ওল্ড র্যামন – ২
দুই
নিভন্ত আগুনের কাছে ব্ল্যাঙ্কেটে বসে রয়েছে বুড়ো র্যামন। আকাশে তারার অস্পষ্ট আলো। র্যামনের ঠেস দিয়েবসে থাকা লাল পাথরটাকে প্রকাণ্ড এক দৈত্যের মত দেখাচ্ছে আধো আলোয়। ওর পায়ের কাছে শুয়ে বুড়ো বাদামীটা, থাবার মধ্যে মুখ গুঁজে। দূরে, ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি মস্ত বড় এক টুকরো জমিতে রাতের মত আশ্রয় মিলেছে ভেড়ার পালটির।
ত্রিশ ফুট তফাতে পাথর থেকে পানির ধারা গড়িয়ে নেমে জমা হচ্ছে নিচে ছোট্ট একটা ডোবায়। ভেড়ার দল পানি পান করেছে ওটা থেকে।
ছেলেটি ঝর্ণার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে এক মুঠো বালি ঘষে চারটে টিনের প্লেট আর দুটো কাপ পরিষ্কার করছে। কুণ্ডলী পাকিয়ে পাশে শুয়ে মনিবের সব কাজকর্ম লক্ষ করছে কালো কুকুরটা।
ছেলেটি প্লেট আর কাপ আগুনের কাছে এনে মাটিতে নামিয়ে রাখল। পায়ে পায়ে ওকে অনুসরণ করেছে কালো কুকুরটা।
‘আমার মনে হয়,’ বলল ছেলেটি, ‘রান্নাটা যত মজা হয়েছে আমার বাসন মাজা তার চাইতে খারাপ হয়নি।
‘ওই যে প্যান,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘আর ওইখানে কফিপট।’
ছেলেটি বুড়োর দিকে চকিত চাহনি হেনে ব্যস্তসমস্ত হয়ে প্যান আর কফিপট আনতে গেল আগুনের ওপাশে। তারপর ওগুলো নিয়ে পা বাড়াল আবার ঝর্ণার উদ্দেশে, পিছু পিছু চলল তার কুকুর।
ছেলেটি আগুনের কাছে কাজ সেরে ফিরে এসে প্যান আর কফিপট নামিয়ে রাখল কাপ-প্লেটের পাশে।
‘জিনিসগুলির জায়গা হচ্ছে তাদের ব্যাগ,’ উদাস সুরে বলল বুড়ো।
ছেলেটি সিধে হয়ে চাইল ওর দিকে।
‘তা কেন? সকালে দরকার হবে এগুলো।’
‘যেখানকার জিনিস সব সময় সেখানেই রাখা উচিত, বলল বুড়ো র্যামন। ‘তাতে তাড়াহুড়ার সময় সব কিছু হাতের কাছে পাওয়া যায়।’
ছেলেটি মাথা নামিয়ে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। একটু পরে ধীরে ধীরে ঝুঁকে, জিনিসগুলো একে একে কুড়িয়ে নিয়ে, খোঁটায় বাঁধা গর্দভটার কাছে পড়ে থাকা ব্যাগগুলোর কাছে গেল। ওগুলো ঠেসে ভরল একটা খালি ময়দার বস্তায়। তারপর ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে আগুনের কাছে এসে মাটিতে বিছিয়ে দিল ওটা। ব্ল্যাঙ্কেটে বুদ্ধের আসনে বসল সে, কালো কুকুরটা ওর পাশে শুয়ে মাথা তুলে দিল কোলে।
‘হ্যাঁ,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘হ্যাঁ। ওইটাও নিজে নিজেই আকার নিয়ে ফেলেছে।
‘ডিশগুলো?’
‘না,’ বলল বুড়ো র্যামন। ‘ডিশ-ফিশের কথা বলছি না। কুকুরটা। কালকে ওই স্যাঞ্চোটা ছিল আমার কুকুর। আমার চাচাতো ভাই রোমেরার হুগো আর ফিডেল হার্নান্টের নিকোলের বাচ্চা ওইটা। ফিডেলের কাছ থেকে আমার কাছে এসেছে। শীতের সময় তুষারে জীবন যখন অচল খাওয়ার মতন মাংস নাই তখন আমার কাছে তিনটা ভেড়া ধার করেছিল ও। ফিডেল স্যাঞ্চোকে নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। ‘আমি ভেড়ার কথা ভুলে গেছি,’ তাকে বললাম। ‘আর আমার পেদ্রো তো আছেই।’
‘আমি ভুলি নাই,’ ও বলল আমাকে। ‘আমার ভেড়া, টাকা-পয়সা কিছুই নাই। আছে খালি একগাদা বালবাচ্চা। কিন্তু আমার নিকোল তারও অনেক ছানা আর এইটা হচ্ছে ওইগুলির একটা।’ কেউ যদি দেনা শোধ করে মনটা হালকা করতে চায়, তো কি করবে লোকে?… আই, কালকে ওই স্যাঞ্চো ছিল আমার কুকুর। এমনকি আজকে সকালেও। কিন্তু এখন এই রাতের বেলা ও তোমার হয়ে গেছে।’
‘আমার?’ ছেলেটি অবাক।
‘নিশ্চয়ই। ও তোমাকে মনিব মেনেছে।’
‘তারমানে আমাকে এটা দিয়ে দিচ্ছ?’
ব্ল্যাঙ্কেটে নিজের পাশে দুম করে এক কিল বসাল বুড়ো র্যামন। ‘নিশ্চয়ই। র্যামন কোন কথার কথা বলে না। ভাল কুকুর যেইটা ঠিক করে জ্ঞানী লোক সেইটা মেনে নেয়…’
আগুনের জ্বলন্ত অঙ্গার এখন ম্লান প্রায়, নিভে যাচ্ছে একে একে। কালো কুকুরটার মাথায় হাত বুলোচ্ছে ছেলেটি, আলতো করে টানছে একটা কান।
নিজের ব্ল্যাঙ্কেটে নড়ে উঠল বুড়ো র্যামন।
‘পেদ্রো।’ বাদামী কুকুরটা মনিবকে দেখতে মাথা তুলে ফেরাল। ‘পেদ্রো। সময় হলো। দলের কাছে যা।’ কুকুরটা অমনি উঠে ছুট লাগাল অন্ধকারে। ছেলেটির দিকে তাকাল বুড়ো র্যামন।
‘ও আমার কাছে থাকুক না,’ বলল ছেলেটি। অনুনয় ঝরে পড়ল কণ্ঠে
‘ওর জায়গা দলের সঙ্গে।’
শ্লথভাবে উঠে পড়ল বালক।
‘যা, স্যাঞ্চো। দলের কাছে যা।’
কুকুরটা ছুটতে তৈরি হয়ে কি ভেবে আবার পিছু ফিরে কিশোরের• হাত চেটে দিল।
বুড়ো র্যামন দুম করে আবারও কিল বসাল ব্ল্যাঙ্কেটের পাশে।
‘ওকে জোর করে পাঠাতে হবে!’
কালো কুকুরটার কাছ থেকে ক’পা পিছু সরল ছেলেটি। মাটিতে ডান পাটা দাপিয়ে চেঁচিয়ে আদেশ করল, ‘স্যাঞ্চো! এক্ষুণি যা বলছি।’
কালো কুকুরটা ছুটতে গিয়ে থমকে পড়ে পিছু চাইল, মৃদু কুঁই করে তারপর তীরবেগে দৌড়ে মিশে গেল আঁধারে।
বুড়ো র্যামন হড়কে নিজেকে সটান ফেলে দিল ব্ল্যাঙ্কেটের ওপর। টেনে নিল ব্ল্যাঙ্কেটের একটা কোমা তারপর আরেকটা। বালক একদৃষ্টে চেয়ে অন্ধকারে কুকুরটির গমনপথের দিকে। এবার ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ে গায়ে টেনে নিল ব্ল্যাঙ্কেটের কিনারা দুটো।
ছেলেটি মাটিতে জায়গা বদলে নড়েচড়ে উঠল ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর। র্যাপিঙের ভেতর থেকে বুড়ো র্যামনের চাপা কণ্ঠস্বর কানে এল ওর।
‘আই, মাটিটা খুব শক্ত। কিন্তু প্রতি রাতে একটু একটু করে নরম হতে থাকে…’
ব্ল্যাঙ্কেটের নিচে নরম বালিতে ছোট ছোট দুটো গর্ত করে নিয়েছে কিশোর, নিতম্ব রাখার সুবিধার জন্যে। নিথর পড়ে রইল ও। আবারও শোনা গেল বুড়ো র্যামনের গলা।
‘আমি এখনও জানি না ও ভাল শিপ ডগ হতে পারবে কিনা। তবে এটা জানি এরইমধ্যে ও ভাল বয়-ডগ হয়ে গেছে….
