দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ২
এখন আর ও ঝড়ের স্বপ্ন দেখে না। ওর স্বপ্নে নারী নেই, উল্লেখযোগ্য বড় ঘটনা নেই, বিশাল মাছ নেই, মারামারি বা গায়ের জোরের লড়াই নেই, এমনকি ওর বউ-ও নেই। ও এখন নানা জায়গার স্বপ্ন দেখে, আর সমুদ্রতটে সিংহের স্বপ্ন দেখে। সিংহেরা সূর্যাস্তের রঙিন আলোয় বাচ্চা বেড়ালের মতো খেলা করে। ও তাদের ভালবাসে, যেমন ভালবাসে ছেলেটাকে। কিন্তু ও কখনও ছেলেটার স্বপ্ন দেখে না। ঘুম ভেঙে গেলে ও সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল, খোলা দরজা দিয়ে আকাশের চাঁদটাকে দেখল, তারপর গোটানো প্যান্টটা টেনে নিয়ে পরে ফেলল। তারপর চালার বাইরে এসে প্রাতঃকৃত্য সেরে ছেলেটাকে ডাকতে গেল। ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় ওর কাঁপুনি লেগেছে, কিন্তু ও জানে যে, কাঁপতে কাঁপতেই ওর শরীর গরম হয়ে যাবে আর তাছাড়া আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তো ওকে নৌকা বাইতে হবে।
ছেলেটার বাড়ির ভেজানো দরজা খুলে বুড়ো খালি পায়ে নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে ঢুকল। মরা চাঁদের বিবর্ণ জ্যোৎস্নায় ছেলেটা ঘুমোচ্ছে একটা খাটে, নিঃসাড়ে। বুড়ো হালকামুঠোয় ছেলেটার একটা পা ধরে নাড়া দিল। ছেলেটা ঘুম ভেঙে বুড়োর দিকে তাকাল। বুড়ো মাথা নাড়তেই ছেলেটা চেয়ারে রাখা প্যান্টটা নিয়ে বিছানায় বসে বসেই পরে ফেলল। তারপর বুড়োর পেছন পেছন ঘুম জড়ানো চোখে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বুড়ো ছেলেটার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এত ভোরে তোমার ঘুম ভাঙানোর জন্য দুঃখিত।
ছেলেটা বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার কর্তব্য করেছ।’
রাস্তা ধরে নিচের দিকে এসে ওরা বুড়োর চালাটায় ঢুকলো। সারা রাস্তায় তখন অন্ধকারেই নগ্নপদ মেছুড়েরা তাদের নৌকার পাল জড়ানো মাস্তুলগুলো বয়ে নিয়ে চলেছে।
বুড়োর চালায় ঢুকে ছেলেটা সুতোর বান্ডিলের বাক্সটা, হারপুন আর কোঁচটা নিল আর বুড়ো কাঁধে তুলে নিল পালজড়ানো মাস্তুলটা।
ছেলেটা। জিজ্ঞেস করল, ‘কফি খাবে?’
‘আগে এই সরঞ্জামগুলো নৌকায় রেখে আসি, তারপর।’
ভোরবেলায় মেছুড়েদের জন্যে খোলা একটা দোকানে গিয়ে ওরা জমানো দুধের কৌটোয় ঢালা কফি খেল।
ছেলেটা শুধালো, ‘রাতে কেমন ঘুমিয়েছ বুড়ো?’ ওর নিজের চোখ তখনও ঘুম জড়ানো, যদিও ও আস্তে আস্তে পুরো জেগে উঠছে।
‘খুব ভালো ঘুমিয়েছি মানোলিন,’ বুড়ো বলল, ‘আজ আমি আত্মবিশ্বাসী, মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে।’
‘আমারও তাই বিশ্বাস’, ছেলেটা বলল, ‘যাই, তোমার আর আমার জন্যে সার্ডিন মাছ আর তোমার তাজা টোপগুলো নিয়ে আসি। আমার নৌকার লোকটা তো নিজের সরঞ্জাম নিজেই বয়ে নিয়ে আসে, ওর চায় না আর কেউ সেগুলোতে হাত দিক।’
‘আমরা অন্যরকম,’ বুড়ো বলল, ‘তোমার পাঁচ বছর বয়েস থেকে আমি তোমাকে আমার জিনিসপত্র বইতে দিয়েছি।’
‘আমি জানি’, ছেলেটা বলল, ‘আমি এক্ষুনি আসছি, ততক্ষণে আরও একটা কফি খাও। দোকানে আমাদের নামে খাতা আছে।’
ছেলেটা খালি পায়েই প্রবাল স্তূপের ওপর দিয়ে বরফ ঘরের দিকে হেঁটে গেল, ওখানে মাছের টোপগুলো রাখা আছে।
বুড়ো ওর কফিটা খুব ধীরে খাচ্ছিল। ও জানে, যে এটাই ওর সারাদিনের খাওয়া আর তাই এটা ওর প্রয়োজন। অনেক দিন ধরেই খাওয়া ব্যাপারটা ওর কাছে বিরক্তিকর আর ও কখনও খাবার নিয়ে বেরোয় না। এক বোতল জল ওর নৌকার গলুইতে রাখা থাকে আর সেটাই ওর সারাদিনের প্রয়োজন মেটায়।
ছেলেটা সার্ডিন মাছ আর কাগজে মোড়া টোপ দুটো নিয়ে এল আর ওরা নুড়িপাথর ভর্তি বালির ওপর দিয়ে হেঁটে নৌকাটার কাছে গেল। তারপর নৌকাটা তুলে টানতে টানতে জলে ভাসিয়ে দিল।
‘বুড়ো তোমার শুভ হোক।’
‘তোমারও,’ বুড়ো বলল। বৈঠার দড়িগুলো ও নৌকার দুপাশে গোঁজের সঙ্গে বেঁধে ফেলল, তারপর সামনে ঝুঁকে বৈঠায় চাড় দিয়ে অন্ধকারের মাঝেই নৌকা বেয়ে এগিয়ে গেল। আশেপাশে অন্য নৌকার বৈঠা ফেলার ঝপাঝপ শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু চাঁদ পাহাড়ের আড়ালে নেমে যাওয়ায় ওগুলোকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না।
কখনও হয়তো কোনো নৌকায় কেউ কথা বলছিল, কিন্তু বৈঠার শব্দ ছাড়া বেশির ভাগ নৌকাই চুপচাপ। খাঁড়ির মুখ থেকে বেরিয়ে সবাই যে যার নিজের পছন্দ মতো মাছ ধরার জায়গা বেছে নিতে বার সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ল। বুড়ো তো ঠিকই করেছে যে, আজ ও সমুদ্রের অনেক ভেতরে চলে যাবে, তাই ও ডাঙার গন্ধ পেছনে ফেলে বৈঠা বাইতে বাইতে ভোর ভোর সকালের সমুদ্রের টাটকা গন্ধের ভেতর ঢুকে গেল। যেখানে সমুদ্র হঠাৎ ঢালু হয়ে সাতশ’ বাঁও গভীর, মেছুড়েরা যে জায়গাটাকে বিশাল কুয়ো বলে থাকে, আর যেখানে সমুদ্রের একেবারে তলায় খাড়া দেয়ালে ধাক্কা খাওয়া স্রোতের ঘূর্ণিতে নানা ধরনের মাছের জমায়েত, সেইখানে বাইতে বাইতে বুড়ো দেখে উপসাগরের আগাছার ফসফরাসের দীপ্তি। মাঝে মাঝে এখানে ওখানে শলা চিংড়ি আর টোপের মাছের ভিড়, কখনও বা রাতের অন্ধকারে সমুদ্রের গভীর গর্ত থেকে উঠে আসা স্কুইডের ঝাঁক আর এইসব মাছ খেতে আসা বড় মাছেদের ঘোরাফেরা।
অন্ধকারেই বুড়ো অনুভব করে ভোর হয়ে আসছে, আর বাইতে বাইতে শোনে উড়ুক্কু মাছের শক্ত ডানায় জলের ঝাপটার শব্দ আর জল ছেড়ে উঠে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া। উডুক্কু মাছকে ও সত্যিই ভালবাসে কারণ বিশাল সমুদ্রে ওরাই ওর প্রকৃত বন্ধু। পাখিদের জন্যে ওর কষ্ট হয়, বিশেষ করে ছোট, কোমল কালো শংখচিল জাতের পাখিদের জন্যে, যেগুলো সারাদিন খালি ওড়ে আর খাবার খোঁজে। ও ভাবে, ‘আমাদের চেয়েও পাখিদের বড় কষ্টের জীবন, অবশ্যই ডাকাত পাখি আর ভারী শক্তপোক্ত পাখিগুলো বাদে। সমুদ্রের সোয়ালো পাখির মতো এত নরম কোমল পাখি কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, যখন সমুদ্র এত নিষ্ঠুর হতে পারে? সমুদ্র দয়ালু, সমুদ্র খুব সুন্দর, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ সমুদ্র এমন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে, অথচ এই পাখিগুলো, উড়ছে, সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে ছোঁ মেরে শিকার করছে, এদের বিষণ্ণ, সরু গলার ডাক, সমুদ্রের কর্কশতার তুলনায় এরা কত কোমল, কত অসহায়।’
স্প্যানিশ ভাষায় সমুদ্রকে লোকেরা ভালবেসে ‘লা মার’ বলে ডাকে। বুড়োও তাই ভাবে। ভালবাসলেও কখনও কখনও ওরা সমুদ্র সম্বন্ধে খারাপ খারাপ কথা বলে, যেন কোনো মেয়েকে বলছে। কিছু কিছু কম বয়সি মেছুড়ে, যারা শার্ক মাছের লিভার বিক্রি করে ভালো পয়সা কামিয়ে মোটর বোট কিনেছে আর মাছ ধরার সুতোয় ফাৎনা ব্যবহার করে, ওরা সমুদ্রকে পুরুষ মনে করে আর স্প্যানিশে ‘এল মার’ বলে সমুদ্রকে অভিহিত করে। ওরা সমুদ্রকে ওদের প্রতিযোগী, কখনও বা শত্রু মনে করে। কিন্তু বুড়ো সব সময় সমুদ্রকে নারীর মতোই ভাবে, যে নারী নিজেকে দুহাত ভরে উজাড় করে দিতে জানে, আর কখনও যদিও বা সেই নারী রূঢ় কর্কশ হয়ে ওঠে, তা নেহাৎ পারে না বলেই। ও ভাবে, নারীর ওপর যেমন চাঁদের প্রভাব পড়ে, সমুদ্রের বেলায়ও তাই।
ও বেশ স্বচ্ছন্দ গতিতে দাঁড় বাইছে, কারণ ও গতি বাড়ায়নি বলে জোর খাটাতে হচ্ছে না। সমুদ্রের ওপরটা প্রায় সমতল, কেবল মাঝে মাঝে স্রোতের ঘূর্ণি উঠছে। ও স্রোতের অনুকূলে দাঁড় বাইছে আর যখন অন্ধকার কেটে গিয়ে প্রথম আলোর রেখা ফুটে উঠেছে আকাশে, তখন ও বুঝতে পারল এইটুকু সময়ে ওর যতদূর আসার কথা, তার চেয়ে বেশিই বার সমুদ্রে এসে পড়েছে।
ও ভাবছে, ‘আমি গত এক সপ্তাহ ওই বিশাল কুয়োর গভীরে সুতো ফেলেছি, কিন্তু একটা মাছও পাইনি। আজ আমি আরও অনেক দূরে চলে যাব, যেখানে বনিতা আর অ্যালবাকোরে মাছের ঝাঁক আর হয়তো সেখানে ওদের মাঝে একটা বিশাল মাছও থাকতে পারে।
পুরোপুরি ফর্সা হওয়ার আগেই ও টোপ গেঁথে বড়শি সুতো ফেলল আর স্রোতের মুখে এগিয়ে চলল। একটা টোপ ঝুলছে চল্লিশ বাঁও জলে, দ্বিতীয়টা পঁচাত্তর বাঁও জলে আর তৃতীয় ও চতুর্থ টোপ দুটো একশ’ আর একশ’ পঁচিশ বাঁও গভীরে। প্রতিটি টোপ এমনভাবে গাঁথা যে বড়শির কোনো অংশই বাইরে বেরিয়ে নেই, তাজা সার্ডিন মাছ দিয়ে পুরোটা ঢাকা। সার্ডিন মাছের দু চোখের ভেতর দিয়ে বড়শি এমনভাবে গাঁথা, যেন লোহার বড়শিতে মালা ঝুলছে আর বিশাল প্রকাণ্ড মাছ এলে কেবল মিষ্টি মিষ্টি গন্ধওয়ালা সুস্বাদু খাবারই দেখতে পাবে, ভেতরে বড়শি আছে টেরও পাবে না।
ছেলেটা দুটো তাজা তুনা মাছ বা অ্যালবাকোরে মাছের টোপ দিয়েছিল, সে দুটো সবচেয়ে গভীরে ফেলা দুটো বড়শিতে ভারী সিসের মতো ঝুলছে। বাকি দুটোর একটাতে একটা নীল রঙের, আর একটাতে হলদে রঙের নকল মাছ ঝুলছে, ওগুলো আগেও ব্যবহার করা হয়েছে আর এখনও ভালো অবস্থাতেই আছে। এছাড়া তাজা সার্ডিন মাছ আটকে দেওয়াতে গন্ধও হয়েছে, লোভনীয়ও হয়েছে। পেন্সিল-এর মতো মোটা প্রতিটি সুতো একটা করে সবুজ রঙের ছিপে ফাঁস দিয়ে আটকানো যাতে টোপে একটু টান পড়লে বা ছোঁয়া লাগলেই ছিপের ডগাটা বেঁকে যাবে। প্রতিটি সুতোর সঙ্গে চল্লিশ গজ সুতোর বান্ডিল লাগোনো আছে, ওগুলো আবার অতিরিক্ত বান্ডিলের সঙ্গে গিঁট দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে, যাতে করে দরকার পড়লে তিনশো গজ সুতো ছেড়ে মাছকে খেলানো যেতে পারে।
বুড়ো তিনটে ছিপের দিকে নজর রেখে ধীরে ধীরে নৌকা বাইতে থাকে, যাতে সুতো একদম খাড়া জলের নিচে সঠিক গভীরতায় ঝুলে থাকে। অন্ধকার পুরো কেটে গিয়ে আলো হয়ে গেছে, যে কোনো মুহূর্তে সূর্য উঠতে পারে।
সমুদ্র থেকে হালকা সূর্য উঠল আর বুড়ো দেখতে পেল দূরে আরও কয়েকটা নৌকা, দিগন্তের দিকে, ডাঙার কাছাকাছি, স্রোতের টানে টানে ছড়িয়ে পড়েছে। এবার সূর্য আরও উজ্জ্বল হলো আর জলের ওপরে রোদ ঝলকাতে লাগল। সেই ঝলক ওর চোখে পড়ায় চোখ ধাঁধিয়ে গেল আর তাই বুড়ো চোখ ফিরিয়ে নৌকা বাইতে লাগল। জলের গভীরে অন্ধকারে সুতোগুলো ঝুলছে, বুড়ো ওগুলোকে এমনভাবে সোজা রাখছে, যাতে সমুদ্রের তলায় স্রোতের অন্ধকার গভীরে যেখানে বড় মাছেরা ঘুরে বেড়ায়, তাদের মুখের সামনে টোপগুলো ঝুলে থাকে। অন্য মেছুড়েরা স্রোতের টানে সুতোগুলো ভেসে যেতে দেয়, তার ফলে ওরা যখন ভাবে সুতোগুলো একশ’ বাঁও জলের তলায় ঝুলছে তখন কিন্তু আসলে সুতোগুলো মাত্র ষাট বাঁও জলের তলায়।
বুড়ো ভাবছে, আমি তো ওগুলো নিখুঁতভাবে ফেলে রাখি, কিন্তু এখন তো আমার কপাল ভালো যাচ্ছে না। তবে কে বলতে পারে হয়তো আজই আমার ভাগ্য খুলতে পারে। প্রতিদিনই তো নতুন একটা দিন। আমি আমার কাজ নিখুঁতভাবে করে যাব, কারণ ভাগ্য যদি আমার সহায় হয়, তখন যেন আমি প্রস্তুত থাকতে পারি
সূর্য দু’ঘণ্টায় আরও ওপরে উঠেছে আর এখন পুব দিকে তাকালে চোখে রোদ লেগে কষ্ট হচ্ছে না। এখন আর মাত্র তিনটে নৌকা দেখা যাচ্ছে, আর ওগুলোকে ডাঙার দিকে অনেক নিচুতে বলে মনে হচ্ছে।
বুড়ো ভাবছে, সারাটা জীবন সকাল বেলার সূর্য আমার চোখকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু তবু আমার চোখ এখনও ভালো। বিকেলের সূর্যের দিকে আমি এখনও সোজাসুজি তাকাতে পারি, আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায় না। বিকেলের রোদও খুব প্রখর, কিন্তু সকাল বেলার রোদে চোখ ব্যথা করে।
ঠিক সেই সময়েই ওর চোখে পড়ল একটা ‘ম্যান অব ওয়ার’ পাখি তার লম্বা কালো ডানায় ভর করে ঠিক সামনেই আকাশে পাক খাচ্ছে। পাখিটা ডানা গুটিয়ে তীরের মতো সোজা জলে ছোঁ মারল, সঙ্গে সঙ্গেই আবার ওপরে উঠে আকাশে পাক খেতে লাগল।
বুড়ো নিজের মনেই বিড়বিড় করল, ‘পাখিটা নিশ্চয়ই কিছু দেখেছে। ও ধীরে ধীরে নৌকাটা বাইতে বাইতে পাখির দিকেই এগোতে লাগল। সুতোগুলো সোজা রেখে ও ধীরে ধীরে বাইছে, যদিও পাখিটার দিকে চোখ রেখে আগের চেয়ে তাড়াতাড়ি ও স্রোতের মধ্যে সুতোগুলোকে কাছাকাছি নিয়ে এল। ততক্ষণে পাখিটা আরও উঁচুতে উঠে গেছে আর ডানা না নাড়িয়ে আকাশে পাক খাচ্ছে। তারপরেই পাখিটা তীরের মতো ছোঁ মারল আর বুড়ো দেখল, উডুক্কু মাছের ঝাঁক জলের ওপরে উঠেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ‘ডলফিন,’ বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল, ‘বড় ডলফিন’।
ও বৈঠা তুলে ফেলল আর গলুই থেকে একটা তার লাগানো মাঝারি বড়শি বাঁধা ছোট সুতো নিয়ে তাতে একটা সার্ডিন মাছের টোপ গেঁথে নৌকার পাশ ঘেঁষে জলে ফেলল আর সুতোর আরেক প্রান্ত নৌকার পেছনের দিকে একটা আংটার সঙ্গে বেঁধে ফেলল। তারপর আর একটা সুতোর বড়শিতেও টোপ গেঁথে নৌকার পাটাতনের নিচে ছায়ায় রেখে দিল। লম্বা ডানাওয়ালা কালো পাখিটা এখন জলের কাছাকাছি উড়ছে আর ও পাখিটার দিকে নজর রেখে আবার নৌকা বাইতে শুরু করল।
বুড়ো দেখল, পাখিটা আবার ডানা মুড়ে জলে ছোঁ মারল, কিন্তু পরক্ষণেই জল থেকে উঠে পড়ে ডানা ঝাড়তে লাগল আর উড়ুক্কু মাছের ঝাঁকের পেছন পেছন উড়তে লাগল। ও মাছ ধরতেই পারছে না, কারণ জলের ওপরটা ফুলে ফুলে ওঠে দেখে বোঝা যাচ্ছে ঠিক তলায় ডলফিনগুলো রয়েছে আর উড়ুক্কু মাছের ঝাঁকটাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। ডলফিনের ঝাঁকটা বেশ বড় মনে হচ্ছে আর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এত দ্রুতগতিতে মাছের ঝাঁকটাকে তাড়া করেছে যে, উডুক্কু মাছগুলোর আর কোনো আশাই নেই। পাখিটারও কোনো আশা নেই, কারণ মাছগুলো ওর পক্ষে বড্ড বড় আর অসম্ভব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
বুড়ো দেখছে মাছের ঝাঁকটা ক্রমাগত জল ছেড়ে ওপরে উঠছে আর ছড়িয়ে পড়ছে আর পাখিটা ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। ও ভাবছে, মাছের ঝাঁকটা আমার কাছ থেকে খুব দ্রুতবেগে সরে যাচ্ছে আর দূরে চলে যাচ্ছে। কি জানি, হয়তো ছিটকে আসা এক আধটা মাছ আমার নৌকায় উড়ে এসে পড়তেও পারে, হয়তো আমার বড় মাছটাও ওদের আশেপাশেই আছে। কোথাও তো নিশ্চয়ই আছে।
এতক্ষণে দিগন্তে ডাঙার উপর ঝুলে থাকা মেঘগুলো পাহাড়ের মতো দেখাচ্ছে আর তটরেখাটা একটা লম্বা সবুজ রেখার মতো লাগছে, পেছনে ছাইছাই নীল রঙের পাহাড়গুলো।
জলের রঙ মনে হচ্ছে গাঢ় নীল, এত গাঢ় যে, প্রায় বেগুনি-নীল-এর মতো। ও জলের ওপর ঝুঁকে ভেতরে তাকাল, দেখল, কালো জলের গভীরে সূর্যের আলোর অদ্ভুত আভা আর লালচে অণুকোষী (প্যাঙ্কটন)-র ঝাঁক। ও দেখল, ওর ফেলা সুতোগুলো সোজা জলের গভীরে দৃষ্টির আড়ালে নেমে গেছে আর প্রচুর পরিমাণে অণুকোষী দেখে বুঝল এখানে মাছ আছে। জলের ভেতর সূর্যের আলোর যে অদ্ভুত আভা আর ডাঙার ওপর ঝুলে থাকা মেঘের যে চেহারা, তার থেকে বোঝা যায়, আবহাওয়া ভালো, পরিষ্কার। কিন্তু এতক্ষণে পাখিটা প্রায় দৃষ্টির বাইরে চলে গেছে আর জলের ওপরে কিছু বিক্ষিপ্ত রোদ-ঝলসানো হলদে সারগোসা শ্যাওলা আর নৌকার খুব কাছেই ভেসে থাকা একটা পর্তুগীজ ম্যান- অফ-ওয়ার-এর কালচে বেগুনি চটচটে আঠালো রামধনু রঙের থলিটা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। ওটা একবার ওল্টাচ্ছে, একবার সোজা হচ্ছে, তলায় প্রায় দুহাত লম্বা মারাত্মক ডাঁটিগুলো ঝুলছে।
বুড়ো স্বগতোক্তি করল, ‘হারামজাদি, নষ্ট মাগি।’
বৈঠার ওপর হালকা ভর রেখে বুড়ো জলের ভেতর তাকিয়ে দেখল, খুব ছোট্ট ছোট্ট একই রঙের মাছ ওই বিষাক্ত ডাঁটিগুলো, যেগুলো সুতোর মতো ঝুলছে, তার মধ্যে দিয়ে আর থলিটার তলায় তলায় সাঁতরে বেড়াচ্ছে। ওরা নিরাপদ, কারণ ওদের গায়ে বিষ লাগে না। কিন্তু ওই বিষের হাত থেকে মানুষের রেহাই নেই। বুড়ো নিজেই এই কথা জানে, কারণ মাছ ধরতে গিয়ে যখন সুতোয় ওই চটচটে পেছল বেগুনি নরম ডাঁটিগুলো জড়িয়ে যায়, তখন সুতো টানবার সময় হাতে, শরীরে ওই বিষাক্ত ডাঁটিগুলো লেগে যায় আর বিষাক্ত আইভি লতা বা বিষাক্ত ওক গাছের মতোই বিষের ক্রিয়ায় ফুলে ওঠে আর ঘা হয়ে যায়। আর এই নষ্ট মাগির বিষটা চাবুকের মতো আঘাত করে আর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই সাতরঙা থলিগুলো দেখতে অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু সমুদ্রের সবকিছুর মধ্যে এই সৌন্দর্যই সবচেয়ে মেকি। আর তাই বুড়ো খুব খুশি হয় যখন দেখে যে, সামুদ্রিক কচ্ছপগুলো ওগুলো খাচ্ছে। কচ্ছপগুলো এই থলিগুলো দেখে, সোজাসুজি সামনে থেকে আক্রমণ করে, চোখ বন্ধ করে খোলার মধ্যে শরীর ঢুকিয়ে কেবল হাঁ করে ডাঁটিটাটি সুদ্ধ থলিগুলোকে গিলে নেয়। কচ্ছপের এই খাওয়া দেখতে বুড়োর খুব ভালো লাগে আর ঝড়ের পরে সমুদ্রের তীরভূমিতে পড়ে থাকা এই থলিগুলোর ওপর ওর শক্তগোড়ালি ফেলে ফেলে হাঁটতে আর থলিগুলো ফট করে ফেটে যাওয়ার শব্দ শুনতেও ওর খুব ভালো লাগে।
সবুজ রঙের কচ্ছপগুলোকে ও দারুণ ভালবাসে, আর বাজপাখির মতো ঠোঁটওয়ালা সুন্দর, দ্রুতগতি, দামি পাখিগুলোকে ও খুব ভালবাসে। আর যে বিশাল বিশাল মাথা মোটা, বোকা, হলদে রঙের শক্ত খোলওয়ালা কচ্ছপগুলো, যেগুলো চোখ বুজে পর্তুগীজ ম্যান-অফ- ওয়ারগুলোকে খায় আর অদ্ভুতভাবে যৌনক্রিয়া করে, সেগুলোকে ও অবজ্ঞার চোখে দেখে।
যদিও অনেক বছর ধরে ও কচ্ছপ ধরার নৌকায় কাজ করেছে, তবু এই কচ্ছপগুলো সম্পর্কে কোনো অলৌকিক মতবাদে ও বিশ্বাস করেনা। বরং ওদের জন্য ওর দুঃখই হয়, এমনকি ওর নৌকার মতো বড় আড়াইমণ ওজনের কচ্ছপগুলোর জন্যেও। বেশির ভাগ মানুষই এই কচ্ছপগুলোর ব্যাপারে হৃদয়হীন, কারণ এগুলো মেরে, কেটে, টুকরো টুকরো করার পরেও এদের হৃৎপিও কয়েকঘন্টা ধরে ধুকধুক করতে থাকে। কিন্তু বুড়ো ভাবে, আমার হৃৎপিণ্ডও তো ওদের মতোই, এমনকি আমার হাত-পা-ও। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বুড়ো ওদের সাদা সাদা ডিমগুলো খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে, যাতে সত্যিকারের বড় মাছ ধরার মতো গায়ে জোর হয়। যে চালাঘরটায় বেশির ভাগ মেছুড়ে তাদের মাছ ধরার সরঞ্জামগুলো রাখে, সেখানে একটা বড় ড্রাম হাঙরের লিভার-তেলে ভর্তি থাকে, তার থেকে ও রোজ এক কাপ করে নিয়ে খায়। ওগুলো সব মোড়েদেরই জন্যই রাখা থাকে। বেশির ভাগ মেছুড়ে অবশ্য ওই তেলের স্বাদ পছন্দ করে না। কিন্তু বুড়ো জানে যে এই তেল সর্দিজ্বর, ইনফ্লুয়েঞ্জার হাত থেকে বাঁচায়, এছাড়া দৃষ্টিশক্তিও ভালো রাখে।
বুড়ো আবার আকাশের দিকে তাকায় আর দেখে যে পাখিটা আবার চক্রাকারে ঘুরছে।
বুড়ো বলে ওঠে, ‘পাখিটা মাছ দেখেছে।’ কোনো উড়ুক্কু মাছ অবশ্য জল ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে না বা ছোট ছোট টোপের মাছও জলের ওপর ছড়িয়ে নেই। কিন্তু বুড়োর তীক্ষ্ণনজরে পড়ে, একটা ছোট ভুনা মাছ জল ছেড়ে লাফিয়ে ওপরে ওঠে আবার মাথা নিচু করে জলের ওপর পড়ল। রোদে তুনা মাছটা রূপার মতো চকচক করছিল আর ওটা জলে পড়ার পর একটার পর একটা তুনা মাছ উঠছিল আর লাফ দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। ওরা ছোট টোপের মাছগুলো ধরার জন্য লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে জলে পড়ছিল আর জলে ঘূর্ণি তুলে ওদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
বুড়ো ভাবল, ওরা যদি বেশি জোরে না যায়, তাহলে আমি ওদের ঝাঁকের মধ্যে নৌকা নিয়ে যেতে পারব। বুড়ো দেখছিল, তুনা মাছের ঝাঁকটা জল একেবারে ঘুলিযে ফেলে ছোট মাছ শিকার করছে আর পাখিটাও জলের ওপরে উঠে আসা ছোট মাছের ঝাঁকের মধ্যে ছোঁ মেরে মেরে মাছ ধরছে।
বুড়ো বলে উঠল, ‘পাখিটা আমাকে সাহায্য করছে।’ ঠিক এই সময় বুড়োর পায়ের তলায় চেপে রাখা পাছ-গলুইএর সুতোটা টান টান হয়ে গেল আর ও তাড়াতাড়ি বৈঠা ওপরে তুলে রেখে সুতোটা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে ছোট তুনা মাছের ওজনটা বুঝে নিয়ে সুতো টানতে লাগল। ও যত টানছে, বড়শিতে গেঁথে যাওয়া মাছের ছটফটানি তত বাড়ছে আর শেষে মাছটার নীল মিঠ আর সোনালি দুপাশ যখন জলের ভেতর দেখা গেল, তখন ও এক হ্যাচকা টানে মাছটাকে তুলে নৌকার ভেতর ফেলল। মাছটা রোদের মধ্যে পড়ে আছে, আর নৌকার তক্তার ওপর ওর লেজ দিয়ে ক্রমাগত ঝাপটা মারছে, ওর বড় বড় নির্বোধ দুটো চোখ, আর শক্তপোক্ত বুলেটের মতো চেহারার শরীরটা ছটফট করছে। বুড়ো দয়া করে ওর মাথায় বৈঠা দিয়ে মেরে ওর ঝাপটা মারা বন্ধ করল, ওর শরীরটা তখনও কাঁপছে। তারপর পাছ গলুইয়ের ছায়ায় ফেলে রাখল।
বুড়ো বলল, ‘অ্যালবাকোরে মাছ, পাঁচ কেজি মতো হবে আর বড় মাছের জন্যে ভালো টোপ হবে।’
একা থাকতে থাকতে কখন থেকে যে বুড়ো নিজের মনে জোরে জোরে কথা বলা শুরু করেছে, ও মনে করতে পারল না। আগেরকার দিনে বুড়ো একা একা নিজের মনে গান গাইত আর রাত্রে যখন একা নৌকা বাইত, তখনও নিজের মনে গান গাইত। বোধ হয় ছেলেটা ওর নৌকা থেকে চলে যাবার পর থেকেই ওর এই একা একা নিজের মনে কথা বলার অভ্যাসটা হয়েছে। ওর অবশ্য এ কথা মনে পড়ে না। যখন ও ছেলেটাকে নিয়ে মাছ ধরতে যেত, তখন ওরা কেবলমাত্র দরকার পড়লেই কথা বলত, নয়তো নয়। রাত্রিবেলা, কিংবা খারাপ আবহাওয়ায় ঝড় উঠলে ওরা কথা বলত। সমুদ্রে মাছ ধরার সময় অপ্রয়োজনে কথা না বলাই যুক্তিযুক্ত, একথা বুড়ো শ্রদ্ধাসহকারে মানত। কিন্তু এখনতো আর সঙ্গে কেউ থাকে না যে বিরক্ত হবে, তাই বুড়ো প্রায়ই নিজের ভাবনাগুলো জোরে জোরে আপন মনেই বলত।
ও বলে উঠল, ‘যদি এখন কেউ আমাকে একা একা জোরে কথা বলতে শোনে, তাহলে নিশ্চয়ই আমাকে পাগল ভাববে। কিন্তু আমি তো পাগল নই, তাই আমি গ্রাহ্য করি না। যাদের পয়সা আছে, তাদের নৌকায় তো রেডিও থাকে, তারা রেডিও-র কথা শোনে, বেসবল খেলার কথা শোনে।’
ও ভাবল, না, এখন বেসবল-এর কথা ভাবা ঠিক নয়। এখন কেবল একটা কথাই ভাবতে হবে, যেটা আমার কাজ এই ছোট মাছের ঝাঁকের আশেপাশে হয়তো বড় মাছ আছে। আমি তো কেবল একটা দলছুট অ্যালবাকোরে মাছ ধরেছি। ওগুলো এখন দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। আজ জলের ওপরে যা কিছু দেখা যাচ্ছে, সবই খুব দ্রুতবেগে উত্তর-পুবে সরে যাচ্ছে। এটা থেকে কি দিনের সময় বোঝা যাচ্ছে, নাকি, এটা আবহাওয়ার কোনো পূর্বাভাস, যা আমি জানি না?
এখন আর ও তটভূমির সবুজ রেখা দেখতে পাচ্ছে না। কেবল নীল পাহাড়ের চুড়োগুলোই সাদা দেখাচ্ছে, যেন বরফে মোড়া আর চুড়োগুলোর ওপরে সাদা মেঘের স্তূপকে মনে হচ্ছে যেন বরফের পাহাড়। সমুদ্র এখন কালো অন্ধকার, কেবল আলো পড়ে মাঝে মাঝে জলে সাতরঙের বিচ্ছুরণ খেলা করছে। সূর্য এখন আকাশে এত ওপরে যে, ওই অগণ্য প্যাঙ্কটনের ফুটকিও দেখা যাচ্ছে না। বুড়ো কেবল দেখছে সমুদ্রের নীল জলের গভীরে আলোর রঙিন বিচ্ছুরণ আর মাইল খানেক গভীর সমুদ্রে ওর সোজা নেমে যাওয়া সুতোগুলো।
তুনা মাছগুলো নিচে নেমে গেছে, আর দেখা যাচ্ছে না। এই জাতের সব রকম মাছকেই মেছুড়েরা তুনা মাছ বলে থাকে, অবশ্য যখন বাজারে বেচতে যায়, তখন মাছগুলোর আলাদা আলাদা সঠিক নামেই বলে। সূর্য এখন উত্তপ্ত, বুড়োর ঘাড়ের পেছনে গরম ছ্যাঁকা আর পিঠ বেয়ে দরদর করে ঘাম নামছে।
বুড়ো ভাবছে- আমি এখন হালছাড়া ভাবে ভেসে যেতে পারি, একটু ঘুমিয়েও নিতে পারি, অবশ্য পায়ের বুড়ো আঙুলে একটা সুতোর ফাঁস লাগিয়ে, যাতে টান পড়লেই ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু আজ তো পঁচাশিতম দিন, আজ সতর্কভাবে মাছ ধরা উচিত।
ঠিক সেই মুহূর্তেই, সুতোগুলোর ওপর নজর রাখতে রাখতে বুড়ো দেখল একটা সবুজ ছিপ এর ডগা তীব্রভাবে বেঁকে ঝুঁকে পড়ল।
বুড়ো বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, এইবার—’ আর সঙ্গে সঙ্গে নৌকা না দুলিয়ে বৈঠা দুটো নৌকার ওপর তুলে ফেলল। তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনী দিয়ে সুতোটা আলতোভাবে চেপে ধরল। কোনো টান অথবা ভার বুড়ো টের পেল না, তবু সুতোটা আলগা করে ধরেই রইল। কিছুক্ষণ পরে একটা হাঙ্কা টান, না জোরালো, না ওজনদার, কিন্তু বুড়ো বুঝে গেল,ওটা কী। একশ বাঁও জলের তলায়, তুনা মাছের টোপ গাঁথা হাতে পিটিয়ে তৈরি করা বড়শির ডগায় যে সার্ডিন মাছগুলো বিধিয়ে রাখা আছে, সেগুলো খেতে শুরু করেছে একটা মাৰ্লিন মাছ।
বুড়ো এখন ছিপ থেকে সুতো ছাড়িয়ে বাঁ হাতে আলতো, নরম করে ধরে আছে। এখন ও মাছটাকে কোনো টান বুঝতে না দিয়ে আঙ্গুলের মধ্যে দিয়ে সুতো ছেড়ে যেতে পারে। ও ভাবছে, এত দূর-বার সমুদ্রে এই মাসে, মাছটা নিশ্চয়ই বিশাল। খাও, মাছ ভালো করে খাও, দেখ, সমুদ্রের ছশ ফিট গভীরে, অন্ধকারে ঠাণ্ডায় তোমার জন্য কি রকম তাজা খাবার রেখেছি। অন্ধকার গভীরে আর একবার পাক দিয়ে এসে খাও।
ও আবার একটা হালকা টান টের পেল, তারপর একটা জোরালো টান, কারণ বড়শি থেকে সার্ডিন মাছের মাথাটা ভেঙে নেওয়া শক্ত। তারপর আবার সব চুপ, সুতো ঢিলা।
বুড়ো জোরে জোরে বলে উঠল, ‘আয়, আর একটা পাক খেয়ে আয়, গন্ধ শোঁক, কি, বেশ ভালো গন্ধ না। ওগুলো ভালো করে খেয়ে নাও বাছা, তারপর তো তুনা মাছটাও আছে, শক্ত, ঠাণ্ডা, সুন্দর তুনা মাছটা! লজ্জা পেও না বাছা, খাও, খেয়ে নাও।’
ও বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর ফাঁকে সুতোটা ধরে প্রতীক্ষায় আছে আর সাথে সাথে অন্য সুতোগুলোর ওপরও নজর রাখছে, কারণ মাছটা তো সাঁতারে ওপরের দিকে বা নিচের দিকেও যেতে পারে। খানিকক্ষণের মধ্যেই আবার সেই হাল্কা, আলতো টান।
‘ও এবার খাবেই’, বুড়ো জোরে জোরে বলে উঠল, ‘ভগবান, ওকে টোপটা গিলতে দাও।’
মাছটা কিন্তু টোপটা গিলল না। আঙুলে কিছু টের না পেয়ে বুড়ো বুঝতে পারল, মাছটা চলে গেছে।
বুড়ো বলে উঠল, ‘ও যেতেই পারে না, ভগবান জানেন, ও যেতেই পারে না। ও এক পাক ঘুরে আবার আসছে। বোধহয় আগে কখনও বড়শির চোট খেয়েছে আর সে কথা ওর মনে আছে।’
তারপরেই আবার সুতোয় হালকা টান, বুড়োর মেজাজ খুশ। ‘ও একটা পাক খেয়ে ঘুরে এল, এবার ও নির্ঘাত টোপটা নেবে।’
খুশি মেজাজে বুড়ো হালকা হালকা টান টের পাচ্ছে, তারপরই হঠাৎ প্রচণ্ড শক্ত একটা টান,অবিশ্বাস্য রকম ভারী। বুড়ো টের পেল প্ৰচণ্ড ওজনদার একটা মাছ আর আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতো নেমে যাচ্ছে, নেমেই যাচ্ছে, নিচে, নিচে, আরও নিচে। পাশে সরিয়ে রাখা অতিরিক্ত সুতোর বান্ডিলের প্রথমটা নেমে যাচ্ছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে আলতো নেমে যাওয়া সুতো ধরে বুড়ো বুঝতে পারছে, মাছটার বিশাল ওজন, যদিও ওর বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর চাপ এত হালকা যে মাছটা কোনো টানই বুঝতে পারবে না।
বুড়ো বলে উঠল, ‘কী বিশাল মাছ, ওর মুখের একপাশে টোপটা আছে আর ও এখন ওটা নিয়ে ছুটে চলেছে।’ ও মনে মনে ভাবল, এবার ও ঘুরবে আর টোপটা গিলে নেবে। একথাটা কিন্তু বুড়ো জোরে জোরে বলল না, কারণ ও জানে যে, কোনো ভালো কথা বললে, ফলে না। ও বুঝতে পারছে, মাছটা বিশাল আর ভাবছে তুনা মাছের টোপটাকে আড়াআড়ি মুখের ভেতর নিয়ে মাছটা দূরে চলে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তেই মাছটা থেমে পড়ল, কিন্তু ওজনদার টানটা তখনও বোঝা যাচ্ছে। তারপরেই টানটা আবার জোরদার হলো আর বুড়ো আরও সুতো ছাড়তে লাগল। এক মুহূর্তের জন্য বুড়ো সুতোর ওপর ওর আঙুলের চাপ শক্ত করল, তৎক্ষণাৎ মাছের টান আরও জোর হলো আর সুতো সোজা নিচে নামতে লাগল।
ও বলে উঠল, ‘ও টোপটা নিয়েছে, এবার ওকে ওটা ভালো করে খেতে দেব।’
