কপিলাবস্তুর কলস – ৪৫
৷৷ পঁয়তাল্লিশ ৷৷
কেভিন দ্য বুচারকে ক্যাফেটেরিয়ার ওয়াক-ইন-ফ্রিজারের ভিতরে পাওয়া গেল। তখনও অচেতন। সশস্ত্র রক্ষীরা কেভিনকে এনে ফেলল UN হেডকোয়ার্টার্সের মেডিক্যাল ইউনিটে। ওখানে কেভিনের জ্ঞান এল। UN হেড কোয়ার্টারের ভিতরে কোনও ক্রাইম হলে তার বিচারের অধিকার একমাত্র UN-এর। কেভিনকে UN হেড কোয়ার্টারের ইন্টারপোল রিপ্রেসেন্টেটিভ অফিসের প্রফেশনাল ল’ এনফোর্সমেন্ট এজেন্টরা জেরা করতে শুরু করল।
যতক্ষণ রিধিমা থার্টি এইটথ ফ্লোরে সেক্রেটারি জেনারেলের অফিসে ছিল, সুনয়ন বাইরে অপেক্ষা করল। আধ ঘন্টা পর রিধিমা বেরিয়ে এল— ‘চলুন।’
‘কথা হল সেক্রেটারি জেনারেলের সঙ্গে?’
‘হ্যাঁ। কেভিন কীভাবে UN এ ঢুকল তাতে উনি খুব উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। উনি বললেন যে UN ইমিউনিটি আমার খুবই দরকার। সেজন্য UN সেক্রেটারিয়েট অফিসিয়াল হিসাবে পোস্টফ্যাক্টো চোদ্দই জানুয়ারি থেকে আমাকে টেম্পোরারি এমপ্লয়মেন্ট দিয়েছেন এবং UN চার্টারের আর্টিকেল হান্ড্রেড ফোর অ্যাণ্ড হান্ড্রেড ফাইভ অনুযায়ী আমাকে UN প্রিভিলেজেস অ্যাণ্ড ইমিউনিটি গ্র্যান্ট করেছেন। নাউ আই হ্যাভ ইমিউনিটি ফ্রম অ্যারেস্ট ফর স্পিচ অর অ্যাক্টস ক্যারিড আউট ইন মাই অফিসিয়াল ক্যাপাসিটি।’
‘কনগ্র্যাচুলেশনস!’ সুনয়নের দু’চোখ ঝলমল করে উঠল। ‘চলুন তাহলে, বেরিয়ে পড়া যাক। মনোজ যোশী এপিসোডটার শেষ অঙ্কটা দেখি।’
রিধিমা সুনয়নের সঙ্গে UNএর বাইরে বেরিয়ে এল। হাঁটতে হাঁটতে সুনয়ন বলল, ‘সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড আর সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট।’
‘সেটা কী?’
‘আমার গায়ানিজ জেনিটর বন্ধুর মুখের চামড়া পুড়িয়ে দিয়েছিল। আপনি সেদিন ঠিকই বলেছিলেন কোনও শিক্ষাই ছোট না, কখন কীভাবে কাজে লাগবে কে বলতে পারে৷’
‘ঠিক বলেছেন,’ রিধিমা সায় দিল। ‘এ’কদিনে কত কিছু শিখলাম। মেজর হু বলল, কেভিনের নাকি হার্ট মাথায় থাকে, আগে জানতাম শুধু চিংড়িরই -’ রিধিমা তাকাল সুনয়নের দিকে, ভেবেছিল সুনয়ন হাসবে, কিন্তু সুনয়ন যথারীতি গম্ভীর। লোকটা হাসতে ভুলে গেছে? রিধিমা আর কথা বাড়াল না। দু’জনে হেঁটে গেল পার্কিং গ্যারাজে। ভ্যালে অ্যাটেন্ডেন্ট গাড়িটা আণ্ডারগ্রাউণ্ড থেকে এনে দিল। গাড়িতে উঠে বসল দু’জন। গ্লাভবক্স খুলে নিজের সেলফোন বের করল সুনয়ন। ওর্জুন অ্যাটর্নির ছ’টা মিসড কল। গাড়িতে উঠে সুনয়ন অর্জুন অ্যাটর্নিকে ফোন করল। ওর্জুন খুব উত্তেজিত।
‘কী হয়েছে ওর্জুন? হরিপরসাদ ঠিক আছে তো?’
‘তুমি কোথায় বস? তোমাকে অনেকক্ষণ ট্রাই করেছি। এদিকে বিরাট প্যাণ্ডোরা বক্স ওপেন হয়ে গেছে।’
‘গুড নিউজ অর ব্যাড নিউজ?’
‘নিউজ গুড না ব্যাড জানি না, তবে ব্রায়ান স্পেনসার হরিপরসাদকে রেসকিউ করার পর হরি পরসাদ জোরাজোরি করে ওই মনাস্টারি রেইড করতে। ওখানে একজন লামাকে ওরা বন্দী করে রেখেছিল।’
‘তারপর?’
‘সার্জেন্ট স্পেনসার ব্যাক আপ সাপোর্ট চেয়ে পাঠায়। পুলিশ মনাস্টারি রেইড করে সেই লামাকে উদ্ধার করে। পুলিশ জানতে পারে ও আসলে একজন ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিস্ট। সে চার বছর আগে নিউ ইয়র্ক থেকে উধাও হয়ে গেছিল।’
‘নাম কী?’ সুনয়ন দেখল রিধিমা যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।
‘ডঃ সিদ্ধার্থ বোস।’
‘হোলি লর্ড কৃষ্ণা!’
‘তুমি চেন?’ ওর্জুন জিজ্ঞাসা করল।
‘উনি রিধিমার দাদা,’ সুনয়ন উত্তেজিত ভাবে বলল।
‘ও মি গসনেস!’ ওর্জুন অবাক।
‘আমরা এক্ষুনি আসছি। উনি এখন কোথায়?’
‘অলবানি মেড।’
‘তুমি এখন অলবানিতে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমরা এক্ষুনি রওনা দিচ্ছি। তিন ঘন্টা লাগবে।’
‘নো প্রবলেম, ড্রাইভ সেফ।’
সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকাল। রিধিমা দুচোখ বন্ধ করে দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে বিড়বিড় করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে চলেছে। রিধিমা বন্ধ দু’চোখের কোনা দিয়ে নামতে শুরু করেছে অশ্রুধারা।
৷৷ ছেচল্লিশ ৷৷
অলবানি মেডিক্যাল সেন্টারের কভার্ড পার্কিং গ্যারাজে গাড়ি পার্ক করে সুনয়ন আর রিধিমা ছুটতে ছুটতে এল রিসেপশনে। সেখানে অপেক্ষা করছিল ওর্জুন।
‘কোথায় উনি?’
‘ICU তে।’
তিনজন দ্রুত পায়ে ICUতে পৌঁছোল। সারি সারি বেড, মাঝে ছাত থেকে ঝুলছে পেসেন্টদের প্রাইভেসি কার্টেন। নার্সিং স্টেশনে একজন নার্সকে ওর্জুন নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করল— ‘এখন কেমন আছেন?’
‘সেডেটিভ দেওয়া হয়েছে। ঘুমোচ্ছেন!’
‘একবার দেখতে পারি ওঁকে?’ রিধিমার আর তর সইছে না।
‘যান, একবার দেখে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসবেন।’ নার্স বলল।
‘এক মিনিট!’ ওর্জুন বলল।
রিধিমা থমকে গেল৷
‘ওর শরীরে অনেক অত্যাচারের চিহ্ন আছে। ওগুলো হয়তো আপনার সহ্য নাও হতে পারে।
রিধিমার এখন সব কিছু সহ্য হবে। রিধিমা এগিয়ে গেল।
সাদা বিছানায় শুয়ে দাদা। ডঃ সিদ্ধার্থ বোস। চোখ বন্ধ। কপালে ব্যাণ্ডেজ, চোয়ালে সেলাইয়ের দাগ, নাকে অক্সিজেনের টিউব, হাতে ইন্ট্রাভেনাস ড্রিপ চলছে, মাথার পাশে পেশেন্ট মনিটরের স্ক্রিনে হলুদ, সবুজ স্পাইকগুলো ছুটে চুলেছে। একজন নার্স আই ভি ব্যাগের ভাল্ভের সেটিং চেঞ্জ করছিল, রিধিমাকে দেখে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। রিধিমার মনের ভিতরে আনন্দ যেন ধুমকেতুর গতিতে দাদার বিছানার দিকে ছুটে যেতে চাইছে। রিধিমা পা টিপে টিপে দাদার বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সাদা চাদরের ওপর দাদার মাংসহীন হাড়সর্বস্ব শীর্ণ খোলা হাতের অনেক জায়গায় ছুঁচের দাগ। শিরা-ধমনী খুঁজে পাওয়াই সম্ভবতঃ একটা কঠিন কাজ ছিল। রিধিমার ইচ্ছা করছিল দাদাকে জড়িয়ে ধরে। নিজেকে সংযত রেখে মুখে হাত চেপে দু’চোখ বন্ধ করল রিধিমা। নিঃশব্দে বুকের জমাট ব্যথার গ্লেসিয়ার গলে দু’গাল দিয়ে ঝরতে লাগল নীরব নির্ঝর।
সুনয়ন সেলফোনে দুটো পটাপট ফটো তুলে নিল। রিধিমার মনে হচ্ছে দাদা যতক্ষণ না জেগে উঠছে দাদার পাশেই বসে থাকে সে।
নার্স বলল এবার আপনাদের বাইরে যেতে হবে। সুনয়ন রিধিমাকে ইশারায় বলল এবার যাওয়া উচিত। রিধিমা বেরিয়ে এল। হলওয়েতে বাইরের নার্সকে বলল, উনি জাগলে বলবেন ওঁকে, আমি ওঁর বোন এসেছিলাম। আবার কাল আসব।’
নার্স বলল, ‘নিশ্চয়ই। কাল সোডিয়াম-পটাশিয়াম লেভেলটা অনেকটা স্টেবিলাইজ হয়ে যাবে।’
‘আরেকজনকে দেখার দরকার আছে,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল।
‘কে?’
‘হরিপরসাদ। পাশের ICUতে। ব্রায়ান বলল ও আপনার দাদাকে বাঁচাবার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে।
নার্স বারণ করল ভিতরে যেতে।
‘কেমন আছে?’ ওর্জুন বলল।
‘ড্রাগ ডিটক্স উইথ মেডিসিন ইনপুট চলছে। এখন আউট অব ডেঞ্জার ওর্জুন বলল, ‘কোল্ড টার্কি সিজার শুরু হয়ে গেছিল, ও সেটা ইগনোর করে আপনার দাদাকে রক্ষা করার জন্য পুলিশকে রিকোয়েস্ট করে। পুলিশের গাড়িতে কোল্যান্স করে গেছিল। কাল সকালে যখন আসব তখন দেখা করব।’
তিনজনে বেরিয়ে এল বাইরে। ওর্জুন বলল, ‘আপনাদের জন্য লাগোয়া হিলটন গার্ডেন ইনে রুম বুক করে রেখেছি। আজ রেস্ট নিন। কাল সকালে আমরা আসব।’
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে হিলটন গার্ডেন ইনে চেক ইন করে সুনয়ন বলল, ‘একটা ইমপর্টেন্ট কাজ বাকি রয়ে গেছে। আপনার ল্যাপটপটা চাই। আর আপনাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে।’ রিধিমা সুনয়নের রুমে ঢুকল। সুনয়ন রিধিমার ল্যাপটপ অন করে অ্যাঙ্গরি বুদ্ধার চ্যাট বক্স খোলার জন্য অ্যাপ থেকে কেভিনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করাতে লাগল। রিধিমা বলল, ‘কাজ করছে?’
‘চাইনীজ হ্যাকারদের তুলনা হয় না,’ সুনয়ন বলল। ‘স্মার্টফোনগুলো তিন রকমের ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানিং টেকনোলজি ব্যবহার করে— ক্যাপাসিটিভ, অপটি—’
‘কাজ করছে কিনা বলুন,’ রিধিমা অধৈর্য।
‘ডান, কেভিন চ্যাটবক্স আনলক করল। তারপর একটা .mov ফাইল পাঠিয়ে টর মেসেঞ্জারে লিখল— ভিডিও—মার্ডার অব রিধিমা বোস আপলোডেড।
লিঙ্কটা হাইলি কনফিডেন্সিয়াল। সেলফোনে খুলবে না, ল্যাপটপে ওপেন করবেন। সুনয়ন লিঙ্কটা পাঠিয়ে দিল। সুনয়নের চোখ সেলফোনে।
‘কী করতে চলেছেন আপনি?’ রিধিমা জিজ্ঞেস করল।
‘মার্ডারের ভিডিওর ফোল্ডারটা আসলে ম্যালওয়্যার। এটা ওর সেলফোনে খুলবে না, ও তখন ল্যাপটপে লিঙ্কটা খোলার চেষ্টা করবে। ও ফাইলটা খুললেই রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান ইনস্টল হয়ে যাবে, আর তার থেকে আমি ওর কী স্ট্রোকে লগ করতে পারব, ওর পাসওয়ার্ড কব্জা করে নেব আর এমন কি ওর নিজের ল্যাপটপের ওয়েবক্যামকেই ইন্সট্রাকশন দেব যে ওর ছবি আমার কাছে পাঠাতে। ল্যাপটপটা টোটালি আমার কন্ট্রোলে এসে পড়বে। ওরই ল্যাপটপের ওয়েবক্যাম দিয়ে ওর ফটো তুলে আমাদের মনিটরের স্ক্রিনে নিয়ে আসব। তারপর কী করব সেটা আমি এখনো ভাবি নি।’
স্ক্রিনে ঝিরঝির করে কুয়াশার মত আবছায়া সৃষ্টি হল। তারপর হঠাৎ একটা মুখ ভেসে উঠল—
মনোজ যোশী!
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মনোজ যোশী কিছু লিখছে। এবার ছোট স্ক্রিনে চ্যাট ভেসে এল, মনোজ যোশী লিখেছে—
ভিডিও কোথায়? ফাইল খালি কেন?
সুনয়ন মনিটরে ঝুঁকে পড়ল। তারপর রিধিমাকে বলল, ‘একটু ভাল করে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখুন তো,’ সুনয়ন ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে কিছু দেখতে লাগল। ‘ব্যাকগ্রাউণ্ডটা নজর করুন।’
রিধিমাও এগিয়ে এল। প্রথমে খেয়ালই করেনি। সুনয়ন ঠিক দেখেছে। মনোজ যোশীর পিছনে কাঁচের বিশাল জানলার বাইরে অন্ধকার নেমে আসায় গোটা কামরাটা প্রতিফলিত হচ্ছে। আর তাতে আবছা দেখা যাচ্ছে মনোজ যোশীর ল্যাপটপের পিছনে একজন মানুষ বসে। মানুষটার মুখ ল্যাপটপের ঢাকনার আড়ালে, তাই বোঝা যাচ্ছে না লোকটা কে। কিন্তু— রিধিমা সুনয়নের হাত চেপে ধরল। ‘দেওয়ালের ঐ ছবিটা— ওটা আমি আগে দেখেছি— ঐ যে লাল গোধুলির আকাশে ক্রুশবিদ্ধ যীশু উড়ে যাচ্ছে— সালভাদোর দালি— এটা ফার্স্ট সেক্রেটারি জয়দেব সাহুর অফিস।’
আমি বলেছিলাম, এটা একজনের পক্ষে সামলানো সম্ভব না,’ সুনয়ন বলল। ‘এরা সব এক দলে। আপনাকে খুন করার জন্য কেভিনকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছে। লি ঝেনের মায়না করা লোক সব।’
সুনয়ন চেয়ার টেনে বসল। তারপর লিখল—
—মনোজ যোশী তোমার সঙ্গে কথা আছে।
—আমার নাম জানলে কীভাবে?
—জেনারেল লি ঝেন বলেছে।
—কী চাও ?
—একটা ব্যাপারে তোমাকে আগাম সাবধান করে দিতে চাই। কথা বলা যাক। তোমার স্ক্রিনের ডান দিকে নিচে একটা মাইক্রোফোনের ছবি দেখতে পাচ্ছ? ওখানে ক্লিক কর।
মনোজ যোশী মাইক্রোফোনের ছবিতে মাউস ক্লিক করল।
‘তোমার নামে FBI এর কাছে রিপোর্ট হয়েছে।’
‘আমার নামে! কী রিপোর্ট?’
‘তুমি নাকি সিদ্ধার্থ বোসকে বলেছিলে বুদ্ধের হাড়ের আমেরিকায় গিয়ে DNA টেস্ট করাতে হবে। সিদ্ধার্থ মিউজিয়াম থেকে গোপনে বুদ্ধের হাড়ের কলসী বের করেছিল নিউ ইয়র্ক যাওয়ার আগে। তুমি গোপনে সেই দৃশ্যের রেকর্ডিং করিয়ে রেখেছিলে। হাড় গোপনে নিউ ইয়র্ক এল। নিউ ইয়র্কে সিদ্ধার্থকে না সরিয়ে বুদ্ধের রেলিকস হাতে আসছিল না। তাই নাকি ওকে সরিয়ে দিলে। আর মিউজিয়ামে তোলা ভিডিওটা ব্যবহার করে বুদ্ধের রেলিকস চুরির দোষ সিদ্ধার্থের ওপর চাপিয়ে দিলে।’
‘সব বাজে কথা। কে বলেছে?’
‘সিদ্ধার্থ বোস নিজে আজ বলেছে।’
‘কী উলটো পালটা কথা বলছ?’ মনোজ যোশী বলল। ‘সিদ্ধার্থ বোস চার বছর আগে মারা গেছে। ওকে লি ঝেনের লোক খুন করেছে।’
‘তাহলে এই ছবিটা দেখ।’ সুনয়ন সিদ্ধার্থ বোসের হাসপাতালের দুটো ছবি পাঠাল।
‘সিদ্ধার্থ বোস বেঁচে আছে!’ মনোজ যোশীর চোয়াল ঝুলে পড়ল।
‘হ্যাঁ, ও আরও বলেছে যে তোমার সঙ্গে জয়দেব সাহুও জড়িত।’
ল্যাপটপটা ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে গেল। জয়দেব সাহু এবার স্ক্রিনে। ‘হ্যাঁ আমরা বুদ্ধের হাড় লি ঝেনকে বিক্রি করেছি। আর সিদ্ধার্থকে স্কেপগোট বানিয়েছি। তবে সিদ্ধার্থকে সরাবার জন্য আমাদের থেকে লি ঝেন এক্সট্রা ডলার নিয়েছিল। ও এটা ঠিক করল না। সিদ্ধার্থ ফিরে এলে আমাদের জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসবে। ওকে আজ রাতেই সরিয়ে দেওয়া খুব দরকার। তুমি কত নেবে?’
‘তুমি একটা ডেঞ্জারাস ব্যাস্টার্ড জয়দেব সাহু।’
এবার জয়দেব সাহু চড়াও হল ‘এত কথার দরকার কী? নাউ কাট দ্য ক্র্যাপ। তোমার কত চাই তাই বল।’
‘জয়দেব সাহু, ইউ আর আ ডেড ম্যান নাউ। তোমাদের ছবি সমেত সমস্ত কথা আমি রেকর্ডিং করেছি। এটা পাঠালাম। এটা দেখ। আজ রাতের মধ্যে এটা ভাইরাল হয়ে যাবে।
ল্যাপটপে একটা ভিডিও ফাইল টুপ করে হাজির হল। জয়দেব সাহু নার্ভাস হাতে ফাইলটা খুলে দেখল। তারপর ক্রুর হেসে বলল, ‘তুমি আমার কিচ্ছুটি করতে পারবে না। আমাদের ডিপ্লোম্যাটদের প্রচুর ক্ষমতা। হ্যাকারের বা ক্রিমিনালের পাঠানো করাপ্ট ভিডিওর কোনও ইম্পরটেন্সই নেই কোর্টের কাছে।’
‘ঠিক আছে। তাহলে তোমার এই ভিডিও আমরা আপাততঃ FBI এর কাছে পাঠাচ্ছি আর সোস্যাল নেটওয়ার্কে রিলিজ করছি।’
‘আমাকে ব্ল্যাকমেল করছ!’ জয়দেব সাহু চিৎকার করে উঠল। ‘যা খুশি কর।’ তারপর একটা প্রচণ্ড শব্দ। মনিটরের স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
ল্যাপটপ বন্ধ করল সুনয়ন ‘জয়দেব সাহু ল্যাপটপ আছাড় মেরেছে মাটিতে। ও কিন্তু খুব বড় মাপের শয়তান।’
রিধিমার মনের মধ্যে একই সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছে— ‘কী করা যায়?’
‘ওর্জুনকে জানাই,’ সুনয়ন বলল। ‘আপনার দাদার একটা সিকিউরিটি দরকার। ব্রায়ান স্পেনসার এখন অনেক কাজে আসবে।’ সুনয়ন সেলফোন বের করল।
‘রজার হুইলারকে একটা কল করে সব জানাতে হবে,’ রিধিমা সুনয়নকে বলল। ‘রজারকে দাদার কথাটাও জানাতে হবে।’
৷৷ সাতচল্লিশ ৷৷
পরদিন সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সুনয়ন রিধিমাকে নিয়ে এল অলবানি মেডিক্যাল সেন্টারে। পার্কিং গ্যারাজে রাতের নার্সের সঙ্গে দেখা। নাইট শিফট সেরে বাড়ি ফিরছে। নার্স হেসে বলল আজ উনি ভাল আছেন। পেসেন্টকে আমরা বেডে শিফট করিয়ে দিয়েছি। ই থার্টি। আমি আপনার দাদাকে বলেছি আপনারা কাল রাতে এসেছিলেন।
দ্রুতপায়ে রিধিমা দাদার কেবিনে পৌঁছোল। বাইরে অপেক্ষা করছিল ওর্জুন। রিধিমা ওর্জুনকে বলল, ‘দাদা কেমন আছেন?’
ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল, ‘আপনি ভিতরে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গে ডাক্তার কিছু কথা বলতে চান।’
রিধিমার বুক ধক করে উঠল— ‘কেন?’
‘আপনি আসুন আমার সঙ্গে,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল। ‘উনি ওখানে।’
নার্সিং স্টেশনের কোনায় একজন ছিপছিপে চেহারার ডাক্তার সাদা অ্যাপ্রন পরে গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে কম্পিউটারের মনিটরে কোনও রিপোর্ট দেখছিলেন ওর্জুনকে দেখে এগিয়ে এলেন। সোজাসুজি পয়েন্টে এলেন ডক্টর— ‘পেশেন্ট এখানে আসার আগে ওর ওপর ক্র্যানোফেসিয়াল রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি করা হয়েছে।’
‘তার মানে?’
‘সহজ ভাষায় বলতে গেলে সাধারণতঃ মাথার খুলি বা মুখের চোয়ালের ডিফরমিটি রিপেয়ার করার জন্য এই সার্জারি করা হয়। খুবই কমপ্লিকেটেড সার্জারি। মাইক্রোস্কোপিক সার্জারি টেকনিকে টিস্যু সরানো হয়, ব্লাড ভেসলস আর নার্ভ সরানো হয়, মুখের ডিফর্মড হাড় কেটে বের করে সেখানে বোন গ্র্যাফটিং করা হয়। মানে পেলভিস, রিব, বা অন্য জায়গার হাড় এনে বসানো হয়, তারপর আবার নার্ভ, রক্তনালী সব জোড়া লাগানো হয়, জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়ায় পেসেন্টকে ঘুম পাড়িয়ে এই সার্জারি করতে অনেক সময় বারো ঘন্টার বেশি সময় লাগে। আপনার দাদার সার্জারিটা কিন্তু অদ্ভুত। যে হাড়গুলো লাগানো হয়েছে সেগুলো নিজেরাই ডিফর্মড হাড়, কোনোটা পোড়া, কোনোটা ভাঙা, কেন এই সার্জারি করা হল জানিনা। এই সার্জারি করার সময় একটা টেম্পরারি ট্র্যাকিওস্টোমি করতে হয়।’ ডাক্তারের মনে হল টু মাচ মেডিকেল টার্মস ব্যবহার করে ফেলছে, তাই আবার ব্যাখ্যা করে বলল ‘আপার এয়ারওয়েজ ব্লক হয়ে যাওয়ার দরুণ শ্বাস নেওয়া মুস্কিল হয়ে যায়, তাই গলায় একটা ফুটো করে একটা টিউব ঢোকানো হয়।’ ডাক্তার স্কুলের মাস্টারমশাইয়ের মত যেন ছাত্রকে কঠিন বিষয় সোজা করে বোঝাচ্ছেন এমনভাবে বললেন ‘খুব এক্সপার্ট সার্জন দরকার হয়। হেড অ্যাণ্ড নেক সার্জনের সঙ্গে নিউরোসার্জন এবং প্ল্যাস্টিকসার্জন একসঙ্গে এই সার্জারিতে ইনভলভড থাকেন। আনফর্চুনেটলি আপনার দাদার এই সার্জারি সাকসেসফুল হয় নি। ওরা আপনার দাদার ভোকাল নার্ভ ড্যামেজ করে দেয় এবং তার ফলে আপনার দাদার কথা বলার ক্ষমতা লোপ পায়। তারপর ওঁর স্পাইনেও বোন গ্র্যাফটিং করার চেষ্টা করা হয়েছে, যার দরুণ আপনার দাদা চলাফেরা করার ক্ষমতা হারিয়েছেন।
‘কী বলছেন কী?’ রিধিমা কেঁদে উঠল। ‘কেন এই সার্জারি করা হয়েছে?’
‘মিস বোস, কেন তা আমি জানি না। সেটা বের করা পুলিশের কাজ। আমি একজন ডাক্তার হিসাবে মেডিক্যাল সাইডটা আপনাকে জানালাম যাতে আপনার দাদার সামনে আপনি ভেঙে না পড়েন।’
‘আমি দাদাকে দেখতে চাই,’ রিধিমা চোখ মুছল।
‘গুড,’ ডাক্তারকে খুশি দেখাল। ‘যান ভিতরে।’
রিধিমা দরজা খুলে দেখল দাদা তার দিকে তাকিয়ে। রিধিমা দরজায় এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল নিজেকে সামলাতে। তারপর ছুটে গিয়ে দাদাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। রিধিমার আলিঙ্গনাবদ্ধ সিদ্ধার্থ বোস সজলনেত্রে শীর্ণ হাত বোনের পিঠে-মাথায় হাত বোলাতে লাগল, দু’চোখ দিয়ে তারও জলের ধারা বইতে লাগল। রিধিমা জানে দাদার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু দাদার শরীরের সব ক্ষত সে ভালবাসার প্রলেপ দিয়ে ভরিয়ে তুলবে।
এবার সুনয়নের সঙ্গে রিধিমা দাদার পরিচয় করিয়ে দিল। সুনয়ন রিধিমার কয়েকটা ফটো আর একটা স্বল্পস্থায়ী ভিডিও তুলে নিল দাদার সঙ্গে। ‘এগুলো আমার কাজে লাগবে।’ রিধিমা বুঝে উঠতে পারছে না কোথা থেকে শুরু করবে। কত কথা জমে আছে— ডঃ উইকস – দাদার ডায়েরি – দেবচরণ – তুলসী রাজকুমারী – বুদ্ধাপট – সব কিছু গলায় দলা পাকিয়ে যাচ্ছে – রিধিমা শুধু দাদাকে জড়িয়ে কাঁদছে। ডঃ উইকসের কথা দাদাকে বলা এখন উচিত হবে না, ভাবছিল রিধিমা। সিদ্ধার্থ বিছানার পাশে রাখা রাইটিং প্যাড টেনে কষ্ট করে লিখল, ‘ডঃ উইকস ডেড?’
‘হ্যাঁ,’ রিধিমা চোখ মুছল। তারপর ব্যাকপ্যাক থেকে দাদার ডায়েরি বের করল। ডঃ উইকস এটা রেখে গেছেন।
নার্স ভিতরে ঢুকল। ওঁকে স্পঞ্জ করিয়ে গাউন চেঞ্জ করে নিই, আপনারা প্লিজ আধ ঘন্টা বাইরে অপেক্ষা করুন, তারপর আবার আসবেন।’ নার্স পেসেন্টের প্রাইভেসি কার্টেন টেনে দিল।
কেবিন থেকে হলওয়েতে বেরিয়ে সুনয়ন বলল, ‘কফি খাবেন?’
রিধিমার এখন দাদার কাছছাড়া হতে মন চাইছে না। কিন্তু সুনয়নকে না বলতেও দ্বিধা লাগছে, মানুষটার কাছে কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। হলওয়েতে দেখা গেল হাতে ফুলের বুকে নিয়ে আসছে রজার হুইলার। আজ ফর্মাল টাই-কোট নেই, জিনস, জ্যাকেট, মাথায় একটা ক্যাপ ক্যাজুয়াল পোশাকে লোকটার বয়স অনেক কম লাগছে। রিধিমা জানে রজার হুইলার কেন অত ভোরে তিন ঘন্টা ড্রাইভ করে এসেছে, এবার ওকে ক্যাফেটেরিয়ায় যেতেই হবে।
ছোট ক্যাফেটেরিয়া। কয়েকজন ডাক্তার, নার্স, পেশেন্টদের বাড়ির লোক এদিক ওদিকে টেবিলে বসে। তিনজনে কফি নিয়ে বসল।
‘হিটম্যান কেভিনকে কথা বলাতে গিয়ে আমার ব্লাড প্রেসার হাই হয়ে গেছে,’ রজার হুইলার বলল। ‘কিছুতেই মুখ খুলবে না!’
‘মানুষের রূপে শয়তান,’ রিধিমা বলল।
‘অভিজ্ঞ ইন্টারপোল এজেন্টরা যখন অ্যাট লাস্ট ওকে বিশ্বাস করাতে পারল যে লি ঝেন রাতের ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছে, এবং লি ঝেন স্টেটমেন্ট দিয়েছে যে কেভিন হার্ভার্ডে গিয়ে তিন জন প্রফেসর ও একজন পুলিশকে খুন করেছে, এবং তারপর নিউ ইয়র্কে ডঃ গিলমোরকে খুন করেছে তখন কেভিনের চোখে আগুন জ্বলে উঠল এবং কেভিন ফাঁস করে দিল যে লি ঝেন এই সকল খুনের জন্য কেভিনকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছে।’
‘লি ঝেনের কী হল?’ রিধিমা জিজ্ঞাসা করল।
‘কেভিনের স্টেটমেন্ট পেয়ে ইন্টারপোল লি ঝেনকে অ্যারেস্ট করেছে। লি ঝেনের অ্যাসেট ফ্রিজ করার জন্য ও ট্রাভেল ব্যান করার জন্য স্পেশাল নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে। কেভিনকে ইন্টারপোল FBI-এর হাতে তুলে দিয়েছে। কাল কী দিনটাই না গেল! আই লাভ মাই জব!’
রজার হুইলার কফিতে চুমুক লাগাল। রজার হুইলার ধরণের লোকেরা বোধহয় সময় নষ্ট করে না। রজার সুনয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি কীভাবে আমাদের UN সিস্টেম হ্যাক করলেন, তা জানতে আমি ইন্টারেস্টেড নই। কিন্তু আমি আপনার জন্য একটা চাকরির অফার এনেছি।’
‘আমার জন্য চাকরি!’ সুনয়ন অবাক। ‘কীসের চাকরি?’
‘হোয়াইট হ্যাট।’
‘কাম অন!’ সুনয়নের মনে হল রজার হুইলার বুঝি রসিকতা করছে।
‘আমি সিরিয়াস, রজার বলল। ‘আমরা UN-এর ইনফরমেশন সিস্টেম হ্যাকপ্রুফ করতে চাই। কাল জেনারেল অ্যাসেম্বলির প্রোজেকশন সিস্টেম হ্যাক করে আপনি আমাদের কমফোর্ট জোনের বাইরে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছেন। আমরা চাই সামওয়ান ফ্রম আউটসাইড আমাদের UN-এ এসে রোবাস্ট পেনিট্রেশন টেস্টিং করে আমাদের সিস্টেমের লুপ-হোলস এক্সপোজ করে দিক। আপনার ট্যালেন্টকে আমরা ব্যবহার করতে চাই। প্লিজ জয়েন এণ্ড হেল্প আস। আপনার বিরুদ্ধে কোনও এনকোয়্যারি হবে না, আই প্রমিস।’
‘থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর কনফিডেন্স ইন মি,’ সুনয়ন বলল, ‘কিন্তু আমি একটা খবরের কাগজের সঙ্গে যুক্ত। আমাকে এডিটরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জব চেঞ্জ করতে গেলে নোটিশ দিতে হবে।’
‘ওসব দায়িত্ব আমার। আপনার ডেট অব জয়েনিং গতকাল সকাল থেকে। রজার জ্যাকেটের ভিতরের পকেট থেকে একটা অফার লেটার বের করল। ‘সই করুন। স্যালারি আমাদের সিনিয়র IT কনসালটেন্টদের সঙ্গে অ্যাট পার রেখেছি।’
সুনয়ন অবাক। কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাগজটা পড়ল। এই রজার হুইলার বেশ ধুরন্ধর লোক মানতেই হবে। রস্ট্রামের লি ঝেনের প্রোজেকশনটা সিকিউরিটি ল্যান্স হিসাবে না দেখিয়ে পেনিট্রেশন টেস্টিং হিসাবে দেখিয়ে নিজের চামড়া বাঁচাতে চায়। অবশ্য এটা সুনয়নের জন্য উইন উইন। সুনয়নের বিরুদ্ধেও কোনও এনকোয়্যারি থাকবে না। সুনয়ন বলল, ‘ঠিক আছে, আমি রাজি। কিন্তু আমার এডিটরকে রাজি করাবার দায়িত্ব আপনার।’
‘আই প্রমিস!’ রজার হুইলার থাম্বস আপ করল।
সুনয়ন কাগজের নিচে অফার অ্যাকসেপ্টেন্সের সই করল।
‘থ্যাঙ্কস!’ রজার হুইলার অফার লেটারটা ভাঁজ করে সুনয়নের সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করল। ‘কপি পাঠিয়ে দেব।’ রিধিমা রজারের স্বস্তির নিঃশ্বাসের আওয়াজ পরিষ্কার শুনল।
রজার হুইলার শরবৎ খাওয়ার স্পিডে ঘনঘন চুমুক মেরে কফি শেষ করে ফেলল। মাথায় ওর বোধহয় অনেক কিছু ঘুরছে। রিধিমাকে বলল, ‘হার্ভার্ড পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। আপনাকে ওদের কাছে ফর্মালি সারেন্ডার করতে হবে। এটা একটা ফর্মালিটি মাত্র। কিছু ব্যুরোক্রেটিক কাগজ-টাগজ সই করতে হবে। সুনার দ্য বেটার। আমি বলি আপনি দাদার সঙ্গে আজ আর কাল কাটিয়ে সোমবার সকালে হার্ভার্ড রওনা দিন।’
তিনজনে ফিরে এল উপরে। রজার হুইলার বেশিক্ষণ থাকল না৷ দাদাকে ফুলের বুকে উপহার দিয়ে, রিধিমার ঝুড়ি ঝুড়ি প্রশংসা করে, আরোগ্য কামনা জানিয়ে চলে গেল। রজার হুইলার বেরিয়ে যেতেই দাদা রাইটিং প্যাডে লিখল, ‘ডায়েরিটা পড়েছিস?’
‘পড়েছি,’ রিধিমা বলল। ‘এবং তুলসী দেবচরণ রাজকুমারীর বংশধরকে আমি আবিষ্কারও করেছি।’ রিধিমা সুনয়নের দিকে আঙুল দেখাল। ‘এই যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি এঁর কাছে খুব কৃতজ্ঞ, ইনি না থাকলে আমায় জীবিত দেখতে পেতে না।’
সুনয়ন দু’হাত জোড় করে নমস্কার করল। সিদ্ধার্থ বোস ছলছল চোখে তাকিয়ে, সে দৃষ্টি যেন কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলছে— ভগবান আপনার ভাল করুন। অনেক ধন্যবাদ বোনকে রক্ষা করার জন্য।
তারপর সিদ্ধার্থ বোস ডায়েরিতে লিখল— ‘তাহলে বুদ্ধের অস্থিকলস এখন কোথায়?’
সুনয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল— ‘অস্থিকলসটা আমার মা ডঃ উইকসকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা ডঃ উইকস কোথায় রেখে গেছেন তা আমরা জানি না।’
‘শুধু ডায়েরির শেষ পাতায় উনি এটা লিখে গেছেন,’ রিধিমা ডায়েরির শেষ পাতাটা দেখাল—
BUDDHA’S BONES HERE IN THE TEMPLE OF HER MOTHER
‘হিয়ার মানে হার্ভার্ড,’ রিধিমা বলল। ‘কিন্তু হার্ভার্ডে বুদ্ধের মায়ের কোনও মন্দিরই নেই। অনেককে জিজ্ঞাসা করলাম, কিন্তু কেউ-ই জানেনা।’ রিধিমা নিরাশ গলায় বলল।
সিদ্ধার্থ বোস সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল। তারপর লিখল, ‘বুদ্ধের মা— মায়া। টেম্পল অব হার মাদার, মানে টেম্পল অব মায়া। সাউথ আমেরিকান অ্যাজটেক–ইনকা-মায়া টেম্পলের মত শোনাচ্ছে ।
রিধিমার মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। ‘পিবডি মিউজিয়ামের চারতলায় পুরোটাই মায়া-অ্যাজটেকদের কালেকশন,’ রিধিমা বলল। ‘তাহলে কি ওখানেই উনি কলসটা রেখেছেন?’
এবার সিদ্ধার্থ বোসকে উত্তেজিত দেখাল। ‘তাহলে তোমরা দেরি কোরো না। এটা একটা বড় আবিষ্কার।’ ডায়েরিতে লিখে সিদ্ধার্থ বোস হাঁফাচ্ছে।
‘হি ইজ টু জ্যাপড,’ নার্স ফিরে এসে সিদ্ধার্থ বোসকে হাঁফাতে দেখে বলল। ‘ওঁর অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশনের ট্রিটমেন্ট চলছে। ওঁকে এবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে দিন।’
‘এতটা যখন হয়েছে, বাকিটাও আমরা ঠিক খুঁজে বের করব,’ সুনয়ন সিদ্ধার্থ বোসের শীর্ণ হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। ‘আই প্রমিস।’
৷৷ আটচল্লিশ ৷৷
২১ জানুয়ারি, ২০১৯
সোমবার
আজ সকাল থেকেই রিধিমার মনে চূড়ান্ত উত্তেজনা। একটা গোপন ইতিহাস উন্মোচিত হতে চলেছে। রাজকুমারী, তুলসী আর দেবচরণ বুকের পাঁজরের মত যে কুম্ভ সঙ্গে নিয়ে ভারত ছেড়েছিল সে কুম্ভের গায়ে কী লেখা ছিল? সুভূতি যে ষষ্ঠ কলসের কথা বলেছিল এটাই কি সেই কলস? ফাদার শিলটন বলেছিল যে কারুক্কে এটা দেখাবে না। ফাদার শিলটন আরও বলেছিল তোমাদের দেশের ইতিহাসকে নিয়ে একটা ব্যবসা চলছে। যারা ব্যবসাটা করছে তারা এটা দেখলে তোমাদের মেরে ফেলবে এবং এটাও ভেঙে ফেলে ইতিহাস মুছে দেবে।
কী লেখা থাকতে পারে?
বুদ্ধের চিতার আগুন তো কতকাল আগে নিভে গেছে, কিন্তু সেই আগুন এখনো বুদ্ধের চিতার ছাইয়ে চাপা পড়ে আছে। পিতরাওয়ার ব্রাহ্মী অক্ষরগুলো হল সেই ছাই চাপা আগুনের প্রকাশ। এই ব্রাহ্মী অক্ষরগুলোকে কেউ খোঁচাখুঁচি করলেই সেই ব্রাহ্মী বহ্নিশিখা দপ করে জ্বলে চারদিকে প্রকট হয়ে ওঠে।
পাশে সুনয়ন ড্রাইভিং সিটে, পিছনের সিটে ওর্জুন অ্যাটর্নি চোখ বন্ধ করে ঘুমোবার চেষ্টা করছে, সুনয়নের দিকে তাকাল রিধিমা। সুনয়ন চিন্তার বুদবুদের মধ্যে ঢুকে আছে। ওর মনেও যে কত উত্তেজনা চলছে তা আন্দাজ করতে পারে রিধিমা। কাল অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। FBI ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটির মনাস্টারির রিনপোচের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনেছে। লামার নির্দেশে নাকি তার শিষ্যরা গত এক বছরে কাঠমাণ্ডুর ওল্ড হোমে বিভিন্ন সময় তিনজন বৃদ্ধকে পয়জনিং করে মেরেছে। সেই বৃদ্ধদের মৃতদেহ তেলে ডুবিয়ে চন্দনকাঠের চিতায় জ্বালিয়ে তাদের হাড় লেক জর্জের মনাস্টারিতে নিয়ে এসেছে।
‘নার্ভাস!’ সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
রিধিমা মাথা নাড়ল— ‘হ্যাঁ। তবে ভগবান আছেন।’
‘ভাবা যায় না,’ সুনয়ন বলল। ‘বুদ্ধের শরীরের হাড়ের টুকরোগুলো জুড়ে জুড়ে বুদ্ধের জীবন্ত কঙ্কাল বানাবার জিগস! এজন্য বুদ্ধের হাড় কিনে চলেছিল ওই লামা।’
‘তবে রিনপোচে হেরে গেল মঞ্জুশ্রী লামা, মানে আপনার দাদার আর হরিপরসাদের প্রখর প্রতিভার কাছে,’ পিছনের সিট থেকে ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল।
‘হরিপরসাদ কেমন আছে?’
‘কাল সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে। ওকে আজ ছেড়ে দেবে হসপিটাল থেকে। ও ওর মঞ্জুশ্রী লামার সঙ্গে দিনটা কাটাতে চায়। গুড নিউজ, ও রিহ্যাব প্রোগ্রামে যেতে রাজি হয়েছে। আমার টিমে এরকম ইন্টেলিজেন্ট ছেলে দরকার।’
‘তবে আমি অনেক ক্রেডিট দেব ওর্জুনকে,’ সুনয়ন বলল৷
‘ক্রেডিট চাই না, ক্রেডিট কার্ড চাই। আমার পেমেন্টটা ঝুলিয়ে রেখো না, পিছনের সিটে ওর্জুন অ্যাটর্নি চোখ না খুলেই বলল, ‘দ্যাট ক্রেজি রিনপোচে কতখানি বদ্ধ উন্মাদ হলে একজন চিৎকার করে বলে যে মিউজিয়ামে বুদ্ধের হাড় যেন কারাগারে পিঞ্জরাবদ্ধ কয়েদি। তাই সে তাকে মুক্ত করে নিজের মঠে নিয়ে আসে। বুদ্ধের শরীর জোড়া লাগালে নাকি মৈত্রেয়ী বুদ্ধের জন্ম অবশ্যম্ভাবী। আমি শুধু ভাবছি একে প্যাম্পার করে চলেছে কারা? কোন দেশ? কী তাদের উদ্দেশ্য?’
‘এদিকে FBI-এর কাছে লি ঝেন ডবল অ্যারোর কথা স্বীকার করেছে,’ সুনয়ন বলল।
‘আমি কিন্তু মোহনকে সন্দেহ করেছিলাম,’ রিধিমা বলল।
‘আমিও কিছুটা। কিন্তু এক সময় মনে হয়েছিল যে যখন আপনার দাদা নিখোঁজ হয়েছিল তখন কি আজকের পাওয়ারফুল প্লেয়ারদের কেউ নিউ ইয়র্কে ছিল? মোহন তখন নিউ ইয়র্কে ছিল না। তবে কে? দেখলাম জয়দেব সাহু তখন সেকেণ্ড সেক্রেটারি। তখন লোকটাকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছিলাম। কিন্তু আপনার উড়ন্ত যীশু ওকে ধরিয়ে দিল।’
‘জয়দেব সাহু ভেবেছিল মন্ট্রিয়েল থেকে দিল্লী ফ্লাই করবে। আমি সন্দেহ করেছিলাম,’ ওর্জুন বলল। ‘ক্যানাডার বর্ডারে ও ধরা পড়ে। নিজেকে বড় চালাক ভেবেছিল।’
একদলে অনেকে কথা বলতে বলতে এক একটা মুহুর্ত আসে যখন সকলের কথা একসঙ্গে শেষ হয়ে যায়, নেমে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা। তখন বোধহয় সকলে নিজের নিজের ভাবনার জগতে কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে যায়। সুনয়নের মনে হল অনেকক্ষণ সবাই চুপ। আরও অনেকটা পথ বাকি। সুনয়ন কথা শুরু করার জন্য বল ‘আপনার দাদা জাম্বল এত ভাল শিখলেন কীভাবে?’
‘ন্যাচারাল ট্যালেন্ট?’ রিধিমা বলল। ‘দাদার ফেভারিট পাসটাইম। আমার সঙ্গে দাদা দিল্লীতে রোজ শব্দের জাম্বল, পাজল, ধাঁধা এসব খেলতেন। তারপর ডঃ উইকসও পাজল ভালবাসতেন।’
‘আচ্ছা? আপনিও তাহলে এক্সপার্ট?’ সুনয়ন বলল। ‘তাহলে বলুন তো ME IN A CAR ABACK. এই ধাঁধার উত্তর কী?’
রিধিমা পায়ের কাছে রাখা ব্যাকপ্যাক থেকে কাগজ কলম বের করে লিখল শব্দগুলো, তারপর কিছুক্ষণ পেন দিয়ে কপালে টোকা মারতে মারতে চিন্তা করতে লাগল।
‘কঠিন হয়ে গেল?’
‘ভাবছি,’ রিধিমা কিছুক্ষণ শব্দগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর কাগজে বড় বড় করে লিখল— AMERICA BANK AC.
‘ওয়াও!’ সুনয়নের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ‘এটাও হয়?’
‘হয় নি?’ রিধিমার চোখে প্রশ্ন।
‘হয়েছে,’ সুনয়ন বলল। ‘আপনার মাথায় সব সময় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ঘোরে বুঝি?’
‘দু-দুটো ক্রেডিট কার্ড হ্যাক হয়ে গেলে আপনার মাথাতেও সব সময় ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই ঘুরত,’ রিধিমা কপট রাগের সঙ্গে বলল।
‘তা ঠিক,’ সুনয়ন এবার হেসে ফেলল। ঝকঝকে দাঁতের সারি, এক নিষ্পাপ পুরুষালি হাসি। এক সপ্তাহের মেঘলা আকাশে প্রথম সূর্যের আলো। রিধিমা হৃদপিণ্ডটা লাব-ডুব থেকে বেরিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল— লোকটার ঠোঁটে হাসি আবার ফিরিয়ে দিলে তুমি। সুনয়নকে হাসলে সুন্দর দেখায়।
৷৷ উনপঞ্চাশ ৷৷
হার্ভার্ড মেমোরিয়াল চার্চের পিউগুলো ভর্তি, প্রায় শ’খানেক মানুষ জমা হয়েছে। হার্ভার্ড অফিস অব কমিউনিকেশনস HDS স্পিকার, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, কলিগ, অ্যাসিস্ট্যান্ট, গাইড, বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী, পরিবারের সদস্য, বন্ধু এবং আরও অনেকে এসেছেন হার্ভার্ডের চারজন প্রফেসরকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানাতে। পোডিয়ামের পাশে স্ক্রিনে চারজন প্রফেসরের ছবি। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট পোডিয়ামে এসে চারজন প্রফেসরের সুখ্যাতি করলেন, দুঃখ প্রকাশ করলেন তাঁদের অকাল মৃত্যুর জন্য, জঘন্য হত্যার তীব্র নিন্দা করলেন, তারপর একে একে আটজন স্পিকার তাদের বক্তব্য রাখলেন। সব শেষে হার্ভার্ডের পুলিশ কমিশনার এলেন পোডিয়ামে। তিনি বললেন এই মৃত প্রফেসরদের শ্রদ্ধা জানাতে আমি যেমন এসেছি, আমি তেমনি এসেছি ক্ষমা চাইতে। আমার ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসারের দ্বারা এই ইউনিভার্সিটির একজন PhD স্টুডেন্টের ওপর এক অবিচার করা হয়েছে, এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তারপর পুলিশ কমিশনার এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন, উনি পোডিয়াম থেকে নেমে রিধিমার পাশে এসে দাঁড়ালেন এবং রিধিমার সামনে মেঝেতে হাঁটু ঠেকিয়ে বসে বললেন— সিনসিয়ার অ্যাপোলজিস ফ্রম হার্ভার্ড পুলিশ। দৃশ্যটা দেখে মেমোরিয়াল চার্চ হাততালি মুখর হয়ে উঠল। এবার পুলিশ কমিশনার অনুরোধ করে রিধিমাকে পোডিয়ামে নিয়ে এসে বললেন, ‘হার্ভার্ড পুলিশের যে অফিসার আপনাকে প্রাণের হুমকি দিয়েছিল তাকে সাসপেণ্ড করা হয়েছে, যদিও আমরা ওই অফিসারের মানসিক অবস্থার কথা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু এই থ্রেট কমপ্লিটলি আন-অ্যাক্সেপ্টেবল। ইনভেস্টিগেশনের জন্য ব্যাপারটা ইনডিপেন্ডেন্ট অফিস অব পুলিশ কণ্ডাক্টের হাতে সমর্পণ করা হয়েছে। হার্ভার্ড পুলিশ আপনার বীরত্বের জন্য গর্বিত, আপনি এদের চারজনের হত্যাকারীকে ধরিয়ে দিয়েছেন, ইউনাইটেড নেশনসে এই হত্যার পিছনে যে সব টপ ক্রিমিনাল আছে তাদেরও মুখোশ খুলে দিয়েছেন। আমি অনার্ড ফিল করছি আপনার সঙ্গে এক পোডিয়াম শেয়ার করার জন্য।’ মেমোরিয়াল চার্চ আবার হাততালিতে ফেটে পড়ল।
সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার পর পোডিয়াম থেকে নেমে এসে রিধিমা সুনয়নের পাশে বসে নিচু গলায় বলল, ‘আপনি কিছুতেই রাজি হলেন না, নতুবা সব বাহাদুরিটা একা নিতে খুবই খারাপ লাগছিল।’
সুনয়ন বলল, ‘থ্যাঙ্কস, আমি চাইনি UN হ্যাক করার প্যাণ্ডোরা বক্স খুলে যাক। চলুন, লেটস রোল। আসল কাজটা বাকি।’
* * *
পিবডি মিউজিয়ামে স্যালির অফিসে স্যালি আর ভক্তি অপেক্ষা করছিল। রিধিমাকে দেখে দু’জনের চোখে খুশি ঝিলিক মেরে উঠল।
‘লাড হনুমান সেভড ইউ,’ ভক্তি এগিয়ে এসে রিধিমাকে জড়িয়ে ধরল। ভক্তির বেষ্টনীর মধ্যে রিধিমার মনে হচ্ছিল এরা তার কত আপনজন, তাকে বাঁচাবার জন্য ওরা কতটা ঝুঁকি নিয়েছে।
‘আমার ভোকাবুলারিতে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা নেই,’ রিধিমা স্যালি আর ভক্তির দিকে তাকিয়ে বলল। ‘তোমরা সকলে না থাকলে আমি আজ মৃত।’
‘মি প্রাউড অফ মাই সন,’ ভক্তি সুনয়নের কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কপালে চুমু খেল। তারপর সুনয়নকে জড়িয়ে ধরল। তারপর রিধিমাকে বলল, ‘সব লাড হনুমানের ইচ্ছা। তোমার জন্য আমার ছেলেকে তিন বছর পর এভাবে কাছে পেলাম।’
‘অ্যা-ক-চু-য়া-লি, তিন বছর ছাব্বিশ দিন,’ রিধিমা আঙুল গুণতে গুণতে হেসে বলল। চোখের জল মুছতে মুছতে ভক্তি সেই হাসিতে যোগ দিল।
মায়া সভ্যতার গ্যালারি পিবডির চারতলায়। গ্যালারি আজ খালি, কেবল একজন অল্পবয়সি ছাত্র ও তার সঙ্গিনী মেঝেতে বসে গ্যালারির মধ্যেখানে হন্ডুরাসের কোপান থেকে খুঁড়ে আনা পাথরের বেদিতে লেখা মায়া সভ্যতার অজস্র হায়ারগ্লিফিক টেক্সটের কোডগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
রিধিমা চারদিকে তাকাল। গোটা গ্যালারি জুড়ে মেক্সিকো, হণ্ডুরাস, নিকারাগুয়া থেকে আনা বিশাল বিশাল পাথরের স্তম্ভ, মূর্তি প্রাক ১৪৯২ ক্ল্যাসিক মায়া সভ্যতা ও পোস্টক্ল্যাসিক অ্যাজটেক সভ্যতার নিদর্শন বহন করে দাঁড়িয়ে আছে৷ প্রথমে Gallery-A, তার ভিতর দিয়ে ঢুকে আরেকটা গ্যালারি, Gallery-B। চারদিকের দেওয়ালে কাঁচের শো-কেসে কালেকশনের নম্বর দেওয়া। Gallery-A তে মেক্সিকান ফোক আর্ট কালেকশন, মেক্সিকো আর গুয়াটেমালার বিশাল মুখোশ, পানামার ভেরাগুয়াস থেকে খনন করে আনা মূর্তি, তাছাড়া নানা ফটো, অ্যাজটেকদের ছোট প্রস্তরমূর্তি। Gallery-B তে মায়া সভ্যতা— কোপান, মেক্সিকোর লাবনা, গুয়াটেমালার টেক্সটাইলস, ফোক আর্ট, মুখোশ, দেয়াল জোড়া পেইন্টিংস, এক্সক্যাভেশন সাইটের ফটো, সামনে উল্টোদিকের দরজার সামনে বিশাল ওয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ম্যুরাল, টেম্পল অব ওয়ারিয়রসের ছবি— মায়ারা সাগরের ঢেউয়ের মধ্যে নৌকা বাইছে। নিচে লেখা ১১০০ খ্রিষ্টাব্দ। কার্ভিং অব জেস্টার গড। ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের স্কাল্পচার। অলটুন হা, বেলিজ থেকে পাওয়া।
‘এত বিশাল গ্যালারি, এত কালেকশন, এর মধ্যে কোথায় কলসী লুকিয়ে রাখতে পারেন ডঃ উইকস?’ স্যালি চিন্তাগ্রস্ত। ‘এত বড় বড় দুটো গ্যালারির মেঝে থেকে ছাত পর্যন্ত উঁচু কয়েক শ’ আইটেমের মধ্যে কোথা থেকে শুরু করব?’
‘একটা চেষ্টা করে দেখি,’ সুনয়ন সেলফোন বের করল।
‘কাকে ফোন করছ?’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল।
‘অলবানি মেডে হরিপরসাদকে। জানি ডঃ বোস খুব ক্লান্ত।
তবু দেখি যদি উনি হরিপরসাদের মাধ্যমে কিছু কমিউনিকেট করাতে পারেন।
সুনয়ন হরিপরসাদের সঙ্গে ফোনে অনেকক্ষণ ধরে কথা বলল। তারপর দরজার বাইরে গিয়ে দেওয়ালে টাঙানো ইনডেক্স বোর্ডের ফটো তুলল সেলফোনে, তারপর টেক্সট করে পাঠাল।
স্যালি সুনয়নের পাশে এসে দাঁড়াল— ‘কোথায় রাখতে পারেন কিছু বোঝা যাচ্ছে?’
‘দেখি উনি কী বলেন?’ সুনয়নের চোখ টেক্সট মেসেজে।
একটু পরে হরিপরসাদ একটা প্রশ্ন পাঠালো হসপিটাল থেকে। ‘ইনডেক্সটা কার বানানো?’ সুনয়ন স্যালিকে জিজ্ঞাসা করল।
‘ডঃ উইকসের। কিছুদিন আগে মিউজিয়ামের কিছু কালেকশন উনি নিজেই এদিক ওদিক করেছিলেন। তারপর এই ইনডেক্স বোর্ডটা প্রিন্ট করিয়েছেন।’
কিছুক্ষণ পর ফোন এল হসপিটাল থেকে। সুনয়নের চোখ ঝকমক করে উঠল। তারপর ফোন বন্ধ করে বলল, ‘Gallery-B এর #1 আইটেমের ভিতর খুঁজতে বলল।
Gallery-B এর #1 আইটেম মায়া সভ্যতার একটা বিশাল সিন্দুক। সিন্দুকে মায়াদের মন্দিরের ছবি আঁকা। স্যালি শো-কেসের লক খুলে নিচু হয়ে বসে সিন্দুকের ডালা খুলল। রিধিমা নিজের বুকের ধকধক শব্দ শুনতে পাচ্ছে। স্যালি সিন্দুকের মধ্যে থেকে বের করে আনল একটা কুম্ভ।
‘এই গ্যালারিতে প্রায় কয়েকশ’র বেশি আইটেম আছে,’ স্যালি অবাক। ‘না দেখে কীভাবে বললেন উনি যে কোথায় পাওয়া যাবে?’
সুনয়ন বলল— ‘হরিপরসাদ লিখেছে এই পাজলটা আপনাদের সলভ করার জন্য রাখলাম।’
কুম্ভের নিচে চাপা দেওয়া ছিল ডঃ উইকসের লেখা একটা চিরকূট—
দ্য বোনস অব বুদ্ধা ফ্রম পিতরাওয়া (কপিলাবস্ত) ইণ্ডিয়া।
গিফট ফ্রম মাই ওয়াইফ ভক্তি — ডঃ উইলিয়াম উইকস।
ভক্তি মুখে রুমাল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
রিধিমা স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে দেখছে ভগবান বুদ্ধের অস্থিকলস! এর কথাই দাদা লিখেছে ওর ডায়েরিতে দেবচরণ থারুর কাহিনিতে।
স্যালি টেবিলে রাখল কলসীটা। কুম্ভের গায়ে ব্রাহ্মী লিপি। অপরূপ শিল্পনৈপুণ্য, কলসের গায়ে খোদাই করে লেখা। রিধিমার চোখের দৃষ্টিতে যুগপৎ বিস্ময় ও রহস্য উদ্ধারের খুশি মিলেমিশে একাকার। পুরোনো লেখা, কিন্তু ভালই পড়া যাচ্ছে—

লেখাটা পড়ে রিধিমার বুকের ভিতর একটা বম্ব-সাইক্লোন জন্ম নিল। রিধিমার নিজেকে মনে হল যেন সে সার্নের বৈজ্ঞানিক, গড পার্টিকলের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে। এই সেই সুভূতির লেখা ষষ্ঠ কলস? এই কলসই ছিল কাঠের বাক্সের ভিতরে যে কাঠের বাক্স বেলেপাথরের পেটিকার ভিতর ছিল রাখা এবং যা চুরি গেছিল, শুধু কাঠের বাক্সের ভাঙা কাঠের কয়েকটা টুকরো পাওয়া গেছিল পেটিকার ভিতর। রিধিমার সামনে এখন তার রিসার্চের জিগস পাজলের হারিয়ে যাওয়া ফাইনাল পিস!
অপুর্ব হ্যাণ্ডরাইটিং! ভগবান বুদ্ধের শরীর-ধাতু যে কুম্ভের ভিতর রাখা হবে, সেই কুম্ভের গায়ে অসীম শ্রদ্ধায় লেখা হয়েছে। এখানে বানান ভুলের কোনও দূর সম্ভাবনাও নেই। এখানে শকিয়নং শব্দের দুটো অক্ষর লিখতে ভুলে গেছে এরকম দুঃসাহস কোনও লিপিকারের হবে না। এটা ভগবান বুদ্ধের শরীরধাতু। সকল লিপিকারের ভাগ্যে এরকম পুরস্কার জোটেনা। এরকম পবিত্র কুম্ভে লেখার জন্য সৌভাগ্য চাই, আর সেখানে বানান ভুলের কোনও প্রশ্নই নেই। রিধিমা জানে এবার তো ওর PhD থিসিস গড়গড় করে এগিয়ে যাবে। সব প্রশ্নের উত্তর ও পেয়ে গেছে। পিতরাওয়া কি কপিলাবস্তু? এই প্রশ্নের উত্তর তার চোখের সামনে। উইলিয়াম চেপ্পির কুম্ভের ব্রাহ্মীলিপির একটা ব্যাখ্যাও চোখের সামনে, ডঃ উইকস বুঝেছিলেন ভক্তির এই কলস কী, তাই উনি সেই হিরেকে তুলে নিয়ে হার্ভার্ডের পিবডি মিউজিয়মে রেখেছিলেন। সুনয়ন আবেগতাড়িত হয়ে পুলিশে খবর না দিলে উনি নিশ্চয়ই এর কথা পৃথিবীর সব ঐতিহাসিককেই জানাতেন। অসম্পূর্ণ কাজটা শেষ করার জন্য রিধিমাকে এদেশে নিয়ে আসেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল রিধিমার PhD রিসার্চের সঙ্গে ওর দাদার তরাইয়ের এই গবেষণা মিলিয়ে এই ব্রাহ্মীকুম্ভের উৎপত্তির ইতিহাস জগৎসভায় বিদ্বজ্জনের সম্মুখে নিয়ে আসবেন। সেটা হল না। তাই যখন তার শিয়রে শমন, তখনও নির্ভীক ভাবে রিধিমার জন্য লিখে রেখে গেছিলেন পথের হদিশ। হাতে সময় একদম ছিল না, হত্যাকারীর বন্দুকের নল কপালে, তা অগ্রাহ্য করেছিলেন কেননা তিনি জানতেন যে তিনি না লিখলে হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে এই ব্রাহ্মীকুম্ভ আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাবে ভারতের এক ছাইচাপা ইতিহাস। রিধিমা চুমু খেল ব্রাহ্মীকুম্ভে আর বিড়বিড় করে পড়ল – কপিলাবথথু থুপ, ভগবত বুধস সরীরম। তারপর নিজের মনে মনে বলল, চিন্তা নেই ডঃ উইকস, তোমার দাবার পার্টনার এবার চেকমেট করে দেবে। রিধিমা অস্থিকলস আবেগে স্পর্শ করল। রিধিমার চোখ ভেজা।
উপসংহার
নিউ ইয়র্ক সিটিতে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির লাঞ্চটাইম সেরিমনিতে পুলিৎজার প্রাইজ বিজয়ীরা সমবেত হয়েছে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্ট, পুলিৎজার প্রাইজ বোর্ড কো-চেয়ার সমেত অনেক মান্যগণ্য অতিথি নানা টেবিল দখল করে বসে আছেন। পুলিৎজার প্রাইজ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর স্পিচ শেষ ব্রেডারি অ্যাণ্ড কমিটমেন্ট টু পারপাস করলেন অনেক ভাল ভাল কথা বলে ওয়াজ আ প্যালপেবল থিম অব দিজ ইয়ার্স প্রাইজেজ। হাততালিতে হল ফেটে পড়ছে। রিধিমা আজ একটা এলিগেন্ট নেভি ব্ল মিডি লেন্থ ড্রেস আর স্টেটমেন্ট ব্লু হিলস পরে এসেছে। আইভরি রঙা কভারে ঢাকা রিধিমাদের গোল টেবিল ঘিরে রিধিমার ডান পাশে হুইল চেয়ারে ডঃ সিদ্ধার্থ বোস, রিধিমার বাঁ-পাশে বো-টাই আর কালো স্যুট পড়ে সুনয়ন সীটাপোটি, সুনয়নের অন্যদিকে ফ্লোরাল লং গাউন আর ব্লাউজ পরে সুনয়নের প্রাউড মাদার ভক্তি সীটাপোটি, তার পাশে প্রায় টেবিল টেনিস বলের সাইজের মুক্তোর মালা পরে, চিকমিকে পার্স হাতে রিচমণ্ড হিলস গেজেটের ট্রেসি ডেভিস। আজ খুশির দিন, রিধিমা খুশি, ভক্তি খুশি, ট্রেসি খুশি, সুনয়নের দুচোখে খুশি উপছে পড়ছে। আজ এই পুরস্কার অনেক কিছুর উত্তর নীরবে দিচ্ছে। আড়াই হাজার এন্ট্রির মধ্যে থেকে একুশজনকে বাছা হয়েছে, আর সুনয়ন তাদের একজন।
আইকনিক পুলিৎজার গোল্ড মেডাল কখনো ব্যাক্তিকে প্রদান করা হয় না, এটা দেওয়া হয় কোনও আমেরিকান নিউজ অর্গানাইজেশনকে। এবারের পুলিৎজার গোল্ড মেডাল পেল রিচমণ্ড হিলস গেজেট নিউজপেপার, পুরস্কার নেওয়ার সময় ট্রেসির দু-চোখে খুশির রঙমশাল, আর ডাবল অ্যারোকে এক্সপোজ করার জন্য এবছরের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং পুলিৎজার প্রাইজ পেল সুনয়ন সীটাপোটি। লি ঝেনের নিশ্চিত চল্লিশ বছরের জন্য ADX ফ্লোরেন্স। এয়ারহেড কপ ব্রায়ান স্পেনসার জুন মাসে মেডাল ফর ভ্যালোর, নিউ ইয়র্ক পুলিশের থার্ড হাইয়েস্ট অ্যাওয়ার্ডের জন্য নমিনেটেড হয়েছে। সামনের সপ্তাহে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অ্যানুয়াল মেডেল দিবসে পুরস্কার দেওয়া হবে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেসিডেন্টের হাত থেকে সুনয়ন পুরস্কার নেওয়ার সময় রিধিমা ঝুঁকল ভক্তির দিকে, ভক্তির এক হাত রিধিমার হাত চেপে ধরল, অন্য হাতে একজন গরবিনী মা তার চোখ মুছছে। মঞ্চে একজন গায়ানিজ আইডল জন্ম নিচ্ছে আজ ।
পুরস্কার নিয়ে সুনয়ন ফিরে এল রিধিমা আর ভক্তির মাঝে।
রিধিমা ভক্তিকে বলল, ‘আমি জানি আজ কে সবচেয়ে খুশি হবে। ‘
‘কে?’ ভক্তি বলল।’
রিধিমা পেন দিয়ে টেবিলের সাদা ন্যাপকিনে লিখে দিল

বুঝতে না পেরে ভক্তি রিধিমার দিকে তাকাল। রিধিমা হেসে ভাঙা গায়ানিজ অ্যাকসেন্টে বলল, ‘ইয়া নো নট ব্রাহ্মী?’
ভক্তি রিধিমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ন্যাপকিনটা ভাঁজ করে পার্সে ঢোকাল।
রিধিমা চোখ কুঁচকে সুনয়নকে বলল, ‘আপনি তো এখন বিশাল খ্যাতির অধীশ্বর। এবার নিউ ইয়র্ক টাইমস না ওয়াশিংটন পোস্ট, নাকি ইউনাইটেড নেশনসে স্টিক করে থাকবেন?’
‘ব্লাড টেস্ট করতে দেব ভাবছি,’ সুনয়ন বলল৷
‘ব্লাড টেস্ট? কেন?’
‘আপনি বলেছিলেন তরাইয়ের জঙ্গলে ম্যালেরিয়ার মহামারীতেও থারুদের নাকি ম্যালেরিয়া হত না,’ সুনয়ন বলল।
‘হ্যাঁ। বহু শতাব্দীর তরাই অরণ্যের শাক্যদের বংশধর ওরা। মডার্ন মেডিক্যাল রিসার্চ বলে যে থারুদের রক্তে খুব বেশি ‘হ্যাপ্লোগ্রুপ-ও’ আছে, তাই ম্যালেরিয়া হয় না। কিন্তু আপনি কেন ব্লাড টেস্ট করতে দেবেন?’
‘থারুরা যদি সত্যিকারের শাক্য বংশের মানুষ হয়ে থাকে, তাহলে আমার দেহেও নিশ্চয়ই বুদ্ধ ভাইরাস থাকবে।’
‘বুদ্ধ ভাইরাস?’
‘ঐ যে এক ঝটকায় বিশাল রাজপাট খ্যাতি-ট্যাতি সব কিছু ছেড়ে চলে যাওয়ার রোগ। যেমন বুদ্ধ গেছিল।’
‘আপনি থারু? ইম্পসিবল।’
‘কেন ইম্পসিবল?’
‘আপনাকে বলেছিলাম না থারুরা মিথ্যা কথা বলে না। আর আপনি?’ রিধিমা বলল। ‘জাল পাসপোর্ট, জাল বোর্ডিং পাস, হার্ভার্ডের জাল ID, ফ্রিজারে ঢুকে মারপিট, UN হ্যাকিং রিধিমা আঙুল গুনতে গুনতে থেমে গিয়ে কৌতূকের চোখে তাকাল।
‘UN-এরটা মাইনাস করুন, ওটা তো হোয়াইট হ্যাট,’ সুনয়ন কপট প্ৰতিবাদ করল। ‘আমি জেনুইন থারু— খড়াভূত আর পাঁচুয়ার দিব্যি।’
‘আচ্ছা না হয় মানলাম। কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে যাবেনটা কোথায়?’
‘তরাই—’
‘তরাই?’
‘হ্যাঁ, বড়া সিপার গুরুবার পুণ্যাগিরির থানে তিন ফোঁটা রক্তের একটা টিপসই দিয়ে রাজকুমারীর দেনাটা চুকিয়ে আসব।’
‘আপনি এসবে বিশ্বাস করেন?’
আমি বিশ্বাস করিনা। কিন্তু আপনার দাদার ডায়েরি মনে সংশয় ঢেলে দিয়েছে। রাজকুমারী নিজের দেশে থিতু হতে পারেনি। সোনাভূম, বনগার্ড, সাগরহাওয়া, পিতরাওয়া, কলকাতা, ত্রিনিদাদ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় শুধু তাড়া খেয়ে দৌড়েছে। কত ঝড়ঝাপটা গেছে ওই ছোট মেয়ের ওপর দিয়ে— কমলারি হয়ে কী অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে! আর আমার মা যদি সত্যিই তার বংশধর হয়, তবে আমার মাকেও তো সারা জীবনে কম অসম্মান সহ্য করতে হয় নি। আর আমি? আমাকেও থিতু হতে দিচ্ছে কই? আগে রক্তের পাওনা মিটিয়ে এলে হয়তো মহাদেবীর চব্বিশ বছর বয়সে চলে যাওয়াটা আটকাতে পারতাম—’ সুনয়নের গলা রুদ্ধ হয়ে এল। পরক্ষণেই সুনয়ন নিজেকে সামলে নিল। রিধিমার হাতে মেডেলটা এগিয়ে দিয়ে সুনয়ন বলল, ‘এই মেডেলটা আপনারও প্রাপ্য।’
‘আমার পুরস্কার আপনি অলরেডি পাইয়ে দিয়েছেন,’ রিধিমা হেসে বলল৷ ‘দাদাকে ফিরেই পেতাম না আপনি না থাকলে।’ রিধিমা দাদার হাতের ওপর হাত রাখার জন্য ডানদিকে হাত বাড়াল। কিন্তু ওর হাত দাদার হাতকে স্পর্শ করল না। বিস্ময়ে রিধিমা ডানদিকে তাকাল— দাদা নেই! দাদার হুইলচেয়ারের স্থান ফাঁকা। দাদা! দাদা কোথায় গেল? রিধিমার বুক ভয়ে কেঁপে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রিধিমা, দাদাকে গোটা হলে কোথাও দেখা যাচ্ছে না! দাদা আবার হারিয়ে গেল? ভয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে রিধিমার ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকারে প্লেনের সহযাত্রীরা সকলেই ঘুমোচ্ছে। পাশের সিটে শ্রান্ত দাদা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, দাদার মাথাটা ডানদিকে হেলে রয়েছে ঘুমন্ত সুনয়নের কাঁধে।
রিধিমার বুক এখনো ভয়ে কাঁপছে। চার বছরের দুঃস্বপ্ন, ভয় কাটতে সময় লাগবে।
দাদাকে নিয়ে রিধিমা বাড়ি ফিরে আসছে। সুনয়ন যাবে ওর পূর্বপুরুষের মাতৃভূমি তরাইতে। নেপালের কমলারিদের নিয়ে UN এর জন্য একটা রিপোর্ট লিখছে সুনয়ন।
মন শান্ত হতেই রিধিমার মন ফিরে গেল স্বপ্নে। মন জুড়ে একটা খুশির অনুভূতি। মন আপ্লুত হয়ে আছে সদ্য দেখা স্বপ্নটায়। ঘুম আর আসবে না এখন। উইণ্ডো সিট থেকে রিধিমা অল্প করে প্লেনের জানলার ঢাকনাটা তুলল। বাইরে রজতশুভ্র যামিনী। কাকজ্যোৎস্না মেঘে মেঘে ছড়িয়ে গেছে, পবনের বেগে যন্ত্রবলাকা গৃহের পানে নিরলস উড়ে চলেছে।
পুলিৎজারের স্বপ্ন ছিল সুনয়নের। রিধিমা অবাক হয়ে ভাবল সুনয়নের স্বপ্ন কেন তার নয়নে? রিধিমা ভাসা ভাসা বুঝছে এর উত্তর। কিন্তু স্তূপের গভীরে রাখা বুদ্ধের অস্থিকলসের মত এ প্রশ্নের উত্তর মনের অনেক গভীরে রাখা। এই মুহূর্তে সেই মনস্তূপ সে খনন করবে না। এখন সে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববে না । এখন শুধু বর্তমান। দাদার হাতের ওপর আলতো করে হাত রেখে অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ বসে বসে উপভোগ করে দেখবে চাঁদের আলো কেমন সুন্দর ধুয়ে দিয়েছে উড়ন্ত বোয়িংপাখির ডানা। রিধিমা দাদার হাতের ওপর হাত রাখার জন্য ডানদিকে হাত বাড়াল।
সমাপ্ত


