দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ১
বুড়ো একা, বড় একা। ওর ডিঙি নৌকাটা নিয়ে একা একা মাছ ধরতে যায় উপসাগরে। গত চুরাশি দিন একটাও মাছ ধরতে পারেনি। প্রথম চল্লিশ দিন একটা ছেলে ছিল ওর সাথে। কিন্তু চল্লিশ দিন পরে ছেলেটার বাবা-মা ওকে বললে যে বুড়ো অপয়া, আর তাই বাবা-মা’র হুকুমে ও এখন অন্য নৌকায় যায় আর প্রথম সপ্তাহেই ওরা তিন-তিনটে বড় মাছ ধরেছে।কিন্তু রোজ বুড়ো খালি নৌকা নিয়ে ফিরছে দেখে ছেলেটার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। ও গিয়ে বুড়োকে সাহায্য করে নৌকার মাছ ধরার সরঞ্জামগুলো বয়ে নিয়ে আসতে। কখনও দড়াদড়িগুলো, কখনও বা কোঁচ, হারপুন অথবা নৌকার মাস্তুলে লাগানো পালটা বয়ে নিয়ে আসে। ময়দার বস্তা কেটে অসংখ্য তালি মারা পাল, হাওয়ায় যখন ফুলে ওঠে, মনে হয় একটা হেরে যাওয়া লোকের পতাকা উড়ছে।
বুড়ো রোগা। ওর শীর্ণ ঘাড়ের পেছনে চামড়া কুঁচকে গেছে। গ্রীষ্মমণ্ডলের সমুদ্রের জলে প্রতিফলিত প্রখর রোদ ওর দুই গালের চামড়া পুড়িয়ে বাদামি ছোপ ফেলেছে। এক সময় ও অনেক ভারী মাছ ধরেছে, তার ছিপের সুতো টানতে টানতে ওর দুই হাত ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, আর এখন শুকনো কাটা দাগে ভর্তি। বুড়োর সারা শরীরে বার্ধক্যের ভার, কেবল ওর চোখ দুটো সমুদ্রের মতো নীল আর হাসিখুশি, যেন হারতে জানে না।
নৌকাটা পাড় থেকে টেনে তুলে ওপরে উঠতে উঠতে ছেলেটা বলল, ‘সান্তিয়াগো জানো, এ-কদিন আমি বেশ কিছু টাকা জমিয়েছি, তাই আমি আবার তোমার সঙ্গে মাছ ধরতে যেতে পারি।’ বুড়োই ছেলেটাকে মাছ ধরতে শিখিয়েছিল আর ও সত্যিই বুড়োকে ভালোবাসতো।
‘না, আমার সঙ্গে যাবে না। যে নৌকায় আছ, ওটা পয়া, ওদের সঙ্গেই থাক।’ বুড়ো বলল।
‘কেন, তোমার মনে নেই, এর আগে একবার একনাগাড়ে সাতাশি দিন একটাও মাছ ধরা পড়েনি আর তারপরেই তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন আমরা বড় বড় মাছ ধরেছিলাম?’
‘সব মনে আছে’, বুড়ো বলল, ‘আমি জানি, আমার ওপর তোমার ভরসা আছে।’
‘বাবাই তো আমাকে বলল তোমার নৌকায় না যেতে। আমি তো ছোট, অবাধ্য তো হতে পারি না।’
‘জানি, এটাই তো স্বাভাবিক।’
‘বাবার কোনো বিশ্বাসই নেই।’
‘ঠিক, কিন্তু আমাদের তো বিশ্বাস আছে, তাই না?’
‘হ্যাঁ’, ছেলেটা বলল, ‘চল চত্বরে গিয়ে বসি, আমি তোমাকে বিয়ার খাওয়াব। তারপর নৌকার সরঞ্জামগুলো ঘরে নিয়ে যাব।’
‘ভালোইতো’, বুড়ো বলল, ‘আমরা দুজনই তো মেছুড়ে, কী বল!’
ওরা চত্বরে গিয়ে বসার পর কিছু মেছুড়ে বুড়োর পেছনে লাগল আর ওকে নিয়ে রগড় করতে শুরু করল।বুড়ো কিন্তু রাগ করল না। অন্য বুড়ো মেছুড়েরা ওর দিকে তাকিয়ে মনে মনে কষ্ট পেতে লাগল, কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ করল না। ওরা সমুদ্রের স্রোত, কত গভীরে ওরা সুতো ফেলেছিল, কেমন ভালো আবহাওয়া চলছে আর কী কী দেখেছে, এইসব নিয়ে নম্রভাবে কথাবার্তা বলতে লাগল। যে সব মেছুড়েদের সেদিন কপাল ভালো ছিল, তারা নিজেদের ধরা বড় বড় মার্লিন মাছগুলোকে দুটো তক্তার ওপর আড়াআড়ি ফেলে মাছের আড়তে গিয়ে গিয়ে বরফের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল, যাতে হাভানার বাজারে তাড়াতাড়ি নিয়ে ফেলতে পারে। আর যারা হাঙর ধরেছিল, তারা ওগুলোকে হাঙরের আড়তে নিয়ে গেল, সেখানে ওগুলোকে দড়িতে ঝুলিয়ে পাখনা কেটে, লিভার বার করে নিয়ে চামড়া ছাড়িয়ে ফেলল আর মাংসটা লম্বা লম্বা ফালি করে কেটে নুন মাখানোর জন্য তৈরি করতে লাগল।
হাওয়া পুব দিক থেকে বইলে হাঙরের আড়ত থেকে গন্ধটা এদিকে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু আজ উত্তরে হাওয়ায় গন্ধটা তেমন টের পাওয়া যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর হাওয়াটা পড়ে গেলে চত্বরের ওপর হালকা রোদ্দুরে দিনটা বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।
বুড়ো বিয়ারের গ্লাস হাতে নিয়ে বিগত জীবনের দিনগুলোর কথা ভাবছিল। ছেলেটা বলল, ‘সান্তিয়াগো, আমি কাল তোমার টোপের জন্য সার্ডিন মাছ নিয়ে আসব?’
‘না, না, তুমি কাল বেসবল খেলতে যেও। আমি নৌকা বাইব, আর রোহেলিও জাল ফেলবে।’
‘কিন্তু আমার যে যেতে ইচ্ছে করছে। তোমার সঙ্গে মাছ ধরতে যেতে না পারলেও তোমার কিছু কিছু কাজ তো আমি করে দিতে পারি।’
‘কেন, তুমি যে আমাকে বিয়ার খাওয়ালে! তুমি তো রীতিমতো মরদ হয়ে উঠেছ।’
‘আচ্ছা, তুমি যেদিন প্রথম আমাকে তোমার নৌকায় নিয়ে যাও, তখন আমার কত বয়স ছিল?’
‘মাত্র পাঁচ বছর, আর সেদিনই তুমি প্রায় মরতে বসেছিলে কেননা, আমি মাছটাকে খেলিয়ে খেলিয়ে ক্লান্ত না করেই নৌকায় তুলে ফেলেছিলাম আর মাছটা নৌকাটাকে প্রায় ভেঙে ফেলেছিল, মনে আছে?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে, মাছটা লেজ দিয়ে বাড়ি মেরে বসার তক্তাটা ভেঙে ফেলল আর তুমি নৌকার গলুইতে কুণ্ডলী পাকানো ভিজে সুতোর ওপর আমাকে ছুঁড়ে সরিয়ে দিয়ে মাছটাকে ক্রমাগত বৈঠা দিয়ে মারছিলে আর আমার সারা শরীরে রক্তের মিষ্টি গন্ধ।’
‘তোমার কি সত্যিই এসব কথা মনে আছে, না আমিই তোমাকে পরে এসব গল্প করেছি?’
‘তোমার সঙ্গে প্রথম দিন যাবার পর থেকে সব আমার মনে আছে।’
বুড়ো ওর দিকে রোদেপোড়া স্নেহ মাখা চোখে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমার ছেলে হতে, তাহলে হয়তো তোমাকে আমার নৌকায় নিয়ে যাবার জুয়া খেলতাম। কিন্তু তুমি তো তোমার বাবা-মায়ের ছেলে, আর তাছাড়া তুমি একটা পয়া নৌকায় আছ।’
‘আমি কি তোমার জন্য সার্ডিন মাছ আনব? আমি জানি কোথায় আমি আরও চারটে ভালো টোপ পাব।’
‘না না, আমারগুলো তো আছে। ওগুলো আমি বাক্সে নুন দিয়ে রেখেছি।’
‘আমি চারটে টাটকা টোপ এনে দেব।’
‘একটা’, বুড়ো বলল। বুড়ো আশা, আত্মবিশ্বাস কোনোটাই হারায়নি, আর এখন তো ফুরফুরে হাওয়ার মতো নিজেকে তাজা মনে হচ্ছে।
ছেলেটা বলল, ‘দুটো’। বুড়ো বলল, ‘যদি চুরি না কর, তাহলে দুটো।’
‘আমি ওগুলো কিনেছি।’
বুড়ো ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিল। ও এত সরল যে, ওর স্বাভাবিক নম্রতার কথা ভাবে না। তবে এটা জানে যে এতে ওর কোনো মর্যাদাহানি ঘটবে না।
‘কাল যদি এই রকম স্রোত থাকে, তাহলে দিনটা ভালোই যাবে।’ বুড়ো বলল।
ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, ‘কাল তুমি কোন দিকে যাবে?’
‘হাওয়া দিক বদলাবার আগেই সমুদ্রের অনেক ভেতরে চলে যাব। অন্ধকার থাকতে থাকতে বেরিয়ে পড়ব।’
‘আমিও আমাদের নৌকাটাকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে বলব। তাহলে তুমি যদি সত্যিই একটা বিশাল মাছ ধরতে পার, তাহলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে যেতে পারব।’
‘তোমার নৌকার লোক বেশি দূরে যাওয়া পছন্দ করে না।’
‘তা ঠিক। কিন্তু আমি কায়দা করে বলব যে, বহুদূরে ও দেখতে না পেলেও আমি একটা পাখিকে মাছ ধরতে দেখতে পাচ্ছি আর আমি ঠিক ডলফিনের পেছন পেছন ওকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করব।’
‘ওর চোখের দৃষ্টি কি খুব খারাপ?’
‘ও তো প্রায় অন্ধ বললেই চলে।’
অবাক কাণ্ড। ও তো কোনোদিন কাছিম ধরতে যায়নি, কারণ এই কাছিম মারার কাজেই মানুষের চোখ নষ্ট হয়।
‘কিন্তু তুমি তো অনেক বছর মসকুইটো উপকূলে কাছিম মারার কাজ করেছিলে, কই তোমার চোখ তো ভালোই আছে।’
‘আরে, আমি একটা আজব বুড়ো।’
‘কিন্তু একটা সত্যিকারের বিশাল মাছ ধরার মতো গায়ের জোর কি তোমার আছে?’
‘তাই তো মনে হয়। তাছাড়া নানা রকম কৌশলও আছে।’
‘চল, সরঞ্জামগুলো ঘরে নিয়ে যাই। আর খেপলা জালটা নিয়ে আমাকে সার্ডিন মাছ ধরতেও যেতে হবে।’ ছেলেটা বলল।
ওরা নৌকা থেকে সরঞ্জামগুলো নামিয়ে আনল। বুড়ো মাস্তুলটা কাঁধে নিল আর ছেলেটা নিল শক্ত করে পাকানো বাদামি সুতোর কুণ্ডলীভরা কাঠের বাক্সটা আর কোঁচ ও হারপুনটা। নৌকার পাছ-গলুইয়ে টোপের বাক্সটা আর মাছ ধরার পর নৌকার পাশে টেনে এনে মারার জন্য ডাণ্ডাটা রাখা থাকল। বুড়োর নৌকা থেকে ওগুলো কেউ চুরি করবে না। তবে রাতের শিশিরে ভিজে নৌকার পাল আর মাছ ধরার শক্ত সুতোর বাণ্ডিল নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই ওগুলো নিয়ে যাওয়া, নইলে বুড়ো জানে যে, কোনো স্থানীয় লোক ওর নৌকা থেকে কিছু চুরি করবে না। তবে এটাও ঠিক যে, কোচ আর হারপনুটা নৌকায় রেখে যাওয়া মানে অনাবশ্যক লোভ জাগানো।
ওরা দুজনে রাস্তা ধরে হেঁটে গিয়ে বুড়োর চালায় পৌঁছল আর খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। বুড়ো পাল গোটানো মাস্তুলটা দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে রাখল আর ছেলেটার তার পাশে কাঠের বাক্সটা আর অন্য জিনিসগুলো রাখল। মাস্তুলটা লম্বায় প্রায় চালা ঘরটার সমান। তালগাছের শক্ত তক্তা দিয়ে বানানো চালা ঘরটায় আছে একটা বিছানা, একটা চেয়ার আর টেবিল আর মেঝেতে কাঠ কয়লা জ্বেলে রান্নার একটু জায়গা। ঘরটার বাদামি দেওয়ালে একটা যিশুখ্রিস্টের আর একটা কুমারী মাতার রঙিন ছবি টাঙানো। ও দুটো ওর বউয়ের স্মৃতি। এক সময়ে দেওয়ালে ওর বউয়ের একটা ছোপ ধরা বিবর্ণ ফটোও টাঙানো থাকতো, কিন্তু ছবিটার দিকে তাকালে বুড়োর নিজেকে খুব একলা মনে হত, তাই ও ছবিটা দেওয়াল থেকে নামিয়ে ঘরের কোণে একটা তাকের ওপর ওর পরিষ্কার জামার তলায় রেখে দিয়েছিল।
‘রাতে কী খাবে?’ ছেলেটা শুধোয়।
‘হাড়িতে ভাত আছে আর মাছ। তুমি খাবে?’
‘না, আমি বাড়িতে গিয়েই খাব। আগুন জ্বালিয়ে দেই।?’
‘না না, ‘আমি পরে আগুন জ্বালাব। আর না হয়, ঠাণ্ডা ভাতই খেয়ে নেব।’
‘তাহলে আমি খেপলা জালটা নিয়ে যাই?’
‘নিশ্চয়ই’।
আসলে বুড়োর কোনো খেপলা জালই নেই আর ছেলেটার পরিষ্কার মনে আছে ওটা কতদিন আগে বেচে দেওয়া হয়েছে। ওরা কিন্তু প্রতিদিনই এই মিথ্যে গল্পের অবতারণা করে। ছেলেটা জানে, যে হাঁড়িতে কোনো ভাতও নেই, মাছও নেই।
বুড়ো বলল, ‘পঁচাশি দিন, পঁচাশি খুব পয়া সংখ্যা। যদি একটা পাঁচশো কিলোর মাছ ধরে আনি, তোমার কেমন লাগবে?
‘আমি খেপলা জাল নিয়ে সার্ডিন মাছ ধরতে যাই। তুমি ততক্ষণ দরজার কাছে বসে থাক।’
‘ঠিক আছে, আমি গতকালকের খবরের কাগজে বেসবল খেলার পাতাটা দেখি।’
ছেলেটা বুঝতে পারছে না, এই খবরের কাগজের ব্যাপারটা বানানো কিনা। তবে বুড়ো সত্যি সত্যিই বিছানার তলা থেকে একটা খবরের কাগজ বার করে আনল আর বলল, ‘পেরিকো এটা আমায় ভাঁটিখানায় দিয়েছে।’
‘সার্ডিন মাছ ধরে নিয়ে আমি আসছি। ওগুলো বরফে রেখে দেব আর কাল সকালে তোমার ভাগ তোমাকে দিয়ে দেব। আমি ফিরে আসলে আমাকে বেসবল খেলার খবর বলবে কিন্তু।’
‘ইয়াঙ্কিরা হারতেই পারে না।’
‘কিন্তু ক্লিভল্যাণ্ড ইন্ডিয়ানদেরই আমার ভয়।’
‘ইয়াঙ্কিদের ওপর ভরসা রাখ বেটা। অতবড় খেলোয়াড় দি মাজ্জিও- র কথা ভাবতো?’
‘আমার কিন্তু ডেট্রয়েট টাইগার আর ক্লিভল্যান্ড ইন্ডিয়ান, এই দুই দলকেই ভয়।’
‘সাবধান, এর পরে তুমি হয়তো সিনসিনাটি রেড আর শিকাগো হোয়াইট সক্স দলকেও ভয় পাবে।’
‘ঠিক আছে, তুমি পড়ে নাও, আমি ফিরে এলে আমাকে বোলো।’
‘আচ্ছা, শেষ দুই সংখ্যা পঁচাশি দিয়ে একটা লটারির টিকিট কিনলে কেমন হয়? কালকেই তে পঁচাশিতম দিন।’
‘কিনলেই হয়! কিন্তু তোমার সেই সাতাশি দিনের রেকর্ড?’
‘এক জিনিস কি দুবার হয়? কী মনে হয়, পঁচাশি ওয়ালা কোন টিকিট পাবে?’
‘দেখি চেষ্টা করে।’
‘একটা পুরো পাতা। আড়াই ডলার। কার কাছে ধার করা যায়, বলতো?’
‘সোজা। আমি যে কোনো সময় আড়াই ডলার ধার করতে পারি।’
‘আমার মনে হয়, আমিও পারি। তবে আমি ধার করতে চাই না। কেননা, প্রথমে ধার, শেষে ভিক্ষা।’
‘বুড়ো, ঠাণ্ডা লাগিয়ো না। মনে রেখ, এটা সেপ্টেম্বর মাস।’
‘যে মাসে বড় মাছেরা ধরা পড়ে। আরে, মে মাসে তো যে কেউ মেছুড়ে হতে পারে।’
‘যাই, সার্ডিন মাছ ধরে আনি গে।’
ছেলেটা যখন ফিরে এল তখন সূর্য ডুবে গেছে আর বুড়ো চেয়ারে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলেটা বিছানা থেকে কম্বলটা তুলে এনে চেয়ারের পেছন দিয়ে বুড়োর কাঁধে জড়িয়ে দিল। বুড়োর দুই কাঁধ আর ঘাড় কিন্তু খুব শক্তিশালী আর ঘাড়ের পেছনের ভাঁজগুলো বুড়ো ঘুমিয়ে পড়লে আর মাথাটা সামনে ঝুঁকে পড়লে বোঝাই যায় না। ওর জামাটা ওর নৌকার পালের মতোই অজস্র তালি লাগানো আর রোদে জ্বলে জ্বলে নানা রঙের। বুড়ো মানুষটার মাথাটা কিন্তু সত্যি সত্যিই বুড়োটে আর চোখ বোজা থাকলে ওর মুখটায় প্রাণের ছোঁয়া থাকে না। সন্ধ্যার হাওয়ায় ওর হাতের তলায় হাঁটুর ওপর খবরের কাগজটা পড়ে আছে। ওর দুই পা খালি।
ছেলেটা বুড়োকে ওইভাবে রেখেই চলে গেল আর অনেকক্ষণ বাদে যখন ফিরে এল, বুড়ো তখনও ঘুমোচ্ছে। ছেলেটা বুড়োর হাঁটুর ওপর হাত রেখে বলল, ‘বুড়ো ওঠ, তোমার জন্যে রাতের খাবার এনেছি।’ বুড়ো চোখ খুলে তাকাল যেন অনেক দূর থেকে ফিরে এল। তারপর একটু হেসে বলল, ‘আমার খিদে নেই।’
‘এস না, খাও। না খেয়ে তুমি মাছ ধরতে পারবে না।’
বুড়ো চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল, তারপর খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রাখল। কম্বলটা ভাঁজ করতে করতে বলল, ‘না, খেয়ে কত মাছ ধরতে গেছি।’
ছেলেটা বলল, ‘কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে রাখ। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তুমি না খেয়ে মাছ ধরতে যেতে পারবে না।’
‘তা’ হলে তুমি দীর্ঘজীবী হও। আর নিজের খেয়াল রেখ।’ বুড়ো বলল, ‘আজ আমরা কী খাচ্ছি?’
‘ভাত, বীনস, কলা ভাজা আর স্টু।’
চত্বরের দোকান থেকে ছেলেটা একটা দু.কৌটোর টিফিন বাক্সে করে খাবারটা এনেছে। কাগজে মোড়া দু সেট কাঁটা চামচ ছুরিও ওপর পকেট থেকে বের করেছে। বুড়ো জিজ্ঞেস করল, ‘এগুলো কার কাছ থেকে আনলে?’
‘দোকানের মালিক, মার্টিনের কাছ থেকে।’
‘তা হলে তো ওকে ধন্যবাদ দিতে হয়।’
‘আমি ওকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। তোমাকে আর ওকে ধন্যবাদ দিতে হবে না।’
‘একটা বড় মাছের পেটি ওকে দেবো। ও আমাদের জন্য আগেও এ রকম করেছে না?’
‘হ্যাঁ, কয়েকবার।’
‘তাহলে তো ওকে মাছের পেটি ছাড়া আরও অনেক কিছু দিতে হয়। ও সত্যিই আমাদের জন্যে ভাবে।’
‘ও দুটো বিয়ারও পাঠিয়েছে।’
‘আমি ক্যান-এ বিয়ার খেতে ভালবাসি।’
‘জানি, কিন্তু ও তো বোতলে বিয়ার পাঠিয়েছে। বোতল দুটো ফেরত দিতে হবে।’
‘তুমি খুব ভালো ছেলে। এখন এস, আমরা খেতে বসি।’
ছেলেটা নরম করে বলল, ‘আমি তো তখন থেকে তোমাকে বলছি। তা তুমি তৈরি না হলে তো টিফিন বাক্স খুলতে পারি না?’
‘ঠিক আছে, এখন আমি তৈরি। শুধু হাত মুখ ধোবার জন্য একটু সময় চাই।’
ছেলেটা ভাবল, বুড়ো কোথায় মুখ হাত ধোয়? গাঁয়ের জলের কল তো দুরাস্তা দূরে। বুড়োর জন্য এখানেই জলের ব্যবস্থা করলে হয়, সঙ্গে সাবান আর একটা ভালো তোয়ালে। কেন আমি আগে এসব ভাবিনি? একটা শার্ট আর এই শীতকালের জন্য একটা গরম জ্যাকেট, আর একটা কম্বল আর এক জোড়া জুতোও বুড়োর দরকার।
বুড়ো বলল, ‘তোমার স্টু-টা দারুণ হয়েছে।’
‘এবার আমাকে বেসবল খেলার কথা বল।’ ছেলেটা বলল।
বুড়ো খুশি মনে বলল, ‘আমেরিকান লিগে ইয়াঙ্কিজ টিমটাই সেরা।
‘ওরা তো আজ হেরে গেছে।’
‘তাতে কিছু আসে যায় না। দি মাজ্জিও কত বড় খেলোয়াড় বল?’
‘টিমে তো আরো খেলোয়াড় আছে।’
‘তা তো থাকবেই, কিন্তু দি মাজ্জিও-র খেলাই আলাদা। অন্য লিগ ম্যাচে ব্রুকলীন আর ফিলাডেলফিয়ার খেলায় আমি কিন্তু ব্রুকলীনকেই বেছে নেব। অবশ্য ডিক সিসলার আর ওর সেই বিখ্যাত হিটগুলোর কথাও ভাবি।’
‘ওদের মতো খেলোয়াড় আর হয় না। ওর মতো লম্বা হিট করতে আমি আর কাউকেই দেখিনি।
‘তোমার মনে আছে, ও যখন এই চত্বরে এসে বসত? ওকে আমার সঙ্গে মাছ ধরতে নিয়ে যাবার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ওকে বলতে ভরসা পাইনি। তোমাকেও তো বলেছিলাম ওকে বলতে, কিন্তু তুমিও তো ওকে বলতে সাহস পাওনি।’
‘জানি, ওটা আমাদের মস্ত বড় ভুল ছিল। বললে হয়তো ও আমাদের সঙ্গে যেত, আর তাহলে আমাদের জীবনে এটা একটা স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকতো।’
‘দি মাজ্জিওকে সঙ্গী করে মাছ ধরতে যেতে খুব ইচ্ছে করে।’ বুড়ো বলল, ‘জানো তো, লোকে বলে ওর বাবা নাকি আমাদের মতনই মেছুড়ে ছিল আর হয়তো ওরা আমাদের মতোই গরিব ছিল আর তাই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতো।’
‘সিসলারের বাবা কিন্তু মোটেই গরিব ছিল না, আর আমাদের বয়সেই ওর বাবা লিগে খেলত।’
‘তোমার বয়সে আমি একটা পাল তোলা জাহাজের মাস্তুলের সামনে, আর আফ্রিকায় গিয়ে সন্ধেবেলা সমুদ্রের তীরে সিংহও দেখেছি।’
‘জানি, তুমি তো বলেছ।’
‘আমরা কি এখন আফ্রিকা, না বেসবল নিয়ে কথা বলব?’
‘বেসবলের কথা বল’, ছেলেটা বলল, ‘আমাকে বিখ্যাত জন জে ম্যাকগ্র-র কথা বল।’
‘এই চত্বরে তো ম্যাকগ্র-ও এসে বসত তখনকার দিনে। কিন্তু ও ছিল খুব কড়া মেজাজের, কর্কশভাষী আর মদ পেটে পড়লে তো কথাই নেই। ও বেসবলও খেলত আবার ঘোড়ার রেসও খেলত। পকেটে রেসের বই, তাতে সব ঘোড়ার নাম লেখা আর প্রায়ই টেলিফোনে ঘোড়ার নাম ধরে বাজী খেলত।’
‘আমার বাবা কিন্তু বলেন ও যে ও নাকি সবচেয়ে ভালো টিম ম্যানেজার ছিল।’ ছেলেটা বলল।
‘আরে ও এখানে ঘনঘন আসতো বলেই সবাই ওকে চিনত। যদি দুরোচের প্রতি বছর এখানে আসত, তাহলে তোমার বাবা ওকেই শ্রেষ্ঠ ম্যানেজার বলত।’
‘তাহলে তোমার মতে কে সবচেয়ে ভালো ম্যানেজার ছিল, লুকে, না, মাইক গনসালেস?’
‘আমার মনে হয়, ওরা দুজনেই সমান সমান।’
‘আর সবচেয়ে বড় মেছুড়ে হলে তুমি।’
‘আরে না না, আমার চেয়েও অনেক ভালো মেছুড়ে আছে।’
ছেলেটা বলল, ‘মেছুড়ে অনেক আছে, ভালোও আছে, নামকরাও আছে। কিন্তু তুমি তুমিই, তোমার মতো কেউ নেই।’
‘ধন্যবাদ, তোমার কথা শুনে খুশি হলাম। আশা করব, এমন মাছ নিশ্চয়ই গাঁথব না যে তোমার ধারণা ভুল প্রমাণ করবে।’
‘এমন কোনো মাছই নেই যে তোমার গায়ের জোরের সঙ্গে পারবে।’
‘মনে হয় আমার গায়ের জোর আর আগের মতো নেই’, বুড়ো বলল, ‘কিন্তু অনেক কায়দা আমার জানা আছে আর তাছাড়া আমার মনের জোর আছে।’
‘ঠিক আছে, এখন তুমি শুতে যাও, যাতে কাল সকালবেলা শরীরটা ঝরঝরে থাকে। আমি তাহলে জিনিসগুলো চত্বরে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘শুভ রাত্রি। কাল সকালে আমি তোমাকে জাগিয়ে দেব।’
‘তুমি তো আমার অ্যালার্ম ঘড়ি।’
‘বয়েসটাই আমার অ্যালার্ম ঘড়ি,’ বুড়ো বলল, ‘আচ্ছা, বুড়ো মানুষদের খুব ভোরবেলায় ঘুম ভাঙে কেন বলতো? একটা লম্বা দিন পাবার জন্যে?’
‘আমি জানি না,’ ছেলেটা বলল, ‘আমি কেবল জানি যে অল্পবয়েসি ছেলেমেয়েরা অনেক বেলা অবধি গভীর ঘুমোয়।’
‘ঠিক বলেছ। তাহলে তোমায় সময় মতোই জাগিয়ে দেব, কেমন?’
‘আমাদের নৌকার লোকটা আমার ঘুম ভাঙায়, এটা আমার মোটেই ভালো লাগে না। মনে হয় আমি যেন ওর চেয়ে নিকৃষ্ট।’
‘আমি জানি।’
‘ঠিক আছে বুড়ো, ভালো করে ঘুমোও।’
ছেলেটা চলে গেল। ওর টেবিলে কোনো আলো ছিল না। বিনা আলোতেই ওরা খাওয়া সেরেছিল, আর তাই বুড়ো অন্ধকারেই প্যান্ট ছেড়ে নিল প্যান্টটা গুটিয়ে খবরের কাগজটা ভেতরে গুঁজে বালিশের মতো করে নিল আর অন্য পুরোনো খবরের কাগজ বিছানো চারপাইটার ওপর কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ও ঘুমিয়ে পড়ল আর স্বপ্নের মধ্যে তলিয়ে গেল। ও চলে গেছে আফ্রিকায়, সেই অল্পবয়সের ছেলেটা, আর দীর্ঘ সোনালি তটভূমি, আর শ্বেতশুভ্র তটভূমি, এত সাদা যে তাকিয়ে থাকলে চোখ ব্যথা করে, আর সেই উঁচু অন্তরীপ, তার সুউচ্চ বাদামি পাহাড়। ও সেই তটভূমিতে প্রতি রাতে চলে যায় আর স্বপ্নের গভীরে শোনে শুধু ঢেউ ভাঙার গর্জন। ও দেখে সেই ঢেউ ভেঙে আদিবাসীরা তাদের নৌকা বেয়ে আসে। ও ঘুমের ভেতর আলকাতরা আর দড়ির ফেঁসোর গন্ধ পায় আর ভোরের হাওয়ায় বয়ে আসা আফ্রিকার ঘ্রাণ ওর তন্দ্রার গভীরে ওকে আকুল করে তোলে।
সাধারণত যখনই ও স্বপ্নে ভোরের হাওয়ার গন্ধ পায়, তখনই ওর ঘুম ভেঙে যায় আর তাড়াতাড়ি পোশাক পরে নিয়ে ও ছেলেটাকে জাগাতে যায়। কিন্তু আজ যখন ও শেষ রাতে ভোরের হাওয়ার গন্ধ পেল ও বুঝতে পারল স্বপ্নের মধ্যে হাওয়াটা আজ বেশি আগেই এসে গেছে, তাই ও স্বপ্নকে আঁকড়ে রইল আর সাগরের বুক ঠেরে জেগে ওঠা দ্বীপগুলোর উঁচু চুড়ো আর ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের বন্দরগুলো আর রাস্তাঘাট দেখতে থাকল।
