কপিলাবস্তুর কলস – ১০
৷৷ দশ ৷৷
সন্ধ্যা হতেই হরি পরসাদের শরীরে তীব্র অস্বস্তি জেগে উঠল। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষ মাদকতার জন্য পিপাসার্ত। কিছুক্ষণ আলো নিভিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে রইল হরিপরসাদ। তারপর উঠে ঢকঢক করে জল খেল। বমিবমি পাচ্ছে, শীতশীত করছে, মনে হচ্ছে জ্বর এসেছে। সাদা পাউডারটা চাই-ই চাই এবার। দরজায় টোকা। পাহারাদার লামার মুখ উঁকি মারল, খাঁচায় লুসির দিকে একবার তাকিয়ে নিল—
‘রিনপোচে আপনাকে ডাকছেন।’
লুসি এবার আর চেঁচামেচি করল না। হরিপরসাদ উঠে খাঁচার ভিতর হাত ঢুকিয়ে লুসির মাথা, গলা, লম্বা লম্বা দুটো ঝুলন্ত কান আদর করে ঘেঁটে দিল। লুসি হরিপরসাদের হাত চেটে পুট পুট করে ল্যাজ নাড়িয়ে আবার মুখ বুজে শুয়ে রইল। কুঠুরি থেকে বেরিয়ে লামার সঙ্গে মন্দিরে গেল হরি পরসাদ। দেহরক্ষী লামাটা ভিতরে ঢুকল না।
রিনপোচে লামা একটা পুঁথি পড়ছিল, মুখ তুলে বলল, ‘শরীর কেমন?’
‘ভাল না। প্যাকেটটা চাই।’
রিনপোচে লামার মুখ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল। আড়ষ্ট হাতে প্রবল অনিচ্ছাসত্বে একটা কাগজের পুরিয়া হরিপরসাদের হাতে দিল— ‘জানিনা প্রভু বুদ্ধ এই পাপ আমার হাত দিয়ে করাচ্ছেন কেন?’
হরিপরসাদ তাড়াতাড়ি মন্দির থেকে বেরিয়ে হলওয়ের পাশের বাথরুমে ঢুকে অতি সাবধানে পুরিয়াটা খুলল। নাক দিয়ে সাদা পাউডার টেনে নিলেই মস্তিষ্কের দাপাদাপি শান্ত হবে। কিন্তু মঞ্জুশ্রী লামার সাবধান বাণী? অথচ এটা এতক্ষণ নেয় নি বলে শরীর বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে। হরিপরসাদ পুরিয়াটা নাকের সামনে ধরল।
অল্পক্ষণ পরে হরিপরসাদ মন্দিরে ফিরে এসে রিনপোচে লামার সামনে মুখোমুখি বসল— ‘একটু শহরে যাব।’
‘কেন?’
‘দেরি করব না। এক ক্রেট বিয়ার কিনেই ফিরে আসব।’
‘এই মঠে যারা আসে তারা বাইরে যায় না। ‘
‘কাজ শেষ হলে বাড়ি ফিরে যেতে দেবেন তো?’
‘আমি আমার কথা রাখি।’
তাহলে সময় নষ্ট না করে কাজটা কী তাই বলুন।’
‘বুদ্ধের মৃত্যুর পরবর্তী কথা জানো?’
‘রিজেন্ট হিস্ট্রিতেও সি প্লাস।
‘আই সি।’
‘হিস্ট্রি সাকস।’ হরিপরসাদ ঘাড় চুলকাল— ‘হাজার বছর আগে কী হয়েছিল জেনে কী লাভ?’
‘হাজার না, অ্যাকচুয়ালি আড়াই হাজার প্লাস।’ লামা বলল। ‘এই কাজের জন্য ব্যাকগ্রাউণ্ডটা জানা খুব দরকারি।’ লামা চশমা খুলে ফেলল।
‘ঠিক আছে শুনছি, লং স্টোরি শর্ট করে বলবেন প্লিজ।’
‘ঠিক আছে।’ সেসময় বুদ্ধ ইণ্ডিয়ার মোস্ট পপুলার সেলেব্রিটি। রিলিজিয়াস শুরু লাখ লাখ শিষ্য। তার মৃত্যুর খবর শুনে হাজার হাজার মানুষের জটলা হবে এটা স্বাভাবিক। মগধ, বৈশালী, শ্রাবস্তি, কপিলাবস্তু থেকে কাতারে কাতারে মানুষ, রাজা-মহারাজা, ভিক্ষু-ভিক্ষুণী সব কুশীনগরে এসে জমায়েত হতে লাগল।’
‘ওয়েস্ট অব টাইম,’ হরিপরসাদ বিরক্তির স্বরে বিড়বিড় করে বলল।
‘বিনা উদ্দেশ্যে হিস্ট্রির সি প্লাস স্টুডেন্টকে হিস্ট্রি পড়াতে আমিও ইচ্ছুক নই,’ লামার বিরক্ত চাহনি। ‘তারপর বুদ্ধকে চন্দনকাঠের চিতায় জ্বালানো হল। এবং তখনই চারপাশে মানুষদের মধ্যে গোলমাল শুরু হল বুদ্ধের চিতার ছাইহাড় কে নেবে তাই নিয়ে। মগধের রাজা অজাতশত্রু, ভেথাদিপের ব্রাহ্মণরা, কপিলাবস্তুর শাক্যরা, বৈশালীর লিচ্ছবীরা, অল্পকাপ্যর বুলিরা, রামগামের কোলিয়রা সকলেই দাবি করল বুদ্ধের চিতার দেহাস্থি তাদের প্রাপ্য। গোলমাল চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, প্রায় লড়াই বাধবার উপক্রম, তখন দ্রোণ নামে একজন ব্রাহ্মণ মধ্যস্থতা করেন। তিনি বুদ্ধের চিতার হাড়-গোড়-ছাই আটটি কলসীতে ভাগ করেন।’
‘ইউ চাইনীজ?’
‘টিবেটান।’
‘মঞ্জুশ্রী লামা?’
‘ড্রাগস নেওয়ার পর কোনও কিছুতে কনসেন্ট্রেট করা কি মুস্কিল হয়?’
‘একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম,’ হরিপরসাদ কটাক্ষ গায়েই মাখল না।
‘কী অদ্ভুত ব্যাপার?’ লামা অতিষ্ঠ।
আজ সকালে দেখলাম, মঞ্জুশ্রী লামার ঘরের দেওয়ালে লর্ড শিবার অত বড় ফটো— শিবা আমাদের হিন্দু দেবতা!’ হরিপরসাদ বলল।
‘বুদ্ধ ছিলেন শিবের অবতার। তাহলে বুদ্ধের গল্প আজ থাক। পরে—’
‘না না, বলুন। আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। এখানে দম আটকে আসছে। যা বলছিলেন আটটা কলসী—’
‘দ্রোণ সেই আটটি কলসী ভাগ করে দিলেন। এক ভাগ পেল মগধের রাজা অজাতশত্রু, এক ভাগ পেল বৈশালীর লিচ্ছবীরা, এক এক ভাগ পেল কপিলাবস্তুর শাক্যরা, অল্পকাপ্যর বুলিরা, রামগামের কোলিয়রা, ভেথাদিপের ব্রাহ্মণেরা, পাবার মল্লরা, এবং কুশীনারার মল্লরা।
‘এই নামগুলো কি আমায় মেমোরাইজ করতে হবে?’ হরিপরসাদ উঠে পড়তে পারলে বাঁচে।
‘তার দরকার নেই,’ রিনপোচের নিরুত্তাপ উত্তর। ‘গল্পটা জানা দরকার। দ্রোণ নামের সেই ব্রাহ্মণ বুদ্ধের দেহ যে তৈলাধারে রাখা ছিল তা নিলেন। তারপর পিপ্পলীবনের মৌর্যরা এসে পৌঁছাল, কিন্তু ততক্ষণে ভাগ-বাঁটোয়ারা শেষ। তাই তারা চিতার ছাই নিয়ে ফিরে গেল। দশ দলের সকলেই প্রতিজ্ঞা করল তারা বুদ্ধের দেহাস্থির ওপর একটা করে স্তূপ বানাবে এবং বুদ্ধের সম্মানার্থে একটি উৎসব করবে। কথিত আছে সকলেই একটা করে স্তূপ বানালো।’
‘এর সঙ্গে জিগস পাজলের কী সম্পর্ক?
কিন্তু বুদ্ধের মৃত্যুর কুড়ি বছরের মধ্যে তখনকার বৌদ্ধধর্মের প্রধান মহাকাশ্যপ হঠাৎ মগধরাজ অজাতশত্রুকে বলেন বুদ্ধের সমস্ত হাড় এক জায়গায় ফিরিয়ে এনে একত্রিত করতে। মগধের রাজা অজাতশত্রু তখন স্তূপগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে রাজগৃহের দক্ষিণে এক বিশাল স্তূপের নিচে সংগৃহীত বুদ্ধের হাড় আবার এক জায়গায় এনে রেখেছিল।’
‘দ্যাটস দ্য লিমিট!’ হরিপরসাদ বিড়বিড় করে বলল। ‘মাথায় আর ঢুকছে না। শিভারিং হচ্ছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তাম।’
রিনপোচে থামল— ‘ঠিক আছে। তুমি আজ বিশ্রাম নাও। কাল সকাল থেকে শুরু করব কাজ।’
হরিপরসাদ নিজের কামরায় এসে আলো নিভিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে রইল। পালাতে হবে। জেলখানার মত উঁচু তারকাঁটার বেড়া। টপকানো অসম্ভব।
তাহলে? পালাবার রাস্তাটা ওই মঞ্জুশ্রী লামাকেই জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? কিন্তু কীভাবে জিজ্ঞেস করবে? জাম্বল? নট আ ব্যাড আইডিয়া। হরিপরসাদ আলো জ্বেলে একটা কাগজে লিখল— HOW I ESCAPE – SAVE
এই লেখাটা ওই রিনপোচে দেখলে হরিপরসাদকে পাহাড়ের একটা ক্লিফে নিয়ে গিয়ে পাছায় লাথি মেরে নিচের খাদে ছুড়ে ফেলবে। এটা দিয়ে কিছু জাম্বল হয় না? জাম্বল সলভ করা বুদ্ধিমান লোকদের কাজ, কিন্তু জাম্বল তৈরি করা! গিভ মি আ ব্রেক। অত জিনিয়াস হরিপরসাদ না। এলেম লাগে। ওই মঞ্জুশ্রী লামা সেটা হতে পারে। হরিপরসাদ অক্ষরগুলোকে একদম পাশাপাশি নিয়ে এল—
HOWIESCAPE – SAVE
কিছু পাওয়া যাচ্ছে? নাঃ! হরিপরসাদের দু’চোখ নেশায় ঢুলছে। কিন্তু পালাতে তো হবেই। হরিপরসাদ চোখ জোর করে খুলে রাখল। S টাকে মাঝখান থেকে তুলে HOW এর সামনে বসালে SHOW, বাকি রইল IECAPE, এটা দিয়ে কী হয়? কী হয়? মাথা কাজ করছে না। আজ লোডেড না হলেই ভাল হত। চ্যাম্পিয়নশিপের দিন হরিপরসাদ নেশা করে না। হরিপরসাদ উঠে বাথরুমে গেল— দুচোখে জলের ঝাপটা মারতে লাগল। IECAPE – ড্যাম! তোয়ালে দিয়ে চোখ-মুখ মুছতে মুছতে মাথায় এল উত্তরটা – APEICE A PIECE
উৎফুল্ল হয়ে বেরিয়ে এসে কাগজে খসখস করে লিখে কাগজটা ভাঁজ করে হাঁটা লাগাল মন্দিরের দিকে হরিপরসাদ। রিনপোচে তখনও পুঁথি পড়ছিল, হরিপরসাদকে দেখে মাথা তুলে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
‘ঘুম আসছে না,’ হরিপরসাদ বলল। ‘আমি একবার মঞ্জুশ্রী লামার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’
‘কেন?’ রিনপোচের দু’চোখে সন্দেহ।
‘উনি আমাকে আশীর্বাদের ফুল দিলেন, অথচ—’ হরিপরসাদ থামল৷ ‘আমি ওঁর জন্য কিছুই নিয়ে যাই নি। ‘আমি আমার এই ফুলদানিটা ওঁকে গিফট করতে চাই। জানি এটা গ্লু দিয়ে জোড়া। কিন্তু আপনি তো আমায় বাইরে কিছু কিনতে যেতে দেবেন না।’
‘আমি দিয়ে দেব।’
‘থ্যাঙ্কস।’ হরিপরসাদ কাগজে লেখাটা ফুলদানির মুখে গুঁজে দিল। ‘এটা কী?’
‘নিজেই দেখুন।
রিনপোচে কাগজটা খুলে দেখে নিল। সন্দেহজনক কিছু নেই—
A SHOWPIECE – VASE
‘ঠিক আছে।’
‘শরীরটা এবার ঠিক লাগছে, বাকি গল্পটা শেষ করবেন? বুদ্ধের হাড়ের কী হল? আমি সরি—’
‘বোসো,’ লামা আবার পুঁথি বন্ধ করল। ‘অজাতশত্রুর পর অশোক নামে একজন রাজা সেই স্তূপটি খুঁড়ে হাড়গুলো বের করে আনে এবং তার সাম্রাজ্যের চুরাশি হাজার স্থানে নাকি ওই হাড় ছড়িয়ে দিয়ে তার ওপর চুরাশি হাজার স্তূপ বানায়।’
‘চুরাশি হাজার! কে এসব বানিয়ে বানিয়ে লেখে?’ হরিপরসাদ বিরক্ত।
‘ওয়েল, চুরাশি হাজার সংখ্যাটা অতিশয়োক্তি,’ রিনপোচে লামা বলল। তবে এটা ঠিক যে অশোকরাজা ব্যাপারটাকে খুবই জটিল করে তুলেছিল, কোন হাড় যে কোথায় গেল তার কোনও হিসেব রইল না। এরপর বহু বছর কেটে গেছে। আট বছর আগে চিনের নানজিং এ রাস্তা বানাবার মজুররা মাটি খুঁড়ে একটা ইলেভেন্থ সেঞ্চুরির গুম্ফা পায়। সেখান থেকে একটা চন্দনকাঠের বাক্স পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ববিদরা বাক্সের গায়ে লেখা পাঠ করে জানতে পারে যে ঝিংঝৌ প্রদেশের লংজিং মঠের মঞ্জুশ্রী মন্দিরের দু’জন লামা ইয়ুনজিয়াং এবং ঝিমি কুড়ি বছর ধরে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধের অনেক হাড় সংগ্রহ করে মঞ্জুশ্রী মন্দিরের নিচে পুঁতে রাখে। ওরা বুদ্ধের শরীরের দু’হাজারটি টুকরো এক জায়গায় সংগ্রহ করে সেই সমস্ত হাড় এবং বুদ্ধের দাঁত একটা স্তূপের নিচে রেখেছিল।’
‘ও-হো! ভুলেই গেছিলাম,’ হরিপরসাদ বলল। ‘আমাকে এখন উঠতে হবে। লুসিকে বাইরে নিয়ে যেতে হবে।’ হরিপরসাদ কড়ে আঙুল তুলে দেখাল। ‘বয়স হয়েছে, বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারেনা।’
‘ফেন্সের কাছাকাছি যেও না।’
‘কেন?’
‘ওটাতে সন্ধ্যার পর থেকে হাই ভোল্টেজ ইলেক্ট্রিসিটি চার্জ করা থাকে। তোমার আগের জিগস সলভার ছেলেটা পরশু রাতে পালাতে গিয়ে ইলেক্ট্রোকিউটেড হয়ে মারা গেছে।’
৷৷ এগারো ৷৷
এটা কি দুঃস্বপ্ন?
রিধিমা কখনো ভাবতে পেরেছে ওর দু’হাত পিছনে মুড়ে হ্যাণ্ডকাফ লাগিয়ে ওকে পুলিশের গাড়িতে ওঠানো হবে?
পিছনের সিটে জায়গা খুবই ছোট, মাথা নিচু করে পা মুড়ে বসতে হয়৷ খুব সম্ভবতঃ এটা ইচ্ছাকৃত ভাবেই ডিজাইন করা যাতে পিছনের সিটে যারা বসে তাদের মনস্তাত্বিকভাবে দমিয়ে রাখা যায়। পিছনের সিটে কোনও ভায়োলেন্ট প্রিজনার বসলে সে সামনের সিটের পুলিশ অফিসারের ওপর আক্রমণ করার মত জায়গাই পাবে না।
একটা মোটাসোটা পুলিশ ওর ঘাড় গুঁজে সিটে প্রায় ঠেলে দিয়ে সিট বেল্ট এত টাইট করে আটকে দিল যেন সিট বেল্টটা থাই কেটে বসছে। সিটে বমির গন্ধ, খুব সম্ভবতঃ এর আগে যাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এই গাড়িতে সে বমিটমি করে ফেলেছিল, ওয়াইপে সিটটা মুছে ফেললেও গন্ধ দূর হয় নি। রিধিমা গা ঘিনঘিন করে উঠল। সামনের সিটে দুটো বাজকাট পুলিশ। বাকিরা না এলেও, মোহন নিচে এসেছে, রিধিমার ল্যাপটপের ব্যাকপ্যাক মোহন কনসুলেটে রেখে এসেছে, ভিতরে রিধিমার সেলফোন, পার্স ।
‘উনি কি আমার সঙ্গে আসতে পারেন?’ রিধিমা পুলিশকে আবেদন জানাল। ‘নো ওয়ে!’ পুলিশটা রিধিমার আবেদন গ্রাহ্যই করল না।
রিধিমা মোহনের দিকে করুণ চোখে তাকাল।
মোহন বলল, ‘রিধিমা, এখন দু’দিন আমরা কিছু করতে পারব না। তবে ডেপুটি কনসুল কথা দিলে কক্ষনো সে কথার নড়চড় হয় না । UN-এর অধিবেশনটা শেষ হলেই—’
‘দু-দিন?’
NYPD ক্রুজার স্টার্ট নিল।
দু’জন পুলিশের সিটের মাঝে হাজারটা গ্যাজেট— র্যাডার, ল্যাপটপ, পিস্তল, কার্তুজ— পুলিশ ড্রাইভারটা সেন্টার কনসোল থেকে একটা মোটরওয়ালা রেডিওর সুইচ টিপতেই গাড়ির মাথার লাইটগুলো জ্বলে উঠে ঘুরতে লাগল আর তীক্ষ্ণ সাইরেন জেগে উঠল। ইণ্ডিয়ান পার্মানেন্ট মিশন খুব দ্রুত পিছনে সরে যেতে লাগল।
পুলিশের গাড়ি তীব্রগতিতে ছুটে চলেছে, বাঁ দিকে ইস্ট রিভার। রিধিমা ভেবেছিল যে পুলিশ স্টেশনটা কাছেই হবে, কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ চলার পর পুলিশটা আবার রেডিওর সুইচ টিপল এবার সাইরেন এবং মাথার ওপরের আলোগুলো বন্ধ হয়ে গেল। রিধিমার অস্বস্তি হতে লাগল, আলো বন্ধ করে দিল কেন? পুলিশের গাড়িটা এবার শহরের ভিতর একটা গলিতে ঢুকে থামল। দরজা খুলে পুলিশ অফিসার বাইরে গেল, তারপর রিধিমার দিকের পিছনের দরজা খুলল। মাথা ঝুঁকিয়ে রিধিমার সিট বেল্ট খুলে বলল, ‘আউট।’
রিধিমা কষ্টেসৃষ্টে বাইরে বেরিয়ে এল। কাছাকাছি কোনও পুলিশ স্টেশন দেখা যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা কনকনে হাওয়া মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দিচ্ছে, জায়গাটা অন্ধকার অন্ধকার। আরেকটা পুলিশের গাড়ি রাস্তার অন্য দিকে দাঁড়িয়ে। ‘ওভার দেয়ার,’ পুলিশ অফিসার রিধিমার কাঁধ ধরে ওই গাড়ির দিকে এগিয়ে দিল। অন্য গাড়িতে দু’জন পুলিশ বসে ছিল, অন্ধকারে ভাল বোঝা যাচ্ছে না। অন্য গাড়িটার পিছনের সিটে রিধিমার মাথা চেপে নিচু করে রিধিমাকে ভিতরে ঢুকিয়ে মাথায় একটা কালো বালাক্লাভা টাইপের ফ্লিসের থলে পরিয়ে দিল, তারপর জোরে দরজা বন্ধ করে গাড়িটাতে চাপড় লাগাল। পুলিশের গাড়িটা চলতে শুরু করল।
পুলিশগুলো কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ড্রাইভারের সিটের পুলিশটা তার সহযোগী পুলিশকে চাপা গলায় কী বলল ঠিক বুঝতে পারল না রিধিমা। রিধিমা উৎকর্ণ। কী বলল? শটগান সিটের পুলিশটা এবার উত্তর দিল। এরা ইংরাজীতে কথা বলছে না! রিধিমার গলা শুকিয়ে গেল— দু’জনে চিনা ভাষায় কথা বলছে! রিধিমার অস্বস্তি বেড়ে গেল। দু’জনেই চিনা পুলিশ?
গাড়ির রেডিওটা এবার কথা বলল— তাও ওই চিনা ভাষায়, রিধিমা বিন্দুমাত্র বুঝল না। ড্রাইভার পুলিশ অফিসার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে হংহং করে কিসব বলে গেল। তারপর বেশ কিছুক্ষণ গাড়ির গোঁ গোঁ শব্দ। রিধিমার শ্বাসকষ্ট হতে লাগল। রিধিমা থলের ভিতর গোঁ গোঁ করে হাত পা ছুড়তে লাগল। রিধিমার মাথার থলে একটানে খুলে গেল।
‘হোয়াট?’ চিনা পুলিশটা শটগান সিট থেকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, পুলিশের হাতে ফ্লিসের থলেটা।
রিধিমা জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, দম বন্ধ হয়ে গেছিল।’
পুলিশ দু’জন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে আর থলেটা মাথায় পরাল না। রিধিমা আবার বড় বড় শ্বাস নিল। দুটো হাত পিঠমোড়া করে তাতে হ্যাণ্ডকাফ লাগান, রিধিমার মনে হল দরজার হাতল চেপে দরজা খুলে লাফ মারে। কিন্তু রিধিমা আজ প্রথম জানল যে আমেরিকায় অন্ততঃ কিছু পুলিশের গাড়িতে পিছনের দরজায় হাতল থাকে না।
গাড়িটা একটা ব্রিজে উঠেছে। রিধিমা ব্রিজটা চিনতে পারল – ব্রুকলীন ব্রিজ, নিচে ইস্ট রিভার। তারমানে ওরা ম্যানহাটন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
ব্রিজ পেরিয়ে গাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ ছুটে শহরতলীর বাইরে চলে এল। একের পর এক গুদাম, সব বন্ধ, টিমটিম করছে কয়েকটা ল্যাম্পপোস্টের আলো। লোডিং আনলোডিং ডকগুলির শাটার টানা, সবকটা খালি, একটাতেও ট্রাক দাঁড়িয়ে নেই, চারদিকে ভাঙা প্যালেট ছড়ানো, বরফে মুখ গুঁজে একটা ফর্ক-লিফট মুখ থুবড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, বহু বছর মনে হচ্ছে এই গোডাউনগুলো ব্যবহার করা হয় নি। জায়গাটা মনে হচ্ছে কোনও পরিত্যক্ত কমার্শিয়াল স্টোরেজ এরিয়া। পুলিশের গাড়িটা রেললাইন পেরিয়ে একটা গুদামের সামনে এল। গুদামের লোডিং ডকগুলোতে পুরোনো কনটেইনারের পিছন দিকগুলো ঢোকানো। কিন্তু কনটেইনারগুলোর অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থা, কোনোটাতেও ট্রাকের ইঞ্জিন লাগানো নেই। দেখেই বোঝা যাচ্ছে একসময় এইসব ওয়্যারহাউসগুলো খুব ব্যস্ত ছিল। প্রচুর ট্রাক থেকে মালপত্র লোডিং আনলোডিং করা হত। এখন এগুলো পরিত্যক্ত। কিছু কনটেইনার লোডিং ডকে রয়েই গেছে।
পুলিশের গাড়িটা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হর্ণ বাজাল। গুদামের শাটারে বিরাট বড় 10 লেখা। শাটার ঝরঝর শব্দ করে উঠে গেল। পুলিশের গাড়িটা ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকল। পিছনে শাটারটা আবার নেমে বন্ধ হয়ে গেল৷
চিনা পুলিশদুটো গাড়ি থেকে নেমে এল। একজন রিধিমার দরজা খুলে বলল— ‘গেত দাউন।’
হ্যাণ্ডকাফে পিঠমোড়া অবস্থায় রিধিমা বাইরে বেরিয়ে এল, ঘাড়টা টনটন করছে। পুলিশটা রিধিমার হ্যাণ্ডকাফ খুলে দিল। রিধিমা হাত দুটো সামনে দু’পাশে স্ট্রেচ করল। একটা অন্ধকার অন্ধকার গো-ডাউন। বিশাল গুদামের এক কোণে তিনটে NYPD’র পুলিশের গাড়ি পাশাপাশি দাঁড় করানো। গুদামের অন্য কোণে একটা ডকে দু’জন বন্দুকধারী বডিগার্ড দাঁড়িয়ে। পুলিশটা তর্জনী দিয়ে রিধিমাকে সেদিক দেখিয়ে নিজে রিধিমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগল। লোহার সিঁড়ি দিয়ে বুক সমান উঁচু একটা লোডিং ডকে উঠে এল ওরা।
দেওয়ালের গায়ে একটা কনটেইনার কেবিন। ওয়্যারহাউসের সঙ্গে যে কনটেইনারগুলো লাগানো, এটা তাদের একটা। কিন্তু কনটেইনারে ঢোকার জন্য কাঁচের দরজা। কনটেইনারের ভিতরটা উজ্জ্বল আলোকিত। রিধিমা অবাক, ভিতরে গোটা দশেক একদম মডার্ণ সাইবার কাফের মত ছোট ছোট কিউবিকল, ডেস্ক, হুইল চেয়ার, প্রতি ডেস্কে ফ্ল্যাট স্ক্রিন কম্পিউটার মনিটর। ভিতরে টেম্পারেচার কন্ট্রোল ডিজিটাল থার্মোস্ট্যাট তাপমাত্রা দেখাচ্ছে— সিক্সটি নাইন ডিগ্রি। পাঁচজন অল্পবয়সি ছেলে মেয়ে মাথায় হেডফোন লাগিয়ে, কেউ কল শুনছে, কেউ কথা বলছে, দেখে মনে হচ্ছে একটা অতিব্যস্ত অত্যাধুনিক কল সেন্টার।
কেবিনের দরজা পর্যন্ত বন্দুকধারী এসে আর এগোল না। বন্দুকধারী দরজা ভিতরে ঠেলল। ‘গো, মেজর ভিতরে অপেক্ষা করছে,’ পুলিশটা বলল। কামরার ওপাশে কাঁচের দেওয়ালের পার্টিশন, তার ওপাশে আরেকটা ছোট কামরা, সুপারভাইজার কেবিনের মত। দেওয়ালে স্টিলের র্যাকে নেটওয়ার্ক ইক্যুপমেন্ট, ফোন, র্যাকে একের ওপর এক রাখা কম্পিউটার। দেওয়ালে টাঙানো একটা বড় প্ল্যাকার্ড— কালো ব্যাকগ্রাউণ্ডে লাল কালিতে আঁকা চিহ্ন। রিধিমার মনে হল এটা অর্গানাইজেশনের সার্ভার নেটওয়ার্ক। কাঁচের দেওয়ালে দেখা যাচ্ছে ভিতরের কামরায় একটা লোক ফোনে কথা বলছে। লোকটা ফোনে কথা বলতে বলতে হাতের আঙুলের ইশারায় রিধিমাকে ভিতরে ডাকল।
রিধিমা ভয়ে ভয়ে সেই কামরার ভিতরে ঢুকল। দেওয়াল ঘেঁষা ডেস্কে একটা কম্পিউটারের সামনে একটা রোগা-পটকা চিনা ছেলে। বয়স ওর কাছাকাছিই হবে, একটু কমও হতে পারে। তার মনিটরে এক নজর তাকাল রিধিমা একটা কেউটে ফনা তুলে স্থির। ছেলেটা রিধিমাকে দেখেই মাউজ ক্লিক করল। স্ক্রিনে একটা এক্সেল ফাইল হাজির হল। ছেলেটা একবার মুখ তুলে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল রিধিমার দিকে, তারপর আবার কম্পিউটারে দৃষ্টি ফেরাল। আরও একটু ভিতরে একটা অ্যাব লিঙ্কন দাড়িওয়ালা লোক ফোনে কথা বলছিল। এ লোকটাও চিনা। লোকটার ডেস্কে ছড়িয়ে রাখা অন্ততঃ গোটা কুড়ি নানা ধরণের সস্তা দামি মোবাইল ফোন।
অ্যাব লিঙ্কন দাড়ি চিনা লোকটা ফোন রেখে রিধিমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল।
‘আমাকে এখানে এনেছেন কেন?’ রিধিমা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘বসুন।’
রিধিমা ভয়ে ভয়ে বসল।
মার্ডার করা একটা আর্ট, চিনা চেয়ার টেনে রিধিমার মুখোখুখি বসল। ‘যা কেভিনের থেকে শিখতে হয়।’
রিধিমার মুখ শুকিয়ে গেছে, মাথার তালু দপদপ করছে।
‘পারফেক্ট এক্সিট। খুন করল কেভিন, অথচ পুলিশ সন্দেহ করছে আপনাকে, এরপর পুলিশ আপনাকে আর কোনোদিন খুঁজে না পেয়ে বলবে খুনি নিখোঁজ। কেস ক্লোজড।’ চিনা ইঙ্গিতে গলার কাছে তালু এনে গলা কেটে দেওয়ার ভঙ্গি করল। রিধিমা শিউরে উঠল।
‘আমাকে কেন আপনারা মারতে চান?’ রিধিমা বলল।
‘সেসব লম্বা গল্প। বরং আপনাকে বাঁচার একটা শেষ সুযোগ দিই। রাজি?’
রিধিমা ঢোক গিলল – আমাকে কী করতে হবে?’
চিনা এবার সামনের যুবককে বলল, ‘ডেভিড, ভিডিওটা দেখা -’
রিধিমা ভালভাবে দেখল ছেলেটাকে। পাতলা চেহারা, চুল উস্কোখুস্কো, দুটো চোখ ক্লান্ত, কিন্তু বুদ্ধিতে ঝকমক করছে, গাল দুটো মুখের ভিতরে ঢুকে যেন একে অপরকে স্পর্শ করছে। ডেভিড নামের ছোঁড়াটা নির্বিকার মুখে রিমোটের বোতামের চাপে দেওয়ালের স্মার্ট টিভিটা চালাল। এর আসল নাম নিশ্চয়ই ডেভিড নয়, রিধিমা শিওর, আমেরিকায় এসে প্রায় সব চাইনীজই নাম পালটায়। হার্ভার্ডের সোস্যাল সায়েন্স ব্লগ অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি চাইনীজ ডেভিড নাম নেয়, মেয়েরা জেনিফার। ছেলেটার গায়ে টি-শার্ট ওর কঙ্কালসার চেহারায় মনে হচ্ছে যেন হ্যাঙারে ঝোলা টি-শার্ট।
স্ক্রিনে CNN-এর একটা ভিডিওতে ডঃ গিলমোরের মুখ ফুটে উঠল। ডঃ গিলমোর বলছেন আমাদের হার্ভার্ডের প্রফেসরদের ওপর চাপ ছিল এটা— সার্টিফাই করতে যে ইণ্ডিয়ার পিতরাওয়া থেকে পাওয়া এই হাড় হল রিয়েল বুদ্ধের হাড়। প্রফেসররা রাজি হন নি, তাই আমাদের তিনজন প্রফেসরকে মারা হয়েছে।’
‘বাস্টার্ড!’ চিনার কুতকুতে দুটো আলমণ্ড চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। ‘এটা ইউটিউবে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর আর কেউ অকশনে এই হাড় কিনবে? একেও আমরা ঠিক খুঁজে বের করব।’
‘অকশন!’ রিধিমা অবাক। ‘কীসের অকশন?
‘বুদ্ধের হাড়ের।’
‘বুদ্ধের হাড়ের অকশন?’ রিধিমা অবাক। ‘কোন অকশন হাউসে বুদ্ধের হাড় বিক্রি করছে?’
‘সেসবে আপনার কী দরকার?’ অ্যাব লিঙ্কন রাগী গলায় বলল। ‘আপনাকে এখানে এক্ষুনি মেরে ফেলতে পারি। কিন্তু বাঁচিয়ে রেখেছি কারণ আপনি আমাদের সাহায্য করবেন।’
আমাকে কী করতে হবে?’
‘কাউন্টার ভিডিও।’
‘মানে?’
‘আপনার একটা ভিডিও ইউটিউবে আমরা আপলোড করব। আপনি ঠিক উলটো কথা বলবেন যে হার্ভার্ডের স্কুল অব এশিয়ান স্টাডিজ এর মতে ইণ্ডিয়া থেকে পাওয়া হাড় হল রিয়েল বুদ্ধের হাড়। কিন্তু, আপনাদের ধমকি দেওয়া হয়েছিল যে আপনারা যেন এই সার্টিফিকেট না দেন।’ চিনা এবার টেবিলের থেকে ব্রাউন এনভেলপটা তুলে তার থেকে একটা কাগজ বের করল। হার্ভার্ডের লেটারহেডে কিছু লেখা। ‘এটাতে একই কথা লেখা। এখানে একটা সাইন করতে হবে।’
রিধিমা কাগজটা পড়ল ৷
‘ব্যাস, এটুকু হলেই আপনার কাজ শেষ। আই প্রমিস, আজ রাতের মধ্যে ইয়ু আর ফ্রি বার্ড।’
ফ্রি বার্ড! রিধিমা ভাবল। পুলিশের খাতায় চার চারটে মার্ডারের চার্জ। সেটা উঠবে কিভাবে? ‘আমার কিছুদিন সময় চাই। ‘
‘দেখুন মিস,’ চিনা এক মুহূর্ত থেমে লম্বা শ্বাস নিয়ে যেন ওর রাগ প্রশমন করল। তারপর শান্তভাবে বলল, আজ সোমবার, অকশন শুক্রবার রাতে। সেলার এখন সিডনি থেকে ফ্লাই করে আসছেন আমেরিকা। আঠারো ঘন্টার ওপর নন-স্টপ ফ্লাই করে কাল সকাল ছটায় সান ফ্রান্সিকোতে নামবেন। নেমে যদি উনি শোনেন যে আমরা এই সার্টিফিকেটটা পাই নি এবং তা সত্ত্বেও আপনি জীবিত, তবে উনি আমার রিব থেকে কয়েকটা হাড় কেটে নিয়ে ওই বুদ্ধের হাড়ের কলসীতে ঢুকিয়ে দেবেন। সেলার ঠাণ্ডা মানুষ, কিন্তু রেগে গেলে নাইন রিখটার স্কেলের আর্থকোয়েক। অ্যাটম বম্বের থেকেও মারাত্মক হয়ে যান।’
‘এটা সার্টিফাই করা ইম্পসিবল!’
‘আই অ্যাম সিরিয়াস, আপনাদের তিনজন প্রফেসরকে খুন করা হয়েছে। আপনাকে চিন্তা করার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি।’
রিধিমা নিরুত্তর। ডঃ হফম্যান, ডঃ উইকস, ডঃ স্টিফেন প্রাণসংশয় জেনেও এই কাগজে সই করেন নি কারণ ওরা ইতিহাসকে বিকৃত করতে চান নি। সে কীভাবে এখানে সই করে?
কেবিনের একদম শেষে রেস্টরুমের সাইন। রিধিমার ব্লাডার ফেটে যাচ্ছে। আপনার রেস্টরুমটা কি ব্যবহার করতে পারি?’
‘ওখানে পালাবার কোনও রাস্তা নেই,’ মেজর বলল। ‘যান।’
রিধিমা উঠে দাঁড়াল।
রিধিমা বাথরুমে ঢুকে দরজা লক করে চারদিকে তাকিয়ে দেখল, কোনও জানলা-টানলা নেই। ছাদের দিকে তাকাল রিধিমা, ক্যামেরা-ট্যামেরা লাগানো আছে বলে মনে হচ্ছে না। মনে হল বাথরুমের দরজার ওপাশে একটা পায়ের শব্দ এসে থামল। অ্যাপল ওয়াচে 911 ডায়াল করে লাভ নেই, হয়তো বাইরের দরজায় কান পেতে আছে ডেভিড ছোঁড়াটা। রিধিমা তাড়াতাড়ি হাত থেকে ঘড়িটা খুলল। কমোডে বসে রিধিমা টয়লেট পেপার ছিঁড়ে তার মধ্যে ঘড়িটা ঢুকিয়ে দলা পাকাল। পাশের ট্র্যাশের ভিতর টয়লেট পেপারের দলাটা ঢুকিয়ে নিচে ঠেসে দিল। অল্পক্ষণ পর টয়লেট ফ্ল্যাশ করে বেরিয়ে এল রিধিমা । ‘থ্যাঙ্কস,’ রিধিমা চেয়ারে এসে বসল। আমি এত তাড়াতাড়ি কোনও ডিসিশন নিতে পারছি না, সরি।’
এবার মেজরের দুচোখ দিয়ে রাগ ঠিকরে বেরিয়ে এল। রিধিমা চোখ সরিয়ে কেবিনের বাইরের দিকে তাকাল। ভিতর থেকে কাঁচের দেওয়ালের ভিতর দিয়ে গোডাউনের অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে— আধো অন্ধকারে ডুবে আছে।
হঠাৎ ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে গোডাউনের বিশাল দরজার ধাতব শাটারটা উঠতে লাগল। রিধিমা কাঁচের দরজা দিয়ে দেখল একরাশ বরফ মাথায় নিয়ে একটা SUV ভিতরে ঢুকল। গাড়িটার হেডল্যাম্প রাস্তার কাদা-বরফে ঢাকা, টায়ারে, গাড়ির বডিতে কালচে বরফ ঢেকে রয়েছে, গাড়িটার ওয়াইপার তখনও উইওশিন্ডে জোলো বরফ সরিয়ে চলেছে।
গো-ডাউনের শাটার নেমে গেল। এবার গাড়ির হেডল্যাম্প নিভল, ওয়াইপার স্থির হল, গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হল। গাড়ি থেকে যে লোকটা ওভারকোট পরে নামল তাকে দেখে রিধিমা চমকে উঠল। সেই কানকাটা চিনাটা। এই লোকটাই হার্ভার্ডে গ্র্যাফটন স্ট্রীট পাব থেকে ওর পিছু নিয়েছিল।
সামনের দাড়িওয়ালার চোখের তারায় চিন্তার প্রতিফলন। ‘বুচার কেভিন হার্ভার্ড থেকে ফিরে এল। ও কিন্তু জানে আপনাকে আমরা এখানে নিয়ে এসেছি।’
রিধিমা শিউরে উঠল।
দাড়িওয়ালার চোয়াল এবার শক্ত হয়ে গেল। ‘চায়নার পিপলস লিবারেশন আর্মির অনেকে সাইকোলজিক্যাল প্রব্লেমে ভোগে। কেভিনের প্রবলেমটা বেশিই ছিল। কেভিন চাইনীজ আর্মির সঙ্গে লিবেরিয়া যায়। ওখানে অবসেশন, অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, সাইকোসিস এসব জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ওকে একটা জান্তব খুনি বানিয়ে তোলে। রক্ত না দেখলে এর অস্বস্তি বাড়তে থাকে, এটা ওর মানসিক রোগ ।’
রিধিমার অস্বস্তি বেড়ে গেল।
‘এখন এর শুধু দুটো জিনিসে উৎসাহ— ধর্ষণ আর খুন।’
‘বুঝেছি,’ রিধিমা বলল।
‘এখনো আমি কথা শেষ করিনি,’ দাড়িওয়ালা গম্ভীর মুখে বলল। ‘কেভিন ইণ্ডিয়ানদের ঘেন্না করে। ধৈর্য-যুক্তি এসব সেন্স ওর নেই। এই লোকটার হার্ট মাথায় থাকে। বুকের ধকধক বেড়ে গেলে কী করবে বুঝতে না পেরে কনফিউজড হয়ে গেলেই এর হাত সোজা পিস্তলের ট্রিগারে চলে যায়। ওকে আমি রাগাতে পারব না।’
রিধিমা ভয়ে ভয়ে কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। ‘ও আপনাকে মার্ডার করতে এখানে এসেছে।’ দাড়িওয়ালা পেন এগিয়ে দিল—’ সাইন অর কেভিন, ইয়োর কল।’
রিধিমা কাগজটা হাতে তুলে নিয়ে মাঝখান থেকে ছিঁড়ে ফেলল।
দাড়িওয়ালা এবার লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সংযত করল, তারপর শান্তভাবে বলল, ‘আমি চাই না মার্ডারটা আমার এখানে হোক। আপনি নিজে যাবেন কেভিনের গাড়িতে? নাকি—’
রিধিমা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
* * * * *
রিধিমা বেরিয়ে যেতেই ডেভিড রাগের চোটে মাউসটা ছুড়ে মারল ডেস্কে ‘ড্যাড, আয়্যাম ডান!’
ভাঙা মাউসটা ডেস্কের ধারে পেণ্ডুলামের মত দুলতে লাগল।
‘ডান! হোয়াট ডান?
‘আমি ডাবল অ্যারোর অ্যাডমিনের জব থেকে রিজাইন করছি।’
‘তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? জেনারেল তোর এই কথা শুনলে কী করবে জানিস?’
‘আমার চোখের সামনে আগের অ্যাডমিনটার কপালে নিজের রিভলভারের ভরা সিলিণ্ডারটা খালি করে দিয়েছিল। আর আমার ছ’মাস লেগেছিল থ্যানাটোফোবিয়াকে মন থেকে মুছে ফেলতে।’ ডেভিড উত্তেজিত হয়ে বলল। আমি কতবার তোমায় বলেছি মার্ডার আমার মধ্যে ইনটেন্স ডেথ অ্যাংজাইটি জাগায়। তা সত্ত্বেও তুমি …’
‘আমি জানি।’
‘প্লিজ শাট আপ! জানলে আমাকে তুমি ওই অ্যাসাইনমেন্টটা দিতে একটা লোককে ড্রাগ ইংজেক্ট করে মার্ডার করে লাশটা পাচার করার? প্যানিক অ্যাটাকের অসহ্য যন্ত্রনা থেকে বাঁচতে আমি সেদিনই সুইসাইড করতাম।
‘কুল ডাউন ডেভিড, কুল ডাউন,’ মেজর ছেলেকে ঠাণ্ডা করবার চেষ্টা করল। ‘আমি জানি। সেজন্য তো তারপর থেকে আমি লাস্ট ফোর ইয়ার্স কোনও মার্ডারে তোকে ইনভলভ করি নি। সেজন্যই তো মেয়েটাকে এখান থেকে বের করে দিলাম। কিন্তু ডাবল অ্যারো হল জেনারেলের ক্যাশ কাউ। ওটার জন্যই জেনারেলের এত পাওয়ারফুল নেটওয়ার্ককে আমি আমার কাজে লাগাতে পারি—’
‘এই জেনারেল তোমাকে একদিন নিজের হাতে মারবে। আমার কথা মিলিয়ে নিও,’ ডেভিড ডেস্কে হাত মুঠো করে দু’বার ঘুষি মারল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মেজর। মেজর জানে তার ছেলে জেনারেলকে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশী ঘেন্না করে।
৷৷ বারো ৷৷
রিধিমাকে গাড়িতে ঢোকাবার আগে এবার ওর দুটো হাত সামনে রেখেই হ্যাণ্ডকাফ পরিয়ে দিল কেভিন। প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে সিট বেল্ট টাইট করে বাঁধার সময় ওর রাশিয়ান নেভির মোটা ওভারকোটটা রিধিমার গালে ঘষে গেল। তারপর স্টিয়ারিঙে বসে কেভিন রিধিমার মাথায় সাফোকেটিং কালো থলেটা পরাতে পরাতে বলল, সিট লাইক আ গুড গার্ল। আই হেট ইণ্ডিয়ান স্মার্টঅ্যাসেস।’
গাড়ি স্টার্ট নিল। রিধিমা টের পেল ঘড়ঘড় শব্দে ওয়্যারহাউসের শাটার খুলে গেল। গাড়ি বেরিয়ে এল। গাড়িটা ধীরে রেললাইন পার হল সেটা চোখ বন্ধ অবস্থায় রিধিমা অনুভব করল। সানসেট পার্কের কমার্শিয়াল স্টোরেজ এরিয়া ছেড়ে রাস্তায় উঠতেই রিধিমার মনে হল আবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল রিধিমা। মাথার থলেটা হঠাৎ বাইরে থেকে জোর একটানে খুলে গেল। রিধিমা বড় শ্বাস নিয়ে যেন বাঁচল। কেভিন থলেটা ব্যাক-সিটে ছুড়ে দিল।
গাড়ি তীব্রগতিতে ছুটছে। সামনের ড্যাশ বোর্ডে সময় দেখাচ্ছে নটা চল্লিশ, বাইরের টেম্পারেচার ছয় ডিগ্রি ফারেনহাইট। বাইরের রাস্তার বরফ পরিষ্কার করার গাড়িগুলো রাস্তার বরফ চেঁচেই চলেছে। দু’দিকে কোথাও ডাঁই করা বরফের পাহাড়, আর রাস্তার পাশের সাইডওয়াকে বরফের দেওয়াল।
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ রিধিমা ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
‘হানিমুনে,’ কেভিন রিধিমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কুৎসিৎ হাসল। রিধিমা বুঝতে পারছে লোকটার উদ্দেশ্য বদ। রিধিমা মুখ ঘুরিয়ে নিল। গাড়ির জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাশে একটা পার্ক অন্ধকারে ডুবে আছে।
‘ইয়ো,’ কেভিন কুৎসিৎ হাসল। ‘হোয়াই ডোন্ট ইয়ু হ্যাং আউট উইথ মি টুনাইট?’ লোকটা এবার একটু ডানদিকে সরে এসে বসল। কেভিনের কঠিন হাতের থাবা শক্ত করে ধরল রিধিমার ঘাড়। তারপর কেভিন এক ঝটকায় রিধিমার গলা ডান হাতে জড়িয়ে ওকে নিজের মুখের কাছে নিয়ে এল। রিধিমার গালে কেভিন বুচারের নিঃশ্বাস পড়ল। তারপর আলতো করে রিধিমার ঘাড়ে একটা কামড় বসালো, যেন শিকারি বিড়াল তার শিকার ছোট্ট ইঁদুরকে থাবার মধ্যে নিয়ে খেলছে। রিধিমা চোখ বন্ধ করে আর্তস্বরে কেঁদে উঠে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু কেভিনের হাত লোহার মত শক্ত। কেভিন ওর নাকটা গুঁজে দিল রিধিমার ঘাড়ে। পারভার্টটা ফোর-প্লে শুরু করে দিয়েছে। রিধিমার ঘাড়ের ওপর লোকটার ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। রিধিমা এবার এক ঝটকায় কেভিনের হাতটা ছিটকে সরিয়ে দিল। উলটো দিক থেকে একটা বিরাট নুনের ট্রাক রাস্তা জুড়ে গোটা রাস্তায় স্প্রিঙ্কলার দিয়ে নুন ছড়াতে ছড়াতে আসছে। কেভিন রিধিমাকে ছেড়ে দু’হাত স্টিয়ারিং হুইলে রাখল । ট্রাকটাকে পাশ দেবার জন্য গাড়ির গতি ধীরে হল, রিধিমার দুটো হাত সামনে হ্যাণ্ডকাফে বাঁধা না থাকলে ট্রাকটা পাশে আসতেই রিধিমা বাম হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলটা ঘুরিয়ে দিত আর গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা মারত নুনের ট্রাকটাতে।
ট্রাকটা বেরিয়ে গেল। রাস্তা খালি। ডানদিকে একটা বিশাল কবরখানা, কবরখানার লোহার রেলিঙের ওপর বরফ জমে আছে। কবরগুলো বরফে ঢেকে ছোট ছোট বরফের ঢিপি হয়ে রয়েছে, শুধু ফলকগুলো বরফ ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। কেভিন কবরখানার দেওয়ালের পাশে গাড়িটা দাঁড় করাল। ‘হারি আপ বেবি!’ কেভিন রিধিমার সিট বেল্ট খুলে দিল। ‘গট্টা গো ফ্যাস্ট।’ কেভিন দরজা খুলে নেমে রিধিমার দরজা খুলে দিল। হাত বাঁধা অবস্থায় রিধিমার বের হতে অসুবিধা হচ্ছিল। ‘কুইক, কুইক!’ কেভিন রিধিমা ঘেঁটি ধরে জোরে টেনে গাড়ি থেকে বের করে আনল যেভাবে কসাই মুর্গির খাঁচা থেকে মুর্গিকে গলা ধরে টেনে বের করে জবাই করার জন্য। রিধিমা বুঝে গেছে এখানে ওকে কেভিন গুলি করে এখানেই ওর কবর দিয়ে যাবে।
রিধিমাকে একহাতে টানতে টানতে কেভিন এগিয়ে নিয়ে চলল কবরখানার লোহার দরজার দিকে। কবরখানায় ঢোকার বড় লোহার রেলিঙের দরজাটা বন্ধ, দরজার ভিতর নিচের দিকে একটা ছোট দরজার কাট আউট, মাথা অনেকটা নিচু করে ঢুকতে হয়। কেভিন এক লাথি মারতেই ছোট দরজাটা খুলে গেল। কেভিন রিধিমার মাথা নিচু করে দরজার ভিতর দিয়ে ঢুকিয়ে সামনে ঠেলে দিল, বরফের চাদর ঢাকা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল রিধিমা, ডান হাত কাদা-বরফ ফুঁড়ে রাস্তার পিচে গিয়ে লাগল। রিধিমা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে দেখল কেভিন ভিতরে ঢোকবার জন্য মাথা নিচু করছে। বিশাল চেহারা নিয়ে এতটুকু দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে কেভিনকে অনেকটা ঝুঁকতে হয়েছে, কেভিনের চোখ মাটিতে।
যা থাকে কপালে, রিধিমা কেভিনের দিকে ছুটে গিয়ে জোরে এক ধাক্কা দিল, কেভিন ভারসাম্য রাখতে না পেরে ভারি দেহ নিয়ে ছোট দরজার বাইরের দিকে ধপ করে বসে পড়ল। রিধিমা দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে কবরখানার অন্ধকারে ছুটতে লাগল।
প্রতিশোধের হিংস্র রাগে কেভিন দ্রুত উঠে দাঁড়াল। পিস্তল বের করল কেভিন, এখান থেকেই গুলি করবে মেয়েটাকে। সামনের অন্ধকারের দিকে তাকাল কেভিন। মেয়েটা মাঠে নেমে অন্ধকার কবরের ফলকের আড়ালে বরফের মধ্যে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু গুলি করলে শব্দ হবে, পুলিশের গাড়ি কাছাকাছি টহল দিলে মুস্কিলে পড়তে হবে। তার চেয়ে ওকে ছুটে ধরে ফেলা সহজ হবে।
রিধিমা উঠে দাঁড়িয়েই পড়িমড়ি করে ছুটেছিল অন্ধকার কবরখানার মধ্যে দিয়ে। ভিতরের পেডেস্ট্রিয়ান ওয়াকওয়ের বরফ পরিষ্কার করা হয়েছে সম্ভবতঃ দিনের বেলায়, কিন্তু রাতের তাপমাত্রা নেমে যাওয়ায় রাস্তা আইসস্কেটিং রিঙ্কের মত পিচ্ছিল । জোরে দৌড়োতে গেলে পা হড়কে হড়কে যাচ্ছে। প্রাণভয়ে রিধিমা অন্ধকারে নেমে গেল কবরের মধ্যেকার বরফ ঢাকা মাঠে। সামনে একটা বড় স্ল্যাব, রিধিমা সেখানে নিচু হয়ে নিজেকে লুকিয়ে পিছন ফিরে তাকাল— কেভিন ঢুকে পড়েছে ছোট লোহার দরজা দিয়ে।
নিচু হয়ে রিধিমা বরফের ওপর দিয়ে মাঠের ভিতরের দিকে যেতে লাগল। জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। রিধিমা জানে বরফের ভিতর পা ঢুকে ঢুকে তার গতিপথ এমনভাবে চিহ্নিত করে দিচ্ছে যে শিকারির এতটুকু সময় লাগবে না শিকারের কাছাকাছি পৌঁছে যাবার। হঠাৎ রিধিমার নাকে এল সিগারেটের গন্ধ।
সিগারেটের গন্ধ! এই জনমানবহীন কবরখানায়?
অন্ধকারে রিধিমার চোখ সয়ে গেছে, রিধিমা তাকিয়ে দেখল ওর বাঁদিকে একটা দু-ফুট রেলিঙ ঘেরা জায়গায় অনেকগুলো কবর, সাধারণতঃ একই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কবর দেওয়ার জন্য এরকম জায়গা কিনে রাখা হয়। ভিতরে একটা কবরের জায়গায় একটা তেরপলের ঢাকনা, তেরপল সরে যাওয়ায় ওখানে একটা গর্ত দেখা যাচ্ছে। রিধিমা তাড়াতাড়ি গর্তের দিকে এগিয়ে গেল— সিগারেটের গন্ধটা এখানে আরও প্রকট। রিধিমা কালবিলম্ব না করে রেলিং টপকে কবরের গর্তের মধ্যে নিজের শরীর নামিয়ে দিল। অন্ধকার কবরের গর্তে কফিনটা খোলা ওখানে একটা বিন্দু আলো জ্বলছে নিভছে— কেউ বসে আছে, সিগারেট টানছে।
‘হোয়াদ্দা হেল—?’ রিধিমার আগমন কবরের মালিকের মনঃপূত হয় নি ৷ তারপরই লোকটার নজর গেল রিধিমার হ্যাণ্ডকাফে— প্রিজনার? এস্কেপড হুসগৌ?’
‘না না, রিধিমা সজোরে মাথা নাড়ল। তারপর কাতর কণ্ঠে বলল, প্লিজ সেভ মাই লাইফ!’
দিস প্লেস ইজ ম্যাড বেইট,’ লোকটা সিগারেটটা কফিনের গায়ের বরফে গুঁজে দিল। তারপর গর্ত দিয়ে মাথা উঁচু করে বাইরেটা দেখল।
কেভিন বরফের ওপর দিয়ে রিধিমার পায়ের ছাপ অনুসরণ করে করে কবরের দিকে এগিয়ে গেল। ছাপ কবরের কাছে এসে শেষ। কেভিনের ঠোঁটে ক্রুর হাসি খেলে গেল। কবরের কাছে পৌঁছে কেভিন দেখল ভিতর থেকে একটা মাথা বেরিয়ে আছে।
‘মেয়েটা কোথায়?’ কেভিন বলল।
‘আর ইউ FIVE-O?’ ভিতরের লোকটা বলল।
‘না। মেয়েটাকে বের করে দাও।’
‘ইয়ো, ডোন্ট বি অল আপ ইন মাই গ্রিল।’
‘আই আইন্ট স্মোকিন হিয়ার,’ কেভিন পিস্তলটা লোকটার কপালের দিকে তাক করল।
‘হ্যাং ইন দেয়ার,’ লোকটা তড়াক করে কবরের গর্তের বাইরে বেরিয়ে গেল। ‘হোয়াট ইয়ু আর আপ টু?’
কেভিন নজর করেনি ওর পিছনে একটা সাড়ে ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা প্রায় আড়াইশ পাউণ্ড ওজনের জমাট অন্ধকার এগিয়ে এল, আর কেভিন কিছু বোঝার আগেই একটা বেসবলের ব্যাট ওর পিস্তল ধরা হাতে আঘাত করল।
রিধিমা শ্বাস বন্ধ করে মাথা নিচু করে মাথাটা পেটের ভিতর ঢুকিয়ে বসে ছিল। হঠাৎ উপর থেকে কিছু একটা ছিটকে নিচে বরফের মধ্যে গেঁথে গেল। উপরে ধস্তাধস্তির আওয়াজ। রিধিমা এগিয়ে ঝুঁকে বস্তুটা তুলল। পিস্তল। রিধিমা ভয়ের চোটে পিস্তল হাতে চুপচাপ বসে রইল। কিছুক্ষণ পর উপরের আওয়াজ কমে গেল, এবার সাহস সঞ্চয় করে মাথা উঁচু করে গর্তের বাইরে তাকাল। কেভিন ঊর্ধ্বশ্বাসে গেটের ছুটে পালাচ্ছে, ওর রাশিয়ান নেভি মার্কা ওভারকোটটা গায়ে নেই। দুটো ছায়ামূর্তি ওর দিকে তেড়ে যাচ্ছে, একজনের হাতে একটা বেসবল ব্যাট।
লোকদুটো কিছুদূর গিয়ে ফিরে এল।
এরা কারা?
একজন সাড়ে ছ’ফুটের কাছাকাছি লম্বা, অন্যজন অত লম্বা না হলেও ছ’ফুট তো হবেই। দু’জনে রিধিমার সামনে এসে দাঁড়াল। ওদের একজনের হাতে একটা ওভারকোট ঝুলছে। রিধিমা বুঝল এটা কেভিনের, ধ্বস্তাধস্তির সময় খুলে গেছে।
লোকদুটো আর এগোচ্ছে না। রিধিমা এবার দাঁড়াল। বোঝা যাচ্ছে লোকদুটো হোমলেস। কবরের গর্তের ভিতর থেকে বডি সরিয়ে ওখানে বাসা বানিয়েছে। এরকম কতজন হোমলেস আছে কে জানে কবরখানায়।
‘গান!’ লম্বা লোকটা হাত বাড়াল।
রিধিমা পিস্তলটা লোকটার দিকে এগিয়ে দিল।
‘দ্যাট ডিক ওয়াজ উইট দিস বিস্কিট ইন হ্যাণ্ড।’ হোমলেস লোকটা পিস্তলটাকে চোখের সামনে নিয়ে নাড়াচাড়া করল। ‘হেকলার।’
রিধিমা ঠাণ্ডায় ভয়ে কাঁপছে— ‘ও একটা খুনি, আমাকে মারতে এসেছিল।’
‘ম্যা-অ্যান, দ্যাট বৌয়েন গট বেকড, ফুললি ব্লোওন।
লম্বা লোকটা বলল, ‘আমি বললাম— কিন্তু ও শুনলই না। সো উই হ্যাড টু বাস্ট হিজ গ্রিল!’ লোকটা কোটটা গায়ে পরে নিল।
‘ইয়াপ, ইয়োর নাকল স্যাণ্ডুইচ ওয়াজ টু হেভি ফর হিম।’
রিধিমা বলল, ‘থ্যাঙ্কস আ লট! লোকটা আমাকে মেরেই ফেলত।’
‘সাইড,’ লোকটা রিধিমার হ্যাণ্ডকাফ দেখাল।
রিধিমা হ্যাণ্ডকাফ লাগান দু হাত ছড়িয়ে শরীরের বাঁ দিকে নিয়ে এল। লোকটা গুলি চালাল হ্যাণ্ডকাফে। হাত মুক্ত হয়ে গেল— ফ্রি।’ লোকটা বড় বড় দাঁত বের করে হাসল।
‘তোমরা এই ঠাণ্ডায় এখানে? শেল্টারে কেন যাচ্ছ না?’
‘শেল্টার!’ একজন বলল। ‘আজ হোমলেস শেল্টার, কাল কেনিয়া ডিপোর্ট। এনিওয়েজ—’
রিধিমা বুঝল এরা ইল্লিগাল ইমিগ্র্যান্ট।
‘অল রাইট, লেটস রোল আউট। ইউ গো ব্যাক টু ইয়োর ক্রিব নাউ,’ ছ’ফুট লোকটা বলল।
লোকদুটো রিধিমাকে পার্কের অন্যপ্রান্তে পৌঁছে দিল। অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে রিধিমার মনে পড়ে গেল কে যেন তাকে বলেছিল যতই অন্ধকার হোক না কেন নিউ ইয়র্ক সিটির অন্ধকারও ২৪ ঘন্টা জেগে থাকে।
‘চেক আউট,’ বেসবল ব্যাট হাতের হোমলেসটা রাস্তার উল্টোদিকের হাসপাতালের ইমারজেন্সি লেখা লাল বোর্ডটা দেখাল— ‘ওখানে একটা ক্যাব দেখা যাচ্ছে।’
‘এবার আমি যেতে পারব, অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর হেল্প।’
‘নো, ইউ আর অ্যান ইজি মার্ক।’ লোকদুটো দাঁড়িয়ে রইল।
রিধিমা জানে ওদের পক্ষে সম্ভব হলে ওরা হাসপাতাল পর্যন্ত আসত। রিধিমা রাস্তা পেরিয়ে হাসপাতালের ইমারজেন্সির ড্রাইভওয়ে দিয়ে হাঁটা লাগাল। গেটের সামনে একটা ইয়েলো ক্যাব দাঁড়িয়ে। খালি? রিধিমা এগিয়ে গেল। ক্যাব চালক রিধিমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকাল, তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘হোয়ার টু?’
রিধিমা ইতস্ততঃ করল। মোহনের ঠিকানাটা ভুলে গেছে। ক্যাব ড্রাইভার বলল— ‘ইণ্ডিয়ান?’
‘হ্যাঁ,’ রিধিমা বলল। ‘আপনিও ইণ্ডিয়ান?’
‘পাকি।’
‘ইণ্ডিয়ান পার্মানেন্ট মিশন কোথায় জানেন? ‘
‘ইণ্ডিয়ান মিশন তো সেই ফর্টি থার্ড স্ট্রীট!’ ক্যাব ড্রাইভার বলল। ‘সে তো ম্যানহাটনে!’
‘আপনি ওদিকে যাবেন না?’ রিধিমা বলল।
‘আমার বাড়ি জার্সি সিটি, ড্রাইভার বলল। ‘একদম উলটো দিকে। ‘তাহলে?’ রিধিমার কণ্ঠস্বরে হতাশা। ‘অ্যাকচুয়ালি, আমি নিউ ইয়র্ক ভাল চিনি না।’
‘ওককে,’ ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করল। ‘চলুন, আপনাকে আমি ছেড়ে আসব।’ ‘থ্যাঙ্কস,’ রিধিমা ভগবানকে ধন্যবাদ দিল। রিধিমা জানলা দিয়ে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাল। কবরখানায় পাথরের দেয়াল ঘেঁষে অন্ধকারে দুটো ছ’ফুটের অন্ধকার অপেক্ষা করছিল। রিধিমা সেদিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। একরাশ কৃতজ্ঞতার উষ্ণতা বাইরের বরফের উপর দিয়ে ছুটে গেল কবরখানার দিকে।
‘এই দুর্যোগের মধ্যে বেরিয়েছেন!’ ড্রাইভার চালাতে চালাতে প্রশ্ন করল। ‘আজ তো অফিস, স্কুল, কলেজ, আদালত সব বন্ধ।’
‘আপনিও তো ক্যাব নিয়ে বেরিয়েছেন,’ রিধিমা বলল।
‘আমার এক বন্ধুর পরিবারকে দেখতে গেছিলাম হসপিটালে। এই ঠাণ্ডায় বাড়ির হিটিং সিস্টেম বিকল হয়ে গেছিল, তাই চারজন বাড়ির বন্ধ গ্যারাজে গাড়ির ইঞ্জিন অন করে হিটিং চালু রেখে গাড়িতে ঘুমিয়ে ছিল। কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং, বুড়োটা কোমাতে চলে গেছে, বাকিরাও ICU তে।’
রিধিমা চুপ করে রইল। কথা বলতে ভাল লাগছে না। হোমলেস দু’জন না থাকলে ওর কী অবস্থা হত ভাবতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে রিধিমা। হাতের তালু জ্বালা করছে, নুনছাল উঠে গেছে। রিধিমা কুঁকড়ে বসে রইল পিছনের সিটে। রিয়ার ভিউ মিররে চোখ গেল, ড্রাইভারটা নজর রাখছে।
ফটি থার্ড স্ট্রীট যে এত দূরে হবে রিধিমা ভাবতেও পারে নি— ‘ফিফটি সিক্স ডলার।’
‘আমার কাছে এত ডলার নেই,’ রিধিমা ইতস্ততঃ করে বলল— ‘তাড়াহুড়োতে বেরিয়ে আসতে হয়েছে।’
‘যিতনা দে সকে দে দো, প্যাহেঞ্জি, পাঞ্জাবী অ্যাকসেন্টে ড্রাইভার বলল।
রিধিমা পকেটে দেখল— দশ ডলার।’ চায়নাটাউন বাসের খুচরোটার থেকে কুড়ি ডলার বাস ড্রাইভারকে দিয়েছিল, পাঁচ ট্যাক্সিওয়ালাকে টিপস।
‘চলেগা।’
‘বহত মেহেরবানি ভাইসাব।’ রিধিমা কৃতজ্ঞতা জানাল।
‘ছাড্ড, এক দিশি প্যাহেনকে লিয়ে দিশি ভাই ইতনা নেহি কর সকেগা?’
ড্রাইভার ডলার পকেটে গুঁজে ক্যাব ঘুরিয়ে চলে গেল। অপসৃয়মান ক্যাবের লাল টেল-লাইটের দিকে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রিধিমা ভাবল— দিশি? পাকিস্তানী লোক ভারতীয় মেয়ের দিশি ভাই? আমাদের ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে শূলে চড়িয়ে দিচ্ছে। আর এই লোকটা ওকে দিশি বোন বলে গেল। এখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছে সম্পূর্ণ উলটো পথে। চোখের জল গালে গড়াচ্ছে, রিধিমা গাল মুছল— এই কনকনে ঠাণ্ডায় চোখ দিয়ে জল বেরোয়। রিধিমা বোঝার চেষ্টা করল— এই জল ঠাণ্ডার না উষ্ণতার?
৷৷ তেরো ৷৷
ক্যাব থেকে নেমে রিধিমা অভ্যাসবশতঃ হাতঘড়ির দিকে তাকাল। হাত খালি। অ্যাপল ওয়াচ এখন মেজরের বাথরুমে টয়লেট পেপার-বন্দী হয়ে ট্র্যাশে।
রিধিমা তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল পার্মানেন্ট মিশনের দিকে। মিশনের দরজার পাশের দেওয়ালের পুশ বাটনটা টিপতেই কড়াক করে আওয়াজ হল, দরজা খুলে গেল। রিধিমা দু-কদম হেঁটে বাঁদিকে সিকিউরিটির কাঁচের জানলায় গেল। সিকিউরিটি গার্ড চেঞ্জ হয়েছে, রিধিমাকে বলল— ‘কী চাই?’
‘সেকেণ্ড সেক্রেটারি মোহন গুপ্তা,’ রিধিমা বলল।
‘এত রাতে?’ সিকিউরিটি গার্ডের চোখে বিস্ময়। অ্যাপয়ন্টমেন্ট আছে?’
‘ওঁর সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা দেখা হয়েছে এখানে।
সিকিউরিটি গার্ড মোহনের কামরার পেজারের বোতামটা টিপল।
‘হু ইজ দিস?’ স্পিকারে মোহনের গলা।
‘আপনার একজন গেস্ট, স্যার।’
‘আমার গেস্ট?’ মনে হল মোহন অবাক। ‘কী নাম?’
রিধিমাকে গার্ড নাম জিজ্ঞাসা করল। রিধিমার নাম শুনে মোহন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। গার্ড একটু অপেক্ষা করে পেজারের স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বলল— ‘স্যার?’
অপমানে রিধিমার কান লাল হয়ে উঠল। এই মুহূর্তে যদি এই অচেনা শহরে আর একটাও থাকার জায়গা থাকত সে সেখানেই চলে যেত।
মোহন বলল— ‘ওককে, সেন্ড হার ইন।’
‘ইলেভেন ও ফোর,’ গার্ড রিধিমাকে বলল।
এলিভেটর এগার তলায় নিয়ে এল রিধিমাকে। এগারশ চার নম্বর রুমে ডোরবেল বাজাতে মোহন দরজা খুলল। মোহনের গায়ে একটা উলেন রোব, ওর স্নান করা শরীর থেকে সুগন্ধ আসছে। মোহনের চোখে-মুখে বিস্ময়— তুমি? এই রাতে? তোমাকে পুলিশ ছেড়ে দিল?’
‘তুমি বললে এটা অফিস? এখানে থাকো যে সেকথা তো বল নি!’
‘নিচের ছ’টা ফ্লোর, বেসমেন্ট এবং সেলার ডিপ্লোমেটিক অফিস। উপরের ফ্লোরগুলোতে মিশনের ডিপ্লোম্যাট, ইণ্ডিয়ান কনসুলেটের কর্মীরা থাকে। বলার সুযোগ পাইনি। বাইরের লোকেরা এখানে থাকতে পারে না।’
‘চিন্তা নেই,’ রিধিমা আত্মসম্মানকে শত কষ্টেও খাড়া করে রাখল। ‘আয়্যাম নট ক্র্যাশিং হিয়ার টুনাইট।’ রিধিমা হাত বাড়াল, আমার ল্যাপটপ।’
‘ভিতরে এসো,’ মোহন হলওয়েতে এক ঝলক দেখে নিয়ে রিধিমাকে তাড়াতাড়ি ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। এবার রিধিমার শরীরের দিকে নজর গেল মোহনের— ‘একি অবস্থা হয়েছে তোমার? জ্যাকেটের হাতা ছিড়ে গেছে, প্যান্ট ভেজা— ওরা টর্চার করেছে থানায়?’
রিধিমা কী উত্তর দেবে। অনেক কিছু বলতে হয়, মোহন যা শোনার যোগ্যতা হারিয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি মোহনের নিজেরও বোধহয় শোনার আগ্রহ নেই। ‘ল্যাপটপটা ফেরত নিতেই এসেছি।
‘ওটা ফার্স্ট সেক্রেটারির অফিসেই রয়ে গেছে।’
‘ওটা আমার এখুনি খুব দরকার—’
মোহনের কপালে কয়েকটা ভাঁজ— ‘দাঁড়াও, দেখছি। তুমি একটু ওয়েট কর।’ মোহন বেডরুমে গিয়ে পোশাক পালটে বেরিয়ে গেল আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল, হাতে রিধিমার ব্যাকপ্যাক।
রিধিমা চটপট ল্যাপটপ খুলে প্লাগ লাগিয়ে ইন্টারনেটে গিয়ে বলল, ‘তোমাদের ওয়াইফাই পাসওয়ার্ডটা কী?’
এক মুহূর্তের দ্বিধা মোহনের চোখে।
রিধিমা আর দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করল না, ল্যাপটপটা মোহনের দিকে ঠেলে দিল। মোহন পাসওয়ার্ড পাঞ্চ করে ল্যাপটপটা রিধিমাকে ফেরত দিল। ‘পুলিশ ছেড়ে দিল?’ মোহন কৌতূহলী।
‘লোকগুলো পুলিশ ছিল না।’ রিধিমা ফাইণ্ড মাই আই ফোন ব্রাউজ করে সাইটে গেল।
‘তবে!’ মোহন বলল।
‘ক্রিমিনাল।’ নিজের অ্যাপল ওয়াচকে লক করে ঘড়িটাকে ট্র্যাক করে ফেলল রিধিমা। তাড়াতাড়ি ঠিকানাটা রাইটিং প্যাড বের করে লিখে নিল। ১০, ইণ্ডাস্ট্রিয়াল স্টোরেজ প্লেস, সানসেট পার্ক, ব্রুকলীন, নিউ ইয়র্ক। রিধিমা ল্যাপটপ বন্ধ করে দেওয়ালে ল্যামিনেটেড ক্যানভাসের হাস্যরতা সুন্দরী, মেয়েটার দিকে অল্প সময় তাকিয়ে বলল— ‘তোমার বৌ?’
‘হ্যাঁ,’ মোহন বলল। ‘ইণ্ডিয়া গেছে ভাইয়ের বিয়েতে।’
‘তুমি যাও নি?’
‘বিয়ে এখনো পনের দিন বাকি,’ মোহনের দৃষ্টিতে এখনো বিস্ময়। ও সবটা বুঝে উঠতে না পারলে স্বস্তি পাচ্ছে না।
‘ঠিক আছে, চলি,’ রিধিমা ল্যাপটপ ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল।
‘এই রাতে কোথায় যাবে?’
রিধিমা চারদিকে তাকাল। বেশ বড় অ্যাপার্টমেন্ট। দেওয়ালে লাগানো ফ্ল্যাট স্ক্রিন টিভি, উল্টোদিকের দেওয়াল ঘেঁষা একটা সোফা-কাম-বেড, কফি টেবলে মোটা মোটা হার্ড-কভার বই। মোহনের ডেল ল্যাপটপটা সোফার মাথার কাছে। ইট-ইন কিচেনে ডাইনিং টেবিলে একগাদা না খোলা মেইল।
‘দেখি যদি সত্যিকারের পুলিশ খুঁজে পাই,’ রিধিমা বলল।
‘এত রাতে?’ মোহন বলল। ‘না না, তুমি এখানেই থেকে যাও বাকি রাতটা। কাল আমি বসকে বলব। ডিনার করেছ?’
ডিনার! রিধিমা মনে মনে হাসল। লাঞ্চই হয় নি। রিধিমা ওর ব্যাকপ্যাকটাকে মেঝে থেকে তুলে আই ফোন চার্জারটা বের করে ফোনটাকে চার্জারে প্লাগ ইন করল। ‘বাথরুমটা ইউজ করি?’
‘হ্যা, হ্যাঁ, যাও। আমি ততক্ষণ খাবার গরম করি।’
‘না, তার দরকার নেই, আমি বেরিয়ে যাচ্ছি।’
‘বললাম তো, কাল সকালে যেও। মিনিস্টারকে রিসিভ করার সময় আমি এয়ারপোর্টে ডেপুটি কনসুলকে বলব।’
‘তুমি শিওর?’ রিধিমা মোহনের চোখে আসল উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করল। মোহনের চোখের তারায় আশ্বাস— ‘আমার ওপর একটু ভরসা রাখো। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘ঠিক আছে,’ রিধিমা উঠে দাঁড়াল। জামা কাপড় প্যাচপ্যাচ করছে। ‘একটা শুকনো সালোয়ার-কুর্তা দিতে পার?’
‘হ্যাঁ, দিচ্ছি।’ মোহন ক্লজেট খুলে এক সেট ভাঁজ করা সালোয়ার কুর্তা দিল। ‘লিনেন ক্লজেটে টাওয়েল আছে।’
বাথরুমে শাওয়ারের গরম জল শরীর থেকে ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছিল। রিধিমা ঘাড়ে সাবান ঘষছিল। কেভিন বুচার ওর ঘাড়ে আলতো এক কামড় বসিয়েছিল। র্যাবিজ-ট্যাবিজ হয়ে যাবে না তো? বাইরে মাইক্রোওয়েভ অন করার আওয়াজ, আর সঙ্গে সঙ্গে রিধিমার মুখের ভিতর স্যালাইভার সিক্রিশন শুরু হল ৷ খুব ক্ষিদে পেয়েছে।
বাথরুমটাকে বাষ্পে ভরিয়ে মোহনের দেওয়া সালোয়ার-কুর্তা পরে বেরিয়ে এল রিধিমা। মোহন ঘরটা পরিষ্কার করছে। ডাইনিং টেবলে একটা ডিশ পাতা, পাশে একটা পাত্রে পাস্তা, তাতে শ্রিম্প, ব্রকোলি আর জুকিনি মেশানো, ঘরে গরম খাবারের গন্ধ। মোহন চিঠিগুলো ডাইনিং টেবিল থেকে সরিয়ে জায়গা বানাচ্ছে।
‘তোমার ড্রায়ারে এই ভেজা কাপড়-জামা শুকিয়ে নিতে পারি?’
‘ধোবে না?’
‘তার দরকার নেই।’
বাথরুমের পাশেই ছোট ইউরোপিয়ান ওয়াশার-ড্রায়ার। রিধিমা দলা করা জিনসের প্যান্ট, শার্ট, মোজা, অন্তর্বাস, এমন কি গ্রাঞ্জি জ্যাকেটটাও ঢুকিয়ে ডেলিকেটস অন করল। মোহন টিভিটা অন করেছে, টিভিতে লোকাল চ্যানেলে খবর দেখাচ্ছে। আজ চারদিকে খবরে শুধু ব্লিজার্ড আর ব্লিজার্ড। নিউ ইয়র্ক সিটির হোমলেস শেলটারগুলোর ছবি দেখাচ্ছে। ভিতরে গিজগিজ করছে লোকেরা, কেউ চেয়ারে, কেউ মাটিতে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে, ঘোষক বলছে সিটির ৩৯টি লোকেশনের হোমলেস সেন্টারের ৭২০০ বেড ভরে গেছে। পুলিশ আরও খুঁজে খুঁজে হোমলেসদের ধরে নিয়ে আসছে, তবে হিসাবের বাইরের কত হোমলেস যে প্ল্যাটফর্মে, পার্কে, ব্রিজের নিচে শীতের সঙ্গে লড়াই করছে তা আমাদের জানা নেই। গত বছর জানুয়ারিতে তিন হাজারের ওপর হোমলেস মানুষকে রাস্তায় রাত কাটাতে দেখা গেছে। অথরিটি উদ্বিগ্ন যে এই সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে।
‘নাও শুরু কর,’ মোহন বলল।
রিধিমা খাওয়া আরম্ভ করল। মোহন এখনো ঠিক ততটাই বাজে কুক রয়ে গেল। তবু গরম খাবার পেটে ঢুকতে শরীরে যেন শক্তি ফিরে আসতে লাগল। রিধিমা খেতে খেতে মোহনকে জিজ্ঞাসা করল ‘মোহন, আমি সরি। আমার জন্য তোমায় এত অসুবিধায় পড়তে হল।’
‘দ্যাটস অলরাইট, রিধিমা,’ মোহন অন্যমনস্ক ভাবে বলল। ‘তুমি আমাদের কথা শুনে আমাদের দলে থাকলে আমাদের দেশকে অনেক হেল্প করতে পারতে। আসলে আমাদের শুক্রবারের এই ডিবেটটা যদিও নেপালের সঙ্গে, কিন্তু আসল লড়াইটা এগেইনস্ট চায়না।’
‘চিন?’
‘কন্টিনিউয়াসলি তাতাচ্ছে নেপালকে। লুম্বিনী প্রজেক্ট মনে আছে তো?’
রিধিমা মাথা নাড়ল। বুদ্ধধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা যে কোনও ভারতীয় জানে লুম্বিনী প্রজেক্ট নিয়ে চিন ভারতকে কতটা অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কিন্তু রিধিমা এখন এসবের কথা চিন্তাই করতে পারছে না। মনে শুধু বার বার হানা দিচ্ছে খুনি কেভিনের অস্বস্তিকর দৃষ্টি। যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে সে।
‘ভারত আর নেপালের মধ্যে ক্রমশঃ ফাটল বেড়েই চলেছে,’ মোহন বলে চলল— ‘কূটনীতির সব চাল চেলে যাচ্ছে চিন। এই বুদ্ধ হল ওদের আরেকটা হাতিয়ার।’ তারপর মোহন অনুনয় করে বলল, ‘তুমি কি সত্যিই পার না লিখে দিতে যে পিতরাওয়া থেকে পাওয়া হাড় সত্যি সত্যি বুদ্ধের হাড়?’
মোহন চিরকাল স্বার্থপরই রয়ে গেল, শুধু নিজের স্বার্থ, রিধিমার মুখে পাস্তাটা তিতকুটে লাগছে। মোহন, আমি যদি লিখে দিতে পারতাম তবে আমাকে এত সব ঝামেলা পোহাতেই হত না। কিন্তু ইতিহাসের একটা সম্ভাব্য কলঙ্কিত অধ্যায় চিরকালের জন্য চাপা পড়ে যাবে তাহলে।’
‘রিধিমা, প্লিজ!’ মোহন দু’হাত জোড় করল। ‘ফর ইয়োর কানট্রি।’
‘আমাদের তিনজন প্রফেসর মিথ্যাকে সমর্থন করল না বলে খুন হল।
‘কিন্তু ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা তো বলে গেছে যে পাত্রের গায়ে ব্রাহ্মীতে লেখা ছিল ওই পাত্রে রাখা বুদ্ধের হাড়।’
‘তাই কি?’ রিধিমা খাওয়া থামাল। ‘ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিউরেটার ডঃ মাইকেল উইলিস বছর সাতেক আগে বলেছেন যে পিতরাওয়া ইনস্ক্রিপশনটা মার্কাস ফিউরারের জালিয়াতি। একশ বছর আগে পালি স্কলার প্রফেসর হাইনরিখ লুডার মোটামুটিভাবে একই কথা বলেছিলেন।’
‘আমিও ইতিহাসের ছাত্র। আমি সহমত নই,’ মোহন বলল।
‘তাহলে আজও কলকাতা মিউজিয়ামের একতলায় কেন একমাত্র ওই গ্যালারিতে ফটো তোলা বারণ?’ রিধিমা শ্বাস নিল। ‘ডঃ থিওডোর ব্লচ সেসময় আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার ইস্টার্ণ সার্কেলের হেড ছিলেন। উনি হাড়গুলো কলকাতা মিউজিয়ামে দেখে বলেছিলেন ওগুলো মানুষের হাড়ই নয়।’
‘ডঃ ব্লচ মোটেই হাড় বিশেষজ্ঞ ছিলেন না।’
‘উনি কলকাতা মিউজিয়ামের হেড ছিলেন, কিন্তু ওঁর পশুতত্ত্ববিদ বন্ধুদের দিয়ে হাড় পরীক্ষা করিয়ে উনি এই মন্তব্য করেন। উইলিয়াম চেপ্পি নিজেও একটা দাঁত রেখে দিয়েছিলেন। ঐ দাঁত আজকের ঐতিহাসিক চার্লস অ্যালেক্স ২০০৪ সালে লণ্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জীবাশ্ম প্রত্নতাত্ত্বিকদের দিয়ে পরীক্ষা করান এবং জীবাশ্মবিদরা বলেন ওটা একটা শুয়োরের দাঁত। তাছাড়া চেপ্পি এশিয়াটিক সোসাইটির রিপোর্টে লিখেছেন যে হাড়গুলো দেখে মনে হচ্ছে মাত্র কিছুদিন আগে তুলে আনা হয়েছে। বুদ্ধের ২৫০০ বছর আগে চিতার আগুনে জ্বলে যাওয়া পুরোনো হাড় দেখে কিভাবে সেটা মনে হয়? পিতরাওয়াতে অত বড় বড় হাড় কীভাবে পাওয়া যাবে? পিতরাওয়ার হাড়গুলো দেখে মনেই হয় না যে ওগুলো কোনো চিতার হাড়, মনেই হয় না যে ওগুলো কখনো জ্বালানো হয়েছিল।’ রিধিমার এ মুহূর্তে একটুও ইচ্ছা করছে না মোহনের সঙ্গে তর্ক করতে। মাথায় চিন্তা ঘুরছে কীভাবে এই ভয়ঙ্কর বিপদের চোরাবালি থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য মোহনের সাহায্য পাওয়া যায়।
‘তোমরা তাহলে পিতরাওয়ার গোটা ইন্সক্রিপশনটাকে ইগনোর করবে?
ওখানে ক্লিয়ারলি লেখা ছিল ওটা বুদ্ধের হাড়।’ মোহন নাছোড়।
‘পিতরাওয়া ইন্সক্রিপশনটাই একটা ফ্যালাসি।’
‘ফ্যালাসি!’ মোহনের গলার স্বরে উম্মা। ‘কীসের ফ্যালাসি!’
‘পিতরাওয়ার কলসীর গায়ের ইন্সক্রিপশন দেখে মনে প্রথম প্রশ্ন জাগে ওখানে বানান ভুল কেন?’
‘বানান ভুল?’
‘হ্যাঁ, আমি দেখাচ্ছি।’ রিধিমা মোহনকে ভালভাবে চেনে৷ তর্ক হল ওর প্যাশন। কিন্তু ওকে এখন থামানো দরকার। নতুবা ভাঙা ভাঙা যুক্তি হাজির করে ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকবে। আধ-খাওয়া পাস্তার ডিশ-ফর্ক ঠেলে পাশে সরিয়ে ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে পটাপট ল্যাপটপ অন করল। মোহন ল্যাপটপে ঝুঁকল। রিধিমা বলল, ‘এখানে—,’

‘এটা হল সভতিনিকনং, পণ্ডিতরা সবাই একবাক্যে বলে গেছেন ওটা হবে সভগিনিকনং। মানে উইথ সিস্টারস। এত ইজি স্পেলিং মিসটেক?’ রিধিমা আরেকটু স্ক্রল করল – ‘আর এই জায়গাটা ‘ল্যাপটপের স্ক্রিনের একটা জায়গায় আঙুল দিয়ে গোল করে দেখাল রিধিমা। ‘এখানে—’

‘এখানে সকিয়নং এর ইয়নংটা লিখতে গিয়ে মিস হয়ে গেছে। তাই উপরে লেখা হয়েছে।’ রিধিমা দেখাল। উপরের তিনটে অক্ষর নিচে নেমে আসা উচিত এভাবে—’

‘ভাবতে পার ভগবান বুদ্ধের চিতার অস্থির ওপর স্তূপ বানানো হচ্ছে, কত সময়-কত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, সেই বুদ্ধের অস্থির কলসের এই লিপিতে বানান ভুল? যদি লিখতে গিয়ে বানান ভুল হয়ও, তখন ওরা আরেকটা সাজিমাটির কলস এনে তাতে আবার লিখতে পারল না? দুটো লাইন লিখতে কত আর সময় লাগে? আর সাজিমাটির কলস তো তখন চারপাশে অ্যাভেইলেবল। তবে? তথাগত বুদ্ধকে একদিকে শ্রদ্ধা করে ভগবান লিখছে, আর ভগবানের অস্থির কলসে এই বানান ভুল কারেক্ট না করে রেখে দিল? আর এতগুলো বানান ভুল হল কীভাবে? অশোকের শিলালিপি কত জায়গায় লেখা হয়েছে, শিলালিপি লেখার জন্য কত পারদর্শী লিপিকার ছিল তখন, ওদের ওখানে এরকম দু’লাইনে দুটো বানান ভুল কখনো দেখা গেছে? না। সাঁচী, ভিলসা, শতধারা এসব স্তূপের গায়ে লেখা ১৯৬টা লিপি দেখেছি। কই সেখানে তো কোনও একটাতেও বানান ভুল নেই এরকম। তাহলে কি লিপিকাররা এটা লেখে নি? লিখেছে অন্য কেউ? এবং যে এটা লিখেছে সে কি ব্রাহ্মী লিপি সম্বন্ধে বেশি অভিজ্ঞ ছিল না? নাকি কোনো অল্প শিক্ষিত কেউ এটা লিখেছে?’
‘কীভাবে বানান ভুল হল?’
‘কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে লিখতে গিয়ে বানান ভুল করে ফেলেছে।’
‘কিন্তু কেন কেউ তাড়াহুড়ো করে লিখতে যাবে?
‘সেই উত্তরই তো খুঁজছি,’ রিধিমা অন্যমনস্কভাবে বলল। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক অ্যালেক্সের ধামা চাপা দেওয়ার থিওরি হল যে এটা লেখাবার সময় সেখানে শিক্ষিত কেউ ছিল না, একজন অনভিজ্ঞ স্থানীয় লোককে দিয়ে এই লিপি লেখানো হয়। সেই লোকটা অনেক বিশ্রী ভুল করে ফেলল। রাজা নিজে লিখতেন না বা পড়তেন না, তাই লিপিকারের কথায় বিশ্বাস করে রাজা বললেন এই কলসের ঢাকনা বন্ধ করা হোক।’ রিধিমা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘কোনও সেন্সিবল ভারতীয় এই হাইপথেসিস বিশ্বাস করতে পারে মোহন? রাজা এত খরচা করে স্তূপ বানাবে, কলসের মধ্যে বুদ্ধের হাড়ে এত সোনাদানা রাখবে আর কলসের গায়ে লিপি লেখার মত কাছাকাছি কোনও শিক্ষিত লোক পেল না? অশিক্ষিত লোক বানান ভুল করল সেটা রাজার কোনও শিক্ষিত রাজকর্মচারীদের নজরে এল না? ব্রিটিশরা প্রাচীন ভারতীয়দের কী মনে করে? ব্রিটিশরা ভারতে আসার আগে ভারতে সবাই অশিক্ষিত ছিল? ভারতীয়রা অশোকের সময়ের থেকে ন্যূনপক্ষে তিনশ বছর আগে লেখা শুরু করেছিল। প্রফেসর ম্যাক্সমুলার বলেছেন যে ভারতীয়রা ৪০০ বিসিতে লিখতে জানত। তাহলে এত বানান ভুল হবে কীভাবে? তাছাড়া চেপ্পি নিজে স্টেটমেন্টে লিখেছে যে অস্থিকলসগুলোর গাত্রে ছেনির দাগ একদম তাজা, মনে হয় যেন কদিন আগে বানানো হয়েছে।’
মোহনকে এবার অপ্রস্তুত দেখাল।
‘এই ব্রিটিশগুলো কবে যে বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে পৃথিবীতে ওদের রাজত্ব আর নেই!’ রিধিমা পাস্তার প্লেটটা কাছে টেনে নিল। ‘ব্রেক্সিটের ইকোনোমিক ইম্প্যাক্ট সামলাতে পারবে কিনা সেটা ঠিক করতেই হিমসিম অথচ পড়ন্ত জমিদারীর দ্ধ জমিদারের রাজকীয় ইগো ষোলো আনা।’
‘তোমার কী মনে হয় ঠিক কী হয়েছিল?’
‘বুদ্ধের হাড় পিতরাওয়া স্তূপের নিচে ছিল। কিন্তু যে কলসে ছিল সেটা চুরি হয়েছিল।’
‘বুলশিট কনস্পিরেসি থিওরি!’ মোহনকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। ‘তাহলে বটম লাইন এই যে আমরা নেপালের কাছে UN-এ হার স্বীকার করে মেনে নেব যে কপিলাবস্তু ভারতের নয়?’
‘সে কথা আমি একবারও বলিনি মোহন। বরং আমার সঙ্গে যথেষ্ট তথ্য আছে যে কপিলাবস্তু একা নেপালের নয়, ভারতেরও। কিন্তু তোমাদের পিতরাওয়ার হাড়ের থিওরির বেসিসে না। আমাকে নিয়ে চল UN-এ আমি প্রমাণ করে দেব—’
‘ইটস টু লেট,’ মোহন মাথা দু’দিকে নাড়াল। ‘তোমার ক্রিডেনশিয়ালই এখন সন্দেহজনক। পুলিশ তোমাকে খুনের দায়ে ম্যানহান্ট করে চলেছে। তুমি আমাদের থেকে যত দূরে থাকবে ততই আমাদের মঙ্গল।’ তারপর হঠাৎ মোহন বিড়বিড় করে বলল, ‘তোমার কাছে যথেষ্ট তথ্য আছে যে কপিলাবস্তু একা নেপালের নয়, ভারতেরও?
‘হ্যাঁ।’
‘গ্রেট!’ মোহনের চোখমুখ ঝলসে উঠল। ‘আমি তোমার একটা এস্কেপ রুট দেখতে পাচ্ছি রিধিমা।’
‘সত্যি বলছ?’ রিধিমা উৎসাহী হয়ে বলল।
আমাদের কনসুলেট ছাড়াও আর একটা জায়গা আছে যেটা আমেরিকান পুলিশের টেরিটোরির বাইরে।
‘কোথায়?’
‘ইউনাইটেড নেশনস হেডকোয়ার্টার,’ মোহন চাপদাড়িতে ঘনঘন হাত বোলাচ্ছে। ‘UN হল ইন্টারন্যাশনাল টেরিটোরি, ওখানে আমেরিকান পুলিশদের নিয়ম খাটে না।’
‘পুলিশ ঢুকতে পারে না?’ রিধিমা যেন নৈরাশ্যের মেঘলা দিনের আকাশে আশার রামধনু দেখল।
‘শুধু পুলিশ কেন— FBI, আর্মি, কেউ না। UN-এর ভিতরে ঢুকে তুমি সারেণ্ডার কর। একটা ইন্টারন্যাশনাল খবর হয়ে যাবে। তারপর তোমার বিচার হোক। তোমার সলিড অ্যালিবাই আছে।’
‘কিন্তু UN-এর ভিতরে ঢুকব কিভাবে?’ রিধিমা বলল। ‘ইণ্ডিয়া কি আমাকে ভিজিটার পাস দেবে?’
‘না দেবে না।’
‘তাহলে? ওখানে নিশ্চয়ই এন্ট্রি পয়েন্টে কড়া পাহারা থাকে?’
‘হ্যাঁ, খুব কড়া পাহারা,’ মোহন বলল। ‘কিন্তু আমার মাথায় অন্য একটা প্ল্যান এসেছে। আমার বন্ধু বিক্রম প্রধানকে তোমার মনে আছে? JNUতে আমাদের চন্দ্রভাগা হস্টেলে আমার ফাইনাল ইয়ারে রুমমেট ছিল?’
‘কাঠমাণ্ডুর বিক্রম?’
‘হ্যাঁ। আমি IAS ক্লিয়ার করলাম, আর ও চলে গেল ললিতপুরে নেপাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্ট্যাফ কলেজে। বিক্রম এখন এখানে নেপাল কনসুলেটের ফার্স্ট সেক্রেটারি। আমার সঙ্গে খুব ভাল কন্ট্যাক্ট আছে। ওর সঙ্গে কথা বলে দেখি। ও যদি তোমায় একটা ভিজিটার পাস বানিয়ে দেয়। তবে তোমাকে প্রমিস করতে হবে যে তুমি ইণ্ডিয়ার বিরুদ্ধে কিছু বলবে না। জাস্ট ভিতরে ঢুকে সারেণ্ডার করবে।’
‘প্রমিস,’ রিধিমার দুচোখ চকচক করে উঠল। ‘কিন্তু বিক্রম রাজি হবে কি?’ বাকি পাস্তা শেষ করে রিধিমা ডিশ রাখতে উঠে রান্নাঘরে গেল। রান্নার জায়গাটা ততোধিক অগোছাল – ওভেনে হলুদের ছাপ, সিঙ্কে ডাঁই করা প্যান, ডিশ ।
‘ওয়াও,’ রিধিমা বলল।
‘ব্যাচেলার্স প্যাড নাউ’ মোহন অপ্রস্তুত হাসি হাসল। মোহন যখন গভীর কিছু ভাবত তখন ঘনঘন দাড়িতে হাত বোলাতো। মোহন এখন তাই করছে। রিধিমা জানে মোহন ভাবছে। ‘দাঁড়াও একবার দেখি বিক্রমকে যদি কন্ট্যাক্ট করতে পারি।’ মোহন ফোন নিয়ে নিজের বেডরুমে চলে গেল।
মিনিট দশেক পর মোহন বেরিয়ে এল। বিক্রম তোমাকে হাই বলেছে। ওকে সব খুলে বলতে হল। ও তোমাকে সব রকম হেল্প করবে। নেপালের কনসুল জেনারেলের বাবা মারা যাওয়ায় তাকে কাঠমাণ্ডুতে হঠাৎ চলে যেতে হয়েছে। বিক্রমের ওপর এখন নেপাল কনসুলের টেম্পোরারি দায়িত্ব। কিন্তু বিক্রম বলল যে ইভেন্ট পাস পেতে গেলে ওদের মন্ত্রীর পারমিশন চাই।’
‘মন্ত্রী কেন পারমিশন দেবে?’
মোহন দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে ‘নেপালের রাজনীতিতে মিনিস্টারদের একটা গ্রুপ প্রো-চায়না আর আরেকটা গ্রুপ হল প্রো-ইণ্ডিয়া। নেপালের প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট প্রো-চায়না। কিন্তু কিছু মন্ত্রী গোপনে ভারতের সমর্থক। বিক্রম ভারতে হায়ার স্টাডিজ করে গেছে, ও নিজেও ভারতের সমর্থক। চাইনীজ প্রেসার ওদের পিসফুল লাইফে এত স্ট্রেস দিচ্ছে যে ওরা সেই প্রেসার থেকে মুক্ত হতে চায়। যে মন্ত্রী আসছেন এঁর ছেলে দিল্লী আইআইটিতে পড়ে, এও নাকি চিনের দাদাগিরিতে তিতিবিরক্ত। তোমাকে ওদের মন্ত্রীকে রাজি করিয়ে ইভেন্ট পাস জোগাড় করতে হবে।’
‘কীভাবে?’
মন্ত্রী ভাবছে যে শুক্রবারের ডিবেটে নেপাল শিওর জিতবে। তোমার প্রথম কাজ মন্ত্রীর কনফিডেন্স একদম নষ্ট করে দিতে হবে। নেপালের মন্ত্রীকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে ওদের ডিবেটে জেতার কোনও চান্স নেই।’
‘তাতে কী লাভ হবে?’
‘নেপালের মন্ত্রী যখন বুঝবে যে ওদের ডিবেটে জেতার কোনও চান্স নেই, তখন তুমি মন্ত্রীকে প্রোপোজাল দেবে যে ব্যাপারটা UN এর বাইরে দু’দেশের মধ্যে সেটল করতে, এখানে চিনকে ভিতরে আনলে নেপালের কোনও লাভ হবে না, বরং ক্ষতিই হবে। তুমি বলবে ইণ্ডিয়ার লজিকেরও প্রচুর হোলস আছে । সুতরাং এই ডিবেটে না নেপাল না ইণ্ডিয়া কেউই জিতবে না। দু’দেশই হারবে। কেউই পাবে না ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্টেটাস। বরং নেপাল ও ইণ্ডিয়া একটা প্রি-ডিবেট সেটলমেন্ট করুক। নেপাল মেনে নিক পিতরাওয়া হল কপিলাবস্তুর অংশ, সিমিলারলি ভারতও মেনে নিক নেপালের তিলৌরাকোটও কপিলাবস্তুর অংশ। ব্যাপারটা দু’দেশের জন্য উইন উইন।
‘কিন্তু তার সঙ্গে ভিজিটর পাসের কী সম্পর্ক?
‘তখন বিক্রম তোমাকে সাপোর্ট করবে আর তোমাকে অনুরোধ করবে UN প্রি-ডিবেট মিটিঙে থাকতে। তুমি বলবে ইণ্ডিয়া একাই কপিলাবস্তু চায়, তাই ইণ্ডিয়া চায় না তুমি UN এ যাও। তাই তোমার কাছে UN এ ঢোকার ইভেন্ট পাস নেই। তখন বিক্রম মিনিস্টারকে রিকোয়েস্ট করবে একটা গেস্ট পাসের পারমিশন দেবার জন্য। গেস্ট যে কেউ যে কোনও দেশেরই হতে পারে। সাউণ্ডস লাইক আ প্ল্যান?’
রিধিমার মনে ধরল প্ল্যানটা, সত্যি ডিপ্লোম্যাটদের মাথা খুব খ্যালে।
‘ওদের মন্ত্রী বুধবার আসছে। বিক্রম বলল বৃহস্পতিবার আফটারনুনে ও একটা টাইম ব্লক করে রাখবে। বিক্রমের ফোন নাম্বার লিখে দিচ্ছি। ওকে কল করে নিও।’
‘থ্যাঙ্কস!’ রিধিমা ব্যাকপ্যাকের সামনের পকেটে বিক্রমের ফোন নাম্বার লেখা কাগজটা ঢুকিয়ে নিল। ‘এত কাঠখড় পোড়াতে হত না যদি আমাকে CNN-এর জ্যাক গিলমোরের সঙ্গে একটা ইন্টারভিউ করিয়ে দিতে পারতে।’
‘তোমাকে কিছুতেই কেন বোঝাতে পারছি না রিধিমা,’ মোহন খুব বিরক্ত হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘জ্যাক গিলমোর ধুরন্ধর সাংবাদিক, ও তোমার মুখ থেকে বের করিয়েই নেবে যে হার্ভার্ডের মতে পিতরাওয়ার হাড় বুদ্ধের হাড় না। সেটা আমার দেশ বা আমি চাই না। প্লিজ, তুমি অন্ততঃ চার পাঁচ দিন ব্যাপারটাকে ভুলে যাও। নাউ ইউ নিড টু ক্যাচ সাম জি’স। আমার বেডরুমের খাটে গিয়ে শুয়ে পড়। একটা রাস্তা ঠিক বের হবেই -’
‘থ্যাঙ্কস,’ রিধিমা ড্রায়ার থেকে জামা কাপড় বের করে আনল। শুকিয়ে গেছে, সেই কাল থেকে পরে আছে। ধুয়ে নিলেই ভাল হত, কিন্তু মোহনের সারাদিনের বদান্যতার পর আর ওর উপকার নিতে মন চাইছিল না। যতটা না নিলেই নয়। আমাকে তো জান আমি হার্ডকোর কাউচ স্লিপার। সোফাই কমফোর্টেবল।’ রিধিমা জামা-প্যান্ট ভাঁজ করে সোফার পাশের কফি টেবলে রেখে ব্যাকপ্যাকটা মাটিতে সোফার পাশে টেনে শুয়ে পড়ল। মোহন বেডরুম থেকে একটা বালিশ আর কম্বল দিয়ে গেল।
‘থ্যাঙ্কস। গুড নাইট।’
‘গুড নাইট।’ মোহন লাইট নিভিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেল।
দশ মিনিটের মধ্যে রিধিমা ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ একটা পুলিশের গাড়ি নিচের রাস্তা দিয়ে এমন জোরে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে গেল যে রিধিমা ধড়মড় করে সোফায় উঠে বসল। ভয়। রিধিমা এদিক ওদিক ফিরে কানে বালিশ চাপা দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমোবার চেষ্টা করল, কিন্তু চিন্তার ওজন মাথার ওপর পাথর হয়ে চেপে বসছে। কিছুতেই ঘুম আর এল না।
‘ইম্পসিবল,’ রিধিমা উঠে বসল। ব্যাকপ্যাকটা সোফার পাশেই ছিল, মাথার কাছের টেবল-ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে বালিশটা টেনে তার ওপর পিঠ ঠেকিয়ে দাদার ডায়েরিটা বের করে পড়তে লাগল—
* * * * *
রাজকুমারী বুঝতে পারছে মাহাতোর কুদৃষ্টি তার বক্ষ লেহন করছে। সে কুঁকড়ে দু’হাত বুকের সামনে নিয়ে এল। মাহাতো চমনলাল দেবচরণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ভারিক্কি চালে বলল— ‘ভিতরে আয়।’
কাঠের মেঝেতে কাঠের জুতোর খটখট আওয়াজে অর্থের অহঙ্কারের প্রতিধ্বনী তুলে চমনলাল বাহারিতে ঢুকল, পিছনে পিছনে কুণ্ঠিত খালি পায়ে সপরিবারে দেবচরণ। অতিথিদের আপ্যায়ন করার জন্য বিশাল কক্ষ। দেওয়ালে বাঘের মাথা, বিরাট বিরাট শিঙওয়ালা বারশিঙ্গার মাথা। দেবচরণ তাজ্জব। দেওয়ালে একটা সেপাইয়ের বন্দুক ঝুলছে, দেওয়ালে একটা ফটো টাঙানো। দেবচরণ ক্যামেরার ফটোর গল্প শুনেছে, কিন্তু জীবনে সেই প্রথম নিজের চোখে ফটো দেখল।
‘এটা আমাকে রবিন সাহেব উপহার দিয়েছিল,’ চমনলাল গর্বের সঙ্গে বলল। ‘সাহেবরা এখানে শিকার খেলতে এসেছিল পাল্পা রাজার সঙ্গে—।’
‘পাল্পা রাজা!’ দেবচরণ যেন ভগবানের নাম শুনছে।
‘তা নয় তো কী?’ চমনলাল গর্বে ফেটে পড়ছে। ‘এই যে ছবিতে রানা রবিন সাহেবের পাশে বসে আছে। আর এই যে আমি।’ চমনলাল ছবিতে আরও গোটা পনের জনের ভিড়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা নিজের মাথাটা দেখাল। ‘পাল্পা রাজা খুশি হয়ে আমাকে নিজে মেডেল দিয়ে গেছেন।’ চমনলাল মেডেলটা আর দেখাল না। ‘বলে গেছেন আমার কোনও কিছুর অসুবিধা উনি রাখবেন না। আজ আমার এত জমিজমা সব ওঁর বন্ধুত্বের জন্যই। চল বাইরে চল।’
ডায়েরির গল্প কোনদিকে মোড় নিচ্ছে? রিধিমা জানে যে খড়া সামসের রানাকে পশ্চিম নেপালের সকলে খুবই ভয় করত। নেপালের ইতিহাস বলে নেপালের রাজা ধীর সামসের রানা মারা যাওয়ার পর তার ছেলেরা তাদের কাকা মহারাজা রণদীপ সিং রানাকে গুলি করে মেরেছিল এবং খুড়তুতো ভাইদের এক এক করে হত্যা করেছিল নিজেদের সিংহাসন লাভের পথের কাঁটা সরাবার জন্য। খড়া সামসের রানা ছিল এই হত্যাকারীদের নেতা। তার বড় ভাই বীর সামসের রানা নেপালের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বুঝতে পারল ছোটভাই খড়া সামসের রানার থেকে বিপদ আসতে পারে, তাই খড়্গা সামসের রানাকে কাঠমাণ্ডু থেকে সরিয়ে পাল্পায় পাঠিয়ে দিল। সেই থেকে খড়া সামসের রানা ‘পাল্পা রাজা।’ গোটা পশ্চিম নেপালে কারোর হিম্মত ছিল না ওর চোখের দিকে চোখ তুলে কথা বলে। সেই পাল্পা রাজা খড়্গ সামসের রানার সঙ্গে চমনলাল এক ফটোতে! তাহলে কি নেপালের রাজপরিবার এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল?
দেবচরণ হাত জোড় করে রানার ছবিতে নমস্কার করে চমনলালের পিছন পিছন বাইরে এল। উঠোনের কোনায় একটা বাঁশে অনেকগুলো ভুট্টা ঝুলছে, এগুলো পরের বছর চাষের জন্য। একটা ভুট্টা নিচে পড়ে গেছিল, সেটা পায়ের কাঠের জুতো দিয়ে লাথি মেরে উঠোনের কোনায় গমের খড়ের গাদার দিকে সরিয়ে দিয়ে মাহাতো বলল, ‘তুই কী কাজ করবি?’
‘যে কোনও কাজ, চাষবাস—’,
‘চাষের জমির এখানে খুবই চাহিদা, আইলানিতে লালপুজা না থাকলে তোকে কেউ চাষ করতে দেবে না,’ মাহাতো চমনলাল চারপাইয়ে এসে বসল। ‘তবে তোর তো একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। টিলার ওপরের জমির মাটি খুব উর্বর গোয়িন্দ না হলেও পালোও নয়। চাষবাস চলে। কিন্তু জমি কেনার ক্ষমতা কি তোর আছে?’
‘না,’ দেবচরণ বিমর্ষ হয়ে মাথা নাড়াল।
তোকে জমি আমি ধারে দিতে পারি,’ চমনলাল বলল। ‘আমার এই জমি তুই চাষ করবি, যা ফসল উঠবে তার চার আনা তুই নিবি,’ চমনলাল এক মুহূর্ত চুপ করল। ‘তবে তোর এই মেয়ে আমার বাড়িতে থাকবে।’
‘কমলারি!’
‘না না,’ জিভ দিয়ে চুকচুক আওয়াজ করে প্রতিবাদ করল চমনলাল। বাড়ির লোকের মত থাকবে এখানে।’ চমনলাল হেসে আশ্বাস দিল। আমার বৌ রাধার সঙ্গে থাকবে, সারাদিন আমাদের বাড়িতে থাকলে আমি তোর মেয়ের রোগ সারাবার জন্য ভাল বদ্যির ব্যবস্থা করব।’
‘মেয়ের রোগ সারবে?’
‘কেন সারবে না?’ চমনলাল বলল। ‘ওসব বড়া সিপার-টিপার দিয়ে কী কাজ হয় রে? আজকাল বিলেত থেকে কত ইংরেজি ওষুধ আসে। তোর মেয়ে ভাল হয়ে যাবে। শশুরা ভাল ঘরে হবে। তোর মেয়েকে আমার বাড়িতে লেখাপড়া শেখাব। কী নাম তোর মেয়ের?’
‘কুমারী’ দেবচরণ বলল। তারপর নিজেকে শোধরাল সে— ‘রাজকুমারী।’
‘তোর মেয়ে আমার বাড়িতে রাজকুমারীর আদরেই থাকবে। কিন্তু এক বছরের আগে তুই ওকে ফেরত পাবি না।
দেবচরণ তুলসীর চোখের দিকে তাকাল না, জানে তাকালে ওই চোখে কখনোই সে সম্মতি দেখতে পাবে না। বড্ড খুঁতখুঁতে তুলসী। এই প্রস্তাবে কোনও মন্দ দেখছে না দেবচরণ। মেয়ে তার নজরের মধ্যেই থাকবে। মেয়ের অপদেবতার অসুখ সারিয়ে তোলার এত ভাল সুযোগ আর আসবে না। রাজি হল দেবচরণ।
‘গোয়ালের পিছনের ওই কাঁচাপথ জঙ্গলে ঢুকে পাহাড়ের গা দিয়ে উপরে উঠে গেছে। ওখানে ওই টিলাটার ওপর আমাদের পুরোনো একটা চালাঘর আছে। আমাদের বাড়িতে শুয়োর ঢুকতে দেওয়া হয় না। ওখানে আগে শুয়োর থাকত। এখন খালি। তুই ওখানে থাকবি। তুই এখানে আসতে পারবি না মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে।’
দেবচরণ মাথা নিচু করে মাটিতে পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষতে লাগল।
‘এটা রাখ,’ বটুয়া থেকে একটা টাকা বের করল চমনলাল। ‘এখন কাজে আসবে। এটা শোধ দিতে হবে না। আর তোর আপাততঃ থাকার একটা বন্দোবস্ত করছি।’
টাকার সঙ্গে চমনলাল দেবচরণকে একতাল চিতল হরিণের মাংস দিল। উঁচু জাতের লোকেদের মত থারুদের শুয়োর নিয়ে এত বাছবিচার নেই। মেয়েকে চমনলালের বাড়িতে রেখে এসে জঙ্গল বেয়ে টিলায় এল দেবচরণ। চালাটার শোচনীয় অবস্থা, দুর্গন্ধে ভরা চারদিক। দুটো ময়ুর দৌড়ে চালার পিছনে চলে গেল। স্বস্তি পেল দেবচরণ, ময়ুর আছে মানে সাপের ভয় নেই। বাড়িতে ঢুকে দেবচরণ মাংসের তালটা তুলসীকে ধরতে দিতেই তুলসী মাংসের তাল আছাড় মারল মেঝেতে ‘আমার মেয়ের মাংস এটা। আমি কক্ষনো এটা উনুনে জ্বালাতে পারব না।’
‘বোকার মত কথা বলিস না!’ বৌকে ধমক লাগাল দেবচরণ। ‘কমলারি করাতে হলে আমি নিজে আমার গ্রাম ছেড়ে এতদূরে আসতাম না। শুনলি না, বিলাতি ওষুধ দিয়ে মেয়ের রোগ সারাবে? কত বড় বড় লোকের সঙ্গে মাহাতোর আলাপ-পরিচয় আছে। আমাদের মেয়ে তো আমাদের চোখের সামনেই থাকছে। লেখাপড়া শেখাবে বলল। তুই কি স্বপ্নেও ভাবতে পারিস আমাদের মেয়ে লেখাপড়া শিখছে? বল, তুই কি এটা চাস না?
‘নিজে যা ভাল মনে কর তাই কর সব সময় মেয়েকে কখনো জিজ্ঞাসা করেছ যে মেয়ে কী চায়?’ তুলসী কাঁদতে কাঁদতে বলল। রাগে দুঃখে তুলসী দেবচরণের সঙ্গে দু’রাত কথা বলল না।
তরাইয়ে পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে তিরিশ ঘর থারুর বসতি নিয়ে বনগাঁও গাঁ, পাহাড়ের পুব ঢালে কুকট, শিশু, খাই, পলাশের ঘন জঙ্গল। মাহাতো চমনলালের বাড়ি গ্রামের অন্য থারুদের বাড়ির থেকে বেশ কিছুটা উপরে। একতলা বাড়ি। থারুদের বিশ্বাস দো-তলা বাড়িতে ভূত ও প্রেতাত্মার বাস, তাই অনেক অর্থবানের মত মাহাতো চমনলালও কুসংস্কারবশতঃ দো-তলা বাড়ি বানায় নি। দেবচরণকে মাহাতো যেখানে থাকতে দিয়েছে সেই টিলা জঙ্গলের মধ্যে খোলা জায়গা তাই জন্তু জানোয়ারের ভয় নেই। কিন্তু রাজকুমারীর অনুপস্থিতি ওদের দু’জনের জীবনের মধ্যে এক শূন্যতার দেওয়াল তুলে দিল। তুলসী এমনিতেই কথা কম বলে, এখন সে বোবা হয়ে গেল। সেদিন মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে দেবচরণ আচমকা জেগে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল – রাজকুমারী পাশে নেই, ও কি ঘুমের মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে? জেগে গেল তুলসী, নিঃসঙ্গ চোখের জলে গাল তখনো ভেজা, সে বুঝেছে দেবচরণের বুকেও তার মত এক শেলের ক্ষত থেকে অদৃশ্য রক্ত ক্রমাগতঃ ঝরেই চলেছে। দেবচরণের বিছানায় এল তুলসী, দেবচরণের হাতের আঙুলগুলোতে নিজের খাটো আঙুলগুলো হালকা ভাবে বোলাতে বোলাতে বলল, ‘কুমহালের আঙুলে তাগদ নেই বেঁচে?’ দেবচরণ চুপ। তুলসী বলল, ‘এই আঙুলের জাদুতে একসময় কাদামাটিতে প্রাণ জেগে উঠত। পারবে না আবার?’ দেবচরণ অন্ধকারে তুলসীর হাত ধরল। স্পর্শ, কুমোরের সবচেয়ে প্রখর অনুভূতি। তুলসীর হাতের তালুতে তালু ঘষতে ঘষতে নরম স্পর্শের আস্বাদ ত্বক দিয়ে শুষতে লাগল দেবচরণ। কয়লা কাটতে কাটতে এই ত্বক পাথর হয়ে গেছিল। এই অন্ধকারে এক স্বপ্ন সেই পাথর ফাটিয়ে বের হতে উন্মুখ। মেয়েকে উদ্ধার করে আনার তীব্র আকাঙ্খা। দেবচরণ দু’হাতে তুলসীর ভেজা দু’গাল স্পর্শ করল। তুলসীর চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলল, ‘পারব।’
চমনলালের বাড়িতে রাজকুমারীর আগমন মাহাতোর মেয়ের বয়সি বৌ রাধার মোটেই মনঃপূত হল না। আর মরার জায়গা পেলি না?’ রাধা খিঁচিয়ে বলল। ‘এখানেই আসতে হল?’
পধানিয়ার খিঁচুনি শুনে রাজকুমারী চুপ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
‘মাথা নিচু করে কেন? মাথা উঁচু করে উপরে তাকিয়ে দেখ!’
রাজকুমারী উপরে তাকাল। ছাতের নিচে ধোঁয়ায় কালো কড়ি-বরগা।
‘ওখানে ঝুলে পড়েছিল আগের কমলারিটা, গলায় কাপড়ের ফাঁস লাগিয়ে।’
শিউরে উঠল রাজকুমারী— ‘কেন?’
‘অনেক থানা পুলিশ হল, তারপর সব চেপে গেল, কেন তা জানা যায় নি। কমলারিদের কে খেয়াল রাখে? এরকম কত হয় নেপালে। তুই সাবধানে থাকবি, বুঝেছিস?’
রাজকুমারী চুপচাপ মাথা নাড়ল। বুক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
রাজকুমারীর স্থান হল পুরোনো গোয়ালের এক কোনায়। পুরোনো গোয়ালে গরু থাকে না, বাড়ির পরিত্যক্ত জিনিসে ভরা। ভিতরে ঢুকে রাজকুমারী দেখল চতুর্দিক অগোছাল কী নেই? চাষবাসের পাটালা, হাল, কিলোয়াই, ক্ষেতের গম মাপার তাখারি, পসেরি, ধারি, ভাঙা একটা ঢেঁকি, মাছ ধরার ঝাপিয়া, ভাঙা কুথিয়া— সব ডাঁই করে রাখা। একটা দিকে জায়গা করে নিল রাজকুমারী, খড় বিছিয়ে তার ওপর গুটিয়ে রাখল কম্বলের বিছানা।
দিন কেটে রাত হল, কম্বল পেতে কুপি নেভাতে গিয়ে রাজকুমারীর মনে হল সে যদি ঘুমের মধ্যে হেঁটে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে যায় তবে? কে তাকে ফিরিয়ে আনবে? রাজকুমারী উঠে ঘরের কোণ থেকে একটা দড়ির গাছা তুলে নিল। গোয়ালের মধ্যে বাঁশের খুঁটি। রাজকুমারী খুঁটির সঙ্গে দড়ি বেঁধে অন্য প্রান্ত নিজের বিছানায় নিয়ে এল। তারপর নিজের হাতে শক্ত করে টেনে টেনে দড়িটা বাঁধল যাতে ঘুমের মধ্যে ঝটকা মেরে খুলতে না পারে। তারপর কুপি নিভিয়ে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল।
সকাল থেকে কমলারির সারদিন অনেক কাজ। ঘর গোছানো, কুথিয়া, কুথালা, চুলহা, সব পরিষ্কার রাখা, মাহাতোর হুকার জন্য বারসিতে আগুন ঠিকঠাক রাখা কিনা তা মাঝেমাঝে দেখা, ফাই-ফরমাস খাটা, এতটুকু ফুসরত নেই। দুপুরে পধানিয়ার চুল আঁচড়ে দেওয়া, হাতপাখা নাড়িয়ে হাওয়া করা।
দুপুরে মালিকের রুটি-মাংসের থালা মালিকের ঘরে নিয়ে গেল রাজকুমারী। চমনলাল এবার একলা রাজকুমারীর দিকে ভালভাবে তাকিয়ে দেখার সুযোগ পেল। মেয়েটার মা বেঁটেখাটো, মুখ থ্যাবড়া, কানে মাকড়ি পরা পোড়া বাদামখোলা রঙের বাপও ধুঁকছে, অথচ মেয়েটার মুখশ্রী আর চেহারা যেন তিতাপাতির ঝোপ থেকে মাথা উঁচু করেছে পুরুষ্টু সূর্যমুখী। দারিদ্র ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসছে এর যৌবন। এ রাজপরিবারে সোহাগ পাওয়ার যোগ্য। সত্যিই যেন রাজকুমারী। সত্যি বলতে গেলে এই লালচে গাল, ফাটা ঠোঁট, চুলে জট পড়া মেয়েটার শরীরে যা আকর্ষণ আছে তা তার রুগ্ন পত্নীর শরীরে নেই। রাজকুমারীকে প্রথমবার দেখেই চমনলাল ন্যায় অন্যায়ের লক্ষ্মণরেখা পেরিয়ে গেছে, এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা।
দিন কেটে চলে৷ রাজকুমারী রোজ রাতে হাতে দড়ি বেঁধে ভয়ে ভয়ে শোয়। বিছানায় বাতি নিভিয়ে কম্বল শরীরের ওপর চাপাতে না চাপাতেই ঘুমে ঢলে পরে শরীর। এক ঘুমে সকাল। আবার পরের দিন খুব সকাল থেকেই দৌড়াদৌড়ি শুরু।
সেদিন অনেক রাতে শরীর ঘুমে কাদা তবু রাজকুমারীর মনে হল কম্বলটা খুব ভারি হয়ে শরীরে চেপে বসেছে। লাগছে! দম বন্ধ হয়ে আসছে। ঘুম ভেঙে গেল রাজকুমারীর। চারদিকে এত অন্ধকার কেন? বাতাস এত কম কেন? ও কম্বলটা সরাবার জন্য হাত তুলল, কিন্তু একহাত দড়ি দিয়ে খুঁটিতে বাঁধা। অন্য হাত কম্বলের নিচে। কিভাবে যেন ওর মাথা কম্বলে ঢেকে গেছে, আর কম্বলের ভিতর ওর শরীরের ওপর যেন একটা কুমীর শুয়ে আছে। সরীসৃপটা মুখ ঘষে চলেছে ওর বুকে, দুটো হাত দুই পা দিয়ে ওর শরীরে কী যেন তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে। হাত খুঁটিতে বাঁধা থাকায় রাজকুমারী ঠিকমত কুমীরটাকে ছিটকে সরিয়ে দিতে পারছে না। সরীসৃপটা ওকে জোরে চেপে ধরেছে আর ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে শরীরের ওপর।
রাজকুমারী জোরে চেঁচাতে গেল, কিন্তু একটা হাতের তালু জোরে ওর মুখ চেপে ধরেছে, শুধু গোঙানি কম্বলের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল। রাজকুমারী এবার এক ঝটকায় মাথা সরিয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠল। এবার শরীরের ওপরের ভার হঠাৎ হালকা হয়ে গেল। কে যেন ধুপধুপ করে ছুটে বেরিয়ে গেল গোয়াল থেকে। রাজকুমারী মাথার ঝটকায় কম্বল সরিয়ে জোরে বাতাস নিল। তারপর ভয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল। এবার বাইরে কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বাতি নিয়ে কেউ গোয়ালে আসছে। পধানিয়া গোয়ালের খোলা আগরে এসে দাঁড়াল, হাতে লন্ঠন।
‘কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছিস কেন?’
‘আমাকে কে যেন চেপে ধরেছিল,’ রাজকুমারী হাতের দড়ি খুলতে লাগল।
‘তোকে এভাবে বেঁধেছে কে?’ রাধা বিস্মিত।
‘আমি নিজেই।’
‘তুই নিজেই! কেন?’
‘আমি ঘুমের মধ্যে ঘর ছেড়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে যাই, তারপর ঘুম ভেঙে যায়, তখন খুব ভয় পেয়ে যাই। তাই—’
‘মরণ! উঠে আয়।’ রাধার মনে মিশ্র অনুভূতি— মায়া লাগছে এই অসহায় মেয়েটার জন্য আর সন্দেহের রাগ ওর মরদের জন্য।
‘কোথায়?’
‘আমার ঘরে চল। ধুসাদুটো আর ছালাগুলো তুলে নে।’
কম্বল হাতে রাধার পিছন পিছন চলল রাজকুমারী। রাধা পাশে চমনলালের কামরার দরজায় বাতি নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল, চমনলাল কম্বলে সারা শরীরমাথা ঢেকে ঘুমাচ্ছে। রাধার শোবার ঘরে রাধার সঙ্গে ঢুকল রাজকুমারী।
‘মেঝেতে বিছানা করে শুয়ে পড়,’ রাধা বলল। ‘এবার থেকে তুই রোজ আমার ঘরে ঘুমোবি।’
মালকিনের ঘর অনেক গরম, এখানে অনেক আরাম। রাজকুমারী কম্বল পেতে শুয়ে পড়ল, কিন্তু ঘুম এল অনেক রাতে।
অন্ধকারে রাধা রক্তশূন্য মুখে খুক খুক করে কাশল, জ্বরে ভুগে ভুগে ক্ষীণকায়া শরীর, গলার আওয়াজও চিঁ চিঁ করে ‘মাহাতোর আগের বৌ পালিয়েছে,’ রাধা রাজকুমারীকে শোনাল। ‘একদিন আমিও পালাবো। হারামির বাচ্চা!’
* * * * *
দেবচরণদের বংশপরম্পরায় কুম্ভকারের উপজীবিকা। মাটির হাঁড়ি, পাতিল, থালা, বাসন, পেয়ালা, ঠাকনা, নন্দা, ঠিলা, কলসী কত কী বাপ-ঠাকুর্দার থেকে বানাতে শিখেছে দেবচরণ। পাহাড়ের বর্ষার ঢল ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাললিক মাটি ফেলে গেছে, সেদিন অনেকটা মাটি তুলে এনে উঠোনে ফেলল। তারপর সেই মাটিতে পা দিয়ে মেখে মেখে খামি তৈরি করল সে। বাঁশ, কাঠ আর বিচালির পাকানো কুচলি দিয়ে দেবচরণ চাক বানাল, আর সেই চাকের ওপর খামি ফেলতে লাগল। চাক ঘুরতে ঘুরতে সেই খামি আকৃতি পেতে লাগল। দেবচরণ প্রথমে একটা ঘট বানাল। ঠাকুরের ঘট।
এবার মাখা মাটি দু’হাতে তুলে থাবড়ে থাবড়ে ছিঁড়ে আবার থাবড়ে থাবড়ে মণ্ড মত বানিয়ে সেটা দু’হাতে চাকের ঠিক মাঝখানে ফেলল দেবচরণ। তারপর বাঁশের দণ্ড দিয়ে চাক ঘোরাতে শুরু করল। চাক ঘুরছে। আরও জোরে, আরও জোরে চাক বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল। আরও ঘুরিয়ে এবার চাকের নরম মাটির তালকে দুহাত দিয়ে স্পর্শ করল। আলতো স্পর্শ, প্রথমবার তুলসীর স্তন যেমন আলতো ভাবে দু’হাতে শুধু ছুঁয়েছিল সেরকম। দেবচরণের হাতের ছোঁয়ায় সেদিন যেমন তুলসীর নরম বুক শিহরণে কেঁপে উঠেছিল, নরম মাটিও সেরকম কেঁপে উঠল। সেই কম্পন ছড়িয়ে গেছিল তুলসীর সারা শরীরে, ঠিক সেভাবে কম্পন ছড়িয়ে গেল মৃত্তিকার কোষে কোষে আর শিহরিত মৃত্তিকার দেহ ধীরে ধীরে কলসীর অবয়ব পেল। নরম তুলতুলে শিশুর মত মাতৃ জঠর থেকে বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় উদ্দ্গ্রীব। সেই শিশুকে অতি সাবধানে দু’হাতের তালুতে তুলে নিল দেবচরণ কুমহালে। তারপর পরপর আরও কয়েকটা মাটির কলসী বানালো দেবচরণ।
রোদ্দুরে কাঁচা মাটির হাঁড়ি পাকে না। টিলার গায়ে পাথরের ভিতর গর্ত থাকায় চুলা বানাবার ঝক্কি ছিল না, তুলসী জঙ্গল থেকে শুকনো হলদু, ঢাক, শিশু, খাই, রাউনির ডাল বেঁধে মাথায় বয়ে এনে জড়ো করল, আর সেই পাথুরে উনুনে কাঠকয়লা জ্বালিয়ে সেই কাঁচা তুলতুলে কলসী পাকা হতে লাগল। মৃৎপাত্র সিঁদুরে রঙ নিল। দেবচরণ কুমহালের চোখে আনন্দ ঝকমক করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, তুলসীর দিকে তাকাল সে। দু’জনেরই মনে একই বাসনা। অল্প অল্প করে পয়সা জমাতে হবে। নিজেদের একটা আশ্রয় হলেই রাজকুমারীকে মুক্ত করে আনবে।
দেবচরণ কুমহালের হাতের কাজ নিখুঁত। সুখ্যাতি গ্রামের বাইরে টিলা দিয়ে গড়িয়ে তারপর আরও নানা পাহাড় বন পার হয়ে পৌঁছে গেল মানিকগঞ্জে। প্রথমবার দেবচরণ যখন ওর মাটির হাঁড়ি – কলসী কাঁধে বাঁশের দণ্ডে ঝুলিয়ে নিয়ে মানিকগঞ্জের হাটে ফেলল তখন সে স্বপ্নেও ভাবে নি তার হাতের কাজের এরকম দাম পাবে। দুপুরের মধ্যেই তার সব হাঁড়ি – কলসী বিক্রি হয়ে গেল। দেবচরণের হাতে কাঁচা পয়সা, হাটের কোনায় এখো তাড়ি নিয়ে বসেছে ব্যাপারী। দেবচরণ বসে পড়ল চারপাইতে। মাটির ছোট ভাঁড়ে গ্যাঁজলা উপছানো তাড়ি। ভাঁড়ে চুমুক দিতে গিয়ে মেয়েটার মুখ মনে পড়ল। এক অব্যক্ত গোঙানি বেরিয়ে এল দেবচরণের মুখ থেকে। ভাঁড় ভর্তি তাড়ি ফেলে উঠে দাঁড়াল দেবচরণ। দোকানী অবাক।
কিছুদিন পরে হাটে চিনির কলের ম্যানেজার একটা কলসী এনে দেখাল।
‘এরকম বানাতে পারবি?’
দেবচরণ ভালভাবে দেখল। ‘মাটি ভালভাবে মাখে নি, কলসী ফেটে যাবে।’
চিনির কলের ম্যানেজার অবাক। ‘একদম ঠিক বলেছিস,’ ম্যানেজার বলল। আমাদের গুড় যায় রেলগাড়িতে লক্ষ্ণৌ, পাটনা, কলকাতায়। গুড়ের হাঁড়ি ফেটে যাচ্ছে। অনেক লোকসান হয়েছে। এরকম দশটা গুড়ের নাগরি সামনের হাটে বানিয়ে নিয়ে আয়। ঠিকঠাক হলে অনেক অর্ডার দেব। তখন আর হাটে আসতে হবে না। শুধু আমাদের সাপ্লাই দিয়েই তোর কপাল খুলে যাবে।’
পরের হাটে দশটা গুড়ের নাগরি দাঁড়ের দুদিকে ঝুলিয়ে নিয়ে গেল দেবচরণ। ম্যানেজারের লোক এসে সবকটা হাঁড়ি কিনে নিল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে অনেক দেরি, দেবচরণ হাট ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল মেলা। মেলার এক কোনায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘেরা এলাকায় পাহাড়ি টাঙ্গন ঘোড়া নিয়ে এসেছে তিব্বতি ব্যাপারী, ঘোড়াদের ঘিরে সাধারণ মানুষের ভিড়। মাঠের দক্ষিণ দিকে একদল মোষ আর পাঁঠাকে ঘাস খাওয়ানো হচ্ছে, ওদের দেবতার বলির জন্য খদ্দের কিনে নিয়ে যাবে। একটা ছেলে সদ্য কেনা বাঁশি ওর ছোট বোনের কানের কাছে বাজিয়ে বাজিয়ে ওকে অতিষ্ঠ করে তুলছে। কাপড়ের ব্যবসায়ী, পিতলের বাসন বিক্রেতা, মিস্টির দোকানদার খদ্দেরের সঙ্গে দর কষাকষিতে ব্যস্ত। কাপড় বিছিয়ে জুয়ারি পাশার চাল চালছে আর তাতে ভাগ্যান্বেষীরা পয়সা লাগাচ্ছে, দান চাললে যারা জিতল তারা আনন্দে হৈ হৈ করে উঠছে। পাশে একটা ব্যাপারী বাংলা থেকে আনা গাঁজা আর চরস বিক্রি করছে, যাদের চরস কেনার ক্ষমতা নেই তারা গাঁজা কিনে নেশায় ডুবে দুঃখ কষ্ট ভুলছে। দেবচরণ মেয়ের জন্য একটা আরশি আর চিরুনি খুঁজতে খুঁজতে মাঠের উত্তর দিকে গেল, আর তখনই সে লোকগুলোকে দেখল৷
হাটের শেষ প্রান্তে সবুজ তৃণভূমি টিলায় উঠতে উঠতে শালের বনে গিয়ে মিশেছে। সেই ঘাসের ওপর সামিয়ানা খাটানো হয়েছে, অনেক লোক মাটিতে বসে রয়েছে আর সাদা পোশাক পরে পাঁচজন খ্রিষ্টান পাদ্রি। দু’জন সাহেব পাদ্রি, তিনজন দেশি— অর্গান বাজিয়ে ভজন গাইছে ‘জয় প্রভু যীশু।’ পাশে লাল পাগড়ি পরা কোম্পানীর সেপাই।
দেবচরণ কুমহালের কৌতূহল হল। দেবচরণ ওদের দলে গিয়ে বসে পড়ল৷ দর্শকদের মধ্যে টিকিধারী হিন্দু ব্রাহ্মণ, মাথায় কুরুশের টুপি পরা মুসলমান, নানকপন্থী আছে, দরিদ্র লোকেরাই বেশি। দেবচরণ পাশের লোকটাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে এদের সঙ্গে কোম্পানীর সেপাই কেন?’
‘বুধুয়াগাঁও গ্রামে গিয়ে লোকেদের খ্রিষ্টান বানাচ্ছিল। গ্রামের জমিদার লক্ষ্ণৌ থেকে ফিরে দেখে পাদ্রিরা অর্ধেক নিচু জাতের লোককে ধরে খ্রিষ্টান বানিয়ে দিয়েছে। জমিদার রেগে লাল, পরদিন পাদ্রিদের আসার কথা, জমিদার প্রজাদের মাঠে চাষের কাজে পাঠিয়ে লেঠেলদের দিয়ে পাত্রিগুলোকে আচ্ছা করে ঠেঙাল। তাই মেজর আজকাল কোম্পানীর সৈন্য সঙ্গে পাঠায় ওদের পাহারা দিতে, ‘লোকটা বেশ আনন্দ সহকারেই পাদ্রিদের নিগ্রহের কথা বলল। ‘কেন যে লোকে এদের কথা শোনে?’
‘তুমি নিজেও তো এখানে এসে বসে আছ,’ দেবচরণ বলল।
আমি এসেছি নিজের ধান্ধায়।’
‘কীসের ধান্ধা?’
‘আমার নাম হীরালাল দালাল। কলকাতায় থাকি, এখানে কখনো সখনো আসি কুলির খোঁজে।’
‘কলকাতা থেকে এখানে কুলির খোঁজে?’ দেবচরণ অবাক।
ব্রিটিশরা গায়ানা নামে এক দেশে প্রচুর ভারতীয় কুলি চেয়ে পাঠিয়েছে। ওখানে অনেক পয়সা, অনেক ইজ্জত, তুমি যাবে নাকি, আমি তোমাকে ওখানে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে পারি।’
এখানে পুলিশ না থাকলে দেবচরণ লোকটাকে কষে এক থাপ্পড় লাগাত— ‘থারু কখনো ঘাঘরা পেরিয়ে দক্ষিণে ফৈজাবাদও গেছে? মাতৃভূমি ছেড়ে কলকাতা? থারু তার মায়ের মাটিকে এঁটুলির মত কামড়ে পরে থাকে, পিঠের ওপর দিয়ে যতই ঝড় ঝাপটা যাক না কেন সে কামড় কখনো হালকা হবে না। এই সামান্য কথাটা তুমি জানো না?’
হীরালাল জানে সেটা। ব্রিটিশ আর্মিতে অনেক নেপালী যোগ দিলেও থারুরা ‘লাহুর জানু’ বলে তরাই ছেড়ে কেউ যায় নি। তবু হীরালাল পালটা তর্ক লাগাল। ‘কীসের মাতৃভূমি? রানার মুলুকি আইনের জন্য নিজের দেশে তোমরা থারুরা সবচেয়ে নিচু জাত, তোমাদের ঘরের মেয়েদের এদের মাহাতোরা কমলারি বানিয়ে রাখে, তোমাদের ছোঁয়া খায় না। সেখানে বাইরে যেতে আপত্তি কীসের?’
‘শুনেছি জাহাজে করে ক্রীতদাসদের নিয়ে যাওয়া হয়,’ দেবচরণ বলল।
‘সে সব দিন কবে চলে গেছে,’ হীরালাল দেবচরণের অজ্ঞানতায় তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ‘ষাট বছর আগে ক্রীতদাস প্রথা আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে শ’য়ে শ’য়ে কুলি ব্রিটিশ গায়ানাতে গেছে, আমি কলকাতার গিলান্ডার আর ভুতনট কোম্পানীর হয়ে লোক নিয়ে যাই। যারা গেছে তারা কি বোকা?’
‘ওদেশে কী কাজ করতে হয়?’ দেবচরণ জানতে চাইল।
‘কিচ্ছু না, ক্ষেতের কাজ।’
‘না না বাবা, তারপর কবরখানায় মাটি খোঁড়াবে।’
‘কী উল্টোপাল্টা বল। পাকা কাগজে সই করা হয় যে শুধু ক্ষেতের আর কারখানার কাজ করবে।’
‘দাসখত?’
‘দাসখত কেন হবে?’ হীরালাল কোটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। ‘এই যে দেখ আমি পড়ছি এখানে লেখা আছে পুরুষ এমিগ্র্যান্টদের পাঁচ বছরের কন্ট্রাক্ট আর মেয়েদের তিন বছরের কন্ট্রাক্ট। লেখা আছে ক্ষেতের কাজ। সাড়ে আট ঘন্টা প্রতি দিন, আধ ঘন্টা দুপুরের খাবারের জন্য ছুটি। রোব্বার আর উৎসবের দিনে ছুটি। প্রতিদিন বারো আনা ছয় পাই করে ডেলি রেট।’
‘খাওয়া দাওয়া?’
‘তারও ব্যবস্থা আছে,’ হীরালাল উৎসাহ বোধ করল। সে বুঝল একটা কুলিকে প্রায় ফাঁসিয়ে এনেছে। ‘একবছর ধরে তোমাদের খোরাকি দেওয়া হবে। প্রতিদিন তিন আনা খরচ। বাকি পয়সা জমাও। এছাড়া বিনে পয়সায় থাকার ব্যবস্থা, হাসপাতাল ওষুধপত্তর সব ফ্রি।’
‘পাঁচ বছর পর?’
‘পাঁচ বছর পর আরও পাঁচ বছর ফ্যাক্ট্রিতে কাজ করতে হবে। ব্যাস তারপর চাও তো দেশে ফিরে এস আর না চাও তো ওখানে জমি-জমা কিনে থেকে যাও, যারা থাকবে তাদের ব্যবসা করার জন্য টাকা দেওয়া হবে। আয়েশ কর।
‘তুমি প্রত্যেক কুলির জন্য কত টাকা পাও,’ দেবচরণ বলল।
‘মানে?’
‘তোমার এই দালালির পেশার চেয়ে এই ধর্ম বদলালে খাওয়ার লোভ দেখানো এই বেধম্মী খ্রিষ্টান পাদ্রির পেশা অনেক সম্মানের!’
হীরালাল রেগেমেগে উঠে দাঁড়াল, ‘যাবে না যখন তখন এত প্রশ্ন করলে কেন? আমার শুধু শুধু সময় নষ্ট!’ হীরালাল কাগজ ভাঁজ করে পকেটে পুরল। ‘একদিন তোমরা সকলে পস্তাবে।’ জুয়ার দোকানের সামনে ভিড়টা বেড়েছে। হীরালাল হনহন করে সেদিকে গেল কুলির সন্ধানে।
একটার পর একটা অনেকগুলো ভজন গাওয়ার পর পাদ্রিগুলো বলতে লাগল যে এই জগতে পাপ থেকে উদ্ধার পাবার জন্য প্রভু যীশুই একমাত্র ত্রাতা। পাদ্রিদের বক্তৃতা শেষ হলে একজন সাদা পাদ্রি জিজ্ঞাসা করল— ‘কেউ কি এখানে পাপ স্বীকার করে ভারমুক্ত হতে চাও?’
কেউ এগিয়ে এল না। তখন পাদ্রি জিজ্ঞাসা করল, ‘কেউ কি প্ৰভু যীশুর চরণে স্থান পেতে চাও?’ একজন উঠে এগিয়ে গিয়ে পাদ্রিদের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল আমায় প্রভু যীশুর চিহ্ন দিন। পাদ্রিরা লোটা থেকে জল ওর মাথায় ছিটিয়ে ব্যাপটিজম করল, তারপর ওকে এক টুকরো পাউরুটি চিবোতে বলল। লোকটা পাউরুটি চিবিয়ে, দু’হাত শূন্যে তুলে ‘প্রভু যীশুর জয়” বলতে বলতে চলে গেল।
দেবচরণ উঠে পাদ্রিদের দিকে এগিয়ে গেল।
‘তুমি প্রভু যীশুর চরণে আসতে চাও?’ পাদ্রি হাসি হাসি মুখে বলল।
‘আমার একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘হ্যাঁ বল,’ পাদ্রির ধৈর্যশীল মুখ।
‘তোমরা চুড়েলকে খ্রীষ্টান করতে পার?’
পাদ্রি এই প্রশ্ন শুনে কী উত্তর দেবে বুঝে পেল না। ওর হাতে অ্যাক্ট অব অ্যাপস্টলের সেকেন্ড চ্যাপ্টার খোলাই রয়ে গেল। পাশের পাদ্রি বলল, হয়েছে?’
‘তোমাদের প্রভু যীশু আমার মেয়েকে সুস্থ করতে পারবে?’ দেবচরণ বলল৷ ‘কী অসুখ ওর?’
‘চুড়েলে ধরেছে,’ দেবচরণ বলল। ‘মাঝরাতে হঠাৎ হঠাৎ ঘুমের মধ্যে ওকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায়।’
অন্য পাদ্রিটা বলল, ‘এটা একটা রোগ। চুড়েল-টুড়েল কিছু না। ওকে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে এস। তুমি ব্যাপটিজম চাও?’
‘না আমি কিছু চাই না। আমি শুধু চাই আমার মেয়ে ঠিক হয়ে যাক,’ — দেবচরণ গ্রামের পথ ধরল। সাহেবদের মতে তাহলে এটা রাজকুমারীর একটা রোগ, চুড়েল না। তুলসীকে গিয়ে কথাটা বলতে হবে।
* * * * *
মোহনের বেডরুম থেকে কথা বলার আওয়াজ আসছে। কারোর সঙ্গে চাপা গলায় ঝগড়া করছে মোহন। রিধিমা উৎকর্ণ। এত রাতে মোহন জেগে? রিধিমা ডায়েরিটা ব্যাকপ্যাকে ঢোকাল। হঠাৎ রিধিমার মনে হল মোহন ওর নাম উচ্চারণ করল। আমার নাম কেন বলল? আবার পুলিশে ধরিয়ে দেবে না তো? রিধিমা পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। মোহনের ঘরের দরজা বন্ধ, দরজার নিচে ক্ষীণ আলোকরশ্মি। রিধিমা দরজায় কান পাতল। অন্যদিকে একজন মহিলার গলা, কিন্তু কী বলছে তা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না।
আমার কোনও এক্সট্রাম্যারিটাল অ্যাফেয়ার থাকলে আমি তোমায় আজকের ঘটনা জানাতাম না।’ মোহন চাপা গলায় প্রতিবাদ করল।
…………
‘আমি কীভাবে এত রাতে চলে যেতে বলি?’
…………
‘এটা সাইকোলজিক্যাল ব্ল্যাকমেল!’ মোহন অতিষ্ঠ হয়ে বলল।
………… ………… …………
এবার মহিলা কন্ঠের অসহ্য চিৎকারের কাছে মোহন পরাজিত হল ‘ওকে বাবা, ওকে! গিভ মি হাফ অ্যান আওয়ার। আমি ওর জন্য একটা হোটেলের রুম দেখি, তারপর ওকে তুলছি ঘুম থেকে’।
…………
‘না না, হোটেলে হোটেলে খুঁজতে যাব কেন? পাশের—’
…………
‘আরে না না, জায়গা না পেলে আমি কেন সঙ্গে যাব? উবার ডেকে দেব।’
রিধিমার গা ঘিনঘিন করতে লাগল। রিধিমা সোফায় ফিরে এসে এক ঝটকায় মোহনের দেওয়া কুর্তাটা মাথার ওপর দিয়ে টেনে শরীর থেকে বের করে দিল। হালকা লাগছে। বমি করার পর শরীর যেমন হালকা লাগে সেরকম। মুখে তিক্ততা ছড়িয়ে গেলেও আরাম লাগে। ওর ওপর ভারি পাথরের ওজনের মত চেপে বসেছিল এই পোশাক। কে ওর আপনার? পাকিস্তানী ক্যাবওয়ালা না ভারতীয় ডিপ্লোম্যাট। রিধিমা ওর নিজের শুকনো জামা, প্যান্ট, জ্যাকেট আবার গায়ে চড়িয়ে ল্যাপটপের ব্যাকপ্যাক পিঠে নিয়ে যখন জুতোর চেন টানছে তখন বেডরুমের দরজা খুলে গেল। নাইট ড্রেস পরে বেরিয়ে এসেছে মোহন।
মোহনের দুচোখে বিস্ময়।
রিধিমা ম্লান হাসল— ‘বের করে দিও না, আমি নিজেই চলে যাচ্ছি।’
মোহন কিছু বলার চেষ্টা করল। রিধিমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে। বাতাস চাই, মুক্ত বাতাস। ‘চলি, মোহন।’ রিধিমা দরজার ল্যাচ খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। পিছনে না তাকিয়েও সে বুঝতে পারছে মোহন তার চিরকালের দ্বিধার সঙ্গে লড়তে লড়তে হেরে যাচ্ছে। যেরকম দ্বিধায় সাড়ে তিন বছর আগে সে তার বাবার সঙ্গে তর্কে যেতে চায় নি। রিধিমার দাদা একজন চোর এটা নাকি ও কোনমতেই বিশ্বাস করত না, তবুও ওর ব্যুরোক্র্যাট বাবাকে রাজি করাবার মত সাহস দুর্বল মোহনের ছিল না।
৷৷ চোদ্দো ৷৷
পার্মানেন্ট মিশন অব ইণ্ডিয়ার এক তলায় ওয়েটিং রুমে এসে রিধিমা সিকিউরিটি গার্ডের চোখে বিস্ময় লক্ষ্য করল। ছেলেটা প্রশ্ন করল না। এখান থেকে নিজের ইচ্ছামত দরজা খুলে বাইরে বেরোনোও যায় না। রিধিমা বলল, ‘বাইরে যাব।’
ছেলেটা একটা বোতাম টিপল, বড় দরজাটার লকটা খুলে গেল। রিধিমা দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই শীতে কেঁপে উঠল। হাঁটতে হাঁটতে পাশের হোটেলের সামনে এল রিধিমা। হোটেলের জেনারেটর চলছে, তার আওয়াজ আসছে, সামনে ‘নো ভেকেন্সি’ বোর্ড টাঙানো। এখন কোথায় যাবে? রিধিমার মনে পড়ল কাগজটার কথা। প্ল্যান-বি। ব্যাকপ্যাকের সামনের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাগজটা অনুভব করল রিধিমা। কুঁচকে পকেটের তলায় পড়ে আছে। রিধিমা কোঁচকানো কাগজটা খুলে বের করল। ভক্তি বুড়ির কাঁপা কাঁপা হাতের লেখা ছেলের ফোন নম্বর।
এত রাতে ফোন করা উচিত হবে? রিধিমা এক মুহূর্ত ভাবল। আমরা সকলে কি উচিত কাজ করি? ইণ্ডিয়া মিশনের এগারতলায় লোকটা যে কাজটা করল সেটা কি উচিত কাজ?
রিধিমা ফোন নম্বর ডায়াল করল।
এত রাতে এত তাড়াতাড়ি কেউ ফোন তুলবে রিধিমা আশা করেনি। দু’বার রিং বাজতেই একটা গম্ভীর ভরাট গলা— ‘হ্যালো।’
‘হ্যালো, আমার নাম রিধিমা বোস, রিধিমা থামল, কী বলবে এবার? ফ্রম হার্ভার্ড – সুনয়ন সীটাপোটির সঙ্গে কথা বলতে পারি?’
‘ইট ইজ হি।’
‘আপনার মা—’
‘মা’র টেক্সট মেসেজ পেয়েছি।’ রিধিমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘আমি খুব বিপদে পড়েছি।’
‘আপনি পৌঁছোতে পারেন নি ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে?’
পৌঁছেছিলাম। কিন্তু কয়েকজন ফেক পুলিশ এসে আমাকে ওখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। আমি কোনোরকমে—’
‘ফেক পুলিশ? ওরা জানল কীভাবে আপনি কনসুলেটে?’
‘আমি— আমি জানিনা। কিন্তু ওরা আমাকে একটা গোডাউনে নিয়ে গিয়ে খুন করার চেষ্টা করেছিল। আমি পালিয়ে—’
‘তার মানে কোনোভাবে ওরা খবরটা পেয়ে যাচ্ছে। আপনি এখন কোথায়?’
‘ম্যানহাটনে।’
‘কোন হোটেলে?’
‘রাস্তায়। ফর্টি থার্ড স্ট্রীট, পার্মানেন্ট মিশন অব ইণ্ডিয়ায় আবার গেছিলাম আশ্রয়ের জন্য। কিন্তু জায়গা হল না। বুঝতে পারছি না এখন কোথায় যাই।’
‘কেউ আপনার পজিশন ট্র্যাক করছে। তাড়াতাড়ি একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখুন তো কোনও মানুষ দেখা যাচ্ছে কিনা?’
‘না, রিধিমা চারদিকে তাকাল। ‘ইটস রিয়্যালি ডেড ইন দ্য সিটি টুনাইট।’
‘ভালভাবে দেখুন,’ ওপাশের কণ্ঠস্বর সিরিয়াস। ‘কোনও সেলফোনের আলো, কোনও গাড়ির হেডল্যাম্প—’
‘না।’
‘ঠিক আছে, ফোনটা বন্ধ করবেন না। হ্যাম্পটন বাই হিলটন হোটেলকে ডান হাতে রেখে হাঁটতে থাকুন। খুব তাড়াতাড়ি। থার্ড অ্যাভিনিউ ক্রশ করে লেক্সিংটন অ্যাভিনিউ পাবেন। রাস্তার উলটো দিকে গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল রেলওয়ে টার্মিনাস, বিল্ডিঙের মাথায় একটা উড়ন্ত ঈগল।’
রিধিমা দ্রুতপদে এক মিনিটের মধ্যে থার্ড অ্যাভিনিউতে এসে পড়ল। ‘আপনি শিওর তো সামনে বা পিছনে কেউ নেই?’
‘পিছনে সেকেণ্ড অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে একটা গাড়ি ঢুকল। গাড়ির ছাতে পিৎজার বিজ্ঞাপনের বাক্সের আলো জ্বলছে।’
‘আপনি এবার দৌড়ান। যত জোরে পারেন দৌড়ান, ওপাশ থেকে প্রায় আদেশ এল।
‘মানে?’
‘প্রাণ বাঁচাতে হলে দৌড়ান। এক্ষুনি!’
রিধিমা ঊর্ধশ্বাসে সামনে দৌড় লাগাল। থার্ড অ্যাভিনিউ পেরিয়ে সামনে কনস্ট্রাকশনের হলুদ টেপ ডিঙিয়ে সরু রাস্তায় ছুটতে লাগল। কিছু কংক্রিটের ব্লক এক এক জায়গায় রাখা। রিধিমা ফোনটা কানে তুলে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘হ্যালো!’
‘কেউ আসছে পিছনে?’
‘গাড়িটা কন্সট্রাকশনের জন্য আসতে পারছে না। হ্যাঁ, দুটো লোক নামল। ওরা ছুটে আসছে।’ রিধিমা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। কথা বলার সময় নেই। লেক্সিংটন অ্যাডে এসে রিধিমা রাস্তার উলটো দিকের বিল্ডিঙের মাথায় উড়ন্ত ঈগলটা দেখতে পেল। গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল স্টেশন।
গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের মেন কংকোর্সের ভিতরে উজ্জ্বল আলোর নিচে জনসমুদ্র। বরফের ঝড়ের তাড়নায় শহরের যত হোমলেস এসে জমা হয়েছে। ভিতরটা বেশ গরম। রিধিমা ভিড়ের মধ্যে গা মিশিয়ে দিল। ডানদিকে রেলের ট্র্যাকগুলোতে যাবার সবকটা গেট বন্ধ। এত ভিড় যে পা রাখার জায়গা নেই ভিতরে। রিধিমা পিছন ফিরে তাকাল, লোকদুটোকে দেখা যাচ্ছে না। ডানদিকে ফর্টি ফিফথ স্ট্রীট মেটলাইফ বিল্ডিঙের দিকের এস্কালেটরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাবলিক যাতে স্ট্যাম্পেড না হয় সেজন্য পুলিশ এস্কালেটরের ওপর বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে, কারুকে এস্কালেটরে উঠতে দিচ্ছে না। এতো মানুষের ভিড়ের মধ্যে রিধিমা নিজেকে অনেক নিরাপদ মনে করল। মেজরের লোকেরা ওকে এখানে অন্ততঃ বিপদে ফেলতে পারবে না। কিন্তু এখানে নিশ্চয়ই অজস্র ক্যামেরা লাগানো আছে। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ওকে আইডেন্টিফাই করে ফেলবে। রিধিমা হুডিটা তুলে মাথা ঢাকল। ভিড় ঠেলে ঠেলে রিধিমা উল্টোদিকের ওয়েস্ট ব্যালকনির কাছে এসে পৌঁছোল। উপরে ওঠার সিঁড়িতে পর্যন্ত লোকজন বসে। রিধিমা ফোন কানে তুলল— ‘হ্যালো!’
‘লোক দুটো এখনো আসছে?’
‘এত ভিড় কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ হ্যাঁ দেখতে পেয়েছি। মেন কংকোর্স থেকে মেন গেটের দিকে যাচ্ছে ওরা।’
‘ঠিক কোথায় আপনি?’
‘ওয়েস্ট ব্যালকনির নিচে।’
‘মাথা নিচু করে বসে যান। পাঁচ মিনিট পর সিঁড়ি দিয়ে ওয়েস্ট ব্যালকনিতে উঠে যাবেন। দরজাটা ভ্যানডারবিল্ট অ্যাভিনিউতে খোলে। এটা স্টেশনের সাইড গেট। আপনাকে ওরা মেন গেট ফর্টি সেকেণ্ড স্ট্রীটের দিকে খুঁজছে। আমি আসছি। হণ্ডা সিভিক। তিনবার ব্লিঙ্ক করব। আপনি উঠে আসবেন। ফোনটা অন রাখবেন।’
ঠিক পাঁচ মিনিট পর রিধিমা মাথা নিচু করে সিঁড়ি দিয়ে ওয়েস্ট ব্যালকনিতে উঠে ভ্যানডারবিল্ট গেট দিয়ে স্টেশনের বাইরের বড় দরজাটা ঠেলে বেরোতেই কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া মুখে বিধল। রিধিমার বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটছে, সামনেটা অন্ধকার কিন্তু কোনও গাড়ি নেই! একদিকের সাইডওয়াক বন্ধ। পাশে একটা লোক এসে দাঁড়াল। কনফার্মড হোমলেস মাথায় উলটো টুপি, ঢোলা পুরোনো জ্যাকেট, ঢোলা জিনসের প্যান্ট মনে হচ্ছে পাছা থেকে এই খুলে পড়ল বলে। রিধিমার মুখের কাছে এসে বলল ‘হাউডি!’ লোকটার মুখে অসহ্য দুর্গন্ধ। লোকটাকে পাত্তা না দিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করল রিধিমা, আরেকবার ওই পারফিউম নাকে ঢুকলে মোহনের পাস্তা পেট থেকে গাইসারের মত বেরিয়ে এসে বাইরের রাস্তায় ল্যাণ্ড করবে। রিধিমা রাস্তার অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি ছুড়ল। সুনয়ন আসবে তো? এক মিনিটের মধ্যে একটা হণ্ডা সিভিক এসে ডাইভারশন এ্যারোর পাশে এসে দাঁড়িয়ে তিনবার ব্লিঙ্ক করল। রিধিমা বুঝল ওর রাইড এসে গেছে।
গাড়িটার দিকে ছুটে গেল রিধিমা। গাড়ির চালক প্যাসেঞ্জারের দিকের কাঁচটা নামিয়ে বলল— ‘রিধিমা?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাড়াতাড়ি উঠে আসুন। লেটস গেট আউট অফ হিয়ার।’
রিধিমা গাড়ির দরজা খুলল। গাড়ির ভিতরে জোর শব্দ করে হিটিং চলছে, পুরোনো গাড়ি। কাপ হোল্ডারের স্টারবাকস কফির মগ থেকে ক্যাফিনের গন্ধ নাকে ধাক্কা মারল। রিধিমা ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। গাড়ির চালক গিয়ার শিফট করে ড্রাইভে ফেলল, গাড়িটা সরু রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে গলি থেকে বেরিয়ে গেল।
এবার রিধিমা এক ঝলক ওর রক্ষাকর্তাকে দেখল। তিরিশের নিচেই হবে লোকটা। গায়ে মোটা জ্যাকেটের নিচে বোঝা যাচ্ছে চওড়া কাঁধ, মাথায় ঠাসা চুল, কথা বলতে গেলে গালের দৃঢ় হাড়গুলো আভাস দেয়। কিন্তু লোকটার সারা মুখে হতাশা— দুঃখ— বিরক্তির প্রলেপ সানস্ক্রিন লোশনের মত লেপে রয়েছে। ‘আপনি সুনয়ন?’
‘আপনার ফোনটা দিন, লোকটা ডান হাত রিধিমার দিকে বাড়াল। ‘তাড়াতাড়ি।’
লোকটার কণ্ঠস্বরে রিধিমা বিস্মিত। যেন আদেশ করছে। ফোনটা লোকটার হাতে দিল। লোকটা ফোনটা হাতে নিয়ে, গাড়িটা এগিয়ে ডান দিকের কার্বের গায়ে দাঁড় করাল। তারপর বাঁ হাতে দরজা খুলে রাস্তার উলটো দিকে দৌড়ে গেল। একটা বড় ট্র্যাশ বিনের মাথায় একফুট বরফ। লোকটা ট্র্যাশবিনের ঢাকনা তুলতেই বরফ মাটিতে হুড়মুড় করে ছড়িয়ে গেল। লোকটা সেলফোনটা গুঁজে দিলে ট্র্যাশবিনের ট্র্যাশের ভিতর। তারপর দৌড়ে ফিরে এসে গাড়ি গিয়ারে ফেলল। রিধিমা হাঁ হাঁ করে উঠল— ‘এটা কী করলেন? আমার নতুন ফোন!’
‘আপনার ব্যাকপ্যাকে কোন ল্যাপটপ?’
‘ম্যাকবুক প্রো, রিধিমা ব্যাকপ্যাকের স্ট্র্যাপটা আঁকড়ে ধরল। ‘কিন্তু ফোনটা ফেললেন কেন? কত দামি ফোন—’
‘খুন হয় গেলে তারপর 911 কল করবেন?’ লোকটার মুখের বিরক্তির ছাপ বেড়ে গেল। ‘আপনাকে ওরা ট্র্যাক করছিল। ল্যাপটপটা দিন।
‘না। এটা ফেলে দিলে আমি মরে যাব।’
‘এটার কি ব্রাউজার লোকেশন এনেবেল্ড আছে?’
‘আমি জানি না।’
‘ওটা খুলুন।’
রিধিমা ভয়ে ভয়ে ল্যাপটপটা খুলে কোলে রাখল। সুনয়ন গাড়ি চালাতে চালতে বলল ‘লোকেশন ডিসেবল করলে হবে না। ফলস কো-অর্ডিনেট দেখিয়ে ওদের ভুল পথে নিয়ে যেতে হবে। ওটা পালটে ফেলুন চটপট।’
‘কীভাবে পালটাব?’
‘কনসোলে গিয়ে সেন্সর ট্যাব খুলুন— সুনয়নের চোখ সামনের রাস্তায় রিধিমার নিজেকে কম্পিউটারের ব্যাপারে পৃথিবীর অজ্ঞতম মানুষ বলে মনে হল— ‘আমি জানি না কীভাবে এসব করতে।’
‘সেজন্যই তো ল্যাপটপটা চাইছিলাম,’ আবার বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ল দু’জনের মাঝের আধো-অন্ধকারে।
সুনয়ন ল্যাপটপটা নিজের কোলে নিয়ে বাঁ হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ডান হাতে সেলফোনে টেক্সট করার মত ল্যাপটপের কী বোর্ডে পাঞ্চ করতে লাগল। এত দ্রুত ওর হাত চলছে যে রিধিমার মনে হল লোকটার থুতনির নিচে আরেকটা চোখ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে সুনয়ন ল্যাপটপ বন্ধ করল— ‘জিও লোকেশন কো-অর্ডিনেটস ম্যানিপুলেট করে দিলাম। আপনি এখন ডাউনটাউনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে।
‘কিন্তু ফোনটা? ওরা জানবে কীভাবে আমি নিউ ইয়র্কে?’
‘টেম্পোরারি মোবাইল সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি লগ হ্যাক করলেই সেটা বোঝা যায়।’
‘সব নিশ্চয়ই ওই টেক উইজ ডেভিডটার কাজ।’
‘কে ডেভিড?’ সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকাল, ভ্রূ-যুগলে কুঞ্চন।
‘আমাকে একটা বিশাল ওয়্যারহাউসে ধরে নিয়ে গেছিল ওরা। বাইরে থেকে রান-ডাউন কণ্ডিশন, কিন্তু ভিতরে একটা হাই-টেক কল সেন্টার অপারেট করছে। আর র্যাকে অজস্র কম্পিউটার, মনে হচ্ছে যেন বিশাল সার্ভার রুমে ঢুকলাম। রুমের দেওয়ালে দুটো অ্যারো চিহ্ন দেওয়া একটা প্ল্যাকার্ড। মনে হল অর্গানাইজেশনের লোগো।’
‘দুটো অ্যারো চিহ্ন?’
‘হ্যাঁ, এরকম,’ রিধিমা ড্যাশবোর্ডের ওপর আঙুল বুলিয়ে আঁকল
‘ডাবল অ্যারো!’ সুনয়নের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় স্পষ্ট দেখতে পেল রিধিমা। ‘আপনি শিওর?
‘হ্যাঁ চিহ্নটা এরকমই।’
‘যারা কাজ করছিল তাদের ডেসক্রাইব করতে পারবেন?’
‘ডেভিড নামে একটা চব্বিশ-পঁচিশ বছরের চিনা ছেলে, আরেকটা দাড়িওয়ালা লোক। ডাবল অ্যারো কী?’
‘কেমন দেখতে ঐ ডেভিডকে?’
‘পাতলা চেহারা, মাকুন্দ, মাথায় একটা উলটো ক্যাপ পরা ছিল। আর হ্যাঁ, ডান হাতে একটা অদ্ভুত ট্যাটু ছিল।’
‘অদ্ভুত ট্যাটু!’
‘একটা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে একটা সাপ ছেলেটার জিভে ছোবল দিচ্ছে।’
‘কোবরা-কিস, ইন্টারেস্টিং,’ লোকটা নিজের মনে বলল।
‘ছেলেটার মনিটরেও আমি একটা কেউটের ছবি দেখেছি। আমি ঢুকতেই বন্ধ করে দিয়েছিল।’
‘জায়গাটা কোথায় সেটা বলতে পারবেন কি?’
‘১০ ইণ্ডাস্ট্রিয়াল স্টোরেজ প্লেস, সানসেট পার্ক, ব্রুকলীন, নিউ ইয়র্ক।’ ঠিকানাটা রিধিমার বুকের ভিতর গেঁথে গেছে।
‘ওরা আপনাকে ট্র্যাক করছিল।’
‘আমার নতুন ফোন! টপ-অফ-দ্য-লাইন, এক্স এস।’
‘এসব ফোন এয়ারপ্লেন মোডে থাকলেও GPS অফ হয় না। স্পেশাল অ্যাকশন নিতে হয়। এগুলো পুরোনো মডেলগুলোর মত না।’ রিধিমা বুঝল লোকটা প্রচণ্ড স্মার্ট। ডিজিটাল গীক।
‘আপনাকে কেন ধরে নিয়ে গেছিল?’
‘ওরা নাকি বুদ্ধের হাড় অকশন করবে, ওদের মার্কেট প্লেসে। সার্টিফাই করতে বলল—’
‘মার্কেট প্লেস!’ সুনয়ন বলল। ‘ডাবল অ্যারোর অকশন সাইট।’
‘কী এই ডাবল অ্যারো?’
‘ডাবল অ্যারো হল একটা ভার্চুয়াল আণ্ডারওয়ার্ল্ড ওয়ান-স্টপ শপিং মল, ‘সুনয়ন বলল। ‘এখানে ড্রাগস, ম্যালিসাস সফটওয়্যার, ওয়েপনস, পাইরেটেড পর্ণো, ক্রেডিট কার্ড ইনফরমেশন এবং অন্যান্য পাইরেটেড ও কাউন্টারফিটেড ইনফরমেশন এই সব আণ্ডারওয়ার্ল্ড পণ্যের কেনাবেচা চলে। সিল্ক রোড, আলফাবে এসবের নাম শুনেছেন তো?’
‘না। এগুলো কী?’
‘নাম যখন শোনেন নি তখন এখন এসব জেনে কাজ নেই। বটম লাইন হল এগুলো ছিল মারাত্মক ডার্কনেট। এগুলো ডাবল অ্যারোর পূর্বপুরুষ বলতে পারেন। প্রত্যেকদিন আটশ মিলিয়ন ডলারের কেনাবেচা হত এই আণ্ডারওয়ার্ল্ড মার্কেটপ্লেসে।’
‘আপনাকে ধন্যবাদ, আমার জন্য এত রাতে বাইরে এলেন—’
‘রাস্তাতেই ছিলাম,’ সুনয়নের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘এত রাতে?’
‘আমাদের ডিউটি আওয়ারস রাতেই—’ কাটাকাটা উত্তর।
‘আপনার মা বলছিল আপনি জার্নালিস্ট—
‘নাইট পুলিশ রিপোর্টারকে জার্নালিস্ট বলার কাছাকাছি অ্যানালজি হল কেঁচোকে সাপ বলা।’
‘মডেস্ট?’
‘সে যোগ্যতা আর হল কই। আমাদের স্টেটাস ক্রিমিন্যালদের থেকে সামান্য উঁচু।’ সুনয়ন স্টিয়ারিং হুইল থেকে ডান হাত সরিয়ে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলের মধ্যে সামান্য ফাঁক রেখে বোঝাল কত সামান্য।
‘কেন? আপনাদের কাজটা কী?’
‘যদি রাত্তির বেলা কেউ পুলিশকে কল করে মার্ডার, রেপ, ডাকাতি, অ্যাকসিডেন্ট এসবের খবর দেয়, তখন আমার কাজ হল এটার গভীরে গিয়ে দেখা। গত দু বছরে আমি মার্ডার, আগুনে জ্বলা, সুইসাইড, ড্রাগ-রিলেটেড গানশট— সব মিলিয়ে অন্ততঃ একশ ডেথ কভার করেছি। ইনভেস্টিগেশনের জন্য ইন্টারভিউ করতে হয় প্রস্টিটিউট, পিম্প, হিজরা, পুসারস, চাইল্ড মলেস্টার, পুলিশ এদের। ইম্প্রেসড?’
‘আপনি রাতে বাইরে ছিলেন তাই আমি বেঁচে গেলাম।’
‘তা ঠিক। তবে আপনাকে একটা কথা সোজাসুজি বলি।’ অল্প বিরাম। ‘আপনাকে পুলিশ খুঁজছে, তাই আপনার কম্প্যানি আমার জন্য খুবই ডেঞ্জারাস। আমি চাই না আপনি বেশিক্ষণ আমার সঙ্গে থাকুন।’
‘জানি,’ রিধিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আমাকে একটা ইণ্ডিয়া যাওয়ার টিকিট কেটে JFK-তে নামিয়ে দিতে পারবেন? প্লিজ?’
‘JFK ক্লোজড। তাছাড়া, এয়ারপোর্টে ধরা পড়ে যাবেন।
‘তাহলে?’ প্রশ্নটা নিজেকেই করল রিধিমা।
‘আমাদের খোঁজ আপনি পেলেন কীভাবে?’
‘হার্ভার্ডের প্রফেসর ডঃ উইলিয়াম উইকস—’
গাড়ির গতি আচমকা কমে গেল। সুনয়নের পা ব্রেকে। রিধিমা হতভম্ব।
গাড়ি আবার গতি বাড়াল – ‘ওই হিপোক্র্যাট লোকটার নাম আমার সামনে উচ্চারণ করবেন না।’
রিধিমা সাবধান হল। ওর মা বলেছিল সুনয়ন রগচটা। ভয় হল ওকে আবার গ্রাণ্ড সেন্ট্রালে ফিরিয়ে না দেয়।
‘এনিওয়েজ,’ সুনয়ন বলল। ‘হোয়াটস ইয়োর স্টোরি?’
স্টোরি! গল্পটা মনে করলেই রিধিমার রক্ত ভয়ে হিম হয়ে আসছে।
রিধিমা কাঁটা বেছে বেছে মাছ খাওয়ার মত গল্পটা বলল। পুলিশ ওকে খুঁজছে, কিন্তু ওর ডর্মে যে পিস্তল পাওয়া গেছে সেটা চেপে গেল, মিসেস উইকসের আর ভক্তির সম্পর্কিত স্যালির গল্পটাও বাদ দিয়ে গেল। সুনয়ন এতক্ষণ একটা কথাও না বলে চুপচাপ শুনেছে। সামনে একটা গ্যাস স্টেশন। সুনয়ন গাড়িটাকে গ্যাস স্টেশনে ঢোকাল। গ্যাস স্টেশন অন্ধকার, শুধু গ্যাস পাম্পমেশিনগুলোতে লাল ডিজিটাল আলোয় লেখা রেগুলার, প্রিমিয়াম গ্যাসের দাম। রিধিমা ভেবেছিল সুনয়ন নেমে এবার গাড়িতে গ্যাস ভরবে, সুনয়ন গাড়ি বন্ধ করল, কিন্তু নামল না।
‘আপনার পাসপোর্টটা দেখি,’ সুনয়ন এমনভাবে হাত বাড়াল যেন দিল্লীর ট্রাফিক পুলিশ অফেণ্ডারের থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চাইছে।
রিধিমা অবাক হলেও, কথা না বলে সুনয়নকে পাসপোর্টটা ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে দিল। সুনয়ন গাড়ির ভিতরের রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালাল। তারপর পাসপোর্টের প্রতিটি পাতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে পাসপোর্টটা রিধিমাকে ফেরত দিয়ে বলল, ‘গল্পটা রাস্তায় আসতে আসতে বানালেন?’
‘মানে?’ রিধিমার খুব রাগ হল। কী রুড এই লোকটা? এই লোকটাকে সে সহানুভূতিশীল ভাবছিল?
‘সিনেমার স্ক্রিপট—’
অনেকক্ষণ ধরে রিধিমার মনে কৃতজ্ঞতা এবং আহত আত্মসম্মান একে অন্যের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছিল, এবার তার ফয়সলা হয়ে গেল— ‘আপনি কী বলতে চান?’ রিধিমা ঝাঁঝিয়ে উঠল।
‘হোয়াই ইউ ফেকিং জ্যাকস?’ বিরক্তি লোকটার সারা মুখে যেন বসন্তের গুটির মত ছড়িয়ে পড়ল।
‘আমি মিথ্যা গল্প ফাঁদছি?’ রিধিমা খুব বিরক্ত।
দিল্লী থেকে পরশু রওনা দিয়ে আপনি এয়ার ফ্রান্সের প্লেনে আজ বস্টনে নেমেছেন বললেন না?’
‘হ্যাঁ। ব্লিজার্ডের জন্য প্যারিসে আটকে রেখেছিল।’
‘প্রপগুলো গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজাতে হয়।’
‘তার মানে?’
‘আপনার পাসপোর্টে না আছে বস্টন-লোগান এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প, না আছে দিল্লী থেকে ইণ্ডিয়া ছাড়ার ডিস-এম্বার্কেশন স্ট্যাম্প।’
‘কী বলছেন আপনি?’ রিধিমা বিস্ময়ে পাসপোর্ট খুলে একের পর এক পাতা ওল্টাতে লাগল, কিন্তু বস্টনের ইমিগ্রেশন বা ইণ্ডিয়া ছাড়ার কোনও স্ট্যাম্পই কোনও পাতায় খুঁজে পেল না। রিধিমা মরিয়া হয়ে আবার খুঁজল, এবার সুনয়ন রিধিমার দিকে ঘুরে বসল— ‘কেন এসব নাটক করছেন?’
‘আমি নাটক করছি?’ রিধিমা ভাবল কে করল ওটা? মোহন? নাকি কনসুলেটের কেউ? পাসপোর্ট থেকে সব চিহ্ন লোপাট করে দিয়েছে!
‘আমায় বিশ্বাস করুন। এই যে আমার বোর্ডিং পাস,’ রিধিমা বোর্ডিং পাসটা বের করার জন্য ল্যাপটপের সাইড পকেটে হাত ঢোকাল। অনেক কিছু হাতে ঠেকল, ওষুধ, সেল ফোন চার্জার, কিছু ভারতীয় টাকা— ‘বোর্ডিং পাস!’ রিধিমার বুক ধক করে উঠল।
‘জানতাম পাবেন না,’ সুনয়ন বলল। ‘দেখুন, আমার উচিত এক্ষুনি আপনাকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া। কিন্তু তাতে আমাকে নিয়েও টানাটানি করবে পুলিশ। তাই পুলিশে আমি যাব না।’
বিশ্বাস করুন, আমি সব সত্যি কথা বলেছি।’
‘বলেন নি,’ সুনয়ন বলল। ‘আপনি আমার কথা জানলেন কীভাবে?’
রিধিমা বুঝল এবার সবটা বলা দরকার। ‘ডঃ উইকস একটা ক্রিপটিক মেসেজে আপনাদের নাম লিখে গেছেন।’
‘আপনি পেলেন কীভাবে?’
‘আমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলেন। ফোনটা থাকলে দেখাতে পারতাম
‘এ’কথাটা কেন লুকিয়ে গেছিলেন?’
‘আপনি বলেছিলেন ডঃ উইকসের নাম আপনার সামনে না আনতে।’
‘ইণ্ডিয়া গেছিলেন অথচ আপনার পাসপোর্টে স্ট্যাম্প নেই কেন?’
‘এটা ছিল। আমি জানি না কীভাবে মুছে গেল।’
‘আপনার পাসপোর্ট, আপনি না জানলে আর কে জানবে?’
‘ইণ্ডিয়ান কনসুলেটে ব্যাকপ্যাকটা রেখে গেছিলাম থানায় যাবার সময়।’
‘আয়্যাম নট বায়িং ইয়োর স্টোরি।’ সুনয়ন অবিশ্বাসে মাথা নাড়াল। ‘আপনার গল্পটার সম্বন্ধে একটু নিজে খোঁজ নেব। ততক্ষণ আপনাকে আমাদের লোকেরা নজর রাখবে।’
‘আপনাদের মানে?’
‘চলুন, জানতে পারবেন।’
রিধিমা একদম দিশেহারা। তারপর বলল, ‘আপনি বলছেন আমি তাহলে ইণ্ডিয়া যাই নি? এসব আমার কল্পনা? হ্যালুশিনেশন! মানে, জন ন্যাশের যেমন ছিল। বিউটিফুল মাইণ্ড?’
‘চারটে মার্ডার একজন নিখোঁজ, ব্যাপারটা বিউটিফুল মোটেই না।’
রিধিমা বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি কি উন্মাদ হয়ে গেলাম? আমার স্মৃতি কি সব মুছে গেল?’ তারপর রিধিমা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ইম্পসিবল! আমার আজ রাতের মত একটা সেফ থাকার জায়গা চাই। আমি কালই চেষ্টা করব যদি ইণ্ডিয়াতে পালাতে পারি।’
সুনয়ন আর কোনও কথা না বলে চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল।
‘আপনি তো একজন জার্নালিস্ট—’
‘কেন দেখে সার্কাসের জোকার মনে হচ্ছে? এত রাতে সার্কাসের জোকাররা গাড়ি নিয়ে পথে পথে ঘোরে না।’
লোকটা শুধু বদরাগী না, ভীষণ কমপ্লিকেটেড, রিধিমা ভাবল, সব কিছু পেঁচিয়ে নেয়— ‘আমাকে CNN-এ একটা ইন্টারভিউ করিয়ে দিতে পারবেন?’
‘ওসব বড় বড় জায়গায় আমার কোনও চেনাশোনা নেই।
আবার কিছুক্ষণ দু’জনে চুপ।
‘আপনাদের কাগজে অন্ততঃ একটা ইন্টারভিউ করাতে পারেন কি?’
‘লাভ হবে না।’
‘কেন?’
‘আমাদের কাগজ ‘রিচমণ্ড হিলস গেজেট’ এই শহরের সব চেয়ে খাজা লোকাল কাগজগুলোর মধ্যে একটা। লিস্ট সার্কুলেশন। খবরটা ছাপা হলেও লোকে জানবেই না।’
‘তাহলে?’
‘আজ রাতটা কাটুক। কাল সকালে আপনাকে থানায় আমি পৌঁছে দেব।’
‘পুলিশে?’
‘হ্যাঁ।’
‘প্রফেসর গিলমোরের ভাই নাকি জ্যাক গিলমোর, CNN এর সিনিয়র করেসপণ্ডেন্ট। প্রফেসর গিলমোরের কাছে আমাকে পৌঁছে দিতে পারবেন?’
‘দেখি খুঁজে পাই কিনা। পেলে আমি আপনাকে ইমেইল করব। তবে আপনার ইমেইল আইডিও নিশ্চয়ই হ্যাক করেছে। আমি যা লিখব তাই ওরা জেনে যাবে।’
হঠাৎ রিধিমার মনে পড়ে গেল— ‘আপনার মা বলছিলেন আপনি ব্রাহ্মী শিখেছিলেন? আপনার এখনো মনে আছে ব্রাহ্মী?’
‘কেন?’
‘আপনি আমাকে ব্রাহ্মী লিপিতে লিখে পাঠাতে পারবেন?’
‘আপনি ব্রাহ্মী পড়তে পারেন?’
এই বিপর্যয়ের মধ্যেও রিধিমা মনে মনে হাসল— ‘পারি।’
‘আইডিয়াটা অরিজিনাল। এটাকে ডিকোড করা ওদের পক্ষে সহজ হবে না। লেটস ট্রাই।’
‘এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি সেটা প্লিজ বলবেন?’
‘আমাদের গায়ানিজদের একটা মন্দিরের বেসমেন্টের নাইট শেল্টারে। আরও আধঘন্টা লাগবে।’ সুনয়ন গাড়ির হিটটা একটু কমিয়ে দিল, আওয়াজও কমে গেল। রাস্তায় একদমই গাড়ি নেই। রিধিমা হাই তুলল, ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ রিধিমা অনুভব করল যে এলাকায় গাড়ি এখন চলছে সেটা নিঃঝুম। ঘুমিয়ে রয়েছে।
‘আরও দেরি আছে?’ রিধিমা সুনয়নকে জিজ্ঞাসা করল।
‘প্রায় এসে গেছি। ওই যে মন্দিরের চূড়া দেখা যাচ্ছে।’
‘ওটা তো চার্চ!’
‘হ্যাঁ, ডেসার্টেড চার্চ। আমরা গায়ানিজরা ওটা কিনে রিনোভেট করে মন্দির বানিয়েছি।’
গলির মুখ থেকে দেখা যাচ্ছে দূরে চার্চের পার্কিং লটটাতে তিনটে পুলিশের গাড়ির মাথায় লাল-নীল হুটার ঘুরছে। সুনয়ন সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে দিয়ে গাড়িটাকে রাস্তার কার্বে দাঁড় করাল। কয়েকজন পুলিশ কিছু লোককে চার্চ থেকে বের করে জোর করে ধাক্কা মেরে ওদের গাড়িতে তুলছে। রিধিমার বুক ধক করে উঠল।
সুনয়ন তাড়াতাড়ি গাড়িটাকে ব্যাক গিয়ারে বড় রাস্তায় তুলল, তারপর জোরে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে গেল।
‘পুলিশ কেন?’
‘অন্য আরেকদিন বলব,’ সুনয়ন বারবার রিয়ার ভিউ মিরারে তাকাচ্ছে। ‘আপনাকে এখন যেখানে ছাড়ব, সেখানে একজন গায়ানিজ মহিলা থাকতেন। এক মাস আগে মারা গেছেন। বাড়িটা খালি। কোনও অসুবিধা হবে না। শুধু কারুকে দরজা খুলে দেবেন না। আমি আপনাকে ইমেইল করে জানাব যদি কিছু লিড পাই। ইমেইল আইডি গ্লাভবক্সে রাখা প্যাডে লিখে দিন। আর এই ফোনটা সঙ্গে রাখুন।’ সুনয়ন গাড়ির ড্যাশ বোর্ড থেকে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন রিধিমাকে দিল। আমার নম্বর ছাড়া কারুকে ফোন করবেন না, আমার নম্বর ছাড়া কোনও ফোন রিসিভ করবেন না। নো ফেসবুক, ট্যুইটার, নো আদার ইমেইল। ওকে?’
রিধিমা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিন্তু রিধিমার মনে একটা সন্দেহ জেগে উঠেছে— ওখানে পুলিশ কেন? পুলিশ দেখে সুনয়ন কেন পালিয়ে গেল? পুলিশ কি সুনয়নকে খুঁজছে? তবে কি সুনয়নই ডঃ উইকসকে খুন করেছে? নাকি লোকটা কোনও বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত?
