কপিলাবস্তুর কলস – ২০
৷৷ কুড়ি ৷৷
দরজা ধাক্কার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল হরিপরসাদের। দরজা খুলল হরিপরসাদ। সকাল হয়ে গেছে, আজ থেকে ওর কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা। পাহারাদার রগ্যাপা লামা তির্যকস্বরে বলল, ডিসটার্ব করলাম?’
‘সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই,’ হরিপরসাদ হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল। ‘তাই লুসিও ডিসটার্ব করেনি।’
সত্যি সত্যি লুসি এতক্ষণ হরিপরসাদকে বিরক্ত করে নি। ও বোধহয় বুঝেছে হরিপরসাদের ঘুম দরকার। এখন কুঁই-কুই শুরু করল।
লুসিকে একটু বাইরে নিয়ে যেতে হবে, হরিপরসাদ বলল।
‘এক মিনিট, আমি আসছি,’ লামা সন্ন্যাসীদের আবাসের দিকে দ্রুতপায়ে গেল, যখন ফিরে এল তখন ওর হাতে গেরুয়া জ্যাকেট, উলের মোজা, চামড়ার জুতো, একটা টুপি। ‘বাইরে খুব ঠাণ্ডা।’
হরিপরসাদ জ্যাকেট, ছুবা, উলের মোজা, জুতো, টুপি পরে ফেলল। তারপর মঠের পিছনের দরজা দিয়ে লুসিকে নিয়ে বেরিয়ে এল। হরিপরসাদের হাতে প্লাস্টিকের প্যাকেট ধরিয়ে দিল রগ্যাপা লামা। নিউ ইয়র্কে আইন অনুযায়ী বাইরে কুকুরের পায়খানা কুকুরের মালিককেই তুলতে হয়, না হলে দু’শ পঞ্চাশ ডলার ফাইন। লুসিকে লিশে লাগিয়ে হাঁটতে লাগল হরিপরসাদ। পিছন পিছন এল পাহারাদার রগ্যাপা লামা।
‘কী যেন তোমার নামটা? খুবই কমপ্লিকেটেড!’
‘রগ্যাপা।’
উচ্চারণ করা খুব কঠিন।
‘তিব্বতে কারা রগ্যাপা জানো?’ লামা বলল।
‘কারা?’
‘যারা পাহাড়ের চূড়ায় মরা কেটে শকুনকে খাওয়ায়।’
‘হোয়াট?’ এরকম কথা জীবনে প্রথম শুনল হরিপরসাদ। ‘তুমি মরা কেটে শকুনকে খাইয়েছ?’
‘আমি কেন আমার বাপ-ঠাকুরদা সবাই এই কাজই করত। ঝাটর জানো?’
‘না।’
‘স্কাই বারিয়াল?’
‘না।’
‘তিব্বতে মানুষ মরে গেলে সেই মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় পাহাড়ের চূড়ায়। সেখানে মাখন প্রদীপ জ্বেলে প্রার্থনা করা হয় মৃতের আত্মার জন্য। তারপর বিশাল ছুরির আংটার এক এক টানে হাড় থেকে মৃতদেহের মাংসখণ্ডগুলো আলাদা করতে হয়, তারপর হাতুড়ি দিয়ে মাথার খুলি ভেঙে মাংসের টুকরো আর শাম্পা মাখানো গুঁড়ো গুঁড়ো হাড় আর ঘিলু পাথরে রেখে সরে গেলে শকুনেরা নেমে এসে চেটেপুটে সাফ করে দেয়।’
হরি পরসাদের গা ঘিনঘিন করতে লাগল। পাহাড়ে বেলা বেড়েছে। চারদিক সাদা বরফে ঢাকা। লুসিকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে চারদিকে ভালভাবে তাকাল হরি পরসাদ। উদ্দেশ্য পালাবার রাস্তা খোঁজা। হঠাৎ লুসি চিৎকার করতে লাগল । হরিপরসাদের নজর এল মঠের ফেন্সিংয়ের ঠিক বাইরে নিচে একদল হরিণ দাঁড়িয়ে, ওদের একজনের পা বরফে ঢুকে গেছে। সম্ভবতঃ ওদিকে একটা নালা আছে, নালার জল জমে বরফ হয়ে গেছে, হরিণগুলো এই বরফের ওপর দিয়েই নালা পার হয়ে যায়, কিন্তু হয়তো কোথাও জল সেভাবে জমেনি সেই ফাঁকে হরিণের পা আটকে গেছে।
রগ্যাপা লামা মঠের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কারুকে ডাকল। দু’জন লামা মঠের ভিতর থেকে বেরিয়ে ফেন্সিংয়ের দিকে হনহন করে হেঁটে গেল। পিছনে পিছনে লুসিও হরিপরসাদের হাতে ধরা লিশ টানতে টানতে চলল ফেন্সের দিকে। লামা দু’জন ফেন্সের দরজার তালা খুলে বেরিয়ে গেল। হরিপরসাদ বেরোতে যেতেই পিছন থেকে রগ্যাপা লামা চেঁচিয়ে বলল— ’নো’। রগ্যাপা লামা তাড়াতাড়ি হেঁটে ফেন্সের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। হরিপরসাদ বুঝল এরা ওকে এই তারকাঁটার চৌহদ্দির বাইরে যেতে দেবে না।
বাইরে লামা দু’জন বরফে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে এগোতে লাগল হরিণগুলোর দিকে। হরিপরসাদ জানে শীতে হরিণগুলোর অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়, পাহাড়ে সব গুল্ম, পাতা বরফে ঢেকে যাওয়ায় ওরা দলে দলে নিচে সমতলে নেমে আসে। তখন হাইওয়েতে আচমকা রাস্তা পার হওয়ার সময় ছুটন্ত গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে অ্যাকসিডেন্টে অনেকে প্রাণ হারায়। তাই নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্নমেন্ট থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের কাছাকাছি সময় থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হরিণ শিকারের লাইসেন্স দেয়। এই হরিণগুলোও খাবারের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে বোধহয় এদিকে চলে এসেছে।
লামা দু’জন সাবধানে নালার ধার থেকে হরিণটাকে টেনে তুলল। হরিণটা মাটিতে পা রেখে খোঁড়াতে লাগল, কিন্তু দু’পা যেতে না যেতেই পা মুড়ে বরফের ওপর বসে পড়ল। হরিপরসাদ বুঝল হরিণটার পা ভেঙেছে। লামা দু’জন এবার হরিণটাকে পাঁজাকোলা করে তারকাঁটার ভিতর নিয়ে এল।
‘পা ভেঙেছে,’ হরিপরসাদ হরিণটার চোখে যন্ত্রণা দেখতে পেল।
‘এরকম অনেক হয়, আমরা প্লাস্টার করে দেব ওর পা, আমাদের এখানে কিছুদিন থাকবে তারপর আবার ছেড়ে দেব।’
লামারা হরিণটাকে নিয়ে মঠে ঢুকে মঠের পশ্চিম দিকের হলওয়ে দিয়ে চলতে লাগল। লুসি চেঁচাচ্ছিল, হরিপরসাদ তাড়াতাড়ি লুসিকে খাঁচায় ঢুকিয়ে ওদের পিছন পিছন চলল। হলওয়ের শেষে একটা মেডিকেল ইউনিট। লামাদের সঙ্গে ভিতরে ঢুকল হরিপরসাদ, ঠিক মনে হচ্ছে একটা মডার্ন হাসপাতালে ঢুকেছে। ভিতরে অনেকগুলো কামরা। একটাতে লেখা ICU, পাশের কামরায় অপারেশন থিয়েটার, তার পাশে ইমারজেন্সি লেখা কামরাটাতে হরিণটাকে নিয়ে তিনজন ঢুকে গেল।
হরিপরসাদ ওর রুমে ফিরে এল, সঙ্গে রগ্যাপা লামা। বাথরুমে ক্লজেটে নতুন এক সেট চীবর রাখা, ঘরে জলচৌকিতে প্রাতরাশ রাখা। চটপট তৈরি হয়ে প্রাতরাশ সারতে সারতে মনের ভিতর উত্তেজনা অনুভব করল হরিপরসাদ। আজ থেকে ওর কাজ শুরু। কী কাজ কে জানে? পারলে এক লাখ ডলার। উঃ, ভাবা যায় না, পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে থাকবে। মনে এক মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। এক অদ্ভুত ভাল লাগা, আর তার সঙ্গে ভয়।
প্রাতরাশের পর রগ্যাপা লামা এবার মঠের মন্দিরের পাশের সিঁড়ি দিয়ে হরিপরসাদকে উপরে একটা ঘরে নিয়ে এল।
‘এখানে অপেক্ষা করো। রিনপোচে উপাসনা শেষ হলেই আসবেন, ‘হরিপরসাদকে বসিয়ে রেখে চলে গেল রগ্যাপা লামা। হরিপরসাদ অপেক্ষা করতে লাগল রিনপোচের জন্যে। ঘরের চারপাশে কাঁচের জানলা। অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টিপাত করা যায়। এই মঠ একটা পাহাড়ের উপরে। সামনে পাহাড়ের নিচ থেকে একটা গাড়ির রাস্তা এঁকে বেঁকে পাহাড়ের উপরে মঠে উঠে এসেছে। ফোর ডাইমেনশনাল জিগস! থ্রি ডাইমেনশনাল জিগস বলতে হরিপরসাদ লেজি বার্ডের ফুলদানি জোড়া লাগানো ছাড়া আগে যা কিছু করেছে তা হল রুবিক কিউব। এবং তখন বুঝেছে যে শুধু আন্দাজে বা ট্যালেন্ট ধুয়ে থ্রি ডাইমেনশনাল জিগস সলভ করা যায় না। ম্যাথমেটিকালি আর সিকোয়েন্সিয়ালি ভাবতে হবে। বারো বছরের স্কুলের বাচ্চা প্যাট্রিক বসসার্টের অ্যালগরিদম স্টেপস সেটা গোটা পৃথিবীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। হরিপরসাদ হাই স্পিডে রুবিক কিউব সলভ করতে পারে যা দেখে লোকে ওকে ট্যালেন্টেড বলে, কিন্তু ও যেটা করেছে সেটা হল বারবার প্র্যাকটিস করে সিক্রেট অ্যালগরিদম মুখস্ত করে ফেলেছে। গত বছর নিউ জার্সি জিগস কনটেস্টে গিয়ে থ্রি ডি জিগস সম্বন্ধে একটা নতুন কথা শুনেছিল হরিপরসাদ। কোন একটা কোম্পানী নাকি একটা সফটওয়্যার আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে থ্রি ডি জিগস টুসকি মেরে সলভ করে দেওয়া যাবে। সেই কোম্পানী নাকি ভার্চুয়্যালি অস্ট্রিচের ভাঙা ডিমের খোলাকে জুড়ে দেখিয়েছে। এখন সেই থিয়োরি প্রয়োগ করে ওরা রিয়েল ওয়ার্ল্ডে অস্ট্রিচের ভাঙা ডিমের খোলাকে জোড়ার কাজেও আশাতীত সাফল্য পেয়েছে। খুবই মর্মাহত হয়েছিল হরিপরসাদ, ওতে তো জিগস’র আনন্দটাই চলে যাবে। জিগস কমপিটিশনে যে নাম-খ্যাতি হয়েছে সব লোপাট করে দেবে ওই সফটওয়্যার। কিন্তু এখন যদি সফটওয়্যারটা এখানে পেত সে!
গতকাল রাতে রগ্যাপা লামাটাকে সে তরমুজের ফালি খাইয়েছে। এখানে নিয়ম কানুন খুব স্ট্রীষ্ট— সদ্ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী দুপুর বারোটা বেজে গেলে এখানকার আবাসিকদের লিক্যুইড ছাড়া আর কিচ্ছু খেতে দেওয়া হয় না। হরিপরসাদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল। রগ্যাপা লামাটা ওর লেফট ওভার তরমুজের ফালিটার দিকে যেভাবে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তাতে হরিপরসাদ হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর যে রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে ব্যাটা ওই তরমুজে কামড় লাগাবে। আজ পালাবার রাস্তাটা খুঁজে বের করতেই হবে। হাই ভোল্টেজ তারকাঁটা ডিঙানো অসম্ভব। কিন্তু এই প্রহরার মধ্যে মেন সুইচ বক্সে গিয়ে হাতল নামানোও প্রায় অসম্ভব কাজই। নানা অপশন খুঁজে বেরাচ্ছিল হরিপরসাদের ব্রেন।
দরজা খুলে গেল, রিনপোচে লামা প্রবেশ করল— ‘আজ শরীর কেমন?’
‘পাউডারটা নেওয়ার পর থেকে নর্মাল ফিল করছিলাম,’ হরিপরসাদ নির্লিপ্ত মুখে বলল।
‘গুড,’ রিনপোচে লামা বলল। ‘আজকের দিনটা তোমার খুব শুভ হবে।’
‘যেদিন বাড়ি ফিরে যাব সেদিনের আগে কোনোদিনই শুভ নয়।’
‘ভগবান তোমার উপহার গ্রহণ করেছেন,’ রিনপোচে চীবরের মধ্য থেকে একটা দোমড়ানো কাগজ বের করল। উনি তোমাকে ইশ্বরের আশীর্বাদী ফুল পাঠিয়েছেন যাতে তোমার মনস্কামনা পূর্ণ হয়।’
হরিপরসাদ দোমড়ানো কাগজটা খুলতেই নাকের সামনে ফুলের সুগন্ধ। ভিতরে কয়েকটা গাঁদা ফুল। কাগজে কিছু লেখা। হরিপরসাদ জানে এই রিনপোচে লোকটা নিশ্চয়ই এই দোমড়ানো কাগজ খুলে দেখেছে ভিতরে কী আছে এবং তখন নিশ্চয়ই পড়েছে। কাগজটা পুরো খুলে দেখল হরি পরসাদ। কাগজে মঞ্জুশ্রী লামা উপহার স্বীকার করে লিখেছেন—
HE GENEROUS
‘এই ফটোটা ওঁর ওয়ালেটে রাখা ছিল, তুমি ভাগ্যবান।’ রিনপোচে একটা কাগজের ওয়ালেট সাইজ ফটো বের করল। কোনও এক দেবতার ছোট ফটো। দেবতার মূর্তির দিকে ভালভাবে তাকিয়ে দেখল। দেবতা এক হাতে বজ্র নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আকাশের কোনও শত্রুর থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করছেন। রিনপোচে ফটোর পিছনে লেখাটা পড়ল— ইন্দ্র।
‘ওঁর ওয়ালেটে কয়েকজন দেব-দেবীর ফটো থাকে। তার থেকে উনি এই ফটোটা বের করে দিয়েছেন,’ রিনপোচে বলল৷
ফটোর পিছনের সাদা দিকটা হলদেটে হয়ে গেছে। সেখানে লেখা-

এবার রিনপোচে লামা হরিপরসাদকে বুঝিয়ে দিল, ‘ইন্দ্র একজন দেবতা। বজ্রবিদ্যুৎ ও বৃষ্টি হল এঁর অস্ত্র। মঞ্জুশ্রী লামা তাই বোঝাচ্ছেন। এবার শুরু করা যাক, আমাদের অনেক কাজ বাকি আছে।’
ফটোটা চীবরে ঢুকিয়ে রাখল হরি পরসাদ। মঞ্জুশ্রী লামা নিশ্চয়ই সাংকেতিক কিছু লিখে পাঠিয়েছেন। পালাবার পথ? দেবতার নাম ইন্দ্র। শুধু একজনের নাম। নামের মধ্যে আর কী সংকেত লোকানো থাকতে পারে? কিন্তু ওই লামা অসম্ভব বুদ্ধিমান। এবার পরের তিনটে লাইন ভালভাবে দেখতে লাগল হরিপরসাদ।
নাঃ, বোঝা যাচ্ছে না। GOD কে উলটে-পালটে DOG করা যায়। THUNDER থেকে D সরিয়ে HUNTER – মাথা কাজ করছে না।
‘এবার তাহলে কাজ শুরু করা যাক?’ রিনপোচে বলল।
‘লেটস নেইল ইট,’ হরিপরসাদ ফটোটা আর চীবরের পকেট থেকে বের করল না। বার বার দেখলে রিনপোচে সন্দেহ করবে। কিন্তু মনে মনে শব্দটাকে কাটাছেঁড়া শুরু করল হরিপরসাদ— INDRA। ওর অজান্তে প্রলিফিক ব্রেন ক্যাসিনোর স্লট মেশিনের মত কলকল করে অজস্র সম্ভাবনা ছড়াতে লাগল। মগজ অ্যালগরিদম কষতে লাগল, হঠাৎ মাথার ভিতরে স্লট মেশিন পিং করে থামল — বিংগো—
INDRA — DRAIN
এটা কি মঞ্জুশ্রী লামার মগজ প্রসূত? নাকি পাওয়ারবল লটারির মত একটা রাণ্ডম নম্বর লেগে যাওয়া?
রিনপোচে গেঁজের থেকে চাবি বের করে ঘরের কোণে রাখা বিশাল চেস্টটা খুলল। ‘এদিকে এসো।’
হরিপরসাদ এগিয়ে গেল। চেস্টের ভিতর বড়মাপের অলংকৃৎ কফিনের মত দেখতে বাক্স। লামা সেই বাক্স খুলল, বাক্সের ভিতর অনেকগুলো নানা আকারের কাঁচের বাক্স, গায়ে নামাঙ্কিত কিছু কিছু লেখা। লামা একটা কাঁচের বাক্স খুলল, তারমধ্যে কিছু হাড় — কিছু আধপোড়া, কিছু পুড়ে কালো হয়ে গেছে। নানা সাইজের হাড়।
‘এগুলো হাড় মনে হচ্ছে?’ হরিপরসাদ জিজ্ঞাসা করল।
‘বুদ্ধের চিতার হাড়।’
‘মানে?’
‘কাল যে তোমায় বললাম বুদ্ধের চিতার হাড় নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেছিল।’ লামা একটা বাক্স খুলল। ‘এই যে দাঁত দেখছ, এটা সত্য সত্যই বুদ্ধের দাঁত,’ রিনপোচে লামা আরেকটা বাক্স খুলল। ‘এটা পাকিস্তানে তক্ষশীলার ধম্মরাজিকা স্তূপ থেকে পাওয়া, এটা ইণ্ডিয়ার বৈশালীর লিচ্ছবীদের স্তূপ থেকে পাওয়া বুদ্ধের বুকের পাঁজরের হাড়।’
‘এই পোড়া হাড় দেখে কীভাবে বুঝলেন বুকের পাঁজরের হাড়?’
লামা হাসল— ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং।’
হরিপরসাদের হতবাক চোখ দেখে লামা বলল, ‘ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন অব বোন আজকের খুব পপুলার ক্রিমিনোলজি সায়েন্স।’
‘অত জ্ঞান নেই,’ হরিপরসাদ বলল।
‘আগুনে পুড়লে হাড়ের শ্রিঙ্কেজ হয় কারণ কোলাজেন হ্রাস পায়—’
‘ওকে স্টপ। আই ট্রাস্ট ইয়ু,’ হরি পরসাদ বলল। অত বায়োলজি না বুঝলেও এটুকু জানি যে হাড় ছাই হয়ে যায়। কিন্তু, এই সব হাড়ের পিস দেখে বুঝবেন কিভাবে যে কোন টুকরো বুদ্ধের শরীরের কোন অংশে ছিল?’
‘রাজা অশোক হাড়গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়ায় আমাদের পক্ষে বোঝা মুশকিল হয়ে গেছিল যে কোন হাড় বুদ্ধের শরীরের কোন অংশের। তাই আমরা একটা উপায় আবিষ্কার করি।’
‘কী উপায়?’
রিনপোচে লামা বলল, ‘মহাপরিনিব্বানসুত্তং বইতে বুদ্ধকে কীভাবে পোড়ানো হয়েছিল সেই বর্ণনা আছে। বুদ্ধের মৃত্যুর কিছুদিন আগেই শিষ্য আনন্দ শুরু বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে বুদ্ধের মৃত্যুর পর বুদ্ধকে কিরকম ভাবে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া করা উচিত। বুদ্ধ বলেছিলেন একজন রাজার মত। আনন্দ বলেছিল সে কীরকম? বুদ্ধ বলেছিলেন— রাজার শরীর বস্ত্র দিয়ে ভাল ভাবে জড়িয়ে তাকে তৈলাধারে নিমজ্জিত করা হয় যাতে দ্রুত পচন রোধ করা যায়। বুদ্ধের শরীরকেও সেভাবে তৈলে নিমজ্জিত করে রাখা উচিত।’
‘তারপর?’
‘বুদ্ধ বলেছিলেন তারপর তাকে যেন চন্দনকাঠের চিতায় প্রজ্জ্বলিত করা হয়। বুদ্ধের মৃত্যুর পর আনন্দ বুদ্ধের দেহকে তেলে ডুবিয়ে রেখে চিতার আয়োজন করল। এই মহামানবের মৃত্যুর খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।’
‘এই ইনফরমেশন কিভাবে কাজে এল?’
‘আমরা একটা শবকে একই রকম ভাবে তুলো দিয়ে মুড়ে আবার তার ওপর কাপড় দিয়ে মুড়ে দিয়ে একটা মেটালিক ভেসেলে তেলের ভিতর ডুবিয়ে রাখি সাত দিন।’
হরিপরসাদের মনে হল মস্তিষ্কে একটু উইড ঢুকলে শান্তি পেত।
‘তারপর চিতা জ্বালানো হলে, ত্বক, মাংস জ্বলে গেলে আমরা চিতার হাড়গুলো সাবধানে বের করে এনে লেবেল করি, দেখি শরীরের কোন অংশের হাড় কেমন দেখতে। তারপর বুদ্ধের চিতার হাড়গুলো মিলিয়ে মিলিয়ে দেখি কোন অংশের সঙ্গে কোন হাড় মেলে। তারপর থেকে আমরা স্থির করি যে ওটা বুদ্ধের শরীরের কোন অংশের হাড়।’
‘কিন্তু আমি তো ফরেনসিক এক্সপার্ট না। আমি কীভাবে হেল্প করব?’
‘তোমাকে এই বর্তমানের হাড়ের টুকরোগুলো নিয়ে অতীতে যেতে হবে।’
‘মানে?’
‘পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধের শরীরের কঙ্কালের যেখান থেকে সেই হাড় এসেছে সেই লোকেশনে হাড়টা বর্তমানের কঙ্কালের গায়ে বসাতে হবে।’
‘এত ছোট ছোট হাড় দিয়ে?’
‘পারবে না?’ রিনপোচের চোখের চাহনীতে উদ্বেগ। হরিপরসাদ সতর্ক হল। একটা হাড়ের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘ম্মুখ সার্ফেস হলে কাজটা সহজ হত, কিন্তু এটাও ফিজিবল। অ্যালগরিদমটা ধরতে একটু সময় লাগবে এই যা।’ একটু টেকনিক্যাল জার্গন ইউজ করল হরিপরসাদ যার মানেটা সেও ঠিকঠাক জানে না।
‘গুড,’ রিনপোচে খুশি হল।
‘কিন্তু এসব তো প্রত্নতত্ত্ব! এখানে কীভাবে এল?’
‘আমি সব কিনে কিনে একত্রিত করেছি।’
কিনেছেন? এগুলো বিক্রি বা কেনা তো বেআইনি!’
‘আইন মানুষের সৃষ্টি। এ হাড় ভগবানের। ভগবান স্থির করে গেছেন এই হাড়ের ভবিষ্যৎ।’
হরিপরসাদ নিশ্চিত এ বদ্ধ উন্মাদ। আজ রাতে সে যে ভাবেই হোক পালাবে। ওর ব্রেন অঙ্ক কষছিল এই নরক থেকে পালাবার রাস্তাটা কোথায়?
হরিপরসাদ চিন্তিত মুখে বলল, ‘এই কাজ দিন রাত এক করে করতে হবে। মাথার ভিতর এখন অন্য কিছুর স্থান রাখলে এই জটিল জিগস সলভ করা সম্ভব হবে না।’
‘ঠিক,’ রিনপোচে খুশি হল। ‘কী চাও তুমি?’
‘টোয়েন্ট ফোর আওয়ার অ্যাকসেস। রাতে ঘুমের মধ্যে সলিউশন মাথায় চলে আসে, তখন ছুটে এসে পিস না জুড়লে সেই চিন্তাটা হারিয়ে যাবে—’
‘ঠিক আছে, তাই হবে।’
‘আমার কামরায় যেন বাইরে থেকে ছিটকিনি দেওয়া না থাকে।’
‘আজ থেকে থাকবেনা। কেউ তোমায় আটকাবে না। শুধু আবার সাবধান বাণী, রাতে ভুলেও ওই ইলেকট্রিক ফেন্সের ধারেকাছে যেও না।’
‘না আমি যাব না, থ্যাঙ্কস!’
কিছুক্ষণ হাড় ঘাটাঘাটি করে আড়মোড়া ভাঙল হরিপরসাদ— ‘টি ব্রেক।’ রিনপোচে পাশে বসে পুঁথি পড়ছিল কোনও উত্তর দিল না। বেরিয়ে এল হরি পরসাদ। মন্দিরের বাইরে আসন পেতে বসে হাতে রুদ্রাক্ষের মালা ঘোরাচ্ছিল রগ্যাপা লামা, হরিপরসাদকে দেখে উঠে দাঁড়াল সে।
‘তোমাদের রিনপোচে দিনরাত এত কী পড়ে?’
‘উনি খুব পণ্ডিত মানুষ, ওঁর অনেক আধ্যাত্মিক শক্তি আছে।’
‘আধ্যাত্মিক শক্তি?’
‘উনি মরা মানুষকে বাঁচাতে পারেন।’
‘আচ্ছা!’ হরিপরসাদের মনে হল এ ব্যাটাও শিওর গাঁজা খায়। ভুলভাল বকছে। হরিপরসাদ বলল। ‘এসব গপ্পো আমি বিশ্বাস করি না।’
‘গপ্পো? মঞ্জুশ্রী লামার মৃতদেহে উনি প্রাণপ্রতিষ্ঠা করলেন এটা আমি নিজের চোখে দেখেছি।’
‘নিজের চোখে দেখেছ?’ হরিপরসাদের অবিশ্বাসী দৃষ্টি।
লামা দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকাল— ‘অনেক রাতে এক মৃতদেহ এল মঠে। রাতেই সৎকার করতে হবে। ওয়াটার বারিয়াল। মৃতদেহের মাংসের টুকরো শকুনের পরিবর্তে মাছকে খেতে দেওয়া হবে। যারা এনেছিল তাদের খুব তাড়া ছিল মনে হল। কফিনে মড়াটাকে রিনপোচের জিম্মায় রেখে চলে গেল। গভীর রাতে আমার ডাক পড়ল। আমি ছুরি শানিয়ে মাখন প্রদীপ, ধুপ জ্বালিয়ে ঝাটরের প্রার্থনা শুরু করলাম। কফিন খুলে রিনপোচে কিন্তু মৃতদেহের মুখ দেখেই বললেন— ‘অসম্ভব!’ রিনপোচে নাকি স্বপ্নে দেখেছিলেন মঞ্জুশ্রী লামার এই মুখের।’
‘তারপর?’
‘তারপর এক অদ্ভুত কাণ্ড হল। রিনপোচে মন্ত্র পড়তে পড়তে মড়ার শরীর ধরতেই ওর হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করে উঠল, মড়া শ্বাস নিতে লাগল। মড়ার পুনর্জন্ম হল৷
‘সত্যি?’
‘মঞ্জুশ্রী লামাকে রিনপোচে তুষিত স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছেন মানবকল্যাণের জন্য।’
‘আচ্ছা? তাহলে যে ছেলেটা পালাতে গিয়ে মরল তাকে কেন বাঁচিয়ে দিল না তোমাদের রিনপোচে?’ হরিপরসাদ হাই তুলল। ‘তাহলে আমি বেঁচে যেতাম।’
৷৷ একুশ ৷৷
পার্কিং লটে ‘রিচমণ্ড হিলস গেজেট’ লেখা একটা ভ্যানের পাশে গাড়ি পার্ক করল সুনয়ন। অফিস বিল্ডিঙের হতশ্রী চেহারা দেখে রিধিমা মনে মনে বেশ দমে গেল৷ যাদের নিজেদের অফিস বিল্ডিঙের এই দশা তারা তাকে কী সাহায্য করবে!
পার্কিং লটটার একদিক দায়সারা ভাবে কাজ চালিয়ে নেবার মত করে বরফ পরিষ্কার করা হয়েছে, অন্যদিকে বরফ ডাই হয়ে জমে৷
‘সাবধানে,’ সুনয়ন বিল্ডিঙের সদর দরজার হাতলে চাপ মারতেই দরজা কঁকিয়ে উঠল। সামনে লিফটের সামনে ‘আউট অফ অর্ডার’ বোর্ড ঝোলানো। পাশে সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়িতে হিট নেই। সিঁড়ির রেলিঙের লোহা বেরিয়ে পড়েছে, সিলিঙের ভারি ভারি বিমের পাশের পলস্তরা খাসা। গোটা বিল্ডিংটা অ্যাকিউট অস্টিওপোরোসিসে কাবু বৃদ্ধার মত ধুঁকছে। দু’জনে তিনতলায় উঠে এল। তিনতলায় বড় একটা নিউজরুম, অনেকগুলো ডেস্ক, কিন্তু গোটা নিউজরুম খালি।
নিউজরুমের কোনায় একটা কাঁচের দেওয়াল ঘেরা কামরা, সুনয়ন এগিয়ে গিয়ে দরজা নক করল।
‘কাম ইন,’ একজন মহিলার কর্কশ গলা।
সুনয়নের সঙ্গে রিধিমা দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। মুখোমুখি চেয়ারে বসে একজন মোটা কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। পিছনের তাকে অনেক ট্রফি, প্ল্যাক, পত্রিকার উজ্জ্বল দিনের অনেকগুলো গ্রুপফটো— ডেস্কের কোনায় ডেস্কটপের মনিটর, ডেস্কে অনেক কাগজ অগোছাল ভাবে সাজানো।
‘ইনি ট্রেসি ডেভিস,’ সুনয়ন রিধিমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।
‘বসুন,’ ট্রেসি বলল।
সুনয়ন খোলা দরজাটা বন্ধ করে রিধিমার পাশে এসে বসল।
‘আপনার সঙ্গে যা হয়েছে সেটা খুব স্যাড। আমাদের সহানুভূতি আছে,’ ট্রেসি মাউসটাকে চওড়া হাতের নিচে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল। ‘আনফরচুনেটলি, আমাদের নিউজপেপার একটা লোকাল র্যাগ। লোকাল কাউন্টির কোন অফিসিয়াল সেক্স স্ক্যামে জড়িয়ে, কে করাপশনে ধরা পড়েছে, লোকাল হাইস্কুলে ছাত্রের লকারে ফিলি ব্লান্টে রোল করা মেরোয়ানা পাওয়া গেছে এসব খবরই এসব নিউজপেপারগুলোতে বেশি চলে।’
রিধিমা চুপ করে রইল। ট্রেসি এবার মাউস ছেড়ে সেলফোনে স্ক্রল করতে লাগল, রিধিমা বুঝতে পারছে ও খুঁজছে কাকে কন্ট্যাক্ট করা যায়। সেলফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়ে ট্রেসি বলল, ‘এখানকার লোকেরা বস্টনে তিনজন প্রফেসর খুন হয়েছে তার খবরে এতটুকু ইন্টারেস্টেড না।’
কিন্তু খবরটা কাগজে সার্কুলেট করতে পারলে হয়তো—’ দ্বিধাগ্রস্ত গলায় রিধিমা বলল।
মুখে একটা ক্ল্যাক করে তাচ্ছিল্যের আওয়াজ করল এডিটর। চোখ ফোনের স্ক্রিনে ‘আমাদের কাগজের যা সার্কুলেশন তার চেয়ে আমার ফেসবুক পেজের বেশি সার্কুলেশন। কেউ পড়ে না এসব। এমনিতেই তো সোস্যাল মিডিয়াগুলোর দাপটে গত পনের বছরে ষাটটা ডেইলি নিউজপেপার আর সতেরশ উইকলি বন্ধ হয়ে গেছে।’ ট্রেসি রিধিমার মুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনের প্রশ্নটা পড়ে ফেলল— ‘ভাবছেন তাহলে আমরা কীভাবে টিকে আছি তাই তো?’
রিধিমা ঠিক এই কথাটাই ভাবছিল, কিন্তু স্বীকার করতে লজ্জা পেল।
‘নামী নিউজ এজেন্সিগুলো লো-লেভেল ইনভেস্টিগেশনের জন্য আমাদের হায়ার করে। এটাই আমাদের কাগজের মেন সোর্স অব রেভিনিউ। কিন্তু US নিউজ এজেন্সিগুলোতেও প্রিন্ট সার্কুলেশন এত কমে গেছে যে আমাদের এই পার্ট-টাইম ইনকামও অ্যাবরাপ্ট ফল করছে। আমাদের এই অফিস বিল্ডিংটা দেখছেন,’ এডিটর দু’হাত মাথা তুলে সিলিং দেখাল। ‘র্যাটহোল! দেড়শ বছরের পুরোনো, মোল্ড লেগেছে, অথরিটি বলেছে খালি করতে, আমাদের কাছে বিল্ডিং রিপেয়ারের পয়সা নেই, আমরা রিপোর্টারদের বলেছি ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে। অর্ধেক স্ট্যাফকে লে-অফ করতে বাধ্য হয়েছি। নিজের চোখেই তো দেখলেন বাইরে কতগুলো ডেস্ক। এক সময় এই নিউজরুম গমগম করত। এখন—’ ট্রেসি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ‘ওসব বুদ্ধ-টুদ্ধ রিলেটেড কনফিউসিং হাই-ফাণ্ডা স্টোরি ছাপলে আমাদের রিডারশিপ স্লাইড করে নেমে যাবে। কাগজ দু’দিনে বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘তাহলে?’
‘আপনাকে অন্য পথে হেল্প করতে হবে। কাকে ধরি সেটাই খুঁজছি।’
রিধিমা নিরাশ হয়ে বলল, ‘কেউ কি নেই আমাকে হেল্প করবে?’
‘আপনার কেসটা ভীষণ কমপ্লিকেটেড। পুলিশে খবর দিতেও ভরসা পাচ্ছি না। অতগুলো মার্ডারের জন্য আপনাকে পুলিশ সন্দেহ করছে! জানতে পারলে আপনাকে তো অ্যারেস্ট করবেই, আমাকেও ছেড়ে দেবে না।’
‘ট্রেসি, ব্রায়ান কি হেল্প করতে পারে?’ সুনয়ন বলল।
‘হু? দ্যাট এয়ারহেড কপ?’ ট্রেসির চোখে মুখে বিরক্তি। ‘ওর সাসপেনশন পিরিয়ড শেষ হয়েছে?’
‘জয়েন করেছে কাজে,’ সুনয়ন বলল। ‘এখন হাইপার অ্যাকটিভ হয়ে আছে, নিজের বদনাম ঘোচাবার জন্য উঠে পড়ে লেগে আছে শুনেছি। ও হয়তো রিস্ক নিতে পারে।’
সুনয়ন বলছিল ফেক পুলিশ NYPD’র গাড়িতে আপনাকে তুলে নিয়ে গেছিল, তাই না?’ ট্রেসি রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল।
‘হ্যাঁ,’ রিধিমা বলল।
‘আপনি জানেন কোথায় ওদের ডেন?’
‘হ্যাঁ, জানি, ১০ ইণ্ডাস্ট্রিয়াল স্টোরেজ প্লেস, সানসেট পার্ক, ব্রুকলীন, নিউ ইয়র্ক।’
ট্রেসি এক মুহূর্ত ভেবে বলল, ‘আপনি শিওর তো?’
‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট।’
‘ওকে, ট্রেসি রিধিমাকে বলল। ‘লেটস গেট ব্রায়ান হিয়ার।’ ট্রেসি সেলফোনে স্পিড ডায়াল করল, ‘হ্যালো ব্রায়ান, ট্রেসি বলছি।’
‘হু? দ্য হুইসিল ব্লোয়ার?’ স্পিকার ফোনে ব্রায়ানের গলা।
‘বাজে কথা রাখো, গট সাম বিগ ডিল পুলিশ শিট—’
‘হোয়াট?’
‘তোমাদের পুলিশের কয়েকটা হট স্টোলো উদ্ধার করতে চাও? RP উইথ মি ।’
‘কয়েকটা! আর ইউ কিডিং?’
‘আমি সিরিয়াস ব্রায়ান। যদি তুমি ইন্টারেস্টেড না থাকো তবে—’
‘না না, এক্ষুনি আসছি।’
দশ মিনিটের মধ্যে একটা বয়স্ক গুঁফো পুলিশ ট্রেসির অফিসের দরজায় হাজির। রিধিমাকে দেখে পুলিশটা চোখ কুঁচকে কিছু মনে করার চেষ্টা করল।
‘একে তুমি আমার এখানে দেখনি, ট্রেসি বলল। ইন ফ্যাক্ট, এই মেয়ে আমার অফিসে আসেই নি। একে পুলিশ চারটে মার্ডারের জন্য সন্দেহ করছে।’
‘হার্ভার্ড—?’
‘ঠিক। একে আমরা পরে হ্যাণ্ডেল করব। আগে এর গল্প শোন।’
রিধিমা আবার গতকালের সমস্ত ঘটনা বলল ইণ্ডিয়ান কনসুলেট থেকে পুলিশের গাড়িতে যাওয়ার থেকে সানসেট পার্কে হোবোদের হত্যা পর্যন্ত।
‘গ্যারাজের ঠিকানাটা কী?’
‘১০ ইণ্ডাস্ট্রিয়াল স্টোরেজ প্লেস, সানসেট পার্ক, ব্রুকলীন।’
‘থ্রি স্টোলোস,’ ট্রেসি বলল।
‘কিন্তু পুলিশের গাড়িও চুরি হয়?’ রিধিমা বলল৷
‘NYPD’র ন’হাজার গাড়ি। হিসেব রাখা বেশ শক্ত কাজ, ব্রায়ান বলল। ‘কিন্তু আপনি কি শিওর গাড়িতে NYPD লেখা ছিল?’
‘হ্যাঁ। ওই গ্যারাজের মধ্যে অন্ততঃ তিনটে NYPD লেখা পুলিশের গাড়ি ছিল।’
‘কী হয়ে গেছে দিনকাল, ট্রেসি?’ ব্রায়ান অবিশ্বাসে মাথা নাড়ল। ‘কখনো পুলিশের বন্দুক চুরি করছে, কখনো পুলিশের গাড়ি চুরি করছে!’ তারপর রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাবতে পারেন? রাত একটায় ডিউটি শেষ করে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরি, আমার দোষ কী? সেদিন আমার সবকিছু আমার টোয়োটার ট্রাঙ্কে রেখে গেছিলাম। সকালে নিচে এসে দেখি— আমার সার্ভিস ওয়েপন? ভ্যানিশ! রেডিও? ভ্যানিশ! অ্যাম্মো? ভ্যানিশ! আমার ভেস্ট, হ্যাণ্ডকাফ, ডিউটিবেল্ট সব চেঁচেপুছে নিয়ে গেছে চোর! ভাবতে পারা যায়? গ্লাভ বক্স খোলা— আমার স্মিথ ওয়েসসন, তিনটে ম্যাগাজিন, মোট ছেচল্লিশটা কাজি, একটা কোল্যান্সিবল ব্যাটন, পেপার স্প্রে— এভরিথিং জ্যাকড আপ! আজ আমি ওদের অ্যায়সি কি ত্যায়সি না করে ছেড়েছি তো আমার নামও ব্রায়ান স্পেনসার না।’ পুলিশ অফিসার এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে সেলফোনে ওর ইউনিটে ফোন লাগাল আর পায়চারি করতে করতে কথা শেষ করল, ‘১০, ইণ্ডাস্ট্রিয়াল স্টোরেজ প্লেস, সানসেট পার্ক, ব্রুকলীন। কোড ওয়ান টু এইট।’ তারপর রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ দেখাব আমি এয়ারহেড কিনা, আমার দশ দিনের ভেকেশন রিভোক করে নিয়েছিল আর সঙ্গে উইদআউট পে সাসপেনশন ফর আ মান্থ!’ ব্রায়ান আর বসল না, ‘ইটস টাইম টু টুল আপ অ্যাণ্ড ড্রপ সাম পাঙ্কস। ট্রেসি, থ্যাঙ্কস ফর দ্য লিড।’
ব্রায়ান বেরিয়ে যেতেই ট্রেসি উত্তেজিত গলায় বলল, ‘সুনয়ন, আমাদের রিচমণ্ড গেজেটের ভ্যানে ক্যামেরা লোড কর। এই অ্যাকশনের কভারেজ চাই। এটা একটা ব্রেকিং নিউজ হবে। ভাল দাম উঠবে।’ দু’হাতে টেবিল থাবড়ে ট্রেসি উঠে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণের মধ্যে রিচমণ্ড গেজেটের ভ্যান ব্রুকলীনের দিকে ছুটে চলল। ‘কোড ওয়ান-টু-এইট মানে কী?’ রিধিমা জিজ্ঞাসা করল।
তুমি শিওর তো? আমার মান-সম্মান জড়িয়ে আছে,’ ট্রেসির ভিতরের চাপা উত্তেজনা ওর মুখে ফুটে বেরিয়ে আসছে। ‘ওয়ান-টু-এইট মানে নো সাইরেন, নো ফ্ল্যাশিং।
কেনেডি এয়ারপোর্টকে বাঁদিকে রেখে গাড়ি বেল্ট পার্কওয়ে দিয়ে ছুটে চলল কুইনস থেকে ব্রুকলীনের দিকে। I-278 দিয়ে গেলে তিন মাইল শর্টকাট হত, কিন্তু এখন এয়ারপোর্ট আবার খুলে যাওয়ায় ওপথে ট্রাফিক জ্যামে ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তাই সুনয়ন বেল্ট পার্কওয়ে ধরল।
চল্লিশ মিনিটের মধ্যে রিচমণ্ড গেজেটের ভ্যান ব্রুকলীন মেরিন টার্মিনালের কাছে পৌঁছে গেল। জায়গাটার একসময় রমরমা ছিল, কিন্তু এখন পরিত্যক্ত। বুলডোজার দিয়ে কয়েকটা ওয়্যারহাউস ভাঙা হয়েছে। বড় বড় পাথর, মরচে ধরা তোবড়ানো লোহার বিম এক জায়গায় ডাঁই করা। তার ওপরে তুষারঝড়ের বরফের পাহাড়, ফাঁকে ফাঁকে লোহালক্কড় দেখা যাচ্ছে। দেওয়ালগুলোতে গ্রাফিটি আঁকা। ইনার সিটিতে যে যখন পেরেছে দেওয়ালে অঙ্কন বিদ্যায় হাত পাকিয়ে গেছে। তিনটে পুলিশের গাড়ি দশ নম্বর ওয়্যারহাউসের সামনে দাঁড়িয়ে। বন্দুকধারী পুলিশেরা ওয়্যারহাউসটাকে ঘিরে ফেলেছে। প্রত্যেকের হাতের বন্দুকের সেফটি ল্যাচ খোলা, ওয়্যারহাউসের শাটার বন্ধ। মাথায় সকলের হেলমেট। সুনয়ন গাড়ি থামাতেই গুঁফো ব্রায়ান স্পেনসার বড় বড় পা ফেলে গাড়ির কাছে এল। ‘হাই ট্রেসি।’
‘না এসে পারলাম না। সব ঠিকমত হয়ে গেলে স্পটেই তোমার একটা ইন্টারভিউ নেব,’ ট্রেসির গলার স্বরে যথেষ্ট উত্তেজনা।
‘এটাই সেই ওয়্যারহাউস তো?’
ট্রেসি রিধিমার দিকে তাকাল। রিধিমা তাকিয়ে দেখল, প্রায় মুছে যাওয়া 10 লেখা বন্ধ শাটারে। রিধিমা বলল, ‘হ্যাঁ। আমি শিওর।’
‘ওকে, থ্যাঙ্কস। আপনি গাড়ি থেকে নামবেন না একদম। আমার কলিগরা যেন আপনাকে না দেখে।’ ব্রায়ান ওর দলে মিশে গেল।
‘সুনয়ন, ক্যামেরা অন করো, স্পটের যত কাছাকাছি যাওয়া যায় চল, ট্রেসির মুখে উত্তেজনা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
গুদামে ঢোকার শাটারের পাশের দরজাটা বন্ধ। একজন পুলিশ দরজাটা ঠেলল— লোহার দরজা খোলা অসম্ভব। একজন বসে শাটারটা উপরে তোলার— চেষ্টা করে বলল, ‘তালাটা মরচে ধরা।’
‘ব্রেক ইট!’ ব্রায়ান বলল।
একজন তালায় গুলি করল, তারপর শাটার উপরে উঠিয়ে দিল।
রিধিমার বুক ধকধক করছে, ভিতর থেকে যদি লোকগুলো গোলাগুলি চালায়! শাটার তুলে পুলিশগুলো বন্দুক উঁচিয়ে অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় ওয়্যারহাউসে ঢুকে গেল। গাড়ির ভিতর থেকে ওয়্যারহাউসের ভিতরটা দেখা যাচ্ছে না৷ ভিতরে কী হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না, কিছুক্ষণ সময় কাটল, এবার পুলিশরা সকলে বেরিয়ে এল বাইরে। একজন পুলিশ শাটারটা নামিয়ে দিল। এক এক করে ওরা যে যার পুলিশের গাড়ির দিকে অগ্রসর হল। ব্রায়ানের মুখ ঝুলে গেছে। একজন পুলিশ সার্জেন্ট চেঁচিয়ে বলল— ‘ব্লু ওয়াল অব সাইলেন্স। নো ওয়ান রিপোর্ট স অন আ কলিগস এরর।’
বাকিরা ‘রজার’ বলে গাড়িতে উঠে গেল। পুলিশের গাড়িগুলো বেরিয়ে গেল। ব্রায়ান এবার এগিয়ে এল রিচমণ্ড গেজেটের ভ্যানের কাছে। ট্রেসির কাছে এসে বলল— ‘ইন্টারভিউ নেবে বলেছিলে—’ তারপর রিধিমার দিকে তাকিয়ে ব্রায়ান বলল, ‘আপনি গাড়ির বাইরে আসুন, ওয়্যারহাউসের ভিতরে একবার চলুন।’
কৌতূহলে রিধিমার আর তর সইছে না। রিধিমা দ্রুতপদে গুদামের সামনে এসে পৌঁছাল।
কিন্তু একি?
এদের সে এ কোথায় এনেছে?
জায়গাটা ঠিক তো? রিধিমা চারদিকে তাকিয়ে দেখল। হ্যাঁ, একদম এই জায়গাটা, ল্যাম্পপোস্টের পাশেই। দশ নম্বরটা আবছা লেখা। কিন্তু ভিতরে?
গুদামের এমাথা থেকে ওমাথা দেখা যাচ্ছে। গুদাম শুধু যে খালি তা নয়, দেওয়ালে গ্রাফিটি আঁকা, বিমগুলো মরচে ধরা, মেঝে বা সিলিং বলে কিছু নেই, মেঝের ল্যামিনেশনের ভিতর থেকে ইঁদুর ছুটে বেরিয়ে গেল, ছাতের সিলিঙের ভেন্টিলেশন ডাক্ট জায়গায় জায়গায় ঝুলে পড়েছে। দেওয়ালের ইন্সুলেশনের সিট-রক জায়গায় জায়গায় কেউ যেন কেটে নিয়ে গেছে। ট্রেসি রিধিমার দিকে তাকাল, দু-চোখে হতাশা, রাগ।
রিধিমার নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না— ‘ওরা এখানেই ছিল! কালকে রাত্রেই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে,’ রিধিমা ট্রেসিকে বিশ্বাস করাবার চেষ্টায় জোর দিয়ে বলল। ‘আনবিলিভেবল! ট্রাস্ট মি!’
দেওয়ালের এক কোনায় বড়বড় করে গ্রাফিটি FS / $1 । রিধিমা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। রিধিমা দেওয়ালের কাছে পৌঁছে নাকে আঙুল চাপা দিল। বোঁটকা গন্ধ! একগাদা ট্র্যাশ ফেলা।
রিধিমা ফিরে এল। মরচে ধরা সিঁড়ি উঠে গেছে আনলোডিং-লোডিং ডকে। রিধিমা বলল, ‘এখানে উপরে মেজরের অফিস ছিল।’
‘এনাফ অফ দিস মেজর-মাইনর!’ গুঁফো ব্রায়ান ধমক লাগাল। ‘ডোন্ট জার্ক মি অ্যারাউণ্ড।’ তারপর ব্রায়ান ট্রেসির কাছে এসে তিরস্কারের দৃষ্টিতে তাকাল— ‘গুড জব ট্রেসি!’
কিছুক্ষণ আগেকার গাঙ-হো ট্রেসির মুখ লজ্জায় অপমানে চুপসে গেছে। ব্রায়ান এবার রিধিমার দিকে তাকিয়ে শ্লেষের সঙ্গে বলল, ‘অ্যাডিওস!’ তারপর কিছুক্ষণ গুম হয়ে গুদামের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর আবার রিধিমার দিকে চোখ ফেরাল, চোখে কঠোর দৃষ্টি— ‘তোমায় একটা ফেভার করলাম যে তোমার আসল পরিচয়টা এদের দিই নি। এক ঘন্টার মধ্যে নিউ ইয়র্ক ছেড়ে চলে যাবে।’
‘এক ঘন্টার মধ্যে? কোথায় যাব?’
‘গো টু হেল!’ ব্রায়ান রেগে লাল। ট্রেসি যা বলেছে তাই— তুমি আমাদের সঙ্গে কখনো ছিলে না। তোমাদের হার্ভার্ডে কী হয়েছিল সে ব্যাপারে আই কেয়ার আ শিট। কিন্তু তোমাকে একঘন্টা পর নিউ ইয়র্ক সিটিতে দেখা গেলে—’ দেখা গেলে কী হবে সেটা ব্রায়ান না বললেও, বেশ খারাপ কিছু যে একটা হবে সেটা বেশ পরিষ্কার।
‘একে সামনের প্রসপেক্ট অ্যাভ মেট্রো স্টেশনে নামিয়ে দাও,’ ব্রায়ান কড়া গলায় ট্রেসিকে বলল। ‘ওখান থেকে নিউ জার্সি— ব্রায়ান হনহন করে ওর গাড়ির দিকে চলে গেল ।
সুনয়ন চুপ। সুনয়নের মনে এখন নানা জটিল সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। সুনয়নের ফোন ভাইব্রেট করল। সুনয়ন নম্বরটা দেখল— ওর্জুন অ্যাটর্নি।
‘এক্সকিউজ মি’ সুনয়ন ফোনটা কানে তুলে ভ্যান থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। ‘ইম্পরটেন্ট খবর আছে,’ ওর্জুন অ্যাটর্নির গলার আওয়াজ সিরিয়াস।
‘কী খবর?’
‘এয়ার ফ্রান্সের সার্ভার গত সপ্তাহে হ্যাকড হয়ে গেছে,’ ওর্জুনের কণ্ঠস্বর উত্তেজিত। ‘প্যাসেঞ্জার ম্যানিফেস্ট ওয়াজ কম্প্রোমাইজড।’
‘কিন্তু ইণ্ডিয়ান এয়ারপোর্টের ডিপার্চার কার্ড?’
‘এয়ার ফ্রান্স হ্যাকিংয়ের কথা জেনে সেটাই আমার মাথায় প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘ওর্জুন বলল। ‘আমার কিছু ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক আছে। ভেরি পাওয়ারফুল অ্যাণ্ড ট্রাস্টওয়ার্দি। জানলাম যে ফার্স্ট জুলাই ২০১৭ থেকে ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্ট ডিপার্চার কার্ড অ্যাবলিশ করে দিয়েছে। প্যাসেঞ্জার এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই আউট করার ইনফরমেশন ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস লাইন্সের ডেটাবেস থেকে অনলাইনে চলে আসে। রিধিমা বোস নিউ ইয়র্কের জন্য এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট AF225-এ রাত একটা ছত্রিশে উঠেছে। আমরা বস্টনে US হোমল্যাণ্ড সিকিউরিটির সঙ্গে কথা বলেছি। রিধিমা বোস বস্টনে এয়ার ফ্রান্সের প্লেনে এসে নেমেছে চোদ্দই জানুয়ারি। তার মানে খুনের সময় ও কিছুতেই ওখানে থাকতে পারে না।’
সুনয়নের অনেক হালকা লাগল। ‘থ্যাঙ্কস ওর্জুন, এই ইনফরমেশনটা খুব দরকারি ছিল। রাখছি, কথা বলব পরে,’ ফোন বন্ধ করে ভাবতে ভাবতে গাড়িতে ফিরে এল সুনয়ন। আপনি কি ইণ্ডিয়ান কনসুলেটের সেকেণ্ড সেক্রেটারি মোহন গুপ্তাকে বলেছিলেন
এই সানসেট পার্কের কথা? ওকে কি বলেছিলেন আপনার অ্যাপল ওয়াচ বাথরুমে লুকিয়ে রেখে এসেছিলেন?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
সুনয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘কেউ একজন ওদের সাবধান করে দিয়েছে। ওরা তাড়াতাড়ি ওই ওয়্যারহাউস থেকে ওদের হিডেন এস্টাব্লিশমেন্ট গুটিয়ে ফেলেছে।’
‘এই টপিকটা আর নিতে পারছি না।’ বিরক্তিতে ট্রেসির গলায় অসন্তোষ ঝরে পড়ছে। ‘লেটস বাউন্স। অনেক কাজ ফেলে রেখে এসেছি। সুনয়ন, তুমি একে তাড়াতাড়ি নামিয়ে দাও—’
সুনয়ন গাড়ি স্টার্ট করল, তারপর রিধিমাকে বলল, ‘পুলিশ অফিসারের কথা শুনতেই হবে। আমি আপনাকে প্রসপেক্ট অ্যাভিনিউ মেট্রো স্টেশনে নামিয়ে দিচ্ছি। ওখান থেকে ডাউনটাউন ম্যানহাটনে চলে যান, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে নিউ জার্সি যাবার “প্যাথ” ট্রেন পেয়ে যাবেন। জার্নাল স্কোয়ার স্টেশনে নামবেন। আমি একজনের নাম ঠিকানা লিখে দিচ্ছি। ও আপনাকে সাহায্য করতে পারে।’
সুনয়ন গাড়ির গ্লাভ বক্স খুলে একটা কাগজ আর পেন বের করে খসখস করে লিখতে থাকল, রিধিমা দেখল ট্রেসির মুখ, ও সহ্য করতে পারছে না রিধিমার উপস্থিতি। সুনয়ন লেখা শেষ করে রিধিমার হাতে কাগজটা দিতে যেতেই ট্রেসি বলল— ‘হোয়াট ইজ দিস? ল্যাটিন?’
‘ব্রাহ্মী,’ সুনয়ন কাগজটা খুলে দেখাল— ‘এই ঠিকানায় পৌঁছে যাবেন।’

ট্রেসি রিধিমার দিকে অবজ্ঞা ভরে তাকাল।
রিধিমা কাগজটা পড়ে অবাক।
এটা কী লিখেছে সুনয়ন!
সুনয়নের দৃষ্টি ওর সেলফোনে, কারুকে টেক্সট করতে ব্যস্ত। রিধিমা লোকটাকে কেন জানে না বিশ্বাস করতে পারছে না। রিধিমা ভাবছে মেজরের দলের কানে খবরটা পৌঁছে দিল কে? সুনয়ন কেন মোহনের নাম নিল? কিন্তু এত তাড়াতাড়ি এত বিশাল এস্টাব্লিশমেন্টকে ভোজবাজির মত গায়েব করা সম্ভব না। কাল রাতে মোহনের মত সুনয়নকেও সে বলেছিল এই ঠিকানাটার কথা, অ্যাপল ওয়াচের কথা। রিধিমার মনে হল এর পিছনে সুনয়নের হাত নেই তো?
৷৷ বাইশ ৷৷
রিচমণ্ড হিলস, ওজোন পার্ক!
কীভাবে যাব? প্রসপেক্ট অ্যাভ মেট্রো স্টেশনে চারদিকে তাকাল রিধিমা। নিউ ইয়র্ক মেট্রো সিস্টেম একটা ভুলভুলাইয়া উইথ ডাইরেকশন। রিধিমা বিশাল ডিরেকশন বোর্ডটা দেখে খুঁজতে লাগল রিচমণ্ড হিলস, ওজোন পার্ক৷ পিছন থেকে গলা খাকারি— ‘এক্সকিউজ মি। ওয়ান্না কুকিজ? ওয়ান ডলার ওনলি।’ একটা কালো অল্পবয়স্ক ছেলে।
নিউ ইয়র্কের মেট্রোতে হকার! ‘নো থ্যাঙ্কস!’ রিধিমা আবার ডিরেকশন বোর্ডে নজর দিল।
‘মনে হচ্ছে আপনি নিউ ইয়র্কে থাকেন না। কোথায় যাবেন?’
‘রিচমণ্ড হিলস, ওজোন পার্ক, রিধিমা বলল।
‘রকওয়ে বুলেভার্ড স্টেশন। টেক ব্লু ‘এ’ ট্রেন। ডাউনস্টেয়ার্স।’
রিধিমা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে ব্লু ‘এ’ ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। লোহার বেঞ্চিতে বসে অপেক্ষা করতে লাগল ‘এ’ ট্রেনের।
মিনিট দশেকের মধ্যে ওজোন পার্কের ‘এ’ ট্রেন এসে গেল। রিধিমা উঠে বসল, খালি ট্রেন। কুকিওয়ালা ছেলেটাও রিধিমার কামরাতে উঠল, রিধিমার চোখ ঘুমে ঢুলে এল। জেট ল্যাগ এখনো কাটেনি, ক্লান্তিতে রিধিমার চোখ লেগে গেছিল। হঠাৎ কাঁধে আলতো টোকা। রিধিমা ধড়মড় করে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে কুকিওয়ালা। ‘আফটার ডিজ ইজ ডাহ স্টপ।’ কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেটা বলল৷
রিধিমা বাইরে তাকাল। ভূগর্ভ থেকে উঠে এসে ট্রেন রাস্তার উপরের এলিভেটেড ট্র্যাকে চলছে। রিধিমা উঠে দাঁড়াল। ট্রেন ঝমঝম করতে করতে চলেছে, পাশে একটা বিশাল কবরখানা, নিচে শুধু সাদা আর সাদা। কাল রাতটা একটা দুঃস্বপ্নের রাত, কবরগুলো দেখে আতঙ্কে রিধিমা চোখ বুজে ফেলল। কবরখানা পেরিয়ে গিয়ে এখন অজস্র একতলা বাড়ি, সবকটার ছাত বরফে ঢাকা। ট্রেন থামল, নেক্সট স্টপ রকওয়ে বুলেভার্ড।
প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামতে তাড়াতাড়ি ট্রেন থেকে নামল রিধিমা । পিছনে পিছনে নামল সেই কুকিওয়ালা। খালি প্ল্যাটফর্মে ওরা মাত্র দু’জন যাত্রী। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে। আবার ঝুরঝুর করে বরফ পড়তে শুরু করেছে। সিঁড়ি দিয়ে রিধিমা নিচে নামতে নামতে দেখল সাইনবোর্ড রাম-জ্যাগ স্টেশনারী। নিশ্চয়ই ভারতের জগন্নাথ গায়ানাতে গিয়ে জ্যাগ হয়ে গেছে, রিধিমা নেমে এল লিবার্টি অ্যাভিনিউতে।
লিবার্টি অ্যাভিনিউ একদম খালি। দু’পাশে ছোট ছোট দোকান। নিউ ইয়র্ক সিটি ইমিগ্র্যান্টদের বসতি। শ্রীলঙ্কার ইমিগ্র্যান্টরা স্ট্যাটেন-আইল্যাণ্ডে, আরবরা ব্রুকলীনে, ঘানার আফ্রিকানরা ব্রঙ্কসে, বাংলাদেশিরা কুইনসে পার্কচেস্টারে, কোরিয়ানরা লং আইল্যাণ্ডের মুরে হিলে নিজেদের বসতি বানিয়েছে, অ্যাফ্রোক্যারিবিয়ান ইমিগ্র্যান্টরা ব্রুকলীনের ফ্ল্যাটবুশে সেটল করেছে, আর এশিয়ান গায়ানিজরা রিচমণ্ড হিলস আর পাশের ওজোন পার্কে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। প্রায় দেড় লাখ গায়ানিজ নিউ ইয়র্ক সিটিতে থাকে। লিবার্টি অ্যাভিনিউ ধরে বরফের মধ্য দিয়ে হাঁটতে লাগল রিধিমা। রাস্তা জনবিরল। হঠাৎ খেয়াল হল বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে কুকিওয়ালা ছেলেটা পিছনে পিছনে আসছে। রিধিমার মনে অস্বস্তি লাগল, ওর মনে হল ছেলেটা ওকে অনুসরণ করছে। ছেলেটাকে এড়াতে হবে। বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে একটা পেরুভিয়ান কুইজিন। লা বাকানা পেরুয়ানা । রিধিমা ভিতরে ঢুকে পড়ল৷
ছোট দোকান। আট-দশটা টেবিল পাতা, কাঁচের আয়না দিয়ে দেওয়াল মোড়া, একটা অল্পবয়স্কা মেয়ে ওকে টেবিল দেখিয়ে মেনু কার্ড দিয়ে গেল। রিধিমার খিদে পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল খেলে বোধহয় গায়ে জোর পাবে। মেনু পড়ে সবই নতুন নাম লাগল ।
‘সেকো ডি ক্যাব্রিটো,’ রিধিমা ওয়েট্রেসকে অর্ডার দিল। ‘পেরুভিয়ান বিয়ার খুব ভাল কী আছে?’
‘কাসকোয়েনা,’ মেয়েটা বলল। তারপর হেসে বলল, ‘মাই ফেভারিট।’
‘ঠিক আছে, ওয়ান কাসকোয়েনা প্লিজ।’
বিয়ারে চুমুক দিয়ে পেরুভিয়ান বড় বড় কর্ন-এর রোস্ট খেতে খেতে রিধিমার মরে যাওয়া খিদেটা চাগিয়ে উঠল। বিয়ারটা বেশ ভাল। ক্লান্তিটা কাটছে। গুঁফো পুলিশটা যদি দেখত ও বসে বসে বিয়ার খাচ্ছে তাহলে বোধ হয় ওকে গুলিই করে দিত। লোকটার অপমানিত মুখ চোখে ভাসছে। কিন্তু রিধিমার দোষ কোথায়? কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার এল— পাঁঠার মাংসের বিশাল বড় বড় পিস, সঙ্গে বিনসের ঝোল, ভাত আর একপাশে কুচি কুচি করে কাটা পেঁয়াজ। পাঁঠার মাংসের হাড়গুলো প্লেটে মনে হচ্ছে গোরুর হাড়ের সাইজের। এখন যা খিদে পেয়েছে তাতে ও ডাইনোসরের মাংস দিলেও খেয়ে নেবে। গরম গরম খাবারের জন্যই হোক বা বিয়ারের জন্যই হোক রিধিমা অনুভব করল শরীরে শক্তি ফিরে আসছে।
হোপ, ইয়ু আর এনজয়িং আওয়ার ফুড, ওয়েট্রেস পাশে এসে দাঁড়াল।
‘তোমাদের পেরুর ডিশ খুব ডেলিশাস।’
‘আমার দেশ ব্রিটিশ গায়ানা, ওয়েট্রেস বলল৷
‘ওঃ,’ রিধিমা বলল। ‘চেক প্লিজ।’
ওয়েট্রেস কালো চামড়ার ডাবল প্যানেল চেকবুক প্রেজেন্টার রিধিমার
টেবিলে রেখে গেল। রিধিমা খুলে ভিতরের বিলটা দেখল— তেইশ ডলার।
রিধিমা একটা পঞ্চাশ ডলারের নোট রেখে বলল, ‘কিপ দ্য চেঞ্জ।’
মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠল। রিধিমা বলল, ‘পার্কার লেনটা কতদূর?’
‘পনের মিনিট লাগবে হেঁটে যেতে।’
‘এখানে ট্যাক্সি পাওয়া যাবে?’
‘উবার?’
‘সঙ্গে ফোন নেই।’
মেয়েটা ওর সেলফোন স্কার্টের পকেট থেকে বের করে বলল, ‘আমি ডেকে দিচ্ছি।’
রেস্তোরাঁর দরজায় উবার এসে দাঁড়াল। রিধিমা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল। সেই কুকিওয়ালা ছেলেটা পাশের দোকানের শেডে দাঁড়িয়ে। রিধিমাকে দেখে ওর চোখের দৃষ্টি চনমন করে উঠল। উবারে উঠতে উঠতে রিধিমা দেখল ছেলেটা তাড়াতাড়ি ফোন বের করে নম্বর ডায়াল করতে থাকল। রিধিমা এখন স্থির নিশ্চিত যে ছেলেটা ওকে ফলো করছিল। কিন্তু কেন?
উবার পার্কার লেনে রিধিমাকে নামিয়ে দিল। টেন পার্কার লেন। কুইন্সের হাজার হাজার ঝরঝরে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের মধ্যে একটা। চারতলা বিল্ডিং, দেখে মনে হয় কম করেও দেড়শ বছর তো বয়স হবেই ইমারতটার। দরজা বন্ধ। কী-প্যাডে পাসকোড পাঞ্চ করতে হবে।
পাসকোড!
রিধিমার মনে পড়ল সুনয়নের শেষ লাইন, কোড 33 = 3। এটাই হয়তো ওর দরজার পাস কোড। কী-প্যাডে গিয়ে টাইপ করল থ্রি থ্রি ইকুয়ালস থ্রি। দরজা খুলল না। তাহলে? রিধিমা হতাশ।
আবার পাঞ্চ করল, এবার জোরে জোরে টিপল। কে জানে হয়তো বিলো জিরো ডিগ্রীতে এই ইলেকট্রনিক সার্কিট কাজ করছে না। কিন্তু কোনও ফল হল না।
আবার ঠাণ্ডা মাথায় ভাল করে ভাবল রিধিমা।
সাংকেতিক চিহ্ন? ১০ পার্কার লেনটা ব্রাহ্মীতে লেখা। ওর মনের ব্ল্যাকবোর্ডে উপস্থিত হল ব্রাহ্মী নিউমেরালস।

ড্যাম! সুনয়ন ব্রাহ্মী নিউমেরালস লিখেছে। রিধিমা কী-প্যাডে 9929 টাইপ করল। এবার কড়াক করে আওয়াজ হল দরজার হাতলের অটো লকে। দরজার হাতল ঘুরিয়ে রিধিমা ভিতরে ঢুকল। সামনে দেওয়ালের গায়ে মেল বক্সের খোপ, আর তাতে রেসিডেন্টদের নাম লেখা। রিধিমা তাড়াতাড়ি চোখ বুলিয়ে নিল সুনয়ন সীটাপোটি ৩২৪। তিন তলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠল রিধিমা। হলওয়েতে কার্পেট ছিঁড়ে গেছে, পরপর সব অ্যাপার্টমেন্ট— হোটেলের মত লাগে। রিধিমা সুনয়নের অ্যাপার্টমেন্টের ডোর বেল বাজাল। দরজা খুলল সুনয়ন, মুখ চোখ ফোলা, ঘুমোচ্ছিল। রিধিমাকে দেখে বলল, ‘আসুন।’
রিধিমা ভিতরে ঢুকল। ছোট দেশলাই বাক্সের মত অ্যাপার্টমেন্ট। কিচেনটা অনেকের ক্লজেটের থেকেও ছোট, ক্যাবিনেটগুলো পুরোনো। ব্রেড টোস্টারের পাশে ব্রেডক্র্যাম্প ছড়িয়ে রয়েছে। রান্নাঘরের সিঙ্কে একটা প্রেসার কুকার রাখলে আর কিছু অটবে না। মেঝেতে প্লাইউড ল্যামিনেশনে হাঁটলে মেঝে ক্যাঁচ-ক্যাঁচ করে উঠছে। দেওয়ালে অনেকগুলো ট্রাভেল পোস্টার আর একটা বিরাট নিউ ইয়র্কের ম্যাপ সাঁটা।
‘একটা জিনিস মাথায় ঢুকছে না—’ রিধিমা ব্যাকপ্যাক নামিয়ে সোফায় বসল। ‘ওরা গুদাম থেকে অত মালপত্র এত তাড়াতাড়ি সরাল কীভাবে?’
‘মডিউলার স্ট্রাকচার, সুনয়ন বলল। ট্রাকের ইঞ্জিন এনে কনটেইনারগুলোকে লোডিং ডক থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে। বাকিটা ধ্বংস করা ব্রো-গানের কাজ। কন্ট্রোলড ফায়ার। মারাত্মক ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক। কিন্তু এখন আপনার এসব নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। ডঃ গিলমোরের হত্যাকাণ্ডে গোটা নিউ ইয়র্কের ল’ এনফোর্সমেন্ট এবার নড়েচড়ে উঠেছে।’
‘আমি তাহলে এখন কী করব?’ রিধিমা শুকনো ঠোঁট জিভ দিয়ে ভেজাল।
‘পুলিশ এখন মরিয়া। আপনাকে আমেরিকা থেকে পালাতেই হবে।’ সুনয়ন বলল। ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’
কিন্তু কীভাবে? আমার পাসপোর্ট স্ক্যান করলেই—’
‘আপনার একটা টোটালি অন্য আইডেন্টিটি তৈরি করতে হবে। আমাদের নিউ জার্সি যেতে হবে ।’
‘এখন?’
‘সারা রাত জেগে এখন তাকিয়ে থাকতে পারছি না। আপনিও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিতে পারেন, বাকি রাত হয়তো আপনাকে জেগে কাটাতে হবে।
‘একটা প্রশ্ন করব?’
‘বলুন।’
‘আপনি তিন বছর কেন বাড়ি যান নি?’
‘কেন একথা জিজ্ঞাসা করছেন?’ সুনয়নের কপালে ভাঁজ।
‘বস্টনে স্টেট ট্রুপার আপনার মা’কে আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করছিল।’
‘আমার বাড়ি যাওয়া না যাওয়ার সঙ্গে আপনার এই কেসটার কি কোনও সম্পর্ক আছে?’
‘না।’
‘তাহলে অহেতুক কিউরিওসিটি কেন?’
‘আমার সত্যি ওসব জানার ইচ্ছা নেই। আমি শুধু জানতে চাই ডঃ উইকস মারা যাবার ঠিক আগে কেন আপনাদের নাম কোডে লিখে গেলেন?’
‘আমি কীভাবে জানব?’ সুনয়নকে বিরক্ত দেখাল। ‘আমি লোকটাকে একদম পছন্দ করি না।’
‘কেন?’ প্রশ্নটা রিধিমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল। ‘আমি তো ওঁকে খুব পছন্দ করতাম। উনি আমার বাবার মত ছিলেন।’
‘শুনবেন?’ সুনয়ন চোখ কুঁচকে বলল। ‘ওকে লেট মি গেট দ্য ফ্যাক্টস স্ট্রেইট। ছোটবেলায় ডঃ উইকস প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসত, আমাকে গায়ানিজদের অতীতের গল্প বলত। আমাকে ব্রাহ্মী শেখাত। কিন্তু একটু বড় হয়ে মিডল স্কুলে যেতেই শুরু হল গণ্ডগোল। স্কুলে একজন স্টুডেন্ট এসে একদিন আমাকে বলল, ওর বাবা আর মাকে বলতে শুনেছে যে ডঃ উইকস নাকি আমার বাবা। আমি বাড়ি ফিরে মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু মা স্বীকার করল না। তারপর থেকে ডঃ উইকসের আসা একদম কমে গেল। তারপর একদিন স্কুল আগে ছুটি হয়ে গেল, আমি দেখি দোকান বন্ধ। পিছনের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে দরজা খুলে দেখলাম— সুনয়ন থামল, ওর মুখে অস্বস্তি। ও যেন এখনো সেই দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছে।’
রিধিমা সুনয়নকে প্রশ্ন করল না।
মা আর প্রফেসর বিছানায়। দু’জনের খালি গা, শরীরের নিচটা হালকা চাদরে ঢাকা, মায়ের কোঁকড়া চুল ঘামে ভেজা, সামনে কপালে নেমে এসেছে। আমি ছোট হলেও, অন্যান্য মিডল স্কুলারের মত ততদিনে আমার পুরুষ-নারীর শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে বেশ ভালই জ্ঞান হয়েছে। আমি বুঝলাম মা আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে। আমি রাগে চেঁচিয়ে মাকে বললাম— ‘তুমি মিথ্যুক।’ ডঃ উইকস আমাকে বোঝাতে গেল, আমি চেঁচিয়ে ডঃ উইকসকে বললাম— ‘গেট আউট!’ ডঃ উইকস পোশাক গায়ে গলিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল, তারপর আর কখনো ওকে আমাদের বাড়িতে দেখিনি।’
‘তারপর?’
‘তারপর বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। স্কুল পাশ করার পর NYU-তে ভর্তি হলাম। নিউ ইয়র্কে চলে এলাম। আমি জানতাম আমার মায়ের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল ছিল না। তাই মা দাদুর দোকানটা থেকে হোম-ইকুয়িটি লোন নিয়ে আমায় পড়াচ্ছে। কিন্তু তারপর জানতে পারলাম ব্যাপারটা মিথ্যা।’
‘কীভাবে?’
‘মা’র দোকানের দেওয়ালে একটা বুদ্ধের ছবি আঁকা আছে।’
‘হ্যাঁ দেখেছি।’
‘ওর নিচে কুলুঙ্গিতে একটা গায়ানিজ অ্যান্টিক ছিল। একটা ছোট মাটির কলসী। আমরা বলতাম বুদ্ধাপট। দাদু নাকি দোকান শুরু করার সময় পুজো করে দোকানে সেই বুদ্ধাপট স্থাপন করেছিল। একবার উইকএণ্ডে বাড়ি এসে কী মনে হল বুদ্ধাপটের কয়েকটা ছবি তুললাম। তারপর কলেজে ফিরে এসে eBay-তে অকশনে তুলে দিলাম। আমি ভেবেছিলাম খুব বেশি হলে পঞ্চাশ একশ বা মেরে কেটে শ’ দুয়েক ডলার পাব। কিন্তু বিডিং শুরু হতে না হতে প্রাইজ গিয়ে দাঁড়াল ফিফটি থাউজ্যাণ্ড ডলারে।
‘ফিফটি থাউজ্যাণ্ড!’
‘আমি টেনশনে মাকে বললাম সব কথা। বললাম বুদ্ধাপটটা লুকিয়ে রাখতে।’
ওটা আমাদের অনেক অভাব মিটিয়ে দেবে। মা বলল ঠিক আছে। পরের দিন সকালে মা’র ফোন বুদ্ধাপট চুরি গেছে!’
‘চুরি গেছে?’
‘শুনে তো আমার মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। আমি কেম্ব্রিজে ছুটে গেলাম সকালের বাস ধরে। বাড়িতে বুদ্ধাপট নেই। বাড়ি তোলপাড় করে খুঁজেও ওটা পেলাম না। তখন মনে হল বুদ্ধাপট ঠিক এখনি চুরি? মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধল। মা ডঃ উইকসকে এই বুদ্ধাপটের কথা বলে নি তো? মাকে জিজ্ঞাসা করলাম। মা যথারীতি লর্ড হনুমানের দিব্যি দিল। আমি তখন চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে লোকাল থানায় চুরির জন্য রিপোর্ট করলাম আর বললাম ডঃ উইকসকে আমার সন্দেহ হয়।’
‘তারপর?’
‘সন্ধ্যায় শেরিফ আমাকে আর মাকে থানায় ডেকে পাঠাল। গিয়ে দেখি ডঃ উইকস থানায় বসে। শেরিফের ডেস্কে রাখা সেই বুদ্ধাপট। শেরিফ আমাদের সামনে ডঃ উইকসকে জিজ্ঞাসা করলেন যে এই পাত্রটা কোথা থেকে পেয়েছেন? ডঃ উইকস স্বীকার করল যে সে এটা আমাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে।
‘চুরি করেছে?’ রিধিমা বলল।
‘ডঃ উইকস মাথা নিচু করে বলল এটা একটা ঐতিহাসিক আর্টিফ্যাক্ট। তাই এর সুরক্ষার জন্য সে ওটা পিবডি মিউজিয়ামে নিয়ে গেছিল।’
‘কিন্তু তাই বলে চুরি করবেন!’
‘শেরিফ বলল যে এর সঙ্গে হার্ভার্ডের সম্মান জড়িত। ডঃ উইকসের চাকরি তো যাবেই, জেলের সাজাও হবে সম্ভবতঃ। আর হার্ভার্ডের বদনাম সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবে। তাই—’
‘তাই?’
‘শেরিফ বলল আমরা যদি এই কমপ্লেইন উইথড্র করে নিই তবে ব্যাপারটা এখানেই মিটে যাবে। কিন্তু লোকটার ওপর আমার রাগ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। আমি বললাম কক্ষনো না। আমি চাই লোকটার অপরাধের সাজা হোক।’
‘তারপর?’
‘হঠাৎ আমার মা ফস্ করে বলল যে এই বুদ্ধাপট মা নাকি ডঃ উইকসকে হার্ভার্ডের মিউজিয়ামের জন্য দিয়েছে।’
‘বলেন কী?’
‘হ্যাঁ। আমি পুলিশের চোখে বিস্ময় দেখতে পেলাম। ডঃ উইকস মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। আমি সেদিন কনফার্মড হলাম যে কে আমার বাবা।’
‘তারপর?’
‘বাড়ি ফেরার সময় গাড়িতে মা বলল, প্রফেসরের নামে আমাদের দিক থেকে পুলিশের কাছে কোনও কমপ্লেইন থাকা উচিত না, বরং আমাদের ওর ওপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, আমার পড়াশোনার খরচা প্রফেসরই বহন করছে। আমার গা ঘিনঘিন করে উঠল। সেদিনই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এলাম, সোজা নিউ ইয়র্ক । নিউ ইয়র্কে ফিরে NYU থেকে নাম কাটিয়ে দিলাম।’
‘মা’র সঙ্গে যোগাযোগ?’
‘প্রথম এক বছর কোনও কথা বলিনি। আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি বোধহয় সেটা শুনে একদিন ডঃ উইকস নিজেই ফোন করল। ফোন আমি ডাম্প করে দিলাম। তারপর ওই নাম্বার থেকে কয়েকবার ফোন এল, আমি নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম। অন্য এক নাম্বার থেকে ডঃ উইকস একদিন ভয়েস মেলে একটা মেসেজ রাখল।’
‘কী বলেছিলেন?’
‘আমি যে মায়ের গর্ভে সেই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে কেলেঙ্কারি, তাই ডঃ উইকস মাকে বলেছিলেন যে গর্ভপাত করাতে। কিন্তু আমার মা জেদ ধরে যে কিছুতেই তার সন্তান সে নষ্ট করবে না। বললেন যে এই হল তোমার মা। শুধু তোমার জন্য অনেক কষ্ট মেনে নিয়েছে। আমার ওপর রাগ করে তুমি ওকে কষ্ট দিও না।’
‘তারপর?’
‘মা গর্ভপাত করাতে রাজি হয় নি। ডঃ উইকসেরও বিবেকে বাধল তার পঙ্গু স্ত্রীকে ত্যাগ করতে। এরপর ওখানে আর মা’র থাকা চলে না। মা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমার দাদুর বাড়ি চলে এসেছিল, তারপর মা’ই আমাকে বড় করেছিল। সিঙ্গল মাদার। কিন্তু সেদিন মা বুঝিয়ে দিল আমাদের দু’জনের মধ্যে কে তার নিকটজন। কিন্তু ওই লোকটা আমাকে আমার মায়ের গর্ভেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল। তাকে আমি কীভাবে বাবা বলব?’
‘আর ওই বুদ্ধাপট?’
মা শেরিফের সামনে ডঃ উইকসকে ওই বুদ্ধাপট দান করে দিয়েছিল। তারপর থেকে ওই বুদ্ধাপটের মালিক ডঃ উইকস।’
‘এটা কবে হয়েছিল?’
‘২০১১ র ক্রিসমাসে।’
‘তারপর?’
রাগারাগি করে তো চলে এলাম। ২০১২ সালের মার্চ নাগাদ মা আমাকে ফোন করেছিল। মা বলল ডঃ উইকসের স্ত্রী মারা গেছেন। তারপর ডঃ উইকস ২০১২ সালের শেষ দিকে নেপাল চলে যান কিছু গবেষণা করতে। আমি তখন মাঝে মাঝে হার্ভার্ডে গিয়ে মা’র সঙ্গে দেখা করতাম। কিন্তু ২০১৫ সালের শুরুতে ডঃ উইকস আবার হার্ভার্ডে পিবডির পুরোনো কাজে ফিরে আসেন ৷ উনি ফিরে এসে আবার মার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে আরম্ভ করেন। আমি লোকটাকে একদম পছন্দ করতাম না, ২০১৫’র খ্রিসমাসের পর আমি আর বাড়ি যাই নি।’
‘আপনার মা আপনাকে বলেন নি বাড়ি ফিরে আসতে?’
‘বলেছিল। এও বলেছিল ডঃ উইকস চান যে আমি পড়াশোনাটা কমপ্লিট করি। কিন্তু আমি আর বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখিনি।’
‘আর বুদ্ধাপট?’
‘জানি না। এখন তো জানার আর উপায়ও রইল না।’
‘আপনি কি জানেন হার্ভার্ডে কোথাও বুদ্ধের মায়ের মন্দির আছে কিনা?’
‘বুদ্ধের মায়ের মন্দির!’ সুনয়ন ভাবল। ‘ঠিক মনে করতে পারছি না। কেন বলুন তো?’
রিধিমা ডায়েরি খুলে বলল, ‘এই বুদ্ধের দেহাবশেষ উনি বুদ্ধের মায়ের মন্দিরে লুকিয়ে রেখে গেছেন যাতে চোর এটা চুরি না করতে পারে।’
‘আমার আর বুদ্ধাপটের ব্যাপারে কোনও উৎসাহ নেই।’ সুনয়ন একটা মোবাইল ফোন বের করল— ‘এটা রাখুন।’
রিধিমা দেখল একটা সস্তা মোটোরোলা ট্র্যাকফোন। আজকের ঝাঁ চকচকে স্মার্টফোনের গ্ল্যামারের কাছে মনে হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক বস্তু।
‘টোয়েন্টি ডলার দাম,’ সুনয়ন বলল। ‘ওয়ালমার্ট থেকে কেনা বার্নার ফোন ব্যবহার করে পুড়িয়ে ফেলুন, বা ট্র্যাশে ফেলে দিন।’
বার্নার ফোনের কথা রিধিমা শুনেছে। ‘টেররিস্ট বা ড্রাগ পেডলাররা ব্যবহার করে শুনেছি।’
‘ভাল লোকেরাও করে। ডেটিং সাইটে নিজের আইডেন্টিটি প্রথমেই ডিসক্লোজ করতে চান না, কিংবা ক্রেইগ লিস্টে মাল বেচতে চান। বেস্ট হল এই বার্নার ফোন। সুনয়ন একটা ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা ক্রেডিট কার্ড বের করে দিল রিধিমাকে। প্রিপেড কার্ড। দুশো ডলার ভরা আছে। এদুটো জিনিস ছাড়া আমেরিকায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করা মানে কার্বন ডাই অক্সাইডে নিঃশ্বাস নেওয়া। ওরা আপনার আইডেন্টিটি থেফট করেছে, এবার আমরা আপনার এমন একটা অন্য আইডেন্টিটি বানাবো যে ওরা খুঁজেই পাবে না আপনাকে। আমি আপনাকে একদম ইনভিজিবল করে দেব। আমি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেব এখন, হয়তো রাত্তিরটা জাগতে হতে পারে। ফিল ফ্রি। আমার এই ছোট্ট ঘরে একটু অসুবিধা—’
‘না না, অসুবিধা কীসের। আপনার ঘরটা বেশ গরম!’
‘এত ছোট যে ওভেনে একবার রান্না হলে পুরো ঘরটা স্টিম-আপ হয়ে যায়, হিটিংয়ের খরচা বেঁচে যায়,’ সুনয়ন রসিকতা করে বলল।
রিধিমা হাসল। সুনয়নের সেন্স অব হিউমার বেশ। মানুষটার মধ্যে একটা আকর্ষণ আছে। বাইরেটা রুক্ষ হলেও, খুব শার্প আর স্মার্ট। কিন্তু নিজের ইমোশন কিছুতেই প্রকাশ করতে চায় না। খুব চাপা।
‘ঘর তো একা একা বেশ সাজিয়েছেন।’
‘এই যে ঘরে মাইক্রোওয়েভ, টিভি-ফিভি দেখছেন, সবই ক্রেইগ লিস্ট থেকে কেনা, সেকেণ্ডহ্যাণ্ড। ড্রেসারটা ক্রেইগলিস্টের ফ্রি ক্যাটেগরিতে পেয়েছি, কাছেই একটা অ্যাপার্টমেন্টে ছিল, দু’জন হোমলেস লেবারকে দশটা ডলার দিয়েছি ওরা তুলে দিয়ে গেছে। কাউচটা একটা স্টুডেন্টের, চলে যাবার আগে স্যালভেশন আর্মিকে দেবে ভাবছিল।’
‘আপনার নিউ ইয়র্ক ভাল লাগে?’
‘নিউ ইয়র্ক ইজ নিউ ইয়র্ক,’ সুনয়ন বলল। ‘ডাইভারসিটির মেল্টিং পট। যেমন একদিকে টাইমস স্কোয়ারের দশতলা উঁচু নিওন সাইন, তেমন অন্যদিকে ইনার সিটির নোংরা গলি, দেওয়ালে গ্রাফিটি। একদিকে থ্রি মিশেলিন স্টার রেস্তোরাঁ, অন্যদিকে ম্যানহাটনে রাস্তার মোড়ে মোড়ে ফুড কার্টে কাবাব। একদিকে ব্রডওয়ের অপেরা, অন্যদিকে রাস্তায় হিপ হপ, পাঙ্ক রক। একদিকে আড়াইশ’র বেশি চল্লিশ তলার চেয়ে উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার, অন্যদিকে পার্কে, সাইডওয়াকে, মেট্রোরেলে হোমলেস ঠাসা। আর কোনো বাইশ স্কোয়্যার মাইল দ্বীপে ম্যানহাটনের মত এত ডাইভারসিটি দেখা যায়?’
রিধিমার হঠাৎ মনে পড়ল কথাটা, কিন্তু বলতে গিয়েও থেমে গেল— মেট্রো রেলের কুকিওয়ালা কালো ছেলেটা কেন লা বাকানা পেরুয়ানা রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল? ছেলেটা কি ওকে ফলো করছিল?
৷৷ তেইশ ৷৷
সন্ধ্যায় বুদ্ধের হাড়গুলো সাজিয়ে সাজিয়ে একটা স্পাইনাল কর্ডের আকৃতি দিচ্ছিল হরি পরসাদ, রিনপোচে লামাকে ধোঁকা দিতে হবে। মাথার ভিতরে চলছে তোলপাড় মঞ্জুশ্রী লামার পাজলের সাংকেতিক অর্থ কী? পালাবার পথের সংকেত আছে এখানে— INDRA মানেটা ধরা গেছে DRAIN। কিন্তু কোথায় সেই DRAIN? বাকিটার মানে বোঝা যাচ্ছে না। মেথের অভাব ব্রেনে দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। ক্র্যাশ ইনটেন্স ক্রেডিং শুরু করেছে, ডিপ্রেশন জাঁকিয়ে ধরছে। কামরায় ফিরে যেতে হবে তাড়াতাড়ি। হরিপরসাদ ভাবতে লাগল RAIN এর পর স্টপ চিহ্নটা কেন? ওটারও কি কিছু গোপন অর্থ আছে? স্টপ চিহ্নটাকে যদি শব্দে লেখা যায়, তাহলে কেমন হয়? হরিপরসাদ একটা কাগজে লিখল—
GOD
RAIN STOP
A THUNDER DEFENCE
নাঃ! কিছু আকার নিচ্ছে না। হরিপরসাদ শব্দগুলোকে এক লাইনে পাশাপাশি এনে লিখল—
GODRAINSTOPATHUNDERDEFENCE
শব্দ থেকে বেরিয়ে অক্ষরে ঢুকলে এবার যেন কিছু দেখা যাচ্ছে মনে হচ্ছে! হরিপরসাদ স্পষ্ট পড়তে পারছে—
GO DRAINS TO PATH UNDER DE FENCE
লোকটার আশ্চর্য ট্যালেন্ট! ইন্দ্র যে বজ্রবৃষ্টির দেবতা সেটাকে ব্যবহার করে সংকেত লিখে দিল! ব্রিলিয়ান্ট! মেসেজ ইজ লাউড অ্যাণ্ড ক্লিয়ার। বরফ ঢাকা কোনও একটা ড্রেন ইলেকট্রিক ফেন্সের তলা দিয়ে বাইরে চলে গেছে। ওটাই পালাবার পথ। কিন্তু কোথায় সেই ড্রেন? হরিণটা যেখানে নালায় পা আটকে গেছিল সেদিকে?
৷৷ চব্বিশ ৷৷
কাউচে শুয়ে রিধিমা ঘুমিয়ে পড়েছিল। গভীর ঘুম। মনে হল কে যেন ডাকছে। রিধিমা তাকাল, পাশে দাঁড়িয়ে সুনয়ন— মিস বোস, এবার বেরোতে হবে।’
দেওয়াল ঘড়িতে রাত নটা। রিধিমা ধড়মড় করে উঠে বসল— ‘আপনি ঘুমিয়েছেন?’
‘অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি,’ সুনয়ন বলল। ‘নাইট শিফটের পর দিনে শরীর টেনে আসে। আপনি গভীর ঘুমে ডুবে ছিলেন, কিন্তু আমাদের বেরোতে হবে। সুনয়ন দুটো বাটিতে ধূমায়মান নুডল স্যুপ এনে টেবিলে রাখল। ‘আপনার জীবনের ওয়ার্স্ট ডিনারটা তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন।’
রিধিমা বাথরুমে গিয়ে মুখ চোখ ধুয়ে সুনয়নের পাশে বসে চুপচাপ খেতে লাগল। মাথা থম মেরে রয়েছে, শরীরের ভিতর উত্তেজনা শুরু হয়েছে। খাওয়া শেষ করে বাটিটা সিঙ্কে ধুয়ে, জুতো পরে, জ্যাকেট গলিয়ে নিল রিধিমা । ‘আমাকে আপনি রিধিমা বলে ডাকবেন। আমি কি আপনাকে সুনয়ন বলে ডাকতে পারি?’
রিধিমা ভেবেছিল লোকটার ঠোঁটে অন্ততঃ এক চিলতে ভদ্রতার হাসি দেখতে পাবে। কিন্তু লোকটা রোবটের মত বলল, ঠিক আছে।’ লোকটা কি হাসতে জানে না? রিধিমার মনেও বিরক্তি জেগে উঠল। লোকটার মুখে সব সময় হতাশা! এত নেগেটিভ কেন এই লোকটা? রিধিমা ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে উঠে দাঁড়াল, ‘আমি রেডি।’
‘আরেকটু কাজ বাকি আছে,’ সুনয়ন একটা ব্যাগের ভিতর থেকে মেয়েদের উইগ বের করল। ‘এটা পরে ফেলুন, আর এই চশমাটা।’
রিধিমা জীবনে কখনো উইগ পরে নি। চেষ্টা করে ঘাড় পর্যন্ত চুল গুটিয়েও উইগটা ঠিকমত ফিট হল না। ‘বাথরুমে চলুন, চুল ছেটে দিই।’ সুনয়ন কথা শেষ করতে করতে বাথরুমে ঢুকে ড্রয়ার থেকে কাঁচি বের করে রিধিমার জন্য অপেক্ষা করল। রিধিমা জ্যাকেট খুলে বাথরুমে এসে এক মুহূর্ত দাঁড়াল, তারপর মাথাটা ওয়াশ-বেসিনের দিকে কাত করল। সুনয়ন কাঁচি চালাতে লাগল। ‘একটা কথা সব সময় মাথায় রাখবেন—,’ সুনয়ন কাঁচি চালাতে চালাতে বলল, ‘পুলিশের রেড অ্যালার্ট। পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলে ছুটে পালাবার চেষ্টা করলে ওরা কিন্তু গুলি করে দেবে।’ সুনয়ন কিছুটা চুল কেটে বলল— ‘এবার ট্রাই করুন।’
আয়নায় নিজেকে দেখবার সাহস হল না রিধিমার। তবু উইগটা মাথায় চাপাবার সময় আয়নায় নিজের চেহারা দেখে ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। ‘এবার ঠিক আছে,’ রিধিমা উইগটা পরে আয়নায় দেখতে লাগল।
রিধিমা চোখে চশমাটা পরে আয়নায় তাকাল, পিছনে সুনয়ন। ওর দৃষ্টিতে কেমন যেন ঘোর লেগে। সুনয়ন পর মুহূর্তে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, ‘চেনা যাচ্ছে না। নতুন হেয়ারস্টাইল, চোখে চশমা, ঠিক এরকম দেখতে ছিল মহাদেবী, যার অ্যাপার্টমেন্টে আপনি কাল রাতে ছিলেন।’
‘এটা কি আমার জন্য কিনে আনলেন আপনি?’
‘না, মহাদেবী ক্যান্সারে মারা গেছে। কেমোথেরাপি শুরু হতেই ওকে এই উইগটা কিনতে হয়েছিল। আমি ওর উইগটা রেখে দিয়েছিলাম। কাজে লেগে গেল।’
কথাটা শুনে রিধিমার মনে হল মাথার ভিতর ফরফর করে একটা আরশোলা হেঁটে বেড়াচ্ছে। অন্যের পরচুলা! কিন্তু এখন উপায়ও নেই। বাইরের ঘরে এসে জ্যাকেট পরে ব্যাকপ্যাক তুলে নিল রিধিমা— ‘চলুন।’
দু’জনে পায়ে পায়ে বাইরের রাস্তায় এসে নামল। বাইরে জানুয়ারির কনকনে ঠাণ্ডা। সুনয়ন এক নজর রাস্তার চারপাশ দেখে বলল, ‘আমরা ওই ছোট গলিটা দিয়ে যাব, অনেকটা হাঁটতে হবে।’
‘চলুন,’ রিধিমা বলল। ঠাণ্ডা হাড়ে কামড়ে ধরেছে। দু’জনে বড় রাস্তা ছেড়ে ছোট গলিতে ঢুকল। রিধিমা বলল, ‘আমাকে দেখতে কি গায়ানিজ মহিলাদের মত লাগছে?’
‘কেন? তাহলে কি উইগ খুলে ফেলবেন?’
রিধিমা এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল— ‘মনে এত ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স পুষে রাখেন?’
‘না, আসলে আমেরিকায় আপনারা হলেন ইণ্ডিয়ান, আর আমরা গায়ানিজরা হলাম কুলি ইণ্ডিয়ান। সবাই জানে আমাদের পূর্বপুরুষরা ভারত থেকে গায়ানাতে এসেছিল মজুর হয়ে। সেই মজুরের তকমা এখনো আমাদের কপাল থেকে গেল না। তাই এটা আমাদের কাছে একটা সেনসিটিভ জায়গা।’
‘আমি যদি আপনাকে অজান্তে আঘাত করে থাকি তবে আমি দুঃখিত,’ রিধিমা সাবধান হল।
দু’জনে আবার চুপচাপ। হাঁটার দরুণ নিঃশ্বাসের শব্দ তালে তালে শুধু পড়ছে। অনেকটা হেঁটে আবার মাথার ওপরে রেলওয়ে ট্র্যাক চলে এল। সামনে এইটিয়েথ স্ট্রীট স্টেশনের বোর্ড দেখা যাচ্ছে। দু’জনে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল। শীতের রাতের প্ল্যাটফর্ম একদম খালি। খুব ঠাণ্ডা। সুনয়ন বিষয়টা নিয়ে সারাটা পথ বোধহয় নিজে নিজেই ঝগড়া করছিল। এবার বলল, ‘অনেকে ভাবে গায়ানিজ মানে এদেশের মেথর, দারোয়ান, ক্যাব ড্রাইভার। আমি চাই কুলি গায়ানিজদের বিশ্বাস করাতে যে আমরা আগাছা নই।’ সুনয়ন গম্ভীর। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ইউনাভির্সিটি ছেড়ে চাকরি খুঁজতে লাগলাম, নিজের পড়ার খরচ যাতে নিজে চালাতে পারি। এখানে ওখানে ইন্টারভিউ দিতে লাগলাম। তখন টের পেলাম সোসাইটিতে, অফিসগুলোতে আমাদের এক স্টিরিওটাইপ ইমেজ আছে— কুলি গায়ানিজ। কলেজ ড্রপ আউট গায়ানিজকে কেউ জেনিটারের চাকরি ছাড়া অন্য কোনও চাকরিই দিতে চায় না!’
‘আপনার গায়ানিজ কমিউনিটি?’
‘সবচেয়ে দুঃখের কথা হল এই যে আমরা গায়ানিজরা অনেকেই বিশ্বাস করে ফেলেছি যে জাত হিসাবে আমরা কুলি। ইণ্ডিয়াতে আমাদের অ্যানসেস্টাররা ছোট জাত ছিল। আমরা বিশ্বাস করে ফেলেছি যে আমরা এইসব ছোট কাজেরই যোগ্য।’
‘এই কাগজের চাকরিটা কিভাবে পেলেন?’
‘একজন গায়ানিজ লিটল গায়ানায় ওর সঙ্গে আমাকে থাকতে দিল। ও বলল ওদের তেত্রিশ তলা অফিস বিল্ডিঙে জেনিটারদের চাকরি জোগাড় করে দিতে পারবে। যখন অফিস টাইম শেষ হয়ে যায়, তখন এদের কাজ শুরু হয়, একদিন সন্ধ্যায় গেলাম ওর সঙ্গে ওর ডিউটিতে। দেখলাম ফ্লোরে ফ্লোরে গায়ানিজরা জেনিটারের কার্ট নিয়ে একের পর এক কিউবিকলে গিয়ে গিয়ে ট্র্যাশ কালেক্ট করছে, তারপর টয়লেটে নো এন্ট্রি সাইন লাগিয়ে ওই টয়লেট স্পঞ্জ ডাউন করছে যাতে পরদিন হোয়াইট কলার সাহেবরা এসে পরিষ্কার টয়লেটে হিসি করতে পারে।’ সুনয়ন মুখ মুছল।
‘তারপর?’
আমার সেই গায়ানিজ জাতভাইয়ের মুখের চামড়া একদিকে কুঁকড়ে গেছিল। আমি ভদ্রতা করে জিজ্ঞাসা করিনি কখনো। কিন্তু সেদিন ও টয়লেট পরিষ্কার করতে করতে দেখাল ড্রেন ক্লিনারের বোতল। বলল এটা নিয়ে কাজ করার সময় খুব সাবধান। অসাবধানে ভিতরের লিক্যুইড ছিটকে অনেকটা ওর মুখে লেগেছিল। তাই—’
রিধিমা শিউরে উঠল।
‘একজন সাদা লোককে দিয়ে এরা এত সস্তায় জেনিটারের এই ছোট কাজ করাতে পারবে? পারলে বুঝতাম হ্যাঁ, ইকুয়ালিটি সত্যিকারে এদেশে আছে।’ সুনয়ন বলল।
‘কোনও কাজই ছোট না। সব কাজ থেকেই আমরা শিখি। কোন শিক্ষা যে কখন কাজে লেগে যায় কে বলতে পারে,’ রিধিমা বলল। ‘তারপর কী হল?’
‘কাজ খুঁজতে লাগলাম । মহাদেবী রিচমণ্ড হিলসের এই কাজটার খোঁজ দিল। নাইট পুলিশ রিপোর্টার! অন্যান্য রিপোর্টাররা এই পোলিশ বিট জবটা নিতেই চায় না। তাই চাকরিটা খালি ছিল,’ সুনয়ন বলল ৷
‘এ’ ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে। রিধিমা সেলফোনে টাইম দেখল দশটা বাহান্ন। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে থামল, দরজা খুলে গেল। রিধিমা ভেবেছিল এত রাতে ট্রেন একদম খালি হবে। কিন্তু ট্রেনে অনেক যাত্রী!
আর এই যাত্রীদের চেহারা বেমানান!
রাতের ট্রেনের চেহারাই অন্যরকম!
দরজার ঠিক পাশেই একজন একটা ছেঁড়া ব্যাকপ্যাককে বালিশ বানিয়ে কম্বল ঢাকা দিয়ে সিটের ওপর কুঁকড়ে শুয়ে আছে, মানুষটার মুখ-মাথা ঢাকা, পুরুষ না মহিলা বোঝা যাচ্ছে না। পাশে একজন বুড়ো একটা পুরোনো ছেঁড়া সুটকেসে পা মেলে বসে আছে। আরেকটা বুড়ো একটা হুইলচেয়ারে ওর হোমলেস সংসার ডাঁই করে রেখে পাশে সিটে বসে ঘুমোচ্ছিল। রিধিমার আর সুনয়নের কথোপকথনে ওর ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে রিধিমার দিকে তাকাল।
সুনয়ন বলল— ‘সরি।’ উলটো দিকে একটা লোক সফট ড্রিংকসের খালি ক্যানে ভরা একটা কালো ট্র্যাশব্যাগ ধরে বসে ঢুলছে। ব্যাগ থেকেই হোক বা লোকটার গা থেকেই হোক এমন দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে, রিধিমার গা ঘিনঘিন করতে লাগল। সুনয়ন বোধহয় রিধিমার মনের অবস্থাটা বুঝল। ও ইশারায় বলল, ‘পাশের কামরাতে’। পরের স্টপে রিধিমারা পাশের কামরার দিকে এগিয়ে গেল।
পাশের কামরার অবস্থা আরও খারাপ। রিধিমা গুনল এক-দুই…নয়। নয়জন হোমলেস শুধু এই একটা কামরাতেই। একজন দাড়িওয়ালা হোমলেস চারটে পিৎজার বাক্সকে বালিশ করে শুয়ে ঘুমোচ্ছে, একজন একটা গ্রসারি কার্টকে রডের সঙ্গে বেঁধে রেখে ঘুমোচ্ছে, কার্টে একটা ট্র্যাশব্যাগ বাঁধা। পাশে বুড়োর থাইয়ের ব্যাগি জিনসের ওপর ছড়িটা কাত হয়ে রয়েছে। ওর ভেজা পুরোনো স্নো-বুট খুলে ফেলেছে, মোজা শোকাচ্ছে। বুড়োটা রিধিমার আগমনের শব্দে চোখ খুলে একবার তাকাল, তারপর আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমোতে লাগল।
‘এত লোক ট্রেনে ঘুমোচ্ছে?’ রিধিমা বিস্ময়ে সুনয়নকে জিজ্ঞাসা করল।
‘এরা হোমলেস,’ সুনয়ন বলল। ‘গরমকালে এরা রাস্তার সাইডওয়াকে, টানেলে, পেডিস্ট্রিয়ান ব্রিজের ওপর শুয়ে ঘুমোয়। কিন্তু এখন বাইরে সিঙ্গল ডিজিট টেম্পারেচার, উইন্ডচিল নিয়ে নেগেটিভ টোয়েন্টি, সুনয়ন নিচু গলার বলল। ‘এরা করবেটা কী? সাবওয়ে ট্রেনই ওদের রোলিং শেল্টার।’
‘পুলিশ ধরে না?’
একটা অল্পবয়স্কা মেয়ে পঁচিশ বছরের কাছাকাছি বয়স হবে, পায়ে ভেলক্রো স্ট্র্যাপ লাগানো পুরোনো লেব্রন জেমস স্নিকার্স, রিধিমা ওর পাশে একটু ফাঁক রেখে বসল। মেয়েটা রিধিমাকে বলল, ‘হোবো?’
‘নোপ,’ রিধিমা ওকে পাশ কাটাতে চাইল।
‘আমার বয়ফ্রেণ্ড আর আমাকে চায় না।’ ডিপ্রেশনে আমি মেয়েটার গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল।
রিধিমা নিরুত্তর থাকাটাই শ্রেয় মনে করল।
ট্রেন ইস্ট রিভারের নিচের টানেল দিয়ে ব্রুকলীন থেকে ম্যানহাটনে ঢুকল। ফুলটন স্ট্রীট স্টেশনে দরজা খুলতেই রিধিমা দেখল চারজন স্বাস্থ্যবান মানুষ কমলা রেনকোট পরে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে— ‘দেয়ার শি ইজ— রিধিমাকে দেখেই ওরা ওর দিকে আঙুল তুলে দেখাল। একজন লোক অটোমেটিক দরজা যাতে বন্ধ না হয় সে জন্য পা দিয়ে দরজার প্রান্ত আটকে দাঁড়াল, অন্য তিনজন ভিতরে ঢুকে রিধিমার দিকে এগিয়ে এল। আমাকে ধরতে আসছে, রিধিমা আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। রিধিমা পাশের খোলা দরজার দিকে তাকাল, কিন্তু ওই দরজাও আটকে দাঁড়িয়ে দু’জন কমলা পোশাকের মানুষ। একজন পায়ে পায়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। রিধিমা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। এবার কী হবে? ছুটে পালাবে? সুনয়নের সতর্কবাণী ভুলে রিধিমা উঠে দাঁড়াতে গেল। পাশ থেকে সুনয়নের শক্ত হাত রিধিমার কবজি ধরে রিধিমাকে সিটে টানল। রিধিমা সুনয়নের হাত আঁকড়ে ধরল। সুনয়ন রিধিমার কাছে সরে এসে গায়ে গা লাগিয়ে রিধিমাকে বুকে টেনে ওকে জড়িয়ে বসল। রিধিমা সুনয়নের বুকে মুখ গুঁজে ভয়ে চোখ বন্ধ করে শ্বাস বন্ধ করে ফেলল। যেন সে শিকারি কুকুরের তাড়া খেয়ে নিজের গর্তে ঢুকে পড়া খরগোশ। রিধিমার শরীরে শক্তি নেই লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখার। সুনয়নের দৃঢ় বাহুবেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ থেকে রিধিমা টের পেল সুনয়নের হৃদপিণ্ডও দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। কিন্তু যে বাহুদ্বয় তাকে জড়িয়ে আছে সেখানে সংযমের কড়া শাসনে মাংসপেশীগুলো লোহার মত শক্ত, প্রাণহীন। মাত্র কয়েকটা সেকেণ্ড কাটল, কিন্তু সময় থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। এবার একজন বলল— মিস, প্লিজ কাম উইথ আস।’ রিধিমা পারলে চোখ নাকের মত কান দুটোও বন্ধ করে ফেলত। ‘নো’ বলতে গিয়েও রিধিমা পাশে একটা আলোড়ন শুনতে পেয়ে চুপ করে গেল। পাশের সিটের মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছে – আমার কাছে এলেই আমি আমার হাতের শিরা কেটে ফেলব।’ রিধিমা মাথা তুলে তাকাল। মেয়েটার হাতে বাঁধা হাসপাতালের রিস্ট ব্যাণ্ড, হাতে একটা কিচেন নাইফ। মেয়েটা চিৎকার করে বলল, ‘এবার আমাকে তোমরা হাসপাতালে পাঠাতে পারবে না।’
‘জাস্ট হ্যাং লুজ,’ একজন কমলা জামা দু’হাত তুলে বলল।
রিধিমা এবার নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনল। লোকগুলো অদ্ভুত তৎপরতার সঙ্গে মেয়েটার দু’হাত ধরে ফেলল। মেয়েটা চেঁচিয়ে অশ্রাব্য গালি দিতে লাগল। লোকগুলো মেয়েটাকে হিঁচড়ে টেনে ট্রেন থেকে নামিয়ে নিল। একজন নামার আগে রিধিমাদের দিকে তাকিয়ে বলে গেল— ‘সরি ফোকস।’ ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সুনয়ন আবার সোজা হয়ে বসল। রিধিমার মুখের লালিমা গায়েব। নিউ ইয়র্ক সিটির এই রূপ সে কখনো জানত না।
‘রাতে এখানে অনেক ড্রাগ অ্যাডিক্ট ঘোরে। নিউ ইয়র্ক সিটির কোড ব্লু প্রটোকলে ৩১১ ডায়াল করে লোকে হোমলেসদের খবর দিতে পারে। তাছাড়াও প্রচুর কমলা জামা বড়বড় স্টেশনগুলোতে ট্রেন থামলে ট্রেনের ভিতরে ঢুকে হোমলেস খোঁজে।’
‘হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল।’
সুনয়ন রিধিমার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমাদের সামনের স্টেশনে নামতে হবে।’ সুনয়ন উঠে দাঁড়াল, ‘থার্টি ফোর্থ স্ট্রীট পেন স্টেশন আর পোর্ট অথরিটি আমাদের ডেস্টিনেশনের কাছের স্টেশন, কিন্তু দুটোই বড় স্টেশন, সব কটা এক্সিট পয়েন্টে পুলিশ কিংবা ক্রিমিনালদের থাকার সম্ভাবনা বেশি।
রিধিমাও উঠে দাঁড়াল। ফোরটিস্থ স্ট্রীটে রিধিমা সুনয়নের সঙ্গে ট্রেন থেকে নামল। ট্রেনটা পিছনে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে রিধিমা বলল, ‘হোমলেস প্যাসেঞ্জারদের পুলিশ অ্যারেস্ট করতে পারেনা?’
‘কোন অপরাধে? হোমলেস মানে তো ক্রিমিন্যাল নয়।’ সুনয়ন বলল। ‘এদের কাছে সাবওয়ের প্যাসেঞ্জারের টিকিট আছে, নামিয়ে দিতে পারবে না। নিয়ম হল সিটে শুয়ে থাকতে পারবে না। তাই পুলিশ এলে এরা উঠে পড়ে। কিন্তু কে আর সারা রাত ধরে খুঁজছে— কে শুয়ে আছে, কে বসে আছে। লাস্ট স্টপ এলে রেকর্ডার লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে এটাই লাস্ট স্টপ, সকলে নেমে যান – কিন্তু এরা কেউই নামে না।’
সাবওয়ের প্ল্যাটফর্মে রিধিমা দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলল। একজন মোটাসোটা অল্পবয়স্ক ছেলে দেওয়ালে হেলান দিয়ে পেইন্টের ড্রামের ওপর বসে পকেট ট্রাম্পেট বাজাচ্ছে। সাবওয়ের সিঁড়িটা এখানে পরিষ্কার, বরফ নেই তবে পিচ্ছিল। যতটা সম্ভব দ্রুতপায়ে দু’জন সিঁড়ি দিয়ে উপরে রাস্তায় উঠে এল। বাইরে বেরোতেই ঠাণ্ডা শরীরকে কামড়ে ধরল। ঝিরঝির করে বরফ পড়ছে, আজ পথ অতটা অন্ধকার নয়।
‘এগারটা চল্লিশ,’ সুনয়ন বলল। ‘একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে।’
‘কোথায় যাচ্ছি?’ রিধিমার কথা বলার সময় মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোল।
‘প্যাথ ট্রেনে নিউ জার্সি যেতে গেলে পেন স্টেশন বা গ্রাণ্ড সেন্ট্রাল দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এত বরফ পড়েছে যে আজ প্যাথ রেলরোড মেইন্টেনেন্স চলছে, সব ডাউন। কোথাও সুইচ ঠাণ্ডায় জমে গেছে, কর্মচারীরা ইন্সট্রুমেন্ট ঠিক করতে করতে ক্লান্ত।’
‘তাহলে শহর থেকে বেরোবো কীভাবে?’
‘মিড টাউন ফেরি,’ সুনয়ন বলল। ‘থার্টি নাইন স্ট্রীট। উবারে পনের মিনিট লাগবে। বারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলেই হবে হাডসনের ফেরি টার্মিনালে। লাস্ট ফেরি বারোটা দশে।’
এত রাতে এই ঠাণ্ডায় উবার পেতে দেরি হল। উইগুচিল নিয়ে মাইনাস টোয়েন্টি, কেভিন দ্য বুচারের মতই ডেডলি। প্রতিটি নিঃশ্বাস দেখা যাচ্ছে। ক্ষুরধার ঠাণ্ডা হাওয়া গালে দাঁত বসিয়ে যাচ্ছে। সুনয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে ও উদ্বিগ্ন। ফেরিঘাটের সামনে রাস্তাটা ভিতরে বেঁকে ক্যাব-স্ট্যাণ্ড। উবার ক্যাবের লাইনের পিছনে নামিয়ে দিল। উবার থেকে নেমে রিধিমা টাইম দেখল বারোটা পাঁচ। সুনয়ন দৌড় লাগাল। রিধিমা ওর পিছনে ছুটে কাঁচের দরজা দিয়ে ফেরি টার্মিনালের ভিতরে ঢুকল। ভিতরটা বেশ গরম, আলোকিত, অনেকটা এয়ারপোর্টের টার্মিনালের মত পরিষ্কার। অনেক লোক ফেরির অপেক্ষায়। সুনয়ন দৌড়ে টিকিট ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দুটো হোবোকেনের টিকিট দিন, সুনয়ন ঝুড়ি ডলারের নোট ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। হোবোকেনের কোথায়?’
‘এন জে ট্রানসিট।’
‘সরি, লাস্ট ফেরি অনেকক্ষণ আগে ছেড়ে চলে গেছে। আবার কাল সকালে আসবে।’
রিধিমার বুক ধক করে উঠল। তাহলে?
‘আপনাদের ওয়েব সাইটে লেখা হোবোকেনের লাস্ট ফেরি রাত বারোটা দশে?’
‘ওটা হোবোকেন ফোরটিস্থ স্ট্রীট।’
‘ওকে, তাহলে দুটো হোবোকেন ফোরটিছ স্ট্রীটের টিকিট দিন।’ তারপর সুনয়ন নিচু গলায় রিধিমাকে বলল, ‘হাডসন পার হওয়া নিয়ে কথা।’
টিকিট দিয়ে লোকটা বলল— স্লিপ নম্বর ফোর। তাড়াতাড়ি যান, ফেরি ঢুকছে।’
‘থ্যাঙ্কস,’ সুনয়ন টিকিট দুটো নিয়ে স্লিপ চারের গেটের দিকে দৌড়োতে শুরু করে বলল, ‘চলুন।’
কাঁচের দরজা খুলে ফেরিঘাটের জন্য বেরিয়ে আসতেই মনে হল আজ ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে। নিচে হাডসনের জল ছলাৎ ছলাৎ করছে। জলের ওপরের গ্যাংওয়ে বরফে পিছল। সাবধানে পা ফেলে সুনয়নকে অনুসরণ করে রিধিমা যতটা সম্ভব দ্রুতপদে চলল। হোবোকেনের ফেরিটা ডকে ঢুকে গেছে। বাইরে সোঁ-সোঁ আওয়াজে বরফকণা ছুটে চলেছে। হোবোকেনের ফেরিটা বরফের ঝাপটার মধ্যে দিয়ে কালো জলের ওপর ভেসে গভীর নিঃসঙ্গ হর্ণ বাজাল, ডকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ লোক সিঁড়ি দিয়ে জেটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভিতর থেকে একজন কৃষ্ণাঙ্গ লোক একটা বক্সের সুইচ টিপতেই ডাঙার গ্যাংওয়েটা নিচে নেমে লঞ্চে গিয়ে লাগল। ভিতর থেকে যাত্রীরা কেউ নামল না। সুনয়ন ফেরিতে ওঠার সময় কৃষ্ণাঙ্গ খালাসির পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘মী না সি সাচ ব্যাড স্টর্ম।’
‘গট লুজি?’ লোকটা নরম কণ্ঠে বলল।
‘না। আমি সিগারেট খাই না,’ সুনয়ন উত্তর দিল।
লোকটা কোনও উত্তর না দিয়ে দু’হাতের তালু ঘষে মুখে ফুঁ দিল।
অন্য যাত্রীদের আজ ভিড় আছে, MTA ট্রেন বন্ধ থাকায় জার্সি সিটির লোকেরা লঞ্চে করে বাড়ি ফিরছে। রিধিমা সুনয়নের সঙ্গে লঞ্চের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। ছোট লঞ্চ, ভিতরে একশটা মত সিট হবে। সব সিটই প্রায় ভর্তি৷ লঞ্চের ভিতরে গরম। হোবোকেনের ফেরিটা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংকে বাঁ দিকে রেখে ভেসে চলল। আজ জলে একদম ব্যস্ততা নেই। বাইরে হাওয়ায় বরফকুচি ছুটে চলেছে। কাঁচের জানলায় নিউ ইয়র্ক সিটি অস্পষ্ট। নদীর জল ছিটকে কাঁচে লেগে ঠাণ্ডায় জমে সেখানেই বরফ হয়ে সেঁটে যাচ্ছে।
সুনয়ন রিধিমাকে সঙ্গে নিয়ে ফেরির ভিতরে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে নিল। রিধিমাও লঞ্চের যাত্রীদের দিকে তাকাল, সন্দেহজনক কেউ নজরে এল না। দুজনে ভিতরে একটা বেঞ্চে পাশাপাশি বসল। লঞ্চটা হাডসনের উপর দিয়ে এগিয়ে চলল নিউ জার্সির দিকে, পিছনে তাকিয়ে রিধিমা দেখতে লাগল নিউ ইয়র্কের আবছা স্কাইলাইন, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিঙের মাথা কুয়াশায় ঢাকা। রিধিমার ভবিষ্যৎও সময়ের কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে৷
লঞ্চ হর্ণ দিল। ওপারে হোবোকেনের ফেরিঘাট আবছা দেখা যাচ্ছে।
হোবোকেনের ফেরিঘাটে নেমে সুনয়ন উবার ডাকল। নদীর এপারে বরফ পড়ছে না। পাঁচ মিনিটের অপেক্ষা, একটা নিশান অলটিমা এসে দাঁড়াল। ‘আমরা ঠিক কোথায় যাচ্ছি?’
‘জার্সি সিটি।’
জার্সি সিটির নেওয়ার্ক অ্যাভিনিউতে ঢুকলে মনেই হয় না যে এটা ভারতের বাইরে। ছোট রাস্তার দু’পাশে ইণ্ডিয়ান গ্রসারি, ধোসা-ইডলি-বিরিয়ানি-পরোটা-গোলগাপ্পের দোকান, একদম যেন মিনি ভারতবর্ষ। সব এখন বন্ধ। তারই মধ্যে গলি, তস্য গলি, খুব পুরোনো বাড়ি।
উবার একটা সরু গলির মুখে দাঁড়াল, দু-জনে গাড়ি থেকে রাস্তায় নামল । লোকালিটিটা খুব খারাপ, রাস্তায় দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিটি আঁকা, বাড়িগুলো কম করে দেড়শ বছরের পুরোনো, অস্বস্তিতে রিধিমার মুখ ফসকে মৃদু কণ্ঠে কথাটা বেরিয়ে গেল— ‘এই নেইবারহুডে?’
‘পাসপোর্ট জাল তো চার্চ বা টেম্পলে হয় না।’ সুনয়ন নির্লিপ্ত মুখে বলল। তারপর আশ্বাস দিল— ‘আমার চেনা, সেফ। ভয়ের কিছু নেই। চলুন।’
রাস্তায় পিচের ওপর এখনো বরফের স্তর। ‘সাবধান, ব্ল্যাক আইস থাকতে পারে,’ সুনয়ন বলল। হাঁটতে হাঁটতে রিধিমা চারদিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল, ‘একদম রান ডাউন সিটি।
‘এক সময় শহরটার খুব রমরমা ছিল, সুনয়ন বলল। ‘দোকান-পাট, রেস্টুরেন্ট— জমজমাট শহর। তারপর আমেরিকার ইকোনমিতে মন্দা আসতে শুরু করল, মালিকরা চিন, জাপান, কোরিয়া থেকে সস্তায় মাল কিনতে লাগল আর বেধড়ক লোক ছাঁটাই হতে আরম্ভ করল, লোকে তখন দূরদূরান্তের শহরে চলে যেতে লাগল— রয়ে গেল বড় বড় সব খালি বাড়িগুলো। তারপর থেকে শহরটাকে ভূতের শহর বলে মনে হয়।’
একটা অর্ধভগ্ন দোকান। ফাটা কাঁচের জানলায় কালো ইণ্ডাস্ট্রিয়াল টেপ লম্বা করে লাগিয়ে বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়ার ভিতরে প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। দোকানের দরজার মাথায় “স্যাণ্ডি ফটো স্টুডিও”-এর বোর্ড। দোকানের দরজায় কলিং বেল বাজাল সুনয়ন। বেল বাজল না। দু-বার টিপেও কোনও কাজ হল না, তখন দুম দুম করে দরজায় চাপড় লাগাল সুনয়ন।
দরজা এবার ফাঁক হল, একটা কালো মুখ। তারপর দরজাটা খুলে গেল। একজন মাঝবয়সি লোক তাড়াতাড়ি ওদের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে বলল, ‘তোমাদের দেরি দেখে চিন্তা হচ্ছিল।’
রিধিমা ভিতরে ঢুকল, একটা অতি দীন-দরিদ্র চেহারার ফটো স্টুডিও। স্মার্টফোন ক্যামেরার কল্যাণে আমেরিকার যে অজস্র মম-অ্যাণ্ড-পপ ফটো স্টুডিও বিজনেসে লালবাতি জ্বলেছে, বোঝাই যাচ্ছে এই দোকানটা সেই ক্যাটেগরিতেই আসে। সাদা ব্যাকড্রপের সামনে স্ট্যাণ্ডে দুদিকে রিফ্লেকটিভ আমব্রেলা, সফটবক্স লাইট, মাঝে স্ট্যাণ্ডে একটা নিকন ডিজিটাল ক্যামেরা দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু মেঝের একদিক গোটানো ছেঁড়া কার্পেট বলে দেয় এখানে কাস্টমার কেমন আসে।
লোকটার মুখে বিয়ারের গন্ধ। লোকটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে রিধিমার দিকে বারবার তাকাচ্ছে, রিধিমার অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। লোকটা দোকানের ভিতরের দরজা খুলে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল।
‘ওর্জুন ফোন করেছিল?’ সুনয়ন হাতের গ্লাভস খুলে জ্যাকেটের পকেটে ঢোকাল, তারপর জ্যাকেট খুলে দেওয়ালে টাঙানো হ্যাঙারে ঝোলালো।
‘হ্যাঁ, ফোনে সব বলেছে। ভিতরে চল।’ সুনয়ন আর রিধিমাকে নিয়ে ভিতরে প্রায় অন্ধকার হলওয়ের মধ্য দিয়ে একটা ঘরে নিয়ে গেল। সোফার ওপর একটা খোলা ল্যাপটপ। ‘আসুন আসুন, বসুন। সরি ফর মি ব্রুক আপ ইনলিস। আহবী ট্রু কুলি ইনলিস।’
সোফায় বসতে বসতে সুনয়ন রিধিমার সঙ্গে স্যাণ্ডির পরিচয় করিয়ে দিল। স্যাণ্ডি রিধিমার সঙ্গে করমর্দন করল। লোকটাকে দেখলেই মনে হয় স্ট্রীট স্মার্ট লোক। কিন্তু চোখে সেই অস্বস্তিকর দৃষ্টি।
‘এর পিছনে খুনি ও পুলিশ দুইই লেগেছে। একে বর্ডার ক্রশ করিয়ে দিতেই হবে স্যাণ্ডি,’ সুনয়ন বলল।
স্যাণ্ডি কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘মেক্সিকো বা ক্যানাডায় বর্ডার পার করে দিলে এর কোনও লাভ হবে না। ওকে ওখানেও মার্ডার করে দিতে পারে।’
‘ঠিক বলেছ। JFK থেকে ইণ্ডিয়ার প্লেনে চড়িয়ে দেব।’
‘কীভাবে?’ রিধিমা বলল।
‘আমাদের গায়ানিজ প্রচুর লোক আছে যারা এয়ারপোর্টের ফ্লোর মোছে। ওদের একজনের ID কার্ড স্ক্যান করে আপনাকে এমপ্লয়ি সাজিয়ে সিকিউরিটি জোনে ঢুকিয়ে দিতে হবে। আর আপনার হাতে বোর্ডিং পাস—’
‘কিন্তু ইণ্ডিয়াতে পৌঁছে?’ স্যাণ্ডি বলল।
‘দিল্লীতে পৌঁছে ইনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। তুমি শুধু এনার একটা পাসপোর্ট বানিয়ে দাও।’
‘কালকের ফ্লাইট?’
‘কাল বিকালের ফ্লাইট ধরা সম্ভব হবে না। এয়ার ইণ্ডিয়ার টিকিট কাটতে হবে, বোর্ডিং পাস জোগাড় করে তাতে জাল সিকিউরিটির স্ট্যাম্প লাগাতে হবে। আমি রিসার্চ করে ফেলেছি— পরশু বিকাল তিনটে পনেরর ফ্লাইট AI101-এ JFK থেকে ডিপার্চার।’
রিধিমা সুনয়নের দিকে তাকাল। সুনয়ন গলার চেন, হাতের আংটি খুলে ছোট পালিশ ওঠা কাঠের টেবিলে রাখল, পকেট থেকে বের করল কিছু ডলার। ‘এটা তোমার কাছে জমা থাক, স্যাণ্ডি।’
‘আর ইউ কিডিং বাড্ডি?’ স্যাণ্ডি সুনয়নের চেন আংটি ফিরিয়ে দিল। ‘কাজ হয়ে গেলে পয়সা দিয়ে দিও। ইউ ক্যান বরো মাই হুইলস। আমি যখন চার্চে যাব, ওখান থেকে তুলে নেব।’
রিধিমা পার্সে উঁকি মারল— ‘সাতশ ডলার আছে দেশ থেকে কালই ফিরেছি।’ তারপর ওয়ালেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে স্যান্ডিকে বলল, ‘এটা ডিক্লাইও হচ্ছে।
‘ডলারটা রাখুন, আপনার অনেক কাজে লাগবে। আর ক্রেডিট কার্ডটা ভুলেও ইউজ করবেন না,’ স্যান্ডি বলল। কোথায় সোয়াইপ করেছেন সে খবর ওদের কাছে চলে যাবে।’
‘কিন্তু আমার ক্রেডিট কার্ডটা বন্ধ করল কীভাবে?’
‘ফিশিং,’ সুনয়ন বলল। ‘কোনও একটা ইমেইল দিয়ে আপনার কম্পিউটারে একটা ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে আপনার ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ড, ব্যাঙ্ক ইনফরমেশন সব তুলে নিয়েছে।’
‘এটা কি সম্ভব? অন্য কেউ আমার ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করে দেবে?’
‘আপনি তো কুঁচো চিংড়ি। ফিশিং করে বড় বড় লবস্টারদের ঘায়েল করে দিচ্ছে এই হ্যাকাররা। অপারেশন অরোরার নাম শুনেছেন?’ সুনয়ন বলল।
‘না।’
‘চিনে গুগল এমপ্লয়িদের এই ফিশিং ইমেইল পাঠিয়ে ছিল। ধান্ধা ছিল কম্পিউটারগুলোকে ইনফেক্ট করে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউতে গুগলের হেড কোয়ার্টারের সার্ভার ধসিয়ে দেওয়া। ওরা গুগল সার্চ ইঞ্জিনের সোর্স কোডের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল। গুগল শেষ সময়ে জানতে পেরে তাড়াতাড়ি চিন থেকে ওদের সমস্ত অপারেশন তুলে আনে।’
স্যাণ্ডি বলল, ‘এই উইগে চলবে না। আপনার চেহারাটা বদলাতে হবে। খুব প্রফেশনাল হ্যাণ্ড দরকার। রাত প্রায় শেষ হতে চলল। আপনি পাশের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। কাল খুব সকালে আপনাকে দরকার হবে।
রিধিমা স্যান্ডির বেডরুমে ঢুকল। অস্বস্তিকর সিগারেটের গন্ধে কার সাধ্য এখানে ঘুমোয়। তারপর সারা সন্ধ্যা ঘুমোবার ফলে ঘুম কেটে গেছে। ডায়েরিটার অদম্য আকর্ষণ। ধর্ম পালটে কী হল দেবচরণ, তুলসী আর রাজকুমারীর?
