কপিলাবস্তুর কলস – ১৫
৷৷ পনেরো ৷৷
অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় নেমপ্লেট— মহাদেবী শিউচরণ। খুবই ছোট একটা স্টুডিও, কিন্তু ভিতরটা বেশ গরম। মহিলা এক মাস আগে মরে গেছে বলল সুনয়ন, কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টের হিট অন! ভিতরটা ছিমছাম। তার মানে এই অ্যাপার্টমেন্টে কেউ থাকে? ভিতরে ঢুকে সুনয়ন বলল, ‘ব্রেকফাস্টের হানিওটস সিরিয়াল প্যানট্রির ডানদিকের ওই উপরের তাকে পাবেন, দুধ ফ্রিজে আছে। ডিম ও আছে। লিপটনের টি-ব্যাগ পাবেন মাঝের তাকে, খুললেই দেখতে পাবেন। লিনেন ক্লজেটে টাওয়েল পাবেন, বাথরুমে এক্সট্রা টুথব্রাশ পাবেন।’ সুনয়নের কথা শুনে রিধিমার মনে হল সুনয়নের যেন এই বাড়িতে প্রচুর যাওয়া আসা আছে। সুনয়ন বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল, ‘অ্যাও প্লিজ ডু মি আ ফেভার, ভুলেও বাড়ির বাইরে পা দেবেন না।
‘রিধিমা মাথা নাড়ল। এই আশ্রয় ছেড়ে বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই আসছে না। সুনয়ন চলে যাওয়ার পর রিধিমা ভালভাবে দরজার তালা-টালা দেখে বিছানায় এসে গুলো। সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই। আলো নেভাতে গিয়েও কৌতূহলে ব্যাকপ্যাক খুলল। দাদার ডায়েরিটার অদম্য আকর্ষণ। রাজকুমারীর কী হল? রিধিমা ডায়েরিটা খুলল—
* * * * *
কাল রাত থেকে রাজকুমারীর শরীর খারাপ। কাল জ্বর ছিল, আজ সকালে বমি করেছে। রাধার ভয় হয়, তরাইতে কলেরা মহামারির মত ছড়িয়ে যায়। এই শীতে অবশ্য কলেরার প্রকোপ তেমন থাকেনা, রাজকুমারীকে শিশুপাতার রস ফুটিয়ে খাইয়ে বেরোতে বেরোতে বেলা হয়ে গেল রাধার। পুত্রকামনায় প্রতি সোমবারে উপরের পাহাড়ে মহাকালের মন্দিরে গিয়ে শিবপুজো করে রাধা, ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে যায়।
বাহারিতে বেতের মোড়ায় বসে সকাল থেকে বাঁশের ঢুংগ্রোতে তরিয়ে তরিয়ে ছাং খাচ্ছিল চমনলাল। রাধার ক্ষীণকায় চেহারা পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যেতেই ওর মাথায় শয়তান ভর করল। এক চুমুকে ছাং শেষ করে ঠক করে টুংগ্রো মাটিতে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল। দেওয়ালের ছোট গর্ত দিয়ে বাইরেটা দেখে নিল চমনলাল। একজন মেষপালক আর একজন গোয়ালা গহরিতে ভেড়া আর গোরুদের দেখাশোনা করছে, একজন চাষী কুথালায় গম ঝাড়ছে, তুষ ছড়িয়ে পড়ছে উঠানে, তারপর অম্লিসোর পাতার ঝাড়ু দিয়ে সেই তুষ উঠানের কোণে জড়ো করছে, একজন ঘাসুড়ে ভুষাণ্ডিতে খড়ের গাদা একত্র করে করে রাখছে। গমের তুষ, কাদা আর গোবর দিয়ে বানানো দেওয়াল দিয়ে ঘর ভাগ করা, চমনলাল দেওয়ালের ছোট গর্তে চোখ রাখতেই শরীরের রক্ত আর ছাং মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। রাজকুমারী— একা ঘরে বসে বাখারি, খাগড়া আর মুঞ্জঘাসে বেঁধে বেঁধে ডোকো বুনছে, ওর পায়ের হাঁটু পর্যন্ত উঠে গেছে পরনের লুঙ্গি।
বাইরে বেরিয়ে এসে চমনলাল সবকটা কাজের লোককে ডেকে কুঁড়ে, আলসে বলে অযথা খুব বকাবকি করে বলল তোরা আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা। আজ সুয্যি ডোবার আগে তোদের এ বাড়িতে মুখ দেখলে এ মাসের গম পাবি না। যা জঙ্গলে যা। জঙ্গল থেকে রান্নার জন্য কাঠ কেটে আন। ওরা বেরিয়ে যেতে চমনলাল মনে মনে সময়ের হিসেব করল, তারপর ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল।
রাধার শয়নকক্ষে বসে বসে রাজকুমারী একটা ডোকো বোনা প্রায় শেষ করে এনেছে। পাশে দরজায় পায়ের শব্দ। রাজকুমারী তাকিয়ে দেখল মাহাতো চমনলাল। আজ চমনলালের চোখ লাল। চমনলাল সময় নষ্ট করল না, সোজা এসে রাজকুমারীকে জড়িয়ে ধরল। মুখে ছাং-এর গন্ধ। রাজকুমারীর ভয়ে শরীর ঠাণ্ডা, অবশ হয়ে গেল, পা যেন আর নড়ছে না, মাহাতোকে বাধা দেবার ক্ষমতা তার নেই। মুখ থেকে অস্ফুট গোঙানি বেরিয়ে এল রাজকুমারীর। মাহাতো রাজকুমারীকে সর্বশক্তি দিয়ে নিষ্পেষণ করল। রাজকুমারীর দম বন্ধ হয়ে আসছে। মাহাতোর চোখের দৃষ্টি উদভ্রান্ত, ওর শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। এবার রাজকুমারী চমনলালকে ছিটকে ফেলার চেষ্টা করতে করতে বলল— ‘ছাড়ুন!’ কিন্তু রাজকুমারী মাহাতোকে সরিয়ে ফেলতে পারল না, লোকটার গায়ে যেন অসুরের মত শক্তি আজ, রাজকুমারীকে অজগরের শিকারের মত জড়িয়ে রেখে রাজকুমারীর ঠোঁটে ঠোঁট চিপে যেন তার শরীরের সমস্ত শাঁস নিংড়ে ছিবড়ে করতে চাইল।
‘ছাড়ুন!’ রাজকুমারী বারংবার অনুনয় করতে লাগল।
‘না!’ মাহাতো রাজকুমারীর নরম হাত নিজের দু-উরুর মধ্যস্থলে ঢুকিয়ে দুই উরু দিয়ে চেপে ধরে ঘষতে লাগল। রাজকুমারী চিৎকার করতে গিয়ে পারলো না— চিৎকার করতে গেলে যতটা সাহসের দরকার হয় তরাইয়ের কমলারিদের বুকের খাঁচায় ততটা সাহস সঞ্চয় হতে হতে ওদের শরীরে বার্ধক্য চলে আসে৷ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল রাজকুমারী।
‘হারামি!’ হঠাৎ পিছন থেকে চিৎকার।
চমনলাল পিছন ফিরে তাকাল, রাজকুমারী দেখল রাধা এসে রণচণ্ডী মূর্তিতে দরজায় দাঁড়িয়ে, রাধা পুজোর পিতলের ঘটি ছুড়ে মারল চমনলালের কপালে— মুরোদ নেই বিছানায় শোবার! ধামির বনতুলসীর পাতা আর হরিণের চামড়া রোজ সকালে উঠে চিবোতে চিবোতে আমার জিভের ছাল উঠে গেল। আর লোককে বলে বেড়াস আমি বাঁজ।’
‘তোকে বের করে দেব বাড়ি থেকে, তুই বাঁজ, বাঁজ, বাঁজ!’ চমনলালের এক হাত রাজকুমারীর হাত শক্ত করে ধরা, অন্য হাত সে বোলাচ্ছে কপালের আঘাতের স্থানে।
‘ওকে ছাড়!’ রাধা হিসহিস করে বলে ছুটে গেল বিছানার দিকে। রাধা বিছানার তোষকের নিচ থেকে হাসুয়া বের করল— ‘আমি বাঁজ! শালা, বুড়া লোমরি! তোকে আজ মেরেই ফেলব!’
‘আমাকে মারবি!’ চমনলাল রাজকুমারীর হাত ছেড়ে দিল। ‘হেঁসেলের কাঠের আগুনে তোর মুখ না পোড়ালে আমি পাল্লা রাজার দেওয়া মেডেল উনুনে জ্বালিয়ে দেব—’ চমনলাল টলতে টলতে রান্নাঘরের দিকে চলল। রাধা চিৎকার করে বলল, ‘চলে যা রাজকুমারী, থাকিস নে এই নরকে। আমি আন্দাজ করেছিলাম এমনটা—’ চমনলালকে অনুসরণ করে দৌড়ে রাধা হেঁসেলে ঢুকে গেল।
কাল রোববারের হাট থেকে ফেরার পর থেকে দেবচরণের মন খুশিতে ভরে আছে। অত ভাল উপার্জন হল, আর পাদ্রিরা বলল রাজকুমারির ওটা অসুখ, চুড়েল-টুড়েল না। আজ দুপুর নাগাদ দেবচরণ রওনা দিল মাহাতোর বাড়ির দিকে। মাহাতোর রাখালের হাতে রাজকুমারীর জন্য কাল হাট থেকে কেনা আরশি আর চিরুনি দিয়ে আসবে।
এই এলাকায় মাহাতো চমনলালের টিনের চালা দেওয়া বিশাল বাড়ি একমাত্র পাক্কিঘর। বাড়ির উঠোনে কাজের লোকদের কারুকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ভিতর থেকে নারীকণ্ঠের অকথ্য গালাগালি ভেসে আসছে। দেবচরণ উঁকিঝুঁকি মারল আর ঠিক তখনই ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল রাজকুমারী, চোখেমুখে আতঙ্ক। বাবাকে দেখেই বাবার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রাজকুমারী— ‘আমাকে এখানে থাকতে বোলো না বাবা, আমি মরে গেলেও এখানে থাকব না। এই মাহাতো একটা শয়তান।
মেয়ের বিধ্বস্ত চোলি-লুঙ্গির দিকে তাকিয়ে এক লহমায় মেয়ের শরীরের ভাষা পড়ে ফেলল দেবচরণ। রাগে ওর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। মাহাতো! আমার মেয়েকে! আজ ওকে কেটেই ফেলব। উঠোন থেকে কুড়ালটা টেনে নিয়ে ভিতরে ঢুকল দেবচরণ। ভিতরাতে রান্নার উনানের ধোঁয়া ছাতের নিচে কালো হয়ে যাওয়া কড়ি-বরগার ভিতর দিয়ে বাহারিতে ঢুকে পড়ছে, কিন্তু ধোঁয়ার গন্ধে মিশে গেছে মাংস পোড়া গন্ধ।
দেবচরণের সর্বাঙ্গে অস্বস্তি। দেবচরণ বাহারি থেকে ভিতরে ছুটে গেল। সব কটা কুস্তে, ভিতরা, সব তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষের শয়নকক্ষে ঢুকল, বিশাল ঘরের এক কোণে উঁচু মাটির চৌরাসিয়া। চৌরাসিয়ার পাল্লা খোলা, দেবচরণ অবাক – চৌরাসিয়া নোটে ঠাসা, আর নিচের তাকে প্রচুর গয়না। চমনলালের বৌ রাধা দ্রুতহস্তে সেই গয়না আর নোট একটা চটের থলেতে ভরছে। দেবচরণকে দেখে রাধা চমকে উঠল।
‘মাহাতো কোথায়?’ ক্ষিপ্ত দেবচরণ জিজ্ঞেস করল।
রাধা ভিতরার দিকে ইঙ্গিত করল। দেবচরণ দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখল চমনলালের মাথা উনুনের মধ্যে গোঁজা, বুকে গেঁথে রয়েছে একটা হেঁসো।
‘ওকে মেরে ফেললে?’ দেবচরণ বেরিয়ে এসে রাধাকে বলল।
‘তুইও তো ওকে মারতেই এসেছিলি,’ রাধা টলছে। ‘তোর কাজ সোজা করে দিলাম। এখন কেউ দেখে ফেলার আগে পালা।’
দেবচরণ বাহারিতে বেরিয়ে এল, বাহারির দেওয়ালে চমনলালের ফটো পাল্পা রাজা খড়া সামসের রানার সঙ্গে। দেবচরণ শিউরে উঠল। রানার বন্ধুকে মেরে ফেলেছে? রানা ওদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারবে। দেবচরণ রাজকুমারীর হাত ধরে টেনে বলল— ‘শিগগির পালা।’
মেয়েকে নিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে বাড়ি ফিরে দেবচরণ তুলসীকে বলল, ‘শিগগির এই গ্রাম ছেড়ে পালাতে হবে। এক্ষুনি!’
‘কেন?’ বাপের সঙ্গে বিধ্বস্ত রাজকুমারীকে দেখে তুলসী বুঝল মারাত্মক কিছু একটা ঘটেছে।
‘চমনলাল খুন হয়েছে,’ দেবচরণ বলল। ‘রানার সেপাই এক্ষুনি এ-গ্রামে আসবে রাজকুমারীকে গ্রেফতার করতে।’
‘চমনলাল খুন!’ তুলসীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ‘কে খুন করেছে?’
‘আগে পালা, রাস্তায় সব বলব,’ দেবচরণ তন্নাবাঁশের লাঠিটা নিল এক হাতে, অন্য হাতে হেঁসোটা। ‘
তুলসী ঘরের ভিতর থেকে তাড়াতাড়ি ডোকোতে কম্বল, ল্যাহেঙ্গা, জামা, কাপড় ঠেসে নিল, খড়াভূত আর পাঁচুয়ার মূর্তি ডোকোতে ঢুকিয়ে দেবচরণের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল। দেবচরণের মনে বাজছে বড়া সিপার গুরুবার কথা— এ মেয়ে তোদের কোথাও থিতু হতে দেবে না। পুণ্যগিরির থানে তিনফোঁটা রক্ত দেওয়া হল না, ওরা ক্রমশঃ আরও দূরে চলে যাচ্ছে।
টিলা থেকে চোৱাবাটো দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে নামতে লাগল তিনজন, পিছনে অদৃশ্য কালান্তক ছুটে আসছে। সামনে একটা বাঁশবন। ছোট পথ জঙ্গলে নেমে গেছে। বন্য জন্তু শিকারের লোভে কাছে আসতে পারে। দেবচরণ তার বৌ মেয়েকে নিয়ে সঙ্কীর্ণ পথে দৌড়ে চলল। পাহাড় থেকে নেমে মাথার ওপরের এক উড়ন্ত ধণেশের পিছনে তিনজন শালের জঙ্গলে মিশে গেল।
থারুর জীবনে জঙ্গল এমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকে যে জঙ্গলকে থাক ভয় পায় না, তরাই হল থারুর মা। মাকে আবার ভয় কী? কিন্তু এখন দেবচরণের গা ছমছম করছে – যদি রানার সৈন্য সামনে এসে হাজির হয়? জঙ্গলের পথে দৌড়ে চলেছে তিন জন। জ্বরে রাজকুমারী দুর্বল, বারবার জল পিপাসা পাচ্ছে। জঙ্গলের উঁচু নিচু পাহাড়ী পথে চলতে চলতে তারপর অনেকটা ন্যাড়া পাহাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে সংকীর্ণ পথ টিলার দিকে এগিয়ে গেছে। পাহাড়ের ওপাশে সূর্য ঢলে গেল, পাহাড়ের মাথায় একচিলতে মরা রোদ পলাশ, শিশু, দেবদারুর জঙ্গলের পিছনে হারিয়ে যেতেই বড় বড় ছায়া ঝাঁপিয়ে পড়ল জঙ্গলের শাল, দেবদারু বনে। তরাইয়ের জঙ্গলে এবার নেমে আসবে শীতল অন্ধকার। হাঁফাতে হাঁফাতে পাহাড় পেরিয়ে নিচে তাকাল দেবচরণ। নিচে, অনেক নিচে, বানগঙ্গার ধারে দেখা যাচ্ছে সারি সারি তাঁবু, ওদিকের জঙ্গল অনেকটা ন্যাড়া হয়ে গেছে, জঙ্গল কেটে মাটি খোঁড়ার জন্য কেউ জমি ইজারা নিয়েছে।
‘ওখানে দূরে কুলিদের তাঁবুতে—’ দেবচরণ হাঁফাতে হাঁফাতে তুলসীকে নিচে আঙুল দিয়ে দেখাল। ‘জোরে পা চালা—’ হেঁসোটা কোমরবন্ধনী থেকে বের করে হাতে নিল দেবচরণ। খোলা জায়গাটা পেরিয়ে আবার সামনের জঙ্গলে ঢুকতে হবে।
‘দাঁড়াও,’ তুলসী পিছন থেকে বলল।
বিরক্ত হল দেবচরণ, এখন দাঁড়ালে চলবে না। অনেকটা পথ সামনের জঙ্গলে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে চলতে হবে। পিছন ফিরে তাকাল সে। সুঁড়িপথের পাশে একজায়গায় অনেকগুলো ডালপালা ডাঁই করে রাখা, তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা ডাল হাতে তুলসী চোখ খুঁজে প্রণাম করে ডালটা সেই ডালপালার ওপর ভক্তি তরে রাখল। বনদেবতা বনস্পতির পুজো করছে তুলসী। দেবচরণ ভয়ে খেয়াল করেনি, কিন্তু তুলসীর নজর এড়িয়ে যায় নি এই জঙ্গলের দেবাত্মার থান। থারুরা জঙ্গলে প্রবেশ করার সময় বনস্পতির আশীর্বাদ প্রার্থনা করে তবে জঙ্গলে ঢোকে। প্রণাম করে তিনজন চলার গতি বাড়াল। জঙ্গলে এই অসময়ে মানুষ দেখে সদ্য বের হওয়া নিশাচর সম্বরটা বিরক্ত হয়ে বনমেথির ঝোপ মাড়িয়ে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেল।
* * * * *
বালিশের পাশে ফোনটা বেজে উঠল।
সুনয়ন!
‘বলুন।’
মৃত ব্যক্তির ঘরে বেশি রাত পর্যন্ত ঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখলে লোকের সন্দেহ হবে। যদি জেগে থাকেন তো লাইট অফ করে অন্ধকার ঘরে জেগে থাকবেন।’
লোকটা স্ট্রীট স্মার্ট, রিধিমা মনে মনে তারিফ করল। দেবচরণের পরিবারের কী হল জানার জন্য ঔৎসুক্য হলেও সে নিজেকে সংযত করে আলো নিভিয়ে দিল।
‘আরেকটা কথা,’ সুনয়নের কণ্ঠস্বর অন্ধকারে শুনল রিধিমা।
‘বলুন।’
‘আপনার সেলফোনের নম্বরটা কী ছিল?’
রিধিমা নম্বরটা সুনয়নকে বলল। ফোনটাকে মাথার নাগালে বালিশের পাশে রাখল রিধিমা। আর সঙ্গে সঙ্গে নিদ্রা ওকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল।
৷৷ ষোলো ৷৷
রিধিমার রাতের থাকার জায়গার বন্দোবস্ত করে সুনয়ন কাগজের অফিসে এল। এই ভোররাতে নিউজরুম একদম খালি। সুনয়ন কমন ওয়ার্কস্টেশনের ডেস্কটপ অন করে নিজের ফোল্ডারে গেল। হার্লেমের জিগস পাজলারের অন্তর্ধানের স্টোরির অ্যাটাচমেন্ট ফোল্ডারে লেজি বার্ডস পাবের দোকানের ভিতরকার কয়েকটা ছবি আর হরিপরসাদের বাড়ির ছবি নিজের মেইল বক্স থেকে ফটো ট্রান্সফার করল। তারপর কাটলাইন জুড়ে ইনভেস্টিগেটিভ ওভারনাইট রিপোর্টিংটা কমপ্লিট করল। এডিটর ট্রেসি সকালে ছবি সাজিয়ে খবরটা ছাপতে দেবে। বিকালে খবরের কাগজে ছেপে বেরোবে এসব খবর । আর যদি ভাল দাম পাওয়া যায় তবে ট্রেসি স্ট্রেট বিক্রি করে দেবে নামী খবরের কাগজগুলোর কাছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুনয়ন, জীবন ওকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়েছে! জীবনের স্বপ্ন ছিল বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হওয়া, নিউ ইয়র্ক টাইমস বা ওয়াশিংটন পোস্ট, ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের জন্য পুলিত্জার প্রাইজ— কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। কোথাও জায়গা হল না, এখন এমন একটা কাগজে কাজ করে যে কাগজ এখন ধুঁকছে, তার আবার নাইট পুলিশ রিপোর্টার! কিন্তু সুনয়ন আশাবাদী। ওর অ্যামবিশন আর অপটিমিজমই ওকে নিউজরুমে রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখে আর অভিশপ্ত সিসিফাসের মত জগদ্দল জীবনের গুরুভারকে ধাক্কা মারতে মারতে ভাবে এটা ওর জীবন না, একদিন ও নিশ্চয়ই বেরিয়ে আসবে ওর সেই স্বপ্নের জগতে।
ডেস্কটপ বন্ধ করে সুনয়ন গাড়ির চাবিটা ডেস্ক থেকে তুলে নিল। মেয়েটাকে যতটা সম্ভব দূরে দূরে রাখতে হবে। মেয়েটাকে পুলিশ খুঁজছে, ওর কাছাকাছি যাওয়া সুনয়নের পক্ষে বিপজ্জনক হবে। পুলিশ মা’র কাছে গেছিল। কেন? তবে কি পুলিশ ওকে সন্দেহ করা শুরু করেছে? জ্যাকেটটা গায়ে গলাতে গলাতে ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেটর ওর্জুন অ্যাটর্নিকে ফোন করল।
‘কল মি টুমরো, বাড,’ ওর্জনের ঘুম জড়ানো গলা। ‘র্যাকিং আউট নাউ ।’
‘সরি, শেষরাতে যখন জ্বালাচ্ছি তখন বুঝতেই পারছ—’ সুনয়ন খুব সিরিয়াস গলায় বলল।
‘অনেস্টলি, এখনো আমার লোকেরা তোমার জিগস পাজলার প্রডিজির কোনও পাত্তা পায় নি। তবে এটা জেনেছি যে ও নিজের ইচ্ছাতেই গেছে।’
‘প্যারিস বস্টন এয়ার ফ্রান্সের প্যাসেঞ্জার ম্যানিফেস্ট চেক করতে হবে। রিধিমা বোস নামে কেউ সকালের ফ্লাইটে বস্টনে নেমেছে কিনা। আর্জেন্ট! আর মেয়েটার ডিটেল ব্যাকগ্রাউণ্ড। ওর সম্বন্ধে সব ইনফরমেশন দরকার।’
মি না নো হোয়া ইউ টক অ্যাবাউট। হু ইজ ডা গ্যাল?’
‘রিধিমা বোস, ইণ্ডিয়ান, হার্ভার্ডের PhD স্টুডেন্ট।’
‘এত রাতে? ডিটেল টেক্সট করে দাও। কাল সকালে দেখব। এখন নাট্টিন বেট্টা টু স্লিপ।
‘ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট, ওর্জুন।
‘ফ্ল্যাটি অলরেডি ইন মা বেলি,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি গজগজ করতে লাগল। দেখছি কী করা যায়,’ ফোন নামিয়ে রাখল।
সুনয়ন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবল মেয়েটা কাদের হয়ে কাজ করছে? মেয়েটা নিজে এখনো অ্যামেচার স্টেজ পেরিয়ে যায় নি, তাই ওর স্টোরিলাইনে অনেক ফাঁকফোঁকর আছে। কিন্তু সুনয়ন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ঠিক। মনে হচ্ছে মেয়েটা সন্দেহও করছে যে সুনয়ন এর মধ্যে জড়িয়ে। ওর এখন সময় নেই হাতে, নাহলে নিজেই বসে বসে মেয়েটার ব্যাকগ্রাউণ্ড চেক করে নিত। তবে ওর্জুন অ্যাটর্নির ওপর ওর খুব আস্থা। ওর্জুন ক্রিমিনাল কোর্টের উকিল, ওর্জুনের বাবা এক সময় ঝানু ক্রিমিনাল অ্যাটর্নি ছিল, বাবার বিরাট দলবলকে কাজে লাগায় ওর্জুন অ্যাটর্নি। তার দলের মধ্যে অনেকেরই রেকর্ড ক্লিন না, কিন্তু সেজন্যই লোকটা এত এফিসিয়েন্ট। সকালের আগে ঠিক কিছু ইনফরমেশন নিয়ে আসবে।
সুনয়ন নেমে এল পার্কিং লটে। গাড়ির ভিতরটা এখনো একটু গরম আছে। গাড়ি স্টার্ট করে গ্যাসে পা রাখল সুনয়ন। ম্যানহাটনে জায়গাটা চিনতে অসুবিধা হবে না। এরিয়াটা খুবই চেনা, কতবার ওখান দিয়ে সে যাওয়া আসা করে। সেলফোনটা দরকার। ট্র্যাশবিনের জায়গাটা মনে রেখেছে সুনয়ন। ফায়ারম্যান হাইড্যান্ট ছিল পাশেই। সেলফোনটা উদ্ধার করার পর অনেক কিছুর উত্তর পাওয়া যাবে। খুব ভিতরে ঠেসে রাখেনি সুনয়ন, একটু ময়লা ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে।
সকাল হতে আর বেশি দেরি নেই। রাত জাগা এখন সুনয়নের দৈনন্দিন রুটিন। এখন তো রাতে ঘুমই আসেনা। তবে সকালের দিকে শরীরটা টেনে আসে। ফর্টি সেকেণ্ড স্ট্রীটে পৌঁছে গেল সুনয়ন। সুনয়নের চোখ রাস্তার সাইডওয়াকে, ওর গাড়ি এখন ফায়ার হাইড্যান্টের কাছাকাছি এসে গেছে।
সামনে দূরে লাল ফায়ার হাইড্যান্টটা দেখা যাচ্ছে। সুনয়ন কার্বের যতটা কাছে যাওয়া যায় গিয়ে গাড়ি থামাল। এখানেই সে রিধিমার টেলিফোনটা ফেলেছিল। গাড়ি থেকে নেমে সুনয়ন বরফের মধ্যে এগিয়ে গেল।
বরফে ভারি জুতোর দাগ।
ট্র্যাশবিনের বাইরে বরফের ওপর ট্র্যাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে— ডিমের খোলা, হানি ওটস সিরিয়ালের দুমড়ানো বাক্স, দু গ্যালন দুধের খালি কনটেইনার— কেউ এসে ট্র্যাশবিন ঘেঁটেছে। তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেলফোন পাওয়া গেল না। কেউ সেলফোনটা নিয়ে গেছে! কে?
সুনয়ন তাড়াতাড়ি গাড়িতে ফিরে এল। আর তখন সেলফোনটা বেজে উঠল। ওর্জুন অ্যাটর্নি।
‘এত তাড়াতাড়ি!’
‘আই হ্যাড টু পুল সাম অল-নাইটার হ্যাকারস। ওভারটাইম চার্জ নেব।’
‘ভাল খবর আছে কিছু?’ সুনয়নের চোখ রাস্তায়।
‘খবর আছে, তবে জানি না তোমার জন্য ভাল না খারাপ।’
‘বলে ফেল।’
‘এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জার ম্যানিফেস্ট পেয়েছি। রিধিমা বোস বলে কেউ সকালের ফ্লাইটে আসেনি।’
‘তুমি শিওর? ফ্লাইট নম্বরটা ভালভাবে চেক করেছিলে?’
‘আমার ফি হাই, কিন্তু আমার ইনভেস্টিগেশন একদম নিখুঁত,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল। ‘আর তাছাড়া কাল সারাদিনে একটাই মাত্র ফ্লাইট প্যারিস দ্য-গল থেকে উড়ে বস্টন লোগানে নেমেছে। এয়ারপোর্টের অবস্থার জন্য বাকি ফ্লাইট ক্যান্সেলড।’
সুনয়ন ভাবতে লাগল তার মানে রিধিমা এত গল্প বলে গেল সব মিথ্যা? তার মানে ওর অনুমানই সত্যি। রিধিমা আসলে ইণ্ডিয়াতে যায়ই নি? তার মানে পাসপোর্ট কনফিসকেশনের গল্পটা মিথ্যা?
‘থ্যাঙ্কস ওর্জুন,’ সুনয়ন বলল। ‘তবে তোমার ফি এর ব্যাপারে আমি একমত। রিধিমা লাস্ট কবে ইণ্ডিয়া ছেড়েছে সেই খবরটাও জোগাড় করতে হবে।’
‘শিওর,’ ওর্জুন অ্যাটর্নি বলল। সুনয়ন এবার ফোন বন্ধ করল। খবরের কাগজের অফিসে ফিরে যেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। সুনয়ন গাড়িটা পার্ক করাল সুপার এইট মোটেলের পার্কিং লটে। মোটেলের রিসেপশন খালি। এই ঠাণ্ডার ভোরে কোনও কাস্টমার আসার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। এটা চেনা জায়গা, এক গুজরাতি বন্ধুর মোটেল। লবির কোনায় মোটেল কাস্টমারদের জন্য পাশাপাশি দুটো কম্পিউটার রাখা। দেওয়ালে লেখা— বোর্ডার – ফ্রি ৷ নন বোর্ডার – টোয়েন্টি ডলার পার আওয়ার। সুনয়ন চেয়ার টেনে বসল। জি-ইউজে-জে-উ – ‘গুঞ্জু’ পাসওয়ার্ড। লেজি লোক, দুবছর ধরে একই পাসওয়ার্ড চলছে। সুনয়ন অনলাইন কোড রিপজিটরি গিথাব থেকে আইব্রুট নামিয়ে রেখেছিল নিজের বক্সে। আইক্রট কিছুক্ষণের মধ্যে হ্যাক করল রিধিমার আইক্লাউড ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড। HARVARD123। মনে মনে হাসল সুনয়ন। কিছু মানুষ পাসওয়ার্ড সিলেকশনে এত আলস্যি করে! নিজের স্কুল, কলেজ, অফিসের নাম লেখে। SONY এন্টারটেইনমেন্টের CEO মাইকেল লিনটনের পাসওয়ার্ড ছিল SONYML3। ভাবা যায়! যেন আয় হ্যাকার ভাই, এত কষ্ট করবি কেন, নিয়ে যা লেবার ডে গিফট! সুনয়ন এবার এলকম ফোন পাসওয়ার্ড ব্রেকারে রিধিমার আইক্লাউড ইউজার নেম পাসওয়ার্ড টাইপ করে ওর সেলফোনের আইক্লাউড অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ল। কাজটা সুনয়নের বাঁ হাতের খেল। এসব ডিজিটাল ফরেনসিক টুলের আগাপাস্তলা মুখস্থ। সুনয়ন জ্যাকেটের ভিতরের পকেট থেকে একটা USB পোর্ট বের করে ডেস্কটপে লাগাল। USB চোঁ চোঁ করে আইক্লাউড থেকে শুষতে লাগল রিধিমার অতীত। এত সুন্দরী মেয়ের কিছু পার্সোনাল ফটোতে উঁকি দেবার লোভ হচ্ছিল, কিন্তু সময় নেই। পেন ড্রাইভ একটানে খুলে পকেটে ফেলে উঠে দাঁড়াল সুনয়ন। রিসেপশনের দিকে যেতে যেতে ভাবল সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটার মানে যতই খারাপ হোক শব্দটা মনে সম্ভ্রম জাগায়। কিন্তু নিক নেমটা বড্ড অশ্রদ্ধাজনক— হ্যাকার! এ যেন রিচার্ড জুনিয়রকে ছোট ডিক বলে গালাগালি দেবার মত। রিসেপশনে একটা কুড়ি ডলারের নোট রেখে দিয়ে মোটেলের দরজা টেনে বেরিয়ে গেল সুনয়ন। মোটেলের সিসিটিভি ওকে নিশ্চয়ই দেখেছে।
গাড়ি স্টার্ট করতেই আবার ওর্জুন অ্যাটর্নির ফোন— ‘সুনায়ান, মেয়েটার ডর্মেটারিতে পুলিশ একটা গ্লুক আর তিনটে ল্যাপটপ পেয়েছে। জুতো-জ্যাকেট সব বরফে ভেজা। গ্লুকের দুটো বুলেট একটা পুলিশের স্কালের ভিতর ঢুকে ছিল। চারটে বুলেট প্রফেসরদের শরীরে। মেয়েটার আঙুলের ছাপ মিলে গেছে। মেয়েটার ID কার্ড ভিক্টিম প্রফেসরদের মিটিংরুমে পাওয়া গেছে। পুলিশ সন্দেহ করছে খুনগুলো মেয়েটাই করেছে।’
ফোন রাখার পর সুনয়ন ভাবতে লাগল এত সুন্দর মেয়ে এত জঘন্য কাজ করে এল? আচ্ছা সমস্ত ঘটনাটা মেয়েটার হ্যালুসিনেশন নয় তো? মেয়েটা একটা কাল্পনিক খুনির কথা বলছে, কিন্তু আসলে নিজের অজান্তে খুনগুলো করে চলেছে না তো? কিংবা অ্যাকিউট ডিমেনশিয়া খুনগুলো মন থেকে মুছে দিচ্ছে। নাকি সাইকিয়াট্রিক ডিসঅর্ডার— ডঃ জেকিল অ্যাণ্ড মিস্টার হাইডের মত স্প্লিট পার্সোনালিটি?
সুনয়ন তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে এল রিচমণ্ড হিলস গেজেটের অফিসে। সকাল হচ্ছে, তিন তলার নিউজরুমে জানলার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে। সুনয়ন কম্পিউটার অন করে USB পোর্টে রিধিমার ফোল্ডারটা খুলল।
ফোল্ডার ফাঁকা!
‘ড্যাম!’ মুষ্টিবদ্ধ হাত ডেস্কে হাতুড়ির মত ঠুকল সুনয়ন, নাক থেকে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে এল হতোদ্যম দীর্ঘশ্বাস। কেঁচে গণ্ডূষ করার মত ইচ্ছা বা এনার্জি শরীরে নেই। দু’পা ছড়িয়ে দিল সুনয়ন। হঠাৎ সুনয়নের মাথায় এক অদ্ভুত প্রশ্ন এল— কেন সে এই মেয়েটার ব্যাপারে এত ইন্টারেস্ট নিচ্ছে? অবলা নারী তাই? নাঃ! তবে? মা পাঠিয়েছে তাই? নাঃ। ডঃ উইকসকে তো ও পছন্দই করেনা৷ তবে? সে কেন এত রিস্ক নিচ্ছে? পুলিশ যদি জানে ও একটা খুনিকে শেল্টার দিয়েছে, চোখ বুজে সোজা পনের বছর জেল। তবে? নিজের মনের অলিগলি পাতিপাতি করে খুঁজল সুনয়ন। ওর জীবনের স্বপ্ন ছিল বিখ্যাত ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হওয়া, ও এখন যেটা করছে সেটা কী? এটাই তো ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টের কাজ। একাজেই তো ওর প্যাশন ওকে নেশায় বুঁদ করে রাখে। নাই বা হল বড় কাগজের ছত্রছায়ার নির্ভরতা। সুনয়ন ঠিক করল এর শেষটা জানতেই হবে। খুঁজে বের করতেই হবে রিধিমা হত্যাকারী কিনা, আর যদি হত্যাকারী না হয় তবে খুনি কে? ডঃ গিলমোরকে খুঁজে বের করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর এই খবর সে কিছুতেই ট্রেসিকে নামী নিউজ এজেন্সিগুলোর কাছে বেচতে দেবে না। সুনয়নের ব্রেনের রানওয়ে থেকে অ্যামবিশনের ফাইটার জেট আরেকবার টেক অফ করল। সুনয়ন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল কফি মেকারের দিকে।
৷৷ সতেরো ৷৷
হঠাৎ আতঙ্কে রিধিমার ঘুম ভাঙল।
কালকের ঘটনাগুলো মাথার ভিতর ফাস্ট ফরোয়ার্ডে অ্যাকশন রিপ্লে হয়ে চলেছে। পাশে ডায়েরিটা। সুনয়ন কাল ফোন করে লাইট অফ না করতে বললে ও হয়তো সারা রাত ধরে ডায়েরিটা পড়ত।
ঝড়ের পর নিউ ইয়র্ক সিটি রোগশয্যার পাণ্ডুর বৃদ্ধা রোগিণীর মত জেগে উঠছে, সারা শহরে জরার ক্লান্তি, তার ধূসর দৃষ্টির মত জানুয়ারির ফ্যাকাশে সকাল একটু একটু করে চোখ মেলে চাইল।
রিধিমা ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসতে গিয়ে অনুভব করল সারা গায়ে কে যেন সারারাত দুরমুশ পেটা করেছে। রিধিমা সেলফোনে সময় দেখল। সাড়ে সাতটা। কাল শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে গেছিল। অঘোরে ঘুমিয়েছে সে। এখানে রিধিমার অনেক নিরাপদ লাগছে। আরও কিছুক্ষণ ঘুমোতে পারলে ভাল হত। হাতের কাছেই ডায়েরিটা। ঘরের আলো বাইরে দেখা যাবে সেই ভয়ে তাকে ডায়েরি বন্ধ করতে হয়েছিল। ডায়েরিটা কাছে টেনে নিল রিধিমা।
* * *
বানগঙ্গার বাম তীরে সাগরহাওয়া গ্রামে ফিউরার সাহেব ক্যাম্প বসিয়েছে ঢিপি খোঁড়ার। সন্ধ্যায় সাহেবের তাঁবুর সামনের মাঠে শাল গাছের সঙ্গে রশিতে বাঁধা একটা হাতি, মাথা দুলিয়ে পিপুলপাতা চিবোচ্ছে আর গলায় বাঁধা ঘন্টা টিং টিং করে বেজে চলেছে। কনকনে ঠাণ্ডায় তরাইয়ের জঙ্গলে খোঁড়াখুঁড়ি করা খুব কষ্টসাধ্য, শীতের দিন ছোট তাই বেশিক্ষণ কাজ করা যায় না। কিন্তু কোনও উপায় নেই, ফাগুন এলেই রবিশস্য কাটার জন্য থারুরা সব মাঠের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে। তারপর মাঠের গম, ডাল, সর্ষে সব মাঠ থেকে তুলে ঝাড়াই মাড়াই করা, গোলায় একদিকে গম, জোয়ার অন্যদিকে কুথালিতে খড়ের আঁটি বাঁধতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, চৈত্রমাস পর্যন্ত ওদের পাওয়াই যাবে না। বৈশাখ-জষ্ঠিতে তরাই তেতে ওঠে, হাওয়া চলা বন্ধ হয়ে চারদিক গুমোট হয়ে যায় তখন মাটি খোঁড়ার কাজ করা মুস্কিল। তারপর তো আষাঢ়ের আগে থেকেই খারিফ বোনার প্রস্তুতিতে সবাই আবার চাষের মাঠে। তাই শীতেই খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।
ওভারসিয়ারের তাঁবুর সামনে কুলিদের লম্বা লাইন। এক এক করে মজুররা ভিতরে ঢুকছে আর কোমরবন্ধনীতে দিনমজুরী গুঁজতে গুঁজতে বেরিয়ে আসছে। অন্ধকার হয়ে গেছে, কুলিদের তাঁবুর সামনে আগুন জ্বালিয়ে কুলিরা জবুথবু হয়ে বসে আগুনের তাপ সেঁকতে সেঁকতে গল্পগুজব করছে, বিড়ি টানছে। হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে দেবচরণ তার বৌ মেয়েকে নিয়ে হাজির হল। কুলিরা দেবচরণদের দেখে অবাক, এই অন্ধকার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল? এরা কারা?
‘সেই সোনাভূম থেকে আসছি,’ দেবচরণ মাহাতো চমনলালের নাম মুখেও আনল না। ‘পাহাড়ের ধসে বাস্তুভিটে ভেঙে নদীতে তলিয়ে গেছে। কোনওরকমে বেঁচে গেছি, কাজ খুঁজতে খুঁজতে এতদূরে চলে এসেছি।’
গলায় বিবর্ণ মাফলার বাঁধা একজন সহৃদয় কমবয়সি কুলি সহানুভূতি দেখিয়ে ওভারসিয়ারের কাছে ওদের নিয়ে গেল। ওভারসিয়ার দেবচরণকে দেখে খুশিই হল। কুলি পাওয়া যাচ্ছে না আজকাল। গোটা তরাই এলাকা ম্যালেরিয়ার মহামারিতে ভুগছে। সাঁওতাল পরগণা, তিরহুট থেকে আসা কুলিদের অনেককেই এই মহামারী গ্রাস করে নিয়েছে, আর যারা বেঁচে গেছে তারা পালিয়েছে। লোকবল দরকার। বলল, ‘মাটি খুঁড়তে পারবি?’
দেবচরণ ঘাড় নাড়ল। মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সোনাভূমকে ধসিয়ে দিয়েছে, এখন তারই প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছে। এখানে মাটি খুঁড়তে খুব পারবে।
‘ঠিক আছে, কাল সকালে নিয়ে যাব সাহেবের তাঁবুতে, সাহেবের খাতায় নাম তুলে দেব।’
‘রাতে থাকার জায়গা?’
‘কুলিদের তাঁবুতে থাকবি। চারু, তাঁবুতে জায়গা খালি আছে?’
‘অনেক। তিরহুটের কুলিদের—?’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে,’ ওভারসিয়ার গাম্ভীর্যের সঙ্গে থামিয়ে দিল। ‘তিনটে ধুসা ওদের জন্য নিয়ে যা। ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দে।’
চারু ওদের নিয়ে বাইরে এল। আগুনের পাশে বসতে দিল দেবচরণদের। রাজকুমারীর হাত ঠাণ্ডায় জমে হিম, মুখ পাংশু, মন থেকে কিছুতেই ওই জানোয়ার মাহাতোটার হিংস্র লোভী দৃষ্টিটা সরাতে পারছে না। আগুনের উত্তাপ নিয়ে দু’হাতের তালু বারবার গালে ঘষতে লাগল।
‘রাতের খাওয়া পাওয়া যাবে? সারাদিন পেটে—’ দেবচরণ বলল।
চারু নামের কুলি ছেলেটা বলল, ‘আমি দেখছি। তাঁবুতে চল।’
দেবচরণ বৌ মেয়েকে নিয়ে কুলি ছেলেটার পিছন পিছন তাঁবুতে ঢুকল। ছেলেটা শক্ত-পোক্ত, কানে মাকড়ি, মাথায় পাগড়ি, গলায় মাফলার, ময়লা ফতুয়ার ওপর কম্বলের চাদর জড়ানো, প্যান্ট, পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। তাঁবুর ভিতরে বড় লোহার উনানে চাল ফুটছে। হাতা দিয়ে ফুটন্ত হাঁড়ির কিছু ফ্যান-চাল তুলল। সেখান থেকে গরম ভাত তুলে হাতে ফুঁ দিয়ে দু’ আঙুলে পিষে বলল, ‘প্রায় হয়ে গেছে, এবার নামাতে হবে। তোমরা বসে যাও। আমি তুলে তুলে দিচ্ছি।’ দেবচরণরা তিনজনে ছালার ওপর বসল। ছেলেটা শালপাতার থালায় গরম ভাত ঢেলে দিল, সঙ্গে কোয়াশের ডগার ঝোল। গরম ভাতের গন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠল। তিনজনে গবগব করে গিলতে লাগল কোয়াশের ঝোল মাখা গরম ভাত। ছেলেটা দেখতে লাগল।
‘কী কাজ করো তোমরা?’ খেতে খেতে প্রশ্ন করল দেবচরণ ।
‘জঙ্গলে ঢিপির মাটি কাটি।’
‘তুমি এখানে অনেক দিন আছ?’
‘কিছুদিন হল আছি।’
‘নাম?’
‘চারুদত্ত।’
‘পরিবার?’
‘না একা।’
থারুদের ছেলেমেয়েদের বাচ্চা বয়সেই দিখনৌরি হয়ে যায়, এরও বোধহয় গ্রামে ভাবী বৌ আছে। তুলসীর মন মায়ের মন, পেটে ভাত পড়তেই রাজকুমারীর চিন্তা মাথায় হাজির হয়েছে।
‘কা থারু হইথো?’ তুলসী জিজ্ঞাসা করল।
‘বাউখাহি উলটাহাওয়াস থারু।’
চারুদত্ত রাজকুমারীকে হাতায় করে ঝোল থেকে কয়েকটা কোয়াশ সিদ্ধ তুলে দিল। দেবচরণের ভাল লাগল ছেলেটাকে। মনে দয়ামায়া আছে। তুলসী মনে মনে খড়্গাভূত আর পাঁচুয়ার কাছে এক পয়সা মানত করল।
খাওয়া শেষ হতে চারুদত্ত বলল, ‘চল তোমাদের তাঁবু দেখিয়ে দিই।’ সারি সারি তাঁবু, একদম শেষের দিকে একটা তাঁবু দেখাল চারুদত্ত। তাঁবুগুলো দু’দিকে খোলে। পিছন দিকে নালা, তার ওপাশে জঙ্গল।
‘জঙ্গল কাটছে কেন সাহেবরা?’ দেবচরণ প্রশ্ন করল। দেবচরণের কষ্ট হচ্ছে, ওরা তরাইয়ের কত গাছ কেটে ফেলছে। থারুদের জীবন তরাইয়ের বৃক্ষ-লতাপাতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পাহাড়ের পায়ের কাছে তরাইয়ের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, অতি উগ্র গরম আর আর্দ্রতা, বর্ষাকালে চারদিকে জলধারা বয়ে গিয়ে জায়গায় জায়গায় জল জমে যায়, আর সেখানে বাসা বাঁধে মশার দল, ম্যালেরিয়া মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়ে, জল খুব সহজেই কলুষিত হয়ে যায় তার ফলে আমাশা, জণ্ডিস ও আন্ত্রিক রোগের এত উপদ্রব যে বাইরের মানুষ এখানে আসে না, আর যারা আসে তারা খুব শীঘ্রই পালায়। তাই হাজার বছর ধরে থারুরা তাদের এক নিজেদের পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছে এই তরাইতে। বাইরের জগতের কাছে তরাই হল মরণভূমি, কিন্তু থারুদের কাছে এটা হল মাতৃভূমি। বৈদ্য, ধামি, ঝাকরি, আমচিরা এই তরাইয়ের গাছপালা থেকেই ওদের ওষুধ বানায়। নিম, কদম, উল্টাছিরছিরি, ধুতরো, বঝো, ছাত্যেন, দুব্বো, মরিচ, গুরুজলাত্তি, তুলসি— থারুরা নিজেরাই কত গাছ চেনে, ওরা ধামি বা ওঝার কাছে যাওয়ার আগে নিজেরাই নিজেদের রোগের চিকিৎসা করে নেয়। তরাইয়ের জঙ্গল থারুদের মা। থারুদের সব রোগের ওষুধ এই তরাইয়ের গাছপালার কোলে রাখা আছে। আর আজ সব গাছপালা কোদালের আঘাতে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ছে। থারুরা জানে গাছের কিচ্ছু ফেলা যায় না— পাতা, ফুল, ফল, শিকড়, লতা, গুল্ম, গাছের ছাল, রজন, তরুক্ষীর, গেঁড়, কন্দ, বীজ, বোঁটা— সব কিছু থেকে থারুরা ওষুধ বানায়। পাহাড়ের বর্ষার ঢল ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাললিক মাটি ফেলে যায়, তাতে মৌসুমি বনের চওড়া পাতা ঝরে পড়ে, সেই পাতা পচে। আর তার সঙ্গে মেশে মৃত জন্তু জানোয়ারের গলিত জীবদেহ। তার থেকে তৈরি হয় উর্বর মাটি, থারুদের মা। সেই মাটি খুঁড়ছে কেন এরা?
‘জঙ্গল সাফ করে মাটি খুঁড়ে মার্কাস সাহেব বের করার চেষ্টা করছে বিরুধকের হাতে মরে যাওয়া শাক্যদের কবর।’
‘তাতে লাভ?’
‘অতশত জানি না,’ চারু বলল। ‘কুলিরা পয়সা পাচ্ছে, কুলিদের বাড়ির বৌ-ছেলে-মেয়ে খেতে পারছে, এটাই কুলিদের লাভ।’
‘তাহলে বনস্পতি আর ভারমলের পুণ্যাত্মা কোথায় যাবে?’
‘সাহেব খ্রিষ্টান, ওসব বিশ্বাস করে না।’ চারুদত্ত ভিতরে মাথা ঢুকিয়ে দেখে নিল কম্বল, আলো জ্বালবার কুপি, জলের কলসী সব ঠিক মত আছে কিনা। তারপর বলল, ‘রান্নার তাঁবুতে সকাল সকাল কুলিদের জন্য পান্তা ভাত আর ঢেঁকিশাকসিদ্ধ রাখা থাকে। সূর্য উঠে গেলে রান্নাঘর বন্ধ হয়ে যায়, সাহেবের হুকুমে আর খাবার পাওয়া যায় না। যাতে কাজে যেতে দেরি না হয় তাই এই ব্যবস্থা।’
রিধিমা ডায়েরি বন্ধ করে চিন্তা করল— দেবচরণ বানগঙ্গার বামতীরে সাগরহাওয়া গ্রামে ফিউরার সাহেবের ক্যাম্পে ঢিপি খোঁড়ার চাকরি নিল?
ফিউরার? রিধিমা কৌতূহলী। পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত ফ্রড জার্মান আর্কিওলজিস্ট মার্কাস ফিউরার? যার জন্য ব্রিটিশদের অনেক দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছিল? যার জালিয়াতি ধরা পড়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ কমিশনার ভিনসেন্ট স্মিথ যাকে লক্ষ্ণৌ মিউজিয়ামের কিউরেটারের পদ থেকে বরখাস্ত করেছিল?
দেবচরণ তাহলে ডঃ ফিউরারের ক্যাম্পে পৌঁছে গেছিল? রিধিমা অবাক।
সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের এমন কোনও স্টুডেন্ট নেই যে কুখ্যাত আর্কিওলজিস্ট ডঃ মার্কাস ফিউরারের নাম শোনে নি। ব্রিটিশদের নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিল। জার্মান কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের কর্মচারী হয়ে ভারতে প্রাচীন স্তূপ খননের কাজ করছিল। বর্মার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ইউ মা-কে একটা কলসে ভরা অস্থি দিয়ে বলেছিল অস্থিগুলো ভগবান বুদ্ধের চিতার অস্থি, কপিলাবস্তুর এক স্তূপ খনন করে পাওয়া। এই অস্থির পাশে চারটে শিলালিপিতে নাকি লেখা ছিল এগুলো ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার চিতার যে অস্থি শাক্যদের দেওয়া হয়েছিল এগুলো সেই অস্থি। ডাহা মিথ্যা। ওগুলো ভগবান বুদ্ধের অস্থি ছিলই না, ছিল ঘোড়ার দাঁত। বিশাল স্ক্যাম! পরে ধরা পড়ে স্বীকার করে এবং ব্রিটিশ সরকার ওকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। কিন্তু দেবচরণ ওসময় ফিউরারের ক্যাম্পে গেছিল? কী দেখল দেবচরণ ওখানে? রিধিমা ডায়েরিতে চোখ রাখল—
দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই কুলিদের বস্তিতে সাড়া পড়ে গেল। কুলিরা পরিবার নিয়ে সকাল সকাল হাজির সাহেবের তাঁবুর পাশে রান্নাঘরে। চারদিকে কুয়াশা, তারমধ্যে দেবচরণও তুলসী আর রাজকুমারীকে নিয়ে লাইনে দাঁড়াল। রাজকুমারীর গায়ে এখনো জ্বর। পান্তা খেয়ে তুলসীর সঙ্গে রাজকুমারী তাঁবুতে ফিরে গেল। দেবচরণকে নিয়ে সাহেবের তাঁবুতে গেল ওভারসিয়ার। একটা নতুন দেহাতি লোককে দেখে খুশিই হল মার্কাস ফিউরার। খুব সহজেই কাজ জুটে গেল দেবচরণের। পুব দিকের জঙ্গলে অনেকগুলো ঢিপি। দেবচরণ শুনল এক-দুই করে আঠারো। তিনটে ঢিপি কাটা হয়ে গেছে। চতুর্থ ঢিপিটা কাটা হচ্ছে। এটা প্রায় চল্লিশ ফুটের ওপর লম্বা, চওড়াও অতটাই, উঁচু কম করে বিশ ফুট তো হবেই। ঢিপি কাটার কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। আজ দেবচরণের পাশেই আছে চারুদত্ত। ও যেন দেবচরণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছে। বেশ চালাক চতুর ছেলে, এদিককার অনেক গল্পকথা জানে। মাটিতে কোদাল চালাতে চালাতে চারুদত্ত বলল, ‘এই সাগরহাওয়া গ্রামের লোকেরা বলে যে এই স্তূপের নিচে নাকি অনেক গুপ্তধন আছে। গুপ্তধনের লোভে এটাকে অনেকবার নেপালী চোরেরা খোঁড়াখুঁড়ি করেছিল, কিন্তু কিছুই পায় নি।’ ফিউরার সাহেব এসে গর্তের উপরে দাঁড়াতেই চারু চুপ। ফিউরার সাহেব কাজে ফাঁকি একদম পছন্দ করে না। স্তূপের ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে এবার নিচের দিকে খোঁড়া শুরু হয়েছে।
সাহেবের হুকুমে মজুররা ঢিপির মাঝামাঝি জায়গায় গিয়ে গাঁইতি দিয়ে গর্ত খুঁড়ে চলেছে। দেবচরণের কাছে এই মাটি খোঁড়া সোনাঝোরার পাথুরে পাড় খোঁড়ার থেকে অনেক সহজ মনে হচ্ছিল। খুঁড়তে খুঁড়তে দুপুরে ছুটির ঠিক আগে দেবচরণের গাঁইতিতে ঠং করে আওয়াজ। একজন মজুর উত্তেজিত হয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে গর্ত থেকে উঠে ছুটে গেল তাঁবুর দিকে— ‘সাহেব, এখানেও ইটের মেঝে পাওয়া গেছে।’
‘তোমার ভাগ্য খুব ভাল,’ চারুদত্ত বলল দেবচরণকে।
‘কেন?’
‘যার গাঁইতি থেকে কিছু পাওয়া যায়, সাহেব তাকে বখশিস দেয়।’
মার্কাস ফিউরার উত্তেজিত হয়ে ছুটতে ছুটতে এল। সাহেব গর্তে নেমে পড়ল। গর্তের মাঝামাঝি বেরিয়ে এসেছে ইটের মেঝে, তার ওপর সুন্দর কাজ করা। সাহেব দেবচরণের পিঠ চাপড়ে দিল— ‘এর নিচে পাওয়া যাবে যুদ্ধে মৃত শাক্যদের হাড়-অস্থি। বিরুধক এখানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল।’ মাটি সরিয়ে ইটের মেঝেটা উন্মোচিত করা হল। ‘ভৈরব!’ মার্কাস ফিউরারের ডাকে ড্রাফটসম্যান ভৈরব বক্স মেঝেতে নেমে পেন্সিল দিয়ে কাগজের ওপর সমস্ত মেঝের ছবি আঁকতে শুরু করল। ছবি আঁকা শেষ হলে মার্কাস ফিউরার দেবচরণকে বলল, ‘মেঝের মাঝের পদ্ম আঁকা ইটটা সাবধানে সরাও।’
দেবচরণ নিজে সাবধানে পাথরটা সরাতেই দেখা গেল একটা তামার কলস। কুলিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। ‘দেখ তো, আরও ঘট পাও কিনা?’
আরও কলস পাওয়া গেল। মাটি খুঁড়ে তামার পাঁচটা ঘট বেরোলো। মার্কাস ফিউরারের কুলিরা পাঁচটা ঘট নিয়ে গর্তের উপর উঠে এল। ফিউরার সাহেব বলল, ‘আমি শাক্যদের মৃত্যুর স্থান আবিষ্কার করেছি। এগুলোর ভিতর আছে তাদের হাড়গোড়।’
সাহেবের সঙ্গে কুলিরা চলল সাহেবের তাঁবুতে। ‘তুই বখশিস পাবি,’ সাহেব দেবচরণকে বলল। আমার তাঁবুতে আয়।’
সাহেবের তাঁবুর ভিতরে একটা লোহার খাট, টেবিল, চেয়ার, কোনায় বন্দুক ঝুলছে। তাঁবুতে গিয়ে সাহেব কাঠের টেবিলে ঘটগুলো একে একে উপুড় করল।
ভিতর থেকে দুটো তেকোনা ভারি ভারি সোনার ও রূপার খণ্ড পাওয়া গেল, দুটো সোনার নাগ পাওয়া গেল, তাছাড়া হালকা সবুজ স্ফটিক, তামড়ি, চুনি, কিছু চাল এবং সাদা ও কালো খড়িমাটি পাওয়া গেল। মার্কাস ফিউরারকে হতোদ্যম দেখাল ‘যাও যাও সবাই আবার কাজে ফিরে যাও।’
কুলিরা আবার স্তূপের দিকে রওনা দিল। দেবচরণ বখশিসের জন্য দাঁড়িয়ে রইল। সাহেবকে বলল, ‘আপনি বললেন হাড়গোড়, কিন্তু হাড়গোড় তো নেই?’
‘এটাতে নেই, কিন্তু অন্যগুলোতে থাকবে।’
দেবচরণ ফিউরারের মুখের দিকে তাকাল, তার দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। সাহেব তার অন্নদাতা, তার মুখের ওপর কথা বলা মানে ঔদ্ধত্য। দেবচরণ আর কথা না বলে তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসছিল।
‘দাঁড়া।’
সাহেবের কথা শুনে তাঁবুর দরজায় দাঁড়িয়ে পড়ল দেবচরণ।
‘এই নে তোর বখশিস, সাহেব দেবচরণকে একটা তামার পয়সা দিল। ‘কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলবি এর ভিতর হাড়-গোড়ও অনেক পাওয়া গেছে।’
‘কিন্তু হাড়-গোড়?’ দেবচরণ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল।
‘শুধু হাড়-গোড়ই নয়, বলবি যে এই মাটির ঘড়াটাও পাওয়া গেছে।’ ফিউরার একটা লোহার বাক্স খুলল, তার ভিতর অনেকগুলো পোড়ামাটির ছোট ছোট কলস। তার গায়ে আঁকিবুকি কাটা। ‘লেখাপড়া জানিস?’
‘না,’ দেবচরণ মাথা নাড়ল। ‘কী লেখা আছে এতে?’
‘এতে লেখা আছে কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোদনের বংশধর শাক্য রাজা মহানামনের হাড়।’
কিন্তু এগুলো এই স্তূপ থেকে তো পাওয়া যায় নি,’ দেবচরণ বলল। ‘আমি যখন বলছি পাওয়া গেছে, তখন পাওয়া গেছে,’ ফিউরার কুটিল হাসি হেসে বলল। ‘তোদের পাল্পা রাজার কপিলাবস্তুর প্রমাণ চাই।’
দেবচরণ তাঁবু থেকে বের হবার আগেই একজন পুলিশের উর্দি পরা নেপালী মানুষ হনহন করে এসে ফিউরারের ক্যাম্পে ঢুকল। পুলিশ! দেবচরণের বুক ধক করে উঠল। পুলিশ টের পেয়ে গেছে ওরা এখানে এসে লুকিয়েছে? পুলিশটা কিন্তু দেবচরণকে অবজ্ঞা করে ওর দিকে তাকালই না। লোকটার কপালে চিন্তার রেখা, সাহেবকে বলল— ‘নেপালের রাজদরবার খুবই বিরক্ত।’
‘কেন?’ মার্কাস ফিউরার বলল।
‘ব্রিটিশরা ক্রমশঃ তরাই জঙ্গল সাফ করে সেখানে চাষবাস শুরু করছে, এভাবে ওরা আমাদের নেপালের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। নেপাল রাজদরবার ভাইসরয়ের কাছে নিজের অসন্তোষ জানিয়েছিল, কিন্তু ভাইসরয় পাত্তা দেয় নি। চাষ আবাদের ফলে ইংরেজদের রাজস্ব বাড়ছে যে। কিন্তু রানা খড়া সামসের ভাবছে এভাবে চললে ব্রিটিশ দক্ষিণ নেপাল কব্জা করে নেবে। শোনা যাচ্ছে যে ভারতের সীমানায় জমিদারদের ঢিপি খুঁড়ে দেখার জন্য সরকারি সাহায্য মিলছে, কিছু একটা পেয়ে গেলেই কপিলাবস্তু ওদের বলে চেঁচামেচি শুরু করবে। রানা তাই খোঁজ নিচ্ছিলেন যে আপনার এই খোঁড়াখুঁড়িতে শাক্যদের কোনও প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা, তাহলে রানা নিশ্চিন্ত ভাবে ব্রিটিশদের বলবে যে কপিলাবস্তু নেপালের তরাইতে ছিল, ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্টের কোনও অধিকার নেই তরাইয়ের জঙ্গল কাটার। আপনার কাজ কি এগোচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, এগোচ্ছে,’ মার্কাস ফিউরার বলল।
‘ওগুলো কী? স্তূপ খুঁড়ে পেলেন বুঝি?’ টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা পাথরগুলো দেখে পুলিশটা বলল।
ফিউরার ধরা পড়ে আমতা আমতা করতে লাগল— ‘হ্যাঁ, এইমাত্র এগুলো পাওয়া গেছে, ক্যাপ্টেন।’
‘ওগুলো আমায় দিন,’ নেপালী ক্যাপ্টেন বলল। ‘আমি রাজদরবারে দেখাব। রানা প্রমাণ চায় যে কাজ এগোচ্ছে।’
দেবচরণ আর এর মধ্যে না থেকে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে আসল, তাঁবুর দরজা দিয়ে বাইরে বেরোবার সময় দেবচরণ মার্কাস ফিউরার সাহেবের দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পেল।
সন্ধ্যাবেলা কুলিদের বস্তিতে আগুন ঘিরে অন্যান্য থারু কুলিদের পরিবারের দলের মধ্যে দেবচরণ আগুনের তাপ সেঁকছিল। সারাদিন বিশ্রামে রাজকুমারী অনেকটা সুস্থ। কিন্তু দেবচরণের মনে সারাক্ষণ ভয় চমনলালের খুনিকে নিশ্চয়ই এতক্ষণে পুলিশ চারদিকে খুঁজছে। বাইরে কুলিদের দলের থেকে যদি কিছু জানা যায় তাই বাইরে আগুনের পাশে এসে বসেছে। চারুদত্ত চিন্তিত মুখে পাশে এসে বসল।
‘কী হল, মুখ শুকনো?’ দেবচরণ বলল।
‘সাগরহাওয়ার তাড়ির দোকানে রানার দু’জন সেপাই এসেছিল। ওরা একজন কমলারিকে খুঁজছে। সে বনগাঁও গ্রামের মুখিয়াকে খুন করে পালিয়েছে। দেবচরণের মুখ পাংশু হয়ে গেল।
‘রানা খড়্গা সামসেরের জেদ মারাত্মক,’ চারুদত্ত বলল। ‘রানা শীতের শুরুতে পান্নার প্রাসাদ ছেড়ে বাতাউলিতে নেমে এসেছে, তাই খবর রানার কানে খুব তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছে। শুনেছি উনি নাকি সাহেবদের কথা দিয়েছিলেন গরমে আবার চমনলালের গ্রামের কাছাকাছি জঙ্গলে শিকার খেলতে নিয়ে যাবেন। রানা খুব রেগে গেছেন। বলেছেন যত শিগগির সম্ভব অপরাধীকে খুঁজে বের করতেই হবে। রানার সেপাইরা এখন সব কাজ ছেড়ে কমলারিকে খুঁজছে। সীমান্তে পর্যন্ত খবর চলে গেছে যাতে ওরা তরাই ছেড়ে পালাতে না পারে। মেয়েটা আজ না হয় কাল ধরা পড়বেই।’
‘তা আমাদের ভয় কীসের?’ দেবচরণ অন্যমনস্ক ভাবে বলল।
‘আমাদের কুলিবস্তিতে এসে তল্লাশি করবে, চারুদত্ত খুবই ক্ষুব্ধ৷ ‘রাতবিরেতে সৈন্যরা এই ঠাণ্ডায় আমাদের মেয়ে-বৌদের বাইরে বের করে উল্টা-সিধা প্রশ্ন করবে। ধুস এই অসভ্যতা সহ্য হয় না, আমি ভাবছি পিতরাওয়া চলে যাব।’
‘পিতরাওয়া? সেটা কোথায়?’
‘ভারতে,’ চারুদত্ত বলল। ‘ওখানে ইংরেজদের আইন। রানার নিয়ম কানুন চলে না।’
‘অনেক দূর?’
না?’ ‘না না কাছেই, মাত্র দশ-বার মাইল দক্ষিণে। তোমার পরিবারকে দেখছি না?’
‘মেয়েটার ঠাণ্ডা লেগে জ্বর এসেছিল কাল। তাই ওরা তাঁবুতে।’
চারুদত্তের চোখের মণিতে উদ্বেগ লক্ষ্য করল দেবচরণ। ‘এই মাফলারটা তোমার মেয়েকে দাও। এটা সাহেবের থেকে পেয়েছি। গরম উলের। মাথা, গলা, কান পেঁচিয়ে নিলে বেশ গরম রাখে। সাহেব আমার নাম লিখে দিয়েছে এখানে,’ গলা থেকে মাফলারটা খুলে দেবচরণকে দিল চারুদত্ত।
‘তোমার মাফলার—’
‘চিন্তা নেই। মেয়ে সুস্থ হলে ফেরত দিও। পালিয়ে তো আর যাচ্ছ না।’
আগুন ঘিরে থারু মজুররা গান ধরেছে, কিন্তু দেবচরণের মাথায় চিন্তার পাহাড়। মাফলার হাতে দেবচরণ চুপচাপ উঠে উদ্বিগ্ন মুখে ওর তাঁবুতে ফিরে এল। তুলসী কুপি জ্বালিয়ে দিয়েছে, রাজকুমারী কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। দেবচরণের চিন্তিত মুখ দেখে তুলসী বুঝল কিছু গণ্ডগোল। তুলসী বলল, ‘কী হয়েছে?’
‘রানার সেপাই এদিকে এসেছে, আমাদের খোঁজাখুঁজি করছে।’
রাজকুমারী ধড়মড় করে উঠে বসল, দু’চোখে ভয়।
‘আমাদের পালাতে হবে,’ দেবচরণ বলল।
‘আবার?’ তুলসী বলল।
‘শেষ রাতে বেরিয়ে পড়ব। রানার সেপাইরা কুলিবস্তিতে কাল সকালে আসবে।’
‘কোথায় যাব?’ তুলসী বলল।
‘নেপাল বর্ডার পেরিয়ে ভারতে। এখান থেকে দশ-বার মাইল দক্ষিণে। ওখানে ইংরেজ কোম্পানীর আইন, নেপালের রানার আইন আর আমাদের ছুঁতে পারবে না।’
‘কিন্তু তারপর? কোথায় থাকব?’
‘নেপাল বর্ডারের ঠিক ওপারেই নাকি পিতরাওয়া কোটে বিশাল বড় এক স্তূপ অনেকদিন ধরে খোঁড়া হচ্ছে। সেখানে কাজ নেব।’
‘ওখানে আমাদের থাকতে দেবে?’
‘চারুদত্ত বলল যে স্তূপ খোঁড়া নাকি শুরু হয়েছিল আগেই, কিন্তু ম্যালেরিয়ায় সাঁওতাল কুলিরা সকলে পালিয়েছে। ওখানে ইংরেজ মালিক নাকি কুলির খোঁজ করছে।’
‘কিন্তু রাতে জঙ্গলে বাঘ, হায়না, জংলী কুকুরের দল—’
‘রানার সেপাই জংলী কুকুরের থেকেও হিংস্র। রাত বাড়লেই বেরিয়ে পড়ব। তৈরি হয়ে নে—’
তুলসী কুপি নাড়িয়ে তেল দেখে নিল। তারপর ফুঁ দিয়ে কুপি নিভিয়ে দিল। তেল নষ্ট করলে চলবে না। রাতে অনেক কাজে লাগবে ।
দেবচরণ সারা রাত তন্নাবাঁশের লাঠিটা হাতে নিয়ে পাহারায় জেগে বসে রইল।
পাহাড়ে রাত গভীর হল। হঠাৎ ভারি জুতোর আওয়াজে চারদিক সরব হয়ে উঠল। দেবচরণ সজাগ, রানার সেপাইরা গ্রামে ঢুকছে। দেবচরণ তুলসীকে ঘুম থেকে জাগালো। ফিস ফিস করে বলল— ‘তাড়াতাড়ি! সেপাই গ্রামে ঢুকে পড়েছে।’
সিপাইরা কুলিদের তাঁবুতে তাঁবুতে খোঁজা শুরু করেছে। দেবচরণ তাঁবুর পিছন দিকের কাপড় অল্প ফাঁক করে বাইরে তাকাল। নালার ওপাশের জঙ্গল যেন ঘন অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে এল দেবচরণ। তারপর তুলসী আর রাজকুমারী। তিনজনে পিছনের নালা ধরে উপরে উঠে গেল।
‘কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না,’ তুলসী ফিসফিস করে বলল। ‘আলোটা জ্বালি?’
‘একদম না, ওরা দেখে ফেলবে আমাদের।’
মাফলারটা দিয়ে রাজকুমারীর মাথা-গলা-কান পেঁচিয়ে দিল তুলসী। শীতে নালার জলের ওপর পাতলা বরফের চাদর। পিছনে রানার সেপাইদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, কুলিবস্তিতে খুব শোরগোল হচ্ছে, বাচ্চারা কাঁদছে। পাথরের ওপর সাবধানে পা ফেলে ফেলে নালা পার হল দেবচরণ, পিছনে এল তুলসী আর রাজকুমারী। তিনজনে জঙ্গলে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর তুলসী বলল ‘অনেকটা পথ এসে গেছি। পথটা একবার দেখতে পেলে অসুবিধা হবে না । এবার কুপি জ্বালি?’
‘জ্বাল।’
অন্ধকারে জঙ্গলে এক চিলতে আলো গাছের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলতে লাগল। রাতের জঙ্গলে দেবচরণ অনভ্যস্ত নয়। মাঠে যখন কাজ থাকেনা, তখন গ্রামের অন্য থারুদের সঙ্গে দেবচরণ সারা দিন নদী-নালায় ঝাপিয়া, পাখাইয়া, জালে মাছ ধরে আবার রাতে জঙ্গলে গিয়ে বহুবার শিকার করেছে। কিন্তু এখনকার কথা আলাদা। থারু মেয়েরা কখনো রাতে শিকারে যায় না। আর তার কাছে অস্ত্র বলতে এখন এই হেঁসো আর এই তল্লাবাঁশের সাত হাতি লাঠি। নুড়ি ঠাসা পাহাড়ী সংকীর্ণ পথ, কোথাও খরগোশ আর ময়ুর ধরার বিপজ্জনক গর্ত-উদারা, পা ফেললেই হঠাৎ নিচে নেমে ঘাড় ভেঙে যাবে। কোথাও পথ ঢালু হতে হতে হঠাৎ আচমকা নিচে নালায় নেমে গেছে। একটু অসাবধান হলে নুড়ি পাথরে পা হড়কে একদম বরফ জমা নালার জলে। ঝোড়ো হিমেল বাতাস কানের পাশ দিয়ে সোঁ সোঁ করে বইছে। নালার কাছাকাছি একটু খোলা জায়গায় হাওয়ার ঝাপটায় কুপি নিভে গেল। থারুরা জানে আগুন নিভলেই অন্ধকারে হাজার শ্বাপদের চোখ জ্বলে উঠবে। বাঘ, চিতা, ভালুক, জংলি কুকুর, বুনো শুয়োর— কত কিছু। তুলসী তাড়াতাড়ি কুপি জ্বালল। একটা নিচু জলা পেরিয়ে গেল দেবচরণ, পিচ্ছিল কাদামাটি পায়ে মেখে চটচট করছে। পায়ের আঙুল জমে শক্ত হয়ে যায়। পাথরে পা মুছে মুছে আবার এগোতে লাগল দেবচরণরা । জঙ্গলী পোকাগুলো কিটকিট করে ডেকেই চলেছে। তরাইয়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হল জায়গায় জায়গায় জমে থাকা জলে বেড়ে ওঠা মশার উপনিবেশ। সারাক্ষণ গা-মাথার চারপাশে পিনপিন করে চলেছে মশার ঝাঁক। গায়ে, হাতে, কপালে সুযোগ পেলেই কামড়াচ্ছে। গায়ে হাত ঘষে মশা মারতে মারতে হাত ব্যথা হয়ে গেল। হঠাৎ জঙ্গলে নালার পাশে পচা দুর্গন্ধ।
‘কাছাকাছি বাঘ থাকতে পারে, আলোটা উঁচু করে চল।’ মেয়েকে মাঝখানে রেখে তুলসীকে সামনে এগিয়ে দিল দেবচরণ। দু-চোখ সদা সতর্ক৷ জোরে জোরে বনস্পতি আর ভারামলের নাম জপতে লাগল দেবচরণ। আর মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে হ্যাট হ্যাট করে আওয়াজ করতে করতে হেঁসো উঁচিয়ে অতি সাবধানে জায়গাটা পেরিয়ে গেল দেবচরণ।
কিছুক্ষণ পরে টিলার জঙ্গল থেকে পথ নেমে এল এক মানুষ উঁচু ঘাসবনে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তরাইয়ের এই ঘাসবন, মাঝে পায়ে চলার সরু সরু কাঁচা আলপথ। অনেকক্ষণ চলার পর জঙ্গল ফিকে হল, একটা গ্রাম নজরে এল, দু’পাশে গমের ক্ষেত। আরও একঘন্টা হেঁটে তৌলিহাওয়ায় এসে রাস্তা দুভাগে ভাগ হল। তরাই উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্বে ধীরে ধীরে ঢালু, পুবের দিকে পথ চলে গেছে লুম্বিনীর দিকে আর দক্ষিণে নেপাল সীমান্ত পার হয়ে ভারতে ঢুকে গেছে রাস্তা। দেবচরণ দক্ষিণের পথ ধরল।
পথ চলতে চলতে রাজকুমারী প্রশ্ন করল— ‘ওই ঢিপিগুলোতে কী ছিল, ‘বাবা?’
দেবচরণ সাহেবের তাঁবুতে নিজের চোখে যা দেখেছে তাই বলল৷ তবে সাহেবের ধারণা ওই স্তূপগুলোর নিচে থাকা উচিত শাক্যদের হাড় আর চিতার ছাই।’
‘শাক্য কারা বাবা?’
‘আমি জানিনে রে মা, অত রাজারাজড়াদের কথা। বুদ্ধ শুনেছি শাক্য ছিল।’ ‘অতগুলো ঢিপি একসঙ্গে কেন বাবা?’
‘অনেক শাক্য যে একসঙ্গে মরেছিল।’
ভাবতেই ভয়ে শিউরে ওঠে রাজকুমারী— ‘কেন?’
‘গোটা শাক্য জাতিকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিল বিরুধক রাজা। তারপর কপিলাবস্তু ধীরে ধীরে জঙ্গলে ঢেকে গেল।’
‘কেন রক্তের বন্যায় ভাসিয়েছিল?’
‘আমি কি সব জানি?’
‘সব শাক্যরা মরে গেছিল?’
‘না বেশির ভাগ শাক্যই মারা পড়েছিল। কিছু অল্প শাক্য পালিয়ে গেছিল। আর রাজা বিরুধক শাক্য মেয়ে-বৌদের সারি বেঁধে বন্দী করে রাজধানীতে নিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন করে। যারা পালিয়ে গেছিল আমরা থারুরা নাকি সেই শাক্যদেরই বংশের লোক। পা চালিয়ে চল মা— দেবচরণ তাড়া লাগায়, ভোরের আলো ফোটার আগে নেপালের সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারলে ভাল হত, মনে হচ্ছে সে সম্ভাবনা কম। মেয়ের মনে হচ্ছে আবার জ্বর এসেছে। ফ্যাস ফ্যাস করে ক্রমাগত নাক টানছে, বারবার হাতের উলটো দিক দিয়ে নাক মুছছে। কিন্তু গতি কমালে চলবে না, এগিয়ে চলতে লাগল দেবচরণ।
এভাবে কয়েক ঘন্টা কেটে গেল, অন্ধকার ফিকে হয়ে গেল। সকাল হচ্ছে। ঘাসবন ছেড়ে কাঁচাপথ এবার জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল। একটা পাখি ডেকে উঠল। কচি শালপাতার জালির মধ্য দিয়ে আকাশের হালকা আলো। জঙ্গলের মাথা কুয়াশায় মোড়া। মেয়ের ক্লান্ত চরণ আর এগোতে চাইছে না। একটু জিরিয়ে নিতে চায় শরীর, কিন্তু এখন শরীরের ওপর থেকে এতটুকু রাশ ছাড়লেই শরীর ঘুমে ঢুলে পড়বে। অনেক শ্বাপদ সেই সুযোগ নিয়ে ভোররাতে শিকার করতে বেরোয়।
‘পা চালিয়ে চল, আর একটু, প্রায় এসে গেছি,’ মেয়েকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে দেবচরণ। ধীরে ধীরে জঙ্গলে সকাল হল। পায়ের নিচে কাদামাটিতে পা মেখে গেছে, কোথাও একটু উঁচুতে ঝরা পাতার স্তূপ দেখলে সেখানে তিনজনে এক পা দিয়ে অন্য পা মুছে নিচ্ছে। জঙ্গলের পথ একটা টিলায় উঠে এল। হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেবচরণ আঁতকে উঠল। সামনে কাঁচাপথ নেমে আবার ঘাসবনের মধ্যে দিয়ে গেছে। টিলার নিচের সেই ঘাসবন পাতিপাতি করে খুঁজছে রানার পল্টন। দেবচরণ বুঝল ওরা সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পল্টনের কানে খবর পৌঁছে গেছে।
‘সর্বনাশ!’ তুলসী থমকে দাঁড়াল। ‘এবার কী হবে?’
দেবচরণ জানেনা এবার কী হবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই পল্টন খুঁজতে খুঁজতে এদিকে এসে পড়লে ওরা নিশ্চিত ধরা পড়ে যাবে। ডানদিকের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যদি টিলা থেকে নিচে নেমে যাওয়া যায়, জঙ্গল পেরোলেই ভারত।
ডানদিকের জঙ্গল ঘন নিচে গর্জাওয়া, বাথুওয়া, ফলসা, বনমেথি, লতাফিকার ঠাসবুনুনি। জঙ্গলের মধ্যে সরু সঁড়িপথে ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে হেঁটে ডানদিকে চলতে লাগল তিনজন।
টিলার জঙ্গল এবার ওপাশে নিচে নামছে। ‘এদিকে চল,’ দেবচরণ বলল। টিলার নিচের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে দ্রুত পা চালাল তিনজন। শাল গাছগুলোর বড় বড় পাতার মধ্যে দিয়ে দিনের আলো এসে ঢুকেছে বনের অন্ধকারে। হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে সৈন্যদের কেউ এক জোরালো বাঁশি বাজাল। আর সৈন্যরা ছুটে আসতে লাগল দেবচরণদের দিকে।
‘আমাদের দেখতে পেয়ে গেছে! পালা!’ দেবচরণ জঙ্গলের ডালপালা ভেদ করে মেয়ে-বৌকে নিয়ে ছুটতে লাগল। সৈন্যরা এবার শোরগোল করে ছুটে আসতে লাগল। ছুটতে ছুটতে দেবচরণ পিছনে তাকাল, পিছনে রানার সেপাইরা অনেক দ্রুত এগিয়ে আসছে। ওদের পায়ে মোটা বিদেশি জুতো। ডালপালা মচমচ করে পাড়িয়ে ওরা ছুটে আসছে। সামনে–পিছনে–ডাইনে-বাঁয়ে জঙ্গল। ধরতে পারলে এই জঙ্গলেই ওদের শেষ করে রেখে যাবে। দেবচরণ ছুটতে ছুটতে পাশে তুলসীর দিকে তাকাল। তুলসী এক হাতে ল্যাহেঙ্গা হাঁটু অবধি তুলে অন্য হাতে নেতিয়ে পড়া মেয়েকে শক্ত করে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে টানতে টানতে ছুটছে। তুলসীর আর রাজকুমারীর পা কাদায় মাখামাখি, মরিয়া হয়ে দিগ্বিদিক ভুলে ছুটছে।
হঠাৎ দেবচরণ শুনতে পেল সামনে অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে গানের সুর। এ গানের সুর শব্দ তার খুব চেনা। এই গান সে মানিকগঞ্জের হাটে শুনেছিল।
প্রভু যীশুর ভজনগান!
‘ওদিকে চল,’ দেবচরণ এবার কোনাকুনি ছুটতে লাগল। জঙ্গল ক্রমশঃ ফিকে হয়ে গেল, শালের জঙ্গলের শেষে একসারি করমচা গাছ তারপর ছোটো ঘাসের লম্বা ঢাল। সেই ঢালের একদম নিচে একটা ফাঁকা জায়গায় একটা সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। সেখানে একজন পাদ্রি সাহেব দাঁড়িয়ে, একমুখ দাড়ি, মাথায় টুপি, চোখে চশমা। একেই দেখেছে সেদিন মানিকগঞ্জে দেবচরণ, পাদ্রিরা এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লায় ঘুরে ঘুরে সামিয়ানা টানিয়ে যীশুর ভজনগান গায় আর লোকেদের খ্রিষ্টান বানায়। পাদ্রির পাশে একজন সাহেব উঁচু গলায় সুরেলা ভজন গাইছে আর তাদের সঙ্গে দু’জন দেশি পাদ্রি গলা মেলাচ্ছে।
ভারতবর্ষ!
সামিয়ানার নিচে বসে আছে একদল দেহাতি মানুষ। চারটে খচ্চর তৃণভূমিতে ঘাস খাচ্ছে। তুলসী ও রাজকুমারীকে নিয়ে ছুটে ঢাল বেয়ে নিচে নামতে নামতে পিছন ফিরে তাকাল দেবচরণ। রানার সৈন্যরা এসে দাঁড়িয়েছে ঢালের ওপরে, শালবনের সীমানায়। ওদের হাতের বন্দুক উদ্যত। ওরা গুলি করবে যে কোনও মুহূর্তে। কিন্তু সৈন্যরা গুলি চালাচ্ছে না, ওদের ক্যাপ্টেন জানে একটা গুলি ফসকে ওই পাদ্রিদের মধ্যে গিয়ে পড়লে ব্রিটিশ সৈন্য আর তাদের ডেরায় ফিরে যেতে দেবে না। তাই রানার সৈন্যরা এবার দ্রুত ঢাল দিয়ে নিচে নামতে লাগল। দেবচরণ ও পাদ্রিদের মধ্যে ঘাসবনে দূরত্ব ক্রমশঃ কমছে। ওদের দেখে পাদ্রিদের ভজন থেমে গেল। এবার একজন পাদ্রি চেঁচিয়ে বলল— কেউ কি কোনও পাপ প্রভু যীশুর সমীপে বলে মুক্ত হতে চাও? কেউ কি প্রভু যীশুর শরণাপন্ন হতে চাও?’
‘আমরা,’ দেবচরণ হাঁফাতে হাঁফাতে দূর থেকে চেঁচিয়ে বলল। ‘আমরা প্রভু যীশুর শরণাপন্ন।’
পাদ্রিরা বিস্ময়ে দেখল মানুষ তিনজনকে। ওরা প্রাণপণে ছুটে আসছে আশ্রয়ের জন্য। তাদের পিছনে বন্দুক উদ্যত করে একদল নেপালী সৈন্য। ‘আমাদের বাঁচাও সাহেব! বিশ্বাস কর আমরা কোনও পাপ করি নি।’
পাদ্রি পাশের লাল পাগড়ি কোম্পানীর সৈন্যকে বিড়বিড় করে কিছু বলল। লাল পাগড়ি সৈন্যরা বন্দুকের কার্তুজ ভরে বন্দুক তুলে রানার সৈন্যদের দিকে তাক করে দাঁড়াল। রানার সৈন্যরা নেপাল সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেখল তিনজন থাক হাঁটু মুড়ে বসল পাদ্রিদের সামনে।
বয়স্ক পাদ্রি লোটার জল দেবচরণের গায়ে ছিটিয়ে ব্যাপটিজম করল, দেবচরণের হাতে কয়েকটা চাল দিল— ‘আজ থেকে তোমার নতুন নাম হল জোসেফ মসীহ,’ —দেবচরণ ওই চাল চিবোতে চিবোতে ঘাড় ঘুরিয়ে নেপালী রানার সৈন্যদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখল, তারপর মুখ ফিরিয়ে নিল। পাদ্রি তুলসীকে বলছে, ‘তোমার নাম কী?’
‘তুলসী।’
‘আজ থেকে তোমার নাম হল মরিয়ম,’ পাদ্রি তুলসীকে চাল দিল— ‘আর তোমার নাম?’
‘রাজকুমারী,’ কুমারী বলল।
‘আজ থেকে তোমার নাম হল রেবেকা।’
রাজকুমারী মায়ের দেখাদেখি চাল চিবোতে লাগল। পাদ্রিরা ওদের খাতায় তিনজনের নাম লিখে নিল। আরও তিনজন নেটিভ খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হল। প্রাণ বাঁচাতে ধর্ম পালটানো ভারতবর্ষে কোনও নতুন কথা নয়। পাদ্রিরা তিনজনকে একটা করে ক্রশ দিল। তুলসী প্রভু যীশুর তিনটে ক্রুশকে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে তার পটুকীতে খড়্গাভূত ও পাঁচুয়ার কাঠের মূর্তির সঙ্গে রেখে দিল।
সুনয়নের কোনও পাত্তা নেই। লোকটা হয়তো নাইট শিফট শেষ করে বাড়ি ফিরে ঘুমোচ্ছে। রিধিমা বিছানা ছেড়ে উঠল। হাত-মুখ ধুয়ে কিচেনে এল। ওট মিল, দুধ মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে মাইক্রোওয়েভ অন করল রিধিমা। টিভির রিমোটটা খাটের পাশে নাইটস্ট্যাণ্ডে। রিমোটে চাপ দিল রিধিমা। CNN-এর নিউজে দেখাচ্ছে নিউ ইয়র্ক সিটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসছে, কেনেডি এয়ারপোর্টে প্লেন চলাচল শুরু হয়েছে। তবে অবস্থা স্বাভাবিক হতে আরও একটা দিন লাগবে।
মাইক্রোওয়েভটা বিপ বিপ করল। মাইক্রোওয়েভের দিকে যেতে গিয়ে থমকে গেল রিধিমা। চোখ আটকে গেল টিভিতে—
সানসেট পার্কে এক কবরখানায় কাল রাতে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড হয়েছে। কবরখানার ভিতরে দু’জন হোমলেসকে কেউ এসে কুপিয়ে ছোট ছোট টুকরোর মাংসখণ্ড বানিয়ে গেছে। চারদিকে বরফের ওপর রক্ত। পুলিশের ক্রাইম সিন টেপের ভিতর জায়গাটা দেখে রিধিমা ভয়ে কেঁপে উঠল।
‘হে ভগবান!’ রিধিমা ডুকরে কেঁদে উঠল। এরাই কাল রাতে ওকে বাঁচিয়েছিল। এদের এভাবে কুপিয়েছে? শরীরের ভিতর থেকে আগ্নেয়গিরি বাইরে বেরিয়ে আসছে। রিধিমা বাথরুমে ছুটে গেল। সিঙ্কে ঝুঁকে পড়ে হড়হড় করে বমি করে দিল। দু’হাতের আঁজলা ভরে ভরে চোখে জলের ছিটে দিতে লাগল সে। কিছুক্ষণ পর আয়নায় তাকিয়ে দেখল দু-চোখ টকটকে লাল, নিচের ঠোঁট থেকে একটা নাছোড় লালা ঝুলছে। ঐ কেভিন প্রতিহিংসায় আবার ফিরে এসেছিল সানসেট পার্কে। মোহনদের ওপর রাগে মাথাটা আগুন হয়ে গেল। ইণ্ডিয়ান কনসুলেট ইচ্ছা করলেই ওকে প্রোটেকশন দিতে পারত। তাহলে এই নিরীহ হোমলেসদের প্রাণ যেত না। যাদের মাথা গোঁজার স্থান পর্যন্ত নেই তারাও রিধিমাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিল— রিধিমার আড়ষ্ট আঙুলগুলো ব্যথায় টনটন করে উঠল যখন সে সেলফোনে মোহনের নাম্বার পাঞ্চ করল।
ফোনটা কয়েকবার বাজল তারপর ‘মোহন গুপ্টা দিস সাইড!’
‘রিধিমা বলছি।’
‘ভেরি সরি, রিধিমা,’ মোহনের কণ্ঠস্বরে অনুতাপ। ‘সোহিনী আমার এক্স রিলেশনের প্রসঙ্গ উঠলেই খেপে ওঠে। আমি কাল সারারাত তোমার জন্য দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারি নি।’
রিধিমা চুপ করে মোহনকে কাঁদুনি গাইবার সময় দিল— থার্টি সেকেণ্ডস।
‘আজ সকালে মিনিস্টার এসেছে,’ মোহন কথা ঘোরাল। ‘তোমার কথাটা আমি পেড়েছি গাড়িতেই।’ মোহন একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘খারাপ খবরটা দিতে হচ্ছে। আমি সরি।’
‘কী খবর?’
‘মিনিস্টার তোমাকে সাপোর্ট করতে রাজি না।’
‘জানতাম সাপোর্ট করবে না।’
‘তুমি বোঝার চেষ্টা কর,’ মোহন বলল। ‘প্রথমতঃ, ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্ট এতদিন ধরে ফাইট করছে যে পিতরাওয়াই হল কপিলাবস্তু।’
‘মিনিস্টারের মেয়ে আমার জায়গায় হলে তোমরা কী করতে মোহন?’
‘ভারত সরকার ওখানে একটা মিউজিয়াম বানিয়েছে, প্রচুর ট্যুরিস্ট আসছে, ট্যুরিজম মিনিস্ট্রি ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক আর জাপানিজ গভর্নমেন্টের থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার লোন চেয়েছে বুদ্ধিস্ট সার্কিট বানাবার জন্য। পিতরাওয়া বা কপিলাবস্তু সেই সার্কিটের এক অংশ। ট্যুরিজম ইণ্ডিয়ার একটা বড় রেভিনিউ গত বছর দশ মিলিয়ন ফরেন ট্যুরিস্ট ইণ্ডিয়ায় ভিজিট করেছে, সাতাশ বিলিয়ন ডলারের রেভিনিউ—।
‘আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না, মোহন।
‘লেট মি ফিনিশ, রিধিমা। পিতরাওয়ার বুদ্ধের হাড় নানা দেশে ডিস্ট্রিবিউট করা হয়েছিল। পৃথিবীর নানা প্রান্তের সমস্ত বৌদ্ধরা খেপে যাবে, এতদিন ধরে যাকে বুদ্ধের হাড় বলে নিত্য পুজো করে এসেছে, যার ওপর কোটি কোটি টাকা খরচা করে প্যাগোডা বা স্তূপ বানিয়েছে, তাকে মিথ্যা বললে তার কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা আন্দাজ করতে পারছ? ভারত সরকার চাইছে না ব্যাপারটাকে নিয়ে জল ঘোলা করতে। শুধু ভারতেই সাড়ে বিরানব্বই লাখ বৌদ্ধ আছে। তাছাড়া এই ঘোষণায় ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরবে।’
‘ফিনিশড? নাকি আরও কিছু আছে?’ রিধিমা জানে মোহনের স্টাইল হল খারাপ খবরগুলো ধীরে ধীরে ঝুলি থেকে বের করার।
‘সবচেয়ে খারাপ খবরটা—’ মোহন বলল। তারপর মোহন চুপ।
‘সেটাও বলে ফেল, কী সেই খারাপ খবর?’
‘মিনিস্টার সাহাব অ্যাডভাইস করেছেন যে তুমি আবার আমাদের এখানে এলে সঙ্গে সঙ্গে যেন তোমাকে আমেরিকান পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’
‘এক্সেলেন্ট!’ রিধিমা ব্যঙ্গের স্বরে বলল।
‘তুমি আমাদের ধারেকাছেও এস না, প্লিজ।’
‘চিন্তা কোরো না মোহন,’ রিধিমা বলল। ‘তোমার প্রবলেমটা কী জান? তুমি নির্বিকার ভাবে মিথ্যা কথা বলে যাও। এর মধ্যে কতটা মিথ্যা কে জানে?’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
তোমার স্ত্রী ওর কাজিনের বিয়েতে দেশে যায় নি।’
মোহন একদম চুপ৷
‘এদেশে নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতে থাকতে ডিপ্রেসন আর নিতে পারছিল না, তাই পিল পপিং ছেড়ে বাড়ি ফিরে বেঁচেছে।’
এবার মোহনের বাক্যস্ফূর্তি হল— ‘এসব গসিপ! তোমায় কে বলেছে?’
‘কেউ বলেনি মোহন, সেলফোন চার্জারের প্লাগটা তোমার কাউচের গদির ভিতর ঢুকে গেছিল। হাত ঢুকিয়ে তুলতে গিয়ে হাতে ফ্লুঅক্সটিনের প্যাকেটটা পেলাম। তুমি যখন আমায় ডাম্প করেছিলে তখন এধরনের অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ক্যাপসুল আমাকে রোজ গিলতে হত।’ রিধিমা থামল। রোজ নিঃসঙ্গ অবস্থায় টিভি দেখতে দেখতে তোমার বৌয়ের হাত থেকে কোনও একদিন প্যাকেটটা কাউচের গর্তের ভিতর চলে গেছিল বোধহয়—’
‘ডিসগাস্টিং!’ মোহন গজগজ করে বলল।
‘এটা ডিসগাস্টিং? তাহলে আমার পাসপোর্টের ইমিগ্রেশনের দুটো পাতা হাপিশ করে দিলে সেটাকে কী বলবে?’
‘কী বলছ তুমি?’
‘কোনও প্রমাণই রাখোনি যে আমি মার্ডারের সময় আমেরিকার বাইরে ছিলাম?’
তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’ মোহন চেঁচিয়ে উঠল।
সেলফোন জানাল আরেকটা ফোন এসেছে, সুনয়নের নম্বর।
‘হিপোক্র্যাট—!’ রিধিমা মোহনের ফোনটা কেটে সুনয়নের ফোনটা ধরল। ধরতেই ভীষণ বকা— ‘আপনি অন্য লাইনে ছিলেন?’
‘হ্যাঁ, ইণ্ডিয়ান মিশনের— ‘রিধিমা বলল।
‘ড্যাম ইট!’ সুনয়নের হতাশার চিৎকার। আপনাকে বলেছিলাম বাইরে কোথাও ফোন করবেন না। একটা লুকোবার মত জায়গা আপনাকে দিলাম, আপনি সেটাও হারালেন।’
‘আমি বুঝতে পারছি না, কী বলছেন—’
‘ইণ্ডিয়ান মিশন নিউ ইয়র্কের সব কটা কল ওরা ট্র্যাক করছে। ওরা এক্ষুনি আপনার কাছে এসে পৌঁছোবে। ফোনটাকে কমোডে ফেলে পালান।’
‘কোথায় পালাবো?’
‘যেদিকে দু’চোখ যায়। রান। খুব বেশি হলে পাঁচ মিনিট সময় পাবেন!’
৷৷ আঠারো ৷৷
ফোনটা তাড়াতাড়ি বাথরুমে কমোডে গিয়ে ফ্লাশ করল রিধিমা। তারপর দ্রুতহাতে চামড়ার জুতোয় চেন টেনে এক হাতে জ্যাকেট, অন্য হাতে ল্যাপটপের ব্যাকপ্যাক নিয়ে দ্রুতপায়ে রাস্তায় নেমে এল। তীব্র ঠাণ্ডা। ঠিক উলটো দিকে পাশাপাশি কয়েকটা দোকান— লক্ট্রোম্যাট, ওয়াইন ও লিক্যুয়র, চাইনিজ রেস্তোরাঁ। রিধিমা সাইডওয়াকের ওপর ছুটতে ছুটতে জ্যাকেটটা কোনওমতে গায়ে গলিয়ে নিল। একটু এগিয়ে একটা কনভিনিয়েন্স স্টোর। কাঁচের দেওয়ালে বিয়ার, সিগারেট, ১৯ সেন্ট হট ডগের অ্যাডভার্টাইসমেন্ট। পাওয়ারবল টিকিটের ডিজিটাল ডিসপ্লে জ্বলছে। রিধিমা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে হাঁফাতে লাগল। কাঁচের জানলা দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা দেখা যাচ্ছে। দুটো পুলিশের গাড়ি ছুটে এসে অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক সামনে রাস্তার ধারে থামল। গাড়ি থেকে চারজন পুলিশ পিস্তল হাতে দ্রুত দুদিকের দরজা খুলে লাফিয়ে নামল। তারপর ছুটে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে গেল।
ওরা এসে গেছে!
রিধিমা জানলা থেকে সরে গেল, ওর হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেছে। ভিতরে একটা ল্যাতিন আমেরিকান মেয়ে কফি-মেকারে কফি রিফিল করছিল, রিধিমা ভিতরের আইল থেকে একটা মাফিন আর একটা জলের বোতল তুলে ক্যাশ কাউন্টারে পে’ করল। তারপর আবার এসে উঁকি মারল জানলায়। পুলিশের গাড়ি দুটো এখনো দাঁড়িয়ে। ওরা সম্ভবতঃ গোটা অ্যাপার্টমেন্টে খুঁজছে রিধিমার সেলফোন।
আরও মিনিট দশেক কেটে গেল। এবার চারজন পুলিশ বেরিয়ে এসে গাড়িতে ঢুকল, পুলিশের গাড়িদুটো বেরিয়ে গেল।
রিধিমা আরও দশ মিনিট দোকানের ভিতরে রইল। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসছে না। রিধিমা এবার কফি পট থেকে কাগজের কাপে কফি ঢালল, তারপর ওয়ার্মার থেকে একটা এগ স্যাণ্ডুইচ তুলে নিল। ক্যাশ মিটিয়ে জানলার পাশের একটা টেবিলে বসে স্যাণ্ডুয়িচে কামড় লাগিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থামস আপ করে বলল, ‘অওসাম।’
মেয়েটা মিস্টি হেসে বলল, ‘থ্যাঙ্কস! হোমমেড। মাই মাদার মেকস ইট।’
‘ডেলিশাস,’ রিধিমা বলল। তারপর রিধিমা জ্যাকেটের পকেট খুঁজতে খুঁজতে বলল, ‘শিট!’
মেয়েটা বলল, ‘এনি প্রবলেম?’
আমার সেলফোন ভুলে অ্যাপার্টমেন্টে ফেলে এসেছি।’
মেয়েটা অ্যাপ্রনের পকেট থেকে একটা সেলফোন বের করে বলল, ‘আমারটা নিতে পার।’
‘অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কাইণ্ডনেস’ রিধিমা ফোনটা নিয়ে সুনয়নের নাম্বারে ডায়াল করল।
‘হ্যালো,’ রিধিমার বুক এখনো ধকধক করছে। ‘ওরা এখানে এসেছিল আমার খোঁজে।’
‘এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম।’ সুনয়নের গলার স্বরে উদ্বেগ। ‘আপনি কোথায়?’ ‘কনভিনিয়েন্ট স্টোরে। অ্যাক্রস দ্য স্ট্রিট।’
‘ওখানেই লুকিয়ে থাকুন। একদম বাইরে যাবেন না। ওরা নজর রাখবে। আমি আসছি।’ সুনয়ন থামল। ‘আপনার অ্যাপল ওয়াচে রিস্টব্যাণ্ডের ভিতরে কি আপনার নাম লেখা আছে?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু, আপনি কীভাবে জানলেন?’ রিধিমা বলল। ‘আপনি কি ঘড়িটা উদ্ধার করতে পেরেছেন?’
সুনয়ন এক সেকেণ্ডের জন্য আবার থামল— ‘ডঃ গিলমোরকে আজ সকালে পুলিশ এয়ারপোর্টের কাছে হিলটনে মৃত অবস্থায় পেয়েছে।’
‘নো-ও-ও!’
‘ওর ব্যাগে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের টিকিট পাওয়া গেছে। সম্ভবতঃ দেশ থেকে বেরিয়ে ইউরোপে গা ঢাকা দেবার প্ল্যান ছিল। আর—’
‘আর?’
‘কফি টেবিলের নিচে একটা অ্যাপল ওয়াচ পাওয়া গেছে, যার রিস্টব্যাণ্ডে আপনার নাম লেখা।’
রিধিমার মনে হল ওর এবার প্যানিক অ্যাটাক হয়ে যাবে।
৷৷ উনিশ ৷৷
রিধিমার মাথা ঝিমঝিম করছে।
‘আপনি ওখানেই থাকুন। আমি আধঘন্টার মধ্যে আসছি।’ সুনয়ন ফোন রেখে দিল। রিধিমা কফিতে চুমুক দিল— ওর একমাত্র ভরসা ছিল এই ডঃ গিলমোর। খুনির মোটিভ ও কিছুটা জানত। ডঃ গিলমোরও খুন হয়ে গেল? এখন তাহলে সে কী করবে?
মেয়েটা রিধিমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। রিধিমার মুখ দেখে ও কিছু গোলমাল আন্দাজ করতে পারল— ‘এভরিথিং ওকে?’
‘ইয়েস, ইয়েস,’ রিধিমা হেসে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
‘শিওর?’
রিধিমা মেয়েটার চোখে অবিশ্বাস দেখতে পেল। মেয়েটা পুলিশ ডাকলে মহা বিপদ।
‘আমার রাইড আসতে একটু দেরি হচ্ছে,’ মেয়েটাকে সেলফোন ফেরত দিল রিধিমা। ‘থ্যাঙ্কস এ লট।’
‘নো প্রবলেম,’ মেয়েটা আবার মিস্টি হাসল বটে, কিন্তু রিধিমা দেখল মেয়েটা ওর টেনশন পড়তে পারছে। মুখ লোকাতে হবে। যেন কিছুই হয় নি এমন ভাব করে কফিতে চুমুক দিল রিধিমা।
পনের মিনিট পর কনভিনিয়েন্স স্টোরের কাঁচের দরজা টেনে সুনয়ন হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল, ভিতরে রিধিমাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস চেপে বলল, ‘চলুন।’
রিধিমা উঠে দাঁড়াল। সুনয়নের গাড়ি রাস্তার কার্বে পার্ক করা ছিল। দু’জনে সুনয়নের গাড়িতে গিয়ে উঠল। সুনয়নের মুখ থমথমে। রিধিমা সাবধান হল, লোকটা বদরাগী, মনে হচ্ছে এখন মাথা বেশ গরম। রিধিমা বলল, ‘আমি সরি।’
সুনয়ন একটাও কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট করল।
তুষারঝড়ে বিপর্যস্ত শহরের এখন প্রাণ ফিরে আসছে। নিউ ইয়র্ক সিটিতে গাড়ি চলাচলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, তাই রাস্তায় গাড়ি চলাচল আবার বেড়ে গেছে। রিধিমার কাছে সুনয়নের নীরবতা অস্বস্তিকর লাগছিল। রিধিমা নীরবতা ভাঙার জন্য বলল— ‘আপনি কি শিওর যে পুলিশের ঊর্দি পরা লোকগুলো আমাকেই মারতে এসেছিল?’
সুনয়ন সেল ফোনটা তুলে ফটো ফোল্ডার খুলে রিধিমার দিকে এগিয়ে দিল— ‘পাশের অ্যাপার্টমেন্টে আমার চেনাশোনা একজন থাকে, তাকে পাঠিয়েছিলাম চেক করতে।’
রিধিমা স্ক্রল করে করে ফটোগুলো দেখতে দেখতে শিউরে উঠল। অ্যাপার্টমেন্টটাকে ধরে কেউ যেন ঝাঁকিয়েছে। টুয়িন বেডের ম্যাট্রেস দেওয়ালে দাঁড় করানো আর সেটা ফালাফালা করে ছেঁড়া, ফাইভ ড্রয়ার চেস্টের পাঁচটা ড্রয়ারই খোলা, তা থেকে কাপড়-জামা ঝুলছে, বইগুলো বুকশেলফ থেকে নামিয়ে নামিয়ে ছিঁড়েছে, ক্লজেটে প্রত্যেকটা প্যান্ট-স্কার্ট ছিঁড়ে ফর্দাফাই করে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। মনে হচ্ছে যেন রিধিমার ওপর কতজন্মের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এসে ব্যর্থ হয়ে ক্ষোভ এদের ওপর দিয়ে মিটিয়ে গেছে। ওট মিল গরম করে খাওয়া হয় নি, সেই বাটির ভাঙা টুকরো, দুধ, ওট রান্নাঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে একটা পল্টন এসেছিল ধ্বংস করতে।
‘মাই গুডনেস!’ রিধিমা শিউরে উঠল।
সুনয়ন গাড়িটাকে একটা ডানকিন ডোনাটস-এর ড্রাইভ ইনে ঢোকাল ‘ভ্যানিলা চায়ে উইথ টার্বো শটস অন দ্য টপ’ সুনয়ন অর্ডার দিল। ‘আপনি কিছু নেবেন?’
‘আয়্যাম গুড, থ্যাঙ্কস।’
সুনয়ন গরম বেভারেজটা নিয়ে পয়সা মিটিয়ে টেক আউট লেনে গাড়ি এগোতে এগোতে গম্ভীর গলায় বলল, ‘মিস বোস, আমি যেটা করছি সেটাকে এদেশের ফেডেরাল ল’ বলে ‘অ্যাকসেসারিস আফটার দ্য ফ্যাক্ট’। ক্রিমিনালকে ক্রাইমের পর হেল্প করা, পালাতে সাহায্য করা, শেল্টার দেওয়া ইত্যাদি। আইনের চোখে এটা গুরুতর অপরাধ। ধরা পড়লে আমার পনের বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। আপনি কি গুরুত্বটা বোঝেন?’
রিধিমা মাথা নাড়ল, সুনয়নের মুখ গম্ভীর, রিধিমা বুঝল মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে।
‘আপনি যদি চান আমি আপনাকে হেল্প করি, তাহলে আপনাকে তিনটে গ্রাউণ্ড রুলে এগ্রি করতে হবে,’ সুনয়ন গম্ভীর। গাড়িটা সুনয়ন পার্কিং লটে দাঁড় করাল। রিধিমা সুনয়নের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল, সুনয়ন চায়ে চুমুক দিচ্ছে।
‘ফার্স্ট রুল!’ সুনয়ন যেন আদেশ দিচ্ছে এভাবে বলল। ‘বাইরের কারুকে ফোনে কন্ট্যাক্ট করতে পারবেন না। আপনার এই হাইড অ্যাণ্ড সিক খেলা খুব রিস্কি। আপনার এবং আমার দু’জনের জন্যই।’ সুনয়ন কঠোর দৃষ্টিতে তাকাল। রিধিমার মনে হল লোকটা রুড, কিন্তু যা বলছে সেটা মেকস সেন্স।
‘এগ্রিড, রিধিমা বলল।’
‘রুল নম্বর টু— আমাকে মিথ্যা বা হাফ মিথ্যা গল্পো শোনাতে আসবেন না। ইচ্ছে না করলে কিচ্ছুটি বলবেন না, কিন্তু আমাকে মিসলিড করবেন না। আমার যদি আপনার ওপর এতটুকু সন্দেহ হয়, আমি কিন্তু আপনাকে গ্র্যাণ্ড সেন্ট্রালে যেখান থেকে তুলেছি সেখানে নামিয়ে দিয়ে আসব।’
রিধিমা তর্ক করতে গিয়েও নিজেকে সংযত করল। হাফ মিথ্যা অলরেডি অনেক বলেছে ও এই লোকটাকে।
‘এগ্রিড, রিধিমা মাথা নাড়ল।’
‘রুল থ্রি— আপনি আমাকে না জানিয়ে কারোর সঙ্গে কোথাও দেখা করতে যাবেন না।’
রিধিমা দ্রুত মাথা উপর নিচ নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, ‘এগ্রিড।’
সুনয়ন গাড়িটাকে গিয়ারে ফেলল।
‘কিন্তু আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,’ রিধিমা বলল।
‘বলে ফেলুন।’
‘আপনি আমাকে সাহায্য করছেন কেন?
‘আপনাকে আমি সাহায্য করছি না, একজন রিপোর্টার সত্য জানবার চেষ্টা করছে। যদি জানতে পারি যে আপনি খুনি, আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করব না পুলিশের হাতে আপনাকে তুলে দিতে।’
‘তার মানে আপনি এখনো আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন নি?’
‘বর্ডার লাইন কেস।’
‘একটা সত্যি কথা বলবেন?’
‘বলুন।’
‘আপনি নিজে পুলিশের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন?’
‘কাল রাতে আমার কোনও উপায় ছিল না। আমাদের চার্চে পুলিশ রেইড করেছিল। আপনি ওখানে না থাকলে আমি পালাতাম না।’
‘পুলিশ রেইড! কেন?’
‘পুলিশ কিছু আনডকুমেন্টেড গায়ানিজ ন্যাশনালকে অ্যারেস্ট করেছে— সুনয়ন বলল।’
‘আনডকুমেন্টড? মানে ইল্লিগ্যাল ইমিগ্র্যান্ট?’
‘বলতে পারেন। তবে এই লোকগুলো আমাদের প্রোটেকটিভ স্যাংচুয়ারিতে গত একবছর ধরে আছে। ওদের রেকর্ড USCIS-এ আছে। কিন্তু পুলিশ সব অগ্রাহ্য করে ওদের রাত্তিরে অ্যারেস্ট করে।’
রিধিমা কিছু বুঝল, কিছু বুঝল না। ও চুপ করে রইল। রাস্তায় এখন ঘোলাটে বরফের কাদা প্যাচপ্যাচ করছে। ঝড়ে জমে থাকা রাস্তার বরফ পরিষ্কার করতেই এখন ব্যস্ত নিউ ইয়র্ক। তিন ফুট বরফ খুঁড়ে নিজেদের গাড়ি, সামনের সাইডওয়াক, ড্রাইভওয়ে খুঁড়ে বের করার কাজে সকলে ব্যস্ত৷
‘আজ সকালে আমাদের গায়ানিজ কমিউনিটির কিছু লোক অধৈর্য হয়ে পুলিশের থানা ঘেরাও করে। পুলিশ সিচুয়েশন সামলাবার জন্য আরও আটজন গায়ানিজ লোককে ডিটেইন করে। আমরা একটা গায়ানিজ ইমিগ্র্যান্টস রাইটস অ্যাডভোকেসি অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের অ্যাটর্নিকে নিয়ে কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম খুব সকালে। এটা খুবই আর্জেন্ট ছিল, না হলে পুলিশ ওদের থানা থেকে কারেকশন সেন্টারে পাঠিয়ে দিত—’
রিধিমা বুঝল। একেই সুনয়নের মা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো বলেছিল ।
‘ডঃ গিলমোরকে হত্যা করা হয়েছে। তাহলে এখন আমরা কী করব?’
‘পুলিশ আর চান্স নেবে না। যা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। ট্রেসির কাছে চলুন।’
‘ট্রেসি?’
‘আমাদের কাগজ রিচমণ্ড হিলস গেজেটের এডিটর। ওর কিছু জানাশোনা আছে। যতই কম সার্কুলেশন হোক না, মিডিয়া তো। কিছু একটা উপায় হয়তো ও সাজেস্ট করতে পারে।’
খুব একটা ভরসা হল না রিধিমার। কিন্তু আর কোনও উপায়ও নেই।
