিকল্পনা করে ফেলে , কোথায় হবে। কেমন হবে। প্রতিদিন তাকে কাছে পাবো, এই সুখে আমি তিরতির করে কাঁপি। আর কোনওদিন তাকে প্রতিমাসের খরচ আনতে দূরে যেতে হবে না। আর কোনওদিন নিঃসঙ্গতার কষ্ট তাকে ছিঁড়ে খাবে না। আমার স্বপ্নের বৃক্ষ ছেয়ে যাচ্ছে ফুলে।

     

    কিন্তু, মোংলা থেকে ফিরে আসে খবর নিয়ে যে তার মেজো মামার কাছ থেকে মায়ের জমি আলাদা করে যে বিক্রি করে ঢাকায় একটি ছাপাখানা দেবে বলেছিল সেটি সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং ঢাকায় পাকাপাকি এখনও বসবাস তার সম্ভব নয়। তবে নিজে সে একটি ব্যবসা শুরু করেছে মোংলায়, চিংড়ির ব্যবসা। ব্যবসাটি দেখাশোনা করার লোক আছে। তার খুব না গেলেও চলবে। বছরে দুবার গিয়ে দেখে এলেই হবে। বেশ তো, এবার মন দিয়ে ঘর সংসার করি চল। এতকাল যে স্বপ্নটি লালন করছি আমরা, দুজন একসঙ্গে থাকব, একজন আরেকজনকে ছেড়ে কখনও দূরে যাবো না। শুরু করার আগে বিয়ের অনুষ্ঠান করে নিই। চল ঘটা করে জানাই সবাইকে যে বিয়ে করেছি। বিয়ে তো সামাজিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই অনুষ্ঠানের জন্য রুদ্র নিজে নিমন্ত্রণ পত্র লেখে।

    আমরা জ্বালাবো আলো কৃষ্ণপক্ষ পৃথিবীর তীরে, জীবনে জীবন ঘসে অপরূপ হৃদয়ের আলো।

    কোনও শাদা শাড়ি পরে বিধবা সেজে বিয়ে করব না, লাল বেনারসি চাই, সঙ্গে সোনার গয়না। রুদ্র রাগ করে খরুচে মেয়ের বেআক্কেলি তালিকা দেখে। কিন্তু আমার ভাষ্য, বউ যখন সাজব আর সব বাঙালি বউএর মতই সাজব। রুদ্রকে কিনে দিই যা যা পরবে সে বিয়ের অনুষ্ঠানে। রুদ্রর চেয়ে আমার উৎসাহ বেশি। শহরের একটি চিনে রেস্তোরাঁকে উনত্রিশে জানুয়ারি তারিখের রাতের জন্য তৈরি থাকতে বলি। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব সবাইকে নিমন্ত্রণ করব। যেখুক সবাই আমি ভাল আছি, সুখে আছি। যেহেতু ভাল থাকা সুখে থাকা শাড়ি গয়না দিয়েই বিচার করে মানুষ। ঢাকায় ঈদ করে ময়মনসিংহে ফিরে গেলে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, বিয়া যে করছস, তা তর জামাই কি শাড়ি দিল ঈদে? আমি কোনও উত্তর দিই নি। না ঈদে কোনও শাড়ি রুদ্র আমার জন্য কেনেনি। আমরা যেহেতু ধমের্ বিশ্বাস করি না, ঈদে বিশ্বাস করি না। শাড়ির প্রশ্ন আসে না। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ঈদে বিশ্বাস করি না বলে নয়, আমি আমার স্বনির্বাচিত স্বামীর কাছ থেকে শাড়ি গয়না পাচ্ছি না বলে। শাড়ি গয়না সুখ দেয় বলে মা হয়ত বিশ্বাস করেন না, কিন্তু শাড়ি গয়না স্ত্রীকে ভালবাসলেই স্বামীরা উপহার দিতে পারে। মা ভালবাসার সন্ধান করেন, আমার জন্য রুদ্রের। রুদ্রর টাকা কত আছে, সে কোনও উপহার দিতে সক্ষম কি না তা না দেখে একজন ডাক্তার মেয়ের জন্য যে ধরনের স্বামী পাওয়া যায়, সে সব স্বামীর যে যোগ্যতা থাকে দামি শাড়ি গয়না উপহার দেওয়ার তা থেকেই বিচার করা হয় আমি আদৌ যোগ্য স্বামী পেয়েছি কি না। রুদ্রর যোগ্যতা নিয়ে সকলের সন্দেহ আমার মনে হুল ফোটাতে থাকে। সামজিক নিয়ম কানুন অস্বীকার করি বলে ভাবি, কিন্তু সমাজে বাস করে তার সবটুকু হয়ে ওঠে না ডিঙোনো। বিয়ের অনুষ্ঠানে −ঝঁপে বৃষ্টি আসা রাতে লাল বেনারসি শাড়ি পরা সোনার অলংকার পরা লাল টুকটুক বউ চিনে রেস্তোরাঁয় যায়। বউকে ঠিক বউএর মত লাগে না, বউএর মাথায় ঘোমটা নেই। কিন্তু তবু তো বউ। রুদ্রর লেখক বন্ধুরা আসে, আমার দুচারজন ডাক্তার বন্ধু আসে, দপু ক্ষের আত্মীয়রাও আসেন, আমার আত্মীয়দের মধ্যে বড়মামা তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে, ছোটদা গীতাকে নিয়ে, রুনুখালা তাঁর বরিশালি স্বামী নিয়ে। অনুষ্ঠান বলতে খাওয়া আর গল্প গুজব। ক্যামেরার সামনে মুখে ভুবনমোহিনী হাসি নিয়ে যার সঙ্গে যার যত বিরোধই থাক না কেন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যাওয়া, ফটো তোলা।

     

    ছোটদার বাড়িতে, রুনুখালার বাড়িতে নেমন্তন্ন খেয়ে আসি রুদ্রকে নিয়ে। মা ঢাকায় এলে মাকে নিয়ে নিজের সংসার দেখিয়ে আসি। সামাজিকতা শেষ হয়। এবার কি? এবার রুদ্র মোংলা চলে যাবে, চিংড়ির ব্যবসা। বাড়িভাড়া আর সংসার খরচের টাকা বোনের হাতে দিয়ে মোংলা চলে যায় বরাবরের মত। প্রশিক্ষণ ভাতার জমানো টাকা সব অকাতরে ঢেলে বাড়িঘর সাজিয়ে, আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবীদের বিয়ের খবর প্রচার করে ভাল আছি সুখে আছি বুঝিয়ে, সংসার করছি জানিয়ে, ময়মনসিংহে নিজের যা কিছু জিনিসপত্র ছিল সব নিয়ে এসে, এমন কি নিজের শেকড়টি তুলে নিয়ে ঢাকায় পুঁতে, ভালবাসার মানুষকে নিয়ে একটি সাজানো গোছানো দাম্পত্য জীবনের স্বপ্ন দেখা মেয়ে লক্ষ্য করি নিজের সংসারে নিজে আমি গৌণ একজন মানুষ। রুদ্র কি আমাকে বিশ্বাস করে না যে আমি এই সংসারের দায়িত্ব নিতে পারব? এরকম তো নয় প্রশিক্ষণের জন্য আমার আবার ময়মনসিংহে দৌড়োতে হবে। ও পাট তো চুকেছেই। তবে কেন এই অবিশ্বাস! কেন এই আস্থাহীনতা! তীব্র অপমানবোধ আমাকে থাবা দিয়ে ধরে। রুদ্রর ভাই বোনগুলো চমৎকার। ওদের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। হাসিখুশি প্রাণচঞ্চল মানুষ। মোংলা বন্দরের বাড়িতে যেমন সবাই ঝিমিয়ে আছে বলে মনে হত এ বাড়িতে তা নয়। আবদুল্লাহ বাইরের গাড়িবারান্দায় ক্রিকেট খেলে, ইশকুলে বন্ধু বান্ধব হয়েছে অনেক। মেরিরও তাই। বন্ধু বান্ধবী বাড়িতে আসছে। হৈ হুল্লোড় হচ্ছে। ওদের সঙ্গে আমিও কদিন হৈ হুল্লোড়ে যোগ দিয়ে নিজেকে পরিবারের একজন ভাবার চেষ্টা করি। কিন্তু চেষ্টা করলেই যে হয় তা নয়। সংসারে আমার কোনও সিদ্ধান্ত নেই। ভূমিকা নেই। দায়িত্ব নেই। সবুজ চলে গেছে। ময়মনসিংহ থেকে নার্গিসের ছোট বোন বিলকিসকে নিয়ে এসেছিলাম। বিলকিসও চলে গেছে। ওরা মোংলা থেকে কাজের মেয়ে নিয়ে এসেছে। মেয়েটি ঘরদোর গুছিয়ে রাখে, রাঁধে বাড়ে, ওদের খাওয়ায়। কি বাজার হবে, কি দিয়ে কি রান্না হবে সব সিদ্ধান্ত নেয় রুদ্রর বোনেরা। টেবিলে খাবার দেওয়া হলে ডাক পড়ে আমার। খেয়ে চলে আসি নিজের ঘরে। বুঝি এ বাড়িতে আমি অতিথি ছাড়া কিছু নই। রুদ্র নিজে টাকা রোজগারের পথ পেয়ে গেছে। পরিবারের অকর্মণ্য অপদার্থ ছেলেটি হঠাৎ খুব গুরুত্বপূণর্ হয়ে উঠেছে কারণ সে পরিবারের বড় একটি দায়িত্ব নিয়েছে। বীথি সংসার করছে, সাইফুল মেডিকেলে পড়ছে। বাকি ছ ভাই বোনকে লালন পালন করার দায়িত্ব নিয়েছে রুদ্র। তিনজন এসে গেছে ঢাকায়, বাকি তিনজন আসছে। এই বড় দায়িত্বটি পেয়ে সে উত্তেজিত। রুদ্রর স্বপ্নে আমাকে নিয়ে একান্ত করে একটি সংসার পাতা নেই। ঢাকায় বাস করারও কোনও স্বপ্নটিও নেই আর। ওসব পুরোনো স্বপ্নকে ঠেলে সরিয়ে অন্য স্বপ্ন শির উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, রুদ্রর স্বপ্নে চিংড়ির ব্যবসা করে প্রচুর টাকার মালিক হওয়া আছে, স্বপ্নের মধ্যে সুষ্ঠু ভাবে তার ছভাইবোনকে বড় করা আছে। রুদ্র বলে যায় দু সপ্তাহ পর ফিরবে, দু মাস চলে গেলেও ফেরার নাম নেই। ওদের সংসারে থেকে ওদের অন্ন ধং্ব স করতে আমার লজ্জা হয়। ছোটদার বাড়ি চলে আসি। গীতার নতুন একটি বাচ্চা হয়েছে। এ বাচ্চাজ্ঞট হওয়ার সময় ক্লিনিকে ডাঃ টি এ চৌধুরি যখন বাচ্চাজ্ঞট প্রসব করাচ্ছিলেন, ডাক্তার বলে আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ভেতরে যেতে। বাচ্চাজ্ঞটর জন্ম আমার দেখা।ছোটদা নাম দিয়েছেন ঐন্দ্রিলা কামাল। ডাক নামটি আমি দিই, পরমা। পরমাকে লালন পালন করার জন্য গীতা চাকরি ছেড়েছে। ছোটদা আর গীতা দুজনই নতুন বাচ্চা নিয়ে খুশিতে লাফাচ্ছে। সুহৃদকে কাছে রাখার কোনও উৎসাহ নেই, দু বাচ্চাকে দেখাশোনা করার ঝামেলা গীতা নিতে পারবে না বলে ঢাকায় এনেও, কিছুদিন পরই সুহৃদকে যেখানে মানায়, সুহৃদের যাদের জন্য টান, তাদের কাছেই পাঠিয়ে দিয়েছে। আমার অলস অবসর কাটতে থাকে ছোটদার বাড়িতে। কখনও কখনও ঝুনু খালার বাড়িতে গিয়ে বসে থাকি। ঝুনু খালার কাছে শুনি বরিশালি স্বামীটি নাকি বড়মামার কাছে মোটা অংকের টাকা ধার চেয়েছেন। অত টাকা বড় মামার নেই যে ধার দেবেন। ঝুনু খালাকে প্রায়ই নাকি বরিশালিটি বলছেন, ফকিরের জাতরে বিয়া করে কি ঠকা ঠকেছি! আমাকে সামনে পেলেই তিনি ঝুনু খালার বয়স বেশি, ঝুনু খালা ছলে বলে কৌশলে বিয়ে করেছেন তাঁকে, তাঁর আরও ভাল পাষনী জুটতে পারত ইত্যাদি বলেন। রুনুখালার বাড়িতেও আমার ভাল লাগে না সময় কাটাতে। আমি ময়মনসিংহে ফিরি। ময়মনসিংহেও আর আগের মত ভাল লাগে না। অতিথি-মত লাগে অবকাশেও। রুদ্র ঢাকায় ফিরে এলেই আমি ও বাড়িতে যাই। রুদ্র সংসারের একজন হয়ে যায়, অতিথি আমি অতিথিই থাকি। তাকে বলি, বারবার বলি, রাগ করে বলি, আদর করে বলি, বুঝিয়ে বলি, চিংড়ির ব্যবসা ছেড়ে তুমি ঢাকায় থাকা শুরু কর, ঢাকায় কিছু কর। কিন্তু ওই ব্যবসা ছেড়ে আসা সম্ভব হবে না তার। অনেক টাকা খাটিয়েছে, লেগে থাকতে হবে। রুদ্র লেগে থাকে ব্যবসায়, আমি লেগে থাকি রুদ্রে।

     

    ফেব্রুয়ারি মাসটি রুদ্র যে করেই হোক ঢাকা থাকে। এ মাসে বই ছাপা, এ মাসে বইমেলা, এ মাসে মঞ্চে মঞ্চে কবিতা পাঠ। জানুয়ারির শেষ দিকে রুদ্র তার স্বৈরাচার নিপাত করতে নিজের হাতে অস ্ত্র নেওয়ার তীব্র ইচ্ছে প্রকাশ করা কবিতাগুলো জড়ো করতে থাকে, বই ছাপবে। প্রকাশক খুঁজে লাভ হয়নি। নিজেই ছাপবে সে বই। আমাকেও বলে আমার কবিতা জড়ো করতে। গত কয়েক বছরের লেখা কবিতাগুলো খুঁজে খুঁজে আটত্রিশটি কবিতা জড়ো করি। কবিতাগুলো রুদ্রর কবিতার মতই বেশিরভাগ অন্যায় অত্যাচার বৈষ−ম্যর বিরুদ্ধে, এবং অবশ্যই স্বৈরাচারের বিপক্ষে। দুটো পাণ্ডুলিপি নীলক্ষেতে শ্মশ্রুমণ্ডিত শ্রীমণ্ডিত কবি অসীম সাহার ছাপাখানা ইত্যাদি প্রিন্টাসের্ দিয়ে আসি ছাপতে। প্রতিদিন বিকেলে দুজন ইত্যাদিতে গিয়ে প্রুফ দেখে আসি কবিতার। শাদামাটা পঈচ্ছদ তৈরি করে বই দুটো ছেপে বাধাঁই হয়ে বেরিয়ে আসে, রুদ্রর বইএর নাম ছোবল, আমারটির নাম শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা। এই প্রথম একটি কবিতার বই বের হল আমার। আনন্দধারা নিরবধি বইতে থাকে আমার ভুবনে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে বইমেলা শুরু হওয়ার পর প্রতিদিন দুজন মেলায় যাই। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে বইমেলার প্রবেশদ্বারে ভিড়ের মধ্যে মেয়েদের স্তন ও নিতম্ব মর্দন করার জন্য ওত পেতে থাকা থাবাগুলো থেকে বহু কষ্টে নিজেকে বাঁচিয়ে মেলায় ঢুকি। মঞ্চে মঞ্চে কবিতা পড়ে সারাদিন মেলার ঘাসে, খাবার দোকানে, একাডেমির সিঁড়িতে, বইয়ের স্টলে, কবি লেখকদের সঙ্গে লম্বা লম্বা আড্ডা দিয়ে আমাদের চমৎকার সময় কাটতে থাকে। আড্ডার মূল বিষয় সাহিত্য এবং রাজনীতি। বাংলা একাডেমির মঞ্চে তো বটেই ভাষা আন্দোলনের এই মাসটিতে বিভিন্ন মঞ্চে রুদ্রও কবিতা পড়ে, রুদ্রর সঙ্গে যেহেতু আছি আমি, যেহেতু আমার কবিতা লেখার অভ্যেস আছে, আমাকেও কবিতা পড়তে বলা হয়, পড়ি। মেলার বিভিন্ন স্টলে দুজনের বইগুলো বিক্রির জন্য দেওয়ার পর প্রতিদিনই খবর নিয়ে দেখি রুদ্রর বই বিক্রি হচ্ছে কিছু আমার কিছুই নয়। মেলা শেষ হলে শিকড়ে বিপুল ক্ষুধার অবিক্রিত বইগুলো বাড়িতে ফেরত আনতে হয়। খাটের নিচে প্যাকেট বন্দি পড়ে থাকে বই। কবিতা যে আমার জন্য নয়, তা বেশ বুঝি। আমার যে এককালে কবিতা লেখার অভ্যেস ছিল, সেঁজুতি নামে পত্রিকা ছেপেছিলাম, সেসব এখন ইতিহাস, কবিতা লিখি না আর, কবিতা লেখা হয় না, পারি না—রুদ্রর বউ হিসেবেই আমি পরিচিত হয়ে উঠি সবখানে। কক্সবাজারে কবিতা পড়তে যাওয়ার আমন্ত্রণ জোটে রুদ্রর। বেশ কজন কবি রওনা হন কক্সবাজারে। রুদ্রর সঙ্গী হয়ে আমি। দুপুরে মহাদেব সাহা সমুদ্রে স্নান করতে নামেন লুঙ্গি পাঞ্জাবি আর কাঁধে গামছা নিয়ে। রুদ্র খালি গা। আমি ক্যাঙ্গারু গেঞ্জি আর জিনস। সূর্যাস্তের সময় সৈকতের বালুতে বসে কবিতাপাঠের অনুষ্ঠানটি হয়। অনুরোধে ঢেকি গেলার মত কবিতা পড়তে হয় আমাকে ওখানেও।

     

    আলাওল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে মুহম্মদ নূরুল হুদাকে। কিছু তরুণ কবিকে আমন্ত্রণ জানানো হল। রুদ্রকেও। সে ফরিদপুরেও গেল আমাকে সঙ্গে নিয়ে। দল বেঁধে গ্রামে গিয়ে কবি জসিমুদ্দিনের বাড়ি দেখে এলাম, এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে র বিখ্যাত ডালিম গাছটিও। রুদ্রর সঙ্গ এবং জীবনের এই প্রচণ্ড গতি ও ছন্দ আমাকে অপার আনন্দে ডুবিয়ে রাখে। জীবন তো আমার আর সাধারণ দশটি বাঙালি বধূর মত হতে পারত। তেল ডাল নুনের হিসেব করে সংসার কাটতে পারত। সমাজের কুসংস্কার আর বিধি নিষেধ অমান্য করেই তো আমরা এতদূর এসেছি। তবে আর অত বেশি সামাজিক হওয়ারই বা স্বপ্ন দেখা কেন! রুদ্রর সঙ্গে আলাদা করে একটি সংসার হল না বলে আমার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা একটি আক্ষেপকে আমি ঝেঁটিয়ে বিদেয় করি। রুদ্র এখন নিজের সংসারটিকে চাইছে অন্য যে কোনও সংসার থেকে সম্পণূর্ আলাদা। জগত থেকে আলাদা হয়ে, মানুষ থেকে আলাদা হয়ে দুজনে স্বাথর্প রের মত কোনও খাঁচা তৈরি করার নাম সংসার নয়। বাইরের মুক্ত জগতে আমরা বাস করব, একটি বৈষম্যহীন সুস্থ সুন্দর সমাজের জন্য আমরা লড়াই করে যাবো, এভাবেই আমরা যাপন করব বিশ্বাসে ও ভালবাসায় আমাদের যৌথ জীবন। পরষ্পরের আমরা সহযাষনী বা সহযোদ্ধা হব। ক্ষুদ্র স্বা−র্থর লেশমাত্র যেখানে থাকবে না। রুদ্রর ভাইবোনেরা মোংলা বন্দরের স্যাঁতসেঁতে সম্ভাবনাহীন পরিবেশ থেকে ঢাকায় এসে নিজেদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে এক একজন বিশাল ব্যক্তি হয়ে দেশ ও দেশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবে। ওদের আমরা আমাদের আদর্শে গড়ে তুলব।

    ঢাকায় চন্দনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। স্বামী নিয়ে ও তার স্বামীর বোনের বাড়িতে ছিল ও। যতক্ষণ আমি ও বাড়িতে ছিলাম, চন্দনা আমার সঙ্গে কথা বলেছে গলা চেপে। স্বামীসহ একদিন এসেও ছিল আমাদের বাড়িতে, ইচ্ছে ছিল কোনও রেস্তোরাঁয় খেতে যাবো সবাই মিলে। কিন্তু স্বামী বলল তার সময় নেই। আমার সঙ্গে সময় কাটানোর ইচ্ছে থাকলেও স্বামীর কারণে চলে যেতে হয়েছে চন্দনাকে। চন্দনার জীবনটি দেখে আমার কষ্ট হয়েছে, এরকম একটি জীবনের স্বপ্ন কি ও দেখেছিল! না দেখলেও এ জীবনটিতেই ও এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। গলা চেপে কথা বলা কুণ্ঠিত জীবনে। চন্দনার, আমার ধারণা হয়, আকাশ দেখারও অবসর জোটে না হয়ত। অথবা দেখতে হলেও স্বামী বা স্বামীর কোনও আত্মীয়ের অনুমতি নিতে হয়।

     

    ফেব্রুয়ারির উৎসব ফুরোলে রুদ্র আমাকে জিজ্ঞেস করে এই সংসারে তোমার কনট্রিবিউশান কি? শুনে আমি লজ্জায় বেগুনি রং ধারণ করি। প্রতি মাসে রুদ্র যেমন টাকা ঢালছে সংসারে, আমি কেন ঢালছি না! আমার এই না ঢালার কারণটি খুব সহজ, আমার হাতে কোনও টাকা পয়না নেই ঢালার, সরকারি চাকরির জন্য অপেক্ষা করছি, চাকরিটি পেলেই, যেহেতু আমি নারী পুরুষে বৈষম্যহীন জীবনের পক্ষপাতি, আমি যে স্বামীর ওপর অর্থ নৈতিক নির্ভরতা চাই না সে আমি প্রমাণ করতে পারব তার ওপর সংসারের খরচ অর্ধেক যোগাড় করতে পারব। কিন্তু সরকারি চাকরি না হওয়াতক আমি কেন উপার্জন করার চেষ্টা করছি না, না করে নিজের শরীরটিকে একটি মেদবহুল মাংসপিণ্ড তৈরি করছি! রুদ্র বলে, যদিও আমার শরীরে মেদের ছিঁটেফোঁটা নেই বরং পিঠে পড়া লম্বা চুলগুলো গীতার প্রেরণায় ঘাড় অবদি কেটে ফেলে আরও হাড়সর্বস্ব লাগে দেখতে। রুদ্রর উৎসাহে সিদ্ধেশ্বরীতে তার বন্ধু সেলিমের ওষুধের দোকানের ভেতর ডাক্তারের চেম্বারটিকে রোগি দেখার জন্য আমার বসার ব্যবস্থা হয়। শান্তিনগর মোড়ে বি এন মেডিকেল হলে

    ডাঃ তসলিমা নাসরিন,
    এম বি বি এস, বিএইচ এস আপার,
    রোগী দেখার সময় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা

    লেখা একটি সাইনবোডের্ ঝুলিয়ে দেয় সেলিম। ওখানে বিকেলে প্রজেশ কুমার রায় বসেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল থেকেই পাশ করেছেন প্রজেশ, দাদার সহপাঠি ছিলেন ইশকুলে। প্রজেশ পিজি হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে চাকরি করেন, বিকেলে রোগী দেখতে বসেন বিএন মেডিকেল হলে। আমি প্রতিদিন হাতে স্টেথোসকোপ আর রক্তচাপ মাপার যন ্ত্র নিয়ে ফার্মেসিটিতে যাই। বসে থাকি চপু চাপ। রোগী আসার নাম গন্ধ নেই। রুদ্রকে বলি, ধুর রোগী আসে না, খামোকা বসে থাকা! রুদ্র বলে, উফ এমন বাচ্চাদের মত করো না তো! বসে থাকো, ধীরে ধীরে রোগী পাবে। দিন যায়, দু একটি রোগী যা মেলে তাতে আমার রিক্সাভাড়ার অর্ধেকও ওঠে না। কোনও একটি ক্লিনিকে চাকরি খুঁজতে থাকি। পত্রিকার পাতা দেখে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলো খুঁজতে খুঁজতে ইস্কাটনের একটি ক্লিনিকে চাকরি পেয়ে যাই। ডিউটি রাতে। মাসে দেড়হাজার টাকা। প্রশিক্ষণ থেকে মাস মাস ভাতাও এই পেতাম। এ টাকায় সংসার চালানো সম্ভব নয় জানি। বাড়ি ভাড়াই বারোশো টাকা। কিন্তু তারপরও নিজে উপার্জন করার আনন্দই আলাদা। এ টাকায় নিজের হাত খরচ হবে, বাড়ির বাজার খরচাও হবে। ক্লিনিকে ঢোকার পর দেখি বাড়তিু উপার্জনের ব্যবস্থাও এখানে আছে। আমি যদি অপারেশনে এসিস্ট করি, তবে পাঁচশ থেকে একহাজার টাকা পেতে পারি। যদি রোগীর মেন্সট্রুয়েশন রেগুলাশেন অর্থাৎ এবরশন করি, তবেও পাঁচশ টাকা পাবো। রাতে যদি রোগী আসে সে রোগী দেখা আমার দায়িত্ব। রোগি যে টাকা দেবে ক্লিনিকে, তার থেকেও পারসেনটেজ পাবো। বাহ! বেশ তো। চাকরিটি চমৎকার চলছিল। মালিক ভদ্রলোকটি বেশ আন্তরিক। তিনি আমাকে এবরশান এর কটি রোগী দিয়ে এ কাজে হাত পাকানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কিন্তু রোগীর ভিড় নেই এমন এক রাতে, দশটার দিকে, মালিক আমাকে দোতলায় তার আপিসরুমে ডেকে পাঠান। খুব জরুরি হলেই সাধারণত মালিক ডেকে পাঠান। কি কারণ ডাকার? না কোনও কারণ নেই, তিনি গল্প করবেন। আমি বলি আমার নিচে যেতে হবে, কারণ যে কোনও সময় রোগি আসতে পারে। আরে বাদ দেন, রোগী এলে নাসর্ আপনাকে ডাকবে, চিন্তু করবেন না। চিন্তা আমি ও নিয়ে করি না, কারণ জানি রোগী এলেই নাসর্ আমাকে খবর পাঠাবেন। চিন্তা করি মালিকের উদ্দেশ্য নিয়ে। মালিক কি কারণে আমাকে ডেকেছেন এখানে, কোনও জরুরি কথা কি আছে? থাকলে তিনি জরুরি কথাটি না বলে আমাকে বসতে বললেন কেন! বসলে ইন্দিরা রোডের রাজাবাজারে ঠিক কোন গলিতে আমার বাড়ি, তিনি প্রায়ই ওদিকে যান বলে কোনও এক বিকেলে আমার বাড়িতেও যাবেন, বলেন কেন! একজন কবিকে কি কারণে বিয়ে করেছি, কবিকে বিয়ে করে মোটেও বুদ্ধির কাজ করিনি, বলেন কেন! স্বামীকে আমার পাশে একদমই মানায় না, স্বামী নিয়ে আমি আদৌ সুখে আছি কি না ইত্যাদিই বা কেন! আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তাঁর এত ভাবনা কেন! আমি নিশ্চিত, এগুলো কোনও জরুরি কথা নয়। কথা বলতে বলতে যে মাঝে মাঝেই চুমুক দিচ্ছেন গেলাসে, না বললেও আমি বুঝি তিনি মদ্যপান করছেন। নিশ্চিন্তে বসে, মালিক যা চাইছেন, সুখ দুঃখের গল্প করা আমার হয় না। আমি তাঁর অবাধ্য হয়ে নিচে নেমে আসি। নিচে নেমে শাদা একটি কাগজে বড় বড় করে লিখি সজ্ঞানে য়ইচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দিচ্ছি আমি।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleদ্বিখণ্ডিত – তসলিমা নাসরিন
    Next Article আমার মেয়েবেলা – তসলিমা নাসরিন

    Related Articles

    তসলিমা নাসরিন

    লজ্জা – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    আমার মেয়েবেলা – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    দ্বিখণ্ডিত – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    কিছুক্ষণ থাকো – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    ভালোবাসো? ছাই বাসো! – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    ভ্রমর কইও গিয়া – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026
    Our Picks

    ডিটেকটিভ তারিণীচরণ – কৌশিক মজুমদার

    January 31, 2026

    ভুতুড়ে ট্রেন – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026

    ব্রাহ্মণ ভূত – সমুদ্র পাল

    January 31, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }