কত অজানারে – ২০
২০
কত অজানারে জানবার সুযোগ দুর্লভ সন্দেহ নেই। এক পরম পুণ্য লগ্নে টেম্পল চেম্বারে এসেছিলাম। দেখতে পেয়েছি জীবনের এক মহা ঐশ্বর্যময় দিক। কোনো পরিশ্রম, কোনো অনুসন্ধান না করে আকস্মিক গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছি। যেন আনমনে হাঁটার পথে আচমকা হোঁচট খেয়ে চেয়ে দেখলাম, পায়ের কাছে কলসী বোঝাই মোহর। আনন্দে লাফিয়ে উঠেছি। জমা হয়ে রয়েছে অসংখ্য জীবনের আখ্যান। গতানুগতিকতার নুড়ি পাথরের স্তূপে হীরের মতো চকচক করছে বৈচিত্র্য ও সংঘাতময় জীবন।
গল্পকার বা শিল্পী নই আমি। মামুলি পড়াশুনা, সাধারণ কৌতূহল আর আটপৌরে অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে এ-পাড়ায় এসেছিলাম। তাই মহত্তর মানবতা বা চিরন্তন মানুষের কোনো সত্য, যাদের দেখেছি, তাদের মধ্য থেকে নিংড়ে আনতে পারিনি। কিন্তু যৌবনের সন্ধিক্ষণে যে অজানা অচেনা মানুষের অন্তহীন শোভাযাত্রা বিস্মিত ও অভিভূত চিত্তে প্রত্যক্ষ করেছিলাম তার ছাপ আজও মনের মধ্যে অটুট রয়েছে। সংসারের অসংখ্য ধোয়ামোছাতেও সে স্মৃতি আজও অস্পষ্ট হয়নি।
রাণী মীরা, ব্যারিস্টার বোস, শ্রীমতী সুনন্দা, মিস্ ট্রাইটন, হেলেন গ্রুবার্ট, নিকোলাস ড্রলাসদের একদিন যতো নিকট থেকে দেখেছিলাম, আজ তাঁরা ততদূরে সরে গিয়েছেন। আমার স্মৃতির এলবামে পরম যত্নে তাঁদের ছবি সাজিয়ে রেখেছি। সব ছবিই হয়তো সমান উজ্জ্বল নয়। কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি ছবির এক বিশেষ মূল্য আছে। হৃদয়ের সঙ্গে স্মৃতির আঠায় তারা যে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
সব ক’টি কিন্তু আইনের গল্প। তবে ভরসা এই যে, ব্যারিস্টারের বাবুর কাছে লোকে আইনের গল্পই আশা করে। আমিও করতাম একদিন। ছোকাদা ও জগদীশবাবুকে চেপে ধরতাম, গল্প শোনাও। উকিল, ব্যারিস্টার, এটর্নি, জজ, সাক্ষী, মক্কেলের গল্প বলো। তাঁরা বলতেন আইনের গল্প সব সময় ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে ঘর সংসারের আলোচনা করে মুখ পালটিয়ে নিতে হয়।
তখন বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আইনটা মুখ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। যাদের জন্য আইন তারাই প্রধান। এতোদিন ছিলাম ও-পাড়ায়, এক বিন্দু আইন শিখিনি, কিন্তু জীবনের অনেক শিক্ষা লাভ করেছি। আইনের বিশ্লেষণ জজ- ব্যারিস্টারদের জন্য তোলা থাক। যা দেখেছি মানুষের মাঝে আমি তাতেই ধন্য। বিচারে গলদ কোথায়, কম খরচে আরও দ্রুত মামলা ফয়সালা করা যায় কিনা, পণ্ডিতরা চিন্তা করবেন। ছোকাদার ভাষায়, আমরা জিঞ্জার মার্চেন্ট, জাহাজের খবরে লাভ নেই।
কিন্তু নদীর ধারে দাঁড়ালে আদার ব্যাপারীও যেমন মাঝে-মাঝে জাহাজ দেখতে পায়, সায়েবের সান্নিধ্যে আমিও তেমনি মাঝে-মাঝে আইনকে দেখেছি। নেপথ্য থেকে প্রত্যক্ষ করেছি বিচার-নাট্য। কোন্ ফাঁকে মক্কেলের জয় পরাজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি নিজের সুখ দুঃখ। আমি তো কেবল বাবু, কিন্তু আমার গোঁ চেপে গিয়েছে জিততে হবে। যে কোনোপ্রকারে আমাদের মক্কেলের জিত চাই।
ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রীট থেকে অনেক দূরে গিয়ে আজ যখন পুরনোদিনের হিসেবনিকেশ করি, প্রশ্ন জাগে আমাদের সব মক্কেলদের দাবিই কি ন্যায়সঙ্গত ছিল? অপরাধ তাদের কেউ-কেউ নিশ্চয় করেছেন। সুতরাং পরোক্ষভাবে অন্যায় সমর্থন করেছি।
মনে পড়ছে, সায়েব একদিন এ-প্রশ্নের বিশ্লেষণ করেছিলেন। বলেছিলেন, “মার্শাল হলের নাম শুনেছো নিশ্চয়—বিলেতের সর্বযুগের খ্যাতি-সম্পন্ন ফৌজদারী ব্যারিস্টার। তিনি বলতেন, All my geese are swans – আমার সব কানা ছেলেই পদ্মলোচন। আসামীদের পক্ষ সমর্থন করতেন তিনি। ব্রীফ হাতে করলেই তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতো, মক্কেল নিরপরাধ।”
কেবল মার্শাল হল নয়, সব-আইনযোদ্ধার ক্ষেত্রে এটি সত্য।
সকলে পারে না। কিন্তু সায়েব পারতেন। ব্যারিস্টার হয়েও নিস্পৃহভাবে হাইকোর্টের জীবনকে বিচার করতে পারতেন। কত কেস্ এল। বিচার হয়েছে, জজরা রায় দিয়েছেন, ল-রিপোর্টের পাতায় তার খানিকটা ইতিহাস বন্দী হয়েছে। আর কিছুটা আছে সায়েবের মনে।
বলতে ভালোবাসতেন তিনি। কিন্তু বোঝবার বিদ্যে আমার ছিল না। তবু সময় পেলেই আমাকে বলতেন আমিও শুনতাম।
বেলা পড়ে আসছে। ফোর্ট উইলিয়ম থেকে যে দীর্ঘ সুঠাম দেহ নিয়ে সায়েব একদিন টেম্পল চেম্বারে এসেছিলেন, সে-দেহ আর নেই। জীবন-সায়াহ্নে দেহ দুর্বল হচ্ছে। ব্যাধি নয়, জরার আক্রমণে। মন কিন্তু পূর্বের মতো সরল, অনাবিল আনন্দে পরিপূর্ণ। অনেকদিন থেকে তাঁকে দেখছি। পরিবর্তন আসছে কোথাও। অতীতের কাহিনী বলতে পূর্বে এতো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ঠিক ধরতে পারি না, হয়তো আমার মনের ভুল।
কেননা, মাঝে মাঝে তিনি কৌতুকে উছলে ওঠেন। কখনো বলেন, “চলো পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে আসি।”
গড়ের মাঠে ঘাসের উপর দিয়ে আমরা হাঁটতে আরম্ভ করি। খেয়াল-বশে হাতের ছড়িটা মাঝে মাঝে মাটিতে ঠোকেন। একদল স্কুলের ছেলে ফুটবল খেলছে। দু’দিকে ইঁট দিয়ে গোল তৈরী হয়েছে। সায়েব দাঁড়িয়ে পড়েন। বলেন, “বিনা পয়সার ফুটবল খেলা দেখা যাক।”
বল নিয়ে ছেলেরা ছুটছে। একজনের পা থেকে বল কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে অন্য একজন। আনন্দে একহাতে তিনি মাটিতে ছড়ি ঠোকেন, অন্য হাতটি রাখেন আমার কাঁধে।
আমরা আরো এগিয়ে যাই। ছেলেরা খেলছে দলে-দলে। বললেন, “আমারও ওদের দলে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। ছোটোবয়সের খেলায় অনেক আনন্দ।”
দমকা হাওয়ায় মাথার চুলগুলো উড়ছিল। তাদের সংযত করে কিছু বলার আগেই, তিনি বললেন, “চলো এবার ফেরা যাক।”
ফেরার পথে বিশেষ কথা হয় না। শুধু তিনি এক ফাঁকে জানিয়ে দেন, “ডবল চা খেতে হবে আজকে।”
চা-এর টেবিলে দেওয়ান সিংকে ডাক দিয়ে বললেন, “আজকে বেজায় খিদে লেগেছে।”
টোস্টে মাখন লাগিয়ে তার উপর খানিকটা জেলি ছড়িয়ে দেন। “এই মাখন আর জেলি নিয়ে, আমার বাবা ও মায়ের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া লাগতো। মা বলতেন, হয় মাখন না হয় জেলি নাও। গেরস্তর সংসারে দুটো চলে না। বাবা বলতেন, ঠিক বলেছো। তবে জেলি ও মাখন আলাদা খেলে দুটো টোস্ট লাগতো। আমি একটাতে কাজ সারছি। সুতরাং তোমার খরচ এতে আরও কম হচ্ছে। লম্বা বেণী হাতে পাকাতে পাকাতে মা রেগে উঠতেন।”
“বেণী! ইংলন্ডে মেয়েরা বেণী রাখে?”
“এখন বব ছাঁট। কিন্তু আমাদের মায়েরা সেকেলে। মানুষ। তাঁরা ইয়া বড়ো-বড়ো বেণী রাখতেন।”
চা খেয়ে উঠে পড়লাম।
কয়েক দিন পরে চেম্বারে সায়েব বললেন, “আজকাল সকালে রোজ বেড়াতে যাচ্ছি।”
কেমন লাগছে?” জিজ্ঞাসা করলাম।
“খুব ভালো, শরীরটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের হাওয়ায় বেশ চাঙা হয়ে ওঠে।”
শুনে আনন্দিত হয়েছি। হাঁটা-হাঁটিতে শরীরটা আরও ভালো থাকবে।
কেস্ ছিল না সেদিন। একটার সময় চেম্বার থেকে তিনি চলে গেলেন। আমাকে বললেন, “ঠিক সাড়ে চারটেতে ক্লাবে এসো, জরুরী কাজ আছে।”
সকাল-সকাল বাড়ি ফিরবো ভেবেছিলাম। কিন্তু হবে না। নিশ্চয় কোনো নতুন কেস্ আসছে।
ঠিক সাড়ে চারটেতে হাজিরা দিলাম। ঘরে ঢুকতেই সায়েব বললেন, “আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
একটা রোগা ছেলে ময়লা জামা ও হাফপ্যান্ট পরে চেয়ারে বসে আছে। তার হাতে একটা রঙীন ছবির ম্যাগাজিন। আমার দিকে একবার তাকিয়ে সে আবার ছবি দেখতে লাগলো।
যখন সাহেব বললেন, এই ছেলেটির জন্য আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন তখন ভয়ঙ্কর রাগ হলো। ইংরেজি ভালো বোঝে না, আমাকে দোভাষীর কাজ করতে হবে।
জরুরী কাজের এই নমুনা! মনের মধ্যে রাগ গুমরে উঠছিল। বাজে লোকের জ্বালাতনে বিরক্ত হয়ে উঠছি। দিনকয়েক আগে চেম্বারে মিসেস বার্ড এসেছিলেন। সাঙ্গে গোটাতিনেক বাচ্চা। মিস্টার বার্ড লরি ড্রাইভার। মদের ঝোঁকে ছিল সেবারে, লরির তলায় একটা ছেলে চাপা পড়লো। ছ’মাসের জেল। সাহেব আপীল করেছিলেন কিছু হয়নি। স্বামী জেলে, মিসেস বার্ড চেম্বারে এসে বসে থাকেন। সংসার চলে না। একটা ছেলে কোলে শুয়ে থাকে। আর দুটো বেজায় ছটফটে। বড়োটা টাইপরাইটার নিয়ে খটখট্ করতে আরম্ভ করে। তাকে আটকাতে গেলে, ইতিমধ্যে অন্যটি র্যাক থেকে কাগজ বার করে ছিড়তে আরম্ভ করে। সায়েবকে বলেছি, কিন্তু তিনি খেয়াল করেন না।
“ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হয়েছে। বেড়াচ্ছিলাম, ও এসে আমার ছড়ি ধরে টানছিল। কথা বুঝতে পারিনি, তাই আজকে আসতে বলেছি।” সায়েব বললেন।
নাম বাসুদেব ধাড়া। বয়স পনেরো, দেখলে মনে হয় এগারো। শীর্ণ দেহের উপর মোটা মাথা, ঠিক যেন কাঠির ওপর আলুর দম। প্রশ্নোত্তরে জানলাম, যশোর জেলায় বাড়ি। এখানে এক দর্জির দোকানে জামার বোতাম লাগায় এবং পরিবর্তে দু’বেলা খেতে পায়, থাকে আরও বড়ো জায়গায়—নিউ মার্কেট! দর্জির ব্যবসা ভালো চলছে না, তাই তাড়িয়ে দিয়েছে।
শুনে সায়েব বললেন, “হুঁ।”
তিনি মিনিটখানেক ভাবলেন। তারপর বললেন, “কিন্তু বড্ড রোগা। অল্রাইট। ক্লাবের মেশিনে ওর ওজন নিয়ে এসো।”
“চাকরি খুঁজছে ও। ওজনে কী হবে?”
“না-না ওজন নিয়ে এসো। আমার প্ল্যান আছে।”
“বাহাত্তর পাউন্ড।”
“ওনলি বাহাত্তর! সকালে….না সকালে হবে না। বিকালে তুমি রোজ চা খেতে আসবে। ওজন বাড়াতে হবে।” তিনি বাসুদেবকে বললেন।
“চা খেলে ওজন বাড়ে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
“না-না যতোদিন না বিরাশি পাউন্ড হচ্ছে বাটার ও জেলিটা আমরা খাবো না।”
মুখ কুঞ্চিত করে তিনি বললেন, “ঠিক করে ফেলেছি। ওজন না বাড়লে অন্য কোনো চিন্তা করবো না।”
বাসুদেব রোজ বিকেলে চা খেতে আসে। যাবার সময় সায়েব তাকে একটা টাকা দেন। রবিবার দেখা হয় না বলে, শনিবার দু’টাকা দেন।
এক শনিবারে ক্লাবে গিয়েছি। দেড়টা বাজে। বাসুদেব বসে আছে। সায়েব লাঞ্চে গিয়েছেন।
একটু পরে তিনি ফিরলেন। দরজাটা বন্ধ করে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে তিনি বললেন, “চুপ।”
সন্তর্পণে এগিয়ে এসে ফিস-ফিস্ করে বললেন, “বামাল সমেত পালিয়ে এসেছি! ধরতে পারেনি।”
ভয়ে পেয়ে গেলাম। বামাল মানে?
বললেন, “পকেটেই আছে।” তারপর পকেট থেকে একটা আপেল বার হলো। “লাঞ্চ টেবিলে ডিসে দেওয়ামাত্রই চারিদিকে আড়চোখে তাকিয়ে টপ করে সরিয়ে ফেলেছি।” আপেলটা বাসুদেবকে দিয়ে বললেন, “ঠিক হ্যায়, দু’মিনিটে বেমালুম গায়েব করে দাও আপেলটা।”
হাসতে-হাসতে পেটে ব্যথা ধরে গিয়েছিল।
“খবরের কাগজ বিক্রি করবো ভাবছি,” বাসুদেব একদিন সায়েবকে বললে।
বেজায় খুশি তিনি। “এই তো চাই। চেষ্টা না থাকলে কিছু হয় না।”
জামা জুতো কিনে দিলেন। “স্মার্ট না হলে কেউ কাগজ কিনবে না।”
প্রথমদিন বাসুদেব মুখ শুকনো করে ফিরলো। সারাদিন মাত্র দু’খানা বিক্রি হয়েছে। কাপে চা ঢাললেন সায়েব, বেশি করে দুধ মিশিয়ে বাসুদেবের দিকে এগিয়ে দিলেন। “প্রথম দিনে দু’খানা বিক্রি খারাপ নয়। তোমার কি মত?” আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন।
“মন্দ নয়। ক্রমশ বাড়বে”, উত্তর দিলাম।
কি ভাবে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে অনেক আলোচনা হলো। আধ ঘন্টা ধরে তিনি বাসুদেবকে উপদেশ দিলেন।
কিন্তু কিছুতে পাঁচখানার বেশি বিক্রি হয় না। চা-এর টেবিলে বাসুদেবের বিক্রির সংখ্যা জানবার জন্য আমরা অধীর হয়ে বসে থাকি। “আজ ক’খানা?”
“চারটে।”
শুনে আমার মুখের দিকে তিনি তাকালেন। কপাল কুঞ্চিত করে বললেন, “কাল রাত্রে ভাবছিলাম। এতোদিনে কারণটা বুঝতে পেরেছি।”
“কি কারণ?”
“মোজা দরকার। আরও স্মার্ট হতে হবে, তবে বিক্রি বাড়বে।”
হাসি চেপে রাখতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো।
আসলে গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে অনেক কাগজওয়ালার ভিড়। নতুন লোককে তারা ভালো চোখে দেখে না। চোখ রাঙায়, অকারণে তেড়ে যায়। সায়েব কিন্তু নিরুৎসাহ হন না। বিকেলে চা-এর কাপ সামনে রেখে অপেক্ষা করেন। ক্রিকেট টেস্টের খবর নেওয়ার মতো ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞাসা করেন, “হাউ মেনি?”
শরীর ভালো যাচ্ছে না তাঁর। একমাসে দু’বার অসুখে পড়লেন। সম্পূর্ণ সেরে না উঠতেই মাদ্রাজ যেতে হবে। সেখানে একটা মামলা অনেকবার নানা অজুহাতে পিছিয়ে, এবার পাকা দিন পড়েছে।
যাবার আগে বাসুদেবকে দশটা টাকা দিয়ে তিনি বললেন, “দশদিন পরে ফিরছি।”
মালপত্রের লগেজ কম নয়। দু’ট্রাঙ্ক বই নিয়ে হাওড়া স্টেশনে গেলাম। মাদ্রাজ মেল ছাড়তে দেরী আছে। সঙ্গে দেওয়ান সিং যাচ্ছে। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় সাহেব বই পড়তে লাগলেন। আমি তাঁর ঠিক সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। কোন্ ফাঁকে জানলা দিয়ে দৃষ্টি বাইরে চলে গিয়েছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে বুঝলাম আমার দিকে তিনি তাকিয়ে রয়েছেন। বইটা মুড়ে পাশে রেখেছেন। চোখ নামিয়ে নিলাম।
“সাবধানে থেকো। চেম্বারের খবরাখবর আমাকে লিখো। আমিও চিঠি দেবো।”
মাদ্রাজ মেল ছেড়ে দিলো। শেষ বগিটার পেছনের লাল আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
চেম্বারে রোজ যাই। বেয়ারাকে সেখানে বসিয়ে হাইকোর্টে যাই। বার- লাইব্রেরীর সামনে বেঞ্চিতে বসে গল্প করি। বেঞ্চিতে অনেক নতুন মুখ। বিভূতিদার সঙ্গে প্রথম যাদের দেখেছিলাম, তাঁদের অনেকেই নেই। লোক পাল্টিয়েছে। কিন্তু বেঞ্চির রূপ পাল্টায়নি। ঠিক আগের মতো সব কিছু। ছোকাদাকে মনে পড়ছিল। তাঁর কৈশোরে হাইকোর্টের রূপ একই ছিল। আরও আগে হাইকোর্ট কেমন ছিল জানি না। কেউ লিখে যাননি তখনকার কথা। সে যুগের বাবুদের জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তাঁদের সায়েবদের। এই একই বেঞ্চিতে বসে বাবুরা হয়তো সুখ দুঃখের গল্প করতেন। বার-লাইব্রেরীর ভিতরেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু কেদারবাবুর কাজ বাড়ছে। নতুন বই আসছে প্রতিমাসে। র্যাকগুলো উঁচু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মইটাও বড় করতে হচ্ছে।
বাসুদেব এসেছিল চেম্বারে। মাদ্রাজের খবর নিতে। চিঠি আসেনি এখনো।
কয়েকদিন পরে চিঠি এল। পেন্সিলে লেখা দেওয়ান সিং-এর চিঠি। সায়েবের শরীর ভালো নেই, লাঞ্চের আগে কোর্ট থেকে ফিরে এসেছেন।
মনটা খারাপ। চেম্বারে হাজিরা দিয়ে হাইকোর্টে গেলাম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মক্কেলদের দেখছিলাম। চিনি না তাদের, কিন্তু তাদের মতো অনেককে দেখেছি। লোকটা হয়তো জিতবে, ফিরে যাবে আনন্দে। কিংবা ভাগ্যে রয়েছে দুঃখময় পরিণতি।
দুঃখের প্রতি স্বাভাবিক টান আছে নাকি আমার? প্রশ্ন করি নিজেকে। বেদনার উপলব্ধিকে আমি কিছুতে এড়াতে পারি না। প্রেমের নয়, আমার জন্য বিষাদের ফাঁদই পাতা আছে ভুবনে ভুবনে। তাই বিষাদের মধ্যেই আনন্দ সন্ধানের চেষ্টা করি। যারা আসে এখানে, তারা আনন্দ নিয়ে আসে না। সমস্যার সমাধানেও আনন্দ ফিরে পায় না অনেকে। জিতটা হয় হারের সামিল। কিন্তু আমাদের অর্থাৎ বাবুদের বেদনার উপলব্ধি ক্ষণিকের। আমরা উপভোগ করি হাইকোর্টের প্রতিটি মুহূর্ত। আমাদের সায়েবরা যখন কোর্টে কোমর-বেঁধে ঝগড়া করেন, আমাদের মক্কেলরা যখন রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ফলাফলের প্রতীক্ষা করেন, তখন আমরা গল্প করি, বিড়ি চেয়ে খাই, তহুরির খবর নিই। আর সায়েবরা? তাঁরাও তো কোর্টের ঝগড়াঝাঁটিটা কোর্টের মধ্যেই সেরে আসেন। বাইরে ভাই-ভাই।
জজ সায়েবরা? বলতে পারবো না। দূর থেকে সসম্ভ্রমে তাঁদের দেখেছি। এক-এক সময় মনে হয়েছে তাঁরা মানুষ নন। অন্য কিছু। বিচারের দাঁড়ি-পাল্লায় অতি সাবধানে সর্বদা ন্যায় অন্যায় ওজন করে চলেছেন। লিখছেন পাতার পর পাতা, বই হয়ে ছাপা হচ্ছে সে-সব, দপ্তরীরা বাঁধাচ্ছে। এক কপি কেদারবাবু লাইব্রেরীতে সাজিয়ে রাখছেন।
চেম্বারে তালা লাগিয়ে বাড়ি চলে গেলাম। পরের দিন তালা খুললাম ঠিক সময়ে।
পিয়ন এসেছে। টেলিগ্রাম! দেওয়ান সিং-এর টেলিগ্রাম; গতকাল গভীর রাতে সজ্ঞানে সায়েব চোখ বুজেছেন। তিনি ফিরবেন না।
সেই দিনই আর একটা চিঠি পেলাম সায়েব নিজের হাতে লিখেছেন—
‘শংকর,
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে নার্সিং হোমে এসেছি। বিশেষ চিন্তা করো না। এখন বেশ ভালো মনে হচ্ছে। তবে কলকাতায় ফিরতে আরও কয়েকদিন দেরি হবে।
চিঠির উত্তর দিও, আর বাসুদেব ক’খানা কাগজ বিক্রি করেছে জানাতে ভুলো না।
ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।
ইতি”
কাঁদিনি। একটু কাঁদিনি। নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছি। এক ফোঁটা জল আসছে না চোখে। বজ্রাঘাতে জল যেন পাথর হয়ে গিয়েছে।
শেষ। শেষ হয়ে গিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের ইতিহাসের এক অধ্যায়। আমারও। চোখ বুজেছেন শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার। ইতি পড়েছে আমারও জীবনের এক অধ্যায়ে।
আইন-পাড়ায় আর নয়। চাকরি পেলেও নয়। এখানে থাকতে হলে পাগল হয়ে যাবো। আবার পথে বেড়িয়ে পড়তে হবে। হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।
শেষবারের মতো চেম্বারের দরজা বন্ধ করে ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রীটে দাঁড়িয়েছিলাম। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে টেম্পল চেম্বার। স্মৃতির পর্দায় সিনেমা ছবির মতো অসংখ্য দৃশ্য ভেসে উঠছে।
বিভূতিদার হাত ধরে ওল্ড পোস্ট আপিস স্ট্রীটে আসবার প্রথম দিনটি মনে পড়ছে। লালরঙের হাইকোর্ট-বাড়িটার বিশালতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেদিন সেই অচেনা জগৎকে ভালোবাসতে পারিনি—ছিল ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার উপলব্ধি। তারপর পরিচয়ের সূর্যকিরণে ভয়ের মেঘ কেটে গিয়েছে। ছোটো হয়ে এসেছে বিশাল প্রাসাদটি। একতলা, দোতলা, তিনতলার প্রতিটি ঘর প্রতিটা থাম চিনেছি। তবুও অজানা রয়ে গিয়েছে চৌদ্দ আনা। দু’আনা জানবার আগেই শেষ হয়েছে সময়, ছিন্ন হয়েছে বাঁধন।
যে জীবনকে দেখেছি তার কিছুই বলা হয়নি।
ভাবীকালের কোনো ঐতিহাসিক ভারতের এই প্রাচীনতম ধর্মাধিকরণের প্রামাণিক ইতিহাস নিশ্চয়ই রচনা করবেন। ইতিহাসের উপাদান রয়েছে যথেষ্ট। হাইকোর্টের রেকর্ড রুমে জমা হয়ে রয়েছে অসংখ্য দলিল, অগণিত নথিপত্র। ভাবীকালের ঐতিহাসিক সেই স্তূপ থেকে উদ্ধার করবেন কত অজানা তত্ত্ব ও তথ্য। আমি ঐতিহাসিক নই। ইতিহাসের কোনো উপাদানও রেখে যেতে পারলাম না।
কিন্তু পূর্ণচ্ছেদ টানবার আগে একটি ছোট কাহিনী মনে পড়ছে। সায়েবই বলেছিলেন আমাকে।
এই শতাব্দীর প্রারম্ভে লন্ডনের এক এক্স-রে ছবির প্রদর্শনীতে তিনি গিয়েছিলেন। বেজায় ভিড়। নতুন রশ্মির অবিশ্বাস্য ক্রিয়াকলাপ দেখতে অনেকে এসেছেন। সায়েবের পাশে দাঁড়িয়ে এক চীনা ভদ্রলোকও ছবি দেখছিলেন। সায়েবের বয়স তখন খুব কম। বালকসুলভ চপলতা-বশে অজানা ভদ্রলোকটিকে তিনি বলে, ফেললেন, “কী আশ্চর্য, এই আলোতে দেহের প্রতিটি হাড় পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে!” দার্শনিক গাম্ভীর্য নিয়ে চীনা ভদ্রলোকটি তার দিকে তাকিয়ে, উদাসভাবে বললেন, “Yes my boy. But only bones. Unfortunately it does not show your heart.” (হ্যাঁ, তা সত্যি। কিন্তু কেবল হাড়। এতে হৃদয় দেখা যায় না)।
ঠিকই বলেছিলেন চীনা ভদ্রলোকটি এবং আশা করি, আমিও অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে কেবল আইনের অন্তরস্থিত অস্থিকে খুঁজে বেড়ানোর অপরাধ করিনি।
***
