Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    উপনিষদ – অখণ্ড সংস্করণ (অসম্পূর্ণ)

    লেখক এক পাতা গল্প390 Mins Read0
    ⤶

    ছান্দোগ্য উপনিষদ – অষ্টম অধ্যায়

    অষ্টম অধ্যায়

    প্ৰথম খণ্ড – দহরবিদ্যা—বিশ্বাত্মা ও জীবাত্মার একত্বজ্ঞান ও তৎফল

    ৫৬৭. অথ যদিদমস্মিন্ ব্রহ্মপুরে দহরং পুণ্ডরীকং বেশ দহরোহস্মিন্নন্তরাকাশস্তস্মিন্ যদন্তস্তদন্বেষ্টব্যং তদ্বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যমিতি ॥ ১

    অন্বয় : অথ (অনন্তর) যৎ ইদম্ [বেশ্ম] (এই যে গৃহে) অস্মিন্ ব্রহ্মপুরে (এই ব্রহ্মপুরে=শরীরে) দহরম্ (অল্প) পুণ্ডরীকম্ (পদ্ম) বেশ্ম দহরঃ, অস্মিন্ (ইহাতে) অন্তরাকাশঃ (অভ্যন্তরস্থ আকাশ; কিংবা অন্তঃ-অভ্যন্তরে) তস্মিন্ (তাহাতে) যৎ (যাহা) অন্তঃ (অন্তর্বর্তী; মধ্যে) তৎ (তাহা) অন্বেষ্টব্যম্ (অন্বেষণ করিতে হইবে), তৎ বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যম্ (বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে)।

    সরলার্থ : (দেহরূপ) ব্রহ্মপুরে এই যে ক্ষুদ্র পদ্মাকার গৃহ ইহাতে এক ক্ষুদ্র আকাশ আছে। তার মধ্যে যাহা আছে তাহাকে অন্বেষণ করিতে হইবে, তাহাকেই বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে।

    মন্তব্য : ব্রহ্মপুরে=ব্রহ্মের পুরে। ব্রহ্মন্ ও পুর শব্দের সমাসে ‘ব্রহ্মপুর’ হইতে পারে। কোন কোন মতে ‘যদৈতজ্জরা বাপ্নোতি’=যদা+এত+জরা+বা+ আপ্নোতি — যখন ‘জরা’ দেহকে প্রাপ্ত হয়। আমরা যে পাঠ গ্রহণ করিয়াছি তাহাতে ‘জরাঃ’ শব্দ বহুবচন। জরাবাপ্নোতি=জরা+অবাপ্নোতিও হইতে পারে।

    ৫৬৮. তৎ চেদ ব্রুয়ুর্যদিদমস্মিন্ ব্রহ্মপুরে দহরং পুণ্ডরীকং বো দহরোহস্মিন্নন্তরাকাশঃ কিং তদত্র বিদ্যতে যদন্বেষ্টব্যং যদ্বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যমিতি ॥ ২

    ৫৬৯. স য়াদ্ যাবান্ বা অয়মাকাশস্তাবানেষোহন্তহৃদয় আকাশ উভে অস্মিন্ দ্যাবাপৃথিবী অন্তরেব সমাহিতে উভাবগ্নিশ্চ বায়ুশ্চ সূর্যাচন্দ্রমসাবুভৌ বিদ্যুম্নক্ষত্রাণি যচ্চাস্যেহাস্তি যচ্চ নাস্তি সর্বং তদস্মিন্ সমাহিতমিতি ॥ ৩

    অন্বয় : তম্ (আচার্যকে) চেৎ (যদি) ব্রুয়ুঃ (যদি বলে)—যৎ ইদম্ অস্মিন্ ব্রহ্মপুরে দহরম্ পুণ্ডরীকম্ বেশ দহরঃ অস্মিন্ অন্তঃ আকাশঃ কিম্ (কি) তৎ (তাহা) অত্র (এখানে) বিদ্যতে (আছে), যৎ (যাহা) অন্বেষ্টব্যম্ যৎ বাব বিজিজ্ঞাসিতব্যম্? ইতি—সঃ (আচার্য) ব্রুয়াৎ (বলিবেন) (১মঃ) যাবান্ (যে পরিমাণ) বৈ অয়ম্ (এই) আকাশঃ তাবান্ (সেই পরিমাণ) এষঃ (এই) অন্তঃ (অভ্যন্তরে) হৃদয়ে আকাশঃ। উভে (উভয়) অস্মিন্ (ইহাতে) দ্যাবাপৃথিবী (দ্যাবাপৃথিব্যৌ—দ্যৌ ও পৃথিবী) অন্তঃ এব সমাহিতে (সমাহিত) উভৌ (উভয়) অগ্নিঃ চ বায়ুঃ চ, সূর্যাচন্দ্রমসৌ (সূর্য ও চন্দ্র) উভৌ, বিদ্যুৎ+নক্ষত্রাণি (বিদ্যুৎ ও নক্ষত্রসমূহ), যৎ চ (যাহা) অস্য (দেহবান্ আত্মার) ইহ (ইহলোকে) অস্তি (আছে), যৎ চ ন অস্তি—সর্বম্ তৎ (সেই সমুদয়) অস্মিন্ (ইহাতে) সমাহিতম্ ইতি।

    সরলার্থ : (২য় ও ৩য় মন্ত্ৰ)—ইহা শুনিয়া যদি শিষ্যগণ আচার্যকে জিজ্ঞাসা করেন, এই ব্রহ্মপুরে ক্ষুদ্র পদ্মাকার গৃহের মধ্যে যে ক্ষুদ্র আকাশ—তাহাতে এমন কি আছে যাহা অন্বেষণ করিতে হইবে এবং বিশেষরূপে জিজ্ঞাসা করিতে হইবে? তবে আচার্য বলিবেন—বাহিরের এই আকাশ যতখানি, হৃদয়ের আকাশও ততখানিই। স্বর্গ ও পৃথিবী উভয়েই ইহার মধ্যে নিহিত রহিয়াছে। আরও আছে অগ্নি ও বায়ু, সূর্য ও চন্দ্র, বিদ্যুৎ ও নক্ষত্রসমূহ এবং এই দেহবান্ আত্মার ইহলোকে নিজের বলিতে যাহা আছে বা নাই তাহার সমস্ত কিছুও ইহাতে নিহিত।

    ৫৭০. তং চেদ্ ব্রুয়ুরস্মিংশ্চেদিদং ব্রহ্মপুরে সর্বং সমাহিতং সর্বাণি চ ভূতানি সর্বে চ কামা যদৈতজ্জরা বাপ্নোতি প্রধ্বংসতে বা কিং ততোঽতিশিষ্যত ইতি ॥ ৪

    অন্বয় : তম্ (আচার্যকে) চেৎ (যদি) ব্রুয়ুঃ (শিষ্যগণ বলেন) অস্মিন্ [ব্রহ্মপুরে] (এই ব্রহ্মপুরে) চেৎ ইদম্ [সর্বম্] (এই সমুদয়) ব্রহ্মপুরে সর্বম্ সমাহিতম্, সর্বাণি চ ভূতানি (সমুদয় ভূত) সর্বে চ কামাঃ (সমুদয় কামনা)—যদা (যখন) এতৎ (ইহা; এই শরীর) জরাঃ (বার্ধক্যদশাকে) বা আপ্নোতি (প্রাপ্ত হয়) প্রধ্বংসতে বা (কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়)—কিম্ (কি) ততঃ (তখন; কিংবা ইহা হইতে ‘পৃথক্’) অতিশিষ্যতে (অবশিষ্ট থাকে) ইতি।

    সরলার্থ : শিষ্যগণ যদি আচার্যকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘এই ব্রহ্মপুরে যদি সর্বভূত, সকল কামনা এই সমস্তই নিহিত থাকে, তবে এই দেহ যখন জরাগ্রস্ত হয় কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তখন কি অবশিষ্ট থাকে?

    ৫৭১. স ব্রুয়ান্নাস্য জরয়ৈতজ্জীর্যতি ন বধেনাস্য হন্যত এতৎ সত্যং ব্রহ্মপুরমস্মিন্ কামাঃ সমাহিতা এষ আত্মাপহতপাদ্মা বিজরো বিমৃত্যুর্বিশোকো বিজিঘৎসোহপিপাসঃ সত্যকামঃ সত্যসংকল্পো যথা হ্যেবেহ প্রজা অন্বাবিশন্তি যথানুশাসনং যং যমন্তমভিকামা ভবন্তি যং জনপদং যং ক্ষেত্রভাগং তং তমেবোপজীবন্তি ॥ ৫

    অন্বয় : সঃ (তিনি) ব্রুয়াৎ (বলিবেন)—ন (না) অস্য (ইহার অর্থাৎ দেহের) জরয়া (জরা দ্বারা) এতৎ (ইহা, হৃদয়স্থ আকাশ) জীর্ঘতি (জীর্ণ হয়), ন বধেন (বিনাশ দ্বারা) অস্য (ইহার, দেহের) হন্যতে (হত হয়)। এতৎ (ইহা) সত্যম্, ব্রহ্মপুরম্। অস্মিন (ইহাতে) কামাঃ (কামনাসমূহ) সবাহিতাঃ (নিহিত)। এষঃ (এই) আত্মা; অপহতপাদ্মা (যাহার পাপ বিগত হইয়াছে; পাপ্পা—পাপ, দুঃখ) বিজরঃ (জরারহিত), বিমৃত্যুঃ (মৃত্যুরহিত), বিশোকঃ (শোকরহিত) বিজিঘৎসঃ (ভোজনেচ্ছারহিত; জিঘৎসা—ভোজন করিবার ইচ্ছা) অপিপাসঃ (পিপাসারহিত) সত্যকামঃ (সত্য যাহার কামনা) সত্যসংকল্পঃ (সত্য যাহার সংকল্প)। যথা (যেমন) হি এব ইহ (ইহলোকে) প্রজাঃ (মানবগণ, অনু+আবিশন্তি (অনুবর্তন করে) যথা+অনুশাসনম্ (রাজশাসনানুসারে) যম্ যম্ অন্তম্ (যে যে প্রদেশকে) অভিকামাঃ ভবন্তি (কামনা করে)—যম্ জনপদম্ (যে কোন জনপদকে), যম্ ক্ষেত্রভাগম্ (যে কোন ক্ষেত্রকে)—তম্ তম্ এব (সেই সেই বস্তুকে) উপজীবন্তি (উপভোগ করিয়া থাকে)।

    সরলার্থ : আচার্য উত্তরে বলিবেন—দেহের জরায় অন্তরস্থ আকাশ জীর্ণ হয় না; দেহ নষ্ট হইলে ইহার নাশ হয় না। ইহাই সত্যস্বরূপ ব্রহ্মপুর। ইহাতে সমস্ত কামনা নিহিত রহিয়াছে। ইনিই আত্মা এবং ইনি পাপ, জরা, মৃত্যু, শোক ও ক্ষুধারহিত— সত্যকাম, সত্যসংকল্প। এই পৃথিবীতে মানুষ যদি রাজার আদেশানুসারে কাজ করে তবে সে যে যে বস্তু কামনা করে—যে যে জনপদ, যে যে ক্ষেত্র লাভ করিতে ইচ্ছা করে—(রাজার অনুগ্রহে) সে সেই সবই লাভ করে।

    মন্তব্য : ‘যম্ যম্ অন্তম্’, ‘যম্ জনপদম্’, ‘যম্ ক্ষেত্রভাগম্’—এই কয়েকটির একাধিক অর্থ হইতে পারে। কেহ কেহ বলেন ‘অন্তম্’ কথাটি ‘জনপদম্’ এবং ‘ক্ষেত্রভাগম্’ এই দুইটির বিশেষণ, ইহার অর্থ নিকটস্থ। কাহারও কাহারও মতে এখানে ‘অন্তম্, জনপদম্’ ও ‘ক্ষেত্রভাগম্’ এই তিনটি বিষয়ের কথা বলা হইয়াছে, ইহাদিগের মতে অন্তম্—প্রদেশ। আবার কেহ বলেন, ‘অন্তম্’ কথাটিকেই ‘জনপদম্’ ও ‘ক্ষেত্রভাগম্’ দ্বারা ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, এস্থলে অন্তম্—নিকটস্থ বস্তু বা প্রদেশ। তাহা হইলে অর্থ হইবে এই— যে যে বস্তু কামনা করে, তাহা জনপদই হউক বা ভূমিখণ্ডই হউক

    ৫৭২. তদ্ যথেহ কর্মজিতো লোকঃ ক্ষীয়ত এবমেবামুত্র পুণ্যজিতো লোকঃ ক্ষীয়তে। তদ্ য ইহাত্মানমননুবিদ্য ব্ৰজন্ত্যেতাংশ্চ সত্যান্ কামা – স্তেষাং সর্বেষু লোকেম্বকামচারো ভবতি। অথ য ইহাত্মানমনুবিদ্য ব্ৰজন্ত্যেতাংশ্চ সত্যান্ কামাংস্তেষাং সর্বেষু লোকেষু কামচারো ভবতি॥৬ অন্বয় : তৎ যথা (যেমন) ইহ (এই জগতে) কর্মজিতঃ (কর্মলব্ধ, রাজসেবাদি কর্মদ্বারা লব্ধ) লোকঃ (ক্ষেত্রাদি) ক্ষীয়তে (ক্ষয়প্রাপ্ত হয়), এবম্ এব (এই প্রকার) অমূত্র (পরলোকে) পুণ্যজিতঃ (অগ্নিহোত্রাদি এবং দানাদি দ্বারা লব্ধ) লোকঃ (স্বর্গাদি) ক্ষীয়তে। তৎ যে (যাহারা) ইহ আত্মানম্ (আত্মাকে) অননুবিদ্য (না জানিয়া, লাভ না করিয়া; অনুবিদ্যা—জানিয়া বা লাভ করিয়া) ব্রজন্তি (পৃথিবী হইতে চলিয়া যায়), এতান্ চ সত্যান্ কামান্ (এই সমুদয় সত্য কামনাকে), তেষাম্ (তাহাদিগের) সর্বেষু লোকে (সর্বলোকে) অকামচারঃ (পরাধীনতা) ভবতি (হয়)। অথ (আর) যে (যাহারা) ইহ আত্মানম্ অনুবিদ্য ব্ৰজন্তি, এতান্ চ সত্যান্ কামান্, তেষাম্ সর্বেষু লোকেষু কামচারঃ (স্বাধীনতা) ভবতি।

    সরলার্থ : কিন্তু কর্মলব্ধ এই সব বস্তু অর্থাৎ ভূমি কি জনপদের (ইহলোকে) যেমন ক্ষয় হয় তেমনি পরলোকেও পুণ্যার্জিত ভোগের বিনাশ হইয়া থাকে। যে ব্যক্তি ইহলোকে এই আত্মাকে এবং সত্যকামনাসমূহকে না জানিয়া চলিয়া যায়, সে সর্বলোকে পরাধীন হয়, আর যিনি ইহলোকে এই আত্মাকে এবং সত্যকামনাসমূহকে জানিয়া দেহত্যাগ করেন সর্বলোকে তাঁহার স্বাধীন গতি হইয়া থাকে।

    মন্তব্য : শঙ্করাচার্য ৫ম মন্ত্রের শেষ অংশ এবং ৬ষ্ঠ মন্ত্রের প্রথমাংশকে পৃথক পৃথক দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি পঞ্চম মন্ত্রের শেষ অংশের এইরূপ ব্যাখ্যা দিয়াছেন—প্রজাগণ যাহাকে প্রভু বলিয়া মনে করে, তাহার শাসনের অধীন হইয়া জনপদ ক্ষেত্রভাগাদি ভোগ করিয়া থাকে। এখানে প্রজার যেমন স্বাধীনতা নাই, তেমনি পুণ্যফলভোগেও মানুষের স্বাধীনতা নাই। শঙ্করাচার্য বলেন এই দৃষ্টান্ত দ্বারা পুণ্যফলভোগের অস্বাতন্ত্র্য-দোষ দেখান হইয়াছে এবং ৬ষ্ঠ মন্ত্রে অন্য একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা দেখান হইয়াছে যে, কর্মফলের ক্ষয় হইয়া থাকে।

    দ্বিতীয় খণ্ড – পরলোকে জ্ঞানীর কামনাপূরণ

    ৫৭৩. স যদি পিতৃলোককামো ভবতি সঙ্কল্পাদেবাস্য পিতরঃ সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন পিতৃলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ১

    অন্বয় : সঃ যদি পিতৃলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব (সঙ্কল্প হইবামাত্রই) অস্য (ইহার) পিতরঃ (পিতৃপুরুষগণ) সম্—উৎ+তিষ্ঠন্তি (পুরোভাগে উপস্থিত হন)। তেন পিতৃলোকেন (সেই পিতৃলোকের সহিত) সম্পন্নঃ (যুক্ত হইয়া) মহীয়তে (পূজনীয় হন, মহীমাযুক্ত হন)।

    সরলার্থ : তিনি যদি পিতৃলোক কামনা করেন, তবে সঙ্কল্পমাত্রই পিতৃগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি পিতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    মন্তব্য : ‘পিতৃলোক’ অর্থ ‘পিতৃপুরুষগণের লোক’ নহে। এস্থলে পিতৃপুরুষগণকেই লোক বলা হইয়াছে। শঙ্কর বলেন—’পিতৃপুরুষগণ আমাদিগকে সুখপ্রদান করেন, সুতরাং তাঁহারাও আমাদিগের বিষয়বস্তু। এইজন্য ইহাদিগকেও লোক বলা হইয়াছে। ‘ মাতৃলোক, ভ্রাতৃলোক প্রভৃতিরও এই ব্যাখ্যা।

    ৫৭৪. অথ যদি মাতৃলোককামো ভবতি সঙ্কল্পাদেবাস্য মাতরঃ সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন মাতৃলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ২

    অন্বয় : অথ যদি মাতৃলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য মাতরঃ (মাতৃগণ সমুত্তিষ্ঠন্তি, তেন মাতৃলোকেন (মাতৃগণের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ দ্রঃ)।

    সরলার্থ : তিনি যদি মাতৃলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই মাতাগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি মাতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    ৫৭৫. অথ যদি ভ্রাতৃলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য ভ্রাতরঃ সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন ভ্রাতৃলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৩

    অন্বয় : অথ যদি ভ্রাতৃলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য ভ্রাতরঃ (ভ্রাতৃগণ) সমুত্তিষ্ঠন্তি, তেন ভ্রাতৃলোকেন (ভ্রাতৃগণের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর তিনি যদি ভ্রাতৃলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই ভ্রাতাগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি ভ্রাতৃলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    ৫৭৬. অথ যদি স্বসৃলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য স্বসারঃ সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন স্বসৃলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৪

    অন্বয় : অথ যদি স্বসৃলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য স্বসারঃ (ভগিনীগণ) সমুত্তিষ্ঠন্তি; তেন স্বসূলোকেন সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি ভগিনীলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই ভগিনীগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি ভগিনীলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    ৫৭৭. অথ যদি সখিলোককামো ভবতি সঙ্কল্পাদেবাস্য সখায় সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন সখিলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৫

    অন্বয় : অথ যদি সখিলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য সখায়ঃ (সমুদয় সখা) সমুত্তিষ্ঠন্তি, তেন সখিলোকেন (সখাদিগের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি সখিলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই সখিগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হন এবং তিনি সখিলোক পাইয়া মহীয়ান হন।

    ৫৭৮. অথ যদি গন্ধমাল্যলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য গন্ধমাল্যে সমুত্তিষ্ঠতস্তেন গন্ধমাল্যলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৬

    অন্বয় : অথ যদি গন্ধমাল্য-লোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য গন্ধমাল্যে (গন্ধ ও মাল্য) সমুত্তিষ্ঠতঃ (উপস্থিত হয়); তেন গন্ধমাল্যলোকেন (গন্ধমাল্যরূপ লোকের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি গন্ধমাল্যরূপ লোক পাইবার অভিলাষ করেন, সঙ্কল্পমাত্রই গন্ধমাল্যরূপ লোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি গন্ধমাল্যলোক পাইয়া মহীয়ান হন।

    ৫৭৯. অথ যদ্যন্নপানলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্যান্নপানে সমুত্তিষ্ঠত স্তেনানুপানলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৭

    অন্বয় : অথ যদি অনুপান লোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্গাৎ এব অস্য অন্নপানে (অন্ন ও পানীয়) সমুত্তিষ্ঠতঃ (উপস্থিত হয়); তেন অনুপান-লোকেন (অন্নপানরূপ লোকের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি অনুপানরূপ-লোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই অনুপানরূপ-লোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি অনুপানলোক পাইয়া মহীয়ান হন।

    ৫৮০. অথ যদি গীতবাদিত্ৰলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য গীতবাদিতে সমুত্তিষ্ঠতস্তেন গীতবাদিত্রলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৮

    অন্বয় : অথ যদি গীত-বাদিত্ৰ-লোককামঃ (বাদিত্র=বাদ্যযন্ত্র বা বাদ্য) ভবতি, সঙ্কল্গাৎ এব অস্য গীতবাদিত্রে (গীত ও বাদিত্র) সমুত্তিষ্ঠতঃ (উপস্থিত হয়), তেন গীত—বাদিত্র-লোকেন (গীত ও বাদিত্রের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি গীতবাদ্য-লোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই গীতবাদ্যলোক তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি গীতবাদ্যলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    ৫৮১. অথ যদি স্ত্রীলোককামো ভবতি, সঙ্কল্পাদেবাস্য ত্রিয়ঃ সমুত্তিষ্ঠন্তি। তেন স্ত্রীলোকেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ৯

    অন্বয় : অথ যদি স্ত্রীলোককামঃ ভবতি, সঙ্কল্পাৎ এব অস্য ত্রিয়ঃ (নারীগণ) সমুত্তিষ্ঠন্তি (সমীপে উপস্থিত হয়); তেন স্ত্রীলোকেন (নারীগণের সহিত) সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : আর যদি তিনি নারীলোক কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই নারীগণ তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি নারীলোক লাভ করিয়া মহীয়ান হন।

    ৫৮২. যং যমন্তমভিকামো ভবতি যং কামং কাময়তে, সোহস্য সঙ্কল্পাদের সমুত্তিষ্ঠতি। তেন সম্পন্নো মহীয়তে ॥ ১০

    অন্বয় : যম্ যম্ অন্তম্ (যে যে বিষয়ের বা প্রদেশের প্রতি) অভিকামঃ (অভিলাষী) ভবতি, যম্ কামম্ (যে যে কামনাকে) কাময়তে (কামনা করে), সঃ (তাহা) অস্য সঙ্কল্গাৎ এব সমুত্তিষ্ঠতি; তেন সম্পন্নঃ মহীয়তে (১মঃ)।

    সরলার্থ : তিনি যে যে বিষয় (বা প্রদেশ) পাইতে ইচ্ছা করেন, যে কাম্যবস্তু কামনা করেন, সঙ্কল্পমাত্রই তাহা তাঁহার নিকট উপস্থিত হয় এবং তিনি উহা লাভ করিয়া মহিমান্বিত হন

    তৃতীয় খণ্ড – অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত সত্য কামনা-’সত্য’ ও ‘হৃদয়’ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যা

    ৫৮৩. ত ইমে সত্যাঃ কামা অনৃতাপিধানাস্তেষাং সত্যানাং সতামনৃতমপিধান যো যো হাস্যেতঃ প্রৈতি ন তমিহ দর্শনায় লভতে ॥ ১

    অন্বয় : তে ইমে (সেই এই) সত্যাঃ কামাঃ (সত্য কামনাসমূহ) অনৃত+অপিধানাঃ (অসত্য যাহাদিগের আবরণ)। তেষাম্ সত্যানাম্ (সেই সত্যকামনাসমূহের) সতাম্ (আত্মাতে বর্তমান) অনৃতম্ (অসত্য) অপিধানম্ (আচ্ছাদন)। যঃ যঃ (যে যে ‘আত্মীয়”) হি অস্য (ইহার) ইতঃ (এই পৃথিবী হইতে) প্রৈতি (চলিয়া যায়) ন (না) তম্ (তাহাকে) ইহ (এই পৃথিবীতে) দর্শনায় (দর্শন করিবার জন্য) লভতে (লাভ করে)।

    সরলার্থ : কিন্তু এই সব সত্যকামনা অসত্যের আবরণে আবৃত। এই সকল সত্যকামনা আত্মাতে থাকিলেও তাহারা অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত। সেইজন্য ইহার (অর্থাৎ অজ্ঞান ব্যক্তির) কোন আত্মীয় যদি ইহলোক হইতে চলিয়া যায়, সে তাহাকে আর পৃথিবীতে দেখিতে পায় না।

    ৫৮৪. অথ যে চাস্যেহ জীবা যে চ প্রেতা যচ্চান্যদিচ্ছন্ন লভতে সর্বং তদ গত্বা বিন্দতেহএ হ্যস্যৈতে সত্যাঃ কামা অনৃতাপিধানাঃ। তদ্ যথাপি হিরণ্যনিধিং নিহিতমক্ষেত্রজ্ঞা উপর্যুপরি সঞ্চরন্তো ন বিন্দেয়ুরেবমে- বেমাঃ সর্বাঃ প্রজা অহরহর্গচ্ছন্ত্য এতং ব্রহ্মলোকং ন বিন্দন্ত্যনৃতেন হি প্রত্যূঢ়াঃ ॥ ২

    অন্বয় : অথ যে চ (যাহারা) অস্য (ইহার; শঙ্করের মতে বিদ্বান জীবের) ইহ জীবাঃ (জীবিত) যে চ প্রেতাঃ (যে দূরে গমন করে, মৃত), যৎ চ অন্যৎ (অন্য যে সমুদয় বস্তু) ইচ্ছন্ (ইচ্ছা করিয়া) ন লভতে (প্রাপ্ত হয়)—সর্বম্ তৎ (সেই সমুদয়) অত্র (এই স্থানে) গত্বা (গমন করিয়া) বিন্দতে (লাভ করে)। অত্র হি অস্য এতে সত্যাঃ কামাঃ অনৃত+অপিধানাঃ (১মঃ)। তৎ+যথা (যেমন) অপি হিরণ্যনিধিম্ (সুবর্ণরূপ ধনকে) নিহিতম্ অক্ষেত্রজ্ঞাঃ (ক্ষেত্রে নিহিত ধনের বিষয় যাহারা জানে না) উপরি+উপরি (বারংবার) সঞ্চরন্তঃ [অপি] (বিচরণ করিয়াও) ন (না) বিন্দেয়ুঃ (লাভ করিতে পারে),-এবম্ এব (এই প্রকার) ইমাঃ সর্বাঃ প্রজাঃ (এই সমুদয় প্রাণী) অহঃ+অহঃ (প্রতিদিন) গচ্ছন্ত্যঃ (গমন করিয়া) এতম্ ব্রহ্মলোকম্ (এই ব্রহ্মলোককে) ন বিন্দন্তি (লাভ করে) অনূতেন (অসত্য দ্বারা) প্রত্যুঢ়াঃ (প্রতি-উহ; আচ্ছাদিত)।

    সরলার্থ : আর ইহার যে সব আত্মীয় জীবিত রহিয়াছে ও যাহাদের মৃত্যু হইয়াছে এবং মানুষ ইচ্ছা করিয়াও যে সকল বস্তু লাভ করিতে পারে না—সেই হৃদয়াকাশে যাইয়া এই সমস্তই সে লাভ করে। মানুষের যাবতীয় সত্যকামনাই এইখানে বর্তমান; কিন্তু সে সব অসত্য আবরণে আবৃত। অক্ষেত্রজ্ঞ ব্যক্তি যেমন বারবার বিচরণ করিয়াও ক্ষেত্রে নিহিত সুবর্ণধন লাভ করিতে পারে না, তেমনি প্রাণিগণ অহরহ ব্রহ্মলোকে গেলেও সত্য বস্তু লাভ করিতে পারে না, কারণ তাহারা অসত্য দ্বারা আচ্ছাদিত।

    মন্তব্য : এই হৃদয়াকাশে বিশ্বচরাচর নিহিত। সুষুপ্তির সময়ে সকলেই এইখানে ব্রহ্মের সহিত সম্মিলিত হয়; এই সময়ে সকলেই বিশ্বচরাচর সহ ব্রহ্মলাভ করিয়া থাকে। তবে যে ইহা জানিতে পারে না তাহার কারণ অজ্ঞানতা।

    ৫৮৫. স বা এষ আত্মা হৃদি তস্যৈতদেব নিরুক্তং হৃদ্যয়মিতি তস্মাদ্ধৃদয়মহরহর্বা এবংবিৎ স্বর্গং লোকমেতি ॥ ৩

    অন্বয় : সঃ বৈ এষঃ (সেই এই) আত্মা হৃদি (হৃদয়ে); তস্য (তাহার) এতদ্ এব (ইহাই) নিরুক্তম্ (নিঃ-উক্তম্=ব্যাখ্যা, মৌলিক অর্থ)—হৃদি অয়ম্ ইতি; তস্মাৎ (সেইজন্য) হৃদয়ম্ (হৃদয় এই নাম)। অহঃ+অহঃ বে এবম্+বিৎ (এই প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন) স্বর্গম্ লোকম্ (স্বর্গলোকে) এতি (গমন করে)।

    সরলার্থ : সেই আত্মা হৃদয়ে অবস্থিত। তাহার ব্যাখ্যা এই—অয়ম্ (ইহা) হৃদি (হৃদয়ে) এইজন্য ইহার নাম হৃদয়ম্। যিনি এই কথা জানেন, তিনি প্রতিদিন স্বর্গলোকে যান অর্থাৎ সুষুপ্তির সময়ে হৃদয়াকাশে ব্রহ্মলাভ করেন।

    মন্তব্য : (১) এখানে ‘নিরুক্ত’ একটি সাধারণ শব্দ; অনেকেই মনে করেন ‘নিরুক্ত’ নামক গ্রন্থ বহু পরে রচিত হইয়াছিল। (২) হৃদ্যয়ম্—হৃদি+অয়ম্—ইনি হৃদয়ে। ‘হৃদ্যয়ম্’ এবং ‘হৃদয়ম্’ এই দুইটির উচ্চারণ প্রায় এক। ঋষি বলিতেছেন—ইনি (ইদম্) অর্থাৎ ব্রহ্ম হৃদয়ে (হৃদি), এইজন্য তাহার বিষয় বলা হয় ‘হৃদ্যয়ম্। সুতরাং হৃদয়ম্=হৃদয়ই ব্ৰহ্ম।

    ৫৮৬. অথ য এষ সংপ্রসাদোহ মাচ্ছরীরাৎ সমুথায় পরং জ্যোতিরূপসম্পদ্য স্বেন রূপেণাভিনিষ্পদ্যত এষ আত্মেতি হোবাচৈতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্মেতি তস্য হ বা এতস্য ব্ৰহ্মণো নাম সত্যমিতি ॥ ৪

    অন্বয় : অথ যঃ এষঃ (এই যে) সম্প্রসাদঃ (প্রসন্নভাব, প্রসাদ গুণযুক্ত বলিয়া সুষুপ্ত আত্মার নাম সম্প্রসাদ) অস্মাৎ শরীরাৎ (এই শরীর হইতে) সমুথায় (উত্থিত হইয়া) পরং জ্যোতিঃ (পরম জ্যোতি) উপসম্পদ্য (লাভ করিয়া) স্বেন রূপেন স্বীয়রূপে) অভিনিষ্পদ্যতে (প্রকাশিত হয়)। এষঃ (ইনিই) আত্মা, ইতি হ উবাচ; এতৎ (ইহা) অমৃতম্, অভয়ম্, এতৎ ব্রহ্ম ইতি। তস্য হ বৈ এতস্য ব্রহ্মণঃ (সেই এই ব্রহ্মের) নাম সত্যম্ ইতি।

    সরলার্থ : আচার্য বলিলেন, ‘আর এই যে সম্প্রসাদ (প্রসাদগুণ পুরুষ) যিনি শরীর হইতে বাহির হইয়া পরম জ্যোতিঃসম্পন্ন হইয়া নিজরূপে প্রকাশিত হন—ইনিই আত্মা, ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্রহ্ম; এই ব্রহ্মের নামই সত্য।’

    ৫৮৭. তানি হ বা এতানি ত্রীণ্যক্ষরাণি সতীয়মিতি, তদ্ যৎ সত্তদমৃতমথ যত্তি তন্মাতমথ যদ্ যং তেনোভে যচ্ছতি যদনেনোভে যচ্ছতি তস্মাদ্ যম- হরহবা এবংবিৎ স্বর্গং লোকমেতি ॥ ৫

    অন্বয় : তানি হ বৈ এতানি ত্রীণি (সেই এই তিন) অক্ষরাণি (অক্ষরসমূহ) সতীয়ম্ (=স+তী+যম্; স, ত এবং যম্ এই তিনটি অক্ষর; ‘তী’র ‘ঈ’ উচ্চারণের জন্য) ইতি। তৎ যৎ (সেই যে; কিংবা তৎ—সেই স্থলে) ‘সৎ’ (‘সৎ’ এই অক্ষর; কিংবা ‘স’ অক্ষর ‘ৎ’ উচ্চায়ণার্থ) তৎ (তাহা) অমৃতম্; অথ (তাহার পর) যৎ (যে) তি (‘ত’ এই অক্ষর, ‘ই’ উচ্চারণের জন্য), তৎ মার্ত্যম্ (মরণশীল); অথ যৎ যম্ (‘যম্’ এই অক্ষর), তেন (তাহার দ্বারা) উভে (উভয়কে অর্থাৎ ‘স’ এবং ‘ত’ এই দুই অক্ষরকে) যচ্ছতি (যম্; নিয়মিত করে, কর্তা উহ্য)। যৎ (যেহেতু) অনেন (ইহা দ্বারা; ‘যম্’ অক্ষর দ্বারা) উভে যচ্ছতি, তস্মাৎ (সেইজন্য) যম্ (ইহার নাম ‘যম্’)। অহরহঃ বৈ এববিৎ (এই প্রকার জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি) স্বর্গম্ লোকম্ (স্বর্গলোকে) এতি (গমন করে)।

    সরলার্থ : (‘সত্যম্’ শব্দে) এই তিনটি অক্ষর সৎ (বা স), তি, যম্। এই যে ‘সৎ’ অক্ষর ইহা অমৃত; আর ‘তি’ অক্ষর মর্ত্য। ‘যম্’ অক্ষর দ্বারা এই উভয়কে (অর্থাৎ ‘সৎ’ ও ‘তি’কে অথবা অমৃত ও মর্ত্যকে) নিয়মিত করা হয়। ইহা দ্বারা স্বর্গ ও মর্ত্য এই উভয়কে নিয়মিত করা হয় বলিয়া ইহার নাম যম্। যিনি ইহা জানেন, তিনি অহরহ স্বৰ্গলোকে যান।

    মন্তব্য : (ক) ‘সত্যম্’ এবং ‘সতীয়ম্’ এই দুইটি শব্দের উচ্চারণ প্রায় একই; সুতরাং মনে করিয়া লইতে হইবে এ দুইটি একই কথা। (খ) শঙ্কর ও আনন্দগিরি বলেন—এই মন্ত্রে একস্থলে ‘তী’ অপর স্থলে ‘তি’। ‘সতীয়ম্’ শব্দে ‘তী’; এস্থলে ‘ত’ অক্ষরে ‘ঈ’। ‘যৎ তি’ অংশে ‘তি’; এ স্থলে ‘ত’ অক্ষরে ‘ই’; সুতরাং বুঝিতে হইবে, এই ‘ঈ’ এবং ‘ই’ কেবল উচ্চারণের জন্য, ইহাদিগের অন্য কোন অর্থ নাই। সুতরাং সতীয়ম্=স+ত+যম্। (গ) মোক্ষমূলার বলেন ‘সতীয়ম্’ পাঠ গ্রহণ না করিয়া ‘সত্তীয়ম্’ পাঠ গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয়। সত্তীয়ম্=সৎ+তী+য়ম্। এই শব্দের পরে প্রথমে ‘সৎ’ শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। সতীয়ম্ পাঠ হইলে ‘স’ বর্ণের ব্যাখ্যা দেওয়া হইত। (ঘ) বৃহদারণ্যক উপনিষদ ‘সত্যম্’ শব্দের ‘স’, ‘ত’ এবং ‘যম্’ এই তিন অক্ষরের ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। এস্থলেও মন্ত্রে ‘ত’ স্থলে ‘তী’ ব্যবহৃত হইয়াছে ৫।৫।১)। (ঙ) তৈত্তিরীয় উপনিষদে সত্য=‘স্যৎ’ এবং ত্যৎ (216)।

    চতুর্থ খণ্ড – ব্রহ্ম সেতুস্বরূপ—ব্রহ্মলোকের বর্ণনা (১)

    ৫৮৮. অথ য আত্মা স সেতুর্বিধৃতিরেষাং লোকানামসংভেদায় নৈত সেতুমহোরাত্রে তরতো ন জরা ন মৃত্যুর্ন শোকো ন সুকৃতং ন দুষ্কৃতং সর্বে পাপ্পানোহতো নিবর্তন্তেহপহতপাপ্পা হোষ ব্ৰহ্মলোকঃ ॥ ১

    অন্বয় : অথ (অনন্তর) যঃ (যিনি) আত্মা, সঃ (তিনি) সেতুঃ, বিধৃতিঃ (ধারণকর্তা) এযাম্ লোকানাম্ (এই স্বর্গাদি লোকসমূহের) অসম্ভেদায় (ভিন্ন না হইয়া যায়, এইজন্য)। ন এতম্ সেতুম্ (এই সেতুকে) অহোরাত্রে (দিবস ও রাত্রি) তরতঃ (পার হইয়া যায়); ন জরা, ন মৃত্যুঃ, ন শোকঃ, ন সুকৃতম, ন দুষ্কৃতম্ সর্বে পাপ্পানঃ (সমুদয় পাপ) অতঃ (ইহা হইতে) নিবর্তন্তে (ফিরিয়া আইসে)। অপহত-পাপ্পা (বিগতপাপ) হি এষঃ (এই) ব্রহ্মলোকঃ (ব্রহ্মলোক)।

    সরলার্থ : এই যে আত্মা, ইনি সেতুস্বরূপ। লোকসমূহ যাহাতে বিচ্ছিন্ন না হইয়া যায়, এইজন্য ইনি তাহাদের ধরিয়া রহিয়াছেন। দিন ও রাত্রি এই সেতু পার হইতে পারে না; জরা, মৃত্যু, শোক, সুকৃতি, দুষ্কৃতি—ইহারাও পারে না। সমস্ত পাপ ইহা হইতে ফিরিয়া আসে, কারণ এই ব্রহ্মলোক পাপবিহীন।

    মন্তব্য : ‘সেতু’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ— (ক) দুই ক্ষেত্রকে পৃথক রাখিবার জন্য যে ‘আলি” দেওয়া হয় তাহার নাম সেতু। (খ) জলাভূমির মধ্য দিয়া সে বাঁধ দেওয়া হয়, কিংবা জলের এক পার হইতে অপর পারে যাইবার জন্য যে ‘সাঁকো’ প্রস্তুত করা হয় তাহার নামও সেতু। এস্থলে প্রশ্ন এই—এখানে সেতুকে পৃথক রাখিবার হেতু বলা হইয়াছে, না সংযোগের হেতু বলা হইয়াছে? অনেকেই প্রথম অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু এস্থলে দ্বিতীয় অর্থই অধিকতর যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হয়। ইহার পরের মন্ত্রেই বলা হইয়াছে যে, ব্ৰহ্মলোকে যাইতে হইলে এই সেতুই পার হইয়া যাইতে হয়। সুতরাং এই মন্ত্রে ‘সেতু’কে সংযোগেরই হেতু বলিতে হইবে।

    অসম্ভেদায়—অ-সম্+ভেদায়। ‘অসম্ভেদায়’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হইতে পারে (১) মিশ্রিত না হইয়া যায় এই জন্য। (২) ভিন্ন না হইয়া যায় এই জন্য। (৩) বিদীর্ণ না হইয়া যায় বা বিনষ্ট না হইয়া যায় এই জন্য (শঙ্কর)। যাঁহারা সেতুকে পৃথক রাখিবার হেতু বলেন তাঁহারা প্রথম অর্থ গ্রহণ করেন; আর যাঁহারা সংযোগের হেতু বলেন তাঁহারা দ্বিতীয় অর্থ গ্রহণ করিয়া থাকেন।

    ৫৮৯. তস্মাদ্বা এতং সেতুং তীত্বাহন্ধঃ সন্ননদ্ধো ভবতি বিদ্ধঃ সন্নবিদ্ধো ভবত্যু-পতাপী সন্ননুপতাপী ভবতি তস্মাদ্বা এতং সেতুং তীত্বাপি নক্তমহরেবা-ভিনিষ্পদ্যতে সকৃদ্ধিভাতো হোবৈষ ব্ৰহ্মলোকঃ ॥ ২

    অন্বয় : তস্মাৎ (সেইজন্য) বৈ এতম্ সেতুম্ (এই সেতুকে) তীত্বা (পার হইয়া) অন্ধঃ সন্ (অন্ধ হইলেও) অনন্ধঃ (চক্ষুষ্মান্, অন্ধ নয় এমন) ভবতি (হয়); বিদ্ধঃ সন্ (বিদ্ধ বা আহত হইলেও) অবিদ্ধঃ (বিদ্ধ নয়, এমন) ভবতি; উপতাপী সন্ (সন্তপ্ত হইলেও) অনুপতাপী (সন্তাপবিহীন; উপতাপী নয়, এমন) ভবতি। তস্মাৎ বৈ এতম্ সেতুম্ তীত্বা, অপি নক্তম্ (রাত্রিও) অহঃ এব (দিন রূপেই) অভিনিষ্পদ্যতে (প্রকাশিত হইয়া থাকে); সকৃৎ বিভাতঃ (নিত্য বিভাসিত) হি এব এষঃ (এই) ব্রহ্মলোকঃ।

    সরলার্থ : এই সেতু পার হইলে অন্ধ চক্ষুষ্মান হয়, শোকক্লিষ্টের ক্লেশ থাকে না, সমস্ত ব্যক্তির সন্তাপ দূর হয়। এই সেতু উত্তীর্ণ হইলে রাত্রিও দিন হয়, কারণ ব্রহ্মলোক চির-জ্যোতির্ময়।

    ৫৯০. তদ্ য এবৈতং ব্ৰহ্মলোকং ব্ৰহ্মচর্যে ণানুবিন্দন্তি তেষামেবৈষ ব্রহ্মলোকস্তেষাং সর্বেষু লোকেষু কামচারো ভবতি ॥ ৩

    অন্বয় : তৎ+যে (যাহারা) এব এতম্ ব্রহ্মলোকম্ (এই ব্রহ্মলোককে) ব্ৰহ্মচর্যেণ (ব্রহ্মচর্য দ্বারা) অনুবিন্দন্তি (লাভ করেন) তেষাম্ এব তাহাদিগেরই) এষঃ (এই) ব্ৰহ্মলোকঃ; তেষাম্ সর্বেষু লোকেষু (সমুদয় লোকে) কামচারঃ ভবতি।

    সরলার্থ : যাঁহারা ব্রহ্মচর্য দ্বারা এই ব্রহ্মলোক লাভ করেন, এই ব্ৰহ্মলোক তাঁহাদেরই। সমস্ত লোকেই তাঁহারা স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন।

    পঞ্চম খণ্ড – ব্রহ্মচর্যরূপে নানা যজ্ঞের উল্লেখ—ব্রহ্মলোকের বর্ণনা (২)

    ৫৯১. অথ যদ্ যজ্ঞ ইত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদ্ ব্রহ্মচর্যেণ হ্যেব যো জ্ঞাতা তং বিন্দতেহথ যদিষ্টমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদ্ ব্রহ্মচর্যেন হোবেত্মানুমনুবিন্দতে ॥ ১

    অন্বয় : অথ যৎ (যাহাকে) যজ্ঞঃ ইতি আচক্ষতে (‘লোকে’ বলে) ব্রহ্মর্যম্ এব তৎ (তাহা)। ব্রহ্মচর্যেণ হি এব (ব্রহ্মচর্য দ্বারাই) যঃ জ্ঞাতা (যিনি জ্ঞাতা) তম্ (তাহাকে, ব্রহ্মলোককে) বিন্দতে (লাভ করে)। অথ যৎ ইষ্টম্ (ইষ্ট—যজ্ঞ, পূজা করা) ইতি আচক্ষতে, ব্রহ্মচর্যম্ এব তৎ। ব্রহ্মচর্যেণ হি এব ইষ্টা (অনুসন্ধান করিয়া) আত্মানম্ (আত্মাকে) অনুবিন্দতে (লাভ করে)।

    সরলার্থ : যাহাকে ‘যজ্ঞ’ বলা হয় তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ যিনি জ্ঞাতা (যঃ জ্ঞাতা), তিনি ব্রহ্মচর্য দ্বারাই ব্রহ্মলোক লাভ করেন। যাহাকে ‘ইষ্ট’ বলা হয়, তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য সহকারে অনুসন্ধান করিয়াই (ইষ্টা) আত্মাকে লাভ করা হয়।

    মন্তব্য : এই যুগে প্রধানত দুই শ্রেণীর সাধক ছিলেন, এক শ্রেণীর সাধক কর্মবাদী ছিলেন, আর এক শ্রেণীর সাধক জ্ঞানমার্গ অবলম্বন করিয়া চলিতেন। কর্মবাদিগণ যাগযজ্ঞ লইয়া থাকিতেন, আর জ্ঞানবাদিগণ ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ ইন্দ্রিয়-সংযমাদির শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করিতেন। আমাদের ঋষি কর্মবাদী ছিলেন, কিন্তু তিনি জ্ঞানবাদীদিগের মতও স্বীকার করেন; তিনি দেখাইতে চান যে যজ্ঞাদিকেও ব্রহ্মচর্য বলা যাইতে পারে। ভাষার সাদৃশ্য দেখাইয়া তিনি নিজ মত সমর্থন করিয়াছেন। (ক) কর্মবাদী বলেন—’যজ্ঞ’ দ্বারা ব্রহ্মলোক লাভ হয়, জ্ঞানবাদী বলেন ‘যঃ জ্ঞাতা’ (যিনি জ্ঞাতা) তিনি ব্রহ্মচর্যের দ্বারা ব্রহ্মলোক লাভ করেন। ‘যজ্ঞ’ এবং ‘জ্ঞাতা’ এতদুভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য আছে। ‘যঃ’ শব্দের ‘য’ এবং ‘জ্ঞাতা’ শব্দের ‘জ্ঞ’ লইলেই ‘যজ্ঞ’ হয়। ইহা দেখিয়া শুনিয়া ঋষি বলিতেছেন, যজ্ঞই ব্রহ্মচর্য। (খ) ‘ইষ্টা’ শব্দের দুই অর্থ — (১) যজ্ + ক্ত্রা, যজন করিয়া, পূজা করিয়া।

    (২) ই+ন্ধ্রা অন্বেষণ করিয়া। ‘ইষ্ট’ কর্মে অর্থাৎ যজ্ঞকর্মে পূজা করিয়া (ইষ্টা) ব্রহ্মলোক লাভ করা হয়; আবার ব্রহ্মচর্য দ্বারা আত্মাকে অন্বেষণ করিয়া (ইষ্টা) ব্রহ্মলোক লাভ করা যায়। উভয় স্থলেই ‘ইষ্টা’। সুতরাং ইষ্টই ব্রহ্মচর্য।

    ৫৯২. অথ যৎ সন্ত্রায়ণমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদ্ ব্রহ্মচর্যেণ হ্যেব সত আত্মনস্ত্রাণং বিন্দতেহথ যন্মৌনমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদ্ ব্রহ্মচর্যেণ হ্যেবাত্মানমনুবিদ্য মনুতে ॥ ২

    অন্বয় : অথ যৎ ‘সন্ত্রায়ণম্’ (সন্ত্র+অয়নম্; সন্ত্র-যজ্ঞ; অয়ন-গতি। দীর্ঘকালব্যাপী যজ্ঞবিশেষ) ইতি আচক্ষতে, ব্রহ্মচর্যম্ এব তৎ। ব্রহ্মচর্যেণ হি এব সতঃ (সৎস্বরূপের নিকটে) আত্মনঃ (জীবাত্মার) ত্রাণম্ বিন্দতে। অথ যৎ মৌনম্ (যজ্ঞারম্ভে মৌনভাব ইতি আচক্ষতে, ব্রহ্মচর্যম্ এব তৎ। ব্রহ্মচর্যেণ হি এব আত্মানম্ অনুবিদ্য (লাভ করিয়া, অবগত হইয়া) মনুতে (মনন করে)।

    সরলার্থ : যাহাকে ‘সন্ত্রায়ণ’ বলা হয়,তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারাই সৎস্বরূপের নিকটে (সতঃ) আত্মার ত্রাণ (আত্মনঃ ত্রাণম্) লাভ হয়। আবার যাহাকে ‘মৌন’ বলা হয় তাহাও ব্রহ্মচর্য; কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারাই লোকে আত্মাকে জানিয়া ‘মনন’ করে।

    মন্তব্য : (ক) ‘সন্ত্রায়ণ’ একটি বিশেষ যজ্ঞ। ‘সন্ত্রায়ণ’ যজ্ঞদ্বারা ব্রহ্মলোক লাভ করা যায়; আবার ব্রহ্মচর্য দ্বারাও ‘সতঃ আত্মনঃ ত্রাণম্’ অর্থাৎ সৎস্বরূপের নিকট হইতে আত্মার ত্রাণ লাভ করা যায়। ‘সন্ত্রায়ণ’ এবং ‘সতঃ আত্মনঃ ত্রাণম্’ এই দুয়ের মধ্যে উচ্চারণে সাদৃশ্য রহিয়াছে। সুতরাং সন্ত্রায়ণই ব্রহ্মচর্য। (খ) যজ্ঞের আরম্ভে ‘মৌন’ অবলম্বন আবশ্যক। আবার ব্রহ্মচর্য দ্বারা আত্মাকে মনন করা যায় (মনুতে)। ‘মৌন’ এবং ‘মনুতে’ উচ্চারণে সাদৃশ্য রহিয়াছে। সুতরাং মৌনই ব্রহ্মচর্য

    ৫৯৩. অথ যদনাশকায়নমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদেষ হ্যাত্মা ন নশ্যতি যং ব্রহ্মচর্যেণানুবিন্দতে। অথ যদরণ্যায়নমিত্যাচক্ষতে ব্রহ্মচর্যমেব তদ্‌রশ্চ হ বৈ ণ্যশ্চার্ণবৌ ব্ৰহ্মলোকে তৃতীয় স্যামিতো দিবি। তদৈরং মদীয়ং সরস্তদশ্বথঃ সোমসবনস্তদপরাজিতা পূব্রহ্মণঃ প্রভুবিমিতং হিরন্ময়ম্ ॥ ৩

    অন্বয় : অথ যৎ অনাশকায়নম্ (অনাশক+অয়নম্—উপবাসব্রত; অনাশক—উপবাস; অয়ন—গতি, পথ) ইতি আচক্ষতে, ব্রহ্মচর্যম্ এব তৎ। এষঃ (এই) হি আত্মা ন (না) নশ্যতি (বিনষ্ট হয়) যম্ (যে আত্মাকে) ব্রহ্মচর্যেণ (ব্রহ্মচর্যের দ্বারা) অনুবিন্দতে। অথ যৎ অরণ্যায়নম্) অরণ্য+অয়নম্=অরণ্যে বাস (ইতি আচক্ষতে, ব্রহ্মচর্যম্ এব তৎ। তৎ (সেখানে) অরঃ চ (অর-নামক) বৈ ণ্যঃ চ (ও ণ্য নামক) অর্ণবৌ (অর্ণবদ্বয়) ব্রহ্মলোকে তৃতীয় স্যাম্ [দিবি] (তৃতীয় দ্যুলোকে) ইতঃ (এই স্থল হইতে) দিবি তৎ (সেই স্থলে) ঐরম্+মদীয়ম্ (ঐরম্মদীয় নামক; ইরা=অন্ন; ঐরঃ=ইরাময়,মণ্ড; ঐরম্=মণ্ডপূর্ণ; মদীয়ম্=মদকর,হর্যোৎপাদক) সরঃ (সরোবর)। তৎ অশ্বত্থঃ সোমসবনঃ (সোমস্রাবী; কিংবা সোমসবন নামক)। তৎ অপরাজিতা (অপরাজিতা নামক; যাহা পরাজিত হয় না) পূঃ (পুরী) ব্রহ্মণঃ (ব্রহ্মের), প্রভুবিমিতম্ (প্রভু অর্থাৎ ব্রহ্ম কর্তৃক বিমিত=যাহা বিশেষভাবে নির্মিত, এস্থলে মণ্ডপ। হিরন্ময় (সুবৰ্ণময়)।

    সরলার্থ : যাহাকে ‘অনাশকায়ন’ (অনশনব্রত) বলা হয় তাহাও ব্ৰহ্মচর্য, কারণ ব্রহ্মচর্য দ্বারা যে আত্মাকে লাভ করা হয়, তাহার নাশ নাই (ন নশ্যতি)। আবার যাহাকে ‘অরণ্যায়ন’ বলা হয়, তাহাও ব্রহ্মচর্য, কারণ এই পৃথিবী হইতে তৃতীয় স্বর্গে, — ব্রহ্মলোকে—’অর’ ও ‘ণ্য’ নামক দুইটি সমুদ্র আছে। সেখানে ‘ঐরম্মদীয়’ নামে সরোবর, সোমরসস্রাবী অশ্বত্থবৃক্ষ, ‘অপরাজিতা’ নামে ব্রহ্মের পুরী এবং ব্রহ্মা কর্তৃক বিশেষভাবে নির্মিত একটি স্বর্ণমণ্ডপ আছে।

    মন্তব্য : (ক) ‘অনাশকায়ন’ শব্দের দুই অর্থ : (১) অনাশক+অয়ন=উপবাস-ব্ৰত; আশক=ভক্ষণ; অনাশক=উপবাস। (২) যাহাতে নাশ হয় না তাহাই অনাশক। এই প্রকার পথের নাম ‘অনাশকায়ন’। যজ্ঞেও অনাশকায়ন এবং ব্রহ্মচর্যেও অনাশকায়ন। সুতরাং যজ্ঞের অনাশকায়নই ব্রহ্মচর্য। (খ) ‘অরণ্য’ শব্দের দুই অর্থ : (১) বন; (২) অর এবং ণ্য নামক অর্ণবদ্বয়। কর্মপথে অরণ্যায়ন (অর্থাৎ বনগমন বিধি) আবার জ্ঞানপথেও অরণ্যায়ন (অর্থাৎ অর ও ণ্য নামক সমুদ্রদ্বয় লাভ)। সুতরাং অরণ্যায়নই ব্ৰহ্মচর্য। (গ) কৌষীতকি উপনিষদে যে ব্রহ্মলোকের বর্ণনা আছে তাহাতে বলা হইয়াছে যে, ‘আর’ নামক হ্রদ, বিজরা নদী, ইল্য বৃক্ষ, সালজ্য নগর, ‘অপরাজিত’ প্রাসাদ, ‘বিভুপ্রতিম’ মণ্ডপ, ‘বিচক্ষণা’ সিংহাসন, ‘অমিতৌজা’ নামক পর্যঙ্ক ইত্যাদি সেই ব্রহ্মলোকে বর্তমান রহিয়াছে।

    ৫৯৪. তদ্য এবৈতাবরং চ ণ্যং চার্ণবৌ ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মচর্যেণ্যনুবিন্দন্তি, তেষামেবৈষ ব্রহ্মলোকস্তেষাং সর্বেষু লোকেষু কামচারো ভবতি ॥ ৪

    অন্বয় : তৎ যে (যাহারা) এব এতৌ (এই দুই) অরম্ চ ণ্যম্ চ (‘অর’ ও ‘ণ্য’ নামক) অর্ণবৌ (অর্ণবদ্বয়কে) ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মচর্যেণ (ব্রহ্মচর্যদ্বারা) অনুবিন্দন্তি (লাভ করেন), তেষাম্ (তাহাদিগের) এব এষঃ (এই) ব্রহ্মলোকঃ; তেষাম্ সর্বেষু লোকে (সর্বলোকে) কামচারঃ (স্বাধীন আচরণ) ভবতি (হয়)।

    সরলার্থ : যাঁহারা ব্রহ্মচর্য দ্বারা সেই ব্রহ্মলোকে ‘অর’ ও ণ্য’ নামে দই সমুদ্র লাভ করেন, ব্রহ্মলোক তাঁহাদেরই; সর্বলোকে তাঁহাদের যথেচ্ছ গতি হয়।

    ষষ্ঠ খণ্ড – নাড়ী ও সূর্যরশ্মির সংযোগ—হ্মলোকের পথ ও দ্বার

    ৫৯৫. অথ যা এতা হৃদয়স্য নাড্যস্তাঃ পিঙ্গলস্যাণিমস্তিষ্ঠন্তি শুক্লস্য নীলস্যপীতস্য লোহিতস্যেত্যসৌ বা আদিত্যঃ পিঙ্গল এষ শুক্ল এষ নীল এষ পীত এষ লোহিতঃ ॥ ১

    অন্বয় : অথ যাঃ এতা [নাড্যঃ] (এই যে নাড়ীসমূহ) হৃদয়স্য (হৃদয়ের) নাড্যঃ তাঃ (সে সমুদয়) পিঙ্গলস্য (পিঙ্গলবর্ণের) অণিম্নঃ (অণু পরিমাণ) তিষ্ঠন্তি (রহিয়াছে শুক্লস্য (শুক্লবর্ণের) নীলস্য (নীলবর্ণের) পীতস্য লোহিতস্য (লোহিত বর্ণের) ইতি। অসৌ (ঐ) বৈ আদিত্যঃ পিঙ্গলঃ এষঃ (এই আদিত্য) শুক্লঃ এষঃ নীলঃ, এষঃ পীতঃ, এষঃ লোহিতঃ।

    সরলার্থ : হৃদয়ের এই যে নাড়ীসমূহ—এইগুলি পিঙ্গল, শুক্ল, নীল, পীত ও লোহিত বর্ণের সূক্ষ্মরস পরিপূর্ণ। এই আদিত্যই পিঙ্গল, ইহাই (আদিত্যই) শুক্ল, নীল, পীত এবং লোহিত বর্ণ।

    মন্তব্য : বৃহদারণ্যক উপনিষদেও অনুরূপ একটি মন্ত্র আছে (৪।৩।২০)।

    ৫৯৬. তদ্ যদা মহাপথ আতত উভৌ গ্রামৌ গচ্ছতীমং চামুং চৈবমেবৈতা আদিত্যস্য রন্ময় উভৌ লোকৌ গচ্ছন্তীমং চামুং চামুম্মাদাদিত্যা‍ প্রতায়ন্তে তা আসু নাড়ীষু সৃপ্তা আভ্যো নাড়ীভ্যঃ প্রতায়ন্তে তেহমুষ্মিন্নাদিত্যে সৃপ্তাঃ ॥ ২

    অন্বয় : তৎ যথা (যেমন) মহাপথঃ (বিস্তীর্ণ পথ) আততঃ (বিস্তৃত) উভৌ গ্রামৌ (দুই গ্রামে) গচ্ছতি (গমন করে); ইমম্ চ (ঐ গ্রামে); অমুং চ এবম্ এব (এই প্রকারেই এতাঃ (এই সমুদয়) আদিত্যস্য (আদিত্যের) রন্ময়ঃ (রশ্মিসমূহ, স্ত্রীং, ইহার বিশেষণ এতাঃ) উভৌ লোকৌ (উভয় লোকে); গচ্ছন্তি (গমন করে) ইমম্ চ (এইলোকে) অমুম্‌ চ (ঐ লোকে)। অমুম্মাৎ আদিত্যাৎ (ঐ আদিত্যলোক হইতে) প্রতায়ন্তে (বিস্তৃত হয়), তাঃ (সেই সমুদয়) আসু নাড়ীষু (এই সমুদয় নাড়ীতে) সুপ্তাঃ (প্রবিষ্ট হয়) আভ্যঃ নাড়ীভ্যঃ (এই সমুদয় নাড়ী হইতে) প্রতায়ন্তে, তে (তাহারা; রশ্মিসমূহ পুং) অমুষ্মিন্ আদিত্যে (ঐ আদিত্যে) সুপ্তাঃ (প্রবিষ্ট হয়)।

    সরলার্থ : যেমন এক মহাপথ বিস্তৃত হইয়া নিকট এবং দূরের দুই গ্রামেই যায়। তেমনি সূর্যের রশ্মিসমূহও এই লোক এবং ঐ লোক দুই লোকেই যায়। রশ্মিসমূহ ঐ আদিত্য হইতে বিস্তৃত হয় এবং (বিস্তৃত হইয়া) এইসব নাড়ীতে প্রবেশ করে। আবার এই নাড়ী হইতে বিস্তৃত হইয়া তাহারা ঐ সূর্যে প্রবেশ করে।

    মন্তব্য : (ক) ‘রশ্মি’ শব্দ পুংলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ উভয়ই। (খ) দুটি গ্রাম যদি একটি পথদ্বারা সংযুক্ত হয়, ইহা বলা যাইতে পারে যে, পথটি ঐ গ্রাম হইতে আরম্ভ করিয়া এই গ্রাম পর্যন্ত আসিয়াছে, কিংবা ইহাও বলা যাইতে পারে যে, পথটি এই গ্রাম হইতে আরম্ভ করিয়া ঐ গ্রাম পর্যন্ত গিয়াছে। এই প্রকার ইহাও বলা যায় যে, রশ্মিসমূহ সূর্য হইতে বিস্তৃত হইয়া নাড়ীসমূহে আসিয়াছে, কিংবা ইহাও বলা যাইতে পারে যে, নাড়ী হইতে বিস্তৃত হইয়া সূর্যে গিয়াছে। (গ) সচরাচর ‘পরলোকে যাইবার পথ’ বা ‘মৃত্যু’ অর্থে ‘মহাপথ’ ব্যবহৃত হয়, কিন্তু প্রাচীনকালে ‘বিস্তীর্ণ পথ’ অর্থেও ইহা ব্যবহৃত হইত।

    ৫৯৭. তদ্ যত্রৈত‍ সুপ্ত সমস্তঃ সংপ্রসন্নঃ স্বপ্নং ন বিজানাত্যাস্ তদা নাড়ীষু সুপ্তো ভবতি, তন্ন কশ্চন পাপ্পা স্পৃশতি তেজসা হি তদা সম্পন্নো ভবতি ॥ ৩

    অন্বয় : তৎ [অতত্] (সেই এই জীব; ক্লীং বৈদিক) যত্র (যখন) এতৎ সুপ্তঃ (নিদ্রিত) সমস্তঃ (একীভূত) সংপ্রসন্নঃ (সাম্যকরূপে প্রসন্নতাপ্রাপ্ত) স্বপ্নম্ ন বিজানাতি (জানে) আসু [নাড়ীষু] (এই সমুদয় নাড়ীতে) তদা (তখন) নাড়ীষু সুপ্তঃ (প্রবিষ্ট) ভবতি (হয়), তম্ (তাহাকে) ন কঃ + চন [পাপ্পা] (কোন পাপ) পাপ্পা স্পৃশতি (স্পর্শ করে); তেজসা (‘সূর্যের’ তেজের সহিত) হি তদা (তখন) সম্পন্নঃ (যুক্ত) ভবতি (হয়)।

    সরলার্থ : জীব নিদ্রিত হইলে যখন একীভূত হয় (অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গুলি ভোগ্য বিষয় ত্যাগ করিয়া একত্র হয়), পরিপূর্ণ প্রসন্নতা লাভ করে এবং স্বপ্নও দেখে না, তখন সে এই সব নাড়ীতে প্রবেশ করে। কোন পাপ (তখন) তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না এবং সে তেজোযুক্ত হয় (অর্থাৎ সূর্যেয় তেজের সহিত সংযুক্ত হয়)।

    মন্তব্য : সমস্তঃ—সম্—অস্+ক্ত। অস্ ধাতুর অর্থ একত্র করা বা সংগ্রহ করা। জাগ্রত অবস্থায় ইন্দ্রয়সমূহ নানা বিষয়ে ধাবিত হয়; সুষুপ্তির সময় তাহারা বিষয় হইতে প্রত্যাগত হইয়া একীভূত হয়। এখানে এই অবস্থার কথা বলা হইয়াছে।

    ৫৯৮. অথ যত্রৈতদবলিমানং নীতো ভবতি তমভিত আসীনা আহুর্জানাসি মাং জানাসি মামিতি। স যাবদমাচ্ছরীরাদৎক্রান্তো ভবতি তাবজ্জানাতি ॥৪

    অন্বয় : অথ যত্র (যখন) এতৎ (এষঃ, এই জীব) অবলিমানম্ (দৌর্বল্য) নীতঃ ভবতি (প্রাপ্ত হয়) তম্ অভিতঃ (তাহার চারিদিকে) আসীনাঃ (আসীন হইয়া) আহুঃ (বলিয়া থাকে) জানাসি মাম্ (আমাকে কি চেন?) জানাসি মাম্ ইতি—সঃ (সে) যাবৎ (যে পর্যন্ত) অস্মাৎ শরীরাৎ (এই শরীর হইতে) অনুৎক্রান্তঃ ভবতি (উৎক্রান্ত না হয়) তাবৎ (সেই পর্যন্ত) জানাতি (চিনিতে পারে)।

    সরলার্থ : যখন মানুষ (রোগগ্রস্ত হইয়া) অত্যন্ত দুর্বল হয়, তখন সকলে তাহাকে চারিদিকে ঘিরিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করে—’আমাকে কি চেন?’ যতক্ষণ এই দেহ হইতে সে চলিয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তাহাদিগকে চিনিতে পারে।

    ৫৯৯. অথ যত্রৈতদমাচ্ছরীরাদুক্রামত্যথৈতৈরেব রশ্মিভিরূমাক্রমতে স ওমিতি বা হোদ্বা মীয়তে স যাবৎ ক্ষিপ্যেন্মনস্তাবদাদিতাং গচ্ছত্যেতদ্বৈ খলু লোকদ্বারং বিদুষাং প্রপদনং নিরোধোহবিদুষাম্ ॥ ৫

    অন্বয় : অথ (আর) যত্র এতৎ (এই জীব) অস্মাৎ শরীরাৎ (এই শরীর হইতে) উৎক্রামতি (উৎক্রান্ত হয়) অথ (তখন) এতৈঃ এব রশ্মিভিঃ (এই সমুদয় রশ্মিদ্বারা) ঊর্ধ্বম্ (ঊর্ধ্বদিকে) আক্রমতে (গমন করে; বা গমন করিতে আরম্ভ করে)। সঃ (সে) ‘ওম্’ ইতি (ওম্ এই ‘অক্ষর ধ্যান করিলে’) বা হ (নিশ্চয়ার্থ অব্যয়=এর) উৎ (ঊর্ধ্বে) বা (নিশ্চয়ই) মীয়তে (মৃত হয়, মরিয়া চলিয়া যায়)। সঃ (সে), যাবৎ (যে সময়) ক্ষিপ্যেৎ (এক বিষয় হইতে অন্য বিষয়ে যাইতে পারে) মনঃ তাবৎ (সেই সময়ে) আদিত্যম্ গচ্ছতি (গমন করে)। এতৎ বৈ (ইহাই) খলু (নিশ্চয়ই) লোকদ্বারম্ (ব্রহ্মলোকে যাইবার দ্বার)। বিদুষাম্ (বিদ্বানদিগের) প্রপদনম্ (প্রবেশ); নিরোধঃ (প্রবেশের বাধা) অবিদুষাম্ (অবিদ্বানদিগের)।

    সরলার্থ : যখন পুরুষ এই দেহ হইতে বাহির হয় তখন এই সব রশ্মিদ্বারা সে ঊর্ধ্বে যাইতে থাকে। ‘ওম্’, এই অক্ষরের ধ্যান করিতে করিতেই যদি তাহার মৃত্যু হয়, তবে সে নিশ্চয়ই ঊর্ধ্বে যায়। এক বিষয় হইতে অন্য বিষয়ে যাইতে মনের যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়ের মধ্যেই আদিত্যে চলিয়া যায়। এই আদিত্যই ব্রহ্মলোকের দ্বার। যাহারা বিদ্বান তাহারা এখানে প্রবেশ করে, আর যাহারা বিদ্বান নয় তাহারা প্রবেশ করিতে পারে না।

    মন্তব্য : ‘সঃ ওম্ ইতি বা হ উৎ বা মীয়তে’—শঙ্কর বলেন ‘বা হ’=এব ‘নিশ্চয়ই; আমরাও এই অর্থই গ্রহণ করিয়াছি। দ্বিতীয় ‘বা’ শব্দের অর্থ ও ‘নিশ্চয়ই’। সমগ্র অংশের অর্থ এই—সে ওম্ এই (অক্ষরের ধ্যান করিলেই) মরিয়া নিশ্চয়ই ঊর্ধ্বদিকে যায়। শঙ্কর বলেন— যাহারা অবিদ্বান, তাহারা সূর্যরশ্মি দ্বারা গমন করিয়া কর্মলব্ধ লোক লাভ করে। আর যাঁহারা বিদ্বান তাঁহারা ওঙ্কারের ধ্যান করিতে করিতে মরিয়া ব্রহ্মলোক প্রাপ্ত হয়।

    ‘স যাবৎ ক্ষিপ্যেৎ মনঃ’ ইত্যাদি। মোক্ষমুলার এই অংশের এইরূপ অর্থ করিয়াছেন—’While his mind is falling he is going to the Sun’ অর্থাৎ তাহার মন যতক্ষণ ক্ষীণ হইতে থাকে, ততক্ষণ সে সূর্যলোকে যাইতে থাকে। শঙ্করের অর্থ—এক বিষয় হইতে অন্য বিষয়ে যাইতে মনের যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়ে আত্মা সূর্যলোকে গমন করে অর্থাৎ ক্ষিপ্র সূর্যলোকে গমন করে।

    ৬০০. তদেষ শ্লোকঃ—শতং চৈকা চ হৃদয়স্য নাড্যস্তাসাং মূর্ধানমভিনিঃসৃতৈকা। তয়োমায়ন্নমৃতত্বমেতি বিষ্ণুগুনা উৎক্রমণে ভবন্তি উৎক্রমণে ভবন্তি ॥ ৬

    অন্বয় : তৎ (সে বিষয়ে) এষঃ (এই) শ্লোকঃ—শতম্ চ একা চ (১০১টি) হৃদয়স্য (হৃদয়ের) নাড্যঃ (নাড়ীসমূহ)। তাসাম্ [একা] (তাহাদিগের একটি নাড়ী) মূর্ধানম্ অভি (মূর্ধার অভিমুখে) নিঃসৃতা (নিঃসৃত হইয়া) একা। তয়া (সেই নাড়ীর দ্বারা) ঊর্ধ্বম্ আয়ন্‌ (ঊর্ধ্বদিকে গমন করিয়া) অমৃতত্বম্ এতি (প্রাপ্ত হয়)। বিম্ব [ভবন্তি] (নানাদিকে গতিবিশিষ্ট হয়) অন্যাঃ (অন্য নাড়ীসমূহ) উৎক্রমণে (উৎক্রমণ বিষয়ে) ভবন্তি, উৎক্রমণে ভবন্তি (কঠ ২।৩।১৬)।

    সরলার্থ : এই বিষয়ে এই শ্লোক আছে—হৃদয়ের একশত একটি নাড়ী আছে, তাহাদের মধ্যে একটি মূর্ধা পর্যন্ত গিয়াছে। যিনি এই নাড়ীদ্বারা ঊর্ধ্বদিকে যান, তিনি অমৃতত্ব লাভ করেন। অন্য যে সব নাড়ী বিভিন্নদিকে যায় তাহাদের দ্বারা কেবল দেহত্যাগই হইয়া থাকে।

    সপ্তম খণ্ড – প্রজাপতি ও ইন্দ্র-বিরোচন-সংবাদ (১)

    ৬০১. য আত্মাপহতপাপ্পা বিজরো বিমুত্যুর্বিশোকো বিজিঘৎসোহপিপাসঃ সত্যকামঃ সত্যসংকল্পঃ সোহন্বেষ্টব্যঃ স বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ স সর্বাংশ্চ লোকানাপ্নোতি সর্বাংশ্চ কামান্ যস্তমাত্মানমনুবিদ্য বিজানাতীতি হ প্রজাপতিরুবাচ ॥ ১

    অন্বয় : যঃ (যে) আত্মা অপহতপাপ্পা, বিজরঃ বিমৃত্যুঃ বিশোকঃ বিজিঘৎসঃ অপিপাসঃ সত্যকামঃ সত্যসঙ্কল্পঃ সঃ অন্বেষ্টব্যঃ (তাহাকে অন্বেষণ করিতে হইবে); সঃ বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ (বিশেষরূপে জানিবার ইচ্ছা করিতে হইবে); সঃ সর্বান্ চ লোকান্‌ (সমুদয় লোককে) আপ্নোতি (প্রাপ্ত হয়), সর্বান্ চ কামান্ (সমুদয় কামনাকে) যঃ (যে তম্ আত্মানম্ (আত্মাকে) অনুবিদ্য (বিচার করিয়া) বিজানাতি (বিশেষরূপে জানে,), ইতি হ প্রজাপতিঃ উবাচ (বলিয়াছিলেন)।

    সরলার্থ : প্রজাপতি এক সময়ে বলিয়াছিলেন— ‘যে আত্মা পাপরহিত, জরা-মৃত্যু-শোকরহিত, ভোজনেচ্ছা এবং পিপাসারহিত, যিনি সত্যকাম ও সত্য-সঙ্কল্প, তাঁহাকেই অন্বেষণ করিতে হইবে, তাঁহাকেই বিশেষরূপে জানিতে হইবে। যিনি তাঁহাকে অনুসন্ধান করিয়া জানেন তিনি সমস্ত লোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন।’

    মন্তব্য : শঙ্করের ভাষ্যে ‘অনুবিদ্য’ স্থলে ‘অন্বিষ্য’ আছে। ইহাতে মনে হয় তিনি যে হস্তলিপি পাইয়াছিলেন, তাহাতে মূলে ‘অন্বিষ্য’ই ছিল। আর অন্বিষ্য (অনুসন্ধান করিয়া) হইলেই অর্থ সুসঙ্গত হয়। প্রথম বলা হইল ‘সেই আত্মাকে অন্বেষণ করিতে হইবে (অন্বেষ্টব্যঃ), সেই আত্মাকে বিশেষ করিয়া জানিতে হইবে (বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ)’। তাহার পর যদি বলা হয় ‘তিনি অন্বেষণ করিয়া (অন্বিষ্য) তাঁহাকে জানেন ইত্যাদি’— তাহা হইলে অর্থ অতি সুন্দর হয়।

    ৬০২. তদ্ধোভয়ে দেবাসুরা অনুবুবুধিরে তে হোচুর্হন্ত তমাত্মানমন্বিচ্ছামো যমাত্মানমন্বিষ্য সর্বাংশ্চ লোকানাপ্নোতি সর্বাংশ্চ কামানিতীন্দ্ৰো হৈব দেবানামভিপ্রবব্রাজ বিরোচনোহসুরাণাং তৌ হাসংবিদানাবেব সমিপাণী প্রজাপতি সকাশমাজগ্মতুঃ ॥ ২

    অন্বয় : তৎ (সেই উপদেশ), হ উভয়ে (উভয়) দেবাসুরাঃ (দেবতা ও অসুরগণ) অনুবুবুধিরে (লোকপরম্পরায় জানিতে পারিয়াছিল; অনু=লোকপরম্পরায় কর্ণগোচর হইয়াছিল এই অর্থ প্রকাশ করিবার জন্য—শঙ্কর)। তে (তাহারা) হ উচুঃ (বলিয়াছিল)— হন্ত! তম্ আত্মানম্ (সেই আত্মাকে) অনু ইচ্ছামঃ (অন্বেষণ করি), যম্ আত্মানম্ (যে আত্মাকে) অন্বিষ্য (অন্বেষণ করিয়া) সর্বান্ চ লোকান্ (সমুদয় লোককে) আপ্নোতি (লাভ করে) সর্বান্ চ কামান্ (সমুদয় কামনাকে) ইতি। ইন্দ্র হ এব দেবানাম্ (দেবগণের মধ্যে) অভি প্রবব্রাজ (গমন করিলেন)। বিরোচনঃ অসুরাণাম্ (অসুরগণের মধ্যে)। তৌ (তাহারা দুই জন) হ অসংবিদানৌ (পরস্পরকে না জানাইয়া) এব সমিৎপাণী (সমিধহস্তে) প্রজাপতিসকাশম্ (প্রজাপতির নিকটে) আজগ্নতুঃ (গমন করিয়াছিলেন)।

    সরলার্থ : দেব ও অসুর উভয়েই লোকপরম্পরায় এই উপদেশের কথা শুনিয়াছিলেন। তাঁহারা বলিলেন, ‘যে আত্মাকে অনুসন্ধান করিলে সর্বলোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করা যায়, আমরা সেই আত্মার অনুসন্ধান করিব।’ এই উদ্দেশ্যে দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র এবং অসুরগণের মধ্যে বিরোচন প্রজাপতির নিকট গেলেন। তাঁহারা পরস্পরকে না জানাইয়া সমিধহস্তে তাঁহার নিকট গেলেন।

    ৬০৩. তৌ হ দ্বাত্রিংশতং বর্ষাণি ব্রহ্মচর্যমূষতুস্তৌ হ প্রজাপতিরুবাচ কিমিচ্ছন্তাব-বাস্তমিতি তৌ হোচতুর্থ আত্মাপহতপাদ্মা বিজরো বিমৃত্যুর্বিশোকো বিজিঘৎসোহপিপাসঃ সত্যকামঃ সত্যসংকল্পঃ সোহন্বেষ্টব্যঃ স বিজিজ্ঞাসিতব্য স সর্বাংশ্চ লোকানাপ্নোতি সর্বাংশ্চ কামান্ যস্তমাত্মানমনুবিদ্য বিজ্ঞানাতীতি ভগবতো বচো বেদয়ন্তে তমিচ্ছন্তাববাস্তমিতি ॥ ৩

    অন্বয় : তৌ (তাহারা দুইজন) হ দ্বাত্রিংশতম্ বর্ষাণি (৩২ বৎসর) ব্রহ্মচর্যম্ ঊষতুঃ (ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করিয়া বাস করিয়াছিল)। তৌ হ প্রজাপতিঃ উবাচ (বলিলেন) কিম্‌ (কি) ইচ্ছন্তৌ (ইচ্ছা করিয়া) অবাস্তম্ (বৈদিক, দুইজনে বাস করিয়াছ) ইতি। তৌ হ ঊচতুঃ (বলিল)—যঃ আত্মা অপহতপাপ্পা, বিজরঃ বিমৃত্যুঃ বিশোকঃ বিজিঘৎসঃ অপিপাসঃ সত্যকামঃ সত্যসঙ্কল্পঃ (৮।১।৫ দ্রঃ), সঃ অন্বেষ্টব্যঃ, সঃ বিজিজ্ঞাসিতব্যঃ। সঃ সর্বান্ চ লোকান্ আপ্নোতি, সর্বান্ চ কামান্—যঃ তম্ আত্মানম্ অনুবিদ্য বিজানাতি ইতি (৮।৭।১ দ্রঃ)—ভগবতঃ বচঃ (ভগবানের বাক্যকে) বেদয়ন্তে (জ্ঞাপন করেন; ইহার কর্তা ‘জ্ঞানিগণ’ উহ্য)। তম্ (সেই আত্মাকে) ইচ্ছন্তৌ (ইচ্ছা করিয়া) অবাস্তন্ (বৈদিক অবাস; বাস করিয়াছি)। ইতি।

    সরলার্থ : তাঁহারা দুইজন বত্রিশ বৎসর ব্রহ্মচর্য পালন করিয়া সেখানে রহিলেন। তখন প্রজাপতি তাঁহাদের জিজ্ঞাসা করিলেন—’তোমরা কেন এখানে আছ?” তাঁহারা বলিলেন—’যে আত্মা নিষ্পাপ, জরারহিত, মৃত্যু-শোক-ক্ষুধা-পিপাসারহিত, যিনি সত্যকাম ও সত্যসঙ্কল্প—তাহাকেই অন্বেষণ করা এবং জানা প্রয়োজন। যিনি এই আত্মাকে জানেন, তিনি সর্বলোক ও কাম্যবস্তু লাভ করেন—ইহাই আপনার বাণী। সেই আত্মাকেই জানিবার ইচ্ছায় আমরা দুইজনে এখানে রহিয়াছি।

    ৬০৪. তৌ হ প্রজাপতিরুবাচ য এষোহক্ষিণি পুরুষো দৃশ্যত এষ আত্মেতি হোবাচৈতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্মেতি। অথ যোহয়ং ভগবোহঙ্গু পরিখ্যায়তে যশ্চায়মাদর্শে কতম এষ ইত্যেষ উ এবৈষু সর্বেষন্তেষু পরিখ্যায়ত ইতি হোবাচ ॥ ৪

    অন্বয় : তৌ (সেই দুই জনকে) হ প্রজাপতিঃ উবাচ—যঃ এষঃ (এই যে) অক্ষিণি (বৈদিক প্রয়োগ; অক্ষ্মি বা অক্ষণি, চক্ষুতে) পুরুষঃ দৃশ্যতে (দৃষ্ট হয়), এষঃ (ইনি) আত্মা ইতি হ উবাচ (বলিলেন); এতৎ (ইনি) অমৃতম্, অভয়ম্ এতৎ ব্রহ্ম ইতি। অথ যঃ অয়ম্ (এই যে ‘পুরুষ’) ভগবঃ! (ভগবন্) অপ্‌ (জলে) পরিখ্যায়তে অনুভূত হয়, (দৃষ্ট হয়), যঃ চ অয়ম্ আদর্শে (দর্পণে), কতমঃ (কে) এষঃ (এই)? ইতি। এষঃ (এই আত্মা) উ এব এষু সর্বেষু অন্তেষু (এই সমুদয়ের অভ্যন্তরে) পরিখ্যায়তে ইতি হ উবাচ।

    সরলার্থ : প্রজাপতি ঐ দুই জনকে বলিলেন—’চক্ষুতে এই যে পুরুষ দেখা যায় ইনিই আত্মা।’ তিনি আরও বলিলেন—’ইনিই অমৃত, অভয় এবং ব্রহ্ম।’ তাঁহারা জিজ্ঞাসা করিলেন—”ভগবান, জলে যে পুরুষ দৃষ্ট হয়, আর যে পুরুষ দর্পণে দৃষ্ট হয়, ইহারা কে?’ প্রজাপতি বলিলেন—’এই সমস্ত কিছুতেই আত্মা দৃষ্ট হন।

    মন্তব্য : প্রজাপতি যাহা বলিয়াছিলেন তাহার অর্থ এই— চক্ষুর মধ্যে যিনি দ্রষ্টারূপে থাকিয়া দর্শন করেন, তিনিই আত্মা; যোগিগণ চক্ষু মুদ্রিত করিয়াও এই দ্রষ্টারূপী আত্মাকে দর্শন করেন। কিন্তু ইন্দ্র ও বিরোচন বুঝিয়াছিলেন যে, চক্ষুর মধ্যে যে প্রতিবিম্বিত মূর্তি দৃষ্ট হয়, তাহাই আত্মা (শঙ্কর)।

    অষ্টম খণ্ড – প্রজাপতি ও ইন্দ্র-বিরোচন-সংবাদ (২)—আসুরী উপনিষদ

    ৬০৫. উদশরাব আত্মানমবেক্ষ্য যদাত্মনো ন বিজানীথস্তন্মে প্রতমিতি। তৌ হোদশরাবেহবেক্ষাংচক্রাতে। তৌ হ প্রজাপতিরুবাচ কিং পশ্যথ ইতি। তৌ হোচতুঃ সর্বমেবেদমাবাং ভগব আত্মানং পশ্যাব আলোমভ্য আনখেভ্যঃ প্রতিরূপমিতি ॥ ১

    অন্বয় : উদশরাবে (উদকপূর্ণ শরাবে; শরাব=পাত্র) আত্মানম (আপনাকে) অবেক্ষ্য (দেখিয়া) যৎ (যাহা) আত্মনঃ (আত্মার) ন বিজানীথঃ (না জানিতে পার) তৎ (তাহা) মে (আমাকে) প্রতম্ (বল)। ইতি। তৌ (তাহারা দুই জন) হ উদশরাবে অবেক্ষাম্+ চক্রাতে (দর্শন করিয়াছিল); তৌ হ প্রজাপতিঃ উবাচ—কিম্ (কি) পশ্যথঃ (দেখিলে)? ইতি। তৌ (তাহারা দুইজন) হ উচতুঃ (বলিল) সর্বম্ এব ইদম্ (এই সমুদয়ই) আবাম্ (আমরা দুই জন) ভগবঃ (ভগবন্!) আত্মানম্ (আপনাকে) পশ্যাবঃ (দেখিলাম) আলোমভ্যঃ (লোম পর্যন্ত) আনখেভ্যঃ (নখ পর্যন্ত) প্রতিরূপম্ (প্রতিমূর্তিকে) ইতি।

    সরলার্থ : প্রজাপতি বলিলেন—’জলপূর্ণ পাত্রে নিজেকে দেখিয়া আত্মার সম্বন্ধে যাহা বুঝিবে না, তাহা আমাকে জিজ্ঞাসা করিও।’ তাঁহারা জলপূর্ণ পাত্রে নিজেদের দেখিলেন। তখন প্রজাপতি তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’কি দেখিলে?” তাঁহারা বলিলেন, “ভগবান, আমরা সমগ্র আত্মা—লোম ও নখ পর্যন্ত ইহার প্রতিমূর্তি দেখিলাম।

    ৬০৬. তৌ হ প্রজাপতিরুবাচ সাধ্বলঙ্কৃতৌ সুবসনৌ পরিষ্কৃতৌ ভূত্বোদশরাবেহ-বেক্ষেথামিতি। তৌ হ সাধ্বলঙ্কৃতে সুবসনৌ পরিষ্কৃতৌ ভূত্বোদশরাবেহ-বেক্ষাচক্রাতে। তৌ হ প্রজাপতিরুবাচ কিং পশ্যথ ইতি ॥ ২

    অন্বয় : তৌ (তাহাদিগকে) হ প্রজাপতিঃ উবাচ—সাধু+অলংকৃতৌ (সুন্দর বেশে অলংকৃত) সুবসনৌ (সুবসন পরিহিত) পরিষ্কৃতৌ (পরিষ্কৃত) ভূত্বা (হইয়া) উদশরাবে (উদকপূর্ণ পাত্রে) অবেক্ষেথাম্ (দেখ) ইতি। তৌ হ সাধু+অলঙ্কৃতৌ সুবসনৌ পরিষ্কৃতৌ ভূত্বা উদশরাবে অবেক্ষাম্+চক্রাতে (১মঃ)। তৌ হ প্রজাপতিঃ উবাচ—কিম্‌ পশ্যথঃ? ইতি (১মঃ)।

    সরলার্থ : প্রজাপতি তাহাদিগকে বলিলেন—’সুন্দর অলঙ্কার ও বসনে সজ্জিত এবং পরিষ্কৃত হইয়া জলপূর্ণ পাত্রে দেখ।’ তাঁহারা সুন্দর অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া সুন্দর বস্ত্র পরিয়া এবং পরিষ্কৃত হইয়া জলপূর্ণ পাত্রে দেখিলেন। প্রজাপতি জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কি দেখিলে?’

    ৬০৭. তৌ হোচতুৰ্যথৈবেদমাবাং ভগবঃ সাধ্বলংকৃতৌ সুবসনৌ পরিষ্কৃতৌ স্ব এবমেবেমৌ ভগবঃ সাধ্বলঙ্কৃতৌ সুবসনৌ পরিষ্কৃতাবিত্যেষ আত্মেতি হোবাচৈতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্মেতি তৌ হ শান্তহৃদয়ৌ প্ৰব্ৰজতুঃ ॥ ৩

    অন্বয় : তৌ (তাহারা দুই জন) হ ঊচতুঃ (বলিল)—যথা এব (যেমন) ইদম্ (এই প্রকার) আবাম্ (আমরা দুই জন) ভগবঃ সাধু+অলংকৃতৌ সুবসনৌ, পরিষ্কৃতৌ স্বঃ (আছি,) এবম্ এব (এই প্রকারই) ইমৌ (জলে দৃষ্ট এই দুই জন) ভগবঃ! সাধ্বলঙ্কৃতৌ, সুবসনৌ পরিষ্কৃতৌ ইতি। এষঃ (এই) আত্মা ইতি হ উবাচ—এতৎ (ইহা) অমৃতম্, অভয়ম্; এতৎ ব্রহ্ম ইতি। তৌ (তাহারা দুইজন) হ শান্তহৃদয়ৌ (শান্তহৃদয় হইয়া) প্রবব্রজতুঃ (প্রতিগমন করিল)।

    সরলার্থ : তাঁহারা বলিলেন—’ভগবান, এই আমরা যেমন সুন্দর অলঙ্কারে ও বসনে সজ্জিত এবং পরিষ্কৃত, তেমনি জলের মধ্যে দুইজনও সুন্দর অলঙ্কারে ও বসনে ভূষিত এবং পরিষ্কৃত।’ প্রজাপতি বলিলেন—’ইনিই আত্মা; ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্ৰহ্ম।’ তখন দুইজনে শান্তহৃদয়ে ফিরিয়া গেলেন।

    ৬০৮. তৌ হান্বীক্ষ্য প্রজাপতিরুবাচানুপলভ্যাত্মানমননুবিদ্য ব্ৰজতো যতর এতদুপনিষদো ভবষ্যন্তি দৈবা বাসুরা বা তে পরাভবিষ্যন্তীতি। স হ শান্তহৃদয় এব বিরোচনোঽসুরান্ জগাম, তেভ্যো হৈতামুপনিষদং প্রোবাচাত্মৈবেহ মহয্য আত্মা পরিচর্য আত্মানমেবেহ মহয়নাত্মানং পরি- চরনুভৌ লোকাববাপ্নোতীমং চামুং চেতি ॥ ৪

    সরলার্থ : তৌ (তাহাদিগকে) হ অনু + ঈক্ষ্য (নিরীক্ষণ করিয়া) প্রজাপতিঃ উবাচ (বলিলেন)—অনুপলভ্য (লাভ না করিয়া, অনুভব না করিয়া), আত্মানম্ (আত্মাকে) অনুবিদ্য (না জানিয়া, প্রাপ্ত না হইয়া) ব্ৰজতঃ (গমন করিল)। যতরে (এই দুইয়ের মধ্যে যে—দেবগণ বা অসুরগণ) এতৎ+উপনিষদঃ (এই প্রকার হইয়াছে উপনিষৎ অর্থাৎ বিদ্যা যাহাদিগের) ভবিষ্যন্তি (হইবে), দেবাঃ বা অসুরাঃ বা (দেবগণ বা অসুরগণ), তে (তাহারা) পরাভবিষ্যন্তি (বিনষ্ট হইবে, পরাভূত হইবে) ইতি। সঃ (সেই) হ শান্তহৃদয়ঃ এব বিরোচনঃ অসুরান্ (অসুরগণের নিকট) জগাম (গমন করিল)। তেভ্যঃ (তাহাদিগকে) হ এতাম্ উপনিষদম্ (উপনিষৎকে, এই তত্ত্বকে) প্রউবাচ (বলিল) —আত্মা এব (এই দেহই) ইহ (এই পৃথিবীতে) মহয্যঃ (পূজনীয়) আত্মা পরিচর্যঃ (সেব্য)। আত্মানম্ এব ইহ মহয়ন্ (মহীয়ান্ করিলে) আত্মানম্ পরিচর (পরিচর্যা করিলে) উভৌ লোকৌ (উভয় লোককে) অব আপ্নোতি (প্রাপ্ত হয়) ইমম্ চ (এই লোককে) অমুম্ চ (ঐ লোককে) ইতি।

    সরলার্থ : তাঁহাদের চলিয়া যাইতে দেখিয়া প্রজাপতি মনে মনে বলিলেন—’ইহারা আত্মাকে উপলব্ধি না করিয়াই, আত্মাকে না জানিয়াই চলিয়া গেল। ইহাদের মধ্যে যে এই জ্ঞানকেই উপনিষৎ অর্থাৎ প্রকৃত জ্ঞান বলিয়া গ্রহণ করিবে—সে দেবতাই হউক বা অসুরই হউক—বিনষ্ট হইবে।’ অসুররাজ বিরোচন শান্তচিত্তে অসুরগণের নিকট গিয়া তাঁহাদিগকে এই উপনিষৎ শিক্ষা দিলেন—’এই পৃথিবীতে দেহেরই (অর্থাৎ আত্মারই) পূজা ও পরিচর্যা করিবে। দেহকে মহীয়ান করিলে এবং তারপর পরিচর্যা করিলে ইহলোক পরলোক—উভয় লোকই লাভ করা যায়।’

    মন্তব্য : এস্থলে ‘আত্মা’=দেহ। এ বিষয়ে ১।২।১৪ মন্তব্য দ্রষ্টব্য।

    ৬০৯. তস্মাদপ্যদ্যেহাদদানমশ্ৰদ্ধধানমযজমানমাহুরাসুরো বতেত্যসুরাণাং হোষোপনিষৎ প্রেতস্য শরীরং ভিক্ষয়া বসনেনালঙ্কারেণেতি সংস্কৃর্বন্ত্যেতেন হামুং লোকং জেষ্যন্তো মন্যন্তে ॥ ৫

    অন্বয় : তস্মাৎ (সেইজন্য) অপি অদ্য (অদ্যাপি) ইহ (এই পৃথিবীতে) অদদানম্ (দানবিহীন লোককে) অশ্রদধানম্ (শ্রদ্ধাবিহীন লোককে) অযজমানম্ (যজ্ঞবিহীন লোককে) আহ্বঃ (বলিয়া থাকে) আসুরঃ বত ইতি (অসুরস্বভাবসম্পন্ন) অসুরাণাম্ (অসুরদিগের) হি এষা (এই) উপনিষৎ—প্রেতস্য (মৃত ব্যক্তির) শরীরম্ ভিক্ষয়া (ভিক্ষা, গন্ধমাল্য অনুপানাদি দ্বারা—শঙ্কর) বসনেন (বসন দ্বারা) অলঙ্কারেণ (অলঙ্কার দ্বারা) ইতি সংস্কুর্বন্তি (ভূষিত করে); এতেন (এই উপায়ে) হি অমুম্ লোকম্ (ঐ লোককে জেষ্যন্তঃ (জয় করিবে) মন্যন্তে (মনে করে)।

    সরলার্থ : এইজন্য আজও দানহীন, শ্রদ্ধাহীন ও যজ্ঞহীন ব্যক্তিকে অসুর বলা হয়। ইহাই অসুরদের উপনিষৎ। তাহারা গন্ধমালা, বস্ত্র ও অলঙ্কার দ্বারা মৃত ব্যক্তির দেহকে সাজায়; কারণ তাহারা মনে করে যে ঐ ভাবেই পরলোক জয় করিবে।

    মন্তব্য : ‘ভিক্ষয়া’ (ক) Monier Williams বলেন—’ভোগ করিবার ইচ্ছা’ অর্থে ‘ভজ্‌’ ধাতু হইতে ‘ভিক্ষা’ ধাতু হইয়াছে। এই মত গ্রহণ করিলে ‘ভিক্ষা’র একটি অর্থ ‘ভোগ্যবস্তু’ হইতে পারে। তাহা হইলে ভিক্ষয়া=ভোগ্যবস্তুর দ্বারা। (খ) মৃতদেহকে শ্মশানে লইয়া যাইবার সময় অনেকে হয়ত ইহার জন্য গন্ধমালাদি প্ৰদান করিত; ইহাকেও ‘ভিক্ষা’ বলা যাইতে পারে।

    নবম খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ— দেহাত্মবোধের ভ্রম

    ৬১০. অথ হেন্দ্ৰোহপ্ৰাপ্যৈব দেবানেতদ্ভয়ং দদর্শ যথৈব খল্বমস্মিঞ্ছরীরে সাধু- অলঙ্কৃতে সাধ্বলঙ্কৃতে ভবতি সুবসনে সুবসনঃ পরিষ্কৃতে পরিষ্কৃত এবমেবায়মস্মিন্নন্ধেহন্ধো ভবতি স্লামে স্ত্রামঃ পরিবৃণে পরিবৃণোহস্যেব শরীরস্য নাশমন্বেষ নশ্যতি নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীতি ॥ ১

    অন্বয় : অথ হ ইন্দ্ৰঃ অপ্রাপ্য এব (না পাইয়া, না যাইয়া) দেবান্ (দেবতাদিগের নিকট) এতং ভয়ং (এই শঙ্কা) দদর্শ (দেখিল)—যথা এব (যেমন) খলু অয়ম্ (এই জলে প্রতিবিম্বিত দেহ) অস্মিন্ শরীরে সাধু+অলঙ্কৃতে (এই শরীর সুন্দররূপ অলঙ্কৃত হইলে) সাধু+অলঙ্কৃতঃ (সুন্দর অলঙ্কৃত) ভবতি (হয়), সুবসনে (সুবসন পরিধান করিলে)) সুবসন পরিহিত), পরিষ্কৃতে (পরিষ্কৃত হইলে) পরিষ্কৃতঃ, এবম্ এব (এই প্রকারেই) অয়ম্ অস্মিন্ অন্ধে (ইহা অন্ধ হইলে) অন্ধঃ ভবতি, স্লামে (খঞ্জ হইলে) স্লামঃ (খঞ্জ), পরিবৃষ্ণে (হস্তপদাদি ছিন্ন হইলে) পরিবৃষ্ণঃ, অস্য এব শরীরস্য (এই শরীরের নাশম্ অনু (নাশের পর) এষঃ (এই প্রতিবিম্বিত দেহ) নশ্যতি (বিনষ্ট হয়)। ন অহম্ (আমি) অত্র (এই উপদেশে) ভোগ্যম্ (ফল) পশ্যামি (দেখিতেছি) ইতি।

    সরলার্থ : এদিকে দেবতাদের কাছে ফিরিয়া যাইবার পূর্বেই ইন্দ্রের আশঙ্কা হইল যে, এই দেহ সুন্দর অলঙ্কারে সজ্জিত হইলে জলে প্রতিবিম্বিত দেহও অলঙ্কৃত হয়, ইহা সুবসন পরিহিত হইলে ঐ দেহও তাহাই হয়, ইহা পরিষ্কৃত হইলে উহাও পরিষ্কৃত হয়। আবার এই দেহ অন্ধ হইলে প্রতিবিম্বও অন্ধ হয়, ইহা খঞ্জ হইলে উহাও হয়, ইহার হস্তপদাদি ছিন্ন হইলে উহারও তাহাই হয়, ইহার বিনাশ হইলে উহারও বিনাশ হয়। এই বিদ্যাতে আমি মঙ্গল দেখিতেছি না।

    মন্তব্য : শঙ্করের মতে স্লাম শব্দের দুইটি অর্থ—(ক) কানা অর্থাৎ যাহার একটি মাত্র চক্ষু, (খ) যাহার চক্ষু ও নাসিকা হইতে ক্লেদ বহির্গত হয়। ঋগ্বেদে প্রথমোক্ত অর্থে ‘স্লাম’ শব্দের ব্যবহার আছে (৮।৪।৫)।

    ৬১১. স সমিৎপাণিঃ পুনরেয়ায়, তং হ প্রজাপতিরুবাচ মঘবন্ যচ্ছান্তহৃদয়ঃ প্রাব্রাজীঃ সাধং বিরোচনেন কিমিচ্ছন্ পুনরাগম ইতি স হোবাচ যথৈব খল্বয়ং ভগবোহস্মিঞ্ছরীরে সাধ্বলঙ্কৃতে সাধ্বলঙ্কৃতো ভবতি সুবসনে সুসবনঃ পরিষ্কৃতে পরিষ্কৃত এবমেবায়মস্মিন্নন্ধেহ ন্ধো ভবতি সামে গ্রামঃ পরিবৃষ্ণে পরিবৃণোহস্যৈব শরীরস্য নাশমন্বেষ নশ্যতি নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীতি ॥ ২

    অন্বয় : সঃ (সে) সমিপাণিঃ (হস্তে সমিধ লইয়াই) পুনঃ এয়ায় (ফিরিয়া আসিল)। তম্ (তাহাকে) হ প্রজাপতিঃ উবাচ—মঘবন্! যৎ (যে, যেহেতু) শান্তহৃদয়ঃ (শান্তহৃদয় হইয়া) প্র+আব্রাজীঃ (গিয়াছিল) সার্ধ বিরোচনেন (বিরোচনের সহিত), কিম্ ইচ্ছন্ (কি ইচ্ছা করিয়া) পুনঃ আগমঃ (আগমন করিলে)? ইতি। সঃ হ উবাচ—যথা এব খলু অয়ং ভগব অস্মিন্ শরীরে সাধ্বলঙ্কৃতে সালঙ্কৃতঃ ভবতি, সুবসনে সুবসনঃ, পরিষ্কৃতে পরিষ্কৃতঃ— এবম্ এব অয়ম অস্মিন্ অন্ধে অন্ধঃ ভবতি, স্লামে স্রামঃ, পরিবৃণে পরিবৃকণঃ অস্য এব শরীরস্য নাশম্ অনু এষঃ নশ্যতি, ন অহম্ অত্র ভোগ্যম্ পশ্যামি ইতি (১মঃ দ্রঃ)।

    সরলার্থ : ইন্দ্র আবার সমিধ হস্তে ফিরিয়া আসিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন ‘ইন্দ্র, তুমি শান্তহৃদয়ে বিরোচনের সঙ্গে চলিয়া গিয়াছিলে। কি মনে করিয়া আবার ফিরিয়া আসিলে?’ ইন্দ্ৰ বলিলেন—’ভগবান্, এই শরীর উত্তমরূপে অলঙ্কৃত হইলে ছায়াদেহও অলঙ্কৃত হয়, ইহার পরিধানে সুবসন থাকিলে উহারও তাহাই হয়, ইহা পরিষ্কৃত থাকিলে উহাও পরিষ্কৃত থাকে। তেমনি ইহা অন্ধ হইলে উহাও অন্ধ হয়, খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয়, ছিন্নাবয়ব হইলে ছিন্নাবয়ব হয়; শরীর বিনষ্ট হইলে উহাও বিনষ্ট হয়। এই বিদ্যাতে আমি মঙ্গল দেখিতেছি না।’

    ৬১২. এবমেবৈষ মঘবন্নিতি হোবাচৈতং ত্বেব তে ভূয়োহনুব্যাখ্যাস্যামি বসাপরাণি দ্বাত্রিংশতং বর্ষাণীতি। স হাপরাণি দ্বাত্রিংশতং বর্ষাবাস তস্মৈ হোবাচ ॥ ৩

    অন্বয় : এবম্ এব (এই প্রকারেই) এষঃ (ইহা) মঘবন্! ইতি হ উবাচ—এতম্ (ইহা) তু এব তে (তোমাকে) ভূয়ঃ অনুব্যাখ্যাস্যামি (ব্যাখ্যা করিব)। বস (বাস কর) অপরাণি দ্বাত্রিংশতম্ বর্ষাণি (আরও বত্রিশ বৎসর) ইতি। স হ অপরাণি দ্বাত্রিংশতম্ বর্ষাণি উবাস (বাস করিল)। তস্মৈ (তাহাকে) হ উবাচ (বলিলেন)

    সরলার্থ : প্রজাপতি বলিলেন—’ইন্দ্ৰ, ইহা এই রকমই। তোমাদের নিকট এই বিষয়টি আবার ব্যাখ্যা করিব। তুমি আরও বত্রিশ বৎসর এখানে বাস কর।’ ইন্দ্র আরও বত্রিশ বৎসর বাস করিলেন। তারপর (প্রজাপতি) তাঁহাকে বলিলেন—।

    দশম খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—স্বপ্নাবস্থার শুভাশুভ

    ৬১৩. য এষ স্বপ্নে মহীয়মানশ্চরত্যেষ আত্মেতি হোবাচৈতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্মেতি। স হ শান্তহৃদয়ঃ প্রব্রাজ স হাপ্রাপ্যৈব দেবানেতদ্ ভয়ং দদৰ্শ তদ্ যদ্যপীদং শরীরমন্ধং ভবত্যনন্ধঃ স ভবতি যদি স্লামমগ্রামো নৈবৈষোহস্য দোষেণ দুষ্যতি ॥ ১

    ৬১৪. ন বধেনাস্য হন্যতে নাস্য স্লামো স্ৰাম্যেণ ঘ্নন্তি ত্বেবৈনং বিচ্ছাদয়ন্তীবা- প্রিয়বেত্তের ভবত্যপি রোদিতীব নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীতি ॥২

    অন্বয় : যঃ এষঃ (এই যিনি) স্বপ্নে মহীয়মানঃ (পূজ্যমান হইয়া) চরতি (বিচরণ করেন), এষঃ (ইনিই) আত্মা ইতি হ উবাচ—এতৎ অমৃতম্, অভয়ম্, এতৎ ব্ৰহ্ম ইতি (৮।৮।৩ দ্রঃ)। সঃ হ শান্তহৃদয়ঃ প্ৰব্ৰাজ। সঃ হ অপ্রাপ্য এব দেবান্ এতৎ ভয়ম্ দদর্শ (৮।৯।১ দ্রঃ)—তৎ যদি অপি ইদম শরীরম্ অন্ধম্ ভবতি (হয়), অনন্ধঃ (অন্ধ নয় এমন, চক্ষুষ্মান্) সঃ ভবতি। যদি স্লামম্ (খঞ্জ) অস্ত্রামঃ (খঞ্জ নয় এমন)। ন এব অস্য (এই শরীরের) দোষেণ (দোষদ্বারা) দুষ্যতি (দূষিত হয়) (৮।৯।২), ন বধেন (বধ দ্বারা) অস্য (এই শরীরের) হন্যতে (বিনাশ প্রাপ্ত হয়), ন অস্য স্লামেণ (খঞ্জত্বদ্বারা) স্রামঃ (খঞ্জ)। মন্তি (বিনাশ করে) তু এব (=ইব, যেন) এনম্ (ইহাকে) বিচ্ছাদয়ন্তি ইব (যেন ধাবিত হয়—শঙ্কর) অপ্রিয়বেত্তা ইব (যেন অপ্রিয় ঘটনার বেত্তা; বেত্তা=বেতৃ, যে জানে বা অনুভব করে ভবতি (হয়) অপি রোদিতি ইব (যেন ক্রন্দন করিতেছে)। ন অহম্ অত্র ভোগ্যম্ (কল্যাণ) পশ্যামি ইতি (দেখিতেছি)।

    সরলার্থ : (১ম ও ২য় মন্ত্র)—এই যিনি স্বপ্নে পূজিত হইয়া বিচরণ করেন, তিনিই আত্মা, তিনিই অমৃত, অভয়, তিনিই ব্রহ্ম। তখন ইন্দ্ৰ শান্তহৃদয়ে চলিয়া গেলেন, কিন্তু দেবতাদের নিকট উপস্থিত হইবার আগেই তাঁহার মনে এই আশঙ্কা দেখা দিল— ‘যদিও এই শরীর অন্ধ হইলে স্বপ্নপুরুষ অন্ধ হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে সে খঞ্জ হয় না, এই শরীরের দোষে সে দূষিত হয় না, দেহ বিনষ্ট হইলে সে বিনষ্ট হয় না, দেহের অশ্রুপাতেও ইহার অশ্রুপাত হয় না—তবুও (নিদ্রাবস্থায় মনে হয়, এই স্বপ্নপুরুষকে) যেন কেহ বিনাশ করিতেছে, কেহ ইহাকে তাড়া করিতেছে, এই স্বপ্নপুরুষ যেন দুঃখ অনুভব করিতেছে, রোদন করিতেছে। এই উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।

    মন্তব্য : ৮।১০।২ শঙ্করের মতে বিচ্ছাদয়ন্তি=বিদ্রাবয়তি—পশ্চাৎ ধাবিত হয়। মোক্ষমূলার বলেন—এই শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘আবরণ উন্মুক্ত করা’, সুতরাং এস্থলে এ অর্থ সঙ্গত হয় না।’ এই জন্য তিনি ‘বিচ্ছায়য়ন্তি’ পাঠ গ্রহণ করিয়াছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও (৪।৩।২০) এরূপ স্থলে ‘বিচ্ছায়য়তি’ প্ৰয়োগ আছে।

    ৬১৫. স সমিপাণিঃ পুনরেয়ায় তং হ প্রজাপতিরুবাচ মঘবন্ যচ্ছান্তহৃদয়ঃ প্রাব্রাজীঃ কিমিচ্ছন্ পুনরাগম ইনি স হোবাচ তদ্ যদ্যপীদং ভগবঃ শরীরমন্ধং ভবত্যনন্ধঃ স ভবতি যদি স্লামমগ্রামো নৈবৈষোহস্য দোষেণ দুষ্যতি ॥ ৩

    ৬১৬. ন বধেনাস্য হন্যকে নাস্য সাম্যেণ স্লামো মন্তিত্বৈবৈনং বিচ্ছাদয়ন্তীবা- প্রিয়বেত্তেব ভবত্যপি রোদিতীব, নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীত্যেবমেবৈষ মঘবন্নিতি হোবাচৈতং ত্বেব তে ভূয়োহনুব্যাখ্যাস্যামি বসাহপরাণি দ্বাত্রিংশতং বর্ষাণীতি। স হাপরাণি দ্বাত্রিংশতং বর্ষাবাস তস্মৈ হোবাচ ॥ ৪

    অন্বয় : সঃ সমিপাণিঃ পুনঃ এয়ায়। তম্ হ প্রজাপতিঃ উবাচ—মঘবন্! যৎ শান্তহৃদয়ঃ প্রাব্রাজীঃ, কিম, ইচ্ছন্, পুনঃ আগমঃ? ইতি (৮।১০।২)। সঃ হ উবাচ—তৎ যদি অপি ইদম্ ভগবঃ শরীরম্ অন্ধম্ ভবতি; অনন্ধঃ সঃ ভবতি; যদি স্লামম্, অস্ত্রামঃ; ন এব এষঃ অস্য দোষেণ দুষ্যতি (১মঃ)। ন বধেন অস্য হন্যতে ন অস্য স্ল্যম্যে স্রামঃ, ঘ্নন্তি তু এব এনম্, বিচ্ছাদয়ন্তি ইব, অপ্রিয়বেত্তা ইব ভবতি, অপি রোদিতি ইব। ন অহম্ অত্র ভোগ্যম্ পশ্যামি ইতি (২মঃ)। এবম্ এব এষঃ মঘবন্ ইতি হ উবাচ, এতম্ তু এব তে ভূয়ঃ অনুব্যাখ্যাস্যামি। বস অপরাণি দ্বাত্রিংশতম্ বর্ষাণি ইতি। সঃ হ অপরাণি দ্বাত্রিংশতম্ বর্ষাণি উবাস। তস্মৈ হ উবাচ—

    সরলার্থ : (৩য় ও ৪র্থ মন্ত্র)—তিনি সমিধহস্তে আবার ফিরিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—’ইন্দ্র, তুমি শান্তচিত্তে চলিয়া গিয়াছিলে, আবার কি মনে করিয়া ফিরিয়া আসিলে?’ ইন্দ্ৰ বলিলেন— ভগবান্, এই শরীর অন্ধ হইলে যদিও স্বপ্নাত্মা অন্ধ হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয় না, শরীরের দোষে ইহা দূষিত হয় না, শরীরকে বিনাশ করিলে বিনষ্ট হয় না, শরীর খঞ্জ হইলে খঞ্জ হয় না—তবুও (স্বপ্নে দেখা যায়) ইহাকে যেন কেহ বিনাশ করিতেছে, ইহার পশ্চাতে যেন কেহ ধাবিত হইতেছে, ইহা যেন দুঃখ ভোগ করিতেছে এবং ইহা যেন ক্রন্দন করিতেছে। ইহাতে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’ প্রজাপতি বলিলেন—’ইন্দ্র, ইহা এই রকমই। তোমার নিকট ইহা আমি আবার ব্যাখ্যা করিব। তুমি আরও বত্রিশ বৎসর এখানে বাস কর।’ ইন্দ্র আবার বত্রিশ বৎসর বাস করিলেন। তখন প্রজাপতি বলিলেন।

    একাদশ খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—সুষুপ্ত অবস্থার শুভাশুভ

    ৬১৭. যদ্ যত্রৈত‍ সুপ্তঃ সমস্তঃ সম্প্রসন্নঃ স্বপ্নং ন বিজানাত্যেষ আত্মেতি হোবাচৈতদমৃতমভয়মেতদ্ ব্রহ্মেতি। স হ শান্তহৃদয়ঃ প্রবব্রাজ স হ অপ্রাপ্যৈব দেবানেতদ্ভয়ং দর্দশ নাহ খল্বয়মেবং সম্প্রত্যাত্মানং জানাত্যয়-মহমস্মীতি নো এবেমানি ভূতানি বিনাশমেবাপীতো ভবতি নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীতি ॥ ১

    অন্বয় : তৎ [এতৎ] (সেই এই) যত্র (যখন) এতৎ সুপ্তঃ সমস্তঃ সম্প্রসন্নঃ স্বপ্নম্‌ নৈ বিজানাতি (৮।৬।৩), এষঃ আত্মা ইতি হ উবাচ—এতৎ অমৃতম্, অভয়ম্, এতৎ ব্রহ্ম ইতি। সঃ শান্তহৃদয়ঃ প্রব্রাজ। সঃ হ অপ্রাপ্য এব দেবান্ এতৎ ভয়ম্ দদশ (৮।৯।১)—নাহ (না+হ=নিশ্চয়ই নয়; কিংবা ন+অহ; ন=না, অহ=নিশ্চয়ই) খলু অয়ম্‌ (ইহা) এবম্ (এই প্রকার) সম্প্রতি (এই সময়ে) আত্মানম্ (আপনাকে) জানাতি (জানে)— অয়ম্ (ইহা) অহম্ (আমি) অস্মি (হই) ইতি নো (ন+উ=না) এব ইমানি ভূতানি (এই সর্বভূতকেও) বিনাশম্ এব (বিনাশকেই; কিংবা যেন বিনাশকে, এব=যেন) অপীতঃ (প্রাপ্ত) ভবতি। ন অহম্ অত্র ভোগ্যম্ পশ্যামি (২মঃ)।

    সরলার্থ : প্রজাপতি বলিলেন-’এই যে প্রসুপ্ত জীব (নিদ্রিতাবস্থায়) একীভূত হন, প্রসন্নতা লাভ করেন এবং স্বপ্নদর্শন হইতেও বিরত হন, ইনিই আত্মা, ইনিই অমৃত ও অভয়, ইনিই ব্রহ্ম।’ ইন্দ্র তখন শান্তহৃদয়ে ফিরিয়া গেলেন। কিন্তু দেবগণের নিকট উপস্থিত হইবার পূর্বেই তাহার এই আশঙ্কা দেখা দিল—’এই সময়ে ইনি নিজেকে ‘ইহাই আমি’ এইভাবে জানিতে পারেন না, এবং ইনি এইসব প্রাণীদেরও জানিতে পারেন না। সেই সময়ে ইহার যেন বিনাশ হয়। এই উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’

    ৬১৮. স সমিপাণিঃ পুনরেয়ায় তং হ প্রজাপতিরুবাচ মঘবন্ যচ্ছান্তহৃদয়ঃ প্রাব্রাজীঃ কিমিচ্ছন্ পুনরাগম ইতি। স হোবাচ নাহ খল্বয়ং ভগব এবং সম্প্রত্যাত্মানং জানাত্যয়মহমস্মীতি, নো এবেমানি ভূতানি বিনাশমেবাপীতো ভবতি, নাহমত্র ভোগ্যং পশ্যামীতি ॥ ২

    অন্বয় : সঃ সমিপাণিঃ পুনঃ এয়ায়। তম্ হ প্রজাপতিঃ উবাচ—মঘবন্! যৎ শান্তহৃদয়ঃ প্রাব্রাজীঃ কিম্ ইচ্ছন্ পুনঃ আগমঃ? ইতি (৮।৯।২)। সঃ হ উবাচ—নাহ খলু অয়ম্ ভগবঃ এবম্ সম্প্রতি আত্মানম্ জানাতি—অয়ম্ অহম্ অস্মি ইতি, নো এব ইমানি ভূতানি। বিনাশম্ এব অপীতঃ ভবতি। ন অহম্ অত্র ভোগ্যম্ পশ্যামি ইতি (৮। ১১। ১)।

    সরলার্থ : (তখন) সমিধহস্তে ইন্দ্র আবার ফিরিয়া আসিলেন। প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন—’ইন্দ্ৰ, তুমি শান্তহৃদয়ে চলিয়া গিয়েছিলে, আবার কি মনে করিয়া ফিরিয়া আসিলে?” ইন্দ্ৰ বলিলেন—’ভগবান্, এই সময়ে ইনি নিজের বিষয়েই জানিতে পারেন না যে ‘ইহাই আমি’ এবং ইনি প্রাণীদিগকেও জানিতে পারেন না। ঐ সময়ে ইহার যেন বিনাশ হয়। এ উপদেশে আমি কল্যাণ দেখিতেছি না।’

    ৬১৯. এবমেবৈষ মঘবন্নতি হোবাচৈতং ত্বেব তে ভূয়োহনুব্যাখ্যাস্যামি নো এবান্যত্রৈতস্মাদ্বসাপরাণি পঞ্চবর্ষাণীতি। স হাপরাণি পঞ্চ বর্ষাগ্যুবাস তান্যেকশতং সম্পেদুরেতত্তদ্ যদাত্তুরেকশতং হ বৈ বর্ষাণি মঘবান্ প্রজাপতৌ ব্রহ্মচর্যমুবাস তস্মৈ হোবাচ ॥ ৩

    অন্বয় : এবম্ এব এষঃ, মঘবন্! ইতি হ উবাচ এতমু তু এব তে ভূয়ঃ অনু- ব্যাখ্যাস্যামি (৮।৯।৩)। নো (ন+উ, না) এর অন্যত্র (অন্য) এতস্মাৎ (প্রকৃত আত্মা হইতে)। বস (বাস কর) অপরাণি পঞ্চবর্ষাণি (আর পাঁচ বৎসর) ইতি। সঃ হ অপরাণি পঞ্চবর্ষাণি উবাস (বাস করিয়াছিল)। তানি (সেই সমুদয়) একশতম্ (১০১ বৎসর সম্পেদুঃ (পূর্ণ হইয়াছিল)। এতৎ (ইহা) তৎ (সেই জন্য) যৎ (যে) আহুঃ (লোকে বলে)) একশতম্ হ বৈ বর্ষাণি (১০১ বৎসর) মঘবান্ প্রজাপতৌ (প্রজাপতির নিকট) ব্রহ্মচর্যম্ উবাস (ব্রহ্মচারীরূপে বাস করিয়াছিল)। তস্মৈ (তাহাকে) হ উবাচ (বলিলেন) —

    সরলার্থ : প্রজাপতি বলিলেন—ইন্দ্ৰ, ইহা এই রকমই। এই আত্মার বিষয়ে আবার তোমাকে উপদেশ দিব, ইহা ছাড়া অন্য কিছু ব্যাখ্যা করিব না। তুমি আরও পাঁচ বৎসর এখানে বাস কর। ইন্দ্র আরও পাঁচ বৎসর বাস করিলেন। সবশুদ্ধ একশ এক বৎসর হইল। এই জন্যই লোকে বলিয়া থাকে, ‘ইন্দ্র প্রজাপতির নিকট একশ এক বৎসর ব্রহ্মচর্য নিয়া বাস করিয়াছিলেন।’ (তখন) প্রজাপতি তাঁহাকে বলিলেন—।

    দ্বাদশ খণ্ড – ইন্দ্র-প্রজাপতি—সংবাদ—অশরীরী আত্মা ও ব্রহ্মলোকের বর্ণনা

    ৬২০. মঘবন্ মর্ত্যং বা ইদং শরীরমাত্তং মৃত্যুনা তদস্যামৃতস্যা- শরীরস্যাত্মনোহ-ধিষ্ঠানমাত্তো বৈ সশরীরঃ প্রিয়াপ্রিয়াভ্যাং ন বৈ সশরীরস্য সতঃ প্রিয়া—প্রিয়য়োরপহতিরস্ত্যশরীরং বাব সন্তং ন প্রিয়াপ্রিয়ে স্পৃশতঃ ॥ ১

    অন্বয় : মঘবন্! মর্ত্যম্ বৈ ইদম্ (এই) শরীরম্ আত্তম্ (গৃহীত, গ্রস্ত)) মৃত্যুনা (মৃত্যু কর্তৃক)। তৎ (সেই শরীর) অস্য অমৃতস্য অশরীরস্য আত্মনঃ (এই অশরীরী অমৃতস্বরূপ আত্মার) অধিষ্ঠানম্। আত্তঃ (গ্রস্ত) বৈ সশরীরঃ (শরীরী অবস্থায়) প্রিয় + অপ্রিয়াভ্যাম্ (প্রিয় ও অপ্রিয় কর্তৃক)। ন বৈ সশরীরস্য সতঃ (শরীরী আত্মার, সৎ=সত্তা, সৎস্বরূপ) প্রিয়+অপ্রিয়য়োঃ (প্রিয় ও অপ্রিয়ের) অপহতিঃ (বিনাশ) অস্তি (আছে)। অশরীরম্ বাব সন্তম্ (অশরীর আত্মাকে) ন প্রিয়+অপ্রিয়ে (প্রিয় ও অপ্রিয়) স্পৃশতঃ (স্পর্শ করে)।

    সরলার্থ : হে ইন্দ্র, এই শরীর মরণশীল এবং মৃত্যুগ্রস্ত। ইহাই এই অমৃত অশরীর আত্মার অধিষ্ঠান। যাহার শরীর আছে তিনিই সুখদুঃখগ্রস্ত হন, তাঁহার সুখদুঃখের বিরাম নাই। অশরীর আত্মাকে প্রিয় ও অপ্রিয় স্পর্শ করিতে পারে না।

    ৬২১. অশরীরো বায়ুরভ্রং বিদ্যুৎ স্তনয়িতুরশরীরাণ্যেতানি তদ্যথৈতান্য- মুম্মাদা-কাশাৎ সমুথায় পরং জ্যোতিরুপসম্পদ্য স্বেন রূপেণাভি— নিষ্পদ্যন্তে ॥ ২

    ৬২২. এবমেবৈষ সম্প্রসাদোহ স্মাচ্ছরীরাৎ সমুথায় পরং জ্যোতিরূপসম্পদ্য স্বেন রূপেণাভিনিষ্পদ্যতে স উত্তমঃ পুরুষঃ। স তত্র পর্যেতি জক্ষৎ ক্রীড়ন্ রমমাণঃ স্ত্রীভির্বা যানৈর্বা জ্ঞাতিভির্বা নোপজনং স্মরনিন্দং শরীরং স যথা প্রয়োগ্য আচরণে যুক্ত এবমেবায়মস্মিঞ্জুরীরে প্রাণো যুক্তঃ ॥ ৩

    অন্বয় : অশরীরঃ (শরীরবিহীন) বায়ুঃ, অভ্রম্ (মেঘ; মেঘের প্রথমাবস্থা) বিদ্যুৎ, স্তনয়িত্বঃ (মেঘগর্জন) অশরীরাণি এতানি (এ সমুদয় অশরীর)। তৎ যথা (যেমন) এতানি (এ সমুদয়) অমুম্মাৎ আকাশাৎ (ঐ আকাশ হইতে) সমুথায় (উত্থিত হইয়া) পরম্‌ জ্যোতিঃ (পরম জ্যোতিকে) উপসম্পদ্য (প্রাপ্ত হইয়া) স্বেন রূপেণ (স্বীয় রূপে) অভিনিষ্পদ্যন্তে (প্রকাশিত হয়)। এবম্ এব (তেমনি) এষঃ সম্প্রসাদঃ (প্রসন্নতাপ্রাপ্ত এই আত্মা) অস্মাৎ শরীরাৎ সমুথায় পরম্ জ্যোতিঃ উপসম্পদ্য স্কেন রূপেণ অভিনিষ্পদ্যতে (৮।৩।৪ টীকা)। সঃ (সেই আত্মা) উত্তমঃ পুরুষঃ (শ্রেষ্ঠ পুরুষ)। সঃ তত্র (সেই অবস্থাতে) পর্যেতি (সর্বত্র বিচরণ করে) জক্ষৎ (ভোজন করিয়া, বা হাস্য করিয়া) ক্রীড়ন্ (ক্রীড়া করিয়া) রমমাণঃ (আনন্দ লাভ করিয়া), স্ত্রীভিঃ বা (স্ত্রীলোকের সহিত) যানৈঃ বা (যানের সহিত, যানে আরোহণ করিয়া), জ্ঞাতিভিঃ বা (জ্ঞাতিগণের সহিত) ন (না উপজনম্ (শরীরকে) স্মরন্ (স্মরণ করিয়া) ইদম্ শরীরম্ (এই শরীরকে)।—সঃ যথা (যেমন, ৪।১৬।৩ মন্তব্য দ্রঃ) প্রযোগ্যঃ (রথাদিতে যাহাদিগকে যুক্ত করা হয়; অশ্ব বা বলীবর্দ) আচরণে (রথে; যাহাতে লোকে বিচরণ করিতে পারে) যুক্তঃ এবম্ এব (এই প্রকার) অয়ম্ প্রাণঃ (এই প্রাণ) অস্মিন্ শরীরে যুক্তঃ।

    সরলার্থ : (২য় ও ৩য় মন্ত্র)—বায়ু অশরীর; মেঘ, বিদ্যুৎ, মেঘগর্জন এই সবও তাই। ইহারা যেমন আকাশ হইতে উঠিয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া আপন আপন রূপে প্রকাশিত হয়, সেই রকম সম্প্রসন্ন এই আত্মা শরীর হইতে বাহির হইয়া পরম জ্যোতির্ময় হইয়া বিরাজ করে। ইহাই সেই শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তখন নারী বা জ্ঞাতিগণের সঙ্গে বা যানে আরোহণ করিয়া সে আহারে, ক্রীড়ায় আনন্দ উপভোগ করিয়া বিচরণ করিতে থাকে। যে দেহে তাহার উৎপত্তি, সেই দেহকে তখন সে ভুলিয়া যায়। অশ্ব যেমন রথে সংযুক্ত থাকে, তেমনি প্রাণও এই দেহে সংযুক্ত হইয়া রহিয়াছে।

    মন্তব্য : ৮।১২।৩, দেহে আত্মার জন্ম হয় বা উপজন্ম হয়, এই জন্য দেহের নাম ‘উপজন’। শঙ্কর ইহার দুইটি অর্থ দিয়াছেন, (ক) স্ত্রীপুংসয়োঃ অন্যোন্যোপগমেন জায়তে ইতি উপজনম্; (খ) আত্মভাবেন বা আত্মসামীপ্যেন জায়তে ইতি উপজনম্ অর্থাৎ আত্মভাবে—আত্মার সমীপস্থরূপে উৎপন্ন হয়, এইজন্য শরীরকে উপজন বলা যাইতে পারে।

    দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মন্ত্রে যাহা বলা হইয়াছে, তাহার অর্থ এই—বায়ু, মেঘ, বিদ্যুৎগর্জন প্রভৃতির হস্তপদাদি অবয়ব নাই, সুতরাং ইহারা অশরীর। এই অশরীরের বায়ু প্রভৃতির ন্যায় আত্মাও অশরীর। কিন্তু বায়ু, অভ্রাদি কখন কখন স্বীয় রূপ পরিত্যাগ করিয়া আকাশে বিলীন হইয়া যায়, তখন যেন ইহারা আকাশত্বই প্রাপ্ত হয়। এই অবস্থায় ইহাদের স্বতন্ত্র সত্তা উপলব্ধি করা যায় না; লোকে মনে করে কেবল আকাশ‍ই রহিয়াছে। তেমনি আত্মাও যখন শরীরে মগ্ন হইয়া থাকে, তখন ইহার স্বতন্ত্র সত্তা অনুভব করা যায় না, লোকে কেবল দেহই দেখে; ইহার অতিরিক্ত যে আত্মা নামে এক বস্তু আছে, তাহা বুঝিতে পারে না। শীতকালে বায়ু ইত্যাদি আকাশে বিলীন হইয়া থাকে। শীতের অবসানে ইহারা আকাশ হইতে উত্থিত হয় এবং সূর্যের কিরণ লাভ করিয়া নিজ নিজ প্রকৃতি লাভ করে। তখন ইহারা বায়ু, মেঘ প্রভৃতি রূপে প্রকাশিত হয় এবং ইহা ইহাদিগের স্বরূপ। ইহারা যেমন আকাশ হইতে উত্থিত হইয়া সূর্যের উত্তাপ লাভ করিয়া স্ব স্ব রূপ লাভ করে, আত্মাও তেমনি দেহ হইতে উত্থিত হইয়া ব্ৰহ্মজ্যোতি লাভ করিয়া স্বরূপ প্রাপ্ত হয়। এই আত্মাকেই সম্প্রসাদ বলা হইয়াছে এবং ইহাই আত্মার স্বরূপ।

    ৬২৩. অথ যত্রৈতদাকাশমনুবিষণ্নং চক্ষুঃ স চাক্ষুষঃ পুরুষো দর্শনায় চক্ষুরথ যো বেদেদং জিঘ্রাণীতি স আত্মা গন্ধায় ঘ্রাণমথ যো বেদেদমভিব্যাহরাণীতি স আত্মাহভিব্যাহারায় বাগথ যো বেদেদং শূণবানীতি স আত্মা শ্রবণায় শ্রোত্রম্ ॥ ৪

    অন্বয় : অথ যত্র (যে স্থলে) এতৎ [চক্ষুঃ] (এই চক্ষু) আকাশম্ (চক্ষুর যে কৃষ্ণতারা, সেই আকাশ) অনুবিষণ্নম্ (অনুপ্রবিষ্ট) চক্ষুঃ সঃ চাক্ষুষঃ পুরুষঃ (চক্ষুর অধিষ্ঠাতৃ পুরুষ); দর্শনায় (দর্শন করিবার জন্য) চক্ষুঃ। অথ যঃ (যিনি) বেদ (জানেন ইদম্ (ইহাকে) জিঘ্রাণি (ঘ্রাণ করিতে পারি) ইতি, সঃ আত্মা; গন্ধায় (গন্ধ গ্রহণ করিবার জন্য) ঘ্রাণম্ (ঘ্রাণেন্দ্রিয়)। অথ যঃ বেদ ইদম্ অভিব্যাহরাণি (কথা কহিতে পারি) ইতি, সঃ আত্মা; অভিব্যাহারায় (কথা বলার জন্য) বাক্ (বাগিন্দ্রিয়)। অথ যঃ বেদ ইদম্ শূণবানি (শ্রবণ করিতে পারি) ইতি, সঃ আত্মা শ্রবণায় (শ্রবণ করিবার জন্য) শ্রোত্রম্ (শ্রবণেন্দ্রিয়)।

    সরলার্থ : এই দর্শনেন্দ্রিয় (চক্ষুর অভ্যন্তরস্থ) আকাশের (অর্থাৎ কৃষ্ণ তারকার যেই জায়গায় অনুপ্রবিষ্ট আছে, সেইখানেই চক্ষুর অধিষ্ঠাতৃ পুরুষ রহিয়াছেন। চক্ষু কেবল দেখিবার জন্য (অর্থাৎ পুরুষই দেখেন, চক্ষু কেবল দেখিবার যন্ত্র মাত্র)। দেহের মধ্যে থাকিয়া যিনি জানেন ‘আমি আঘ্রাণ লইতেছি’ তিনিই আত্মা, নাসিকা কেবল গন্ধ নিবার জন্য। যিনি জানেন ‘আমি বাক্য উচ্চারণ করি’ তিনিই আত্মা; বাগিন্দ্রিয় কেবল বাক্য উচ্চারণ করিবার জন্য। যিনি জানেন ‘আমি শুনিতে পারি’ তিনিই আত্মা, কর্ণ কেবল শুনিবার জন্য।

    ৬২৪. অথ যো বেদেদং মন্বানীতি স আত্মা মনোহস্য দৈবং চক্ষুঃ স বা এষ এতেন দৈবেন চক্ষুষা মনসৈতান্ কামান্ পশ্যন্ রমতে ॥ ৫

    অন্বয় : অথ যঃ বেদ ইদম্ মন্বানি (মনন করিতে পারি) ইতি, সঃ আত্মা; মনঃ অস্য (ইহার) দৈবম্ চক্ষুঃ (দৈব চক্ষু)। সঃ বৈ এষঃ (সেই এই পুরুষ) এতেন দৈবেন চক্ষুষা—মনসা (মনোরূপ দৈবচক্ষু দ্বারা) এতান্ কামান্ (এই সমুদয় কাম্যবস্তুকে পশ্যন্ (দেখিয়া) রমতে (আনন্দ লাভ করে)।

    সরলার্থ : আর যিনি জানেন যে, ‘আমিই মনন করিতেছি’, তিনিই আত্মা, মন তাঁহার দৈব চক্ষু, তিনি মনোরূপ দৈব চক্ষু দ্বারা সমস্ত কাম্যবস্তু দর্শন করিয়া আনন্দ লাভ করেন।

    মন্তব্য : এই দুই মন্ত্রে বলা হইয়াছে যে, চক্ষু প্রভৃতি ইন্দ্রিয় কেবল যন্ত্র মাত্র, ইন্দ্রিয়গণ দর্শনশ্রবণাদি করে না, করেন আত্মা।

    ৬২৫. যে এতে ব্রহ্মলোকে তং বা এতং দেবা আত্মানমুপাসতে তস্মাত্তেষাং সর্বে চ লোকা আত্মাঃ সর্বে চ কামাঃ, স সর্বাংশ্চ লোকানাপ্নোতি সর্বাংশ্চ কামান্ যস্তমাত্মানমনুবিদ্য বিজানাতীতি হ প্রজাপতিরুবাচ প্রজাপতিরুবাচ ॥ ৬

    অন্বয় : যে এতে (এই যে সমুদয় ‘দেবতা’) ব্ৰহ্মলোকে তম্ বৈ এতম্ [আত্মানম্] (সেই এই আত্মাকে) দেবাঃ (দেবগণ) আত্মানম্ উপাসতে (উপাসনা করেন)। তস্মাৎ (সেই জন্য) তেষাম্ (তাহাদিগের) সর্বে চ লোকাঃ (সমুদয় লোক) আত্তাঃ (প্রাপ্ত) সর্বে চ কামাঃ (সমুদয় কামনা)। সঃ সর্বান চ লোকান্ (সমুদয় লোককে) আপ্নোতি (প্রাপ্ত হন) সর্বান্ চ কামান্ (সমুদয় কাম্যবস্তুকে), যঃ (যিনি) তম্ আত্মনম্ (সেই আত্মাকে) অনুবিদ্য (প্রাপ্ত হইয়া) বিজানাতি (জানেন) ইতি হ প্রজাপতিঃ উবাচ—প্রজাপতিঃ উবাচ (দ্বিরুক্তি সমাপ্তিসূচক)।

    সরলার্থ : এই যে ব্রহ্মলোকে দেবতাগণ ইঁহারা সেই আত্মাকেই উপাসনা করেন। সেইজন্য তাঁহারা সর্বলোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন। এইভাবে যিনি সেই আত্মাকে জানিয়া বিশেষরূপে অনুভব করেন, তিনিও সকল লোক ও সকল কাম্যবস্তু লাভ করেন। প্রজাপতি এই কথাই বলিয়াছিলেন।

    মন্তব্য : (ক) কোন কোন সংস্করণে ‘যে এতে ব্ৰহ্মলোকে’ এই অংশকে ৫ম মন্ত্রের সহিত যুক্ত করা হইয়াছে। তাহা হইলে ঐ মন্ত্রের শেষ অংশের এই অর্থ হইবে— ব্ৰহ্মলোকে যে সমুদয় কামনা আছে (যে এতে ব্ৰহ্মলোকে), তিনি মনোরূপ দৈবচক্ষু দ্বারা সেই সমুদয় কামনা দর্শন করিয়া আনন্দিত হন। (খ) কেহ কেহ ষষ্ঠ মন্ত্রের প্রথম অংশের এই প্রকার অর্থ করেন—এই যে দেবতাগণ, ইঁহারা ব্রহ্মলোকে এই আত্মাকে উপাসনা করেন।

    ত্রয়োদশ খণ্ড – সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্ম

    ৬২৬. শ্যামাচ্ছবলং প্রপদ্যে শবলাচ্ছ্যামং প্রপদ্যেহশ্ব ইব রোমাণি বিধূয় পাপ চন্দ্র ইব রাহোর্মুখাৎ প্রমুচ্য ধূত্বা শরীরমকৃতং কৃতাত্মা ব্ৰহ্মলোকমভি সম্ভবামীত্যভিসম্ভবামীতি ॥ ১

    অন্বয় : শ্যামাৎ (শ্যাম অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ অর্থাৎ একাকার ব্রহ্ম হইতে) শবলম্ (বিচিত্র ‘ব্রহ্মকে’) প্রপদ্যে (প্রাপ্ত হই)। শবলাৎ (বিচিত্র ব্রহ্ম হইতে) শ্যামম্ (একাকার ব্রহ্মকে) প্রপদ্যে। অশ্ব ইব রোমাণি (অশ্ব যেমন লোমসমূহকে বিধূয় (কম্পিত করিয়া, দূর করিয়া) পাপম্ (পাপকে), চন্দ্রঃ ইব (চন্দ্ৰ যেমন রাহোঃ (রাহুর) মুখাৎ (মুখ হইতে) প্রমুচ্য (প্রমুক্ত হইয়া) ধূত্বা (ত্যাগ করিয়া) শরীরম্, অকৃতম্ [ব্রহ্মলোকম্] (অসৃষ্ট বা নিত্য ব্রহ্মলোককে) কৃতাত্মা (কৃতকৃত্য হইয়া) ব্রহ্মলোকম্ অভিসম্ভবামি (প্রাপ্ত হই) ইতি—অভিসম্ভবামি ইতি (দ্বিরুক্তি সমাপ্তিসূচক)।

    সরলার্থ : আমি শ্যামবর্ণ (অর্থাৎ হৃদয়স্থিত ভেদরহিত ব্রহ্ম) হইতে বিচিত্রবর্ণে (বিচিত্রতাপূর্ণ ব্রহ্মে) যাই। আবার বিচিত্র হইতে শ্যামবর্ণে যাই। অশ্ব যেমন লোম কম্পিত করে, তেমনি আমি পাপকে (কম্পিত করিয়া) দূর করি; চন্দ্র যেমন রাহুর মুখ হইতে মুক্ত হয়, আমিও তেমনি শরীর হইতে মুক্তি লাভ করি। তারপর কৃতাত্মা হইয়া অসৃষ্ট (অর্থাৎ শাশ্বত) ব্ৰহ্মলোক লাভ করি, (ব্রহ্মলোকই) লাভ করি।

    মন্তব্য : শঙ্করের মতে শ্যাম=হৃদয়স্থ ব্রহ্ম। দুরবগাহ্য বলিয়া ইহাকে শ্যাম অর্থাৎ কৃষ্ণবর্ণ বলা হইয়াছে। শবল=বহু কামনাযুক্ত ব্রহ্মলোক।

    চতুর্দশ খণ্ড – আকাশরূপ ব্রহ্ম—পুনর্জন্ম অনিচ্ছা

    ৬২৭. আকাশো বৈ নাম নামরূপয়োর্নির্বহিতা তে যদন্তরা তদ্‌ব্রহ্ম তদমৃতং স আত্মা প্রজাপতেঃ সভাং বেশ্ম প্রপদ্যে যশোহহং ভবামি ব্রাহ্মণানাং যশো রাজ্ঞাং যশো বিশাং যশোহহমনুপ্রাপৎসি স হাহং যশসাং যশঃ শ্যেতমদৎ-কমদৎকং শ্যেতং লিন্দু মাভিগাং লিন্দু মাভিগাম্ ॥ ১

    অন্বয় : আকাশঃ বৈ নাম নামরূপয়োঃ (নাম ও রূপের) নির্বহিতা (নিৰ্বাহক, প্রকাশক)। তে যৎ অন্তরা (নাম ও রূপ যাহার অভ্যন্তরে কিংবা যাহা নামরূপের অভ্যন্তরে) তৎ (তাহা) ব্রহ্ম, তৎ অমৃতম্ সঃ আত্মা। প্রজাপতেঃ (প্রজাপতির) সভাম্ বেশ্ম (সভাগৃহকে) প্রপদ্যে (প্রাপ্ত হই)। যশঃ অহম্ (আমি) ভবামি (হই) ব্রাহ্মণানাম্ (ব্রাহ্মণগণের); যশঃ রাজ্ঞাম্ (রাজগণের), যশঃ বিশাম্ (বৈশ্যগণের, বিশ্ শব্দের মৌলিক অর্থ মনুষ্য)। যশঃ (যশকে) অহম্ অনুপ্রাপৎসি (প্রাপ্ত হইয়াছি)। সঃ হ অহম্ (সেই আমি) যশসাম্ (যশসমূহের) যশঃ। শ্যেতম্ (রক্তাভ শ্বেতবর্ণ) অদৎকম্ (ন দৎকম্=দন্তরহিত) অদৎকম্ (ভক্ষণশীল, ‘অদ্’ হইতে) শ্যেতম্ লিন্দু (পিচ্ছিল, ক্লেদময়) মা (না) অভিগাম্‌ (যেন পাই) লিন্দু মা অভিগাম্ (দ্বিরুক্তি সমাপ্তিসূচক)।

    সরলার্থ : আকাশ নামরূপের প্রকাশক; এই নাম ও রূপ যাঁহার অভ্যন্তরে (কিংবা যিনি এই নামরূপের অভ্যন্তরে), তিনিই ব্রহ্ম, তিনিই অমৃত, তিনিই আত্মা। আমি প্রজাপতির সভাগৃহে গমন করি। আমি ব্রাহ্মণগণের, রাজগণের ও বৈশ্যগণের যশলাভ করিয়াছি। আমি সমস্ত যশের যশ; আমি যেন রক্তবর্ণ, দন্তহীন অথচ ভক্ষক, পিচ্ছিল ক্লেদময় গৃহে না যাই (অর্থাৎ আমাকে যেন আবার জন্মগ্রহণ করিতে না হয়।

    পঞ্চদশ খণ্ড – সাধু জীবনের সংক্ষিপ্ত চিত্র

    ৬২৮. তদ্বৈতদ্ ব্ৰহ্মা প্রজাপতয় উবাচ প্রজাপতির্মনবে মনুঃ প্রজাভ্যঃ আচার্য-কুলাদ্ বেদমধীত্য যথাবিধানং গুরোঃ কর্মাতিশেষেণা— ভিসম্যবৃত্য কুটুম্বে শুচৌ দেশে স্বাধ্যায়মধীয়ানো ধার্মিকান্ বিদধদাত্মনি সর্বেন্দ্রিয়াণি সংপ্রতিষ্ঠাপ্যাহিংসন্ সর্বভূতান্যন্যত্র তীর্থেভ্যঃ স খল্বেবং বর্তয়ন্ যাবদায়ুষং ব্রহ্মলোকমভিসংপদ্যতে ন চ পুনরাবর্ততে ন চ পুনরাবর্ততে ॥ ১

    অন্বয় : তৎ হ এতৎ (সেই এই তত্ত্ব) ব্রহ্মা প্রজাপতয়ে (প্রজাপতিকে) উবাচ (বলিয়াছিলেন)। প্রজাপতিঃ মনবে (মনুকে) মনুঃ প্রজাভ্যঃ (মানবগণকে)। আচাৰ্যকুলাৎ (আচার্যকুল হইতে) বেদম্ অধীত্য (অধ্যয়ন করিয়া) যথাবিধানম্ (যথারীতি) গুরোঃ কর্ম+অতিশেষেণ (গুরুর কর্ম শেষ করিয়া অবসর সময়ে), অভিসমাবৃত্য (প্রত্যাবর্তন করিয়া) কুটুম্বে (গার্হস্থ্যে) শুচৌ দেশে (পবিত্র স্থানে) স্বাধ্যায়াম্ অধীয়ানঃ (বেদপাঠ করিয়া) ধার্মিকান্ বিদধৎ (ধার্মিক পুত্রগণের পিতা হইয়া; কিংবা ধার্মিক পুত্র ও শিষ্যগণকে পালন করিয়া) আত্মনি (নিজ আত্মাতে বা পরমাত্মাতে) সৰ্বেন্দ্রিয়াণি (ইন্দ্রিয়সমূহকে) সংপ্রতিষ্ঠাপ্য (সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া) অহিংসন্ (হিংসা না করিয়া) সর্বভূতানি (ভূতসমূহকে) অন্যত্র তীর্থেভ্যঃ (তীর্থ ব্যতীত অন্যস্থানে) সঃ খলু এবম্ (এই প্রকারে) বর্তায়ন্ (জীবন যাপন করিয়া) যাবৎ+আয়ুষম্ (যাবজ্জীবন) ব্রহ্মলোকম্ অভিসম্পদ্যতে (প্রাপ্ত হয়) ন চ পুনঃ আবর্ততে (প্রত্যাবর্তন করে), ন চ পুনঃ আবর্ততে (দ্বিরুক্তি সমাপ্তিসূচক)।

    সরলার্থ : ব্রহ্মা প্রজাপতিকে, প্রজাপতি মনুকে এবং মনু মানবগণকে এই তত্ত্ব বলিয়াছিলেন। যিনি আচার্যকুলে গুরুসেবা করিয়া অবসর সময়ে যথাবিধি অধ্যয়ন করেন, তারপর গার্হস্থ্য আশ্রমে ফিরিয়া পবিত্র স্থানে বেদ পাঠ করেন, ধার্মিক পুত্রের পিতা হন (কিংবা ধার্মিক পুত্র ও শিষ্যগণকে পালন করেন), সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আত্মাতে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন, তীর্থ ভিন্ন অন্যত্র হিংসা ত্যাগ করেন এবং যাবজ্জীবন এই রকম আচরণ করেন, তিনি (মৃত্যুর পর) ব্রহ্মলোকে যান, তাঁহাকে আর (জন্মলাভের জন্য) ফিরিয়া আসিতে হয় না—আর ফিরিয়া আসিতে হয় না।

    মন্তব্য : (ক) ‘কর্মাতিশেষেণ’কেহ কেহ বলেন ইহার অর্থ বিদ্যাসমাপ্তির পর গুরুর প্রতি যে কর্তব্য তাহা শেষ করিয়া অর্থাৎ দক্ষিণা দিয়া। কিন্তু আমরা যে অর্থ গ্রহণ করিয়াছি, মহাভারতেও ঠিক সেই অর্থেই শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে (শান্তিপর্ব, ২৪১।১৯)। (খ) তীর্থ—শাস্ত্রানুমোদিত বিষয়, ক্ষেত্রাদি।

    [সমাপ্ত]

    ⤶
    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleশিক্ষা ও সভ্যতা – অতুলচন্দ্র গুপ্ত
    Next Article বুদ্ধ অথবা কার্ল মার্কস – ভীমরাও রামজি আম্বেদকর

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    তারপর কী হল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 17, 2025
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    শর্ম্মিষ্ঠা নাটক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    November 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }