দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ৩
ডান হাতের আঙুলের ফাঁক দিয়ে সুতোটা ছাড়তে ছাড়তে ও নিচু হয়ে বাঁ হাত দিয়ে দুটো অতিরিক্ত সুতোর বান্ডিলের সঙ্গে গিঁট বেঁধে ফেলল। এখন ও প্রস্তুত, কারণ যে বান্ডিলের সুতো মাছটা টানছে, তার সঙ্গে আরও তিনটে আড়াইশো ফুটের সুতোর বান্ডিল ওর তৈরি হয়ে রইল।
‘আর একটু খাও বাবা, ভালো করে খাও,’ ও বলল।
ও ভাবছে, আর একটু ভালো করে খেলেই বড়শি সোজা তোমার হৃৎপিণ্ডে ঢুকে গিয়ে তোমার মৃত্যু ঘটাবে। আস্তে আস্তে ওপরে উঠে এস, আমি হারপুনটা তোমার শরীরে বিধিয়ে দিই। ঠিক আছে, এখন কি তুমি প্রস্তুত। কাবার টেবিলে তো অনেকক্ষণ বসে আছ?
‘এইবার’- বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল আর দুহাতে সজোরে হ্যাঁচকা টান মারল। একগজ সুতো কোনো রকমে টেনে এনে শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে একবার বাঁহাত একবার ডান হাত দিয়ে বারবার হ্যাঁচকা টান মারতে লাগল।
কিছুই হলো না। মাছটা ধীরে ধীরে সুতো টেনে চলতেই লাগল, বুড়ো ওকে এক ইঞ্চিও তুলতে পারল না। ভারী ভারী মাছ ধরার জন্য তৈরি ওর সুতো খুব শক্ত আর ও পিঠের ওপর দিয়ে সুতোটা ঘুরিয়ে টানটা রাখল। সুতো তখন এত টান টান যে, সুতোর গা থেকে জলের ফোটা টপটপ করে ঝরছে। তারপর জলের মধ্যে সুতোর টানে শিসের মতো শব্দ শুরু হল। আর ও বসবার তক্তাতে শরীর ঠেকিয়ে ঝুঁকে পড়ে সুতোর টান সামাল দিতে থাকল। উত্তর-পশ্চিম দিকে তখন নৌকা ধীরে ধীরে মাছের টানে চলতে শুরু করেছে।
মাছটা একভাবে টেনে চলেছে আর ওরা শান্ত জলের ওপর দিয়ে ধীর গতিতে চলছে। অন্য টোপগুলো তখনও জলের তলায় ঝুলছে, কিন্তু কিছু করার নেই।
বুড়ো জোরে জোরে বলে উঠল, ‘আহা, যদি ছেলেটা এখন আমার সঙ্গে থাকত। আমি মাছটাকে টানব, তা নয়, মাছটাই আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে। সুতোটা অবশ্য আমি না ছেড়ে বেঁধে রাখতে পারি। কিন্তু তাহলে মাছটা টানের চোটে সুতো ছিঁড়ে ফেলতেও পারে। মাছটাকে যতটা পারি, ধরে রাখার চেষ্টা করি আর দরকারে আরও সুতো ছাড়তে পারি। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, যে ও ক্রমাগত সামনের দিকে চলেছে, নিচে নামছে না।
‘জানি না, ও যদি নিচে নামতে চায়, তাহলে আমি কী করব। যদি একদম নিচে গিয়ে ও মরে, তাহলে কী করব তাও জানি না। কিন্তু কিছু একটা তো করতেই হবে। আমি অনেক কিছুই করতে পারি।
ও পিঠের ওপর দিয়ে সুতো ঘুরিয়ে এনে ধরে থাকল আর জলের মধ্যে সুতোর বাঁকটা নজরে রাখল। নৌকা উত্তর-পশ্চিম মুখে একভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
বুড়ো ভাবছে, ‘ও তো চিরকাল এ রকম টেনে চলতে পারবে না, ওকে মরতেই হবে।’
কিন্তু চার ঘণ্টা কেটে গেল, মাছটা একভাবে সমুদ্রের আরও ভেতরে সাঁতারে চলেছে, নৌকাটাকে টানতে টানেত, আর বুড়ো একইভাবে পিঠের ওপর দিয়ে সুতোটা নিয়ে শক্তভাবে ঠেকনো দিয়ে আছে।
‘ঠিক ভর দুপুরে ওকে আমি গেঁথেছি’- বুড়ো বলল, ‘আর এখনও পর্যন্ত ওকে আমি দেখতে পাইনি।’ মাছটা গাঁথবার ঠিক আগেই ও ওর খড়ের টুপিটা মাথার ওপর চেপে বসিয়ে দিয়েছিল, এখন সেই টুপির ঘষায় ওর কপালটা কেটে যাচ্ছে। ওর জলতেষ্টাও পেয়েছে। ও খুব সাবধানে, সুতোয় যাতে হ্যাঁচকা টান না পড়ে, সেইভাবে হাঁটু মুড়ে বসে গলুইয়ের দিকে যতদূর সম্ভব ঝুঁকে একহাত দিয়ে জলের বোতলটা টেনে আনল আর বোতল খুলে একটু জল খেল। তারপর গলুইয়ে রাখা পালগোটানো মাস্তুলটার ওপর বসে বিশ্রাম নিতে লাগল। ও এখন আর কিছু ভাববে না, কারণ ওকে এখন সইতে হবে।
তারপর ও পেছনে তাকিয়ে দেখল ডাঙা আর দেখা যাচ্ছে না। ও ভাবল, ‘কিছু যায় আসে না। হাভানার আলোর আভা দেখে আমি যে কোনো সময় ফিরে আসতে পারি। সূর্য ডুবতে এখনও দু ঘণ্টা দেরি আর হয়তো তার আগেই ও জলের ওপর ভেসে উঠবে। তখন যদি ও না ওঠে, তাহলে চাঁদ ওঠার পর হয়তো ভেসে উঠবে। তাও যদি না হয়, তাহলে কাল সূর্য ওঠার সময় ও নিশ্চয়ই ওপরে উঠবে। আমার গায়ে এখনও শক্তি আছে আর আমার মাংসপেশীতে খিলও ধরেনি। ওরই মুখে বড়শি গেঁথে আছে। কিন্তু কী মাছ রে বাবা, এই রকম টান! নিশ্চয়ই বড়শির লোহার তারের ওপর ও হা মুখ চেপে রেখেছে।
যদি একবার ওকে দেখতে পেতাম! কার সঙ্গে আমাকে লড়তে হচ্ছে, সেটা জানবার জন্যেও যদি একবার ওকে দেখতে পেতাম!
সারাটা রাত মাছটা একভাবে গতি পরিবর্তন না করে একই দিকে টেনে চলল। আকাশের তারা দেখে বুড়োর তাই মনে হল। সূর্য ডোবার পর ঠাণ্ডা পড়ল আর ওর পিঠের, হাতের, বুড়োটে পায়ের ঘাম ঠাণ্ডায় শুকিয়ে গেল। দিনের বেলা ও টোপের বাকস ঢাকা দেওয়া চটের বস্তাটা রোদে শুকিয়ে নিয়েছিল। সূর্য ডুবে গেলে ও বস্তাটা গলার সঙ্গে বেঁধে পিঠের দিকে ঝুলিয়ে দিল আর খুব সাবধানে সুতোটাকে বস্তার ওপর দিয়ে নিয়ে এসে ওর কাঁধের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। বস্তাটা থাকায় সুতোর টানটা আর ওর চামড়ায় লাগবে না, আর তাই ও সামনে ঝুঁকে গলুইয়ে হেলান দিয়ে মোটামুটি একটু আরামদায়ক অবস্থায় এল। আসলে ওর অস্বস্তিটা একটু কম হল, কিন্তু ও ভাবল, এটাতেই আমার আরাম।
‘আমি এখন মাছটাকে কিছুই করতে পারব না আর ও আমাকে কিছুই করতে পারবে না,’ বুড়ো ভাবল, ‘অন্তত যতক্ষণ ও এইভাবে টেনে যাবে।’
একবার ও উঠে দাঁড়িয়ে নৌকার ধারে এসে পেচ্ছাপ করল আর আকাশের তারার দিকে চেয়ে দিক নির্ণয় করার চেষ্টা করল। ওর কাঁধের ওপর দিয়ে সোজা জলের ভেতর নেমে যাওয়া সুতোটা এখন ফসফরাসের মতন জ্বলছে। ওরা এখন খুব ধীরে চলছে আর হাভানার আলোর আভা অতটা জোরালো নয়, তাইতে ওর মনে হল স্রোতটা ওদের পূর্ব দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ‘যদি হাভানার আলোর আভা আর দেখতে না পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমরা আরও পুবে সরে যাচ্ছি,’ ও ভাবল, ‘কারণ মাছটা যেভাবে যেদিকে যাচ্ছে, তেমনই যদি চলতে থাকে, তাহলে আরো অনেক ঘণ্টা হাভানার আলোর আভা দেখা যাবে।’ ও ভাবছে, ‘আজকের বেসবল গ্র্যান্ড লিগে কে কেমন খেলল কে জানে। একটা রেডিও থাকলে ভালো হতো।’ তারপরেই ভাবল, ‘আমায় যা করতে হচ্ছে বা হবে, সেটাই এখন ভাবা উচিত, বোকার মতো কিছু করা উচিত নয়।’
তারপরেই ও জোরে জোরে বলে উঠল, ‘আহা যদি ছেলেটা আমার সঙ্গে থাকত। তাহলে ও এসব দেখতেও পেত। আর আমাকে সাহায্য করতেও পারত।’ ও ভাবল, ‘বুড়ো বয়সে কারোরই একা থাকা উচিত নয়। কিন্তু উপায় নেই।’ তারপরেই ভাবল, ‘যে তুনা মাছটা ধরে রেখেছি, সেটা পচে যাবার আগেই আমার খাওয়া দরকার, কারণ আমার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। ইচ্ছা না থাকলেও কাল সকালেই ওটা আমায় মনে করে খেতে হবে।’ ও নিজেকে বলল, ‘মনে রেখ।’
রাত্রে কোনো এক সময়ে দুটো সামুদ্রিক কচ্ছপ নৌকার পাশে এসে জলে ওলট-পালট খেতে লাগল আর কচ্ছপটার ভারী শব্দ করতে লাগল। পুরুষ কচ্ছপটার ভারী শব্দ আর মাদি কচ্ছপটার শ্বাস ফেলার মতো শব্দের তফাৎ ও ঠিক ধরতে পারল।
ও বলল, ‘এগুলো বেশ মজার। এরা খেলা করে, একে অপরকে ভালোওবাসে। উড়ুক্কু মাছেদের মতো এরাও আমাদের বন্ধু।’
তারপরেই ওর বড়শিতে গেঁথে যাওয়া বিশাল মাছটার প্রতি করুণা হল। ও ভাবল, মাছটা অপূর্ব, অদ্ভুত, কত বয়স কে জানে। এর আগে কখনও এ রকম শক্তিশালী মাছ আমি ধরিনি আর মাছটার চাল-চলনও কেমন অদ্ভুত। লাফিয়ে জলের ওপর উঠে পড়বার মতো বোকা বোধহয় ও নয়। কিন্তু একবার যদি ও সত্যিই লাফায় অথবা হঠাৎ প্ৰচণ্ড বেগে টান শুরু করে, তাহলে আমি গেলাম। তবে মনে হয় ও আগেও অনেকবার বড়শি গিলেছে আর তাই ও জানে যে, এইভাবেই লড়াইটা চালাতে হবে। ও তো জানে না যে, মাত্র একটাই লোক, তাও একটা বুড়ো লোক ওর সঙ্গে লড়ছে। যাই হোক, মাছটা কি প্রকাণ্ড, আর বাজারে ওর মাংস কি দামেই যে বিকোবে। ও ঠিক পুরুষ মাছ, কারণ ওর টোপ গেলা আর এই সুতো টেনে নিয়ে চলা, সব পুরুষ মাছের মতোই। ওর লড়াইয়ে কোনো ভয়ডরের ব্যাপারে নেই। বুঝতে পারছি না, ওর মাথায় কি কোনো মতলব খেলছে, নাকি আমার মতোই ও-ও মরিয়া?’
ওর মনে পড়ে যায়, একবার যখন ও এক জোড়া মার্লিনের একটাকে বড়শিতে গেঁথেছিল। পুরুষ মাছ সব সময় মাদি মাছকে আগে টোপ খেতে দেয় আর তাই মাদি মাছটা বড়শি সুদ্ধ টোপ গিলে যন্ত্রণায় ভয়ে দিশেহারা হয়ে প্রচণ্ড টানাটানি করে লড়াই করতে শুরু করেছিল আর খানিকক্ষণের মধ্যেই হাঁপিয়ে পড়েছিল। আর সারাক্ষণ পুরুষ মাছটা মাদিটার সঙ্গে প্রায় সেটে থেকে সুতোটার চারপাশে ঘুরছিল, এমন কি জলের ওপর ভেসে উঠেও। পুরুষ মাছটার লেজটা একটা কাস্তের মতো দেখতে আর কাস্তের মতোই ধারালো। বুড়ো তো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল যে, ওই ধারালো লেজের ঝাপটায় সুতোটা না কচ করে কেটে যায়। যখন বুড়ো মাছটাকে বর্শা দিয়ে গাঁথল আর ওর শিরীষ কাগজের মতো খসখসে ঠোঁট দুটো চেপে ধরে ডাণ্ডা দিয়ে মাথায় মেরে মেরে প্রায় আয়নার পেছন দিকের রঙের মতো করে তুলল আর শেষ পর্যন্ত ছেলেটার সাহায্যে মাছটাকে নৌকার ওপর তুলে ফেলল, তখনও পুরুষ মাছটা নৌকার পাশে পাশেই ঘুরছে। তারপর যখন সুতোটুতো গুটিয়ে বুড়ো হারপুনটা নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে, তখন পুরুষ মাছটা নৌকার পাশেই একটা বিরাট লাফ দিয়ে উঁচুতে উঠে মাদি মাছটা কোথায় রয়েছে দেখে ছিল, আর তারপরই ওর বুকের দুপাশের ফিকে নীল পাখনা দুটো ছড়িয়ে, ওর দেহের সব ফিকে নীল রেখাগুলো দৃশ্যমান করে জলের অনেক গভীরে ডুব দিল। বুড়ো ভাবে, কী অপূর্ব সুন্দর মাছটা, আর ও কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকেছিল। আমি আর কখনও ওদের ভালবাসার এই রকম হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখিনি। ছেলেটাও খুব কষ্ট পেয়েছিল। আমরা মাছটার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম আর খুব তাড়াতাড়িই মাদি মাছটাকে সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলাম।
‘ছেলেটা যদি আমার সঙ্গে থাকতো’,- বুড়ো স্বগতোক্তি করে উঠল। তারপর গলুইয়ের গোলাকার তক্তার ওপর ঠিক মতো ঠেসান দিয়ে বসে, কাঁধের ওপর দিয়ে টেনে ধরে রাখা সুতোয় ঐ বিশাল মাছের শক্তিশালী টানে নৌকার অবিরাম গতি টের পেতে পেতে বুড়ো ভাবল, মাছটা যে কোনদিকে যাচ্ছে কে জানে!
‘মাছটার ইচ্ছার বিরদ্ধে ওকে ঠকিয়ে লোভ দেখিয়ে, টোপ গিলতে বাধ্য করেছি,’ বুড়ো ভাবে। ‘মাছটার ইচ্ছা ছিল অন্ধকার গভীর জলের আরো গভীরে যেখানে কোনো ফাঁদ নেই, জাল নেই, বড়শি নেই, কোনো প্রতারণা নেই, সেখানে অবাধ স্বাধীন বিচরণ করার, আর আমার ইচ্ছা ছিল সেইখানে গিয়ে ওকে খুঁজে বার করার, পৃথিবীর সমস্ত মানুষের আয়ত্তের বাইরে গিয়ে ওকে ধরার। আর এখন সেই দুপুর বেলা থেকে আমরা দুজন একে অপরের সঙ্গে আটকে গেছি, আর আমাদের দুজনকেই সাহায্য করার কেউ নেই।
বোধহয় আমার মেছুড়ে হওয়াটা উচিত হয়নি। কিন্তু এ জন্যই তো আমি জন্মেছি, আর এই আমাকে করতে হবে। ভোরের আলো ফোটার পরেই তুনা মাছটা খেয়ে নেবার কথা মনে রাখতে হবে।
ভোর হবার কিছু আগেই বুড়োর নৌকার পেছনদিকের একটা টোপ কোনোমাছ খেল। ও ছিপটা মট করে ভাঙার শব্দ টের পেল আর সুতোটা নৌকার ধারের তক্তার ওপর দিয়ে হুড়হুড় করে বেরিয়ে যেতে লাগল। অন্ধকারেই ও খাপ থেকে ছুরিটা বের করে পেছন দিকে ঝুঁকে পড়ল আর বাঁ কাঁধের ওপর বিশাল মাছটার সুতোর সমস্ত টান সামলে তক্তার ওপর দিয়ে দ্বিতীয় সুতেটা কেটে দিল। তারপরে ও ওর হাতের কাছে অন্য ফেলে রাখা সুতোটাও কেটে দিল আর সেগুলোর জন্যে রাখা অতিরিক্ত সুতোর বান্ডিলগুলো অন্ধকারেই গিট দিয়ে তৈরি করে রাখল। ও একহাত দিয়েই খুব কৌশলে কাজটা করছিল আর পা দিয়ে সুতো চেপে ধরে শক্ত করে গিটগুলো দিচ্ছিল। এখন ওর মোট ছটা অতিরিক্ত সুতোর বান্ডিল প্রস্তুত রইল। যে দুটো টোপ-ওয়ালা বড়শি ও কেটে ফেলে দিল, সেগুলোর দুটো দুটো চারটে, আর মাছটা যে টোপটা গিলে টেনে নিয়ে চলেছে, তার দুটো, মোট ছটা সুতোর বান্ডিল একসঙ্গে গিট দিয়ে রাখা হল।
‘আলো ফুটলে, আশিগজ তলায় যে টোপটা ঝুলিয়ে রাখা আছে, সেটার কাছে গিয়ে সেটাও কেটে ফেলতে হবে আর সেটার দরুন রাখা দুটো অতিরিক্তসুতোর বান্ডিলও আগের সুতোর সঙ্গে জুড়তে হবে,’ ও ভাবল। ‘তার মানে আমার মোট চারশ গজ ভালো ‘কাতালান’ সুতো আর তার সাথে বড়শি, সিসে ইত্যাদি নষ্ট হবে। তবে এ সব তো আবার কেনা যাবে। কিন্তু অন্য কোনো মাছ যদি আমার অন্য বড়শির টোপ খেত আর তার টানাটানিতে যদি আমার এই বড় মাছটার সুতো কেটে যেত, তাহলে এই বড় মাছটাকে কি আর পাওয়া যেত; যে মাছটা এই মাত্র অন্য টোপটা গিলেছিল, সেটা কী মাছ আমি জানি না। সেটা একটা মার্লিন হতে পারে অথবা ব্রডবিল কিংবা হাঙরও হতে পারে। অবশ্য ওটার কোনো টান বুঝবার আগেই তো আমি তাড়াতাড়ি সুতো কেটে দিলাম।’
ও আবার বলে উঠল, ‘যদি ছেলেটা আমার সঙ্গে থাকতো।’
কিন্তু আবার ও ভাবে, ‘তোমার সঙ্গে তো ছেলেটা নেই, এখন তোমার তুমিই আছ। কাজেই অন্ধকার থাকুক বা নাই থাকুক, তাড়াতাড়ি পেছন দিকে গিয়ে শেষ ফেলে রাখা সুতোটা কেটে ফেল আর অতিরিক্ত সুতোর বান্ডিলগুলো জুড়ে নাও।’
ও তাই করল। অন্ধকারের মধ্যে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল আর ঠিক সেই সময় মাছটা একটা এমন হ্যাঁচকা টান মারল, যে ও হুমড়ি খেয়ে মুখ থুবড়ে নৌকার ভেতর পড়ল আর কাঠে লেগে ওর চোখের নিচে কেটে গিয়ে গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। তবে রক্তটা চিবুক অবধি নামার আগেই শুকিয়ে জমে গেল আর ও কোনো রকমে গলুইর দিকে সরে এসে তক্তায় ঠেসান দিয়ে বসে বিশ্রাম নিতে লাগল। ও এরপর কাঁধের ওপরের বস্তাটা আস্তে আস্তে এমনভাবে সরালো যাতে টানটান সুতোটা ওর কাঁধের অন্য জায়গার ওপর সরে যায় আর কাঁধের ওপর সুতোটা রেখেই ও খুব সাবধানে হাত দিয়ে মাছের টানটা আর জলের ওপর নৌকার গতিবেগটা বুঝবার চেষ্টা করল।
বুড়ো ভাবে, ‘মাছটা ও রকম হঠাৎ একটা ঝাপটা মারল কেন? ওর পাহাড়ের মতো উঁচু পিঠটার ওপর নিশ্চয়ই বড়শির সঙ্গে লাগানো তারটার ঘষা খেয়েছে। তা হলেও আমার পিঠের যে যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা, ওর পিঠের অবস্থা নিশ্চয়ই এত খারাপ নয়। কিন্তু ও যত বিশালই হোক, এই নৌকাটাকে তো চিরকাল টেনে নিয়ে চলতে পারে না। আমার তরফে তো এখন সব পরিষ্কার করে রেখেছি, যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি হতে না পারে আর এখন তো আমার হাতে প্রচুর অতিরিক্ত সুতো রয়েছে, একটা মানুষ এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারে?
ও নরম স্বরে বলে উঠল, ‘মাছ, আমি না মরা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আছি।’ ‘ও-ও আমার সঙ্গেই থাকবে মনে হয়’, বুড়ো ভাবল। আর আকাশে আলো ফোটার অপেক্ষা করতে লাগল। এই সময়টাতে বেশ ঠাণ্ডা আর শরীর গরম রাখার জন্য ও কাঠের সঙ্গে গা ঠেসে রাখল। ‘ও যতক্ষণ পারবে, আমিও ততক্ষণ পারব’, বুড়ো ভাবে। আলো ফুটলে দেখা গেল, সুতোটা লম্বালম্বি সোজা জলের ভেতর নেমে গেছে। নৌকা একভাবে চলেছে আর যখন সূর্যের একটুখানি জলের ওপরে উঠল, তখন ওটা বুড়োর ডান কাঁধের ওপর।
‘তার মানে মাছটা উত্তর দিকে যাচ্ছে’ বুড়ো বলে উঠল। ‘সমুদ্রের স্রোতের অনুকূলে গেলে আমরা তো পূব দিকে যেতাম,’ বুড়ো ভাবে, ‘আমি চাই মাছটা স্রোতের দিকে ঘুরে স্রোতের টানে চলুক, তাহলে অন্তত বুঝতে পারব যে, ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।’
উঠল, বুড়ো বুঝতে পারল, যে মাছটা মোটেই ক্লান্ত হয়নি। একটা কেবল ভালো লক্ষণ দেখা গেল, কারণ সুতোর বাঁক দেখে বোঝা যাচ্ছে, মাছটা জলের তলায় ওপরের দিকে উঠে এসেছে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে, মাছটা আবার লাফ দেবে। তবে বলা যায় না, দিতেও পারে।
‘ভগবান, ও যেন লাফ দেয়’, বুড়ো বলে উঠল। ‘ওকে কব্জা করার জন্যে আমার যথেষ্ট সুতো আছে!’
বুড়ো ভাবে, ‘যদি আমি সুতোটা বেশি টেনে ধরি, তাহলে ওর মুখে বেশি যন্ত্রণা হবে, আর তা হলে হয়তো ও লাফ দিতেও পারে। এখন তো দিনের বেলা ও একটা লাফ দিক না, তাহলে ওর পিঠের মেরুদণ্ডের দুপাশের থলিগুলো হাওয়ায় ভরে যাবে আর তখন ও সুমদ্রের গভীর তলদেশে গিয়ে মরতে পারবে না।’ ও টানটা বাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মাছটা টোপ গেলার পর থেকেই সুতোটা এত টানটান হয়ে আছে যে, আর বেশি টানতে গেলেই সুতো ছিঁড়ে যাবে। ও পেছনে ঝুঁকে টানটা বাড়ানোর চেষ্টা করতেই সুতোর খরখরে চাপটা টের পেল আর বুঝল, আর বেশি টান দেওয়া সম্ভবই নয়। ও ভাবে, আমি একদম হ্যাচকা টান দেব না। কারণ প্রতিটি হ্যাচকা টানে ওর মুখে যেখানে বড়শিটা গিঁথে আছে, সে জায়গাটা আরও বেশি কেটে ফাঁক হয়ে যাবে, আর তাহলেই ও যখন লাফ দেবে, তখন মুখ থেকে বড়শিটা খুলেও ফেলতে পারে। যাই হোক, এখন সূর্য উঠেছে, আর আমাকেও সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে না। তাই আমার ভালো লাগছে।’
সুতোটাতে হলদে হলদে জলজ শ্যাওলা জড়িয়ে রয়েছে আর বুড়ো জানে, এতে সুতোর টানটা আর একটু বাড়বে। তাই ও খুশি। এই হলদে রঙ-এর আগাছাগুলোই রাত্রে এত জ্বলজ্বল করছিল।
‘মাছ, আমি তোমাকে ভালবাসি আর খুব শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আজ দিন শেষ হবার আগেই আমার হাতে তোমার মৃত্যু’, বুড়ো বলল। তারপরেই ভাবল, আশা করতে ক্ষতি কি?
উত্তর দিক থেকে একটা ছোট্ট পাখি নৌকার দিকে উড়ে এল। এটা একটা ওয়ার্বলার পাখি আর জলের ওপর খুব নিচে দিয়ে উড়ে আসছে। বুড়ো দেখল, পাখিটা খুব ক্লান্ত।
পাখিটা নৌকার পাছ-গলুইয়ে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল। তারপর বুড়োর মাথার চারপাশে একচক্কর উড়ে শেষ পর্যন্ত বুড়োর কাঁধের ওপর দিয়ে টান টান সুতোর ওপরে বেশ আরাম করে বসল। বুড়ো পাখিটাকে শুধোয়, কত বয়েসরে তোর? এটাই কি তোর প্রথম যাত্রা?’
ও যখন কথা বলছিল, পাখিটা ওর দিকে তাকিয়েছিল। পাখিটা এতই ক্লান্ত ছিল যে, সুতোটা ভালো করে না দেখেই ওর সরু সরু পা দিয়ে কোনো রকমে সুতোটা শক্ত করে ধরে নড়বড় করছিল।
বুড়ো ওকে বলে, ‘সুতোটা বেশ শক্ত আর টানটান আছে। একটা রাত্তির বাতাস বয়নি, তাতে তো এত পরিশ্রান্ত হওয়ার কথা নয়। পাখিদের সব কী হচ্ছে?
‘বাজপাখিগুলো ওদের কাছে এতদূর সমুদ্রেও উড়ে আসে’, বুড়ো ভাবে, কিন্তু পাখিটাকে এসব কথা বলে না, কেননা, পাখিটা তো ওর কথা বুঝতে পারছে না আর তাছাড়া ও নিজে নিজেই খুব শিগগিরই বাজপাখি যে কী জিনিস, তা জেনে যাবে।
ও বলে ওঠে, ‘ছোট্ট পাখি, ভালো করে বিশ্রাম নিয়ে নে। তারপর ঝুঁকি নিয়ে উড়ে যা, অন্য মানুষ, পাখি বা মাছেরাও তো তাই করে।’
রাত্তিরে বুড়োর পিঠের মাংশপেশী শক্ত জমাট হয়ে গেছে আর বেশ ভালোই ব্যথা করছে, তাই বুড়ো কথা বলে নিজেকে অন্যমনস্ক করতে চাইছিল।
‘পাখি, তুই আমার বাসায় আমার কাছেই থাক,’ বুড়ো বলল, ‘খুব খারাপ লাগছে আমি পালটা খাটাতে পারছি না আর তোকেও, যে হাল্কা হাওয়া উঠেছে, তার কোনো সুবিধা দিতে পারছি না। কিন্তু তুই তো আমার বন্ধু।’
ঠিক সেই সময় মাছটা এমন একটা ঝটকা মারল, যে টানের চোটে বুড়ো গলুইয়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল আর নৌকা থেকে প্রায় জলেই পড়ে যাচ্ছিল। কোনো রকমে টাল সামলে আর খানিকটা সুতো ছেড়ে বুড়ো এ যাত্রা রক্ষা পেল।
সুতোটায় ঝটকা লাগতেই পাখিটা উড়ে গেছিল, সেটা বুড়ো খেয়ালই করেনি। ওর সাবধানে ডান হাত দিয়ে সুতোটা ঠিক আছে কিনা দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করল, ও হাত থেকে রক্ত ঝরছে।
‘নিশ্চয়ই মাছটার আঘাত লেগেছে;- বুড়ো বলে উঠল আর সুতোটা টানবার চেষ্টা করল, যাতে মাছটাকে ঘোরানো যায়। কিন্তু সুতো যখন টান টান হয়ে ছিঁড়বার উপক্রম করছে, তখন ও আবার একটু ঢিল দিল আর সুতোটার স্বাভাবিক টান টানভাব বজায় রেখে স্থির হয়ে বসল।
‘মাছ, তোমার এখন খুব কষ্ট বোধ হচ্ছে, আর ভগবান জানেন, আমার অবস্থাও তোমার মতো।’- ও বলে উঠল। তারপর চারিদিকে তাকিয়ে ছোট পাখিটাকে খুঁজল, কারণ ওর পাখিটাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে ভালোই লাগছিল। কিন্তু পাখিটা উড়ে গেছে।
ও ভাবল, ‘তুই আমার কাছে বেশিক্ষণ থাকলি না। কিন্তু ডাঙায় না পৌঁছানো পর্যন্ত তোকে খুব কষ্ট করতে হবে।’ তারপরেই ভাবল, ‘মাছটার ঐ হঠাৎ ঝটকায় আমার হাত কেটে গেল? আমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাচ্ছে। কিংবা হয়তো আমি ঐ ছোট পাখিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর ওর কথাই ভাবছিলাম, আর তাই অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। এখন আমার আসল কাজের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর তার জন্যে আমার তুনা মাছটা খাওয়া অবশ্যই দরকার। যাতে আমার শক্তি সঞ্চার হয়।’
ও বলে উঠল, ‘যদি ছেলেটা এখন আমার কাছে থাকত। আর সঙ্গে যদি একটু লবণ থাকত।’
খুব সাবধানে সুতোর ওজনকে বাঁ কাঁধের ওপর সরিয়ে আর হাঁটু মুড়ে বসে ও সমুদ্রের জলে ডান হাতটাকে মিনিটখানেক ডুবিয়ে রাখল, আর হাতটাকে ধুয়ে নিল। ও দেখল,নৌকা চলছে, আর সাথে সাথে জলের স্রোতের টানে উল্টোদিকে ওর হাতের রক্ত ধীরে ধীরে বেয়ে চলেছে। ও বলল, ‘মনে হচ্ছে, মাছটার চলার বেগ কমে এসেছে।’
বুড়োর ইচ্ছা ছিল কাটা হাতটাকে নোনা জলের ভেতর আরও কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখে কিন্তু ভয় হলো, যদি মাছটা হঠাৎ আর একটা ঝটকা টান মারে তাই ও এবার দাঁড়িয়ে উঠল, আর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে হাতটাকে রোদের দিকে ধরে রইল। সুতোর টানে ওর হাতের তালুর মাংস লম্বালম্বিভাবে কেটে গেছে। তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না, যদি না হাতের কাজ করার জায়গাটা কেটে যেত। এই মাছটাকে কব্জা করতে হলে ওর ডান হাতটাকে ব্যবহার করতেই হবে আর তাই ব্যাপারটা শেষ হবার আগেই ওর হাতটা কেটে যাওয়াতে ও মোটেই খুশি নয়।
হাতটা রোদে শুকিয়ে যাবার পর বুড়ো বলল, ‘এখন ওই ছোট তুনা মাছটাকে অবশ্যই খেতে হবে। হুকটা দিয়ে ওটাকে এখানে টেনে নিয়ে এসে আরামসে খাওয়া যাবে।’
ও হাঁটু মুড়ে বসে, পাছ গলুইয়ের তক্তার নিচ থেকে তুনা মাছটাকে টেনে বার করে সুতোর বান্ডিলগুলোর পাশ দিয়ে সাবধানে নিজের দিকে টেনে আনলো। তারপর আবার সুতোর টান বাঁ কাঁধের ওপর রেখে বাঁ হাত দিয়ে পুরো টানটা সামলে রেখে, ও ডান হাতের হুক থেকে তুনা মাছটাকে ছাড়িয়ে নিল, তারপরেই হুকটাকে জায়গামতো রেখে দিল। এবার একটা হাঁটু দিয়ে মাছটাকে চেপে ধরে মাছটার মাথার পেছন দিক থেকে লেজ পর্যন্ত আর মেরুদণ্ড থেকে পেটের ধার পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে ফালা করে কাটল। ছটা গাঢ় লাল মাংসের ফালি কাটার পর ওগুলোকে গলুইয়ের তক্তার ওপর বিছিয়ে রাখল, তারপর ছুরিটাকে প্যান্টে মুছে নিয়ে বাকি মাছটার লেজ ধরে নৌকার বাইরে জলে ফেলে দিল।
‘পুরো মাছটা খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়’ ও বলল আর ছুরি দিয়ে একটা ফালি আধখানা করে কাটল। এদিকে সুতোটার একই রকম শক্ত টান ধরে রাখতে আর সামাল দিতে দিতে ওর বাঁ হাতটার মাংসপেশী শক্ত হয়ে গেছে। ঐ মোটা সুতোটা বাঁ হাত অস্বাভাবিক শক্ত করে ধরে আছে দেখে ও ভীষণ বিরক্ত হল।
কি ধরনের হাত এটা?’- ও বলে উঠল, ‘ইচ্ছে হলে শক্ত হও, ক্র্যাম্প ধরুক, থাবার মতো হয়ে যাও, তাতে তোমার মোটেই ভালো হবে না।’
টানটান তীর্যকভাবে জলের ভেতর ঢুকে যাওয়া সুতোটার দিকে তাকিয়ে ও ভাবল, ঠিক আছে, এবার খাওয়া যাক। তাহলে হাতটা জোর পাবে। হাতটার আর কি দোষ, কত ঘণ্টা ধরে মাছটার টান সহ্য করতে হচ্ছে, ভাব তো? কিন্তু চিরটাকাল তো মাছটার সাথে এইভাবে থাকা যাবে না; যাক, এখন খাওয়া যাক।
মাছটার একটা টুকরো নিয়ে মুখের মধ্যে ফেলে ও ধীরে ধীরে চিবোতে লাগল। স্বাদটা খারাপ নয়।
ও ভাবে, ‘ভালো করে চিবোও যাতে পুরো রসটা পাও। একটু লেবুর রস অথবা একটু নুন দিয়ে খেলে অবশ্য খারাপ লাগত না?’
‘হাত, এখন তোমার কেমন বোধ হচ্ছে? বুড়ো শক্ত জমে যাওয়া ক্র্যাম্প ধরা হাতটাকে জিজ্ঞেস করল। মরার পর একটা দেহ যেমন রাইগর মর্টিসে শক্ত হয়ে যায়, হাতটা তেমনই শক্ত হয়ে গেছে। আমি তোমার জন্য আরো খানিকটা খাব।’ বুড়ো বলল।
দু’টুকরো করে কাটা ফালিটার বাকি অর্ধেক ও এবার খেল। ও খুব সাবধানে চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে, চামড়াটুকু মুখ থেকে ফেলে দিল।
‘হাত, এখন কেমন লাগছে? নাকি, এত তাড়াতাড়ি কিছু বোঝা যাবে না?
আরেকটা আস্ত মাংসের ফালি নিয়ে ও চিবোতে লাগল। ও ভাবল, ‘ভুনা মাছটা বেশ শক্তপোক্ত স্বাস্থ্যবান ছিল। ভাগ্য ভালো, যে আমি এই মাছটাকেই ধরেছি, ডলফিন ধরিনি। ডলফিনের মাংস বড্ড মিষ্টি। এই মাংসটা মোটেই মিষ্টি মিষ্টি নয় আর মাছটার সমস্ত শক্তি এই মাংসের টুকরোগুলোর মধ্যে এখনও রয়েছে।’ ও ভাবে, ‘বাস্তববাদী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। একটু নুন পেলে ভালোই হোত। আর এই রোদে মাছটার বাকি অংশটা পচে যাবে, না শুকিয়ে যাবে, জানি না। তার চেয়ে পুরোটা খেয়ে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ, যদিও আমার এখন খিদেই নেই। বড় মাছটা তো একভাবে চুপচাপ টেনে নিয়ে চলেছে। তাহলে এখন বাকি মাছটুকু খেয়ে নিই আর নিজেকে তৈরি রাখি।’ ও বলল, ‘হাত, একটু ধৈর্য ধর। তোমার জন্যেই এটা করতে হচ্ছে’। তারপর ভাবল, ‘ঐ বিশাল মাছটাকেও যদি কিছু খাওয়াতে পারতাম। ও তো আমার ভাই-এর মতো। কিন্তু ওকে মারতে হলে আমাকে গায়ে জোর করতেই হবে।’ খুব সচেতনভাবে আস্তে আস্তে চিবিয়ে চিবিয়ে ও সব কটা মাংসের ফালি খেয়ে ফেলল।
প্যান্টে হাতটা মুছে নিয়ে ও সোজা হল।
‘হাত, এখন তুমি সুতোটা ছেড়ে দিতে পার। যতক্ষণ না তুমি এই সভ্যতা বন্ধ করছ, আমি কেবল ডান হাত দিয়েই মাছটাকে সামলাব।’ বুড়ো বলে উঠল। তারপর বাঁ হাত পা দিয়ে ধরা ওই মোটা শক্ত সুতোটা বাঁ পা দিয়ে চেপে ধরে পিঠের ওপর মাছের টানটা রেখে বসে পড়ল।
ও বলল, ‘ঈশ্বর, বাঁ হাতের এই ক্র্যাম্পটা সারাতে সাহায্য কর, কারণ মাছটা যে কখন কী বসে, জানি না।’
‘কিন্তু মাছটা তো বেশ ঠাণ্ডা মাথায় একটি পরিকল্পনা অনুযায়ী সাঁতরে চলেছে,’ ও ভাবে, ‘কিন্তু ওর পরিকল্পনাটা কী? আর আমার পরিল্পনাই বা কি? ওর বিশালত্বের জন্যেই ওর পরিকল্পনার চাইতে আমারটা আরও ভালো করতে হবে। যদি ও লাফ দেয়, তাহলে ওকে মারতে আমার সুবিধা হয়। কিন্তু ও যদি বরাবর এইরকম জলের তলায় থেকে যায় তাহলে আমাকেও বরাবরের জন্যে ওর সঙ্গেই থেকে যেতে হবে।’
ও প্যান্টে ঘষে ঘষে শক্ত জমাট বাঁধা বাঁ হাতটার আঙুলগুলো নরম করে খুলবার চেষ্টা করল। কিন্তু আঙুলগুলো খুলছেই না। ‘হয়তো রোদের গরমে আঙুলগুলো খুলে যাবে। হয়তো যে তেজালো মাছটা আমি খেলাম, সেটা হজম হয়ে গেলে, আঙুলগুলো খুলে যাবে। যে মূল্যেই হোক না কেন, হাতটাকে আমাকে খুলতেই হবে। কিন্তু এক্ষুনি গায়ের জোরে এটাকে খুলতে চাই না। ও নিজের থেকেই খুলে যাক, আর নিজে নিজেই নরম হয়ে যাক। কেননা, রাত্রে যখন আমি সব সুতোর বান্ডিলগুলোকে খোলা, গিট দেওয়া এই সব করছিলাম, তখন এই বাঁ হাতটা দিয়ে ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলাম না বলে, ওটাকে আমি খুব গালাগাল দিয়েছি।’ ও সমুদ্রের চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এখন ও কত একা। কিন্তু সমুদ্রের অন্ধকার গভীরে রোদের আলোর সাতরঙা বিচ্ছুরণ, শান্ত সমুদ্রের জলের অসমান ঢেউ এর দোলা আর সুতোটা সামনের দিকে সোজা জলে নেমে গেছে, এগুলো ও দেখতে পাচ্ছিল। আকাশে মেঘগুলোর জড় হওয়া দেখে ও বুঝতে পারল, এখন বাণিজ্য বায়ু বইবার সময় হচ্ছে আর সোজা সামনে তাকিয়ে দেখল এক ঝাঁক বুনো হাস আকাশের পটভূমিতে নিজেদের ছবি এঁকে জলের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে, কখনও ঝাপসা, আবার দৃশ্যমান, আর ও বুঝলো যে সমুদ্রে কোনো মানুষ কখনও একা হতে পারে না।
ও ভাবে, ছোট নৌকায় চেপে গভীর সমুদ্রে গেলে যখন ডাঙা দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে যায়, তখন কত লোক ভয় পায় আর ও জানে যে, যে মাসে আবহাওয়া হঠাৎ প্রতিকূল হয়ে ওঠে তখন ভয় পাওয়াটা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এখন তো সেই মাস নয় যখন প্রবল ঝড় ওঠে আর এই সব মাসে যখন ঝড় ওঠে না, তখনকার আবাহওয়া বছরের সেরা।
‘যদি তুমি সমুদ্রে থাকো, তাহলে কয়েকদিন আগে থেকেই আকাশে ঝড়ের সঙ্কেত তুমি বুঝতে পারবে। অবশ্য ডাঙায় থাকলে এইসব ঝড়ের সঙ্কেত তুমি দেখতেই পাবে না। কারণ কী দেখে এসব বোঝা যাবে, তাই তুমি জানো না। তাছাড়া ডাঙায় মেঘের চেহারা অন্যরকম, তাই প্রভেদ ঘটায়। এখন কিন্তু কোনো ঝড় আসবে না।’ ও ভাবে।
ও আকাশে তাকিয়ে দেখল সাদা পুঞ্জমেঘ আইসক্রীমের গাদার মতো দেখাচ্ছে আর সেপ্টেম্বর মাসের খোলা আকাশে আরও ওপরে হাল্কা সাদা পালকের মতো কুঞ্চিত মেঘ দেখা যাচ্ছে।
ও বলল, ‘আমার জন্যে তোমার চেয়ে ভালো আবহাওয়া পেয়েছি, মাছ।’ ওর বাঁ হাত এখনও জমাট বেঁধে আছে, কিন্তু ও ধীরে ধীরে হাতটা নরম করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ও ভাবে, ‘আমি শরীরে কোথাও টান ধরা একদম পছন্দ করি না। এটা শরীরের বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছু নয়। খাবারে বিষক্রিয়ার দরুন পেট খারাপ হলে অথবা বমি হলে অপরের সামনে সেটা লজ্জাদায়ক। কিন্তু মানুষের শরীরে কোথাও যখন মাংসপেশীতে টান ধরে, সেটা নিজের কাছেই অপমানজনক, বিশেষ করে যদি সে একা থাকে।
‘যদি ছেলেটা এখন আমার সঙ্গে থাকত, তাহলে ও আমার বাঁ হাতটাকে ডলে দিলে মাংসপেশীগুলো আলগা করে দিতে পারত’– ও ভাবে। অবশ্য টানটা নিজে থেকেই ঢিলা হয়ে যাবে।
তারপর ডান হাত দিয়ে ও সুতোর টানটা অনুভব করে বুঝতে পারল, একটু অন্যরকম লাগছে। তারপরেই দেখল যেখানে সুতোটা জলে ঢুকেছে, সেখানেও একটু পরিবর্তন এসেছে। তারপর সুতোটা টেনে ধরে ও যখন বাঁ হাতটা নিজের ঊরুর ওপর দ্রুত খুব জোরে জোরে মেরে হাতটাকে ঢিলা করার চেষ্টা করছিল, তখন দেখল, সুতোটা ধীরে ধীরে জলের ওপর দিকে উঠছে।
ও বলল, ‘ও এবার উঠছে। হাত, শিগগিরই ঠিক হয়ে যাও।’ সুতো একভাবে ধীরে ধীরে ওপর দিকে উঠতেই লাগল আর নৌকার সামনের দিকে সমুদ্রের জল ফুলে ফেঁপে উঠল আর মাছটা জলের ওপর উঠে এল। মাছটা জলের ওপর ক্রমাগত উঠছেই, যেন শেষই হয় না, ওর শরীরের দুপাশ থেকে জল ঝরে পড়ছে। রোদে চকচক করছে ওর শরীর, ওর মাথাটা আর পিঠটা ঘন নীলাভ লাল আর ওর দু’পাশের দাগগুলো সূর্যের আলোয় চওড়া আর হাল্কা লালচে নীল দেখাচ্ছে। ওর মুখের ছুরিটা একটা বেসবলের ব্যাটের মতো লম্বা আর সরু তলোয়ারের ডগার মতো বাঁকানো। পুরো শরীরটা জলের সম্পূর্ণ ওপরে উঠিয়ে ও ফের মসৃণভাবে ওস্তাদ ডুবুরের মতো জলে ঝাঁপ খেয়ে গভীরে চলে গেল আর যাবার সময় ওর বিশাল কাস্তের মতো লেজটা বুড়ো দেখতে পেল। সুতোটা তখন হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে।
‘আমার নৌকাটার চাইতে ও আরো দু’ফুট বেশি লম্বা’- বুড়ো বলল। সুতোটা অবিরাম দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বোঝা গেল মাছটা ভয় পায়নি। বুড়ো দু’হাত দিয়ে সুতোটা ধরে টান ধরে রাখতে চাইল ঠিক ছিঁড়ে যাওয়ার আগের পর্যায়ে। ও বুঝতে পারছে যে, যদি সুতোর ওপর ঠিকমতো চাপ রেখে মাছটার গতি শ্লথ না করা যায়, তাহলে মাছটা পুরো সুতো টেনে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে পারে।
‘ও একটা অসাধারণ মাছ, আর আমাকে ওর বিশ্বাস উৎপাদন করতেই হবে।’ ও ভাবে, ‘ও যে কী ক্ষমতার অধিকারী, আর একবার সুতো নিয়ে সত্যিকার দৌড় দিলে ও যে কী করতে পারে, সেটা ওকে জানতে দিলে চলবে না। আমি যদি ওর জায়গায় হতাম, তাহলে আমি এতক্ষণে পুরো শক্তি প্রয়োগ করে দৌড় লাগাতাম, যতক্ষণ না সুতো কেটে বেরিয়ে যেতে পারি। ভগবানকে ধন্যবাদ, আমরা যারা ওদেরকে মারি, সেই আমাদের মতো বুদ্ধি ওদের নেই। ওরা আমাদের চেয়ে যদিও মহানও বটে, সমর্থও।
