Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    প্রীতম বসু এক পাতা গল্প499 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    কপিলাবস্তুর কলস – ২৫

    ৷৷ পঁচিশ ৷৷

    মাঠে গমের ক্ষেতে বাতাসের ঢেউ, পাদ্রিরা খর্বকায় ঘোড়ার পিঠে বসে চলেছে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে, মানুষগুলোর মাথাটুকু শুধু দেখা যাচ্ছে দূর থেকে। পিছনে পিছনে দু’জন দেশি পাদ্রি পায়ে হেঁটে চলেছে, তাদের অনুসরণ করে চলেছে তল্লাবাঁশের লাঠি হাতে দেবচরণ, সঙ্গে তুলসী আর রাজকুমারী। তাদের পিছনে লাল পাগড়ি পরা বন্দুক কাঁধে চারজন ব্রিটিশদের সেপাই। সকালে দেবচরণদের ধর্মান্তরিত করার ঘটনার পর পাদ্রিরা আর ঝুঁকি নেয় নি। তড়িঘড়ি সামিয়ানা তুলে রওনা দিয়েছে সীমান্ত থেকে নিরাপদ দুরত্বে চলে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে নিয়েছে তাদের আশ্রয়প্রার্থী দেবচরণদের।

    দক্ষিণে ঘাঘরা থেকে উত্তরে নেপাল সীমান্ত পর্যন্ত পাললিক সমভূমিতে যেদিকে চোখ যায় শুধু ক্ষেত। খারিফের সময় গরমে এই মাঠে কালানমক ধান জন্মায়। বর্ষার পর শরতে মাঠে সুগন্ধ ছড়িয়ে যায়। ছোট দানার কালো কালো ধান একবার ফোটালে সারা গ্রাম ম ম করে, থারুরা বলে এটা বুদ্ধের উপহার তরাইকে। এখন শীত, তবু ভাতের কথা ভাবতেই ক্ষিদে চাগিয়ে উঠল দেবচরণের। কাল সন্ধ্যাবেলা মার্কাস সাহেবের তাঁবুতে ভাত জুটেছিল, তারপর আর পেটে কিছু পড়ে নি, সারা রাত ধরে ওরা হেঁটেছে আর দৌড়েছে। এখনো হেঁটে চলেছে। রাজকুমারীর শরীরে জ্বর আছে। কাল সারারাত ঠাণ্ডার ধকল গেছে, চারুদত্তের গরম উলের মাফলারটা রাজকুমারী ভালভাবে গলায় পেঁচিয়ে নিল।

    গোটা বাঁদিক জুড়ে শালবন, দূরে পাহাড়ের সারি। তরাইতে শালবন ক্রমশঃ দূরে সরে যাচ্ছে, ইংরেজরা শালের জঙ্গলের ইজারা নিয়ে গাছ কাটতে কাটতে শেষ করে দিয়ে সেখানে চাষবাস শুরু করিয়েছে। ডানদিকে অজস্র গম আর আখের ক্ষেতের মধ্যে এদিক ওদিকে জেগে উঠছে দুচারটে চালা ঘর। ক্ষেতে কাজ করতে করতে গান থামিয়ে চাষিরা ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। এ নতুন দৃশ্য কিছু না ওদের কাছে। প্রভু যীশুর দলে লোক নিতে এরা আসে প্রত্যেক সপ্তাহে।

    ক্ষেতের উপর দিয়ে এক ঝাঁক তিতির উড়ে গেল। খালের জলের বেরি থেকে বাঁশের দোনায় জল এসে হাতা দিয়ে উঁচু ক্ষেতের জমিতে পরে, চাষি চাষির বৌ মিলে সেই হাতা শক্ত করে বাঁধছিল, আর তাদের বাচ্চা ছেলে আদুল গায়ে গুলতি দিয়ে তিতির মারার জন্য মাটির গুলি ছুড়ছিল। দেবচরণ তাকে বারণ করল। থারুরা ভিতির মারে না।

    ঘোড়ার পিঠ থেকে সাহেব পাদ্রি বলল কেন?

    তা জানি না, দেবচরণ বলল।

    কানলার পথে একজন বাউল গান গাইতে গাইতে আসছিল, কপালে রসকলি। সাহেবদের দেখে গান থামিয়ে আলেই দাঁড়িয়ে একতারা কপালে ঠেকিয়ে বলল— জয় শ্রীকৃষ্ণ। সাহেবরাও হেসে বলল জয় প্রভু যীশু।

    নীলগড় অনেকটা রাস্তা। ওখানে একটা পরিত্যক্ত নীলকুঠিতে মিশনারীরা গীর্জা বানাচ্ছে। পাদ্রিরা এখন সেখানেই চলেছে। মাঝে মাঝে মেঠো গ্রাম জেগে উঠছে ক্ষেতের মধ্যে। ধানের গোলার পাশে রাখা হেঙ্গা, ফারাহা, খুরপি, হাসুয়া, গবাদি পশুর জাবের খড় কাটার গরাসি। গ্রামটা অল্প কজনের বস্তি, কুঁড়েঘরের ছাতে কুমড়োর লতা, ছাতে পাকা কুমড়ো দেখা যাচ্ছে। তিনজন লোক ঢোল পেটাচ্ছে। তাদের কাছে গিয়ে পাদ্রিদের ঘোড়া থামল। রংচঙে জরির পোশাক, গলায় মালা পরে একটা অল্পবয়স্ক বর বিয়ে করতে যাবার জন্য পালকিতে উঠল, পিছনে গোরুর গাড়িতে বরযাত্রী প্রস্তুত, সামনে একজন স্যাউলী বয়ে নিয়ে চলেছে। পালকির সঙ্গে চলেছে পঞ্চৈবাজা। বরযাত্রীর একজন লোকের মাথায় বিশাল পাগড়ি বাঁধা, দেবচরণ বুঝল সে বরকর্তা। দেবচরণ তুলসীর দিকে তাকিয়ে তুলসীর নীরব দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেল। দেবচরণ রাজকুমারীকে কাছে টেনে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। গুড়ের নাগরির অর্ডারটা হাতছাড়া না হলে, পয়সা যা আসছিল, কিছুদিনের মধ্যে মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় সেও শুরু করত। ম্যানেজারের কাছে কিছু টাকা অ্যাডভান্স নিত, মনে কত রঙিন স্বপ্ন, সব চুরমার হয়ে গেল। আবার সে কুমহালের কাজ শুরু করবে।

    গম ক্ষেত পেরিয়ে পথ এসে পৌঁছাল বালি ঢাকা শীর্ণ নদীর চড়ায়। এসব নদী পাহাড় থেকে নেমে এসেছে— মুসাই, মাসদি, দোই, মেখরা, ঘাঘুয়া এঁকেবেঁকে নিজের মত করে পথ বের করে জামুয়ারে গিয়ে মেশে। নদীগুলো এখন শীতে শীর্ণ, শান্ত, হাঁটু অবধি কাপড় তুলে পার হয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু বর্ষায় এদের অন্যরূপ। পাহাড়ের ঢল চারদিক ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এদিকে খারিফের ফসল বলতে ধান আর অড়হর। বাজরা, জোয়ার এদিকে একদমই কম হয়। নদীর সাদা বালিতে হাতির পায়ের যাওয়া আসার ছাপ। দেবচরণ জানে এগুলো পোষা হাতি, মাহুত এপথে জঙ্গলে নিয়ে যায় কচি পিপুল পাতা খাওয়ানোর জন্য। জঙ্গল থেকে কচি কচি বিশাল পাতার বোঝা বানিয়ে আবার হাতির পিঠে চাপিয়েই ফিরে আসে।

    নদী পেরিয়ে কাঁচা মেঠো পথ। মাটির বাড়ির উঠানে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় হচ্ছে। কোথাও চাষিবউ অড়হর গাছের ডালের ঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝটি দিচ্ছে। এদিকে মহুয়া গাছের আধিক্য, কোথাও মেটে চারচালার ভিতর থেকে উগ্র তাড়ির গন্ধ আসছে।

    সারাদিন ধরে চলে সন্ধ্যার আগে দূর থেকে গীর্জার অবয়ব দেখা গেল। গীর্জা প্রায় তৈরি। পাশে সারি সারি তাঁবু, সেখান থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাক শুনে ঘোড়াগুলো চঞ্চল হয়ে উঠল। দূরের মাঠে সূর্য অস্ত গেছে, ধুলোয় ঢাকা চরাচর অস্পষ্ট, ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে নেমে আসছে, আরও কাছে আসতে দৃষ্টিগোচর হল একদিকে চারটে উট খুঁটিতে বাঁধা, দুটো বিশাল হাতি কচি পাতা খেতে ব্যস্ত, কুলিদের একটা তাঁবুর ভিতর থেকে মৃদঙ্গ বাজিয়ে কেউ গান করছে তার আওয়াজ আসছে। দু’জন কুলি লোহার দণ্ড নিয়ে লোহার তারের বেড়ার দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, পাদ্রিদের দেখে দরজা খুলে দিল। পাদ্রিরা একজন কুলিকে বলল দেবচরণ, তুলসী ও রাজকুমারীকে একটা তাঁবুতে রাতের আশ্রয় দিতে। তারপর ওরা একটা বড় তাঁবুতে ঢুকে গেল।

    কুলিদের জন্য দুটো তাঁবু। পাশের তাঁবুতে মৃদঙ্গ বাজছে। দেবচরণ স্ত্রীকন্যাকে নিয়ে তাঁবুতে ঢুকল, তাঁবুর ভিতরে একটা দড়িতে লণ্ঠন ঝুলছে। নিচে কুলিরা কম্বল মুড়ি দিয়ে গুড়িসুড়ি মেরে বসে ছাংয়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে গল্প শুনছে। এক স্বপ্নের দেশের গল্প, যেখানে অনেকে গিয়ে আখের ক্ষেতে কাজ করে জমিজমা কিনে নিজেদের অবস্থা ফিরিয়েছে। এখনো সেখানে লোক নেয়, শুধু ভাগ্যবানেরাই সেখানে যেতে পারে। যে লোকটা গল্প বলছে তাকে দেখে দেবচরণ চমকে গেল—

    হীরালাল দালাল!

    পরের দিন সকালে পাদ্রি সাহেব দেবচরণকে নিজের তাঁবুতে ডাকল। ‘এখানকার কুলিদের কাজ প্রায় শেষ,’ পাদ্রি একটা চিঠি লিখতে লিখতে বলল। পিতরাওয়াতে স্তূপের কাজে লোক নিচ্ছে। একটা চিঠি লিখে দিলাম। পিতরাওয়াতে ফাদার গোমেজ এখন আছেন। তাকে দিও।’ সাহেব লেখা শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করল। ‘এখন রওনা দাও, সন্ধ্যার আগে পিতরাওয়া পৌঁছে যাবে।’

    চিঠি নিয়ে দেবচরণ তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল। একটু পরে তিনজনে রওনা দিল অজানা পিতরাওয়ার দিকে।

    মেথডিস্ট এপিসকোপাল চার্চের একটা মিশন বিদপুরে খোলা হয়েছে। এখান থেকে পাদ্রিরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রভু যীশুর গসপেল শোনায়। পিতরাওয়াতে ফাদার গোমেজকে পেতে অসুবিধা হল না দেবচরণের। চিঠি পড়ে ফাদার গোমেজ রাজকুমারীর দিকে তাকাল, তারপর বলল, ‘এখানে স্তূপ কাটা হচ্ছে লোক দরকার। চল ওদের সুপারভাইজারের কাছে।’

    দেবচরণ কাজ পেয়ে গেল। এখানে প্রতি কুলির পরিবারের আলাদা তাঁবু। দেবচরণ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, এখানে রানার সেপাই তাদের ছুঁতে পারবে না।

    ঘুমে চোখ ঢুলে এল রিধিমার। ডায়েরিটা রাখতে গিয়ে পিছনের পাতাগুলো এলোমেলো ওল্টাতেই নজরে এল লেখা মার্কাস ফিউরার সাতসকালে দুঃসংবাদটা পেল।

    আবার মার্কাস ফিউরার?

    কীসের দুঃসংবাদ?

    কৌতূহল রিধিমাকে আবার ডায়েরিতে টেনে আনল।

    মার্কাস ফিউরার সাতসকালে দুঃসংবাদটা পেল। পিতরাওয়ার স্তূপ খুঁড়ে পাথরের বাক্স পেয়েছে,’ একজন থারু কুলি উত্তেজিত হয়ে গর্তের ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল। মার্কাস তখন সাগরওয়ায় পঞ্চম স্তূপ খোঁড়ার তদারকিতে গর্তে নেমেছে। জানুয়ারি মাস, কুলিরা সকালে আসতে একটু দেরি করে, পাথুরে মাটি ঠাণ্ডায় জমি কামড়ে পরে থাকে, গাঁইতি যেন বসতেই চায় না। চার চারটে স্তূপ খোঁড়া হয়ে গেছে, কিন্তু আশানুরূপ কিছু পাওয়া যায় নি। এদের একটার থেকেও শাক্যদের হাড় পাওয়া যায় নি। মূল্যবান পাথর, সোনা-রূপার টুকরো এসবে কোনও আগ্রহ নেই মার্কাসের। মার্কাস অমর হতে চায়। অমরত্বের নেশাতেই সে তার দেশ ছেড়ে এই ম্যালেরিয়া ঠাসা নেপালের জঙ্গলে শীতে রাতের পর রাত কাটাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে এই দুঃসংবাদটা মনে হল শীতের সকালে তার গায়ে কেউ ঠাণ্ডা কনকনে জল ঢেলে দিল।

    ‘পাথরের বাক্স?’ মার্কাস কৌতূহলী। ‘কী পেয়েছে ভিতরে?’

    উপরের পাথরের ঢাকনা এখনো খুলে দেখেনি, কুলিটা বলল। ‘খুব ভারি, বাইরে আনা এত সহজ না। সাহেব বলেছে পুলি জোগাড় করতে হবে যাতে তোলার সময় না ভেঙে যায়।’

    মার্কাস ফিউরার দেখল নেপালী ক্যাপ্টেন তার দিকে হনহন করে হেঁটে আসছে।

    ‘খবরটা শুনেছেন?’ ক্যাপ্টেন বলল।

    মার্কাস গর্ত থেকে উপরে উঠে এল। ক্যাপ্টেন উদ্বিগ্ন, ‘ওখানে সত্যি সত্যি যুদ্ধের হাড় নেই তো?’

    প্রশ্নটা মার্কাসের নিজের কাছেও। অবশেষে তাহলে শাক্যদের রূপ পাওয়া গেল? এই স্তূপ মার্কাস নিজে সমস্ত নেপাল খুঁজেও পায় নি। অবশেষে—

    ‘ভারতের ঐ স্তূপে বুদ্ধের হাড় পাওয়া গেলে আমরা খুব অসুবিধায় পড়ব, ক্যাপ্টেন বলল।’

    ‘কেন?’

    ‘বুদ্ধের হাড়ের স্তূপটা কপিলাবস্তুতে থাকার কথা, ক্যাপ্টেনের চোখ-মুখে দুশ্চিন্তা। ‘তাহলে এটা প্রমাণিত হবে যে পিতরাওয়াই কপিলাবস্তু। কপিলাবস্তু নেপালে নয় ভারতে ছিল। নেপাল রাজদরবার এটা পছন্দ করবে না।’

    ‘নেপাল রাজদরবারের পছন্দ অপছন্দের ওপর নির্ভর করে তো আর ইতিহাস পালটে যাবে না,’ মার্কাস ফিউরার মন্তব্য করল।

    ‘ঐতিহাসিকরা ইতিহাস খুঁজে বের করে আর গুজব শুনেছি তুমি নাকি এমন পণ্ডিত যে নিজে ইতিহাস তৈরি কর,’ ক্যাপ্টেন মার্কাস ফিউরারকে বলল।

    ‘আমি?’ মার্কাস এটা প্রশংসা না নিন্দা সেটা বোঝার চেষ্টা করল।

    ‘হ্যাঁ, তুমি নাকি সেপ্টেম্বরে নেপালের কপিলাবস্তু থেকে বুদ্ধের হাড় পেয়ে সেটা বর্মার এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বিক্রি করেছ?’

    মার্কাস ফিউরার নিরুত্তর।

    ‘নেপাল রাজদরবার তোমাকে প্রত্নতত্ত্বের খনন কার্যের অনুমতি দিয়েছিল, তার একটা প্রধান শর্ত ছিল যে যা আবিষ্কার করবে সেটা নেপালের বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর তুমি বর্মায় পাঠিয়ে দিলে বুদ্ধের হাড়?’

    মার্কাস বুঝল এদের নজর সর্বত্র, তর্ক করার কোনও অর্থ হয় না। ‘এবার তোমাকে আমাদের হয়ে একটা কাজ করতে হবে,’ ক্যাপ্টেন বলল।

    ‘কী কাজ?’

    ‘তোমাকে আমাদের মত করে ইতিহাস লিখতে হবে।’

    ‘মানে?’

    পিতরাওয়ার স্তূপের নিচে পাথরের বাক্স খুলে সম্ভবতঃ পাওয়া যাবে বুদ্ধের হাড়। ওটা তোমার পরের স্তূপ খুঁড়ে বের হবে।

    ‘ওটা এখানে আসবে কীভাবে?’

    সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও,’ ক্যাপ্টেনের ঠোঁটে কুটিল হাসি।

    ‘আর ওরা যখন দেখবে পিতরাওয়ার স্তূপের ভিতরের বাক্স খালি, তখন?’

    ‘না না, ওরা খালি দেখবে কেন? ওরা দেখবে তোমার এইসব স্তূপের মধ্যে পাওয়া ঘট কলসীগুলো। ওগুলো আমরা ওদের বাক্সে রেখে আসব। আর তার মধ্যে রেখে আসব কিছু পোড়া হাড় যাতে ওদের মনে কোনও সন্দেহ না হয় ৷ ‘তার মানে?’

    ‘মানে তুমি যেভাবে নকল বুদ্ধের হাড় বর্মার সন্ন্যাসী ইউ মাকে দিয়েছ, আমরাও সেভাবে নকল হাড় এইসব কলসীতে ভরে রাখব। তারপর আমাদের বিশ্বস্ত কুলি পিতরাওয়া গিয়ে ওদের বাক্সের ঢাকনা ভেঙে ওখানকার ভিতরের বস্তু নিয়ে আসবে আর তার জায়গায় আমাদের পাওয়া কলসগুলো রেখে আসবে।

    ‘কিন্তু ব্রিটিশরা যদি ওটাকে বুদ্ধের হাড় বলে?’

    ‘কলসের গায়ে তুমি লিখে দেবে এটা শাক্যদের ভ্রাতা-ভগিনীদের হাড়।’

    ‘আমি লিখব? আমি সংস্কৃত জানি, কিন্তু ব্রাহ্মী লিপি ভাল জানি না।’ ক্যাপ্টেন দুরভিসন্ধিপূর্ণ হাসি হাসল— ‘তুমি পণ্ডিত লোক, যা ভাল মনে কর তাই লিখে দিও। মোটকথা বুদ্ধের হাড় আমাদের স্তূপ থেকে বেরোবে।’

    ক্যাপ্টেন ক্যাম্প ছেড়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল, মার্কাস ফিউরার চিন্তায় পড়ে গেল— ব্রাহ্মী লিপির যুক্তাক্ষর কিভাবে লিখতে হয় সে জানে না, এখন শেখারও সময় হাতে নেই, কাগজ নিয়ে একটা বিশ্বাসযোগ্য খসড়া লিখতে বসল ফিউরার।

    * * *

    পিতরাওয়ায় কুলিদের ছোট ছোট টালির চালের ঘর। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল দেবচরণের। রাজকুমারী আবার দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ ধর্ম পালটে প্রভু যীশুর ধর্ম নিয়েও ওর এই রোগ গেল না। দেবচরণ বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে মেয়েকে ধরে ঝাঁকাতে লাগল— ‘জাগ, রাজকুমারী চোখ খোল।’ বাবার ঝাঁকুনিতে রাজকুমারী চোখ মেলে তাকাল। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অন্ধকারে ওটা কী?’

    কিছু না, তুই স্বপ্ন দেখছিস।’

    ‘না, ঐ তো আলোটা চলে যাচ্ছে।’

    দেবচরণ অন্ধকারের দিকে তাকাল। অন্ধকারে হাজার হাজার জোনাকি। থারুরা বিশ্বাস করে যে যারা পাপী, নরকে গেছে, তারা জোনাকি হয়ে জন্মায়। রাতের বেলা পাতালের কয়েদখানার দ্বার খুলে ওদের মুক্ত করে দেওয়া হয়, ওরা সারা রাত অন্ধকারে জোনাকি হয়ে উড়ে আবার সকালের আলো ফোটার আগেই ফিরে যায় নরকে। চমনলালও নিশ্চয়ই ওদের এই ভিড়ে আছে। মশা পিনপিন করে মাথার সামনে ঘুরছে। এবার দেবচরণের নজরে এল স্তূপের গা ঘেঁষে সত্যিই একটা আলো বেরিয়ে যাচ্ছে, আলোর পিছনে দু’জন মানুষ একটা বাক্স ধরাধরি করে তুলে আনল।

    ‘শ-শ-শ,’ দেবচরণ তার মেয়েকে ইশারা করল।

    ‘ওরা কারা?’ রাজকুমারী ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল। ‘চোর,’ দেবচরণ মেয়েকে নিয়ে ঘাপটি মেরে বসল। ‘সাবধান, চোরদের কাছে বন্দুক থাকতে পারে।’ দেবচরণ মেয়েকে টেনে নিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে দরজা টেনে দিল। তারপর সাতহাতি তল্লাবাঁশের লাঠিটা নিয়ে ঘাপটি মেরে দেবচরণ আবার অন্ধকারে বেরিয়ে এল। আলোগুলো অনেকটা এগিয়ে গেছে। দেবচরণ তল্লাবাঁশের তেলে পাকানো লালচে সাত হাতি লাঠিটা হাতে নিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল। ওরা স্তূপের ভিতর গেছিল নিশ্চয়ই কিছু বদ মতলবে। দ্রুতপায়ে এগিয়ে চলল দেবচরণ। থারুদের চোখ অন্ধকারে নাকি হায়নার মত জ্বলে। লোকগুলো নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে, ক্রমশঃ ওদের গলার আওয়াজ স্পষ্টতর হচ্ছে। দেবচরণ দেখল ওরা একটা কাঠের বাক্স ধরাধরি করে নিয়ে আসছে। কাঠের বাক্স? তারমানে ঐ পাথরের বাক্সের ভিতর একটা কাঠের বাক্স ছিল? বাক্স বইতে বইতে লোকগুলো এবার হাঁফিয়ে উঠল। সামনে ইটখোলার পাশে কাঁকরের আড়ত। আশেপাশের কোলিয়ারি থেকে তুলে এনে জায়গায় জায়গায় ডাই করে রাখা কালো তেলিয়া কাঁকর, দুধের মত ধবধবে দুধিয়া কাঁকর, তাছাড়া সফেদ, বিচ্ছুয়া কত বিভিন্ন ধরণের কাঁকর স্তূপ করে রাখা। ইটখোলার ইটের গুঁড়ো সুরকির স্তূপ। তার পাশের মিহি বালুয়া কাঁকরের স্তূপের পাশে লুকিয়ে দেবচরণ অপেক্ষা করতে লাগল। বাক্সটাকে কাঁকরের স্তূপের কাছে রেখে একজন গেল হিসি করতে। একটা পাথরের ওপর বসে বাকি দু’জন জিরিয়ে নিতে লাগল।

    কাঁকরের স্তূপের গায়ে বসে দেবচরণ। মহুয়ার গন্ধ লোকটার গায়ে। এই সুযোগ। দেবচরণ মিহি বালুয়া কাঁকর হাঁতের মুঠোয় তুলে লোকটার চোখ লক্ষ্য করে ছুড়ে দিল। আচমকা চোখে বালি ঢুকে যাওয়ায় লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগল। লাঠিটা শক্তহাতে ধরে লোকটা কিছু বোঝার আগেই দেবচরণ লাঠিটা মুগুরের মত ঘুরিয়ে দিল। লাঠি লোকটার কপালে রক্তের স্রোত বইয়ে দিল। লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ল। আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। সঙ্গীর চিৎকারে দ্বিতীয়জন ছুটে এল। কিন্তু ওর কোমরে এত জোরে মারল দেবচরণ যে লোকটা কোমরে হাত দিয়ে মাটিতে বসে কাঁতরাতে লাগল। হ্যারিকেন হাতে তৃতীয় লোকটা বেগতিক দেখে পালাতে যাচ্ছিল, পিছন থেকে লাঠিটাকে ওর সুষুমার মাঝামাঝি দুরমুষ করার মত গুঁতো মারতেই লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল নিচের সুরকির স্তূপে। দেবচরণ কাঠের বাক্সটার কাছে ফিরে এল, দেবচরণকে দেখে কোমর ভাঙা লোকটা চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে লাফ দিয়ে ইটখোলার নিভে থাকা চুল্লীতে নেমে গেল। বাক্সটা আকারে বড়, একার পক্ষে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না, দেবচরণ দ্রুতহাতে বাক্সটার ভাঙা ঢাকনাটা খুলল, ভিতরে একটা কলস, অনেকটা মার্কাস সাহেবের ঘটের মত। দেবচরণ কলসটাকে বুকে জড়িয়ে ছুটতে ছুটতে কুলিদের ডেরায় ফিরে এল।

    ঘরে এসে হাঁফাতে লাগল দেবচরণ।

    তুলসী জেগে উৎকণ্ঠায় বসে ছিল। ‘কী হল?’ তারপর কলসটা দেখে বলল, ‘এটা কী?’

    ‘এটাকে শিগগির লুকিয়ে ফেলতে হবে,’ দেবচরণ বলল। ঘটের ঢাকনা আটকানো। ঘটের গায়ে কিছু লেখা, দেবচরণ লেখপড়া জানলে বুঝতে পারত কী লেখা আছে।

    তারপর দেবচরণ সংক্ষেপে তার সংঘর্ষের কাহিনি বলল। ‘চোরেরা এটা স্তূপ থেকে বের করে নিয়ে পালাচ্ছিল। আমি এটাকে বাঁচিয়ে ফেরত আনতে পেরেছি। কাল সকালে সাহেবকে দিয়ে দেব।’

    ঘরের কোণে মাটির কলসী। দেবচরণ চোরদের ছোট কলসীটাকে তুলসীর ওড়নায় মুড়ে নিজের কলসীর ভিতর ঢুকিয়ে দিল, তারপর তার ওপর গম ঢেলে দিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কলসীতে গম রাখা আছে।

    পরের দিন সকালে বির্দপুর থেকে স্তূপে এল উইলিয়াম চেপ্পি সঙ্গে আরও কয়েকজন সাহেব। উইলিয়াম চেপ্পি নিজে নামল গর্তে। বাক্সের ওপরের ঢাকনাটা ভাঙা। চেপ্পি নিজের হাতে পাথরের ভাঙা ঢাকনাটা সরাল আত্মপ্রকাশ করল পাঁচটি মাটির ঘট আর কৌটো। উইলিয়াম চেপ্পি উত্তেজিত।

    দেবচরণ এবার বিস্মিত। পাঁচ পাঁচটা ঘট ভিতরে কীভাবে এল? চোররা তো কিছু নিয়ে পালাচ্ছিল, তাহলে পাথরের বাক্সে এসব? দেবচরণ সাত-পাঁচ ভাবতে লাগল কীভাবে সাহেবকে বলবে এই কলসের কথা। কিন্তু চেপ্পির কাছাকাছি যাওয়া মুস্কিল। উত্তেজিত সাহেবরা চেপ্পিকে ঘিরে আছে, একজন থারু কুলির পক্ষে তাদের ভেদ করে চেপ্পি সাহেব পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব না। শীঘ্রই চেঞ্জি সাহেব ও অন্যান্য সাহেবরা তাদের আবিষ্কার নিয়ে রওনা দিল বির্দপুর এস্টেটের দিকে। দেবচরণ ঠিক করল পরের দিন সকালে ও নিজে এই কলস নিয়ে বির্দপুর যাবে আর সাহেবকে সব কথা বলবে।

    ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরল চিন্তিত দেবচরণ। চোর এসেছিল এ কথা সে কুলিদের সর্দারের কানে তুলবে না। চোরেরা জেনে গেলে সকলের বিপদ। আমরা কুলি, আমরা কেন নিজেদের বিপদে ফেলব? যা বলার তা চেঙ্গি সাহেবকেই বলব। দেবচরণ ভাবল শুধু শুধু ঝামেলায় পা বাড়াবে না। দেবচরণের মনে প্রশ্ন জাগল বাক্স তোলার পুলি আনার জন্য তিন দিন লাগল? আর বাক্স উপরে না তুলে যখন গর্তের ভিতরই ঢাকনাটা সরিয়ে ওই কৌটোগুলো গর্ত থেকে বের করল তখন সাহেব কেন তিনদিন আগেই ঢাকনাটা সরিয়ে কৌটোগুলো বের করল না?

    দেবচরণ বুঝল ব্যাপারটা বেশ জটিল। সম্ভবতঃ সাহেব জানতে পেরেছে যে চোর এসেছিল, তাই তড়িঘড়ি বাক্সের ভিতরে কী আছে সেটা জানার জন্য গর্তের ভিতরেই ঢাকনা খুলে ফেলল।

    পিতরাওয়াতে স্তূপের আশেপাশে এবার খোঁড়ার কাজ শুরু হল। দেবচরণ ভাবল তুলসীকে গিয়ে একবার জানিয়ে আসে। বিকালে কাজ থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে তাঁবুতে ফেরার সময় দেবচরণ দেখল পাল্পা রাজার ক্যাপ্টেন পিতরাওয়ার চৌকিতে ঢুকছে, সঙ্গে চারজন সেপাই।

    এই ক্যাপ্টেন এখানে কেন? দেবচরণ প্রমাদ গুনল। তবে কি ওদের এখানে ধরতে এসেছে? দেবচরণ তাড়াতাড়ি তাঁবুতে ফিরে এল। ‘রানার ক্যাপ্টেন সঙ্গে চারজন সেপাই নিয়ে এসেছে। আমার কিন্তু ভাল ঠেকছে না। ওরা নিশ্চয়ই আমাদের খোঁজ করছে। মেয়েকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে?’

    তুলসীর মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল— ‘এখন কী হবে?’

    ‘ওরা হয়তো এদিককার কুলিদের মধ্যে আমাদের খোঁজার জন্য তল্লাশি চালাবে।’

    ‘তাহলে? আমরা এখন কী করব?’

    আমার মনে হচ্ছে ওরা আমাদের এখানে আসবে। লোকটা আমাকে মার্কাস সাহেবের তাঁবুতে দেখেছে। আমাকে দেখলে ওর সন্দেহ হবেই,’ দেবচরণ টাকা পয়সা ট্যাঁকে গুঁজে নিল, হাতে তল্লাবাশের লাঠি, কোমরে কুকরি, আর সঙ্গে নিল সেই মূল্যবান কলস। ‘গমের ক্ষেতে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি ওরা এদিকে আসে কিনা।’ দেবচরণ বলল। ততক্ষণে তুলসী তার কাঠের খড়্গাভূত ও পাঁচুয়ার মূর্তি তুলে নিয়েছে, তিনজনে যখন পিছনের মাঠে নেমে দৌড়োতে দৌড়োতে এক মানুষ উঁচু গমের ক্ষেতে ঢুকে পড়ল তখন লাল পাগড়ি মাথার দু’জন ইংরেজদের পুলিশের সঙ্গে রানার ক্যাপ্টেন ও চারজন সেপাই কুলিবস্তিতে ঢুকল।

    দেবচরণ তুলসী আর রাজকুমারী গমের ক্ষেতের মধ্যে বসে রইল। দেবচরণ ফিসফিস করে বলল, ‘কুলিবস্তিতে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখান থেকে পালাতে হবে।’ এবার তিনজনে মাথা নিচু করে উবু হয়ে দূরের দিকে চলতে লাগল। এবছর শীতের শুরুতে এ তল্লাটে বেশ ভালরকম হাথিয়া হয়েছে। বৃষ্টির জলে এখনো মাটি স্যাঁতস্যাঁতে, আর্দ্র। এই ভেজা পলিমাটিতে চলতে কষ্ট হয়, পা কাদায় মেখে যাচ্ছে। দেবচরণ মাথা উঁচু করে দেখল, পশ্চিমে যেতে পারলেই ভাল হত, গ্রাম থেকে দূরে যাওয়া যেত। কিন্তু ওদিকে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা পালিহার, চাষী খারিফের ধান কেটে নেওয়ার পর আর রবিশস্য বোনেনি যাতে মাঠের উর্বরতা কমে না যায়। বর্ষার ধান এত হয় যে তার পুষিয়ে যায়। ওদিক দিয়ে গেলে ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা বেশি। দক্ষিণের ক্ষেতগুলো তকরার, রবিশস্যে ভরা। গ্রামের কাছাকাছি গোয়িন্দ জমিতে মটর বুনেছে আর দূরের জমিতে মসুর, কলাই, তিল, তিসি আর দিগন্ত বিস্তৃত গম আর যবের ক্ষেত। মুশকিল হল ক্ষেতে গাছ সতেজ হয় কাদামাটিতে। তাই যেখানে উঁচু আড়াল সেখানে মাটি প্যাচপ্যাচে। উবু হয়ে দূরের মাঠের দিকে চলতে চলতে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাল দেবচরণ— হে ভগবান কখন সূর্য ডুববে। অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেবচরণের মনে পড়ল বড় সিপার গুরুবার কথা— এ মেয়ে তোদের কোথাও থিতু হতে দেবে না। পুণ্যগিরির থানে তিনফোঁটা রক্ত দেওয়া হল না, ওরা ক্রমশঃ আরও দূরে চলে যাচ্ছে।

    কিছুক্ষণ পর একসময় সূর্য মাঠের ওপারে ডুবে গেল। আকাশে রক্তরঙ ছড়িয়ে গেল, তুলসী বলল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

    ‘বির্দপুর।

    ‘সাহেবকে কলসীটা দেবে?’

    ‘না, আগে ফাদার গোমেজকে গিয়ে সব বলি। উনি আমাদের অবস্থাটা সব জানেন। উনি যা বলবেন তাই করব।’

    শীতের সন্ধ্যায় আকাশের আলো শীঘ্রই মরে এল। তিনটে প্রাণী এখন ক্ষেতের অন্ধকারে মিশে গেছে। ডানদিকে ভূতের বাড়ির মত বিশাল নীলকুঠি। এসব মাঠে আগে নীল চাষ হত, ইংরেজদের নীলকুঠি ছিল বেশ কয়েকটা, কিন্তু নীল ব্যবসাতে মুনাফা না থাকায় জমিতে নীল চাষ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । দেখেই বোঝা যায় অনেক বছর এখানে কেউ থাকে না। এটা পরিত্যক্ত। নীলকুঠির পিছনে বিশাল পুষ্করিণী।

    ‘আর কত দূর?’ রাজকুমারী বলল। ব্যথায় পা টনটন করছে।

    ‘চলতে থাক।’ দেবচরণেরও মাথায় ঘুরছে ভাবনা ফাদার গোমেজকে কোথায় পাওয়া যাবে।

    ‘কোথায় খুঁজবে ফাদার গোমেজকে?’ তুলসী বলল।

    ‘গীর্জায়।’

    বির্দপুর মেথডিস্ট এপিসকোপাল চার্চের ভিতর মিশনারীদের ডাক্তারের সামনে কুলিরা লাইনে বসেছিল। এক এক করে বসন্তের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে শীতকাল থেকেই গুটিবসন্ত শুরু হয়ে যায়, বসন্তকালে প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই গ্রামবাসীরা একদিকে যেমন বসন্তের দেবী মা শীতলার থানে দণ্ডী কাটে, ধুনো দিয়ে আরতি করে, মায়ের জন্য কাঁকড়া, মাছ, সবজির ভোগ চড়ায়, তেমনি মায়ের দয়া রোগ থেকে রক্ষা পেতে সাহেবদের ডাক্তারের কাছে এসে শীতকালে টিকাও নেয়। স্ত্রী-কন্যা সহ দেবচরণকে দেখে ফাদার গোমেজ অবাক।

    দেবচরণ হাতজোড় করে বলল ‘প্রভু যীশুর জয় হোক। ফাদার আমরা খুব বিপদে পড়েছি।’

    ‘তুমি তো পিতরাওয়াতে ছিলে?’ ফাদার গোমেজ জিজ্ঞাসা করল।

    ‘হ্যাঁ ফাদার,’ দেবচরণ হাত জোড় করল। ‘ফাদার আপনার সাহায্য চাই।’

    ‘ভিতরে চল,’ ফাদার গোমেজ বলল। পাদ্রির পিছন পিছন দেবচরণ, তুলসী আর রাজকুমারী একটা কক্ষে প্রবেশ করল। সেখানে প্রভু যীশুর মূর্তির সামনে মোম জ্বলছে।

    ‘বল,’ ফাদার বলল।

    ‘আজ নেপালের রানার সেপাই আর তাদের ক্যাপ্টেন এসেছে পিতরাওয়াতে আমার মেয়েকে ধরে নিয়ে যাবার জন্য।’

    ‘রানা জানল কীভাবে তুমি ওখানে?’

    ‘কাল রাতে ওরা এসে পিতরাওয়ার স্তূপের থেকে একটা বাক্স চুরি করে পালাচ্ছিল। বাক্সের ভিতর একটা কলসী ছিল। আমি চোরদের হাত থেকে সেটা বাঁচিয়েছি। ওরা বোধ হয় আমাকে চিনতে পেরে গেছে। সেখান থেকেই রানা খবর পেয়ে সৈন্য পাঠিয়েছে।’

    ‘কী বলছ?’ ফাদার অবাক। ‘কলসীটা তোমার কাছে আছে?’

    ‘হ্যাঁ ফাদার।’ দেবচরণ তুলসীকে ইঙ্গিত করল। তুলসী এবার ওর সঙ্গের কলসী থেকে গম সরিয়ে বের করে আনল ওড়নায় আচ্ছাদিত সাজিমাটির কলসী। পাদ্রি কলসীটা ভাল ভাবে দেখল। ওর গায়ে হিজিবিজি লেখা। পাদ্রি লণ্ঠনটা কাছে এনে লেখার দিকে তাকাল।

    পাদ্রির কপালে ভাঁজ বিদপুর ‘এটা পিতরাওয়ার স্তূপ থেকে বেরিয়েছে?’

    ‘হ্যাঁ,’ দেবচরণ বলল।

    ‘তুমি চেপ্পি সাহেবকে এটা বলনি কেন?’

    ‘সাহেবকে বলার সুযোগই পাইনি। অন্য সাহেবরাও ছিল। ওরা স্তূপের নিচ থেকে অনেক কিছু জিনিস তুলল, তারপর বির্দপুর চলে এল।’

    ‘হুম,’ পাদ্রি গম্ভীর। তারপর বলল, ‘জোসেফ, কাল সকালে আমি তোমাকে চেপ্পি সাহেবের কাছে নিয়ে যাব। তুমি কলসীটা সঙ্গে নেবে। যা যা ঘটেছে সব সাহেবকে বলবে।’

    দেবচরণ মাথা নাড়ল। একটা বিশাল বোঝা মাথা থেকে নামল।

    ‘আমি এখন তাহলে কী করব ফাদার?’ দেবচরণ ভয়ার্ত কন্ঠে বলল।

    ‘কোনও ভয় নেই,’ ফাদার জোসেফ বলল। ‘প্রভু যীশু রক্ষা করবেন। তোমরা পথক্লান্ত, মুখ দেখে মনে হচ্ছে ক্ষুধার্ত। চল বাইরে।’

    অনেক রাতে দেবচরণের ঘুম ভাঙল। দরজায় লণ্ঠন নিয়ে ফাদার গোমেজ দাঁড়িয়ে। ‘খুব খারাপ খবর দেবচরণ।’ দেবচরণ বিছানায় উঠে বসল, তুলসীও উঠে বসেছে।

    ‘কী হয়েছে ফাদার?

    ফাদার পল পিতরাওয়ার খবর দিলেন। ওখানে চৌকিতে শুনেছেন যে তোমার মেয়ের নামে পুলিশের কাছে নালিশ হয়েছে। তোমার মেয়ে নাকি নেপালে একজন মাহাতোকে খুন করে পালিয়েছে। চৌকিদার তোমার মেয়েকে খুঁজতে গোরাইতদের পাঠাবে বিদপুর—।’

    ‘এর সমস্তটা মিথ্যা ফাদার’ দেবচরণ হাউমাউ করে উঠল। ‘আমার মেয়ের ওপর খালি বাড়িতে অকথ্য অত্যাচার করতে গেছিল ওই মাহাতো। ওর বৌ মন্দির যাওয়ার পথে হঠাৎ বাড়ি ফিরে সেটা দেখে ফেলে আর রাগে অন্ধ হয়ে মাহাতোকে খুন করে। আমরা ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম ফাদার। প্রভু যীশু জানেন আমরা নিরাপরাধ।’

    ফাদার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘তোমাদের পালিয়ে না এসে প্রধান পঞ্চের কাছে নালিশ জানানো উচিত ছিল।’

    ‘নালিশ? গরিবের নালিশ কেউ কানে নেয়?

    ফাদার গোমেজ বুঝল। ‘নেপাল আর ব্রিটিশদের মধ্যে একটা সমঝোতা আছে। ভারত থেকে কোনও আসামী নেপালে পালিয়ে গেলে, নেপাল সরকার তাদের গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশদের ফেরত দেয়। সেপাই বিদ্রোহের সময় অনেক সেপাই পালিয়ে গিয়ে নেপালের তরাইতে আশ্রয় নিয়েছিল। নেপালের রানা তখন তাদের ধরে ধরে ব্রিটিশদের হাতে সমর্পণ করে। সেরকম নেপালের আসামীদেরও ওদের হাতে বিচারের জন্য ব্রিটিশরা তুলে দেয়। আমরা নিরুপায়।

    ‘তাহলে?’

    ফাদার বলল, ঠিক আছে। পুলিশ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। যা শোনা গেছে ওরা কাল সকালে এদিকে আসবে। আমাদের এখানে পুলিশ আসার আগেই তোমাদের আমরা এখান থেকে সরিয়ে দেব।’

    ‘কীভাবে? কোথায় যাব?’

    ‘কাল কাকভোরে কিছু কুলিদের নিয়ে গোরুর গাড়ি ছাড়বে। তুমি ওদের সঙ্গে পালাও।’

    ‘কোথায় যাবে গোরুর গাড়ি?’

    উসকাবাজার। এখান থেকে বাইশ কিলোমিটার দূর, গোরুর গাড়িতে প্রায় সাড়ে চার পাঁচ ঘন্টা লেগে যাবে পৌঁছোতে।’

    ‘ওখানে কেন যাচ্ছে কুলিরা?’

    ‘উসকাবাজার স্টেশন থেকে রেলগাড়িতে চড়বে।’

    ‘রেলগাড়ি?’

    ‘বেঙ্গল এণ্ড নর্থ ওয়েস্টার্ন রেল চলাচল শুরু হয়েছে। নেপাল থেকে গোরখপুর পর্যন্ত লাইন জুড়ে গেছে। চাল আর গম ট্রেনে করে সারা উত্তর ভারত থেকে ক্যালকাটা হয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে যায়। সেই ট্রেনে কুলিরা চলে যাচ্ছে ক্যালকাটা। তোমরাও ওদের সঙ্গে চলে যাও।’

    ‘কলকাতা! শুনেছি ও তো বিরাট শহর! আমি তো কারুকে চিনি না সেখানে!’ ‘এখানে থাকলে তোমার মেয়েকে কিছুতেই বাঁচাতে পারব না। তোমাদের যেতেই হবে দেবচরণ। আমি লোক পাঠাচ্ছি গারোয়ানকে খবর দিতে। কাল সকালে তোমাদের এখান থেকে তুলে নেবে।’

    ‘এই কলসীর দায়িত্ব কে নেবে ফাদার?’

    ‘কলসীটা তুমি মাঠে রানার লোকের থেকে উদ্ধার করেছ। রানার লোকেরা বলবে যে ওটা ওদেরই। তুমি না থাকলে রানার বিরোধিতা করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আর তুমি এখানে থাকলে তোমার মেয়েকে রক্ষা করা যাবে না। আমি একটু আধটু ব্রাহ্মী পড়াশোনা করেছি। আমি ঐতিহাসিক নই। তবে এটুকু মনে হচ্ছে যে এটা এক অমূল্য বস্তু। ক্যালকাটায় আমার জানা একজন পাদ্রি আছেন ফাদার শিলটন, তিনি খুব অভিজ্ঞ, তাকে এটা দেখিও। এটা গমের কলসীর মধ্যেই লোকানো থাক।’

    বাকি রাত দুশ্চিন্তায় ঘুম এল না দেবচরণের। থারুরা কখনো ঘাঘরার দক্ষিণে যায় না। একেবারে কলকাতা? বাইরের মাঠে শেষ প্রহরের শিয়াল ডেকে যাওয়ার পর রাস্তার কুকুরদের চিৎকার শোনা গেল, ক্যাঁচোর-কোঁচর করে এসে উপস্থিত হল গোরুর গাড়ি। ফাদার গোমেজ দেবচরণকে ডেকে বলল, ‘নেপালের রানার হাত কিন্তু অনেক লম্বা। ও নিজে ক্যালকাটায় ইংরেজি কলেজে পড়াশোনা করেছে, অনেক ব্রিটিশ অফিসারের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব। নিশ্চয়ই তোমাদের পালাবার খবর টেলিগ্রাফে চারদিকে ছড়িয়ে দেবে। রেলস্টেশনে তোমাদের ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব।’

    ‘তাহলে?’ দেবচরণ উদ্বিগ্ন।

    ‘এই চিঠিটা রেল ইঞ্জিনের চালককে দেবে,’ ফাদার গোমেজ সাদা আলখাল্লার ভিতর থেকে দুটো ভাঁজ করা কাগজ দেবচরণকে দিল। ‘আর এই চিঠিটা কলকাতায় সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালের ফাদার শিলটনকে দেবে। ঠিকানা লেখা আছে। কেউ যেন দেখতে না পায়।’

    দেবচরণ কাগজটা ফতুয়ার পকেটে রেখে গোরুর গাড়ির কাছে এল।

    ফাদার গোমেজ সঙ্গে এল। দেবচরণ গোরুর গাড়িতে ওঠার আগে ফাদার ফিসফিস করে সাবধান করে বলল, ‘দেবচরণ, কলসীটাকে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না।

    দেবচরণ মাথা নাড়ল, তারপর ছইয়ের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। ছইয়ের ভিতর লোকে ঠাসা। অন্ধকারে মুখ বোঝা যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা এড়াতে সবাই কম্বলে শরীর ঢেকে মুড়িঝুড়ি দিয়ে বসে। তুলসী আর রাজকুমারী ওদের পাশে গিয়ে বসল ৷

    ছইয়ের ভিতর ঢুকতে ঢুকতে দেবচরণ ভাবল কে এত কুলিকে নিয়ে যাচ্ছে কলকাতা? গারোয়ানের পাশে বসে থাকা সুতানিয়া-জামা-কম্বলের কোট পরা লোকটার দিকে চোখ গেল দেবচরণের।

    হীরালাল!

    উসকাবাজার স্টেশনে কুলিদের নামিয়ে দিল গোরুর গাড়ি। উসকাবাজারে প্রচুর বেচাকেনা হয়। পাহাড়ের মাল সমতলে যায়, সমতলের মাল উত্তরের পাহাড়ে। নেপাল থেকে লোহা, ওষুধ, মশলা আসে, গোরখপুর থেকে আসে হলুদ, ছাপরা থেকে তামাকু, দক্ষিণ থেকে ঘাঘরা পেরিয়ে আসে বাসন-কোসন, তুলো, নুন। গোরুর গাড়ি সন্ধ্যাবেলা ফিরবে ব্যাপারীদের মাল ঠেসে ।

    হীরালাল দেবচরণের কাছে এগিয়ে এল – ‘ফাদার গোমেজের লোক আমাকে সব বলেছে। ভারতে বা নেপালে তুই বেশিদিন পালিয়ে পালিয়ে থাকতে পারবি না। ওরা তোর মেয়েকে নেপালে পাঠিয়ে দেবেই। আমার কথা শোন, গায়ানায় পালিয়ে যা। দশ বছরের চুক্তি, ভাল না লাগলে তারপর ফিরে আসতে পারবি। ততদিনে এদিকে সকলে ভুলে যাবে। হয়তো রানাই ততদিন টিকবে কিনা কে জানে। ভাল করে ভাব দেবচরণ।’

    দেবচরণের আর মাথায় ভাবনা চিন্তা করার ক্ষমতা নেই। সে তুলসীর দিকে তাকাল। তুলসী স্বামীকে সব সময় ভরসা করে এসেছে। কিন্তু এটা জীবনের এক বড় সিদ্ধান্ত।

    ‘রেলগাড়ির টিকিট কাটতে হবে। এই সমস্ত কুলিদের টিকিটের খরচা আমার। এদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার। তোর টিকিট কি কাটব?’

    ‘যা আছে কপালে,’ দেবচরণ বিড়বিড় করে বলল। ‘কাটো।’

    রেলইঞ্জিন কয়লার ধুঁয়ো আকাশে ছড়াতে ছড়াতে এল। নিচু সুড়কি বিছানো প্ল্যাটফর্ম। ছোট পাদানি সিঁড়ি দিয়ে রেলগাড়িতে উঠতে হয়। হীরালাল কুলিদের ও তাদের পরিবারকে সারি দিয়ে এক দিকে দাঁড় করাল। দেবচরণের মাথায় ফাদার গোমেজের সাবধানবাণী ঘুরছে, ইষ্টিশনে নিশ্চয়ই পুলিশ চেক করবে। দেবচরণ ইঞ্জিনের দিকে অগ্রসর হল। ইঞ্জিনবাবু একজন গোরা, মাথায় ঢাউস টুপি। দেবচরণ ইঞ্জিনবাবুকে ফাদার গোমেজের ভাঁজ করা চিঠিটা দিল । ইঞ্জিনবাবু চিঠিটা পড়ে দেবচরণের দিকে তাকাল। ‘তোর পরিবার কোথায়? ‘ওদিকে কুলিদের দলের সঙ্গে।’

    ‘তুই উঠে আয় ইঞ্জিনে।’

    ‘জী?’ দেবচরণ বুঝতে পারল না।

    ‘তুই আমার ইঞ্জিনের কয়লা ঠেলার কুলির কাজ করবি। কেউ সন্দেহ করবে না। তুই ধরা না পড়লে তোর পরিবারকে কেউ চিনতে পারবে না।

    দেবচরণ এবার বুঝল। ‘এক্ষুনি আসছি,’ বলে ও তুলসীর কাছে গিয়ে ওকে আড়ালে টেনে নিয়ে বুঝিয়ে বলল। ‘সাবধানে থাকবি।’ দেবচরণ ইঞ্জিনের লোহার সিঁড়ি দিয়ে ইঞ্জিনে উঠে কয়লার বেলচা হাতে নিল, মুখে মেখে নিল ইঞ্জিনের কালি।

    উসকা-গোরখপুর মিটারগেজ ব্র্যাঞ্চ লাইন। গোরখপুর জংশন স্টেশনে গাড়ি বদল হবে। একদিকে লাইন চলে গেছে দক্ষিণে কলকাতার দিকে, অন্যদিকে লক্ষ্ণৌ ও কানপুরে। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার আগেই উসকাবাজার স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পুলিশ, বরকন্দাজ, চৌকিদারে ছয়লাপ হয়ে গেল। উসকা স্টেশনে টেলিগ্রাফে খবর এসেছে যে এই ট্রেনেই নাকি যাচ্ছে থারু দেবচরণ আর তার পরিবার। নেপালের রানা খড়্গা সামসের নিজে অনুরোধ করেছে এই হত্যাকারী আসামীকে তাদের সরকারের হাতে তুলে দিতে। তাই সেই খুনিকে ধরতে পুলিশ এসেছে।

    ইঞ্জিনের বেলচা হাতে মুখে কালি মাখা দেবচরণ দেখল দু’জন বরকন্দাজ সমস্ত কুলিদের প্ল্যাটফর্মে নামাচ্ছে। ভয়ে দেবচরণের বুক কেঁপে উঠল। কুলিদের এক এক করে একজন ইংরেজ পুলিশ ইন্সপেক্টরের সামনে নিয়ে যাচ্ছে, আর ইন্সপেক্টর জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

    এবার তুলসীর ডাক পড়ল, সঙ্গে গেল রাজকুমারী।

    ‘নাম কী?’ মরিয়ম।

    ‘এটা কে?’

    আমার মেয়ে।

    ‘মেয়ের নাম?’

    ‘রেবেকা।’

    ‘তোর মরদের নাম কি?’

    ‘জোসেফ মসীহ।’

    ইংরেজ পুলিশ বোধহয় কিছু সন্দেহের গন্ধ পেল।

    ‘সঙ্গে ওটা কী?’

    ‘কলসী ।’

    ‘ওটা খোল।’

    তুলসী গম ভর্তি কলসী দেখাল।

    ‘গমের মধ্যে কিছু লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস?’

    তুলসী থতমত খেয়ে গেল। ইংরেজ পুলিশ দেশি বরকন্দাজকে হুকুম দিল ‘হাত ঢুকিয়ে দ্যাখ তো ভিতরে কী আছে?’

    বরকন্দাজ গমের ভিতর হাত ঢোকাল। দূর থেকে দেবচরণের বুক ছ্যাঁৎ করে উঠল। তুলসী প্ল্যাটফর্মে এবার ধরা পড়ে যাবে। কলসীর মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল ছোট আরেকটা কলস।

    ‘এটাকে লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিস কেন?’

    ‘যাতে ভেঙে না যায়, তাই সাবধানে – তুলসী মিনমিন করে বলল।

    ‘কী আছে ওতে?’

    ‘চিতার ছাই।’

    ‘চিতার ছাই!’ গোরা পুলিশ অবাক।

    এবার পাশের ভারতীয় বরকন্দাজ নিচু গলায় গোরা পুলিশকে বলল ‘বোধহয় গঙ্গায় ছাই ভাসাবে। এরা সদ্য খ্রিষ্টান হয়েছে, কিন্তু হিন্দুদের ধর্মীয় আচার এখনো মেনে চলে।’

    গোরা পুলিশ ইন্সপেক্টর চেঁচিয়ে বলল— ‘এই অওরতের মরদ কে?’ কেউ উত্তর দিল না।

    বরকন্দাজ এবার চেঁচিয়ে প্রভুর প্রশ্নের প্রতিধ্বনী তুলল ‘এই অওরতের মরদ কে?’

    কোনও উত্তর নেই ।

    আমি শেষবারের মত বলছি, এর মরদ না এলে আমি এদের থানায় নিয়ে যাব।

    কেউ এগিয়ে এল না।

    ‘ঠিকাদারকে ডাক?’

    যাত্রীর কামরা থেকে হস্তদন্ত হয়ে নেমে এল হীরালাল দালাল। ওর পায়ের ফতুয়ার ওপর বিলাতী কোটটা— ‘সাহেব, কী হয়েছে?’

    ‘এই বৌ আর মেয়েটাকে চেন?’

    হীরালাল ভাল করে দেখল। দেবচরণ নিশ্চিন্ত ধূর্ত হীরালাল ঠিক কোনও না কোনও ছল করে ওদের বাঁচিয়ে দেবে৷

    ‘না হুজুর,’ হীরালাল বলল। ‘এদের আমি চিনিনা।’

    দেবচরণের বুক ধ্বক করে উঠল। সে বুঝল তার খেলা শেষ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সামনে মেয়ে আর বৌ বেশিক্ষণ নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পারবে না। দেবচরণ বেলচাটা হতাশায় কয়লার গাদার ওপর ছুড়ে ফেলল। এবার ট্রেন থেকে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল।

    হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হল একজন কুলি ছুটতে ছুটতে আসছে— ‘সাহেব, দাঁড়াও, দাঁড়াও।’

    দেবচরণ থেমে গেল। লোকটা কাছে এল। দেবচরণ চিনল কুলিটাকে কানে মাকড়ি, মাথায় পাগড়ি, ময়লা ফতুয়া, ধুতি । চারুদত্ত।

    ‘তুই কে?’

    ‘এ আমার বৌ আর মা,’ চারুদত্ত জোড়হাত করে বলল। ‘কেন এরা কী করেছে সাহেব?’ চারুদত্ত রাজকুমারীর কাঁধে হাত রাখল। রাজকুমারী আড়ষ্ট হয়ে তুলসীর হাতের মণিবন্ধ দৃঢ়মুষ্টিতে চেপে ধরল।

    ‘তোর বৌ?’ সাহেব ভুরু কুঁচকে তাকাল।

    ‘হ্যাঁ সাহেব। এবার আমার বৌকে গ্রাম থেকে কলকাতা নিয়ে যাচ্ছি।’

    ‘তোর বৌয়ের নাম কী?’

    ‘রেবেকা। হিন্দু নাম ছিল কুমারী।’

    ‘কীরে এ তোর স্বামী?’ সাহেব এবার রাজকুমারীকে জিজ্ঞাসা করল।

    রাজকুমারীর ভয়বিহ্বল দৃষ্টিতে এবার লজ্জা আর বিস্ময় মিশে একাকার হয়ে গেল। রাজকুমারী মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’

    সাহেব এবার চারুদত্তকে বলল— ‘তুই এতক্ষণ এখানে কোথায় ছিলি?’

    ‘মাঠে টাট্টি করতে গেসলাম হুজুর। সেই কোন শেষ রাতে গোরুর গাড়ি ধরে তবে রেলগাড়ি ধরেছি, শরীরকেই বা দোষ দিই কিভাবে?’

    ‘তোর নাম কী?’

    ‘চারুদত্ত।’

    ‘গ্রাম?’

    ‘আমি বাউখাহি উলটাহাওয়াস থারু, চারুদত্ত বলল। হঠাৎ চারুদত্তের নজর পড়ল রাজকুমারীর গলায়। আমার বৌয়ের গলায় মাফলারটা দেখুন সাহেব, আমার নাম কালি দিয়ে লেখা।’

    সাহেবের পিছন থেকে বরকন্দাজ এগিয়ে এসে হাত বাড়াল। রাজকুমারী গলার মাফলার খুলে দিল। বরকন্দাজ মাফলার দেখে বলল, ‘এ ঠিক বলছে সাহেব। এখানে লেখা আছে চারুদত্ত।’

    ‘ঠিক আছে,’ পুলিশ অফিসার বলল। ‘সবাই ট্রেনে উঠে পড়।’

    সকলে ট্রেনের কামরায় উঠতে লাগল। তুলসী আর রাজকুমারীর সঙ্গে চারুদত্তও উঠল একই কামরায়। চারুদত্ত হেসে বলল, ‘আমার মাফলার নিয়ে তোমরা চলে এলে তাই আমায় এত দূর ছুটে আসতে হল। আমার মাফলার কি ফেরত পেতে পারি?’ মাফলার ফেরত দেবার সময় চারুদত্তের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই রাজকুমারী লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল।

    গার্ডসাহেব বাঁশি বাজাল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল দেবচরণ। কয়লার বেলচাটা হাতে তুলে নিল, ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। হুইসিল বাজিয়ে রেলগাড়ি ধকধক করে স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে চলল কলকাতার দিকে। দেবচরণের বুকের ভিতর দশটা রেলগাড়ির ধকধকানি চলছিল এতক্ষণ।

    ৷৷ ছাব্বিশ ৷৷

    রিধিমার ঘরের আলো নিভে যেতেই পাশের ঘরে সুনয়ন স্যাণ্ডির ল্যাপটপে ডঃ উইকসের ইমেইল আইডিতে ওসিএলহ্যাশক্যাট চালাল। সফটওয়্যারটা গ্রাফিকস প্রসেস করে খুব শিগগির পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করবে। সফটওয়্যারটা স্পাইডার অ্যাসলি ম্যাডিসনের এগার মিলিয়ন পাসওয়ার্ডের লিস্ট থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একের পর এক পাসওয়ার্ড তুলে তুলে বসিয়ে পরখ করতে থাকল । যে কোনও দুর্বোধ্য পাসওয়ার্ড এই সফটওয়্যার ভেঙে দেয়, সোজা পাসওয়ার্ড হলে তাড়াতাড়ি, কঠিন হলে সময় লাগে।

    কিন্তু, ডঃ উইকসের পাসওয়ার্ড লাগছে না!

    ‘হুম,’ লোকটার নিজের ক্যারেক্টার যেমন কমপ্লেক্স, পাসওয়ার্ডটাও সেরকম কমপ্লেক্স বানিয়েছে। এক দিক দিয়ে ভালই, ভাবল সুনয়ন। যত ডিফিকাল্ট হবে খোলা, তত সুরক্ষিত থাকবে ডঃ উইকসের ইনফরমেশন। খুনি যদি ওর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে পারে তবে সেটাকেও রিধিমার অ্যাকাউন্টের মত ম্যালওয়ারের অ্যাসিডে ধুয়ে গলিয়ে দেবে। এই খুনের পিছনে সত্যি কে আছে তার ব্লু নিশ্চয়ই হার্ভার্ডের মৃত চারজন প্রফেসরের ইমেইলগুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে। ওদের অ্যাকাউন্ট ক্র্যাক সুনয়ন করবেই, কিন্তু সমস্যা হল হাতে সময় একদম নেই। সুনয়ন রান্নাঘরে গিয়ে ইলেকট্রিক কেটলে গরম জল বসালো। দু মিনিটের মধ্যে সোঁ সোঁ শব্দে জল ফুটতে লাগল। সুনয়ন অন্যমনস্ক। ওসিএলহ্যাশক্যাটের সবুজ বার লাইন ক্রমশঃ বড় হচ্ছে। ডঃ উইকস পুরোনো চিন্তাধারার লোক, ও নিশ্চয়ই ডিজিটাল পাসওয়ার্ড ম্যানেজার দিয়ে পাসওয়ার্ড অটোমেশন করবে না। কালো কফি বানিয়ে সুনয়ন ল্যাপটপের পাশে এসে বসল।

    ওসিএলহ্যাশক্যাট হাল ছেড়ে দিতেই সুনয়ন এবার ল্যাপটপে জন দ্য রিপার পাসওয়ার্ড ক্র্যাকার চালাল। জন দ্য রিপারকে বলে দিতে হয় কনফিগারেশন প্যারামিটার। সুনয়ন প্যারামিটার সেট করল— হার্ভার্ডের সমস্ত স্ট্যাফের লিস্ট, সমস্ত ডিপার্টমেন্টের নাম, তারপর কী ভেবে লিখল মায়ের নাম, নিজের নাম, রিধিমা বোস। তারপর রান। এবার কিছুক্ষণ পরেই ক্রিং! পাসওয়ার্ড ম্যাচ করে গেছে—

    BHAKTI_SUNAYAN

    সুনয়ন বিশ্বাস করতে পারল না, ডঃ উইকসের কাছে সে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল? সুনয়ন তাড়াতাড়ি কয়েকটা মেটাডাটা অ্যানালিসিস সিক্রেট রুম বানিয়ে ফেলল— যতই এনক্রিপটেড ইমেইল মেসেজ হোক না কেন মেটাডাটা— ইমেইলের মাথার সাবজেক্ট লাইনে টু অ্যাণ্ড ফ্রম, সাবজেক্ট, ডেট ও টাইম এগুলো এনক্রিপ্ট করা হয় না, সুতরাং বোঝা যায় কে কাকে কটা কখন ইমেইল পাঠিয়েছে এবং কোন সাবজেক্টে। এবার সমস্ত ইমেইল ট্রাফিক একটা ডিজিটাল ফানেলের মধ্যে চ্যানেলাইজ হয়ে আসতে লাগল, সেই ফানেলের গলায় কয়েকটা কিওয়ার্ডের ফিল্টার— ভক্তি, সুনয়ন, রিধিমা, হার্ভার্ড, বুদ্ধ, ব্রাহ্মী। ব্যাপারটা অভিনব কিছু না, নাইন ইলেভেনের পর NSA AT&T-র সমস্ত ইমেইল, ফোন ট্রাফিককে এভাবে চেক করিয়েছিল। এখন তো অনেক কোম্পানীই এটা করায়। ডঃ উইকসের যাবতীয় ইমেইল ডাউন লোড হতে থাকল। সুনয়ন জানে কাজটা ইল্লিগাল – কম্পিউটার ফ্রড অ্যাণ্ড অ্যাবিউজ অ্যাক্টের ভায়োলেশন। ধরা পড়লে কমপক্ষে দু কাউন্টের গিলটি একটা ফেলোনি, আরেকটা মিসডিমিনর। মিনিমাম এক বছরের জেল তো বটেই। ইমেইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেয়ে গেল রিধিমা ইমেইল করে ওর প্রসপেক্টাস পাঠিয়েছে। আরও ওপরে স্ক্রল করে একটা ইমেইল, হার্ভার্ডের ডঃ হফম্যান মিটিং ইনভাইট পাঠিয়েছে— তেরই জানুয়ারি সন্ধ্যা সাতটা। আরও তিনজনকে ইনভাইট পাঠিয়েছে একই মেইলে— ডঃ গিলমোর, ডঃ স্টিফেন, রিধিমা বোস। লোকেশন থার্ড ফ্লোর সেমিনার রুম, সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ, হার্ভার্ড ৷ তার মানে যদি কেউ ডঃ হফম্যানের ই-মেইল হ্যাক করে থাকে, তবে সে জানত যে তার শিকারদের কোথায় পাবে। স্ক্রল করে আরেকটু অতীতে গেল সুনয়ন, ডঃ হফম্যানের ইমেইল দুসপ্তাহ আগে ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটি হার্ভার্ডের রেকমেণ্ডেশন জানতে চেয়েছে। চৌদ্দ তারিখের মধ্যে হার্ভার্ড তাদের রেকমেণ্ডেশন জানালে হার্ভার্ড বুদ্ধের ব্যাপারে যেকোনো রিসার্চের জন্য হান্ড্রেড থাউজ্যাণ্ড ডলার গ্র্যান্ট পাবে।

    সুনয়ন কালো কফির কাপে চুমুক দিল। কারা এই ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটি? সুনয়ন ওর্জুন অ্যাটর্নিকে টেক্সট করল— ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটির সম্বন্ধে ইনফরমেশন চাই। এবার রিধিমার ফোল্ডারে গেল সুনয়ন। রিধিমার ইমেইল রিধিমাবোস@ জিমেইল.কম। এবার সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। রিধিমার মোবাইল সিম সোয়াপ করতে হবে। স্নো-স্টর্ম রিকভারির সময় ফোন কোম্পানীর কন্ট্রোল রুমের লোকেরা ওয়ার ফুটিংয়ে কাজ করা ফিল্ড টেকনিশিয়ানদের ফোন সামলাতে সামলাতে পাগল হয়ে যায়। তখন ফোন কোম্পানীর ইন্টারনাল নাম্বারে কল করে কারেক্ট লিঙ্গো আর টার্মিনোলজি বলতে পারলে চেকিং লেয়ার অনায়াসে পার হওয়া যায়। এখান থেকে ফোন করা যাবে না, রিধিমা জেগে যাবে। ল্যাপটপটা নিয়ে সুনয়ন বাথরুমে ঢুকল। তারপর ফোন কোম্পানীতে ফোন লাগাল। চাপা গলায় সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করল সুনয়ন। আরও আধ ঘন্টা মোবাইল অপারেটারকে ট্রিক করে সুনয়ন রিধিমার সেলুলার সার্ভিস হাইজ্যাক করে ফেলল। তারপর রিধিমার ইমেইল সার্ভিসের রিসেট পেজে গিয়ে পাসওয়ার্ড রিসেটের রিকোয়েস্ট করল। গুগল থেকে একটা SMS এল। একটা ছয় ডিজিটের ওয়ান টাইম কোড। সুনয়ন তাড়াতাড়ি ঐ পাস কোর্ড রিধিমার জিমেইল অ্যাকাউন্টে গিয়ে ভ্যালিডেট করতেই রিধিমার মেইল অ্যাকাউন্টটা খুলে গেল। সুনয়ন তাড়াতাড়ি একটা পঁচিশ ডিজিটের পাসওয়ার্ড লিখে রিধিমার ইমেইল বক্সের কন্ট্রোল নিয়ে নিল। তারপর সুনয়ন ঘড়ি দেখল। আর ঘন্টা তিনেক পর সকাল হয়ে যাবে। সুনয়ন রিধিমার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করতেই বেরিয়ে এল ডঃ উইকসের পাঠানো ক্রিপটিক মেসেজ। এক সপ্তাহ আগে ডঃ উইকসের ফোন, কলকাতা থেকে রিধিমাকে ডেকে পাঠান। সুনয়ন এবার রিধিমার ইনকামিং আর আউটগোয়িং ফোন চেক করল— ইণ্ডিয়ান কনসুলেট। মোহন গুপ্তা। রিধিমার এক্স বয় ফ্রেণ্ড। লোকটাকে সন্দেহের লিস্টে রাখল সুনয়ন। ওর্জুন অ্যাটর্নিকে একটা টেক্সট মেসেজ পাঠাল সুনয়ন, এই মোহন গুপ্তার সম্বন্ধে কিছু স্কেচি ইনফরমেশন পাওয়া যায় কিনা খোঁজ করতে বলল। এরপর কয়েকটা ম্যালওয়্যার লাগানো ইমেইল ছুড়তে হবে কিছু সন্দেহজনক জায়গায়। কিন্তু এখন একটু ঘুম দরকার। ল্যাপটপ বন্ধ করে স্লিপিং ব্যাগটা মেঝেতে পেতে তার ভিতর ঢুকে গেল। দু-তিনটে বড় বড় হাই উঠল, তারপর সুনয়নের চেতনা প্রকৃতির ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেল।

    ৷৷ সাতাশ ৷৷

    চোখের পাতা বন্ধ হতে না হতেই ভোর।

    খুটখাট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল রিধিমার। ক্লান্তিতে চোখ খুলতেই ইচ্ছা করছে না। ঘরের ভিতরে কেউ ঢুকল। ভিতরটা আধো অন্ধকারে অস্বচ্ছ। পাশের ঘরে সুনয়ন ঘুমোচ্ছে। রিধিমা দেখল স্যাণ্ডি ভারি জ্যাকেট, জুতো, গ্লাভস হাতে, মাথায় উলের টুপি পরে এঘরে পা টিপেটিপে এসে গাড়ির চাবিটা ড্রেসারের উপর থেকে তুলে বেরিয়ে গেল। তারপর বাইরের দরজা খোলার এবং বন্ধ হওয়ার আওয়াজ হল।

    রিধিমা বিছানায় উঠে বসল। পাশেই জানলা। পর্দা ফাঁক করে রিধিমা দেখল সামনের রাস্তার কিছুটা এই জানলা দিয়ে নজরে আসে। নীলাভ ভোরে স্যাণ্ডি পকেট থেকে একটা আধ খাওয়া সিগারেট বের করে তাতে লাইটারের আগুন জ্বালিয়ে একটা বড়সড় টান দিল। তারপর রাস্তার ধারে এক হাঁটু বরফ ভেঙে একটা আপাদমস্তক বরফে ঢাকা একটা গাড়ির পাশে পৌঁছোল। স্যাণ্ডি সিগারেট টানতে টানতে ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে ঝেড়ে গাড়ির বরফ পরিষ্কার করতে লাগল ।

    পুরোনো ল্যামিনেটেড ফ্লোরে মচরমচর পায়ের আওয়াজ শুনে সুনয়নেরও ঘুম ভেঙে গেছিল, সুনয়নও এবার জ্যাকেট গায়ে চড়িয়ে, জুতো পরে বাইরে বেরিয়ে গেল। সুনয়ন স্যাণ্ডির সঙ্গে হাত লাগাল। দু’জনে মিলে বরফ সরাতে সরাতে একটা জাঙ্কি টোয়োটা কোরোলা আত্মপ্রকাশ করল। টোয়োটার পিছনের ট্রাঙ্ক খুলে একটা ঢাউস কাঠের বাক্স বের করল স্যাণ্ডি। দু’জনে ধরাধরি করে ওটা ঘরের দিকে নিয়ে আসতে লাগল। বোঝাই যাচ্ছে ওটা বেশ ভারি।

    ‘আমি বাপের জন্মে কক্ষনো এরকম বরফের ঝড় দেখিনি, স্যাণ্ডি বিরক্ত হয়ে সুনয়নকে বলতে বলতে ঘরে ঢুকল। গাড়ি সাফ করা হয়ে গেছে। ‘গাড়িতে গ্যাস কম আছে। মহাদেবীর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এই কাজ আর কখনো করব না। ও নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করে দেবে। এটাই আমার শেষ কাজ।’

    * * *

    বেসমেন্টের আলো-আঁধারিতে রিধিমা ঔৎসুক্য নিয়ে মাস্টার ক্র্যাফটসম্যানকে দেখছিল। ডেস্কের ওপর স্যাণ্ডি হুমড়ি খেয়ে লেন্সের মধ্যে দিয়ে পাসপোর্টের ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্পটা দেখছে। আঠার প্রকট গন্ধ বেসমেন্টে যেন ঝুলে রয়েছে। জার্সি সিটির ভগ্নপ্রায় বিল্ডিংগুলোতে যে এত সিরিয়াস কাজকম্মো হয় তা বাইরে থেকে আন্দাজই করা যায় না। কফির শুকনো দাগের পাশে ডেস্কের ওপর একটা কম্পিউটার, স্ক্যানার, আল্ট্রা ভায়োলেট লাইট সোর্স। অগোছাল ডেস্কের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আঠার শিশি, ছাপাখানার কালি, সুঁচ, সুতো, ড্রিল, কাগজ কাটার গিলোটিন, ছাপার পেস্ট, অদৃশ্য কালি, ল্যামিনেটিং পাউচ। স্যাপ্তির পায়ের কাছে খোলা কাঠের বাক্সটা, তার মধ্যে থেকে এসব একটু আগে বের করেছে। এবার স্যাণ্ডি ডেস্ক স্ক্যানারের স্ক্রিনে DPI লেভেল অ্যাডজাস্ট করতে শুরু করল।

    ‘কতক্ষণ সময় লাগবে স্যাণ্ডি?’ পাশ থেকে সুনয়ন জিজ্ঞাসা করল।

    ‘তাড়া দিও না বাড্ডি,’ স্যাণ্ডি ঝুঁকে কাঠের বাক্সটা থেকে নানা রঙের পাসপোর্টের কভার বের করতে লাগল, ওর ঘাড়ে নীল রঙের নোঙর আঁকা ট্যাটু বেরিয়ে পড়ল। ‘একটা ছোট্ট মেস-আপ, তুমি দশ বছরের জন্য জেলে। জানোতো পাসপোর্ট আর ভিসা ফ্রড হল ফেডেরাল ফেলোনি?’ স্যাণ্ডি বিজ্ঞের মত বলল।

    ‘দশ বছর?’ রিধিমার ভ্রূ-যুগল মাথার চুলে গিয়ে ধাক্কা মারল।

    ‘অ্যাটলিস্ট। এর সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল টেররিজম যুক্ত থাকলে কুড়ি, স্যাণ্ডি কালো কফির মগে চুমুক মারল। কিন্তু ওর চোখ কম্পিউটার মনিটর স্ক্রিনে সাঁটা, আঙুলগুলো কম্পিউটারের কী -বোর্ডে নাচছে— ‘পাসপোর্টে কী নাম হবে?’

    সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকাল।

    ‘যা ইচ্ছা, আই ডোন্ট কেয়ার,’ রিধিমা বলল। ‘কোনও সেলিব্রিটির নাম দিয়ে দাও।’

    ‘বড় বড় ভুলগুলো খুব বেসিক লেভেলেই হয়, স্যাণ্ডি নির্লিপ্ত মুখে বলল। ‘আমার এক সৌদি কাস্টমার ব্রিটিশ পাসপোর্ট করিয়েছিল। মহম্মদ মুসলমানদের কাছে খুবই কমন নাম, আর লাস্ট নেম দিয়েছিলাম আলি। তখন কি আমি স্বপ্নেও ভেবেছি কেনেডি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসার লেজেণ্ডারি হেভিওয়েট বক্সার মহম্মদ আলির ডাই হার্ড ফ্যান? পাঁচ মিনিট সেই অফিসার আমার কাস্টমারকে ঝাড়া লেকচার দিল যে কিভাবে মহম্মদ আলি সোনি লিস্টনকে ফার্স্ট রাউণ্ডে নক আউট করেছিল। এদিকে আমার কাস্টমারের বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটছে, ফেক পাসপোর্টটা ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতের থাবার নিচে খোলা, ধরা পড়লেই বিশ বছর। ইট মেক হি পি ইন প্যান্টিল—’

    স্যাণ্ডি কোদালের মত বড় বড় এবড়ো খেবড়ো দাঁত বের করে লাজুক হাসি হাসল। ‘তারপর থেকে আমি সেলিব্রিটিদের নাম থেকে কাস্টমারদের দূরে রাখি।’

    ‘ঠিক আছে, ডঃ অঞ্জলি দত্ত, সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল। ‘হার্ভার্ডের PhD টা পাবেন কি পাবেন না জানি না, তাই আমিই আপনাকে PhD দিয়ে দিলাম।’

    ‘ইণ্ডিয়ান পাসপোর্ট তো?’ স্যাণ্ডি জিজ্ঞাসা করল।

    ‘হ্যাঁ ইণ্ডিয়ান,’ রিধিমা বলল।

    স্যাণ্ডি নিজের কাজে ফোকাস করল ‘ইউ নিড আ রাগ। যাতে ব্রেডি বেজম্মাগুলো চিনতে না পারে।’ স্যাণ্ডি একটা স্ট্যাণ্ড লাইটের সুইচ অন করল, তারপর আবার নিচু হয়ে কাঠের বাক্সটা থেকে একটা ভারি ফটো এলবাম বের করল— ‘চুজ ওয়ান।’

    অ্যালবামে অজস্র পরচুলার ফটো। রিধিমা পাতার পর পাতা উলটে কনফিউজড হয়ে পড়ল ৷

    ‘এটা ঠিক হবে,’ সুনয়ন একটা ছোট গ্যামিন স্টাইলের কালো চুলের উইগ পছন্দ করল। রিধিমা পরচুলার ছবিটা দেখল— ট্রেণ্ডি জ্যাগেড ব্যাঙ্গস আর পিছনে ও পাশে সিনগ্লেড চুল।

    ‘এটা আপনার ওভ্যাল শেপের মুখের সঙ্গে ঠিক ম্যাচ করেছে। আপনার সরু কপালের নিচে একটা ট্রেণ্ডি কালো চশমা হলে পুলিশকে ধোঁকা দেওয়া সহজ হবে।’

    ‘এক মিনিট, স্যাণ্ডি বলল। ও এবার আরেকটা অ্যালবাম বের করে বলল, ‘অ্যাক্সেসারিস।’

    ‘গ্রেট,’ সুনয়নকে সন্তুষ্ট দেখাল।

    এবার স্যাণ্ডি সেলফোনে কারুকে ডায়াল করল। স্যাণ্ডি ফোনে উইগের ফটোর পিছনে লেখা নম্বরটা বলল। কিছুক্ষণ ফোন কানে ধরে রাখার পর অন্য দিক থেকে আসা উত্তর শুনে স্যাপ্তির চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল ‘তোমরা লাকি আছ। বেকি নিজে আসছে।’

    কিছুক্ষণ পর উপরে বাইরের দরজায় ধাক্কা। ‘বেকি এসেছে,’ স্যাণ্ডি ক্ষিপ্রপদে বেসমেন্টের সিঁড়িতে অর্ধেক উঠে দরজার দিকে কান পাতল । বাইরে এবার ঘনঘন ধাক্কা। বাইরে যে সে অধৈর্য। দরজা খোলার ক্যাঁচ করে শব্দ হল। ‘স্যাণ্ডি, সান অফ আ ব্লেডি বিচ, তোর কাজকম্মো সব অড আওয়ারে। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা!’ ভাঙা ইংরাজিতে নারীকণ্ঠ নিচ থেকে রিধিমা শুনতে পেল। শাট ইয়ো অ্যাস, টিয়ার মাউট, স্যাণ্ডি নিচু গলায় ধমক লাগাতে নারীকণ্ঠ বকবকানি থামাল। শীঘ্রই একজন মাঝবয়সি মহিলা— ফ্ল্যাট চেস্টেড এবং শণের মত সাদা চুল, একটা প্রফেশনাল মেক আপ কেস হাতে নিয়ে কোমরের যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে নামতে লাগল— ‘স্যাণ্ডি, মি না গনা বাট্টাম হাউজ। মি চার্জ মোর।’ মহিলা নিচে নেমে এসে রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল— ‘ইণ্ডিয়ান?’

    ‘ইয়েস,’ রিধিমা মাথা নাড়ল।

    ‘মাই অ্যানসেস্টারস ইণ্ডিয়ান,’ বেকি গর্ব করে বলল। ‘হাজব্যাণ্ড ফ্রম বিহ্যার। অমিতাভ বাহুচন – ডা রঙ্গো বরোসে ড্যুড, হি-মা-মা-লী-নী, আহবী লাভ বলিউড।’

    বেকি এবার ওর মেক আপ বক্স খুলল। রিধিমা উইগ খুলতেই বেকি আঁতকে উঠল— ‘মনে হচ্ছে তোমার মাথায় একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা লন মোয়ার চালিয়ে গেছে! এরকম কে করল?’ রিধিমা নিরুত্তর, ওর কান্না পাচ্ছিল। পরের এক ঘন্টায় বেকি রিধিমার ডাই করা কালো-সোনালি চুলের বাকিটা শেভ করে একটা কালো চুলের উইগ রিধিমার মাথায় টেনে ফিট করে দিল, ব্রাউন লিপস্টিকের ওপর লিপ-গ্লস ধেবড়ে দিল, রিধিমার আই-ল্যাশের রং পালটে দিল, চোখে চশমা পরিয়ে দিল, এভাবে এক ঘণ্টার ওপর রিধিমাকে নেড়ে চেড়ে বেকিকে সন্তুষ্ট দেখাল— ‘প্রপ্পা!’ বেক্কি নিজেকে প্রশংসা করল। তারপর বলল, ‘হাংকি-ডাংকি! আই অ্যাম ডান।’

    রিধিমা আয়নায় তাকাল। নিজেকে চেনাই যাচ্ছে না।

    বেকি চলে যেতে সুনয়ন রিধিমাকে বলল, ‘আপনি এখানেই থাকুন আমি গাড়িটা নিয়ে গ্যাস স্টেশনে যাচ্ছি। আপনাকে বাইরে বেশিক্ষণ রাখতে চাই না। আপনাদের জন্য কফিও নিয়ে আসব।’

    রাস্তায় বেরিয়ে সুনয়ন ওর্জুন উকিলকে ফোন লাগাল। ‘আমার মেসেজগুলো পেয়েছ?’

    ‘হ্যাঁ, ছেলেরা কাজে লেগে গেছে,’ ওর্জুন বলল। ‘আমি তোমাকেই কল করতে যাচ্ছিলাম। একটা খবর আছে।’

    ‘কী খবর?’

    ‘আই নেভা নিউ ‘বাউট হিজ পেট। লুসি।’

    ‘হ্যাঁ, জানি। ব্যাসেট হাউণ্ড। ও সব সময়ে হরিপরসাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে।’

    ‘ও যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য ওর গলায় একটা স্মার্টকলার বাঁধা থাকে। ন্যানো GPS ডগ ট্র্যাকার বলে দেবে কোথায় আছে হরিপরসাদ।’

    ‘এক্সেলেন্ট!’

    ‘আজ দুপুরের মধ্যে মনে হচ্ছে লেটেস্ট ইনফরমেশন পেয়ে যাব। খবরটা পেলেই আমি নিউ ইয়র্ক স্টেট ট্রুপারদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করছি। যদি স্টেট লাইন ক্রশ করে তবে অবশ্য—’

    ‘NYPD’র কার সঙ্গে কথা বলবে?’

    ‘সব যদি ঠিকঠাক থাকে, তবে NYPD’র যাকে নেব তার তো কপালে বিশাল রিওয়ার্ড নাচছে। হরিপরসাদের ইস্যুটা মেয়রকে পর্যন্ত প্রেসারে রেখেছে। গ্রিফিথ খুব এফিসিয়েন্ট অফিসার, ভাবছি—’

    ‘ওর্জুন, তুমি কি ব্রায়ান স্পেনসারকে এই অ্যাসাইনমেন্টটা দিতে পার?’

    ‘কে? ব্রায়ান! দ্যাট এয়ারহেড কপ? নো ওয়ে!’

    ‘ওর্জুন, ফর মি প্লিজ। একটা ধার চোকাতে হবে।’

    ওর্জুন অ্যাটর্নি চুপ, তারপর বলল, ‘ওকে, ফর ইউ, সুনয়ন। তবে আমাকে ওর সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে।’

    ‘অওসাম! ডেটা পেলে আমাকে কল কোরো। আরেকটা কথা—’

    ‘বলো।’

    ‘একটা চিনা ছেলেকে খুঁজে বের করতে হবে।

    ‘হুলিয়া কেমন?’

    ‘বছর চব্বিশ-পঁচিশ বয়স, রোগা পাতলা, ইঙ্কড আপ আ ট্যাটু অব কোবরাকিস অ্যাট রাইট হ্যাণ্ড।’

    সুনয়নের মুখে ট্যাটুর বর্ণনা শুনে ওর্জুন অ্যাটর্নি শিস দিয়ে উঠল—’ ‘ক্র্যাব ড্যাগ।’

    ‘ফাইণ্ড হিম ওর্জুন।’

    ‘আর ইউ কিডিং সুনয়ন? নিউ ইয়র্ক সিটি, লং আইল্যাণ্ড, নিউ জার্সির বারোটা চায়নাটাউনে প্রায় দশ লাখ চিনা থাকে। ধরে নিলাম ওয়ান ফিফথ, মানে দু’লাখ চিনা ছোকরার ডান হাতের জ্যাকেট আর শার্ট তুলে তুলে দেখতে বলছ?’

    ‘এই ঠাণ্ডায় তোমার ব্রেনটা জমে গেছে ওর্জুন,’ সুনয়ন গম্ভীর গলায় বলল। ‘নিউ ইয়র্ক সিটিতে ট্যাটুর দোকান কটা হবে? ফিফটি, হান্ড্রেড। কল করে করে জিজ্ঞেস কর। এ ধরণের ট্যাটু কেউই করায় না। কে করিয়েছে সেটা খুঁজে পাওয়া বোধ হয় খুব একটা কঠিন হবে না।’

    ওর্জুন অ্যাটর্নি চুপ করে রইল, তারপর বলল, ‘যত সহজ করে বললে ব্যাপারটা মোটেই তত সহজ না। ঠিক আছে আমি দেখছি। অন্য পথ নিতে হবে।’

    সুনয়ন ফোন নামিয়ে রাখল। সামনে ডানকিন ডোনাটস।

    সুনয়ন বেরিয়ে যেতে রিধিমা কিছুক্ষণ বসে রইল। স্যাণ্ডি নিবিষ্টচিত্তে কাজ করে চলেছে। রিধিমা ডায়েরির গল্পটা কোন পথে চলেছে এবার বুঝতে পারছে। কিন্তু ওর ঔৎসুক্য হচ্ছে যে দেবচরণের কলসীতে কী লেখা ছিল যা পড়ে ফাদার গোমেজ এত বিচলিত? রিধিমা ডায়েরিটা খুলল। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে—

    কলকাতায় ট্রেন থেকে নেমে এক্কাগাড়িতে চড়িয়ে অন্যান্য কুলিদের সঙ্গে দেবচরণ, তুলসী, রাজকুমারীকে হীরালাল গার্ডেনরিচে একটা গুমটিতে এনে তুলল। চারুদত্তও সঙ্গে এল। জানুয়ারির শেষদিকে এখনো শীত রয়েছে, তবে তরাইয়ের তুলনায় কিছুই না।

    ‘এখানে মাস ছয়েক থাকতে হবে,’ হীরালাল এসে বলল। ‘জাহাজ এখনও ইউরোপ থেকে ছাড়েনি। জাহাজ ইউরোপ থেকে নুন আর রেললাইনের লোহা নিয়ে কলকাতায় আসবে। তারপর সেই লোহা নামানো হবে, তারপর কলকাতা থেকে মন মন চালের বস্তা লোড হবে, তারপর লেবারদের তোলা হবে জাহাজে। তবে সাবধান, কলকাতায় খুব প্লেগ হচ্ছে, বাইরের খাবার দাবার খাবে না, আমাদের রান্নার ব্যবস্থা আছে। লঙ্গর থেকে দুবেলা খাবার পাবে।

    হীরালাল গুমটির স্টোররুম থেকে তুলসীর জন্য শাড়ি, রাজকুমারীর জন্য সালোয়ার কুর্তা, দেবচরণের জন্য ধুতি, ফতুয়া, মাথার পাগড়ি এসব বের করে এনে দিল। বোঝাই যায় এখান থেকে সারা বছর লেবার পাঠানো হয়। খুব পরিষ্কার ডিপো, সকালে নাকি গঙ্গার জলের কল থেকে হোস পাইপ লাগিয়ে মেঝে ধোওয়া হয়, খাবার জন্য আলাদা জলের কল। ‘কেন এত লোভ দেখাচ্ছে? ওরা আমাদের ওখানে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস হিসাবে বেচে দেবে না তো?’ দেবচরণ জিজ্ঞাসা করল।

    ‘মাথা খারাপ!’ হীরালাল বলল। ‘গিলান্ডার আর ভুতনট কোম্পানী ষাট বছরেরও বেশি হল বিদেশে লেবার পাঠাচ্ছে। ওদের পাকা কাজ।’

    ‘ষাট বছর।’

    ‘আরে এ কি আজ থেকে নাকি?’ হীরালাল বলল। ‘আঠারশ’ আটত্রিশ সাল থেকে ব্রিটিশ গায়ানায় চুক্তিশ্রমিক যাওয়া শুরু হয়েছে। ফি বছর আমরাই তিন হাজার শ্রমিক পাঠাই।

    তিন হাজার!’

    ‘এতো কিছুই না,’ হীরালাল তাচ্ছিল্য করে বলল। ‘ভারতে সেপাই বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর কত যে সেপাই ফাঁসির দড়ির থেকে বাঁচতে গায়ানায় পালিয়েছিল। ওই তিন বছরে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি ভারতীয় সেপাই কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজে চুক্তি শ্রমিকের কাজ নিয়ে পালিয়েছে।’

    ‘আচ্ছা, তাহলে তো অনেক ভারতীয় ওখানে হবে?’

    ‘গায়ানার লোকসংখ্যার প্রায় চল্লিশ পার্সেন্ট ভারতীয় শ্রমিক, হীরালাল বলল। ‘গায়ানা ছাড়াও কত্ত জাহাজ যে কলকাতা থেকে ছাড়ে— সিংহল, ফিজি, মরিশাস, নাটাল, সুরিনাম—’।

    ‘আর কোনও দেশ থেকে লোক যায় না?’

    ‘হ্যাঁ পর্তুগীজ লেবার গেছিল, কিন্তু আখক্ষেতের কাজ নাকি খুব মেহনতের। সবার কম্মো নয়।’

    মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার ব্যথায় দেবচরণের বুক টনটন করছে। সঙ্গে যারা যাবে তারাও দেবচরণের মত নিরুপায় হয়ে চলেছে। চারুদত্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল।

    ‘আমাকে এখানে থাকতে দেবে?’ চারুদত্ত হীরালালকে বলল।

    ‘তুই কি এদের সঙ্গে গায়ানা যাবি?’

    ‘পাগল!’

    ‘তাহলে এখানে এলি কেন?’

    চারুদত্ত নিরুত্তর। ধূর্ত হীরালাল বুঝল ছেলেটার মন মজেছে দেবচরণের মেয়েতে। ওকে একটু ভাবার সময় দেওয়া দরকার। হীরালাল দেবচরণের পরিবারের জন্য গুমটিতে একটা ছোট ঘরের তালা খুলতে খুলতে চারুদত্তকে বলল, ‘তিনদিন পর কাগজ তৈরি হবে। তার মধ্যে ভেবে জানাবি।’

    ‘ঠিক আছে,’ চারুদত্ত সম্মতি জানাল। হীরালাল চারুদত্তকে একটা বড় হলঘরে নিয়ে এল। মেঝেতে কম্বল পেতে অনেক দেহাতি লোক বসে। যাদের পরিবার আছে তারাই শুধু ছোট ছোট কামরায় থাকতে পারে। হীরালাল দেওয়াল ঘেঁষা একটা কম্বলের গোটানো বিছানা দেখিয়ে বলল, ‘মনে থাকে যেন, তিন দিন। এখানে শুধু তারাই থাকবে যারা গায়ানা যাবে।’

    সন্ধ্যাবেলা লঙ্গরে মেয়ে বৌকে নিয়ে দেবচরণ লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। দলে দলে মজুর লোক এসে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে— এলাহাবাদ, গাজীপুর, কানপুর, বেনারস, বস্তি, গোরখপুর, গয়া, পাটনা। তবে বস্তি জেলার লোকেরাই বেশি, তারপর আছে ছোটনাগপুরের সাঁওতালরা। একেকজন দালাল পঁচিশ জন তিরিশ জন লেবার ধরে ধরে এনেছে। এদের অনেক পয়সার স্বপ্ন দেখিয়ে রেলস্টেশন, বাজার, মেলা, মন্দিরের বাইরে থেকে নিয়ে এসেছে। রাজকুমারী বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখছে। দেবচরণ লক্ষ্য করল যে চারুদত্তকে লঙ্গরে ঢুকতে দেখেই মেয়ের দু’চোখ খুশিতে ঝলমল করে উঠল।

    খেতে খেতে দেবচরণের মনে হল কতদিন হয়তো রাজকুমারী এরকম পেট ভরে খেতে পায় নি। পেটের দায়ে তার মেয়ে একটা শয়তানের ঘরে বন্দি ছিল। দেখাই যাক না, এই রাস্তা তাদের কোথায় নিয়ে যায়।

    চারুদত্ত ওদের সঙ্গেই বসে খাচ্ছে। মেয়ের মন বেশ পড়তে পারছে দেবচরণ। ওরও ভাল লেগেছে চারুদত্তকে। রাজকুমারী চারুদত্তের দিকে চোরা চাহনি দিচ্ছে সেটা দেখেও না দেখার ভান করে দেবচরণ। রেলগাড়িতে ইঞ্জিনে থাকার জন্য ভালভাবে ছেলেটার সঙ্গে কথা বলা হয় নি। দেবচরণ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল— ‘তুমি এখানে এলে কেন?’

    ‘আমার মাফলারের জন্য,’ চারুদত্ত দাঁত বের করে নিজের রসিকতায় হাসল। তারপর বলল, ‘সে’রাতে রানার সেপাইরা আমাদের ওভারসিয়ার আর আমাকে সঙ্গে নিয়ে সব তাঁবু খুঁজে খুঁজে দেখছিল। তোমাদের তাঁবুতেও গেছিল। তাঁবু খালি। বুঝলাম তোমরা পালিয়েছ। ওভারসিয়ার পোড় খাওয়া মানুষ। বুঝল কিছু বললে বিপদ বাড়বে। তাই বেমালুম অস্বীকার করে গেল যে এই তাঁবুতে কেউ ছিল।’

    ‘তারপর?’

    ‘রানার পল্টন চলে যেতে ওভারসিয়ার বলল কথা যেন পেট থেকে না বেরোয়।’

    ‘তুমি জানলে কীভাবে আমরা কোথায়?’

    ‘পরের দিন মাটি খোঁড়া শুরু হল, কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল তোমরা জঙ্গলে কোথায় পালিয়ে গেলে? তোমাদের তো রানার পল্টন ঠিক খুঁজে বের করবে। তোমাদের জন্য চিন্তা হচ্ছিল। সেদিন কাজের শেষে ওভারসিয়ারের থেকে ছুটি চাইলাম। বললাম গাঁয়ের জন্য মন কেমন করছে। ওভারসিয়ার বলল একদম মিছে কথা বলবি না। আমি জানি কাদের জন্য তোর মন কেমন করছে। আমি বললাম আমি যাব ওদের খুঁজতে। তিনটে মানুষ আঁধার রাতে এভাবে কখনো উবে যেতে পারে? ওভারসিয়ার বললে নিশচয়ই পারে, যদি ওরা দানো-চুড়েল হয়। ওভারসিয়ার বলল ওরা আঁধার রাতেই জঙ্গল থেকে এসে হাজির হয়েছিল ওরা নিশ্চয়ই দানো-চুড়েল।’

    ‘আমাদের চুড়েল বলল?’ রাজকুমারী ঠোঁট ফোলাল।

    ‘বলল তো আরও অনেক কিছু, সেসব শুনে কাজ নেই,’ চারুদত্ত বলল। ‘গোটা সন্ধ্যা অস্থির অস্থির লাগছিল। খালি ভাবছিলাম তিনটে মানুষ কোথায় যেতে পারে? ধরা পড়লে খবর কানে আসত। মনে পড়ল আমি বলেছিলাম যে পিতরাওয়ায় কাজ আছে। নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিল। তবে কি তোমরা ভারতে চলে গেলে? রানার নাগালের বাইরে? পরদিন ভোরবেলা সকালের ভাত আর কোয়াশের ডগা সিদ্ধ খেয়ে ওভারসিয়ারকে বললুম আর কাজ করব না। রওনা দিলাম পিতরাওয়ার দিকে।’

    ‘ভাগ্যিস এসেছিলে,’ দেবচরণ বলল। ‘না হলে উসকায় ওরা ধরে ফেলত।’

    ‘কিন্তু তোমরা সত্যি সত্যি দেশ ছেড়ে চলে যাবে?’ চারুদত্ত দেবচরণকে বলল।

    ‘আমি নিরুপায়,’ দেবচরণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘রানার লোক জানতে পারলেই রাজকুমারীকে ধরে নিয়ে যাবে।’

    চারুদত্ত চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল। ‘আমি একটু ভেবে দেখি।’

    দেবচরণ হাই তুলল। শরীর ও মনের ওপর খুব ধকল গেছে কয়েকটা দিন। পরের দিন খুব সকালে রাজকুমারীর ঘুম ভেঙে গেল। গুমটির পিছন দিকে পাশাপাশি কয়েকটা বাথরুম। বাইরে সারি সারি জলের কল, ওখানে চারুদত্তকে দেখল নিম দাঁতন চিবোচ্ছে। রাজকুমারীকে দেখে চারুদত্তের চোখমুখ ঝলমল করে উঠল। রাজকুমারীকে বলল, ‘নতুন জায়গা আর ভ্যাপসা গরমে সকালেই ঘুম ভেঙে গেছে। তোমার রাতে ঘুম হয়েছিল?’

    ‘চুড়েলরা রাতে ঘুমায় না।’

    চারুদত্ত নির্লজ্জের মত হাসল, তারপর বলল, ‘ওভারসিয়ার আর কী কী বলেছিল সেটা শুনতে চাও?’

    ‘কী বলেছিল?’

    আমাকে বলেছিল তোকে কি ওরা মোহিনী মন্ত্র পড়া লাড্ডু খাইয়েছে?’

    ‘সেটা কী?’

    মেয়েরা কোনও ছেলেকে মোহিনী মন্ত্র পড়া লাড্ডু খাইয়ে দিলে ছেলেটা যতক্ষণ না মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরছে ততক্ষণ বুকের ভিতরটা অস্থির অস্থির করে, কোনও কাজে মন বসে না, ছেলেটার পিয়াসি মন ছুটে যায় পিয়ার দিকে।

    ‘তোমার কি তাই হয়েছিল নাকি?’

    ‘তুমি কী ভেবেছ? আমি শুধু মাফলার ফেরত নিতে নেপাল থেকে এতদূর কলকাতায় এসেছি?’

    রাজকুমারীর মুখ-চোখ লজ্জায় পলাশ ফুলের রঙ নিল। ‘মিছে কথা,’ বলে দৌড় লাগাল নিজের ঘরের দিকে।

    পিছনে তখন চারুদত্ত হা-হা করে নির্লজ্জ হাসি হাসছে।

    তিনদিন কেটে গেল। হীরালাল গুমটির অফিস ঘরে চারুদত্তকে ডেকে পাঠাল। চারুদত্ত দরজায় এসে দেখল হীরালাল পানের বাক্স থেকে পান মুখে তুলছে। চারুদত্তকে দেখে পান হাতেই রয়ে গেল হীরালালের— ‘কী ঠিক করলি? তোর নামও আমি নথিভুক্ত করে দিই?’ হীরালাল পান মুখে পুরে বলল ‘অনেক উপার্জন করবি ওখানে। রাজার হালে থাকবি।’

    ‘রাজার হালে থাকব? সত্যি?’

    ‘আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না?’

    ‘তোমার আসল রূপ আমি উসকাবাজার রেল স্টেশনেই দেখে নিয়েছি। তোমাকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না।’

    ‘আমার কোনও উপায় ছিল না রে,’ হীরালাল পানের পিক মাটিতে ফেলে, তর্জনী দিয়ে ঠোঁট মুছল। ‘নেপালের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের চুক্তি আছে নেপালী কুলি না পাঠাবার। আমার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেত।’

    ‘তোমার একটা কথাও আমি বিশ্বাস করি না।’

    ‘রাজার হালে থাকবি,’ হীরালাল বলল। ‘আর কটা দিন সময় নে। ভাল করে ভেবে দেখ আরেকবার।’

    ‘সম্ভব হলে বাকিদেরও যাওয়া আটকে দিতাম,’ চারুদত্ত বলল।

    ‘বেরো! এক্ষুনি বেরো এখান থেকে,’ হীরালাল উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।

    চারুদত্ত হীরালালের কথাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না। সে রাস্তার দিকে অগ্রসর হল।

    পরদিন সকালে হীরালাল সব লেবারকে নিয়ে গেল এক অফিসে। একসঙ্গে অনেককে অফিসের ভিতরে ঢোকানো হল, সেখানে একজন বাবু নোটিশ পড়ল— হালকা কাজ, ভাল মায়না, ভবিষ্যতে বাচ্চাদের জন্য চাকরির গ্যারান্টি। গায়ানার আবহাওয়া ভারতীয় কুলিদের জন্য আদর্শ না খুব গরম না ঠাণ্ডা, প্রচুর শুদ্ধ জল, ফল, শাক-সবজি খাবার। ধর্মের ব্যাপারে কেউ কোনও হস্তক্ষেপ করবে না, হিন্দু ও মুসলমান নিজের নিজের ধর্ম পালন করতে পারবে।

    সকলের জন্য কাগজ বানানো হল। গরিব কুলিদের দু’চোখ চকচক করে উঠল। এতদিন সবাই আধপেটা খেয়ে থাকত। তাদের সামনে এখন কত বড় সুযোগ। যারা আসে নি তারা পস্তাবে।

    এভাবে তিন মাস কেটে গেল। চারুদত্ত কাছেই এক কাপড়ের ব্যবসায়ীর কাছে মজুরের কাজ নিয়েছে। আগে রোজ সন্ধ্যায় আসতো, কিন্তু দেবচরণের পরিবারের সঙ্গে চারুদত্তের ক্রমবর্ধমান অন্তরঙ্গতা হীরালালের মোটেই পছন্দ না। হীরালাল চাইত না এই লোকটা এখানে আসে। তাই চারুদত্তকে গুমটিতে দেখলে রাগারাগি করত। চারুদত্ত তাই গতবার বলে গেছে এবার সে যখন আসবে তখন দেবচরণদের একটা পাকা ব্যবস্থা করে তবেই ফিরবে। দেখতে দেখতে কলকাতায় বেশ গরম পড়ে গেল। তরাইয়ের লোক, এত গরমে হাঁসফাঁস করতে লাগল দেবচরণ। দিনে দু-তিনবার করে চান করা শুরু করল। তরাইয়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগল দেবচরণের এখন সবাই খারিফের জন্য ক্ষেত তৈরিতে মাঠে নেমে পড়েছে। তিন-চারবার বার মাঠে হাল পড়বে, তারপর আসবে বর্ষা। তুলসী প্রথম বৃষ্টির জলে ধান ভিজিয়ে রাখতো সারারাত পরের দিন দু’জনে মাঠে গিয়ে ধান বুনতো। কত রকম ধান অঙ্গনা, কারমুল্লি – মাহাতোর কৃষকরা বুনবে বাসমতি, হংসরাজ, রাজভোগ, কী সুন্দর ছিল দিনগুলো, কী অভিশপ্ত জীবনে আটকা পড়ে গেছে সে।

    হীরালাল রোজ সকালে একবার বিকালে একবার এসে দেখে যায়, সেদিন এসে যখন জিজ্ঞাসা করল— ‘কী রে খাওয়াদাওয়ার কোনও অসুবিধা নেই তো?’ তখন দেবচরণ বলল, ‘আসালা মাছের ভাজি ধনে-জিরার গুঁড়ো আর চাটনি মাখিয়ে আন্দিক খাবার কথা মেয়েটা বলছিল।’

    ‘আসালা! আসালা তো তোদের পাহাড়ি নদীতে হয়, এখানে পাবি কোথায়? দেবচরণের অজ্ঞতায় হীরালাল হাসল। ‘ঠাকুরকে বলে দেব গঙ্গার মাছ রাঁধতে।’

    দেবচরণের ভয় হয়, রাণা খোঁজ পেয়ে যাবে না তো? অধৈর্য হয়ে হীরালালকে রোজ জিজ্ঞাসা করত— আর কতদিন এখানে থাকতে হবে?

    আর রাজকুমারী? সে রোজ রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে, কবে তার চারুদত্ত আসবে আর তাদের নিয়ে যাবে সঙ্গে। তুলসী একদিন দেবচরণকে বলল, ‘কলকাতায় এসে রাজকুমারী একবারও ঘুমের মধ্যে উঠে বাইরে যায় নি।’ দেবচরণ বলল, ‘থারুদের চুড়েল-দানোরাও তরাইয়ের বাইরে যায় না।’

    হীরালাল একদিন খবর আনল যে নরওয়ে থেকে জাহাজ ছেড়েছে, দুমাসের মধ্যে জাহাজ কলকাতা পৌঁছোবে। কাল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে যেতে হবে।

    ‘জজ-ম্যাজিস্ট্রেট! কেন?’ ভয়ে ভয়ে বলল দেবচরণ।

    হীরালাল বলল, ‘চিন্তা নেই আমি সব শিখিয়ে পড়িয়ে দেব। কিন্তু ভুলেও বলবে না যে তোমরা নেপাল থেকে এসেছ। তাহলেই রানা জানতে পারে যাবে। তোমরা গোণ্ডার লোক, নাম জোসেফ, মরিয়ম আর রেবেকা— মনে থাকবে?’

    তিনজনে ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ে।

    ম্যাজিস্ট্রেট অফিসে উঁচু টেবিলের ওপাশে গম্ভীর ম্যাজিস্ট্রেট বসে৷ ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, ‘টুম আপনা ইচ্ছামে যা রহে হো?’

    ‘জী সাব।’ হীরালালের শেখানো কথা তোতা পাখির মত উগরাতে থাকল দেবচরণ।

    ‘কন্ট্রাকচুয়াল অবলিগেশন্স, মতলব কেয়া কেয়া কাম করনা পড়েগা ইসিকে বারে মে পুরা পাতা হ্যায়?’

    ‘জী সাব।’

    হীরালাল এমিগ্রেশন সার্টিফিকেট বানিয়ে রেখেছিল— নাম, জন্ম তারিখ, বয়স, কাস্ট, হাইট, গ্রামের নাম, শরীরের চিহ্ন ইত্যাদি। ম্যাজিস্ট্রেট সব মিলিয়ে নিয়ে সেখানে ব্রিটিশ সরকারের ঠাপ্পা লাগিয়ে দিল, নিজেদের ফাইলে এক কপি রেখে দিল। তারপর ডাক্তারের লাইনে ওদের নিয়ে গেল হীরালাল। ডাক্তার চেক আপ করে এমিগ্র্যান্ট সার্টিফিকেটে মেডিক্যাল চেক আপের স্ট্যাম্প লাগাল। এই কাগজগুলো না থাকলে ক্যাপ্টেনের লোক জাহাজে উঠতে দেবে না। তারপর হীরালাল ওদের আবার গার্ডেনরিচের গুমটিতে নিয়ে এল।

    সেদিন হীরালালের সঙ্গে এল ডিপো মেডিক্যাল অফিসার।

    ‘আমাদের জাহাজ সমুদ্রে ডুবে-টুবে যাবে নাতো?’ একজন কুলি হীরালালকে জিজ্ঞাসা করল।

    ‘তোমরা যে এই ‘রোন’ জাহাজে যাবে, সেটা কত দূর থেকে আসে জানো?’ হীরালালের অসীম ধৈর্য, সে শাস্ত ভাবে বলল। ‘ইউরোপ থেকে এই জাহাজ পাল তুলে কলকাতা, তারপর এখান থেকে ত্রিনিদাদে তোমাদের নামিয়ে দিয়ে তারপর চলে যাবে আমেরিকা। সেখান থেকে কেরোসিন তেল তুলে আবার ইউরোপে ফিরে যাবে। কত ব্যবসা চলে জানো? অত ভারি ভারি ইউরোপের লোহা এখানে নামাচ্ছে। ডুবে গেলেই হল?’

    ‘শুনেছি জাহাজে নাকি প্রচুর লোক সমুদ্রেই অসুখ-টসুখে মারা যায়?’ আরেকজন লেবার বলল। সে জাহাজঘাটা থেকে অনেক কিছু জেনে এসেছে।

    ‘সে জন্যই তো এই চেক আপ,’ ডাক্তার বলল। ‘জাহাজে প্লেগ নিয়ে কেউ উঠলে ব্যাস, সে রোগ সারা জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। ত্রিনিদাদে পৌঁছোতে পৌঁছোতে প্রচুর লোক মারা যায়। লেবার না পৌঁছোলে আমাদের মালিক এক পয়সাও কমিশন পাবে না। কলকাতায় এবছর প্লেগ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। নাও এখন বগল আর কুঁচকি দেখাও দেখি।’ ডাক্তার এক এক করে সকলের বগল আর কুঁচকি পরীক্ষা করতে লাগল, প্লেগ হলে বগল, কুঁচকি বা ঘাড় মুরগির ডিমের মত ফুলে ওঠে। তারপর ডাক্তার নানা রকম টিকা লাগাতে লাগাতে ঘরের কোনায় চলে গেল। বিশাল ডিপোর এক কোনায় একজন বয়স্ক কুলিকে কদিন ধরেই দেখছে হীরালাল। ওর মেয়ে আর জামাই এসে ওকে এখানে ছেড়ে গেছে। লোকটা সব সময়ে কেশে চলেছে। হীরালালের সঙ্গে এসে ডিপো মেডিক্যাল অফিসার ওর বুক পরীক্ষা করল। লোকটা কাশতে লাগল, কাশতে কাশতে মুখ থেকে থুথুর সঙ্গে এক দলা রক্ত বেরিয়ে এল।

    ‘একে এক্ষুনি সরিয়ে নিয়ে যাও,’ ডিপো মেডিক্যাল অফিসার বলল। এজেন্সির লোকেরা বয়স্ক লোকটাকে টেনে নিয়ে চলল বাইরে। লোকটা অনুনয় করতে লাগল— ‘আমায় ওষুধ দিন, আমি ঠিক হয়ে যাব। আমি এখানে থাকলে আমাকে রাস্তায় ভিক্ষা করে খেতে হবে।’

    ‘ওকে হাসপাতালে পাঠাও, ওর যক্ষা হয়েছে,’ ডাক্তার বলল। ‘আর ওর এখানকার কাপড় চোপড় সব পুড়িয়ে দাও।’ এজেন্সির লোকেরা এসে ভাল করে ফিনাইল দিয়ে ঘর ধুয়ে ফেলল যাতে রোগ ছড়াতে না পারে।

    ডাক্তার চলে গেলে দেবচরণ ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে হীরালালকে বলল, ‘আমায় একবার এই ঠিকানায় নিয়ে যাবে?’

    হীরালাল কাগজের ওপর ঠিকানাটা দেখে বলল, ‘ফাদার জর্জ শিলটন। সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল! এটা তো একটা চার্চের ঠিকানা! ওখানে তুমি কী করবে?’

    ‘এই চিঠি বির্দপুর চার্চের ফাদার গোমেজ দিয়েছেন,’ দেবচরণ কলসীর কথাটা লুকিয়ে রাখল।

    ‘দেখি কী লিখেছে?’

    ‘না, অন্যের চিঠি পড়া উচিত না।’

    হীরালাল কুটিল সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল দেবচরণ কিছু লুকোচ্ছে কিনা। ‘আমায় দাও, আমি এই চিঠি পৌঁছে দেব।’

    ‘না, ফাদার আমায় নিজের হাতে দিতে বলেছেন।’

    ‘ঠিক আছে,’ হীরালাল জানে লোকটা বিগড়ে গেলে হয়তো জাহাজেই উঠবে না, দালালির অনেক টাকা লোকসান হয়ে যাবে। ‘কাল সকাল সকাল তৈরি থেক, আমি নিয়ে যাব।’

    পরের দিন সকালে হীরালালের সঙ্গে দেবচরণ, রাজকুমারী আর তুলসী কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে এল। গার্ডেনরিচ থেকে অনেকটা পথ গরমে হেঁটে হেঁটে আসতে দেবচরণ আর তার পরিবার ঘেমে নেয়ে নাস্তানাবুদ। ক্যাথিড্রাল দেখে দেবচরণ হাঁ। মন্দিরের চূড়া মেরামতের জন্য প্রচুর কুলি কাজ করছে। হীরালাল গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, ‘গত বছর আসামে যে ভূমিকম্প হল, তাতে এই চার্চের চূড়াটা ভেঙে পড়ে গেছে, তার মেরামতের কাজ চলছে।’

    একজন দেশি খ্রিষ্টানকে ধরল হীরালাল— ‘পাদ্রি ফাদার শিলটনের নামে বির্দপুর থেকে চিঠি আছে।’ দেশি খ্রিষ্টানটা একজন কমবয়সি পাদ্রির কাছে গিয়ে কিছু বলল। পাদ্রি একজন ইংরেজ ফৌজের লোকের সঙ্গে বিরাট বিরাট মোড়ানো কাগজে আঁকা নক্সা দেখছিল। মাথা উঁচু করে তাকাল। দেবচরণ জোড় হাত করে নমস্কার করল। পাদ্রি এগিয়ে এসে বলল, ‘আমিই ফাদার শিলটন। দেখি চিঠি।’

    চিঠি পড়তে পড়তে ফাদারের কপালে ভাঁজ দেখা দিল। ফাদার চিঠিটা হাতে থাকা অবস্থায় বলল, ‘জিনিসটা এনেছ?’

    ‘হ্যাঁ,’ দেবচরণ বলল ।

    ‘আমার সঙ্গে ভিতরে এস।’

    হীরালাল হাঁ হয়ে গেছে। কী জিনিস? তারমানে ওর সন্দেহ ঠিক? ব্যাটা এখানে চাকরি চাইতে আসেনি তো? হীরালালও দেবচরণের সঙ্গে ফাদারের পিছন পিছন একটা ছোট ঘরে ঢুকল, সেখানে একটা উঁচু টেবিল, কিন্তু কোনও চেয়ার নেই ।

    ‘দেখাও,’ ফাদার বলল।

    হীরালালের বিস্মিত চোখের সামনে তুলসী তার গমের কলসীর মধ্য থেকে কাপড়ের ঢাকনা সরিয়ে বের করল ছোট কলসীটা। ফাদার শিলটন কলসীটা টেবিলে রেখে ঝুঁকে ভালভাবে লেখাটা পড়ল।

    ইম্পসিবল!’ ফাদার আবার লেখাটা পড়ল, তারপর কপালে বুকে ক্রুশ এঁকে বলল, ‘গুড লর্ড! বাট ইট ইজ টু লেট!’

    ‘কী হল ফাদার?’

    ‘এটা যেন কেউ না জানে যে তোমার কাছে আছে,’ ফাদার বলল। ‘কারুকে এটা দেখাবে না। ‘

    ‘এটাতে কী লেখা আছে ফাদার?’

    ‘সেটা নাই বা শুনলে তোমরা,’ ফাদার বলল। ‘তোমাদের দেশের ইতিহাসকে নিয়ে একটা রাজনীতির ব্যবসা চলছে। যারা ব্যবসাটা করছে তারা এটা দেখলে তোমাদের মেরে ফেলবে। এবং এটাও ভেঙে ফেলে ইতিহাস মুছে দেবে। এটা বুকের পাঁজরের মত সব সময় নিজের নাগালের মধ্যে রেখো। যেদিন গড অলমাইটি চাইবেন সেদিন এটা ঠিক বাইরে বেরিয়ে আসবে। সেই দিনটার জন্য অপেক্ষা কর।’

    দেবচরণ কিছুটা বুঝল, কিছুটা বুঝল না। হীরালালের সঙ্গে ফেরার সময় হীরালাল ওকে সারা রাস্তা বকাবকি করতে করতে নিয়ে এল। ইংরেজ পুলিশ নাকি বাঘের চেয়েও ভয়ানক। শিকারকে ওঁকে বের করে। এসব শুনে দেবচরণ আরও ভয় পেয়ে গেল এবং মনে মনে খড়াভূত, পাঁচুয়া এবং প্রভু যীশুর কাছে একসঙ্গে মানত করল ভালোয় ভালোয় জাহাজে উঠতে পারলে গুড়ের বাতাসা দেবে।

    বেশ কিছুদিন পর হীরালাল এসে খবর দিল জাহাজ এসে গেছে। হীরালালের মুখে-চোখে খুশির রংমশাল। হীরালাল একদিন ওদের সকলকে দূর থেকে জাহাজ দেখিয়ে আনল। বিশাল বিশাল জাহাজে জাহাজঘাটা ভরে আছে আর চারদিকে শুধু বিশাল বড় বড় খুঁটি।

    ‘ওগুলোকে মাস্তুল বলে, ওখানে পাল টাঙানো হয়, পাল এখন গুটিয়ে রাখা আছে,’ হীরালাল বলল। ‘কী রে, এত বড় জাহাজ কখনো ডুবতে পারে?’

    এত বিরাট জাহাজ দেবচরণ কখনো দেখেনি, কত্তগুলো পাল, পাল গোটানো আছে, জাহজে রঙ করা হচ্ছে, কাঠের পাটাতন বদলানো হচ্ছে, কত মজুর কাজ করছে। হীরালাল ওদের সঙ্গে সঙ্গে গুমটিতে এল। দেবচরণ দেখছে হীরালাল ওদের ছেড়ে আর নড়ছে না। ওদের একা একা বাইরে যেতে দিচ্ছে না। দশটা এমিগ্রেশন এজেন্সি কলকাতায় রিক্রুটমেন্টের কাজ করছে। হীরালাল ওদের একটার এজেন্ট। মরিশাসের গুমটি ভবানীপুরে, আর গায়ানার গুমটি এই গার্ডেনরিচে।

    ‘এই হীরালাল আমাদের ছেড়ে নড়ছে না কেন?’ রাতে দেবচরণ একজন কুলিকে জিজ্ঞাসা করল।

    ‘২৪ পরগনায় জুটমিলগুলোতে খুব ভাল মায়নার চাকরি দিচ্ছে। হীরালালের কয়েকজন কুলি ওর পয়সায় এখানে এসে তারপর পালিয়ে জুটমিলে কাজ নিয়েছে। আমি হীরালাল আর ডাক্তারের কথাবার্তা শুনেছি। কলকাতায় এখন প্রচুর কাজ। অনেকে দুধ বিক্রি করে ভাল পয়সা করছে, অনেকে মাঝির কাজ নিচ্ছে, অনেকে কাঁচ কাটার কাজ নিচ্ছে। চারদিকে চাকরিই চাকরি। গায়ে গতরে খাটতে পারলে পয়সা ভালই উপার্জন। শুধু শুধু গায়ানা কেন যাবে? রাতের অন্ধকারে সবাই পালাচ্ছে। এতে এজেন্টদের কত সময় আর পয়সা বরবাদ হচ্ছে। তাই হীরালাল গায়ে গায়ে লেগে আছে। আমাদের জাহাজে তুলে নিশ্চিন্দি।’

    ‘বিদেশে যাচ্ছে না কেন লোকে?’

    ‘দশ বছর ইচ্ছা করলেও ফিরতে পারবে না,’ কুলি বলল। ‘শুনেছি ওখানে মেয়ে খুব কম, তাই মেয়েদের ঝামেলায় অনেক খুনোখুনি হয়। কী দরকার বাবা বিদেশ বিভূঁইয়ে ঘরের মেয়েদের নিয়ে টানাটানি করার। মরলে দেশেই মরব। আর চাকরি যখন এখানে আছে তখন কেন মরতে বিদেশ যাব? আমি তো পালাবো।’

    কথাটা মনে ধরল দেবচরণের। রাজকুমারীকে এদেশে বাঁচাতেই সে কবে থেকে ছুটে চলেছে, বিদেশে ওর বিপদ হলে তো কিছুই করতে পারবে না। দেবচরণ স্থির করল সেও পালাবে।

    পরদিন সকালে চারুদত্ত এল। চারুদত্ত হাওড়ার জুটমিলে কাজ নিয়েছে। দেবচরণদের নিয়ে যাবে। কিন্তু দেবচরণ জানে সে বন্দী, হীরালাল কিছুতেই তাকে যেতে দেবে না।

    ‘আমরা পালাব,’ তুলসী বলল।

    চারুদত্ত বলল, ‘চিন্তা নেই। আমি তোমাদের আজ রাতেই নিয়ে যাব। রাত গভীর হোক। সকলে শুয়ে পড়লে তোমরা ডিপোর পিছনের দরজা দিয়ে নদীর ঘাটে চুপচাপ চলে এসো, আমি মাঝি-নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করব।’

    বিকালে হীরালাল এল। হীরালাল বলল, ‘কাল সকাল নটায় এসে তোমাদের নিয়ে যাব জাহাজঘাটায়। বিকালে জাহাজ ছাড়বে।’

    দেবচরণের বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

    রাত হল। সকলে শুয়ে পড়লে রাতের অন্ধকারে দেবচরণ বৌ মেয়েকে নিয়ে চুপিচুপি ডিপোর পিছনের দরজায় এসে দরজা খুলল। চারুদত্ত সামনে গার্ডেনরিচের গঙ্গার ঘাটে মাঝি নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছে, ওদের চুপচাপ নদী পার করে হাওড়ার জুটমিলে নিয়ে যাবে। দেবচরণের কানে মাকড়ি, মাথায় পাগড়ি, গায়ে হীরালালের এজেন্সির ফতুয়া, ধুতি। দেবচরণ আঁজলা ভরে ভরে কলের জল খেল। তারপর পিছনের পাঁচিলের দরজা খুলে বাইরে গেল। অন্ধকারে সামনে দু’জন ছায়া দাঁড়িয়ে। দেবচরণ কাছে এসেই চমকে উঠল। হীরালাল।

    ‘পালাচ্ছিস?’ হীরালাল বলল।

    দেবচরণ চুপ।

    ‘কী রে কথা বলছিস না?’

    ‘তোমার দেখানো লোভে পড়ে আমি দেশ ছেড়ে যাব না।’

    ‘তুই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শপথ নিয়েছিস যে নিজের ইচ্ছায় তুই যাচ্ছিস।’

    ‘মিথ্যা কথা বলতে তো তুমিই শিখিয়ে দিয়েছিলে। গ্রামের নাম, দেশ—’

    ‘আর ছ’মাস ধরে তোদের থাকা খাওয়া, আমার এতগুলো টাকা যে নষ্ট হল, তার কী হবে?’

    ‘জুটমিলে চাকরি করে মায়না পেয়ে তোমার প্রতিটা পাই-পয়সা চুকিয়ে দেব।’

    ‘আর এজেন্সি আমাকে যে কখনো বিশ্বাস করবে না, তার কী হবে?’

    ‘এর জন্য দায়ী তুমি।’

    হীরালাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে, যাবি না যখন, তখন তুই জুটমিলে যা। আমি বাধা দেব না৷’

    দেবচরণ বৌ মেয়েকে দু’হাতে দু’দিকে ধরে নদীর ঘাটের দিকে এগোতে লাগল।

    ‘একটা কথা,’ হীরালাল পিছন থেকে বলল।

    দেবচরণ দাঁড়িয়ে পড়ল।

    ‘পাল্লা রাজার সেপাইরা কলকাতায় এসেছে। ওরা দুদিন আগে এদিকে এসেছিল, তোকে খুঁজছিল। তুই নাকি সেপাইদের মেরে ওদের একটা দামি ঘট ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়েছিস। রানা বস্তির কমিশনারকে সব বলেছে। বস্তির কমিশনার নাকি তোকে খুঁজছে। আমি সেজন্য—’

    ‘সেজন্য কী?’ দেবচরণ থমকে দাঁড়াল।

    ‘তোরা যখন জাহাজঘাটায় জাহাজ দেখতে গেছিলি, তখন আমার লোক তোদের ঘরে ঢুকে তোদের কলসী—’

    ‘না!’ দেবচরণ আর্তনাদ করে উঠল। তুলসীর হাত থেকে কলসটা নিয়ে মাটিতে রেখে দ্রুতহাতে উপরের গমের আচ্ছাদন সরিয়ে ফেলল দেবচরণ। ছোট কলসীটা ভিতরে নেই! তার জায়গায় একটা ইট রাখা। ‘তুমি চুরি করলে? ফাদার গোমেজ, ফাদার শিলটন বলেছে একে নিজের পাঁজরের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে।’

    ‘তোর ভালোর জন্যই করেছি। ওটা তুই পেয়ে যাবি।’

    ‘পেয়ে যাব?’ দেবচরণ চিৎকার করল। ‘কীভাবে পেয়ে যাব?’

    ‘দ্যাখ দেবচরণ, তোর সামনে এখন তিনটে পথ। প্রথমটা রানার কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করা, রাগী রানা তোর প্রাণভিক্ষা দেবে কিনা সন্দেহ। দিলেও তোর মেয়েটাকে মেরে ফেলবেই যাতে অন্য কমলারিরা আর এই ধরণের কাজ করার কথা যাতে স্বপ্নেও না ভাবে। দ্বিতীয় পথ, কলসী ছিনতাই, মারধোরের অভিযোগ মেনে নেওয়া। তাতে ইংরেজরা তোকে জেলে ঢোকাবে। তুই জেলে গেলে তোর মেয়ে আর বৌ কলকাতার নোংরা গলিতে হারিয়ে যাবে। আর তৃতীয় পথ, তোর ঘট জাহাজের সারেঙের কাছে রাখা। তুই জাহাজে উঠলে জাহাজ নোঙর তুললেই সারেঙ তোকে ওটা দেবে।’

    ‘সারেঙের কী নাম?’

    ‘রূপলাল সারেঙ।’

    দেবচরণ বিড়বিড় করে বলল, ‘আমি তৃতীয় পথ নেব।’

    পরদিন সকালে দেবচরণ সপরিবারে যাত্রীদের লাইনে দাঁড়াল। পাশে পাশে হীরালাল। সরকারের মেডিকেল ইনসপেক্টর, জাহাজের সার্জন এবং রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার ফাইনাল সার্টিফিকেট দিল। সঙ্গে একগাদা নতুন জামা কাপড়। তুলসী আর রাজকুমারী দেবচরণের জামা কাপড়ের গাঁটরিটাও মাথায় নিল। দেবচরণ অন্যমনস্ক ধীর পদক্ষেপে লাইনে এগোচ্ছে। পায়ে কে যেন কয়েদির অদৃশ্য ভারি লোহার শিকল পরিয়ে দিয়েছে। লাইনের পাশে কিছু উৎসাহী লোকের ভিড়, কেউবা আত্মীয়দের বিদায় জানাতে এসেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে চারুদত্ত৷ কাল অনেক রাত পর্যন্ত গার্ডেনরিচের নৌকাঘাটে দেবচরণদের জন্য অপেক্ষা করেছে। রাজকুমারী লাইনে চলতে চলতে তাকাল চারুদত্তের দিকে, দু-চোখের অসহায় দৃষ্টি যেন বলছে— হেরে গেলাম। তারপর ধীরে ধীরে তিনজনে জাহাজে উঠে পড়ল।

    তিনটে মাস্তুলে বিশাল বিশাল পাল মোটা মোটা কাছি দিয়ে বাঁধা। জাহাজের উপরের পাটাতনে দাঁড়িয়ে একজন জাহাজের কর্মচারী যাত্রীদের কাগজ চেক করে তবে প্রবেশ করতে দিচ্ছে। জাহাজের ভিতরে লোহার সিঁড়ি নিচের ডেকে নেমে গেছে। জাহাজের মাল্লারা তদারকি করছে। একজন মান্না ওদের নিচের ডেকে নিয়ে গিয়ে বাঙ্ক দেখিয়ে দিল।

    কাপড়-জামার গাঁটরি বাঙ্কে রেখে দেবচরণ বলল, ‘তাড়াতাড়ি চল রূপলাল সারেঙের কাছে।’ তিনজনে ছুটতে ছুটতে জাহাজের একদম উপরের পাটাতনে উঠে এল। মাল্লারা ব্যস্ত, নোঙর তোলার তোড়জোড় চলছে, অন্যদিকে সিঁড়ি তোলার জন্য কিছু মাল্লা দাঁড়িয়ে আছে। দেবচরণ সামনের বৃদ্ধ কর্মচারিকে বলল, ‘রূপলাল সারেঙকে কোথায় পাব?’

    ‘কাকে?’ বৃদ্ধ কানে কম শোনে।

    ‘রূপলাল সারেঙ।’

    ‘রূপলাল সারেঙ!’ বৃদ্ধ অবাক। ‘সে তো কবে মরে হেজে গেছে!’

    ‘মরে গেছে?’ দেবচরণ স্তম্ভিত। ‘ঠিক জানো?’

    ‘জানব না! ওর ছেলে হীরালালই তো এখন মজুর পাঠাবার দালালি করে।’

    তুলসী কপাল চাপড়ে বলল, ‘সব্বোনাশ! হীরালাল আমাদের ঠকিয়েছে।’

    দেবচরণ ছুটে সিঁড়ির কাছে গেল। তখনো কিছু কুলি মাল নিয়ে ধীরে ধীরে জাহাজে উঠছে।

    ‘আমি এক্ষুনি আসছি।’

    ‘না,’ তুলসীর উদ্বিগ্ন মুখ। ‘জাহাজ ছেড়ে দিলে কী হবে?’

    ‘চিন্তা করিস না, আমি ঠিক তার আগে ফিরে আসব।’

    কুলি যাত্রীদের বিস্মিত দৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দেবচরণ এক ছুটে নিচে বন্দরে এসে নামল। হীরালাল একজন গোরা সাহেবের সঙ্গে ডকে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, বগলে ফাইল। দেবচরণ হাঁফাতে হাঁফাতে হীরালালের সামনে এসে দাঁড়াল।

    ‘তুই!’ হীরালাল অবাক। জাহাজ থেকে নেমে এলি?’

    ‘আমার কলসী দে’ দেবচরণ বলল।

    জাহাজের প্রথম ভোঁ হল।

    শিগগির জাহাজে ওঠ, হীরালাল তাড়া লাগাল। ‘তোর মেয়ে বৌকে নিয়ে জাহাজ ছাড়ল বলে।’

    ‘তুই মিথ্যা কথা বলেছিস,’ দেবচরণ হীরালালের কোটের কলার চেপে ধরল। ‘কীসের মিথ্যা কথা?’ হীরালাল এক ঝটকায় নিজেকে মুক্ত করে রুক্ষস্বরে বলল।

    ‘সেটা তুই ভালই জানিস। তোর মরা বাপের নামে মিথ্যা বলে ধান্ধা করছিস? ছিঃ!’

    হীরালাল শাস্ত ভাবে বলল, ‘তোর জাহাজ এক্ষুনি ছাড়বে। তোর মেয়ে, বৌ জাহাজে আছে, তুই জাহাজে ফিরে যা। তোর কলসী আমি পরের জাহাজে পাঠিয়ে দেব।’

    ‘না, তুই এক্ষুনি আমায় কলসী দে।’

    ‘দেব না,’ হীরালাল বলল। ‘তুই যা করার করে নে।’

    ‘দিবি না? আমি এখানে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলব যে তুই ভারতীয় বলে নেপালী কুলি গায়ানাতে পাঠাচ্ছিস।’

    হীরালালের চোখে কুটিল দৃষ্টি— ‘সাহস থাকলে বল, কিন্তু তোর মেয়ের খবর জানাজানি হয়ে গেলে ওকে বেঁধে নেপালে নিয়ে যাবে, সেকথা ভেবেছিস?’

    দেবচরণ চুপ হয়ে গেল। এ লোকটা সব পারে। দেবচরণকেই মিথ্যুক সাজিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে নেবে। তারপর রাজকুমারীর ওপর অত্যাচার হবে। দেবচরণ অসহায়।

    ‘যা জাহাজে ফিরে যা, আমি এই কলসী রানাকে উপহার দিয়ে তার বদলে অনেক কমলারিকে লেবার করে গায়ানাতে পাঠাব,’ হীরালাল হাসল। ‘গায়ানাতে মেয়ে খুব কম।’

    ‘না!’

    পিছন থেকে গম্ভীরস্বরে ‘না’ শুনে হীরালাল বিস্মিত হয়ে ঘুরে তাকাল। চারুদত্ত এসে দাঁড়িয়েছে।

    ‘তুই এই কলসী যদি ওকে এখনি দিস তবে আমি পরের জাহাজে লেবার হয়ে গায়ানা যেতে রাজি আছি।’

    হীরালাল দ্বিধায় পড়ে ভাবল। একটা লেবার পাঠালে অনেক টাকা দালালি করে উপার্জন করা যায়। আজকাল লেবার খুঁজতে কোথায় কোথায় না তাকে যেতে হয়। রানার কাছে কলসী নিয়ে গেলে রানা যে ওর কথা বিশ্বাস করবে তারও নিশ্চয়তা নেই। তবু সে সন্দেহের চোখে বলল— তুই মিথ্যা বলছিস।’

    ‘খড়াভূত আর পাঁচুয়ার দিব্যি দিয়ে থারু কখনো মিথ্যা কথা বলে না, ‘চারুদত্ত দিব্যি দিল। আর তুই এখনো যদি না মানিস, তবে জাহাজ ছাড়লে আমি তোর নামে নালিশ করব। তুইই বলেছিস নেপালের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের চুক্তি আছে কুলি না পাঠাবার। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের কানে কথাটা গেলেই তোর লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। দেখি তোকে কে বাঁচায়।’

    হীরালালের মুখ ঝুলে পড়ল— ‘না, তুই এমন কাজ করবি না। কক্ষনো না। আমার তাহলে জেল হয়ে যাবে।’

    ‘তাহলে যা কলসী নিয়ে আয়।’

    ‘আমি এক্ষুনি আসছি, হীরালাল প্যাকিং বাক্স, তেলের ড্রামের মধ্যে দিয়ে দৌড় লাগাল। দেবচরণ হীরালালকে অনুসরণ করে ছুটল।

    কিছুক্ষণের মধ্যে হীরালাল হাঁফাতে হাঁফাতে ফিরে এল, সঙ্গে দেবচরণ। দেবচরণের হাতে কলসী। হীরালাল বলল, ‘আমার কথা কারুকে বলবি না।’

    দেবচরণ ভিতরটা দেখে নিল। চারুদত্ত জাহাজে ওঠার লোহার সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। দেবচরণ চারুদত্তের সামনে এসে এক মুহূর্ত থামল, হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘তুই সত্যি আসবি পরের জাহাজে?’

    চারুদত্ত জামার নিচে কোমরে পেঁচানো মাফলারটা খুলে দেবচরণের হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা রাজকুমারীকে দিও। এটা ওর কাছে খুব পয়া।’

    দেবচরণের মনে পড়ে গেল বড়া সিপার গুরুবার কথা পতির সংস্পর্শ তোর মেয়ের অনেক বিপদ কাটিয়ে দেবে।

    ‘আমার জন্য অপেক্ষা করবে তো?’ চারুদত্ত ধরা গলায় বলল।

    ‘কথা দিলাম,’ কথাটা বলে দেবচরণের মনে হল থারু প্রথায় মেয়ের বাপ কখনো এভাবে কথা দেয় না। দিখনৌরি। দেবচরণ তাড়াতাড়ি ফতুয়া থেকে একটা টাকা আর একটা সিকি চারুদত্তের ডান হাতের তালুতে রেখে বলল, ‘চাল-হলুদের বদলে এই পবিত্র ছাই মাখিয়ে তোর টীকা করছি।’ বুদ্ধের কলস থেকে কিছুটা পবিত্র ছাই নিয়ে চারুদত্তের কপালে লেপে দিয়ে দেবচরণ মন্ত্র উচ্চারণের মত বিড়বিড় করে বলল ‘আজ সে তুম হামারো দামাদোয়া হো গায়ো।’ দেবচরণ চারুদত্তকে জড়িয়ে ধরল, জাহাজটা বেরসিকের মত ভোঁ দিল। দেবচরণ দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল জাহাজে।

    * * *

    ‘আপনার ফোন থেকে একটা ফোন করতে পারি?’ রিধিমা বলল স্যাণ্ডিকে। স্যাণ্ডি কোনও কথা না বলে ফোন এগিয়ে দিল। স্যাণ্ডি সুনয়নের দেওয়া উইগটা আঙুল দিয়ে সযত্নে ব্রাশ করতে করতে বলল, ‘আপনাকে দেখে আমি প্রথমে চমকে গেছিলাম। এই উইগে আর সিলভার রিমের চশমায় আপনাকে একদম মহাদেবী লাগছিল।’

    ‘আপনি মহাদেবীকে চেনেন?’

    ‘আমার দূর সম্পর্কের কাজিন। সুনয়নের সঙ্গে রিচমণ্ড হিলস গেজেটে কাজ করত। একমাস আগে ক্যানসারে মারা গেছিল। না হলে ওদের বিয়ে হত।’ খবরটা রিধিমাকে ধাক্কা মারল। নিজেকে সামলে রিধিমা নিচুস্বরে বলল, ‘আমি সরি, স্যাণ্ডি—’

    ‘দ্যাটস অলরাইট। তবে সুনয়নের জন্য কষ্ট হয়। খুব গভীর ভালবাসা ছিল। মহাদেবী চলে যাওয়ার সময় সুনয়নের ঠোঁট থেকে হাসিটা নিয়ে গেল। এখন ও রাতের পর রাত ঘুমোয় না, নিউজরুমে জেগে থাকে সারা রাত, রাতে রাস্তায় রাস্তায় রিপোর্ট জোগাড় করার ছুতোয় গাড়ি নিয়ে ঘোরে, কাজের মধ্যে না থাকলে ডিপ্রেশন ওর মনে নাকি জাঁকিয়ে বসে। সব সময় হতাশা ওকে ঘিরে আছে, ছেলেটা কেমন যেন জল না পাওয়া চারাগাছের মত শুকিয়ে গেছে।’

    ‘আমাকে ও এসব কিছুই বলে নি।’

    ‘খুব চাপা ছেলে, আপনি ফোনটা করে নিন।’

    রিধিমা দীর্ঘশ্বাস চাপল। কিছু মানুষ বুকের ভিতর দুঃখকে অন্তঃপুরবাসিনী অসূর্যম্পশ্যা করে রাখে। বাইরের বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী, মা-বাবা-ভাইবোন কেউ তার অস্তিত্ব টেরই পায় না। রিধিমা স্যালির নম্বর ডায়াল করল – ‘হ্যালো স্যালি?’

    ‘রিধিমা?’ স্যালি প্রায় ফিসফিস করে বলল। ‘ঠিক আছো তো?’

    ‘হ্যাঁ, থ্যাঙ্কস স্যালি। তুমি কি জানো আমাদের হার্ভার্ডে বুদ্ধের মা মায়াদেবীর কোনও টেম্পল বা স্ট্যাচু আছে কিনা?’

    ‘বুড্ডাস মাদার!’ স্যালি প্রশ্ন শুনে অবাক। আমি তো কখনও শুনি নি।’

    ‘শিওর?’

    ‘শিওর।’

    বাইরে আবার দরজা খটখট। ‘গিম্মি ডা ফোন,’ স্যাণ্ডি হাত বাড়াল।

    ‘থ্যাঙ্কস স্যালি। আই গট্টা গো।’ ফোন বন্ধ করে স্যাণ্ডিকে ফেরত দিল রিধিমা। স্যাণ্ডি উপরে গিয়ে দরজা খুলল। সুনয়ন। সুনয়নের হাতে একটা কাগজের কাপ হোল্ডারে তিনটে কফি আর একটা ঠোঙা। ‘পাইপিং হট,’ সুনয়ন বলল। অ্যাণ্ড মাফিন।

    ‘এত বরফের মধ্যেও ডানকিন ডোনাটস? আমি ইম্প্রেসড।’ রিধিমা বলল। এবার স্যাণ্ডি রিধিমাকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে সাদা ব্যাকড্রপের সামনে দাঁড় করাল, ‘চশমাটা খুলুন, এটা পাসপোর্টের ফটো,’ স্যাণ্ডি খোলা ছাতার লাগোয়া দুটো হাই পাওয়ার ল্যাম্প জ্বালিয়ে বলল। তারপর নিকন ডিজিটাল ক্যামেরার ডঃ অঞ্জলি দত্তের ফটো তুলল।

    ‘এবার আমাকে একঘন্টা টাইম দাও,’ স্যাণ্ডি বলল। ‘এখন খুব কনসেন্ট্রেশন দিয়ে কাজ করতে হবে।’ স্যাণ্ডি আবার বেসমেন্টে নেমে গেল। সুনয়ন বলল, ‘স্যাণ্ডি হল টোটাল পারফেকশনিস্ট।’

    রিধিমা উত্তর দিল না। টোটাল পারফেকশনিস্টদের ওর খুব একটা পছন্দ না। ফ্রেঞ্চ ইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টার ক্লোঁদ মোনে ছিল একজন পারফেকশনিস্ট। ওর বৌ ক্যামিলে যখন মৃত্যুশয্যায় তখন মোনে মৃত্যুপথযাত্রিনী স্ত্রীর গালের রং কিভাবে ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে তার ছবি এঁকেছিল।

    এক ঘন্টা পর স্যাণ্ডি উপরে উঠে এল, হাতে রিধিমার নতুন পাসপোর্ট। রিধিমা ওর পাসপোর্টটা দেখল— ডঃ অঞ্জলি দত্ত।

    ‘এক্সেলেন্ট!’ রিধিমা লোকটার ক্র্যাফটসম্যানশিপ দেখে অবাক।

    ‘খোলা রাখতে হবে, আঠার গন্ধটা চলে যাবে,’ স্যাণ্ডি বলল।

    পাসপোর্ট হাতে নিয়ে রিধিমা জানলার কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, আবার ঝুপ ঝুপ করে বরফ পড়া শুরু হয়েছে।

    ‘আমরা তাহলে চলি স্যাণ্ডি।’ সুনয়ন মহাদেবীর উইগটা হাতে নিল।

    স্যাণ্ডি বলল, ‘গুড লাক, রিধিমা।’

    দু’জনে স্যাণ্ডির গাড়িতে উঠে বসল। রিধিমা সুনয়নের দিকে এক ঝলক তাকাল। লোকটার মুখের দুঃখ-হতাশার ভাঁজগুলোর সঙ্গে স্যাণ্ডি রিধিমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। ঘনিষ্ঠ মানুষ চিরতরে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা রিধিমা জানে। তা সত্ত্বেও লোকটা ওর জন্য কত কিছু করছে। লোকটাকে ভুল বুঝেছিল রিধিমা। নিজের ওপর লজ্জা হল। ‘এবার কোথায়?’ রিধিমা বলল।

    ‘ব্যাক টু রিচমণ্ড হিলস,’ সুনয়ন বলল।

    ‘স্যাণ্ডি লোকটা ইন্টারেস্টিং,’ রিধিমা বলল। ‘আপনাকে খুবই পছন্দ করে।’

    ‘আমাদের অনেক দিনের কানেকশন,’ সুনয়ন বলল। ‘স্যাণ্ডির দাদু আর আমার দাদু বন্ধু ছিল। দুজনে একই জাহাজে গায়ানা থেকে ভাগ্যের সন্ধানে আমেরিকা আসে।’

    ইণ্ডিয়াতেও আপনাদের অ্যানসেস্টরসরা একে অন্যকে চিনতেন?

    মনে হয় না। কেননা আমার পূর্বপুরুষ নেপাল থেকে এসেছিল আর ওর পূর্বপুরুষ এসেছে ইণ্ডিয়ার দা নর্থ ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সেস এন্ড ঔধ থেকে। পরে ওই জায়গার নাম হয় ইউনাইটেড প্রভিন্সেস।

    ঠিক, এখন সে জায়গার নাম পালটে হয়েছে উত্তরপ্রদেশ, রিধিমা বলল। কিন্তু আপনি কী জানেন আপনার অ্যানসেস্টরস কারা?’

    ‘না, জানি না,’ সুনয়ন বলল। ‘আমরা গায়ানিজদের একটা ফ্যামিলি ট্রির আর্কাইভ বানিয়েছি। কলকাতা বন্দর থেকে এগার হাজার মাইল একশ দিনে পার হয়ে ইন্ডেঞ্চারড লেবাররা জাহাজে যখন গায়ানা পৌঁছাত তখন ত্রিনিদাদে পোর্ট-অব-স্পেনে ওয়ার্ডেনের অফিসে জাহাজের রেজিস্টারে লেখা হত ইমিগ্র্যান্টদের নাম, জাত, গ্রাম এসব। আমরা সেই আর্কাইভড রেজিস্টারের কপি আনিয়েছি আর আমাদের ছেলেমেয়েরা সব ডিটেল লিখে রাখছে এক্সেল স্প্রেডশিটে। কে এসেছে, কোথা থেকে এসেছে, কবে এসেছে, কোন জাহাজে এসেছে, তাদের নেক্সট জেনারেশনদের নাম কী এসব। ওখান থেকেই অনেকের মত স্যাণ্ডির অ্যানসেস্টরসদেরও ট্র্যাক করেছি, কিন্তু আমার পাস্ট ট্র্যাক করতে পারিনি।’

    একঘন্টা লাগল রিচমণ্ড হিলস পৌঁছোতে। চার্চটা কাছ থেকে দেখলে মনে হয় একটা পরিত্যক্ত চার্চ, পাথরের পাঁজরা বের করে দাঁড়িয়ে আছে৷ কম করে দুশ বছর তো হবেই। চার্চের পিছনে ছোট্ট একটা পার্কিং লটে অনেক গাড়ি । চার্চের চূড়া দেখতে দেখতে চার্চের দিকে এগোল রিধিমা।

    চার্চের দরজায় অনেকগুলো জুতো রাখা। জুতো খুলে চার্চে ঢুকতে হয়? রিধিমা জীবনে কক্ষনো এরকম চার্চ দেখেনি। ইতালির মিলানে একটা চার্চে একবার টুপি পরে ঢোকার সময় ওকে চার্চের গেটে বলেছিল টুপি খুলে ঢুকতে, কিন্তু জুতো খুলে? সুনয়নকে জুতো খুলতে দেখে রিধিমাও জুতো খুলে ভিতরে ঢুকল। চার্চের ভিতরটা অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে, কিন্তু গরম। সামনে একটা স্টেজ, তার ওপর যীশুর মূর্তির জায়গায় রাম সীতা-লক্ষ্মণ আর হনুমানের মূর্তি। স্টেজের নিচে অনেক গায়ানিজ লোক জটলা করে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে।

    ‘এদেরই কাল পুলিশের হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছে,’ সুনয়ন বলল। ‘আমরা নিচে বেসমেন্টে যাব। আসুন।’

    সুনয়নকে দেখে এবার কিছু লোক হাত তুলে সম্ভাষণ করল। সুনয়ন ওদের দিকে হাত নাড়িয়ে বলল, ‘একটু পরে আসছি।’

    রিধিমা সুনয়নের সঙ্গে বেদির পাশের কনফেশন বক্সের পিছনের ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। বেসমেন্টে পাশাপাশি অনেকগুলো লোহার খাট, তাতে বিছানা পাতা। ‘এখানে আমরা হোমলেস গায়ানিজদের আশ্রয় দিই, এগোতে এগোতে বলল সুনয়ন। পাশে ছোট্ট একটা কামরা। কামরার ভিতরে ঢুকে রিধিমা বলল, ‘পুলিশ আজকেও আসবে না তো?’

    ‘কথায় বলে এক গাছের ওপর দু’বার বজ্রপাত হয় না। তাছাড়া কংগ্রেসম্যানের পাওয়ার খুব।’

    নিচের ছোট ঘরটাতে একটা অফিস, ডেস্কে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফাইলপত্তর রাখা। পাশে একটা বিছানা, বিছানায় ভাঁজ করা লেপ, বালিশ।

    ‘এটা আমার অফিস। আপনি চাইলে এখানে রেস্ট নিতে পারেন,’ সুনয়ন বলল। ‘আমি একটা জিনিস একটু তাড়াতাড়ি চেক করে নিই।’ ডেস্কে একটা রাস্পবেরি পাই মিনি কম্পিউটার। সুনয়ন কম্পিউটারে লগ ইন করে টকাটক কী-বোর্ডে পাঞ্চ করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সুনয়ন হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ‘নাঃ! পেলাম না।’

    ‘কী?’

    ‘ডঃ উইকসের ইমেইল মেটাডেটায় একটা ইমেইলের সাবজেক্ট ছিল ‘অকশন ইনফরমেশন ডেডলাইন’। ইমেইলের মেটাডেটা থেকে IP অ্যাড্রেসটা খুঁজলাম,’ সুনয়ন ঠোঁট বেঁকিয়ে মাথা নাড়ল— ’টর অনিয়ন রাউটার ব্যবহার করে নিজের আইডেন্টিটি গোপন রেখেছে।’

    ‘তাহলে?’

    মাথাটাও টরের মত খুব স্লো হয়ে গেছে।’

    ‘অনিয়ন খুব স্লো বুঝি?’

    ‘হ্যাঁ, নতুবা স্যান্ডির রদ্দিমারা ল্যাপটপ থেকে আজ ভোরেই এসব ইনফরমেশন পেয়ে যেতাম। কিন্তু এখন আমাকে যেতে হবে উপরে, আমাদের কমিউনিটির লোকেদের একটু সাহায্য করতে হবে।’

    ‘একটা সাহায্য চাই,’ রিধিমা বলল।

    ‘বলুন।’

    ‘আপনি বলেছিলেন আপনারা গায়ানিজদের একটা ডেটাবেস বানিয়েছেন।’

    ‘হ্যাঁ।’

    ‘আমি কি সেই ডেটাবেস অ্যাকসেস করতে পারি?’

    ‘হ্যাঁ, আমার এই কম্পিউটার থেকেই সেই ডেটাবেস অ্যাকসেস করতে পারবেন। কিছু ইনফরমেশন চাই?’

    ‘হ্যাঁ। ত্রিনিদাদে যত জাহাজ ভারত থেকে ১৮৯৮ সালে এসেছিল তার ডিটেল হিস্টোরিক্যাল আর্কাইভস আছে?’

    ‘হ্যাঁ, কিন্তু সেই ইনফরমেশন দিয়ে আপনি কী করবেন?’

    ‘কলকাতা পোর্ট থেকে একটা জাহাজ ছেড়েছিল গায়ানার জন্য। সেখানে তিনজন যাত্রী ছিল – দেবচরণ, তুলসী আর রাজকুমারী। আমি এদের সম্বন্ধে একটু খোঁজ চাই।’

    ‘কেন?’

    ‘এদের সঙ্গে একটা দামি বস্তু ছিল। একটা কলসী, তাতে ব্রাহ্মীতে কিছু লেখা ছিল। দেবচরণ, রাজকুমারী আর তুলসী সেই কলসী নিয়ে জাহাজে চড়ে।

    ‘কীসের কলসী?’

    ‘পিতরাওয়ার স্তূপ খুঁড়ে একটা কলসী পাওয়া যায়, যেটা চোরের হাত থেকে দেবচরণ বাঁচায়। কলসীতে এমন কিছু লেখা ছিল যেটা পড়ে কলকাতায় ক্যাথিড্রালের বিশপ বলেছিলেন এটা লুকিয়ে রাখতে। আমি খুঁজছি সেই কলসী। জানতে চাই ওখানে কী লেখা ছিল।’

    রিধিমার কথায় সুনয়নের মনে কোনও উৎসাহ জাগল না। সুনয়ন এবার ঘড়ি দেখল— ‘আমি একটু উপরে আমার কমিউনিটির লোকেদের সঙ্গে দেখা করে আসি?’

    ‘হ্যাঁ হ্যাঁ শিওর!’ রিধিমা লজ্জা বোধ করল। ওর জন্য এই মানুষটার নিজের কাজকম্মো সব শিকেয়। ‘কম্পিউটারে কোনও পাসওয়ার্ড—’

    ‘ভক্তি,’ সুনয়ন বেরিয়ে যেতে যেতে বলল। ‘কিন্তু এই কম্পিউটার থেকে ফেসবুক, ট্যুইটার, হার্ভার্ড বা আপনার ত্রিসীমানায় যারা কখনো থেকেছে তাদের ইমেইল— এসব করতে পারবেন না। শুধু আমার ডেটাবেস খুঁজবেন। যদি অন্য কিছু করতে চান তবে অন্য ল্যাপটপ—’

    ‘আই প্রমিস।’

    সুনয়ন বেরিয়ে গেল।

    রিধিমা মনে মনে ভাবল যে মানুষটা তিন বছর মা’র সঙ্গে দেখা করে না, সে কীভাবে মায়ের নামে পাসওয়ার্ড সেট করে?

    সুনয়ন উপরে চলে যাবার পর রিধিমা কম্পিউটারে লগ ইন করতে করতে ভাবল যে মোহন ওকে ওর পাসওয়ার্ড বলতে ইতস্ততঃ করছিল। এবার রিধিমা খুঁজতে লাগল ১৮৯৮ সালে ত্রিনিদাদে এমবার্ক করা কলকাতা বন্দর থেকে আসা সব জাহাজের নাম আর তাদের প্যাসেঞ্জার লিস্ট। দেবচরণের লাস্ট নেম কী? রিধিমা ভাবল। হয়তো ওর নাম দেব আর সারনেম চরণ। রিধিমা চরণ লিখে সার্চ কম্যাণ্ড দিল। সাইত্রিশটা চরণ বেরিয়ে এল, কিন্তু দেব চরণ না রাজকুমারী চরণ বা তুলসী চরণ নেই।

    তাহলে? রিধিমা বলল। লাস্ট নেম দেবচরণ?

    রিধিমা ‘দেবচরণ’ টাইপ করল। কম্পিউটার দেখাল সার্চ রেজাল্ট জিরো। জাহাজের নাম দিয়ে চেষ্টা করা যাক। দাদার ডায়েরিতে জাহাজের নাম লেখা ছিল। রিধিমা ডায়েরিটা বের করল। জাহাজের নাম ‘রোন’।

    রিধিমা সার্চ বক্সে জাহাজের স্পেলিং R H O N E – রোন টাইপ করল।

    এবার কম্পিউটার স্ক্রিন নামে ভর্তি। ‘বাপরে,’ রিধিমা বলল। ‘পাঁচশ একাশি জন এই জাহাজে ইমিগ্রেশনে চেক ইন করেছে।’

    রিধিমার উৎসাহ বেড়ে গেল। স্ক্রিনে ঝুঁকে পরে ভারতীয় ইন্ডেঞ্চারড ইমিগ্র্যান্টদের নাম পড়তে লাগল। লম্বা লিস্ট, রিধিমার উদগ্রীব চোখ নাম খুঁজছে আর ডান হাতের অনামিকা মাউসে ক্লিক করে স্ক্রিনে স্ক্রল ডাউন করছে৷ দেখতে দেখতে পাতা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু দেবচরণ, রাজকুমারী, আর তুলসীর নাম পাওয়া গেল না।

    নাম নেই! রিধিমা হতাশ। দেবচরণ, তুলসী আর রাজকুমারী রোন জাহাজে চড়েছিল কলকাতায়, তবে ওদের নাম নেই কেন? রিধিমা খুঁজতে খুঁজতে ওয়ার্ডেনের শিপিং রিপোর্ট অ্যাকসেস করল। শিপিং রিপোর্ট ঘটিতে ঘটিতে হঠাৎ রিধিমার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। আশ্চর্য! পাঁচশ একাশি জন ভারতীয় যাত্রী ত্রিনিদাদে নেমেছে, কিন্তু কলকাতা থেকে জাহাজে চড়েছে ছ’শ নব্বই জন? বাকি একশ নয় জনের কী হল?

    রিধিমা পড়ল জাহাজে একশ নয় জনের মৃত্যু হয়। এত লোক জাহাজে মরে গেল! কিভাবে? দাদার ডায়েরি থেকে মনে হয় সে সময় কিছু যাত্রী রোগ লুকিয়ে জাহাজে উঠত। প্লেগ বা স্মল পক্সের পেশেন্ট থাকলে সেই রোগ মহামারীর মত জাহাজে ছড়িয়ে যেত। তাতে দু-তিন মাসের জার্নিতে জাহাজে অনেকে মারা যেত। সেরকম কিছু হয়েছিল?

    মৃত যাত্রীদের কী হত? ওদের সমুদ্রের জলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হত? রিধিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দাদার লেখা কাহিনির তাহলে এই মর্মান্তিক পরিণতি! রোন শিপ – ১৬ অক্টোবর, ১৮৯৫ – ডেট অব ডিসএমবার্কেশন অ্যাট ত্রিনিদাদ পোর্ট, রিধিমা উঠে দাঁড়াল। কুঠুরির সংলগ্ন বাথরুম, রিধিমা বাথরুমে ঢুকল। কুঠুরির হিটিং সিস্টেম পুরোনো দিনের রেডিয়েটর হিটিং, গরম জলে ঘর গরম হয়৷

    বাথরুম থেকে বেরোতে বেরোতে রিধিমা স্বগতোক্তি করল— ‘সিক্সটিন্থ অক্টোবর এইটিন নাইনটি ফাইভ।’ রিধিমার নিজের কানে কথাটা যেতেই রিধিমা থমকে গেল—’ওয়েট!’

    পিতরাওয়া স্তূপ খোঁড়া হয়েছিল জানুয়ারি এইট্রিন নাইনটি এইটে। তাহলে “রোন” এর ১৮৯৫ সালের অ্যারাইভাল লিস্টে ওরা কিভাবে আসবে? তাহলে ১৮৯৮ সালে রোন আবার ত্রিনিদাদে গেছিল?

    রিধিমা তাড়াতাড়ি কম্পিউটারে ফিরে গিয়ে ‘রোন’ টাইপ করল। রিধিমার মনটা এবার খুশিতে ভরে গেল। হ্যাঁ, রোন তারপর আরও একবার ত্রিনিদাদে গেছিল। টেনথ নভেম্বর এইটিন নাইনটি এইটে শিপ ত্রিনিদাদে ল্যাণ্ড করেছিল।

    ‘দশই নভেম্বর,’ রিধিমা গুনতে লাগল। ‘জাহাজ তিনমাস নিত কলকাতা থেকে ত্রিনিদাদ পৌঁছাতে। তার মানে অক্টোবর-সেপ্টেম্বর-আগষ্ট। জানুয়ারিতে ওরা পালিয়েছিল পিতরাওয়া থেকে, কলকাতা এসে বেশ কয়েক মাস জাহাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হিসাবটা মিলে যাচ্ছে।’

    ‘ছশ বাহান্ন জন যাত্রী, কিন্তু এবার মাত্র তিনজনের জাহাজে মৃত্যু হয়েছিল।’ ‘সুপার!’ রিধিমা উত্তেজিত। ওদের প্যাসেঞ্জার লিস্টটা রিধিমা স্ক্রল করতে লাগল। রিধিমার বুক ধকধক করছে। তিন-চারশ’ নাম পেরিয়ে গেল, কিন্তু যাদের খুঁজছে তাদের নাম নেই। রিধিমার উৎসাহ কমে যেতে লাগল। লিস্ট একদম শেষে এসে পৌঁছেছে। লিস্টের একদম নিচে তাকিয়ে রিধিমার হৃদপিণ্ড রক্ত পাম্প করতে ভুলে গেল—

    ডি জোসেফ – মেল

    আর রেবেকা – ফিমেল

    টি মরিয়ম – ফিমেল

    রিধিমার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। দেবচরণ জোসেফ, তাই ডি জোসেফ। রাজকুমারী হল আর রেবেকা আর তুলসী হল টি মরিয়ম।

    ‘গায়ানিজ অ্যানসেস্টর ট্রি ডেটাবেসে হয়তো এই দেবচরণের ডিসেন্ডেন্ট ট্রি পেতে পারি,’ রিধিমা ডেটাবেস সার্ফ করল। প্রত্যেক গায়ানিজ ইমিগ্র্যান্টের একটা ফ্যামিলি ট্রি ডেটাবেস বানানো হয়েছে। রিধিমা সেখানে খুঁজতে লাগল দেবচরণ জোসেফের বংশধর কারা। রিধিমাকে বেশি খুঁজতে হল না। রিধিমা খুঁজে পেল দেবচরণ-তুলসী-রাজকুমারীর বংশধরদের।

    জোসেফ + মরিয়ম

    রেবেকা + চারুদত্ত

    প্রহ্লাদ (১৯০২) + সরমা

    গোবর্ধন (১৯৩২)

    চারুদত্ত! রিধিমা’র মন খুশিতে ভরে গেল। তার মানে সেই চারুদত্ত রাজকুমারীর প্রেমে মজে পরের জাহাজে ত্রিনিদাদ পৌঁছায়। আর সেই চারুদত্তের সঙ্গেই বিয়ে হয় রাজকুমারীর। ওদের এক ছেলে জন্মায় ১৯০২ সালে, নাম প্রহ্লাদ। প্রহ্লাদের ছেলে জন্মায় ১৯৩২ সালে, নাম গোবর্ধন।

    ব্যাস, তারপর আর কিছু নেই। রিধিমা ডেটাবেসের নানা প্রাপ্ত খুঁজেও আর কিছু পেল না। হয়তো সেই গোবর্ধন আর বিয়ে করেনি। কিংবা হয়তো ইণ্ডিয়া ফিরে গেছিল। কিংবা হয়তো অন্য কোনও দেশে মাইগ্রেট করে চলে গেছিল। এই মাইগ্রেশন হয়তো ট্র্যাক করা যায় নি। মাইগ্রেশন ট্র্যাক করা খুব কঠিন হয়ে যায়। বংশের ট্রেসই পাওয়া যায় না। কর্ডটা ছিঁড়ে যায়। কোনও তথ্যও থাকে না। নানা গল্পকথা জুড়ে যায়। রিধিমার নিজের ক্ষেত্রেও এরকম হয়েছিল। রিধিমার দাদুর বাবা বর্মা থেকে এসেছিলেন। বর্মার আত্মীয়দের কোনও ট্র্যাক নেই। আছে শুধু গপ্পো কথা, রিধিমার পূর্বপুরুষরা নাকি বিশাল জমিদার ছিল। বাংলাদেশ থেকে রিফ্যুজি হয়ে আসা অনেক বাঙালিই দাবি করে তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি পূর্ব বাংলায় জমিদার ছিল। যেমন সুনয়নের মাকে সুনয়নের দাদু গল্প শোনাতো যে তার দাদি নাকি প্রিন্সেস ছিলেন।

    প্রিন্সেস?

    ভক্তির দাদি নাকি অভিশপ্ত রাজকুমারী ছিলেন।

    ছোটবেলার বানিয়ে বানিয়ে গল্প? মিথ্যা গল্পকথা?

    কিন্তু যদি সত্যি কথা হয়? যদি সত্যি হয় তাহলে কী?

    প্রিন্সেস কথাটার উত্তর-ভারতীয় বা নেপালের অর্থ হল রাজকুমারী। এই রাজকুমারী দেবচরণ আর তুলসীর মেয়ে রাজকুমারী রেবেকা নয় তো? রাজকুমারী যার ওপর অপদেবতা ভর করতো! সেজন্য ওকে অভিশপ্ত রাজকুমারী বলে নি তো?

    রিধিমা উঠে দাঁড়াল। সুনয়নকে দরকার। বাইরে বেরিয়ে তরতর করে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এল রিধিমা। উপরটা খালি! গোটা দলবল সমেত সুনয়ন কোথাও গেছে। হয়তো থানায়, বা কংগ্রেসম্যান-টংগ্রেসম্যান। রিধিমার আর তর সইছে না। রিধিমা পকেট থেকে ফোনটা বের করে বেসমেন্টে দৌড়ে নামল। তারপর ভক্তির নম্বর ডায়াল করল। ভক্তি ফোন তুলল।

    ‘হ্যালো ভক্তি? আমি রিধিমা।’

    ‘রি-ধি-মা!’ তক্তি চেঁচিয়ে উঠল। ‘সুনয়নের থেকে তোমার খবর পেয়েছি।’

    ‘ভক্তি, একটা প্রশ্ন ছিল।’

    ‘বল— বল কী প্রশ্ন?’

    ভক্তি, আপনার বাবার নাম কি গোবর্ধন?’

    ‘নাতো কেন?’

    রিধিমা হতাশ— ‘কী নাম ওঁর?’

    ‘মি বাহবু? গোয়ারডেন সীটাপোটী।’

    ‘বিংগো!’ রিধিমার মুখ-চোখে খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠল। গায়ানাতে ভারতীয় নামগুলো সব পাকিয়ে গেছে। যেমন শিবরতন হল শিউরট্টন, সীটাপোটী সীতাপতি, সেরকম গোবর্ধন হল গোয়ারডেন।

    ‘তার মানে?’

    আপনার কী মনে আছে আপনার দাদুর নাম?’

    ‘আজা?’ বুড়ি বলল। ‘পেরহলাদ।’

    ‘ওকে থ্যাঙ্কস!’ রিধিমা উচ্ছ্বাসে ভেসে গেল। পেরহলাদ মানে প্রহ্লাদ। ‘আপনি কি কোনও কলসীর কথা জানেন যা আপনার পূর্বপুরুষরা ইণ্ডিয়া থেকে সঙ্গে নিয়ে আসে?’

    ‘বুদ্ধাপট,’ ভক্তি গজগজ করতে করতে বলল। ‘ওটাকে নিয়েই তো ডঃ উইকস আর সুনয়নের ঝগড়া হয়। আর সুনয়ন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।’

    ‘থ্যাঙ্কস ভক্তি,’ রিধিমা বলল। ‘আমি রাখছি আজ। আবার কথা হবে।’ রিধিমা ফোন নামিয়ে রাখল। বুকের মধ্যে আবিষ্কারের আনন্দ। ডঃ উইকসের মিসিং লিঙ্ক সে পেয়ে গেছে! তরাইয়ের দেবচরণ আর ত্রিনিদাদের রেজিস্টারে লেখা নাম জোসেফের মধ্যেই রয়েছে এই মিসিং লিঙ্ক। একই মানুষ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য নাম। পাশের বিছানাটা টানছে। কাল রাতে দু ঘন্টাও ঘুম হয় নি। বিছানায় শরীরটাকে গড়িয়ে দিল রিধিমা। তারপর হঠাৎ মনে পড়ল। রিধিমা ছুটে উপরে গেল। উপরে রাম–সীতা–লক্ষ্মণ-হনুমান। সামনে প্রদীপ জ্বলছে। ধুনুচিতে ধুনো ঢালা। রিধিমা ধুনুচিতে আগুন দিল, দাউ দাউ করে ধুনো জ্বলে উঠল। রিধিমা পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফেলে দিল আগুনে।

    বার্নার ফোন!

    ৷৷ আঠাশ ৷৷

    রাতে সুনয়ন ফিরল, চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। ‘খবর ভাল না,’ সুনয়ন গম্ভীর, একটা ব্যাকপ্যাক কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখল।

    ‘কী হয়েছে?’

    ‘তিনদিন ধরে যা চলছে এয়ারপোর্ট আর ধকল নিতে পারছে না।’

    ‘এয়ারপোর্ট আবার বন্ধ?’

    ‘টারম্যাকে প্লেনের ট্রাফিক জ্যাম। এত প্লেন যে গেট কম পড়ে গেছে। এয়ার চায়নার বোয়িং ল্যাণ্ড করার সাত ঘন্টা পরেও প্যাসেঞ্জাররা প্লেন থেকে নামতে পারে নি।’

    ‘কেন? বম্ব-সাইক্লোন তো দু’দিন আগে চলে গেছে, তাহলে?’

    ‘তারপরেই ঝামেলাটা শুরু। রানওয়ে আর ট্যাক্সিওয়ের তিন ফুট বরফ পরিষ্কার করতে করতে মাঝে মাঝেই বরফের পাহাড় তৈরি হয়েছে। প্লেনগুলো যে এদিক ওদিক নড়াচড়া করবে তার উপায় নেই। বারোটা প্লেন ডিপার্চার লাইনে দাঁড়িয়ে। তিন দিন একটানা সিঙ্গল ডিজিট টেম্পারেচার, তার ওপর আজ দুপুরে টার্মিনাল চারে একটা জলের মেন পাইপ ফেটে গেছে, এয়ারপোর্টে প্রথমে তিন ইঞ্চি জলের স্রোত, তারপর এই ঠাণ্ডায় সব জল জমে বরফ, এয়ারপোর্টের কর্মচারীরা ব্যতিব্যস্ত।’

    ‘তাহলে তো চিন্তার কথা!’ রিধিমা বলল।

    ‘কালকের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে আশা করি,’ সুনয়ন রিধিমাকে ভরসা দিল। ‘তবে ব্যাকলগ ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। আপনাকে অনেকক্ষণ এয়ারপোর্টে আটকে থাকতে হতে পারে। যত বেশিক্ষণ এয়ারপোর্টে থাকবেন তত ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা বাড়বে।’ সুনয়ন ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করল। ‘এটা এয়ার ইণ্ডিয়ার বোর্ডিং পাস, স্যাণ্ডির কাছে যেতে হয়েছিল স্ট্যাম্প লাগাতে, ‘সুনয়ন আবার ব্যাগের ভিতর হাত ঢোকাল। ‘এটা এয়ারপোর্ট জেনিটারের অ্যাপ্রন, গ্লাভস, চশমা, আর এটা জেনিটারের ID কার্ড।’ আবার ওগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল সুনয়ন।

    রিধিমা বোর্ডিং পাসটা দেখল। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির স্ট্যাম্প লাগানো, ফ্লাইট তিনটে পনেরয়। দুটো পনেরয় বোর্ডিং। ডিপার্চার গেট A6।

    আমি আপনাকে টার্মিনাল ফোরের পার্কিং লটে ছেড়ে দেব দুপুর দেড়টায়। এয়ারপোর্টে ঢুকেই অ্যারাইভাল লাউঞ্জ। ডানদিকে উইমেন্স রেস্টরুম। প্রথমেই রেস্টরুমে ঢুকে যাবেন। রেস্টরুমে একটা স্টলে ঢুকে দরজা বন্ধ করে আপনি এই এয়ারপোর্ট অ্যাপ্রন পরে ফেলবেন, গলায় আইডেন্টিটি কার্ডটা ঝুলিয়ে রাখবেন। হাতে এই ভিনাইল গ্লাভস পরতে ভুলবেন না, চোখে সেফটি গ্লাসেস পরে নেবেন। ওখানে রোলার ট্র্যাশবিন দেখবেন। একটা ভর্তি ট্র্যাশবিন তুলে নেবেন। রোলার ট্র্যাশবিন ঠেলতে ঠেলতে এমপ্লয়িজ ওনলি গেটে এসে দরজায় এই কার্ডটা স্ক্যান করবেন।’

    ‘কিন্তু সিকিউরিটি চেক?’

    ‘এখানেই তো এদেশের এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির লুপহোল। হোমল্যাণ্ড সিকিউরিটির কড়াকড়ি ওসব প্যাসেঞ্জারদের জন্য। আপনার বেল্ট, জুতো সব খুলিয়ে চেক করাবে, জলের বোতল ফেলাবে প্যাসেঞ্জারদের ঢোকার সময়, কিন্তু এয়ারপোর্ট এমপ্লয়িদের গেটে কোনও চেকিং নেই। শুধু আইডি কার্ড স্ক্যানারে স্ক্যান করলেই হল ।

    ‘আপনি শিওর?’

    ‘শিকাগো, আটলান্টা, নিউ ইয়র্ক সব জায়গাতেই এই ল্যান্স নিয়ে অনেক কথাবার্তা মাঝে মাঝেই হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তাহলে রিসোর্স প্রচুর বাড়াতে হয়। শুধু JFK এয়ারপোর্টে পঁয়ত্রিশ হাজার এমপ্লয়ি কাজ করে। কার্ড স্ক্যান করেই এরা ভিতরে ঢোকে। চেকিং নেই কোনো। যাই হোক, ভিতরে ঢুকে দশ ফুট মত এগিয়ে যাবেন। সামনে ডানদিকে আর একটা উইমেনস বাথরুম। ট্র্যাশবিন নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবেন। অন্ততঃ পনের মিনিট বাথরুমে বসে থাকবেন। তারপর অ্যাপ্রন, গ্লাভস সব খুলে বেরিয়ে আসবেন। আপনি এখন প্যাসেঞ্জার যার সিকিউরিটি চেক ডান, বোর্ডিং পাসে সিকিউরিটি স্ট্যাম্প লাগানো। সোজা ডিপার্চার গেট A6-এ চলে যাবেন। উল্টোদিকে একটা আইরিশ পাব। ঐ পাব থেকে দেখা যায় বোর্ডিং অ্যানাউন্স হয়েছে কিনা। বোর্ডিং অ্যানাউন্স করবে সওয়া দুটো নাগাদ। তখনই প্লেনে ঢুকবেন না। আধঘন্টা পর ধীরে সুস্থে প্লেনে ঢুকবেন। কাল আরেকবার স্টেপগুলো বলে দেব। ঠিক আছে?’

    রিধিমা নার্ভাস, দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে মাথা নাড়ল। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই৷’

    ‘চিন্তা করবেন না। ভরসা রাখুন আমার প্ল্যানে। ফাইনাল অ্যাডভাইস, ইন কেস—’ সুনয়ন থামল। ‘ইন কেস, পালাবার প্ল্যানটা এয়ারপোর্টে ফ্লপ হয়ে যায়,’ সুনয়নের কন্ঠস্বর সিরিয়াস ‘তবে ছুটে পালাতে যাবেন না। পুলিশ কিন্তু টেররিস্ট সন্দেহ করে গুলি চালিয়ে দেবে।’

    ‘তবে কী করব?’

    ‘দোতলায় উঠে আসবেন। সার্কুলার এয়ারট্রেন। প্রতি দু-মিনিটে একটা ট্রেন আসছে যাচ্ছে। আপনি ট্রেনে টার্মিনাল ফোর থেকে বেরিয়ে জ্যামাইকা এয়ারট্রেন স্টেশনে আসবেন। আপনি প্লেনে না ওঠা পর্যন্ত আমি গাড়ি নিয়ে জ্যামাইকা স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করব। ঠিক আছে?’

    রিধিমা মাথা নাড়ল। সুনয়ন এবার ডেস্কের দিকে তাকাল, রিধিমা রাইটিং প্যাডে অনেক কিছু লিখেছে। ‘যা ইনফরমেশন খুঁজছিলেন পেলেন?’

    ‘হ্যাঁ,’ রিধিমা বলল। ‘অন্ততঃ একটা কাজ করে যেতে পারলাম। খুঁজে পেলাম আপনার শিকড়।’

    ‘আমার শিকড়?’

    ‘হ্যাঁ, আপনার পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজকুমারী।’

    ‘সত্যি প্রিন্সেস?’

    ‘গরিব বাবার কাছে তিনি ছিলেন প্রিন্সেস। তাই নাম রাখা হয়েছিল রাজকুমারী। আপনার সেই পূর্বপুরুষের পরিবার ভারত থেকে এক মহা মূল্যবান কলসী অনেক ঝড়ঝাপটা সয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। সেই কলসীর ইতিহাস হারিয়ে যায়, কিন্তু সেই কলসী রয়ে যায় আপনাদের বাড়িতে। আমার দাদা সেই কলসীর ইতিহাস লেখা শুরু করেছিল, কিন্তু সেই ইতিহাসের শেষ অধ্যায় দেখতে পেয়েছিলেন ডঃ উইকস। আর তাই তিনি বুদ্ধাপটকে বিক্রি হতে দেন নি। কিন্তু কোথায় যে তিনি বুদ্ধাপট লুকিয়ে রেখেছেন, আর কলসের গায়ে কী লেখা ছিল সেটা না খুঁজে বের করলে একটা রহস্য চিরকালের জন্য অজানা থেকে যাবে।’

    ‘ফার্স্ট থিং ফার্স্ট,’ সুনয়ন বলল। ‘মা’কে ফোন করেছিলেন?’

    ‘হ্যাঁ,’ রিধিমা অপরাধীর মত বলল। ‘তবে ফোনটা উপরে ধুনুচিতে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালিয়ে দিয়েছি। বার্নার ফোন।’

    সুনয়ন পকেট থেকে আরেকটা বার্নার ফোন বের করল, ‘এটা রাখুন ।’

    ৷৷ উনত্রিশ ৷৷

    চুম্বকে যেমন লোহা আটকে থাকে সেভাবে হরিপরসাদের সঙ্গে আটকে সব সময় সঙ্গে সঙ্গে চলেছে পাহারাদার রগ্যাপা লামা। লুসিকে নাম্বার টু করাবার ছলে মনাস্টারির পিছনের ড্রেনগুলোও হরি পরসাদের ঠিকমত দেখা হল না। মনাস্টারি থেকে বাইরে যাওয়ার সামনের রাস্তাটা পাহাড়ের মাথা থেকে পাক খেয়ে খেয়ে নিচে নেমে গেছে। অনেক নিচে দেখা যাচ্ছে একটা চেক পোস্ট।

    মঞ্জুশ্রী লামা বলেছে ড্রেন। কোথাও ড্রেনের কোনও দেখা নেই, কোথা দিয়ে সে পালাবে সেটা দিনের বেলাতে দেখেই বুঝতে পারছে না, রাতের বেলা অন্ধকারে পালাবে কী করে? হরিপরসাদ স্থির করল আবার সে মঞ্জুশ্রী লামার মন্দিরে যাবে পথ জানতে।

    মঠে ফিরে এসে হরিপরসাদ স্নান করে প্রাতরাশ করতে করতে মঞ্জুশ্রী লামার লেখা কাগজটা খুলল। লোকটার হাতের লেখা কাঁপা কাঁপা। হরিপরসাদের নজর গেল লেখাটায়— HE GENEROUS —হরিপরসাদকে প্রশংসা করে লেখা। তাই কি? একে তো সংকেত হিসাবে ধরেই নি হরিপরসাদ। এখনো পর্যন্ত মঞ্জুশ্রী লামা একটা শব্দও বাড়তি খরচ করে নি। ওটার মধ্যে কি তবে কোনও সংকেত আছে? HE কে উলটে পালটে কিছু হয় না, তার মানে HE কে বড় শব্দটার সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। শব্দ দুটোকে একসঙ্গে জুড়ল হরিপরসাদ—

    HEGENEROUS

    তারপর মাথার মধ্যে একটা হাই-স্পিড কম্পিউটার চালিয়ে দিল— এই খেলার নেশাই আলাদা— অজস্র পারমিউটেশন কম্বিনেশন কাজ করছে, কনসাস মাইণ্ড ও সাবকনসাস মাইণ্ডে ক্রমাগতঃ প্রবাবিলিটির আদান প্রদান চলছে, ভাঙা-গড়া-স্থান পরিবর্তন। মিনিট পনের পর হরিপরসাদ দেখতে পেল শব্দটাকে। কোড ভাঙা হয়ে গেছে—

    GREENHOUSE হরিপরসাদ কাগজটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে বাথরুমে গিয়ে ফ্লাশ করে দিল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleতালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    দোকানির বউ

    January 5, 2025
    Our Picks

    কপিলাবস্তুর কলস – প্রীতম বসু

    March 23, 2026

    তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব – সায়ক আমান

    March 23, 2026

    কালীগুণীন ও বজ্র-সিন্দুক রহস্য – সৌমিক দে

    March 23, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }