Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    প্রীতম বসু এক পাতা গল্প499 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    কপিলাবস্তুর কলস – ৫

    ৷৷ পাঁচ ৷৷

    স্যালির ভোক্স ওয়াগেন জেট্টা হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি চত্বর ছাড়িয়ে বেরিয়ে গেল। চার্লস রিভার পেরিয়ে প্রায় মিনিট কুড়ি চালাল স্যালি। এদিকে লোকালয়টা ঘিঞ্জি, রাস্তাগুলো সরু সরু। রিধিমা এদিকটাতে কখনো আসেনি। স্যালি একটা গলির মুখে গাড়ি থামাল।

    ‘ওই হলদে কলোনিয়াল বাড়িটা। নিচতলায় ওদের দোকান।’

    ‘অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর হেল্প স্যালি।’

    ‘এনিটাইম, হান। আমি ফোন নম্বরটা ট্রেস করছি। কিন্তু জানাব কীভাবে? পুলিশ তোমার কল ট্রেসিং করবে।’

    স্যালি ঠিক বলেছে, রিধিমা বুঝল। ‘আমি এক ঘন্টা পর অন্য নাম্বার থেকে কল করব।’

    ‘টেক কেয়ার। গুড লাক!’ রিধিমাকে নামিয়ে স্যালি ফিরে গেল।

    লম্বা পদক্ষেপে কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে গেল রিধিমা। সামনের রাস্তায় এখনো বরফ পরিষ্কার করা হয় নি। সাইডওয়াকেও বরফ। একটা পিৎজার দোকান, একটা কয়েন লণ্ডি, তার পাশে একটা গিফট শপ। দোকানের সাইনবোর্ডের উপরের দিকটা বরফে ঢাকা, ইংরাজি নামটা পড়া যাচ্ছে না, কিন্তু নিচের দিকে পড়া যাচ্ছে। কয়েকটা চিহ্ন—

    কয়েকটা চিহ্ন

    প্রথমে রিধিমা ভাবল যে ওটা রোমান অক্ষরে লেখা প্লাস চিহ্ন, একটা স্কোয়্যার সাইন, পাই-টাই লেখা। তারপর হঠাৎ মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল।

    ব্রাহ্মী!

    কপিলাবস্তু

    তার মানে সে ঠিক জায়গাতেই এসেছে। রিধিমা পাকা দাবাড়ুদের মত অপশন হাতড়াচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ ডঃ উইকসের হাতে সময় ছিল না সব কিছু বিস্তারিত ভাবে লিখে যাওয়ার। তাই সাংকেতিক অক্ষরে এখানে এসে সুনয়নের সঙ্গে দেখা করতে বলে গেছেন।

    দোকানের কাঁচের দেওয়ালে লাল ‘ওপেন’ লেখা গ্লাস-টিউব নিওন সাইনটা জ্বলছে। রিধিমা কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল। আর পাঁচটা মামুলি গিফট শপের মত একটা সাদামাটা পুরোনো দোকান। দেখে মনে হয় না খুব একটা বিক্রি-বাট্টা হয়। গায়ানিজদের হস্তশিল্প, ভিনটেজ শাঁখ, খোদাই করা কাঠের পশুপাখি, সস্তা অলঙ্কার, কবজ-মাদুলী, গায়ানিজ শিল্পীর আঁকা তেলচিত্র, ফটোগ্রাফিক পোস্টকার্ড, চাবির রিং, রেফ্রিজারেটর ম্যাগনেট, হাতে বোনা কাপড়, টেবিল-ক্লথ, ডাচ অ্যান্টিক কাঁচের জার, বোতল। দোকানের এক কোণে ‘এমপ্লয়িজ ওনলি’ লেখা একটা ছোট ক্লজেট সাইজের স্টোর, স্টোরের দরজা খোলা, দেখা যাচ্ছে অন্ধকার স্টোররুম অজস্র ভাঙাচোরা গিফট আইটেমে ঠাসা।

    ক্যাশে বসে একজন বয়স্কা গায়ানিজ মহিলা। দেখলে মনে হয় যৌবনে বেশ সুন্দরী ছিল কিন্তু সংসারের ঝড় ঝাপটা এর মাথার চুল সাদা করে, মুখে কপালে ভাঁজ এনে, শরীরে দ্রুত বার্ধক্য নিয়ে এসেছে। গায়ে পুরোনো একটা মেরিনো উলের কার্ডিগান। মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারা রাত কেঁদেছে, চোখ লাল, ফোলা ফোলা।

    ক্যাশিয়ারের পিছনের দেওয়ালে ধ্যানরত বুদ্ধের একটা বিশাল ছবি, সোনালী তেলরঙ অনেক জায়গায় উঠে গেছে। ছবির ঠিক নিচে কাঠের দেওয়ালে একটা কুলুঙ্গি। কুলুঙ্গিটা খালি, কেবল তার মধ্যে একথোকা লাল সিল্ক-ভেলভেট কৃত্রিম গোলাপ রাখা। পায়ে পায়ে ক্যাশ রেজিস্টারের দিকে এগিয়ে গেল রিধিমা। নিচু গলায় বলল— ‘সুনয়নের সঙ্গে দেখা করতে পারি?’

    ‘আগে বল তুমি কে?’ বুড়ির চোখের চামড়ার কুঞ্চন বৃদ্ধি পেল, গলার স্বরে রুক্ষতা।

    ‘আমি হার্ভার্ড থেকে—’

    ‘সুনয়ন তোমাকে চেনে?’ বুড়ি রিধিমার কথা শেষ করতে দিল না।

    ‘না,’ রিধিমা ইতস্ততঃ করে বলল।

    ‘তাহলে?’ বুড়ির ভ্রূ যুগলে বিরক্তির বক্ররেখা।

    ‘ডঃ উইকস বলে গেছেন সুনয়নের সঙ্গে দেখা করতে। আপনি কি ভক্তি?’

    ‘হ্যাঁ।’ বুড়ির চোখে কৌতূহল। কিন্তু কী বললে তুমি? ডঃ উইকস বলে গেছেন? কিন্তু ডঃ উইকস মারা গেছেন। তাহলে উনি কীভাবে বললেন? কখন বললেন?’ বুড়ির দৃষ্টিতে অবিশ্বাস।

    রিধিমা ভেবে পেল না এখন কীভাবে একে বোঝাবে অত সব সাংকেতিক কোড— টোড, তাই বলল, ‘হ্যাঁ, জানি ডঃ উইকসকে এবং আর দু’জন হার্ভার্ডের প্রফেসরকে কাল রাতে খুন করা হয়েছে। উনি তার আগেই আমাকে—’ রিধিমা থেমে গেল। কিন্তু, আপনাকে কে বলল?’

    ‘লোকাল নিউজে খবরটা বারবার দেখাচ্ছে,’ বুড়ি কাউন্টার থেকে রিমোটটা তুলে উঁচু দেওয়ালে সাঁটা টিভি অন করল।

    বাইরে দুটো পুলিশের গাড়ি আর্তনাদ করতে করতে ছুটে চলে গেল। রিধিমার আতঙ্কিত চোখ দরজায়।

    ‘মি না বিলিভ!’ এবার বুড়ি রিধিমার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল ৷ ‘ওয়াপ্পেন না গ্যাল?’ রিধিমা জানে এটা গায়ানিজ ক্রিয়ল অ্যাকসেন্ট। জিজ্ঞাসা করছে হোয়াটস হ্যাপেনিং গ্যাল? ‘ওয়াচ ইউ ডেহ,’ বুড়ি টিভির দিকে চোখের ইশারা করল। টিভির দিকে তাকিয়ে গলা শুকিয়ে গেল রিধিমার। গোটা স্ক্রিন জুড়ে ওর মুখ। নিচে গ্র্যাফিকসে ব্রেকিং নিউজ দ্রুত চলে যাচ্ছে—

    Three Harvard Professors and One Policeman killed

    Manhunt intensifies for fugitive Harvard student

    তার সঙ্গে হার্ভার্ডের তিনজন প্রফেসর খুনের বিস্তারিত খবর! ঘটনাস্থলের ছবি। সিরিয়াল কিলার হার্ভার্ডের স্টুডেন্ট। কেউ একে দেখলেই যেন পুলিশকে ফোন করে। টিভির নিউজ ক্যামেরা এবার রিধিমার ডরমেটারির সামনে। অ্যাঙ্কর উত্তেজিত হয়ে বলে চলেছে প্রফেসরদের তিনটে ল্যাপটপ খুনির রুম থেকে পুলিশ আবিষ্কার করেছে, সঙ্গে একটা গ্লক আর মৃত পুলিশের ওয়ালেট।

    বুড়ি তাড়াতাড়ি ফোন তুলল। রিধিমা বুড়ির হাত চেপে ধরল— ‘বিশ্বাস করুন, ‘রিধিমা কাঁদোকাঁদো। ‘আমি এর কিচ্ছু জানি না।’

    ‘চারটে খুন!’ বুড়ির হাত সেলফোনে। ‘বয়! মি না এবল উইড্ডাহ।’

    ‘আমাকে বিশ্বাস করুন, রিধিমার কাতর কণ্ঠ —‘এটা মিথ্যা।’

    ‘নাহ্ ট্রু? রিয়্যালি?’ বুড়ি সানমাইকার কাউন্টার টপে সেলফোন নামিয়ে রাখল। ‘রিমুভ ডিস প্লেস গ্যাল। মি না ওয়ান ট্রাবল।’

    ‘আমাকে ওরা মেরে ফেলবে, প্লিজ হেল্প মি, রিধিমার দু’চোখে কাতরতা। ‘ডঃ উইকস আমাকে নিজের মেয়ের মত ভালোবাসতেন।’

    ‘হার্ভার্ড স্টুডেন্ট?’

    ‘হ্যাঁ,’ রিধিমা ID বের করে দেখাল।

    বুড়ি রিধিমার ID কার্ড ভাল করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল— ‘তুমিই রিধিমা?’

    ‘তুমি আমার নাম শুনেছ?’ রিধিমার চোখে আশার আলো।

    ‘ডঃ উইকস কাল সকালে এসেছিলেন। তোমার জন্য উনি একটা প্যাকেট আমার কাছে রেখে গেছেন। ওটা নিয়ে তাড়াতাড়ি ভাগো আমার দোকান থেকে।

    বাইরে আবার পুলিশের সাইরেন। এবার দোকানের ঠিক বাইরে একটা ম্যাসাচুসেটস স্টেট পুলিশ ক্রুজার এসে থামল। গাড়ির ছাতে লাইটবারের লাল-নীল আলো ঘুরছে।

    ‘পুলিশ!’ রিধিমা আতঙ্কে বলল৷

    কাঁচের দেওয়ালের বাইরে ম্যাসাচুসেটস স্টেট ট্রুপারের গাড়িটা কিছুক্ষণ থেমে রইল। তারপর কাউবয় মার্কা টুপি পরে একজন ট্রুপার গাড়ি থেকে নেমে ধীরে সুস্থে টুপিটা মাথায় সেট করতে করতে গিফট শপের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল। রিধিমা পড়িমরি করে ছুটে স্টোররুমে ঢুকে দরজা টেনে দিল। দু-সেকেণ্ডের নীরবতা। রিধিমা দরজায় কান পাতল, কেউ ভিতরে ঢুকল। এবার বুড়ির গলা শোনা গেল, খুব মিস্টি গলায় কাকে বলছে, ‘মি ক্লোজড, হান।’

    ‘তোমার ছেলে কোথায়?’ পুলিশটার ভাঙা কাঁসরের মত গলা।

    ‘কেন?’

    ‘সে কি এখানে আছে?’

    ‘এখানে থাকবে কেন? সে নিউ ইয়র্কে থাকে।

    ‘কী যেন নাম?’

    ‘সুনয়ন সীটাপোটি,’ বুড়ির বিরক্ত উত্তর।

    ‘শেষ কবে এসেছিল?’

    ‘আমার ছেলে তিন বছর কেমব্রিজে পা দেয় নি।’

    ‘তিন বছর? আর ইউ শিওর?’

    ‘এক মিনিট, বুড়ি এবার দেওয়ালের কাছে এগিয়ে গেল। তারপর ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে গুনে বলল— ‘অ্যা-ক-চু-য়া-লি, তিন বছর ঊনিশ দিন।’

    ‘আমি এখন তামাশার মুডে নেই!’ স্টেট ট্রুপারের গলার স্বর কড়া। ‘ডঃ উইকস এবং আর দু’জন প্রফেসর মার্ডার হয়েছে। একজন পুলিশও খুন হয়েছে।’

    ‘এর সঙ্গে আমার ছেলের কী সম্পর্ক?’

    ‘তোমার ছেলের সঙ্গে ডঃ উইকসের সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল। তাই—’

    ‘সো হোয়াট?’ বুড়ি এবার জ্বলে উঠল। ‘তাই আমার ছেলে ডঃ উইকসকে খুন করবে?’

    ‘ডোন্ট গেট সো বেন্ট। আয়্যাম ডুয়িং মাই জব,’ বুড়ির ধারালো প্রশ্নে বেকায়দায় পরে স্টেট ট্রুপার বলল। ‘তোমার ছেলের কোনও গার্লফ্রেণ্ড ছিল? হার্ভার্ড স্টুডেন্ট?’

    ‘গ্যালফ্রেণ্ড! কলেজ ড্রপ আউটকে কোন হার্ভার্ডের মেয়ে পছন্দ করবে?’

    ‘একজন হার্ভার্ডের মেয়ের ছবি টিভিতে দেখাচ্ছে। দেখলে ইমিডিয়েটলি নাইন ওয়ান ওয়ান কল কোরো।’

    ‘শিওর!’ বুড়ি বলল।

    পুলিশটা গটগট করে বেরিয়ে গেল, দরজা জোরে বন্ধ করার আওয়াজ পরিষ্কার শোনা গেল ।

    ‘স্মার্ট-অ্যাস!’ বুড়ি বন্ধ দরজার দিকে গালি ছুড়ে দিল।

    বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। রিধিমা এবার স্টোরের দরজা খুব আস্তে অল্প ফাঁক করে বাইরের দিকে তাকাল। স্টোরে বুড়ি একা। বুড়ি পিছন ফিরে রিধিমা দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গে’লাং গ্যাল।’

    রিধিমা দরজা ঈষৎ ফাঁক করে মাথা বের করে সাবধানী দৃষ্টিতে দোকানের ভিতরটার চারপাশ দেখে নিল। তারপর সন্তর্পণে বেরিয়ে এল। ওর বুক ধকধক করছে।

    বুড়ি ওর দোকানের ‘ওপেন’ বাতিটা নিভিয়ে ক্লোজড বোর্ড ঝুলিয়ে দিল। ‘কাম লেট উই গ্যাফ, বুড়ি স্টোররুমের আলো জ্বালাল, তারপর স্টোরের দরজাটা টেনে দিল। জায়গা খুবই কম। দু’জনে দুটো টুলে বসেছে। বুড়ি তখনও রাগে ফুঁসছে— ‘আমার ছেলেকে সন্দেহ করছে? ব্যাসটার্ড!’

    ‘আপনি ইণ্ডিয়ান গায়ানিজ?’ রিধিমা জিজ্ঞাসা করল।

    ‘একজন হোয়াইটকে এসব কোয়েশ্চেন করার সাহস হত?’ বুড়ির রাগ কমেনি। ‘আমাদের এই অবস্থা দেখে ভিখারি ভেবেছে? বেজন্মাটা জানেনা আমার অ্যানসেস্টর নেপালে প্রিন্সেস ছিল।’

    ‘প্রিন্সেস!’ রিধিমা বুড়িকে তোয়াজ করল, যদি এখানে লুকোতে পারে।

    ‘লাড হনুমানের দিব্যি। আমার বাবার দাদি। এক কঠিন অভিশাপ লেগেছিল ওর ওপর। তাই তো আমাদের এই দুরবস্থা – যাক ওসব ছাড়, তুমি খুন না করলে পুলিশ তোমাকে কেন খুঁজছে?’

    ‘কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, রিধিমা বলল। ‘সকালে বস্টনে নেমেছি, তারপর থেকে কপালে দুর্ভোগ চলছে। কোনরকমে প্রাণে বেঁচে এ পর্যন্ত এসেছি।’ রিধিমা পকেট থেকে ভাঁজ করা বোর্ডিং পাস বের করে দেখাল।

    বুড়ি আবার ভালভাবে দেখল বোর্ডিং পাসটা, বুড়ির চিবুকে ভাঁজ— ‘ইউ গান গেট ল্যাস ফ্রম পুলিশ।’

    ‘প্লিজ, হেল্প মি!’ রিধিমা বলল। ‘আমি নির্দোষ!

    ‘আমার ভয় হচ্ছে আমার ছেলেকে এবার পুলিশ টানাহেঁচড়া করবে।’ বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

    ‘ডঃ উইকস কেন সুনয়নের নাম লিখেছেন?’

    ‘তুমিও কি ভাবছ সুনয়ন ডঃ উইকসকে খুন করেছে?’ বুড়ি খুব বিরক্ত।

    ‘না না, আমি একদম তা ভাবছি না।’ রিধিমা বুড়িকে আশ্বস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

    ‘এ কথা সত্যি যে সুনয়ন ডঃ উইকসকে একদম পছন্দ করে না৷ নাম শুনলেই রেগে ওঠে। ও খুব বদরাগী টাইপের ছেলে তাও মানছি, কিন্তু সুনয়ন ছেলে ভাল।’

    ‘আমিও নির্দোষ। আমাকে সুনয়নের সঙ্গে ফোনে একবার কথা বলাতে পারবেন?’

    ‘নো ওয়ে,’ বুড়ি দুহাতের দশ আঙুল মেলে দু’দিকে নাড়াল। ‘তোমাকে পুলিশ খুঁজছে। তুমি ওকে ফোন করলে পুলিশ ওকেও খুনি বানিয়ে দেবে। নিজের চোখেই তো দেখলে পুলিশ আমাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে ।

    রিধিমা ভাবল ডঃ উইকস যখন ওর নাম লিখে গেছেন, কিছু একটা কারণ তো নিশ্চয়ই থাকবে— প্লিজ! আমি অন্যের ফোন থেকে ফোন করব।’

    ‘ওকে ডিস্টার্ব কোরো না। ও রাত জেগে ডিউটি করে দিনে ঘুমোয়। ঘুম ভাঙালে খুব রেগে যায়।’

    ‘কী করে সে?’ রিধিমা সুনয়নের সম্বন্ধে জানতে উৎসুক।

    ‘নিউ ইয়র্কে কাগজের অফিসে চাকরি।’

    ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস?’

    ‘না নাঃ! ফালতু একটা লোকাল নিউজপেপার। নামই কেউ শোনেনি, ‘বুড়ি ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল।

    ‘জার্নালিস্ট?’

    কলেজ শেষ করল কই? ব্রিলিয়ান্ট, কিন্তু রেগেমেগে কলেজই ছেড়ে দিল।

    বড্ড গোঁয়ার, কারো কথা শোনে না।’

    ‘আপনার ছেলে আমাকে হেল্প করতে পারবে?’

    বুড়ি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘শুধু ঘরের খেয়ে বনের প্রচুর মোষ তাড়ায় শুনেছি।

    ‘দোকানের নামটা ব্রাহ্মীতে কে লিখেছে?’

    ‘তুমি কীভাবে জানলে ওটা ব্রাহ্মী?’

    ‘কপিলাবস্তু।’

    ‘ওটা আমার ছেলেরই কাজ। সুনয়নের ছোটবেলায় ডঃ উইকস ওকে ব্রাহ্মী শিখিয়েছেন।’

    ‘স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, রাশিয়ান, ল্যাটিন এত কিছু থাকতে ব্রাহ্মী?’

    ‘ডঃ উইকস বলতেন এই ব্রাহ্মীই নাকি আমাদের প্রাচীন স্ক্রিপট।’ বুড়ি টুল থেকে উঠে দাঁড়াল— ‘এক মিনিট, আমি এক্ষুনি আসছি।’

    বুড়ি বেরিয়ে গেল, মিনিট পাঁচেক কেটে গেল, রিধিমার একটু ভয় ভয় লাগল। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বুড়ি ওকে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেবে না তো? হঠাৎ দেখল বুড়ি ফিরে এল— হাতে একটা প্যাকেট।

    ‘এটা ডঃ উইকস তোমার জন্য রেখে গেছেন,’ বুড়ি প্যাকেটটা রিধিমাকে দিল। ‘এবার প্লিজ তুমি যাও।’

    রিধিমা প্যাকেটটা খুলল। একটা স্পাইরাল বাইণ্ড করা ডায়েরি। রিধিমার বুক ধক করে উঠল। ডঃ উইকসের লেখা একটা ছোট নোট ডায়েরির উপরে স্টিকারে সাঁটা—

    সিদ্ধার্থের লেখা এই কাহিনি অসমাপ্ত। ও যে কাহিনির শুরুটা লিখে গেছে সে কাহিনির শেষটা আমি সম্ভবতঃ দেখেছি, কিন্তু সেই কাহিনির মাঝের কয়েকটা পাতা যেন সময়ের যাত্রাপথে হারিয়ে গেছে। আমি সেই মিসিং লিঙ্কটা আবিষ্কার করতে পারি নি। নিউ ইয়র্কে সিদ্ধার্থ আমাকে ম্যানুস্ক্রিপটটা দিয়েছিল। ওর ইচ্ছা ছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে হার্ভার্ড ওরিয়েন্টাল সিরিজের বই হিসাবে এটা পাব্লিশ করতে। রিধিমা, তোমার জন্য রেখে গেলাম সেই দায়িত্ব। সেই মিসিং লিঙ্ক খুঁজে পেলে হার্ভার্ডে এটা পাব্লিশ কোরো। এটা খুব সেন্সিটিভ ডকুমেন্ট। প্লিজ হ্যাণ্ডেল উইথ আটমোস্ট কনফিডেনশিয়ালিটি।

    রিগার্ডস,

    ডঃ উইলিয়াম উইকস

    দাদার ডায়েরি এখানে! তাড়াতাড়ি প্রথম পাতা উল্টাল রিধিমা। শুরুতেই একটা ঝটকা—

    THE WORST ARCHAEOLOGICAL FRAUD OF THE CENTURY

    রিধিমা ভ্রূ কুঁচকাল। প্রচণ্ড কৌতূহল হচ্ছে, কিন্তু এখন পালাবার চিন্তা সারা মাথা জুড়ে। ডায়েরির পৃষ্ঠা ওলটাল রিধিমা পাতার পর পাতা প্রচুর লেখা। এখন পড়ার সময় নেই। ডায়েরি বন্ধ করার আগে শেষ পাতায় গেল রিধিমা আরেকটা চমক এটা ডঃ উইকসের হাতের লেখা—

    BUDDHA’S BONES HERE IN THE TEMPLE OF HER MOTHER

    এখন সাংকেতিক লেখা ভাঙার মত চিন্তা করার শক্তি নেই রিধিমার। ডায়েরিটা ব্যাকপ্যাকে চালান করে দিয়ে ভক্তিকে বলল— ‘আমি কি আপনার বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে পারি?’

    ‘সি, গ্যাল,’ বুড়ি এবার পয়েন্টে এল। ‘পুলিশ এখানে আবার আসবে। তোমাকে এখানে খুঁজে পেলে তোমার সঙ্গে আমার ছেলেকেও ইলেকট্রিক চেয়ারে বসাবার ব্যবস্থা করবে। মি না ওয়ান ড্যা। ইউ গো নাউ।’

    রিধিমার মুখে চিন্তার অমাবস্যার তমসা। কোথায় যাওয়া যায়? কে তাকে বিপদ মাথায় নিয়ে আশ্রয় দেবে? পুলিশ ম্যানহান্ট শুরু করেছে। শহর থেকে নিশ্চয়ই প্রত্যেকটা আউটগোয়িং গাড়ির তল্লাশি হচ্ছে। কী করা যায়?

    ‘কী ভাবছ?’ বুড়ি বলল৷

    ‘ভাবছি ইণ্ডিয়ান এম্বাসীর হেল্প নেব।’

    ‘গুড। তাহলে আক্স হেল্প। এম্বাসীতে কাউকে চেন?’

    ‘এম্বাসী! এম্বাসী এখানে কোথায়?’ রিধিমা বলল। ‘সবচেয়ে কাছাকাছি ইণ্ডিয়ান কনসুলেট তো নিউ ইয়র্ক সিটিতে!’

    ‘ওখানে কারুকে চেন?’

    ‘হ্যাঁ।’ রিধিমা দীর্ঘশ্বাস চাপল। সেকেণ্ড সেক্রেটারি মোহন গুপ্তা। এক সময় খুব কাছের মানুষ ছিল। কিন্তু নিউ ইয়র্কে এখন যাব কীভাবে? গ্রেহাউণ্ড, অ্যামট্রাক সব ক্যান্সেলড।’

    ‘কেন? উপায় তো আছে,’ বুড়ি যেন ওকে তাড়াতে পারলে বাঁচে।

    ‘উপায় আছে?’ রিধিমার চোখের নিরাশার প্রদীপে যেন বুড়ি তেল ঢালল। ‘কীভাবে?’

    ‘চায়নাটাউন বাস। ওরা স্নো-স্টমকে পাত্তা দেয় না। ভূমিকম্প, সাইক্লোনে ও বাস চলে। ক্যাশে টিকিট কাটা যায়। চার্লস মোটেল থেকে বাস ছাড়ে।’

    ‘কিন্তু যাব কীভাবে চার্লস মোটেল?’

    ‘ঠিক আছে, আমি নামিয়ে দেব।’

    ‘আপনি? আপনি আমার জন্য এত রিস্ক নেবেন?’

    ‘তোমার জন্য না। আমার ছেলেকে যাতে তোমার সঙ্গে না জড়ায় সেজন্য।’ দরজায় ঝুলন্ত মলিন পাফার কোটটা টানতেই চাবির গোছার শব্দ হল৷ বুড়ি কোটটা পরে মাথায় ফারের হুডটা টেনে ডান পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে দেখে নিয়ে আবার পকেটে ঢোকাল। বাঁ পকেট থেকে বেরোলো গ্লাভস। হাতে গ্লাভস গলাতে গলাতে বুড়ি বলল— ‘কাম, লেট উই গান ফর ক্যার।’

    বাড়ির পিছনে একটা পুরোনো গ্যারাজ। গ্যারাজের পাশে একটা পুরোনো বিট আপ ফোর্ড রেঞ্জার পিক আপ ট্রাক, বুড়ির কাছাকাছিই বয়স হবে। বুড়ি বরফের উপর দিয়ে পেঙ্গুইনের মত দুলতে দুলতে হেঁটে পৌঁছোলো গ্যারাজের দরজায়। ডান হাতের গ্লাভস দাঁতে চেপে খুলে গ্যারাজের টাচ প্যাডে শীর্ণ আঙুল দিয়ে নাম্বারগুলো পাঞ্চ করল, কিন্তু গ্যারাজের শাটার খুলল না। বুড়ি বিরক্ত। গজগজ করতে করতে নিচু গলায় স্বগতোক্তি করল— ‘এই ঠাণ্ডায় ব্যাটারি বুড়ো ব্যাটাছেলেদের ইয়ের মত ডাউন হয়ে থাকে।’ রিধিমার সাহায্য করার ইচ্ছা থাকলেও কোনও উপায় নেই। কোড-ফোডের সিকিউরিটির ব্যাপার। ও চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বুড়ি বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপসই দেবার মত করে কীপ্যাডের নম্বরগুলোতে এক এক করে চাপতে লাগল। এবার ঝরঝর করে গ্যারাজের শাটার উপরে উঠল। ছোট সিঙ্গল কার গ্যারাজ। ভিতরে একটা হণ্ডা CRV, আর একটা পুরোনো গ্যাস বার-বি-কিউ গ্রিল, আর টুকুটাকি বাগানের যন্ত্রপাতি। CRVর গা ভেজা। ছাদের বরফ গলে গলে নিচে পরে গ্যারাজের মেঝে ভিজিয়ে দিয়েছে, গাড়ির চাকা আর গার্ডের ভিতর চাপ চাপ কাদামাখা বরফ ঝুলছে। গাড়িটার সামনের ডানদিক ভেঙে তুবড়ে গেছে। চাকায় ডো-নাট টায়ার লাগানো। বুড়ি আদর করে গাড়িটার গায়ে হাত দিল। গাড়ির নিউ ইয়র্ক স্টেটের কাস্টম লাইসেন্স প্লেট। লেখা আছে ‘ভক্তি’।

    ‘কালকের ঝড়ে?’ রিধিমা বলল।

    টায়ার ফ্ল্যাট হয়ে রাস্তায় স্কিড করে রাস্তার ধারের ফেন্সে মারে, ‘বুড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মাথা নাড়ল।

    ‘খুব খারাপ রকমের অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল,’ রিধিমা বলল।

    ‘ভেবেছিলাম অল হুইল ড্রাইভ, কোনও প্রবলেম হবে না।’

    গ্যারাজ থেকে বুড়ি একটা স্নো-শাভল বের করল। তারপর গ্যারাজ বন্ধ করে ট্রাকের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোবার মত করে বরফ কেটে কেটে সরাতে শুরু করে গোটা শরীর স্বেদসিক্ত। ড্রাইভওয়ের বরফ পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রতি বছর উত্তর আমেরিকায় বেশ কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধার হার্টফেল হয়ে মৃত্যু হয়। রিধিমার ভয় হল, এর সেরকম কিছু হলে একেও পুলিশ ওর সিরিয়াল কিলিংয়ের ভিকটিম লিস্টে ফেলে দেবে। রিধিমা ও হাত লাগাল। বুড়ির ব্রাশ দিয়ে ট্রাকের সামনে, পিছন, পাশের কাঁচগুলোর বরফ পরিষ্কার করল। ট্রাকের মাথায় এক-দেড় ফুট বরফ। ‘দ্য হেল ব্রোক হিয়ার’ বুড়ি হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এসে বেলচাটা গ্যারাজের কোনায় ছুড়ে ফেলল— ‘ওয়াটা—।’ ভক্তি রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে ট্যাপ খুলে এক গ্লাস জল খেয়ে মুখ মুছল – “চল, তাড়াতাড়ি।’ রিধিমা বুড়িকে অনুসরণ করে ট্রাকের ভিতরে ঢুকল। গাড়ির ভিতরে কনকনে ঠাণ্ডা, ঢুকে রিধিমার মনে হল সে একটা আইস চিলারবক্সে ঢুকেছে। বুড়ি গিয়ার শিফট করে ড্রাইভে ফেলে বলল, ‘কিপিং ফিঙ্গারস ক্রসড!’

    গাড়ির মাথার বরফ রাস্তায় ছিটাতে ছিটাতে বুড়ির ট্রাক চার্লস মোটেলের কাছাকাছি আসতেই বুড়ি একটা বড়োসড়ো নিঃশ্বাস ফেলে বলল— ‘থ্যাঙ্ক লাড হনুমান! তোমার কপাল ভালো।’

    একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। এতক্ষণ রিধিমা মৃত্যুর আতঙ্কে অবশ ছিল, দূর থেকে বাসটাকে দেখে মন খুশিতে ভরে গেল। চায়নাটাউন বাস। এরা আমেরিকার সবচেয়ে সস্তা ট্রান্সপোর্ট৷ আমেরিকান গ্রেহাউন্ডের অর্ধেক ভাড়া। সার্ভিসের মোটেই সুনাম নেই। কিন্তু এখন ওসবের পরোয়া কে করে? স্টমাক বাগ পেটে মোচড় দিলে রাস্তায় পাবলিক টয়লেটে ঢোকার সময় ভিতরে টয়লেট পেপার সফট না খসখসে এসব নিয়ে ভাবার কোনও অবকাশ থাকে না। বুড়ি গাড়ি পার্ক করল। রিধিমা বলল, ‘তোমার ফোন থেকে একটা কল করব?’

    ‘কাকে?’

    ‘আমার এক কলিগকে একটা দরকারি ফোন করতে হবে। আমার ফোন থেকে ওকে কল করে বিপদে ফেলতে চাই না।’

    বুড়ি ওর ফোনটা কোটের পকেট থেকে বের করে দিল।

    রিধিমা স্যালির নম্বর ডায়াল করল— ‘স্যালি, কিছু পেলে?’

    ‘টিভিতে একটু আগে পুলিশটার ইন্টারভিউ দেখাল মৃত পুলিশ টম কলিনের ছোট ভাই। রিধিমা দ্যাট গাঈ ওয়াজ ফিউমিং। নাম ব্রেট কলিন, অ্যাফগানিস্ট্যানে US আর্মিতে ছিল, এখন পুলিশ সার্জেন্ট।’

    ‘থ্যাঙ্কস স্যালি, রিধিমা বলল। ‘আই গট্টা রান। টক টু ইয়্যু!’ রিধিমা ফোন নামিয়ে রাখল। ‘থ্যাঙ্কস আ লট,’ রিধিমা বুড়িকে ফোন ফেরত দিল। রিধিমা ট্রাকের দরজার হাতলে হাত রাখল।

    ‘ওয়েট!’

    রিধিমা থেমে গেল।

    বুড়ি কোটের পকেট হাতড়ে একটা দোমড়ানো কাগজ বের করে কাঁপা— হাতের লেখায় পিছনে লিখল— সুনয়ন সীটাপোটি, জার্নালিস্ট, তারপর একটা ফোন নাম্বার লিখল। বুড়ি কাগজটা রিধিমাকে দিল।

    ‘তোমার ছেলের ফোন নম্বর তুমি দিলে?’

    বুড়ির চোখের দৃষ্টি নরম। ‘ফর ইমারজেন্সি ওনলি।’ তারপর বুড়ি পার্স থেকে একটা ফটো বের করল, কোঁকড়ানো কালো চুল, টিপিকাল গায়ানিজ দেখতে— ‘সুনয়ন। আমি ওকে টেক্সট করে তোমার কথা জানিয়ে রাখব।’

    ‘থ্যাঙ্কস আ লট, রিধিমা কৃতজ্ঞতা জানাল।

    বুড়ি দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল— ‘লাড হনুমান সেভ ইউ।’

    ফোন নম্বর লেখা বুড়ির কাগজটা ভাঁজ করে ব্যাকপ্যাকের সামনের পকেটে চালান করার সময় রিধিমা অন্যমনস্ক। ভক্তির ট্রাকের দরজা খুলে নেমে রিধিমা দৌড়ে গেল চায়নাটাউন বাসের দিকে। বাসের ড্রাইভার একজন চিনা, দাঁড়িয়ে ছিল বাসের বাইরে দরজার পাশে। ‘নিউ ইয়র্ক?’ রিধিমা বলল।

    ‘ইয়েস।’

    ‘কখন ছাড়বে?’

    ‘তেন মিনিতস।’ ড্রাইভার বলল।

    রিধিমা পঞ্চাশ ডলারের নোট দিল, লোকটা রিধিমাকে পঁয়ত্রিশ ডলার ক্যাশ ফেরত দিল, কোনও টিকিট-ফিকিটের বালাই নেই। এই ওয়েদারে পনের ডলারে বস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি! রিধিমা খুচরো ক্যাশটা প্যান্টের পকেটে রেখে ভিতরে উঠল।

    বাসের ভিতরে দমকা সিগারেটের গন্ধ, বমি এসে গেল রিধিমার। প্রশ্বাসের এক টানেই মিনিমাম এক বছরের প্যাসিভ স্মোকিং হয়ে গেল। অন্য সময় হলে রিধিমা শিওর বাস থেকে নেমে যেত, কিন্তু প্রাণের তুলনায় এসব তুচ্ছ। বাস প্রায় ভর্তি। যাত্রীদের দেখলেই বোঝা যায় সব লো ইনকাম ক্যাটেগোরি। সকলে অখণ্ড মনোযোগে যে যার সেলফোন দেখছে, দু একজন মাথা তুলে তাকিয়ে আবার ফিরে গেল সেলফোনে। ফ্রি সিটিং। রিধিমা একটা খালি সিটে বসল। ভক্তির ট্রাক আর অপেক্ষা করল না। বাসে বসে রিধিমার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন কিন্তু ঘুরে ঘুরে আসছে। ভক্তির দোকানে পুলিশ কেন এল ওর ছেলের খোঁজ করতে? তবে কি ডঃ উইকস হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে খুনির নাম লিখে পাঠিয়েছিলেন? বুড়ির ছেলে সুনয়নের সঙ্গে এই খুনের কোনও সম্পর্ক আছে?

    ৷৷ ছয় ৷৷

    খ্যাস-খ্যাস-খ্যাস-খ্যাস।

    বাইরে কিছু একটা একটানা ঘষার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল হরিপরসাদের। চোখ মেলে অবাক! এটা কোন জায়গা? একটা ছোট কুঠুরি। কুঠুরির দরজা বন্ধ, মেপলের হার্ডউড মেঝেতে একটা সাদা চাদরের বিছানা পাতা, সেখানে সে এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল। এতক্ষণ মানে কতক্ষণ? মনে হচ্ছে কত যুগ যেন সে ঘুমিয়েছে। অভ্যাসবশতঃ মাথার চুলে হাত বুলোতে গিয়ে হরিপরসাদ চমকে গেল। মাথা ন্যাড়া! গায়ে জ্যাকেট, জিনসের প্যান্ট কিচ্ছু নেই— শুধু একটা গেরুয়া কাপড় জড়ানো!

    ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল হরিপরসাদ— মেথের প্যাকেট? বিছানা থাবড়ে থাবড়ে খুঁজল— নেই! বালিশের নিচে? নেই! লুসি কোথায়? লুসি নেই, মেথের প্যাকেট নেই— হরিপরসাদের মনে হল ও মরেই যাবে। সেলফোনটাও নেই। পেটটা চাপ দিয়ে দেখল হরিপরসাদ— কিডনি-ফিডনি অপারেট করে বের করে নেয় নি তো? পেটে কোনও ব্যথা নেই, তারমানে মাথার চুল ছাড়া ওর শরীরে কেউ হাত দেয় নি।

    এত গভীর ঘুম?

    নাকি ওকে ওরা ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল?

    এটা কোন জায়গা?

    বাইরে থেকে আওয়াজটা ক্রমাগত আসছে। বিছানা থেকে হন্তদন্ত হয়ে উঠে জানলার ভারি পর্দা সরালো হরিপরসাদ। বিশাল কাঁচের জানলা। বাইরে চারদিকে সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়। পাহাড়ে ন্যাড়া পত্রমোচী সব গাছের ডালপালা থেকে বরফ ঝুলছে। বাইরে দুপুরের সূর্যের আলো। জানলার ঠিক নিচে পিছনের প্রাঙ্গণে একজন বিশালদেহী লামা, পরনে হরিপরসাদের মত গেরুয়া পোশাকের ওপর একটা গেরুয়া জ্যাকেট, পায়ে উলের মোজা, চামড়ার জুতো, মাথায় একটা টুপি, একটা বড় পাথরের ওপর এক পা রেখে ঝুঁকে তলোয়ার সাইজের এক বিশাল লম্বা ছুরি শানাচ্ছে। লোকটার ডানহাতের মণিবন্ধে একটা সাদা ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। শানিয়ে শানিয়ে ছুরিটা চোখের কাছে নিয়ে এসে সূর্যের আলোর প্রতিফলনে দেখছে ধার ঠিকমত হয়েছে কিনা, আবার শানাচ্ছে। অদ্ভুত দেখতে এই ছুরিটা সামনের দিকে একটা ধারালো আংটার মত। এবার লামাটা ছুরিটা উপরে তুলে তাকাতেই জানলার কাঁচের ওপাশে হরিপরসাদের সঙ্গে চোখাচোখি হল। সঙ্গে সঙ্গে পাথরের ওপর ছুরিটা রেখে লামা মঠের দিকে রওনা দিল।

    স্নো-স্টর্মটা সব কিছুকে বরফে মুড়ে দিয়ে গেছে। দূরে একটা বিশাল লেক, বরফঢাকা, ঠাণ্ডায় জমে গেছে। জায়গাটা কোনও এক পাহাড়ের উপরে। এটা কোনও একটা বিল্ডিংয়ের পিছন দিক। গোটা এলাকা ঘিরে উঁচু তারকাঁটার প্রাচীর, ঠিক যেন একটা জেলখানা। কিন্তু বিল্ডিংয়ের আদল দেখে মনে হচ্ছে এটা একটা বৌদ্ধ মন্দির বা মঠ। তাড়াতাড়ি জানলার পর্দা নামিয়ে দিল হরিপরসাদ। এবার কড়াক করে ছিটকিনির শব্দে দরজা খুলে গেল, পদার্পণ করল বিশালদেহী লামাটা। জিজ্ঞাসা করল—‘নেশা কেটেছে?’

    যদি সম্ভব হত, তবে হরিপরসাদ লোকটার গলা টিপে ধরে কিছুক্ষণ ঝাঁকাত, কিন্তু রাগ সংবরণ করাটাই ঠিক কাজ হবে বলে মনে হল কারণ লোকটাকে দেখলেই মনে হয় কারেকশনাল ফেসিলিটি থেকে ডাইরেক্ট রিক্রুট। বাইরে তলোয়ারের সাইজের একটা ছুরি শানাচ্ছিল এই মানুষটা, একে না রাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

    রাগ চেপে হরিপরসাদ বলল— ‘আমি কোথায়?’

    ‘আমাদের মঠে।’

    ‘লুসি, আমার ঘড়ি, ফোন, ইয়ে মানে আরও কিছু পার্সোনাল স্টাফ ছিল—’

    ‘সব ঠিক আছে,’ লামা বলল। ‘রিনপোচে সব বলবেন।’

    ‘রিনপোচে?’

    ‘আমাদের গুরু, এই মঠের হেড লামা।’

    মাই ব্যাড, হরিপরসাদ মনে মনে বলল। কাল লেজি বার্ড থেকেই ওই দাড়িওয়ালাকে ফুটিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। ফোর্থ ডাইমেনশন জিগস ক্র্যাপ! ‘লুসি কোথায়?’

    ‘কুত্তাটাতো? বললাম তো ঠিক আছে,’ লামা মণিবন্ধের ব্যাণ্ডেজে হাত বোলাল। ‘কোনও চিন্তা নেই।’

    ‘চিন্তা নেই? আমার মাথার চুল উড়িয়ে দেওয়ার ডিসিশন কে নিল? আর এই স্যাফ্রন? জেলের কয়েদি মনে হচ্ছে নিজেকে—’

    ‘এই মঠে কেবল সন্ন্যাসীরাই থাকে। শহুরে পোশাকে দেখলে বাইরের দর্শনার্থীরা অনেক প্রশ্ন শুরু করবে। তাই রিনপোচে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

    ‘দর্শনার্থী? এটা কোন জায়গা?’

    ‘রিনপোচে সব বলবেন, লামা আবার বলল।

    দরজার পাশে একটা ঘণ্টা বাঁধা। লামা ঘন্টা বাজাতেই একজন নর্মাল সাইজের লামা হরিপরসাদের জন্য নতুন গৈরিক বসন, কচ্ছ, উত্তরীয় দিয়ে গেল। ‘আমি এক্ষুনি আসছি।’ লামা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। হরিপরসাদ কৌতূহলে আবার জানলার পর্দা সরালো। কাল অ্যাব লিঙ্কন বলেছিল এটা ওয়ান ওয়ে স্ট্রীট, পালাবার চেষ্টা করা বৃথা। কুংফু মুভির খতরনাক শাওলিন টেম্পলের চাইনীজ ভিলেনের মত দেখতে এই লামা আর তার তলোয়ার দেখার পর পালাবার চিন্তা মাথায় আনাই বোকামি। একটা রাস্তা পিছনে পাহাড় বেয়ে নেমে গেছে তারকাঁটার প্রাচীর পর্যন্ত, রাস্তায় স্নো-প্লাউ করার ফলে পথের দু’পাশে কোমর সমান বরফের দেয়াল হয়ে গেছে। রাস্তা যেখানে তারকাঁটার প্রাচীরে মিশেছে সেখানে একটা বিশাল লোহার জালি দেওয়া দরজা। লামাটা মঠ থেকে বেরিয়ে এসে পাথর থেকে বিশাল ছুরিটা তুলে নিল, তারপর হনহন করে পিছনের তারকাঁটার বেড়ার দিকে হাঁটতে লাগল। হরিপরসাদ পর্দা অল্প ফাঁক করে উঁকি মেরে দেখতে লাগল লোকটা কোথায় যায়। মনাস্টারির পিছনের দিকের পায়ে চলা পথ দিয়ে লোকটা পিছনের গেটের দিকে চলল। পথের শেষে ফেন্সিংয়ের গায়ে একটা মডার্ন, হেভি ডিউটি ডিজাইনের স্নো রেসিস্ট্যান্ট গ্রীনহাউসের ধরণের স্ট্রাকচার। বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না ভিতরে কী আছে। লামাটা ছুরিটা নিয়ে ঐ স্ট্রাকচারের মধ্যে ঢুকল, আবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসে ল্যাচ টেনে দিল। এবার হাত খালি।

    তাড়াতাড়ি পর্দা নামিয়ে দিল হরিপরসাদ। তৈরি হতে বলে গেছে লোকটা। কামরার লাগোয়া বাথরুম। বাথরুম ছিমছাম করে সাজানো। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হলেও এই নতুন কাপড়টা গিঁট-ফিট দিয়ে পরতে বেশ নাকানি চোবানি খাচ্ছে, এমন সময় বাইরের দরজা খুলে লামাটা ঢুকল। ‘আমি দেখিয়ে দিচ্ছি কীভাবে পরতে হয়,’ লামাটা হরিপরসাদকে সাহায্য করল। তারপর লামার সঙ্গে হরিপরসাদ কুঠুরি থেকে হলওয়েতে বেরিয়ে এল।

    মঠের ভিতরে কাঁচে ঢাকা সেন্ট্রালি হিটেড হলওয়ের দেওয়ালে ডাইরেকশন আঁকা – হরিপরসাদ দেখল ওরা সন্ন্যাসী আবাস থেকে মূল মন্দিরের দিকে যাচ্ছে। দু’জনে মঠের মূল মন্দিরে প্রবেশ করল। হরিপরসাদ লক্ষ্য করল এই মঠটা বড় বেশি নিশ্চুপ। সন্ন্যাসীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। এক আধজনকে দেখা যাচ্ছে নীরবে মঠের মেঝে পরিষ্কার করছে, ব্যাস। না কোনও প্রার্থনার আওয়াজ, না কোনও কথাবার্তা, অদ্ভুত অস্বস্তিকর নীরবতা।

    বড় একটা হলঘরে এসে উপস্থিত হল হরিপরসাদ। হলঘরে কোনও জানলা নেই, খুবই অল্প আলো। দেওয়ালে চারদিকে বিশাল বিশাল থাংকা ঝুলছে। হলের মাঝে একটা লালরঙা স্তম্ভ ছাত পর্যন্ত উঠে গেছে। একদম প্রাস্তে দেওয়ালে সোনালি রঙা বুদ্ধের প্রায় চল্লিশ ফুট মত উঁচু মূর্তি। মূর্তির সামনে অনেকগুলো প্রদীপ জ্বলছে। সেখানে একজন বৃদ্ধ অথচ বেশ শক্তপোক্ত লামা বসে। বৃদ্ধের হাতে কাল সন্ধ্যার লেজি বার্ডসের গোরিলা-গ্লু লাগানো ফুলদানি, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। হরিপরসাদ বুঝল এই বয়স্ক লামাটাই রিনপোচে। ‘গো,’ তলোয়ার শানানো লামা নিচু গলায় বলে দরজায় দাঁড়িয়ে গেল৷ হরিপরসাদ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।

    বৃদ্ধ লামা এবার মাথা তুলে হরিপরসাদের দিকে তাকাল। হরিপরসাদ কাছাকাছি এলে শান্তমুখে আসন দেখিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসো।’ হরিপরসাদ পিছন ফিরল, তলোয়ার লামাকে দেখা যাচ্ছে না।

    ‘আমাকে কোথায় আনা হয়েছে?’ হরিপরসাদ বসল না।

    ‘এটা তুমি জোড়া লাগিয়েছ?’ বৃদ্ধ লামা ফুলদানি দেখিয়ে বলল।

    ‘আনফরচুনেটলি ইয়েস,’ হরিপরসাদ বিরক্ত হয়ে বলল। আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না।’

    ‘বলব সব বলব, আগে বসো,’ লামার শান্তমুখ।

    হরিপরসাদ বসল। ওর মাথায় ঘুরছে ফার্স্ট প্রায়োরিটি লুসি, সেকেণ্ড প্রায়োরিটি মেথের প্যাকেটটা, আর থার্ড প্রায়োরিটি সেলফোন, তারপর বাদবাকি প্রশ্ন৷

    ‘এই জায়গাটা আপস্টেট নিউ ইয়র্কের অ্যাডিরনড্যাক পাহাড়ের মধ্যে। পাহাড়ের নিচেই লেক জর্জ। ক্যানাডা বেশি দূরে না। আমাদের এই মঠের নাম ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটি। আমরা ভারমন্ট নিউ ইয়র্কের বর্ডারে।’ বৃদ্ধ লামা বলল।

    সেলফোনটা দিলে এত কিছু বলার দরকার হত না, গুগল জিও ট্র্যাকারে ল্যাটিচুড-লঙ্গিচূড-নাড়ি-নক্ষত্র সব দু-মিনিটে জানা হয়ে যেত, ন্যাড়া মাথায় হাত বোলাল হরিপরসাদ। ‘আমাকে এখানে এনেছেন কেন?’

    ‘তুমি জিগস পাজলের একজন উইজার্ড। ভেরি ইম্প্রেসিভ!’ লামা ফুলদানিটা নামিয়ে রাখল ।

    ‘হান্ড্রেড থাউজ্যাণ্ড ডলার।’

    লামা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

    ‘আমার জিনিসপত্র? ঘড়ি, সেলফোন—’

    ‘ড্রাগস ব্যবহার আমাদের মঠে নিষিদ্ধ। ওটা তোমায় দেওয়া যাবে না।’

    হরিপরসাদের রাগ এক লাফে মাথায় চড়ল। ‘আর ইউ নাটস? ডোন্ট ইউ নট নো কোল্ড টার্কি ইজ ডেডলি? ওই উইড না পেলে আমি ফ্রিকিং ডেড!’

    ‘মেথ বডি সিস্টেমের জন্য ডেঞ্জারাস। হার্ট রেট, ব্লাড প্রেসার, রেস্পিরেটরি রেট বাড়িয়ে দেয়।’

    ‘প্লিজ!’ হরিপরসাদ দু-হাত জোড় করল। ‘ওসব রিহ্যাবের থিওরিটিক্যাল লেকচার ঝাড়বেন না। যা জানেন না, তা নিয়ে ইডিয়েটের মত বকবক করবেন না। উইড ইনটেক সাডেনলি স্টপ করলে আমার সিজার শুরু হবে। আমার ব্রেন ড্যামেজ হয়ে যেতে পারে। আর ইউ ম্যাড?’

    লামা কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে হরিপরসাদের দিকে তাকিয়ে বলল— ‘ওকে, সে দেখা যাবে। তবে আমরা চাইনা তুমি বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখো, তাই তোমার সেলফোন আমাদের কাছেই থাকবে।’

    ‘লুসি কোথায়?’

    ‘তোমার কুকুর খাঁচায়। কাল রাতে তোমাকে অজ্ঞান দেখে ও চেঁচামেচি, কামড়াকামড়ি শুরু করেছিল। সামলাতে বেশ অসুবিধা হয়েছে।’

    হরিপরসাদ বুঝল তলোয়ার লামার হাতের ব্যাণ্ডেজটা সম্ভবতঃ লুসিরই অবদান। ‘ও এবার থেকে আমার সঙ্গেই থাকবে। নাউ লেটস গেট স্টার্টেড। যত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারি। এই লাউজি সাফোকেটিং রোব—’

    লামার চীবরের ভিতর সেলফোন ভাইব্রেট করে উঠল। লামা ফোনটা কানে তুলে ধরল। হরিপরসাদ লক্ষ্য করল লামার চোখ-মুখে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। লামা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফোন বন্ধ করে ঊর্ধ্বাবাসের পকেটে রাখল।

    হরিপরসাদ বুঝল খারাপ কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু ওর সে ব্যাপারে নাক গলাবার এতটুকু ইচ্ছা নেই। মেজাজটা চেটে আছে। কাজটা শেষ করে আজ সন্ধ্যার মধ্যে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। ‘বলুন কী করতে হবে।’

    লামার কানে যেন হরিপরসাদের কথা ঢুকলই না। বৃদ্ধ অন্যমনস্ক, চীবর দিয়ে মুখ মুছল। তারপর হরিপরসাদকে বলল, ‘এক্ষুনি ভগবানের কাছে যেতে হবে।’

    ‘ভগবান? মানে গড?’

    ‘উনি হিউম্যান গড। বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রীর অবতার।

    ‘ইউ মিন দালাই লামা?’

    দালাই লামার নাম শুনে লামার মুখে একটা বিরক্তির রেখা জেগেও মিলিয়ে গেল। লামা শান্তকণ্ঠে বলল, ‘দালাই লামাকে যেমন অবলোকিতেশ্বরের বা বোধিসত্ত্ব অব কম্প্যাশনের পুনর্জন্ম বলা হয়, তেমন ইনি হলেন বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী বা বোধিসত্ত্ব অব উইজডমের পুনর্জন্ম। উনি মহাজ্ঞানী, অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ। মানুষের মুখ দেখে তার সম্বন্ধে অনেক কথা বলে দিতে পারেন। তুমি আমার সঙ্গে চল।’

    ‘এসব জ্ঞানী-ফ্যানিদের আমি ধারে কাছে যাই না। সেজন্যই তো হাইস্কুল কমপ্লিট করিনি।’

    ‘ওঁর বিশেষ কাজের জন্যই তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। ‘

    ‘অলরাইট!’ হরিপরসাদ নিমরাজি মুখে উঠে দাঁড়াল। ‘চলুন তাহলে।’

    রিনপোচে হরিপরসাদকে নিয়ে বাইরের হলওয়েতে বেরিয়ে এল। ‘ওঁর একটা দুরারোগ্য রোগ আছে, তাই ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী ওঁকে বাইরের লোকের থেকে দূরে রাখতে হয়।’

    ‘কী অসুখ?’

    ‘ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ডিসঅর্ডার।’

    ‘এইডস!’

    ‘না না। ওঁর শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। ব্যাক্টিরিয়া বা ভাইরাস থেকে সেফগার্ড করে রাখতে হয়। চল, ওঁকে একটা বিশেষ খবর দেওয়ার আছে।’

    বুদ্ধের এই মন্দির থেকে বেরিয়ে হলওয়ের চারিপথের সংযোগস্থল, সেখান থেকে সামনে এগিয়ে গিয়ে রিনপোচে লামার সঙ্গে একটা বড় হলঘরে প্রবেশ করল হরিপরসাদ। হলঘরে তিব্বতী গালিচা পাতা, হলঘরের শেষ মাথায় আরেকটা ছোট ঘর, তার দরজা কাঁচের। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সেই ছোট ঘরের উল্টোদিকের দেওয়ালে অনেক দেবদেবীর মূর্তি। ভিতরে একটা হুইলচেয়ারে চীবর পরা একজন মানুষ, ঈশ্বরদের দিকে মুখ করে বসে। পিছন ফিরে থাকায় ওঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না। দেওয়ালের গায়ে একটা ছোট আসনে বসে একজন চশমা পরা লামা একটা পুঁথি পড়ছে।

    রিনপোচে হলঘরে পৌঁছে বাইরে থেকেই দণ্ডি কাটার মত সাষ্টাঙ্গে শুয়ে প্রণাম করল। দরজার পাশের দেওয়ালে একটা স্পিকার, সেখানে বোতাম টিপে রিনপোচে বলল— ‘ভগবান, একটা সংবাদ পেলাম এইমাত্র। হার্ভার্ডে ডঃ উইকসকে কাল খুন করা হয়েছে।’

    হুইলচেয়ারের দুদিকের হাতলে মানুষটার দু’হাতের আঙুলের চাপ বাড়ল৷ হাতল আঁকড়ে মানুষটা পাথরের মত শক্ত হয়ে বসে রইল। এভাবে কিছুক্ষণ সময় কাটল, এবার রিনপোচে বলল, ‘ভগবান, ইনি হরিপরসাদ। জিনিয়াস জাম্বল ও জিগস পাজল চ্যাম্পিয়ন।’

    এবার বোধিসত্ত্ব ভগবান হুইলচেয়ারের হাতলে লাগানো কনসোলের একটা বোতামে চাপ দিল, হুইলচেয়ারটা ঘুরল। হরিপরসাদ আশা করেছিল লোকটার মুখমণ্ডলে জ্যোৎস্নার আলোর মত ছড়িয়ে থাকবে কোমল স্নিগ্ধ শাস্তি। লোকটার মুখ এবার দেখা যাচ্ছে। মুখটা দেখে শিউরে উঠল হরিপরসাদ। কুৎসিৎ মুখশ্রী, কপালে জুড়ে কাটা সেলাইয়ের দাগ, গালে, গলায়, থুতনিতেও তাই। লোকটার চেহারা কঙ্কালসার, যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে যেন বেলুনের ভিতর একটা কঙ্কাল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু চামড়া আর হাড়। ছিটেফোঁটা মাংস নেই শরীরে। রিনপোচের দিকে তাকাল লোকটা, মুখে বিরক্তি ঝরে পড়ছে। চোখে এতটুকু বৈরাগ্যের দীপ্তি নেই, হরিপরসাদ প্রবল অনীহায় চোখ নামিয়ে নিল।

    বোধিসত্ত্ব মঞ্জুশ্রী লামা এবার ইশারা করলেন। ভিতরের সেবাইত লামা একটা রাইটিং প্যাড আর কলম এগিয়ে দিল। মঞ্জুশ্রী লামা কোনরকমে আঙুলের মাঝে কলম চেপে রেখে লিখতে লাগলেন। হরিপরসাদ দেখল খুব কষ্ট করে সেই কাগজে ভগবান কিছু লিখলেন আর ওর ইশারায় সেবাইত ফুলদানি থেকে একটা লাল গোলাপ তুলে আনল। তারপর ফুল আর কাগজটা নিয়ে কাঁচের দরজা খুলে হরিপরসাদের হাতে দিল—’ভগবান আশীর্বাদ করলেন। হরিপরসাদ তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে কাগজটা দেখল। কাগজে লেখা—

    garden is peace

    মঞ্জুশ্রী লামা আবার পিছন ফিরে ঈশ্বরের ধ্যানে বসলেন।

    ‘চল, ফিরে যাওয়া যাক,’ রিনপোচে লামা ফিসফিস করে বলল। হরিপরসাদের চীবরে হালকা আকর্ষণ করে কামরা থেকে বের করে নিয়ে গেল। রিনপোচে বলল, ‘তুমি ক্লান্ত, স্নান-টান সেরে কিছু খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও।’

    ‘আগে আমি লুসিকে দেখতে চাই,’ হরিপরসাদ দাঁড়িয়ে গেল।

    হলওয়ে পেরিয়ে সন্ন্যাসীদের আবাসের পাশে একটা স্টোর রুম। তলোয়ার লামা ওদের দেখে এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। কামরার ভিতর একটা খাঁচায় শুয়ে লুসি নিজের থাবা চাটছিল। হরিপরসাদকে দেখে লুসি আনন্দে দাঁড়িয়ে উঠে ল্যাজ নাড়াতে লাগল।

    ‘হেই বাডি!’ হরিপরসাদ খাঁচার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। লুসি চকাস চকাস করে হরিপরসাদের মুখ চেটে দিল। তারপর তলোয়ার লামার দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে ঘেউ ঘেউ করে বকুনি দিতে লাগল যে হরিপরসাদের মনে হল যেন লুসি নালিশ করছে।

    ‘ওকে খাঁচাতেই রেখো,’ রিনপোচে বলল।

    খাঁচার তলায় চাকা লাগানো, হরিপরসাদ খাঁচা ঠেলে ঠেলে নিজের কুঠুরিতে নিয়ে এল লুসিকে।

    ‘সন্ধ্যাবেলা তোমার সঙ্গে কাজের কথা হবে,’ রিনপোচে মন্দিরের দিকে চলে গেল।

    নিজের কুঠুরিতে ফিরে এসে হরিপরসাদ দেখল একটা জলচৌকিতে খাবার ঢাকা— নানা ধরণের ফল, দই, দুধ, মাখন, বার্লি-চা। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাণ্ডেজে হাত বোলাচ্ছিল পাহারাদার লামা। হরিপরসাদকে জিজ্ঞেস করল— ‘কুকুরের র‍্যাবিজ ভ্যাকসিন আপ-টু-ডেট?’

    লুসির জন্য গর্ব হল হরিপরসাদের, মুখে বলল, ‘ও ইয়েস!’

    মনে হল তলোয়ার লামা নিশ্চিন্ত হল। বলল, ‘খাবার এনে রেখেছি।’

    হরিপরসাদের খুব খিদে পেয়েছিল। ‘লুসির খাবার?’

    লামাটা মনে হল চিন্তায় পড়ে গেল। হরিপরসাদ কলার ছড়া থেকে কলা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে লুসিকে দিল। নিজের বাটিতে জল ঢেলে লুসির দিকে এগিয়ে দিল। লুসির খুব তেষ্টা পেয়েছিল বোঝা গেল, অনেকক্ষণ ধরে চেটে চেটে জল খেল। ‘এবার থেকে ওকে দু-বেলা রাইস-দাল দিলেই চলবে,’ হরি পরসাদ বলল। তারপর লামার বিস্মিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে হরিপরসাদ ব্যাখ্যা করে বলল, ‘দাল? ইয়েলো পিজ, ইউ ডাস বয়েল দেম ইনটু লিকুইড উইড স্টাফ দ্যাট ইউ ওয়ান্না অ্যাড।’

    খিদে পেয়েছিল খুব। খেতে খেতে হরিপরসাদ খুলল কাগজটা। মঞ্জুশ্রী লামার কাঁপা কাঁপা হাতের লেখা। লোকটা তাকিয়ে আছে সেদিকে।

    ‘নো চিকেন ফুট স্যুপ?’ হরিপরসাদ বলল।

    ‘ভেজিটেরিয়ান, লামা বলল।

    ‘ড্যুড, ইয়ো ফ্রম চায়না?’

    ‘টিবেট। ইউ?’

    ‘মি কুলি ইণ্ডিয়ান। গায়ানিজ। হোয়াট ইউ নেম?’

    ‘রগ্যাপা লামা।’

    ‘রগ-গ্যাপা—’ হরিপরসাদ কষ্ট করে উচ্চারণ করল। ‘আমি হরিপরসাদ।’ হরিপরসাদ মঞ্জুশ্রী লামার কাগজটার দিকে তাকাল। কোনও শব্দ দেখলেই হরিপরসাদের অবচেতন মন নিজের অজান্তেই জাম্বল করতে শুরু করে। হরিপরসাদের মাথার মধ্যে পাক খেয়ে চলেছে জাম্বল— garden is peace। বাগান হল শান্তির স্থান। মনে মনে শব্দগুলোকে নাড়াচাড়া করতে লাগল হরি পরসাদ। GARDEN এর অক্ষরগুলোকে সামনে পিছনে এদিক ওদিক করে সাজাতে লাগল হরিপরসাদ। GARDEN – RANGED – GANDER – এবার হরিপরসাদ শিউরে উঠল —

    GARDEN — DANGER

    খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল হরিপরসাদের। এটা কি মঞ্জুশ্রী লামার আশীর্বাদ নাকি তার উদ্দেশ্যে গোপন সাবধানবাণী? হরিপরসাদ মঞ্জুশ্রী লামার কাগজটার দিকে আবার তাকাল। পাহারাদার রগ্যাপা লামাকে মনের ভাব বুঝতে দিলে চলবে না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করল হরিপরসাদ। চীবরটা খুব টাইট লাগছে। নিম্নবাসের গিঁট খুলে ধুতির মত আলগা ভাবে পেঁচাল— ‘নাউ বেটার। দোতীই, ইটস কোয়াইট রুমি নাউ।’ হরিপরসাদ জানলার পর্দা টেনে দিল, কুঠুরিতে রোদ ঢুকে কুঠুরি আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    ‘ওভার দেয়ার— হোয়াজ দ্যাট?’ হরিপরসাদ স্ট্রাকচারটা দেখাল।

    ‘গ্রীনহাউস,’ রগ্যাপা লামা বলল। ‘মঞ্জুশ্রী লামার জন্য বাগান বানানো হয়েছিল। যখন উনি সুস্থ ছিলেন, রোজ বাগানে যেতেন। ওখানে অনেকক্ষণ সময় কাটাতেন। উনি নিজে অনেক ফুলের গাছ পুঁতেছিলেন।’

    ‘এখন যান না?’

    ‘না, উনি যেতে পারেন না। তাই ঘর থেকেই বেরোন না।

    ‘ফুলের গাছ এখনো আছে?’

    ‘হ্যাঁ, ওঁর জন্য বাগান থেকে টাটকা ফুল তুলে রোজ দেওয়া হয়। গোলাপটা ওখানকারই ।

    ‘ইয়ো, ইউ গট সাম হাইড্রো ক্যানাবিস ওভার দেয়ার?’

    লামা মানে না বুঝে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাল— ‘মানে?’

    ‘না তেমন কিছু না, আই মেন্ট ইন্ডোর গ্রোওন উইড।’

    লামা তাও বুঝল না— ‘না শুধু ফুলের গাছ।

    ‘লেটস গো দেয়ার।

    রগ্যাপা লামার দু’চোখে কৌতূহলী দৃষ্টি – আরেক দিন নিয়ে যাব।’

    হরিপরসাদ কিছু বলল না, কিন্তু বুঝল ঐ গ্রীনহাউসের কিছু রহস্য আছে। ঘরের ভিতরে একটা তাকে কিছু বই, রাইটিং প্যাড, কলম। লোকটাকে কাটাবার জন্য হরিপরসাদ একটা বই খুলে মেঝেতে বসল। রগ্যাপা লামা কামরার বাইরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি টেনে দিল।

    garden Is peace। peace? অনেকটা চিন্তা করল হরিপরসাদ, শব্দটাকে ভেঙে pace- ace নাঃ মিলছে না। অনেকক্ষণ চিন্তা করেও কোনও সুরাহা হল না। কাগজটা একমনে দেখতে লাগল হরিপরসাদ। হঠাৎ মাথার অন্ধকারে আলোকরশ্মির মত চিন্তাটা এল। সবটা ছোট হরফে লেখা কিন্তু Is এর ‘I’ টা বড় হরফে কেন? তবে কি ওটা ‘I’ না? একটা সেপারেটর? জাম্বলে হরিপরসাদ এরকম সেপারেটরের সঙ্গে পরিচিত। হরিপরসাদ এবার পড়ল—

    garden I s peace

    S-কে এবার PEACE এর সঙ্গে জুড়ল হরিপরসাদ। SPEACE? আবার সাজাল হরিপরসাদ PEACES? PEACES এর কোনও মানে হচ্ছে না। তাহলে এখানেও জাম্বল— PEACES? PEACES? PEACES? একটা সুপার ফাস্ট ট্রেন যেন ব্রেনের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনের দিকে দৌড়োচ্ছে। এবার ট্রেন থামল। গতবছরের জাম্বল ও জিগস চ্যাম্পিয়ন কব্জা করে ফেলল— PEACES – ESCAPE।

    DANGER / ESCAPE

    ভ্রূ কুঁচকে গেল হরিপরসাদের। এই মঞ্জুশ্রী লামা লোকটা কে? এখানে কী করছে? এ কেন পালাবার কথা লিখছে? এখানে কীসের বিপদ? এই মঞ্জুশ্রী লামাকে কি তবে এরা আটকে রেখেছে?

    ৷৷ সাত ৷৷

    তেন মিনিতস কেটে গেল। চায়নাটাউন বাস ছাড়ার কোনও লক্ষণই নেই ড্রাইভার দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালো। এবার বাইরে একজন হিস্প্যানিক বুড়ো এসে জিজ্ঞাসা করল ‘বাস কখন ছাড়বে?’

    ‘তেন মিনিতস।’

    রিধিমা সেলফোন বের করল। নিউ ইয়র্কের ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে একটা ফোন করা দরকার। কাকে করবে? মোহনকে? JNU’র কমন বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপের দলে নম্বরটা দেখেছিল রিধিমা। ফোন করার আগে আবার ভাবল রিধিমা— মোহনকে ফোন করবে? একটা লম্বা শ্বাস নিল রিধিমা। তিন-সাড়ে তিন বছর অনেকটা সময়, কিন্তু কিছু ক্ষত শোকাবার পক্ষে যথেষ্ট নয়।

    রিধিমা মোহনের নম্বর ডায়াল করল।

    ফোনের অন্যদিকে মোহনের গলা। জিভে আমেরিকানদের ট্যাঁশ অ্যাকসেন্ট আনার চেষ্টা করছে মোহন, কিন্তু সময় লাগবে।

    ‘রিধিমা বলছি,’ রিধিমা ফোনটাকে দৃঢ়মুষ্টিতে চেপে ধরল।

    ‘রিধিমা!’ মোহনের গলায় বিস্ময়।

    ‘খুব বিপদে পড়ে তোমাকে ফোন করছি।’

    ‘বিপদ? কী হয়েছে? কোথা থেকে বলছ?’

    ‘মোহন, আমাদের হার্ভার্ডে তিনজন প্রফেসর আর একজন পুলিশ খুন হয়েছে,’ রিধিমা দু’পাশে তাকিয়ে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করল। ‘আর পুলিশ আমাকে এই চারটে খুনের জন্য সন্দেহ করছে।’

    ‘হো-আ-আ-ট!’

    মোহন এত জোরে চেঁচিয়ে উঠল যে রিধিমার মনে হল সমস্ত বাস শুনতে পেল।

    ‘তোমাকে কেন পুলিশ সন্দেহ করতে যাবে?’ মোহনের কণ্ঠস্বর তখনও উচ্চগ্রামে।

    ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না,’ রিধিমা ঢোঁক গিলল। রিধিমা সংক্ষিপ্ত ভাবে সমস্যাটা বোঝাবার চেষ্টা করল – আমার ডর্মে একজন পুলিশের পিস্তল পাওয়া গেছে।’

    ‘পুলিশের পিস্তল! পুলিশ কেন তোমার ডর্মে গান রাখবে?’

    ‘পুলিশ রাখেনি, পুলিশটার লাশ পড়েছিল হার্ভার্ড ইয়ার্ডে বরফের নিচে।’

    ‘লা-শ!’

    রিধিমার মনে হল মোহনের চোয়ালে ক্র্যাম্প ধরে কথা আটকে গেছে। রিধিমা বলল, ‘কোনরকমে বস্টন থেকে পালাচ্ছি। আমাকে একদিকে হিটম্যান আর অন্য দিকে পুলিশ খুঁজছে। আমার মনে হয়েছে তোমরা নিউ ইয়র্ক ইণ্ডিয়ান কনসুলেটই একমাত্র আমাকে বাঁচাতে পার। পুলিশ আমাকে দেখতে পেলেই হয়তো গুলি করবে। ঘটনাটা শোনো।’ রিধিমা খুব সংক্ষেপে ঘটনাটা বলল।

    মোহন একটু সময় নিল উত্তর দিতে, তারপর উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা খুব সিরিয়াস। তবে তোমার কাহিনি শুনে মাই নি-জার্ক রিঅ্যাকশন ইজ ইণ্ডিয়ান কনসুলেট ক্যান’ট হেল্প।’

    মোহন এই অর্ধেক দিশি-অর্ধেক ইংরাজি মেশান সেন্টেন্স বলার অভ্যাস মনে হয় না এজন্মে ধুয়ে ফেলতে পারবে, রিধিমা ভাবল। ‘তুমি কী সাজেস্ট কর?’ ‘আমার মনে হয় এখানে না এসে তুমি পুলিশের কাছে সারেণ্ডার কর ।

    ‘সারেণ্ডার!’ রিধিমা অবাক। ‘মোহন, আমি খুন করি নি!

    ‘সেটা আমি না হয় বিশ্বাস করলাম। কিন্তু, পুলিশকে তো বিশ্বাস করাতে হবে। এভাবে পালিয়ে বেরালে—’

    ‘মোহন!’ রিধিমার গলার আওয়াজে হতাশা ঝরে পড়ল। ‘পুলিশটা নিজে আমাকে বলেছে ধরতে পারলে আমার কপালে গুলি করবে। ‘এখন বল আমি কী করে সারেণ্ডার—’

    ‘ভাইকে খুন করা হয়েছে বলে পুলিশ গুলি চালাতে পারে না।’

    রিধিমা জানে এটা টিপিক্যাল মোহন, এখন তর্ক করতে আরম্ভ করবে, নানা রকম লজিক দিয়ে প্রতিপন্ন করাবে যে রিধিমা ভুল। মোহন তখন ক্রমাগত বলেই চলেছে, ‘আমেরিকান পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পলিসি হল পুলিশ লিথ্যাল ওয়েপন ইউজ করতে পারে দুটো কারণে। প্রথম কারণ হল ডিফেন্স অফ লাইফ, আর দ্বিতীয় কারণ হল ফ্লিইইং আ ভায়োলেন্ট ফেলোনি।’

    ‘আমার ক্ষেত্রে তো দুটোই অ্যাপ্লিকেবল, আমি পুলিশ মেরেছি বলছে!’ রিধিমা বিরক্ত।

    ‘ডিবেটেবল,’ মোহন বলল। ‘সেটা পুলিশের ওপর নির্ভর করছে। তবে পুলিশের কাছে থ্রেট মনে হলে পুলিশ গুলি চালাতে পারে।’

    ‘তাহলে আমি এখন বাস থেকে নেমে গিয়ে বস্টনে পুলিশ স্টেশনের সামনে দু’হাত তুলে দাঁড়াই—’

    ‘আমি কি তা বলেছি?’ মোহনের গলায় উষ্মা। ‘তোমার প্রবলেম হল তুমি সব কিছু ইগোতে নাও। ডেপুটি কনসুল জেনারেল এখন একটা মিটিংয়ে। আমি ওর মিটিং শেষ হলেই ওকে ব্রিফ করে তোমাকে ফোন করছি।’

    কথা শেষ হল। রিধিমা একটুও নিশ্চিন্ত বোধ করল না। এটা আমার জীবন মরণের ব্যাপার, রিধিমা বিড়বিড় করে বলল। এর ডিসিশন মোহন গুপ্তা নেবে? আমি যাবই কনসুলেটে প্রোটেকশন চাইতে। তারপর দেখা যাক কী হয় ৷ কিন্তু যদি ইণ্ডিয়ান কনসুলেট প্রোটেকশন না দেয়, যদি কোনও ব্যুরোক্রেটিক এক্সিউজ দেখায় তবে? রিধিমা প্ল্যান বি চিন্তা করতে করতে বুড়ির কাগজটা বের করল। সুনয়ন সীটাপোটি। রিধিমা চটপট ফেসবুকে নামটা টাইপ করল। আশ্চর্য! লোকটা ফেসবুক, ইনস্টাতে নেই! ট্যুইটার? নাঃ, কোথাও নেই। এ কেমন রিপোর্টার? স্যোসাল মিডিয়ায় থাকে না! গুগল সার্চ করেও রিধিমা কিছু পেল না।

    বাস পুরো ভরলে, ড্রাইভার বাসে উঠে আরেকবার চেক করে নিল যে আর একটা সিটও খালি নেই, তারপর বাস স্টার্ট দিল। রিধিমা স্বস্তি পেল। তবু এত বড় বড় জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে ভয় লাগছে যদি পুলিশ-টুলিশ দেখে ফেলে। বাস কেমব্রিজের এলাকা থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে এসে পড়ল। এবার রিধিমা একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল। শরীর খুব ক্লান্ত। এতক্ষণ স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্সে ছুটতে ছুটতে অন্যের জন্য সুখ দুঃখ নিয়ে ভাবার কথা মনেই আসেনি। এবার দুঃখগুলো মনের তটে সাগরের ঢেউয়ের মত এক এক করে হাজির হতে লাগল। হার্ভার্ডে রিধিমার রিসার্চের অ্যাডভাইসার ডঃ স্টিফেন হলেও হার্ভার্ড মিউজিয়ামের ডিরেক্টর ডঃ উইকসই প্র্যাকটিক্যালি রিধিমাকে হার্ভার্ডে নিয়ে এসেছিলেন। ডঃ উইকস যখন নেপালে এবং ভারতে বুদ্ধের ওপর রিসার্চ করছিলেন তখন দাদা ডঃ উইকসকে অনেক সাহায্য করেছিল। দাদার ইচ্ছা ছিল রিধিমা হার্ভার্ডে পড়ে। দাদা কখনো সেই ইচ্ছার কথা ডঃ উইকসকে জানিয়েছিল। দাদার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং তারপর মোহনের গোটা পরিবারের নির্দয় ব্যবহারে এক সময় রিধিমার মানসিক অবস্থা একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। হার্ভার্ডে এসে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল রিধিমা। ডঃ উইকসই ওর মেন্টর ছিলেন। সেই ডঃ উইকসই চলে গেলেন। উইকএণ্ডে দাবার বোর্ডে দু’জনের লড়াই চলত। সঙ্গে চলত ডঃ উইকসের জীবনদর্শনের উপলব্ধির লেকচার। ডঃ উইকস বলতেন জীবনটা একটা বিশাল দাবার বোর্ড। জীবনের সমস্যার যদি সমাধানের পথ না পাওয়া যায়, তখন দাবার স্ট্র্যাটেজিগুলো প্রয়োগ করবে, দেখবে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রিধিমার গলায় দুঃখ দলা পাকিয়ে আটকে আছে। কাঁদতেও পারছে না রিধিমা । দাদাভাইয়ের স্মৃতি হুড়মুড় করে মনের নিঃসঙ্গ খালি জায়গায় ঢুকতে লাগল ৷ তের বছরের বড় দাদা। বাবার অভাব ছোটবেলা থেকেই রিধিমাকে বুঝতে দেয় নি। দাদাভাই জীবন থেকে অতর্কিতভাবে হারিয়ে গেল। হঠাৎ রিধিমার মনে পড়ল দাদার ডায়েরিটার কথা। ব্যাকপ্যাক খুলে ডায়েরিটা বের করল রিধিমা । শেষ পাতাটা ওকে টানছে। বুদ্ধের মায়ের মন্দির! এর মানে কী? এটা কেন গোটা গোটা করে আলাদা পৃষ্ঠায় ডঃ উইকস লিখে গেছেন? রিধিমা একটু ভাবল। নাঃ, মাথা কাজ করছে না। রিধিমা ডায়েরির দ্বিতীয় পৃষ্ঠা খুলল—

    ১৮৯৭ সাল

    তরাই, নেপাল

    কী হয়েছিল নেপালের তরাইয়ের জঙ্গলে একশ বাইশ বছর আগে? রিধিমা ভ্রূতে কুঞ্চন—

    * * *

    নারীকণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল দেবচরণ কুমহালের। আতঙ্কে ধড়মড় করে গা থেকে ধুসা সরিয়ে উঠে বসল, ছাংয়ের নেশা এক ঝটকায় নেমে গেছে। ঘর অন্ধকার, খোলা সদর দরজা দিয়ে বাইরের হিমালয়ের হাড়কাঁপানো হিম বাতাস আসছে। দেবচরণ খাটিয়া থেকে লাফিয়ে নামল মাটির ঠাণ্ডা মেঝেতে, বাইরে সোনাঝোরার ওপারে সেই চিৎকার অন্ধকার খাগড়ার জঙ্গল পেরিয়ে মৌন পাহাড়ের সারিতে ছড়িয়ে যাচ্ছে। দেবচরণ টের পেল তুলসী জেগে গেছে। দরজা দিয়ে ছুটে বাইরে বের হয়ে এল দেবচরণ। বাইরে নিকষ আঁধার। সেই অন্ধকারে একদলা জমাট অন্ধকার চিৎকার করতে করতে সোনাঝোরার সাঁকোর ওপর দিয়ে ছুটে আসছে তার দিকে।

    মেয়ে কাছে আসতেই ওর হাত চেপে ধরল দেবচরণ। হাঁফাচ্ছে কুমারী, ভয়ে মুখ বিবর্ণ। মেয়েকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে এল দেবচরণ। মেয়ের গাল, দু-হাত ঠাণ্ডা বরফ। তুলসী তাড়াতাড়ি ওকে কম্বলে ঢেকে জড়িয়ে বসল। কুমারী হাঁটুতে মাথা গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল— ‘বাবা, এরকম কেন হয়?’

    ‘ভয় পাস না, সকাল হোক, আমি দেখছি কী করা যায়,’ দেবচরণ দরজার কবাট দিল।

    ‘ভারারা ঠাকুর আর তারপর ঘরগুরুবা, সবাই এসে তো অনেক ঝাড়ফুঁক করল,’ তুলসী নিরাশ। ‘কিছুই তো হল না।’

    ‘এবার বড়া সিপার গুরুবার কাছে যাব। উনি অব্যর্থ সব দাওয়াই দেন,’ বৌকে আশ্বাস দিল দেবচরণ। ‘একটা উপায় বের হবেই।’

    মায়ের বেষ্টনীতে মেয়ের শরীরে উষ্ণতা ফিরে এল। বিছানায় পা মুড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল কুমারী। মেয়েকে জড়িয়ে তুলসী পাশে শুল। দেবচরণ জানে তার মত তুলসীও আর বাকি রাতটুকু ঘুমোবে না।

    পাহাড়ি নদী সোনাঝোরার পুব পাড়ে তরাইয়ের পাহাড়ি গ্রাম সোনাভূম। কুড়ি ঘর থারুর বাস। বর্ষায় সোনাঝোরার দাপাদাপি দেখলে বিশ্বাসই হয় না এই দুরন্ত নদী শীতকালে তার সমস্ত উচ্ছ্বল জলরাশি হারিয়ে শুধুই বালুময় শরীরে রূপান্তরিত হয়। আর সেই নুড়ি-বালুকার শীর্ণ খাতের মধ্যে জলধারা যেন বৃদ্ধার শীর্ণ হাতের এদিক ওদিকে জেগে ওঠা শিরার আঁকাবাঁকা আলপনা। কে কোনকালে এই নদীর বালুতে সোনার গুঁড়ো পেয়েছে তা কেউ জানেনা, কিন্তু নদীর নাম হয়ে গেছে সোনাঝোরা। সেই গল্পকথা বিশ্বাস করত গ্রামের অনেকেই, তাই শীতের সময় থেকে বর্ষায় পাহাড়ে ঢল নামার আগে পর্যন্ত নদীর বুকে অনেকেই বালু ছেঁকে চলত যদি কপাল খোলে। সোনা কখনো পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু এভাবে খুঁড়তে খুঁড়তে একদিন হঠাৎ সোনাঝোরার উঁচু পাড়ে উন্মোচিত হল কাঁচা-কয়লার হালকা স্তর। ব্যাস, গাঁ শুদ্ধু সকলে লেগে পড়ল জায়গায় জায়গায় পাড় খুঁড়ে কয়লা বের করতে। পাহাড়ি বানিয়ারা থারুদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দামে আর ওজনে ঠকিয়ে যেত, সুযোগ দেখে গাঁয়ের মাহাতো নিচের উদ্ভবপুর বাজারের ঠিকাদারের সঙ্গে দরদাম ঠিক করে এল। তারপর থেকে গাঁয়ের লোকেরা মাহাতোকে কয়লা বেচে ডোকো প্রতি দাম পেত, আর সপ্তাহের শেষে ঠিকাদারের লোক এসে কয়লা নিয়ে যেত মাহাতোর কাছ থেকে। দেবচরণ প্রথম প্রথম বারণ করেছিল – মা’র গভভো এভাবে খুঁড়িস না, অভিশাপ লাগবে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। সকলেই দু’পয়সা বানাচ্ছে, তাই শেষমেশ দেবচরণও বাপ-পিতামহের কুমোরের চাক ফেলে নেমে পড়ল কূর্মী-শাবল হাতে কয়লা খুঁড়তে। পয়সার বড় লোভ। ফলে গাঁয়ের নিচে ইদিক-উদিকে সুড়ঙ্গ জেগে উঠতে লাগল। বর্ষায় বড় ভয় হত দেবচরণের, বাড়ির গা ঘেঁষে বইছে দামাল সোনাঝোরা, সুড়ঙ্গে জল ঢুকে ধাক্কা মারছে, বাড়ি ধসে নদীতে ভেসে না যায়।

    বৃদ্ধ বড়া সিপার গুরুবাকে লোকে বলে ত্রিকালদর্শী তান্ত্রিক। জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের গুহার ভিতর পুণ্যগিরির মন্দিরে থাকে। তান্ত্রিক প্রতি রোববার সকালে গুহার মুখে ছাইমাখা গায়ে বেরিয়ে এসে বসে, লোকের দুঃখ কষ্টের কথা শোনে, ওষুধ-তাবিজ-মাদুলি দেয়। সপ্তাহের শেষে দেবচরণ গেল পশ্চিমের দু’গ্রাম ছাড়িয়ে একমানুষ উঁচু ঘাসবনের জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়-গুহায়। বড়া সিপার গুরুবার কাছে লোকে কত কিছু নিয়ে যায়— গর্মেন্টের মদের শিশি, ঝুড়িতে আলু, পেঁয়াজ, বাঁধাকপি। দেবচরণের অত সাধ্য কোথায়? দেবচরণ নিয়ে গেল তার নিজের হাতে বানানো একটা সিঁদুর রঙা কলসী, তাতে কোদো ভরে দিল, বড়া সিপার গুরুবার সঙ্গে খালি হাতে দেখা করতে কেউ যেতে পারে?

    বড়া সিপার গুরুবা সব শুনে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘কোনও দেবতার মানত অপূৰ্ণ আছে?

    ‘নাতো!’ দেবচরণ বলল।

    ‘কী নাম মেয়ের? কত বয়স?’

    ‘কুমারী,’ দেবচরণ তারপর ভাল নাম বলল। ‘রাজকুমারী, তেরো হয়েছে।

    ‘চুড়েলের নজর লেগেছে।’

    ‘কিছু একটা উপায় বলুন ঠাকুর,’ দেবচরণ জোড়হাতে মিনতি করল।

    ‘কাজটা খুব কঠিন, তোর মেয়েকে নিজের হাতে চুড়েলকে বলি দিতে হবে। সামনের মঙ্গলবার অমাবস্যা, তোর বাড়িতে ‘পাটি বৈঠনা’ কর, আমি আসব।’

    দেবচরণের মনে যুগপৎ আনন্দ ও দুশ্চিন্তা। বড়া সিপার গুরুবা নিজে আসবে! কিন্তু অত বড় আয়োজনের অর্থ কোথায়?

    ‘একটা বনমোরগ আনবি। আমি মন্ত্র পড়ে অপদেবতাকে তোর মেয়ের শরীর থেকে বের করে বনমোরগের শরীরে ঢুকিয়ে দেব। তোর মেয়ে নিজের হাতে সেই মোরগের গলা কাটলে অপদেবতার হাত থেকে মুক্তি।’

    দেবচরণ বাড়ি ফিরে তুলসীকে সব বলল। তুলসীর গলার মঙ্গলসূত্রে এক চিলতে সোনা লাগানো ছিল, তুলসী মঙ্গলসূত্র থেকে সেই সোনা খুলে দেবচরণের হাতের মুঠোয় দিয়ে বলল, ‘আমাদের কাছে মেয়ে সব কিছুর চেয়ে দামি।

    অমাবস্যার আগে দেবচরণ পাহাড় জঙ্গল পেরিয়ে গঞ্জে গিয়ে সোনা জমা রেখে নিয়ে এল বলির জন্য মোরগ, আর ফর্দ দেখে পুজোর আর যজ্ঞের সামগ্রী— আতপচাল, ঘি, গুড়, ধূপ, কাঠ, মধু, কাপড়, তেল।

    মঙ্গলবার বড়া সিপার গুরুবা এল, পরনে কৌপীন, গায়ে নামাবলী, হাতে কমণ্ডলু। বড়া সিপার গুরুবার আশীর্বাদ নিতে গ্রামের অনেকেই দেবচরণের

    উঠোনে ভিড় করল। উঠোনে যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে পুজোয় বসল তান্ত্রিক। কিছুক্ষণ পর রাজকুমারীর ডাক পড়ল। তার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে তান্ত্রিক রাজকুমারীকে বলল কিছু চাল তুলে দিতে। রাজকুমারীর থেকে চাল ডান হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে বড়া সিপার গুরুবা বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল, আর বাঁ হাতে একটা জ্বলন্ত প্রদীপ নিয়ে রাজকুমারীর শরীরের সামনে দোলাতে লাগল, এভাবে নাকি ভূত, প্রেত, বা অনিষ্টকারী আত্মাটা কে তা বোঝা যায়। যদি কোনও দেব-দেবী অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে তাও বোঝা যায়। রাজকুমারী চুপচাপ সমস্ত পুজো বসে বসে দেখল। তারপর ঝুড়ি চাপা বনমোরগটাকে তুলে আনা হল যজ্ঞের আগুনের সামনে। বড়া সিপার গুরুবা ডান হাত রাজকুমারীর মাথায় আর বাঁ হাত মোরগের গলায় শক্ত করে ধরে অনেকক্ষণ ধরে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে হুংকার দিয়ে বলল, ‘এবার ধর এর গলা, কেটে ফেল তোর ওপর ভর করা চুড়েলকে ।

    রাজকুমারী একহাতে দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে মোরগের গলা ধরল, অন্যহাতে তান্ত্রিক একটা ভোজালি ধরিয়ে দিয়ে বলল— ‘একদম দেরি করিস না। এই পাথরে গলাটা কাট।’

    রাজকুমারীর একদম সায় ছিল না। যেই না পাথরে মোরগের গলা চেপে ধরেছে, অমনি মোরগ এমন চিৎকার করে ঝটপট করতে লাগল যে বাচ্চা মেয়ের শীর্ণ হাতের মুঠো খুলে গেল। আর মোরগ উড়ে-লাফিয়ে-ছুটে পুজোর ঘট উলটে, চালের থালা, কোষাকুষি ছিটকে চিৎকার করতে করতে বাইরের বনমেথি— রামতুলসীর ঝোপঝাড়ে ঢুকে গেল। দেবচরণ মরিয়া হয়ে পিছন পিছন ছুটল। অল্পক্ষণ পর দেবচরণ ফিরে এল, হাত খালি।

    ‘ঘোর অমঙ্গল,’ বড়া সিপার গুরুবা গম্ভীর মন্তব্য করল। তারপর বড়া সিপার গুরুবা হাতে কুশ ও দূর্বা নিয়ে মন্ত্র পড়তে পড়তে দেবচরণের কুটিরের চারদিকে মন্ত্রপূতঃ জল ছিটোতে লাগল। প্রদক্ষিণ সেরে ফিরে এসে বড়া সিপার গুরুবা চিন্তিত মুখে বলল ‘তোদের ঘরে অপদেবতা এবার রেগে আঘাত হানবার চেষ্টা করবে। সাবধানে থাকিস। দেখি হাতটা—’ বড়া সিপার গুরুবা রাজকুমারীর বাঁ হাতের রেখা পড়তে শুরু করল। তান্ত্রিকের কপালে সারি সারি রেখা এসে জড়ো হল।

    ‘কী হল গুরুবা?’ দেবচরণ বুঝল কিছু গুরুতর ব্যাপার।

    বড়া সিপার গুরুবা বলল, ‘এ মেয়ে তোদের কোথাও থিতু হতে দেবে না। আর দেরি করিস না, এর জন্য পাত্র খোঁজ, একে বিদেয় দে, না হলে তোদের কপালেও অনেক দুর্ভোগ। তবে এর পতির সংস্পর্শ এর অনেক বিপদ কাটিয়ে দেবে।’

    ‘একটা উপায় করুন ঠাকুর,’ দেবচরণ হাতজোড় করে কাতর গলায় বলল৷ বড়া সিপার গুরুবা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে ভাবল। তারপর বলল, ‘সামনের অমাবস্যায় মঙ্গলবার আমার গুহায় মেয়েকে নিয়ে আয়। আমি পুণ্যগিরির পুজো করে রাখব। পুণ্যগিরির থানে মেয়ের হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের থেকে তিন ফোঁটা রক্ত লেপে দিবি। অপদেবতার অপচ্ছায়া দূরে চলে যাবে। না হলে এই অপদেবতা তোর মেয়ের বংশের কারুকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। সকলের কপালে দুর্ভোগ, অসম্মান লেপে তোদের একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে। মেয়েকে এই ক’টা দিন খুব সাবধানে রাখবি।’

    ঠাকুর, মেয়ের শরীরে তো আমার রক্ত বইছে, আমি গিয়ে রক্ত দিলে চলবে না?’ দেবচরণ মেয়েকে বাইরে অতদূরে নিয়ে যেতে চাইছে না, কে জানে যাওয়ার পথে চুড়েল কোনও ক্ষতি না করে বসে।

    ‘পূর্বপুরুষের ঋণ বংশধরকে চোকাতে হয়। তোকে দানোয় ধরলে তোর বদলে তোর পুত্রকন্যার রক্ত চলবে, কিন্তু পুত্রকন্যার দানো দূর করতে বাপমায়ের রক্ত চলবে না। মেয়েকে নিয়ে আসিস।’

    প্রথা অনুযায়ী এক টাকা, চাল, মদ, তেল, কাপড় নিয়ে বড়া সিপার গুরুবা চলে গেল। তুলসী দেবচরণকে বলল তাকে গ্রামের অন্য বৌরা বলেছে জঙ্গলে পাহাড়ী আত্মা পার্বতীয়ার থান, বহু পুরোনো মন্দির, খুব নাকি জাগ্রত। ওখানে পুজো দিলে নাকি মেয়েদের বিয়ে খুব শিগগিরই হয়ে যায়। স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে দেবচরণ পরদিন গেল দেবতার থানে, কিন্তু রাজকুমারীর পাত্র খোঁজা সহজ ব্যাপার হল না। সাধারণতঃ থারুরা নিজেদের গ্রামের বাইরে বিয়ে দিতে চায় না। কিন্তু দেবচরণ কুমহালের গ্রাম খুবই ছোট, মাত্র কুড়ি ঘরের বসতি। চিতওয়ানিয়া, কাঠারিয়া, ডাংগৌরা, কোচিলা, মেচরা থারুদের বিরাদারির, তাদের ঘরে মেয়েকে পাঠাতেও দেবচরণের আপত্তি নেই, কিন্তু পাহাড়ে দ্রুত খবর ছড়ায়। চুড়েলের অপচ্ছায়া যার মাথায় সেই মেয়েকে বিয়ে করতে সাহস করে কেউ এগিয়ে এল না। জীবিকার জন্য কোনও কোনও থারু নেপাল ছাড়িয়ে ভারতের চাম্পারণ, বস্তি, গোরখপুর, নৈনিতালে ছড়িয়ে গেছে, কিন্তু দেবচরণ অসুস্থ মেয়েকে অত দূরে পাঠাতে চায় না। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও রাজকুমারীর পাত্র পাওয়া গেল না। এদিকে রাজকুমারীর অসুখ দিন দিন বাড়তে লাগল। ঘুমের মধ্যে অজান্তে রাত-বিরেতে আচম্বিতে উঠে জঙ্গলে ছুটে যাওয়া সামলানো মুস্কিল হয়ে পড়ল।

    পাশের সিটের চাইনীজ ছেলেটার আদব কায়দা দেখে রিধিমার প্রথমে ওকে জাঙ্কি মনে হয়েছিল, কিন্তু বাস চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর রিধিমা বুঝল ছেলেটা এখন উইথড্রয়াল প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ছেলেটা খ্যাস-খ্যাস করে গাল চুলকোতে লাগল, তারপর হঠাৎ হঠাৎ দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বকতে লাগল, আবার বসে পড়ে যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে মাথার চুল টানতে লাগল, আবার কখনো নিজের থাইয়ের ওপর চাটি মারতে লাগল। রিধিমা প্রথমে ভয় পেয়ে সিটের হাতল ধরে অন্যদিকে কুঁকড়ে বসল, বাঁ দিকে একটা কৃষ্ণাঙ্গ যুবক সেলফোনের ইয়ারবাডস কানে গুঁজে এত জোর ভল্যুমে Jay-Z’র র‍্যাপ শুনছে যে রিধিমা ওর যে বিট ঝমঝম করে বাজছে সেটা শুনতে পাচ্ছে। ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে তালে তালে নিজেও কন্টিনিউয়াস বিড়বিড় করে বিট বক্সিং করে যাচ্ছে, আর যখন ফোর লেটার ওয়ার্ডটা আসছে তখন একটু জোরে ‘ফা—’ বলে আবার ধীরে— উইথ মি, ইউ নো আই গট ইট বলে রিপিট করে চলেছে। অস্বস্তি লাগছে রিধিমার— দাদা একশ কুড়ি বছরের বেশি আগেকার তরাইয়ের জঙ্গলের থারুদের কথা কেন লিখেছে? কে এই দেবচরণ? কৌতূহলে রিধিমা আবার ডায়েরির পাতায় ফিরে গেল—

    গত এক সপ্তাহ ধরে অঝোর অকালবর্ষণে সোনাঝোরায় হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। এই বৃষ্টি কিন্তু সোনাভূমের থারুদের উৎসাহ একটুও কমাতে পারেনি। আজ বাবুলালের ছেলের ছঠি। দীর্ঘ সাতবছর ধরে ভূমসেনের থানের পিপুল গাছে অনেক সুতো বেঁধে, অনেক পুজো-আচ্চা-মানত করে তবে ওর বৌ এর কোলে এসেছে এই পুত্র। শিশু জন্মাবার ছ’দিন পর এই শুদ্ধিকরণ অনুষ্ঠান। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সকালে গ্রামের পূর্ব প্রান্তে ভূমসেনের মন্দিরে ভারারা পুজো করল। তারপর দুপুরে গ্রামশুদ্ধু লোকের বাবুলালের বাড়িতে খাবার নিমন্ত্রণ। বাবুলাল উদ্ভবপুরে কাঠের মিস্ত্রির কাজ করে দু’পয়সা বানিয়েছে, জামা-প্যান্টুলন পরে, গ্রামশুদ্ধ লোককে বলে বেরিয়েছে একাশি টাকা খরচা করছে বাচ্চার ছঠিতে। পঞ্চাশ টাকা শুধু মদে। নাচাকাইয়াও এনেছে। বাবুলালের বাড়ির সামনে বড় চাঁদোয়া টাঙানো হয়েছে, পাঁঠা কাটা হয়েছে, নুনিয়া চালের ভাত, ডাল, ফারা, মাছ ছাকানা-গরিব গ্রামবাসীরা কতদিন এত ভাল খাবার চোখে দেখেনি। তাই আজ পুরুষ মানুষেরা ল্যাঙোটের ওপরে ছ’গজের সাদা কাছা জড়িয়েছে, মেয়েরা বাড়িতে যা যা গহনা-ল্যাহেঙ্গা-ঝুমকো সব আছে তাতে সেজেছে। ভিড় বাড়ছে বাবুলালের বাড়িতে।

    রাজকুমারীকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। মা’র কানের ঝুমকো পরেছে, উদ্ভবপুরের পুণ্যগিরির মেলা থেকে দেবচরণ যে কালো-লাল চোলি-ঘাঘারিয়া কিনে দিয়েছিল সেটা পরেছে, কপালে বিন্দিয়া লাগিয়েছে। তুলসীও চোলি ল্যাহেঙ্গা-উড়ানিয়ায় খুব সেজেছে, মাথায় ঘুঙ্ঘট, কানে তারপুটিয়া, গলায় তামার হাঁসুলি, কবজিতে খাড়ুয়া, নাকে নাথুনি। দেবচরণও কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকেছে সাদা থানে, ফতুয়ার সঙ্গে মাথায় ঢাউস একটা পাগড়ি পরেছে। তিনজনে বাঁশের টোকো মাথায় খুব দ্রুত হেঁটে বাবুলালের বাড়িতে পৌঁছাল। বাবুলালের বৌএর কোলে ওর ছেলে। নজর যাতে না লাগে সেজন্য ছেলের কপালের পাশে কালো কাজলের টিপ। তুলসী পাঁচসিকে দিল বাবুলালের বৌয়ের হাতে। কোলের শিশু রাজকুমারীকে দেখে একগাল হাসল। রাজকুমারী আদর করে শিশুর গালে হাত বুলিয়ে দিতেই বিপত্তি।

    ‘দাঁড়া!’ বাবুলাল কাছে এগিয়ে এল, চোখ ঘোলাটে, কথা জড়ানো।

    থমকে গেল রাজকুমারী।

    ‘আমি চাইনা আমার এই ছেলের ওপর কোনও চুড়েলের নজর লাগুক।’

    ‘চুড়েল?’ দেবচরণ প্রতিবাদ করে উঠল।

    ‘হ্যাঁ, গ্রামের সবাই শুনেছে বড়া সিপার গুরুবা কী বলে গেছে,’ বাবুলাল বলল। ‘তোর মেয়েকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে যা।’

    অপমানে দেবচরণের কান ঝাঁ-ঝাঁ করতে লাগল। গ্রামশুদ্ধু লোকের সামনে এ কী অপমান! তুলসীর মুখ পাংশু, রাজকুমারী কাঁদোকাঁদো। দেবচরণ চারদিকে তাকাল, কেউ দেবচরণের হয়ে কথা বলতে এগিয়ে এল না। দেবচরণ রেগেমেগে তেড়ে গেল বাবুলালের দিকে ‘তোর এত বড় সাহস! আমার মেয়ের নামে এই কুকথা বললি?’ তুলসী দেবচরণকে জোর করে সামলাল। দেবচরণ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘বাড়ি চল। এস্থানে থাকাও পাপ।’

    বাড়ি ফেরার সময় রাজকুমারী কাঁদতে লাগল। সারা রাস্তা দেবচরণ গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরল। এই মেয়ে ওর বুকের পাঁজর। তাকে এতবড় অপমান করল? দেবচরণ মেয়েকে আশ্বাস দিল— ‘সামনের পুণ্যগিরির মেলায় মাংস আর নুনিয়া ভাত খাব আমরা।’

    রাজকুমারী কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা, আমি কি সত্যিই চুড়েল?’

    দেবচরণ বৃষ্টির মধ্যে মেয়েকে নিজের টোকোতে কাছে টেনে নিল, ‘আমি বিশ্বাস করি না। অমাবস্যায় তো আমরা যাচ্ছিই বড়া সিপার গুরুবার গুহায়। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।’

    রাতে বৃষ্টি প্রবল আকার ধারণ করল। বাঁশের চোঙে জাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে বারবার আক্ষেপ করতে করতে বলতে লাগল দেবচরণ— মিত না ছুটাই, চাহে ছুটাই সাগো ভাই— গ্রামের দিলাবাররা এত বড় অপমান করল? দুঃখ ভুলতে নেশাটা আজ একটু বেশিই হয়ে গেছিল, তাই ঘুম এত গভীর হয়েছিল যে রাজকুমারী রাতের অন্ধকারে কখন এই বৃষ্টিতেও বাইরে বেরিয়ে গেছে সে টেরই পায়নি। ঘুম ভাঙল তুলসীর আর্তনাদে। রাজকুমারী বিছানায় নেই। পড়িমরি করে দু’জনে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরের বৃষ্টির মধ্যে ধাপজমিতে তামাক ক্ষেতের কিনারে কানলা দিয়ে সম্মোহিত মানুষের মত হেঁটে চলেছে রাজকুমারী। দেবচরণ আর তুলসী তিতাপাতি, সিমুর ঝোপের ভিতর দিয়ে ছুটে গেল মেয়ের দিকে, আর তখনই ঘটনাটা ঘটল। প্রবল বর্ষণের মধ্যে পায়ের দুপাশে মাটি ঘনঘন কেঁপে উঠল, মহী-মেদিনী সব এলোমেলো হয়ে গেল। পিছনে মড়মড় করে সব ভেঙে পড়ার শব্দ। পিছন ফিরে তাকাল দেবচরণ। সোনাঝোরার তীরের বাড়িগুলো ধসে নামছে নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে বালি, কাদা, কয়লামাখা ভারাই, কাশ, বাঁশ, দরমা কুণ্ডলী পাকিয়ে জলস্রোতের সঙ্গে প্রকৃতির টানে অনেক নিচে ছুটে গেল, আর সঙ্গে নিয়ে গেল কিছু অভাগা মানুষজনকে। তাদের মধ্যে দু-চারজন যারা ছিটকে বেরিয়ে আসতে পারল তারা প্রাণে বেঁচে গিয়ে চেঁচামেচি আর্তনাদ শুরু করল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দেবচরণ দেখল ওর চালা বাড়ির মাঝের মোটা বাঁশের ধুরী কাশের চালা ফুঁড়ে নদীর দিকে হেলে গেল আর কিছু বুঝবার আগেই ওর চালাঘর মুখ থুবড়ে পড়ল সোনাঝোরায়। ভয়ে শিউরে উঠে মেয়ের হাত শক্ত করে ধরল দেবচরণ— মেয়ে যদি ওদের বাইরে না আনত তাহলে ওরা এতক্ষণে ধসের সঙ্গে নিচে তলিয়ে যেত।

    প্রবল বর্ষণের মধ্যে অন্যান্য গ্রামবাসীরা বেরিয়ে এসেছে। সকলে এই ভয়ানক ধসের দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত। নদীর পাড়ে বসে বাবুলাল ছুতোর চিৎকার করে কাঁদছে, ওর বৌকে আর শিশুপুত্রকে ধসে খেয়েছে। ও নদীর পাড় ধরে নিচে নামার চেষ্টা করল, গ্রামবাসীরা ওকে আটকে রাখল। বাবুলাল যখন সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও নিচে যেতে সক্ষম হল না তখন কপাল চাপড়ে কাঁদতে লাগল। ছুতোরপট্টির আরও চার-পাঁচজন গ্রামবাসী বাবুলালের মত কপাল চাপড়াচ্ছে, তাদেরও ঘরবাড়ি নিচে ধসে গেছে। দু’জন ঘাসুড়ের সঙ্গে গ্রামপ্রধান মাহাতো হাজির হল। সব দেখে মাহাতো বুঝে গেল নদীর পাড়ের কয়লা-কাটা সুড়ঙ্গগুলোর ওপরের জমিই ধসে গেছে। মাহাতো তাড়াতাড়ি চেঁচিয়ে বলে উঠল গোটা গ্রামের ওপর চুড়েলের দৃষ্টি পড়েছে।’

    দেবচরণ বলল, ‘ভাগ্যিস আমার মেয়ে অন্ধকারে ঘুমের মধ্যে বাইরে বেরিয়ে গেছিল, তাই আমরা রক্ষা পেয়েছি—’

    ‘তোর মেয়ের জন্যই চুড়েল এসেছে এই সোনাভূমে। সঙ্গে এনেছে মারণ ধস,’ মাহাতোর মুখে মদের যবপচা গন্ধ। ‘বড়া সিপার গুরুবা বলে গেছে তোর মেয়ের ওপর চুড়েল ভর করে,’ মাহাতো বলল।

    ‘একি অলক্ষুণে কথা?’ দেবচরণের মাথায় বজ্রাঘাত। আমার মেয়েকে দোষ কেন দিচ্ছ? আমি বারণ করেছিলাম নদীর পাড়ে কয়লার সুড়ঙ্গ খুঁড়ো না। তখন তোমরা পয়সার লোভে—’

    ‘বাজে কথা বলিস না,’ মাহাতো ধমক লাগালো। ‘তোর মেয়েকে এক্ষুনি এ গ্রাম থেকে সরিয়ে দে। নাহলে আমাদের ক্ষতি হতেই থাকবে।

    ‘আপনারা কী বলছেন যা তা?’

    এবার বাবুলাল এগিয়ে এল, ওর চোখের দৃষ্টিতে ক্রোধ— ‘তোরা দুপুরের প্রতিশোধ নিলি?’

    ‘আমরা প্রতিশোধ নেব কেন?’

    ‘চুড়েলের অপমানের রোষ। তোরা এক্ষুনি গ্রাম ছেড়ে চলে যা, নতুবা তোর মেয়েকে পুড়িয়ে মারব,’ বাবুলাল হিংস্রকন্ঠে বলল। সঙ্গে সঙ্গে নিচের বস্তির সকলে যারা সন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত অঞ্জলি ভরে জল খাওয়ার মত মদ খেয়েছে বাবুলালের বাড়িতে, তারা আর কিছু না হোক বাবুলালের প্রতি কৃতজ্ঞতায় হৈ হৈ করে উঠে বাবুলালকে সমর্থন করল— ‘চুড়েল দূর হোক।’

    ‘সবাই শান্ত হও,’ মাহাতো গ্রামবাসীদের শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু হতাশা মানুষের মনে এত ক্রোধের সৃষ্টি করেছে যে কেউ মাহাতোর কথা কানে নিল না। ‘চুড়েলকে আগুনে পোড়াও,’ গ্রামবাসীদের চিৎকার বর্ষণের শব্দ ছাপিয়ে গেল।

    মাহাতো এবার দেবচরণকে বলল, ‘আমি এদের সামলাতে পারব না দেবচরণ। ওদের পরিবার ভেসে গেছে। ভাল খারাপ কিছু হয়ে যাবে, তুই তোর মেয়েকে নিয়ে এক্ষুণি গ্রাম ছেড়ে চলে যা—’

    ‘গ্রাম ছেড়ে কোথায় যাব?’ দেবচরণ বলল। ‘এই গ্রামই আমার মা।’

    কেউ সহানুভূতি দেখাতে এগিয়ে এল না। মেয়ের দিকে তাকাল দেবচরণ। রাজকুমারী তুলসীর হাত আঁকড়ে ধরে ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। এই মানুষগুলোকে এতদিন সে আপনার বলে জেনেছে। এখন এরাই রাজকুমারীকে পুড়িয়ে মারার ধমকি দিচ্ছে? মেয়ের হাত শক্ত করে ধরল দেবচরণ। বাবুলালদের দৃষ্টি মোটেই সুবিধের নয়, রাগে হতাশায় উন্মাদ হয়ে গেছে ওরা। রাজকুমারীর ক্ষতি করে বসতে পারে। আর দেরি না করে মেয়ের হাত ধরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে থপথপ করতে করতে দেবচরণ কুমহালে পুবের দিকে রওনা দিল। পিছনে পিছনে চলল তুলসী। দেবচরণ জানেনা এত রাতে তারা কোথায় আশ্রয় পাবে।

    মাথায় ঝরছে অঝোর বর্ষণ। তিনজনে ভিজে চুবুচুবু হয়ে কাঁপতে কাঁপতে একবস্ত্রে গ্রাম ছাড়ল।

    ‘কোথায় যাব আমরা এখন?’ তুলসী আতঙ্কিত।

    ‘জানিনে,’ দেবচরণ বলল। ‘হাঁটতে থাক।’

    গাঁয়ের পুব সীমানায় ভূমসেনের মন্দির। তারপর অনেকটা খালি মাঠের পর পথ পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠে গেছে। মাঠের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে নজর এল মাঠের সীমান্তে খড়ের ছাউনির আবছায়া। তুলসী তাকাল দেবচরণের দিকে— ‘ছাওপড়ি?’

    ‘চল ওখানে।’

    ‘পাপ লাগবে না?’

    মাথায় বাজ পড়ার থেকে তো বাঁচি আগে।’

    খড়ের ছাউনি দেওয়া কাঠের দরমার খুপরি, গ্রামের বাইরে একদম নির্জন স্থানে ছাওপড়ি। নেপালের অনেক গ্রামে ঋতুস্রাবের সময় মেয়েদের বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয় না। গ্রামবাসীদের কাছে মেয়েদের ঋতুস্রাব এক অশুদ্ধ ব্যাপার। তখন মেয়েদের গ্রামের পাতকুয়ো বা নদীর ঘাট ব্যবহার করা নিষেধ, পুরুষদের ছায়া মাড়ালে পুরুষদের অমঙ্গল হয়, এমন কি এসময় গাছকে ছুঁলে সেই গাছ নাকি বন্ধ্যা হয়ে যায়। সেই ক’দিন মেয়েরা গ্রাম থেকে দূরের এইসব খড়ের ছাউনির ছাওপড়িতে আশ্রয় নেয়। তুলসী দরজায় ধাক্কা দিল— ‘দরজা খোলো, ভিতরে আসতে দাও।’

    দরজা খুলল। কুপির কম্পমান আলো হাতে গাঁয়েরই একজন খুবই অল্পবয়সি থারু মেয়ে। মেয়েটি সদ্য বোধহয় বয়ঃসন্ধির চৌকাঠ পেরিয়েছে। সে দেবচরণকে দেখে চমকে উঠল। তুলসীকে বলল, ‘কী হয়েছে?’

    ‘গাঁয়ে অনেকের ঘরবাড়ি ভূকম্পে সোনাঝোরায় তলিয়ে গেছে।’

    ‘ছাওপড়ি খুব জোরে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল,’ মেয়েটা বলল। ‘আমি ভয়ে জেগে উঠে ভূমসেনের নাম জপছিলাম। তোমাদের গলার আওয়াজ শুনে ভাবলাম আমার বাড়ির লোকেরা এসেছে আমায় নিয়ে যেতে।’

    মাহাতো বলেছে আমার মেয়ের ওপর চুড়েল ভর করেছে, এই ভূকম্প তারই কাজ। আমাদের গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছে,’ দেবচরণ হাতজোড় করল। মা, আমাদের রাতের আশ্রয় দাও।’

    ‘তোমার অমঙ্গল হবে না?’

    ‘ভূমসেনের সপ্তদেবী জানেন। আমি তাদের ওপর সব ছেড়ে রেখেছি।’

    ‘ভিতরে এসো,’ মেয়েটি হাতের তালুতে কুপির কম্পমান শিখা আড়াল করল।

    তিনজনে ভিতরে ঢুকল। মেয়েটি একটা লুঙ্গি আর চোলি দিয়ে বলল, ‘শুধু এটাই আছে। এখানে তো কাপড়চোপড় আনা যায় না।’ দেবচরণ উনুনে ইন্ধন দিয়ে আগুন জ্বালালো। নিজের ভেজা ফতুয়া দিয়ে তিনজনে গা মাথা মুছে ফতুয়া নিংড়াবার জন্য দরজা খুলতেই বাইরের বৃষ্টির ছাঁটের ভেজা হাওয়া ঘরে ঢুকে শরীর কাঁপিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করল দেবচরণ। তারপর ভেজা পোশাক আগুনের উপরের দড়িতে টাঙিয়ে নিজেরা আগুনের তাপ শেঁকে শরীর গরম করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি চটের ছালা পেতে বলল, ‘শুয়ে পড়। কিন্তু কাল মুর্গা বোলের আগেই তোমরা চলে যাবে। নয়তো আমাকে এরা গাঁয়ে আর ঢুকতে দেবে না।’

    আকাশে ভোরের আলোর ছিটা লাগার আগেই বাস্তুহারা দেবচরণ থারু, তুলসী আর রাজকুমারী তৈরি হয়ে নিল। বৃষ্টি নেই। মেয়েটা তুলসীকে বাইরে ডেকে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। তুলসী তাড়াতাড়ি ছাওপড়ির পিছনের মাঠে নেমে পড়ল। মাঠের জমি অনুর্বর তাই কেউ চাষ করেনা, আগাছা— ঝোপঝাড়ে ভর্তি— তিতাপাতি, রামতুলসী, বাথুয়া, ঘেউকুমারী— তুলসী ঝোপঝাড়ে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে কয়েকটা উলটা ছিরছিরির গোটা ডাল উপড়ে আনল। ‘এগুলো বেঁটে খেলেই হবে।’ দেবচরণ জানে মেয়েটা অনভিজ্ঞ, আর কয়েকবছর পর নিজেই শিখে যাবে অত্যধিক ঋতুস্রাব হলে কী করতে হয়।

    পাহাড়ের মাথা কুয়াশায় ঢেকে আছে। তুলসী বলল, ‘কোথায় যাবে?’

    ‘পুবের দিকে দেখি কোথায় আশ্রয় মেলে,’ দেবচরণ বলল।

    মেয়েটি কুথালা থেকে বের করল বালুতে ভাজা মকাই, বের করল একডেলা গুড়। একটা ছেঁড়া কাপড়ে বেঁধে দিয়ে বলল, ‘পথে খেও। বারান্দা থেকে তুলে নিও কাঠের খড়্গাভূত আর পাঁচুয়ার মূর্তি। সবসময় কাছে রেখো। বিপদ থেকে বাঁচাবে।’

    তুলসী কোমরের পটুকীতে বেঁধে নিল দেবতাদের, তারপর দেবচরণ আর রাজকুমারীর সঙ্গে পথে নামল।

    রাস্তায় নেমে রাজকুমারী বলল, ‘বাবা, আমরা চলে যাচ্ছি যে, তাহলে বড়া সিপার গুরুবার পুণ্যগিরির থানে রক্ত দেব না?’

    দেবচরণ দূরে সোনাঝোরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পশ্চিমের পথ পাহাড় ধসে নেমে নদীর জলে ভেসে গেছে। পথচলার রাস্তা তৈরি হলে ফিরে এসে রক্ত দিয়ে যাবোখন।

    মাঠের শেষে পথের বাঁ-দিকে বাকলা বাঁশের ঝাড়। ভিতরে একজোড়া ফটিকজল উত্তেজিত হয়ে চ্যাঁ-চ্যাঁ করে চেঁচাচ্ছে, হলদে-জলপাই ক্ষুদে শরীর নিয়ে পুচকে পাখিদুটো গুল্মলতা, আগাছা, ঝোপঝাড়ের ঠাসবুনোটে এদিক ওদিক লাফিয়ে চলেছে। রাজকুমারী বাঁশবনে ছুটে ঢুকতেই পাখিদুটো কালচে সবুজ ডানা মেলে উড়ে বেরিয়ে এসে উলটো দিকের তেলিয়া গর্জনের উঁচু ডালে উড়ে বসল। রাজকুমারী উত্তেজিত হয়ে বেরিয়ে এল, হাতে পাখির বাসা। পাটের সরু আঁশ, শুকনো সরু ঘাস, গাছের চিকন নরম শিকড়, মরা দূর্বাঘাস, সরু লতা, মাকড়সার জাল দিয়ে বোনা ফটিকজলের শক্ত বাসা কালকের ভূমিকম্পে মাটিতে খসে পড়েছে। দেবচরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফটিকজলগুলো থারুদের মতই, থারু যেমন নিজেদের গাঁয়ের মাটি কামড়ে এঁটুলির মত পড়ে থাকে সেরকম ফটিকজলেরা নিজের গ্রামের বাসা ছেড়ে কিছুতেই উড়ে দূরদূরান্তে গিয়ে কক্ষনো বাসা বানাবে না। বাসাটা নিজের হাতে নিল দেবচরণ, তারপর বাঁশঝাড়ের ভিতরে ঢুকল। পাখির ডিম পাড়ার সময় হয়েছে। পাখির বাসাটা পাশের শিশমের ডালের গোড়ায় তুলে আটকে দিয়ে দেখে নিল দেবচরণ, বাসাটা গাছের দোলায় নিচে পড়ে যাবে না। তারপর বেরিয়ে এসে আবার রওনা দিল। দেরি করলে চলবে না। আজ কতটা পথ যেতে হবে কে জানে।

    কিছুক্ষণ পর পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে যাওয়ার আগে সংকীর্ণ পথের উপর থেকে ওর গ্রামের দিকে ফিরে তাকাল দেবচরণ। অনেক নিচে সোনাভূম দেখা যাচ্ছে। সোনাঝোরার পাড়ে ধসের ক্ষত অনেকটা জায়গা জুড়ে, কয়লার স্তর উন্মোচিত হয়ে মনে হচ্ছে গ্রামের গায়ে যেন অজস্র কালসিটে। পুবদিকে ভূমসেনের মন্দিরের বাইরে নিম আর পিপুলগাছে টাঙানো ছোট ছোট পতাকাগুলো বাতাসে পতপত করে উড়ছে। জনমানবশূন্য মাঠে খড়ের ছাউনি দেওয়া ছাওপড়ির সামনে একলা দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে তাদের আশ্রয়দাত্রী, তার গায়ে ঊষার প্রথম কিরণের স্পর্শ। তুলসী চোখের জল মুছছে। ভূমসেনের থানের দেবীদের চরণে মনে মনে মাথা ঠেকাল দেবচরণ, একে একে – কালকা, পার্বতী, হুলকা, শীতলা, জ্বালা, পূর্বা, দুর্গা – তারপর ছাওপড়ির মানবীর দিকে বাতাসে কৃতজ্ঞতা ভাসিয়ে দিয়ে গিরিপথ ধরে এগিয়ে চলল পুবের অজানার উদ্দেশ্যে।

    সারাদিন পাহাড়ী পথে হাঁটল দেবচরণ- তুলসী-রাজকুমারী। দুপুরে পথের ধারে একটা পাথরের ওপর বসল জিরিয়ে নিতে। পাশে বাঁশের টুকরো আধাআধি করে চেরা, তার মধ্যে দিয়ে নালার জল পথে পড়ছে। তিনজনে সেখানে মকাই ভাজা খেয়ে আঁজলা ভরে জল খেয়ে আবার হাঁটতে লাগল । রাতে যতই ঠাণ্ডা হোক, দিনের বেলা চড়া রোদে পাথর তেতে উঠেছে, হাঁটতে গিয়ে পায়ের পাতা পুড়ে যাচ্ছে, হাওয়াও বইছে না, প্রকৃতি থম মেরে আছে। এত দূরে আগে কখনো আসেনি দেবচরণ। ফটিকজলের মত বাসা আঁকড়ে রয়ে গেছে। হোক দরমা-বাঁশ-মাটির চালাঘর, কিন্তু ওর মধ্যেই ছিল ওর জগৎসংসার, মন বড় খারাপ হয়ে আছে। কিন্তু অনেক দূরে যেতে হবে ওদের, যেখানে রাজকুমারীর অপদেবতার গল্প পৌঁছোতে পারে নি, সেখানে বিকালের অল্প আগে দূরের বনগাঁও নামে একটা গ্রামে পৌঁছোল সপরিবারে দেবচরণ। একটা কাজের জন্য আর আশ্রয়ের জন্য বনগাঁও গ্রামের মাহাতো চমনলালের বাড়ির দরজায় এসে হাত জোড় করে দাঁড়াল ক্ষুধার্ত দেবচরণ, তুলসী আর রাজকুমারী। আঙিনায় খাটিয়ায় বসে হুঁকোর নল মুখে দিয়ে শুরুক গুরুক করে তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মাহাতো চমনলাল দেবচরণের গ্রামের ধসে গৃহহারা হওয়ার কথা শুনতে লাগল আর রাজকুমারীর দিকে ঘন ঘন লোলুপ দৃষ্টি দিতে লাগল।

    * * *

    ফোনটা কুরুর-কুরুর করে বেজে উঠল। মোহন? ধড়মড় করে ফোনটা কানে তুলল রিধিমা।

    ‘নিউ ইয়র্কে নেমে ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে চলে এসো। ঠিকানাটা জানো?’ ‘আমি গুগল করে নেব,’ মোহনের থেকে কোনও অতিরিক্ত সাহায্য নিতে রিধিমার মন চাইছে না৷

    ‘থার্ড ইস্ট, সিক্সটি ফোর্থ স্ট্রিট, ফিফথ আর ম্যাডিসন অ্যাভিনিউর মাঝে। নেয়ারেস্ট মেট্রো স্টেশন ফিফথ অ্যাড এণ্ড ফিফটি নাইনথ স্ট্রীট।’ মোহন তারপর বলল, ‘কটা নাগাদ পৌঁছোবে?’

    ‘নিউ ইয়র্ক পৌঁছোতে পৌঁছোতে সাতটা সাড়ে সাতটা বেজে যাবে।’

    ‘কনসুলেট সাড়ে পাঁচটায় বন্ধ হয়। কেউ থাকবে না অত রাতে। স্নো-স্টমটা টোটাল সিটি লাইফকে প্যারালাইজ করে দিয়েছে। তুমি এক কাজ কর, তুমি আমাদের পার্মানেন্ট মিশনে চলে এস।’

    ‘সেটা কোথায়?’

    ‘টু থার্টি ফাইভ ইস্ট ফর্টি থার্ড স্ট্রীট। পাশের বাড়িটা হল হ্যাম্পটন বাই হিলটন হোটেল। পেন স্টেশন থেকে হাঁটা পথ টুওয়ার্ডস ইস্ট রিভার। ছাব্বিশ তলা একটা বিল্ডিং। বেলেমাটি রঙের। সিকিউরিটিকে বলা থাকবে।’

    ‘থ্যাঙ্কস মোহন। তোমার দয়া অনেক দিন মনে রাখব—’ রিধিমা ফোন রেখে দিয়ে একটা বড় শ্বাস নিল। বাইরে দু’পাশে বরফই বরফ। পাতাহীন পত্রমোচী বৃক্ষরা কঙ্কালসার গায়ে সাদা থান জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ইণ্ডিয়ান কনসুলেট ঠিক কীভাবে হেল্প করবে সে সম্বন্ধে কোনও ধারণা রিধিমার নেই। রিধিমা ক্লান্তিতে হাই তুলল। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছে। এখন আর শরীর দিচ্ছে না দেবচরণ থারুর কাহিনি পড়তে, কিন্তু রিধিমার মনে প্রশ্ন জাগছে অনেক। দাদা কেন এটা দেশের জার্নালে না ছাপিয়ে ডঃ উইকসকে দিয়েছিল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে ছাপাতে? নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। কিন্তু এই নেপালের তরাইয়ের জঙ্গলে এক শতাব্দী আগে কী ঘটেছিল যার গল্প দাদা দেশে ছাপাতে পারে নি? ডঃ উইকস এই গল্প প্রকাশ না করে লুকিয়ে রেখেছেন কেন? হ্যাণ্ডেল উইথ কেয়ার! কিসের জন্য সাবধানতা? রিধিমা চোখ টেনে ওল্টাল ডায়েরির পরের পাতা। পিছনের পাতাগুলো অনেকগুলো প্রশ্ন তুলছে মনে। রিধিমার জেট ল্যাগে ক্লান্ত শরীর আর মনের শক্তির মধ্যে টাগ-অফ-ওয়ার চলছে। চোখের পাতাগুলো অনেকক্ষণ ধরে বিদ্রোহ করছে। রিধিমা আর পারল না। ডায়েরিটা কোলে খোলা অবস্থাতেই ক্লান্ত শরীর কখন যেন ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করল। কিন্তু অবচেতনে কয়েকটা জটিল প্রশ্ন সমাধানের পথ খুঁজতে লাগল – কী ঘটেছিল নেপালের তরাইয়ের জঙ্গলে একশ বাইশ বছর আগে যা দাদা তার ডায়েরিতে গোপন করে রেখে গেছে? কে খুন করল তিনজন প্রফেসরকে? এরাই কি ওর দাদাকে খুন করে গুম করে ফেলেছে? কেন? কেন ওকে কেউ খুন করতে চায়?

    ।। আট ।।

    ব্রুকলীন, নিউ ইয়র্ক

    সানসেট পার্কে এখনো সূর্য অস্ত যায় নি, কিন্তু বাইরের রাস্তায় আজ জনমানব নেই। পঞ্চাশ বছর আগেও ব্রুকলীনের এই অঞ্চলগুলি বিশেষতঃ পাশের ডক এরিয়া ইতালিয়ান মাফিয়ার আস্তানা ছিল। ইতালির কুখ্যাত কলম্বো আর বোনাপ্পো ফ্যামিলির কাহিনি এখনো জনশ্রুতি হয়ে বেন্সনহার্স্ট, ব্রাইটন বিচ, সানসেট পার্ক কেন সারা নিউ ইয়র্ক শহরে ছড়িয়ে আছে – জুয়া, চড়া সুদের কারবার, ছিনতাই, ধনকুবের ব্যবসায়ী, ফিল্মস্টারদের কেচ্ছা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল, অপহরণ, ভাড়াটে খুন, ধর্ষণ কী না ছিল এদের উপজীবিকার পোর্টফোলিওতে। ব্রুকলীনে মেরিন টার্মিনালে একের পর এক পরিত্যক্ত গুদাম। একসময় সমুদ্র থেকে হাডসনে প্রবেশ করা জাহাজের মাল ওঠানো নামানো হত, এবং আড়ালে গুদামজাত করা হত বেআইনি অস্ত্র-শস্ত্র, ড্রাগস ইত্যাদি। কিন্তু এখন গুদামগুলোকে বুলডোজার দিয়ে ভাঙার কাজ চলছে। বড় বড় পাথর, মরচে ধরা তোবড়ানো লোহার বিম জায়গায় জায়গায় ডাঁই করা। তুষারঝড় যে বরফবমন করে গেছে তার ফাঁকে ফাঁকে লোহালক্কড় দেখা যাচ্ছে৷ দেওয়ালগুলোতে গ্রাফিটি আঁকা। পথে কোনও গাড়ি চলাচল নেই, রাস্তার বরফও পুরোপুরি পরিষ্কার করা হয় নি। এরকমই অবস্থায় অন্যান্য গুদামগুলির মত দশ নম্বর গুদামের শাটার বন্ধ। বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হলেও ভিতরে কয়েকজন মানুষ একমনে কাজে ব্যস্ত। এই মানুষেরা যে এত দুর্যোগ মাথায় নিয়ে এরকম সন্দেহজনক পরিবেশে দেশ উদ্ধারের কাজ করছে না তা বেশ বোঝাই যায়। এই দলটির অনেকেই এক সময় বোনান্নো ফ্যামিলির মাফিয়স অ্যানথনি স্পেরোর দলে ছোট বড় কাজ করত। জেলে স্পেরো মারা যাওয়ার পর এই লোকেরা সকলে কুপথের কাজকম্মোর অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনি, খুঁজছিল একটা বিপথের আশ্রয়। সেই আশ্রয় দিয়েছে এক চিনা মাফিয়স মেজর হু। সকলে ওকে মেজর বলেই ডাকে। আর মেজরের এই গুদামটি ব্যবহৃত হয় আণ্ডারওয়ার্ল্ড কাজকম্মে।

    মেজর এখন নিজের ডেস্কে উদ্বিগ্ন মুখে কারোর সঙ্গে স্পিকার ফোনে কথায় ব্যস্ত। মেজরের সামনে দেওয়াল ঘেঁষে ডেস্কে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের রুক্ষ দেখতে যে রোগা-পটকা ছেলেটা কম্পিউটারে ঝুঁকে পড়ে একজনের GPS লোকেশন খুঁজছে সে মেজরের ছেলে ডেভিড। মেজর কথা বলতে বলতে আড়চোখে তাকাল ছেলের ডেস্কটপের স্ক্রিনে। বাপকে পাত্তাই দেয় না, সব সময় যেন বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে রেখেছে। GPS লোকেশন খুঁজতে বলা হয়েছে, কিন্তু ডেভিড ডাবল অ্যারোতে কিছু একটা শপিং করছে।

    উচ্ছন্নে গেছে এই ছেলে মেরোয়ানা, হেরোয়িন, মেথ-উইডসের এনসাইক্লোপিডিয়া। কোকেন, গাঁজা, — এখন কিছুদিন হল কোবরা-কিস নিয়ে ছেলে মেতেছে। হাতের বাহুতে সেদিন ট্যাটুটা দেখেই সন্দেহ হয়েছিল মেজরের একটা ছেলের গলা জড়িয়ে ধরে একটা কোবরা ছেলেটার জিভে ছোবল দিচ্ছে।

    মেজরের মাফিয়া সাম্রাজ্য বোনান্নো-টোনান্নোর তুলনায় নস্যি, কিন্তু যা আছে তা ঠিকমত দেখাশোনা করলে ওর পরের তিন জেনারেশন খেয়েও শেষ করতে পারবে না। কিন্তু একে সামলাবে কে? এই ডেভিড? এই হতচ্ছাড়া ছেলে জিনিয়াস, কিন্তু মার্ডার সিন দেখলে যার ডেথ অ্যাংজাইটিতে সুইসাইড করতে মন চায় তার ওপর ভরসা করা যায়? অথচ মেজাজটা অত্যন্ত অভদ্র। বাপকে সম্মান জানানো তো দূর, বাপকে ফোরলেটার ওয়ার্ডের গালাগালি দিতে এতটুকু দ্বিধা করে না। ভাবে না যে এটা মেজরের চৈনিক সভ্যতায় একটা ঝটকা। এই ছেলের মাথা গরম হয়ে গেলেই এর ভোকাবুলারি নর্দমার পাঁক হয়ে ওঠে।

    বস্টন থেকে ফোনে মেজরের জন্য এক দুঃসংবাদ এসেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় মেজরের সমস্ত মুখমণ্ডল কুঞ্চিত।

    ‘কীভাবে পালালো মেয়েটা?’ মেজর ডেস্কে রাখা স্পিকার ফোনের দিকে তাকিয়ে কথা বলল।

    ‘ওর কোঅর্ডিনেটস তাড়াতাড়ি দাও।’

    ‘একটু অপেক্ষা কর।’

    ডেভিড কথোপকথন শুনছিল। এবার কাগজে খসখস করে কিছু লিখে মেজরের ডেস্কে অবহেলার সঙ্গে ফেলল। মেজরের কপালে অজস্র ভাঁজ খেলে গেল— ‘মেয়েটা এখন ইন্টারস্টেট নাইনটিতে নিউ ইয়র্ক সিটির পথে চলেছে বাসে। তার মানে বস্টন থেকে পালিয়েছে!’

    ‘বাসে? অসম্ভব!’ হিটম্যানের গলায় অবিশ্বাস। ‘আজ গ্রে-হাউণ্ড, ট্রেলওয়েজ সব বন্ধ। কারোর সঙ্গে গাড়িতে গেছে নিশ্চয়ই।’

    ‘স্যাটেলাইট মিথ্যা কথা বলবে না।’ মেজর ডেভিডের দিকে তাকাল, কিন্তু বলল স্পিকার ফোনের উদ্দেশ্য।

    ‘কতদূর গেছে?’ হিটম্যানের প্রশ্ন।

    এবার ডেভিড কথা বলল, ‘ওয়েস্টবরো পেরিয়ে গেছে। হার্ভার্ড থেকে একত্রিশ মাইল ওয়েস্টে।’

    ‘গাড়ি নিয়ে তাড়া করে রাস্তায় ধরে ফেলতে পারব,’ খুনি বলল।

    ‘তার দরকার নেই,’ মেজর বলল। ‘আমি দেখছি। গিলমোরকে পেলে?’

    ‘ও হার্ভার্ডে আসেনি৷ নিউ ইয়র্কের কোথাও লুকিয়ে আছে।’

    ‘তাহলে ফিরে এসো। আমার অন্য একটা প্ল্যান এসেছে মাথায়।’

    মেজর ফোন বন্ধ করে উল্কিওয়ালা ছেলেটাকে বলল— ‘ডেভিড—’

    ডেভিড মেজরের দিকে বিরক্ত চোখে তাকাল।

    ‘মেয়েটা নিজে গাড়ি চালিয়ে আসছে না তো?’

    ‘চল্লিশটা মোবাইল ফোন একসঙ্গে টাওয়ার কাট করতে করতে আসছে, এমন কোনও সেডান নেই যেখানে চল্লিশ জন প্যাসেঞ্জার বসতে পারে—’

    ‘তার মানে বাস?’

    ডেভিড মাথা নাড়ল।

    ‘কিন্তু গ্রে-হাউণ্ড বন্ধ বলছে।’

    চায়নাটাউন বাসকে কোনও দুর্যোগ বন্ধ করতে পারে না। আমি একবার বস্টন থেকে নিউ ইয়র্ক চায়নাটাউন বাসে এসেছিলাম। বাস ভর্তি ছারপোকা।’

    ‘ETA কত?’

    ‘এই রোড কণ্ডিশনে একশ আশি মাইল পেরিয়ে ম্যানহাটনে চায়নাটাউনের টার্মিনাসে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সাতটা মিনিমাম,’ ডেভিড ভারিক্কি চালে বলল।

    ‘ঠিক আছে বাসের নাম্বারটা বের করে জানাও। বাস চায়নাটাউনে পৌঁছোলেই মেয়েটাকে আমরা স্বাগত জানাব। কিন্তু মেয়েটা যদি নিউ ইয়র্কে বাস ঢোকার আগেই কোথাও নেমে পড়ে?’

    ‘মেয়েটার ফোন থেকে একটা আউট গোয়িং আর একটা ইনকামিং কল হয়েছে নিউ ইয়র্ক ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে। মেয়েটা ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে একবার ঢুকে গেলে কেউ ওর মাথার চুলও ছুঁতে পারবে না।’

    ‘আই সি,’ মেজর একটু ভাবল। নিজে বেবিবুমার হয়ে এই ডিজিটাল জেনারেশনের ইন্টেলিজেন্স মাপার চেষ্টা সে করেনা, ডেভিড এমন সব খবর খুঁজে বের করে যা মেজরের বোধগম্য নয়। জিগস পাজল স্টার হ্যারি পরসাদের ক্রেডিট কার্ড কোন রেঁস্তোরাতে কটার সময় গত একমাস পাঞ্চ করা হয়েছে তা বলে দিল। এদের কথা অবিশ্বাস্য লাগলেও প্রতিবারই মেজর বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে যে এরা অসম্ভব স্মার্ট। মেজর ফোন লাগাল NYPD’র কন্ট্যাক্টের নম্বরে— ‘একটা ফোর্জড অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে হবে। ইমিডিয়েট। ডিটেইল টেক্সট করছি। একটা চায়নাটাউন বাস আসছে বস্টন থেকে৷ বাসটাকে সামনে পিছনে NYPD’র দুটো স্টোলো দিয়ে এসকর্ট করে নিয়ে আসতে হবে, একটা ইণ্ডিয়ান মেয়ে ওই বাসে আসছে। ওকে অ্যারেস্ট করে সানসেট পার্কে নিয়ে আসতে হবে।’

    ফোন রেখে মেজর বলল, ‘ডেভিড, বাসের নম্বরটা বের কর। মেয়েটা যদি প্রেসের কাছে পৌঁছে যায়, জেনারেল আমার গলা কেটে ফেলবে।’

    অনেকক্ষণ ধরে ডেভিড ‘কোবরা-কিস’-এর একটা ভাল এবং রিল্যায়েবল ডিলার খুঁজছে। আগের ডিলারটাকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে দেড় মাস হয়ে গেল। এখন শরীর আনচান করছে সাপের চুম্বনের জন্য। ডিলারটার সাপের কোয়ালিটি দারুণ ছিল। জিভে ছোবল খেলেই শরীর অসাড়। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে একদম চারদিক ব্ল্যাকআউট। ঘন্টাখানেক পর ঘুম ভাঙে, তখন নেশা একদম টঙ-এ। তিন-চার সপ্তাহ সেই ঝিমুনি শরীরে থাকে, তখন আর ড্রাগস নিতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু জেনারেলের নাম শুনতেই ডেভিডের সুষুম্নায় অ্যাড্রেনালিন রাশ বয়ে গেল। ডেভিড নড়েচড়ে বসল। ডেভিড সারা পৃথিবীতে যদি একজন মানুষকে ভয় পায় তবে সে হল এই জেনারেল ঝেন। লোকটা অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্টের শো-কেস এক্সাম্পল। ডেভিড ওর কম্পিউটারে ফিরে গেল।

    জেনারেল ঝেন।

    লোকটাকে ঘেন্না করে ডেভিড। নির্মম, নির্দয় এই চাইনিজ-অস্ট্রেলিয়ান অলওয়েজ অ্যাঙ্গরি টি-রেক্স। ওর মুখের এক বিলিয়ন ডলারের বাড়া ভাতে ছাই দিলে ও যে গলা কেটে দেবে এব্যাপারে ডেভিডের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। ডেভিড কম্পিউটারের ভিতর ঢুকে গেল, আপাততঃ চায়নাটাউন বাসের নম্বরটা খুঁজে বের করতে হবে। ডেভিড মেয়েটার ছবি আবার আনল কম্পিউটার স্ক্রিনে— ‘দিজ নিউ চিক ইজ ডা বম্ব! ম্যান! সি’জ হট। কিন্তু জেনারেল কেন চেসিটাকে মারতে চায়?’

    ৷৷ নয় ৷৷

    চায়নাটাউন বাস একটা ঝাঁকুনি দিয়ে থামল, ঘুম ভেঙে গেল রিধিমার। ধড়মড় করে তাকাল চারদিকে। মড়ার মত ঘুমিয়ে ছিল সে। জেটল্যাগ। কেউ যেন তাকে কফিনে ঢুকিয়ে মাটির নিচে নামিয়ে রেখেছিল, কোনও আওয়াজ কানে আসে নি।

    হঠাৎ খেয়াল হল— ডায়েরিটা! কোলেই তো রাখা ছিল, কোথায় গেল ডায়েরিটা? হস্তদন্ত হয়ে পাশে তাকাল।

    ডায়েরিটা নিচে পায়ের পাশে পড়ে আছে। কখন ঘুমের মধ্যে বাসের ঝাঁকুনিতে খোলা ডায়েরিটা কোল থেকে নিচে পড়ে গেছে। ডায়েরিটা তুলতেই চমকে গেল রিধিমা। কানের পাশ দিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স হুটার বাজিয়ে ছুটে গেল। বাস নিউ ইয়র্ক সিটির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু এ কোন অচেনা নিউ ইয়র্ক সিটি? যে শহর সারারাত আলোয় ঝলমল করে, সেই শহর অন্ধকারে ডুবে যেন একটা ভুতুড়ে শহর। বিশাল বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপারগুলোর অধিকাংশই অন্ধকার, কয়েকটা জায়গায় আলো টিমটিম করছে, রিজার্ভের ফলে বিদ্যুতসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। গরমকালে উত্তর আমেরিকায় রাত সাড়ে আটটাতেও আকাশে সূর্য, পনের ঘন্টা দিনের আলো থাকে, আর শীতকালে ঠিক উলটো। জানুয়ারিতে দিন বড় হতে থাকে, তবু এখনো পাঁচটা সাড়ে পাঁচটায় অন্ধকার নেমে আসে। রাস্তায় দু’পাশে নোংরা বরফের দেওয়াল, দু’পাশে ট্রাফিক অস্বাভাবিক রকমের কম। রাস্তার পাশের খুঁটির ওপরে ইলেকট্রিকের মোটা কেবল লাইনগুলোর গা থেকে তখনো বরফ ঝরে যায় নি। বাসটা রাস্তায় কাদাজল ছেটাতে ছেটাতে এগিয়ে চলেছে। বরফের ঝড় শহরের রোশনাই নিংড়ে উড়ে বেরিয়ে গেছে।

    রিধিমা ডায়েরিটা ব্যাকপ্যাকে ঢোকাল। যেটুকু পড়েছে সে তাতে মনে অনেক প্রশ্নের সঙ্গে অস্বস্তির মেঘ জমেছে। এরাই তাহলে সেই তরাইয়ের থারু উপজাতি। তরাইয়ের চারদিকে ম্যালেরিয়ার মহামারিতে বাইরের কুলিরা টেকে না, শুধু এখানকার জঙ্গলী শিকারি ‘থারু’রা বংশানুক্রমে টিকে আছে। প্রকৃতির সঙ্গে এদের শরীরের জিন এমনভাবে নিজেকে পরিবর্তন করে ফেলেছে যে মশার কামড়ে এদের ম্যালেরিয়া হয় না। কী হয়েছিল দেবচরণের মেয়ে রাজকুমারীর? সমনামবুলিজম? মেয়ের মাথায় অপদেবতার ছায়া সন্দেহ করে সমাজ ওকে গ্রাম থেকে বের করে দিল? কোথায় যাবে ঘরছাড়া গরিব দেবচরণ বৌ মেয়েকে নিয়ে? কিন্তু এসব প্রশ্নের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে একটা মুখ্য প্রশ্ন— দাদা কেন এদের কথা লিখেছে? দরিদ্র থারু দেবচরণ, তুলসী, আর মেয়ে রাজকুমারী এত কী গুরুত্বপূর্ণ যে তাদের কথা দাদা শতাব্দীর কুখ্যাততম আর্কিওলজিকাল ফ্রডের গল্পে লিখেছে?

    নিউ ইয়র্ক সিটিতে বাস চলেছে। বাসের পিছনে পিছনে একটা NYPD লেখা নীল-সাদা ক্রুজার আসছে। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় পুলিশের গাড়ি মোটেই অস্বাভাবিক না। কিন্তু বাসের আগে আগে আরেকটা NYPD-র নীল-সাদা ক্রুজার। পুলিশের গাড়ি দুটো যেন বাসটাকে এসকর্ট করে এগিয়ে চলেছে। গাড়িদুটোর ওপর কিছুক্ষণ নজর রাখল রিধিমা গাড়িদুটো বাসটাকে ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে না। রিধিমার বুক ধক করে উঠল। পুলিশের গাড়িদুটো বাসের স্পিডেই চলেছে। হঠাৎ রিধিমার চিন্তা হল পুলিশ বা খুনিরা কি টের পেয়েছে যে সে এই চায়নাটাউন বাসে বস্টন থেকে পালিয়েছে? ওরা নিশ্চয়ই সব এক্সিট পয়েন্টে কড়া পাহারা রেখেছে। এত সত্ত্বেও রিধিমাকে ধরতে না পেরে ওদের মাথায় কি এই চায়নাটাউন বাসের কথা আসে নি? ওরা যদি খোঁজ করে তবে ঠিক জানতে পারবে যে একটা বাস নিউ ইয়র্ক সিটির দিকে গেছে। তবে কি ওরা রিধিমাকে ধরতে বাস টার্মিনাসে লোক রাখবে না?

    রিধিমার মনে পড়ল ডঃ উইকস দাবা খেলার সম্বন্ধে একটা কথা বলতেন, দাবায় হয় তুমি অ্যাটাক করছ, না হয় তুমি ডিফেন্স সলিডিফাই করছ, আর যদি দুটোর কোনটাই না করছ তবে তুমি তোমার রাজাকে খোয়াতে চলেছ। রিধিমা ভাবল এখন সে দুটোর কোনটাই করছে না। রিধিমা চলন্ত বাসে উঠে দাঁড়াল। সামনের ট্রাফিক সিগন্যালে বাস থামলেই নেমে পড়তে হবে। রিধিমা এগিয়ে সামনের দরজার দিকে গেল। ড্রাইভার বিস্ময়ে রিধিমার দিকে তাকাল।

    ‘আমি সামনের সিগন্যালে নেমে যাব,’ রিধিমা বলল।

    ‘নো স্তুপ হিয়ার,’ বাসের ড্রাইভার বিরক্তি প্রকাশ করে বলল। ‘বাস স্তপ অ্যাত চায়নাতাউন। গো তু ইয়োর সিত।’ ভাঙা অ্যাকসেন্টে চিনা ড্রাইভার প্রায় বকাই লাগাল। রিধিমা সিটে ফিরে এল। রিধিমার সন্দেহ হল পুলিশগুলো চায়নাটাউন পর্যন্ত বাসের সঙ্গে সঙ্গে যাবে, টার্মিনাসে বাস থামলেই ওরা ওকে অ্যারেস্ট করবে। বাস নদীর ধার ঘেঁষে টুয়েলভথ অ্যাভিনিউ দিয়ে চলছে। চওড়া রাস্তা, কিন্তু গাড়ি কম। বাইরে ঝুরঝুর করে বরফ পড়েই চলেছে। ডানদিকে দুটো চিমনির মত বিল্ডিং বড় বড় করে লেখা নিউ ইয়র্ক ওয়াটারওয়ে। বিল্ডিঙের পিছনে হাডসন নদী। বেশ কয়েকটা হলুদ ক্যাব দাঁড়িয়ে। ফেরি স্টেশন। রিধিমা জানলা দিয়ে বাইরেটা একবার দেখল। হঠাৎ পিছনে সাইরেনের আওয়াজ। রিধিমা তাকিয়ে দেখল দুটো ফায়ার ট্রাক সাইরেন বাজিয়ে অন্ধকারে লাল আলোর রঙ ছড়াতে ছড়াতে দ্রুতগতিতে আসছে। এই ঠাণ্ডায় কোথাও আগুন লেগেছে। রাস্তার সমস্ত গাড়ি ডানদিকের কার্ব ঘেঁষে দাঁড়াল। ওদের বাসটাও দাঁড়াল। কেবল পুলিশের গাড়িটা বাসকে অতিক্রম করে সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

    টাইমিং। দাবা খেলায় সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হয়। ডঃ উইকস বলতেন মোস্ট ফেভারেবল টাইম একবারই আসবে। সেটা বুঝতে হয় আর সঙ্গে সঙ্গে তার সদ্ব্যবহার করতে হয়। রিধিমা পকেট থেকে একটা কুড়ি ডলারের নোট হাতের মুঠোয় নিয়ে এল। ফায়ার ব্রিগেডের প্রথম গাড়িটা যেই কাছাকাছি এল রিধিমা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বাসের ড্রাইভারের পাশে গিয়ে মুখটা করুণ করে হাতজোড় করে বলল – প্লিজ! আমার ইমারজেন্সি আছে। রিধিমার জোড় হাতের ভিতর দিয়ে যে বিশ ডলারের নোটটা পটকার সলতের মত বেরিয়ে আছে সেটার আবেদন চিনা ড্রাইভার অস্বীকার করতে পারল না। রাতের টাকিলার বোতল হয়ে যাবে। ফাইনানশিয়াল ট্র্যান্সাকশনটা যেটা এখন ঘটল তাকে ঘুষ আর টিপসের মাঝামাঝি বর্ডারলাইনে ফেলা যায়। চিনা ড্রাইভার বিরক্ত মুখে পাশের লাল হাতলটা তুলে ধাক্কা মারল। এয়ার রিলিজ সুইচটা অ্যাক্টিভেটেড হয়ে দরজাটা ভস করে খুলে গেল।

    ‘থ্যাঙ্কস!’ নোটটা রিধিমা ড্রাইভারের হাতে ধরিয়ে দিল।

    কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বাসে ঢুকতে লাগল।

    ‘হোয়াট দ্য হেল—’ পাশের কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটা কথা শেষ করার আগেই, যার উদ্দেশ্যে এই গালি দেওয়া সে ততক্ষণে রাস্তায় নেমে পড়েছে। এবার পিছনের দমকলের গাড়িটা ওদের বাসকে অতিক্রম করে গেল। রাস্তা বরফগলা জলে আর বরফে মাখামাখি হয়ে রয়েছে। বরফের ঝড় নিউ ইয়র্ক সিটিকে দুরমুশ পেটাই করে দিয়ে গেছে। রাস্তার দু’পাশের সাইডওয়াক বরফে ভর্তি, কয়েকজন পথচারী রাস্তার ধার ঘেঁষে হাঁটছে। সামনে পেডেস্ট্রিয়ান ক্রসিংয়ে লাল আলো, ভিশন জিরো সত্ত্বেও নিউ ইয়র্ক সিটিতে জে’ওয়াকিং ডেডলি, কিন্তু এই রিস্ক নিতেই হবে। রিধিমা রাস্তায় নেমে ছুট লাগাল রাস্তার অন্যদিকে।

    রাস্তার অন্য দিকের কার্বে একটা খালি ক্যাব! ‘ফটি থার্ড এণ্ড সেকেণ্ড,’ শুনে ক্যাবের ড্রাইভার ঘাড় হেলাতেই রিধিমা ক্যাবের দরজা খুলে দ্রুত ভিতরে ঢুকল। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখল রিধিমা। বাসটা অনেকটা এগিয়ে গেছে, একটা পুলিশের গাড়ি আবার বাসের পিছনে পিছনে চলেছে।

    ক্যাব এগিয়ে চলল। রিধিমার মনে হল ওটা হয়তো ওর অর্থহীন সন্দেহ। তবু সাবধানের মার নেই। রিধিমা পিছন থেকে একটা পাঁচ ডলারের বিল ড্রাইভারের পাশের সিটে ফেলে দিল। ‘একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে ব্রো। ‘

    ড্রাইভার একবার তাকিয়ে নোটটা দেখেই গ্যাসে চাপ দিল। রিধিমার পিঠ পিছনের সিটে ধাক্কা মারল, ক্যাব উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। ক্যাব ড্রাইভার থার্টি এইট স্ট্রিটে ডান দিকে ঘুরল। ফর্টি থার্ড এণ্ড সেকেণ্ডের মোড়ে বাঁদিকে ঘুরে রিধিমা গুগল ম্যাপ দেখল। ইণ্ডিয়ান পার্মানেন্ট মিশন সামনেই। সামনে ডানদিকে হ্যাম্পটন হোটেল দেখা যাচ্ছে। মোহন বলেছিল হোটেলের পাশের ছাব্বিশতলা বাড়িটাই ইণ্ডিয়ান পার্মানেন্ট মিশন। রিধিমা ক্যাবকে থামতে বলল।

    পার্স খুলে বিল মিটিয়ে রাস্তায় নামার আগে রিধিমা সাবধানী চোখে রাস্তাটা দেখে নিল। রাস্তা খালি। রিধিমা দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেল ইণ্ডিয়ান মিশনের বিল্ডিঙের দিকে। রাস্তা পিচ্ছিল, তাড়াতাড়ি হাঁটা যায় না। ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া শরীর জমিয়ে দিচ্ছে। গোটা নিউ ইয়র্ক শহরটা যেন বিশাল বিশাল টানেল। দু’শর বেশি পঞ্চাশতলা বা তার চেয়ে উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার এই শহরে। এর অর্ধেকও আমেরিকার কোনও শহরে নেই। দু’পাশের আকাশ ছোঁওয়া কংক্রীটের বডিগুলোর মধ্যে সরু রাস্তা টানেল এফেক্ট সৃষ্টি করে। রাস্তার ওপারের উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপারটার কালচারাল আইকনোগ্রাফি লাল গ্রানাইটের ওপর ক্যানিয়ন রেড অ্যালুমিনিয়ামের পর্দা চড়ানো দেওয়াল রাজস্থানের লাল বেলেপাথরের আর্কিটেকচারের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। সদর দরজার ওপর লাল গ্রানাইট কেটে একটা বিশাল বর্গাকার পরিসর সৃষ্টি করে তাতে ভারতের জাতীয় পতাকার একটা আভাস সৃষ্টি করা হয়েছে। বিল্ডিঙের সামনে সাইডওয়াকে স্ক্যাফোল্ডিঙের পাইপ লাগানো, গেটের ওপরে দেওয়ালে বিশাল অশোক স্তম্ভ আঁকা, নিচে একটা পিতলের আয়তাকার চাকতিতে লেখা—

    পার্মানেন্ট মিশন অব ইণ্ডিয়া টু দ্য ইউনাইটেড নেশনস

    নিচে ঠিকানা টু থার্টি ফাইভ ইস্ট ফর্টি থার্ড স্ট্রীট। আর বিল্ডিঙের দুটো সোনালি ধাতব চাদর সাঁটা দরজা রাজকীয় মাইশোর প্যালেসের দরজাকে মনে পড়িয়ে দেয়।

    ইণ্ডিয়ান পার্মানেন্ট মিশনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। রিধিমা একটু এগিয়ে গেল, ওখানে একটা দেওয়ালের গায়ে লেখা— নো পার্কিং, এ্যাকটিভ ড্রাইভওয়ে। যেন একটা সুদর্শন জেলখানা। নিশ্চয়ই কোনও ঘন্টি থাকবে। দরজার পাশে দেওয়ালে একটা স্পিকার লাগানো প্ল্যাস্টিকের ঘণ্টার বোতাম। রিধিমা বোতামটা টিপে বলল— হ্যালো!’

    কড়াক করে একটা আওয়াজ হল, দরজা খুলে গেল। রিধিমা ভিতরে ঢুকতেই দরজা আবার বন্ধ হয়ে গেল। রিধিমা স্বস্তির এক বিশাল নিঃশ্বাস ফেলল। সে এখন ইণ্ডিয়ান টেরিটোরিতে, ওকে আমেরিকান পুলিশ অ্যারেস্ট করতে পারবে না। ভিতরে ওয়াকওয়ের শেষে একটা বন্ধ দরজা। বাঁদিকে কয়েকটা কাঁচের জানলা, কোথাও কোনও জনমানব নেই। রিধিমা তৃতীয় জানলায় একজনকে দেখল।

    ‘কী চাই?’

    ‘আমার নাম রিধিমা বোস,’ রিধিমা পরিচয় দিল। ‘মোহন গুপ্তা—’

    ‘ভিতরে আসুন,’ লোকটা একটা বোতাম টিপল, ডান দিকের একটা দরজা খুলে গেল। ‘মোহনজী আপনার কথা বলে রেখেছেন।’

    ছোট ওয়েটিং রুম, গ্রানাইটের মেঝের কিছুটা জুড়ে কার্পেট পাতা, চারটে মেরুন রঙা গদিসাঁটা ওয়ালনাট চেয়ার, দুটো চেয়ারের পাশে কফি টেবলে ফ্যান্সি বই রাখা। একদিকের দেওয়ালের মাঝে গান্ধিজীর ছবির একপাশে ফটোতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, অন্যপাশে রাষ্ট্রপতি হাসছে। অন্যদিকের দেওয়ালে নেহেরু থেকে শুরু করে সকল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ফটো। ‘আপনি বসুন।’ সিকিউরিটি গার্ড ইন্টারকমে ফোন করল।

    রিধিমা একটা শান্তির শ্বাস নিল। ভাবতেই ভয় লাগছে কীভাবে সে ওই নরক থেকে পালিয়ে এল। রিধিমা আর ভাববে না। সে এখন নিরাপদ!

    অল্প অপেক্ষা। মোহন বেরিয়ে এল।

    অনেকদিন পর মোহনকে দেখল রিধিমা। মোহনের চেহারায় আভিজাত্য এসেছে – দাড়ি নিখুঁত ভাবে ট্রিম করা, চোখে সোনালি রিমের চশমা, মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, চেনাই যায় না এই সেই JNUতে UPSC প্রিপারেশন করা ছাত্র মোহন। দাদার সব চেয়ে প্রিয় ছাত্র, দাদা বলতো মোহনের আর্কিওলজিস্ট না হয়ে IAS হওয়াটা দেশের ঐতিহাসিকদের জন্য একটা বিরাট লোকসান হবে। রিধিমা উঠে দাঁড়াল। রিধিমার মনে এক মিশ্র অনুভূতি হল। এক তীব্র আকর্ষণ, খুব কাছের মানুষ দেখলে যেমন হয়, আবার অভিমান যেন মোহন তার জীবনে থাকলে তাকে এই দুঃসহ অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হত না। ডঃ উইকস বলতেন পাকা দাবাড়ু মুখে মুখোশ এঁটে খেলে। পোকার ফেস। মুখ দেখে মনের ভাব বোঝাই যায় না। মোহনকেও চিনতে পারেনি রিধিমা ওর মুখোশটা এত নির্ভরশীল মনে হত যে সে বিশ্বাস করেছিল। মোহনের হাঁটায় কনফিডেন্স ঝরে পড়ছে, পায়ে কালো জুতো চকচক করছে, গায়ে মাইকেল কোরস ব্লেজার, নীল টাই। মোহনের হাসিটাও যেন মাপা, এতটুকু সঞ্চয় বা অপচয় নেই হাসিতে। মুসৌরির লালবাহাদুর শাস্ত্রী অ্যাকাডেমি আর দিল্লীর ফরেন সার্ভিস ইনস্টিটিউট দারুণ এটিকেট, ডিপ্লোমেসি শিখিয়েছে, JNUর সেই ক্যন্টিনে চায়ের কাপে গভর্নমেন্টের পলিসির বিরুদ্ধে গলা ফাটানো ডাউন-টু-আর্থ মোহন আর নেই। মোহন রিধিমার পাশের চেয়ারে এসে বসল। তারপর মোহন বিড়বিড় করে প্রথমেই যে কথাটা বলল তার জন্য রিধিমা মোটেই প্রস্তুত ছিল না ‘আমি চাইনা এরা জানুক আমাদের আগেকার সম্পর্কের কথা।’ মোহন চারদিকে একবার দ্রুত তাকিয়ে নিল।

    রিধিমা মাথা নাড়ল, সে এখন যেটা চায় সেটা হল একটা আশ্রয়। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার মত মনের অবস্থা তারও নেই। রিধিমার পাশে মেঝেতে একটা বড় পিতলের পাত্রে জলে অনেকগুলো লাল গোলাপের পাপড়ি ভাসছে। পাশে একটা স্ট্যাণ্ড, সেখানে একটা বোর্ডে লেখা—

    হিন্দি ওয়ার্ড অব দ্য ডে

    সাথী – Fellow (saathi)

    কী কোয়েন্সিডেন্স! রিধিমা মনে মনে বিদ্রুপের হাসি হাসল।

    ‘আমি তোমার কথা অনেকক্ষণ ধরে ভেবেছি,’ মোহনের দু-হাতের আঙুল একে অপরের মধ্যে আঁকশির মত বদ্ধ। ‘তোমাকে কেন কেউ টার্গেট করতে যাবে?’

    ‘সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। আমি তো কারও কোনও ক্ষতি করিনি।’

    ‘অ্যাপারেন্টলি তোমার দাদাও কারোর কোনও ক্ষতি করেনি। কিন্তু আমেরিকায় এসে গুম হয়ে গেল। ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্টের বাঘা বাঘা গোয়েন্দারা এখনো বুঝে উঠতে পারল না যে কে ওকে মারল আর কেন?’

    ‘দাদার খুনের সঙ্গে আমার কী কানেকশন?’

    ‘আমি কী জানি?’ মোহন মাথা ঝাঁকিয়ে দৃঢ় অথচ নিচুস্বরে বলল। ‘তোমাদের ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন সব কিছু গোপন রাখা।’

    ‘মোহন, প্লিজ!’ রিধিমা বলল। এ নিয়ে আমরা তিন বছর আগে প্রচুর আলোচনা করেছি। আবার—’ রিধিমা চুপ করে গেল। তর্ক করার মত শক্তি নেই মনে৷

    মোহন উঠে দাঁড়াল। ‘ওককে, তুমি বসো, আমি দেখি বস ফ্রি হল কিনা আজ বস খুবই ব্যস্ত। সময় বের করা ডিফিকাল্ট।’

    রিধিমাকে বসিয়ে রেখে মোহন ভিতরে চলে গেল। মোহন চলে যাওয়ার পর রিধিমা চারদিকে তাকাল। মোহন যা খুশি বলুক, নিজের দেশের কনসুলেটের ভিতর ঢুকে অনেক নিশ্চিন্ত লাগছে। পাশে একটা ছোট কামরা, সেখানে ছাত পর্যন্ত উঁচু ভারতের পতাকা একটা স্ট্যাণ্ডে টাঙানো। রিধিমা সেখানে হেঁটে গেল৷ একদিকের দেওয়ালে কোনও অ্যাবস্ট্রাক্ট মর্ডার্ন আর্ট, উলটো দিকের দেওয়ালে একটা পঞ্চাশ ইঞ্চি টিভি সাঁটা। একটা সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে, টিভিতে খবর হচ্ছে। একজন ব্লণ্ড শ্বেতাঙ্গিনী বরফ ঢাকা সাইডওয়াকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে এই রিজার্ডে কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্যামেরা রেকর্ডিং করা শহরের নানা অংশ কেটে জুড়ে দেখাচ্ছে— অজস্র পাওয়ার লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় নিউ ইয়র্ক আর নিউ জার্সির কুড়ি লাখ বাড়িতে হিট আর ইলেকট্রিসিটি নেই। যাতে বুড়োবুড়িরা ঠাণ্ডায় মরে না যায় তাই ন্যাশনাল গার্ডের লোকেরা অনেক সিনিয়র সিটিজেনকে হোটেল বা সুরক্ষিত স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজের ওপর একটা বড় রকমের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে এবং স্ট্যাটেন আইল্যাণ্ড ও নিউ জার্সির বেয়ন্নে ব্রিজ বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক কমিউটার নিউ ইয়র্ক সিটিতে আটকে পড়েছে। পোর্ট অথরিটি বাস স্ট্যাণ্ড ও গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল রেল স্টেশন ওয়াল টু ওয়াল মানুষে থিকথিক করছে। স্ক্রিনের নিচে গ্র্যাফিকে লেখা চলে যাচ্ছে—

    নিউ ইয়র্ক সট বাই ওয়ার্স্ট স্টর্ম ইন ফর্টি ইয়ার্স।

    বরফ ঢাকা গোটা নিউ ইয়র্ক ধুঁকছে।

    নিউজ অ্যাঙ্কররা আবার স্ক্রিনে ফিরে এল। পরের খবর নিখোঁজ সংবাদ স্ক্রিনে একজন গায়ানিজের মুখ। হার্লেম থেকে হরিপরসাদ নামে এই গায়ানিজ যুবক নিখোঁজ। হরিপরসাদ নিউ ইয়র্ক জাম্বল-জিগস পাজল ডার্বি কম্পিটিশনে গত বছরের চাম্পিয়ন। কাল সন্ধ্যাবেলা থেকে নিখোঁজ, ‘লেজি বার্ডস’ নামে একটা রেস্টুরেন্ট থেকে ও আর বাড়ি ফেরে নি। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে ২০১৭’র জিগস পাজল চ্যাম্পিয়ন লিওনার্ড মোরাস্কিকে গত সামারে কেউ অপহরণ করেছিল এবং এখনো পর্যন্ত তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায় নি। কেউ জিগস পাজলের চ্যাম্পিয়নদের টার্গেট করছে বলে পুলিশ সন্দেহ প্রকাশ করছে। কিন্তু কেন? হরি পরসাদের সেলফোনে কোন সাড়া নেই।

    অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল, কারোর দেখা নেই। রিধিমা আবার ওয়েটিং রুমে ফিরে গিয়ে চেয়ারে বসল। জিগস পাজল চ্যাম্পিয়নদের কেন কেউ অপহরণ করতে পারে? শরীরে অস্থিরতা বেড়েছে। পায়চারি করার জন্য উঠতে গিয়েও আবার বসে গেল রিধিমা, মন বলছে দাদার উধাও হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্বন্ধ আছে দাদার ডায়েরির।

    পাশে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। উপর থেকে মোহন নেমে এল। ‘চল, সাহুজী ফ্রি হয়ে গেছেন।’

    ‘সাহুজী?’

    ‘জয়দেব সাহু, ফার্স্ট সেক্রেটারি। আমার বস। দারুণ শার্প মাথা। উনি তোমাকে হেল্প করতে পারবেন।

    রিধিমা ডায়েরিটা বন্ধ করে ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।

    লিফটে উপরে উঠে ফার্স্ট সেক্রেটারির অফিসে মোহন দরজা নক করে খুলল। খুব ছিমছাম সাজানো অফিস। বিশাল কাঁচের জানলা দিয়ে UN-বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে। ফার্স্ট সেক্রেটারির পিছনে দেওয়ালে একটা বিশাল ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ছবি— সুরিয়ালিস্ট পেইন্টিং— গোধুলির লাল আকাশে ক্রুশবিদ্ধ যীশু যেন উড়ে যাচ্ছে। সালভাদোর দালি।

    ‘বসুন বসুন।’ ভদ্রলোককে খুব সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান দেখতে। ‘সরি, আপনাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। আমি জয়দেব সাহু। কনসুলেটের ফার্স্ট সেক্রেটারি। কাল খুব সকালে মিনিস্টার আসছেন। তাই খুব ব্যস্ত। প্লিজ বসুন।’

    রিধিমা বসল— ‘খুব বিপদে পড়ে আপনাদের—’

    ‘মিস বোস, রিল্যাক্স,’ জয়দেব সাহু দু-হাত কাঁধের পাশে তুলে গুরুদের আশীর্বাদের ভঙ্গীতে অভয় দিল। ‘ভয়ের কিচ্ছু নেই। ভারতীয় নাগরিকদের গায়ে যাতে একটা আঁচড়ও না লাগে তার জন্যই তো আমরা আছি। আমাকে মোহন ইস্যুটা ব্রিফলি বলেছে। কী হয়েছে আপনি সবটা খুলে বলুন।’

    ফার্স্ট সেক্রেটারির আশ্বাসে রিধিমা মনে খুব শান্তি পেল। অনেক হালকা বোধ করল রিধিমা। সব গুছিয়ে জয়দেব সাহুকে বলল। জয়দেব সাহু ডিফেন্সিভ ভঙ্গীতে বলল, ‘দেখুন আমেরিকান ল’ এনফোর্সমেন্ট কী করবে সেটা ওদের ব্যাপার। তবে আমরা এটা মেক শিওর করব যে যেন আপনার ওপর তাদের পাওয়ার মিসইউজ না করে। কিন্তু কে ওদের খুন করতে পারে?’

    ‘আমি তো কিছু ভাবতেই পারছি না।’

    ‘আচ্ছা, খুনি আপনাকে টার্গেট করবে কেন?’ আপনাকে শব্দটার ওপর জোর দিল জয়দেব সাহু।

    সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’

    ‘প্রফেসররা এই বরফ ঝড়ের রাতে কী করছিল ইউনিভার্সিটিতে?’

    ‘বিশ্বাস করুন আমি কিচ্ছু জানি না।’

    ‘মোহন বলল আপনারও ওই মিটিঙে থাকার কথা ছিল?’

    ‘হ্যাঁ, এজন্যই আমাকে দেশ থেকে আর্জেন্ট আসতে বলা হয়েছিল।’

    ‘অথচ মিটিঙের টপিক কী তা জানতেন না?’ জয়দেব সাহুর কণ্ঠে অবিশ্বাস।

    দীর্ঘশ্বাস ফেলল রিধিমা। নিজের কানেই নিজের কথা অবিশ্বাস্য লাগছে ‘ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল কিছু। আমাকেও বলা হয় নি। আমাকে শুধু এটুকু বলা হয়েছিল যে এটার সঙ্গে আমার PhD’র গ্র্যান্ট জড়িত।’

    ‘আপনার PhD’র গ্র্যান্ট?’ জয়দেব সাহু সন্দেহের গন্ধ পেল। ‘আমি কি জিজ্ঞাসা করতে পারি যে আপনার PhD’র টপিকটা কী?’

    ‘কপিলাবস্তু,’ রিধিমা বলল। ‘পিতরাওয়া—’

    ‘হোলি কাউ!’ জয়দেব সাহু রিধিমার কথার মধ্যে কথা বলল। ‘দ্যাট কপিলাবস্তু পেইন ইন দ্য বাট?’

    ‘তার মানে?’ রিধিমা ঠিক বুঝতে পারল না।

    ‘প্লিজ পার্ডন মাই ফ্রেঞ্চ, জয়দেব সাহু বলল। ‘কপিলাবস্তু একদম পাগল করে ছাড়ছে আমাদের। কামিং ফ্রাইডে এখানে UN হেডকোয়ার্টারে ভারত আর নেপালের মধ্যে এক তুমুল ঝগড়া হতে চলেছে কপিলাবস্তু নিয়ে।

    ‘ঝগড়া!’

    ‘ভদ্র ভাষায় বলে ডিবেট। আমাদের দেশের ডয়েন আর্কিওলজিস্টরা এসেছে, শুনেছি নেপালের নাম করা সব আর্কিওলজিস্টরা অলরেডি নিউ ইয়র্কে এসে গেছে এই ডিবেটের জন্য। কাল মিনিস্টার তো ওই ডিবেটের জন্যই আসছেন।’

    রিধিমা বুঝল ব্যাপারটা কী। কিন্তু এ মুহূর্তে ওর নিজেকে রক্ষা করা ছাড়া আর কিছুতে উৎসাহ নেই। জেট ল্যাগের জন্য শরীর ছেড়ে দিয়েছে। রিধিমা বলল, ‘এটা কিন্তু আপনারা UN-এ না এনে দু’দেশের মধ্যেই মিটিয়ে ফেলতে পারতেন।’

    ‘সে চেষ্টা ইণ্ডিয়া অনেকবার করেছে, কিন্তু নেপাল কিছুতেই আমাদের কথা শুনতে চায় না।’

    ‘কেন?’

    ‘মিস বোস, বুদ্ধ হচ্ছে এমন একটা প্রোডাক্ট যা আমাদের দুই দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ট্যুরিজম নিয়ে আসে,’ জয়দেব সাহু বলল। ‘এত সহজে ওরা বুদ্ধের ভাগ আমাদের দেবে? নেপাল মানতেই চায় না যে আমাদের পিতরাওয়ার স্তূপ থেকে খুঁড়ে বের করা হাড় হল বুদ্ধের হাড়। আমরা স্ট্রংলি বলে চলেছি হোল ওয়ার্ল্ড জানে যে পিতরাওয়ায় পাওয়া হাড় বুদ্ধের হাড়। পিতরাওয়াই কপিলাবস্তু। আসলে চিন ওদের মাইন্ডটা বিষিয়ে দিচ্ছে। যাক গে, ওসব ছাড়ুন, ফার্স্ট থিং ফার্স্ট।’

    মোহনের তর্জনী সেলফোন স্কুল করছিল। বিড়বিড় করে বলল, ‘আপনার ব্যাপারটাতে CNN খুব ইন্টারেস্ট নিচ্ছে দেখছি।’

    ‘CNN!’ মোহনের মুখে ‘আপনি’ শুনে রিধিমার ধাক্কা লাগল। JNUতে মোহনের হস্টেলে ছোট সিঙ্গল বেড খাটে শুয়ে আদর করার সময় মোহন ওকে তুই-ও বলত।

    ‘হ্যাঁ, আপনাদের প্রফেসর ডঃ গিলমোরের ভাই জ্যাক গিলমোর CNN-এর সিনিয়র রিপোর্টার। ও এই ব্যাপারটা খুব তলিয়ে দেখছে।’

    ‘ডঃ গিলমোর,’ রিধিমা উত্তেজিত হয়ে জয়দেব সাহুকে বলল। ‘উনিই তো আমাকে বললেন আমার লাইফের ওপর হামলা হতে পারে। অ্যাডভাইস করলেন হার্ভার্ড ছেড়ে পালাতে। ওঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছি না। উনি জানেন যে কেন মার্ডারগুলো হয়েছে।

    ‘ইন্টারেস্টিং,’ জয়দেব সাহু বলল। জয়দেব সাহুর মোবাইলে পিং করে টেক্সট মেসেজ এল। ‘প্লেন একঘন্টা লেট,’ জয়দেব সাহুর চোখ মোবাইলে।

    ‘সরি?’ রিধিমা বলল।

    জয়দেব সাহু মোহনকে বলল, ‘এয়ারপোর্টে যেতে দেরি করো না, টেইলউইন্ড পেয়ে গেলে লেট মেক-আপ করে নেবে।’ তারপর জয়দেব সাহু রিধিমার দিকে তাকিয়ে ভদ্র হাসি ছুড়ে বলল, ‘মিনিস্টার।’ তারপর আবার মোহনকে বলল, ‘জ্যাক গিলমোর কী লিখেছে এই ব্যাপারে?’

    ‘অনেক কিছু, লং স্টোরি শর্ট-হার্ভার্ডের স্কুল অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ – দু-সপ্তাহ আগে ‘ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটি’র থেকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট পায়। একটা ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট সাবমিট করার জন্য যে ইণ্ডিয়ার পিতরাওয়া স্তূপ খুঁড়ে পাওয়া হাড় কি সত্যই বুদ্ধের হাড়?’

    ‘টু-উ ডিফিকাল্ট টু হ্যাণ্ডল দ্যাট গড ড্যাম পিতরাওয়া অ্যাট দিস আওয়ার,’ জয়দেব সাহুর ডান হাত কোনও এক রিফ্লেক্স অ্যাকশনে কপালে চলে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়দেব সাহু বলল, ‘সরি! ঠিক আছে পড়ে যাও। আমি শুনছি।’

    মোহন পড়ে চলল, ‘রিপোর্টের ডেডলাইন ছিল ফোরটিস্থ। কিন্তু থারটিস্থ সকালে হঠাৎ ডঃ গিলমোর নাকি একটা ফোনি কল পান যে হার্ভার্ড প্রফেসররা যেন সার্টিফাই করেন যে পিতরাওয়া থেকে পাওয়া হাড় বুদ্ধেরই হাড়। এটা সার্টিফাই করলে হার্ভার্ড কমিটি বেশ ভাল রকমের পারিশ্রমিক পাবে, আর সার্টিফাই না করলে, ওদের খুন করা হবে। গতকাল সন্ধ্যায় কমিটির মিটিং ছিল।’

    ‘তা হার্ভার্ডের ওপিনিয়ন কী ছিল?’

    ‘ডঃ গিলমোর বলেন হার্ভার্ড কোনও একটা বিশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এই সার্টিফিকেট দিতে রাজি হচ্ছিল না। ডঃ গিলমোর বলেন যে তার অনুমান হত্যাকারী হার্ভার্ডের প্রফেসরদের মিটিঙে গিয়ে তাদের ওয়ার্নিং দেয় এবং প্রফেসররা রাজি না হওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।’

    ‘বাই চান্স এই ‘বিশেষ তথ্যটা’ কি আপনার PhD থিসিসের ফাইণ্ডিংস?’ জয়দেব সাহু চটপট দুইয়ে দুইয়ে চার করল।

    ‘হ্যাঁ,’ রিধিমা বলল।

    এবার জয়দেব সাহুকে হতাশ দেখাল— ‘তবে তো আপনি আমাদের খুব বিপদে ফেললেন।’

    ‘আপনাদের বিপদে ফেললাম, আমি?’

    ‘মিস বোস, কপিলাবস্তু নিয়ে UN ডিবেটে আমাদের ওনলি স্ট্রং এভিডেন্স হল পিতরাওয়ার স্তূপের নিচ থেকে পাওয়া বুদ্ধের হাড়। আর ঠিক এখনই হার্ভার্ড প্রফেসর যদি বলে যে আপনার PhD থিসিস অনুযায়ী ওটা বুদ্ধের হাড় নয় তাহলে সেই স্টেটমেন্ট কি আমাদের দেশের আরগুমেন্টকে উইক করে দেবে না?’

    ‘সত্যি কথা বলতে কী, পিতরাওয়া থেকে পাওয়া হাড় সত্যি সত্যি বুদ্ধের হাড় কিনা টেকনিক্যালি সে মীমাংসা এখনো হয় নি।’ রিধিমা বলল।

    ‘কে বলেছে হয় নি?’ জয়দেব সাহু প্রতিবাদ করল। ‘একশ বছর ধরে পৃথিবী বিখ্যাত এত ঐতিহাসিকরা বলে গেল পিতরাওয়ায় স্তূপের হাড় বুদ্ধের হাড়, আর আপনি একজন ইণ্ডিয়ান হয়ে বলছেন যে মীমাংসা এখনো হয় নি!’ জয়দেব সাহু খুব অস্বস্তির মধ্যে নিজের সেলফোন তুলল। ‘চটপট যা করার করতে হবে। ব্যাপারটা ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে হবে।’

    দরজায় টকটক টোকা। একজন সিকিউরিটি গার্ড দরজা নক করে ভিতরে ঢুকল। জয়দেব সাহুর কৌতূহলী দৃষ্টি। লোকটা জয়দেব সাহুকে একটা কাগজ দিয়ে ফিসফিস করে কিছু বলল। জয়দেব সাহু চশমা পরে নিল। কাগজটা পড়তে পড়তে জয়দেবের কপালে চারটে প্যারালাল ভাঁজ পড়ল, জয়দেব সাহু সিকিউরিটির লোকটাকে বলল, ‘আপনি নিচে যান, দেখছি। ওরা ভিতরে আসে নি তো?’

    ‘না।’

    ‘গুড।’

    সিকিউরিটির লোকটা বেরিয়ে যেতে জয়দেব সাহু বলল, ‘আপনি নিউ ইয়র্ক পুলিশের তাড়া খেয়ে এখানে ঢুকেছেন?’

    ‘না, মানে—’

    ‘মিথ্যা কথা বলবেন না’ জয়দেব সাহুর কঠোর গলা। আমরা আপনাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি আর আপনি—’

    আমি মিথ্যা কথা বলছি না,’ রিধিমা প্রতিবাদ করল। ‘তবে হ্যাঁ, পুলিশের গাড়িগুলো আমার বাসের আগে পিছনে আসছিল। ওরা আমাকেই খুঁজছে?’

    ‘অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট!’ জয়দেব সাহু একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল।

    রিধিমা কাগজটার ওপরে দেখল বড় বড় করে লেখা—

    ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট

    তার নিচে একগাদা কালো লাল স্ট্যাম্প মারা, তার মাঝখান দিয়ে পড়া যাচ্ছে ক্রিমিনাল কমপ্লেইন্ট, এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নেবার সময় রিধিমা নিজের নামটা পড়ল, নিচে অনেক কিছু লেখা, নিচে একজন জজ সাইন করেছে আজকের ডেটে।

    ‘ব্যাপারটা বড় গোলমেলে হয়ে গেল,’ জয়দেব সাহু উঠে দাঁড়াল। ‘এর মধ্যে আমেরিকান পুলিশ জড়িয়ে গেছে,’ জয়দেব সাহু মুখ দিয়ে একটা চরম হতাশার আওয়াজ করে সেল ফোনে নম্বর ডায়াল করল তারপর ‘স্যার, জয়দেব বলছি। ইউ গট আ মিনিট? খুব আর্জেন্ট স্যার। ইয়েস। থ্যাঙ্ক ইয়ু স্যার।’ বলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ডেপুটি কনসুল জেনারেলকে এক্ষুনি ব্যাপারটা ইনফর্ম করা দরকার। আমি আসছি।’ জয়দেব সাহু অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টটা নিয়ে ওর অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।

    রিধিমা এবার মোহনের দিকে তাকাল, মোহনের চোখে নীরব ধিক্কার রিধিমা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। রিধিমা অবনত মস্তকে বসে রইল।

    দশ মিনিটের মধ্যে জয়দেব সাহু ফিরে এসে ধপ করে চেয়ারে বসল।

    ‘কথা হল?’ মোহন জিজ্ঞাসা করল।

    ডেপুটি কনসুল জেনারেল রেগে আগুন।’

    ‘কেন?’

    ‘চলুন উপরে।’

    লিফটে জয়দেব সাহ আর মোহনের সঙ্গে উঠে গেল রিধিমা। বেশ বড় কনফারেন্স রুম। জয়দেব সাহু দরজায় টোকা দিয়ে ভিতরে ঢুকল। ভিতরে তিনজন লোক৷

    ‘ইনি রিধিমা বোস, স্যার, এনার কথাই হচ্ছিল,’ জয়দেব সাহু বলল৷

    ‘বসুন,’ ডেপুটি কনসুল জেনারেল গম্ভীর।

    ‘আমি খুব দুঃখিত— রিধিমা ইতস্ততঃ করে বলল।

    ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই মিডিয়া রটিয়ে দেবে একজন খুনিকে ইণ্ডিয়ান কনসুলেট শেল্টার দিয়েছে। আর মুহূর্তের মধ্যে সে খবর সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যাবে।’ ডেপুটি কনসুল জেনারেল যেন এক আসন্ন বিপর্যয় ঘোষণা করল। তারপর অন্য দু’জনের দিকে হাত দেখিয়ে বলল, ‘আপনি এদের নিশ্চয়ই চেনেন?’

    ‘হ্যাঁ,’ রিধিমা মাথা নাড়ল। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার ডাইরেক্টর জেনারেল মনোজ যোশী এবং জয়েন্ট ডাইরেক্টর জেনারেল মিঃ রাঘবন। দাদা নিখোঁজ হওয়ার পর মিনিস্ট্রি অব এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্সকে প্রেসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে এদের অফিসে বেশ অনেকবার যেতে হয়েছিল। দু’জনে চেয়ার ছেড়ে অল্প শরীর তুলে দায়সারা ভাবে রিধিমার সঙ্গে হাত মেলাল।

    ডেপুটি কনসুল এবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘কাল মিনিস্টার আসছেন। এমনিই একটা ফল্গুর মত হিডেন অ্যাড্রেনালিন সার্জ থাকে মন্ত্রী-টন্ত্রীরা এলে। তার ওপর আপনি কী ঝামেলাটা পাকালেন বলুন তো?’

    ‘অ্যাকচুয়ালি—’

    ‘মিস বোস,’ ডেপুটি কনসুল কথা শেষ করতে দিল না। ‘আমেরিকান পুলিশ নিচে, অতএব আমাদের যা করার একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। সামনের শুক্রবারের UN-এ ইণ্ডিয়া আর নেপালের মধ্যে তুমুল তর্ক হবে কপিলাবস্তু কোন দেশের সেই দাবি নিয়ে। ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্টকে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে প্রমোটার কান্ট্রি জোগাড় করতে হয়েছে। চিন ও পাকিস্তান নেপালকে সাহায্য করছে। ব্রিটেন আমাদের সাপোর্ট করছে। অন্যান্য আরও কিছু দেশকে আমরা নিরপেক্ষ থাকতে রাজি করিয়েছি। আমরা প্রিটি শিশুর যে মনোজ যোশীজি এবং মিঃ রাঘবন আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার থেকে যা প্রুফ নিয়ে এসেছেন তাতে অডস আর ইন আওয়ার ফেভার। ডেপুটি কনসুল আর্কিওলজিস্টদের দিকে তাকাতে ওরা মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টটাতে তর্জনী দিয়ে টোকা মেরে ডেপুটি কনসুল বলল, ‘কিন্তু আপনাদের ঘটনাটা আমাদের কেসটাকে উইক করে দেবে। আমেরিকান প্রেস যদি লেখে যে আপনারা হার্ভার্ডের এক্সপার্টরা বলছেন যে পিতরাওয়ায় আবিষ্কৃত ক্যাসকেটে বুদ্ধের অস্থি নকল আর হার্ভার্ড এক্সপার্টদের মধ্যে একজন ইণ্ডিয়ান সিটিজেন আছে এবং তাকে আমরা এই ইণ্ডিয়া মিশনে আটকে রেখেছি তাহলে ‘ডেপুটি কনসুল জেনারেল কথাটা শেষ করল না।

    এবার জয়দেব সাহু খুব ঠাণ্ডা শান্ত গলায় বলল, ‘মিস বোস, একটা মেজর ইস্যু হল ব্যাপারটাতে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টও ইনভলভড আছে। অ্যাকচুয়ালি, ব্রিটিশরাই একশ বছর আগে বলেছিল যে এটা বুদ্ধের হাড়। সারা পৃথিবীতে সেই হাড় ডিস্ট্রিবিউটেড হয়ে গেছে। আর্কিওলজিকাল স্ক্যাণ্ডাল চারদিকে ছড়িয়ে যাবে, গোটা পৃথিবী বলবে ব্রিটিশরা ধাপ্পাবাজ, তাতে ইণ্ডিয়া-ব্রিটেন ডিপ্লোমেটিক রিলেশনশিপে একটা বড় ফাটল ধরবে। আমাদের গভর্নমেন্ট সেটা কোনমতেই চাইবে না। ব্রিটেন আমাদের মিত্র দেশ।’ জয়দেব সাহু তার বক্তব্য সমর্থনের জন্য ভারতীয় এক্সপার্টদের দিকে তাকাল।

    ‘তাহলে আমার এখন কী করা উচিত?’ রিধিমা বলল।

    ‘সামনে এখন একটাই রাস্তা খোলা, মিস বোস,’ জয়দেব সাহু পরামর্শ দিল। ‘আপনি একটা প্রেস রিলিজ বানান যে হার্ভার্ডের স্টাডি অনুযায়ী পিতরাওয়ার স্তূপের নিচে ক্যাসকেটে পাওয়া হাড় সত্যই বুদ্ধের হাড়। আমরা CNN সিনিয়র করেসপণ্ডেন্ট জ্যাক গিলমোরকে এখানে ডাকছি, আপনি ওনাকে বলুন যে আপনাকে প্রেসার দেওয়া হয়েছে এটা লিখতে যে ওটা বুদ্ধের হাড় না। আমরা সেই খবর আমেরিকার সব বড় বড় নিউজ এজেন্সিতে এক্ষুনি ছড়িয়ে দেব।’

    ‘সেটা কিভাবে সম্ভব!’ রিধিমা ক্ষীণ প্রতিবাদ করল। ‘আমি আগেও বলেছি ওটা সত্যি না মিথ্যা সেটা তো এখনো—’

    ‘মিস বোস,’ জয়দেব সাহু বসের সামনে খুব নম্র। নরম গলায় রিধিমাকে বোঝাল, ‘বাইরে আমেরিকান পুলিশ আপনাকে অ্যারেস্ট করার জন্য দাঁড়িয়ে। আপনি ফ্লেক্সিবল হোন।

    ‘ফ্লেক্সিবল!’ রিধিমা প্রতিবাদ করে উঠল। ‘ইটস সাচ আ বিগ ডিল বিগ ডিল! কোনটা বিগ ডিল? রিসার্চ না আপনার প্রাণ?’ ডেপুটি কনসুল অবাক।

    রিধিমা অনাবশ্যক তর্ক বাড়াল না। এদের দয়ার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

    ‘এটা তো একটা প্রুভেন হিস্ট্রি!’ ডঃ রাঘবন এবার হস্তক্ষেপ করল।

    ‘প্রুভেন হিস্ট্রি?’ রিধিমার লোকটাকে একদম পছন্দ না। ‘তাহলে আপনাদের ওপর অতবড় অ্যালিগেশনের পরও আপনারা কেন বুদ্ধের হাড়ের DNA টেস্ট করান নি? এর তদন্ত করছিল বলে কেন আমার দাদা সিদ্ধার্থ বোস UN ডিবেটে নিউ ইয়র্কে এসে কর্পূরের মত উবে গেল?’

    এবার রাঘবনের চোখে রাগের ঝিলিক। তবু রাঘবন মুখে প্রফেশনাল হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘মিস বোস, আপনার এই ক্রাইসিসের সময় সিদ্ধার্থ বোসের কথা এখন না আলোচনা করাই বোধহয় উচিত হবে। UN ডিবেটের সময় আমি ছিলাম সিদ্ধার্থের সঙ্গে, ও সব সময়ে অন্যমনস্ক ছিল।’

    ‘NYPD’র তদন্তকারী শেরিফের ডিপার্টমেন্ট সেভেন্টি টু আওয়ার্স চারদিকে সার্চ করে দাদার দেহ যখন খুঁজে পেল না তখন আপনারই এই স্টেটমেন্ট কোট করে ‘ভলেনটারি মিসিং পার্সন’ বলে কেস বন্ধ করে দিয়েছিল। আমেরিকায় নাকি প্রতিবছর সাড়ে ছয় লাখ লোক মিসিং হয় আর তাদের মধ্যে নব্বই হাজারের কোনও খোঁজ পাওয়া যায় না। আর সাপ্রাইসিংলি, আমাদের এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রিও সব মেনে নিল?’

    ‘আচ্ছা! তাহলে আমি রেসপন্সিবল!’ রাঘবনের হাসি ওষ্ঠচ্যূত হল। রিধিমা দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে ঝুঁকে পড়ল রাঘবন। ‘হ্যাঁ আমরা বারণ করেছিলাম এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রিকে ব্যাপারটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে,’ – রাঘবন উত্তেজিত – ‘সরি টু সে, আপনার দাদা সিদ্ধার্থ বোস বুদ্ধের হাড় চুরি করেছিল দিল্লীর মিউজিয়াম থেকে। ইণ্ডিয়া চলুন, আপনাকে মিউজিয়ামের সিসিটিভির ক্যাসেট দেখাব।’ রাঘবন মুখ মুছল। ‘আপনি আমাকে দোষ দিচ্ছেন? আপনার আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে আপনার দাদার স্ক্যাণ্ডাল আমরা গোপন রেখেছি—’

    ‘অসম্ভব!’ রিধিমা বলল। ‘আমার দাদা চুরি করতে পারে না।

    ‘ওয়েল,’ মনোজ যোশী মাথা নাড়লেন— ‘যদি আমার পার্সোনাল মতামত চান তবে আমি বলব সিদ্ধার্থ ওয়াজ আ ভেরি অনেস্ট পার্সন। আমি ওকে খুব ভালভাবে চিনতাম। আমি বিশ্বাস করিনা ও মিউজিয়াম থেকে চুরি করতে পারে। ওর নিশ্চয়ই কোনও গুড ইনটেনশন ছিল।’

    ‘প্লিজ কাট ইট আউট!’ জয়দেব সাহ হস্তক্ষেপ করল। আমেরিকান পুলিশ নিচে, আর আপনারা এখানে ঝগড়া করছেন?’ তারপর রিধিমাকে বলল, মিস বোস, আপনি এখন বিপজ্জনক অবস্থায়। আপনি স্টেটমেন্টটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিন, আমরাও আপনাকে প্রোটেক্ট করব, প্রমিস।’

    ‘অসম্ভব!’

    সবাই এক মুহূর্ত চুপ। ডেপুটি কনসুল বিচারকের রায় দেবার মত করে বলল— ‘এনাফ! এই আলোচনা এখানে শেষ। আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন, কিন্তু আমাদের কনসুলেটের বাইরে গিয়ে।’

    তার মানে? আমাকে বের করে দেবেন?’

    প্লিজ ডোন্ট ড্রাইভ মি নাটস, ডেপুটি কনসুল বলল। ‘এমনিতেই তো জানেনই আমার এক প্রেডিসেসার কাজের লোকের ভিসা-টিসা নিয়ে এমন ঝামেলাটা পাকিয়েছিল যে টু টেল ইয়ু দ্য ট্রুথ আমাদের গভর্নমেন্টের নাক-কান কাটা গেছে। আমেরিকান পুলিশ ভারতের ডিপ্লোম্যাটকে হ্যাণ্ডকাফ পড়িয়ে জেলে নিয়ে গেছে ভাবতে পারেন? ওকে আরও ভুগতে হত যদি না আমরা পরের দিনের ফ্লাইটেই ওকে দেশে পাঠিয়ে দিতাম। ও বেঁচে গেছে। কিন্তু এসব খবর এক সেকেণ্ডে ভাইরাল হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়। আপনি এখন খবরের কাগজওয়ালাদের কাছে হেভিওয়েট নিউজ। আপনাকে শেল্টার দেওয়া আর রেসিং হর্সের ওপর সুমো জকি বসিয়ে দেওয়া একই ব্যাপার। প্রচুর জবাবদিহি করতে হবে।’

    রিধিমার মাথায় এবার যেন বাজ পড়ল। এরা কী বলছে? যাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ভেবে সে এতদূর থেকে বিপদ মাথায় নিয়ে ছুটে এসেছে, তারাই—?

    ‘প্লিজ!’ রিধিমা কাতর গলায় বলল। ‘আমাকে আশ্রয় দেওয়াটা কি অসম্ভব?’

    ‘কোনও কিছুই অসম্ভব না,’ জয়দেব সাহু বলল। উইকিলিকসের আসাঞ্জ যদি লণ্ডনের ইকোয়েডর এম্বাসীতে সাত বছর থাকতে পারে তবে আপনার এখানে আশ্রয় নেওয়া অসম্ভব কীসের? কিন্তু ইউ হ্যাভ টু হেল্প আস টু হেল্প ইউ। আপনি লিখে দিন যে পিতরাওয়ায় পাওয়া হাড় হান্ড্রেড পার্সেন্ট বুদ্ধের হাড়। বাকিটা আমরা দেখে নেব।’

    কিন্তু, হার্ভার্ডে তিনজন প্রফেসর যে সত্য রক্ষা করতে গিয়ে খুন হল, তাদের কী হবে?’

    ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আপনি লড়াই করলে কি ওরা প্রাণ ফিরে পাবে? এই নিন কাগজ আর কলম, লিখুন—’

    রিধিমা মাথা ঝাঁকাল— ‘অসম্ভব।’

    ডেপুটি কনসুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল— আপনার নামে আমেরিকান পুলিশের ওয়ারেন্ট আছে। বাইরে নিউ ইয়র্ক পুলিশ। টেকনিক্যালি আমাদেরও সলিড গ্রাউণ্ড থাকা দরকার আপনাকে এখানে শেল্টার দেবার জন্য। আপনি আমেরিকান পুলিশের কাছে সারেণ্ডার করুন। UN-এর ঝামেলাটা মিটে গেলেই দু’দিন পর আপনাকে নির্দোষ প্রমাণ করে ছাড়িয়ে আনব।’

    রিধিমা দু’হাত দিয়ে মাথার দু’দিকের রগ চেপে ধরল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }