ইহুদির কবচ
১.
প্রাচ্যের পুরাতত্ত্ব সম্পর্কে আমার বিশিষ্ট বন্ধু ওয়র্ড মর্টিমারের জ্ঞান ছিল অসামান্য। সে এ বিষয়ে বিস্তর প্রবন্ধ লিখেছিল, মিশরের ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এ খননকার্য তদারকের সময় একটানা দু বছর থিবিসের একটি সমাধিগৃহে বাস করেছিল, আর যে কাজটা করে সবচেয়ে বেশি সাড়া জাগিয়েছিল, সেটা হল ফাইলিতে হোরাসের মন্দিরের একটি ভিতরের ঘরে ক্লিওপ্যাট্রার মমি আবিষ্কার। মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে যে লোক এত কিছু করতে পেরেছে, তার ভবিষ্যৎ যে উজ্জ্বল হতে বাধ্য, সেটা প্রায় সকলেই বিশ্বাস করত। তাই মর্টিমার যখন বেলমোর স্ট্রিট মিউজিয়মের তত্ত্বাবধায়কের কাজটা পেল, তখন কেউই বিশেষ অবাক হয়নি। এই পদ যিনি পাবেন, তিনি সেইসঙ্গে ওরিয়েন্টাল কলেজের অধ্যাপকের পদেও অধিষ্ঠিত হবেন, এবং তার ফলে তাঁর মাসিক রোজগার যা হবে, তাতে সচ্ছল জীবনযাত্রার সঙ্গে গবেষণার কাজও চালানো যায়।
শুধু একটা কারণেই ওয়র্ড মর্টিমার কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করছিল। সেটা হল, যে-তত্ত্বাবধায়কের স্থান সে দখল করেছিল, তাঁর অতুল খ্যাতি। প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াসের পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ, এবং খ্যাতি সারা ইউরোপ জোড়া। দেশ-বিদেশ থেকে তরুণ ছাত্ররা আসত তাঁর বক্তৃতা শুনতে। তা ছাড়া মিউজিয়মের মহামূল্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য তিনি যে ব্যবস্থা করেছিলেন, সকলেই একবাক্যে তার প্রশংসা করত। ফলে পঞ্চান্ন বছর বয়সে তিনি হঠাৎ এমন একটি চাকরি ছেড়ে দেওয়াতে সকলেই বেশ অবাক হয়েছিল। ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাড্রিয়াস স্বভাবতই তাঁর মেয়েকে নিয়ে মিউজিয়ম-সংলগ্ন তাঁর বাসস্থান ত্যাগ করে চলে যান, আর তাঁর ঘরগুলি দখল করে আমার অকৃতদার বন্ধু ওয়র্ড মর্টিমার। চাকরিটা পাবার কয়েকদিনের মধ্যেই মর্টিমারকে চিঠি লিখে অভিনন্দন জানালেন প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াস। যেদিন প্রথম এই দুজনের পরিচয় হয় পরস্পরের সঙ্গে, সেদিন আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। অ্যাড্রিয়াস সেদিন তাঁর সংগ্রহশালার আশ্চর্য জিনিসগুলি আমাদের দেখালেন। প্রোফেসরের সুন্দরী মেয়ে এবং উইলসন নামে একটি যুবক (বোঝাই যাচ্ছিল। ইনি অধ্যাপক-দুহিতার পাণিপ্রার্থী) আমাদের সঙ্গে ছিলেন। সংগ্রহশালায় সবসুদ্ধ পনেরোটি ঘর; তার মধ্যে ব্যাবিলন ও সিরিয়ার সভ্যতা সংক্রান্ত দুটি, আর সংগ্রহশালার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত প্রাচীন মিশরীয় ও ইহুদি সভ্যতা সংক্রান্ত একটি ঘরই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াস এমনিতে চুপচাপ মানুষ, কিন্তু তাঁর সংগ্রহের প্রিয় জিনিসগুলি দেখাবার সময় তাঁর শ্মশুগুহীন শুকনো মুখখানা উৎসাহে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। পুরাতত্ত্বের এই মহামূল্য নিদর্শনগুলির উপর থেকে তাঁর হাত যেন আর সরতে চায় না। বেশ বোঝা যায় সেগুলি তাঁর গর্বের বস্তু, এবং সেগুলি অন্যের আওতায় চলে যাওয়াটা যেন তাঁর পক্ষে এক মর্মান্তিক ঘটনা।
তাঁর সংগ্রহশালার মমিগুলি, তাঁর প্রাচীন পুঁথির সম্ভার, তাঁর স্ক্যারাবের সংগ্রহ, ইহুদি সভ্যতার যাবতীয় নিদর্শন, আর টাইটাস কর্তৃক রোম শহরে আনা বিখ্যাত সপ্তপ্রদীপের অবিকল প্রতিরূপ (আসলটি টাইবার নদীগর্ভে নিমজ্জিত)–এ সবই একের পর এক আমাদের দেখালেন প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াস। তারপর তিনি হলঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটি শো-কেসের দিকে ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে গভীর সম্ভ্রমের সঙ্গে তার উপর ঝুঁকে পড়লেন।
আপনার মতো বিশেষজ্ঞের পক্ষে এ জিনিসটা হয়তো তেমন বিস্ময়কর কিছু নয়, মর্টিমারকে উদ্দেশ করে বললেন প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াস, কিন্তু আপনার বন্ধু মিঃ জ্যাকসনের পক্ষে হওয়া উচিত।
এবার আমিও কাঁচের আবরণের উপর ঝুঁকে পড়ে দেখলাম, কেসের ভিতর রাখা রয়েছে হাতের তেলোর মতো বড় সূক্ষ্ম কারুকার্য করা একটি চতুষ্কোণ সোনার পাত, যার উপর তিন সারিতে চারটি-চারটি করে পাথর বসানো। পাতটির একদিকে দুই কোণে দুটি সোনার আংটা। সমান আয়তনের পাথরগুলো প্রত্যেকটি আলাদা জাতের এবং রঙের। রঙের বাক্সে পাশাপাশি খোপে খোপে যেমন বিভিন্ন রঙ সাজানো থাকে, এ যেন কতকটা সেইরকম। এও দেখলাম যে, প্রত্যেকটি পাথরের উপর একটি করে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন খোদাই করা আছে।
মিঃ জ্যাকসন, আপনি কি উরিম ও থুমিমের কথা জানেন?
নামগুলো আমার চেনা, কিন্তু তাদের মানে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না।
প্রোফেসর বললেন, ইহুদিদের প্রধান পুরোহিতের বুকে যে কবচটা ঝুলত, তাকেই বলা হত উরিম ও থুমিম। ইহুদিরা এই কবচের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার ভাব পোষণ করত, যেমন রোমানরা করত ক্যাপিটলে রাখা সিবিলাইন পুঁথিগুলির প্রতি। সাংকেতিক চিহ্ন-আঁকা বারোটি মহামূল্য রত্ন দেখতে পাচ্ছেন। উপরে বাঁ দিক থেকে শুরু করে পাথরগুলি হল কার্নেলিয়ান, পেরিডট, এমারেল্ড, রুবি, ল্যাপিস ল্যাজুলি, অনিক্স, অ্যাগেট, অ্যামেথিস্ট, টোপ্যাজ, বেরিল আর জ্যাসপার।
আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম মণিমুক্তোখচিত মহামূল্য কবচটার দিকে। শেষে প্রশ্ন করলাম, এই কবচের সঙ্গে কি কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত আছে?
জিনিসটা যে অতি প্রাচীন এবং অতি মূল্যবান, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, বললেন, প্রোফেসর। অ্যান্ড্রিয়াস। অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও আমরা নানা কারণে বিশ্বাস করি যে, এটা সেই সলোমনের মন্দিরের আদি ও অকৃত্রিম উরিম ও থুমিম। এ জিনিস ইউরোপের কোনও মিউজিয়মে নেই। আমার তরুণ বন্ধু ক্যাপ্টেন উইলসন মণিমুক্তো সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ। উনিই বলবেন এই পাথরগুলো কত খাঁটি।
তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ক্যাপ্টেন উইলসন দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ভাবী পত্নীর পাশেই। অল্প কথায় তিনি তাঁর মনের ভাব ব্যক্ত করলেন।
সত্যি কথা। আমি এর চেয়ে ভাল পাথর আর দেখিনি।
স্বর্ণকারের কাজও দেখার মতো, বললেন অ্যান্ড্রিয়াস। অতীতে স্বর্ণকারেরা–
প্রোফেসরের কথার উপর কথা চাপিয়ে উইলসন বললেন, ওর চেয়ে ভাল সোনার কাজের নিদর্শন দেখা যাবে এই মোমবাতিদানে। তাঁর দৃষ্টি এখন অন্য একটি টেবিলের দিকে। আমরা সকলেই শাখা-প্রশাখা-বিশিষ্ট সোনার বাতিদানটার আশ্চর্য কারুকার্যের প্রশংসায় উইলসনের সঙ্গে গলা মেলালাম।
অ্যান্ড্রিয়াসের মতো বিশেষজ্ঞের চোখ দিয়ে এইসব আশ্চর্য জিনিস দেখা পরম সৌভাগ্যের কথা। সত্যি বলতে কি, সবকিছু দেখা শেষ হলে পর প্রোফেসর যখন আমার বন্ধুকে জানালেন যে, এখন থেকে এ সবই তার জিম্মায় চলে যাচ্ছে, তখন ভদ্রলোকের জন্য বেশ কষ্টই হচ্ছিল, আর সেইসঙ্গে আমার বন্ধুর সৌভাগ্যকে খানিকটা ঈষার চোখে না দেখে পারছিলাম না। এক সপ্তাহের মধ্যেই ওয়র্ড মর্টিমার বেলমোর স্ট্রিট মিউজিয়মের অধিকর্তা হিসাবে তার নতুন বাসস্থানে উঠে গেল।
এর দিন পনেরো পর মর্টিমার তার জনা-ছয়েক অকৃতদার বন্ধুদের সঙ্গে তার নতুন বাড়িতে একটা ভোজের আয়োজন করল। শেষে যখন সবাই যাবার জন্য উঠে পড়েছে, তখন মর্টিমার আমার কোটের আস্তিন ধরে একটা ছোট্ট টান দিয়ে বুঝিয়ে দিল যে, সে চায় আমি আর একটুক্ষণ থাকি।
তোমার বাড়ি তো এখান থেকে দশ-পা, বলল মর্টিমার (আমি তখন অ্যালব্যানিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি)–তুমি একটু থেকে যাও। চুরুট সহযোগে দুজনে নিরিবিলি কথা হবে। একটা ব্যাপারে তোমার পরামর্শের দরকার।
অগত্যা আমি একটি আরাম কেদারায় বসে মর্টিমারের একটি উৎকৃষ্ট ম্যাট্রোনাস চুরুট ধরালাম। সবাই চলে যাবার পরে সে পকেট থেকে একটা চিঠি বার করে আমার সামনে বসল।
এই নামবিহীন চিঠিটা আজই সকালে এসেছে, বলল মর্টিমার। আমি পড়ে শোনাচ্ছি, তারপর তুমি বলো এ ব্যাপারে আমার কী কর্তব্য।
বেশ তো আমার সাধ্যমতো পরামর্শ দিতে আমি প্রস্তুত।
চিঠিটা হচ্ছে এই–মহাশয়, আপনার জিম্মায় যে সমস্ত মহামূল্য সম্পদ রয়েছে, সেগুলি সম্পর্কে আপনাকে বিশেষ সাবধান হতে বলি। বর্তমান ব্যবস্থা অনুযায়ী একটিমাত্র পাহারাদারে কাজ হবে বলে আমি মনে করি না। আপনি এ বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন না করলে অপূরণীয় ক্ষতি হবার সম্ভাবনা আছে।
এই কি পুরো চিঠি?
হ্যাঁ।
অন্তত এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, তোমাদের ওখানে রাত্রে যে একটিমাত্র পাহারাদার থাকে, সে-খবরটা মুষ্টিমেয় যে কজন জানে, তাদেরই একজন লিখেছে এ চিঠি।
মর্টিমার এবার একটা রহস্যজনক হাসি হেসে চিঠিটা আমার হাতে দিল।
হস্তলিপি ব্যাপারটা নিয়ে তুমি কোনও চর্চা করেছ? প্রশ্নটা করে মর্টিমার আর-একটা চিঠি আমার সামনে রেখে বলল, এটার কনগ্রাচুলেটে সি-এর সঙ্গে ওটার কমিটেড-এর সি মিলিয়ে দেখো। ক্যাপিটাল আই-টাও লক্ষ করো, আর ফুলস্টপের জায়গায় ড্যাশ-চিহ্ন ব্যবহার করাটা। আমি বললাম, দুটো চিঠি নিঃসন্দেহে একই লোকের লেখা, যদিও প্রথমটায় হাতের লেখা গোপন করার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে।
দ্বিতীয় চিঠিটা হচ্ছে আমার এই নতুন চাকরিটা পাবার খবর পেয়ে প্রোফেসর অ্যান্ড্রিয়াসের অভিনন্দন পত্র।
আমি অবাক হয়ে চাইলাম মর্টিমারের দিকে, তারপর দ্বিতীয় চিঠিটা ওলটাতেই মার্টিন অ্যান্ড্রিয়াস সইটা চোখে পড়ল। যে তোক হাতের লেখা নিয়ে সামান্যতম চচাও করেছে, তার মনে কোনও সন্দেহ থাকতে পারে না যে, প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াসই মিউজিয়মের সদ্য-ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ককে চুরির ব্যাপারে সাবধান হতে বলে এই নামহীন চিঠিটা লিখেছেন। ঘটনাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি।
কিন্তু ভদ্রলোক এমন চিঠি লিখবেন কেন? আমি প্রশ্ন করলাম।
ঠিক এই প্রশ্নই আমি করতে চাই তোমাকে। তাঁর মনে যদি এ ধরনের আশঙ্কা থেকেই থাকে, তা হলে তো তিনি নিজে এসে আমাকে বলতে পারতেন।
তুমি কি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাও?
সেখানেও তো গণ্ডগোল। উনি তো সোজাসুজি অস্বীকার করতে পারেন যে, চিঠিটা উনি লেখেননি।
যাই হোক–এ চিঠির উদ্দেশ্য যে সৎ, তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই। উনি যে পরামর্শ দিয়েছেন, সেটা মানতে কোনও বাধা আছে কি? এখন যে ব্যবস্থা চালু আছে, সেটা কি সতর্কতার দিক দিয়ে যথেষ্ট?
আমার তো তাই বিশ্বাস। দর্শকদের জন্য মিউজিয়ম খোলা থাকে দশটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। সেই সময়টা পাশাপাশি দুটো ঘরের জন্য একটি করে গার্ড মোতায়েন থাকে। দুটো ঘরের মাঝখানে যে দরজা–সেখানে দাঁড়ায় গার্ড, ফলে একসঙ্গে দুটো ঘরেই সে চোখ রাখতে পারে।
কিন্তু রাত্রে?
পাঁচটার পর লোহার গেটগুলো সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে গেট খোলার সাধ্যি কোনও চোরের নেই। যে পাহারা দেয়, সে অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোক। সে তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সারা মিউজিয়মটা টহল দেয়। প্রত্যেকটি ঘরে একটি করে বিজলিবাতি সারারাত জ্বলে।
তা হলে একমাত্র উপায় হচ্ছে গার্ডগুলিকে রাত্রেও রেখে দেওয়া।
সেটা খরচে পোষাবে না।
অন্তত পুলিশে খবর দিয়ে বললো যে, বেলমোর স্ট্রিটে তারা যেন একটি বিশেষ কনস্টেবলের ব্যবস্থা করে। এই চিঠি যিনি লিখেছেন তিনি যদি তাঁর পরিচয় গোপন করতে চান, তা হলে কিছু বলার নেই। কেন তিনি এটা চাইছেন, সেটা আশা করি এর পর কী ঘটে তার থেকেই বোঝা যাবে।
এর পর অবিশ্যি এ বিষয়ে আলোচনা করার আর কিছু রইল না। আমি বাড়ি ফেরার পর সারারাত মাথা ঘামিয়েও প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াসের চিঠির পিছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী, সেটা বুঝতে পারলাম না। এ চিঠি যে তাঁরই লেখা সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। মিউজিয়মে যে চোরের উপদ্রব হতে পারে, সেটা তিনি আঁচ করেছিলেন; সেই কারণেই কি তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিলেন? কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে সরাসরি মর্টিমারকে সতর্ক করলেন না কেন? আমি অনেক ভেবেও রহস্যের কিনারা করতে না পেরে শেষরাত্রে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, ফলে আমার উঠতেও দেরি হয়ে গেল।
ঘুমটা ভাঙলও আশ্চর্যভাবে। নটা নাগাদ মর্টিমার হন্তদন্ত হয়ে এসে আমার দরজায় টোকা মেরে ঘরে ঢুকল। তার চাহনিতে গভীর উদ্বেগ। এমনিতে পোশাক-আশাকের ব্যাপারে মর্টিমার খুব পরিপাটি। কিন্তু আজ দেখি তার শার্টের কলার প্রায় খুলে এসেছে, গলার টাই আর মাথার টুপিরও প্রায় সেই দশা। তার সন্ত্রস্ত দৃষ্টি থেকে মোটামুটি বোঝা যায় কী ঘটেছে।
আমি তৎক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে বললাম, মিউজিয়মে চোর এসেছিল বুঝি?
ঠিকই ধরেছ। সেই পাথরগুলো–উরিম আর থুমিমের সেই অমূল্য পাথরগুলো! দৌড়ে আসার ফলে মর্টিমার হাঁফাচ্ছে। আমি চললাম থানায়। তুমি যত শিগগির পায়রা চলে এসো জ্যাকসন–গুড বাই!
উদভ্রান্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মর্টিমার, আর পরক্ষণেই শুনলাম তার দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ।
আমি ওর কথামতো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিউজিয়মে পৌঁছে দেখি, মর্টিমার এর মধ্যেই একটি ইনস্পেক্টর ও আর একটি ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছে। ভদ্রলোকটি হলেন মিঃ পার্ভিস–বিখ্যাত হীরক ব্যবসায়ী মবসন অ্যাণ্ড কোং-এর একজন অংশীদার। নামকরা জহুরি হিসাবে ইনি পাথর চুরির ব্যাপারে পুলিশকে সাহায্য করতে সদা প্রস্তুত। ইহুদির কবচটা যে শো-কেসের মধ্যে ছিল, সেটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনজন। কবচটা এখন বাইরে বার করে কাঁচের আচ্ছাদনটার উপর রাখা হয়েছে, আর তিনজনে গভীর মনোযোগের সঙ্গে সেটাকে পরীক্ষা করছে।
কবচটার উপর যে মানুষের হাত পড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, বলল মর্টিমার। আজ সকালে এটার দিকে চোখ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সন্দেহ হয়। কাল রাত্রেও আমি এটা দেখেছি, তখন ঠিকই ছিল। অর্থাৎ কুকীর্তিটা হয়েছে মাঝরাত্রে।
মর্টিমার ঠিকই বলেছে; কবচটা নিয়ে কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেছে। প্রথম সারির চারটে পাথরকে ঘিরে সোনার উপর ক্ষতচিহ্ন। পাথরগুলো তাদের জায়গাতেই রয়েছে; ক্ষতি যা হয়েছে, সেটা সোনার সূক্ষ্ম কারুকার্যে–যার সৌন্দর্যের তারিফ আমরা এই কদিন আগেই করেছি।
ইনস্পেক্টর সাহেব বললেন, দেখে মনে হচ্ছে, কেউ যেন পাথরগুলোকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল।
মর্টিমার বলল, আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, শুধু চেষ্টাই করেনি, কৃতকার্য হয়েছিল। আমার ধারণা, প্রথম সারির চারটে পাথরই নকল, যদিও চোখে দেখে ধরার উপায় নেই।
জহুরি মশাইয়েরও মনে হয়তো একই সন্দেহের উদয় হয়েছিল, কারণ তিনি এখন আতশ কাঁচের সাহায্যে অতি মনোযোগের সঙ্গে পাথরগুলো যাচাই করছেন। কাঁচের সাহায্য ছাড়াও নানাভাবে সেগুলোকে পরীক্ষা করে অবশেষে মর্টিমারের দিকে চেয়ে একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, আপনার কপাল ভাল। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি যে, প্রথম সারির চারটে পাথরই খাঁটি। এত নিখুঁত পাথর সচরাচর দেখা যায় না।
আমার বন্ধুর মুখ থেকে ফ্যাকাশে ভাবটা চলে গেল। সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, যাক, বাবা! কিন্তু তা হলে চোরের উদ্দেশ্যটা ছিল কী?
হয়তো পাথরগুলো নেওয়ার মতলবেই এসেছিল, কিন্তু সেকাজে বাধা পড়ে।
কিন্তু নেওয়াই যদি উদ্দেশ্য হবে, তা হলে তো একটা একটা করে খুলে নেওয়া উচিত। এখানে দেখছি চারটে পাথরকেই আলগা করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু একটাকেও নেওয়া হয়নি।
ব্যাপারটা খুবই অস্বাভাবিক, বললেন ইনস্পেক্টর সাহেব। ঠিক এরকম ঘটনা আর একটাও মনে পড়ছে না। চলুন, একবার পাহারাদারের সঙ্গে কথা বলা যাক।
প্রহরীকে ডেকে আনানো হল। মজবুত, মিলিটারি গড়ন, চেহারায় সততার ছাপ, গত রাত্রের ঘটনায় সে তার মনিবের মতোই বিচলিত।
না স্যার, আমি কোনও আওয়াজ পাইনি। ইনস্পেক্টরের প্রশ্নের উত্তরে সে বলল। আমি যেমন রোজ করি, তেমনই কাল রাত্রেও তিনবার টহল দিয়েছি, কিন্তু সন্দেহজনক কিছু দেখিনি। আমি গত দশ বছর এই কাজ করছি; এমন ঘটনা আমার আমলে এর আগে কখনও ঘটেনি।
কোনও জানলা দিয়ে চোর ঢুকতে পারে কি?
অসম্ভব স্যার!
তোমার ঘরের সামনে দিয়ে কেউ গিয়ে থাকতে পারে?
না স্যার। টহল দেবার সময়টুকু ছাড়া আমি সারাক্ষণ আমার ঘরের বাইরে বসে থাকি।
মিউজিয়মে ঢোকার আর কী পথ আছে?
মিঃ মর্টিমারের কোয়ার্টাসের একটা প্রাইভেট দরজা দিয়ে মিউজিয়মে ঢোকা যায়।
সে দরজা রাত্রে চাবি দিয়ে বন্ধ থাকে, বলল মর্টিমার। আর সেটায় পৌঁছতে হলে আগে মিউজিয়মের সদর দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়।
আপনার চাকরবাকর?
তাদের থাকবার জায়গা একেবারে আলাদা।
ব্যাপারটা বেশ ঘোলাটে, তাতে সন্দেহ নেই–বললেন ইনস্পেক্টর। অবিশ্যি মিঃ পার্ভিসের মতে আপনার কোনও ক্ষতি হয়নি।
আমি শপথ করে বলতে পারি, প্রথম সারির চারটে পাথর একেবারে খাঁটি, আবার বললেন মিঃ পার্ভিস।
তা হলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে যে, চোরের একমাত্র উদ্দেশ্য হল কবচটাকে জখম করা, বললেন ইনস্পেক্টর সাহেব, তা সত্ত্বেও একবার দালানটা ঘুরে দেখায় কোনও ক্ষতি আছে বলে মনে করি না। হয়তো তার ফলে কে এই রহস্যময় চোর, তার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।
সারা সকাল পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানেও কোনও ফল হল না। মিউজিয়মে ঢোকার যে আরও দুটো সম্ভাব্য পথ আছে, সেটা ইনস্পেক্টর সাহেব আমাদের দেখালেন। একটা হল মাটির নীচে সেলারের মাথায় একটা চোরা দরজা, আর দ্বিতীয় হল মাথার উপরে একটি অকেজো জিনিসপত্র রাখার ঘর বা লাম্বার রুমের স্কাইলাইট। এই ঘরের একটা বিশেষ স্কাইলাইট দিয়ে নীচে মিশরীয় ও ইহুদি জিনিসের ঘরটা পরিষ্কার দেখা যায়। তবে এই দুটো প্রবেশপথের যে-কোনও একটা ব্যবহার করতে গেলেই চোরকে আগে ঢুকতে হবে দালানের মধ্যে। কিন্তু সে পথ যেহেতু বন্ধ, আর সেলার এবং লাম্বার রুম দুটোতেই যে পরিমাণ ধুলো জমে রয়েছে, এই দুটো প্রবেশপথের কথাই ওঠে না। শেষ পর্যন্ত কে, কখন, কেন কুকীর্তিটা করেছে সে রহস্যের কোনও কিনারা হল না।
আর একটিমাত্র পথ মর্টিমারের সামনে খোলা আছে, এবং শেষ পর্যন্ত সে সেটাই নিল। পুলিশদের তাদের কাজ চালিয়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে সে আমাকে অনুরোধ করল সে দিনই বিকেলে তার সঙ্গে প্রোফেসর অ্যাড্রিয়াসের ওখানে যেতে। যাবার সময় সে সঙ্গে চিঠি দুটো নিয়ে নিল, উদ্দেশ্য, প্রোফেসরকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা তিনি কেন নামবিহীন চিঠিটা লিখেছিলেন এবং কী করে তিনি অনুমান করলেন যে, মিউজিয়ামে এইরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটবে। আপার নরউডে একটা ছোট বাড়িতে প্রোফেসর থাকেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে বাড়ির এক পরিচারিকার কাছ থেকে জানলাম যে, প্রোফেসর শহরে নেই। এই খবরে আমরা দুজনেই খুব হতাশ হয়েছি দেখে পরিচারিকা বললেন, আমরা যদি বৈঠকখানায় গিয়ে বসি, তা হলে তিনি প্রোফেসরের মেয়ের সঙ্গে আমাদের দেখা করিয়ে দেবেন।
আগেই বলেছি যে, অ্যাড্রিয়াসের কন্যাটি সুন্দরী। দীর্ঘ ছিমছাম তার গড়ন, মাথার চুল সোনালি, গায়ের রঙ ও মসৃণতা গোলাপের পাপড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সে যখন ঘরে ঢুকল, তখন এই দু-সপ্তাহে তার কত পরিবর্তন হয়েছে দেখে আমি প্রায় চমকে উঠলাম। তার চাহনিতে গভীর সংশয়ের ছাপ।
বাবা গেছেন স্কটল্যান্ডে, বললেন মহিলা। উনি বড় ক্লান্ত বোধ করছিলেন, তার উপর দুশ্চিন্তার কারণ ছিল। উনি কালই চলে গেছেন।
আপনাকেও যেন ক্লান্ত দেখছি, মিস অ্যাড্রিয়াস, বলল আমার বন্ধু।
সেটা হয়েছে বাবার সম্বন্ধে