কপিলাবস্তুর কলস – ৩০
৷৷ ত্রিশ ৷৷
আজ 1-678এ বাম্পার-টু-বাম্পার ট্রাফিক!
রিচমণ্ড হিলস থেকে নিউ ইয়র্ক কেনেডি এয়ারপোর্ট মোটে চার মাইল। ট্রাফিক না থাকলে সাত মিনিট লাগে, কিন্তু এখন তুষারঝড়ের পর সব কিছু স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে, লোকেরা আবার এয়ার-ট্রাভেল করা শুরু করেছে। তাই রাস্তায় গাড়ির ভিড় খুব বেড়ে গেছে।
সুনয়ন এয়ারপোর্টের চার নম্বর টার্মিনালের পার্কিং লটে গাড়ি থামাল। তারপর এয়ার ইণ্ডিয়ার ওয়েবসাইটে গিয়ে প্লেনের ডিপারটিং স্কেজুলে সুনয়ন চোখ রেখে বলল, ‘ফ্লাইট অন স্কেজুল।’ এবার সুনয়ন রিধিমার দিকে তাকাল— ‘গুড লাক।’
রিধিমা সুনয়নের হাত দু’হাত দিয়ে চেপে ধরল। মনে কৃতজ্ঞতার শব্দগুলো ঠেলাঠেলি করে গলা দিয়ে বেরোতে গিয়ে গলাতে জ্যাম হয়ে গেল। আর সেই শব্দরাজি নীরব দৃষ্টি হয়ে সুনয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। কী মানসিক কে ডাউনের মধ্যে লোকটা কত বিপদের ঝুঁকি নিয়েছে শুধু ওর জন্য! ওকে মাঝরাতে রাস্তা থেকে তুলে মহাদেবীর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে দিয়েছে, ট্রেসির ভর্ৎসনা শুনেছে, রাতের সাবওয়ে ট্রেন, একদিকে পুলিশের ঝুঁকি অন্যদিকে খুনিদের, জাল পাসপোর্ট, ওর মাথার চুল পর্যন্ত কত যত্ন করে কেটে দিয়েছে। রিধিমা এখন অনুভব করল এই মানুষটার ওপর এই ক’দিনে অজান্তে একটা আলগা ভাললাগা তৈরি হয়ে গেছিল।
‘নিজের নামটা মনে আছে তো?’
রিধিমার ঘোর কাটল। রিধিমা হাসল, নার্ভাস হাসি—’ডঃ অঞ্জলি দত্ত।’
‘এটা রাখুন।’ সুনয়ন রিধিমার সোনার বালাটা ফেরত দিল। ‘এটা আর গলার চেনটা আমার কম্পিউটারের পাশে খুলে রেখে এসেছিলেন। আর এই সাতশ’ ডলার। এগুলো দিয়ে স্যাণ্ডির খরচা মেটাবার দরকার নেই। আমি দেখে নেব। ফোনটা অন রাখবেন।’
রিধিমা নিরুত্তর, জীবনে কিছু ধার শোধ করতে নেই। হাতে বালাটা গলিয়ে নিল।
‘আপনার ল্যাপটপ আমার কাছে থাক। সব স্বাভাবিক হয়ে গেলে ইণ্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেব।’
রিধিমা প্যাকেট হাতে গাড়ি থেকে নামল। সামনে রাস্তার ওপারেই এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স। রিধিমা দ্রুতপায়ে অ্যারাইভাল টার্মিনালে ঢুকে গেল। ভিতরে ঠাসা ভিড়। বোঝা যাচ্ছে এয়ারপোর্টে অবস্থা এখনো স্বাভাবিক হয় নি। রিধিমা ঢুকেই মেয়েদের পাবলিক টয়লেটে ঢুকল। এয়ারপোর্ট জেনিটারের অ্যাপ্রন পরে গলায় জেনিটারের ID কার্ড ঝুলিয়ে নিল রিধিমা। হাতে গলিয়ে নিল ভিনাইল গ্লাভস, চোখে সেফটি গ্লাসেস। দরজার পাশে ট্র্যাশ বিন উপছে পড়ছে, রিধিমা চাকা লাগানো ট্র্যাশবিনটা ধরল। এক মুহূর্তের দ্বিধা, তারপর টাশনিটা বের করে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলল সামনে। ডান দিকে এসকালেটার উঠে গেছে— দোতলায় এয়ারট্রেন, তিন তলায় ডিপার্চার। বাঁয়ে এলিভেটরের সামনে ট্রলি নিয়ে যাত্রীদের লম্বা লাইন। এগোতে এগোতে রিধিমা দরজার সামনে এসে ID কার্ডটা গলা থেকে খুলে স্ক্যানারে স্ক্যান করল, দরজা খুলে গেল। রিধিমা এয়ারপোর্টের ম্যাপটা মনে করার চেষ্টা করল। দশ গজ মত দূরে আরেকটা মেয়েদের বাথরুম থাকার কথা। বোর্ডটা দেখা যাচ্ছে, রিধিমা বাথরুমে ঢুকে ট্র্যাশবিনটা দরজার পাশে রেখে একটা স্টলে ঢুকে পড়ে কমোডের ওপর বসে হাঁফাতে লাগল। প্রথম পার্টটা ঠিকমত কেটেছে। রিধিমা অ্যাপ্রন খুলে ফেলল, নিচে শার্ট আর স্কার্ট, চোখে চশমা পরে নিল। তারপর সুনয়নের কথা মত পনের মিনিট অপেক্ষা করল।
পনের মিনিট পর অ্যাপ্রনটা ট্রাশে গুঁজে টয়লেট থেকে বাইরে বেরিয়ে এল রিধিমা। সিকিউরিটি বাইপাস হয়ে গেছে। বাঁদিকে ‘A’ গেটস, ডান দিকে ‘B’ গেটস, দু’পাশে ডিউটি ফ্রি শপস, অ্যাপল স্টোর, ম্যাকডোনাল্ডস, কনভিনিয়েন্ট স্টোর্স। সর্বত্র যাত্রীদের ভিড়। ভিড়েই রিধিমা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে এখন। ‘A’ গেটগুলোর দিকে চলতে লাগল রিধিমা। সামনে ডানদিকে দেখা যাচ্ছে গেট A6, সামনের সোফাগুলো সব ভরা, বেশির ভাগ যাত্রীই সেলফোনে ঝুঁকে রয়েছে। ঘড়ি দেখল রিধিমা – দুটো। এখনো আধ ঘন্টার বেশি সময় হাতে। বাঁদিকে আইরিশ পাব। রিধিমা আইরিশ পাবে ঢুকে একটা টেবিলে বসে মেনু দেখতে লাগল— ডাবল এগ স্ক্র্যাম্বল্ড, আইরিশ সসেজ, র্যাশারস, মাশরুমস, টোম্যাটোস, গিনেস শেডার ব্রেড, ব্ল্যাক এণ্ড হোয়াইট পুডিং আর কফি। রিধিমা ভাবছিল যে প্লেনে উঠে বিক্রমকে একটা ফোন করে দিতে হবে, ব্যাকপ্যাকে ফোন নম্বরটা রয়ে গেছে, সুনয়নকে বলতে হবে। ঠিক তখনই ফোনটা এল।
‘রিধিমা?’
ইয়েস, সুনয়ন,’ রিধিমা নিচু গলায় বলল। ‘আমি আইরিশ পাবে পৌঁছে গেছি। সব কিছু ঠিকঠাক আছে।’
‘স্যাণ্ডির ডেটাবেস কেউ হ্যাক করে ফেলেছে,’ সুনয়নের গলার আওয়াজে প্যানিক। ‘আই ক্লাউডে বেনামে স্যাণ্ডি সব ডেটা রাখত যাতে পুলিশ রেইড হলে ধরা না পড়ে। ওখানে আপনার ফটো, জাল পাসপোর্টের স্ক্যান সব রাখা ছিল। দোতলায় এয়ারট্রেন— জ্যামাইকা এয়ারট্রেন স্টেশন। নিচে রাস্তায় আমি গাড়িতে থাকব।’
বাইরে A6 গেটের সামনে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটির তিনজন পুলিশ কোমরের বন্দুক স্পর্শ করে এয়ার ইণ্ডিয়ার স্ট্যাফদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ওরা প্যাসেঞ্জার ম্যানিফেস্ট খুলে দেখছে। ‘আমি একটু পরে ফোন করছি।’
বাইরে বেরিয়েই রিধিমা আবার বাথরুমে। একটানে উইগটা খুলে ফেলে ট্র্যাশবিনে ঠেসে দিল রিধিমা। তারপর শান্তভাবে বাইরে বেরিয়ে এসে উলটো দিকে হাঁটা লাগাল। মাঝে একবার পিছন ফিরে রিধিমা দেখল আরও কয়েকজন পুলিশ A6 গেটে ভিড় করেছে, রিধিমার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। ও নিশ্চিত যে এসব তাকে স্বাগত জানাবার জন্য। ওর পক্ষে আর ইণ্ডিয়া ফিরে যাওয়া সম্ভব না।
কেনেডি এয়ারপোর্ট যেন মানুষের সমুদ্র। তিনজন পুলিশ দ্রুতপদে হেঁটে গেল A6 গেটের দিকে। রিধিমা তাড়াতাড়ি পা চালাল। সামনে ব্যাগেজ ক্যারৌসেল, গ্রাউণ্ড ট্রান্সপোর্টেশন। রিধিমা সে দিকে না গিয়ে এসকালেটর দিয়ে সেকেণ্ড ফ্লোরে এয়ারট্রেন স্টেশনে উঠে এল।
এয়ারট্রেনটা দুমিনিটে আসবে। প্রত্যেক সেকেণ্ড যেন এক এক ঘন্টা লম্বা হয়ে গেছে। ট্রেনের দরজা খুলতেই একগাদা লোকের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে রিধিমা ভিতরে ঢুকল। পরের স্টেশন টার্মিনাল থ্রি। টার্মিনালে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। উইচ হান্ট শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ওর শেভ করা মাথার জন্য বোধহয় ওকে চেনা সহজ হচ্ছে না। টার্মিনালের স্টেশনগুলো পেরিয়ে ফেডেরাল সার্কেলে ট্রেনটা খালি হয়ে গেল। এখানে রেন্টাল কারের স্টপেজ— অ্যাভিস, ন্যাশনাল, বাজেট, অ্যালামো, হার্জ। হোটেলের শাটলগুলো এখানেই দাঁড়ায়। ট্রেনের দরজা বন্ধ হল। জ্যামাইকা স্টেশন আসতে রিধিমা প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ল৷ এলিভেটরের সামনে বেশ ভিড়, রিধিমা এলিভেটরে নামতে লাগল। এলিভেটর থেকে নেমে মেট্রো স্টেশনে না ঢুকে রিধিমা বাইরের রাস্তায় এসে নামল। সুনয়নের এখানেই থাকার কথা। রিধিমা চারদিকে তাকাল। সুনয়ন কোথায়?
৷৷ একত্রিশ ৷৷
‘খবর আছে,’ ওর্জুন অ্যাটর্নির ফোন।
‘কী খবর?’ সুনয়ন বাইরের জানলায় দৃষ্টি রেখে বলল।
‘লুসিকে ট্রেস করা গেছে।’
সুনয়নের মনের মধ্যে অশুভ চিন্তার ডাক। ‘আর হরিপরসাদ?’
‘ওকে এখনো পাওয়া যায় নি।’
‘কোথায় পাওয়া গেল লুসিকে?’
‘লেক জর্জ।’
‘লেক জর্জ? অতদূরে? ওখানে কী করছে হরিপরসাদ?’
‘সেটাই বিস্ময়কর,’ ওর্জুন বলল। ‘অ্যাকচুয়ালি জায়গাটা লেক জর্জ ভিলেজের পাশে অ্যাডিরনড্যাক পাহাড়ের ইন্টিরিয়রে। সিগন্যাল ভাল আসছিল না।’
‘কোঅর্ডিনেটটা লোকেট করা গেছে?’
‘হ্যাঁ, তাই একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করা গেছে।’
‘আশ্চর্য ব্যাপার?’
‘জায়গাটাতে ওরিয়েন্টাল বোধি সোসাইটির একটা বুদ্ধিস্ট মনাস্টারি আছে পাহাড়ের ওপর। তুমি এই সোসাইটির সম্বন্ধেই খোঁজ নিতে বলেছিলে।’
‘স্ট্রেঞ্জ! বুদ্ধিস্ট মনাস্টারিতে হরিপরসাদ কী করছে?’
‘আমি ওর বন্ধুকে লেজি বার্ডস রেস্টুরেন্টে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছি, হরি পরসাদ বুদ্ধিস্ট ছিল কিনা। হরিপরসাদ হিন্দু।’
‘হরিপরসাদ ওদিকে গেছে?’
‘সম্ভাবনা খুব। আজ একবার ওদিকে ঢুঁ মারব। তোমাদের ওদিকের খবর সব ঠিক তো?’
‘না, রিধিমা পালাতে পারে নি।’
‘ধরা পড়ে গেছে?’
‘এখনো জানিনা। না না, ওই যে ও স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাইরের রাস্তায়। আমাকে খুঁজছে। এখন রাখি। থ্যাঙ্কস।’ সুনয়ন ফোন রাখল।
৷৷ বত্রিশ ৷৷
রিধিমা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসে স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল— স্যান্ডিকে কি অ্যারেস্ট করেছে পুলিশ?’
‘স্যাণ্ডি বেঁচে গেছে, টর অনিয়নে এতগুলো এনক্রিপটেড লেয়ার যে তা ভেদ করে স্যাণ্ডি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ; সুনয়ন গাড়ি স্টার্ট করতে করতে বলল। ‘কিন্তু আপনার সঙ্গে পাসপোর্ট ফ্রডের কেসটাও জুড়ে গেল। আপনাকে আমেরিকান পুলিশের নাগালের বাইরে যেতে হবেই।’
আমি তো কোনও উপায়ই দেখছি না,’ রিধিমার হতাশ গলা।
‘বাইরে মানে ক্যানাডা হল ক্লোজেস্ট,’ সুনয়ন বলল। মন্ট্রিয়েল বা টোরান্টো থেকে দুবাই বা আবুধাবি দিয়ে ফ্লাই ব্যাক টু ইণ্ডিয়া। মন্ট্রিয়েল তিনশ পঁচাত্তর মাইল, নিউ হ্যাম্পশায়ার, ভারমন্টের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আড়াই শ’ মাইল গিয়ে তবে কেনেডিয়ান বর্ডার। ছয় ঘন্টায় আমি টেনে দিতে পারি, কিন্তু কেনেডিয়ান বর্ডারে এতক্ষণে খবর পৌঁছে গেছে।’
রিধিমা পায়ের কাছ থেকে ব্যাকপ্যাকটা টেনে তুলল। ব্যাকপ্যাক হাতড়াতে হাতড়াতে বলল— ‘বিক্রম প্রধান।’
‘নেপাল?’
‘হ্যাঁ,’ বিক্রমের ফোন নাম্বারটা বের করল রিধিমা।
‘সাবধানে হ্যাণ্ডেল করবেন। শুনেছি কিছু ডিপ্লোম্যাটের শরীরে শেয়ালের DNA থাকে।’ সুনয়ন গাড়ি নেপাল কনসুলেটের দিকে ঘোরাল।
নিউ ইয়র্কের নেপাল কনসুলেটের সামনে দাঁড়ালে বিশ্বাস হয় না এটা একটা কনসুলেট। একপাশে চাইনীজ কুইজিন, অন্য পাশে ইতালিয়ান পিৎজার দোকান, মাঝে দেওয়ালে সাঁটা কনসুলেট জেনারেল অব নেপালের পিতলের ফলক। কনসুলেটের সামনে সাইডওয়াকের ওপর রাস্তার ধার ঘেঁষে অন্ততঃ গোটা পনের কালো ট্র্যাশ ব্যাগ ডাঁই করে রাখা, বরফের জন্য ট্র্যাশ পিক আপ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই ট্র্যাশ জমেছে। বেশ কিছুটা দূরে উলটোদিকের রাস্তার কার্বে সুনয়ন গাড়িটা দাঁড় করাল।
নেপাল কনসুলেটের দরজা খুলে দু’জন চিনা লোক বেরিয়ে এল । একজন অভিজাত পোশাকে, হাতে সেলফোন, দেখলেই মনে হয় ফিলদি রিচ। সেলফোনে কারুকে কিছু ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে। অন্যজন অ্যাব লিঙ্কন দাড়ি, মাথায় ফ্লপি হ্যাট, ওকে দেখেই রিধিমা মাথা নিচু করল।
‘কী হল?’
‘এই সেই মেজর!’
‘পাশের লোকটা কে?’ সুনয়ন জিজ্ঞাসা করল৷
‘জানিনা। যেভাবে কথা বলছে মেজরের বস মনে হচ্ছে,’ রিধিমা বলল৷
সুনয়ন চটপট সেল ফোনে ছবি তুলল ওদের— ‘চার্চিক্স এদের আইডেন্টিফাই করে দেবে।’ সুনয়ন সেলফোনের স্ক্রিনে জুম করে লোকটার মুখটাকে বড় করে দেখল।
রাস্তার ধারে একটা পিক আপ ট্রাক এসে দাঁড়াল, পাঁচ-ছ’জন চিনা লোক ট্রাক থেকে নেমে এসে মেজরকে চারপাশে ঘিরে দাঁড়াল।
‘ঐ-ঐ-ঐ লোকটা হল কেভিন!’ রিধিমা ভয়ে সিঁটিয়ে গেল।
সুনয়ন কেভিনের দিকে ফোকাস করে ওর ফটোও সেলফোনের ক্যামেরাতে তুলে রাখল। তারপর তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট করল।
রিধিমা সেলফোনে বিক্রমকে ডায়াল করল।
‘হ্যালো,’ রিধিমার সেলফোনে অন্যদিক থেকে কথা ভেসে এল।
‘বিক্রম?’ রিধিমা বলল। ‘রিধিমা বোস বলছি, মোহন—’
‘হাই রিধিমা,’ বিক্রম প্রধানের আন্তরিক গলা। ‘আপনার কথা বলে রেখেছি মিনিস্টারকে। উনি যদিও খুবই ব্যস্ত, তবু কিছুটা সময় বের করা গেছে। এখন আসতে পারবেন কি?’
‘পনের মিনিট?’
‘নো প্রবলেম। চলে আসুন। আমি আছি।’
সুনয়ন গাড়ি রাস্তায় তুলল, তারপর দশ মিনিট এদিক ওদিক ঘুরে সুনয়ন গাড়ি নিয়ে এল নেপাল কনসুলেটের সামনে। এখন মেজর ও দলবলকে দেখা গেল না। সুনয়ন রিধিমাকে কনসুলেটের দরজায় নামিয়ে দিল।
‘এই পেনটা সঙ্গে রাখুন।’
‘পেন আছে,’ রিধিমা বলল।
‘এর মধ্যে একটা মাইক্রো ভয়েজ রেকর্ডার ইমপ্ল্যান্ট করা আছে। আমাদের রিপোর্টারদের খুব কাজে লাগে। গুড লাক।’
রিধিমা বুঝল। ল্যাপটপের ব্যাগ কাঁধে ফেলে রিধিমা নেপাল কনসুলেটের দিকে এগোতে এগোতে রিধিমা ভাবল ওই মেজর, কেভিন এরা কি সব নেপাল কনসুলেটের সঙ্গে জড়িত? এরা এখানে কেন?
৷৷ তেত্রিশ ৷৷
নেপাল কনসুলেটের মধ্যে আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত। কনসুলের অফিসে ঢুকিয়ে ফার্স্ট সেক্রেটারি বিক্রম প্রধান যাকে নেপালের মিনিস্ট্রি অব কালচার, ট্যুরিজম এণ্ড সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রী বলে পরিচয় করালো, সে কনসুলের চেয়ারে বসে তখনও রাগে ফুঁসছে। পাশের চেয়ারের বৃদ্ধ ভদ্রলোক নিজেকে নেপালের ডিপার্টমেন্ট অব আর্কিওলজির ডিরেক্টর জেনারেল ডঃ থাপা বলে পরিচয় দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সৌজন্যে হাত মেলাল রিধিমার সঙ্গে, কিন্তু মন্ত্রী শিষ্টাচারের ধারও ঘেঁষল না— আপনার মোটিভটা কী বলুন তো?’ মন্ত্রীর চোখে কুটিল সন্দেহ। ‘কেন আপনি আপনার দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে আমাদের সাহায্য করতে চান?’
দেশের বিরুদ্ধে যাচ্ছি না তো, আমাদের দুই দেশেরই যাতে লাভ হয় তারই চেষ্টা করছি।’
‘আপনি হার্ভার্ডে PhD করেন?’
‘হ্যাঁ। আমার PhD-র টপিক হল কপিলাবস্ত ।’
‘আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে কাল নেপাল UN-এ ইণ্ডিয়ার বিরুদ্ধে কপিলাবস্তু নিয়ে ডিবেট লড়তে যাচ্ছে?’
‘সেজন্যই আমি এখানে এসেছি। যাতে আমরা UN-এর বাইরেই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে পারি।’
‘অ, তাহলে আপনাকে ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্ট পাঠিয়েছে। কিন্তু এত লুকোচুপি কেন? আমরা কিন্তু পুরোদমে প্রস্তুত হয়েই এসেছি কাল UN-ডিবেটে আপনাদের হারাবার জন্য।’
‘ব্যাপারটা যতটা সহজ ভাবছেন তত সহজ না।’
‘তাই নাকি?’ —মন্ত্রীর মনে হল নিজেদের ওপর খুব আস্থা — ‘সেটা দেখাই যাবে কাল।’
‘আপনারা মে নাইনটিন নাইনটি সিক্সে কপিলাবস্তুর জন্য ইউনেস্কোর কাছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের রিকোয়েস্ট সাবমিট করেছেন। বাইশ বছর হয়ে গেল, ইউনেস্কোর অ্যাপ্রুভাল পেয়েছেন কি?’
‘ওটা আপনাদের ইণ্ডিয়া আর ব্রিটিশদের পলিটিক্স,’ মন্ত্রী বলল।
‘গ্যারান্টি কী যে এবারও সেই পলিটিক্সের শিকার আপনারা হবেন না?’
মন্ত্রী মুখে রাজসিক অবহেলা ফুটিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে’ বলুন আপনি কী বলতে চান?’
ট্রাস্ট মি স্যার, আমার অ্যাডভাইস শুনলে আপনাদের অনেক হেল্প হবে।’
‘হেল্প?’ মন্ত্রী বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বলল, আজ কী হল বলুন তো? সবাই আমাদের হেল্প করতে এখানে দৌড়াদৌড়ি লাগিয়ে দিয়েছে? কিন্তু ঐ চাইনীজ-অস্ট্রেলিয়ান হাইব্রিড বাস্টার্ডটাকে আর কোনও দিন এই কনসুলেটে আমি যেন না দেখি। সাহস কম না! আমাকে ধমকায়?’
‘পাঁচ বিলিয়ন কম নয়,’ ডঃ থাপা একটু নম্রভাবে বলল। ‘কিছু কণ্ডিশন তো সব ফাণ্ডিংয়েই থাকে।’
‘কণ্ডিশন! আমরা চোখে ঠুলি পড়ে বসে আছি?’ মন্ত্রী দু’আঙুল নিজের দু’চোখের দিকে তাক করে বলল। শ্রীলংকা ভুলে গেলেন? লোনের বোঝা আট বিলিয়ন ডলার। শ্রীলংকা টাকা দিতে না পারায় ওদের হামবান্টোটা পোর্ট এবং পনের হাজার একর জমি চিনকে নিরানব্বই বছর লিজ দিতে বাধ্য হয়েছে। চিন পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা নেপালের ওপর ফেলবে। তারপর গোটা বৌদ্ধ ধর্মস্থানগুলোকে চিন লিজে নিয়ে নেবে। আর আমি সেই মদত দেব চিনকে? তারপর মালদীভে? চিন ওদের এয়ারপোর্ট এবং ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছিল, এখন ওদের প্রত্যেক বছর বিরানব্বই মিলিয়ন ডলার ধার চোকাতে হয়। চিনের স্টাইল আমরা জানি না? লোনে লোনে আমরা তো বিক্রি হয়ে যাব! আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন!’
রিধিমা চেয়ারে বসতে বসতে এক নজরে কনসুলের অফিসের ভিতরটা দেখল। দিল্লীর বড় ট্রাভেল এজেন্সির জেনারেল ম্যানেজারদের অফিসও এর থেকে বড় হয়। ছোট ডেস্ক, তাতে মনিটর আর কম্পিউটার কী-বোর্ড। ডেস্কের একপাশে একগাদা ছোট ছোট ফ্ল্যাগ পেন হোল্ডারে ফুলের তোড়ার মত দাঁড় করানো। চাকা লাগানো চামড়ার কালো চেয়ারের পিছনের দেওয়ালে নেপালের রাজবাড়ির ফটো আর তার চারপাশে ভলেন্টিয়ারদের ব্যাজের মত অজস্র বড় বড় ব্যাজ দেওয়ালে সাঁটা। ডেস্কের একপাশের দেওয়াল জুড়ে কাঠের ক্যাবিনেট, তাতে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা ফাইলের পর ফাইল, নিচের তাকে একটা প্রিন্টার, স্ক্যানার। রিধিমা আন্দাজ করতে পারছে চিন লুম্বিনী প্রজেক্টের মত পাঁচ বিলিয়ন ডলার নেপালকে পাইয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু তার কিছু খটোমটো কণ্ডিশন আছে। রিধিমা কৌতূহল না দেখানোই উচিত ভেবে চুপ থাকাই ঠিক বিবেচনা করল। রিধিমা ভাবল যে প্ল্যান থেকে ডেভিয়েট করবে না। কনফিডেন্স নষ্ট করানো ওর ফার্স্ট স্টেপ। ওয়ান স্টেপ অ্যাট আ টাইম।
একজন চাপরাশি একটা ট্রেতে এক গ্লাস জল নিয়ে এল। মিনিস্টার চককে করে জলটা খেল, তারপর গোর্খা টুপিটা ঠিকমত মাথায় বসিয়ে বলল, ‘বলুন শুনি আপনার কী প্রোপোজাল?’
‘কাল UN-এর ডিবেটে ইণ্ডিয়া পিতরাওয়াকে কপিলাবস্তু বলে ক্লেইম করবে, রিধিমা বলল।
‘যত্তসব ফ্রড!’ নেপালের মিনিস্টারের চোখ রাগে লাল। পিতরাওয়াতে ব্রিটিশরা যে বুদ্ধের হাড় তুলে এনেছিল সেটা ধাপ্পাবাজি।’
‘কিন্তু ১৯৭১ সালে ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিস্টরা তো ওর ঠিক নিচ থেকে আবারও বুদ্ধের হাড় তুলে এনেছে,’ রিধিমা বলল।
‘ওগুলো আপনাদের ইণ্ডিয়া গভর্নমেন্টের চালাকি!’ মিনিস্টার ঝাঁঝিয়ে উঠল। ‘একটা নিজেদের ভাড়াটে আর্কিওলজিস্ট পাঠিয়ে দিলেন, আর সেম স্পটের জাস্ট এক হাত নিচের থেকে মাটি খুঁড়ে সে আরেক সেট বুদ্ধের হাড় বের করে আনল। আর ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা নিজেদের কেচ্ছা ধামাচাপা দিতে ইণ্ডিয়ার সঙ্গে নাচানাচি করে উঠল। এটা কি আলুর ক্ষেত নাকি? মাটির নিচে হাত ঢুকিয়ে এদিক ওদিক থেকে আলুর মত বুদ্ধের হাড় বের করে আনছে! আমি মানিনা!’
‘ইণ্ডিয়া তো আপনাদের এক্সক্যাভেশন নিয়ে একই কথা বলে,’ রিধিমা বলল।
‘ইয়ার্কি পেয়েছে? আমাদের এক্সক্যাভেশন নিউট্রাল লোকেদের দিয়ে করানো হয়েছে। দু’জন ব্রিটিশ আর্কিওলজিস্ট— ‘মিনিস্টার নামগুলো মনে করার চেষ্টা করল— ‘আজকাল স্ট্রেস হলে মেমোরি ভীষণ ফেল করে—’
‘ইংলণ্ডের ব্র্যাডফোর্ড ইউনিভার্সিটির রবিন কানিংহাম, আর আর্মিন ম্মিদ, ‘ডঃ থাপা মনে করিয়ে দিল।
‘হ্যাঁ, মাটির ১৩ ফিট নিচে কাঠের দেওয়াল পেয়েছে— এটাই রিয়েল কপিলাবস্তু।’
‘কিন্তু ‘বোনস অব দ্য বুদ্ধা’ ডকুমেন্টারিটা—?’
নামটা শুনেই মিনিস্টার জ্বলে উঠল— প্লিজ স্টপ! কয়েকটা এক্সক্যাভেশনের— মক-আপ সিন শুট করলেই ওটা রিয়েল হয়ে গেল?’
‘আপনার মতে তাহলে পিতরাওয়া একটা ফোর্জারি?’ রিধিমা বলল।
‘অ্যাবসোলিউটলি!’ মন্ত্রী বলল। মার্কাস ফিউরার ইউ মা’র সঙ্গে ফোর্জারি করেছিল। ঘোড়ার দাঁত দিয়ে বলেছিল বুদ্ধের দাঁত। ধরা পড়ে গেল। মার্কাস ফিউরার ব্রিটিশ কর্মচারি। ফোর্জারির সাজা তখন জেল। কিন্তু মার্কাস ফিউয়ারের তো জেল হল না! বলুন কেন?’
‘কেন?’
‘কেননা ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট মার্কাস ফিউরারকে বলেছিল তাকে জেলের সাজা থেকে রেহাই দেবে যদি মার্কাস ফিউরার একটা কাজ গোপনে করে দেয়।’
‘কী কাজ?’
‘পিতরাওয়ার লিপিটা ওকে দিয়ে কলসীর গায়ে লিখিয়ে নেয়। তিন দিন সময় ছিল। সুবিধা বুঝে ওটা স্তূপের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ব্যাস, কপিলাবস্তু হয়ে গেল ইণ্ডিয়ার। আচ্ছা, আপনারা ইণ্ডিয়ানরা কি ইতিহাসকে নিজের ইচ্ছা মত চালাবেন? গ্রেট চাইনীজ ট্রাভেলার হিউয়েন সাঙ ক্লিয়ারলি লিখে গেছেন যে কপিলাবস্তু নেপালে, তাকে কি আপনারা এতটুকু ইম্পরটেন্স দেবেন না? ডঃ থাপা আপনি বলুন—’
‘নতুন করে কী আর বলব, ইনি ইতিহাসের ছাত্রী, সবই জানেন,’ ডঃ থাপা এবার বিরক্ত হয়ে বলল। ‘হিউয়েন সাঙ বলেছে লুম্বিনী থেকে চৌদ্দ মাইল পশ্চিমে কপিলাবস্তু। যদি হিউয়েন সাঙের বর্ণনা মিলিয়ে একটা চৌদ্দ মাইল রেডিয়াসের বৃত্ত আঁকি, তবে সেটা নেপালের তিলৌরাকোটকে কাট করে।’
‘অর্ধেক ইতিহাস টেনে নিজেদের মত করে ব্যবহার করবেন না, ডঃ থাপা,’ রিধিমা বলল। ‘ফা-হিউয়েনকে ভুলে গেলেন? হিউয়েন সাঙের দু’শ বছর আগে ৪০৫ খ্রিষ্টাব্দে ফা-হিউয়েন ভারতে এসেছিলেন। ফা-হিউয়েন বলে গেছিলেন যে লুম্বিনী থেকে পঞ্চাশ লি পশ্চিমে কপিলাবস্তু। যদি লুম্বিনী বা রুম্মিন-দেই থেকে পঞ্চাশ লি বা নয় মাইল রেডিয়াসের একটা বৃত্ত পশ্চিমে টানা যায়, তবে সেই বৃত্তে পিতরাওয়া ছাড়া আর কোনও ধ্বংসস্তূপকে কাট করে না। সুতরাং ইণ্ডিয়ার পিতরাওয়া হল ফা-হিউয়েনের কপিলাবস্তু।’
‘কিন্তু হিউয়েন সাঙ?’ এবার নেপালের মন্ত্রী বললেন। ‘তার কথার তাহলে কোনও দাম নেই?’
‘এজন্য ভারত বলে ফা-হিউয়েনের পিতরাওয়াই হল কপিলাবস্তু, আপনারা তা মানেন না। আর আপনারা বলেন হিউয়েন সাঙের তিলৌরাকোট হল কপিলাবস্তু, ভারত তা মানে না। এই নিয়েই আপনাদের কালকের ডিবেট। দুটো আলাদা জায়গা। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ বলেছিলেন যে স্থানীয় লোকেরা দু’জন ভ্রমণকারীকে কপিলাবস্তুর দুই প্রান্ত দেখিয়েছিল। ভারতের পিতরাওয়া হল কপিলাবস্তুর দক্ষিণ প্রাপ্ত আর তিলৌরাকোট কপিলাবস্তুর উত্তর প্রাপ্ত। এই ফা-হিউয়েন আর হিউয়েন সাঙ ঝগড়ার কোনও সমাধান হবে না। তাছাড়া হিউয়েন সাঙ কপিলাবস্তু শহরের বর্ণনা দেন যে চারদিকে ধ্বংসাবশেষ, রাজপ্রাসাদের কাছে একটা মনাস্টারিতে কেবল জনমানুষ আছে। আপনাদের নেপালের কপিলাবস্তুতে কিন্তু ওরকম কোনও মনাস্টারি পাওয়া যায় নি। বরং ইণ্ডিয়ার পিতরাওয়াতে মনাস্টারি পাওয়া গেছে।’
‘মিস বোস,’ এবার শান্ত কণ্ঠে ডঃ থাপা বললেন। ব্রিটিশরা বা ভারতীয়রা কে কী বলে ওসব নিয়ে ইতিহাস লেখা হয় না। নেপাল গভর্নমেন্ট, ইউনেস্কো এবং জাপানি সহায়তায় জিওফিজিক্যাল সার্ভে, ড্রোন ম্যাপিং এবং জিওআর্কিওলজি করে আমরা এখন কনফার্ম করেছি যে এখানে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে একটা শহর ছিল। সেই শহরটা খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে কাঠের বেড়া দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়। পরে সেই বেড়ার স্থানে ইট ও মাটির দেওয়াল তুলে কেল্লা বানানো হয়। সেটাই কপিলাবস্তু।’
‘আমি পড়েছি সে রিপোর্ট,’ রিধিমা বলল। ‘কতটা জায়গা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল?’
‘উত্তর দক্ষিণে ১৬০০ ফিট, পুব পশ্চিমে ১০০০ ফিট,’ ডঃ থাপা বলল।
‘১৬০০ বাই ১০০০ ফিটে একটা শহর হয়ে যায়?’ রিধিমা বলল। ‘এক্সক্যাভেশন করে কী পাওয়া গেছে সেটা দেখলে ইণ্ডিয়ানদের ক্লেইম অনেক স্ট্রং।’
‘কীভাবে?’ মন্ত্রীর উঁচু কণ্ঠস্বর। ‘আপনাদের ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিস্টরা মাটি খুঁড়ে রাজা শুদ্ধোদনের কোনও উইল টুইল পেয়েছেন নাকি যেখানে বলা আছে কপিলাবস্তু আমি ইণ্ডিয়াকে দিয়ে যাচ্ছি?’ মন্ত্রীর কন্ঠে যুগপৎ রাগ ও ব্যঙ্গ।
রিধিমা ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘ইণ্ডিয়ান আর্কিওলজিস্টরা পিতরাওয়ার চারপাশের মাটি খুঁড়ে আবিষ্কার করেছিলেন কয়েকটা মাটির ফলক, তাতে ব্রাহ্মীতে লেখা আছে—
“ওম দেবপুত্র বিহারে কপিলবস্তু ভিক্ষু মহাসঙ্ঘস।”
এবং
“ওম দেবপুত্র বিহারে কপিলবস্তু ভিক্ষু সঙ্ঘস।”
‘পরিষ্কার লেখা আছে কপিলাবস্তু, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে যে পিতরাওয়া হল কপিলাবস্তু।’
ডঃ থাপা সুবিধা করতে না পেরে প্রসঙ্গ পালটালো।
‘কিন্তু পিতরাওয়া থেকে পাওয়া কলসীর ইন্সক্রিপশনে কোনও যুক্তাক্ষর নেই কেন?’
‘মানে?’
‘তখনকার দিনের পালি লিপিতে প্রচুর যুক্তাক্ষর লেখা হত৷ অশোকের শিলালিপি দেখলেই সেটা বোঝা যায়। এই দেখুন—’

‘এক লাইনে কতগুলো যুক্তাক্ষর দেখেছেন?’ ডঃ থাপা ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখাল৷
‘রাইট!’ মন্ত্রী সমর্থন করল ডঃ থাপাকে। ‘বলুন, তাহলে পিতরাওয়ার লিপিতে একটাও যুক্তাক্ষর নেই কেন?’ মন্ত্রী এমন ভাবে জিজ্ঞাসা করল যে যেন যুক্তাক্ষর লেখাবার দায়িত্বটা রিধিমার ওপর ছিল। মন্ত্রী তারপর ডঃ থাপাকে বলল, ‘আর সেদিন ওই যে পুৎ আর পুত্রটা বললেন সেটা বলুন এনাকে—’
‘হ্যাঁ,’ ডঃ থাপা বলল। ‘প্রাচীনকালে পুত্রকে লেখা হত পুত্ত৷ তবে পিতরাওয়ার কলসীর ইনস্ক্রিপশনে সপুতদলনং কথাটা এল কীভাবে? শাক্যেরা লিখলে সপুত্তদলনং লিখত।’
ডঃ থাপা, আপনি কখনো ভারতের সাঁচীস্তূপ দেখেছেন?’ রিধিমা বলল।
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনার পয়েন্টটা কী?’
‘ভারতের প্রাচীন সাঁচীস্তূপ বানানো হয়েছিল অশোকের মৃত্যুর কিছু পরে। সাঁচীস্তূপের গায়ে একশ ষাটটা প্রস্তরলিপির মধ্যে মাত্র তিনটে যুক্তাক্ষর সাঁচীস্তূপের লিপিতে রক্ষিতকে ‘রখিত’ লেখা হয়েছে, শ্রেষ্ঠীকে ‘শেঠি’, ভিক্ষুকে ‘ভিছু’, প্রতিস্থানকে ‘পতিথান’, গ্রামকে ‘গাম’ লেখা হয়েছে।’ রিধিমা মন্ত্রীর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে কি আপনারা বলবেন গোটা সাঁচীস্তূপের দেওয়াললিপিগুলোও ফ্রড?’
ডঃ থাপা নিরুত্তর।
‘আপনাকে একটা জিনিস দেখাই,’ রিধিমা এবার নিজের ল্যাপটপ খুলল। ‘বুদ্ধের এক প্রধান শিষ্য ছিলেন সারিপুত্র। বুদ্ধের নির্ব্বাণলাভের কয়েক বছর আগে সারিপুত্রের মৃত্যু হয়। সারিপুত্রের চিতার অস্থি পাওয়া যায় সাঁচীর কাছে শতধারার স্তূপে। সেখানে ভস্মাধারের গায়ে লেখা ছিল—

সারিপুতস। আর ওখানে বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী মোগালিপুত্রের চিতার পোড়া হাড় পাওয়া যায়। অশোকের সময় বৌদ্ধধর্মের যে তৃতীয় ধর্মমহাসভা হয়েছিল, মোগালিপুত্র ছিল তার সভাপতি। সেই মোগালিপুত্রের স্টিয়াটাইট বক্সের নিচে লেখা ছিল— এই যে—

এটা কী লেখা আছে ডঃ থাপা?’ রিধিমা বলল ।
‘ওয়েল, আমি ব্রাহ্মী ঠিক স্টাডি করিনি। আমি ইংলিশ ট্র্যানস্লেশন—’
‘নো প্রবলেম, আমি পড়ে দিচ্ছি— সপুরিসস মোগলিপুতস। মানে ইংলিশে রেলিকস অব দ্য ইম্যান্সিপেটেড মোগালিপুত্র। আপনি UN-এ কাল এই পুত্তের লজিকটা দিলে আমি ভারতের হয়ে এই কাউন্টার লজিক দিতাম। তাতে আপনার ইতিহাসের নলেজ নিয়ে লোকেরা সংশয় প্রকাশ করত। আর কপিলাবস্তুর ওনারশিপের দাবী তো ভুলেই যেতে হত।’
‘ওকে ওকে,’ ডঃ থাপার গলার রুক্ষতায় মনে হল রিধিমার কথা ওর ইগোর লেজে কাঁচি চালিয়ে দিয়েছে। ‘নেপালের তৌলিহাওয়ার কাছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে মার্কাস ফিউরার সতেরটা স্তূপ খুঁড়ে যে শাক্যদের হাড় বের করে সেটা তো অস্বীকার করতে পারেন না। এই জায়গাতেই বিরুধকের কোশল সেনা কপিলাবস্তু আক্রমণ করে শাক্যদের গণহত্যা করেছিল। তাই প্রমাণিত হয় যে ওটাই কপিলাবস্তু।’
‘আপনারাই বললেন যে মার্কাস ফিউরার একজন এস্টাব্লিশড ফ্রড। হাড় পেয়েছিল কিনা সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ভিনসেন্ট স্মিথ বলেন ফিউরারের কথা মিথ্যা।’
‘হ্যাং অন,’ ডঃ থাপা রিধিমাকে থামিয়ে দিল। ‘এটা তো মিথ্যা না?’ ডঃ থাপা ল্যাপটপের স্ক্রিনে ছবিটা আনল। ‘এগুলো মার্কাস ফিউরার স্তূপ খুঁড়ে স্তূপের মেঝেতে পেয়েছে।’
‘প্রত্যেক স্তূপের মেঝেতে ইটের টালিতে মোটামুটি এই একই ছবি পাওয়া গেছে। বলুন এত অস্ত্রশস্ত্র কেন আঁকা?’
‘আপনার মনে হয় কেন?’
‘এই আঁকা অস্ত্রগুলো যুদ্ধে মৃত শাক্যদের অস্ত্রের ছবি। বৌদ্ধস্তূপগুলো শাক্যদের হাড়-গোড়ের ওপর বানানো হয়েছে। তাই কপিলাবস্তু নেপালেই।’

‘ভুল বলেছেন। ওগুলো বৌদ্ধ স্তূপই না। বৌদ্ধস্তূপের মেঝে বর্গাকার হয় না, গোল হয়।’
‘তাতে কী প্রমাণ হল?’ নেপালের ফরেন মিনিস্টার জোর দিয়ে বলল। ‘ছবিটা ভাল করে দেখুন। কত অস্ত্র আঁকা— বর্শা, সোর্ড—’
‘আমি আগে এটা অনেকবার দেখেছি। মার্কাস ফিউরারের ড্রাফটসম্যান ভৈরব বক্সের আঁকা। প্রতি স্ট্রাকচারের মাঝে দেখতে পাবেন একটা পদ্মফুল। প্রতিটি পদ্মফুলের আটটা পাপড়ি, আর পদ্মফুলের চারপাশে আটটা স্কোয়্যার।’
‘হোয়াট ডাস দ্যাট সিগনিফাই?’
‘এই আটটা পাপড়ি আট দিক নিদর্শন করে।’
‘আট দিক?’
‘হ্যাঁ পুব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ ছাড়াও হিন্দুদের ঈশান, অগ্নি, নৈঋত, বায়ু।’
‘আর এই আঁকা অস্ত্রশস্ত্রগুলো?’
‘হিন্দুদের আট দিকে থাকে অষ্ট দিকপাল। এই অস্ত্রগুলো অষ্টদিকপালের আয়ুধ— ইন্দ্রের বজ্র, অগ্নির শক্তি বা বর্শা, যমের দণ্ড, নৈঋতের খড়া, বরুণের পাশ, বায়ুর ধ্বজ, কুবেরের গদা, আর ঈশানের ত্রিশুল। এগুলো হিন্দুসের দেবতা, এদের সঙ্গে শাক্যদের অস্ত্রের কোনও সম্পর্কই নেই।’
‘এগুলো কি আপনার থিওরি?’
‘ভারতের প্রথম মহিলা আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়ার হেড ছিলেন দেবলা মিত্র। ওঁর এই থিওরি ভারতীয় আর্কিওলজিস্টরা কাল UN ডিবেটে নিয়ে যাচ্ছেন।’
রিধিমা দেখল মিনিস্টারের মুখটা ঝুলে গেল।
রিধিমা বলল, ‘যে পদ্মটা আঁকা, তাকে ধরণী বলে। ‘বিশ্বকর্ম-প্রকাশ’ অনুযায়ী পদ্মচিহ্ন মানে সাফল্য। যুদ্ধে মৃত শাক্যের কবরে পদ্ম আঁকার কোনও মানেই হয় না, মরা সৈনিকের সাফল্য প্রার্থনা করে কী হবে? সে তো অলরেডি ডান।’
‘তাহলে ওটা কী?’
‘ওটা ভিত্তিপ্রস্তরের নিধি-কুম্ভ। ভিত স্থাপন করার সময় তামার ধাতুর কুম্ভে রত্ন, সোনা-রূপার বাস্তু সাপ, চাল এসব রাখা হত—’
‘তাহলে যে হাড় পাওয়া গেছে?’
‘ওর মধ্যে হাড় থাকতেই পারেনা। ওগুলো মার্কাস ফিউরারের মিথ্যা প্রচার। ‘এসব আপনাদের গাঁজাখুরি থিওরি, মিনিস্টার বলল। ‘আমি তো একশবার বলব স্তূপগুলো শাক্যদের হাড়-গোড়ের ওপর বানানো হয়েছে ব্যাস, ওটা ওদের শ্মশান। অতএব ওটাই কপিলাবস্তু।’
‘শাক্যদের হাড়-গোড়ের ওপর স্তূপ? যার তার হাড়-গোড়ের ওপর স্তূপ বানানো যায় না,’ রিধিমা বলল ।
‘বানালেই হল, কে আটকাচ্ছে?’ মিনিস্টার বলল।
‘ভগবান বুদ্ধ। উনি বলে দিয়েছিলেন কার কার শরীরের অস্থির ওপর স্তূপ বানানো যেতে পারে।’
‘আচ্ছা? তাই নাকি? তা কার কার ওপর বানানো যায়?’
‘মহাপরিনিব্বান সুত্তংয়ের পঞ্চমভাগে আছে আনন্দ জিজ্ঞাসা করলেন ভগবান, কে স্তূপের যোগ্য? ভগবান বুদ্ধ বললেন চত্তারোমে আনন্দ ধূপারহা— আনন্দ, চাররকম মানুষ স্তূপের যোগ্য। তথাগতো, পচ্চেকসম্বুদ্ধ, তথাগতস সাবকো, রাজা চক্কবত্তী থূপারহোহতি— অর্থাৎ তথাগত বা বুদ্ধ স্বয়ং স্তূপের যোগ্য, এছাড়া প্রত্যেক সম্বুদ্ধ, তথাগতের শ্রাবকেরা এবং রাজচক্রবর্তী স্তূপের যোগ্য।’ রিধিমা মন্ত্রীর বিরক্ত মুখের দিকে তাকাল। মনে হল বুদ্ধের এই— ডিসিশন মিনিস্টারের ঘোর অপছন্দ হয়েছে।
‘সেজন্য বুদ্ধের শিষ্য সারিপুত্র ও মৌদগল্যায়নের শরীর ধাতু নিয়ে সাঁচীতে বানানো হয়েছিল। কিন্তু শাকাদের রাজা শুদ্ধোদন রাজচক্রবর্তী ছিলেন না। তাই তারও কোনও স্তূপ নেই। যেহেতু রাজার স্তূপ নেই, তাই এটা কখনোই সম্ভব না যে শাক্য প্রজাদের জন্য সতের-আঠারোটা স্তূপ বানানো হবে।’ রিধিমা মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার বলি স্তূপ কোথায় হওয়া সম্ভব?’
‘বলুন’ মন্ত্রীর দৃষ্টিতে অন্যমনস্কতা।
‘মহাপরিনিব্বানসুত্তং বইতে লেখা ছিল যুদ্ধের শরীর ধাতু নিয়ে কোথায় কোথায় দশটি স্তূপ স্থাপনা হয়েছিল। ওখানেই লেখা আছে— কাপিলবথুবাপি সন্ধ্যা কপিলবথুূুস্মিং ভগবতো সরীরানং থূপঞ্চ মহঞ্চ অকংসু। অর্থাৎ কপিলাবস্তুবাসী শাক্যরাজগণ কপিলাবস্তুতে ভগবানের দেহাবশেষের স্তূপ নির্মাণ ও পূজা করলেন,’ রিধিমা ল্যাপটপ বন্ধ করল। ‘সুতরাং কপিলাবস্তুতেই বুদ্ধের শরীর স্তূপটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আপনাদের নেপালের সো কলড গোটা কপিলাবস্তুতে ওরকম কোনও স্তূপ নেই। ওই এলাকায় পিতরাওয়াতেই একমাত্র স্তূপ আছে।’
মিনিস্টার বিরোধী পক্ষের উকিলের মত বলল, ‘তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম যে আপনাদেরটাই কপিলাবস্তুর স্তূপ। এটাও তো হতে পারে যে সেই স্তূপটা কপিলাবস্তু শহর থেকে বাইরে কিছুটা দূরে পিতরাওয়ার নির্জন স্থানে তৈরি করা হয়েছিল যাতে লোকে নির্জন জায়গায় শান্তিতে পূজা করে।’
‘শাস্ত্র তা বলে না,’ রিধিমা বলল। ‘বুদ্ধের অন্যতম শিষ্য আনন্দ প্রভু বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন— কোথায় বুদ্ধের অস্থির স্তূপ হওয়া উচিত? বুদ্ধ তখন বলেছিলেন চতুমহাপথে তথাগতসস থুপো কাতব্বো। চারটে রাজপথের মিলন স্থানে স্তূপ কর্তব্য। মহাপথ বা রাজপথ রাজধানীতেই থাকত। তাহলে সেই স্তূপ কপিলাবস্তুতেই বানাতে হবে রাজধানীতে চার মহাপথের— সংযোগস্থলে, দূরে নির্জন মাঠে বা জঙ্গলে না।’
ডঃ থাপা হতাশ হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করল।
দু-পক্ষে সাময়িক নীরবতা। রিধিমা বলল, ‘ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট ডিক্লেয়ার করলে ট্যুরিজম চড়চড় করে বেড়ে উঠবে, চিনের ডলারের ওপর আপনাদের নির্ভর করতে হবে না। সেজন্য আমার মতে আপনারা একটা প্রোপোজাল আনুন। ভারতের সঙ্গে হাত মেলান, আপনাদের উপকারই হবে।’
‘ঠিক আছে আপনি বলুন, আপনি কী সাজেস্ট করেন?’ মিনিস্টার বলল।
‘লং স্টোরি শর্ট, কপিলাবস্তুর কিছুটা আছে নেপালে, কিছুটা ভারতে। দুটো মিলিয়েই আমাদের কপিলাবস্তু। এটা তো আপনি মানেন?’
‘বলে যান আমি শুনছি, ‘মন্ত্রী বলল।
‘আমার মতে আপনারা ইউনেস্কোকে প্রোপোজ করুন যে কপিলাবস্তু দুদেশের জয়েন্ট হেরিটেজ সাইট’ রিধিমা বলল।
‘জয়েন্ট হেরিটেজ সাইট? দু-দেশ? তা আবার হয় নাকি?’ মন্ত্রী বিরক্ত।
‘কেন হয় না?’ রিধিমা প্রশ্ন করল। ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ‘মন্টি সান গিরোজিও’ ইতালি ও সুইটজারল্যাণ্ড ভাগাভাগি করে নিয়েছে, ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আল্পসের প্রিহিস্টোরিক পাইল ডোয়েলিংস ইতালি, অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, স্লোভেনিয়া আর সুইটজারল্যাণ্ড ভাগ করে নিয়েছে। তাহলে কেন ভারত ও নেপাল দু’জনেই জয়েন্টলি কপিলাবস্তুর অধিকার পাবে না?’
মন্ত্রী কৌতূহলে ডঃ থাপার দিকে তাকাল।
ডঃ থাপা সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘আমি মনে করি এটা দুদেশের পক্ষেই একটা উইন-উইন স্ট্রাটেজি।’
এবার মন্ত্রী রিধিমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাদের ইণ্ডিয়া এসব মানবে?’
‘সত্যি কথাটা হল— না মানবে না,’ রিধিমা বলল।
‘তবে?’ মন্ত্রী দু’হাত ছড়িয়ে বিস্ময় প্রকাশ করল।
‘আপনাদের যুক্তির দুর্বলতা যেমন আমি দেখালাম, সেরকম ভারতের যুক্তিরও অনেক দুর্বলতা আমি জানি। ওদের আমি সেটা ওদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছি, সেজন্য ওরা চায়না আমি UN এর এই সেমিনারে যাই।’
‘তাহলে আপনার প্ল্যানটা কী?’
‘ডিবেট একবার শুরু হয়ে গেলে আপনাদের যুক্তির আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ইউনেস্কো দু’জনের ওপর থেকেই কনফিডেন্স হারাবে, এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের দাবিকে ঝুলিয়ে রাখবে। এতে ইউনেস্কোর কিছু আসে যায় না। কিন্তু লুজার হবে নেপাল ও ইণ্ডিয়া। আমি চাই ডিবেটের আগে আপনারা একবার দু’পক্ষ কথা বলুন।’
‘আইডিয়াটা মন্দ না। UN মিটিঙের আগে একবার ইনফরমালি কথা বলাই যায়। ঠিক আছে, আমি ইণ্ডিয়ান কন্টিজেন্টকে একটা প্রি-ডিবেট মিটিঙের জন্য ইনভাইট করছি। মিটিঙটা হবে UN-এ। আপনি থাকবেন, ইন্ডিয়ার উইক পয়েন্টগুলোও আপনি সেখানে ডিসকাস করবেন, দেখা যাক কাজ হয় কিনা।’
‘কিন্তু আমি তো UN এ ঢুকতে পারব না।’
‘কেন?’
‘আমার ইভেন্ট পাস নেই। আমাকে ইণ্ডিয়া ইভেন্ট পাস দিতে অস্বীকার করেছে। আমি যদি ঢুকতে পারতাম, তাহলে শিওর—’
‘আমরা দেব আপনাকে ইভেন্ট পাস। আপনি আমাদের হেল্প করবেন। রাজি?’
‘রাজি’ রিধিমার মন আনন্দে নেচে উঠল।
হঠাৎ মন্ত্রীর ফোন বাজল। ফোন শুনতে শুনতে মন্ত্রীর চোখে বিস্ময়, বিরক্তি জেগে উঠল। ‘রিয়্যালি!’ মন্ত্রী রিধিমার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিয়ে এস।’ মন্ত্রীর ফোন নামিয়ে রাখার আগেই কনসুলেটের একজন স্ট্যাফ ঝোড়ো হাওয়ার মত দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। হাতে খবরের কাগজ। মন্ত্রী কাগজটা সকলের সামনে ডেস্কে ফেলল। কাগজে রিধিমার ছবি। তার নিচে লেখা—
হার্ভার্ড সিরিয়াল কিলার নাউ ইলিউডেড নিউ ইয়র্ক কপস।
মন্ত্রী কাগজটা দেখিয়ে বলল, ‘এটা আপনিই তো?’
রিধিমা ইতস্ততঃ করে বলল, ‘এটা মিথ্যা।’
‘শাট আপ!’ মন্ত্রী ধমক লাগাল। ‘আমাকে ফাঁসাতে এসেছেন? আপনার প্ল্যান আমি বুঝি না ভাবছেন? এজন্যই ইণ্ডিয়া আপনাকে এড়িয়ে গেছে। মিঃ প্রধান এবার মিনিস্টার প্রধানের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন, ‘একটা ইণ্ডিয়ান খুনি মেয়ে তিন চারদিন ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কাগজে নাম ছবি ছাপা হচ্ছে, অথচ আপনারা এটা জানেন না?’
‘আমি একে চিনি স্যার,’ বিক্রম প্রধান অবস্থা সামাল দেবার চেষ্টা করল। ‘এ নির্দোষ।’
‘তার মানে? আপনি ক্রিমিনাল কোর্টের জাজ নাকি?’ মন্ত্রী আরও ক্ষেপে গেল। ‘আপনি জানতেন? অথচ আমাকে বলেন নি? আপনার এগেন্সটে আমি পিএম এর কাছে রিপোর্ট করব। আপনি ইমিডিয়েট পুলিশ ডাকুন।’
বিক্রম প্রধান বলল, ‘স্যার, পুলিশের ঝামেলার মধ্যে না যাওয়াই আমাদের পক্ষে মঙ্গল। একে যেতে দিন। আমরা বলব ইনি আমাদের এখানে আসেন নি, ব্যাস মিটে গেল। পুলিশ একবার আসলে আমাদের সবাইকে নিয়ে টানা—’
মন্ত্রী দুটো বড় বড় শ্বাস নিয়ে রিধিমার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘গেট আউট!’
রিধিমা ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।
৷৷ চৌত্রিশ ৷৷
রিধিমা বাইরে এসে রাস্তার ধারের হণ্ডাতে উঠল। ‘হল না,’ রিধিমা হতোদ্যম।
‘সব শুনলাম,’ সুনয়ন বলল। ‘খুব ইম্পর্টেন্ট কথা আছে। আগে গাড়িটা এ তল্লাট থেকে সরাই।’ সুনয়ন গাড়ি স্টার্ট করল। আপনি র্যাটল স্নেকের গর্তে পা দিয়েছেন।’
‘মানে?’
‘আপনাকে যারা মারতে চেয়েছিল ওই কেভিন এবং মেজর, নেপাল কনসুলেটের বাইরে ওদের সঙ্গে একটা বস টাইপ দেখতে লোক ছিল।’
‘হ্যাঁ।’
আপনি যখন নেপাল কনসুলেটে ঢুকলেন, আমি তখন ওদের ফটোগুলো ওর্জুন অ্যাটর্নির কাছে পাঠালাম চার্চিক্সে রান করাবার জন্য। ওই লোকটা হল লি ঝেন।’
‘কে এই লি ঝেন? ‘
লি ঝেন পৃথিবীর প্রথম এক হাজার ধনীদের লিস্টের একজন। একজন ফিল্যানথ্রপিস্ট, আফ্রিকায় AIDS-এর বিরুদ্ধে ওর ঝেন ফাউণ্ডেশন লাগাতার লড়াই করে চলেছে, কিন্তু আসলে একজন নটোরিয়াস ক্রিমিন্যাল, ওয়েপনস ডিলার! এক সময়ে চিনের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের জেনারেল ছিল, বিরুদ্ধে ঘুষ ও ইল্লিগাল আণ্ডারহ্যাণ্ড আর্মস ট্রেডের অভিযোগে চিনা গভর্নমেন্ট ওকে বরখাস্ত করে। মারাত্মক নিষ্ঠুর লোক এই জেনারেল ঝেন। চিনের আর্মিতে ঘুষের অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাবাস ওর কপালে ঝুলছিল। তখন জেনারেল ঝেন চিন ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব নেয় এবং গোপনে আর্মস ডিলারশিপ শুরু করে খুব শীঘ্রই একজন ধনকুবের হয়ে ওঠে। ইণ্ডিয়াতে লোকেটেড টেররিস্টদের অস্ত্র বিক্রি করে। অ্যান্টিক বিজনেসেও ইনকাম। অনেক দেশের পুলিশ, মন্ত্রী সকলকে ও নিজের পে-রোলে রেখেছে। ভীষণ ডেঞ্জারাস। আপনাকে প্রত্যেক স্টেপ অনেক সাবধানে ফেলতে হবে।’
‘আমি এখন কী করব?’
‘আপনাকে যেভাবেই হোক UN-এ ঢুকতে হবে।’
‘কিন্তু আমি তো কোনও উপায় দেখছি না।’
‘একটা উপায় আছে। তবে রাস্তাটা বড্ড রিস্কি,’ সুনয়ন সেল ফোনে সার্ফ করতে করতে বলল।
‘অনেক রিস্ক নিয়েছি এই কদিনে। আরও নেব। আপনি বলুন।’
‘UN বিল্ডিংয়ে চার রকম ভাবে ঢোকা যায়। এক— ইভেন্ট ডেলিগেটস, সেটা রুলড আউট, দুই— UN সেক্রেটারিয়েট স্ট্যাফ, সেটাও সম্ভব না, তিন— UN এর অ্যাক্রেডিটেড হাজার দুয়েক আমাদের মত জার্নালিস্ট, সেটাও সম্ভব না, ফাইনালি চার— পাবলিক ভিজিটার। UN-এ সাধারণ পাবলিকের জন্য গাইডেড ট্যুর থাকে। আমি গাড়িতে বসে বসে প্ল্যান বি’র রিসার্চ করছিলাম। কাল লাঞ্চের পর দুপুর একটায় একটা গাইডেড ট্যুর আছে। এই ট্যুরে UN হেড কোয়ার্টারসের ভিতরে কিছু সিলেক্টেড জায়গা পাবলিককে ঘুরে ঘুরে দেখায়।’
‘কিন্তু ভিজিটার পাস? সেটা কীভাবে জোগাড় করব?’ রিধিমা বলল।
‘আমি ব্যবস্থা করছি।’ সুনয়ন ল্যাপটপে দ্রুত আঙুল চালাতে লাগল। ঠিকানা, ইমেইল আইডি— সব লিখে ড্রপ ডাউন মেনুতে ক্রেডিট কার্ড নম্বর পাঞ্চ করে বাইশ ডলার পে করল। ভেণ্ডিনির টিকিট স্ক্রিনে হাজির হল।
‘মহাদেবী শিউচরণ?’ রিধিমা বলল।
সুনয়ন মহাদেবীর DMV লাইসেন্সটা ওয়ালেট থেকে বের করল। ‘লাইসেন্সটা সারেণ্ডার করার জন্য ওয়ালেটেই রয়ে গেছে। মহাদেবীর উইগ আর চশমায় আপনাকে মহাদেবীর মত দেখতে লাগে। খুব খুঁটিয়ে না দেখলে পার্থক্যটা বোঝা যায় না। এক ঘন্টা আগে UN-এ ঢোকার এন্ট্রি পাস নিতে গেটের ঠিক উলটোদিকের সিকিউরিটি অফিসে হাজির হতে হবে। এইট ও ওয়ান ফার্স্ট অ্যাভিনিউ ফর্টি ফিফথ স্ট্রীট। এটার একটা প্রিন্ট আউট চাই।’
সুনয়নের ফোন বাজল। ওর্জুন অ্যাটর্নি— কোবরা-কিস ইজ ইন।’
‘রিয়্যালি?’ সুনয়নের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল— ‘কোথায়?’
‘সার্ভার রুমে।’
‘সার্ভার রুমে কীভাবে আনলে?’
‘কোবরা-কিস’এর ডিলারের জন্য ও ক’দিন খুব খোঁজাখুঁজি করছিল ডাবল অ্যারোতে। আমার ‘কোবরা-কিস’ এর সেলারের অ্যাডের টোপটা ও গিলল। বাকিটা সিম্পল ট্র্যাপ।’
‘এক্ষুনি আসছি,’ সুনয়ন উত্তেজিত হয়ে ফোন রাখল।
‘ওর্জুন অ্যাটর্নি কাকে ধরেছে?’
‘টিপ অব আইসবার্গ, গভীর জলের নিচে থাকা ডার্কনেট ডাবল অ্যারোর অ্যাডমিন।’ সুনয়ন গ্যাসে চাপ দিল। ‘ডেভিড হু।’
