দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি – ৬
মাছটার অঙ্গহানির বিকৃতিটা দেখতে হবে বলে ও আর মাছটার দিকে তাকাচ্ছে না। যখন হাঙরটা মাছটাকে আক্রমণ করেছিল, ওর মনে হয়েছিল, বুঝি ওকেই আক্রমণ করছে।
‘কিন্তু আমার মাছকে আক্রমণ করেছে বলে হাঙরটাকে আমি মেরে ফেলেছি’ ও ভাবছে, ‘যত হাঙর আমি দেখেছি, তার মধ্যে এই দেভসোটাই সবচেয়ে বিশাল, আর ভগবান জানেন, আমি সত্যিই বড় বড় হাঙর দেখেছি।’
‘কোনো ভালো জিনিসই শেষপর্যন্ত থাকে না’, ও ভাবছে, ‘এখন মনে হচ্ছে, এটা একটা স্বপ্ন হলেই ভালো হত, আমি মাছটাকে কখনোই গাঁথিনি আর আমার খবরের কাগজ-পাতা বিছানায় একা একা শুয়ে আছি, এটাই বোধ হয় ভালো ছিল।’
‘কিন্তু মানুষ তো হারার জন্য জন্মায়নি,’ ও বলল, ‘একটা মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু কক্ষনো হারবে না।’ ‘অবশ্য আমি মাছটাকে মারার জন্যে দুঃখিত’ ও ভাবে, ‘এখন দুঃসময় আসছে, আর আমার হাতে হারপুনটা পর্যন্ত নেই।’ ‘দেস্তুসোটা বড় শক্তিশালী, বুদ্ধিমান, দক্ষ এবং নৃশংস ছিল। কিন্তু আমি ওর চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান। না, তা হয়তো নয়।হয়তো আমার হাতে ওর চেয়েও ভালো অস্ত্র ছিল।’ ও বলে উঠল, ‘বুড়ো, বেশি ভেবো না, যে গতিপথে এগোচ্ছ, সেই পথেই চল আর যখন বিপদ আসবে, তখন তাকে প্রতিহত করো।’
আবার ও ভাবছে, ‘কিন্তু আমাকে তো ভাবতেই হবে। কারণ ভাবনা ছাড়া আমার হাতে তো এখন আর কিছুই নেই। এই ভাবনা, আর বেসবল, এই দুটো। আমি যে ভাবে হাঙরটার ঠিক মগজের মধ্যে হারপুনটা ঢুকিয়ে ছিলাম, সেটা মহান মাজ্জিওর পছন্দ হতো কিনা, জানি না। এটা এমন কিছু বিরাট ব্যাপার নয়। যে কোনো লোকই এটা করতে পারত। কিন্তু গোড়ালির হাড় বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারটার চাইতে আমার এই ক্ষতবিক্ষত হাতের ব্যাপারটা কি আরো বড় বোঝা? আমি বুঝতে পারি না। আমার তো গোড়ালি নিয়ে কখনো কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি, অবশ্য একবার ছাড়া যেবার আমি সাঁতার কাটতে কাটতে একটা কাঁটাওয়ালা মাছের (স্টিং-রে) ওপর পা চাপিয়ে ছিলাম আর ওটা তৎক্ষণাৎ আমার গোড়ালিতে কাঁটা বিধিয়ে আমার পায়ের হাঁটুর নিচে থেকে একেবারে অবশ করে দিয়েছিল আর কি অসহ্য যন্ত্রণাই না সহ্য করতে হয়েছিল।’
ও বলে উঠল, ‘বুড়ো, কিছু হাসি-খুশির কথা ভাব, প্রতিটি মিনিটে তুমি বাড়ির কাছাকাছি হচ্ছ। আরে চল্লিশ পাউন্ড চলে যাওয়া মানে তুমি তো আরো হাল্কা হয়ে নৌকা চালাচ্ছ।’
স্রোতের ভেতর দিকটায় এসে গেলে কী ঘটতে পারে, সেটা ও ভালোই জানে। কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই।
কিন্তু ও জোরে জোরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, কিছু করা যায় বৈ কি! আমি একটা বৈঠার ডগায় আমার ছুরিটা বেঁধে নিতে পারি।’
অতএব ও হালটা বগলের তলায় আর পালের দড়িটা পায়ের তলায় চেপে ধরে ছুরিটা বৈঠার ডগায় শক্ত করে বেঁধে নিল।
‘এখন-’ ও বলল, ‘আমি এখনও একটা বুড়ো লোক, কিন্তু এখন আমি আর নিরস্ত্র নই।’
বাতাস এখন জোর বইছে আর নৌকা পালের হাওয়ায় ভালোই চলছে। ও মাছটার সামনের দিকটা কেবল দেখছে আর মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে।
ও ভাবছে, ‘আশা না করাটাই তো মূর্খামি। তাছাড়া আমি তো বিশ্বাস করি যে, আশা হারিয়ে ফেলা পাপ। আঃ, পাপের কথা ভেবো না। পাপ ছাড়াও এখনও প্রচুর সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া এই পাপ-টাপের ব্যাপার আমি কী-ই বা বুঝি।’
‘এই ব্যাপারে আমার কোনো জ্ঞান নেই, আর আমি ঠিক জানি না এসব বিশ্বাস করি কি না। হয়তো মাছটাকে মারাতে আমার পাপ হয়েছে। আমার মনে হয় এটা পাপ, যদিও আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি নিজে বেঁচে থাকার জন্যে আর অনেক লোকের মুখে খাদ্য জোগানোর জন্যে। কিন্তু তাহলে তো সবকিছুতেই পাপ আছে। না, পাপের কথা ভেবো না। এসব কথা ভাবার জন্যে বড় দেরি হয়ে গেছে আর তাছাড়া পাপের কথা ভাবার লোক তো টাকা দিয়ে রাখাই আছে। তাদেরই পাপের কথা ভাবতে দাও। তোমার জন্ম হয়েছে মেছুড়ে হবার জন্যে, যেমন মাছের জন্ম হয়েছে মাছ হবার জন্যে। সান পেদ্রো মেছুড়ে ছিল, মহান দি মাজ্জিও-র বাবাও মেছুড়ে ছিল।’
কিন্তু ওর জীবনে যা কিছুর সঙ্গে ও জড়িয়ে ছিল, সে সব জিনিস সম্পর্কেই ও চিন্তা করতে ভালোবাসত আর বা ওর কাছে রেডিও-ও ছিল না, বা ওর কাছে রেডিও-ও ছিল না, ও ভাবতে লাগল, ‘তুমি কেবল বেঁচে থাকার জন্যে আর খাদ্য হিসেবে বেচার জন্যেই মাছটাকে মারনি। তুমি যেহেতু একজন মেছুড়ে, সেই জন্যে আর নিজের অহমিকা বজায় রাখবার জন্যেই মাছটাকে মেরেছ। যখন মাছটা বেঁচে ছিল, তখন তুমি ওকে ভালোবেসেছিলে। যদি তুমি ওকে ভালোবাস, তাহলে ওকে মারাটা পাপ নয়। নাকি, বেশি পাপ?’
ও বলে উঠল, ‘বুড়ো, তুমি বড় বেশি ভাবছ।’ তারপরেই আবার ভাবছে, ‘কিন্তু তুমি ওই ‘দেন্তুসো’-কে মারাটা খুব উপভোগ করেছ। তুমি যেমন জ্যান্ত মাছ খেয়ে বেঁচে থাক, ও-ও তো তেমনি। ও তো সমুদ্রের ধাঙর নয় অথবা কিছু হাঙরের মতো সর্বগ্রাসী রাক্ষসও নয়। ও তো সুন্দর, রাজকীয়, আর কোনোকিছুকেই ভয় পেত না।’
‘আমি ওকে আত্মরক্ষার্থে মেরেছি’, বুড়ো জোরে জোরে বলে উঠল, ‘আর আমি ওকে ভালোভাবেই মেরেছি।’
‘তাছাড়া’- ও আবার ভাবছে, ‘সবাই সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে মারছে। মাছ ধরার পেশাটাও আমাকে যেমন বাঁচিয়ে রাখে, তেমনি মেরেও ফেলে। ছেলেটা আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি অন্তত নিজেকে এ ব্যাপারে ঠকাব না।’ ও নৌকার পাশে ঝুঁকে পড়ল, আর হাঙরটা মাছটার শরীরের যে জায়গা থেকে মাংস কেটে খেয়েছে, সেখান থেকে এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে নিয়ে চিবুতে লাগল। ওটার অপূর্ব স্বাদ ও উৎকর্ষ ওর মনে ধরল। ওটা পশুর মাংসের মতোই পুষ্ট আর রসালো, অথচ ওটা লাল-মাংস নয়। ওটাতে কোনো আঁশ নেই আর ও বুঝল যে, বাজারে এটা সবচেয়ে চড়া দামে বিকোবে। কিন্তু জলের মধ্যে এটার গন্ধ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করার কোনো উপায় নেই আর বুড়ো জানে যে, এবার দুঃসময় আসছে।
বাতাস একভাবে বয়ে চলেছে। একটু উত্তর-পুবে সরে গেছে বটে, তবে বুড়ো জানে, যে তার মানে বাতাস থেমে যাবে না। বুড়ো সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়, তাকিয়ে দেখল, কিন্তু কোনো নৌকার পাল, অথবা কোনো জাহাজের হাল কিংবা ধোঁয়া কিছুই চোখে পড়ল না। কেবল ওর নৌকার গলুইয়ের দুই পাশে ছিটকে যাওয়া উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক আর মাঝে মাঝে হলুদ রঙের উপসাগরীয় আগাছা। এমনকি একটা পাখিও ওর চোখে পড়ল না।
ইতোমধ্যে দু’ঘণ্টা কেটে গেছে ওর নৌকা চলছে, ও পাছ গলুইয়ে ঠেসান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে আর মাঝে মার্লিন মাছটার এক টুকরো মাংস নিয়ে চিবোচ্ছে যাতে বিশ্রামও পায় আর গায়ে জোর-ও হয়। ঠিক এমনি সময় ও দুটো হাঙরের প্রথমটাকে দেখতে পেল।
‘আই’- ও জোরে জোরে বলে উঠল। এই কথাটার কোনো অনুবাদ হয়না আর এটা বোধহয় এমন একটা স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ যেটা হাত ফুটো করে কাঠে গেঁথে যাওয়া পেরেক ঢুকলে গলা দিয়ে বের হয়।
‘গালানোস’, ও আবার জোরে জোরে বলে উঠল। প্রথমটার পেছনে দ্বিতীয় পাখনাটাকেও এবার দেখতে পেল আর ওগুলোর বাদামি তিনকোণা পাখনা আর লেজের ঝাপটানি দেখে বুঝতে পারল, ওগুলো বেলচা-নাক হাঙর। ওরা গন্ধ পেয়েছে আর উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড খিদের বোকামিতে আর উত্তেজনায় গন্ধটা বার বার হারিয়ে ফেলছে আবার খুঁজে পাচ্ছে। কিন্তু ওরা বরাবর নৌকার কাছেই চলে আসছে।
বুড়ো পালটা গুটিয়ে ফেলল আর হালটাকেও শক্ত করে আটকে দিল। তারপর ছুরি বাঁধা বৈঠাটা হাতে তুলে নিল। ওর দুই হাত ব্যথার চোটে বিদ্রোহ করছে, তাই খুব হাল্কা হাতেই ও বৈঠাটা তুলল। তারপর বৈঠা ধরা হাত দুটো হালকাভাবে খোলা বন্ধ করে করে হাত দুটোকে ঢিলা করে নিল। শেষে বৈঠাটা শক্ত করে হাত মুঠো করে ধরল যাতে হাত দুটো ব্যথা সইতে পারে আর না কাঁপে। এইভাবে ও হাঙর দুটোর কাছে এগিয়ে আসা লক্ষ্য করতে লাগল। ও এখন ওদের চওড়া, থ্যাবড়ানো, বেলচার মতো মাথা আর বুকের দুপাশের চওড়া ডগা সাদা পাখনাগুলো দেখতে পাচ্ছে। এগুলো অত্যন্ত ঘৃণ্য জীব, দুর্গন্ধ-যুক্ত, জলের জাড়ুদার, খুনি তো বটেই, আর যখন এগুলো ক্ষুধার্ত থাকে, তখন নৌকার বৈঠা, হাল যে কোনো কিছুই কামড়ে খেয়ে ফেলতে চায়।
এগুলো সেই জাতের হাঙর, যারা জলের ওপরে ভাসমান, ঘুমন্ত কচ্ছপগুলোর পাগুলো কেটে নেয় আর ক্ষুধার্ত থাকলে জলের ভেতর কোনো মানুষকে পেলেও আক্রমণ আক্রমণ করে, যদিও মানুষের গায়ে মাছের রক্তের গন্ধ অথবা রস কিছুই নেই।
‘আই’- ও বলে উঠল, ‘গালানোস। আয় চলে আয় গালানোস।’ ওরা এলো কিন্তু ম্যাকো হাঙরটা যেভাবে এসেছিল, সে ভাবে নয়। একটা উল্টে গিয়ে নৌকার তলায় দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, আর নৌকার ঝাঁকুনি থেকে বুড়ো বুঝতে পারল, ওটা মাছটাকে কামড়ে টানাটানি করছে। অন্যটা ওর হলদে চেরা চোখে বুড়োকে দেখতে দেখতে প্ৰচণ্ড গতিতে ওর অর্ধবৃত্তাকার চোয়াল হাঁ করে মাছটাকে আক্রমণ করল, ঠিক সেইখানে, যেখানে থেকে ইতোমধ্যেই প্রথম হাঙরটা মাংস কেটে নিয়েছে। ওর বাদামি মাথার ওপর দিক থেকে পেছন দিক পর্যন্ত যেখানে ওর মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ডের যোগ, সেখানকার রেখা বরাবর ওই সংযোগ স্থলে বুড়ো বৈঠায় বাঁধা ছুরিটা সবেগে ঢুকিয়েই বার করে নিল আর সঙ্গে সঙ্গে হাঙরটার বিড়ালের মতো হলদে চোখের ভেতর আমূল বসিয়ে দিল। হাঙরটার মাছের গায়ের কামড় আলগা হয়ে গেল আর যেটুকু মাংস ও কামড়ে তুলে নিতে পেরেছিল, মরতে মরতেও সেটুকু গিলে নিয়ে জলের অতলে তলিয়ে গেল।
নৌকাটা তখনও ঝাঁকানি খাচ্ছে, কারণ অন্য হাঙরটা নৌকার তলা থেকে মাছটার মাংস কামড়ে কামড়ে খেয়ে শেষ করছে। বুড়ো পাল্টা খুলে দিল, যাতে নৌকাটা ঘুরে যায় আর তলা থেকে হাঙরটা বেরিয়ে আসে। যখন ও হাঙরটাকে দেখতে পেল ও নৌকার পাশে ঝুঁকে হাঙরটাকে খোঁচা মারল। কিন্তু ছুরিটা ওর গায়ের শক্ত চামড়া ভেদ করে ওর মাংসে গিঁথতেই পারল না। এইওভাবে গাঁথতে গিয়ে ওর হাত দুটো আর কাঁধে বেশ চোট লাগল। কিন্তু হাঙরটা জলের ওপর মাথা তুলে দ্রুত বেগে ফিরে এল আর যখন ওর নাকটা জলের ওপর ভেসে উঠে মাছটার গায়ে ঠেকেছে, তখনই বুড়ো ওর চ্যাপটা মাথার ঠিক মাঝখানে ছুরিটা বসিয়ে দিল। তারপর ছুরিটা বের করে নিয়ে আবার ঠিক একই জায়গায় ছুরি বিধিয়ে দিল। হাঙরটা তখনও মাছটাকে কামড়ে ধরে ঝুলছে। বুড়ো এবার ওর বাঁ চোখের মধ্যে ছুরি বসিয়ে দিল। তখনও হাঙরটা কামড় আলগা করেনি।
‘এতেও হল না?’ বুড়ো বলল আর এবার ও মেরুদণ্ড আর মস্তিষ্কের মাঝামাঝি জায়গায় ছুরিটা আমূল বিধিয়ে দিল। ওই মোক্ষম মারটা এখন বেশ সহজেই করা গেল আর বুড়ো টের পেল, হাঙরটার কোমলাস্থি দু টুকরো হয়ে গেছে। তারপর বুড়ো বৈঠাটা ঘুরিয়ে নিয়ে হাঙরটার বন্ধ চোয়াল খুলবার জন্যে ওর মুখের মধ্যে ছুরিটা ঢুকিয়ে মোচড় দিল। তখন হাঙরটার কামড় আলগা হয়ে, হাঙরটার তলিয়ে যেতে বুড়ো বলে উঠল, ‘যা গালানোস, এক মাইল নিচে নেমে যান। ওখানে তোর বন্ধুকে দেখতে পাবি, কিংবা তোর মা-ও হতে পারে।’
‘ওরা মাছটার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ খেয়ে নিয়েছে, আর ওই মাংসটাই সবচেয়ে ভালো ছিল,’ বুড়ো বলে উঠল, ‘এটা একটা স্বপ্ন হলেই ভালো হতো। আর আমি যদি মাছটাকে না ধরতাম। মাছ, এসব কিছুর জন্য আমি খুব দুঃখিত, সব ব্যাপারটাই কেমন যেন অন্যায় হয়ে গেল। ও থামল আর এখন মাছটার দিকে তাকাতে মোটেই ইচ্ছে করছে না। রক্ত ঝরে গিয়ে, জলে পড়ে থেকে মাছটার গায়ের রঙ এখন আয়নার পেছন দিককার রূপালি ফ্যাকাশে সাদা, অথচ ওর গায়ের ডোরা দাগগুলো এখনও দেখা যাচ্ছে। ‘আমার এত দূরে আসা উচিত হয়নি, মাছ,’ ও বলে উঠল, ‘তোমার জন্যেও নয়, আমার নিজের জন্যেও নয়। আমি দুঃখিত, মাছা। ‘ ও এবার নিজেকেই বলল, ‘এখন ছুরির বাঁধনটা একবার দেখ আর ওটা কেটে গেছে কিনা দেখে নাও তারপর নিজের হাত দুটোকে ঠিক করো, কারণ আরো দুঃসময় আসছে।’
বৈঠার ডাণ্ডার সাথে চুরির বাঁধনটা দেখে নিয়ে বুড়ো এবার বলে উঠল, ‘একটা পাথর সঙ্গে আনা উচিত উচিত ছিল’। ‘অনেক কিছুই আনা উচিত ছিল’, ও ভাবল, ‘কিন্তু বুড়ো, তুমি তো সেসব কিছুই আনোনি। যা তোমার নেই, তা নিয়ে ভাবার সময় এটা নয়। যা তোমার কাছে আছে, সেগুলোকে কিভাবে কাজে লাগাবে, সেটাই ভাবো।’
আবার নিজেই নিজেকে বলে উঠল, ‘আমাকে খুব সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। ও সব শুনে শুনে ক্লান্ত হয়ে গেছি।’
নৌকা সামনে এগিয়ে চলেছে। ও হালটাকে বগলের তলায় চেপে ধরে, দু’হাতের পাতা জলে ভিজিয়ে নিল।
‘শেষ হাঙরটা কতটা মাংস খুবলে নিয়েছে, ভগবানই জানেন। তবে এখন নৌকাটা হালকা হয়ে গেছে। মাছটার ক্ষতবিক্ষত পেটের দিকটার কথা ও ভাবতে চাইছে না। ও জানে যে, হাঙরটার প্রতিটি ধাক্কা মানে, মাছটার মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেওয়া আর এখন মাছটার রক্ত-মাংস সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে সমস্ত হাঙরদের জন্যে সড়ক বানিয়ে রেখেছে।
‘এই মাছটা আগামী গোটা শীতকালটা একটা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখত’, ও ভাবছে, এখন আর সে কথা ভেবে লাভ নেই। এখন শুধু বিশ্রাম নেওয়া আর মাছটার যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটা রক্ষা করার জন্যে হাত দুটোকে তৈরি রাখা। জলের মধ্যে মাছটার রক্ত-মাংসের যে গন্ধ ছড়িয়ে গেছে, তার তুলনায় আমার রক্তাক্ত হাতের গন্ধ কিছুই নয়। তাছাড়া হাত থেকে তো রক্ত বেশি ঝরছে না। এমন কিছু বেশি কাটেও নি। বাঁ হাতের রক্ত পড়া ওটাকে খিঁচ ধরা থেকে বাঁচাবে।
‘এখন কি নিয়ে চিন্তা করব?’ ও ভাবছে, ‘কিছুই না। আমি কোনো কিছু নিয়েই চিন্তা করব না, শুধু পরেরগুলোর জন্যে অপেক্ষা করি। মনে হচ্ছে, এটা সত্যিই যদি একটা স্বপ্ন হতো। কিন্তু কে জানে, হয়তো ভালো কিছু হতেও পারত।’
এরপরে যে হাঙরটা এল, ওটা একটাই বেলচা-নাক হাঙর। শুয়োর যেমন জাবনার গামলার দিকে ছুটে আসে, তেমনিভাবেই ওটা এল, অবশ্য শুয়োরের যদি অতবড় হার থাকে, যার মধ্যে তোমার মাথা ঢুকে যেতে পারে। বুড়ো ওটাকে মাছটাকে আক্রমণ করতে দিল, আর সেই সুযোগে ওর মাথায় ঠিক মগজের মধ্যে বৈঠায় বাঁধা ছুরিটা ঢুকিয়ে দিল। কিন্তু হাঙরটা উল্টে গিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে পেছন দিকে সরে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে ছুরির ফলাটা ভেঙে গেল।
বুড়ো নৌকা ঠিক পথে চালানোর জন্য বসে পড়ল। ও দেখতেই চাইল না যে, মস্ত হাঙরটা কিভাবে প্রথমে পূর্ণ চেহারায়, তারপর ছোট, আরো ছোট হতে হতে শেষে জলের মধ্যে তলিয়ে গেল। এই ব্যাপারটা বুড়ো আগে সব সময় মুগ্ধ চোখে দেখত। কিন্তু এখন ও এমনকি তাকাল না পর্যন্ত।
‘আমার হাতে এখন খালি কোঁচটা আছে,’ ও বলল, ‘কিন্তু ওটা দিয়ে বিশেষ কোনো কাজ হবে না। বাকি রইল কেবল দুটো বৈঠা, হালের হাতলটা আর ছোট ডাণ্ডাটা।
‘ওরা আমাকে হারিয়ে দিল’, ও ভাবছে, ‘কোনো হাঙরকে ডাণ্ডা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার বয়স আর আমার নেই। কিন্তু যতক্ষণ আমার হাতে বৈঠা দুটো, ছোট ডাণ্ডাটা আর হালের হাতলটা আছে, আমি চেষ্টা চালিয়ে যাব।
ও আবার হাত দুটো ভিজিয়ে নেবার জন্যে জলে ডোবাল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আকাশ আর সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই নজরে পড়ছে না। আগের চেয়ে বাতাসের জোর এখন অনেক বেশি আর ওর মনে আশা হচ্ছে, যে খুব জলদি ডাঙা চোখে পড়বে।
‘তুমি খুব ক্লান্ত, বুড়ো’, ও বলে উঠল, ‘ভেতরে ভেতরে তুমি খুব ক্লান্ত।’
সূর্য ডোবার ঠিক আগে পর্যন্ত কোনো হাঙর মাছটাকে আক্রমণ করেনি। তারপরই বুড়ো বাদামী পাখনাগুলোকে জলের ওপর দিয়ে আসতে দেখল মাছটার রক্তের গন্ধে ভরা জলের পথরেখা ধরে। ওরা গন্ধ খুঁজে খুঁজে এদিকওদিক ঘোরাঘুরি করল না। একেবারে সোজা নৌকার দিকে এগিয়ে এসে সমান্তরালভাবে সাঁতরাতে লাগল।
ও নৌকার হালের হাতলটাকে আটকিয়ে দিয়ে, পালটাও বেঁধে ফেলল আর পাছ-গলুইয়ের নিচ থেকে ছোট ডাণ্ডাটা তুলে নিল। এটা একটা ভাঙা বৈঠার হাতলের অংশটা, করাত দিয়ে কেটে আড়াই ফুট লম্বা করা হয়েছে। এটা কেবল একহাত দিয়ে মুঠিয়ে ধরে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। ও হাঙরগুলোকে দেখতে দেখতে ডান হাত দিয়ে শক্ত মুঠোয় ডাণ্ডাটা চেপে ধরল। দুটো হাঙরই ছিল বেলচা-নাকী, গালানো।
‘প্রথমটা মাছটাকে যখন বেশ ভালো করে কামড়ে ধরবে, তখন ওটার নাকের ডগায় অথবা মাথার ওপরে ঠিক আড়াআড়ি ডাণ্ডা মারতে হবে,’ ও ভাবল।
KERBOLCOM
হাঙর দুটো এক সঙ্গেই এসে পড়ল। যখন ও কাছেরটাকে মুখ হাঁ করে মাছটার রূপালি গায়ে দাঁত বসাতে দেখল, ও ডাণ্ডা উঁচিয়ে ধরে একদম সোজা প্রচণ্ড জোরে হাঙরটার চওড়া মাথার ওপর মারল। মনে হল যেন ডাণ্ডাটা রবারের মতো অথচ শক্ত কিছুতে আঘাত করেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওর মাথার হাড়ের কাঠিন্যও ও টের পেল। ও এবার হাঙরটার নাকের ডগায় প্রচণ্ড জোরে ডাণ্ডা মারল আর হাঙরটা মাছের কামড় ছেড়ে নিচে তলিয়ে গেল।
অন্য হাঙরটা ততক্ষণে আসছে, যাচ্ছে আর এখন পুরো চোয়াল হাঁ করে আবার এগিয়ে এল। ও যখন মাছটাকে এক ধাক্কায় কামড়ে ধরে হাঁ বন্ধ করছে তখন বুড়ো দেখল ওর চোয়ালের কোণায় মাছটার মাংসের টুকরোটাকরা সাদা সাদা লেগে রয়েছে। ও ডাণ্ডাটা ঘুরিয়ে হাঙরটার মাথায় মারল। হাঙরটা ওর দিকে তাকিয়ে মুচড়ে মাংস ছিঁড়ে নিল। বুড়ো আবার ওকে ডাণ্ডাটা দিয়ে মারল, কিন্তু শক্ত রবারের ওপর মারল বলে মনে হয়। হাঙরটা ততক্ষণে সরে গিয়ে মাংসটা গিলে নিয়েছে।
‘আয় গালানো, আয়,’ বুড়ো বলে উঠল, ‘আর একবার আয়।’ হাঙরটা প্রচণ্ড বেগে এসে মাছটার মাংসে কামড় বসাতেই বুড়ো ওকে ডাণ্ডা মারল। যত উঁচুতে পারে, ডাণ্ডাটা তুলে একেবারে মোক্ষম মার। বুড়ো টের পেল, এবারের মারটা ওর মগজের গোড়ার হাড়টায় লেগেছে আর মারের চোটে হাঙরটা কামড় আলগা করে যখন মাংস তুলে নিয়েছে, তখন ঠিক একই জায়গায় আবার মারল। হাঙরটা মাছটাকে ছেড়ে তলিয়ে গেল।
বুড়ো লক্ষ্য করতে লাগল হাঙরটা আবার ওপরে উঠে আসে কিনা কিন্তু দুটো হাঙরের কোনোটাকেই ও আর দেখতে পেল না। তারপরই ও একটাকে দেখল বৃত্তাকারে জলের ওপর ঘুরছে। আর একটার পাখনা ওর চোখে পড়ল না।
‘ওগুলোকে মেরে ফেলার আশা আমি করিনি।’ ও ভাবল। ‘অবশ্য বয়সকালে পারতাম। কিন্তু দুটোকেই মোক্ষম চোট দিয়েছি আর ওরা মোটেই সুস্থ বোধ করছে না। যদি দুহাত দিয়ে ধরে ডাণ্ডা চালাতে পারতাম, তাহলে এই বয়সে এখনও প্রথমটাকে মেরে ফেলতে পারতাম।’ ও মাছটার দিকে আর তা চাইছে না। ও জানে যে, মাছটার প্রায় অর্ধেকটা ওরা খেয়ে ফেলেছে। ইতোমধ্যে হাঙরগুলোর সাথে লড়াই এর সময় কখন যেন সূর্য অস্ত গেছে।
‘খুব শিগগিরই অন্ধকার হয়ে যাবে’, ও বলে উঠল, ‘তখন আমি হাভানার আলোর আভা দেখতে পাব। যদি খুব বেশি পুবের দিকে চলে গিয়ে থাকি, তাহলে ওই নতুন বেলাভূমিগুলোর কোনো একটার আলো দেখতে পাব।
‘এখন খুব একটা বেশি দূরে নেই,’ ও ভাবল, ‘আশা করি, আমার জন্যে কেউ খুব বেশি উদ্বিগ্ন হয়নি। অবশ্য ছেলেটাই কেবল আমার জন্যে দুশ্চিন্তা করবে। তবে আমি নিশ্চিত, যে আমার ওপর ওর ভরসা আছে।বুড়ো মেছুড়েদের মধ্যে অনেকেই দুশ্চিন্তা করবে। হয়তো, আরো অনেকেই করবে’ ও ভাবল, ‘আমাদের শহরটা ভালো।’
মাছটা একেবারে বিশ্রীভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে, তাই ও মাছটার সঙ্গে আর কথা বলতে পারছে না। তখন ওর মাথায় একটা বুদ্ধি এল।
‘আধা মাছ’ ও বলে উঠল, ‘তুমি পুরো মাছ ছিলে। আমার খুব দুঃখ হচ্ছে যে, আমি বেশি দূরে চলে গিয়েছিলাম। আমি আমাদের দুজনেরই সর্বনাশ করেছি। কিন্তু আমরা অনেকগুলো হাঙর মেরেছি, তুমি আর আমি দুজনে মিলে, আর অনেকগুলোর সর্বনাশ করেছি। বুড়ো মাছ, তুমি নিজে কতগুলোকে মেরেছ? তোমার মাথার ডগায় ঐ বর্শা ফলকটা তো আর এমনি এমনি নেই।’
ওর এখন মাছটার কথা ভাবতে ভালো লাগছে। মাছটা এখন যদি স্বাধীনভাবে সাঁতার কাটতে পারত তাহলে হাঙরের কী দশা করতে পারত, সে কথা ভাবতেও ওর ভালো লাগছে। ও ভাবতে লাগল, ‘আমার উচিত ছিল মাছটার মুখের লম্বা ঠোঁটটা কেটে নিয়ে ওটা দিয়ে হাঙরগুলোর সাথে লড়াই করা। কিন্তু আমার কাছে কোনো কুড়ুল ছিল না, আর এখন তো ছুরিটাও নেই।
‘কিন্তু যদি থাকত, তাহলে ওটা কেটে নিয়ে একটা বৈঠার ডাণ্ডার সঙ্গে বাঁধতাম। কি ভালো অস্ত্রই না হতো? তাহলে আমরা দুজনে মিলে ওগুলোর সাথে লড়তে পারতাম। যদি ওরা রাত্রে আসে, তাহলে তুমি কী করবে বুড়ো? কী করতে পার?’ ‘লড়বো’, বুড়ো বলে উঠল, ‘ওদের সঙ্গে আমরণ লড়াই চালিয়ে যাব।’
কিন্তু এখন রাতের অন্ধকারে, যখন কোথাও কোনো আলোর আভা দেখা যাচ্ছে না, কোনো লড়াই-ও নেই, কেবল হু হু বাতাস আর পালের টানে নৌকার একভাবে বয়ে চলা, তখন ওর মনে হল, আমি হয়তো ইতোমধ্যেই মরে গেছি। ও হাত দুটো বড় করে হাতের পাতা দুটো পরীক্ষা করল। না, হাত দুটো তো মরেনি, কেবল কয়েকবার হাতের মুঠি খোলা আর বন্ধ করলেই প্রচণ্ড ব্যথার মধ্যে দিয়ে ও জীবনকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। ও পাছ-গলুইয়ে ঠেসান দিয়ে বসে ভাবল, না, ও এখনও মরেনি। ওর কাঁধ দুটোর যন্ত্রণা ওকে তাই বলল।
‘মাছটাকে ধরতে পারলে ওই সব প্রার্থনাগুলো করব বলে আমি শপথ করেছিলাম’, ও ভাবছে, ‘কিন্তু আমি এত ক্লান্ত যে এখন ওগুলো আবৃত্তি করতে পারছি না। এখন বরং বস্তাটা নিয়ে আমার কাঁধের ওপর জড়িয়ে নিই।
ও পাছ-গলুইয়ে শুয়ে নৌকার গতিপথ ঠিক রেখে চালাতে লাগল আর আকাশের দিকে তাকিয়ে আলোর আভা দেখা যায় কিনা, লক্ষ রাখতে লাগল। এখনও মাছের অর্ধেকটা আছে,’ ও ভাবল, ‘হয়তা, ওর সামনের দিকে অর্ধেকটা নিয়ে আমি ডাঙায় পৌঁছতে পারব যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। কিছুটা তো ভাগ্যের সাহায্য দরকার।’ ‘না, যখন তুমি সমুদ্রের অনেক ভেতরে চলে গিয়েছিলে তখনই তুমি তোমার ভাগ্যকে অমান্য করেছ,’ ও মনে মনে বলল।
মূর্খের মতো চিন্তা করো না’, ও জোরে জোরে বলে উঠল, ‘জেগে থাক আর নৌকাটা ঠিকভাবে চালাও। হয়তো এখনও তোমার ভাগ্য প্রসন্ন হতে পারে।’ আবার বলল, ‘ভাগ্য বিক্রি হয়, এমন কোনো জায়গা যদি থাকত, তাহলে সেখান থেকে আমি কিছুটা সৌভাগ্য কিনতাম। আবার নিজেকেই জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের বিনিময়ে আমি সৌভাগ্য কিনতাম? একটা হারিয়ে যাওয়া হারপুন, একটা ভাঙা ছুরি আর দুটো ক্ষত-বিক্ষত হাতের বিনিময়ে?’
‘হয়তো তাই করতে,’ ও বলে উঠল, ‘সমুদ্রে চুরাশি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা দিয়ে তুমি তো ভাগ্যকে কিনতে চেষ্টা করেছিলে। আর তা প্রায় কিনে ফেলেছিলে।’
‘আজেবাজে কথা ভাবা উচিত নয়,’ ও আবার ভাবল, ‘ভাগ্য নানান রূপ ধরে আসে। কিন্তু তাকে কি কেউ চিনতে পারে তবে যে চেহারাতেই আসুক না কেন আর যে দামই চাক না কেন, আমি যদি কিছু ভাগ্য কিনতে পারতাম।’ আবার ভাবল, ‘যদি আলোর আভাটা এখন দেখতে পেতাম। আমি অনেক কিছুই চাই, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে আমি কেবল আলোই দেখতে চাই।’ ও নৌকাটা ঠিক করে চালানোর জন্য আর একটু আরামপ্রদভাবে ঠেসান দিয়ে বসার চেষ্টা করল আর তার দরুন, যে যন্ত্রণা টের পেল, তাতে বুঝল যে, ও এখনও মরেনি।
ও যখন শহরের আলোর প্রতিফলিত আভা দেখতে পেল, তখন মনে হয় রাত্রি দশটার কাছাকাছি। চাঁদ ওঠার আগে যেমন আকাশে একটা আভা দেখা যায়, ঠিক সেই রকম হালকা একটা আভা প্রথমে দেখা গেল। জোর হাওয়ায় অশান্ত সমুদ্রের জলের ওপর দিয়ে আলোর আভাটা তারপর পরিষ্কার ছড়িয়ে পড়ল। ও আলোর আভার মধ্যিখান দিয়ে নৌকাটা ঘুরিয়ে নিয়ে চালাতে লাগল আর ভাবল, এখন খুব তাড়াতাড়িই ও স্রোতের মুখে এসে পড়বে।
‘তাহলে এতক্ষণে সব শেষ হচ্ছে’, ও ভাবল, ‘হাঙরগুলো বোধ হয় এখন আবার আক্রমণ করবে।’ কিন্তু অন্ধকারে, কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া কি করে একটা মানুষ ওদের সঙ্গে লড়তে পারে?’
ওর সারা শরীর এখন যন্ত্রণাকাতর, শক্ত হয়ে গেছে। ওর শরীরের যত ক্ষত আর শরীরের যে সব জায়গায় মাংসপেশীতে টান পড়েছিল, খিঁচ ধরেছিল, সমস্ত এখন রাতের ঠাণ্ডায় অসহ্য ব্যথায় টনটন করছে। ‘আর আমি লড়তে চাই না,; ও ভাবছে, ‘আমি কোনোমতেই চাই না, যে আমাকে আবার লড়াই কতে হবে।’
কিন্তু মাঝরাতে ওকে আরও একবার লড়াইয়ে নামতে হলো আর এবারও বুঝতে পারল যে, এই লড়াইটা নিরর্থক। ওরা এবার দল বেঁধে এল আর জলের ওপর ওদের পাখনার রেখাপথ আর ওদের শরীরের ফসফরাসের প্রভাব কেবল ওর চোখে পড়ল। ওদের পুরো দলটাই মাছটার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। ও ওদের মাথা লক্ষ্য করে ডাণ্ডা চালাল আর শুনল ওগুলো মাছটার নিচের দিকে মাংসে দাঁত বসিয়ে মাংস ছিঁড়ছে তার শব্দ, আর ঝাঁকুনিতে নৌকো দুলছে। ও অন্ধকারেই আন্দাজে বেপরোয়া ডাণ্ডা চালিয়ে গেল কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর ডাণ্ডাটা কোনো একটা হাঙর কামড়ে ধরল আর ডাণ্ডাটা ওর হাত থেকে ছিটকে গেল।
ও হাল থেকে হাতলটা এক ঝটকায় খুলে নিয়ে দুই হাতে ওটা ধরে পাগলের মতো সমানে হাঙরদের ওপর চালাতে লাগল। কিন্তু ওরা তখন নৌকার গলইয়ের দিকে সরে গেছে আর একটার পর একটা মাছটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মাংস ছিঁড়ে নিচ্ছে। জলের তলায় ওদের মুখে মাংসের টুকরোগুলো জ্বলজ্বল করছে আর ওরা আবার ঘুরে এসে মাছটার ওপর ঝাঁপাচ্ছে।
সবশেষে একটা হাঙর যখন মাছটার মাথাটায় কামড় বসাল, তখন ও বুঝল যে, সব শেষ হয়ে গেছে। মাছটার ভারী মাথাটা হাঙরটা কামড়ে ধরেছে, কিন্তু ছিঁড়ে নিতে পারছে না আর বুড়ো হাঙরটার মাথায় হাতলের ডাণ্ডাটা সপাটে চালাল। একবার, দুবার, আবার। ও শুনতে পেল হাতলটা মড়মড় করে ভেঙে গেল আর ঐ ভাঙা ডাণ্ডার ফাটা চটা ডগা দিয়েই ও হাঙরটার গায়ে আঘাত করল। হাঙরটার গায়ের মাংসে ভাঙা ডাণ্ডার ডগাটা ঢুকে যেতেই ও বুঝতে পারল, ভাঙা কাঠের ডগা তীক্ষ্ণ ছুঁচের মতো হয়ে আছে আর তাই আবার ওটা হাঙরটার শরীরে সজোরে ঢুকিয়ে দিল। হাঙরটা কামড় ছেড়ে পাক খেয়ে তলিয়ে গেল। ওটাই ছিল ঝাকটার শেষ হাঙর। ওদের খাবার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
বুড়োর এখন আর শ্বাস নেবার ক্ষমতাও নেই আর মুখের ভেতর একটা বিশ্রী স্বাদ। কি রকম তামার মতো আর মিষ্টি মিষ্টি, বুড়ো ক্ষণেকের জন্যে বেশ ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু বেশিক্ষণ ওটা থাকল না।
ও সমুদ্রের জলে থুতু ফেলে বলে উঠল, ‘খা ব্যাটারা, থুতু খা আর স্বপ্ন দেখ, যে একটা মানুষ মেরেছিস।’
ও বুঝে গেছে যে, ওর চূড়ান্ত হার হয়েছে যার আর কোনো প্রতিকার নেই। তাই ও পাছ-গলুইয়ে গিয়ে হালের ভাঙা ডাণ্ডাটা হালের খাঁজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, যাতে নৌকটা সঠিকভাবে চালাতে পারে। বস্তাটা কাঁধের চারপাশে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে এবার ও সুস্থিরভাবে নৌকাটা সঠিক পথে চালাতে লাগল। ও নৌকাটা চালাচ্ছে, হালকা মনে, মনের মধ্যে কোনো চিন্তা বা কোনো অনুভূতি নেই। ও এখন সব কিছুর বাইরে আর তাই ও এখন কেবলমাত্র বাড়ি ফেরার তাগাদায় ঠাণ্ডা মাথায় ভালভাবে বুঝে-শুনে নৌকা চালাচ্ছে। রাতে আর একবার কয়েকটা হাঙর এসে মাছটার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল, যেন খাবার টেবিলে পড়ে থাকা রুটির টুকরো ঠোকরাচ্ছে। বুড়ো ওদের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে একমনে নৌকা চালাতে লাগল। ও কেবল অনুভব করতে পারছে নৌকাটা কী হালকা, মসৃণভাবে চলেছে, কেননা ওর গায়ে তো এখন আর ভারী ওজনের বিশাল কিছু নেই।
‘নৌকাটা বেশ ভালো’ ও ভাবছে, ‘এটা বেশ মজবুত আর হালটা ছাড়া আর কোনো ক্ষতিও হয়নি। হালটা সহজেই বদলে ফেলা যাবে।’
ও বুঝতে পারছে, এখন ও স্রোতের মধ্যে এসে পড়েছে আর সমুদ্রের তীর ধরে ছড়ানো লোকালয়ের আলোও দেখা যাচ্ছে। ওর অবস্থানটা এখন ওর জানা আর এ-ও জানে যে, বাড়ি পৌঁছানোটা এখন আর কোনো ব্যাপারই নয়।
ও ভাবছে, ‘বাতাস হচ্ছে আমাদের বন্ধু’, তারপরেই ভাবছে, ‘অবশ্য সব সময় নয়, কখনো কখনো। সমুদ্রও আমাদের বন্ধু, আর ওর মধ্যেও কিছু বন্ধু আছে, শত্রুও আছে। আর বিছানা’, ও ভেবেই চলেছে, ‘বিছানা আমার বন্ধু। কেবল বিছানাই। বিছানাটা একটা অসাধারণ জিনিস।’ আবার ভাবছে, ‘হেরে যাওয়াটা কী সহজ ব্যাপার। আগে জানতামই না এটা কত সহজ। আর কারা আমাকে হারালো।’
‘কিছু না, কিছু না,’ ও স্বগতোক্তি করল, ‘আমি বড্ড দূরে চলে গিয়েছিলাম।’
যখন ও ছোট জাহাজঘাটায় এসে নৌকা ভিড়াল, তখন চত্বরের আলো নিভে গেছে আর ও জানে যে, সব্বাই তখনও বিছানায়।
বাতাসের জোর বেড়ে বেড়ে এখন খুব জোরে বইছে। জাহাজঘাটা একদম চুপচাপ। ও পাথরের স্তূপের নিচে নুড়ি পাথর বিছানো ছোট্ট জায়গাটায় নৌকা ভিড়াল। এ সময় ওকে সাহায্য করার কেউ উপস্থিত নেই, তাই ও নৌকাটাকে যতখানি পারে ওপরদিকে একা একাই টেনে আনল। তারপর একটা পাথরের সঙ্গে নৌকাটাকে বাঁধল।
ও মাস্তুলটা খুলে নিয়ে পাল গুটিয়ে বেঁধে ফেলল। তারপর মাস্তুলটা কাঁধে নিয়ে ওপরদিকে উঠতে শুরু করল। ঠিক তখনই ও বুঝতে পারল যে, ওর শরীরের ওপর দিয়ে কী পরিমাণ ধকল গেছে। এক লহমার জন্যে থেমে ও পেছন ফিরে তাকাল আর রাস্তার আলোর প্রতিফলনে দেখতে পেল, মাছটার বিশাল লেজটা ওর নৌকার পাছ-গলুই অনেকটা ছাড়িয়ে উঁচু হয়ে রয়েছে। ও দেখল, মাছটার বিশাল লম্বা মেরুদণ্ডের সাদা হাড়ের সারি, ওর কালচে হয়ে যাওয়া বিশাল মাথাটা লম্বা সরু ঠোঁটসমেত, আর মাথা আর লেজের মাঝখানের প্রকট সমস্ত উলঙ্গতা।
ও আবার উঠতে শুরু করল আর ওপরে উঠেই ও পড়ে গেল। কিছুক্ষণ কাঁধের ওপর মান্ত্রলসমেত ও পড়েই রইল। ও চেষ্টা করছে ওঠে দাঁড়াতে কিন্তু ওঠাটা এখন ওর পক্ষে বড় কঠিন। ও কাঁধের ওপর মাস্তুল নিয়ে খানিকক্ষণ ওখানেই বসে রইল আর রাস্তার দিকে তাকাল। দূরে একটা বিড়াল নিজের কাজে রাস্তা পার হচ্ছে, ও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। তারপর শুধু রাস্তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। শেষমেষ ও মাস্তুলটাকে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায়। মালটা তারপর তুলে নিয়ে কাঁধে রেখে আবার রাস্তা ধরে চলতে শুরু করে। ওর চালাটায় পৌঁছতে ওকে পাঁচবার বসে বসে বিশ্রাম নিতে হয়।
