দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ৫
আকাশে পুব দিকটাতে মেঘ জমতে শুরু করল আর তারারা একে একে মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, যেন ও এক বিশাল মেঘের গিরিখাতে ঢুকে পড়ছে আর বাতাসও পড়ে গেল।
ও বলল, ‘আর তিনচার দিনের মধ্যেই আবহাওয়া খারাপ হয়ে পড়বে। তবে আজ রাত্রে তো নয়ই, কালও নয়। বুড়ো, এখন মাছটা ঠাণ্ডা চুপচাপ আর একই রকম আছে, একটু ঘুমিয়ে নাও।’
শরীরের সমস্ত ভার গলুইয়ের কাঠের ওপর রেখে আধশোয়া হয়ে ও ডান হাত দিয়ে সুতোটা শক্ত মুঠোয় ধরে থাকল আর উরু দিয়ে হাতটা চেপে থাকল। তারপর কাঁধের ওপর সুতোর টানটাকে আরো একটু নিচের দিকে নামিয়ে এনে বাঁ হাতটা দিয়ে সুতোটা বেড় দিয়ে নিল।
ও ভাবল ‘যতক্ষণ বাঁ হাতের বেড় দিয়ে সুতোটা আটকে রাখবে, ততক্ষণ আমার ডান হাত সুতোটাকে ধরে থাকতে পারবে। যদি আমার ঘুমের মধ্যে ডান হাতের মুঠি আলগা হয়ে যায়, তাহলে সুতোটা হুড়হুড় করে বেরিয়ে গেলে আমার বাঁ হাতই আমায় জাগিয়ে দেবে। ডান হাতের ওপর বেশি চাপ পড়ছে বটে, কিন্তু ও খুব শক্ত আছে আর খাটাখাটিনিতে অভ্যস্ত। তারপর ও সুতোর সঙ্গে সমস্ত শরীরটা লাগিয়ে ডান হাতের ওপর সুতোর সমস্ত টানটা রেখে গুড়িসুড়ি হয়ে শুয়ে পড়ল আর পরমুহূর্তেই ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল।
এবার আর ওর স্বপ্নের মধ্যে সিংহ এল না, এল সামুদ্রিক কচ্ছপের একটা বিরাট ঝাঁক, প্রায় আট দশ মাইল লম্বা। কচ্ছপগুলোর এটা জোড় লাগার সময় আর ওরা জল থেকে অনেকটা ওপরে লাফিয়ে উঠছে আবার সেই জলের গর্ততেই পড়ছে।
তারপর ও স্বপ্নে দেখল যে, ও গ্রামে ওর নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছে, উত্তুরে হাওয়া বইছে, ওর খুব শীত শীত করছে আর বালিশের বদলে ডান হাতের ওপর মাথা রেখে শোয়ার দরুন ওর ডান হাতটা ঝিঁঝিঁ ধরে অবশ হয়ে গেছে।
এরপর ওর স্বপ্নে আবার সেই দীর্ঘ হলুদ তটভূমি এসে গেল আর ও দেখল প্রথম সিংহটা সন্ধ্যার মুখে মুখে তটভূমিতে নেমে এল, তারপর আরো সিংহ এসে গেল। ও যেন ডাঙার দিক থেকে বয়ে আসা মৃদু বাতাসে নোঙর ফেলা জাহাজের গলুইয়ের তক্তার ওপর থুতনি রেখে প্রতীক্ষায় আছে, কখন আরো, আরো সিংহ আসবে। ওর মনটা প্রশান্ত হয়ে আছে। চাঁদ অনেকক্ষণ ওপরে উঠে এসেছে আর ও ঘুমিয়েই চলেছে। মাছটা একইভাবে অবিরাম টেনে নিয়ে চলেছে আর নৌকাটা মেঘের সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।
ওর ডান হাতের মুঠিটা সজোরে ওর মুখে লাগতেই একটা ঝাঁকুনি খেয়ে ওর ঘুম ভেঙে গেল, সুতোটা তখন ওর ডান হাতের মুঠি থেকে হু হু করে বেরিয়ে যাচ্ছে আগুনের মতো জ্বালা ধরিয়ে। ওর বাঁ হাতটার অস্তিত্বই ও টের পেল না, ডান হাত দিয়েই সুতোটা আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করল, কিন্তু সুতো বেরিয়েই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ওর বাঁ হাতই সুতোটা ধরল আর ও সুতোর ওপর সমস্ত শরীরের ভার ছেড়ে দিল। এবার সুতোর প্রবল টানে ওর পিঠ আর বাঁ হাত যে জ্বলতে লাগল আর বাঁ হাতের ওপর সুতোর সমস্ত টানটা পড়ায়, বিশ্রীভাবে হাতের তালুর মাংস কেটে যেতে লাগল। ও সুতোর বান্ডিলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল, সুতো স্বচ্ছন্দ গতিতে অবিরাম বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তেই মাছটা সমুদ্রের জল লণ্ডভণ্ড করে একটা লাফ দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করে আবার জলে পড়ল। তারপর ক্রমাগত লাফের পর লাফ দিতেই থাকল, আর সুতোটা হু হু করে বেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও নৌকা দ্রুতবেগে চলতে থাকল। বুড়ো সুতোটা যতটা সম্ভব টেনে রেখে প্রায় ছেড়ে ছেড়ে অবস্থায় আনতে লাগল। টানের চোটে ও গলুইয়ের ওপর রাখা ডলফিনটার বাকি মাংসের ফালির ওপর এমন মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছিল যে, নড়তে পর্যন্ত পারছিল না।
‘তাহলে এরই অপেক্ষায় এতক্ষণ ছিলাম,’ ও ভাবল, ‘ঠিক আছে, তাহলে হয়ে যাক। যত বেশি সুতো টানবে, তত বেশি মূল্য দিতে হবে। ওকে বাধ্য করতে হবে মূল্য দিতে।’
মাছটার লাফগুলো ও অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু সমুদ্রের জল তোলপাড় হওয়ার আর ওর ভারী শরীরের জলের ওপর আছাড় খাওয়ার শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছিল। সুতোটা এত জোরে ওর হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল যে, ওর হাত কেটে যাচ্ছিল কিন্তু ও তো জানত যে এমনটা হতে পারে, তাই ও চেষ্টা করছিল, যাতে সুতোর ধারে ওপর হাতের কড়া পরা জায়গাগুলোই কেটে যায় আর তাই সুতোটায় যাতে ওর হাতের তালুর নরম জায়গা অথবা আঙ্গুলগুলো না কাটে, সেই চেষ্টা করছিল।
‘যদি ছেলেটা এখানে থাকত তাহলে ও সুতোর বান্ডিলগুলো জল দিয়ে ভিজিয়ে দিত,’ ও ভাবে, ‘হ্যাঁ, যদি ছেলেটা এখানে থাকত, যদি ছেলেটা এখানে থাকত।’
সুতোটা ক্রমাগত বেরিয়েই যাচ্ছে, কিন্তু এখন সুতো বেরিয়ে যাওয়ার গতিটা কমে এসেছে আর প্রতি ইঞ্চি সুতো টানার জন্য মাছটাকে ও যথেষ্ট পরিশ্রম করতে বাধ্য করছে। এইবার ও কাঠের ওপর থেকে মাথাটা তুলতে পারল যেখানে ও মাছের ফালিটার ওপর মুখ থুবড়ে গাল চেপে পড়েছিল। তারপর প্রথমে হাঁটুর ওপর ভর দিল আর আস্তে আস্তে পায়ের ওপর ভর দিয়ে সোজা হল। সুতো কিন্তু সারাক্ষণই বেরিয়ে যাচ্ছে, তবে গতি আরো ধীর হচ্ছে। ও দেখতে পাচ্ছিল না বলে, পা দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করল, সুতোর বান্ডিলগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা। এখনও যথেষ্ট সুতো হাতে আছে আর এই যে নতুন করে প্রচুর সুতো বেরিয়ে গেল, জলের মধ্যে দিয়ে সেটার ঘর্ষণের বাধা তো অতিরিক্ত টানের সৃষ্টি করেছে, মাছটাকে তো সেটাও টানতে হচ্ছে।
‘হ্যাঁ, এখন যে মাছটা বারো চৌদ্দ বার লাফ দিল আর ওর শরীরের ভেতরে মেরুদণ্ডের দুপাশের থলিগুলোয় হাওয়া ভরে নিল, এর ফলে ও তো আর সমুদ্রের তলায় গিয়ে মরে পড়ে থাকতে পারবে না, নইলে ওখান থেকে ওকে টেনে তোলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না,’ ও ভাবে, ‘খুব শিগগিরগই ও এবার গোল হয়ে ঘুরতে আরম্ভ করবে আর তখনই আমার ওকে কায়দা করতে হবে। ভাবছি, ও হঠাৎ অমন করে লাফাতে শুরু করল কেন? এটা কি ওর খিদের চোটে বেপরোয়া হয়ে যাওয়া, নাকি রাতের সমুদ্রে কিছু দেখে ভয় পেয়েছে? হতে পারে ও হঠাৎ-ই ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু ওকে তো মনে হয়েছিল, খুব বলশালী, ঠাণ্ডা প্রকৃতির আর একেবারে নির্ভয় আর আত্মবিশ্বাসী। অবাক কাণ্ড।’
ও বলল, ‘বুড়ো, তুমি নিজে একটু নির্ভয় আর আত্মবিশ্বাসী হও তো। তুমি ওকে এখন টেনে ধরে আছ বটে, কিন্ত সুতো তো একটুও টেনে আনতে পারছ না। অবশ্য ওকে শিগগিরই গোলাকারে ঘোরা শুরু করতে হবে।’
বুড়ো এখন ওর কাঁধে আর বাঁ হাতের জোরে মাছটাকে টেনে ধরে আছে। ও নিচু হয়ে ডান হাত দিয়ে খানিকটা জল তুলে নিয়ে মুখের ওপর দিয়ে ডলফিনের মাংসের দলাটা ধুয়ে ফেলল। ওর ভয় হচ্ছিল পাছে বমি না করে বসে, তাহলে ওর শক্তিক্ষয় হবে। যখন গাল মুখ পরিষ্কার করে ধোয়া হয়ে গেল, তখন ও ডান হাতটা নৌকার পাশে জলে ধুয়ে নিয়ে হাতটা কিছুক্ষণ ওই নোনা জলেই ধরে রাখল। সূর্যোদয়ের ঠিক আগে, প্রথম সূর্যের আলো তখন আকাশে ফুটে উঠেছে, ও দেখল,মাছটা প্রায় পুব দিকেই চলেছে। তার মানে ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আর স্রোতের অনুকূলেই সাঁতরে চলেছে। ‘এবার ও শিগগিরই ঘুরতে শুরু করবে আর তখনই আমাদের আসল কাজ শুরু হবে,’ ও ভাবল। ও বিবেচনা করে দেখল, যে ডান হাতটা যথেষ্ট সময় জলের ভেতর রাখা হয়েছে। তখন ও হাতটা তুলে দেখল, আর বলে উঠল, ‘হাতটার অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়, আর তাছাড়া একটা পুরুষ মানুষের এই ব্যথা, যন্ত্রণাতে কিছুই যায় আসে না?’
ও এবার সাবধানে সুতোটাকে ডান হাত দিয়ে ধরল যাতে হাতে নতুন করে যে সব জায়গা কেটে গেছে, সেখানে সুতোর ঘষা না লাগে, তারপর দুপায়ের ওপর শরীরের ভার এমনভাবে জলে ডোবানো যায়।
ও বাঁ হাতকে বলল, তোমার মতো অপদার্থের পক্ষে তুমি খুব একটা খারাপ করনি। কিন্তু একটা অসময়ে আমি তোমাকে খুঁজেই পাইনি।
ও ভাবল, ‘আচ্ছা, দুটো ভালো হাত নিয়ে আমার জন্ম হল না কেন? হয়তো আমারই দোষ, ওকে ঠিক মতো শেখাতে পারিনি। ভগবান জানেন, শিখবার মতো যথেষ্ট সুযোগ ওকে দেওয়া হয়েছে। যদিও রাত্তিরে ও খুব একটা খারাপ করেনি, কেবল একবার খিল ধরেছিল। যদি আবার ওর খিল ধরে, সুতোটা যেন ওকে কেটে ফেলে দেয়।
ও বুঝতে পারছে, যে ওর মাথাটা ঠিকঠাক পরিষ্কার কাজ করছে না, তবু ভাবছে ডলফিনের মাংসটা আরও কিছুটা খেলে হত। আবার নিজেই নিজেকে বলছে, ‘না ওটা খাওয়া ঠিক হবে না। বমি করে শক্তিক্ষয় করার চাইতে মাথাটা হাল্কা থাকা বাঞ্ছনীয়। আমি জানি যে, ওটার ওপর মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম আর ওটা খেলেও আমি পেটে ধরে রাখতে পারব না। তার চেয়ে বরং ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের জন্যে ওটা রেখে দেওয়া যাক, অবশ্য যতক্ষণ না নষ্ট হয়ে যায়। এখন ওটা খেয়ে শক্তি সঞ্চার করার পক্ষে বড় দেরি হয়ে গেছে।’ ও নিজেকেই বলছে, ‘তুমি একটা মূৰ্খ, অন্য উড়ুক্কু মাছটা খাও না কেন।
উড়ুক্কু মাছটা কেটে পরিষ্কার করে রাখা আছে। ও ওটা বাঁ হাত দিয়ে তুলে নিয়ে সাবধানে কাঁটা ফাটা সমেত পুরো মাছটা লেজ পর্যন্ত চিবিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিল। ‘অন্য মাছের চাইতে এটা অনেক পুষ্টিকর’, ও ভাবে, ‘অন্তত আমার যে রকম শক্তি চাই, সেটা পাব। এখন আমার যা করার দরকার তা করলাম, এবার ও যদি গোল হয়ে ঘুরতে আরম্ভ করে তাহলেই আসল লড়াই শুরু হবে।’
সমুদ্রে ডিঙি ভাসানোর পর এই নিয়ে তৃতীয়বার সূর্য উঠল আর তখনই মাছটা গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল।
মাছটা যে ঘুরছে, সেটা অবশ্য ও সুতোর ঢল দেখে বুঝতে পারছিল না। এত তাড়াতাড়ি ওটা চোখে দেখা যাবে না। ও খালি সুতোর ওপর চাপটা একটু হাল্কা হয়েছে সেটা বুঝতে পেরে ডান হাত দিয়ে খুব ধীরে ধীরে সুতো টেনে আনতে আরম্ভ করল। মাঝে মাঝেই সুতো আটকে আটকে যাচ্ছিল, কিন্তু সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় আসার আগেই আবার ও মাছটাকে টেনে আনতে পারছিল না। ও সুতোর তলা থেকে ওর কাঁধ আর মাথা সরিয়ে নিল আর আস্তে আস্তে সমান ভাবে সুতো টেনে আনতে লাগল। ও দুই হাত দুলিয়ে দুলিয়ে এমনভাবে সুতো টানতে থাকল, যাতে ওর পুরো শরীর আর দুটো পা-এর ওপর ওই টানের বেশির ভাগ চাপটা পড়ে, যাতে ওর বুড়ো পা আর কাঁধ টানের দুলুনিতে পুরো ভর রাখে।
‘বেশ বড় গোলাকার বৃত্তে ও ঘুরছে। কিন্তু ঘুরছে তো!’ ও বলল।
তারপরেই ও আর সুতো টেনে আনতে পারছে না, বেশি জোর করতে গেলে সুতো থেকে সূর্যের আলোয় জলের ফোটা ঝরতে দেখল। তারপরেই আবার ওর হাত থেকে সুতো বেরিয়ে যেতে শুরু করল আর বুড়ো হাঁটু মুড়ে বসে একান্ত অনিচ্ছায় কালো জলের ভেতর সুতোটা চলে যেতে দিল।
‘ও এখন ঘুরতে ঘুরতে দূরে চলে যাচ্ছে। যতটা সম্ভব ওকে টেনে রাখতে হবে। কষে টেনে রাখলে ওর ঘোরার বৃত্তটা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসবে। মনে হচ্ছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমি ওকে দেখতে পাব। এখন ওকে আশ্বস্ত রাখতে হবে আর তারপরেই আমার হাতে ওর মৃত্যু।’
কিন্তু মাছটা ধীরে ধীরে ক্রমাগত ঘুরেই চলেছে আর দু’ঘণ্টা বাদে বুড়ো শরীরের ভেতরে হাড় পর্যন্ত ক্লান্ত হয়ে, ঘেমে নেয়ে ভিজে একাকার। তবে ওর ঘোরার বৃত্তগুলো আরো ছোট হয়ে এসেছে আর সুতোর ঢল দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, মাছটা সাঁতরাতে সাঁতরাতে জলের ভেতর অনেকটা ওপরের দিকে উঠে এসেছে।
গত ঘণ্টাখানেক ধরে বুড়ো চোখের সামনে কালো কালো ছোপ দেখতে পাচ্ছে আর ওর ঘামের নুন চোখের ভেতর ঢুকে গেছে আর ওর কপালে চোখের ওপর কাটা জায়গায় ঢুকে গেছে আর জ্বলছে। ওই কালো কালো ছোপের জন্য ওর ভয় নেই। কারণ ও জানে যে সুতোর টান ধরে রাখার জন্য যে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে, তাতে এটা হওয়া স্বাভাবিক। তবে অন্তত বার দুয়েক যে ওর মাথা ঝিমঝিম করে মূর্ছা যাবার মতো অবস্থা হয়েছিল, তার জন্যে ওর একটু উদ্বেগ রয়েছে।
‘আমি নিজের কাছে হেরে যাব আর এই রকম একটা মাছের জন্যে মরে যাব, তা হয় না’ ও বলল, ‘এখন যখন ওকে সুন্দরভাবে টেনে আনতে পারছি, তখন ভগবান আমাকে আরও সহ্য করার শক্তি দেবেন। আমি আরও একশবার ‘আমাদের পিতা’ আর ‘হেইল মেরী’ প্রার্থনা করব। কিন্তু এখনই অবশ্য তা করতে পারছি না।’
ও ভাবল, ‘আমি প্রার্থনাগুলো করে নিয়েছি, মনে করে নাও ভগবান। আমি পরে নিশ্চয়ই করব।’
ঠিক এই সময় ওর দু’হাত দিয়ে ধরে থাকা সুতোয় ও হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে হ্যাঁচকা টান টের পেল। টানটা তীব্র, ওজনদার আর শক্ত।
নিশ্চয়ই ওর মুখের বর্শা দিয়ে ও সুতোয় বাঁধা সিসেগুলোকে আঘাত করছে,’ ও ভাবল। ‘এ তো হতেই হবে, ওকে তো এটা করতেই হবে। অবশ্য এরপরে ও হয়তো লাফও দিতে পারে। কিন্তু আমি চাই যে ও ঘুরতে থাকুক। বাতাস নেবার জন্য লাফ দেওয়া ওর দরকার কিন্তু প্রতিটি লাফের পর ওর মুখে সেখানে বড়শি বিঁধে আছে, সেখানকার কাটাটা আরও চওড়া হয়ে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ওর মুখ থেকেবড়শি খুলেও যেতে পারে।’
ও বলে উঠল, ‘লাফিও না মাছ, লাফ দিও না।’
মাছটা আরও বার কয়েক সুতোটাকে ঝাপটা মারল আর প্রতিবারই ওর মাথা নাড়ার সাথে সাথেই বুড়ো আরও সুতো ছাড়তে লাগল।
‘ওর মুখের যন্ত্রণাটা ধরে রাখতে হবে,’ বুড়ো ভাবে, ‘আমার যন্ত্রণায় কিছু যায় আসে না। আমারটা আমি দমন করতে পারব। কিন্তু ওর যন্ত্রণা ওকে পাগল করে দিতে পারে।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাছটা সুতোয় ঝাপটা মারা বন্ধ করে আবার বৃত্তাকারে আস্তে আস্তে ঘুরতে আরম্ভ করল। এখন বুড়ো ক্রমাগত সুতো টেনে মাছটাকে কাছে নিয়ে আসছে। কিন্তু আবার ওর মাথা ঘুরে জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হলো। ও বাঁ হাত দিয়ে সমুদ্রের জল তুলে মাথায় দিয়ে থাবড়াতে লাগল, তারপর আরও জল নিয়ে ঘাড়ের পেছনে ঘষতে লাগল।
‘আমার তো কোনো খিঁচ ধরেনি,’ ও বিড়বিড় করল, ‘মাছটা শিগগিরই ভেসে উঠবে আর আমি ঠিক চাঙ্গা থাকব। তোমাকে টিকে থাকতেই হবে। একথা একদম বলবে না পর্যন্ত।’
ও গলুইয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল আর একটু সময়ের জন্য সুতোটাকে ফের পিঠের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে নিল। ‘ও যতক্ষণ গোল হয়ে ঘুরতে থাকবে বাইরের দিকে যাবে, ততক্ষণ একটু বিশ্রাম নিয়ে নিই, তারপর ও যখন কাছে আসতে থাকবে, তখন দাঁড়িয়ে ওঠে সুতো টেনে ওকে আরও কাছে নিয়ে আসব,’ ও ঠিক করল।
ওর খুব লোভ হচ্ছিল যে, গলুইয়ে বসে আরও একটু বিশ্রাম নেয়, ততক্ষণে মাছটা নিচে থেকে পুরো একটা বৃত্ত গোল হয়ে ঘুরুক আর সুতো টানা না হোক। কিন্তু যখন সুতোর টান থেকে বোঝা গেল যে, মাছটা ঘুরে ফের নৌকার দিকে আসছে, তখন বুড়ো দাঁড়িয়ে উঠে পায়ের ওপর শক্ত করে ভর রেখে যতখানি পারা যায় সুতো টেনে টেনে নিয়ে আসতে লাগল।
‘আগে কখনও আমি এত ক্লান্ত বোধ করিনি,’ ও ভাবছে, ‘এখন আবার বাণিজ্য বায়ু বইতে শুরু করেছে আর এর ফলে ওকে টেনে আনা সুবিধেজনক হবে। এটা আমার অত্যন্ত দরকার।
‘এবার ও যখন গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে বাইরের দিকে যাবে, তখন আবার একটু বিশ্রাব নেব’ ও বিড়বিড় করল, ‘এখন একটু ভালো লাগছে, আর দুতিনবার ঘুরলেই ওকে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাব।’
ওর খড়ের টুপিটা ওর মাথার অনেক পেছন দিকে হেলে পড়েছে আর ও মাছটা ঘুরে বাইরের দিকে যেতেই সুতোর টানটা শক্ত রেখে গলুইয়ে বসে পড়ল।
‘মাছ, এখন তুমি তোমার কাজ করে যাও, এর পরের বার ঘুরে এলে আমি তোমাকে ধরে নেব।’ ও ভাবে।
সমুদ্র অনেকটা ফুলে উঠেছে। কিন্তু এটা অনুকূল বায়ু আর বাড়ি ফিরতে হলে, এই বাতাসটা দরকার।
ও বিড়বিড় করল, ‘আমি দক্ষিণ-পশ্চিমে নৌকা বাইব। সমুদ্রে কেউ কখনও হারিয়ে যায় না আর আমাদের দ্বীপটা তো অনেক লম্বা।’
যখন তৃতীয়বার ঘুরছে, তখনই ও মাছটাকে প্রথম দেখতে পেল।
প্রথমে ও একটা কালো আবছায়া দেখতে পেল, যেটা নৌকার তলা দিয়ে এত সময় ধরে অতিক্রম করল যে, ও মাছটার দৈর্ঘ্য বিশ্বাসই করতে পারছিল না। ‘না’- ও বলতে লাগল ‘ও এত বড় হতেই পারে না।’ কিন্তু মাছটা সত্যিই বিশালাকৃতি আর পুরো বৃত্ত ঘোরার পরে ও মাত্র ত্রিশ গজ দূরে জলের ওপর ভেসে উঠল আর বুড়ো জলের ওপর ওর লেজটাকে দেখতে পেল। একটা বড় হাঁসুয়ার ফলার চাইতেও বড় আর খুব ফিকে নীল রঙের লেজটা ঘন নীল জলের ওপর উঁচু হয়ে আছে। লেজটা ফের জলের ভেতর আছড়ে পড়ল আর মাছটা যখন জলের ঠিক নিচ দিয়ে সাঁতরে যাচ্ছিল, বুড়ো ওর সুবিশাল আকৃতি আর ওর শরীরের নীল বেগুনি লম্বা দাগগুলো দেখতে পাচ্ছিল। ওর পিঠের পাখনাটা মোড়া আর বুকের দু’পাশের বিশাল দুটো পাখনা ছড়ানো।
এই বারের ঘোরার সময় বুড়ো মাছটার চোখ আর দুটো ধূসর রঙের চোষক মাছ ওর পাশে পাশে সাঁতার কাটছে, দেখতে পেল। কখনও কখনও ওই চোষক মাছ দুটো ওর গায়েও সেঁটে থাকছে আবার কখনও ছিটকে যাচ্ছে। কখনও ওরা ওর শরীরের ছায়ায় ছায়ায় সাঁতার কেটে চলেছে। ও দুটো তিনফুটের ওপর লম্বা আর যখন খুব দ্রুত সাঁতার কাটছে, তখন ওদের সারা শরীর বানমাছের মতো মোচড়াচ্ছে।
বুড়ো এখন খুব ঘামছে, কিন্তু রোদ ছাড়াও অন্য কিছু এর জন্য দায়ী। মাছটা যতবার স্থির শান্তভাবে ঘুরে ভেতরের দিকে আসছে,
ততবারই ও সুতো টেনেটেনে মাছটাকে আরও কাছে নিয়ে আসছে আর ও প্রায় নিশ্চিত যে আর বার দুয়েক ঘুরে এলেই ও হারপুন ছুঁড়ে ওকে গেঁথে ফেরার মতো সুযোগ পেয়ে যাবে।
‘কিন্তু ওকে কাছে, আরো কাছে খুব কাছে এনে ফেলতে হবে।’ ও ভাবল, ‘ওর মাথায় তাক করে মারলে হবে না, ওর হৃৎপিণ্ড লক্ষ্য করে হারপুন গাঁথতে হবে।’
ও জোরে জোরে বলে উঠল, ‘বুড়ো মাথা ঠাণ্ডা রাখ, দৃঢ় হয়ে থাক।’
এরপরের বার মাছটা ঘুরে আসতে ওর পিঠটা জলের ওপর ভেসে উঠল, কিন্তু এখনও ও নৌকা থেকে বেশ খানিকটা দূরে রয়েছে। তারপরের বার ও তখনও অনেকটাই দূরে তবে জলের ওপরে ওর শরীর আরও উঁচুতে ভেসে উঠেছে। বুড়ো এবার স্থির নিশ্চিত হল যে, আরো খানিকটা সুতো টেনে আনলে ও মাছটাকে একেবারে নৌকার পাশে নিয়ে আসতে পারবে।
ও হারপুনটাকে অনেক আগেই দড়ি-টড়ি বেঁধে তৈরি রেখেছিল। হালকা দড়ির বান্ডিলটা একটা গোল ঝুড়ির মধ্যে রাখা আর গড়ির শেষ প্রান্তটা গলুইয়ের একটা কড়ার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা।
মাছটা এবার ওর ঘোরার বৃত্তে ঘুরে আসছে, কি শান্ত আর সুন্দর দেখতে। ওর বিশাল লেজটা কেবল নড়ছে। বুড়ো ওকে আরো কাছে আনার জন্যে যত পারে সুতো টানতে লাগল। এক পলকের জন্যে মাছটা একটু কাত হল। তারপরেই আবার সোজা হয়ে আরেকটা বৃত্তে ঘুরতে শুরু করল।
‘আমি ওকে নড়াতে পেরেছি’, বুড়ো বলে উঠল, ‘আমি ওকে তাহলে নড়িয়েছি।’
বুড়োর আবার মূর্ছা যাবার মতো মাথাটা ঘুরে উঠল, কিন্তু ও যতটা পারে চাপ রেখে ঐ অসাধারণ মাছটার টানটা ধরে রাখল ‘আমি ওকে নড়াতে পেরেছি’, ও ভাবল, ‘হয়তো এইবার আমি ওকে উল্টে ফেলতে পারব। হাত, টানো, টানো; পা শক্ত হয়ে থাকো; মাথা আমার জন্যে আরো কিছুক্ষণ কাজ করো। আমার জন্য আরো কিছুক্ষণ; তোমার কখনোই কিছু হয়নি। এবার আমি ঠিক ওকে টেনে নিয়ে আসতে পারব।’
কিন্ত যখন ও মাছটা কাছাকাছি আসবার আগেই সমস্ত প্রচেষ্টা দিয়ে, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে টানতে চেষ্টা করল, মাছটা একটু কাত হয়েই ফের সোজা হয়ে গেল আর সাঁতরে দূরে চলে গেল।
‘মাছ,’ বুড়ো বলে উঠল, ‘মাছ, তোমাকে তো শেষ পর্যন্ত মরতেই হবে। তুমি কি আমাকেও মারতে চাও?’
‘এভাবে কিছুই করা যাবে না’ বুড়ো ভাবল। ওর মুখের ভেতরটা পর্যন্ত এমন শুকিয়ে গেছে যে ও কথা বলতে পারছে না। কিন্তু এখন জলের বোতলের দিকে হাত বাড়ানো যাবে না। ‘এবার আমি ওকে ঠিক নৌকার পাশে টেনে আনব,’ ও ভাবল, ‘আরও কয়েক পাক সহ্য করার মতো গায়ের জোর আর নেই। না না, আছে, ‘ ও নিজেকে বলল, ‘তুমি চিরকাল এইভাবে চালিয়ে যেতে পারবে।’
এরপরের পাকে ও মাছটাকে প্রায় হাতে পেয়ে গেছিল। কিন্তু মাছটা আবার সোজা হয়ে আস্তে আস্তে সাঁতরে দূরে চলে গেল।
‘তুমি আমাকে মেরে ফেলছ, মাছ’, বুড়ো ভাবে, ‘অবশ্য তোমার সে অধিকার আছে। ভাই, তোমার চেয়েও অসাধারণ, সুন্দর, ধীর-ঠাণ্ডা আর মহান মাছ আমি কখনও দেখিনি। এস আমাকে মার। এখন আর কে কাকে মারবে, তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।’
‘এবার কিন্তু তোমার মাথায় গণ্ডগোল হচ্ছে,’ বুড়ো ভাবে, ‘তোমার মাথা ঠিক রাখতে হবে। মাথা পরিষ্কার রাখো, আর কী করে মানুষের মতো সহ্য করতে হয় ভাবো। অথবা মাছের মতো।
‘মাথা, পরিষ্কার হও’- বুড়ো এমন সুরে বলে উঠল, যে ও নিজেই প্রায় নিজের কথা শুনতে পেল না,’ ‘পরিষ্কার হও।’
আরও দুবারের পাকে ওই একই পুনরাবৃত্তি হল। ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না,’ বুড়ো ভাবে, ‘প্রতিবারই মনে হচ্ছে, বুঝি এবারেই অজ্ঞান হয়ে যাব। জানি না, কিন্তু আরও একবার চেষ্টা করি।’ ও আরও একবার টেনে টেনে মাছটাকে আরো কাছে আনবার চেষ্টা করল। আর মাছটা যখন টানের চোটে কাত হয়ে পড়েছে, তখনই মনে হল, এবার বুঝি ও মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। কিন্তু মাছটা আবার সোজা হল আর বাতাসে বিশাল লেজ নাড়িয়ে খুব ধীরে সাঁতরে দূরে চলে গেল।
বুড়ো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ‘আমি আবার চেষ্টা করব।’ ওর হাত দুটো এখন মণ্ডের মতো নরম হয়ে গেছে আর মাঝে মাঝে কেবল কয়েক পলকের জন্য ও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
ও আবার চেষ্টা করল, কিন্তু ফল একই। ‘তাহলে’- ও ভাবছে, আর প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় এসে আবার ভাবছে, ‘আমি আরো একবার চেষ্টা করব।’
ও ওর সমস্ত যন্ত্রণা, ওর শরীরের অবশিষ্ট শক্তি আর ওর বহুক্ষণ আগে ফুরিয়ে যাওয়া আত্মাভিমানের শেষ বিন্দুটুকু একত্র করে মাছটার নিদারুণ যন্ত্রণাকাতরতার বিরুদ্ধে শেষ লড়াই চালাল। মাছটা একপাশে পুরো কাত হয়ে ওইভাবেই ভেসে থেকে থেকে সাঁতরাতে লাগল, ওর ছুরির ফলার মতো চঞ্চু নৌকার কাঠে প্রায় মধ্যে প্রায় ঠেকেছে আর ওইভাবেই জলের মধ্যে ওর বিশাল, লম্বা চওড়া রূপোর মতো শরীরটা নীল বেগুনি ডোরা দাগ নিয়ে সীমাহীনের মতো নৌকাটা অতিক্রম করে চলেছে।
বুড়ো সুতোটা নিচে নামিয়ে পা দিয়ে চেপে ধরল আর হারপুনটা তুলে নিয়ে যতটা সম্ভব উঁচু করে ধরে শরীরের সমস্ত শক্তি আর শেষ মুহূর্তের ভেতর থেকে আরো শক্তি জড় করে মাছটার বুকের পাখনা, যেটা প্রায় ওর বুকের কাছ পর্যন্ত উঁচু হয়ে রয়েছে, তার ঠিক পাশে আমূল ঢুকিয়ে দিল। ও টের পাচ্ছে, লোহার ফলাটা গভীরে ঢুকে যাচ্ছে আর ও ওটার ওপর পুরো শরীরের ভর রেখে নিজের সমস্ত ওজনটা চাপিয়ে প্রাণপণে ফলাটা আরো ভেতরে ঠেলে দিল।
এই সময় মাছটা যেন সজীব হয়ে উঠল, ওর শরীরের মধ্যে মৃত্যুর পদধ্বনি আর ও ওর সুবিশাল লম্বা চওড়া শরীর, ওর সমস্ত শক্তি আর সৌন্দর্য নিয়ে জলের ওপর শেষ লাফ দিল। মনে হল নৌকায় বুড়োর মাথার ওপরে শূন্যে ওর শরীরটা কিছুক্ষণের জন্য ভেসে রয়েছে। তারপরেই ও প্রচণ্ড শব্দ করে জলের ভেতর পড়ল, জল ছিটকে উঠে বুড়োর সারা শরীর, পুরো নৌকা ভিজিয়ে দিল।
বুড়োর চেতনা প্রায় লুপ্ত, অবসন্ন, ভালো করে দেখতেও পাচ্ছে না। কিন্তু সেই অবস্থাতেই ও হারপুনের দড়িটা ঠিক করে দুটো ক্ষতবিক্ষত হাতের মাঝখানে দিয়ে দড়িটা ছাড়তে লাগল। তারপর যখন ওর দৃষ্টি একটু স্বচ্ছ হয়ে এল, তখন দেখল, মাছটা চিত হয়ে আসছে, ওর বড় রূপালি পেটটা উঁচু হয়ে রয়েছে। মাছটার ঘাড় থেকে হারপুনের ডাণ্ডাটা কোনাকুনি বেরিয়ে রয়েছে আর ওর হৃৎপিণ্ডের রক্ত সমুদ্রের জল লাল করে তুলছে। এক মাইল গভীর ওই জায়গায় নীলজলটা প্রথমে জলের তলার অগভীর চড়ার মতো কালচে লাগছিল, তারপর ওটা আস্তে আস্তে মেঘের মতো ছড়িয়ে গেল। মাছটা তখন ওর ঠাণ্ডা, রূপালি শরীরটা নিয়ে ঢেউয়ের তালে তালে ভাসছে।
বুড়োর যেটুকু দৃষ্টিশক্তি অবশিষ্ট আছে, তাই দিয়ে সাবধানে ও তাকিয়ে দেখল। তারপরে হারপুনের দড়িটা নৌকার পাশের আংটায় দু’পাক ঘুরিয়ে বেঁধে ফেলে, হাতের ওপর মাথা রাখল।
‘মাথাটা পরিষ্কার রেখ।’ ও গলুইয়ের কাঠের ওপর মুখ রেখে বিড়বিড় করছে, ‘আমি একটা ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত বুড়ো। কিন্তু আমি, আমার ভাই এই মাছটাকে মেরে ফেললাম। আর এখন আমাকে ক্রীতদাসের মতো খাটতে হবে।’
‘এখন মাছটাকে নৌকার পাশে বেঁধে ফেলার জন্য আমাকে ফাঁস, দড়ি এইসব তৈরি করতে হবে।’ ও ভাবল, ‘আমরা দুজনও যদি থাকতাম, তাহলেও নৌকাটা জলে ভরে মাছটাকে নৌকায় তুলে তারপর জল ছেঁচে ফেললেও হতো না, কারণ, এই নৌকায় মাছটা ধরতই না। আমাকেই সব করতে হবে, তারপর মাছটাকে কাছে টেনে এনে নৌকার সঙ্গে ভালো করে বেঁধে ফেলতে হবে, তারপর মাস্তুলটা বসিয়ে পাল খাটিয়ে বাড়ির দিকে নৌকা বাইতে হবে।
ও মাছটাকে নৌকার ঠিক পাশে টেনে আনতে শুরু করল, যাতে ওর কানকোর মধ্যে দিয়ে একটা দড়ি ঢুকিয়ে ওর মুখের ভেতর দিয়ে বার করে এনে ওর মাথাটা নৌকার গলুইয়ের পাশে বেঁধে ফেলা যায়। ‘আমি ওকে এবার ভালো করে দেখতে চাই, ওকে ছুঁতে চাই, ওকে অনুভব করতে চাই,’ ও ভাবল, ‘ও তো আমার সৌভাগ্য। অবশ্য সে জন্যেই ওকে ছুঁতে চাইছি না। মনে হয় ওর হৃৎপিণ্ডটা আমি অনুভব করেছি। যখন আমি দ্বিতীয়বার হারপুনের ডাণ্ডাটায় চাপ দিয়ে আরো ভেতরে ঠেলেছি, তখন। এবার মাছটাকে টেনে নিয়ে এসো, আর বেঁধে ফেলো। একটা ফাঁস দিয়ে ওর লেজটা আর একটা ফাঁস দিয়ে ওর মাঝখানটা জড়িয়ে নৌকার সঙ্গে বেঁধে ফেলো।’
‘কাজে লেগে পড়ো বুড়ো’, ও বলে উঠল, আর একটুখানি জল খেয়ে নিল, ‘লড়াই শেষ, এখন ভূতের মতো খাটতে হবে।’
ও ওপরে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর মাছটার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। খুব নিবিষ্টভাবে সূর্যের দিকেও দেখল। ‘এখনও বেলা দুপুর গড়ায়নি,’ ও ভাবল, ‘আর বাণিজ্য বায়ুও উঠছে। সুতোগুলোর এখন আর কোনো গুরুত্ব নেই। বাড়ি ফিরে ছেলেটা আর আমি, দু’জনে মিলে ওগুলো পাকিয়ে ফেলব।’
‘মাছ, এবার কাছে এসো, ও বলল। কিন্তু মাছটা কাছে আসে না, সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে ওঠানামা করে। তখন বুড়ো নৌকাটাকেই ওর পাশে নিয়ে এল। যখন ও মাছটার সঙ্গে নৌকাটাকে সমান্তরাল করে মাছটার মাথাটা গলুইয়ের গায়ে লাগাল, তখন ও বিশ্বাসই করতে পারছে না মাছটার বিশালতা। যাই হোক, ও গলুইয়ের আংটা থেকে হারপুনের দড়িটা খুরে নিয়ে মাছটার কানকোর মধ্যে ঢুকিয়ে মুখ দিয়ে টেনে বার করে নিল, তারপর ও বিশাল ঠোঁট দুটোকে একপাক জড়িয়ে নিয়ে অন্য দিকের কানকোর মধ্য দিয়ে বার করে আবার ঠোঁট দুটোকে এক পাক জড়িয়ে নিয়ে দড়ির দুই প্রান্ত কষে গিট বেঁধে গলুইয়ের আংটার সঙ্গে ফের শক্ত করে বেঁধে দিল। তারপর বাকি দড়িটা কেটে নিয়ে পাছ-গলুইয়ে গেল লেজটা ফাঁস দিতে। মাছটার গায়ের রঙ এখন আর আগেকার নীল বেগুনি আর রূপালি নেই। পুরো রূপালি সাদা হয়ে গেছে আর ওর গায়ের ডোরাগুলো ওর লেজের মতো হাল্কা বেগুনি রঙ হয়ে গেছে। ডোরাগুলো মানুষের আঙ্গুল ছড়ানো হাতের চেয়েও চওড়া আর মাছটার চোখ দুটো এখন পেরিস্কোপের আয়নার মতো অথবা শোভাযাত্রায় হেঁটে যাওয়া কোনো সাধুসন্তের মতো নির্লিপ্ত, উদাসীন I
‘ওকে এভাবে মারা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না,’ ও বলল। মাথায় জল চাপড়ানোর পর থেকে ওর এখন একটু সুস্থ লাগছে আর ও জানে যে, এখন আর মাছটা পালাতে পারবে না, তাই ওর মাথাও এখন পরিষ্কার কাজ করছে। ও ভাবল, মাছটার পনেরোশো পাউন্ড এর ওপর ওজন হবে, হয়তো আরো অনেক বেশি। যদি প্রতি পাউন্ড মাংস তিরিশ সেন্ট দরে মাছটার দুই-তৃতীয়াংশ বেচতে পারি?
‘একটা পেন্সিল দরকার,’ ও বলে উঠল, ‘আমার মাথাটা এখনও তত পরিষ্কার নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, মহান দি মাজ্জিও আমার জন্যে আজ নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন। আমার তো পায়ের গোড়ালির হাড় বাড়েনি। কিন্তু দুটো হাত আর পিঠ সত্যিই বড় কষ্ট দিচ্ছে।’
‘গোড়ালির হার বাড়াটা কী যে ব্যাপার আমি জানি না,’ ও ভাবল, ‘বোধহয় আমরা জানতেও পারি না, যে ওটা আমাদের হয়েছে।’
ও মাছটাকে গলুইয়ের সাথে পাছ-গলুইয়ে আর নৌকার মাঝখানকার কাঠের সঙ্গে ভালো করে বাঁধল। মাছটা এত বিশাল, যে মনে হচ্ছিল ওর নৌকার চাইতেও অনেক বড়। আরেকটা নৌকাকে ও পাশাপাশি বাঁধছে। ও একটুকরো ছোট দড়ি কেটে নিয়ে মাছটার মুখের নিচের চোয়ালটার আর ওপরের লম্বা ঠোঁটটা এক সঙ্গে বেঁধে দিল, যাতে মুখটা না খোলে আর নৌকা বাওয়াটা সহজ হয়। তারপর ও মাস্তুলটা তুলল আর ওর কোঁচের লাঠিটা দিয়ে তালিমারা পালটা খাটিয়ে ফেলল। নৌকা চলতে শুরু করল আর ও পাছ-গলুইয়ে অর্ধশায়িত হয়ে দক্ষিণ পশ্চিমে নৌকা ভাসিয়ে দিল।
দক্ষিণ-পশ্চিম কোন দিকটা, সেটা জানার জন্য ওর কোনো কম্পাস প্রয়োজন হয় না। কেবল বাণিজ্যবায়ুর বওয়া থেকে আর পালের ফুলে ওঠা দেখেই ওর বোঝা হয়ে যায়। ‘ছোট্ট করে একটা সুতো বড়শি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া যাক, কিছু খাদ্যের আর পানীয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, শরীরের জল শুকিয়ে গেছে,’ কিন্তু কোনো বড়শিই ও খুঁজে পেল না, আর টোপের সার্ডিন মাছগুলো তো পচেই গেছে। তাই ও নৌকার পাশ দিয়ে ভেসে যাওয়া কিছু হলদে রঙের উপসাগরের আগাছা ওও কোঁচ দিয়ে গেঁথে তুলে ফেলল আর ওগুলো ঝাঁকাতেই নৌকার পাটাতনের ওপর বেশ কিছু কুচো চিংড়ি ঝরে পড়ল। প্রায়বারো চৌদ্দটা কুচো চিংড়ি পাটাতনের ওপর লাফাচ্ছে, ছটকাচ্ছে। বুড়ো, বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ওগুলোর মাথা ছিঁড়ে ফেলে, খোসা লেজসমেত চিবিয়ে খেল। যদিও ওগুলো খুবই ছোট ছোট, কিন্তু ও জানে যে, ওগুলো খুব পুষ্টিদায়ক, সুস্বাদু তো বটেই।
ওর বেতালে এখনও দুবার খাবার মতো জল আছে আর চিংড়ি মাছগুলো খাবার পর ও আধ চুমুক মাত্র জেল খেল। অতিরিক্ত বোঝা সত্ত্বেও নৌকাটা কিন্তু ভালোই এগোচ্ছে আর ও বগলের তলায় হালটা চেপে ধরে নৌকা চালাতে লাগল। ও মাছটা দেখতে পাচ্ছে আর ওর নিজের হাত দুটোর এবং কাঠে ঠেসান দেওয়া পিঠের অবস্থা দেখে ও এখন বুঝতে পারছে, যে ব্যাপারটা সতিই ঘটেছে এবং এটা একটা স্বপ্ন নয়। শেষের দিকে যখন ওর শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ, তখন এক সময় ওর মনে হয়েছিল যে, বোধহয় সমস্ত ব্যাপারটা স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে। তারপর যখন ও দেখল, যে মাছটা জলের ওপরে উঠেছে, লাফ দিয়ে ওপরে উঠে পলকের জন্যে যেন আকাশে ঝুলে রইল তারপর শব্দ করে জলে আছড়ে পড়ল, তখন ওর ধারণা হল, যে অলৌকিক কিছু যেন ঘটছে আর ও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপরেই ও আর ভালো করে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। অবশ্য এখন ও আবার আগের মতোই সব কিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।
এখন ও জানে যে মাছটাও আছে আর ওর হাতের আর পিঠের যন্ত্রণাও স্বপ্ন নয়। ‘হাত খুব শিগগিরই ঠিক হয়ে যাবে,’ ও ভাবল, ‘আমি রক্ত বের করে হাত দুটো পরিষ্কার করে নিয়েছি আর সাগরের নোনা জল কাটাগুলো সারিয়ে তুলবে। উপসাগরের এই কালো জল সবচেয়ে নিরাময়কারী। এখন কেবল মাথাটা ঠিক রাখতে হবে। হাত দুটো তাদের কাজ করেছে আর আমাদের নৌকা ভালোই চলছে। মাছটার মুখটা বেঁধে রেখেছি আর ওর লেজটা সোজা ওপর নিচে খাড়া রয়েছে, তাই আমরা দুই ভাই এর মতো নৌকা বেয়ে চলেছি।’ এরপরেই ওর চিন্তাটা আবার ঘোলাটে হয়ে গেল আর ও ভাবল, আমি মাছটাকে নিয়ে যাচ্ছি, না মাছটাই আমাকে নিয়ে যাচ্ছে? আমি যদি ওকে পেছনে বেঁধে টেনে নিয়ে যাই তাহলে কোনো কথা নেই। অথবা মাছটা যদি নৌকাতে থাকত, ওর সমস্ত মান-মর্যাদা হারিয়ে, তাহলেও কোনো কথা ছিল না।’ কিন্তু ওরা দুজনেই তো পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা হয়ে এক সঙ্গে চলছে, তাই বুড়ো ভাবে, ‘ঠিক আছে, ও যদি খুশি হয়, তাহলে আমাকে টেনে নিয়ে চলুক। আমি কেবল কৌশল অবলম্বন করে ওর চেয়ে ভালো জায়গায় আছি, অথচ ও তো আমার কোনো ক্ষতি চায়নি।’
ওরা বেশ ভালভাবেই এগোচ্ছিল। বুড়ো সাগরের নোনা জলে হাত দুটো ফের ভিজিয়ে নিল আর মাথাটা পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করল। আকাশে পুঞ্জ মেঘের উঁচু উঁচু স্তূপ আর আরো ওপরে ঘন মেঘের ঘটা দেখে বুড়ো বুঝতে পারল যে, সারা রাত বাতাস বইবে। বুড়ো বারবার মাছটার দিকে চোখ ফেলে নিশ্চিত হতে চাইছিল যে, ব্যাপারটা সত্যিই ঘটেছে। প্রথম হাঙরটা আক্রমণ করার এক ঘণ্টা আগের ঘটনা এটা।
হাঙরটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। প্রায় এক মাইল গভীর সমুদ্রের জলে মাছটার রক্ত ঘন মেঘের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল আর হাঙরটা গভীর জল থেকে রক্তের গন্ধে ওপরে উঠে এসেছিল। কোনো সতর্কতা অবলম্বন না করেই ও এত দ্রুতগতিতে উঠে এসেছিল যে জলের উপরিভাগ ভেদ করে একেবারে শূন্যে রোদের মধ্যে উঠে পড়েছিল। তারপরে ফের জলে পড়ে রক্তের গন্ধ শুকে শুকে নৌকা আর তার সাথে বাধা মাছটার পেছন পেছন সাঁতরে এসেছিল। কখনও কখনও ও গন্ধটা হারিয়ে ফেলছিল, কিন্তু আবার ঠিক গন্ধটা অথবা তার একটু আভাস পেয়েই পূর্ণগতিতে দ্রুত নৌকার দিকে এগিয়ে আসছিল। ওটা একটা মস্ত বড় ম্যাকো হাঙর ছিল। ওর শরীরের গড়নটা এমন যে, সমুদ্রের দ্রুততম মাছের সঙ্গে সাঁতারে পাল্লা দিতে পারে, আর ওর চোয়াল ছাড়া। ওর পিঠটা ছুরিমাছের রূপালি আর গায়ের চামড়াটা মসৃণ, বাদ দিলে ছুরিমাছের পিঠের মতোই নীল, ওর পেটটা রূপালি আর গায়ের চামড়াটা মসৃণ, দেখতেও সুন্দর। ওর মস্ত চোয়ালটা বাদ দিলে ছুরিমাছের মতোই ওর শরীরের গড়ন। ওর চোয়ালের হাঁ এমন শক্ত করে বন্ধ আর ও জলের ঠিক নিচ দিয়ে দ্রুতগতিতে সাঁতরে আসছে, ওর পিঠের উঁচু পাখনা সোজা তীরের মতো জল কেটে চলেছে। ওর চোয়ালের বন্ধ দুই ঠোঁটের ভেতর আট সারি তীক্ষ্ণ দাঁত ভেতর থেকে বাঁকানো। বেশির ভাগ হাঙরের মতো ওর দাঁতগুলো কিন্তু সাধারণ পিরামিড আকৃতির নয়। থাবার বাঁকানো আঙ্গুলের মতো বাঁকা। বুড়োর হাতের আঙ্গুলের মতোই প্রায় লম্বা আর দাঁতের দুপাশেই ক্ষুরের মতো ধার। সমুদ্রের সব মাছকে খাবার জন্যেই যেন এদের সৃষ্টি করা হয়েছে আর এগুলো এত দ্রুতগতি, এত শক্তিশালী আর এমন অস্ত্র-সজ্জিত যে, ওদের কোনো শত্রু নেই। এখন ও মাছটার রক্তের টাটকা গন্ধ পেয়ে গতি বাড়িয়েছে আর পিঠের নীল পাখনা দ্রুত জল কেটে এগিয়ে আসছে।
যখন বুড়ো ওকে আসতে দেখল তখন বুঝল যে, এই হাঙরটার কোনো ভয় ডর নেই। আর ও যা চায় ঠিক তাই করবে। বুড়ো হাঙরটার এগিয়ে আসা দেখতে দেখতে হারপুনটা দড়ি বেঁধে তৈরি রাখল। মাছটাকে বাঁধার জন্য দড়িটা কাটতে হয়েছিল বলে হারপুনের দড়িটা ছোট হয়ে গেছে।
বুড়োর মাথাটা এখন একদম পরিষ্কার আর মনকে দৃঢ় সংকল্প করে নিয়েছে, কিন্তু জানে যে কোনো আশা নেই। ও ভাবলো, ‘কোনো ভালো জিনিসই চিরকাল থাকে না।’ হাঙরটা একদম কাছে এসে পড়েছে, ও শেষবারের মতো ওই বিশাল অসাধারণ মাছটাকে একবার দেখে নিল। ভাবল, ‘এটা যদি একটা স্বপ্ন হত। ওর আক্রমণ করা আটকাতে পারব না, কিন্তু ওকে হয়তো মারতে পারব। ‘দেন্তুসো, তোর মায়ের ভাগ্য খারাপ।’
হাঙরটা দ্রুত পাছ-গলুইয়ের কাছে এগিয়ে এল আর যখন ও মাছটাকে আক্রমণ করল, বুড়ো দেখল ওর বিরাট হাঁ করা মুখ, ওর দুটো অদ্ভুত চোখ, আর মাছটার লেজের ঠিক ওপরের মাংসের ওপর বসে যাওয়া ওর দু’সারি তীক্ষ্ণ দাঁতের আওয়াজ। হাঙরটার মাথাটা জলের ওপর রয়েছে আর পেছনটা জলের ওপরে উঠে আসছে আর বুড়ো শুনতে পাচ্ছে ওর ওই বিশাল মাছের শরীর থেকে চামড়া সমেত মাংস ছিঁড়ে নেওয়ার শব্দ, ঠিক এমনি সময় ও হাঙরটার মাথায়, যেখানে দু’চোখের মধ্যবর্তী রেখাটা নাক থেকে সোজা পেছনে চলে যাওয়া রেখাটার সঙ্গে কাটাকুটি করেছে, সেই বিন্দুতে হারপুনটা আমূল বসিয়ে দিল। আসলে এ রকম কোনো রেখারই অস্তিত্ব নেই। কেবল হাঙরটার বিরাট ভারী মাথাটা, আর বড় বড় দুটো চোখ আর সবকিছু গিলে খাবার রাক্ষুসে হাঁ। কিন্তু ওর মস্তিষ্কটা ঠিক ওই জায়গায় আর বুড়ো ঠিক ঐ জায়গায় হারপুনের ফলাটা ঢুকিয়ে দিল। ওর দুই রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হাত দিয়ে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। কোনো আশা নেই। দৃঢ় সংকল্প মনে চরম বিদ্বেষে ও হারপুনটা গেঁথে দিল।
হাঙরটা উল্টে গেল আর বুড়ো দেখল ওর চোখ দুটোতে প্রাণের সাড়া নেই। তারপরেই হাঙরটা আবার ওলোটা-পালোট খেল আর দড়িটা ওর শরীরে দু পাক জড়িয়ে গেল। বুড়ো বুঝতে পারছে যে, হাঙরটা মরেই গেছে, কিন্তু হাঙরটা বোধহয় মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছে না। তারপর চিৎ হয়ে, লেজ আছড়াতে আছড়াতে আর হাঁ চোয়াল খোলা-বন্ধ করতে করতে হাঙরটা একটা স্পীডবোটের মতো জলটাকে যেন চষে ফেলতে লাগল। যেখানে ও লৈজ আছড়াচ্ছে, সেখানে জল সাদা হয়ে উঠছে আর শরীরের তিন-চতুর্থাংশ জলের একেবারে ওপরে, এমন সময় দড়িটা টানটান হয়ে, কাঁপতে কাঁপতে পট করে ছিঁড়ে গেল। হাঙরটা কিছুক্ষণ জলের ওপর স্থির হয়ে ভেসে রইল আর বুড়ো ওকে দেখতে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে জলের নিচে তলিয়ে গেল।
বুড়ো জোরে জোরে বলে উঠল, ‘প্রায় চল্লিশ পাউন্ড মাংস নিয়ে গেল।’ ‘আমার হারপুনটা আর বাকি দড়িটাও নিয়ে গেল,’ বুড়ো ভাবল, ‘আর এখন আমার মাছটার শরীর থেকে আবার রক্তঝরা শুরু হয়েছে আর এবার আরো হাঙর আসবে।’
