দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ৪
বুড়ো অনেক বিশাল মাছ দেখেছে। ও এমন অনেক মাছ দেখেছে, যাদের ওজন পাঁচশ কিলোগ্রামের চাইতেও বেশি আর ও নিজের জীবনে দুটো এই ওজনের বিশাল মাছ ধরেছে, কিন্তু কোনো সময়েই ও এ রকম একেবারে একা ছিল না। এখন একেবারে একা, নিঃসঙ্গ, ডাঙা থেকে বহু দূরে গভীর সমুদ্রে ও এমন একটা মাছকে বড়শিতে গেঁথে আটকে গেছে, যে রকম বিশাল মাছ ও আজ পর্যন্ত দেখেনি বা কখনো কোথাও শোনেওনি। অথচ এই রকম সময় ওর বাঁ হাতটা এখনও জমাট শক্ত হয়ে আছে, যে মনে হচ্ছে যেন ঈগল পাখির বাঁকা নখের দৃঢ়মুষ্টি।
‘অবশ্য বাঁ হাতটা আলগা হবেই। আমার ডান হাতকে সাহায্য করার জন্যে ওকে খুলে যেতেই হবে। আমার তো এই তিনজনই আছে, তিন ভাই। মাছটা, আর এই দুটো হাত। তাই ওকে খুলতেই হবে। ওর পক্ষে এই শক্ত হয়ে থাকাটা অত্যন্ত অযোগ্য ব্যাপার। এদিকে মাছটা আবার চলার গতি কমিয়েছে আর আগের মতো ধীর গতিতে যাচ্ছে’, ও ভাবে।
‘ও কেন লাফাল, তাই ভাবছি। মনে হচ্ছে যেন ও যে কত প্ৰকাণ্ড সেটা দেখাবার জন্যই ও লাফ দিয়েছিল। অবশ্য এখন তো আমি জেনে গেলাম,’ বুড়ো ভাবে ‘আমি কী ধরনের মানুষ, সেটা যদি ওকে দেখাতে পারতাম। অবশ্য তাহলে ও আমার টানধরা হাতটা দেখে ফেলত। আমি যা, তার চাইতেও বেশি আমার ক্ষমতা, এটাই ও ভাবুক। আমিও তাহলে সেই রকম হবার চেষ্টা করব। আমার ইচ্ছাশক্তি আর বুদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো ওর যা কিছু ক্ষমতা, সেই সব নিয়ে আমি যদি মাছটা হতাম!
কাঠের তক্তায় ঠেসান দিয়ে ও একটু আরাম করে বসল আর সুতোর ঐ প্রচণ্ড টান সামাল দেবার যত কষ্ট সব চুপচাপ সইতে লাগল। মাছটা সমানে সাঁতরে চলেছে আর কালোজলের ওপর দিয়ে নৌকাটা ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে চলেছে। পুব দিক থেকে হাওয়া বইতে শুরু করল আর সমুদ্রে ছোট ছোট ঢেউল উঠল। ঠিক দুপুর বেলায় ওর বাঁ হাতটা আলগা হয়ে খুলে গেল।
ও ওর বাঁ কাঁধের বস্তার ওপরে টানটান সুতোটাকে একটু সরিয়ে নিল আর বলে উঠল, ‘মাছ, তোমার জন্য একটা খারাপ খবর।’ এত যন্ত্রণা সত্ত্বেও ও এখন একটু আরামে বসেছে যদিও ওর কষ্টের কথা ও মোটেই স্বীকার করবে না।
‘আমি ধার্মিক নই, কিন্তু এই মাছটাকে যাতে ধরতে পারি, তার জন্য আমি দশবার ‘আমাদের পিতা’ আর দশবার ‘হেইল মেরী’ এই স্তোত্রগুলো প্রার্থনা করব আর যদি মাছটাকে শেষ পর্যন্ত ধরি, তাহলে শপথ করছি, আমি ‘ভার্জিন দে কোবরে’তে তীর্থ যাত্রা করব। এটাই আমার শপথ।’ ও যন্ত্রের মতো প্রার্থনার স্তোত্রগুলো আউড়ে যেতে লাগল। কখনও কখনও ওর এত ক্লান্ত লাগছিল, যে স্তোত্রগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মনে এসে যায়। আর প্রার্থনা করতে করতে ও ভাবছিল, ‘আমাদের পিতা’-র চাইতে ‘হেইল মেরী’ আবৃত্তি করা সোজা।
‘হে মাতা মেরী, করুণার প্রতিমূর্তি, ঈশ্বর তোমার সঙ্গে আছেন। সকল নারী জাতির মধ্যে তুমিই আশীর্বাদধন্যা আর তোমার গর্ভের ফল, যিশুও আশীর্বাদধন্য। যে পবিত্র মেরী, ঈশ্বরের মাতা, আমাদের পাপীদের জন্য তুমি এখন, আর আমাদের মরণকালে প্রার্থনা কর। আমেন।’ তারপর ও যোগ করল, ‘আশীর্বাদধন্যা কুমারী মাতা, এই মাছটার মৃত্যুর জন্যও তুমি প্রার্থনা কর, যদিও এই মাছটাও অসাধারণ অপূর্ব।’
প্রার্থনা শেষ হবার পর ওর একটু ভালো লাগল, যদিও ওর শারীরিক কষ্ট আগের চাইতে আরো বেশি হয়ে উঠেছে। ও গলুইয়ের তক্তায় হেলান দিয়ে বসে, যান্ত্রিকভাবে নিজের বাঁ হাতের আঙুলগুলোকে নাড়াতে লাগল।
যদিও অল্পস্বল্প হাওয়া বইছে, কিন্তু রোদের এখন বেশ তেজ। ‘পাছ গলুইয়ে ফেলে রাখা সুতোটাতে নতুন করে টোপ লাগানো দরকার, ‘ ও বলল, ‘যদি মাছটা আরও একটা রাত এভাবে চলতে থাকে, তাহলে আমার কিছু খাবারের সংস্থান করা দরকার। বোতলে জলও তো কমে এসেছে। মনে হচ্ছে এখানে ডলফিন ছাড়া আর কোনোও মাছ পাওয়া যাবে না। তবে টাটকা টাটকা খেয়ে নিলে, ডলফিনও মন্দ না। আজ রাতে যদি একটা উড়ুক্কু মাছ নৌকায় এসে পড়ত। কিন্তু এই মাছেদের আকর্ষণ করার জন্য আমার কাছে তো কোনো আলোরও ব্যবস্থা নেই। উড়ুক্কু মাছ কাঁচা খেতেও অপূর্ব আর ওটাকে কাটাকুটিও করতে হয় না। এখন আমার শক্তি সঞ্চয় করে রাখতে হবে। ভগবান, আমি কি জানতাম যে এই মাছটা এত প্রকাণ্ড হবে। কিন্তু ওর সমস্ত মহানতা, সমস্ত গৌরব সত্ত্বেও ওকে আমার হাতে মরতেই হবে।’
আবার ভালো, ‘অবশ্য এটা অন্যায় হবে। কিন্তু ওকে দেখাতেই হবে, একটা মানুষ কী করতে পারে, আর কত সহ্য করতে পারে।’
‘ছেলেটাকে তো বলেইছিলাম, আমি একটা অদ্ভুত মানুষ আর এখন আমাকে সেটা প্রমাণ করতে হবে।’ আরও কত হাজার বার যে ও এটা প্রমাণ করেছে, সেটা কোনো ব্যাপার নয়। এখন আবার ওকে প্রমাণ করতে হবে। প্রতিটি বারই নতুন বার আর এটা করার সময় ও কখনও অতীতের কথা ভাবে না।
‘আমার ইচ্ছা, ও ঘুমোক, আমিও ঘুমোব আর সিংহের স্বপ্ন দেখব, ‘ ও ভাবল, ‘আচ্ছা, এত কিছু থাকতে শুধু সিংহ কেন?’ ও নিজেকে বলল, ‘বুড়ো, অত চিন্তা করো না। চুপচাপ তক্তায় ঠেসান দিয়ে বিশ্রাম নাও আর কোনো চিন্তা করো না। মাছটা পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তুমি কিন্তু যত কম পার, খাট।’
বিকেল হয়ে আসছে আর নৌকাটা ধীর কিন্তু অবিরাম গতিতে চলেছে। এখন আবার পূবালি হাওয়ায় সুতোর টানটা একটু বেড়েছে। ওর পিঠের ওপর সুতোর টানটা ধরে রাখার কষ্টটা ও বেশ শান্তভাবেই সহ্য করছে আর ফুলে ওঠা সমুদ্রের ওপর দিয়ে নৌকা মসৃণভাবে এগিয়ে চলেছে।
বিকেলের দিকে একবার সুতোটা উপরে উঠতে শুরু করল। কিন্তু মাছটা কেবল খানিকটা ওপরে উঠে এসে চলতে থাকল। সূর্যের রোদটা এখন বুড়োর বাঁ হাতে, কাঁধে আর পিঠের ওপর। তাই ও বুঝতে পারল, মাছটা উত্তর দিক থেকে খানিকটা পুবের দিকে ঘুরে গিয়েছে।
মাছটাকে একবার ও দেখেছে তাই এখন মানসচক্ষে দেখছে মাছটা ওর বুকের দু’পাশের হালকা লালচে নীল পাখনা দুটো দু’পাশে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে আর ওর বিশাল লেজটা উঁচু করে জল কেটে কেটে অন্ধকারে জলের গভীরে সাঁতরে চলেছে। আর ভাবছে, ‘এত জলের গভীরে ও কতখানি দেখতে পাচ্ছে। ওর চোখ দুটো তো মস্ত বড় বড় আর একটা ঘোড়া তুলনায় অনেক ছোট চোখ দিয়ে অন্ধকারে দেখতে পায়। এক সময় আমিও অন্ধকারে ভালোই দেখতে পেতাম। অবশ্য একেবারে নিকষ অন্ধকারে নয়। কিন্তু প্রায় একটা বিড়ালের মতোই দেখতে পেতাম।’
সূর্যের রোদে আর ক্রমাগত নড়াচড়ায় ওর বাঁ হাতের আঙুলগুলো এখন পুরো খুলে গিয়ে কাজ করার মতো হয়েছে আর তাই ও সুতোর টানটা বেশি বেশি বা হাতের ওপর দিয়ে পিঠের মাংসপেশীগুলো নাচিয়ে নাচিয়ে ব্যথাটা একটু কমানোর চেষ্টা করল। আর জোরে জোরে বলে উঠল, ‘মাছ, তুমি যদি এখনও ক্লান্ত না হয়ে থাক, তাহলে বলতেই হবে তুমি একটা আজব মাছ।’ ওর নিজেকে এখন খুব ক্লান্তলাগছে আর ও জানে যে শিগগিরই রাত্রি নেমে আসবে আর তাই ও অন্য কথা ভাববার চেষ্টা করল। ও বড় খেলাগুলোর কথা, যেগুলোকে ও গ্র্যান্ড লিগের খেলা বলে, সেগুলোর কথা ভাবতে লাগল, কারণ ও জানে যে, নিউইয়র্ক ইয়াঙ্কিদের ডেট্রয়েট টাইগারমেন সাথে খেলা আছে।
‘আজ নিয়ে দুদিন হল আমি খেলার ফলাফল জানতে পারছি না,’ ও ভাবে- ‘কিন্তু যে মহান খেলোয়াড় দি মাজ্জিও ওর গোড়ালিতে হাড় বেড়ে যাওয়ায় যন্ত্রণা সত্ত্বেও সব কাজ নিখুঁত ভাবে করে, তার ওপর আমার ভরসা রাখা উচিত। এবং তার যোগ্য হওয়া উচিত। আচ্ছা, এই গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়া, ব্যাপারটা কী?- ও নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে, কই আমাদের তো ওটা নেই। লডুয়ে মোরগেরা পায়ের পেছন দিকে যেমন যন্ত্রণাদায়ক নাল থাকে, মানুষের গোড়ালিতে ওটা থাকলে কিন্তু তেমনই যন্ত্রণা হয়? লড়য়ে মোরগেরা যেমন একটা বা দুটো চোখই নষ্ট হয়ে গেলে অথবা ঐ লোহার নাল পরানোর ফলে যন্ত্রণা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যায়, আমার মনে হয়, আমি ওরকম যন্ত্রণা সহ্য করতে পারব না। বড় বড় পাখি বা জন্তু জানোয়ারের তুলনায় মানুষ এমন কিছু নয়। তবু আমি যদি ঐ অন্ধকার সমুদ্রের তলায় সাঁতরে চলা প্রাণীটি হতাম।’
‘অবশ্য হাঙর যদি না এসে পড়ে। ও জোরে জোরে বলে উঠল- ‘যদি হাঙরেরা এসে যায়, ভগবান ওকে আর আমাকে দয়া করো।’
আবার ভাবে, ‘তোমার কি বিশ্বাস, যে আমি যতক্ষণ এই মাছটার সঙ্গে থাকব, মহান দি মাজ্জিও অতক্ষণ থাকতে পারবে? আমি নিশ্চিত যে দি মাজ্জিও নিশ্চয়ই পারবে, কারণ ওর তো বয়স কম আর ওর গায়েও খুব জোর। তাছাড়া ওর বাবাও তো মেছুড়ে ছিল। কিন্তু ওর গোড়ালির বেড়ে যাওয়া হাড় কি ওকে খুব কষ্ট দেবে?’
‘জানি না, কারণ আমার তো কখনও গোড়ালির হাড় বেড়ে যায়নি।’ ও বলে উঠল।
সূর্য যখন ডুবছে, তখন নিজেকে ভরসা দেবার জন্য ও স্মৃতি-চারণ শুরু করল, সেই সব দিনের কথা, যখন ও ক্যাসাব্লাঙ্কার সরাইখানায় সিয়েন ফুয়েগোস থেকে আসা সেই বিশাল নিগ্রো, যে কিনা জাহাজঘাটার সবচেয়ে শক্তিশালী লোক ছিল, তার সাথে পাঞ্জা লড়েছিল। টেবিলের ওপর চক দিয়ে লাইন কাটা ছিল, আর তার উপরে কনুই রেখে হাত সোজা ওপরে তুলে জোরালো মুঠিতে পরস্পরের হাত চেপে ধরে ওরা পুরো একদিন একরাত লড়েছিল। একজন অপরজনের হাত টেবিলের ওপর নামিয়ে ফেলার চেষ্টায় ছিল। সবাই ওদের ওপর প্রচুর বাজি ধরছিল আর কেরোসিন ল্যাম্পের আলোয় দর্শকেরা ঘরে ঢুকছিল, বেরোচ্ছিল। ও কেবল ওই নিগ্রোর বাহু, হাত আর ওর মুখ দেখছিল। প্রথম আট ঘণ্টা কেটে যাবার পর ওরা প্রতি চারঘণ্টা অন্তর রেফারি পাল্টাচ্ছিল, যাতে রেফারিরা ঘুমিয়ে নিতে পারে। ওদের দুজনেরই হাতের নখ ফেটে গিয়ে রক্ত ঝরছিল আর ওরা পরস্পরের বাহু, হাত ও চোখের দিকে তাকিয়েছিল। জুয়াড়িরা হয় ঘর বার করছিল অথবা দেয়াল ঘেঁষা উঁচু চেয়ারগুলোয় বসে ওদের লড়াই দেখছিল। দেয়ালগুলো ছিল কাঠের, উজ্জ্বল নীল রঙ করা আর ল্যাম্পের আলোয় ওদের ছায়াগুলো দেয়ালে পড়ছিল। নিগ্রোটার ছায়াটা ছিল বিশাল আর হাওয়াতে ল্যাম্পগুলোর দুলুনিতে, ওর ছায়াটাও দেয়ালে নড়ছিল।
সারা রাত ধরে ওদের দর বাড়ছিল, কমছিল। ওরা নিগ্রোটাকে মাঝে মাঝে রাম খাওয়াচ্ছিল আর বুড়োর মুখের সিগারেট জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
রাম খাওয়ার পরেই নিগ্রোটা একটা প্রচণ্ড প্রচেষ্টায় বুড়োকে একবার প্রায় কায়দা করে ফেলেছিল। আর ওর হাত প্রায় তিন ইঞ্চি নামিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য বুড়ো তখন বুড়ো ছিল না, ও ছিল ‘সান্তিয়াগো দি চ্যাম্পিয়ন’। কিন্তু বুড়ো আবার ওর নিজের হাত সোজা করে আগের জায়গায় এনে ফেলেছিল। তখনই ও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় যে ওই নিগ্রোকে, যে কিনা একজন চমৎকার মানুষ আর একজন বড় খেলোয়াড়, ওকে ঠিক হারাতে পারবে। আর ঠিক ভোরের আলো যখন ফুটেছে আর জুয়াড়িরা বলতে শুরু করেছে যে ম্যাচটা অমীমাংসিত বলে ঘোষণা করা হোক, আর রেফারি মাথা নাড়ছে, ঠিক তখনই ওর শেষশক্তি সংহত করে বুড়ো নিগ্রোর হাতটা নামাতে নামাতে একেবারে টেবিলের কাঠের ওপর নামিয়ে দিল। ম্যাচটা শুরু হয়েছিল এক রবিবারের সকালে আর শেষ হলো সোমবারের সকালে। অনেক জুয়াড়ি, যাদের জাহাজঘাটায় চিনির বস্তা বোঝাই করার কাজে অথবা হাভানার কয়লা কোম্পানিতে কাজে যাবার তাড়া ছিল, তারা ম্যাচটা অমীমাংসিত হোক, সেটাই চেয়েছিল। ওরা ছাড়া বাকি সবাই ম্যাচটা হার-জিতে শেষ হোক সেটাই চেয়েছিল। কিন্তু কারো কাজে যাবার সময় হবার আগেই ও লড়াইটা শেষ করে দিল।
এরপর অনেক দিন পর্যন্ত লোকেরা ওকে ‘দি চ্যাম্পিয়ন’ বলে ডাকত আর পরের বসন্তকালে একটা ফিরতি লড়াইও হয়েছিল। কিন্তু এবারে আর বেশি টাকা বাজি ধরা হয়নি আর ও নিতান্ত সহজেই লড়াইটা জিতে গিয়েছিল কারণ ও সিয়েন ফুয়েগোস-এর নিগ্রোর মনোবল প্রথম লড়াইয়ে ভেঙে দিয়েছিল। তারপরে ও অবশ্য আরো কয়েকটা ম্যাচ লড়ে জিতেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ও খেলা ছেড়ে দিল। কারণ ও ভেবে দেখল যে, পাঞ্জা লড়াইয়ে ও যে কোনো খেলোয়াড়কেই হারাতে পারবে। কিন্তু যে মাছ ধরার কাজে ওর ডান হাত লাগে, সেই হাতটার ক্ষতি হতে পারে। কয়েকটা অনুশীলনী ম্যাচে ও বাঁ হাত দিয়ে খেলেছিল। কিন্তু ওর বাঁ হাতটা তো সব সময়েই বিশ্বাসঘাতক আর যা করতে বলা হবে, কিছুতেই করবে না আর তাই ও বাঁ হাতকে একদম বিশ্বাস করে না।
ও ভাবল, ‘রোদে পুড়ে এবার হাতটা ঠিক হয়ে যাবে। রাত্রে যদি খুব ঠাণ্ডা না পড়ে, তাহলে ওর আর টান ধরে যাওয়া উচিত নয়। কি জানি, এই রাতটা কেমন হবে’
মাথার ওপর দিয়ে একটা উড়োজাহাজ মিয়ামির দিকে উড়ে গেল আর উড়োজাহাজটার ছায়া জলের ওপর পড়ায় এক ঝাঁক উড়ুক্কু মাছ ভয় পেয়ে ছিটিয়ে গেল।
‘এত উড়ুক্কু মাছ যেখানে আছে, সেখানে নিশ্চয়ই ডলফিন থাকবে,’ ও বলল। তারপর সুতোটার ওপর চাপ দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করল, সুতোটা টেনে মাছটাকে কাছে আনা যায় কিনা। কিন্তু ও একটুও টেনে আনতে পারল না, সুতো একেবারে শক্ত টানটান হয়ে আছে, আর সুতো ছিঁড়ে যাবার আগের মুহূর্তে যে সুতোর ওপর জলের ফোঁটা কাঁপতে থাকে, সেই জায়গায় এসে গেছে। নৌকা ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে আর ও যতক্ষণ চোখ যায়, উড়োজাহাজটাকে দেখতে থাকল।
ও ভাবল, ‘উড়োজাহাজের মধ্যে থাকলে খুব অদ্ভুত লাগে বোধ হয়। অত উঁচু থেকে সমুদ্রকে দেখতে কেমন লাগে, কে জানে। যদি খুব বেশি উঁচুতে না ওড়ে, তাহলে উড়োজাহাজ থেকে মাছটাকে নিশ্চয়ই ভালোই দেখা যাবে। চারশ’ গজ ওপরে খুব ধীর গতিতে উড়তে উড়তে ওপর থেকে মাছটাকে দেখতে ইচ্ছে করে। যখন কাছিম ধরার নৌকায় যেতাম, তখন মাস্তুলের ডগা থেকে আমি অনেক কিছু পরিষ্কার দেখতে পেতাম। অত ওপর থেকে ডলফিনগুলোকে সবুজ দেখাত আর ওদের গায়ের ওপরকার রঙিন ডোরা, লালচে নীল দাগ সব পরিষ্কার দেখা যেত এমনকি পুরো ঝাঁকটাকেও সাঁতার কাটতে দেখা যেত। আচ্ছা এটা কেন হয় যে, অন্ধকার স্রোতের গভীরে দ্রুতগামী মাছেদের সবারই লালচে নীল পিঠ আর লালচে নীল ডোরা বা দাগ থাকে? ডলফিনগুলোর রঙ সোনালি বলেই ওগুলোকে জলের মধ্যে সবুজ দেখায়। কিন্তু যখন ওরা খুব খিদে পেলে খেতে আসে, তখন ওদের দু’পাশে মার্লিন মাছের মতোই লালচে নীল ডোরাগুলো দেখা যায়। রেগে গেলে কিংবা খুব দ্রুতগতিতে চললে কি ওদের এই ডোরা কাটা দাগগুলো ফুটে ওঠে?
ঠিক সন্ধ্যে হবার মুখে যখন ওরা সারগাসো গুল্মের এক বিশাল চাপড়া পার হচ্ছিল, যেগুলো সমুদ্রের হাল্কা ঢেউয়ে দুলছিল, উঠছিল, নামছিল, যেন সমুদ্র একটা হলুদ চাদরের তলায় কারো সঙ্গে রতিক্রিয়া করছে, ঠিক সেই সময় ওর ছোট সুতোর টোপটা একটা ডলফিন ধরল। যখন ডলফিনটা বাতাসে লাফিয়ে উঠল আর সূর্যের শেষ রশ্মিতে ওর শরীরটা সত্যিকারের সোনার মতো দেখাচ্ছিল, আর ও বেঁকেচুরে বাতাসে পাখনা ঝাপটাচ্ছিল, তখনই ও ওটাকে প্রথম দেখল। ওটা ভয়ের চোটে বার বার জলের ওপর লাফাতে লাগল আর বুড়ো নিচু হয়ে ডান হাত দিয়ে বড় মাছের সুতোটা সামলে রেখে কোনো রকমে পাছ গলুইয়ে নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে ডলফিনটাকে টেনে আনতে লাগল। ও সুতো একটু একটু টানছে আর খালি পা দিয়ে টেনে আনা সুতোটাকে চেপে চেপে ধরছে। তারপর মাছটা যখন এপাশে ও পাশে ঝাপটা মারতে মারতে একেবারে পাছ- গলুইয়ের কাছে চলে এল, তখন ও পাছ-গলুইয়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ওই গায়ে লালচে নীল দাগওয়ালা চকচকে সোনালি মাছটাকে একটানে নৌকার ওপর তুলে ফেলল। ওটার চোয়াল প্রবল আক্ষেপে নড়ছে, বড়শিটার ওপর ক্রমাগত কামড় দিচ্ছে, ওর লম্বাটে মসৃণ শরীর, লেজ আর মাথাটা নৌকার তলার কাঠে ক্রমাগত ঝাপটা মারছে। বুড়ো ওটার চকচকে সোনালি মাথাটায় ডাণ্ডার বাড়ি মেরে ওটার ছটফটানি থামিয়ে দিল
বুড়ো এরপর মাছটার মুখ থেকে বড়শিটা খুলে ওটাকে আবার একটা সার্ডিন মাছের টোপ গেঁথে সুতোটাকে জলে ফেলল। তারপর আবার ধীরে ধীরে সাবধানে নৌকার গলুইতে চলে এল। বাঁ হাতটা ভালো করে জলে ধুয়ে নিয়ে প্যান্টে মুছে ফেলল। তারপর বড় মাছের ভারী সুতোটাকে ডান হাত থেকে বাঁ হাতে নিয়ে নিল আর সমুদ্রে সূর্যের ডুবে যাওয়া আর ভারী সুতোটার ঢল দেখতে দেখতে ও ডান হাতটা সমুদ্রের জলে ধুয়ে নিল।
‘ও এখনও একটুও বদলায়নি’, বুড়ো বলল। কিন্তু হাত দিলে জলের ধাক্কা পরখ করে বুঝতে পারল, মাছটার চলার গতি বেশ কিছুটা মন্থর হয়েছে।
‘পাছ-গলুইয়ে আড়াআড়ি করে দুটো বৈঠা এক সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে, তাহলে রাত্রে মাছটাকে আরো মন্থর করে দেওয়া যাবে,’ ও বলল, ‘রাত্রে ও যেমন ঠিক থাকবে, তেমনি আমিও ভালোই থাকব।’
‘আর একটু পরে ছোট মাছটার পেটটা কেটে ফেলে দিতে হবে। তাহলে ওর মাংসের মধ্যে রক্তটা ঠিক থাকবে।’ ও ভাবল, ‘আর কিছুক্ষণ বাদে এটাও করতে হবে আর বৈঠা দুটোকে এক সঙ্গে বেঁধে ও ফেলতে হবে, যাতে টানটা কমিয়ে দেওয়া যায়। এখন এই সূর্যাস্তের সময় মাছটাকে বেশি উত্তেজিত করা উচিত নয়, ওকে এখন ঠাণ্ডা রাখাই ভালো। সূর্যাস্তের সময়টা সব মাছের পক্ষেই একটা কঠিন সময়।’
ও ওর হাতটাকে হাওয়ায় শুকিয়ে নিল তারপর হাত দিয়ে সুতোটা শক্ত করে ধরে যতটা সম্ভব আরাম করে বসল আর নৌকার কাঠে শরীরের ঠেকনো দিয়ে রাখল, যাতে সুতোর ভারী টানটা বেশির ভাগ নৌকাটার ওপর দিয়েই যায়।
ও ভাবল, ‘কিভাবে এসব করতে হবে আমি এখন শিখছি। অন্তত নৌকার ওপর মাছের টানটা চাপানোর ব্যাপারটা। অবশ্য মনে রাখতে হবে, টোপটা ধরবার পর থেকে এখন পর্যন্ত ও কিন্তু কিছুই খায়নি অথচ ও এত প্রকাণ্ড আর ওর প্রচুর খাদ্য দরকার। আমি তো পুরো বনিতো মাছটাই খেয়েছি। কাল আবার ডলফিনটাও খাব।’ ও অবশ্য ডলফিনটাকে ‘ডোরাডো’ বলল। ‘ওটাকে যখন পরিষ্কার করব তখন ওর কিছুটা খেয়ে নিতে হবে। বনিতো মাছটার চেয়ে এটাকে খাওয়া কঠিন হবে। তবে কিছুই তো আর সহজে হয় না।’
ও জোরে জোরে বলে উঠল, ‘মাছ, তুমি কী রকম বোধ করছ? আমি কিন্তু ভালোই বোধ করছি আর আমার বাঁ হাতটাও ঠিক হয়ে গেছে আর আমার আরও এক রাত্রি একদিনের খাবার মজুত আছে। নৌকাটাকে টানো মাছ।’
সত্যি কথা বলতে কি, ও কিন্তু মোটেই ভালো বোধ করছিল না, কারণ পিঠের ওপর ওই ভারী সুতোর টান ও ঘষার যে যন্ত্রণা, সেটা এই সুদীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকায় যন্ত্রণাটা পরিবর্তিত হয়েছে একটা অসাড় ব্যথায় যেটা ও মোটেই পছন্দ করছিল না। কিন্তু এর চেয়েও খারাপ অবস্থায় আমি পড়েছি,’ ও ভাবল, আমার ডানহাতটা খালি একটু কেটে গেছে আর বাঁ হাতটায় যে টান ধরেছিল, সেটাও ঠিক হয়ে গেছে। আমার পা দুটো ঠিক আছে। সবচেয়ে বড় কথা, খাওয়ার প্রশ্নে আমি ওর থেকে এগিয়ে আছি।’
সেপ্টেম্বর মাসে সূর্য ডোবার পর খুব তাড়াতাড়ি যেমন অন্ধকার হয়ে যায়, এখন তেমনই অন্ধকার। ও গলুইয়ের ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের ওপর শুয়ে পড়ে যতটা পারা যায় বিশাম নেবার চেষ্টা করল। আকাশে প্রথম তারারা ফুটে উঠল। ও ‘রিগেল’ নক্ষত্রের নাম জানে না, কিন্তু ওটাকে দেখে চিনতে পারল আর বুঝল, খুব তাড়াতাড়িই বাকি নক্ষত্রেরা একে একে স্পষ্ট হবে আর তখন ওই দূরবর্তী বন্ধুদের কাছে পাব।
আর ও স্বগতোক্তি করল, ‘মাছটাও তো আমার বন্ধু। আমি জীবনে কখনও এই রকম মাছ দেখিওনি বা এই রকম মাছের কথা শুনিওনি। তবু আমার ওকে মারতেই হবে। নক্ষত্রদের যে আমরা মেরে ফেলার চেষ্টা করি না, সেটাই আমার আনন্দ।’
‘ভাবো তো, প্রতিদিনই একটা লোক চাঁদকে মারবার চেষ্টা করছে।’ ও ভাবল ‘চাঁদ তো পালিয়ে যায়। কিন্তু ভাবো তো, যদি একটা লোক প্রতিদিনই সূর্যকে মারার চেষ্টা করেই যায়? আমরা ভালো কপাল নিয়ে জন্মেছি’, তারপরই ওর দুঃখ হল মাছটা কিছুই খায়নি ভেবে যদিও মাছটাকে মারবার দৃঢ়সংকল্প একটুও কমেনি ওর জন্যে দুঃখ সত্ত্বেও। ও ভাবে, ‘এই মাছটার মাংস কতগুলো লোক খেতে পারবে? কিন্তু ওই লোকগুলো কি মাছটা খাবার যোগ্য? না, নিশ্চয়ই না। ওর এই অপূর্ব মর্যাদাসম্পন্ন ব্যবহারের দরুন, কেউই এই মাছটা খাবার যোগ্য নয়’।
‘এসব ব্যাপার আমি ঠিক বুঝি না,’ ও ভাবে- ‘কিন্তু আমরা যে সূর্য, চাঁদ অথবা নক্ষত্রদের মারবার চেষ্টা করি না, সেটা ভালো জিনিস সমুদ্রে বাস করে আমাদের সত্যিকার ভাইদের বধ করাই যথেষ্ট।
‘এখন কিন্তু আমাকে এই টানটার কথা চিন্তা করতে হবে। এটার ভালো মন্দ দুটো দিকই আছে। যদি মাছটা জোর খাটায়, আর বৈঠা দুটোর প্রতিকূল বাধার ফলে নৌকাটা ভারী হয়ে পড়ে, তাহলে আমার সুতো এত বেরিয়ে যাবে যে, হয়তো মাছটাকে আর ধরে রাখতে পারব না। নৌকাটা হালকা থাকলে আমাদের দুজনেরই কষ্ট বেশি হবে ঠিকই, কিন্তু আমার পক্ষে এটাই নিরাপদ, কেননা মাছটা যে প্রচণ্ড গতির অধিকারী, সেটা সে এখনও প্রয়োগ করেনি। যাই হোক না কেন, নষ্ট হওয়ার আগেই ডলফিনটার পেটটা পরিষ্কার করে ওর কিছুটা অংশ আমার খেয়ে নেওয়া উচিত। যাতে আমার গায়ের জোর ঠিক থাকে।’
‘এখন আমি এক ঘণ্টা বিশ্রাম নেব আর পাছ গলুইয়ে গিয়ে কাজগুলো করবার আগে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাছটা এখনও একভাবে একই গতিতে চলছে কিনা বুঝে নেব। ও কী করে, ওর চলার গতি বদলাচ্ছে কিনা, সেটাও দেখব বৈঠা দুটো বেঁধে আড়াআড়ি জলে ফেলার কৌশলটা ভালোই কিন্তু এখন সাবধান হবার সময় এসেছে। ও এখনও যথেষ্ট বলবাল আর আমি তো দেখছি ওর মুখের কোণার দিকে বড়শিটা বিঁধে আছে আর ও মুখটা শক্ত করে বন্ধ করে রেখেছে। বড়শির যন্ত্রণা ওর কাছে এমন কিছু নয় কিন্তু অনাহারের যন্ত্রণা আর এমন কিছুর বিরুদ্ধে ও লড়ছে যেটা ওর বোধগম্য নয়, সেটার যন্ত্রণা ওর কাছে এখন সব কিছু। বুড়ো, এখন বিশ্রাম নাও, আর যতক্ষণ না তোমার পরবর্তী কাজের সময় আসে, ওকে কাজ করতে দাও।’
ওর বিশ্বাস মতো প্রায় দু’ঘণ্টা ও বিশ্রাম নিল। চাঁদ দেরি করে উঠবে, কাজেই সময়টা বুঝবার কোনো উপায়ই নেই। অবশ্য তুলনামূলক বিচারের কথা না ধরলে, ওর প্রকৃতই কোনো বিশ্রাম হয়নি। ওর কাঁধের ওপর মাছটার প্রচণ্ড ভারী টান ওকে এখনও সহ্য করতে হচ্ছে। ও বাঁ হাতটা গলুইয়ের ধারের তক্তার ওপর ভর দিয়ে নৌকাটার ওপরই বেশি বেশি করে মাছের টানের ভারটা চাপিয়ে দিল।
‘কী সোজা উপায়ই না ছিল, যদি আমি সুতোটা নৌকার সাথে বেঁধে রাখতে পারতাম,’ ও ভাবছিল, ‘কিন্তু তাহলে একটা ছোট ঝটকা মারলেই ও সুতোটা ছিঁড়ে ফেলতে পারত। আমার শরীর দিয়ে আমি ওর টানের ওজনকে আটকাচ্ছি আর সব সময় দুহাতে আর সুতো ছাড়তে তৈরি আছি।’
‘কিন্তু বুড়ো তুমি তো এখনও ঘুমোওনি, ও জোরে জোরে বলে উঠল- ‘একটা আদ্ধেক দিন আর একটা গোটা রাত্রি পার হয়ে গেছে আর এখন আরও একটা পুরো দিন তুমি ঘুমোওনি। এমন একটা উপায় বার কর, যাতে মাছটা যখন চুপচাপ অবিচল, তখন একটু ঘুমোতে পার। যদি তুমি না ঘুমোও, তাহলে কিন্তু মাথা পরিষ্কার থাকবে না।’
‘আমার মাথা যথেষ্ট পরিষ্কার আছে’, ও ভাবে, ‘খুবই পরিষ্কার। আমার ভাই, ওই তারাদের মতোই পরিষ্কার। তবু আমাকে ঘুমোতে হবে। তারারা ঘুমোয়, চাঁদ, সূর্য, ওরাও ঘুমোয়, এমনকি কোনো কোনো সময়, যখন কোনো স্রোত থাকে না আর সমুদ্র সমতল, শান্ত, তখন সমুদ্রও ঘুমোয়।’
কিন্তু মনে করে ঘুমোতে হবে। সুতোটার ব্যাপারে একটা কোনো সহজ আর নিশ্চিত উপায় বার করে ঘুমের ব্যবস্থা কর। এখন গিয়ে ডলফিনটাকে কেটে কুটে তৈরি কর। তুমি যদি ঘুমোতে চাও, তাহলে ওই বৈঠা বাঁধাবাঁধির ব্যাপারটা একটু ঝুঁকি হয়ে যাবে। ও নিজেকে বলল, ‘আমার না ঘুমোলেও চলবে। কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে।’ মাছটার সুতোয় যাতে কোনো ঝাঁকি না পড়ে, সেদিকে সাবধান হয়ে ও হাতের তালু আর হাঁটুতে ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে পাছ গলুইয়ে গেল। ‘মাছটা হয়তো এখন আধ ঘুমন্ত’, ও ভাবে, ‘কিন্তু আমি চাই না, যে ও বিশ্রাম নিক। যতক্ষণ না ওর মৃত্যু হয়, ততক্ষণ ওকে টেনে যেতেই হবে।’
পাছ গলুইয়ে এসে ও শরীরটা ঘোরালো, যাতে ওর কাঁধের ওপর দিয়ে সুতোর টানটা ও বাঁ হাত দিয়ে ধরতে পারে। তারপর ও ডান হাত দিয়ে খাপের মধ্যে থেকে ছুরিটা বার করল। নক্ষত্রেরা এখন অনেক উজ্জ্বল আর ও ডলফিনটাকে পরিষ্কার দেখতে পেল পাছগলুইয়ের তলায় পড়ে আছে। ও ছুরিটা ওর মাথায় বিধিয়ে মাছটাকে টেনে বার করে আনল, তারপর এক পা দিয়ে মাছটাকে চেপে ধরে পেট থেকে নিচের চোয়াল পর্যন্ত একটানে ফেড়ে ফেলল। তারপর ছুরিটা নিচে রেখে ডান হাতটা ওর পেটের ভেতর ঢুকিয়ে নাড়িভুঁড়ি আর কানকো বার করে ভেতরটা পরিষ্কার করে ফেলল। পাকস্থলীটা পিচ্ছিল আর ভারী ভারী মনে হতে ওটাকেও কেটে দেখে, ভেতরে দুটো উড়ুক্কু মাছ। মাছ দুটো একেবারে টাটকা আর শক্ত আছে। ওগুলোকে পাশাপাশি সাজিয়ে রেখে ও এবার নাড়িভুঁড়ি ও কানকো নৌকার পাশ দিয়ে জলে ফেলে দিল। জলের মধ্যে ফসফরাসের জ্বলজ্বলে রেখা টেনে ওগুলো ডুবে গেল। ডলফিন মাছটার শরীরটা এনে ঠাণ্ডা আর তারার আলোয় পাশুটে সাদা লাগছিল। ডান পা দিয়ে মাছের মাথাটা চেপে ধরে বুড়ো মাছটার একদিককার চামড়া ছাড়িয়ে ফেলল। তারপর মাছটাকে উল্টে নিয়ে অন্য দিককার চামড়াও ছাড়াল। আর মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত দুধারের মাংস কেটে নিল।
মাছের শরীরের বাকি অংশটা জলে ফেলে দিয়ে ও দেখতে চেষ্টা করল জলের মধ্যে কোনো আলোড়ন হয় কিনা। কিন্তু ওটার ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়ার হাল্কা আভাই কেবল দেখা গেল। এরপর ও ঘুরে দাঁড়িয়ে উডুক্কু মাছ দুটোকে দু ফালি মাংসের মধ্যে রেখে আর ছুরিটাকে খাপে গুঁজে দিয়ে আবার খুব আস্তে আস্তে গলুইয়ে ফিরে এল। পিঠের ওপর ওজনদার সুতোর ভারে ওর পিঠ বেঁকে গেছে আর ও ডান হাতে মাছগুলোকে নিয়ে এল।
গলুইয়ে এসে ও মাছের ফালি দুটোকে আর উড়ুক্কু মাছ দুটোকে তক্তার ওপর পাশাপাশি বিছিয়ে রাখল। তারপর পিঠের ওপর সুতোটাকে সরিয়ে নতুন জায়গায় এনে গলুইয়ের তক্তার ওপর বাঁ হাতের ভর রেখে সুতোটাকে ধরে থাকল। তারপর নৌকার ধারে ঝুঁকে উড়ুক্কু মাছ দুটোকে ধুয়ে নিল আর হাতে জলের ধাক্কায় জলের গতিটা দেখে নিল। মাছটার চামড়া ছাড়াবার দরুন ওর হাতটা ফসফরাসে জ্বলজ্বল করছিল আর ও জলের প্রবাহ দেখতে থাকল। গতি এখন অনেক ধীর আর ও যখন নৌকার কাঠের গায়ে হাতটা ঘষছিল, তখন ফসফরাসের কণা ও হাত থেকে ঝরে ঝরে নৌকার পেছনদিকে ভেসে যাচ্ছিল।
বুড়ো বলল, ‘ও হয় বিশ্রাম নিচ্ছে, নয়তো আধা ঘুমন্ত। এখন তাহলে ডলফিন মাছটাকে খেয়ে নেওয়া যাক। তারপর কিছু বিশ্রাম আর একটু ঘুম।
খোলা আকাশের নক্ষত্রের নিচে রাতের ঠাণ্ডা ক্রমশ বাড়ছে। ও ডলফিনের এক ফালি মাংস আর একটা উড়ুক্কু মাছের মাথাটা কেটে ফেলে দিয়ে আর পেটটা পরিষ্কার করে খেয়ে নিল।
‘রান্না করা ডলফিন মাছ খেতে কী ভালো আর কাঁচা খেতে কী খারাপ। লেবু বা নুন না নিয়ে আর কখনও নৌকায় উঠব না’, ও বলে উঠল।
ও ভাবে, ‘একটু বুদ্ধি করে যদি সারাদিন গলুইয়ের তক্তার ওপর জল ছিটাতাম, তাহলে জল শুকিয়ে গেলে নুন তৈরি হত। অবশ্য ডলফিনটা তো ধরলাম প্রায় সন্ধের মুখে মুখে। যাই হোক, এটা ঘটনা যে আমি মোটেই প্রস্তুতি নিইনি। তবে এটাও ঠিক যে, আমি মাছটা কাঁচা হলেও ভালোই খেয়েছি আর বমি বমি ভাবও হয়নি।’
